📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ১.৮: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্রের পরিচিতি

📄 ১.৮: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্রের পরিচিতি


এটা এমন শাস্ত্র, যেখানে প্রতিপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করা হয়, আত্মরক্ষার কৌশল পর্যালোচনা করা হয় এবং ঐকান্তিক প্রয়াস চালানো হয় প্রতিপক্ষকে যথার্থ ও প্রভাবক জবাব দেওয়ার জন্য। একটি বিষয় এখানে বলে রাখা জরুরি মনে করছি-বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্র এ দুইয়ে কিন্তু পার্থক্য আছে। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্র অধ্যয়ন এবং গবেষণার বিষয়। আর বুদ্ধির লড়াইটা সংঘটিত হয়ে থাকে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ১.৯: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্রের আলোচ্য

📄 ১.৯: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্রের আলোচ্য


সে সকল মাধ্যম ও পন্থা এই শাস্ত্রের আলোচ্য বিষয়, যা দ্বারা একটি জাতির মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন সাধন করা হয়। এই শাস্ত্রের আলোচনার কেন্দ্রে থাকে সেই পন্থা ও পদ্ধতি, যার সাহায্যে একটি জাতির চিন্তার গতিপথ এবং হৃদয়ের উত্তাপ বদলে দেওয়া হয়। ঘুরিয়ে দেওয়া হয় একটি জাতির কর্মের ছায়াপথ। একজন বিজ্ঞ সার্জন যেভাবে রোগীর শরীরে ব্যাধির পরীক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন, একজন কবি যেভাবে চিন্তামগ্ন হয়ে পড়েন কাব্যের উপমা, রূপক ও ভাষার নিগূঢ়ার্থ নিয়ে, এই শাস্ত্রের অধ্যয়নকারী তেমনি গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করবে চিন্তাযুদ্ধের সকল উপায়, অবলম্বন ও মাধ্যম নিয়ে, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ময়দানে প্রতিপক্ষ ঠিক যে মাধ্যমসমূহের সাহায্যে আক্রমণে উদ্যত হয়।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ১.১০: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

📄 ১.১০: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য


নিজের চিন্তা, চেতনা, আকিদা, বিশ্বাস, জাতিগত স্বাতন্ত্র্য এবং তাহজিব-তামাদ্দুন, সভ্যতা-সংস্কৃতি সুরক্ষিত করবার পাশাপাশি অন্যান্য জাতির উপর মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তৃত্ব অর্জন করাই এই শাস্ত্রের উদ্দেশ্য।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ১.১১: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই শাস্ত্রের তাৎপর্য

📄 ১.১১: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই শাস্ত্রের তাৎপর্য


কোনো শাস্ত্রের তাৎপর্য ও গুরুত্ব নির্ভর করে সমাজে তার প্রয়োজন অনুপাতে। একটি শাস্ত্র সমাজের জন্য যতটা কল্যাণ বয়ে আনার সম্ভাবনা রাখে, তার গুরুত্ব হয়ে থাকে ঠিক ততটা।

বর্তমান সময়টাতে সমগ্র বিশ্ব সম্মিলিতভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এই যুদ্ধ যেভাবে সামরিক ক্ষেত্রে সংঘটিত হচ্ছে, তদ্রূপ হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও। চিন্তার লড়াইয়েও মুসলমানদেরকে আজ প্রতিপক্ষের সম্মিলিত আঘাতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। মুসলমানদের তাই আবশ্যিক কর্তব্য-আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্রের লড়াইয়ের পাশাপাশি চিন্তাযুদ্ধের জন্যও প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

নেতা, রাজনীতিক, আলেম, গবেষক, শিক্ষক, ছাত্র, মসজিদের ইমাম, খতিবসহ প্রতিজন মুসলমানের কর্তব্য-ইসলামের শত্রুপক্ষের সকল প্রকার ধোঁকা ও অপকৌশল সম্বন্ধে পূর্ণ অবগতি অর্জন করা। আর অমুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের কৌশল জানার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্র অধ্যয়নের বিকল্প নেই।

