📄 সুপারিশের শির্ক
১৪. সুপারিশের শিরকঃ
সুপারিশের শির্ক বলতে আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর নিকট পরকালের সার্বিক মুক্তির জন্য গ্রহণযোগ্য কোন সুপারিশ কামনা করাকে বুঝানো হয়।
এ জাতীয় সুপারিশের অনুমতি বা মঞ্জুরির চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার হাতে। অতএব তিনি ছাড়া অন্য কারোর নিকট তা কামনা করা মারাত্মক শির্ক।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ قُلْ لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعاً অর্থাৎ (হে নবী!) আপনি বলে দিনঃ যাবতীয় সুপারিশ একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই জন্য তথা তাঁরই ইখতিয়ারে। অন্য কারোর ইখতিয়ারে নয়।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ مَا لَكُمْ مِّنْ دُونِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَ لَا شَفِيعٍ ، أَفَلَا تَتَذَكَّرُوْنَ অর্থাৎ তিনি ছাড়া তোমাদের জন্য কোন অভিভাবকও নেই এবং সুপারিশকারীও। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?
তিনি আরো বলেনঃ لَيْسَ لَهُمْ مِّنْ دُوْنِهِ وَلِيٌّ وَ لَا شَفِيعٌ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُوْنَ অর্থাৎ তিনি ছাড়া তাদের না কোন সাহায্যকারী থাকবে না কোন সুপারিশকারী। এতে করে হয়তোবা তারা আল্লাহ্ তা'আলাকে ভয় করবে। কিয়ামতের দিন কেউ কারোর জন্য সুপারিশ করতে চাইলে তাকে সর্বপ্রথম আল্লাহ্ তা'আলার অনুমতি নিতে হবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ অর্থাৎ কে আছে এমন যে আল্লাহ্ তা'আলার অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট কারোর জন্য সুপারিশ করতে পারে? আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার অনুমতি ছাড়া সে দিন কোন সুপারিশকারী থাকবে না।
সুপারিশ তো দূরের কথা সে দিন তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে কেউ কোন কথাই বলার অধিকার রাখবে না। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ অর্থাৎ সে দিন কোন ব্যক্তি তাঁর (আল্লাহ্ তা'আলার) অনুমতি ছাড়া কথাও বলতে পারবে না। আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ لَا يَتَكَلَّمُوْنَ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ অর্থাৎ সে দিন দয়াময় প্রভুর অনুমতি ছাড়া কেউ কোন কথা বলতে পারবেনা। সে দিন কেউ আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে সুপারিশ করার অনুমতি পেলেও সে নিজ ইচ্ছানুযায়ী যে কোন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবেনা। বরং সে এমন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবে যার উপর আল্লাহ্ তা'আলা সন্তুষ্ট। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ لَا يَشْفَعُوْنَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى অর্থাৎ ফিরিস্তাগণ শুধু ওদের জন্যই সুপারিশ করবে যাদের প্রতি আল্লাহ্ তা'আলা সন্তুষ্ট। আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ وَ كَمْ مِّنْ مَّلَكَ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَ يَرْضَى অর্থাৎ আকাশে অনেক ফিরিস্তা এমন রয়েছে যাদের সুপারিশ কোন কাজে আসবে না যতক্ষণনা আল্লাহ্ তা'আলা সুপারিশের অনুমতি দিবেন যাকে ইচ্ছা তাকে এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তার জন্য। আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ يَوْمَئِذٍ لَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَ رَضِيَ لَهُ قَوْلاً অর্থাৎ সে দিন কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। তবে শুধু ওর সুপারিশই ফলপ্রসূ হবে যাকে দয়াময় প্রভু সুপারিশের অনুমতি দিবেন এবং যার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা সুপারিশ করা পছন্দ করবেন।
এমনকি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ ও সে দিন আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সুপারিশের অনুমতি চাবেন। অতঃপর তাঁকে সুপারিশের অনুমতি দেয়া হবে এবং সাথে সাথে তাঁর জন্য সুপারিশের গণ্ডিও ঠিক করে দেয়া হবে। অতএব আল্লাহ্ তা'আলার অনুমতি ছাড়া এবং তাঁর নির্ধারিত গণ্ডির বাইরে সে দিন তিনিও কারোর জন্য সুপারিশ করতে পারবেন না।
হযরত আনাস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী ইরশাদ করেনঃ فَيَأْتُوْنِي فَأَنْطَلِقُ حَتَّى أَسْتَأْذِنَ عَلَى رَبِّي فَيُؤْذَنَ لِي ، فَإِذَا رَأَيْتُ رَبِّي وَقَعْتُ ساجداً ، فَيَدَعُنِي مَا شَاءَ اللهُ ، ثُمَّ يُقَالُ: ارْفَعْ رَأْسَكَ وَ سَلْ تُعْطَهُ ، وَقُلْ يُسْمَعْ، وَ اشْفَعْ تُشَفَعْ فَأَرْفَعُ رَأْسِي فَأَحْمَدُهُ بِتَحْمِيدِ يُعَلِّمُنِيهِ ، ثُمَّ أَشْفَعُ ، فَيُحَدُّ لِي حَدًّا ، فَأُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ ، ثُمَّ أَعُوْدُ إِلَيْهِ ، فَإِذَا رَأَيْتُ رَبِّي وَقَعْتُ سَاجِداً مِثْلَهُ ، ثُمَّ أَشْفَعُ فَيُحَدُّ لِي حَداً فَأُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ وَ هَكَذَا الثَّالِثَةُ ، ثُمَّ أَعُوْدُ الرَّابِعَةَ فَأَقُولُ: مَا بَقِيَ فِي النَّارِ إِلَّا مَنْ حَبَسَهُ الْقُرْآنُ وَ وَجَبَ عَلَيْهِ الْخُلُوْدُ অর্থাৎ জান্নাতীদেরকে জান্নাতে ঢুকার পূর্বে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা হবে। তখন তারা নবীদের সুপারিশ কামনা করলে কেউ তাতে রাজি হবেননা। পরিশেষে তারা রাসূল এর নিকট আসবে। রাসূল বলেনঃ তখন আমি আমার প্রভুর নিকট অনুমতি চাইলে আমাকে অনুমতি দেয়া হবে। প্রভুকে দেখেই আমি সিজদাহে পড়ে যাবো। তিনি আমাকে যতক্ষণ ইচ্ছা সিজদাহ্রত অবস্থায় রাখবেন। অতঃপর