📄 শির্কের বাহন
শির্কের বাহনঃ এমন কিছু কথা ও কাজ রয়েছে যা সরাসরি শির্ক না হলেও রাসূল নিজ উম্মতকে তা করতে ও বলতে নিষেধ করেছেন। কারণ, তা যে কোন ব্যক্তিকে অতিসত্বর শিকের দিকে পৌঁছিয়ে দেয়। সে কথা ও কাজগুলো নিম্নরূপঃ
১. রাসূল এমন শব্দ উচ্চারণ করতে নিষেধ করেছেন যা সৃষ্টি ও স্রষ্টার মাঝে সমতা বুঝায়। যেমনঃ এমন বলা যে, আপনি ও আল্লাহ্ তা'আলা চেয়েছেন বলে কাজটি হয়েছে। নতুবা হতোনা। আপনি ও আল্লাহ্ তা'আলা ছিলেন বলে ঘটনাটি ঘটেনি। নতুবা ঘটে যেতো। ইত্যাদি ইত্যাদি।
২. নবী কারোর কবরকে নিয়ে যে কোন ধরনের বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। যেমনঃ কবরের উপর বসা, কবরের উপর ঘর বানানো, পাকা করা, মোজাইক করা, চুনকাম করা, কবরস্থানে বা কবরের দিকে ফিরে নামায পড়া, কবরকে যে কোন ধরনের ইবাদাত বা মেলা ক্ষেত্র বানানো, কবরের মাটির সাথে অন্য কিছু বাড়ানো, কবরকে উঁচু করা ইত্যাদি ইত্যাদি।
হযরত আবুল্ হাইয়াজ আসাদী (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ হযরত 'আলী একদা আমাকে বললেনঃ أَلَا أَبْعَثُكَ عَلَى مَا بَعَثَنِي عَلَيْهِ رَسُولُ اللهِ ؟ أَنْ لَا تَدَعَ تِمْثَالَاً وَ لَا صُوْرَةً إِلَّا طَمَسْتَهَا، وَ لَا قَبْراً مُشْرِفاً إِلَّا سَوَّيْتَهُ অর্থাৎ আমি কি তোমাকে এমন কাজে পাঠাবো না যে কাজে আমাকে রাসূল পাঠিয়েছেন?! তুমি কোন মূর্তি বা ছবি পেলে তা মুছে দিবে এবং কোন উঁচু কবর পেলে তা সমান করে দিবে।
বাকি প্রমাণগুলো মূল আলোচনায় আসবে।
৩. নবী সূর্য উঠা ও ডুবার সময় নামায পড়তে নিষেধ করেছেন। কারণ, তাতে সূর্য পূজারীদের সাথে মিল পাওয়া যায়।
হযরত 'উক্ববাহ্ বিন্ 'আমির জুহানী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ ثَلَاثُ سَاعَاتِ كَانَ رَسُوْلُ الله يَنْهَانَا أَنْ تُصَلِّيَ فِيهِنَّ أَوْ أَنْ تَقْبَرَ فِيهِنَّ مَوْتَانَا ، حِيْنَ تَطْلُعُ الشَّمْسُ بَازِغَةً حَتَّى تَرْتَفِعَ ، وَ حِيْنَ يَقُوْمُ قَائِمُ الظَّهِيرَةِ حَتَّى تَمِيلَ الشَّمْسُ ، وَ حِيْنَ تَضَيَّفُ الشَّمْسُ لِلْغُرُوبِ حَتَّى تَغْرُبَ অর্থাৎ তিনটি সময় এমন যে, রাসূল আমাদেরকে সে সময়গুলোতে নামায পড়তে অথবা মৃত ব্যক্তিকে দাফন করতে নিষেধ করেছেন। সূর্য উঠার সময় যতক্ষণ না তা পূর্ণভাবে উঠে যায়। ঠিক দুপুর বেলায় যতক্ষণ না তা মধ্যাকাশ থেকে সরে যায়। সূর্য ডুবার সময় যতক্ষণ না তা সম্পূর্ণরূপে ডুবে যায়।
৪. রাসূল সাওয়াবের আশায় তিনটি মসজিদ তথা মসজিদে হারাম (মক্কা মসজিদ), মসজিদে নববী (মদীনা মসজিদ), মসজিদে 'আক্বসা (বায়তুল মাক্বদিস) ছাড়া অন্য কোথাও সফর করতে নিষেধ করেন। এর প্রমাণ মূল আলোচনায় আসবে।
৫. রাসূল পূজা মণ্ডপে অথবা মেলা ক্ষেত্রে মানত পুরা করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, তাতে মূর্তি পূজারীদের সাথে মিল পাওয়া যায়। এর প্রমাণ মূল আলোচনায় আসবে।
