📄 আহ্বানের শির্ক
বড় শিকের প্রকারভেদঃ
১. আহ্বানের শিকঃ আহ্বানের শির্ক বলতে পুণ্যার্জন বা মানুষের সাধ্যের বাইরে এমন কোন পার্থিব লাভের আশায় অথবা এমন কোন পার্থিব ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত অন্য কাউকে আহ্বান করাকে বুঝানো হয়। সকল আহ্বান একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই জন্য এবং তা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত। যা তিনি ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক। তবে মানুষের সাধ্যের বাইরে নয় এমন কোন সহযোগিতার জন্য সক্ষম যে কোন ব্যক্তিকে আহ্বান করা যেতে পারে। এতদসত্ত্বেও এ সকল ব্যাপারে মানুষের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হওয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ أَنَّ الْمَسَاجِدَ اللَّهِ فَلَا تَدْعُوْا مَعَ اللَّهِ أَحَداً অর্থাৎ নিশ্চয়ই মসজিদ সমূহ একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্ তা'আলাকে ডাকার পাশাপাশি অন্য কাউকে ডেকোনা। যারা আল্লাহ্ তা'আলাকে গর্ব করে ডাকছেনা তাদেরকে তিনি জাহান্নামের হুমকি দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ قَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ، إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ অর্থাৎ তোমাদের প্রভু বলেনঃ তোমরা আমাকে সরাসরি ডাকো। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। নিশ্চয়ই যারা অহঙ্কার করে আমার ইবাদাত (দো'আ বা আহ্বান) হতে বিমুখ হবে তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
আল্লাহ্ তা'আলা ভিন্ন অন্য কাউকে ডাকা হলেও তারা কখনো কারোর ডাকে সাড়া দিবেনা। বরং তাদেরকে ডাকা সর্বদা ব্যর্থ ও নিষ্ফল হতে বাধ্য। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ لَهُ دَعْوَةُ الْحَقِّ ، وَ الَّذِيْنَ يَدْعُوْنَ مِنْ دُونِهِ لَا يَسْتَجِيبُوْنَ لَهُمْ بِشَيْءٍ إِلَّا كَبَاسِطِ كَفَّيْهِ إِلَى الْمَاءِ لِيَبْلُغَ فَاهُ وَ مَا هُوَ بِبَالِغِهِ ، وَ مَا دُعَاءُ الْكَافِرِيْنَ إِلَّا فِي ضلال অর্থাৎ সত্যিকারের একক ডাক একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার জন্য। যারা তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে আহ্বান করে তাদের আহ্বানে ওরা কখনো কোন সাড়া দিবেনা। তারা ওব্যক্তির ন্যায় যে মুখে পানি পৌঁছুবে বলে হস্তদ্বয় সম্প্রসারিত করেছে। অথচ সে পানি কখনো তার মুখে পৌঁছুবার নয়। বস্তুত কাফিরদের ডাক ব্যর্থ ও নিষ্ফল হতে বাধ্য।
যারা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কাউকে ডাকে তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা ভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ مَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُوْ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَ هُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُوْنَ অর্থাৎ সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে হতে পারে? যে আল্লাহ্ তা'আলার পরিবর্তে এমন ব্যক্তি বা বস্তুকে ডাকে যা কস্মিনকালেও (কিয়ামত পর্যন্ত) তার ডাকে সাড়া দিবেনা এবং তারা ওদের প্রার্থনা সম্পর্কে কখনো অবহিত নয়।
হযরত ইব্রাহীম মুশরিকদেরকে এবং তারা যাদেরকে ডাকতো তাদেরকেও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাকে ডাকেন। যাঁকে ডাকলে কখনো সে ডাক ব্যর্থ হয়না। তিনি বলেনঃ وَ أَعْتَزِلُكُمْ وَ مَا تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ وَ أَدْعُوْ رَبِّي عَسَى أَلا أَكُوْنَ بِدُعَاءِ رَبِّي شَقِيًّا অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে এবং তোমরা আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া যাদেরকে ডাকছো সকলকে প্রত্যাখ্যান করছি। আমি শুধু আমার প্রভুকে ডাকছি। আশা করি, আমার প্রভুকে ডেকে আমি কখনো ব্যর্থ হবোনা।
একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই সকল লাভ-ক্ষতির মালিক। অন্য কেউ নয়। তিনি ইচ্ছে না করলে কেউ কারোর লাভ বা ক্ষতি করতে পারেনা। আর সকল কল্যাণাকল্যাণও কিন্তু মানব সাধ্যের আওতাধীন নয়। বরং তার অনেকটুকুই মানব সাধ্যাতীত। সুতরাং সকল ব্যাপারে তাঁকেই ডাকতে হবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ لَا تَدْعُ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَ لَا يَضُرُّكَۚ فَاِنْ فَعَلْتَ فَاِنَّكَ اِذًا مِّنَ الظّٰلِمِيْنَ، وَ اِنْ يَّمْسَسْكَ اللّٰهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهٗۤ اِلَّا هُوَۚ وَ اِنْ يُّرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَآدَّ لِفَضْلِهٖۚ يُصِيْبُ بِهٖ مَنْ يَّشَآءُ مِنْ عِبَادِهٖۚ وَ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُۘ অর্থাৎ : আর তুমি আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া এমন কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে ডেকো না যা তোমার কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারবে না। এমন করলে সত্যিই তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যদি আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে কোন ক্ষতির সম্মুখীন করেন তাহলে তিনিই একমাত্র তোমাকে তা থেকে উদ্ধার করতে পারেন। আর যদি তিনি তোমার কোন কল্যাণ করতে চান তাহলে তাঁর অনুগ্রহের গতিরোধ করার সাধ্য কারোই নেই। তিনি নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চান অনুগ্রহ করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও অতিশয় দয়ালু। আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন : قُلِ ادْعُوا الَّذِيْنَ زَعَمْتُمْ مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ لَا يَمْلِكُوْنَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمٰوٰتِ وَ لَا فِي الْاَرْضِ وَ مَا لَهُمْ فِيْهِمَا مِنْ شِرْكٍ وَّ مَا لَهٗ مِنْهُمْ مِّنْ ظَهِيْرٍ، وَ لَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَهٗۤ اِلَّا لِمَنْ اَذِنَ لَّهٗؕ অর্থাৎ : হে নবী তুমি বলে দাও : তোমরা যাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার পরিবর্তে পূজ্য মনে করো তাদেরকে ডাকো। তারা আকাশ ও পৃথিবীর অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়। এতদুভয়ে তাদের কোন অংশীদারিত্বও নেই এবং তাদের কেউ তাঁর সহায়কও নয়। তাঁর নিকট একমাত্র অনুমতিপ্রাপ্তদেরই কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হতে পারে। তিনি আরো বলেন: وَ الَّذِيْنَ تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِهٖ مَا يَمْلِكُوْنَ مِنْ قِطْمِيْرٍؕ اِنْ تَدْعُوْهُمْ لَا يَسْمَعُوْا دُعَاءَكُمْ وَ لَوْ سَمِعُوْا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُوْنَ بِشِرْكِكُمْ وَ لَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَيْرٍ অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ্ তা'আলার পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা (খেজুরের আঁটির আবরণ পরিমাণ) সামান্য কিছুরও মালিক নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা কিছুতেই শুনতে পাবে না। আর শুনতে পাচ্ছে বলে মেনে নিলেও তারা তো তোমাদের ডাকে কখনো সাড়া দিবেনা। কিয়ামতের দিবসে তারা তোমাদের শিককে অস্বীকার করবে। আমার মতো সর্বজ্ঞের ন্যায় কেউই তোমাকে সঠিক সংবাদ দিতে পারবে না।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা রাসূল আমাকে কিছু মূল্যবান বাণী শুনিয়েছেন যার কিয়দাংশ নিম্নরূপঃ إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ، وَ إِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ ، وَ اعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوْكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ، وَ لَوِ اجْتَمَعُوْا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ অর্থাৎ কিছু চাইলে তা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার নিকটই চাইবে। কোন সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার নিকটই কামনা করবে। জেনে রেখো, পুরো বিশ্ববাসী একত্রিত হয়েও যদি তোমার কোন কল্যাণ করতে চায় তাহলে তারা ততটুকুই কল্যাণ করতে পারবে যা তোমার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। আর তারা সকল একত্রিত হয়েও যদি তোমার কোন ক্ষতি করতে চায় তাহলে তারা ততটুকুই ক্ষতি করতে পারবে যা তোমার জন্য বরাদ্দ রয়েছে।
এ হচ্ছে মানব সাধ্যাধীন কল্যাণাকল্যাণ সম্পর্কে। তাহলে যা মানব সাধ্যাতীত তা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা ছাড়া কখনো ঘটবে কি? কখনোই নয়।
