📘 বড় শিরক কি ও কত প্রকার > 📄 ফরিয়াদের শির্ক

📄 ফরিয়াদের শির্ক


২. ফরিয়াদের শিকঃ
ফরিয়াদের শির্ক বলতে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করাকে বুঝানো হয়। যে ধরনের সাহায্য সাধারণত একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কেউ করতে সক্ষম নয়। যেমনঃ রোগ নিরাময় বা নৌকোডুবি থেকে উদ্ধার ইত্যাদি।
এ জাতীয় ফরিয়াদ গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শিক্ক।
যে কোন সঙ্কট মুহূর্তে সাহায্যের জন্য ফরিয়াদ করা হলে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই সে ফরিয়াদ শুনে থাকেন এবং তদনুযায়ী বান্দাহকে তিনি সাহায্য করেন। অন্য কেউ নয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ إِذْ تَسْتَغِيْثُوْنَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ ۞ অর্থাৎ স্মরণ করো সেই সংকট মুহূর্তের কথা যখন তোমরা নিজ প্রভুর নিকট কাতর স্বরে প্রার্থনা করেছিলে তখন তিনি তোমাদের সেই প্রার্থনা কবুল করেছিলেন।
মক্কার কাফিররা সংকট মুহূর্তে নিজ মূর্তিদের কথা ভুলে গিয়ে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার নিকটই ফরিয়াদ করতো। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে সেই সংকট থেকে উদ্ধার করতেন। এরপর তারা আবারো আল্লাহ্ তা'আলাকে ভুলে গিয়ে তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, বর্তমান যুগের কবর বা পীর পূজারীরা আরো অধঃপতনে পৌঁছেছে। তারা সংকট মুহূর্তেও আল্লাহ্ তা'আলাকে ভুলে গিয়ে নিজ পীরদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকে।
আল্লাহ্ তা'আলা মক্কার কাফিরদের সম্পর্কে বলেনঃ فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ ، فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُوْنَ অর্থাৎ তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে তখন তারা একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাকে ডাকে। অন্য কাউকে নয়। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে পানি থেকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন তখন তারা আবারো তাঁর সাথে শির্কে লিপ্ত হয়।
তিনি আরো বলেনঃ قُلْ أَرَأَيْتَكُمْ إِنْ أَتَاكُمْ عَذَابُ اللهِ أَوْ أَتَتْكُمُ السَّاعَةُ أَغَيْرَ اللَّهِ تَدْعُوْنَ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ، بَلْ إِيَّاهُ تَدْعُوْنَ فَيَكْشِفُ مَا تَدْعُوْنَ إِلَيْهِ إِنْ شَاءَ وَ تَنْسَوْنَ مَا تُشْرِكُوْنَ অর্থাৎ আপনি ওদেরকে বলুনঃ তোমরাই বলো! আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে কোন শাস্তি অথবা কিয়ামত এসে গেলে তোমরা কি তখন আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবে? তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকলে অবশ্যই সঠিক উত্তর দিবে। সত্যিই তোমরা তখন অন্য কাউকে ডাকবেনা। বরং তখন তোমরা ডাকবে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাকে। তখন তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন। আর তখন তোমরা অন্যকে আল্লাহ্ তা'আলার সাথে শরীক করা ভুলে যাবে।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ وَإِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِي الْبَحْرِ ضَلَّ مَنْ تَدْعُونَ إِلَّا إِيَّاهُ فَلَمَّا نَجَّاكُمْ إِلَى الْبَرِّ أَعْرَضْتُمْ ۚ وَكَانَ الْإِنْسَانُ كَفُورًا অর্থাৎ সমুদ্রে থাকাকালীন যখন তোমরা কোন বিপদে পড়ো তখন আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য সকল শরীক তোমাদের মন থেকে উধাও হয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন তখন তোমরা আবারো তাঁর প্রতি বিমুখ হয়ে যাও। সত্যিই মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ।
তিনি আরো বলেনঃ وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ۖ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ * ثُمَّ إِذَا كَشَفَ الضُّرَّ عَنْكُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْكُمْ بِرَبِّهِمْ يُشْرِكُونَ অর্থাৎ তোমরা যে সকল নিয়ামত ভোগ করছো তা সবই আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে। অতঃপর যখন তোমরা দুঃখ দীনতার সম্মুখীন হও তখন তোমরা তাঁকেই ব্যাকুলভাবে ডাকো। অতঃপর যখন তিনি তোমাদের দুঃখ দুর্দশা দূর করে দেন তখন আবারো তোমাদের একদল নিজ প্রতিপালকের সঙ্গে শিকে লিপ্ত হয়ে যায়।