আমাকে বলা হবে, মাথা উঠাও। তুমি যা চাও তা দেয়া হবে। যা বলো শুনা হবে। যা সুপারিশ করো তা গ্রহণ করা হবে। অতঃপর আমি মাথা উঠাবো। তখন আমি প্রভুর প্রশংসা করবো যা তখন তিনি আমাকে শিখিয়ে দেবেন। এরপর আমি সুপারিশ করবো। তখন আমার সুপারিশের গণ্ডি ঠিক করে দেয়া হবে। তখন আমি শুধু তাদেরকেই জান্নাতে প্রবেশ করাবো। পুনরায় আমি তাঁর নিকট ফিরে আসবো এবং আমি তাঁকে দেখা মাত্রই সিজদাহে পড়ে যাবো। অতঃপর আমি সুপারিশ করলে আমার সুপারিশের গণ্ডি ঠিক করে দেয়া হবে। তখন আমি শুধু তাদেরকেই জান্নাতে প্রবেশ করাবো। এভাবে তৃতীয়বার। চতুর্থবার আমি ফিরে এসে বলবো, এখন শুধু জাহান্নামে ওব্যক্তিই রয়েছে যাকে কুর'আন মাজীদ আটকে রেখেছে। অর্থাৎ যাদের জন্য চিরতরে জাহান্নামে থাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে বিশেষভাবে জানার বিষয় এইযে, আল্লাহ্ তা'আলা শুধুমাত্র খাঁটি তাওহীদপন্থীদের জন্যই সুপারিশের অনুমতি দিবেন। অন্য কারোর জন্য নয়। আল্লাহ্ তা'আলা মুশরিকদের সম্পর্কে বলেনঃ فَمَا تَنْفَعُهُمْ شَفَاعَةُ الشَّافِعِيْنَ অর্থাৎ ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি রাসূল কে বললামঃ হে আল্লাহ্'র রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ পাওয়ার ভাগ্য কার হবে? তিনি বললেনঃ لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْ لَا يَسْأَلَنِي عَنْ هَذَا الْحَدِيْثِ أَحَدٌ أَوَّلَ مِنْكَ لِمَا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيْثِ، أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصاً مِّنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ অর্থাৎ হে আবু হুরাইরাহ্! পূর্ব থেকেই তোমার সম্পর্কে আমার এ ধারণা ছিল যে, তোমার আগে এ সম্পর্কে আর কেউ প্রশ্ন করবে না। কারণ, আমি তোমাকে সর্বদা হাদীসলোভী দেখছি। কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ পাওয়ার ভাগ্য ওব্যক্তির হবে যে খাঁটি অন্তঃকরণে আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া কোন মা'বুদ নেই বলে স্বীকার করবে।
হযরত 'আউফ্ বিন্ মালিক আব্জা'য়ী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ أَتَانِي آتَ مِنْ عِنْدِ رَبِّي ، فَخَيَّرَنِي بَيْنَ أَنْ يُدْخِلَ نِصْفَ أُمَّتِي الْجَنَّةَ وَبَيْنَ الشَّفَاعَةِ ، فَاخْتَرْتُ الشَّفَاعَةَ ، وَ هِيَ لِمَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا অর্থাৎ হযরত জিব্রীল আমার প্রভুর প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে দু'টি ব্যাপারের যে কোন একটি গ্রহণের স্বাধীনতা দিলেন। আল্লাহ্ তা'আলা আমার আধা উম্মাতকে জান্নাতে দিবেন নাকি আমি এর পরিবর্তে আমার সকল উম্মাতের জন্য সুপারিশ করবো। অতঃপর আমি সুপারিশের ব্যাপারটিই গ্রহণ করলাম। আর এ সুপারিশটুকু এমন সকল ব্যক্তির ভাগ্যে জুটবে যারা শিকমুক্ত অবস্থায় ইন্তিকাল করবে।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ ، وَ إِنِّي احْتَبَأْتُ دَعْوَتِيْ شَفَاعَةً لأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةَ ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا অর্থাৎ প্রত্যেক নবীর জন্য একটি কবুল দো'আ বরাদ্দ রয়েছে এবং প্রত্যেক নবী তা দ্রুত (দুনিয়াতেই) করে ফেলেছেন। তবে আমি আমার দো'আটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের জন্য সুপারিশ হিসেবে সংরক্ষণ করেছি। আল্লাহ্ চানতো তা এমন সকল ব্যক্তির ভাগ্যে জুটবে যারা শিকমুক্ত অবস্থায় ইন্তিকাল করবে।
উক্ত হাদীসদ্বয় এটিই প্রমাণ করে যে, পরকালে তাওহীদপন্থীদের জন্য রাসূল এর সুপারিশ দো'আ বা আবেদন জাতীয় হবে। দুনিয়ার সুপারিশকারীদের সুপারিশের অনুরূপ নয়। দুনিয়ার কোন সুপারিশকারী সাধারণত এমন ব্যক্তির নিকট সুপারিশ করে থাকে যে ব্যক্তি সুপারিশকারীর নিকট কোন ধরণের অনুগ্রহভোগী অথবা তার উপর সুপারিশকারীর কোন কর্তৃত্ব রয়েছে। আর আল্লাহ্ তা'আলার উপর কারোর কোন অনুগ্রহ বা কর্তৃত্ব নেই।
মূলতঃ আল্লাহ্ তা'আলা ফিরিস্তা, নবী বা ওলীগণকে সুপারিশের অনুমতি দিয়ে তাঁদেরকে সম্মানিত করবেন। ব্যাপারটা এমন যে, আল্লাহ্ তা'আলা নিজ অনুগ্রহে কিছু গুনাহগারকে ক্ষমা করে তাদেরকে জান্নাত দিতে চান। কিন্তু তিনি তাদেরকে সরাসরি জান্নাতে না পাঠিয়ে তাদেরকে ক্ষমা করা ও জান্নাতে পাঠানোর ব্যাপারে নিজ ফিরিস্তা, নবী বা ওলীগণকে সুপারিশের অনুমতি দিয়ে তাঁদেরকে সম্মানিত করবেন। সুতরাং সুপারিশকারীরা সুপারিশের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলার নিশ্চিত ফায়সালার সামান্যটুকুও পরিবর্তন করতে পারবেনা।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ لَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَداً অর্থাৎ তিনি নিজ ফায়সালায় কাউকে শরীক করেন না।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ وَ اللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ ، وَ هُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা এককভাবে ফায়সালা করেন। তাঁর ফায়সালা দ্বিতীয়বার পর্যালোচনা করার অধিকার কারোর থাকে না। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
তিনি আরো বলেনঃ قُلْ فَمَنْ يَمْلِكُ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ أَنْ يُهْلِكَ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَ أُمَّهُ وَ مَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعاً অর্থাৎ (হে মুহাম্মাদ!) আপনি ওদেরকে বলে দিনঃ আল্লাহ্ তা'আলা যদি ঈসা ও তাঁর মা এবং দুনিয়ার সবাইকে ধ্বংস করে দিতে চান তাহলে কে আছে এমন যে তাঁদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে?
📄 হিদায়াতের শির্ক
১৫. হিদায়াতের শির্ক্কঃ
হিদায়াতের শির্ক বলতে আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কেউ কাউকে হিদায়াত দিতে পারে এমন বিশ্বাস করা অথবা এ বিশ্বাসে কারোর নিকট হিদায়াত কামনা করাকে বুঝানো হয়।
একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছে ছাড়া কেউ কাউকে ইচ্ছে করলেই সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেনা। এমনকি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ ও নিজ ইচ্ছায় কাউকে হিদায়াত দিতে পারেননি। একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই যাকে চান হিদায়াত দিতে পারেন। অন্য কেউ নয়।
আল্লাহ্ তা'আলা রাসূল কে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ لَيْسَ عَلَيْكَ هُدَاهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ অর্থাৎ তাদেরকে সুপথে আনার দায়িত্ব আপনার উপর নয়। বরং আল্লাহ্ তা'আলা যাকে চান সৎপথে পরিচালিত করেন।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ وَ مَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَ لَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِيْنَ অর্থাৎ আপনি যতই চান না কেন অধিকাংশ লোকই মু'মিন হওয়ার নয়।
তিনি আরো বলেনঃ إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَ لَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ ، وَ هُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ অর্থাৎ আপনি যাকে ভালোবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারেন না। তবে আল্লাহ্ তা'আলা যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই সৎপথে আনয়ন করেন। তিনি হিদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে ভালই জানেন। হযরত আবু যর থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী ইরশাদ করেনঃ يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ ضَالٌ إِلَّا مَنْ هَدَيْتُهُ فَاسْتَهْدُوْنِي أَهْدِكُمْ অর্থাৎ (আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাহদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন) হে আমার বান্দাহরা! তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট। শুধু সেই ব্যক্তিই হিদায়াতপ্রাপ্ত যাকে আমি হিদায়াত দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকট হিদায়াত চাও। আমি তোমাদেরকে হিদায়াত দেবো। হযরত মুসাইয়াব থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ لَمَّا حَضَرَتْ أَبَا طَالِب الْوَفَاةُ جَاءَهُ رَسُوْلُ الله ﷺ فَوَجَدَ عِنْدَهُ أَبَا جَهْلِ ابْنَ هِشَامٍ وَ عَبْدَ اللهِ بْنَ أَبَي أُمَيَّةَ بْنِ الْمُغِيرَةِ قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ لَأَبِي طَالِبٍ: يَا عَمِّ! قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهَ كَلِمَةً أَشْهَدُ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ ، فَقَالَ أَبُوْ جَهْلِ وَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أُمَيَّةَ: يَا أَبَا طَالِبٍ أَتَرْغَبُ عَنْ مِلَّة عَبْدِ الْمُطَّلِبِ ، فَلَمْ يَزَلْ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعْرِضُهَا عَلَيْهِ وَ يَعُوْدَانِ بتِلْكَ الْمَقَالَةِ حَتَّى قَالَ أَبُو طَالِبٍ آخِرَ مَا كَلَّمَهُمْ: هُوَ عَلَى مِلَّة عَبْدِ الْمُطَّلِب وَ أَبَى أَنْ يَقُولَ: لاَ إِلَهَ إِلَّا اللهُ ، فَقَالَ رَسُوْلُ اللَّهُ : أَمَا وَ اللَّهِ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ مَا لَمْ أَنْهَ عَنْكَ ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى فِيْهِ: مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَ الَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِيْنَ وَ لَوْ كَانُوْا أُوْلِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ ﴾ وَ نَزَلَتْ : إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَ لَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ অর্থাৎ রাসূল এর চাচা আবু তালিব যখন মৃত্যু শয্যায় তখন তিনি (রাসূল ) তার (আবু তালিব) নিকট এসে দেখতে পেলেন, আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ্ বিন্ আবু উমাইয়া তার নিকট বসা। তখন রাসূল তাঁর চাচাকে বললেনঃ হে চাচা! আপনি বলুনঃ আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই। তাহলে আমি আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এ ব্যাপারে আপনার জন্য সাক্ষী দেবো। আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ্ বললোঃ হে আবু তালিব! তুমি কি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করছো? এভাবে রাসূল তাকে কালিমা পাঠ করাতে চাচ্ছিলেন। আর ওরা সে কথাই বার বার বলছিলো। পরিশেষে আবু তালিব আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম নিয়েই ইন্তিকাল করলো এবং কালিমা উচ্চারণ করতে অস্বীকার করলো। এরপরও রাসূল বললেনঃ আল্লাহ্'র কসম! আমি আপনার জন্য আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো যতক্ষণনা তিনি আমাকে নিষেধ করেন। অতঃপর তার সম্পর্কে এ আয়াত নাযিল হলোঃ "নবী ও অন্যান্য সকল মু'মিনদের জন্য জায়িয নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। যদিও তারা আত্মীয়-স্বজনই বা হোকনা কেন এ কথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে, তারা সত্যিকার জাহান্নামী"। আরো নাযিল হলোঃ "আপনি যাকে ভালোবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারেন না। তবে আল্লাহ্ তা'আলা যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই সৎপথে আনয়ন করেন"।
📄 সাহায্য প্রার্থনার শির্ক
১৬. সাহায্য প্রার্থনার শিকঃ
সাহায্য প্রার্থনার শির্ক বলতে মানুষের সাধ্যের বাইরে এমন কোন সাহায্য একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর নিকট কামনা করাকে বুঝানো হয়।
এ জাতীয় সাহায্য একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার নিকটই কামনা করতে হয়। অন্য কারোর নিকট নয়।
আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে প্রতি নামাযে এ বাক্যটি বলতে শিখিয়েছেনঃ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَ إِيَّاكَ نَسْتَعِيْنُ অর্থাৎ আমরা আপনারই ইবাদাত করি এবং আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা রাসূল আমাকে কিছু মূল্যবান বাণী শুনিয়েছেন যার কিয়দাংশ নিম্নরূপঃ إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهُ ، وَ إِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ ، وَ اعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَو اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوْكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوْكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ ، وَ لَوِ اجْتَمَعُوْا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ অর্থাৎ কিছু চাইলে তা একমাত্র আল্লাহ্ তা'লার নিকটই চাইবে। কোন সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার নিকটই কামনা করবে। জেনে রেখো, পুরো বিশ্ববাসী একত্রিত হয়েও যদি তোমার কোন কল্যাণ করতে চায় তাহলে তারা ততটুকুই কল্যাণ করতে পারবে যা তোমার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। আর তারা সবাই একত্রিত হয়েও যদি তোমার কোন ক্ষতি করতে চায় তাহলে তারা ততটুকুই ক্ষতি করতে পারবে যা তোমার জন্য বরাদ্দ রয়েছে।
📄 কবর পূজার শির্ক
১৭. কবর পূজার শিরকঃ কবর পূজার শির্ক বলতে কবরে শায়িত কোন ওলী বা বুযুর্গের জন্য যে কোন ধরনের ইবাদাত সম্পাদন বা ব্যয় করাকে বুঝানো হয়। বর্তমান যুগের মাযারকে শিরকের কুঞ্জ বা আড্ডা বলা যেতে পারে। এমন কোন শির্ক নেই যা কোন না কোন মাযারকে কেন্দ্র করে অনুশীলিত হচ্ছে না। আহ্বান, ফরিয়াদ, আশ্রয়, আশা, রুকু, সিজদাহ্, বিনম্রভাবে কবরের সামনে দাঁড়ানো, তাওয়াফ, তাওবা, জবাই, মানত, আনুগত্য, ভয়, ভালোবাসা, তাওয়াক্কুল, সুপারিশ ও হিদায়াত কামনা করার মত বড় বড় শিক যে কোন কবরের পার্শ্বে নির্বিঘ্নে চর্চা করা হচ্ছে।
এ সবের মূলে সর্বদা একটি কারণই কাজ করে চলছে। আর তা হলোঃ ওলী-বুযুর্গদের ব্যাপারে অমূলক বাড়াবাড়ি। এ জাতীয় বাড়াবাড়ির কারণে যেমনিভাবে ধ্বংস হয়েছে হযরত নূহ এর উম্মতরা তেমনিভাবে ধ্বংস হয়েছে ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা।
এ কারনেই আল্লাহ্ তা'আলা ওদেরকে ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে পরিষ্কারভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَ لَا تَتَّبِعُوْا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَ أَضَلُّوْا كَثِيرًا وَ ضَلُّوْا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ অর্থাৎ আপনি বলে দিনঃ হে ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা! তোমরা ধর্মীয় ব্যাপারে অমূলক সীমালংঘন করোনা এবং ওসব লোকদের ভিত্তিহীন কল্পনার অনুসারী হয়ো না যারা অতীতে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং আরো বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে। বস্তুতঃ তারা সরল পথ থেকে বহু দূরে সরে গিয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি আল্লাহ্ তা'আলার বাণীঃ وَ قَالُوْا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَ لَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَّ لَا سُوَاعًاً ، وَ لَا يَغُوْثَ وَ يَعُوْقَ وَنَسْرًا অর্থাৎ তারা বলেছেঃ তোমরা কখনো পরিত্যাগ করোনা তোমাদের দেব-দেবীকে; পরিত্যাগ করোনা ওয়াদ্দ, সুওয়া', ইয়াগুস্, ইয়াউক্ ও নাসকে।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেনঃ صَارَتِ الْأَوْثَانُ الَّتِي كَانَتْ فِي قَوْمِ نُوْحٍ فِي الْعَرَبِ بَعْدُ ، أَمَّا وَدٌ: كَانَتْ لِكَلْبِ بِدَوْمَةِ الْجَنْدَلِ ، وَ أَمَّا سُوَاعٌ : كَانَتْ لِهَذَيْلٍ ، وَأَمَّا يَغُوْتُ: فَكَانَتْ لِمُرَادِ ، ثُمَّ لِبَنِي غُطَيْفَ بِالْجَوْفِ عِنْدَ سَبَا ، وَ أَمَّا يَعُوْقُ: فَكَانَتْ لِهَمْدَانَ ، وَأَمَّا نسر: فَكَانَتْ لِحِمْيَرَ لَآلِ ذِي الْكَلَاعِ أَسْمَاءُ رِجَالٍ صَالِحِيْنَ مِنْ قَوْمِ نُوْحٍ ، فَلَمَّا هَلَكُوْا أَوْحَى الشَّيْطَانُ إِلَى قَوْمِهِمْ أَنِ انْصِبُوا إِلَى مَجَالِسِهِمْ الَّتِي كَانُوا يَجْلِسُوْنَ أَنْصَابَاً وَ سَمُوْهَا بِأَسْمَائِهِمْ ، فَفَعَلُوا ، فَلَمْ تُعْبَدْ ، حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُوْلَائِكَ وَ تَنَسَّخَ الْعِلْمُ عُبِدَتْ অর্থাৎ যে মূর্তিগুলোর প্রচলন নূহ্ এর সম্প্রদায়ে ছিলো তা এখন আরবদের নিকট। দাউমাতুল্ জান্দাল্ এলাকায় কাল্ব সম্প্রদায় ওয়াদ্দকে পূজা করতো। হুযাইল্ সম্প্রদায় সুওয়া'কে। মুরাদ্ সম্প্রদায় ইয়াগুস্কে। সাবাদের নিকটবর্তী এলাকা জাউফের "বানী গোত্বাইফ" গোত্ররাও ইয়াগুসেরই পূজা করতো। হাম্দান সম্প্রদায় ইয়াউকে। জুল্ কালা' এর বংশধর হিময়ার সম্প্রদায় নাস্ত্রকে। এ সবগুলো ছিল নূহ্ এর সম্প্রদায়ের ওলী-বুযুর্গদের নাম। যখন তারা মৃত্যুবরণ করলো তখন শয়তান তাদের সম্প্রদায়কে এ মর্মে বুদ্ধি দিলো যে, তোমরা ওদের বৈঠকখানায় ওদের প্রতিমূর্তি বানিয়ে সম্মানের সাথে বসিয়ে দাও। অতঃপর তারা তাই করলো। কিন্তু তখনো ওদের পূজা শুরু হয়নি। তবে এ প্রজন্ম যখন নিঃশেষ হয়ে গেলো এবং ধর্মীয় জ্ঞানের বিলুপ্তি ঘটলো তখনই এ প্রতিমূর্তিগুলোর পূজা শুরু হলো।
শুধু বুযুর্গদের ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি নয় বরং রাসূল নিজ ব্যাপারেও কোন বাড়াবাড়ি করতে উম্মতদেরকে সুদৃঢ় কণ্ঠে নিষেধ করেছেন।
হযরত 'উমর থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি নবী কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেনঃ لَا تُطْرُوْنِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ ، فَقُوْلُوْا: عَبْدُ اللَّهِ وَ رَسُولُهُ অর্থাৎ তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি করোনা যেমনিভাবে বাড়াবাড়ি করেছে খ্রিষ্টানরা 'ঈসা বিন্ মায়াম্ এর ব্যাপারে। আমি কেবল আল্লাহ্ তা'আলার বান্দাহ্। সুতরাং তোমরা আমার সম্পর্কে বলবেঃ তিনি আল্লাহ্ তা'আলার বান্দাহ্ এবং তদীয় রাসূল।