আল্লাহ্ তা'আলাকে ডাকা বা তাঁর নিকট দো'আ করা যে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত তা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ অসংখ্য হাদীসে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ্ তা'আলা প্রতি রাত্রের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে এসে সকল মানুষকে দো'আর জন্য আহ্বান করে থাকেন।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلِّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِيْنَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُوْلُ : مَنْ يَدْعُوْنِي فَأَسْتَجِيْبَ لَهُ ، مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা প্রতি রাত্রের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে নেমে এসে বলতে থাকেন, কে আছে যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। কে আছে যে আমার কাছে কিছু চাবে আমি তাকে তা দান করবো। কে আছে যে আমার কাছে ক্ষমা চাবে আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী ইরশাদ করেনঃ لَيْسَ شَيْءٌ أَكْرَمَ عَلَى اللَّهُ تَعَالَى مِنَ الدُّعَاءِ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার নিকট দো'আর চাইতেও সম্মানিত কোন বস্তু নেই।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ مَنْ لَمْ يَدْعُ اللَّهُ سُبْحَانَهُ غَضِبَ عَلَيْهِ অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলাকে ডাকেনা তার উপর তিনি রাগান্বিত হন।
হযরত নু'মান বিন্ বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ অর্থাৎ দো'আই হচ্ছে ইবাদাত।
সুতরাং এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শিক বৈ কি।
এমন তো নয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা কোন মাধ্যম ছাড়া কারোর ডাকে সাড়া দেননা। বরং তিনি যখনই কোন বান্দাহ্ তাঁকে একান্তভাবে ডাকে, সাথে সাথেই তিনি তার ডাকে সাড়া দেন।
তিনি বলেনঃ وَ إِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ، أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ، فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُوْنَ অর্থাৎ যখন আমার বান্দারা আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তখন আপনি তাদেরকে বলুনঃ নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ্ তা'আলা) অতি সন্নিকটে। কোন আহ্বানকারী যখনই আমাকে আহ্বান করে তখনই আমি তার আহ্বানে সাড়া দেই। অতএব তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার উপর ঈমান আনে। তাহলেই তারা সঠিক পথের সন্ধান পাবে।
কবরবাসী কোন ওলী বা বুযুর্গ কারোর কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে এমন বিশ্বাস করে তাদেরকে ডাকাও কিন্তু এ জাতীয় শিকের অন্তর্ভুক্ত।
এমন ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের গণ্ডী থেকে বের হয়ে যাবে। যদিও সে আল্লাহ্ তা'আলার একান্ত ইবাদাতগুযার বান্দাহ্ হোক না কেন। কারণ, মক্কার কাফিররাও তো আল্লাহ্ তা'আলাকে স্বীকার করতো এবং তাঁর ইবাদাত করতো। কিন্তু শিকের কারণেই তাদের এ ইবাদাত কোন কাজে আসেনি। তাই তারা অনন্তকাল জাহান্নামে থাকবে।
আল্লাহ্ তা'আলা মক্কার কাফিরদের সম্পর্কে বলেনঃ وَ لَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَ الأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ ، قُلْ أَفَرَأَيْتُمْ مَّا تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتٌ رَحْمَتِهِ ، قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ ، عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُوْنَ অর্থাৎ আপনি যদি কাফিরদেরকে জিজ্ঞাসা করেনঃ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীকে কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ্ তা'আলাই সৃষ্টি করেছেন। আপনি বলুনঃ তোমরা কি কখনো ভেবে দেখেছো যে, আল্লাহ্ তা'আলা আমার কোন অনিষ্ট করতে চাইলে তোমাদের উপাস্যরা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? বা আল্লাহ্ তা'আলা আমার প্রতি কোন অনুগ্রহ করতে চাইলে ওরা কি সে অনুগ্রহ রোধ করতে পারবে? আপনি বলুনঃ আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। ভরসাকারীদেরকে তাঁর উপরই ভরসা করতে হবে।