আল্লাহ্ তা'আলা এ জাতীয় শিৰ্কে লিপ্ত ব্যক্তিদেরকে জাহান্নামী বলেছেন। তিনি বলেনঃ وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ ضُرٌّ دَعَا رَبَّهُ مُنِيبًا إِلَيْهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَهُ نِعْمَةً مِنْهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدْعُو إِلَيْهِ مِنْ قَبْلُ وَجَعَلَ لِلَّهِ أَنْدَادًا لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِهِ ۚ قُلْ تَمَتَّعْ بِكُفْرِكَ قَلِيْلاً ، إِنَّكَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ অর্থাৎ মানুষকে যখন দুঃখ দুর্দশা পেয়ে বসে তখন সে একনিষ্ঠভাবে তার প্রভুকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি ওর প্রতি কোন অনুগ্রহ করেন তখন সে ইতিপূর্বে আল্লাহ্ তা'আলাকে স্মরণ করার কথা ভুলে গিয়ে তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে অন্যদেরকে তাঁর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে। (হে রাসূল!) তুমি বলে দাওঃ আরো কিছু দিন কুফরীর মজা ভোগ করো। নিশ্চয়ই তুমি জাহান্নামীদের অন্যতম।
পীর বা কবর পূজারীরা যতই নিজ ওলী বা বুযুর্গদের নিকট ফরিয়াদ করুকনা কেন, যতই তাদের পূজা অর্চনা করুকনা কেন তারা এতটুকুও নিজ ভক্তদের দুর্দশা ঘুচাতে পারবেনা। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ قُلِ ادْعُوا الَّذِيْنَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُوْنِهِ فَلَا يَمْلِكُوْنَ كَشَفَ الضُّرِّ عَنْكُمْ وَ لَا تَحْوِيلاً অর্থাৎ আপনি বলে দিনঃ তোমরা আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া যাদেরকে পূজ্য বানিয়েছো তাদেরকে ডাকো। দেখবে, তারা তোমাদের কোন দুঃখ দুর্দশা দূর করতে পারবেনা। এমনকি সামান্যটুকু পরিবর্তনও নয়। তিনি আরো বলেনঃ أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ ، أَإِلَةٌ مَّعَ اللَّهِ ، قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ অর্থাৎ মূর্তীদের উপাসনা করাই উত্তম না সেই সত্তার উপাসনা যিনি আর্তের ডাকে সাড়া দেন, বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন এবং যিনি পৃথিবীতে তোমাদেরকে প্রতিনিধি বানিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলার সমকক্ষ অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।
একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই সকল সমস্যা সমাধান করতে পারেন। তা যাই হোকনা কেন এবং যে পর্যায়েরই হোকনা কেন।
হযরত আবু যর থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী ইরশাদ করেনঃ يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ ضَالٌ إِلَّا مَنْ هَدَيْتُهُ فَاسْتَهْدُوْنِي أَهْدِكُمْ ، يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ جَائِعٌ إِلَّا مَنْ أَطْعَمْتُهُ فَاسْتَطْعِمُونِي أَطْعِمْكُمْ ، يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ عَارٍ إِلَّا مَنْ كَسَوْتُهُ فَاسْتَكْسُونِي أَكْسُكُمْ ، يَا عِبَادِي إِنَّكُمْ تُخْطِئُوْنَ بِاللَّيْلِ وَ النَّهَارِ وَأَنَا أَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا فَاسْتَغْفِرُونِي أَغْفِرْ لَكُمْ অর্থাৎ (আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাহদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন) হে আমার বান্দারা! তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট। শুধু সেই ব্যক্তিই হিদায়াতপ্রাপ্ত যাকে আমি হিদায়াত দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকটই হিদায়াত চাও। আমি তোমাদেরকে হিদায়াত দেবো। হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত। শুধু সেই ব্যক্তিই আহারকারী যাকে আমি আহার দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকটই আহার চাও। আমি তোমাদেরকে আহার দেবো। হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই বিবস্ত্র। শুধু সেই ব্যক্তিই আবৃত যাকে আমি আবরণ দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকটই আবরণ চাও। আমি তোমাদেরকে আবরণ দেবো। হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই রাতদিন গুনাহ্ করছো। আর আমি সকল গুনাহ্ ক্ষমাকারী। অতএব তোমরা আমার নিকটই ক্ষমা চাও। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবো।

