📄 কুরআনের আলোকে তাহাজ্জুদ নামায
তাহাজ্জুদ নামাযের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতে তাহাজ্জুদের ফযীলত ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে তাহাজ্জুদ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি আয়াত ও সেগুলোর ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো।
تَتَجَافٰى جُنُوْبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ يُنْفِقُوْنَ. فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُمْ مِّنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْনَ.
অর্থ : তারা শয্যাত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশঙ্কায়, এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে। কেউ জানে না তাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কী লুকায়িত রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ।¹
আয়াতের ব্যাখ্যা : পার্শ্বদেশকে শয্যা হতে পৃথক রাখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মুফাসসিরীনে কেরামের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। হাফেজ ইবনে কাছীর রহ. তা বিশদভাবে উল্লেখ করেছেন। তবে তাফসীরের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রূহুল মা'আনী এর সম্মানিত লেখক আল্লামা মাহমুদ আলূসী রহ. তাঁর তাফসীরে লেখেন, অত্র আয়াতে পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে পৃথক করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য উঠা। এ ব্যাপারে এটিই প্রসিদ্ধ অভিমত। হাদীস থেকেও এ ব্যাখ্যার সমর্থন মেলে। হযরত মু'আজ রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى أَبْوَابِ الْخَيْرِ ؟ الصَّوْمُ جُنَّةٌ، وَالصَّدَقَةُ تُطْفِىءُ الْخَطِيئَةَ كَمَا يُطْفِىءُ الْمَاءُ النَّارَ، وَصَلَاةُ الرَّجُلِ فِي جَوْفِ اللَّইْلِ، ثُمَّ تَلَا تَتَجَافٰى جُنُوْبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ حَتَّى بَلَغَ " يَعْمَلُوْনَ "
অর্থ : আমি তোমাদেরকে কল্যাণের দ্বারসমূহের সুসংবাদ দিব? রোযা ঢালস্বরূপ। সদকা গুনাহকে এমন মিটিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুন নিভিয়ে দেয়। মধ্যরাতে উঠে নামায পড়া।²
হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ. উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় এ হাদীস উল্লেখ করে লেখেন, এ আয়াতে তাহাজ্জুদের ফযিলত বর্ণিত হয়েছে।
উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, যে সমস্ত লোক নীরব-নিস্তব্ধ রাতে আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করে, নামায, তেলাওয়াত, দুআ, ইস্তিগফার ইত্যাদিতে লিপ্ত হয় এবং আল্লাহর দেয়া রিযিক তাঁর পথে ব্যয় করে আর এ সকল ইবাদত করার সময় আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ এবং আল্লাহর ভয় থেকে নির্ভীক হয় না, তারাই প্রকৃত ও খাঁটি মুসলমান। তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলা এমন এমন নেয়ামত প্রস্তুত রেখেছেন, যা কেউ জানে না। আল্লাহ তা'আলা নিজেই সে নেয়ামত সম্পর্কে এক হাদীসে কুদসীতে ইরশাদ করেন :
قَالَ اللهُ تَعَالَى : أَعْدَدْتُ لِعِبَادِي الصَّالِحِينَ مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ ، وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ ، وَلَا خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ ، وَاقْرَؤُوا إِنْ شِئْتُمْ : فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُمْ مِّনْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْনَ [السجدة : ১৭] متفق عليه .
অর্থ : আমি নেক বান্দাদের জন্য এমন বস্তু প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শুনেনি, এমনকি কারো অন্তর তা কল্পনাও করেনি। এর প্রমাণস্বরূপ কুরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করুন-
فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُمْ مِّنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ.
অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি জানে না যে, কী নয়নাভিরাম বিষয় তাদের জন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে।³
كَانُوْا قَلِيْلًا مِّنَ الَّيْلِ مَا يَهْجَعُوْنَ. وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُوْনَ.
অর্থ : তারা রাতের সামান্য অংশে নিদ্রা যেত, রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।⁴
এ আয়াতের পূর্বের আয়াতে মুত্তাকীদের উপর আল্লাহর নেয়ামত ও করুণার আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, মুত্তাকীরা বাগ-বাগিচা এবং প্রস্রবণে থাকবে। আল্লাহ তাদেরকে যে নেয়ামত দিবেন তা তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করবে। এরপরে তাদের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের আলোচনা করা হয়েছে। তার মধ্য থেকে একটি হলো, তারা রাতে খুব কম ঘুমায়। অর্থাৎ রাতের অধিকাংশ সময় আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করে এবং রাতের শেষ প্রহরে নিজের ত্রুটি ও গুনাহের কথা স্মরণ করে এই বলে ক্ষমা প্রার্থনা করে যে, হে আল্লাহ! হক আদায় করে ইবাদত করতে পারিনি। অনুগ্রহপূর্বক নিজ অনুকম্পায় আমাকে ক্ষমা করে দিন।
মুফতী শফী রহ. তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআনে আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন : وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُوْনَ অর্থাৎ, মুমিন-পরহেযগারগণ রাতের শেষ প্রহরে গোনাহের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করে। সحر শব্দটি আসহার এর বহুবচন। এর অর্থ রাতের ষষ্ঠ প্রহর। এই প্রহরে ক্ষমা-প্রার্থনা করার ফযিলত অন্য এক আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে। আর তা হলো : والمستغفرين بالاسحار। সহীহ হাদীসের সব কয়টি কিতাবেই এই হাদীস বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে বিরাজমান হন। তিনি ঘোষণা করেন : কোনো তাওবাকারী আছে কি, যার তাওবা আমি কবুল করব? কোনো ক্ষমা-প্রার্থনাকারী আছে কি, যাকে আমি ক্ষমা করব?⁵
এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় এই যে, শেষ প্রহরে ক্ষমা প্রার্থনার আয়াতে সেই সব পরহেযগারের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে, যাদের অবস্থা পূর্ববর্তী আয়াতে বিবৃত হয়েছে যে, তারা রাতে আল্লাহ তা'আলার ইবাদতে মশগুল থাকে এবং খুব কম নিদ্রা যায়। এমতাবস্থায় ক্ষমা-প্রার্থনা করার বাহ্যত কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, গুনাহের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। যারা সমগ্র রাত ইবাদতে অতিবাহিত করেন, তারা শেষ রাতে কোন্ গুনাহের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেন?