মক্কার কাফিররা আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদাতকে মৌলিক মনে করতো। তবে তারা মূর্তিপূজা করতো একমাত্র তাঁরই নৈকট্য লাভের জন্য।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ، وَ الَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ، مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُوْنَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى، إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيْهِ يَخْتَلِفُوْنَ، إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ অর্থাৎ জেনে রেখো, অবিমিশ্র আনুগত্য একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই জন্য। আর যারা আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত অন্য কাউকে অভিভাবক বা সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করেছে তারা বলেঃ আমরা তো এদের পূজা এ জন্যই করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে। তারা যে বিষয় নিয়ে এখন নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের দিন সে বিষয়ের সঠিক ফায়সালা দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা কাফির ও মিথ্যাবাদীকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ وَ يَعْبُدُونَ مِنْ دُوْنِ اللهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُوْلُوْنَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللهِ ، قُلْ أَتُنَبِّئُوْنَ اللَّهُ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ، سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُوْنَ অর্থাৎ তারা আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত এমন ব্যক্তি বা বস্তুসমূহের ইবাদাত করে যা তাদের কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারেনা। তারা বলেঃ এরা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করবে। আপনি বলে দিনঃ তোমরা কি আল্লাহ্ তা'আলাকে ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলে তাঁর অজানা কোন কিছু জানিয়ে দিচ্ছো? তিনি পবিত্র এবং তিনি তাদের শিরক হতে অনেক ঊর্ধ্বে।
তিনি আরো বলেনঃ أَمِ اتَّخَذُوا مِنْ دُوْنِ اللَّهِ شُفَعَاءَ، قُلْ أَوَلَوْ كَانُوا لَا يَمْلِكُوْنَ شَيْئًا وَّ لَا يَعْقِلُوْنَ، قُلْ اللَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعاً ، لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَ الْأَرْضِ ، ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ অর্থাৎ তারা কি আল্লাহ্ তা'আলার অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে সুপারিশকারী বানিয়ে নিয়েছে? আপনি বলে দিনঃ তোমরা কি কাউকে সুপারিশকারী বানিয়ে নিয়েছো? অথচ তারা এ ব্যাপারে কোন ক্ষমতাই রাখেনা এবং কিছুই বুঝেনা। আপনি বলে দিনঃ যাবতীয় সুপারিশ একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই জন্য তথা তাঁরই ইখতিয়ারে। অন্য কারোর ইখতিয়ারে নয়। আকাশ ও ভূমণ্ডলের সার্বভৌমত্ব একমাত্র তাঁরই। পরিশেষে তাঁর নিকটেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।
কবর পূজারীদের অনেকেই মনে মনে এমন ধারণা পোষণ করে থাকবেন যে, মক্কার কাফির ও মুদ্রিকরা নিজ মূর্তিদের ব্যাপারে এমন মনে করতো যে, তাদের মূর্তিরা স্পেশালভাবে এমন কিছু ক্ষমতার মালিক যা আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে কখনোই দেননি। বরং তাদের এ সকল ক্ষমতা একান্তভাবেই তাদের নিজস্ব। আর আমরা আমাদের পীর-বুযুর্গদের সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করছি তা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা মনে করছি যে, আমাদের পীর-বুযুর্গদের সকল ক্ষমতা একান্ত আল্লাহ্ প্রদত্ত। আল্লাহ্ তা'আলা নিজ দয়ায় তাঁর ওলীদেরকে এ সকল ক্ষমতা দিয়েছেন। তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব নয়। মূলত: তাদের এ ধারণা একেবারেই বাস্তববর্জিত। কারণ, মক্কার কাফির-মুর্শিকদের ধারণাও হুবহু এমন ছিলো। বিন্দুমাত্রও এর ব্যতিক্রম ছিলোনা। তারাও তাদের মূর্তিদের ক্ষমতাগুলোকে একান্তভাবেই আল্লাহ্ প্রদত্ত বলে মনে করতো। একেবারেই তাদের নিজস্ব ক্ষমতা বলে কখনোই মনে করতোনা।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আন্হুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ كَانَ الْمُشْرِكُوْنَ يَقُوْلُوْنَ: لَبَّيْكَ لا شَريكَ لَكَ ، قَالَ: فَيَقُوْلُ رَسُوْلُ الله ﷺ : وَيْلَكُمْ قَدْ قَدْ، فَيَقُوْلُوْنَ: إِلَّا شَرِيكَاً هُوَ لَكَ، تَمْلِكُهُ وَ مَا مَلَكَ، يَقُوْلُوْنَ هَذَا وَهُمْ يَطُوْفُوْنَ بِالْبَيْتِ অর্থাৎ মুদ্রিকরা বলতোঃ (হে প্রভু!) আপনার ডাকে আমি সর্বদা উপস্থিত এবং আপনার আনুগত্যে আমি একান্তভাবেই বাধ্য। আপনার কোন শরীক নেই। তখন রাসূল ﷺ বলতেনঃ হায়! তোমাদের কপাল পোড়া। এতটুকুই যথেষ্ট। এতটুকুই যথেষ্ট। আর একটুও বাড়িয়ে বলোনা। তারপরও তারা বলতোঃ তবে হে আল্লাহ্! আপনার এমন শরীক রয়েছে যার মালিক আপনি এবং সে যা কিছুর মালিক সেগুলোও আপনার। তার নিজস্ব কিছুই নেই। তারা এ বাক্যগুলো বলতো এবং ক্বাবা শরীফ তাওয়াফ করতো।
