📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 মক্কার জীবন

📄 মক্কার জীবন


মক্কার জীবনে মুসলমানেরা ছিল দুর্বল। গুটিকয়েক মানুষ ছিল মাত্র ইসলামের সাহায্য করবার জন্য। বিপরীতে ইসলামের শত্রুরা সেখানে ছিল বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। অস্ত্র, ক্ষমতা, লোকবল, প্রভাব-প্রতিপত্তি কোনো দিক থেকেই তাদের সাথে মুসলমানদের কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। কিন্তু অন্ধকারের চাদর ছিন্ন করে দিতে একটি আলোকবিন্দুই যথেষ্ট। সেই ঘনঘোর অন্ধকারের মধ্যেও ইসলাম আলো ছড়িয়ে যাচ্ছিল আপন বিভায়। মিথ্যার জনপদে সত্যের আপাত-ক্ষুদ্র একটি পতাকা উড্ডীন ছিল পতপত করে। সেই ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুর বিভা দারুন নাদওয়ার কাফিরদের হৃদয়ের জ্বলন আরো দ্বিগুণ করে তুলছিল। তাদের ক্রোধ, রাগ এবং হিংসার মাত্রা দিনদিন কেবল বেড়েই চলছিল। তারা একের পর এক কৌশল আঁটতে থাকে। ইসলামের বিকাশপথ রুদ্ধ করে দিতে, প্রোজ্জ্বল আলোকবিন্দুটি চিরদিনের মতো নিভিয়ে দিতে তারা ব্যয় করে চলছিল তাদের চিন্তা ও ভাবনার সবটুকু। চিন্তাযুদ্ধে তাদের গৃহীত পদক্ষেপের কয়েকটি হলো:

পরামর্শসভা : মক্কার নেতৃস্থানীয় কাফিরেরা ইসলামের বিরোধিতার জন্য নিয়মিত পরামর্শ করত। দারুন নাদওয়ায় তাদের শলাপরামর্শের একমাত্র বিষয় ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ইসলামের বিরোধিতার উদ্দেশ্যে নিত্যনতুন কৌশল খুঁজে বের করা। আবু জাহেল, আবু লাহাব, উমাইয়া বিন খালফ, উবাই বিন খালফ, ওয়ালিদ বিন মুগিরা, উকবা বিন মুয়ীত, নজর বিন হারেস প্রমুখ ছিল সেই পরামর্শসভার সভ্য।

সত্য-আহ্বানে সংশয় সৃষ্টি করা : নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যের প্রতি যে আহ্বান, তারা তাতে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টির প্রয়াস চালায়। তারা সত্য দাওয়াতকে সাধারণ মানুষের কাছে সন্দেহপূর্ণ করে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যায়। তারা বলতে থাকে:

أَجَعَلَ الْعَالِهَةَ إِلَهَا وَحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ
সে কি বহু উপাস্যের পরিবর্তে এক উপাস্যের উপাসনা সাব্যস্ত করে দিয়েছে। নিশ্চয় এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার।

مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ آلْ ءَاخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلَقٌ
আমরা সাবেক ধর্মে এ ধরনের কথা শুনিনি। এটা মনগড়া ব্যাপার বৈ নয়।

উদ্ভট ব্যাখ্যা: তারা নিজেদের শিরক, বিদআত এবং ভ্রান্ত ধর্মচিন্তার পক্ষে উদ্ভট সব ব্যাখ্যা হাজির করত, যেন সাধারণ মানুষকে ভ্রান্তির উপর স্থির রাখা যায়। তারা বলতো:

مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّه
আমরা তাদের ইবাদত এজন্যই করি, যেন তারা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়।৯

মিথ্যা প্রোপাগান্ডা : সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য প্রমাণের জন্য নানামুখী প্রোপাগান্ডার বিস্তার তারা করত। একটির কথা বলি-নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন, তারা বলতো :

