📄 ওস্তাদ নোমান আলী খান-এর জীবনী
কুরআন তার সৌন্দর্যে চিত্তবিমোহনকারী, শব্দের দিক থেকে বিমোহিতকারী, বাণীর দিক থেকে প্রবলতর শক্তিশালী, সংগতি ও ঐক্যতানের দিক থেকে মন্ত্রমুগ্ধকারী এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক থেকে অন্যকে হতবুদ্ধকারী।
উস্তাদ নোমান আলী খান আল-কুরআনের শব্দচয়ন, শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের সাথে বাস্তব উদাহরণ, বাক্যের ধরন-গঠন, উপমা, একটি সূরার সাথে অন্য সূরার সংগতি ও সেতুবন্ধন, প্রতিটির ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য অথচ একটি সাথে আরেকটির অর্থগত ও শাব্দিক তুলনায় কত মিল এবং আল-কুরআনের গভীর ব্যাখ্যা ইত্যাদি মুজিযাভিত্তিক ও অর্থের দিক থেকে চমৎকার আলোচনার জন্য সারা বিশ্বেই বেশ সমাদৃত। তাঁর কুরআনের আলোচনা এতটাই প্রিয় যে, সরাসরি অনলাইন ওয়েবিনারে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯০টিরও অধিক দেশের মানুষজন অংশগ্রহণ করেছিলেন।
কুরআনের চমৎকার শৈল্পিক সৌন্দর্য উপস্থাপনার জন্য তিনি বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের মুসলিম তরুণ প্রজন্মের কাছে এক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। কুরআনের শব্দচয়ন কতটা সৃজনশীল, ভাষা কতটা মনোমুগ্ধকর, অর্থ কতটা যৌক্তিক। এগুলোই নোমান আলী খানের চিন্তা-ভাবনা ও আলোচনার বিষয়। তাঁর বক্তব্যে কুরআনের অন্তর্গত সৌন্দর্য ও মুজিযা মানুষের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনার ও অনলাইনে তাঁর বক্তব্য শুনে অসংখ্য মানুষ ইসলামের দিকে ফিরে আসছে এবং ইসলাম গ্রহণ করছে। তিনি প্রায় ২০টিরও অধিক তাফসির গ্রন্থ পাঠ করেছেন। ফলে কুরআন নাজিলের ইতিহাস, শব্দচয়নের কারণ, ভাষার অলঙ্কার, অর্থের গভীরতা, যুক্তির প্রখরতা এবং ব্যাকরণগত শুদ্ধতার বিষয়গুলো তাঁর আলোচনায় ফুটে ওঠে। তাই অনেক ইসলামি স্কলার নোমান আলী খানকে আল কুরআনের ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এ ছাড়াও বিশ্বের ৫০০ প্রভাবশালী ইসলামি স্কলারের মাঝে তাঁর স্থান অন্যতম।
এ মানুষটি জন্মগ্রহণ করেন জার্মানির রাজধানী বার্লিন শহরে। কিন্তু শিশু নোমান সেখানে ছয় মাসও থাকেননি। তাঁর বাবা পাকিস্তান দূতাবাসে কাজ করতেন বলে পরিবারসহ ছয় মাস বয়সে তাঁকে পাকিস্তানে চলে আসতে হয়। এখানেও তাঁর পরিবার দুমাসের বেশি থাকেননি; চলে যান সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় রিয়াদে, একটি পাকিস্তানি উর্দু মিডিয়াম স্কুলে। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছয় বছর তাঁর পরিবার রিয়াদে অবস্থান করেন। এরপর তাঁরা চলে যান আমেরিকায়। সেখানে তিনি খ্রিষ্টানদের পরিচালিত একটি হাইস্কুলে ভর্তি হন।
ফলে সবকিছুই তাঁর কাছে ভিন্ন মনে হলো। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন পরিবেশ। বন্ধুরা সব ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন সংস্কৃতি লালন করে এবং চলাফেরা করে ভিন্নভাবে। এতে তাঁর কাছে অনেক অসহায় লেগেছিল তখন। প্রায় দুই বছর পর্যন্ত তিনি কোনো মুসলিমের দেখা পাননি। শুক্রবারে ক্লাস থাকায় দুই বছর তিনি জুমার সালাতও পড়তে পারেননি। অথচ তখন তিনি হাইস্কুলের ছাত্র। তাঁর বন্ধুদের আচার-আচরণের মধ্যে নৈতিকতা ও ধর্মের কোনো ছোঁয়া ছিল না। ফলে তিনিও ধীরে ধীরে তাদের আচার-আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁকে বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না; এমনকী তাঁর পরিবারও না। একসময় তাঁর মাঝে প্রবল অপরাধবোধ জেগে ওঠে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। হয় তাঁকে ধর্ম ত্যাগ করতে হবে, নাহয় স্কুল ত্যাগ করতে হবে। দুর্ভাগ্য, অন্য কোথাও ভালো স্কুল নেই বলে পরিবার তাঁকে স্কুল ত্যাগ করতে দিলো না। স্কুল শেষে তিনি কলেজে ভর্তি হলেন। আগের মতোই বন্ধুদের সাথে চলাফেরা, সবকিছু। এবার তিনি আস্ত নাস্তিক হয়ে গেলেন। প্রায় দুই বছর তিনি নাস্তিকতার চর্চা করেন। ইসলাম থেকে তখন তিনি অনেক অনেক দূরে চলে গেলেন।
তারপর সময় হলো ফিরে আসার। নোমান আলী খান ইসলামে ফিরে আসলেন আগের চেয়ে শতগুণ গতিতে। হঠাৎ একদিন আমেরিকান মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (MSA) দুজন সদস্যের সাথে তাঁর দেখা হয়।
তাঁরা নিজেদের মধ্যে কুরআনের আলোচনা করছিলেন; তিনি তা শুনছিলেন। যদিও এসব ধর্ম-কর্মের আলাপ তাঁর কাছে তখন ভালো লাগত না। তাঁরা নিজেরাই নোমান আলী খানের সাথে পরিচিত হলেন এবং ছায়ার মতো তাঁর সাথে চলাফেরা শুরু করলেন। তবে তাঁরা কখনো সরাসরি নোমান আলী খানকে কুরআন পড়তে কিংবা সালাত আদায় করতে বলেননি। এমনকী কখনো ইসলামের দাওয়াতও দেননি। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন তাঁরা নোমান আলী খানের সাথে সময় কাটাতে লাগলেন। এতেই নোমান আলী খানের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়।
একদিন তাঁদের একজন নোমান আলী খানের সামনে সালাত পড়লেন। নোমান আলী খানের কাছে খুব খারাপ লাগল। কারণ, তিনি সালাতের অনেক কিছুই ভুলে গেছেন দুই বছরের নাস্তিকতার কারণে; এমনকী মাগরিবের সালাত কয় রাকাত,
তিনি ভুলে গেছেন! নিজের অজান্তেই তিনি মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের এ দুজন ভাইকে বন্ধু ভাবতে লাগলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতেও লাগলেন। ধীরে ধীরে তাঁর অন্তরে ইসলাম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়তে থাকে। তিনি কুরআনের অনুবাদ পড়া শুরু করলেন। আল্লামা ইউসুফ আলীর ইংরেজি অনুবাদ পড়তে লাগলেন।
কিন্তু অনুবাদের মাধ্যমে কুরআন বোঝা খুবই কষ্টকর। কোথায় বাক্যের শুরু আর কোথায় বাক্যের শেষ- কিছুই তিনি বুঝতে পারছিলেন না। কেন আল্লাহ হঠাৎ করে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে চলে যান- এসব কিছুই তিনি অনুবাদ পড়ে বুঝতে পারেননি। তখন তিনি ভালোভাবে কুরআন বোঝার জন্য গুগল সার্চ করতে লাগলেন। ইন্টারনেটে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচুর লেকচার পেলেন, কিন্তু কুরআনের ধারাবাহিক কোনো আলোচনা তখনও তিনি পাননি।
কুরআনের ধারাবাহিক আলোচনা প্রথম তিনি শোনেন তাঁর মহল্লার একটি মসজিদে। রমজান মাস উপলক্ষ্যে সে মসজিদে পাকিস্তান থেকে একজন আলেম আসেন। তাঁর নাম ছিল ইমাম ডক্টর আব্দুস সামি। তিনি প্রতিদিন এক পারা করে কুরআনের অনুবাদ এবং সংক্ষিপ্ত তাফসির করতেন। সকালে দুই ঘণ্টা, বিকালে চার ঘণ্টা এবং তারাবির পর রাত ১০টা পর্যন্ত কুরআনের ধারাবাহিক আলোচনা হতো। নোমান আলী খান ডক্টর আব্দুস সামির সকল আলোচনায় অংশ নেন। এভাবে তিনি সম্পূর্ণ কুরআনের তাফসির শুনে শেষ করেন। কুরআনের এই ধারাবাহিক আলোচনা শুনে তাঁর কাছে মনে হয়েছে, তিনি এবারই প্রথম কুরআন শুনেছেন। এতে কুরআনের প্রতি তাঁর ভীষণ আগ্রহ জন্মে।
তিনি তাঁর উস্তাদ ডক্টর আব্দুস সামিকে বলেন, 'আপনি যেভাবে তাফসির করেছেন, আমিও সেভাবে তাফসির করতে চাই।' ডক্টর আব্দুস সামি তাঁকে বললেন- 'তাহলে আগে আরবি শেখো।' নোমান আলী খান তাঁকে বললেন, 'আমি থাকি নিউইয়র্কে, সারা দিন কাজ থাকে, কলেজে যেতে হয়, আমি কীভাবে সৌদি আরব গিয়ে আরবি শিখব?' ডক্টর আব্দুস সামি (এখনও জীবিত আছেন ও তাঁর একটা ফাউন্ডেশনও আছে পাকিস্তানে) তাঁকে বললেন- 'তুমি আগামী সপ্তাহ থেকে এ মসজিদে আমার আরবি ক্লাসে আসতে পারো'। এভাবে তিনি ডক্টর আব্দুস সামির কাছে আরবি শেখা শুরু করেন।
পরবর্তীকালে তিনি ডক্টর আব্দুস সামির ব্যাপারে স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'আমি তাঁর কাছে গিয়ে কুরআন তাফসির শুনতাম। আমার জীবনে এ রকম কুরআনের আলোচনা আমি শুনিনি। তাঁর আলোচনা শুনে মনে হতো, এই বুঝি এক্ষুনি কুরআন নাজিল হচ্ছে আমার ওপর, আমারই বিভিন্ন বিষয়ে। এতটাই জীবন্ত ছিল আল্লাহর বাণীর সেসব আলোচনা, এই তাফসিরই তাকে আরবি শেখার দিকে উদ্বুদ্ধ করে, আল্লাহর দিকে গভীরভাবে ফিরে আসতে সহায়তাস্বরূপ কাজ করে।
