📄 ১.২: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং আন্তর্জাতিক জাতিগোষ্ঠী
যখন কোনো জাতি অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর চিন্তাভাবনা, তাহজিব-তামাদ্দুন, কৃষ্টি-কালচার, সভ্যতা-সংস্কৃতি বদলে দেবার চেষ্টায় ব্যাপৃত হয় তখন তাদের সেই প্রচেষ্টাকে বলা হয় বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। পৃথিবীর প্রতিটি ক্ষমতাধর জাতি, যে অন্য জাতিগোষ্ঠীর উপর নিজের ক্ষমতা বিস্তার করতে চায় কিংবা চায় অন্য জাতির থেকে নিজের ভৌগোলিক ও চিন্তাজগতের সীমানা নিরাপদ রাখতে, সে আবশ্যিকভাবে এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের অবতারণা করে। যদি কোনো জাতি তার প্রতিপক্ষকে কাবু করবার জন্য কেবল অস্ত্রের লড়াইকেই যথেষ্ট মনে করে, সে কখনোই পরিপূর্ণ সাফল্যের মুখ দেখতে সক্ষম হবে না। এমন তো হতেই পারে, সে অস্ত্রের জোরে সাময়িক বিজয় ছিনিয়ে আনবে; কিন্তু সে তার প্রতিপক্ষের উপর কখনোই কেবল অস্ত্রের মাধ্যমে জাদুকরী প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।
ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছে এমন প্রতিটি জাতি বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মাধ্যমেই ইতিহাসের বুকে নিজেদের ঠাঁই করে নিয়েছে। কেউ তো অন্যের উপর নিজের মোহময় প্রভাব বিস্তারের জন্য এ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। কেউ আবার লড়েছে পৃথিবীর বুকে নিজের ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। কখনো-বা এ লড়াই সংঘটিত হয়েছে অন্যের চিন্তাজগৎকে বিক্ষত করে দেবার উদগ্র বাসনা নিয়ে। আবার কখনো সংঘটিত হয়েছে নিজেদের লুটতরাজ ও খুনখারাবির বৈধতা আদায়ের লক্ষ্যে। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দুই প্রান্তেই এই লড়াইয়ে অসংখ্য মানুষ অংশ নিয়েছে। অমুসলিমেরা যেমন অবতীর্ণ হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ময়দানে, তেমনি সেই ময়দানে মুসলমানদেরও দেখা গেছে যথার্থ টক্কর দিতে।
তবে উভয়ের ফারাক থেকেছে চিন্তা ও আদর্শে। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করে অনায়াসেই আমরা মুসলিম ও অমুসলিমের সেই চিন্তা এবং আদর্শগত ভিন্নতা বিশ্লেষণ করে উঠতে পারি।
যুগ যুগ ধরে মুসলমানেরা চিন্তাগত লড়াইয়ে শামিল হয়ে আসছে। তাদের ভূমিকা কখনো আত্মরক্ষামূলক ছিল, আবার কখনো ছিল আক্রমণাত্মক। কখনো-বা একইসাথে উভয় প্রকার লড়াইয়েই তারা অবতীর্ণ হয়েছে। মুদাফায়াত বা প্রতিরক্ষামূলক লড়াই দ্বারা উদ্দেশ্য-আল্লাহ তায়ালার সর্বশেষ মনোনীত ধর্মকে তার আসল আকৃতিতে টিকিয়ে রাখা। আর আক্রমণাত্মক বা ইকদামি লড়াই দ্বারা উদ্দেশ্য-দীনকে পৃথিবীর সকল প্রান্তে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া। এই সকল কর্মযজ্ঞে মুসলমানদের পক্ষ থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা উৎকৃষ্ট আদর্শ এবং উন্নত চরিত্রের উত্তম নমুনা। এই লড়াইয়ে মুসলমানেরা প্রতিটি পদক্ষেপে সততা, সদিচ্ছা, নিঃস্বার্থতা, আখিরাতের চিন্তা, চরিত্রের উচ্চতা, মানবতার প্রতি দায়বোধ, নিপীড়িতের প্রতি সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধের পরিচয় দিয়ে গেছে অকল্পনীয়ভাবে। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহ মুসলমানদের নির্দেশ দিয়েছে যুদ্ধ ও লড়াইয়ের ময়দানেও উন্নত আখলাকের পরিচয় দেবার জন্য; লড়াইটা অস্ত্রের হোক কিংবা চিন্তার।
বিপরীতে পাশ্চাত্য এবং কাফিরদের অস্ত্রের লড়াইয়ের ইতিহাস যেভাবে জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন ও সহিংসতায় বিক্ষত তেমনিভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়েও তাদের আঁচল মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণা, ওয়াদাখেলাফি এবং কৃত্রিমতার কালিতে কালো হয়ে আছে। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের এই ময়দান, যেখানে আমরা নিজেদের চারিত্রিক নীতি-নৈতিকতার অনুসরণের মাধ্যমে আমাদের প্রতিপক্ষকে অনবরত আঘাত করে যাচ্ছিলাম, আজ আমাদেরই অলসতা ও উদাসীনতার সুযোগে সে ময়দান শত্রুর দখলে চলে গেছে। আমাদের ধারাবাহিক উদাসীনতা বর্তমান সময়ে শত্রুকে সুযোগ করে দিয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ময়দানে কর্তৃত্বশীল হয়ে উঠবার জন্য।
📄 ১.৩: একটি বড় পার্থক্য
বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন সম্বন্ধে এ পর্যন্ত যতটুকু আলোচনা হলো, আশা করছি তাতে করে স্পষ্ট হয়ে গেছে, নিষিদ্ধ কর্মের প্রতি আগ্রহ, অশ্লীলতা, বিদআত এবং চারিত্রিক ও বিশ্বাসগত দুর্বলতা, যা বাইরের শত্রুর মাধ্যমে নয়; বরং মুসলমানের অন্তঃস্থিত শত্রুর মাধ্যমেই তার মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে, তাকে আমরা চিন্তাযুদ্ধের আলোচ্য হিসেবে গণ্য করছি না। কোনো মুসলমান যদি বেচা-বিক্রি বা চাকরিবাকরির ব্যস্ততায় নামাজে অংশ নিতে না পারে তবে এটা বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইশাস্ত্রের আলোচ্য নয়; বরং তা দাওয়াত ও আত্মশুদ্ধির আলোচনার সাথে সম্পৃক্ত।