৬. রাসূল তাঁর সম্মান ও প্রশংসায় যে কোন ধরনের বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ শিখীর থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি বনু 'আ'মির গোত্রের এক প্রতিনিধি দলের সাথে রাসূল এর নিকট গেলাম। অতঃপর আমরা রাসূল কে সম্বোধন করে বললামঃ আপনি আমাদের সাইয়েদ! রাসূল বললেনঃ সাইয়েদ হচ্ছেন আল্লাহ্ তা'আলা। আমি নই। তখন আমরা বললামঃ আপনি আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও প্রতিপত্তিশীল! তখন তিনি বললেনঃ قُوْلُوْا بِقَوْلِكُمْ أَوْ بَعْضٍ قَوْلِكُمْ ، وَ لَا يَسْتَجْرِيَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ অর্থাৎ তোমরা এমন কিছু বলতে পারো। তবে মনে রাখবে যে, শয়তান যেন তোমাদেরকে নিজ কাজের জন্য প্রতিনিধি বানিয়ে না নেয়।
যদিও কোন উপযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তাকে সাইয়েদ বলা যায় তবুও রাসূল তাঁর ব্যাপারে তা বলতে এ জন্যই নিষেধ করেছেন যে, যেন কেউ তাঁর সম্মান ও প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করে তাঁকে আল্লাহ্ তা'আলার সমপর্যায়ে বসিয়ে না দেয় যা বড় শিরকের অন্তর্গত।
এ কারণেই কেউ কারোর নিকট রাসূল এর পরিচয় দিতে চাইলে তিনি তাকে শুধু তাঁর ব্যাপারে এতটুকুই বলতে আদেশ করেছেন যে, তিনি আল্লাহ্ তা'আলার বান্দাহ্ ও তদীয় রাসূল।
হযরত 'উমর থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি নবী কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেনঃ لَا تُطْرُوْنِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا: عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ অর্থাৎ তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি করোনা যেমনিভাবে বাড়াবাড়ি করেছে খ্রিষ্টানরা 'ঈসা বিন্ মায়াম্ এর ব্যাপারে। আমি কেবল আল্লাহ্ তা'আলার বান্দাহ্। সুতরাং তোমরা আমার ব্যাপারে বলবেঃ তিনি আল্লাহ্ তা'আলার বান্দাহ্ এবং তদীয় রাসূল।
৭. রাসূল কারোর সম্মুখে তার প্রশংসা করতে নিষেধ করেছেন। যাতে তার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করা না হয় এবং সেও আত্মম্ভরিতা থেকে বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি রাসূল কাউকে কারোর সম্মুখে প্রশংসা করতে দেখলে তার চেহারায় বালি ছুঁড়ে মারতে নির্দেশ দিয়েছেন।
হ হযরত মু'আবিয়া থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি রাসূল কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেনঃ إِيَّاكُمْ وَ التَّمَادُحَ فَإِنَّهُ الذَّبْحُ অর্থাৎ তোমরা একে অপরের প্রশংসা করা থেকে দূরে থাকো। কারণ, সম্মুখ প্রশংসা হচ্ছে কাউকে জবাই করার শামিল।
হযরত আবু বাক্বাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ জনৈক ব্যক্তি নবী এর সম্মুখে অন্য জনের প্রশংসা করছিলো। তখন নবী প্রশংসাকারীকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ وَيْحَكَ! قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ ، قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ مِرَارًا ، إِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ مادحاً صَاحِبَهُ لَا مَحَالَةَ ، فَلْيَقُلْ: أَحْسِبُ فُلاناً ، وَ اللَّهُ حَسِيبُهُ ، وَ لَا أُزَكِّيْ عَلَى الله أَحَداً ، أَحْسِبُهُ ، إِنْ كَانَ يَعْلَمُ ذَلِكَ كَذَا وَ كَذَا অর্থাৎ তুমি ধ্বংস হও! তুমি ওর ঘাড় ভেঙ্গে দিয়েছো। তুমি ওর ঘাড় ভেঙ্গে দিয়েছো। এ কথা রাসূল কয়েক বার বলেছেন। তবে যদি তোমাদের কেউ অবশ্যই কারোর প্রশংসা করতে চায় তাহলে সে যেন বলেঃ আমি ধারণা করছি, তবে আল্লাহ্ তা'আলাই ভালো জানেন। আমি তাঁর উপর কারোর পবিত্রতা বর্ণনা করতে চাই না। আমি ধারণা করছি, সে এমন এমন। সে ওব্যক্তির ব্যাপারে ততটুকুই বলবে যা সে তার ব্যাপারে ভালোভাবেই জানে। হাম্মাম (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা জনৈক ব্যক্তি 'উসমান এর সম্মুখে তাঁর প্রশংসা করলে হযরত মিক্বদাদ তার চেহারায় মাটি ছুঁড়ে মারেন এবং বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ إِذَا رَأَيْتُمُ الْمَدَّاحِيْنَ فَاحْتُوْا فِي وُجُوهِهِمُ التَّرَابَ অর্থাৎ যখন তোমরা প্রশংসাকারীদেরকে দেখবে তখন তোমরা তাদের মুখে মাটি ছুঁড়ে মারবে।
৮. রাসূল কোন নেক্কার বান্দাহ্'র ব্যাপারে যে কোন ধরনের বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন এবং তিনি এ জাতীয় লোকদেরকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলার নিকট তাঁর সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
হযরত 'আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ হযরত উম্মে হাবীবা ও হযরত উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) নবী এর নিকট একদা ইথিওপিয়ার এক গীর্জার কথা বর্ণনা করেন। যাতে অনেক ধরনের ছবি টাঙ্গানো ছিলো। তখন নবী তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ إِنْ أُوْلَائِكَ إِذَا كَانَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فَمَاتَ ، بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِداً وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ ، أَوْلَائِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ অর্থাৎ ওরা এমন যে, ওদের মধ্যে কোন নেক্কার ব্যক্তির মৃত্যু হলে তারা তার কবরের উপর মসজিদ বানিয়ে নেয় এবং তাতে এ জাতীয় ছবি অঙ্কন করে। ওরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে পরিগণিত হবে।
মূলতঃ নেক্কার লোকদের প্রতি আমাদের শরীয়ত সম্মত দায়িত্ব হলো এই যে, আমরা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করবো। তাদের জন্য আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো। তাদের প্রতি কোন ধরনের বিদ্বেষ পোষণ করবো না এবং কোন ধরনের বাড়াবাড়ি ব্যতিরেকে তাদের যে কোন নেক আমল কোর'আন ও হাদীস সম্মত হলে তা আমরা মেনে নেবো।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَ الَّذِيْنَ جَاؤُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِيْنَ سَبَقُونَا بِالإِيْمَانِ، وَ لَا تَجْعَلْ فِي قُلُوْبِنَا غِلا لِلَّذِينَ آمَنُوْا، رَبَّنَا إِنَّكَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٍ অর্থাৎ যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে এবং যারা আমাদের পূর্বে খাঁটি ঈমান নিয়ে মৃত্যু বরণ করেছে তাদেরকে ক্ষমা করুন। হে প্রভু! আমাদের অন্তরে যেন কোন ঈমানদারের প্রতি সামান্যটুকু হিংসে-বিদ্বেষও না থাকে। নিশ্চয়ই আপনি পরম দয়ালু ও অত্যন্ত মেহেরবান।