إِنَّمَا أَنتَ مُفْتَرٍ
আপনি তো মনগড়া উক্তি করেন।১০

কিন্তু যখন কেউ তাদের জিজ্ঞাসা করে বসত যে, একজন নিরক্ষর মানুষ এমন অভিনব ও উৎকৃষ্ট মানের রচনা কীভাবে করতে পারে তখন তারা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দিত এই বলে যে إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرِ জনৈক ব্যক্তি তাকে শিক্ষা দেয়।১১

মিথ্যা অপবাদ এবং মন্দ উপাধির প্রচার: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তারা মন্দ উপাধিতে পরিচিত করে তুলতে থাকে। তিনি ছিলেন মুহাম্মদ (চির প্রশংসিত)। কিন্তু তারা তাকে 'মুজাম্মাম' (নিন্দনীয়) বলে সমাজে পরিচিত করে তুলবার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। তাকে নিয়ে উপহাসে মেতে ওঠে। মিথ্যাবাদী, জাদুকর, কবি-একের পর এক এমনসব আজগুবি শব্দ যুক্ত করে দিতে থাকে নবীজির পবিত্র নামের সাথে।

وَقَالُوا يَأَيُّهَا الَّذِي نُزِّلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ إِنَّكَ لَمَجْنُونٌ
তারা বলল, হে ওই ব্যক্তি, যার প্রতি কুরআন নাজিল হয়েছে, আপনি তো একজন উন্মাদ।১২

بَلْ قَالُوا أَضْغَثُ أَحْلُمٍ بَلِ افْتَرَنَهُ بَلْ هُوَ شَاعِرٌ
এ ছাড়া তারা আরও বলে, (এগুলো) অলীক স্বপ্ন; না সে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে, না সে এক কবি।১৩

قَالَ الْكُفِرُونَ إِنَّ هَذَا لَسْحِرٌ مُّبِينٌ
কাফিররা বলতে লাগল, নিঃসন্দেহে এ লোক প্রকাশ্য জাদুকর।১৪

নৈরাশ্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান: ইসলামের দাঈদের নিরাশ করতে কখনো কখনো হতাশাব্যঞ্জক কথার প্রচার চালাতো। তারা বলত:

قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِّمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي عَاذَانِنَا وَقْرٌ وَمِنْ بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَمِلُونَ
আপনি যে বিষয়ের দিকে আমাদের দাওয়াত দেন, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আবৃত, আমাদের কর্ণে আছে বোঝা এবং আমাদের ও আপনার মাঝখানে আছে অন্তরাল। অতএব, আপনি আপনার কাজ করুন এবং আমরা আমাদের কাজ করি।১৫

উদ্ভট সব দাবি-দাওয়া: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা বলেন :
وَقَالُوا لَن نُّؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا
এবং তারা বলে, আমরা কখনো আপনাকে বিশ্বাস করব না, যে পর্যন্ত না আপনি ভূপৃষ্ঠ থেকে আমাদের জন্য একটি ঝরনা প্রবাহিত করে দেবেন।১৬

أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِّن نَّخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهُرَ خِلَّلَهَا تَفْجِيرًا
অথবা আপনার জন্য খেজুরের ও আঙুরের একটি বাগান হবে, অতঃপর আপনি তার মধ্যে নির্ঝরিণীসমূহ প্রবাহিত করে দেবেন।১৭

أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالْمَلَئِكَةِ قَبِيلًا
অথবা আপনি যেমন বলে থাকেন, তেমনিভাবে আমাদের উপর আসমানকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে দেবেন অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে নিয়ে আসবেন।১৮