এই শাস্ত্রটিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে তার চর্চা ব্যাপক করা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু বাস্তবতা দেখা যায় তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কিছু মানুষ মনে করেন, ইসলামের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য অস্ত্রের লড়াইটাই একমাত্র সমাধান। চিন্তাযুদ্ধের কোনো প্রয়োজন নেই। নিঃসন্দেহে তাদের এই চিন্তার সংশোধন প্রয়োজন। সশস্ত্র জিহাদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কোনো মুসলমান সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজন অস্বীকার করতে পারে না। সশস্ত্র লড়াই ছাড়া ইসলামের পুনরুজ্জীবন এবং তার স্থায়ীকরণ কখনোই সম্ভব নয়। তবে সেই সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইও চালিয়ে যেতে হবে। সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কোনোভাবেই চিন্তাযুদ্ধের আবশ্যকতাকে খাটো করা যাবে না। চিন্তাযুদ্ধের প্রয়োজন যদি অস্বীকার করা হয় তবে সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে যে লক্ষ্য অর্জন উদ্দেশ্য-আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীন সমুন্নত করা-বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে।

দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তারের জন্য অস্ত্রের লড়াইয়ের মতোই সমান দরকারি চিন্তার লড়াই। অস্ত্র ও চিন্তার লড়াই দুটো যদি সমান তালে লড়ে যাওয়া না হয় এবং দুই যুদ্ধের মধ্যে যদি কোনো প্রকার সম্পর্ক না থাকে তাহলে অস্ত্র ও সৈন্যবলে বলীয়ান বিশাল বাহিনী সামান্য ক্ষুদ্র একটি বাহিনীর বিরুদ্ধেও জয় ছিনিয়ে আনতে সমর্থ হবে না। যদি-বা বিজয় লাভ করে; তবে তা হবে সাময়িকের জন্য। বিজিত জাতিগোষ্ঠীর হৃদয়-মন যদি জয় করা না যায় তবে পাশার দান উলটে যেতে পারে যেকোনো মুহূর্তে।

সামরিক সামর্থ্যের বিবেচনায় মুসলমানেরা এখন অমুসলিমদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। বলা যায়-শত্রুর সাথে শক্তির বিচারে তাদের অবস্থান অসম। এমতাবস্থায় চিন্তাযুদ্ধের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার প্রয়াসে লিপ্ত হওয়া মুসলমানদের জন্য পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক জরুরি। সমরবিদেরা মনে করেন-যুদ্ধ এখন রণাঙ্গনে হয়ে থাকে বিশ ভাগ। আর যুদ্ধের আশি ভাগ সংঘটিত হয় মিডিয়াতে। এই যখন অবস্থা, তখন জমানার নাজুকতা, সময়ের প্রয়োজনীয়তা এবং নিজেদের আত্মরক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই সম্পর্কে উদাসীন থাকা আমাদের জন্য কোনোভাবেই উচিত নয়।

বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্র-বিগত ৩০-৪০ বছর যাবৎ আরবের দেশগুলোতে স্বতন্ত্র শাস্ত্রের মর্যাদা লাভ করে আসছে। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুরুত্বের সাথে এই শাস্ত্রের পাঠদান করা হয়। প্রফেসরগণ লেকচার তৈরি করেন, ক্লাসে সেমিনারে নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর আলোচনা করেন। এই বিষয়ের উপর শিক্ষার্থীরা সেখানে পিএচডিও করে থাকেন। বহু রচনা এবং পিএচডি থিসিস তাদের গ্রন্থভান্ডারে যুক্ত হয়েছে বিগত বছরগুলোতে। কিন্তু আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয়নি। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। স্বতন্ত্র শাস্ত্রের মর্যাদা দিয়ে সকল দীনি ও আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্রের পঠন-পাঠন শুরু করা অতীব জরুরি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px