রাসূলকে অমূলক বেশি সম্মান দিতে যাওয়ার কারণেই বহু শিরকের উদ্ভাবন হয়। এ অমূলক সম্মান হেতুই যে কোন সমস্যায় তাঁকে আহ্বান করা হয়, তাঁর নিকট ফরিয়াদ করা হয়, তাঁর জন্য মানত মানা হয়, তাঁর কবরের চতুষ্পার্শ্বে তাওয়াফ করা হয় এবং তিনি গায়েব জানেন ও তাঁর হাতে সর্বময় ক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
সত্যিকারার্থে এটি সম্মান নয় বরং তা কুফরী বৈ কি? মূলতঃ রাসূল কে তিন ভাবে সম্মান করা যায়। তা নিম্নরূপঃ
ক. অন্তর দিয়ে সম্মান করা। আর তা হচ্ছে মুহাম্মাদকে আল্লাহ্ তা'আলার বান্দাহ্ ও তদীয় রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করার আওতাধীন এবং তা কেবল রাসূল এর ভালোবাসাকে নিজ সত্তা, মাতা, পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের ভালোবাসার উপর প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।
তবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, বাহ্যিক এমন দু'টি কর্ম রয়েছে যা কারোর অন্তরে সত্যিকারার্থে রাসূল এর জন্য এ জাতীয় ভালোবাসা বিদ্যমান রয়েছে কি না তা প্রমাণ করে। কর্ম দু'টি নিম্নরূপঃ
১. খাঁটি তাওহীদে বিশ্বাসী হওয়া। কারণ, রাসূল সার্বিকভাবে শিকের সকল পথ, মত ও মাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছেন। সুতরাং রাসূল এর সম্মান কখনো শিকের মাধ্যমে হতে পারে না।
২. সর্ব ক্ষেত্রে তাঁরই অনুসরণ করা। অতএব সর্ব বিষয়ে তাঁর কথাই গ্রহণযোগ্য হবে। অন্য কারোর কথা নয়। যেমনিভাবে সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার জন্যই হতে হয় তেমনিভাবে সকল প্রকারের অনুসরণ একমাত্র তাঁরই রাসূলের জন্য হতে হবে।
খ. মুখ দিয়ে সম্মান করা। আর তা কোন রকম বাড়াবাড়ি ছাড়া রাসূল এর যথোপযুক্ত প্রশংসা করার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।
গ. অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে সম্মান করা। আর তা রাসূল এর সমূহ আনুগত্য বাস্তব কর্মে পরিণত করার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।
মোটকথা, রাসূল এর কার্যত সম্মান তাঁর বিশুদ্ধ বাণীর প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর আদেশ-নিষেধ মান্য করা, তাঁরই জন্যে কাউকে ভালোবাসা বা কারোর সাথে শত্রুতা পোষণ করা, যে কোন ব্যাপারে তাঁরই ফায়সালাকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়ার মাধ্যমেই সুসংঘটিত হয়ে থাকে।
অমূলক বাড়াবাড়ি শরীয়তের দৃষ্টিতে মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। চাই তা ইবাদাতের ক্ষেত্রেই হোক বা আক্বীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে।
হযরত 'আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِيَّاكُمْ وَالْعُلُوَّ فِي الدِّينِ ، فَإِنَّهُ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ الْغُلُوُّ فِي الدِّيْنِ অর্থাৎ হে মানুষ সকল! তোমরা ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কারণ, তোমাদের পূর্বেকার সকল উম্মাত শুধু এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। হযরত 'আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্'উদ (রাযিয়াল্লাহু আন্হুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُوْنَ ، هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُوْنَ ، هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُوْنَ অর্থাৎ সীমা লঙ্ঘনকারীরা ধ্বংস হোক! রাসূল এ বাক্যটি তিন বার উচ্চারণ করেন।
ওলী-বুযুর্গদের ব্যাপারে বেশি বাড়াবাড়ি করার কারণেই প্রথমে তাদের কবরের উপর ঘর বা মসজিদ তৈরি করা হয়। অতঃপর সে কবরের জন্য সিজদা করা হয়, মানত করা হয় এমনকি উহাকে নামায ও দো'আ কবুল হওয়ার বিশেষ স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়, তাতে শায়িত ব্যক্তির নামে কসম খাওয়া হয়, তার নিকট ফরিয়াদ করা হয়, তাকে আল্লাহ্ তা'আলার চাইতেও বেশি ভয় করা হয়, তার নিকট যে কোন সমস্যার সমাধান চাওয়া হয়, তার নিকট অতি বিনয়ের সঙ্গে এমনভাবে কান্নাকাটি করা হয় যা আল্লাহ্ তা'আলার ঘর মসজিদেও করা হয় না এমনকি পরিশেষে তা খাদিম নামের কিছু সংখ্যক মানুষের আড্ডা হয়ে যায়। ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ কবরের উপর মসজিদ নির্মাণকারীকে আল্লাহ্ তা'আলার সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
হযরত 'আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ হযরত উম্মে হাবীবাহ্ ও হযরত উম্মে সালামাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ইথিওপিয়ায় একটি গির্জা দেখেছিলো যাতে অনেকগুলো ছবি টাঙ্গানো রয়েছে। তারা তা রাসূলকে জানালে তিনি বলেনঃ إِنْ أُوْلَائِكَ إِذَا كَانَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فَمَاتَ ، بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِداً ، وَصَوَّرُوْا فِيْهِ تِلْكَ الصُّوَرَ ، فَأُوْلَاتِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ অর্থাৎ নিশ্চয়ই ওরা তাদের মধ্যে কোন ওলী-বুযুর্গ ইন্তিকাল করলে তারা ওর কবরের উপর মসজিদ বানিয়ে নেয় এবং এ জাতীয় ছবি সমূহ টাঙ্গিয়ে রাখে। ওরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসউদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ إِنَّ مِنْ شِرَارِ النَّاسِ مَنْ تُدْرِكُهُمُ السَّاعَةُ وَ هُمْ أَحْيَاءُ ، وَ الَّذِيْنَ يَتَّخِذُوْنَ الْقُبُورَ مَسَاجِدَ অর্থাৎ সর্ব নিকৃষ্ট মানুষ ওরা যারা জীবিত থাকতেই কিয়ামত এসে গেলো এবং ওরা যারা কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করলো। নবী কবরের উপর মসজিদ নির্মাণকারী ইহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে লা'নত (অভিশাপ) দিয়েছেন।