📄 ফরিয়াদের শির্ক
২. ফরিয়াদের শিকঃ
ফরিয়াদের শির্ক বলতে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করাকে বুঝানো হয়। যে ধরনের সাহায্য সাধারণত একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কেউ করতে সক্ষম নয়। যেমনঃ রোগ নিরাময় বা নৌকোডুবি থেকে উদ্ধার ইত্যাদি।
এ জাতীয় ফরিয়াদ গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শিক্ক।
যে কোন সঙ্কট মুহূর্তে সাহায্যের জন্য ফরিয়াদ করা হলে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই সে ফরিয়াদ শুনে থাকেন এবং তদনুযায়ী বান্দাহকে তিনি সাহায্য করেন। অন্য কেউ নয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ إِذْ تَسْتَغِيْثُوْنَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ ۞ অর্থাৎ স্মরণ করো সেই সংকট মুহূর্তের কথা যখন তোমরা নিজ প্রভুর নিকট কাতর স্বরে প্রার্থনা করেছিলে তখন তিনি তোমাদের সেই প্রার্থনা কবুল করেছিলেন।
মক্কার কাফিররা সংকট মুহূর্তে নিজ মূর্তিদের কথা ভুলে গিয়ে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার নিকটই ফরিয়াদ করতো। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে সেই সংকট থেকে উদ্ধার করতেন। এরপর তারা আবারো আল্লাহ্ তা'আলাকে ভুলে গিয়ে তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, বর্তমান যুগের কবর বা পীর পূজারীরা আরো অধঃপতনে পৌঁছেছে। তারা সংকট মুহূর্তেও আল্লাহ্ তা'আলাকে ভুলে গিয়ে নিজ পীরদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকে।
আল্লাহ্ তা'আলা মক্কার কাফিরদের সম্পর্কে বলেনঃ فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ ، فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُوْنَ অর্থাৎ তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে তখন তারা একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাকে ডাকে। অন্য কাউকে নয়। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে পানি থেকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন তখন তারা আবারো তাঁর সাথে শির্কে লিপ্ত হয়।
তিনি আরো বলেনঃ قُلْ أَرَأَيْتَكُمْ إِنْ أَتَاكُمْ عَذَابُ اللهِ أَوْ أَتَتْكُمُ السَّاعَةُ أَغَيْرَ اللَّهِ تَدْعُوْنَ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ، بَلْ إِيَّاهُ تَدْعُوْنَ فَيَكْشِفُ مَا تَدْعُوْنَ إِلَيْهِ إِنْ شَاءَ وَ تَنْسَوْنَ مَا تُشْرِكُوْنَ অর্থাৎ আপনি ওদেরকে বলুনঃ তোমরাই বলো! আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে কোন শাস্তি অথবা কিয়ামত এসে গেলে তোমরা কি তখন আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবে? তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকলে অবশ্যই সঠিক উত্তর দিবে। সত্যিই তোমরা তখন অন্য কাউকে ডাকবেনা। বরং তখন তোমরা ডাকবে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাকে। তখন তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন। আর তখন তোমরা অন্যকে আল্লাহ্ তা'আলার সাথে শরীক করা ভুলে যাবে।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ وَإِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِي الْبَحْرِ ضَلَّ مَنْ تَدْعُونَ إِلَّا إِيَّاهُ فَلَمَّا نَجَّاكُمْ إِلَى الْبَرِّ أَعْرَضْتُمْ ۚ وَكَانَ الْإِنْسَانُ كَفُورًا অর্থাৎ সমুদ্রে থাকাকালীন যখন তোমরা কোন বিপদে পড়ো তখন আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য সকল শরীক তোমাদের মন থেকে উধাও হয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন তখন তোমরা আবারো তাঁর প্রতি বিমুখ হয়ে যাও। সত্যিই মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ।