অবশ্য এতে কোনো দ্বিমত নেই যে-মুসলমানদের চিন্তার যে লড়াই পরিচালিত হয়েছে, দাওয়াত এবং আত্মশুদ্ধিমূলক প্রচারণার সাথে তার সম্পর্ক গভীর। কিন্তু তারপরও দাওয়াত ও আত্মশুদ্ধি একটি বিস্তৃত পরিসর। বিপরীতে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ব্যাপ্তি কিছুটা স্বল্প। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে সেইসব চিন্তাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলের মোকাবেলা করা হয়, যার ফলে সমাজে মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক এবং চারিত্রিক অধঃপতন নেমে আসে। সুতরাং আমরা এভাবে বলতে পারি-দাওয়াত এবং আত্মশুদ্ধি একটি ব্যাপক ও বিস্তৃত বিষয়, যার একটি অংশ হলো এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই।
উভয়ের মধ্যকার পার্থক্যের আরেকটি দিক বলা যেতে পারে-দাওয়াত ও আত্মশুদ্ধিমূলক কার্যক্রম সাধারণত মুসলমানদের তরফে হয়ে থাকে ধর্মের বিস্তৃতির লক্ষ্যে। বিপরীতে চিন্তাযুদ্ধে মুসলিম অমুসলিম উভয়েই অংশ নেয়। এই বিবেচনায় চিন্তার লড়াইটি হলো আম বা ব্যাপক। আর দাওয়াত হলো খাস বা বিশেষ এবং সীমাবদ্ধ।
📄 ১.৪: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের দ্বিতীয় সংজ্ঞা
সাধারণ অর্থে তো যেকোনো জাতির পক্ষ থেকে পরিচালিত চিন্তার লড়াইকে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই বলা যেতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের শত্রুদের দৌরাত্ম্য অধিক এবং ইসলাম ও মুসলমানের উপর মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য বিস্তারের মধ্য দিয়ে তারা ক্রমশ সমুখে অগ্রসর হয়ে চলেছে; সে কারণে বর্তমান সময়টাতে যে-সকল মুসলিম স্কলার চিন্তাযুদ্ধের সংজ্ঞায়ন করেছেন, তারা বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই দ্বারা মুসলিমের বিরুদ্ধে পরিচালিত অমুসলিমদের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইকে উদ্দেশ্য করে থাকেন।
অধিকাংশ আরব গবেষকের রচনায় যেখানে الغزو الفكري বা চিন্তাযুদ্ধের উল্লেখ হয়েছে, সেখানে উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অমুসলিমবিশ্বের, বিশেষ করে পশ্চিমের পরিচালিত বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইকে। এ কারনেই কতক আরব আলেম চিন্তাযুদ্ধের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে : هو الغزو الذي اتخذها الصليبيين ضد المسلمين لا زالة المظاهر الحياة الاسلامية وصرف المسلمين عن التمسك بالاسلام بالوسائل غير العسكرية
বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই হলো, অস্ত্রের বিপরীতে অন্যান্য উপায়-উপকরণের মাধ্যমে পরিচালিত এমন যুদ্ধ, ক্রুসেডাররা যা মুসলমানদের বিরুদ্ধে শুরু করেছে। ইসলাম বিষয়ে মুসলমানদের আবেগ ও অনুভূতি শূণ্য করে ফেলা এবং ইসলাম থেকে তাদের দূরে সরিয়ে নেওয়াই হলো এই লড়াইয়ের উদ্দেশ্য। তবু সংজ্ঞাটি আমরা ক্রুসেডারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারি না। কারণ, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই কেবল তাদের দ্বারাই পরিচালিত হয়—এমন নয়। মুসলমানদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে ইহুদি, হিন্দু, কম্যুনিস্টসহ বহু জনগোষ্ঠী, দল ও সম্প্রদায়।
📄 ১.৫: তৃতীয় সংজ্ঞা
বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের তৃতীয় যে সংজ্ঞাটি আমরা পাই: هو اسلوب جديد للغزو ضد المسلمين بعد هزائم متكررة
অনবরত পরাজয়ের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নতুন তরিকা। অর্থের বিস্তৃতি এবং শব্দের সংক্ষিপ্ততার কারণে এই সংজ্ঞাটি বেশি উপযোগী। বিশেষ করে 'অনবরত পরাজয়ের পর' বাক্যবন্ধটি বিশেষ অর্থ ধারণ করে। এই বাক্যবন্ধ দ্বারা মূলত একটি ধারাবাহিক ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। 'বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত' শিরোনামে আমরা তা দেখে উঠব। বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের আলোচনা যেহেতু বিরোধীপক্ষ কীভাবে আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই পরিচালনা করছে এবং তাদের প্রতিরোধে কী কী পদক্ষেপ আমাদের গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়ে, সেজন্য মনস্তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই দ্বারা আমাদের বর্তমান উদ্দেশ্য সেই আগ্রাসন, পশ্চিম যা আমাদের উপর অব্যাহত রেখেছে।