তিনি আরবি ব্যাকরণ শিখেন পাকিস্তানে। সেখানে তিনি ১৯৯৩ সালে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় জাতীয় পর্যায়ের মেধা তালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে স্থান দখল করেন।
কিন্তু আরবিতে তাঁর গভীর পড়াশোনা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডক্টর আব্দুস সামি-এর তত্ত্বাবধানে। ডক্টর আব্দুস সামি পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের কুরআন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, যিনি মাঝে মাঝে আমেরিকাতে যেতেন আরবি শিক্ষা এবং কুরঅনের তাফসিরের ওপরে গভীরতাপূর্ণ বক্তব্য রাখতে। তাঁর অধীনে পড়াশোনায় নোমান আলী খান আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের ওপরে তীক্ষ্ম এবং গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি পরবর্তীকালে ডক্টর আব্দুস সামির কাছে আরও উপকৃত হন তাঁর সম্পূর্ণ শিক্ষাদান পদ্ধতিকে আত্মস্থ করে। তিনি ডক্টর সামির করা কাজগুলোকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন; তাঁর নিজের ছাত্রদের উপকারের জন্য।
আরবি শেখা অবস্থায় তিনি ইন্টারনেটে খুঁজতে খুঁজতে একদিন পেয়ে গেলেন ড. তারিক আল-সোয়াইদানের কুরআনের মুজিযা বিষয়ক প্রায় ১৫ ঘণ্টার একটি ভিডিও সিরিজ আলোচনা। এটি ছিল আরবিতে। তিনি রাত-দিন এগুলো শুনতে থাকলেন, কিন্তু তেমন কিছুই বুঝতেন না। পরে সম্পূর্ণ লেকচারটা লিখে ফেললেন। অভিধান থেকে প্রত্যেকটি শব্দের অর্থ বের করলেন।
এভাবে আস্তে আস্তে তিনি আরবি লেকচার বুঝতে শুরু করলেন। এর কিছুদিন পর তিনি ইন্টারনেটে পেলেন শাইখ মুতাওল্লিকে। তাঁর লেকচারগুলো নোমান আলী খানকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে। এরপর পেলেন কুরআনের ওপর লেখা ডা. ফাদেল আল সামারাইয়ের বিভিন্ন বই ও বক্তৃতা। এগুলো পেয়ে তাঁর কাছে মনে হলো, তিনি জ্ঞানের সাগর পেয়ে গেছেন। তিনি এসব পড়তে ও শুনতে শুরু করলেন। একের পর এক স্কলারকে আবিষ্কার করলেন, আর তাঁদের থেকে জ্ঞান আহরণ করতে থাকলেন। দিনের পর দিন পরিশ্রম করলেন। নিজেকে নিজে বারবার বাধ্য করলেন- যেভাবেই হোক আরবি শিখতে হবে, আরবি বুঝতে হবে। মানুষ যা চায় তা-ই পায়। আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেছেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নোমান আলী খান আরবি ভাষা ও কুরআনের ওপর অসাধারণ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। চমৎকার উপস্থাপনা, যুক্তিযুক্ত কথা, সহজ-সরল পদ্ধতির কারণে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ আজ কুরআন শেখার জন্য তাঁর কাছে ভিড় করছে। কেবল অনলাইনে বর্তমানে ১০ হাজারেরও বেশি তরুণ তাঁর কাছে কুরআন ও আরবি ভাষা শিখছে।
আরবি ভাষায় কুরআন উপলব্ধির ব্যাপারে তিনি বলেন-
'কুরআনের এই অলৌকিকতার মাঝেই যে অনিন্দ্য হেদায়াত রয়েছে, শুধু কুরআনের অনুবাদ পড়ে কোনোভাবেই তা আহরণ করা সম্ভব নয়। কারণ, অনুবাদে আসতে পারে কিছুটা মেসেজ, কিন্তু আল্লাহর অলৌকিকত্ব ও তাঁর বাণীর যে গভীরতা, সেটা কোনোভাবেই আসে না।'
তিনি সিদ্ধান্ত নেন- যত কষ্ট করে তিনি ইসলাম ও কুরআন শিখেছেন, ততটা কষ্ট যাতে অন্য কোনো মুসলিমের করতে না হয়, সেজন্য তিনি অনলাইনে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। সিদ্ধান্তানুযায়ী ২০০৫ সালে তিনি বাইয়্যিনাহ ইন্সটিটিউট নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন এবং বাইয়্যিনাহ টিভি নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। এই সাইটে কুরআনের সৌন্দর্য, আরবি ভাষা ও ইসলামের ইতিহাসের ওপর বর্তমানে পাঁচ শতাধিক ভিডিও ক্লাস রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে বাইয়্যিনাহ টিভি নামে বিশ্বব্যাপী একটি চ্যানেলও চালু হবে। মূলত দুটো উদ্দেশ্যে তিনি এসব কাজ করছেন। প্রথমত, মানুষের জন্য আরবি ভাষাকে একেবারে সহজ করে তোলা; যাতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে কেউ ইচ্ছা করলেই আরবি ভাষায় দক্ষ হয়ে যেতে পারে। তিনি বাইয়্যিনাহ টিভিতে চমৎকার চমৎকার কিছু কৌশলে মানুষকে আরবি শেখান। যেহেতু তিনি অনেক সংগ্রাম করে আরবি শিখেছেন, তাই তিনি জানেন- কীভাবে শেখালে মানুষ তাড়াতাড়ি আরবি ভাষায় দক্ষ হতে পারে। তাঁর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো- মানুষকে কুরআনের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। তাঁর বিশ্বাস, মানুষকে আগে আরবি শেখানের ভয় দেখালে সে কখনো কুরআনের স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে না। তাই মানুষকে আগে কুরআনের স্বাদ পাইয়ে দিতে হবে। তারপর মানুষ নিজ থেকেই আরবি শিখতে চাইবে, যেমনটি স্বয়ং তাঁর নিজের ক্ষেত্রে ঘটেছে।
তিনি মনে করেন, তাঁর মতো লাখো তরুণ দিশেহারা হয়ে আছে। তাদের কাছে একবার যদি কুরআনের মুজিযা তুলে ধরা যায়, তাহলে তাদের জীবনই পরিবর্তন হয়ে যাবে।
অনেকে অভিযোগ করে, আধুনিক তরুণরা কুরআন পড়ে না, আরবি পড়তে চায় না। নোমান আলী খান এমন অভিযোগ করেন না। তাঁর কথা হলো- 'আমরা যদি তরুণদের জন্য আরবি ভাষাকে সহজ করে দিতে পারতাম, অবশ্যই তারা আরবি শিখত। আমরা যদি কুরআনকে তাদের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে পারতাম, অবশ্যই তারা তা গ্রহণ করত। কারণ, ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। সবাই বলে- আরবি ভাষা ও কুরআন শেখার জন্য আমার কাছে এসো, কিন্তু আমি নিজেই কুরআন শেখানোর জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে উপস্থিত হতে চাই।'
দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকলে শক্তিশালী লোহাতেও মরিচাতে পড়ে ক্ষয়ে যায়। একজন মুসলমানের ঈমানের যত্ন না নিলে তেমনি কালবের ওপরে প্রলেপ পড়ে যায়, নষ্ট হয়ে যেতে থাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস- আমাদের আত্মা। একটা প্র্যাকটিসিং মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও আমাদের অনেকেই ইসলাম থেকে, আল্লাহর ভালোবাসা থেকে দূরে সরে যায়। ফলে কোনো কাজেই শান্তি থাকে না, কোনো কিছুতেই স্বস্তি পাওয়া যায় না। জীবন তখন যেন ছন্নছাড়া হয়ে যায়। ফলে জীবনের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যায়।
এসব বিবেচনায় উস্তাদ নোমান আলী খানের লেকচারের মাঝে রয়েছে আত্মিক জ্ঞানের, আল্লাহর দ্বীন উপলব্ধির সুন্দরতম দিক; যেগুলো জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিক এবং অর্থপূর্ণ। ফলে এসব আলোচনার মাধ্যমে আমাদের আল্লাহকে ভুলে যাওয়া ক্ষুদ্র আত্মা এক অন্য দিগন্তের খোঁজ পায়, আল্লাহর দিকে পুনরায় ফিরে আসার প্রেরণা জোগায়।
উস্তাদ নোমান আলী খানের অনন্য বিশেষত্ব কী? দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুই মনে হয়- এটা কেন এমন, ওটা কেন অমন হয়, কেন এসব এমন হয় না, সবকিছু এ রকম কেন হয় টাইপের। এটা নিশ্চিত যে, এসবের পরিষ্কার উত্তর আমাদের রব আল্লাহ তায়ালার দেওয়া জীবনবিধানে পরিষ্কারভাবেই আছে।
কিন্তু সেগুলো কীভাবে বুঝতে হয়, সেগুলোর গূঢ় কারণ কী? কীভাবে মনের এই সময়গুলোকে 'ডিল' করতে হয়, তা আমাদের মতো অধিকাংশদের কাছেই অজানা। এসব প্রশ্নগুলো দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির যার সাথে আত্মিক বিশ্বাস যুক্ত- এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর যারা অমন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। কিন্তু নোমান আলী খানের লেকচারে সেসবের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক উত্তর রয়েছে। ফলে আমাদের মতো যুবকদের মনে জেগে উঠা সাধারণ ও সমস্যামূলক অনেক জিজ্ঞাসার অসাধারণ সুন্দর সমাধান পাওয়া যায় উস্তাদের কথায়।