তিনি আরো বলেনঃ وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ۖ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ * ثُمَّ إِذَا كَشَفَ الضُّرَّ عَنْكُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْكُمْ بِرَبِّهِمْ يُشْرِكُونَ অর্থাৎ তোমরা যে সকল নিয়ামত ভোগ করছো তা সবই আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে। অতঃপর যখন তোমরা দুঃখ দীনতার সম্মুখীন হও তখন তোমরা তাঁকেই ব্যাকুলভাবে ডাকো। অতঃপর যখন তিনি তোমাদের দুঃখ দুর্দশা দূর করে দেন তখন আবারো তোমাদের একদল নিজ প্রতিপালকের সঙ্গে শিকে লিপ্ত হয়ে যায়।
আল্লাহ্ তা'আলা এ জাতীয় শিৰ্কে লিপ্ত ব্যক্তিদেরকে জাহান্নামী বলেছেন। তিনি বলেনঃ وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ ضُرٌّ دَعَا رَبَّهُ مُنِيبًا إِلَيْهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَهُ نِعْمَةً مِنْهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدْعُو إِلَيْهِ مِنْ قَبْلُ وَجَعَلَ لِلَّهِ أَنْدَادًا لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِهِ ۚ قُلْ تَمَتَّعْ بِكُفْرِكَ قَلِيْلاً ، إِنَّكَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ অর্থাৎ মানুষকে যখন দুঃখ দুর্দশা পেয়ে বসে তখন সে একনিষ্ঠভাবে তার প্রভুকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি ওর প্রতি কোন অনুগ্রহ করেন তখন সে ইতিপূর্বে আল্লাহ্ তা'আলাকে স্মরণ করার কথা ভুলে গিয়ে তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে অন্যদেরকে তাঁর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে। (হে রাসূল!) তুমি বলে দাওঃ আরো কিছু দিন কুফরীর মজা ভোগ করো। নিশ্চয়ই তুমি জাহান্নামীদের অন্যতম।
পীর বা কবর পূজারীরা যতই নিজ ওলী বা বুযুর্গদের নিকট ফরিয়াদ করুকনা কেন, যতই তাদের পূজা অর্চনা করুকনা কেন তারা এতটুকুও নিজ ভক্তদের দুর্দশা ঘুচাতে পারবেনা। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ قُلِ ادْعُوا الَّذِيْنَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُوْنِهِ فَلَا يَمْلِكُوْنَ كَشَفَ الضُّرِّ عَنْكُمْ وَ لَا تَحْوِيلاً অর্থাৎ আপনি বলে দিনঃ তোমরা আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া যাদেরকে পূজ্য বানিয়েছো তাদেরকে ডাকো। দেখবে, তারা তোমাদের কোন দুঃখ দুর্দশা দূর করতে পারবেনা। এমনকি সামান্যটুকু পরিবর্তনও নয়। তিনি আরো বলেনঃ أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ ، أَإِلَةٌ مَّعَ اللَّهِ ، قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ অর্থাৎ মূর্তীদের উপাসনা করাই উত্তম না সেই সত্তার উপাসনা যিনি আর্তের ডাকে সাড়া দেন, বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন এবং যিনি পৃথিবীতে তোমাদেরকে প্রতিনিধি বানিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলার সমকক্ষ অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।
একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই সকল সমস্যা সমাধান করতে পারেন। তা যাই হোকনা কেন এবং যে পর্যায়েরই হোকনা কেন।
হযরত আবু যর থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী ইরশাদ করেনঃ يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ ضَالٌ إِلَّا مَنْ هَدَيْتُهُ فَاسْتَهْدُوْنِي أَهْدِكُمْ ، يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ جَائِعٌ إِلَّا مَنْ أَطْعَمْتُهُ فَاسْتَطْعِمُونِي أَطْعِمْكُمْ ، يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ عَارٍ إِلَّا مَنْ كَسَوْتُهُ فَاسْتَكْسُونِي أَكْسُكُمْ ، يَا عِبَادِي إِنَّكُمْ تُخْطِئُوْنَ بِاللَّيْلِ وَ النَّهَارِ وَأَنَا أَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا فَاسْتَغْفِرُونِي أَغْفِرْ لَكُمْ অর্থাৎ (আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাহদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন) হে আমার বান্দারা! তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট। শুধু সেই ব্যক্তিই হিদায়াতপ্রাপ্ত যাকে আমি হিদায়াত দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকটই হিদায়াত চাও। আমি তোমাদেরকে হিদায়াত দেবো। হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত। শুধু সেই ব্যক্তিই আহারকারী যাকে আমি আহার দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকটই আহার চাও। আমি তোমাদেরকে আহার দেবো। হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই বিবস্ত্র। শুধু সেই ব্যক্তিই আবৃত যাকে আমি আবরণ দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকটই আবরণ চাও। আমি তোমাদেরকে আবরণ দেবো। হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই রাতদিন গুনাহ্ করছো। আর আমি সকল গুনাহ্ ক্ষমাকারী। অতএব তোমরা আমার নিকটই ক্ষমা চাও। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবো।
