📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ২.৩: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং ইসলামের দাওয়াত ও জিহাদ-ব্যবস্থা

📄 ২.৩: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং ইসলামের দাওয়াত ও জিহাদ-ব্যবস্থা


প্রারম্ভিককাল থেকেই ইসলাম তার অনুসারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের উত্তম হাতিয়ার সরবরাহ করে এসেছে। জিহাদের মতো চিন্তাযুদ্ধেরও পরিপূর্ণ নির্দেশনা ইসলাম আমাদের প্রদান করেছে। শরিয়ত যেভাবে জিহাদের রীতিনীতি, পদ্ধতি ও বিধান বয়ান করেছে, তদ্রূপ বিস্তারিত আলাপ হাজির করেছে চিন্তাযুদ্ধের কৌশল নিয়েও। ইসলামের প্রাথমিককাল থেকে এই দাওয়াত ও মানুষকে সত্যের প্রতি আহ্বান-কার্যক্রমই মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছে। অর্থাৎ, ইসলামে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই ভিন্ন কোনো বিষয় নয়; বরং ইসলামের যে দাওয়াতি প্রকল্প, তা তার বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইও। দুটো একই আন্দাজে পরিচালিত হয়। মুসলমানেরা তাদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে অংশ নেয় আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে বিনিময়প্রাপ্তির প্রত্যাশায়। আখিরাতের প্রতিদানই এখানে প্রধান প্ররোচক; এমনকি ব্যক্তিগত কিংবা জাতি ও গোত্রগত কোনো স্বার্থ এখানে কোনো প্রকারের ভূমিকা রাখে না। মানবসমস্তের কল্যাণকামনা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে থাকে। তারা একনিষ্ঠতা এবং কল্যাণকামিতাকে অবলম্বন করে চিন্তার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এ যুদ্ধে তাদের প্রধান হাতিয়ার হয় আভিজাত্য, সততা, সৃষ্টির সেবা, বদান্যতা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার মতন অনন্য সব বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তায়ালার প্রতি আস্থা, তার শক্তিমত্তার প্রতি অনড় বিশ্বাস, ধৈর্য এবং সহনশীলতাকে তারা গ্রহণ করে প্রতিপক্ষের আঘাতের বিরুদ্ধে ঢালরূপে। তাদের আহ্বান হয় তাওহিদের কালিমার প্রতি। মুখে মুহুর্মুহু উচ্চারিত হতে থাকে রবের নাম। আল্লাহ নামের জিকির হয় তাদের রুহের খোরাক। কুরআন কারিমের আয়াত তাদের জবানে এমন ভাষা পায়, কোনো শ্রোতা তাতে প্রভাবিত না হয়ে থাকতে পারে না।

তারা তো আল্লাহর সৈনিক। যে কারণে শরিয়ত কখনো লঙ্ঘিত হয় না তাদের দ্বারা। যুদ্ধক্ষেত্রেও তারা মেনে চলে রবের নির্দেশ। শরিয়তের বিধান ভূলুণ্ঠিত করে আল্লাহর নারাজিকে তারা সাথি করতে চায় না। তাদের সর্বক্ষণের আরাধ্য থাকে রবের সন্তোষ অর্জন। সে কারণেই মিথ্যার আশ্রয় তারা গ্রহণ করে না। চিন্তাযুদ্ধে বাহ্যত জয়ের জন্য নীতিবিরুদ্ধ প্রোপাগান্ডায় কখনো লিপ্ত হয় না। তারা প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করে না। তারা ধোঁকাকে নিজেদের চিন্তার সাথে গুলিয়ে ফেলে না। তারা বরং সত্যের দ্বারা প্রভাবিত করে পৃথিবীকে। তারা কৃত্রিম চাকচিক্যের ঝলকানিতে মানুষকে মোহগ্রস্ত করে না। বরং অন্ধকার পথের যাত্রীকে সত্যের আলোকবিন্দুর সন্ধান দেয়। তারা মানুষকে মতিভ্রম করে দেয় না। বরং তাদের সুস্থির চিন্তার দিশা এনে দেয়।

প্রথম শতাব্দীর ইতিহাস সাক্ষী—কোনো জনপদে মুসলমান পৌঁছার পূর্বে পৌঁছে যেত ইসলামের দাওয়াত। দাঈদের কথার তুলনায় তাদের কর্ম ও আমলের বিভায় প্রভাবিত হয়ে মানুষ দলে দলে প্রবেশ করত ইসলামে।

ইসলামের আভিজাত্যের যারা বিরোধিতা করত, অস্বীকার করে বসত ইসলামের ঐতিহ্যের এবং সৌন্দর্যের, যারা বাধা তৈরি করত ইসলামের দাওয়াতি প্রকল্পে, জিহাদের তরবারি উঁচিয়ে সরিয়ে দেওয়া হতো তাদের পথের মাঝখান থেকে। জিহাদ ছিল ইসলামের দাওয়াতি-প্রকল্পের উত্তম সহায়ক এবং শ্রেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ২.৪: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই : খেলাফতে রাশেদা পর্ব