📘 বড় শিরক কি ও কত প্রকার > 📄 আশ্রয়ের শির্ক

📄 আশ্রয়ের শির্ক


৩. আশ্রয়ের শিকঃ আশ্রয়ের শির্ক বলতে যে কোন অনিষ্টকর বস্তু বা ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারোর শরণাপন্ন হওয়াকেই বুঝানো হয়।
আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এ জাতীয় কোন আশ্রয় কামনা করা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা তিনি ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শিরক। তবে যে আশ্রয় মানব সাধ্যাধীন তা সক্ষম যে কারোর নিকট চাওয়া যেতে পারে। তবুও এ ব্যাপারে কারোর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নিকটই আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দেন।
তিনি বলেনঃ وَ إِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ অর্থাৎ যদি শয়তান তোমাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে প্ররোচিত করতে চায় তাহলে তুমি একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই আশ্রয় চাবে। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।
তিনি আরো বলেনঃ وَ قُلْ رَّبِّ أَعُوْذُبِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ ، وَ أَعُوْذُبِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُوْنَ অর্থাৎ আর আপনি বলুনঃ হে আমার প্রভু! আমি শয়তানের প্ররোচনা হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি এবং আপনার নিকটই আশ্রয় প্রার্থনা করি তাদের উপস্থিতি হতে।
মানব শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যও একমাত্র তাঁরই নিকট আশ্রয় প্রার্থনার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীকে নির্দেশ দেন।
তিনি বলেনঃ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ অর্থাৎ অতএব আপনি (ওদের শত্রুতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য) একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই শরণাপন্ন হোন। তিনিই তো সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর প্রিয় নবীকে আরো ব্যাপকভাবে তাঁর আশ্রয় চাওয়া শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ، مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ، وَ مِنْ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ، وَ مِنْ شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ، وَ مِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ অর্থাৎ আপনি বলুনঃ আমি আশ্রয় চাচ্ছি প্রভাতের প্রভুর তাঁর সকল সৃষ্টি, অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত, গ্রন্থিতে ফুৎকারকারিনী নারী এবং হিংসুকের হিংসার অনিষ্ট থেকে।
তিনি আরো বলেনঃ قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ، مَلِكِ النَّاسِ، إِلَهِ النَّاسِ، مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ، الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ، مِنَ الْجِنَّةِ وَ النَّاسِ অর্থাৎ আপনি বলুনঃ আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানবের প্রভু, মালিক ও উপাস্যের আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে। যে কুমন্ত্রণা দেয় মানব অন্তরে। চাই সে জিন হোক অথবা মানুষ।
আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারোর আশ্রয় চাইলে তাতে তারা তাদের অনিষ্ট কখনো বন্ধ করেনা বরং তারা আরো হঠকারী, অনিষ্টকারী ও গুনাহগার হয় এবং আশ্রয় অনুসন্ধানীরা আরো বিপথগামী ও পথভ্রান্ত হয়।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ أَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الإِنْسِ يَعُوْذُوْنَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوْهُمْ رَهَقاً অর্থাৎ আর কিছু সংখ্যক মানুষ কতক জিনের আশ্রয় প্রার্থনা করতো। তাতে করে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা আরো বাড়িয়ে দেয়।
জিনদের আশ্রয় কামনাকারী মুদ্রিক বা জাহান্নামী হলেও তারা আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছায় মানুষের কিছুনা কিছু উপকার করতে অবশ্যই সক্ষম। সুতরাং তাদের থেকে উপকার পাওয়া যাচ্ছে বলে তাদের আশ্রয় কামনা করা কখনোই জায়েয হবেনা। শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন বস্তু বা ব্যক্তি কর্তৃক উপকৃত হওয়া তা জায়েয বা হালাল হওয়া প্রমাণ করেনা। এমনও অনেক বস্তু বা কর্ম রয়েছে যা হারাম বা না জায়েয হওয়া সত্ত্বেও তা কর্তৃক মানুষ কিছুনা কিছু উপকৃত হয়ে থাকে। যেমনঃ ব্যভিচার, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি।
উল্লেখ্য যে, কোর'আন ও হাদীসে অজ্ঞ বা অপরিপক্ব পীর ফকিররা যে কোন সমস্যার সমাধানে সাধারণত জিনদের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। মানুষরা যে জিন জাতি কর্তৃক কখনো কখনো উপকৃত হতে পারে তা আল্লাহ্ তা'আলা কোর'আন মাজীদের মধ্যে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ يَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعاً يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ قَدِ اسْتَكْثَرْتُمْ مِنَ الإِنْسِ ، وَقَالَ أَوْلِيَاؤُهُمْ مِّنَ الإِنْسِ رَبَّنَا اسْتَمْتَعَ بَعْضُنَا بِبَعْضٍ وَ بَلَغْنَا أَجَلَنَا الَّذِي أَجَلْتَ لَنَا ، قَالَ النَّارُ مَثْوَاكُمْ خَالِدِينَ فِيهَا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ، إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيْمٌ অর্থাৎ হে মোহাম্মাদ! স্মরণ করুন সে দিনকে যে দিন আল্লাহ্ তা'আলা কাফির ও জিন শয়তানদেরকে একত্রিত করে বলবেনঃ হে জিন সম্প্রদায়! তোমরা বহু মানুষকে গুমরাহ্ করেছো। তখন তাদের কাফির অনুসারীরা বলবেঃ হে আমাদের প্রভু! আমরা একে অপরের মাধ্যমে প্রচুর লাভবান হয়েছি। এভাবেই আমরা আমাদের নির্ধারিত জীবন অতিবাহিত করেছি। আল্লাহ্ তা'আলা বলবেনঃ জাহান্নামই হচ্ছে তোমাদের বাসস্থান। সেখানে তোমরা চিরকাল থাকবে। তবে আল্লাহ্ তা'আলা যাকে মুক্তি দিতে চাইবেন সেই একমাত্র মুক্তি পাবে। অন্যরা নয়। নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভু সুকৌশলী এবং অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ বিশেষ প্রয়োজনে সকলকে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার আশ্রয় চাওয়া শিখিয়েছেন। অন্য কারোর নয়।
হযরত খাওলা বিন্তে হাকীম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ مَنْ نَزَلَ مَنْزِلاً ثُمَّ قَالَ: أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ ، لَمْ يَضُرَّهُ شَيْءٌ حَتَّى يَرْتَحِلَ مِنْ مَنْزِلِهِ ذَلِكَ অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন জায়গায় অবস্থান করে বলবেঃ আল্লাহ্ তা'আলার পরিপূর্ণ বাণীর আশ্রয় চাচ্ছি তাঁর সকল সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে। তাহলে উক্ত স্থান ত্যাগ করা পর্যন্ত কোন বস্তু বা ব্যক্তি তার এতটুকুও ক্ষতি করতে পারবেনা।