আমাদের অনেকেরই জীবনের একটা বাস্তব অথচ অমসৃণ অভিজ্ঞতা হলো, সাধারণত কিশোর-তরুণরা গড়ে উঠার সময়ে মনে মনে দ্বীন-ইসলামসংক্রান্ত প্রচুর প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। হতে পারে সেটা পর্দা নিয়ে, কোনো ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন নিয়ে, ফিকহ অথবা ধর্মীয় তত্ত্বসংক্রান্ত প্রশ্ন, হয়তো কোনো অশ্লীল বিষয়কে কীভাবে ডিল করতে হবে তা নিয়ে, অথবা কীভাবে দান করতে হয়, নিয়াত কেমন থাকা উচিত- এ রকম হাজারো প্রশ্নের উত্তর জানতে ইচ্ছে করে। অথচ এই বিশ্বাসী তরুণ-তরুণীরা উত্তর না পেয়ে শেষে ভুল করতে থাকে। একদিন হয়তো তাদের ইচ্ছেটাই হারিয়ে যায়... কুরআনের স্বতঃস্ফূর্ত পড়াশোনা, ইসলামকে তরুণ প্রজন্মের কাছে সুন্দর করে উপস্থাপনার আয়োজন বাংলাদেশে, আমাদের সমাজে খুবই কম। এই অদ্ভুত অবস্থায় আমার মতো ছেলেদের জন্য অশেষ রহমত অনলাইনের রিসোর্সে পাওয়া স্কলাররা- যারা তরুণ প্রজন্মের সাথে খোলামেলা আলাপ করেন, কীভাবে চিন্তা করতে হবে শেখান, কীভাবে ভাবতে হয় সেটা শেখান। আর সেগুলোর ভিডিও অ্যাভেইলেবল পাওয়া যায় ইন্টারনেটে। এসবের মাঝে উস্তাদ একজন অন্যতম শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন। বস্তুত হেদায়াতের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা।
উস্তাদ নোমান আলী খানের বক্তব্যের সুন্দর দিক হলো- তিনি সাধারণ আর সরল ভাষায় তরুণদের বোধগম্য হওয়ার মতো করে বিষয়গুলো আলোচনা করেন।
তার একেকটা লেকচার শোনার পর ওই বিষয়ক খটকা এবং প্রশ্ন থাকে না এবং পালন করার ব্যাপারে সন্দেহ আর অজুহাত থাকে না। এইটুকু বুঝতে হলে হয়তো আমাদেরকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়তে হতো। এই সহজ-সরল অথচ গভীর ও বহুমুখী প্রজ্ঞার কারণে আমাদেরকে আল্লাহর বাণী আরও কাছে টানে, আল্লাহর দ্বীন পালনে নিজেদের আরও উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।
উস্তাদ নিজেই একটি ঘটনা তুলে ধরেছিলেন, যেখানে আমরা উস্তাদের আল্লাহর বাণী আল-কুরআন মাজিদের আলোচনায় তার অনন্যতা উঠে আসে।
তিনি বলেন, অনেক মা তাদের সন্তানকে জোর করে তাঁর লেকচার ও সেমিনারে পাঠান বা নিজে নিয়ে আসেন, যাতে করে তারা তাঁর লেকচার শুনতে পারে এবং ইসলামের পথে আসতে পারে। কিন্তু একবার যখন উস্তাদের কুরআনের আলোচনা শুনে, এরপর অনেকেই আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেছেন- 'আমি যেন এই জীবনে এই প্রথম আল্লাহর বাণী শ্রবণ করলাম!' এত গভীর ও অলৌকিকতার সহিত এর আগে আমি আর কখনোও শুনিনি। এরপর থেকে নিজেরাই আসত! কী অসাধারণ চমৎকারিত্বের বর্ণনা হলে এই সব প্রায় বখে যাওয়া, ইসলামের প্রতি অনীহাপ্রবণ ছেলেমেয়েরা নিজ ইচ্ছায় আসে ও অন্যদের নিয়ে আসে উস্তাদ নোমান আলী খানের সেমিনার ও লেকচার শুনতে!
মুসলিম উম্মাহর ব্যাপারে অনেকে যেখানে কেবল অভিযোগ আর সমস্যা চিহ্নিত করে, সেখানে নোমান আলী দেখেন সম্ভাবনা ও স্বপ্নের দ্বার। তিনি তরুণদের মাঝে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা দেখতে পান। উম্মাহর ৭০ ভাগ তরুণকে যদি কেবল সঠিক অনুপ্রেরণা দেওয়া যায়, তাঁর বিশ্বাস, বিশ্বের চেহারাটাই পালটে যাবে। তিনি মনে করেন- মুসলিমদের দায়িত্ব হলো কেবল তরুণদের কাছে উন্নত ও সহজ পদ্ধতিতে কুরআনের বাণী পৌছে দেওয়া; বাকি দায়িত্ব আল্লাহর। তিনিই সব করবেন। একই মাটিতে একই বৃষ্টির পানি পড়ার পরও যেভাবে ভিন্ন ভিন্ন ফুলের জন্ম হয়, একই ওহি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে সে রকম হাজার রকমের সম্ভাবনা ও পরিবর্তনের সূচনা হবে। নোমান আলী খানের চিন্তাভাবনা সব তরুণদের জন্যই। এ কারণেই সম্ভবত সারা পৃথিবীর তরুণরা নোমান আলী খানকে তাদের জন্য আদর্শ মনে করে। তাঁর বক্তব্যগুলো সারা বিশ্বের তরুণদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, বিশ্বের নানা প্রান্তের তরুণরা তাদের নিজেদের ভাষায় নোমান আলী খানের বক্তব্যগুলো ভাষান্তরিত করছে। বাংলা ভাষায় তাঁর ১০০ টিরও অধিক বক্তৃতা ডাবিং, সাবটাইটেল, নোট এবং আর্টিকেল হিসেবে পরিবেশন করেছে আমাদের NAK Bangla ওয়েবসাইট। আল-কুরআনকে দর্শকদের সামনে জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে সত্যিই নোমান আলী খান এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব এবং একটি অসাধারণ প্রতিষ্ঠান।
কুরআন তার সৌন্দর্যে চিত্তবিমোহনকারী, শব্দের দিক থেকে বিমোহিতকারী, বাণীর দিক থেকে প্রবলতর শক্তিশালী, সংগতি ও ঐক্যতানের দিক থেকে মন্ত্রমুগ্ধকারী এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক থেকে অন্যকে হতবুদ্ধকারী।
উস্তাদ নোমান আলী খান আল-কুরআনের শব্দচয়ন, শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের সাথে বাস্তব উদাহরণ, বাক্যের ধরন-গঠন, উপমা, একটি সূরার সাথে অন্য সূরার সংগতি ও সেতুবন্ধন, প্রতিটির ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য অথচ একটি সাথে আরেকটির অর্থগত ও শাব্দিক তুলনায় কত মিল এবং আল-কুরআনের গভীর ব্যাখ্যা ইত্যাদি মুজিযাভিত্তিক ও অর্থের দিক থেকে চমৎকার আলোচনার জন্য সারা বিশ্বেই বেশ সমাদৃত। তাঁর কুরআনের আলোচনা এতটাই প্রিয় যে, সরাসরি অনলাইন ওয়েবিনারে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯০টিরও অধিক দেশের মানুষজন অংশগ্রহণ করেছিলেন।
কুরআনের চমৎকার শৈল্পিক সৌন্দর্য উপস্থাপনার জন্য তিনি বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের মুসলিম তরুণ প্রজন্মের কাছে এক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। কুরআনের শব্দচয়ন কতটা সৃজনশীল, ভাষা কতটা মনোমুগ্ধকর, অর্থ কতটা যৌক্তিক। এগুলোই নোমান আলী খানের চিন্তা-ভাবনা ও আলোচনার বিষয়। তাঁর বক্তব্যে কুরআনের অন্তর্গত সৌন্দর্য ও মুজিযা মানুষের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনার ও অনলাইনে তাঁর বক্তব্য শুনে অসংখ্য মানুষ ইসলামের দিকে ফিরে আসছে এবং ইসলাম গ্রহণ করছে। তিনি প্রায় ২০টিরও অধিক তাফসির গ্রন্থ পাঠ করেছেন। ফলে কুরআন নাজিলের ইতিহাস, শব্দচয়নের কারণ, ভাষার অলঙ্কার, অর্থের গভীরতা, যুক্তির প্রখরতা এবং ব্যাকরণগত শুদ্ধতার বিষয়গুলো তাঁর আলোচনায় ফুটে ওঠে। তাই অনেক ইসলামি স্কলার নোমান আলী খানকে আল কুরআনের ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এ ছাড়াও বিশ্বের ৫০০ প্রভাবশালী ইসলামি স্কলারের মাঝে তাঁর স্থান অন্যতম।
এ মানুষটি জন্মগ্রহণ করেন জার্মানির রাজধানী বার্লিন শহরে। কিন্তু শিশু নোমান সেখানে ছয় মাসও থাকেননি। তাঁর বাবা পাকিস্তান দূতাবাসে কাজ করতেন বলে পরিবারসহ ছয় মাস বয়সে তাঁকে পাকিস্তানে চলে আসতে হয়। এখানেও তাঁর পরিবার দুমাসের বেশি থাকেননি; চলে যান সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় রিয়াদে, একটি পাকিস্তানি উর্দু মিডিয়াম স্কুলে। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছয় বছর তাঁর পরিবার রিয়াদে অবস্থান করেন। এরপর তাঁরা চলে যান আমেরিকায়। সেখানে তিনি খ্রিষ্টানদের পরিচালিত একটি হাইস্কুলে ভর্তি হন।