হযরত 'আয়েশা ও ইবনে 'আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেনঃ لَمَّا نُزِلَ بِرَسُوْلِ اللهِ ، طَفِقَ يَطْرَحُ خَمِيْصَةً عَلَى وَجْهِهِ ، فَإِذَا اغْتَمَّ كَشَفَهَا عَنْ وَجْهِهِ ، فَقَالَ وَ هُوَ كَذَلِكَ : لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْيَهُوْدِ وَ النَّصَارَى ، اتَّخَذُوا قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ، يُحَذِّرُ مَا صَنَعُوْا অর্থাৎ যখন রাসূল মৃত্যু শয্যায় তখন তিনি চাদর দিয়ে নিজ মুখমণ্ডল ঢেকে ফেললেন। অতঃপর যখন তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো তখন তিনি চেহারা খুলে বললেনঃ ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের উপর আল্লাহ্ তা'আলার লা'নত; তারা নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিলো। এ কথা বলে নবী নিজ উম্মতকে সে কাজ না করতে সতর্ক করে দিলেন।
নবী কবরের উপর মসজিদ বানানোর ব্যাপারে শুধু লা'নত ও নিন্দা করেই ক্ষান্ত হননি বরং তিনি তা করতে সুস্পষ্টভাবে নিষেধও করেছেন।
হ হযরত জুন্দাব থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি নবী কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেনঃ أَلَا وَ إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوْا يَتَّخِذُوْنَ قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ وَ صَالِحِيْهِمْ مَسَاجِدَ ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُوْرَ مَسَاجِدَ ، إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ অর্থাৎ তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা নিজ নবী ও ওলী-বুযুর্গদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিতো। সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদ বানিওনা। আমি তোমাদেরকে এ ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করছি।
শুধু কবরের উপর মসজিদ বানানোই নয় বরং রাসূল কবরের উপর বসতে বা উহার দিকে ফিরে নামায পড়তেও নিষেধ করেছেন।
হযরত আবু মারসা থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ لَا تَجْلِسُوْا عَلَى الْقُبُوْرِ وَ لَا تُصَلُّوْا إِلَيْهَا অর্থাৎ তোমরা কবরের উপর বসোনা এবং উহার দিকে ফিরে নামাযও পড়ো না।
হযরত আনাস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ نَهَى النَّبِيُّ عَنِ الصَّلَاةِ بَيْنَ الْقُبُوْرِ অর্থাৎ নবী কবরস্থানে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন।
রাসূল শুধু কবরের উপর ঘর বানাতে নিষেধ করেই ক্ষান্ত হননি বরং তিনি কবরকে পাকা করতে এবং কবরের সাথে যে কোন বস্তু সংযোজন করতেও কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
হযরত জাবির থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ نَهَى رَسُوْلُ اللَّهُ أَنْ يُجَصَّصَ الْقَبْرُ ، وَ أَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ ، وَ أَنْ يُبْنَى عَلَيْهِ أَوْ يُزَادَ عَلَيْهِ অর্থাৎ রাসূল কবর পাকা করতে, উহার উপর বসতে, ঘর বানাতে এমনকি উহার সাথে কোন জিনিস সংযোজন করতেও নিষেধ করেছেন।
কবরের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা যাতে মানুষের অন্তরে গেঁথে না যায় এবং রাসূলে আক্রাম এর কবর এলাকা যাতে মেলা বা ঈদগাহে রূপান্তরিত না হয় সে জন্য রাসূল তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম করার আদেশ দেননি। বরং তিনি এর বিপরীতে তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম করার প্রতি নিজ উম্মতদেরকে অনুৎসাহিত করেছেন। সুতরাং যে কোন মুসলমান যে কোন স্থান হতে তাঁর নিকট সালাত ও সালাম পাঠাতে পারে। অতএব তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম দেয়ার মধ্যে কোন বিশেষত্ব নেই।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ لا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُوْراً ، وَلَا تَجْعَلُوْا قَبْرِي عِيْداً ، وَصَلُّوْا عَلَيَّ ، فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ تَبْلُغْنِي حَيْثُ كُنتُمْ অর্থাৎ তোমরা নিজেদের ঘর গুলোকে কবর বানিও না। বরং তোমরা তাতে নফল নামায, কোর'আন তিলাওয়াত ও দো'আ ইত্যাদি করিও এবং আমার কবরকে মেলা বানিও না। তাতে বার বার নির্দিষ্ট সময়ে আসার অভ্যাস করো না। বরং তোমরা সর্বদা আমার উপর সালাত ও সালাম পাঠিও। কারণ, তোমাদের সালাত ও সালাম আমার নিকট অবশ্যই পৌঁছুবে। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন।
হযরত আউস্ বিন্ আউস্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ ؛ فِيْهِ خُلِقَ آدَمُ ، وَ فِيهِ قُبِضَ ، وَفِيهِ النَّفْحَةُ، وَ فِيهِ الصَّعْقَةُ ، فَأَكْثَرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلاةِ فِيْهِ ، فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوْضَةٌ عَلَيَّ ، قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ! وَ كَيْفَ تُعْرَضُ صَلَاتُنَا عَلَيْكَ وَ قَدْ أَرِمْتَ؟! قَالَ: إِنَّ اللَّهُ عَزَّ وَ جَلَّ حَرَّمَ عَلَى الْأَرْضِ أَجْسَادَ الْأَنْبِيَاءِ অর্থাৎ সর্বোৎকৃষ্ট দিন জুমার দিন। এ দিন আদম -কে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ দিনই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ দিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে এবং এ দিনই সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। অতএব তোমরা এ দিন আমার নিকট বেশি বেশি সালাত ও সালাম পাঠিও। কারণ, নিশ্চয়ই তোমাদের সালাত ও সালাম আমার নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। সাহাবারা বললেনঃ কিভাবে আপনার নিকট আমাদের সালাত ও সালাম পৌঁছিয়ে দেয়া হবে? অথচ আপনি তখন মাটি হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবেন। রাসূল বললেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা মাটির উপর নবীদের শরীর হারাম করে দিয়েছেন।
এ যদি হয় রাসূল এর কবরের অবস্থা। যেখানে যিয়ারাতের উদ্দেশ্যে বার বার যাওয়ার অভ্যাস করা যাবে না। যাতে করে তা মেলাক্ষেত্রে রূপান্তরিত না হয়ে যায়। তাহলে নিয়মিতভাবে প্রতি বছর ওলী-বুযুর্গদের কবরের উপর উরস ও দো'আভোজ উদ্যাপন কিভাবে জায়িয হতে পারে? যা সরাসরি মেলা হওয়ার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই এবং যাতে ঈদের চাইতেও অনেক বেশি খুশি প্রকাশ করা হয়। অতএব কোন্ যুক্তিতে উরস মাহফিল অভিমুখে মানতের গরু ছাগল নিয়ে মাযারভক্তদের শোভাযাত্রা বড় শির্ক না হয়ে তা জায়িয বরং সাওয়াবের কাজ হতে পারে? অথচ রাসূল তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও সাওয়াবের নিয়্যাতে ভ্রমণ করা হারাম করে দিয়েছেন।
হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ لَا تُشَدُّ الرِّجَالُ إِلَّا إِلَى ثَلَاثَةِ مَسَاجِدَ : مَسْجِدِ الْحَرَامِ ، وَ مَسْجِدِ الْأَقْصَى ، ومسجدي অর্থাৎ তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও সাওয়াবের নিয়্যাতে সফর করা যাবে না। সে মসজিদগুলো হলোঃ হারাম (মক্কা) শরীফ, মসজিদে আক্সা এবং মসজিদে নববী।
হযরত বাস্ত্রা বিন্ আবী বাস্ত্রা গিফারী থেকে বর্ণিত তিনি হযরত আবু হুরাইরাহ্ কে তুর পাহাড় থেকে আসতে দেখে বললেনঃ لَوْ أَدْرَكْتُكَ قَبْلَ أَنْ تَخْرُجَ إِلَيْهِ لَمَا خَرَجْتَ ، سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُوْلُ: لَا تُعْمَلُ الْمَطِيُّ إِلَّا إِلَى ثَلَاثَةِ مَسَاجِدَ : الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ ، وَمَسْجِدِي هَذَا ، وَالْمَسْجِدِ الْأَقْصَى অর্থাৎ আমি আপনাকে তুর পাহাড়ের দিকে যাওয়ার পূর্বে দেখতে পেলে অবশ্যই সে দিকে যেতে দিতাম না। কারণ, আমি রাসূলকে বলতে শুনেছিঃ সাওয়াবের নিয়্যাতে তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও সফর করা যাবেনা। সে মসজিদগুলো হলোঃ মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদে আক্সা।
মোটকথা, ওলী-বুযুর্গদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা সমূহ ধ্বংসের মূল। সুতরাং যে কোন ধরণের বাড়াবাড়ি ওদের ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।
নবী-ওলীদের নিদর্শন সমূহ অনুসন্ধান করে তা নিয়ে ব্যস্ত হওয়াও তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ির শামিল। সুতরাং তাও শরীয়তের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। হযরত নাফি' (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ كَانَ النَّاسُ يَأْتُوْنَ الشَّجَرَةَ الَّتِي يُقَالُ لَهَا شَجَرَةُ الرِّضْوَانَ فَيُصَلُّوْنَ عِنْدَهَا ، قَالَ: فَبَلَغَ ذَلِكَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ لَهُ فَأَوْعَدَهُمْ فِيْهَا وَ أَمَرَ بِهَا فَقُطِعَتْ অর্থাৎ রাসূল এর মৃত্যুর পর রিওয়ান বৃক্ষের (যে গাছের নীচে রাসূল সাহাবাদেরকে ষষ্ঠ হিজরী সনে মক্কার কাফিরদের সঙ্গে যুদ্ধের বায়'আত করেন) নীচে এসে অনেকেই নামায পড়া শুরু করলো। তা শুনে হযরত 'উমর এ কঠোর ভাষায় উহার নিন্দা করলেন এবং উক্ত গাছটি কেটে ফেললেন। হযরত মা'রুর বিন্ সুওয়াইদ্ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা আমি 'উমর এর সাথে মক্কার পথে ফজরের নামায আদায় করলাম। অতঃপর তিনি দেখলেন অনেকেই এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেনঃ এরা কোথায় যাচ্ছে। উত্তরে বলা হলোঃ রাসূল যেখানে নামায পড়েছেন ওখানে নামায পড়ার জন্যে। তখন তিনি বললেনঃ إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِمِثْلِ هَذَا ، كَانُوا يَتَتَبَّعُوْنَ آثَارَ أَنْبِيَائِهِمْ وَ يَتَّخِذُونَهَا كَنَائِسَ وَ بِيَعاً ، فَمَنْ أَدْرَكَتْهُ الصَّلَاةُ فِي هَذِهِ الْمَسَاجِدِ فَلْيُصَلِّ ، وَ مَنْ لَا فَلْيَمْضِ وَ لَا يَتَعَمَّدْهَا অর্থাৎ তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। তারা নিজ নবীদের নিদর্শন সমূহ খুঁজে বেড়াতো এবং উহার উপর গির্জা বা ইবাদাতখানা বানিয়ে নিতো। অতএব এ মসজিদগুলোতে থাকাবস্থায় নামাযের সময় হলে তোমরা তাতে নামায পড়ে নিবে। নতুবা তা অতিক্রম করে যাবে। বিশেষ সাওয়াবের নিয়্যাতে তাতে নামায পড়তে আসবে না। হযরত আবুল 'আলিয়াহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ لَمَّا فَتَحْنَا تُسْتَرَ وَجَدْنَا فِي بَيْتِ مَالِ الْهُرْمُزَانِ سَرِيْراً عَلَيْهِ رَجُلٌ مَيِّتَ عِنْدَ رَأْسِهِ مُصْحَفٌ ، فَأَخَذْنَا الْمُصْحَفَ فَحَمَلْنَاهُ إِلَى عُمَرَ ، فَدَعَا لَهُ كَعْباً فَنَسَحَهُ بِالْعَرَبِيَّةِ ، فَأَنَا أَوَّلُ رَجُلِ قَرَأَهُ مِنَ الْعَرَبِ ، قَرَأْتُهُ مِثْلَ مَا أَقْرَأُ الْقُرْآنَ ، قَالَ الرَّاوِي لِأَبِي الْعَالِيَةِ : فَمَا كَانَ فِيْهِ؟ قَالَ: سِيْرَتُكُمْ وَ أُمُوْرُكُمْ وَ لُحُوْنُ كَلَامِكُمْ وَمَا هُوَ كَائِنٌ بَعْدُ ، قَالَ الرَّاوِيُّ: فَمَا صَنَعْتُمْ بِالرَّجُلِ؟ قَالَ: حَفَرْنَا لَهُ بِالنَّهَارِ ثَلَاثَةَ عَشَرَ قَبْراً مُتَفَرِّقَةٌ ، فَلَمَّا كَانَ بِاللَّيْلِ دَفَنَاهُ وَ سَوَّيْنَا الْقُبُورَ كُلَّهَا لِنُعَمِّيَهُ عَلَى النَّاسِ لَا يَنْبُشُونَهُ ، قَالَ : وَ مَا يَرْجُوْنَ مِنْهُ؟ قَالَ: كَانَتِ السَّمَاءُ إِذَا حُبِسَتْ عَنْهُمْ بَرَزُوا بِسَرِيْرِهِ فَيُمْطَرُوْنَ ، قَالَ: مَنْ كُنْتُمْ تَظُنُّوْنَ الرَّجُلَ؟ قَالَ: رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ دَانِيَالُ ، قَالَ: مُنْذُ كَمْ وَجَدْتُمُوهُ قَدْ مَاتَ؟ قَالَ: مُنْذُ ثَلَاثَ مِئَةٍ سَنَةٍ ، قَالَ: مَا كَانَ تَغَيَّرَ مِنْهُ شَيْءٌ؟ قَالَ : لا ، إِلَّا شُعَيْرَاتٌ مِنْ قَفَاهُ ، إِنْ لُحُوْمَ الْأَنْبِيَاءِ لَا تُبْلِيْهَا الْأَرْضُ অর্থাৎ যখন আমরা তুস্তার্ জয় করলাম তখন আমরা হুরুমুষের খাজাঞ্চিখানায় একটি খাট পেলাম। তাতে একটি মৃত মানুষ শায়িত এবং তার মাথার পার্শ্বে একখানা কেতাব রাখা আছে। আমরা কেতাবখানা 'উমর এর নিকট নিয়ে আসলে তিনি কা'ব কে ডেকে তা আরবী করে নেন। আরবদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম তা পড়লাম। যেভাবে আমরা কোর'আন মাজীদ পড়ি সেভাবেই পড়লাম। বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি আবুল 'আলিয়াকে জিজ্ঞাসা করলামঃ তাতে কি লেখা ছিলো? তিনি বললেনঃ তোমাদের জীবন যাপন, কর্মকাণ্ড, কথার ধ্বনি ও ভবিষ্যতে যা ঘটবে সে সম্পর্কেই আলোচনা ছিলো। বর্ণনাকারী বললোঃ সে মৃত লোকটাকে আপনারা কি করলেন? তিনি বললেনঃ আমরা দিনের বেলায় বিক্ষিপ্তভাবে তার জন্য তেরোটি কবর খনন করলাম। রাত্র হলে আমরা তাকে কোন একটিতে দাফন করে কবরগুলো সমান করে দেই। যাতে কেউ বুঝতে না পারে তাকে কোথায় দাফন করা হলো। যাতে তারা পুনরায় তাকে কবর থেকে উঠিয়ে না ফেলতে পারে। বর্ণনাকারী বললোঃ তারা সে ব্যক্তি থেকে কি আশা করতো? তিনি বললেনঃ (তাদের ধারণা) যখন তাদের এলাকায় কখনো অনাবৃষ্টি দেখা দিতো তখন তারা তাকে খাট সহ বাইরে নিয়ে আসতো এবং তখনই বৃষ্টি হতো। বর্ণনাকারী বললোঃ আপনাদের ধারণা মতে সে কে হতে পারে? তিনি বললেনঃ লোক মুখে শুনা যায়, তিনি ছিলেন দানিয়াল নবী। বর্ণনাকারী বললোঃ কতদিন থেকে আপনারা তাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেলেন? তিনি বললেনঃ তিন শত বছর থেকে। বর্ণনাকারী বললোঃ তাঁর শরীরের কোন অংশের পরিবর্তন হয়নি কি? তিনি বললেনঃ না। তবে শুধু ঘাড়ের কয়েকটি চুলের সামান্যটুকু পরিবর্তন দেখা গেলো। কারণ, মাটি নবীদের শরীর খেতে পারে না।