৯. রাসূল ছবি তুলতে নিষেধ করেছেন। কারণ, ছবি তোলাই ছিলো মূর্তিপূজার প্রথম পর্যায়। শয়তান ইবলিস সর্ব প্রথম হযরত নূহ এর সম্প্রদায়কে তাদের নেককারদের ছবি এঁকে তাদের মজলিসে স্থাপন করতে পরামর্শ দেয়। যাতে করে তাদেরকে স্মরণ করা যায় এবং ইবাদাতের ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করা যায়। পরবর্তীতে সে ছবিগুলোর পূজা শুরু হয়ে যায় এবং তারা কারোর লাভ বা ক্ষতি করতে পারে এমনও মনে করা হয়। এ পরিণতির কথা চিন্তা করেই রাসূল ছবি তুলতে নিষেধ করেছেন এবং ছবি উত্তোলনকারীরাই কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি ভোগ করবে।
হযরত 'আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ أَشَدُّ النَّاسِ عَذَاباً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الَّذِيْنَ يُضَاهُوْنَ بِخَلْقِ اللَّهِ অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সর্ব কঠিন শাস্তির অধিকারী হবে ওরা যারা আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্টির ন্যায় কোন কিছু বানাতে চায়।
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস'উদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি নবী কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেনঃ إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَاباً عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُوْنَ অর্থাৎ নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সর্ব কঠিন শাস্তির অধিকারী হবে ওরা যারা (বিনা প্রয়োজনে) ছবি তোলে বা তৈরি করে।
হযরত 'আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি রাসূল কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেনঃ كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ ، يُجْعَلُ لَهُ بِكُلِّ صُوْرَةٍ صَوَّرَهَا نَفْسٌ فَتُعَذِّبُهُ فِي جَهَنَّمَ অর্থাৎ প্রত্যেক ছবিকার জাহান্নামী। প্রত্যেক ছবির পরিবর্তে তার জন্য একটি করে প্রাণী ঠিক করা হবে যে তাকে সর্বদা জাহান্নামের মধ্যে শাস্তি দিতে থাকবে।
হযরত 'আব্দুল্লাহ্ বিন্ 'আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি মুহাম্মাদ কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেনঃ مَنْ صَوَّرَ صُورَةً فِي الدُّنْيَا كُلَّفَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنْ يَنْفُخَ فِيْهَا الرُّوْحَ ، وَ لَيْسَ بِنَافِخِ অর্থাৎ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন ছবি এঁকেছে কিয়ামতের দিন তাকে এ ছবিগুলোতে রূহ্ দিতে বলা হবে। কিন্তু সে কখনোই তা করতে পারবে না।