ফলে সবকিছুই তাঁর কাছে ভিন্ন মনে হলো। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন পরিবেশ। বন্ধুরা সব ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন সংস্কৃতি লালন করে এবং চলাফেরা করে ভিন্নভাবে। এতে তাঁর কাছে অনেক অসহায় লেগেছিল তখন। প্রায় দুই বছর পর্যন্ত তিনি কোনো মুসলিমের দেখা পাননি। শুক্রবারে ক্লাস থাকায় দুই বছর তিনি জুমার সালাতও পড়তে পারেননি। অথচ তখন তিনি হাইস্কুলের ছাত্র। তাঁর বন্ধুদের আচার-আচরণের মধ্যে নৈতিকতা ও ধর্মের কোনো ছোঁয়া ছিল না। ফলে তিনিও ধীরে ধীরে তাদের আচার-আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁকে বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না; এমনকী তাঁর পরিবারও না। একসময় তাঁর মাঝে প্রবল অপরাধবোধ জেগে ওঠে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। হয় তাঁকে ধর্ম ত্যাগ করতে হবে, নাহয় স্কুল ত্যাগ করতে হবে। দুর্ভাগ্য, অন্য কোথাও ভালো স্কুল নেই বলে পরিবার তাঁকে স্কুল ত্যাগ করতে দিলো না। স্কুল শেষে তিনি কলেজে ভর্তি হলেন। আগের মতোই বন্ধুদের সাথে চলাফেরা, সবকিছু। এবার তিনি আস্ত নাস্তিক হয়ে গেলেন। প্রায় দুই বছর তিনি নাস্তিকতার চর্চা করেন। ইসলাম থেকে তখন তিনি অনেক অনেক দূরে চলে গেলেন।
তারপর সময় হলো ফিরে আসার। নোমান আলী খান ইসলামে ফিরে আসলেন আগের চেয়ে শতগুণ গতিতে। হঠাৎ একদিন আমেরিকান মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (MSA) দুজন সদস্যের সাথে তাঁর দেখা হয়।
তাঁরা নিজেদের মধ্যে কুরআনের আলোচনা করছিলেন; তিনি তা শুনছিলেন। যদিও এসব ধর্ম-কর্মের আলাপ তাঁর কাছে তখন ভালো লাগত না। তাঁরা নিজেরাই নোমান আলী খানের সাথে পরিচিত হলেন এবং ছায়ার মতো তাঁর সাথে চলাফেরা শুরু করলেন। তবে তাঁরা কখনো সরাসরি নোমান আলী খানকে কুরআন পড়তে কিংবা সালাত আদায় করতে বলেননি। এমনকী কখনো ইসলামের দাওয়াতও দেননি। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন তাঁরা নোমান আলী খানের সাথে সময় কাটাতে লাগলেন। এতেই নোমান আলী খানের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়।
একদিন তাঁদের একজন নোমান আলী খানের সামনে সালাত পড়লেন। নোমান আলী খানের কাছে খুব খারাপ লাগল। কারণ, তিনি সালাতের অনেক কিছুই ভুলে গেছেন দুই বছরের নাস্তিকতার কারণে; এমনকী মাগরিবের সালাত কয় রাকাত,
তিনি ভুলে গেছেন! নিজের অজান্তেই তিনি মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের এ দুজন ভাইকে বন্ধু ভাবতে লাগলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতেও লাগলেন। ধীরে ধীরে তাঁর অন্তরে ইসলাম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়তে থাকে। তিনি কুরআনের অনুবাদ পড়া শুরু করলেন। আল্লামা ইউসুফ আলীর ইংরেজি অনুবাদ পড়তে লাগলেন।
কিন্তু অনুবাদের মাধ্যমে কুরআন বোঝা খুবই কষ্টকর। কোথায় বাক্যের শুরু আর কোথায় বাক্যের শেষ- কিছুই তিনি বুঝতে পারছিলেন না। কেন আল্লাহ হঠাৎ করে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে চলে যান- এসব কিছুই তিনি অনুবাদ পড়ে বুঝতে পারেননি। তখন তিনি ভালোভাবে কুরআন বোঝার জন্য গুগল সার্চ করতে লাগলেন। ইন্টারনেটে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচুর লেকচার পেলেন, কিন্তু কুরআনের ধারাবাহিক কোনো আলোচনা তখনও তিনি পাননি।
কুরআনের ধারাবাহিক আলোচনা প্রথম তিনি শোনেন তাঁর মহল্লার একটি মসজিদে। রমজান মাস উপলক্ষ্যে সে মসজিদে পাকিস্তান থেকে একজন আলেম আসেন। তাঁর নাম ছিল ইমাম ডক্টর আব্দুস সামি। তিনি প্রতিদিন এক পারা করে কুরআনের অনুবাদ এবং সংক্ষিপ্ত তাফসির করতেন। সকালে দুই ঘণ্টা, বিকালে চার ঘণ্টা এবং তারাবির পর রাত ১০টা পর্যন্ত কুরআনের ধারাবাহিক আলোচনা হতো। নোমান আলী খান ডক্টর আব্দুস সামির সকল আলোচনায় অংশ নেন। এভাবে তিনি সম্পূর্ণ কুরআনের তাফসির শুনে শেষ করেন। কুরআনের এই ধারাবাহিক আলোচনা শুনে তাঁর কাছে মনে হয়েছে, তিনি এবারই প্রথম কুরআন শুনেছেন। এতে কুরআনের প্রতি তাঁর ভীষণ আগ্রহ জন্মে।
তিনি তাঁর উস্তাদ ডক্টর আব্দুস সামিকে বলেন, 'আপনি যেভাবে তাফসির করেছেন, আমিও সেভাবে তাফসির করতে চাই।' ডক্টর আব্দুস সামি তাঁকে বললেন- 'তাহলে আগে আরবি শেখো।' নোমান আলী খান তাঁকে বললেন, 'আমি থাকি নিউইয়র্কে, সারা দিন কাজ থাকে, কলেজে যেতে হয়, আমি কীভাবে সৌদি আরব গিয়ে আরবি শিখব?' ডক্টর আব্দুস সামি (এখনও জীবিত আছেন ও তাঁর একটা ফাউন্ডেশনও আছে পাকিস্তানে) তাঁকে বললেন- 'তুমি আগামী সপ্তাহ থেকে এ মসজিদে আমার আরবি ক্লাসে আসতে পারো'। এভাবে তিনি ডক্টর আব্দুস সামির কাছে আরবি শেখা শুরু করেন।
পরবর্তীকালে তিনি ডক্টর আব্দুস সামির ব্যাপারে স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'আমি তাঁর কাছে গিয়ে কুরআন তাফসির শুনতাম। আমার জীবনে এ রকম কুরআনের আলোচনা আমি শুনিনি। তাঁর আলোচনা শুনে মনে হতো, এই বুঝি এক্ষুনি কুরআন নাজিল হচ্ছে আমার ওপর, আমারই বিভিন্ন বিষয়ে। এতটাই জীবন্ত ছিল আল্লাহর বাণীর সেসব আলোচনা, এই তাফসিরই তাকে আরবি শেখার দিকে উদ্বুদ্ধ করে, আল্লাহর দিকে গভীরভাবে ফিরে আসতে সহায়তাস্বরূপ কাজ করে।
তিনি আরবি ব্যাকরণ শিখেন পাকিস্তানে। সেখানে তিনি ১৯৯৩ সালে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় জাতীয় পর্যায়ের মেধা তালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে স্থান দখল করেন।
কিন্তু আরবিতে তাঁর গভীর পড়াশোনা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডক্টর আব্দুস সামি-এর তত্ত্বাবধানে। ডক্টর আব্দুস সামি পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের কুরআন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, যিনি মাঝে মাঝে আমেরিকাতে যেতেন আরবি শিক্ষা এবং কুরঅনের তাফসিরের ওপরে গভীরতাপূর্ণ বক্তব্য রাখতে। তাঁর অধীনে পড়াশোনায় নোমান আলী খান আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের ওপরে তীক্ষ্ম এবং গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি পরবর্তীকালে ডক্টর আব্দুস সামির কাছে আরও উপকৃত হন তাঁর সম্পূর্ণ শিক্ষাদান পদ্ধতিকে আত্মস্থ করে। তিনি ডক্টর সামির করা কাজগুলোকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন; তাঁর নিজের ছাত্রদের উপকারের জন্য।
আরবি শেখা অবস্থায় তিনি ইন্টারনেটে খুঁজতে খুঁজতে একদিন পেয়ে গেলেন ড. তারিক আল-সোয়াইদানের কুরআনের মুজিযা বিষয়ক প্রায় ১৫ ঘণ্টার একটি ভিডিও সিরিজ আলোচনা। এটি ছিল আরবিতে। তিনি রাত-দিন এগুলো শুনতে থাকলেন, কিন্তু তেমন কিছুই বুঝতেন না। পরে সম্পূর্ণ লেকচারটা লিখে ফেললেন। অভিধান থেকে প্রত্যেকটি শব্দের অর্থ বের করলেন।
এভাবে আস্তে আস্তে তিনি আরবি লেকচার বুঝতে শুরু করলেন। এর কিছুদিন পর তিনি ইন্টারনেটে পেলেন শাইখ মুতাওল্লিকে। তাঁর লেকচারগুলো নোমান আলী খানকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে। এরপর পেলেন কুরআনের ওপর লেখা ডা. ফাদেল আল সামারাইয়ের বিভিন্ন বই ও বক্তৃতা। এগুলো পেয়ে তাঁর কাছে মনে হলো, তিনি জ্ঞানের সাগর পেয়ে গেছেন। তিনি এসব পড়তে ও শুনতে শুরু করলেন। একের পর এক স্কলারকে আবিষ্কার করলেন, আর তাঁদের থেকে জ্ঞান আহরণ করতে থাকলেন। দিনের পর দিন পরিশ্রম করলেন। নিজেকে নিজে বারবার বাধ্য করলেন- যেভাবেই হোক আরবি শিখতে হবে, আরবি বুঝতে হবে। মানুষ যা চায় তা-ই পায়। আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেছেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নোমান আলী খান আরবি ভাষা ও কুরআনের ওপর অসাধারণ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। চমৎকার উপস্থাপনা, যুক্তিযুক্ত কথা, সহজ-সরল পদ্ধতির কারণে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ আজ কুরআন শেখার জন্য তাঁর কাছে ভিড় করছে। কেবল অনলাইনে বর্তমানে ১০ হাজারেরও বেশি তরুণ তাঁর কাছে কুরআন ও আরবি ভাষা শিখছে।
আরবি ভাষায় কুরআন উপলব্ধির ব্যাপারে তিনি বলেন-