📄 আশ্রয়ের শির্ক
৩. আশ্রয়ের শিকঃ আশ্রয়ের শির্ক বলতে যে কোন অনিষ্টকর বস্তু বা ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারোর শরণাপন্ন হওয়াকেই বুঝানো হয়।
আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এ জাতীয় কোন আশ্রয় কামনা করা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা তিনি ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শিরক। তবে যে আশ্রয় মানব সাধ্যাধীন তা সক্ষম যে কারোর নিকট চাওয়া যেতে পারে। তবুও এ ব্যাপারে কারোর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নিকটই আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দেন।
তিনি বলেনঃ وَ إِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ অর্থাৎ যদি শয়তান তোমাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে প্ররোচিত করতে চায় তাহলে তুমি একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই আশ্রয় চাবে। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।
তিনি আরো বলেনঃ وَ قُلْ رَّبِّ أَعُوْذُبِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ ، وَ أَعُوْذُبِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُوْنَ অর্থাৎ আর আপনি বলুনঃ হে আমার প্রভু! আমি শয়তানের প্ররোচনা হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি এবং আপনার নিকটই আশ্রয় প্রার্থনা করি তাদের উপস্থিতি হতে।
মানব শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যও একমাত্র তাঁরই নিকট আশ্রয় প্রার্থনার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীকে নির্দেশ দেন।
তিনি বলেনঃ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ অর্থাৎ অতএব আপনি (ওদের শত্রুতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য) একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই শরণাপন্ন হোন। তিনিই তো সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর প্রিয় নবীকে আরো ব্যাপকভাবে তাঁর আশ্রয় চাওয়া শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ، مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ، وَ مِنْ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ، وَ مِنْ شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ، وَ مِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ অর্থাৎ আপনি বলুনঃ আমি আশ্রয় চাচ্ছি প্রভাতের প্রভুর তাঁর সকল সৃষ্টি, অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত, গ্রন্থিতে ফুৎকারকারিনী নারী এবং হিংসুকের হিংসার অনিষ্ট থেকে।
তিনি আরো বলেনঃ قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ، مَلِكِ النَّاسِ، إِلَهِ النَّاسِ، مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ، الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ، مِنَ الْجِنَّةِ وَ النَّاسِ অর্থাৎ আপনি বলুনঃ আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানবের প্রভু, মালিক ও উপাস্যের আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে। যে কুমন্ত্রণা দেয় মানব অন্তরে। চাই সে জিন হোক অথবা মানুষ।
আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারোর আশ্রয় চাইলে তাতে তারা তাদের অনিষ্ট কখনো বন্ধ করেনা বরং তারা আরো হঠকারী, অনিষ্টকারী ও গুনাহগার হয় এবং আশ্রয় অনুসন্ধানীরা আরো বিপথগামী ও পথভ্রান্ত হয়।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ أَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الإِنْسِ يَعُوْذُوْنَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوْهُمْ رَهَقاً অর্থাৎ আর কিছু সংখ্যক মানুষ কতক জিনের আশ্রয় প্রার্থনা করতো। তাতে করে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা আরো বাড়িয়ে দেয়।