মুসলমানদের শারীরিক এবং মানসিক নিপীড়ন: মুসলমানদের উপর শারীরিক অত্যাচার এবং মানসিক নিপীড়নও অব্যাহত রেখেছিল মক্কার মুশরিকরা। কোনোদিন নবীজির দরজার সামনে ময়লা আবর্জনা ফেলে রেখে যেত। চলার পথে তার মাথার উপর মাটি ছিটিয়ে দিত। এমনকি কোনো কোনো দিন হারাম শরিফে নামাজ ও তাওয়াফরত নবীজির পিঠের উপর রেখে যেত উটের নাড়িভুঁড়ি।১৯ হজরত বেলাল হাবশী, আম্মার বিন ইয়াসার, খাব্বাব ইবনুল আরাত, সুহাইব রুমী প্রমুখ সাহাবি ছিলেন তাদের অত্যাচার ও নিপীড়ন নিরীহ লক্ষ্যস্থল।২০

বংশীয় প্রভাব এবং হুমকি: মক্কার মুশরিকরা নবীজির চাচা আবু তালিবের শরণাপন্ন হয়ে আবদার করে, নবীজি যেন তার দাওয়াত থেকে বিরত থাকেন। কেবল আবদারই করেনি; বরং ধমকও দিয়ে আসে-যদি মুহাম্মদ বিরত না থাকে তবে এর পরিণতি সুখকর হবে না। কিন্তু নবীজি তাদের সকল হুমকিধমকি উড়িয়ে দিয়ে চাচার সামনে উচ্চারণ করেন সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য-এই লোকেরা যদি আমার ডান হাতে এনে দেয় সূর্য আর বাম হাতে এনে রাখে চাঁদ, তবু আমি যে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছি তা থেকে নিবৃত হবো না। আমি সত্যের দিকে মানুষকে আহ্বান করেই যাব। হয়তো-বা আল্লাহ তায়ালা এই সত্য দীন বিজয়ী করবেন কিংবা আমার জীবন নিঃশেষ হয়ে যাবে এই দীনের প্রচারে।২১

অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সুন্দর রমণীর প্রলোভন : নবীজির সামনে বিভিন্ন লোভনীয় প্রস্তাবও রাখা হয়। অর্থবিত্ত, সুন্দর নারী এমনকি তাকে প্রস্তাব করা হয় আরবের নেতৃত্বের। বিনিময়ে তাদের প্রার্থনা ছিল কেবল এতটুকু-যেন দীনের দাওয়াত থেকে তিনি সরে দাঁড়ান। মানুষকে যেন তিনি আর আহ্বান না করেন সত্যের প্রতি। কিন্তু তিনি তো ছিলেন আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত পুরুষ। কোনো পয়গাম্বর নেতৃত্ব বা বিত্তের লোভে সত্যের প্রতি আহ্বান থেকে সরে যাবেন, আপস করবেন মিথ্যার সাথে, তা কীভাবে হতে পারে!২২

সমঝোতার প্রস্তাব: একবার এক অদ্ভুত সমঝোতার প্রস্তাব করে বসে মক্কার মুশরিকেরা। এক বছর তারা মুসলমানদের মতো করে ইবাদত করবে আর এক বছর মুসলমানদের পুজো করতে হবে মুশরিকদের মতো করে।২৩

সামাজিক বয়কট : নিপীড়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে মুসলমানদের বয়কট করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, মুসলমানদের সাথে মুশরিকরা না কোনো আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হবে আর না তারা তাদের সাথে সামাজিক কোনো কার্যকলাপ, বেচাকেনা ইত্যাদি করবে। মুসলমান এবং তাদের সহায়তার অপরাধে (!) বনি হাশেমকে তারা তিন বছরের জন্য আবুতালিব-উপত্যকায় নির্বাসিত করে রাখে।২৪

প্রোপাগান্ডা এবং মিথ্যার শোরগোল: মিথ্যার শোরগোল উচ্চকিত করে রাখার মাধ্যমে সত্যের আওয়াজ দমিয়ে দেওয়ার প্রয়াস তারা গ্রহণ করে। তারা একে অপরকে বলতে থাকে: لَا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْءَانِ وَالْغَوْا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ তোমরা এ কুরআন শ্রবণ করো না এবং এর আবৃত্তিতে হট্টগোল সৃষ্টি করো, যাতে তোমরা জয়ী হও।২৫

