📄 বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ইতিবৃত্ত
বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং সামরিক লড়াই-পৃথিবীতে দুটোর অবস্থানই সেই প্রাচীনকাল থেকে। সত্য মিথ্যা এবং হক বাতিলের লড়াই যেদিন থেকে শুরু, চিন্তা এবং সামরিক লড়াইয়ের সূচনাও সেদিন থেকে। আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার অব্যবহিত পরেই আল্লাহ তায়ালার সাথে বান্দার সম্পর্কচ্ছেদের মধ্য দিয়ে এই লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটে। শয়তান অস্বীকার করে বসলো আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করতে। পরিণামে অভিসম্পাৎ কপালে নিয়ে আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হলো সে। তাকে যখন তাড়িয়ে দেওয়া হয় রবের দরবার থেকে তখন সে আল্লাহ তায়ালার সামনে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে উচ্চারণ করে—সুযোগ হলে সমস্ত মানুষকে সে সত্য থেকে বিচ্যুত করে ছাড়বে। সবাইকে নিমজ্জিত করবে মিথ্যার অন্ধকারে।
لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إِلَّا قَلِيلًا
যদি আপনি আমাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত সময় দেন, তবে আমি সামান্য সংখ্যক ছাড়া তার (আদমের) বংশধরকে সমূলে নষ্ট করে দেব।২
কেয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আগত মানুষদের পরীক্ষা করবেন—এটা আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা যেহেতু; তাই তিনি ইবলিসকে অবকাশ দিলেন :
وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُم بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِم بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِي الْأَمْوَلِ وَالْأَوْلُدِ وَعِدْهُمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَنُ إِلَّا غُرُورًا
তুই সত্যচ্যুত কর তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস স্বীয় আওয়াজ দ্বারা, স্বীয় অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদের আক্রমণ কর, তাদের অর্থসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে শরিক হয়ে যা এবং তাদের প্রতিশ্রুতি দে। ছলনা ছাড়া শয়তান তাদের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না।৩
পরক্ষণেই আল্লাহ তায়ালা ইবলিসকে এই সতর্কবার্তাও শুনিয়ে দিলেন :
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَنٌ وَكَفَىٰ بِرَبِّكَ وَكِيلًا
নিশ্চয় আমার যারা বান্দা, তাদের উপর তোর কোনো ক্ষমতা চলবে না। (তাদের) রক্ষকরূপে তোর প্রতিপালকই যথেষ্ট।৪
চিন্তাযুদ্ধের সূচনা তো সেই মুহূর্তেই ঘটে গিয়েছিল যখন ইবলিস তার কূটকৌশল ব্যবহার করে আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালামকে প্রভাবিত করতে সমর্থ হয়েছিল। সে ফুসলিয়ে-ফাঁসলিয়ে তাদের সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল গলাধঃকরণ করানোর চেষ্টা করে। শপথবাক্য পাঠ করে তাদের সামনে প্রমাণ করতে উদ্যোগী হয়, সে তাদের ঐকান্তিক কল্যাণকামী।