হযরত 'আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল ইরশাদ করেনঃ إِنْ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّورِ يُعَذِّبُوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، يُقَالُ لَهُمْ: أَحْيُوْا مَا خَلَقْتُمْ ، وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ لَا تَدْخُلُ بَيْتًا فِيْهِ الصُّوْرَةُ অর্থাৎ নিশ্চয়ই এ সকল ছবিকারদেরকে কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা যা বানিয়েছো তাতে জীবন দাও। কিন্তু তারা কখনো তা করতে পারবে না। নিশ্চয়ই ফিরিস্তারা এমন ঘরে প্রবেশ করে না যে ঘরে ছবি রয়েছে।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি রাসূল কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ كَخَلْقِي ، فَلْيَخْلُقُوْا حَبَّةٌ ، وَلْيَخْلُقُوْا ذَرَّةً ، وَلْيَخْلُقُوْا شَعِيْرَةً অর্থাৎ ও ব্যক্তির ন্যায় জালিম আর কেউ হতে পারে না? যে আমার সৃষ্টির ন্যায় কোন কিছু বানাতে চায়। মূলতঃ সে কখনোই তা করতে পারবে না। যদি সে তা করতে পারবে বলে দাবি করে তাহলে সে যেন একটি দানা, একটি অণু-পরমাণু এবং একটি যব বানিয়ে দেখায়।
📄 জা'হির ও বা'তিন শব্দদ্বয়ের আবিষ্কার
ছ. জা'হির ও বা'তিনঃ
সূফীদের আক্বীদা-বিশ্বাস কোর'আন ও হাদীসের সরাসরি বিরোধী হওয়ার দরুন মানুষ যেন সেগুলো বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে পারে সে জন্য তারা বা'তিন শব্দের আবিষ্কার করে। তারা বলেঃ কুর'আন ও হাদীসের দু' ধরনের অর্থ রয়েছে। একটি জা'হিরী। আরেকটি বা'তিনী এবং বা'তিনী অর্থই মূল ও সঠিক অর্থ। তারা এ বলে দৃষ্টান্ত দেয় যে, জা'হিরী অর্থ খোসা বা খোলসের ন্যায় এবং বা'তিনী অর্থ সার, মজ্জা ও মূল শরীরের ন্যায়। জা'হিরী অর্থ আলিমরা জানে। কিন্তু বা'তিনী অর্থ শুধু ওলী-বুযুর্গরাই জানে। অন্য কেউ নয় এবং এ বা'তিনী জ্ঞান শুধুমাত্র কাশফ, মুরাক্বাবাহ্, মুশাহাদাহ্, ইল্হাম অথবা বুযুর্গদের ফয়েয বা সুদৃষ্টির মাধ্যমেই অর্জিত হয়। আর এ গুলোর মাধ্যমেই তারা শরীয়তের মনমতো অপব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। যেমনঃ তারা কোর'আন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেঃ وَ اعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ অর্থাৎ তুমি তোমার প্রভুর ইবাদাত করো এক্বীন বা মা'রিফাত হাসিল হওয়া পর্যন্ত। যখন মা'রিফাত হাসিল হয়ে যাবে তথা আল্লাহ্ তা'আলাকে চিনে যাবে তখন নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ও তিলাওয়াতের কোন প্রয়োজন হবেনা। অথচ মূল অর্থ এই যে, তুমি তোমার প্রভুর ইবাদাত করো মৃত্যু আসা পর্যন্ত। তেমনিভাবে তারা নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেঃ وَ قَضَى رَبُّكَ أَنْ لَا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ অর্থাৎ তোমরা যারই ইবাদাত করোনা কেন তা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদাত হিসেবেই গণ্য করা হবে। ব্যক্তি পূজা, পীর পূজা, কবর পূজা ও মূর্তি পূজা সবই আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদাত। প্রকাশ্যে অন্য কারোর ইবাদাত মনে হলেও তা তাঁরই ইবাদাত হিসেবে গণ্য করা হবে। অথচ মূল অর্থ এই যে, আপনার প্রভু এ বলে আদেশ করেছেন যে, তোমরা তিনি (আল্লাহ) ছাড়া অন্য কারোর ইবাদাত করবেনা।