দেশান্তর: সকল প্রকারের কৌশল ও চক্রান্তের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের দেশত্যাগে বাধ্য করা। এবং তা-ই হয়। এতসব জুলুম-অবিচার-নিপীড়নের ফলে মুসলমানেরা দেশত্যাগে বাধ্য হয়ে পড়েন। কিছু লোক হিজরত করেন হাবশায়। আর তার কয়েক বছর পর মুসলমানেরা হিজরত করে চলে যান মদিনা মুনাওয়ারায়।

চিন্তাযুদ্ধে মক্কার কাফিরদের গৃহীত যে পদক্ষেপগুলোর বিবরণ দিলাম, অনুসন্ধান করলে দেখতে পাবেন, যুগে যুগে কাফিররা এই পদ্ধতিই প্রয়োগ করে এসেছে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনে।

২.২: মক্কার মুশরিকদের মোকাবেলায় মুসলমানদের পদক্ষেপ
এ তো গেল মক্কার মুশরিকদের পদক্ষেপের বিবরণ, যা তারা মুসলিমদের চিন্তা-দর্শনের বিস্তৃতি রোধে গ্রহণ করেছিল। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের বিরুদ্ধে মুসলমানেরা তিনটি 'অস্ত্র' প্রয়োগ করে:
১. আল্লাহ তায়ালার সাথে সম্পর্ক স্থাপন।
২. সৃষ্টির কল্যাণকামিতা।
৩. নিজেদের ইলমি ও আমলি তথা জ্ঞান ও কর্মের প্রশিক্ষণ এবং প্রতিপালন।

স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক: মুসলমানেরা আল্লাহর সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে নিয়েছিল এবং প্রতি ক্ষণে তারা সেই সম্পর্কের নবায়ন করে নিতো। জিকির, দোয়া, তেলাওয়াত এবং ইবাদত ছিল রবের সাথে তাদের সম্পর্ক-স্থিতির মাধ্যম। তখনও নামাজের বিধান আসেনি। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরির উপায় ছিল কেবল এসকল ইবাদত।

তবে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মোকাবেলার জন্য মুসলমানদের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র ছিল তাওহিদের কালিমা এবং কুরআন কারিম। কুরআন কারিম মুশরিকদের ভ্রান্ত দাবি ও অসার চিন্তা-বিশ্বাসের এমন জবাব দিত যে, তারা লা জবাব হয়ে পড়তো। কুরআন কারিম তার চিত্তাকর্ষক বর্ণনাশৈলী, তার বিস্ময়কর বাকরীতি এবং আসমানি সুরের মহত্ত্বে কঠিন হৃদয়বানেরও অন্তরে এমন প্রভাব বিস্তার করত, যার ফলে সে কুরআন কারিম নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য হয়ে পড়তো। প্রতিজন চিন্তাশীল ব্যক্তির হৃদয়ের অর্গল মুহূর্তেই খুলে দিত কুরআন কারিমের মোহন আয়াত।

সৃষ্টির কল্যাণকামিতা : সৃষ্টির প্রতি কল্যাণকামিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিজন মুসলমান অপরের কেবল আবশ্যিক হকগুলো আদায় করতেন এমন নয়; বরং আবশ্যিক হক নয় এমনসব প্রয়োজনেও তারা একে অপরের প্রতি সহায়তার হাত প্রসারিত করে দিতেন। সকলের চেষ্টা থাকত বিপদে-আপদে একে অন্যের পাশে থাকবার। বিশেষ করে দুর্বল ও অক্ষম ব্যক্তির তাবৎ প্রয়োজনে মুসলমানেরা এগিয়ে যেতেন সর্বাগ্রে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়াও অন্যান্য সাহাবি, বিশেষ করে আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু, মানবসেবায় প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