জিনদের আশ্রয় কামনাকারী মুদ্রিক বা জাহান্নামী হলেও তারা আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছায় মানুষের কিছুনা কিছু উপকার করতে অবশ্যই সক্ষম। সুতরাং তাদের থেকে উপকার পাওয়া যাচ্ছে বলে তাদের আশ্রয় কামনা করা কখনোই জায়েয হবেনা। শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন বস্তু বা ব্যক্তি কর্তৃক উপকৃত হওয়া তা জায়েয বা হালাল হওয়া প্রমাণ করেনা। এমনও অনেক বস্তু বা কর্ম রয়েছে যা হারাম বা না জায়েয হওয়া সত্ত্বেও তা কর্তৃক মানুষ কিছুনা কিছু উপকৃত হয়ে থাকে। যেমনঃ ব্যভিচার, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি।
উল্লেখ্য যে, কোর'আন ও হাদীসে অজ্ঞ বা অপরিপক্ব পীর ফকিররা যে কোন সমস্যার সমাধানে সাধারণত জিনদের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। মানুষরা যে জিন জাতি কর্তৃক কখনো কখনো উপকৃত হতে পারে তা আল্লাহ্ তা'আলা কোর'আন মাজীদের মধ্যে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ يَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعاً يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ قَدِ اسْتَكْثَرْتُمْ مِنَ الإِنْسِ ، وَقَالَ أَوْلِيَاؤُهُمْ مِّنَ الإِنْسِ رَبَّنَا اسْتَمْتَعَ بَعْضُنَا بِبَعْضٍ وَ بَلَغْنَا أَجَلَنَا الَّذِي أَجَلْتَ لَنَا ، قَالَ النَّارُ مَثْوَاكُمْ خَالِدِينَ فِيهَا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ، إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيْمٌ অর্থাৎ হে মোহাম্মাদ! স্মরণ করুন সে দিনকে যে দিন আল্লাহ্ তা'আলা কাফির ও জিন শয়তানদেরকে একত্রিত করে বলবেনঃ হে জিন সম্প্রদায়! তোমরা বহু মানুষকে গুমরাহ্ করেছো। তখন তাদের কাফির অনুসারীরা বলবেঃ হে আমাদের প্রভু! আমরা একে অপরের মাধ্যমে প্রচুর লাভবান হয়েছি। এভাবেই আমরা আমাদের নির্ধারিত জীবন অতিবাহিত করেছি। আল্লাহ্ তা'আলা বলবেনঃ জাহান্নামই হচ্ছে তোমাদের বাসস্থান। সেখানে তোমরা চিরকাল থাকবে। তবে আল্লাহ্ তা'আলা যাকে মুক্তি দিতে চাইবেন সেই একমাত্র মুক্তি পাবে। অন্যরা নয়। নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভু সুকৌশলী এবং অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ বিশেষ প্রয়োজনে সকলকে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার আশ্রয় চাওয়া শিখিয়েছেন। অন্য কারোর নয়।
হযরত খাওলা বিন্তে হাকীম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ مَنْ نَزَلَ مَنْزِلاً ثُمَّ قَالَ: أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ ، لَمْ يَضُرَّهُ شَيْءٌ حَتَّى يَرْتَحِلَ مِنْ مَنْزِلِهِ ذَلِكَ অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন জায়গায় অবস্থান করে বলবেঃ আল্লাহ্ তা'আলার পরিপূর্ণ বাণীর আশ্রয় চাচ্ছি তাঁর সকল সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে। তাহলে উক্ত স্থান ত্যাগ করা পর্যন্ত কোন বস্তু বা ব্যক্তি তার এতটুকুও ক্ষতি করতে পারবেনা।
📄 আশা ও বাসনার শির্ক
৪. আশা বা বাসনার শিরকঃ আশা বা বাসনার শির্ক বলতে মানুষের অসাধ্য এমন কোন বস্তু একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারোর নিকট কামনা করাকে বুঝানো হয়। যেমনঃ কবরে শায়িত পীর-বুযুর্গের নিকট স্বামী বা সন্তান কামনা করা। এ জাতীয় বাসনা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা আল্লাহ্ তা'আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শিরক।
তবে কোন পুণ্যকর্ম সম্পাদন না করে আল্লাহ্ তা'আলার রহমত ও জান্নাতের আশা করাও কিন্তু অমূলক।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوْا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيْلِ اللَّهِ ، أَوْلَائِكَ يَرْجُوْنَ رَحْمَةَ اللَّهِ ، وَ اللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ অর্থাৎ নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্ তা'আলার উপর ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত ও আল্লাহ্'র পথে জিহাদ করেছে সত্যিকারার্থে তারাই একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার অনুগ্রহের প্রত্যাশী। তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়। হযরত 'আলী বলেনঃ لَا يَرْجُوْ عَبْدٌ إِلَّا رَبَّهُ অর্থাৎ বান্দাহ্'র নিশ্চিত কর্তব্য হলো এইযে, সে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার নিকটই কোন কিছু কামনা করবে। অন্য কারোর নিকট নয়।