📄 ২.৪: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই : খেলাফতে রাশেদা পর্ব


খেলাফতে রাশেদার সময়কার চিন্তাযুদ্ধের সূচনা ঘটে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিরোধানের সাথে সাথেই। ইসলামকে সমগ্র আরবজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে দেখে যেসব ভ্রান্ত দল আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তারা নতুন করে সামনে আসে। ইসলামের সকল বিরোধীশক্তি মুসলমানদের এমন শোকতপ্ত ও অস্থির সময়ের পূর্ণ ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় নামে। ইসলামি দুনিয়ায় সহসাই এমন কিছু ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য যা যথেষ্ট ছিল। দলে দলে মানুষ দীন ত্যাগ করে মুরতাদ হতে থাকে। কিছু গোত্র জাকাতের বিধান অস্বীকার করে বসে। একই সময়ে নবুওয়াতের তিনজন মিথ্যা দাবিদার একসাথে আত্মপ্রকাশ করে। এটা একদমই স্পষ্ট যে, এমন পরিকল্পিত ও সম্মিলিত বিদ্রোহ কোনো প্রকার ভাবনা-চিন্তা ও কারুর পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়। চিন্তার দৈন্য এবং বিশ্বাসের সংশয় অকস্মাৎ ঘটে না কখনো। একদমই কারুর প্রয়াস-প্রচেষ্টা ছাড়া ভ্রান্ত চিন্তার আবির্ভাব অতঃপর মানুষের মগজে তার বিস্তার—অসম্ভব প্রায়। একটি বিন্যস্ত পরিকল্পনাই মানুষের মন-মগজে এমন বিবর্তন নিয়ে আসতে পারে কেবল। হ্যাঁ, সুযোগসন্ধানীরা লুফে নিতে পারে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের জন্য—এমন মুহূর্তেরও জন্ম হয় বটে। সে আলাপ ভিন্ন।

নবীজির তিরোধান না হতেই ভ্রান্তচিন্তার লোকেরা সেই সময়টাকে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের সুবর্ণ সুযোগ মনে করে। সে-সময় যদি আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের মাঝে আবু বকর সিদ্দিকের মতো সুস্থির চিন্তা, অদম্য সাহস এবং যোগ্য নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিকে নেতৃত্বের আসনে আসীন না করতেন, ইসলামের দুর্ভাগ্যের দাস্তান হয়তো-বা তখনই রচিত হয়ে যেত। সে আশঙ্কা ছিল বৈ কি!

অবিচলতা, আল্লাহ তায়ালার উপর অনড় বিশ্বাস এবং ঈমানি জজবার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তখন সিদ্দিকে আকবর। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ফেতনাগুলোর সামনে তিনি এমন দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান যে, নিতান্ত অল্প সময়ের মধ্যে মিথ্যার সকল ক্ষমতা নিস্তেজ হয়ে আসে। ইসলাম তার নিজস্ব শক্তিমত্তা এবং সত্যতার বলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে মুক্তআকাশের নিচে।

হজরত উমরের খেলাফতকাল তো ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগ। দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ছিল ইসলামের আহ্বান। প্রতিদিন বিস্তৃত হয়ে চলছিল ইসলামের সীমানা। সেই সময় আড়ালে-আবডালে মুখ লুকিয়ে পড়ে থাকা ছাড়া ফেতনাবাজদের করার তেমন কিছু ছিল না। তারপরও ইসলামের বিপক্ষশক্তি একদমই কোনো চক্রান্ত-ছক আঁকেনি তা নয়; বিশেষ করে অমুসলিমেরা ইসলামের বিজয়গতি রুখে দেবার জন্য সময়ে সময়ে নানা বুদ্ধিবৃত্তিক ছল ও কৌশল নিয়ে হাজির হয়েছে।

হজরত উমরের শঙ্কা ছিল, অমুসলিমেরা মুসলিমদের কৃষ্টি-কালচার ও তাহজিব- তামাদ্দুন বিনষ্ট করার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইবে না। সে কারণে প্রথম থেকেই তিনি ইসলামি রাষ্ট্রের জিম্মিদের জন্য স্বতন্ত্র বিধান প্রণয়ন করেন। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, তাদের বাহনজন্তু এমনকি তাদের বসতির সীমানাও আলাদা করে ফেলেন। অনারব ইসলামি অঞ্চলগুলোতে মুসলিম-অমুসলিম জনপদের মধ্যে এতটুকু দূরত্ব রাখা বাধ্যতামূলক করে দেন যে, মুসলমান এবং জিম্মি তারা যেন একে অপরের ঘরের আলোও দেখতে না পারে। এ সতর্কতা তিনি অবলম্বন করেছিলেন—যেন কাফিরদের কোনো কার্যকলাপ ও সংস্কৃতি মুসলিম-মানসে প্রভাব বিস্তার করবার অবকাশ না পায়।