জওয়াব এই যে, তাঁরা আল্লাহ তা'আলার আধ্যাত্মজ্ঞানে জ্ঞানী এবং আল্লাহ তা'আলার মাহাত্ম্য সম্পর্কে সম্যক অবগত। তাঁরা তাঁদের ইবাদতকে আল্লাহ তা'আলার মাহাত্ম্যের পক্ষে যথোপযুক্ত মনে করেন না। তাই এই ত্রুটি ও অবহেলার কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।⁶
وَالَّذِيْنَ يَبِيْتُوْনَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا.
অর্থ : (তারা আল্লাহর খাঁটি বান্দা) যারা তাদের প্রতিপালকের সামনে সেজদা এবং দণ্ডায়মান অবস্থায় রাত অতিবাহিত করে।⁷
এ আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, রাতে যখন মানুষ গাফেল থাকে এবং গভীর ঘুমে অচেতন থাকে, তখন তারা আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে বা সেজদারত অবস্থায় সময় কাটায়। তারা মদের দোকান, ফূর্তির স্থান, নাচ-গানের আসর, সিনেমা-থিয়েটারে সময় ব্যয় করে না। এমনকি বৈধ অন্যান্য কাজেও সময় লাগায় না; বরং নামায ও ইবাদতে পুরো সময় অতিবাহিত করে।
أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ الَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُوْ رَحْمَةَ رَبِّهٖ ، قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْনَ وَالَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْনَ ، إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ.
অর্থ : যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন সময়ে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখেরাতকে ভয় করে এবং তাঁর প্রতিপালকের অনুগ্রহ প্রকাশ করে, সে কি তার সমান, যে তা করে না? বল, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান? বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।⁸
যে বান্দা রাতের ঘুম বর্জন এবং আরাম বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত হয়, কখনো তাঁর সামনে হাত বেঁধে দাঁড়ায়, আবার কখনো তাঁকে সেজদা করে, একদিকে আখেরাতের ভয় তার হৃদয়কে অস্থির করে তোলে আবার অপরদিকে আল্লাহর রহমত লাভের আশাতেও বুক বাঁধে, এর বিপরীতে যে হতভাগারা কেবল বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকে এবং বিপদ অপসারিত হলে আল্লাহকে ভুলে যায়, এই দুই শ্রেণীর লোক কি সমান হতে পারে? কখনো নয়। যদি তারা বরাবর হয় তাহলে আলেম ও জাহেল এবং জ্ঞানী ও মূর্খের মধ্যে পার্থক্য থাকল কোথায়? অথচ এদের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা বিবেকবান ব্যক্তি মাত্রই জানেন।
উপরোক্ত আয়াতে آنَاءَ الَّيْلِ এর অনুবাদ একদল আলেম 'মধ্যরাত' করেছেন। তবে কেউ কেউ রাতের প্রথমভাগ, মধ্যভাগ ও শেষভাগ বলে উল্লেখ করেছেন।⁹
وَمِنْ آنَاءِ الَّيْلِ فَসَبِّحْ وَأَطْرَافَ النَّهَارِ لَعَلَّكَ تَرْضٰى.
অর্থ : এবং রাতে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং দিবসের প্রান্ত সমূহেও; যাতে তুমি সন্তুষ্ট হতে পার।¹⁰
মুফাসসিরীনে কেরাম লেখেন, দিনের প্রান্তভাগে পঠিত নামায দ্বারা উদ্দেশ্য জোহরের নামায। আর রাতে পঠিত নামায দ্বারা উদ্দেশ্য মাগরিব এবং ইশা। তবে কতিপয় মুফাসসিরের অভিমত হলো, রাতে পঠিত নামাযের মধ্যে তাহাজ্জুদও অন্তর্ভুক্ত।
إِنَّ نَاشِئَةَ الَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيْلًا.