এরপর জান্নাত থেকে আদম আলাইহিস সালামকে যখন পৃথিবীতে পাঠানো হলো অতঃপর তার বংশধারার বিস্তার শুরু হলো, শয়তান তখন তাদের প্ররোচিত করবার কাজে নেমে পড়ে। আদমের সন্তানদের সত্যবিচ্যুত করার জন্য সে সর্বত্র মিথ্যার জাল ছড়িয়ে দেয়। তখন আল্লাহ তায়ালা শয়তানের বিছানো জাল ছিন্ন করার লক্ষ্যে সময়ে সময়ে প্রেরণ করতে থাকেন তার পক্ষ থেকে বার্তাবাহক। যুগে যুগে পৃথিবীতে আগমন ঘটতে থাকে নবী, রাসুল ও পয়গাম্বরদের। তারা শত অন্যায়-অত্যাচার ও নিপীড়ন উপেক্ষা করে সত্য পৌঁছে দিতে থাকেন প্রত্যেকের দোরগোড়ায়; প্রতিজন ব্যক্তির হৃদয়ের অলিন্দে। অপরদিকে শয়তান ও তার অনুসারী বিভ্রান্ত মানুষেরা কিন্তু থেমে থাকে না। তারা সমাজে তাদের বিকৃত চিন্তা ও ভ্রষ্ট বিশ্বাসের প্রচার করে যেতে থাকে। আর উভয় পক্ষের, হক ও বাতিলের এই দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। নবী-রাসুলদের বিরোধিতায় চিন্তাযুদ্ধের নব নব সব কূটকৌশল ও চক্রান্ত আবিষ্কৃত হতে থাকে। অস্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়েছে-এমন নবীর সংখ্যা কমই। হজরত মুসা, ইউশা বিন নুন, সুলাইমান ও দাউদ আলাইহিমুস সালামের সময়ে কিছু লড়াই সংঘটিত হয়ছিল বটে; কিন্তু চিন্তাযুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়নি, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মোকাবেলা করতে হয়নি, এমন কোনো পয়গাম্বর পৃথিবীতে অতিক্রান্ত হননি। প্রতিজন নবী কিংবা রাসুলকেই তার সময়ে চিন্তাযুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
২.১: হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়কাল
যুগ-যুগান্তরের চলমান বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে এসে আরও ভয়ঙ্কর রূপ লাভ করে। এই সময়টাতে চিন্তাযুদ্ধে এমন সব ঘটনার দৃশ্যায়ন হতে থাকে, যা অতীতকালে কখনো দেখা যায়নি। কুরআন কারিম সেই সময়কার চিত্রায়ণ করতে গিয়ে বলেছে:
وَلَا يَزَالُونَ يُقْتِلُونَكُمْ حَتَّىٰ يَرُدُّوكُمْ عَن دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَعُوا
তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদের দীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে; যদি সম্ভব হয়।
وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتٰبِ লَوْ يَرُدُّونَكُم مِّنْ بَعْدِ إِيمَنِكُمْ كُفَّارًا
আহলে কিতাবদের অনেকেই হিংসাবশত চায় যে, মুসলমান হওয়ার পর তোমাদের কোনো রকমে কাফির বানিয়ে দেবে।
দীন ও সত্যের পতাকা সমুন্নত রাখার জন্য প্রতি যুগে নবী-রাসুল ও তাদের অনুসারীরা অবর্ণনীয় নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু দীনের জন্য, হকের কালিমা প্রতিষ্ঠা করবার জন্য যে অসহ্য নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছিলেন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম, তার দৃষ্টান্ত অতীতের কোথাও নেই। গালিগালাজ-কটুকথা তো শুনতে হয়েছেই; দীনের জন্য শারীরিক নির্যাতন, এমনকি ঘরবাড়ি পর্যন্ত ছাড়তে হয়েছে তাদের। আপনজন হয়ে গেছে শত্রু। প্রতিপক্ষের অনবরত অত্যাচারের মুখে জীবন হাতে করে যেন দীনের প্রচারপ্রসার করে গেছেন তারা। দীনের হেফাজতের জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়েছেন। সবার কাছে ভাঙা অস্ত্র পর্যন্ত ছিল না, তবু তারা সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হয়েছেন। কেবল মক্কা আর মদিনা নয়; তাদের শত্রুরা ছড়িয়ে ছিল কিসরা-কায়সার তথা রোম-পারস্য পর্যন্ত। তৎকালীন পরাশক্তির মুখোমুখি হয়েছেন। এবং সেই অবস্থায় ইরানের রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে দীনের আহ্বান তারা পৌঁছে দিয়েছেন সুদূর আফ্রিকার বনাঞ্চল পর্যন্ত।