এমনতর সব সতর্কতার কারণে হজরত উমরের সময়কালে ইসলামের শত্রুপক্ষ কোনোদিক থেকে ইসলামের ক্ষতি সাধনে বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। ইসলামের বিরুদ্ধে কোনোদিক থেকেই কায়দা করে উঠতে না পেরে ইসলামের বিপক্ষশক্তি তাদের চলার পথের প্রাচীরই সরিয়ে দেয়। জনৈক ইহুদির হাতে শহিদ হতে হয় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ২.৫: অনৈক্য সৃষ্টির প্রয়াস

📄 ২.৫: অনৈক্য সৃষ্টির প্রয়াস


খ্রিষ্টীয় হঠকারিতা এবং ইহুদিচক্রান্ত হজরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এসে একাত্ম হয়ে যায়। এবং সাবায়ী গোষ্ঠীর ছদ্মাবরণে তারা নবরূপে ইসলামের বিনাশ সাধনের লক্ষ্যে মাঠে নামে, যার পরিণতিতে উসমান ইবনে আফফানের নামে কুৎসা রটানো হয়। আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসার নামে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির কাজ শুরু হয়ে যায়। এবং পরিশেষে ইসলামের তৃতীয় খলিফা এমনই এক ভ্রান্ত দলের হাতে নির্মমভাবে শহিদ হন। এর ফলে ইসলামের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যে ক্ষতি হয়ে যায়, তার ক্ষতিপূরণ আর কখনো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে পরবর্তী এক দশক পর্যন্ত ইসলামি খেলাফত এবং মুসলিম-সমাজ তার বিরূপ ফল ভোগ করতে থাকে।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ২.৬: বনু উমাইয়ার যুগে গৃহযুদ্ধের চেষ্টা

📄 ২.৬: বনু উমাইয়ার যুগে গৃহযুদ্ধের চেষ্টা


হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময়কার জামাল এবং সিফফিনের যুদ্ধদুটি ছিল সেই বিরূপ পরিণামেরই ধারাবাহিকতা। আরও দুঃখজনক হলো—সিফফিনের যুদ্ধের ভয়াবহতা চিন্তা করে হজরত আলী এবং মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মধ্যে যখন সন্ধিচুক্তির একটি পরিবেশ তৈরি হলো, খারেজি নামে এক নতুন ফেতনার আবির্ভাব ঘটিয়ে মুসলমানদের আবারও দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলা হলো। হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্থলবর্তী হজরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের বদৌলতে হজরত মুয়াবিয়াকে যখন ইসলামি বিশ্বের খলিফা মনোনীত করা হলো তখন গিয়ে ইসলামি বিশ্বে স্থিরতা ফিরে এলো। মুসলমানেরা প্রবেশ করল বিজয় এবং সফলতার নতুন যুগে।

হজরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইনতেকালের পর ইসলামি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার একটি শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সেই অবস্থায় হজরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফা গমন করেন চলমান পরিস্থিতি শান্ত করবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কারবালার প্রান্তরে তাকে শহিদ করে দেওয়া হয়। তার শাহাদাতের ঘটনা বিবদমান পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেয় এবং নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়বার একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। ভ্রান্ত দলগুলো জেগে উঠতে থাকে নতুন উদ্যমে। আর মুসলিম-সমাজ ক্রমেই তলিয়ে যেতে থাকে দ্বন্দ্ব-বিরোধ ও গৃহযুদ্ধের অতল অন্ধকারে। এবং গৃহযুদ্ধের অতলান্তে তলিয়ে যাবার এই ধারা অব্যাহত থাকে খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের সময়কাল পর্যন্ত। তারপর পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আসে।

শাসনামলের মাঝের এবং শেষদিককার কিছু সময় বাদ দিলে উমাইয়া শাসনামলের পুরো সময়টা ছিল মুসলমানদের উত্থানকাল। বিভিন্ন ভ্রান্ত দল ও ফেরকার উদ্ভব সত্ত্বেও মুসলমানদের বিজয় এবং কর্তৃত্ব সমুন্নত ছিল। যেহেতু ফেরকাগুলো তখন মাত্র প্রকাশ্যে আসছে, সদস্যসংখ্যা তখনও সামান্য—যার ফলে ইসলামের বড় কোনো ক্ষতি তাদের দ্বারা সংঘটিত হবার সুযোগ তৈরি হয়নি। এই যুগেই কুরআন কারিম, সিরাত এবং হাদিসের উপর খ্রিষ্টীয় জগতের আপত্তি উত্থাপিত হতে শুরু করে। কিন্তু তাদের অভিযোগ-আপত্তি তৎকালীন মুসলমানদের তেমন প্রভাবিত করতে পারে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px