অর্থ : নিশ্চয় ইবাদতের জন্য রাতে উঠা প্রবৃত্তি দমনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল।¹¹
রাতে নিদ্রা হতে ইবাদতের উদ্দেশ্যে জাগ্রত হওয়া বড় কঠিন। প্রবৃত্তিকে দমিত করতে পারলেই তা সম্ভব হয়। তখন যা কিছু বলা হয় বা আবৃত্তি করা হয়, তা হৃদয় হতে উৎসারিত হয়। আর সেই সময় পূর্ণ মনোযোগের সাথে ইবাদতও করা যায়।
মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, إِنَّ نَاشِئَةَ الَّيْلِ এর মধ্যে نَاشِئَة এর অর্থ রাতের নামাযের জন্য দণ্ডায়মান হওয়া।
হযরত আয়েশা রা. বলেন, এর অর্থ রাতে নিদ্রার পর নামাযের জন্য গাত্রোত্থান করা। তাই এর অর্থ হয়ে গেছে তাহাজ্জুদ। কারণ, এর শাব্দিক অর্থও রাতে নিদ্রার পর উঠে নামায পড়া।
ইবনে কায়সান রহ. বলেন, শেষরাতে গাত্রোত্থান করাকে نَاشِئَةَ الَّيْلِ বলা হয়। ইবনে যায়েদ রহ. বলেন, রাতের যে অংশে কোনো নামায পড়া হয়, তা نَاشِئَةَ الَّيْلِ এর অন্তর্ভুক্ত।
ইবনে আবী মুলাইকা রহ. এক প্রশ্নের জওয়াবে এবং ইবনে আব্বাস ও ইবনে যুবায়ের রহ.ও তাই বলেছেন। (মাযহারী)
এসব উক্তির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। প্রকৃতপক্ষে রাতের যে কোনো অংশে যে নামায পড়া হয়, বিশেষ করে ইশার পর যে নামায পড়া হয়, তাই قيام الليل ও نَاشِئَةَ الَّيْلِ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। যেমন হাসান বসরী রহ. বলেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও বুযুর্গগণ সর্বদা এই নামায নিদ্রার পর শেষরাতে জাগ্রত হয়ে পড়তেন। তাই এটা উত্তম ও অধিক বরকতের কারণ। তবে ইশার নামাযের পর যে কোনো নফল নামায পড়া যায় এবং তাতে তাহাজ্জুদের সুন্নত আদায় হয়ে যায়।
প্রসিদ্ধ কেরাত মতে وطأ শব্দটির অর্থ দলন করা, পিষ্ট করা। আয়াতের অর্থ এই যে, রাতের নামায প্রবৃত্তি দলনে খুবই সহায়ক; অর্থাৎ এতে করে প্রবৃত্তিকে বশে রাখা এবং অবৈধ বাসনা থেকে বিরত রাখার কাজে সাহায্য পাওয়া যায়।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, أَشَدُّ وَطْئًا এর অর্থ এই যে, কর্ণ ও অন্তরের মধ্যে তখন অধিকতর একাত্মতা থাকে। কারণ রাত্রিবেলায় সাধারণত কাজকর্ম ও হট্টগোল থাকে না। তখন মুখ থেকে যে বাক্য উচ্চারিত হয়, কর্ণও তা শোনে ও অন্তরও উপস্থিত থাকে।
ইবনে যায়েদ রা. বলেন, রাতে নামাযের জন্য গাত্রোত্থান করা অন্তর, দৃষ্টি, কর্ণ ও জিহ্বার পারস্পরিক একাত্মতা সৃষ্টিতে খুবই কার্যকর।
أَقْوَمُ শব্দের অর্থ অধিক সঠিক অর্থাৎ রাত্রিবেলায় কুরআন তেলাওয়াত অধিক শুদ্ধতা ও স্থিরতা সহকারে হতে পারে। কারণ, তখন বিভিন্ন প্রকার ধ্বনি ও হট্টগোল দ্বারা অন্তর ও মস্তিষ্ক ব্যাকুল হয় না।
إِنَّ رَبَّكَ يَعْلَمُ أَنَّكَ تَقُوْমُ أَدْنٰى مِنْ ثُلُثَيِ الَّيْلِ وَنِصْفَهٗ وَثُلُثَهٗ وَطَائِفَةٌ মِّنَ الَّذِيْنَ مَعَكَ.
অর্থ : আপনার পালনকর্তা জানেন, আপনি ইবাদতের জন্য দণ্ডায়মান হন রাতের প্রায় দু'তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ ও তৃতীয়াংশ এবং আপনার সঙ্গীদের একটি দলও দণ্ডায়মান হয়।¹²
উক্ত আয়াতের সারকথা হলো, আল্লাহ বলছেন, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ ভাল করেই জানেন যে, আপনি ও আপনার সাথীগণ আমার قيام الليل এর নির্দেশ যথাযথ বাস্তবায়ন করেছেন। আপনারা কখনো অর্ধারাত, কখনো দুই-তৃতীয়াংশ, কখনো এক-তৃতীয়াংশ রাত আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেন। কোনো কোনো রেওয়ায়েত হতে জানা যায় যে, সাহাবায়ে কেরাম রাতে এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামায পড়তেন যে, তাঁদের পা ফুলে-ফেটে যাওয়ার উপক্রম হত।
আল্লামা যুবায়দী রহ. লেখেন, আল্লাহ তা'আলা রাত জাগরণকারীদের সওয়াবের কথা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সওয়াবের পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। এতে করে তাদের মর্যাদার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اسْتَعِيْنُوْا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ.
অর্থ : তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।¹³
আল্লামা যুবায়দী রহ. বলেন, একদল আলেমের মতে এখানে নামায দ্বারা উদ্দেশ্য, রাতে নামায পড়া। যার দ্বারা নফসের ইসলাহ এবং সমস্ত দ্বিধা-সংশয় দূরীভূত হয়। -ইতহাফ
وَمِنَ الَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهٖ نَافِلَةً لَّكَ عَسٰى أَنْ يَّبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُوْডًا.