'কুরআনের এই অলৌকিকতার মাঝেই যে অনিন্দ্য হেদায়াত রয়েছে, শুধু কুরআনের অনুবাদ পড়ে কোনোভাবেই তা আহরণ করা সম্ভব নয়। কারণ, অনুবাদে আসতে পারে কিছুটা মেসেজ, কিন্তু আল্লাহর অলৌকিকত্ব ও তাঁর বাণীর যে গভীরতা, সেটা কোনোভাবেই আসে না।'
তিনি সিদ্ধান্ত নেন- যত কষ্ট করে তিনি ইসলাম ও কুরআন শিখেছেন, ততটা কষ্ট যাতে অন্য কোনো মুসলিমের করতে না হয়, সেজন্য তিনি অনলাইনে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। সিদ্ধান্তানুযায়ী ২০০৫ সালে তিনি বাইয়্যিনাহ ইন্সটিটিউট নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন এবং বাইয়্যিনাহ টিভি নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। এই সাইটে কুরআনের সৌন্দর্য, আরবি ভাষা ও ইসলামের ইতিহাসের ওপর বর্তমানে পাঁচ শতাধিক ভিডিও ক্লাস রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে বাইয়্যিনাহ টিভি নামে বিশ্বব্যাপী একটি চ্যানেলও চালু হবে। মূলত দুটো উদ্দেশ্যে তিনি এসব কাজ করছেন। প্রথমত, মানুষের জন্য আরবি ভাষাকে একেবারে সহজ করে তোলা; যাতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে কেউ ইচ্ছা করলেই আরবি ভাষায় দক্ষ হয়ে যেতে পারে। তিনি বাইয়্যিনাহ টিভিতে চমৎকার চমৎকার কিছু কৌশলে মানুষকে আরবি শেখান। যেহেতু তিনি অনেক সংগ্রাম করে আরবি শিখেছেন, তাই তিনি জানেন- কীভাবে শেখালে মানুষ তাড়াতাড়ি আরবি ভাষায় দক্ষ হতে পারে। তাঁর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো- মানুষকে কুরআনের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। তাঁর বিশ্বাস, মানুষকে আগে আরবি শেখানের ভয় দেখালে সে কখনো কুরআনের স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে না। তাই মানুষকে আগে কুরআনের স্বাদ পাইয়ে দিতে হবে। তারপর মানুষ নিজ থেকেই আরবি শিখতে চাইবে, যেমনটি স্বয়ং তাঁর নিজের ক্ষেত্রে ঘটেছে।
তিনি মনে করেন, তাঁর মতো লাখো তরুণ দিশেহারা হয়ে আছে। তাদের কাছে একবার যদি কুরআনের মুজিযা তুলে ধরা যায়, তাহলে তাদের জীবনই পরিবর্তন হয়ে যাবে।
অনেকে অভিযোগ করে, আধুনিক তরুণরা কুরআন পড়ে না, আরবি পড়তে চায় না। নোমান আলী খান এমন অভিযোগ করেন না। তাঁর কথা হলো- 'আমরা যদি তরুণদের জন্য আরবি ভাষাকে সহজ করে দিতে পারতাম, অবশ্যই তারা আরবি শিখত। আমরা যদি কুরআনকে তাদের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে পারতাম, অবশ্যই তারা তা গ্রহণ করত। কারণ, ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। সবাই বলে- আরবি ভাষা ও কুরআন শেখার জন্য আমার কাছে এসো, কিন্তু আমি নিজেই কুরআন শেখানোর জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে উপস্থিত হতে চাই।'
দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকলে শক্তিশালী লোহাতেও মরিচাতে পড়ে ক্ষয়ে যায়। একজন মুসলমানের ঈমানের যত্ন না নিলে তেমনি কালবের ওপরে প্রলেপ পড়ে যায়, নষ্ট হয়ে যেতে থাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস- আমাদের আত্মা। একটা প্র্যাকটিসিং মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও আমাদের অনেকেই ইসলাম থেকে, আল্লাহর ভালোবাসা থেকে দূরে সরে যায়। ফলে কোনো কাজেই শান্তি থাকে না, কোনো কিছুতেই স্বস্তি পাওয়া যায় না। জীবন তখন যেন ছন্নছাড়া হয়ে যায়। ফলে জীবনের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যায়।
এসব বিবেচনায় উস্তাদ নোমান আলী খানের লেকচারের মাঝে রয়েছে আত্মিক জ্ঞানের, আল্লাহর দ্বীন উপলব্ধির সুন্দরতম দিক; যেগুলো জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিক এবং অর্থপূর্ণ। ফলে এসব আলোচনার মাধ্যমে আমাদের আল্লাহকে ভুলে যাওয়া ক্ষুদ্র আত্মা এক অন্য দিগন্তের খোঁজ পায়, আল্লাহর দিকে পুনরায় ফিরে আসার প্রেরণা জোগায়।
উস্তাদ নোমান আলী খানের অনন্য বিশেষত্ব কী? দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুই মনে হয়- এটা কেন এমন, ওটা কেন অমন হয়, কেন এসব এমন হয় না, সবকিছু এ রকম কেন হয় টাইপের। এটা নিশ্চিত যে, এসবের পরিষ্কার উত্তর আমাদের রব আল্লাহ তায়ালার দেওয়া জীবনবিধানে পরিষ্কারভাবেই আছে।
কিন্তু সেগুলো কীভাবে বুঝতে হয়, সেগুলোর গূঢ় কারণ কী? কীভাবে মনের এই সময়গুলোকে 'ডিল' করতে হয়, তা আমাদের মতো অধিকাংশদের কাছেই অজানা। এসব প্রশ্নগুলো দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির যার সাথে আত্মিক বিশ্বাস যুক্ত- এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর যারা অমন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। কিন্তু নোমান আলী খানের লেকচারে সেসবের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক উত্তর রয়েছে। ফলে আমাদের মতো যুবকদের মনে জেগে উঠা সাধারণ ও সমস্যামূলক অনেক জিজ্ঞাসার অসাধারণ সুন্দর সমাধান পাওয়া যায় উস্তাদের কথায়।
আমাদের অনেকেরই জীবনের একটা বাস্তব অথচ অমসৃণ অভিজ্ঞতা হলো, সাধারণত কিশোর-তরুণরা গড়ে উঠার সময়ে মনে মনে দ্বীন-ইসলামসংক্রান্ত প্রচুর প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। হতে পারে সেটা পর্দা নিয়ে, কোনো ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন নিয়ে, ফিকহ অথবা ধর্মীয় তত্ত্বসংক্রান্ত প্রশ্ন, হয়তো কোনো অশ্লীল বিষয়কে কীভাবে ডিল করতে হবে তা নিয়ে, অথবা কীভাবে দান করতে হয়, নিয়াত কেমন থাকা উচিত- এ রকম হাজারো প্রশ্নের উত্তর জানতে ইচ্ছে করে। অথচ এই বিশ্বাসী তরুণ-তরুণীরা উত্তর না পেয়ে শেষে ভুল করতে থাকে। একদিন হয়তো তাদের ইচ্ছেটাই হারিয়ে যায়... কুরআনের স্বতঃস্ফূর্ত পড়াশোনা, ইসলামকে তরুণ প্রজন্মের কাছে সুন্দর করে উপস্থাপনার আয়োজন বাংলাদেশে, আমাদের সমাজে খুবই কম। এই অদ্ভুত অবস্থায় আমার মতো ছেলেদের জন্য অশেষ রহমত অনলাইনের রিসোর্সে পাওয়া স্কলাররা- যারা তরুণ প্রজন্মের সাথে খোলামেলা আলাপ করেন, কীভাবে চিন্তা করতে হবে শেখান, কীভাবে ভাবতে হয় সেটা শেখান। আর সেগুলোর ভিডিও অ্যাভেইলেবল পাওয়া যায় ইন্টারনেটে। এসবের মাঝে উস্তাদ একজন অন্যতম শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন। বস্তুত হেদায়াতের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা।
উস্তাদ নোমান আলী খানের বক্তব্যের সুন্দর দিক হলো- তিনি সাধারণ আর সরল ভাষায় তরুণদের বোধগম্য হওয়ার মতো করে বিষয়গুলো আলোচনা করেন।
তার একেকটা লেকচার শোনার পর ওই বিষয়ক খটকা এবং প্রশ্ন থাকে না এবং পালন করার ব্যাপারে সন্দেহ আর অজুহাত থাকে না। এইটুকু বুঝতে হলে হয়তো আমাদেরকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়তে হতো। এই সহজ-সরল অথচ গভীর ও বহুমুখী প্রজ্ঞার কারণে আমাদেরকে আল্লাহর বাণী আরও কাছে টানে, আল্লাহর দ্বীন পালনে নিজেদের আরও উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।
উস্তাদ নিজেই একটি ঘটনা তুলে ধরেছিলেন, যেখানে আমরা উস্তাদের আল্লাহর বাণী আল-কুরআন মাজিদের আলোচনায় তার অনন্যতা উঠে আসে।
তিনি বলেন, অনেক মা তাদের সন্তানকে জোর করে তাঁর লেকচার ও সেমিনারে পাঠান বা নিজে নিয়ে আসেন, যাতে করে তারা তাঁর লেকচার শুনতে পারে এবং ইসলামের পথে আসতে পারে। কিন্তু একবার যখন উস্তাদের কুরআনের আলোচনা শুনে, এরপর অনেকেই আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেছেন- 'আমি যেন এই জীবনে এই প্রথম আল্লাহর বাণী শ্রবণ করলাম!' এত গভীর ও অলৌকিকতার সহিত এর আগে আমি আর কখনোও শুনিনি। এরপর থেকে নিজেরাই আসত! কী অসাধারণ চমৎকারিত্বের বর্ণনা হলে এই সব প্রায় বখে যাওয়া, ইসলামের প্রতি অনীহাপ্রবণ ছেলেমেয়েরা নিজ ইচ্ছায় আসে ও অন্যদের নিয়ে আসে উস্তাদ নোমান আলী খানের সেমিনার ও লেকচার শুনতে!