তারা কালিমায়ে তাওহীদের অর্থ করতে গিয়ে বলে থাকে, দুনিয়াতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ্। তিনি ভিন্ন অন্য কিছু কল্পনাই করা যায়না।
সূফীরা কোন হালাল বস্তুকে হারাম এবং হারাম বস্তুকে হালাল করার জন্য বা'তিন শব্দ ছাড়াও আরো কিছু পরিভাষা আবাস্কিার করেছে যা নিম্নরূপঃ "অবস্থা", "জযবা", "পাগলামি", "মত্ততা", "চেতনা" ও "অবচেতনা"।
তারা আরো বলেঃ ঈমান বলতে আল্লাহ্ তা'আলার খাঁটি প্রেমকে বুঝানো হয়। আর নকল প্রেম ছাড়া খাঁটি প্রেম কখনো অর্জিত হয়না। তাই তারা নকল প্রেমের সকল উপকরণ তথা নাচ, গান, বাদ্য, সুর, তাল, মদ, গাঁজা, রূপ-সৌন্দর্য ও প্রেমের কাহিনী শুনে মত্ত হওয়াকে হালাল মনে করে।
📄 এ যুগের প্রশাসকবর্গ
৬. এ যুগের প্রশাসকবর্গঃ
পাক-ভারতে শির্ক ও বিদ'আত প্রচলনের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকেই এ কথা বলে থাকেন যে, ভারতবর্ষে ইসলাম পৌঁছে প্রথম হিজরী শতাব্দীর শেষ ভাগে। যখন হযরত মুহাম্মদ বিন্ ক্বাসিম (রাহিমাহুল্লাহ) ৯৩ হিজরী সনে সিন্ধু বিজয় করেন। সে সময় তিনি ও তাঁর সৈন্যরা ভারত থেকে তড়িঘড়ি চলে গিয়েছিলেন বলে কোর'আন ও হাদীস নির্ভরশীল খাঁটি ইসলাম প্রচার ও প্রসার লাভ করতে পারেনি। দ্বিতীয়তঃ ইসলামের এ দা'ওয়াত খুব সীমিত পরিসরে ছিলো বলে মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশই হিন্দু ও মুন্ত্রিকদের রীতি-নীতি চালু রয়েছে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণানুযায়ী এ কথা সঠিক নয়। বরং হযরত 'উমর ফারূক্ব এর যুগেই সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে ইসলাম প্রবেশ করে। হযরত 'উমর ফারুক ও হযরত 'উসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এর যুগে ইসলামী খিলাফতের অধীনে যে যে এলাকাগুলো ছিলো তন্মধ্যে শাম (বৃহত্তর সিরিয়া), মিশর, ইরাক, ইয়েমেন, তুর্কিস্তান, সমরকন্দ, বুখারা, তুরস্ক, আফ্রিকা এবং হিন্দুস্তানের মালাবার, মালদ্বীপ, চরণদ্বীপ, গুজরাত ও সিন্ধু এলাকা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। সে যুগে ভারতে আসা সাহাবাদের সংখ্যা ২৫, তাবিয়ীর সংখ্যা ৩৭ এবং তাবে তাবিয়ীনের সংখ্যা ১৫ জন ছিলো।
অতএব বলতে হবে, প্রথম হিজরী শতাব্দীর শুরুতেই ভারতবর্ষে খাঁটি ইসলাম পৌঁছে গেছে।
তবে ঐতিহাসিক একটি নিশ্চিত সত্য এই যে, যখনই কোন ঈমানদার ব্যক্তি ক্ষমতায় আরোহণ করে তখনই ইসলামের প্রচার-প্রসার ও মর্যাদা-সম্মান বৃদ্ধি পায়। উক্ত কারণেই হযরত মুহাম্মদ বিন্ ক্বাসিমের পর সুলতান সবক্তগীন, সুলতান মাহমুদ গজনভী, সুলতান শিহাবুদ্দীন মুহাম্মদ গুরীর যুগে (৯৮৬-১১৭৫ খ্রিঃ) ভারত উপমহাদেশে ইসলাম একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিলো। ঠিক এর বিপরীতেই যখন কোন মুলহিদ্ ও বেদ্বীন