অর্থ : রাতের কিছু অংশ কুরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকুন। এটা আপনার জন্যে অতিরিক্ত। হয়তবা আপনার পালনকর্তা আপনাকে মাকামে মাহমূদে পৌঁছাবেন।¹⁴
তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআনে এ আয়াতের দীর্ঘ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সংক্ষেপে তা নিম্নরূপ :
وَمِنَ الَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهٖ : تهجد শব্দটি নিদ্রা যাওয়া ও জাগ্রত হওয়া এই পরস্পর বিরোধী দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়। আয়াতের অর্থ এই যে, রাতের কিছু অংশে কুরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকুন। কেননা 'বে' সর্বনাম দ্বারা কুরআন বোঝানো হয়েছে (মাযহারী)। কুরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকার অর্থ নামায পড়া। এ কারণেই শরীয়তের পরিভাষায় রাত্রিকালীন নামাযকে 'তাহাজ্জুদ নামায' বলা হয়।
سِيْمَاهُمْ فِيْ وُجُوْهِهِمْ মِّنْ أَثَرِ السُّجُوْডِ.
অর্থ : তাঁদের মুখমণ্ডলে রয়েছে সেজদার চিহ্ন।¹⁵
কোনো কোনো মুফাসসির এ আয়াতকে তাহাজ্জুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলেছেন। আয়াতে সেজদার চিহ্ন বলে নূরের আভা বোঝানো হয়েছে। কপালে সেজদার কালো দাগ বোঝানো হয়নি। বিশেষত তাহাজ্জুদ নামাযের ফলে এই চিহ্ন বেশি ফুটে উঠে। যেমন মুহাদ্দিস শরীক্ ইবনে আব্দুল্লাহ্ নাখায়ী কুফী রহ. বলেন :
مَنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهٗ بِاللَّيْلِ حَسُنَ وَজْهُهٗ بِالنَّهَارِ —
অর্থ : যে ব্যক্তি রাতে বেশি নামায পড়ে, দিনের বেলায় তার চেহারা সুন্দর ও নূরান্বিত হয়।¹⁶
টিকাঃ
১. সূরা সাজদা-আয়াত : ১৬-১৭।
২. তিরমিযী ২:৮৯।
৩. বায়হাকী।
৪. সূরা যারিয়াত : ১৭-১৮।
৫. ইবনে কাসীর।
৬. মা'আরিফুল কুরআন।
৭. সূরা ফুরকান, আয়াত : ৬৪।
৮. সূরা যুমার : ৯।
৯. ইবনে কাসীর।
১০. সূরা ত্বোয়া-হা : আয়াত-১৩০।
১১. সূরা মুয্যাম্মিল : আয়াত-৬।
১২. সূরা মুয্যাম্মিল : আয়াত-২০।
১৩. সূরা বাকারা : আয়াত-১৫৩।
১৪. সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত-৭৯।
১৫. সূরা ফাতহ : আয়াত-২৯।
১৬. আলমাছনু-১৯২।
তাহাজ্জুদ নামাযের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতে তাহাজ্জুদের ফযীলত ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে তাহাজ্জুদ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি আয়াত ও সেগুলোর ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো।
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُوْنَ . فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ .
অর্থ: তারা শয্যাত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায়, এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে। কেউ জানে না তাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কী লুকায়িত রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ।¹
আয়াতের ব্যাখ্যা: পার্শ্বদেশকে শয্যা হতে পৃথক রাখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মুফাসসিরীনে কেরামের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। হাফেজ ইবনে কাছীর রহ. তা বিশদভাবে উল্লেখ করেছেন। তবে তাফসীরের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রূহুল মা'আনী এর সম্মানিত লেখক আল্লামা মাহমূদ আলুসী রহ. তাঁর তাফসীরে লেখেন, অত্র আয়াতে পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে পৃথক করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য উঠা। এ ব্যাপারে এটিই প্রসিদ্ধ অভিমত। হাদীস থেকেও এ ব্যাখ্যার সমর্থন মেলে। হযরত মু'আজ রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: ألا أَدُلُّكَ على أَبْوَابِ الخَيْرِ ؟ الصَّوْمُ جُنَّةٌ، وَالصَّدَقَةُ تُطْفِي الخَطِيئَةَ كما يُطفىء الماء النارَ، وَصَلاةُ الرَّجُلِ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ، ثم تলা تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ পর্যন্ত।²
অর্থ: আমি তোমাদেরকে কল্যাণের দ্বারসমূহের সুসংবাদ দিব? রোযা ঢালস্বরূপ। সদকা গুনাহকে এমন মিটিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুন নিভিয়ে দেয়। মধ্যরাতে উঠে নামায পড়া।
হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ. উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় এ হাদীস উল্লেখ করে লেখেন, এ আয়াতে তাহাজ্জুদের ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, যে সমস্ত লোক নীরব-নিস্তব্ধ রাতে আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করে, নামায, তেলাওয়াত, দুআ, ইস্তেগফার ইত্যাদিতে লিপ্ত হয় এবং আল্লাহর দেয়া রিযিক তাঁর পথে ব্যয় করে আর এ সকল ইবাদত করার সময় আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ এবং আল্লাহর ভয় থেকে নির্ভীক হয় না, তারাই প্রকৃত ও খাঁটি মুসলমান। তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলা এমন এমন নেয়ামত প্রস্তুত রেখেছেন, যা কেউ জানে না। আল্লাহ তা'আলা নিজেই সে নেয়ামত সম্পর্কে এক হাদীসে কুদসীতে ইরশাদ করেন: قَالَ اللهُ تَعَالَى : أَعْدَدْتُ لعِبَادِي الصَّالِحِينَ مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ ، وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ ، وَلَا خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ ، وَاقْرَؤُوا إِنْ شِئْتُمْ : فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنِ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ [السجدة : ۱۷] متفق عَلَيْهِ³
অর্থ: আমি নেক বান্দাদের জন্য এমন বস্তু প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শুনেনি, এমনকি কারো অন্তর তা কল্পনাও করেনি। এর প্রমাণস্বরূপ কুরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত কর- فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ . অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি জানে না যে, কী নয়নাভিরাম বিষয় তাদের জন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ - وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ.⁴
অর্থ: তারা রাতের সামান্য অংশে নিদ্রা যেত, রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।
এ আয়াতের পূর্বের আয়াতে মুত্তাকীদের উপর আল্লাহর নেয়ামত ও করুণার আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, মুত্তাকীরা বাগ-বাগিচা এবং প্রস্রবণে থাকবে। আল্লাহ তাদেরকে যে নেয়ামত দিবেন তা তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করবে। এরপরে তাদের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের আলোচনা করা হয়েছে। তার মধ্য থেকে একটি হলো, তারা রাতে খুব কম ঘুমায়। অর্থাৎ রাতের অধিকাংশ সময় আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করে এবং রাতের শেষ প্রহরে নিজের ত্রুটি ও গুনাহের কথা স্মরণ করে এই বলে ক্ষমা প্রার্থনা করে যে, হে আল্লাহ! হক আদায় করে ইবাদত করতে পারিনি। অনুগ্রহপূর্বক নিজ অনুকম্পায় আমাকে ক্ষমা করে দিন।⁵
মুফতী শফী রহ. তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআনে আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন : وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَসْتَغْفِرُونَ অর্থাৎ, মুমিন-পরহেযগারগণ রাতের শেষ প্রহরে গোনাহের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করে। السَّحَارُ শব্দটি এর বহুবচন। এর অর্থ রাতের ষষ্ঠ প্রহর। এই প্রহরে ক্ষমা-প্রার্থনা করার ফযিলত অন্য এক আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে। আর তা হলো : وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ
বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে বিরাজমান হন। তিনি ঘোষণা করেন: কোনো তাওবাকারী আছে কি, যার তাওবা আমি কবুল করব? কোনো ক্ষমা-প্রার্থনাকারী আছে কি, যাকে আমি ক্ষমা করব?⁶ জওয়াব এই যে, তাঁরা আল্লাহ তা'আলার আধ্যাত্মজ্ঞানে জ্ঞানী এবং আল্লাহ তা'আলার মাহাত্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। তাঁরা তাঁদের ইবাদতকে আল্লাহ তা'আলার মাহাত্মের পক্ষে যথোপযুক্ত মনে করেন না। তাই এই ত্রুটি ও অবহেলার কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا.⁷
অর্থ: (তারা আল্লাহর খাঁটি বান্দা) যারা তাদের প্রতিপালকের সামনে সেজদা এবং দণ্ডায়মান অবস্থায় রাত অতিবাহিত করে। এ আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, রাতে যখন মানুষ গাফেল থাকে এবং গভীর ঘুমে অবচেতন থাকে, তখন তারা আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে বা সেজদারত অবস্থায় সময় কাটায়। তারা মদের দোকান, ফুর্তির স্থান, নাচ-গানের আসর, সিনেমা-থিয়েটারে সময় ব্যয় করে না। এমনকি বৈধ অন্যান্য কাজেও সময় লাগায় না; বরং নামায ও ইবাদতে পুরো সময় অতিবাহিত করে।
أَمْ مَنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ .⁸
অর্থ: যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন সময়ে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখেরাতকে ভয় করে এবং তাঁর প্রতিপালকের অনুগ্রহ প্রকাশ করে, সে কি তার সমান, যে তা করে না? বল, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান? বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।