কোন কবরকে পূজা করা হলে শরীয়তের পরিভাষায় তা মূর্তিপূজা হিসেবে গণ্য করা হয়। এ কারণেই রাসূল তাঁর কবরকে ভবিষ্যতে কেউ যেন মূর্তি বানিয়ে না নেয় সে জন্য আল্লাহ্ তা'আলার নিকট করুণ কণ্ঠে ফরিয়াদ করেন।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী কারীম আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এ দো'আ প্রার্থনা করেনঃ اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْ قَبْرِي وَثَنَا يُعْبَدُ ، لَعَنَ اللهُ قَوْمًا اتَّخَذُوْا قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ অর্থাৎ হে আল্লাহ্! আপনি আমার কবরকে মূর্তি বানাবেন না। ভবিষ্যতে যার পূজা করা হবে। আল্লাহ্ তা'আলার লা'নত এমন সম্প্রদায়ের উপর যারা নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিলো।
বর্তমান যুগের কবর পূজারী ও মাযারের খাদিমদের সাথে ইব্রাহীম ও মূসা (আলাইহিমাস্ সালাম) এর যুগের মূর্তি পূজারীদের কতইনা সুন্দর মিল রয়েছে। হযরত ইব্রাহীম তাঁর যুগের মূর্তি পূজারীদেরকে বললেনঃ مَا هَذِهِ التَّمَاثِيْلُ الَّتِي أَنْتُمْ لَهَا عَاكِفُوْنَ অর্থাৎ এ মূর্তিগুলো কি যে; তোমরা তাদের নিকট পূজার জন্য নিয়মিত অবস্থান করছো। হযরত মূসা এর যুগের মূর্তি পূজারীদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ جَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتَوْا عَلَى قَوْمٍ يَعْكُفُوْنَ عَلَى أَصْنَامٍ لَّهُمْ অর্থাৎ আমি বনী ইস্রাঈলকে সমুদ্র পার করে দিলে তাদের সঙ্গে মূর্তির নিকট নিয়মিত অবস্থানকারী এক দল পূজারীর সাথে সাক্ষাৎ হয়।
কবর পূজারীদের অনেকেরই ধারণা এই যে, যারা একবার আল্লাহ্ তা'আলা ও তদীয় রাসূল এর উপর ঈমান এনেছে তাদের মধ্যে কখনো কোন শিরক পাওয়া যেতে পারে না। মুশরিক শুধু রাসূল এর যুগেই ছিল। যারা তাঁর ইসলাম প্রচারে সর্বদা বাধা প্রদান করতো। অন্যদিকে যে ব্যক্তি একবার আল্লাহ্ তা'আলা ও তদীয় রাসূল এর উপর ঈমান এনেছে সে কি করে মুশরিক হতে পারে? তা কখনোই সম্ভব নয়।
তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণরূপেই ভুল প্রমাণিত। কারণ, রাসূল হাদীসের মধ্যে এর সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করেছেন। শুধু এতটুকুতেই তিনি ক্ষান্ত হননি বরং তিনি এ উম্মতের মধ্যে মূর্তি পূজাও যে চালু হবে তা সত্যিকারভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন।
হযরত সাউবান থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِيْنَ وَ حَتَّى تَعْبُدَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي الْأَوْثَانَ অর্থাৎ কিয়ামত কায়েম হবেনা যতক্ষণনা আমার উম্মতের কয়েকটি গোত্র মুশরিকদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা এবং মূর্তি পূজা শুরু করবে।
শুধু এতটুকুতেই ক্ষান্ত নয় বরং রাসূল এর উম্মতরা ছোট-বড় প্রতিটি কাজে ইহুদী, খ্রিষ্টান ও অগ্নিপূজকদের হুবহু অনুসারী হবে।
হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী ইরশাদ করেনঃ لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ ، وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ ، حَتَّى لَوْ سَلَكُوْا جُحْرَ ضَبِّ لَسَلَكْتُمُوهُ ، قُلْنَا : يَا رَسُوْلَ اللهُ الْيَهُودَ وَ النَّصَارَى؟ قَالَ: فَمَنْ ؟! অর্থাৎ তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের অনুসারী হবে। হাত হাত বিঘত বিঘত তথা হুবহু অবিকলভাবে। এমনকি তারা যদি কোন গুইসাপ গর্তে ঢুকে পড়ে তাহলে তোমরাও তাতে ঢুকে পড়বে। আমরা (সাহাবারা) বললামঃ হে আল্লাহ্'র রাসূল! তারা কি ইহুদী ও খ্রিষ্টান? তিনি বললেনঃ তারা নয় তো আর কারা?
এরই পাশাপাশি কোর'আন ও হাদীসে অপরিপক্ক কিছু আলিম সমাজ, রাজা-বাদশাহ, আমীর-উমারা বিপুল সংখ্যক জনসাধারণকে পথভ্রষ্ট করার কাজে ব্যস্ত রয়েছে। তারা এতটুকুও আল্লাহ তা'আলাকে ভয় পাচ্ছে না। এদেরই সম্পর্কে রাসূল ﷺ বহু পূর্বে সত্য ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। হযরত সাউবান রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ﷺ ইরশাদ করেনঃ وَإِنَّمَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي الْأَئِمَّةَ الْمُضَلِّينَ অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে পথভ্রষ্টকারী ইমাম বা নেতাদের ভয় পাচ্ছি। যারা প্রতিনিয়ত জনসাধারণকে গোমরাহ করবে। এতদসত্ত্বেও একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত সর্বদা ও সর্বাবস্থায় সত্যের উপর অটল ও অবিচল থাকবে। কারো অসহযোগিতা বা অসঙ্গতিশীলতা তাদের কোনোরূপ ক্ষতি করতে পারবে না।
হযরত সাউবান, মু'আবিয়া ও মুগীরা বিন শো'বা রা. থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেনঃ রাসূল ﷺ ইরশাদ করেনঃ لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِّنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ مَنْصُورِينَ، لَا يَضُرُّهُمْ مَّنْ خَذَلَهُمْ وَ لَا مَنْ خَالَفَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَ هُمْ عَلَى ذَلِكَ অর্থাৎ সর্বদা আমার একদল উম্মত সত্যবিজয়ী এবং সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। কারোর অসহযোগিতা বা বিরোধিতা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কিয়ামত আসা পর্যন্ত তারা এ অবস্থায় থাকবে।