📘 বড় শিরক কি ও কত প্রকার > 📄 আশা ও বাসনার শির্ক

📄 আশা ও বাসনার শির্ক


৪. আশা বা বাসনার শিরকঃ আশা বা বাসনার শির্ক বলতে মানুষের অসাধ্য এমন কোন বস্তু একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারোর নিকট কামনা করাকে বুঝানো হয়। যেমনঃ কবরে শায়িত পীর-বুযুর্গের নিকট স্বামী বা সন্তান কামনা করা। এ জাতীয় বাসনা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শিরক।
তবে কোন পুণ্যকর্ম সম্পাদন না করে আল্লাহ্ তা'আলার রহমত ও জান্নাতের আশা করাও কিন্তু অমূলক।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوْا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيْلِ اللَّهِ ، أَوْلَائِكَ يَرْجُوْنَ رَحْمَةَ اللَّهِ ، وَ اللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ অর্থাৎ নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্ তা'আলার উপর ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত ও আল্লাহ্'র পথে জিহাদ করেছে সত্যিকারার্থে তারাই একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার অনুগ্রহের প্রত্যাশী। তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়। হযরত 'আলী বলেনঃ لَا يَرْجُوْ عَبْدٌ إِلَّا رَبَّهُ অর্থাৎ বান্দাহ্'র নিশ্চিত কর্তব্য হলো এইযে, সে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার নিকটই কোন কিছু কামনা করবে। অন্য কারোর নিকট নয়।

