📄 আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারকের কণ্ঠে আবেদদের অবস্থা
মুহাম্মাদ বিন আবু বকর বলেন, বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও শায়েখ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. আল্লাহওয়ালা আবেদদের প্রসঙ্গ স্মরণ করে বলতেন- তাদের বিছানা ছিল লুঙ্গি ও চাদর। তাকিয়া ছিল শরীরের কাপড়। তাদের রাত ছিল আল্লাহভীতিতে ভরপুর। তাদের ঘুম ছিল বাসায় আবদ্ধ ভীত-সন্ত্রস্ত পাখীর ঘুমের মত। আল্লাহর ভয়ে তাদের চেহারা এমন হলুদ হয়ে থাকত যেন তাদের চোখে-মুখে হলদে খোশবু ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে। মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে তারা এমনভাবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত, যেন প্রিয়তম কোনো ব্যক্তির সদ্য ইন্তেকালের সংবাদে তারা কাঁদছে। তাদের নিয়মিত জিকিরের মজলিস বসত আর সে মজলিসে আমি নিজেও হাজির থাকতাম। তাদের চোখগুলো ছিল আল্লাহর দীদারে উন্মুখ।
📄 মোতির বাহনে চড়ে জান্নাতে গমন
ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেহ রহ. রাত জাগরণকারীদের উচ্চমর্যাদা সম্পর্কে বলেন:
لن يبرح المتهجدون من عرصة القيامة حتى يؤتوا بنجائب من اللؤلؤ قد نفخ فيها الروح فيقال لهم : انطلقوا الى منازلكم من الجنة ركبانا، قال فيركبونها فتطير بهم متعالية والناس ينظرون إليهم فيقول بعضم لبعض : من هؤلاء الذين قد من الله عليهم من بيننا
অর্থ: "তাহাজ্জুদগুজাররা হাশরের ময়দান হতে ততক্ষণ সরবেন না, যতক্ষণ তাদের নিকট উন্নত জাতের মোতি না আনা হবে এবং তাতে রূহ সঞ্চারিত করা হবে। অতঃপর রাত জাগরণকারীদের বলা হবে, এ মোতিতে সওয়ার হয়ে তোমরা জান্নাতে নিজ নিজ ঠিকানায় চল। তখন তারা তাতে সওয়ার হবে এবং ঐ মোতি তাদের নিয়ে উপরে উঠতে থাকবে। লোকজন বিস্মিত নয়নে তাদের দেখবে এবং বলাবলি করবে, এরা কারা- যাদের প্রতি আল্লাহ পাক এমন বিশেষ মেহেরবানী করেছেন?"
বর্ণনাকারী বলেন, তারা মোতির গাড়ীতে চড়ে উপরে উঠতেই থাকবে এবং উঠতে উঠতে জান্নাতে নিজ নিজ ঠিকানায় ও স্থানে পৌঁছে যাবে।
📄 স্বপ্নের মধুর আলাপন
মুগীরা বিন হাবীব বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ বিন গালেব হাদ্দানী রহ. এক যুদ্ধে শত্রুপক্ষের সম্মুখীন হয়ে বলেন-
দুনিয়া হতে প্রাপ্ত সমস্ত নেয়ামত উৎসর্গ করছি। আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, দুনিয়ার বাড়ীর প্রতি আমার বিন্দুমাত্র মহব্বত নেই। হে আল্লাহ! যদি রাত জাগরণের প্রতি আমার মহব্বত না হত, তোমার সন্তুষ্টির জন্য পার্শ্বদেশ শয্যা হতে পৃথক রাখার অভিলাষ না হত, অন্ধকার রাতে তোমার পক্ষ থেকে সওয়াব লাভের আশাবাদী না হতাম এবং তোমার সন্তুষ্টি লাভের প্রেরণায় স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার তথা নামাযের আকাঙ্ক্ষা না থাকত, তবে আমি দুনিয়া বিসর্জন ও দুনিয়াবাসী থেকে বিচ্ছিন্নতা প্রত্যাশী হতাম।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর শায়েখ হাদ্দানী রহ. স্বীয় তলোয়ারের খাপ ভেঙে ফেলেন এবং সামনে অগ্রসর হয়ে লড়াই করতে থাকেন। লড়তে লড়তে এক সময় তিনি মারাত্মক আহত হয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়েন। রণাঙ্গন হতে তাকে যখন উঠানো হয়, তখন তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তে অবস্থান করছিলেন। মুজাহিদ ক্যাম্পে পৌছানোর পূর্বেই তিনি শহীদ হয়ে যান। তাকে দাফন করা হলে তার কবর থেকে মেশকের ঘ্রাণ বের হতে থাকে। তার এক সঙ্গী স্বপ্নে তাকে দেখেন, তখন স্বপ্নে তাদের মধ্যে নিম্নরূপ আলাপ হয়-
সঙ্গী: হে আবু ফারাস! আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছে?