যে বান্দা রাতের ঘুম বর্জন এবং আরাম বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত হয়, কখনো তাঁর সামনে হাত বেঁধে দাঁড়ায়, আবার কখনো তাঁকে সেজদা করে, একদিকে আখেরাতের ভয় তার হৃদয়কে অস্থির করে তোলে আবার অপরদিকে আল্লাহর রহমত লাভের আশাতেও বুক বাঁধে, এর বিপরীতে যে হতভাগারা কেবল বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকে এবং বিপদ অপসারিত হলে আল্লাহকে ভুলে যায়, এই দুই শ্রেণীর লোক কি সমান হতে পারে? কখনো নয়। যদি তারা বরাবর হয় তাহলে আলেম ও জাহেল এবং জ্ঞানী ও মূর্খের মধ্যে পার্থক্য থাকল কোথায়? অথচ এদের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা বিবেকবান ব্যক্তি মাত্রই জানেন। উপরোক্ত আয়াতে وَمِنْ آنَاءِ اللَّيْلِ ا এর অনুবাদ একদল আলেম 'মধ্যরাত' করেছেন। তবে কেউ কেউ রাতের প্রথমভাগ, মধ্যভাগ ও শেষভাগ বলে উল্লেখ করেছেন।⁹
وَمِنْ آنَاءِ اللَّيْلِ فَسَبِّحْ وَأَطْرَافَ النَّهَارِ لَعَلَّكَ تَرْضَى .¹⁰
অর্থ: এবং রাতে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং দিবসের প্রান্ত সমূহেও; যাতে তুমি সন্তুষ্ট হতে পার। মুফাসসিরীনে কেরাম লেখেন, দিনের প্রান্তভাগে পঠিত নামায দ্বারা উদ্দেশ্য জোহরের নামায। আর রাতে পঠিত নামায দ্বারা উদ্দেশ্য মাগরিব এবং ইশা। তবে কতিপয় মুফাসসিরের অভিমত হলো, রাতে পঠিত নামাযের মধ্যে তাহাজ্জুদও অন্তর্ভুক্ত।
إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا.¹¹
অর্থ: নিশ্চয় ইবাদতের জন্য রাতে উঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। রাতে নিদ্রা হতে ইবাদতের উদ্দেশ্যে জাগ্রত হওয়া বড় কঠিন। প্রবৃত্তিকে প্রদমিত করতে পারলেই তা সম্ভব হয়। তখন যা কিছু বলা হয় বা আবৃত্তি করা হয়, তা হৃদয় হতে উৎসারিত হয়। আর সেই সময় পূর্ণ মনোযোগের সাথে ইবাদতও করা যায়। মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ এর মধ্যে ناشئة এর অর্থ রাতের নামাযের জন্য দণ্ডায়মান হওয়া।
হযরত আয়েশা রা. বলেন, এর অর্থ রাতে নিদ্রার পর নামাযের জন্য গাত্রোত্থান করা। তাই এর অর্থ হয়ে গেছে তাহাজ্জুদ। কারণ, এর শাব্দিক অর্থও রাতে নিদ্রার পর উঠে নামায পড়া। ইবনে কায়সান রহ. বলেন, শেষরাতে গাত্রোত্থান করাকে نَاشِئَةَ اللَّيْلِ বলা হয়। ইবনে যায়েদ রহ. বলেন, রাতের যে অংশে কোনো নামায পড়া হয়, তা نَاشِئَةَ اللَّيْلِ এর অন্তর্ভুক্ত। ইবনে আবী মুলাইকা রহ. এক প্রশ্নের জওয়াবে এবং ইবনে আব্বাস ও ইবনে যুবায়ের রহ. ও তাই বলেছেন। (মাযহারী)
এসব উক্তির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। প্রকৃতপক্ষে রাতের যে কোনো অংশে যে নামায পড়া হয়, বিশেষ করে ইশার পর যে নামায পড়া হয়, তাই نَاشِئَةَ اللَّيْلِ ও قيام الليل এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। যেমন হাসান বসরী রহ. বলেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও বুযুর্গগণ সর্বদাই এই নামায নিদ্রার পর শেষরাতে জাগ্রত হয়ে পড়তেন। তাই এটা উত্তম ও অধিক বরকতের কারণ। তবে ইশার নামাযের পর যে কোনো নফল নামায পড়া যায় এবং তাতে তাহাজ্জুদের সুন্নত আদায় হয়ে যায়। প্রসিদ্ধ কেরাআত মতে শব্দটির অর্থ দলন করা, পিষ্ট করা। আয়াতের অর্থ এই যে, রাতের নামায প্রবৃত্তি দলনে খুবই সহায়ক; অর্থাৎ এতে করে প্রবৃত্তিকে বশে রাখা এবং অবৈধ বাসনা থেকে বিরত রাখার কাজে সাহায্য পাওয়া যায়।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, এর অর্থ এই যে, কর্ণ ও অন্তরের মধ্যে তখন অধিকতর একাত্মতা থাকে। কারণ রাত্রিবেলায় সাধারণত কাজকর্ম ও হট্টগোল থাকে না। তখন মুখ থেকে যে বাক্য উচ্চারিত হয়, কর্ণও তা শোনে ও অন্তরও উপস্থিত থাকে। ইবনে যায়েদ রা. বলেন, রাতে নামাযের জন্য গাত্রোত্থান করা অন্তর, দৃষ্টি, কর্ণ ও জিহ্বার পারস্পরিক একাত্মতা সৃষ্টিতে খুবই কার্যকর। أَقومُ শব্দের অর্থ অধিক সঠিক অর্থাৎ রাত্রিবেলায় কুরআন তেলাওয়াত অধিক শুদ্ধতা ও স্থিরতা সহকারে হতে পারে। কারণ, তখন বিভিন্ন প্রকার ধ্বনি ও হট্টগোল দ্বারা অন্তর ও মস্তিষ্ক ব্যাকুল হয় না।
إِنَّ رَبَّكَ يَعْلَمُ أَنَّكَ تَقُوْمُ أَدْنَى مِنْ ثُلُثَيِ اللَّيْلِ وَنِصْفَهُ وَثُلُثَهُ وَطَائِفَةٌ مِنَ الَّذِينَ مَعَكَ .¹²