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতে সত্য-মিথ্যার মধ্যকার লড়াই-সংঘাতের গতিপ্রকৃতি লক্ষ করা এবং বিশেষ দৃষ্টিতে সেই সময়কার চিন্তাযুদ্ধের কলাকৌশল সম্বন্ধে ভাবনা-চিন্তায় ব্যাপৃত হয়ে সিরাত অধ্যয়ন করা এখন সময়ের দাবি। কেননা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীতেই আমাদের জন্য রয়েছে বর্তমান সময়ের মিথ্যাপন্থিদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই-প্রতিরোধের উৎকৃষ্ট নির্দেশনা।
আমি এখানে খুবই সংক্ষেপে সেই সময়কার চিন্তাযুদ্ধের একটি চিত্র তুলে ধরছি। চিত্রটি আমি দুটি অংশে উপস্থিত করব: নবীজির মক্কার জীবন এবং মদিনার জীবন।
টিকাঃ
২ সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৬২
৩ সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৬৪
৪ সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৬৫
* সুরা বাকারা, আয়াত ২১৭
* সুরা বাকারা, আয়াত ১০৯
📄 ২.৩: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং ইসলামের দাওয়াত ও জিহাদ-ব্যবস্থা
প্রারম্ভিককাল থেকেই ইসলাম তার অনুসারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের উত্তম হাতিয়ার সরবরাহ করে এসেছে। জিহাদের মতো চিন্তাযুদ্ধেরও পরিপূর্ণ নির্দেশনা ইসলাম আমাদের প্রদান করেছে। শরিয়ত যেভাবে জিহাদের রীতিনীতি, পদ্ধতি ও বিধান বয়ান করেছে, তদ্রূপ বিস্তারিত আলাপ হাজির করেছে চিন্তাযুদ্ধের কৌশল নিয়েও। ইসলামের প্রাথমিককাল থেকে এই দাওয়াত ও মানুষকে সত্যের প্রতি আহ্বান-কার্যক্রমই মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছে। অর্থাৎ, ইসলামে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই ভিন্ন কোনো বিষয় নয়; বরং ইসলামের যে দাওয়াতি প্রকল্প, তা তার বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইও। দুটো একই আন্দাজে পরিচালিত হয়। মুসলমানেরা তাদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে অংশ নেয় আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে বিনিময়প্রাপ্তির প্রত্যাশায়। আখিরাতের প্রতিদানই এখানে প্রধান প্ররোচক; এমনকি ব্যক্তিগত কিংবা জাতি ও গোত্রগত কোনো স্বার্থ এখানে কোনো প্রকারের ভূমিকা রাখে না। মানবসমস্তের কল্যাণকামনা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে থাকে। তারা একনিষ্ঠতা এবং কল্যাণকামিতাকে অবলম্বন করে চিন্তার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এ যুদ্ধে তাদের প্রধান হাতিয়ার হয় আভিজাত্য, সততা, সৃষ্টির সেবা, বদান্যতা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার মতন অনন্য সব বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তায়ালার প্রতি আস্থা, তার শক্তিমত্তার প্রতি অনড় বিশ্বাস, ধৈর্য এবং সহনশীলতাকে তারা গ্রহণ করে প্রতিপক্ষের আঘাতের বিরুদ্ধে ঢালরূপে। তাদের আহ্বান হয় তাওহিদের কালিমার প্রতি। মুখে মুহুর্মুহু উচ্চারিত হতে থাকে রবের নাম। আল্লাহ নামের জিকির হয় তাদের রুহের খোরাক। কুরআন কারিমের আয়াত তাদের জবানে এমন ভাষা পায়, কোনো শ্রোতা তাতে প্রভাবিত না হয়ে থাকতে পারে না।