শায়েখ হাদ্দাদ: খুব ভাল আচরণ করা হয়েছে।
সঙ্গী: জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে আপনাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে?
শায়েখ হাদ্দাদ: জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সঙ্গী: কোন আমলের সুবাদে?
শায়েখ হাদ্দাদ: তিন আমলের উসিলায়। (১) আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস, (২) বেশি বেশি তাহাজ্জুদ নামায পড়া এবং (৩) দিনে রোযা রাখা।
সঙ্গী: আপনার কবর হতে যে সুঘ্রাণ বের হচ্ছে তার রহস্য কী?
শায়েখ হাদ্দাদ: এটা কুরআন তেলাওয়াত এবং রোযা অবস্থায় পিপাসার কষ্ট সহ্য করার সুফল।
সঙ্গী: আমাকে কিছু ওসিয়ত করুন।
শায়েখ হাদ্দাদ: আমি তোমাকে সব কল্যাণ ও ভাল কাজের উপদেশ দিচ্ছি।
সঙ্গী: আরও কোনো ওসিয়ত থাকলে করুন।
শায়েখ হাদ্দাদ: নিজের জন্য যত পার নেকী সঞ্চয় কর। তোমার দিন-রাত যেন বেহুদা না কাটে। কেননা আমি নেককারদের দেখেছি যে, তারা তাদের উত্তম পরিণতি নেকী ও সৎকর্মের মাধ্যমে অর্জন করেছে।
📄 কেয়ামতের দিন তাহাজ্জুদগুজারদের মর্যাদা
হযরত বিশর বিন মুসলিহ আল আতাকী রহ. বলেন, আমাকে ইব্রাহীম বিন খালদ রহ. বলেছেন, এক চিত্রকর আমাকে ঘটনা শুনিয়েছেন যে, স্বপ্নে আমাকে কেয়ামতের দৃশ্য দেখানো হয়। আমি কতকের চেহারা অত্যন্ত তরুতাজা এবং ঝলমলে দেখি। তাদের শরীরে ছিল মূল্যবান পোশাক। কেয়ামতের সাধারণ সমাবেশের সাইডে তাদের আলাদা সমাবেশ ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করি, এরা কারা, যারা মূল্যবান পোশাকে সুসজ্জিত অথচ অন্য লোকজন এখনও বস্ত্রহীন? তাদের চেহারা আলো ঝলমলে অথচ অন্যদের চেহারা ধূলি-ধূসরিত ও বিধ্বস্ত?
এক লোক উত্তরে আমাকে জানায়, তুমি তাদের শরীরে যে দামী পোশাক দেখছ তার কারণ হলো, কেয়ামতে নবীদের পরে সমস্ত মানুষের মধ্যে সর্বাগ্রে মুআজ্জিন এবং কুরআনের খাদেমদের বস্ত্র পরানো হবে। তাদের চেহারার প্রফুল্লতা ও উজ্জ্বলতা হলো তাদের অধিকহারে তাহাজ্জুদ পড়ার বদলা।
মূল ঘটনার বর্ণনাকারী জনৈক চিত্রকর আরও বলেন, এরপর আমি কিছু লোককে উন্নতজাতের ঘোড়ায় চলাফেরা করতে দেখি। আমি জানতে চাইলাম, এসব লোক ঘোড়ায় চড়ে ফিরছে অথচ অন্যান্য লোক পদাতিক কেন? তখন আমাকে বলা হলো, এরা তারা, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য হাসিলের আশায় নামাযে দীর্ঘ দণ্ডায়মান থাকতেন। আল্লাহ আজ তাদের উত্তম বদলা দান করেছেন। তাদেরকে উন্নত ঘোড়া দেওয়া হয়েছে, যা কখনো পেশাব-পায়খানা করে না। তাদেরকে দেওয়া হয়েছে এমন সব স্ত্রী, যারা কোনো দিন বুড়ি হবে না এবং মৃত্যুবরণও করবে না।
চিত্রকর বলেন, আল্লাহর কসম, আমি স্বপ্নে এসব দেখে জোরে চিৎকার করে উঠে বলি- واها للعا بدين ما أشرف اليوم مقامهم অর্থ: "ইবাদতকারীদের মর্যাদা কত বড়! আজ মর্যাদায় তারাই শ্রেষ্ঠ ও শীর্ষে।"