মুসলিম উম্মাহর ব্যাপারে অনেকে যেখানে কেবল অভিযোগ আর সমস্যা চিহ্নিত করে, সেখানে নোমান আলী দেখেন সম্ভাবনা ও স্বপ্নের দ্বার। তিনি তরুণদের মাঝে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা দেখতে পান। উম্মাহর ৭০ ভাগ তরুণকে যদি কেবল সঠিক অনুপ্রেরণা দেওয়া যায়, তাঁর বিশ্বাস, বিশ্বের চেহারাটাই পালটে যাবে। তিনি মনে করেন- মুসলিমদের দায়িত্ব হলো কেবল তরুণদের কাছে উন্নত ও সহজ পদ্ধতিতে কুরআনের বাণী পৌছে দেওয়া; বাকি দায়িত্ব আল্লাহর। তিনিই সব করবেন। একই মাটিতে একই বৃষ্টির পানি পড়ার পরও যেভাবে ভিন্ন ভিন্ন ফুলের জন্ম হয়, একই ওহি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে সে রকম হাজার রকমের সম্ভাবনা ও পরিবর্তনের সূচনা হবে। নোমান আলী খানের চিন্তাভাবনা সব তরুণদের জন্যই। এ কারণেই সম্ভবত সারা পৃথিবীর তরুণরা নোমান আলী খানকে তাদের জন্য আদর্শ মনে করে। তাঁর বক্তব্যগুলো সারা বিশ্বের তরুণদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, বিশ্বের নানা প্রান্তের তরুণরা তাদের নিজেদের ভাষায় নোমান আলী খানের বক্তব্যগুলো ভাষান্তরিত করছে। বাংলা ভাষায় তাঁর ১০০ টিরও অধিক বক্তৃতা ডাবিং, সাবটাইটেল, নোট এবং আর্টিকেল হিসেবে পরিবেশন করেছে আমাদের NAK Bangla ওয়েবসাইট। আল-কুরআনকে দর্শকদের সামনে জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে সত্যিই নোমান আলী খান এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব এবং একটি অসাধারণ প্রতিষ্ঠান।
📄 পরিশিষ্ট : শারঈ সম্পাদকের কথা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মাদ -এর ওপর।
নোমান আলী খানের লেকচার থেকে চয়নকৃত কিছু আলোচনার মলাটবদ্ধ রূপ বন্ধন-এর শরঈ সম্পাদনা সমাপ্ত হলো। সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে কাজগুলো আমাকে করতে হয়েছে, শুরুতেই সে বিষয়ে কিছু কথা বলে নিই। যাতে করে পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে পাঠক একটা ধারণা লাভ করতে পারেন।
এই বইটিতে করা সম্পাদনার কাজগুলোকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক. যা মূল পাণ্ডুলিপি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন বিষয়গুলো আবার দুই ধরনের। প্রথম হলো- যেগুলোতে শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি উঠার সুযোগ আছে। দ্বিতীয় হলো, শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে মৌলিক বিচারে সমস্যা না থাকলেও বাংলাভাষী মানুষদের পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় তা না থাকাটাই উত্তম মনে হয়েছে। দুই. আয়াতসমূহের আরবি পাঠ সংযোজন, এর অনুবাদ সংযুক্তকরণ ও উপস্থাপনাগত সৌন্দর্যের দিক লক্ষ রেখে কোনো কোনো বাক্যকে একটু-আধটু পরিমার্জন।
এর বাইরে এক জায়গায় প্রয়োজন মনে হওয়ায় টীকা যুক্ত করা হয়েছে; যাতে করে পাঠকের মধ্যে কোনো ভুল জানা বা অর্ধ-জানা তৈরি হতে না পারে। মূল পাণ্ডুলিপির বিষয় সূচিতেও কিছু রদবদল করা হয়েছে। হৃদয়গ্রাহী আলোচনা ও কিছুটা রুক্ষ আলোচনাকে সমতা রক্ষা করে সাজানো হয়েছে। এই ছিল শরঈ সম্পাদনার মোটামুটি বর্ণনা।
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। প্রসঙ্গের মূল ফটকে প্রবেশ করার আগে প্রস্তুতিমূলক কিছু কথা আরজ করব। আশা করি, পাঠক এতে চিন্তার খোরাক পাবেন এবং নিজেদের পাথেয় হিসেবে তা গ্রহণ করে নেবেন।
মানুষকে যাচাই-বাছাই করার ইসলামসম্মত শাস্ত্রটির নাম হচ্ছে- 'ইলমুল জারহি- ওয়াত তাদিল'। 'ব্যক্তি নির্ণয় বিদ্যা' হিসেবে এটি স্বীকৃত ও সমাদৃত। এই শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞদের একটা কথা খুবই প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য। তা হলো- লি কুলু ফন্নিন রিজাল। অর্থাৎ প্রত্যেক শাস্ত্রের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন। সেই ব্যক্তিদের কাছ থেকেই ওই শাস্ত্রের বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু যিনি যে শাস্ত্রের পণ্ডিত, তার দক্ষতা সেই শাস্ত্রতেই, সুতরাং এর বাইরের অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে তার মতামত অতটা গ্রহণযোগ্যতা ও স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার রাখে না। এই বিষয়টিকে অনেকেই তাদের গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। তাদের মধ্যে ভারতের বিশ্ব বিখ্যাত আলেম, ফকিহ, মুহাদ্দিস আল্লামা আবদুল হাই লাখনবি (রহ.) অন্যতম।
এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের বাংলা ভাষ্য হুবহু তুলে ধরছি : 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি স্থানের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের কথা ও প্রতিটি শাস্ত্রের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ব্যক্তিবর্গ তৈরি করেছেন। তাঁর সৃষ্টিজগতের প্রত্যেককে বিভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্যাবলি প্রদান করেছেন। যা একজনের মধ্যে পাওয়া যায়; অন্যজনের মধ্যে পাওয়া যায় না। যেমন: মুহাদ্দিসদের মধ্যে অনেকে এমন রয়েছেন যারা কেবল হাদিস বর্ণনা করেন, কিন্তু হাদিসের অন্তর্নিহিত মর্ম বোঝা ও সেখান থেকে মাসআলা-মাসায়েল উদ্ঘাটন করার মতো সক্ষমতা তাদের থাকে না। আবার এর বিপরীতে অনেক ফুকাহায়ে কেরাম রয়েছেন, যারা কেবল মাসআলা-মাসায়েল মুখস্থ করেন। হাদিস বর্ণনায় তারা দক্ষতা রাখেন না। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে- তাদের প্রত্যেককে স্ব স্ব স্থানে অবস্থান দেওয়া এবং তাদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া।'
এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি উদাহরণ পেশ করা হয় যার মাধ্যমে তিনি হলেন ইমাম গাজালি (রহ.)। তাঁর রচনা করা 'ইহয়াউ উলুমিদ্দিন' একটি জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ। এটি রচনাকাল থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর অধিক পঠিত গ্রন্থগুলোর অন্যতম। কিন্তু এই গ্রন্থে উল্লিখিত অনেক হাদিসের ওপরই প্রাজ্ঞ হাদিসবিশারদগণ আপত্তি করেছেন। সেগুলোর কোনোটিকে বাতিল আর কোনোটিকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অবহিত করেছেন। এই গ্রন্থে উল্লিখিত হাদিসগুলোর অবস্থা ও সূত্র নির্ণয় করে আল্লামা ইরাকি (রহ.) একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার নাম হলো- 'আলমুগনি আন হামলিল আসফারি ফিল আসফার ফি তাখরিজি মা ফিল ইহয়াই মিনাল আখবার।'
আল্লামা লাখনবি (রহ.) এই বিষয়ে বলছেন, 'ইহয়াউ উলুমিদ্দিনের গ্রন্থাকারের ব্যাপারটাই চিন্তা করুন। তার মর্যাদা ও অবস্থানের বিষয়টি তো স্বীকৃত। তবুও দেখা যায়, তাঁর গ্রন্থে তিনি এমন কিছু হাদিস নিয়ে এসেছেন, যার কোনো ভিত্তি নেই। সুতরাং এসব হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়; যেমনটা আল্লামা ইরাকির গ্রন্থ অধ্যয়ন করলে বুঝে আসে।'
মোটকথা, আমি যে বিষয়টি বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো- সবার মধ্যে সব ধরনের বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা থাকে না। আল্লাহ একেকজনকে একেক ধরনের বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা দান করেন। তো যে বিষয়ে যার যোগ্যতা আছে- সেই বিষয়ে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া ও সেই ক্ষেত্রে, আবারও বলছি, 'সেই ক্ষেত্রে' তাকে গ্রহণীয় মনে করা যেতে পারে। বাকি এর বাইরে অন্যান্য বিষয়ে তাঁর মন্তব্য অতটা গ্রহণযোগ্যতা রাখে না। সেটা যদি সঠিক হয় তবে তো ভালো। অন্যথায় সম্মানের সাথে তা বর্জন করতে হবে।
এবার চলুন মূল ফটকে প্রবেশ করি। আপনি যদি নোমান আলী খানের জীবনী পড়েন তাহলে দেখবেন যে, তাঁর মূল পাণ্ডিত্য ও দক্ষতার ক্ষেত্র হচ্ছে কুরআনের ভাষা তথা আরবি ভাষা ও সাহিত্যে। পবিত্র কুরআনের আলংকারিক সৌন্দর্যের বর্ণনা, নান্দনিকতার দিকগুলোর উপস্থাপনা ও বিভিন্ন আয়াতের আলোকে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন ইত্যাদিকে ব্যাখ্যা করা ও সামাজিক নানা অসংগতির সংশোধনকল্পে নাসিহাহ প্রদান করা।
সে হিসেবে তাঁর মূল অবস্থান হচ্ছে, তিনি একজন দায়ি ও কুরআনের মুজিযা তথা ভাষা-সৌন্দর্যের অভিলাষী ও মানুষের মাঝে কুরআনের বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাকারী। আরবি ভাষা শেখানোও তাঁর পছন্দের একটা কাজ। ফিকাহ-ফতোয়া বা হাদিস শাস্ত্র তাঁর পাণ্ডিত্যের বিষয় নয়। এই জায়গাটা স্পষ্ট হলেই আমাদের জন্য কর্মপন্থার পদ্ধতি বোঝাটা সহজ হয়ে যাবে।
নোমান আলী খান যেহেতু একজন মানুষ, সুতরাং তাঁর ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কিছু ভুল মানুষ করে থাকে তার চিন্তাগত অবস্থান থেকে। তো তিনি যেহেতু পশ্চিমা দেশে বেড়ে উঠেছেন এবং সেখানকার আবহাওয়াতে তিনি দাওয়াতি কাজ করেন, ফলে সেখানকার পরিবেশগত কিছু প্রভাবও কখনো কখনো তাকে প্রভাবিত করে; যা অনেক সময় তাঁর আলোচনাতেও প্রকাশ পায়ে যায়। সুতরাং এই বিষয়টার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত।
এর জন্য আপনাকে যে কাজগুলো করতে হবে তা হলো- দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানকে আরও শাণিত করা। কুরআনের জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধু লেকচারের ওপর সীমাবদ্ধ না থেকে নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থগুলোও অধ্যয়নের প্রতি মনোযোগ প্রদান করা। সালাফদের বুঝ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের কর্মপন্থা, তাদের আদর্শ ইত্যাদি বিষয়ে যত বেশি পারা যায় ধারণা অর্জন করা এবং এর আলোকেই পরবর্তীদের বক্তব্যকে নিরীক্ষণ করা।
কারণ, পূর্ববর্তী মনীষীদের অনুসরণের ব্যাপারে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) লোকদের নসিহত করে বলতেন, 'তোমাদের মধ্য হতে কেউ যদি কারও অনুসরণ করতে চায়, তবে যেন সে তাদের অনুসরণ করে, যাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। কারণ, জীবিতরা ফিতনা থেকে মুক্ত নয়।'
লেকচার শোনাটাও দ্বীনের জ্ঞান বৃদ্ধি করার একটা আধুনিক মাধ্যম। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, এটি দ্বীন শেখার মৌলিক কোনো মাধ্যম নয়; বরং সহায়ক মাত্র। তাই যারা প্রচুর পরিমাণে লেকচার শোনেন তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো- লেকচার শোনার সাথে সাথে আলেমদের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্ক সৃষ্টি করুন। সম্পর্ক যদি মোটামুটি থেকে থাকে তবে তাকে আরও উন্নত করুন। তাদের থেকে সরাসরি দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করতে বেশি সচেষ্ট হোন। এটাই দ্বীন শেখার সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। আপনি নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, সরাসরি কারও সংস্পর্শে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা আর ডিভাইসের সহায়তায় তা অর্জন করার মধ্যে কত বিস্তর ফারাক রয়েছে।
ওপরে যে মতামত প্রদান করা হলো, তা একান্তই আমার। আর এই বইয়ের শরঈ সম্পাদনা করার মানে এই নয় যে, নোমান আলী খানের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর সব আলোচনার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি বা ঢালাওভাবে সব শ্রেণির শ্রোতার জন্য তাঁর আলোচনা শোনাকে আমি সমর্থন ও উৎসাহিত করি। তবে উপকারী দ্বীনি জ্ঞান অর্জনকে আমি সব সময় উৎসাহিত করি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপকারী জ্ঞান দান করুন। ক্ষতিকর জ্ঞান থেকে হেফাজত করুন। ভালো কাজগুলো কবুল করে নিন। মন্দ কাজগুলো ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিন। আমিন।
আবদুল্লাহ আল মাসউদ ১৫-০১-১৮
টিকাঃ
১. উমদাতুর রিআয়াহ ১/১৩
২. আলআজওয়িবাতুল ফাদিলা, আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর টীকাসহ- ৩৩পৃ.