তারা তো আল্লাহর সৈনিক। যে কারণে শরিয়ত কখনো লঙ্ঘিত হয় না তাদের দ্বারা। যুদ্ধক্ষেত্রেও তারা মেনে চলে রবের নির্দেশ। শরিয়তের বিধান ভূলুণ্ঠিত করে আল্লাহর নারাজিকে তারা সাথি করতে চায় না। তাদের সর্বক্ষণের আরাধ্য থাকে রবের সন্তোষ অর্জন। সে কারণেই মিথ্যার আশ্রয় তারা গ্রহণ করে না। চিন্তাযুদ্ধে বাহ্যত জয়ের জন্য নীতিবিরুদ্ধ প্রোপাগান্ডায় কখনো লিপ্ত হয় না। তারা প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করে না। তারা ধোঁকাকে নিজেদের চিন্তার সাথে গুলিয়ে ফেলে না। তারা বরং সত্যের দ্বারা প্রভাবিত করে পৃথিবীকে। তারা কৃত্রিম চাকচিক্যের ঝলকানিতে মানুষকে মোহগ্রস্ত করে না। বরং অন্ধকার পথের যাত্রীকে সত্যের আলোকবিন্দুর সন্ধান দেয়। তারা মানুষকে মতিভ্রম করে দেয় না। বরং তাদের সুস্থির চিন্তার দিশা এনে দেয়।
প্রথম শতাব্দীর ইতিহাস সাক্ষী—কোনো জনপদে মুসলমান পৌঁছার পূর্বে পৌঁছে যেত ইসলামের দাওয়াত। দাঈদের কথার তুলনায় তাদের কর্ম ও আমলের বিভায় প্রভাবিত হয়ে মানুষ দলে দলে প্রবেশ করত ইসলামে।
ইসলামের আভিজাত্যের যারা বিরোধিতা করত, অস্বীকার করে বসত ইসলামের ঐতিহ্যের এবং সৌন্দর্যের, যারা বাধা তৈরি করত ইসলামের দাওয়াতি প্রকল্পে, জিহাদের তরবারি উঁচিয়ে সরিয়ে দেওয়া হতো তাদের পথের মাঝখান থেকে। জিহাদ ছিল ইসলামের দাওয়াতি-প্রকল্পের উত্তম সহায়ক এবং শ্রেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক।
📄 ২.৪: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই : খেলাফতে রাশেদা পর্ব
খেলাফতে রাশেদার সময়কার চিন্তাযুদ্ধের সূচনা ঘটে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিরোধানের সাথে সাথেই। ইসলামকে সমগ্র আরবজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে দেখে যেসব ভ্রান্ত দল আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তারা নতুন করে সামনে আসে। ইসলামের সকল বিরোধীশক্তি মুসলমানদের এমন শোকতপ্ত ও অস্থির সময়ের পূর্ণ ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় নামে। ইসলামি দুনিয়ায় সহসাই এমন কিছু ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য যা যথেষ্ট ছিল। দলে দলে মানুষ দীন ত্যাগ করে মুরতাদ হতে থাকে। কিছু গোত্র জাকাতের বিধান অস্বীকার করে বসে। একই সময়ে নবুওয়াতের তিনজন মিথ্যা দাবিদার একসাথে আত্মপ্রকাশ করে। এটা একদমই স্পষ্ট যে, এমন পরিকল্পিত ও সম্মিলিত বিদ্রোহ কোনো প্রকার ভাবনা-চিন্তা ও কারুর পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়। চিন্তার দৈন্য এবং বিশ্বাসের সংশয় অকস্মাৎ ঘটে না কখনো। একদমই কারুর প্রয়াস-প্রচেষ্টা ছাড়া ভ্রান্ত চিন্তার আবির্ভাব অতঃপর মানুষের মগজে তার বিস্তার—অসম্ভব প্রায়। একটি বিন্যস্ত পরিকল্পনাই মানুষের মন-মগজে এমন বিবর্তন নিয়ে আসতে পারে কেবল। হ্যাঁ, সুযোগসন্ধানীরা লুফে নিতে পারে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের জন্য—এমন মুহূর্তেরও জন্ম হয় বটে। সে আলাপ ভিন্ন।
নবীজির তিরোধান না হতেই ভ্রান্তচিন্তার লোকেরা সেই সময়টাকে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের সুবর্ণ সুযোগ মনে করে। সে-সময় যদি আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের মাঝে আবু বকর সিদ্দিকের মতো সুস্থির চিন্তা, অদম্য সাহস এবং যোগ্য নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিকে নেতৃত্বের আসনে আসীন না করতেন, ইসলামের দুর্ভাগ্যের দাস্তান হয়তো-বা তখনই রচিত হয়ে যেত। সে আশঙ্কা ছিল বৈ কি!