📘 বড় শিরক কি ও কত প্রকার > 📄 রুকু, সিজদাহ্, বিনম্রভাবে দাঁড়ানো বা নামাযের শির্ক

📄 রুকু, সিজদাহ্, বিনম্রভাবে দাঁড়ানো বা নামাযের শির্ক


৫. রুকু, সিজদাহ্, বিনম্রভাবে দাঁড়ানো বা নামাযের শিকঃ রুকু, সিজদাহ্, সাওয়াবের আশায় কোন ব্যক্তি বা বস্তুর সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো বা নামাযের শির্ক বলতে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য এ সকল গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতগুলো ব্যয় করাকে বুঝানো হয়। এ ইবাদাতগুলো একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার জন্যই করতে হয়। অন্য কারোর জন্য নয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوْا وَ اسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَ افْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমারা রুকু, সিজদাহ্, তোমাদের প্রভুর ইবাদাত এবং সৎকর্ম সম্পাদন করো। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَ لَا لِلْقَمَرِ وَ اسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَهُنَّ، إِنْ كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُوْنَ অর্থাৎ তোমরা সিজদাহ্ করোনা সূর্য বা চন্দ্রকে। বরং সিজদাহ্ করো সে আল্লাহ্ তা'আলাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন ওগুলোকে। যদি তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করতে চাও।
হযরত কাইস্ বিন্ সা'দ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি ইয়েমেনের "'হীরা" নামক এলাকায় গিয়ে দেখতে পেলাম, সে এলাকার লোকেরা নিজ प्रशासককে সিজদা করে। তখন আমি মনে মনে ভাবলাম, এ জাতীয় সিজদাহ্'র উপযুক্ত একমাত্র রাসূলই হতে পারে। অন্য কেউ নয়। তাই আমি মদীনায় এসে রাসূল কে ঘটনাটি এবং আমার মনের ভাবটুকু জানালে তিনি বললেনঃ لَا تَفْعَلُوا، لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لأَحَد لَأَمَرْتُ النِّسَاءَ أَنْ يَسْجُدْنَ لأَزْوَاجِهِنَّ ؛ لِمَا جَعَلَ اللَّهُ لَهُمْ عَلَيْهِنَّ مِنَ الْحَقِّ অর্থাৎ বলো! তুমি আমার ইন্তিকালের পর আমার কবরের পাশ দিয়ে গেলে আমার কবরটিকে সিজদাহ্ করবে কি? আমি বললামঃ না, তিনি বললেনঃ তাহলে এখনও করোনা। আমি যদি কাউকে কারোর জন্য সিজদাহ্ করতে আদেশ করতাম তাহলে মহিলাদেরকে নিজ স্বামীদের জন্য সিজদাহ্ করতে আদেশ করতাম। কারণ, আল্লাহ্ তা'আলা পুরুষদেরকে নিজ স্ত্রীদের উপর প্রচুর অধিকার দিয়েছেন।
আল্লাহ্ তা'আলা নামায ও সুদীর্ঘ বিনম্রভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পর্কে বলেনঃ حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَ الصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَ قُوْمُوْا لِلَّهِ قَانِتِينَ অর্থাৎ তোমরা নামায সমূহ বিশেষভাবে মধ্যবর্তী নামায ('আসর) সময় মতো আদায় করো এবং বিনীতভাবে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার উদ্দেশ্যেই দাঁড়াও। অন্য কারোর উদ্দেশ্যে নয়।
হযরত মু'আবিয়াহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি রাসূল কে বলতে শুনেছিঃ مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَتَمَثَّلَ لَهُ الرِّجَالُ قِيَامًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ অর্থাৎ যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে সন্তুষ্ট যে, মানুষ তার জন্য মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকুক তাহলে সে যেন নিজ বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ، لَا شَرِيكَ لَهُ وَ بِذَلِكَ أُمِرْتُ وَ أَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ অর্থাৎ আপনি বলে দিনঃ আমার নামায, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মরণকালের সকল নেক আমল সারা জাহানের প্রভু একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই, আমি এরই জন্যে আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই আমার উম্মতের সর্বপ্রথম মুসলমান।
তিনি আরো বলেনঃ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ الْحَرْ অর্থাৎ অতএব তোমার প্রভুর জন্য নামায পড়ো এবং কুরবানী করো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00