অর্থ: আপনার পালনকর্তা জানেন, আপনি ইবাদতের জন্য দণ্ডায়মান হন রাতের প্রায় দু'তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ ও তৃতীয়াংশ এবং আপনার সঙ্গীদের একটি দলও দণ্ডায়মান হয়। উক্ত আয়াতের সারকথা হলো, আল্লাহ বলছেন, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ ভাল করেই জানেন যে, আপনি ও আপনার সাথীগণ আমার কিয়ামুল্লাইল এর নির্দেশ যথাযথ বাস্তবায়ন করেছেন। আপনারা কখনো অর্ধরাত, কখনো দুই-তৃতীয়াংশ, কখনো এক-তৃতীয়াংশ রাত আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেন। কোনো কোনো রেওয়ায়েত হতে জানা যায় যে, সাহাবায়ে কেরাম রাতে এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামায পড়তেন যে, তাঁদের পা ফুলে-ফেটে যাওয়ার উপক্রম হত। আল্লামা যুবায়দী রহ. লেখেন, আল্লাহ তা'আলা রাত জাগরণকারীদের সওয়াবের কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সওয়াবের পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। এতে করে তাদের মর্যাদার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ .¹³
অর্থ: তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। আল্লামা যুবায়দী রহ. বলেন, একদল আলেমের মতে এখানে নামায দ্বারা উদ্দেশ্য, রাতে নামায পড়া। যার দ্বারা নফসের ইসলাহ এবং সমস্ত দ্বিধা-সংশয় দূরীভূত হয়।
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا.¹⁴
অর্থ: রাতের কিছু অংশ কুরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকুন। এটা আপনার জন্যে অতিরিক্ত। হয়তবা আপনার পালনকর্তা আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন। তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআনে এ আয়াতের দীর্ঘ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সংক্ষেপে তা নিম্নরূপঃ
تهجد : وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ শব্দটি নিদ্রা যাওয়া ও জাগ্রত হওয়া এই পরস্পর বিরোধী দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়। আয়াতের অর্থ এই যে, রাতের কিছু অংশে কুরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকুন। কেননা 'ব' সর্বনাম দ্বারা কুরআন বোঝানো হয়েছে (মাযহারী)। কুরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকার অর্থ নামায পড়া। এ কারণেই শরীয়তের পরিভাষায় রাত্রিকালীন নামাযকে 'তাহাজ্জুদ নামায' বলা হয়।
سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ.¹⁵
অর্থ: তাঁদের মুখমণ্ডলে রয়েছে সেজদার চিহ্ন। কোনো কোনো মুফাসসির এ আয়াতকে তাহাজ্জুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলেছেন। আয়াতে সেজদার চিহ্ন বলে নূরের আভা বোঝানো হয়েছে। কপালে সেজদার কালো দাগ বোঝানো হয়নি। বিশেষত তাহাজ্জুদ নামাযের ফলে এই চিহ্ন বেশী ফুটে উঠে। যেমন মুহাদ্দিস শরীকু ইবনে আব্দুল্লাহ নাখায়ী কুফী রহ. বলেন: مَنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهُ بِاللَّيْلِ حَسُنَ وَجْهُهُ بِالنَّهَارِ - অর্থ: যে ব্যক্তি রাতে বেশি নামায পড়ে, দিনের বেলায় তার চেহারা সুন্দর ও নূরান্বিত হয়।¹⁶
টিকাঃ
১. সূরা সাজদা-আয়াত: ১৬-১৭।
২. তিরমিযী ২:৮৯।
৩. বায়হাকী।
৪. সূরা যারিয়াত: ১৭-১৮।
৫. ইবনে কাসীর।
৬. মা'আরিফুল কুরআন।
৭. সূরা ফুরকান, আয়াত: ৬৪।
৮. সূরা যুমার: ৯।
৯. ইবনে কাসীর।
১০. সূরা ত্বোয়া-হাঃ আয়াত-১৩০।
১১. সূরা মুয্যাম্মিল : আয়াত-৬।
১২. সূরা মুয্যাম্মিল: আয়াত-২০।
১৩. সূরা বাকারা: আয়াত-১৫৩।
১৪. সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-৭৯।
১৫. সূরা ফাতহঃ আয়াত-২৯।
১৬. আলমাছনৃ-১৯২।
📄 তাহাজ্জুদের ফায়দা
তাহাজ্জুদের ফায়দা : মাযাহেরে হক গ্রন্থ প্রণেতা লেখেন যে, হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহ. কে জনৈক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, আল্লাহপাক আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? উত্তরে তিনি জানান যে, আমি মারেফাত ও হাকীকত সম্বন্ধে যা কিছু বলেছি তার কিছুই আমার উপকারে আসেনি, কোনো সাহায্যে আসেনি ঐ সমস্ত সূক্ষ্ম ও চিকন কথা বা ইশারা যা আমি বয়ান করেছি; কিন্তু গভীর রাতে যা কিছু নামায (তাহাজ্জুদ) পড়তাম, আল্লাহপাক তার উসিলায় আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং জান্নাত দান করেছেন।
মাযাহেরে হক গ্রন্থ প্রণেতা লেখেন যে, হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহ. কে জনৈক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, আল্লাহপাক আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? উত্তরে তিনি জানান যে, আমি মারেফাত ও হাকীকত সম্বন্ধে যা কিছু বলেছি তার কিছুই আমার উপকারে আসেনি, কোনো সাহায্যে আসেনি ঐ সমস্ত সূক্ষ্ম ও চিকন কথা বা ইশারা যা আমি বয়ান করেছি; কিন্তু গভীর রাতে যা কিছু নামাজ (তাহাজ্জুদ) পড়তাম, আল্লাহপাক তার উসিলায় আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং জান্নাত দান করেছেন।
টিকাঃ
১৯. বায়হাকী, মেশকাত-১০৯।
২০. বায়হাকী, মেশকাত-১১০।
📄 কুরআনের বাহক কারা