অবিচলতা, আল্লাহ তায়ালার উপর অনড় বিশ্বাস এবং ঈমানি জজবার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তখন সিদ্দিকে আকবর। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ফেতনাগুলোর সামনে তিনি এমন দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান যে, নিতান্ত অল্প সময়ের মধ্যে মিথ্যার সকল ক্ষমতা নিস্তেজ হয়ে আসে। ইসলাম তার নিজস্ব শক্তিমত্তা এবং সত্যতার বলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে মুক্তআকাশের নিচে।
হজরত উমরের খেলাফতকাল তো ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগ। দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ছিল ইসলামের আহ্বান। প্রতিদিন বিস্তৃত হয়ে চলছিল ইসলামের সীমানা। সেই সময় আড়ালে-আবডালে মুখ লুকিয়ে পড়ে থাকা ছাড়া ফেতনাবাজদের করার তেমন কিছু ছিল না। তারপরও ইসলামের বিপক্ষশক্তি একদমই কোনো চক্রান্ত-ছক আঁকেনি তা নয়; বিশেষ করে অমুসলিমেরা ইসলামের বিজয়গতি রুখে দেবার জন্য সময়ে সময়ে নানা বুদ্ধিবৃত্তিক ছল ও কৌশল নিয়ে হাজির হয়েছে।
হজরত উমরের শঙ্কা ছিল, অমুসলিমেরা মুসলিমদের কৃষ্টি-কালচার ও তাহজিব- তামাদ্দুন বিনষ্ট করার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইবে না। সে কারণে প্রথম থেকেই তিনি ইসলামি রাষ্ট্রের জিম্মিদের জন্য স্বতন্ত্র বিধান প্রণয়ন করেন। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, তাদের বাহনজন্তু এমনকি তাদের বসতির সীমানাও আলাদা করে ফেলেন। অনারব ইসলামি অঞ্চলগুলোতে মুসলিম-অমুসলিম জনপদের মধ্যে এতটুকু দূরত্ব রাখা বাধ্যতামূলক করে দেন যে, মুসলমান এবং জিম্মি তারা যেন একে অপরের ঘরের আলোও দেখতে না পারে। এ সতর্কতা তিনি অবলম্বন করেছিলেন—যেন কাফিরদের কোনো কার্যকলাপ ও সংস্কৃতি মুসলিম-মানসে প্রভাব বিস্তার করবার অবকাশ না পায়।
এমনতর সব সতর্কতার কারণে হজরত উমরের সময়কালে ইসলামের শত্রুপক্ষ কোনোদিক থেকে ইসলামের ক্ষতি সাধনে বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। ইসলামের বিরুদ্ধে কোনোদিক থেকেই কায়দা করে উঠতে না পেরে ইসলামের বিপক্ষশক্তি তাদের চলার পথের প্রাচীরই সরিয়ে দেয়। জনৈক ইহুদির হাতে শহিদ হতে হয় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে।
📄 ২.৫: অনৈক্য সৃষ্টির প্রয়াস
খ্রিষ্টীয় হঠকারিতা এবং ইহুদিচক্রান্ত হজরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এসে একাত্ম হয়ে যায়। এবং সাবায়ী গোষ্ঠীর ছদ্মাবরণে তারা নবরূপে ইসলামের বিনাশ সাধনের লক্ষ্যে মাঠে নামে, যার পরিণতিতে উসমান ইবনে আফফানের নামে কুৎসা রটানো হয়। আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসার নামে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির কাজ শুরু হয়ে যায়। এবং পরিশেষে ইসলামের তৃতীয় খলিফা এমনই এক ভ্রান্ত দলের হাতে নির্মমভাবে শহিদ হন। এর ফলে ইসলামের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যে ক্ষতি হয়ে যায়, তার ক্ষতিপূরণ আর কখনো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে পরবর্তী এক দশক পর্যন্ত ইসলামি খেলাফত এবং মুসলিম-সমাজ তার বিরূপ ফল ভোগ করতে থাকে।