৩. জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহী ২/৪৭
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মাদ -এর ওপর।
নোমান আলী খানের লেকচার থেকে চয়নকৃত কিছু আলোচনার মলাটবদ্ধ রূপ বন্ধন-এর শরঈ সম্পাদনা সমাপ্ত হলো। সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে কাজগুলো আমাকে করতে হয়েছে, শুরুতেই সে বিষয়ে কিছু কথা বলে নিই। যাতে করে পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে পাঠক একটা ধারণা লাভ করতে পারেন।
এই বইটিতে করা সম্পাদনার কাজগুলোকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক. যা মূল পাণ্ডুলিপি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন বিষয়গুলো আবার দুই ধরনের। প্রথম হলো- যেগুলোতে শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি উঠার সুযোগ আছে। দ্বিতীয় হলো, শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে মৌলিক বিচারে সমস্যা না থাকলেও বাংলাভাষী মানুষদের পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় তা না থাকাটাই উত্তম মনে হয়েছে। দুই. আয়াতসমূহের আরবি পাঠ সংযোজন, এর অনুবাদ সংযুক্তকরণ ও উপস্থাপনাগত সৌন্দর্যের দিক লক্ষ রেখে কোনো কোনো বাক্যকে একটু-আধটু পরিমার্জন।
এর বাইরে এক জায়গায় প্রয়োজন মনে হওয়ায় টীকা যুক্ত করা হয়েছে; যাতে করে পাঠকের মধ্যে কোনো ভুল জানা বা অর্ধ-জানা তৈরি হতে না পারে। মূল পাণ্ডুলিপির বিষয় সূচিতেও কিছু রদবদল করা হয়েছে। হৃদয়গ্রাহী আলোচনা ও কিছুটা রুক্ষ আলোচনাকে সমতা রক্ষা করে সাজানো হয়েছে। এই ছিল শরঈ সম্পাদনার মোটামুটি বর্ণনা।
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। প্রসঙ্গের মূল ফটকে প্রবেশ করার আগে প্রস্তুতিমূলক কিছু কথা আরজ করব। আশা করি, পাঠক এতে চিন্তার খোরাক পাবেন এবং নিজেদের পাথেয় হিসেবে তা গ্রহণ করে নেবেন।
মানুষকে যাচাই-বাছাই করার ইসলামসম্মত শাস্ত্রটির নাম হচ্ছে- 'ইলমুল জারহি- ওয়াত তাদিল'। 'ব্যক্তি নির্ণয় বিদ্যা' হিসেবে এটি স্বীকৃত ও সমাদৃত। এই শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞদের একটা কথা খুবই প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য। তা হলো- লি কুলু ফন্নিন রিজাল। অর্থাৎ প্রত্যেক শাস্ত্রের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন। সেই ব্যক্তিদের কাছ থেকেই ওই শাস্ত্রের বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু যিনি যে শাস্ত্রের পণ্ডিত, তার দক্ষতা সেই শাস্ত্রতেই, সুতরাং এর বাইরের অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে তার মতামত অতটা গ্রহণযোগ্যতা ও স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার রাখে না। এই বিষয়টিকে অনেকেই তাদের গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। তাদের মধ্যে ভারতের বিশ্ব বিখ্যাত আলেম, ফকিহ, মুহাদ্দিস আল্লামা আবদুল হাই লাখনবি (রহ.) অন্যতম।
এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের বাংলা ভাষ্য হুবহু তুলে ধরছি : 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি স্থানের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের কথা ও প্রতিটি শাস্ত্রের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ব্যক্তিবর্গ তৈরি করেছেন। তাঁর সৃষ্টিজগতের প্রত্যেককে বিভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্যাবলি প্রদান করেছেন। যা একজনের মধ্যে পাওয়া যায়; অন্যজনের মধ্যে পাওয়া যায় না। যেমন: মুহাদ্দিসদের মধ্যে অনেকে এমন রয়েছেন যারা কেবল হাদিস বর্ণনা করেন, কিন্তু হাদিসের অন্তর্নিহিত মর্ম বোঝা ও সেখান থেকে মাসআলা-মাসায়েল উদ্ঘাটন করার মতো সক্ষমতা তাদের থাকে না। আবার এর বিপরীতে অনেক ফুকাহায়ে কেরাম রয়েছেন, যারা কেবল মাসআলা-মাসায়েল মুখস্থ করেন। হাদিস বর্ণনায় তারা দক্ষতা রাখেন না। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে- তাদের প্রত্যেককে স্ব স্ব স্থানে অবস্থান দেওয়া এবং তাদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া।'
এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি উদাহরণ পেশ করা হয় যার মাধ্যমে তিনি হলেন ইমাম গাজালি (রহ.)। তাঁর রচনা করা 'ইহয়াউ উলুমিদ্দিন' একটি জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ। এটি রচনাকাল থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর অধিক পঠিত গ্রন্থগুলোর অন্যতম। কিন্তু এই গ্রন্থে উল্লিখিত অনেক হাদিসের ওপরই প্রাজ্ঞ হাদিসবিশারদগণ আপত্তি করেছেন। সেগুলোর কোনোটিকে বাতিল আর কোনোটিকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অবহিত করেছেন। এই গ্রন্থে উল্লিখিত হাদিসগুলোর অবস্থা ও সূত্র নির্ণয় করে আল্লামা ইরাকি (রহ.) একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার নাম হলো- 'আলমুগনি আন হামলিল আসফারি ফিল আসফার ফি তাখরিজি মা ফিল ইহয়াই মিনাল আখবার।'
আল্লামা লাখনবি (রহ.) এই বিষয়ে বলছেন, 'ইহয়াউ উলুমিদ্দিনের গ্রন্থাকারের ব্যাপারটাই চিন্তা করুন। তার মর্যাদা ও অবস্থানের বিষয়টি তো স্বীকৃত। তবুও দেখা যায়, তাঁর গ্রন্থে তিনি এমন কিছু হাদিস নিয়ে এসেছেন, যার কোনো ভিত্তি নেই। সুতরাং এসব হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়; যেমনটা আল্লামা ইরাকির গ্রন্থ অধ্যয়ন করলে বুঝে আসে।'
মোটকথা, আমি যে বিষয়টি বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো- সবার মধ্যে সব ধরনের বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা থাকে না। আল্লাহ একেকজনকে একেক ধরনের বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা দান করেন। তো যে বিষয়ে যার যোগ্যতা আছে- সেই বিষয়ে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া ও সেই ক্ষেত্রে, আবারও বলছি, 'সেই ক্ষেত্রে' তাকে গ্রহণীয় মনে করা যেতে পারে। বাকি এর বাইরে অন্যান্য বিষয়ে তাঁর মন্তব্য অতটা গ্রহণযোগ্যতা রাখে না। সেটা যদি সঠিক হয় তবে তো ভালো। অন্যথায় সম্মানের সাথে তা বর্জন করতে হবে।
এবার চলুন মূল ফটকে প্রবেশ করি। আপনি যদি নোমান আলী খানের জীবনী পড়েন তাহলে দেখবেন যে, তাঁর মূল পাণ্ডিত্য ও দক্ষতার ক্ষেত্র হচ্ছে কুরআনের ভাষা তথা আরবি ভাষা ও সাহিত্যে। পবিত্র কুরআনের আলংকারিক সৌন্দর্যের বর্ণনা, নান্দনিকতার দিকগুলোর উপস্থাপনা ও বিভিন্ন আয়াতের আলোকে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন ইত্যাদিকে ব্যাখ্যা করা ও সামাজিক নানা অসংগতির সংশোধনকল্পে নাসিহাহ প্রদান করা।
সে হিসেবে তাঁর মূল অবস্থান হচ্ছে, তিনি একজন দায়ি ও কুরআনের মুজিযা তথা ভাষা-সৌন্দর্যের অভিলাষী ও মানুষের মাঝে কুরআনের বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাকারী। আরবি ভাষা শেখানোও তাঁর পছন্দের একটা কাজ। ফিকাহ-ফতোয়া বা হাদিস শাস্ত্র তাঁর পাণ্ডিত্যের বিষয় নয়। এই জায়গাটা স্পষ্ট হলেই আমাদের জন্য কর্মপন্থার পদ্ধতি বোঝাটা সহজ হয়ে যাবে।
নোমান আলী খান যেহেতু একজন মানুষ, সুতরাং তাঁর ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কিছু ভুল মানুষ করে থাকে তার চিন্তাগত অবস্থান থেকে। তো তিনি যেহেতু পশ্চিমা দেশে বেড়ে উঠেছেন এবং সেখানকার আবহাওয়াতে তিনি দাওয়াতি কাজ করেন, ফলে সেখানকার পরিবেশগত কিছু প্রভাবও কখনো কখনো তাকে প্রভাবিত করে; যা অনেক সময় তাঁর আলোচনাতেও প্রকাশ পায়ে যায়। সুতরাং এই বিষয়টার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত।
এর জন্য আপনাকে যে কাজগুলো করতে হবে তা হলো- দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানকে আরও শাণিত করা। কুরআনের জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধু লেকচারের ওপর সীমাবদ্ধ না থেকে নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থগুলোও অধ্যয়নের প্রতি মনোযোগ প্রদান করা। সালাফদের বুঝ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের কর্মপন্থা, তাদের আদর্শ ইত্যাদি বিষয়ে যত বেশি পারা যায় ধারণা অর্জন করা এবং এর আলোকেই পরবর্তীদের বক্তব্যকে নিরীক্ষণ করা।