কুরআনের বাহক কারা : কুরআনের বাহক দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ সকল ব্যক্তি, যারা কুরআন মুখস্থ করে তার অর্থ বোঝে এবং কুরআনের সমস্ত আদেশ-নিষেধ মান্য করে। অবশ্য কেউ কেউ শুধু হাফেজদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
কুরআনের বাহক দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ সকল ব্যক্তি, যারা কুরআন মুখস্থ করে তার অর্থ বোঝে এবং কুরআনের সমস্ত আদেশ-নিষেধ মান্য করে। অবশ্য কেউ কেউ শুধু হাফেজদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
📄 পূর্ববর্তী নবীদের তাহাজ্জুদ
পূর্ববর্তী অনেক নবী-রাসূল তাহাজ্জুদ পড়েছেন। তবে তাদের মধ্য হযরত মূসা আ., হযরত দাউদ আ., হযরত সুলাইমান আ. এবং হযরত ঈসা আ.-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১. হযরত মূসা আ.-এর তাহাজ্জুদ
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি মেরাজের রাতে হযরত মূসা আ.-এর পাশ দিয়ে গমনকালে তাকে দেখি যে, তিনি কবরে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন।³²
২. হযরত দাউদ আ.-এর তাহাজ্জুদ
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নফল নামাযসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নামায হল হযরত দাউদ আ.-এর নামায এবং নফল রোযাসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোযা হল হযরত দাউদ আ.-এর রোযা। হযরত দাউদ আ.-এর অভ্যাস ছিল, তিনি রাতের শুরুতে ঘুমিয়ে রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে উঠে তাহাজ্জুদ নামায পড়তেন। পরে কিছু সময় আরাম করতেন। আর তিনি একদিন পরপর রোযা রাখতেন।³³
৩. হযরত সুলাইমান আ.-এর তাহাজ্জুদ
হযরত দাউদ আ. ও তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান আ. নিজেদের মাঝে রাত ভাগ করে নিয়েছিলেন। হযরত দাউদ আ. সুলাইমান আ.-কে বলেছিলেন, বাবা! হয়ত তুমি প্রথম রাতে তাহাজ্জুদ পড়বে আর আমি পড়ব শেষ রাতে অথবা তুমি শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়বে আর আমি পড়ব প্রথম রাতে। রাতে কখনও এমন হত না যে, পিতা-পুত্র একই সময়ে ঘুমিয়েছেন।³⁴
৪. হযরত ঈসা আ.-এর তাহাজ্জুদ
হযরত ঈসা আ.ও তাহাজ্জুদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। কেননা তাহাজ্জুদ প্রসঙ্গে তার বাণী স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি বলেন : রাতে যারা তাহাজ্জুদ নামাযে লিপ্ত থাকে তাদের জন্য শুভ কামনা। যারা এভাবে অন্ধকার রাতে প্রভুর সামনে দাঁড়ায় তাদেরকে একটি স্থায়ী নূর দেয়া হয়।
টিকাঃ
৩২. মুসনাদে আহমদ, মুসলিম, নাসাঈ।
৩৩. বুখারী, মুসলিম।
৩৪. আত তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লায়াল।
পূর্ববর্তী অনেক নবী-রাসূল তাহাজ্জুদ পড়েছেন। তবে তাদের মধ্য হযরত মূসা আ., হযরত দাউদ আ., হযরত সুলাইমান আ. এবং হযরত ঈসা আ.-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেযোগ্য।
১. হযরত মূসা আ.-এর তাহাজ্জুদ
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি মেরাজের রাতে হযরত মূসা আ.-এর পাশ দিয়ে গমনকালে তাকে দেখি যে, তিনি কবরে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন।³²
২. হযরত দাউদ আ.-এর তাহাজ্জুদ
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নফল নামাযসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নামায হল হযরত দাউদ আ.-এর নামায এবং নফল রোযাসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোযা হল হযরত দাউদ আ.-এর রোযা। হযরত দাউদ আ.-এর অভ্যাস ছিল, তিনি রাতের শুরুতে ঘুমিয়ে রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে উঠে তাহাজ্জুদ নামায পড়তেন। পরে কিছু সময় আরাম করতেন। আর তিনি একদিন পরপর রোযা রাখতেন।³³
৩. হযরত সুলাইমান আ.-এর তাহাজ্জুদ
হযরত দাউদ আ. ও তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান আ. নিজেদের মাঝে রাত ভাগ করে নিয়েছিলেন। হযরত দাউদ আ. সুলাইমান আ.-কে বলেছিলেন, বাবা! হয়ত তুমি প্রথম রাতে তাহাজ্জুদ পড়বে আর আমি পড়ব শেষ রাতে অথবা তুমি শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়বে আর আমি পড়ব প্রথম রাতে। রাতে কখনও এমন হত না যে, পিতা-পুত্র একই সময়ে ঘুমিয়েছেন।³⁴
৪. হযরত ঈসা আ.-এর তাহাজ্জুদ
হযরত ঈসা আ.ও তাহাজ্জুদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। কেননা তাহাজ্জুদ প্রসঙ্গে তার বাণী স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি বলেন: রাতে যারা তাহাজ্জুদ নামাযে লিপ্ত থাকে তাদের জন্য শুভ কামনা। যারা এভাবে অন্ধকার রাতে প্রভুর সামনে দাঁড়ায় তাদেরকে একটি স্থায়ী নূর দেয়া হয়।
টিকাঃ
৩১. মুয়াত্তা মালেক, মেশকাত-১১০।
৩২. মুসনাদে আহমদ, মুসলিম, নাসায়ী।
৩৩. বুখারী, মুসলিম।
৩৪. আত তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লায়ল।