ব্যক্তি ক্ষমতায় আরোহণ করে তখন ইসলাম তারই কারণে লাঞ্ছিত ও পশ্চাৎপদ হতে বাধ্য। ভারত উপমহাদেশে এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে আকবরী যুগ। সে যুগে সরকারীভাবে মুসলমানদের জন্য কালিমা ঠিক করে দেয়া হলোঃ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ أَكْبَرُ خَلِيْفَةُ اللَّهِ অর্থাৎ আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই। আকবর বাদশাহ্ আল্লাহ্'র খলীফা। সে যুগে আকবরের দরবারে তার সম্মুখে সিজদাহ্ করা হতো, নবুওয়াত, ওহী, হাশর-নশর, জান্নাত-জাহান্নাম নিয়ে ঠাট্টা করা হতো। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ও অন্যান্য বিষয়ের উপর প্রকাশ্যভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করা হতো। সে যুগে সুদ, জুয়া, মদ ইত্যাদি হালাল করে দেয়া হয়েছিলো। শুকরকে পবিত্র পশু বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো। হিন্দুদের সন্তুষ্টির জন্য গরুর গোস্তকে হারাম করে দেয়া হয়েছিলো। দেয়ালী, রাখি, দশাবতার, পূর্ণিমা, শিবরাত্রির মতো হিন্দু আচার-অনুষ্ঠানগুলো সরকারীভাবে পালন করা হতো।
বর্তমান যুগের প্রশাসকরাও ইসলামের খিদমতের নামে শির্ক ও বিদ'আত বিস্তারে বিপুল সহযোগিতা করে যাচ্ছে। পীর ফকিরদের প্রতি অঢেল ভক্তি-শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হচ্ছে। তাদের মাযারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের ইসলাম বিধ্বংসী মুবারক দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। শুধু এতেই ক্ষান্ত নয়। বরং দু' একটি রাজনৈতিক দল ছাড়া প্রত্যেক ছোট-বড় রাজনৈতিক দলেরই এক একজন নির্দিষ্ট পীর সাহেব রয়েছেন। যাঁরা তাদেরকে নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে শির্ক ও বিদ'আতের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যেক জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে প্রতিটি দলই নিজ নিজ পীর সাহেবের দরবারে গিয়ে তাঁদের দো'আ ও বরকত হাসিল করে থাকে। আর যাঁদের নিজস্ব কোন পীর সাহেব নেই তারাও পীর ধরাকে ভালো চোখেই দেখে থাকেন। অথচ পীর ও ফকিররা বিশ্বের বুকে ইসলামের নামে এতো কঠিন কঠিন শির্ক ও বিদ'আত চালু করেছে যা অন্য কোন মানুষ কর্তৃক সম্ভব হয়নি।
📄 প্রচলিত ওয়ায মাহফিল
৭. প্রচলিত ওয়ায মাহফিলঃ
আমাদের দেশের সাধারণ ওয়ায মাহফিলগুলোও শির্ক এবং বিদ'আত বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ, কোর'আন ও হাদীস নির্ভরশীল ওয়াযের সংখ্যা খুবই কম। গণা কয়েকজন ছাড়া যে কোন ওয়ায়িয কোর'আন ও হাদীস সম্পর্কে আলোচনা না করে বরং বুযুর্গদের নামে বানানো কাহিনী বলতে খুবই পছন্দ করেন। যে গুলোর অধিকাংশই শির্ক ও বিদ'আত নির্ভরশীল। পীর সাহেবদের ওয়ায মাহফিলের তো কোন কথাই নেই। তা তো শির্ক ও বিদ'আতের বিশেষ আড্ডাই বলা চলে। তাতে শির্ক ও বিদ'আতের সরাসরি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তাই এক বাক্যে বলা চলে, বর্তমান যুগে কোর'আন ও হাদীস নির্ভরশীল ওয়াযের খুবই অকাল।