মানবতার জন্য সর্বোত্তম কল্যাণকামিতা হলো একজন মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা এবং দীনের দাওয়াত সবার দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া। সে লক্ষ্যে প্রতিজন মুসলমান একনিষ্ঠভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন দীনের দাওয়াতের জন্য। তাওহিদের কালিমার দাওয়াত প্রথমে শুরু হয় গোপনে। তারপর প্রকাশ্যে। একাকী এবং দলবদ্ধভাবেও চলতে থাকে কালিমার প্রতি আহ্বান। পরামর্শভিত্তিক কার্যক্রম, প্রজ্ঞার সাথে দিনযাপন, চারিত্রিক উৎকর্ষ ও মানবিক বদান্যতার সাহায্যে সত্যের প্রতি আহ্বান এবং বিনিময়ে নিজেদের উপর আপতিত বিপদ-আপদ ও নিপীড়নে ধৈর্য অবলম্বন-মক্কার জীবনে কুরাইশ মুশরিকদের চিন্তাযুদ্ধের মোকাবেলায় এসবই ছিল মুসলমানদের 'অনন্য হাতিয়ার'।

জ্ঞান এবং কর্মের প্রশিক্ষণ: নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য ছিল তাদের চারিত্রিক উন্নতি এবং আত্মিক পরিশুদ্ধির বড় মাধ্যম। তার মহান সত্তাই ছিল তাদের জ্ঞান, কর্ম ও চারিত্রিক উৎকর্ষের কেন্দ্রবিন্দু।

দীনি ইলম এবং ওহীর সংরক্ষণের সূচনা সেই সময় থেকেই। মক্কার জীবনেও কুরআন কারিমের আয়াত মুখস্থ করা এবং একে অপরকে শোনানোর ধারা অব্যাহত ছিল। দীনি পরামর্শ এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল দারুল আরকাম।

এই সকল প্রয়াস-প্রচেষ্টায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাথিদের নির্ভরতার বিরাট একটি অংশ দখল করে ছিল কুরআন কারিম। প্রতি কদমে কুরআন কারিম তাদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে যাচ্ছিল (কুরআনের যে নির্দেশনাবলি আজও বর্তমান এবং কেয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে)।

মুশিরকরা যখনই ওহীর মধ্যে কোনো প্রকার সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করত, আসমান থেকে তার জবাব চলে আসতো। কাফিররা মুসলমানদের মনোবল ভেঙে দিতে যখনই কোনো প্রোপাগান্ডার বিস্তার করত, আসমান থেকে তখনই ওহী এসে উজ্জীবিত করে তুলত প্রতিটি মুসলিম প্রাণকে। কুরআন কারিম সেই সময় মুসলমানদের সুসংবাদ দিতে থাকে আগত বিজয়ের এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করে যেতে থাকে উত্তম ধৈর্য অবলম্বনের।

টিকাঃ
' সুরা সোয়াদ, আয়াত ৫
৮ সুরা সোয়াদ, আয়াত ৭
* সুরা যুমার, আয়াত ৩
১০ সুরা নাহল, আয়াত ১০১
১১ সুরা নাহল, আয়াত ১০৩
১২ সুরা হিজর, আয়াত ৬
১৩ সুরা আমবিয়া, আয়াত ৫
১৪ সুরা ইউনুস, আয়াত ২
১৫ সুরা হা-মীম সাজদা, আয়াত ৫
১৬ সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৯০
১৭ সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৯১
১৮ সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৯২
১৯ আর-রওজুল উনুফ, ২/৪০
২০ সিরাতে ইবনে হিশাম, ১/৩৪২
২১ আল-কামিল, ১/২৮৮, ২৮৯
২২ সিরাতে ইবনে হিশাম, ১/২৯৫, ২৯৬
২৩ সুরা কাফিরুন, তাফসিরে ইবনে কাসির
২৪ আল-কামিল, ১/৫০৪
২৫ সুরা হা-মীম সাজদা, আয়াত ২৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px