কারণ, পূর্ববর্তী মনীষীদের অনুসরণের ব্যাপারে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) লোকদের নসিহত করে বলতেন, 'তোমাদের মধ্য হতে কেউ যদি কারও অনুসরণ করতে চায়, তবে যেন সে তাদের অনুসরণ করে, যাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। কারণ, জীবিতরা ফিতনা থেকে মুক্ত নয়।'
লেকচার শোনাটাও দ্বীনের জ্ঞান বৃদ্ধি করার একটা আধুনিক মাধ্যম। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, এটি দ্বীন শেখার মৌলিক কোনো মাধ্যম নয়; বরং সহায়ক মাত্র। তাই যারা প্রচুর পরিমাণে লেকচার শোনেন তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো- লেকচার শোনার সাথে সাথে আলেমদের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্ক সৃষ্টি করুন। সম্পর্ক যদি মোটামুটি থেকে থাকে তবে তাকে আরও উন্নত করুন। তাদের থেকে সরাসরি দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করতে বেশি সচেষ্ট হোন। এটাই দ্বীন শেখার সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। আপনি নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, সরাসরি কারও সংস্পর্শে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা আর ডিভাইসের সহায়তায় তা অর্জন করার মধ্যে কত বিস্তর ফারাক রয়েছে।
ওপরে যে মতামত প্রদান করা হলো, তা একান্তই আমার। আর এই বইয়ের শরঈ সম্পাদনা করার মানে এই নয় যে, নোমান আলী খানের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর সব আলোচনার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি বা ঢালাওভাবে সব শ্রেণির শ্রোতার জন্য তাঁর আলোচনা শোনাকে আমি সমর্থন ও উৎসাহিত করি। তবে উপকারী দ্বীনি জ্ঞান অর্জনকে আমি সব সময় উৎসাহিত করি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপকারী জ্ঞান দান করুন। ক্ষতিকর জ্ঞান থেকে হেফাজত করুন। ভালো কাজগুলো কবুল করে নিন। মন্দ কাজগুলো ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিন। আমিন।
আবদুল্লাহ আল মাসউদ ১৫-০১-১৮
টিকাঃ
১. উমদাতুর রিআয়াহ ১/১৩
২. আলআজওয়িবাতুল ফাদিলা, আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর টীকাসহ- ৩৩পৃ.
৩. জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহী ২/৪৭
📄 পরিশিষ্ট : নোমান আলী খানের কাজসমূহ যেখানে পাবেন
Free Quran Education (Video Illustration) https://www.fqetv.com/
Nouman Ali Khan Collection http://www.nakcollection.com/
বাংলা সাইট: www.nakbangla.com
ইউটিউব :
Bayyinah Institute https://www.youtube.com/user/BayyinahInstitute
Quran Weekly https://www.youtube.com/user/QuranWeekly
Nouman Ali Khan Collection http://www.youtube.com/user/NAKcollection/videos
Free Quran Education (Video Illustration) https://www.youtube.com/user/NAKcollection
ফেইসবুক:
Nouman Ali Khan Official Page https://www.facebook.com/noumanbayyinah
Bayyinah Institute https://www.facebook.com/bayyinahinst/
Nouman Ali Khan Collection in Bangla (বাংলা) https://www.facebook.com/NAKBangla
টুইটার :
Nouman Ali Khan https://twitter.com/noumanbayyinah
Bayyinah Institute https://twitter.com/bayyinahinst
Quran Weekly https://twitter.com/quranweekly
অ্যাপস :
Android Lecture (NAK Collection) https://play.google.com/store/apps/details?id=com.dawathnaklectures
Juz Amma English Tafseer (MP3) https://play.google.com/store/apps/details?id=com.andromo.dev391844.app578675
Bayyinah TV https://play.google.com/store/apps/details?id=com.bayyinah.tv&hl=en
iPhone App (Nouman Ali Khan) https://itunes.apple.com/za/podcast/muslim-central-lecture-speaker/id593432991
Free Quran Education (Video Illustration) https://www.fqetv.com/
Nouman Ali Khan Collection http://www.nakcollection.com/
বাংলা সাইট: www.nakbangla.com
ইউটিউব :
Bayyinah Institute https://www.youtube.com/user/BayyinahInstitute
Quran Weekly https://www.youtube.com/user/QuranWeekly
Nouman Ali Khan Collection http://www.youtube.com/user/NAKcollection/videos
Free Quran Education (Video Illustration) https://www.youtube.com/user/NAKcollection
ফেইসবুক:
Nouman Ali Khan Official Page https://www.facebook.com/noumanbayyinah
Bayyinah Institute https://www.facebook.com/bayyinahinst/
Nouman Ali Khan Collection in Bangla (বাংলা) https://www.facebook.com/NAKBangla
টুইটার :
Nouman Ali Khan https://twitter.com/noumanbayyinah
Bayyinah Institute https://twitter.com/bayyinahinst
Quran Weekly https://twitter.com/quranweekly
অ্যাপস :
Android Lecture (NAK Collection) https://play.google.com/store/apps/details?id=com.dawathnaklectures
Juz Amma English Tafseer (MP3) https://play.google.com/store/apps/details?id=com.andromo.dev391844.app578675
Bayyinah TV https://play.google.com/store/apps/details?id=com.bayyinah.tv&hl=en
iPhone App (Nouman Ali Khan) https://itunes.apple.com/za/podcast/muslim-central-lecture-speaker/id593432991
📄 পরিশিষ্ট : বায়্যিনাহ টিভি কী
www.bayyinah.tv
ww.gift.bayyinah.com
আমরাও কি পারব?
হ্যাঁ, আমরাও পারব ইনশাআল্লাহ। তাঁর রিসোর্স আমাদের সামনে আছে। তাঁর দিকে অগ্রগামিতাই আমাদেরকে কুরআনের আরও গভীরে নিয়ে যাবে। আমাদের ইসলামি কাজকে আরও শতগুণে কোয়ালিফাই করতে পারে। আমাদের ইসলামের দাওয়াতের পদ্ধতিতে আনতে পারে এক সৌন্দর্যময় ও প্রবলতর পরিবর্তন, যা মানুষকে ইসলামের দিকে তীব্রভাবে আহ্বান করতে প্রয়োজন হবে।
উস্তাদ নোমান আলী খান যতই পড়াশোনা করতে লাগলেন, ততই আল-কুরআনের সৌন্দর্য ও মুজিযা উপলব্ধি করতে পারলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, কুরআনের অনুবাদে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। একজন ব্যক্তি অনুবাদ পড়ে আল-কুরআনের বাণী পেতে পারে, কিন্তু সে মুজিযা পায় না। তিনি আশা করতেন যে, তিনি যেভাবে উত্তরণের পথে গিয়েছেন, সেভাবেই অন্যরাও যাক। আর এজন্য আল-কুরআনকে তাক থেকে তুলে এনে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে চাইলেন। তিনি তাঁর Information Technology-এর জব ছেড়ে দিয়ে মানুষ যাতে নিজে আল-কুরআন বুঝতে পারে, সেই স্বপ্নময় পথের দিকে ধাবিত হলেন।
যদিও তিনি ছোটো থাকা অবস্থায় রিয়াদে আরবি ভাষার ট্রেনিং শুরু করেন, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণ নেন পাকিস্তানে। তিনি পাকিস্তান জাতীয় অ্যারাবিক শিক্ষাতে শীর্ষ ১০ জনের মধ্যে থাকার কারণে স্কলারশিপ পান এবং তখন থেকেই ড. আব্দুস সামি'র তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায়ই অ্যারাবিক গ্রামারের ওপর মেথডলজিক্যালি গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। আব্দুস সামি'র ইউনিক অ্যারাবিক শিক্ষার পদ্ধতি তাকে অনেক সাহায্য করে এবং তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের জন্য আব্দুস সামি'র অনেক কাজ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তিনি অ্যারাবিকের প্রফেসরও (Nassau Community College)। তিনি আধুনিক ও ক্ল্যাসিক্যাল আরবি শিক্ষা দেন গত ছয় বছর ধরে এবং তাঁর অ্যারাবিক বই কানাডার
Jaamiah-Al-Uloom Al-Islamiyyah, Institute of Islamic Education in Ajax, Canada-তে পাঠ্য হিসেবেও আছে।
তিনি 'The Bayyinah Institute for Arabic & Quranic Studies'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এবং প্রধান ইনস্ট্রাক্টর। এ ছাড়া তিনি তাঁর অবদানের জন্য 'The 500 Most Influential Muslims'-এর মাঝেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
বর্তমানে টেক্সাসসহ ৪০টি লোকেশনে তাঁর নিয়মিত সেমিনার চলে কুরআন, তাফসির ও অ্যারাবিকের ওপর। ২০০৮ সালে ১০ দিনের 'Fundamental Arabic Course'-এ পোডকাস্টের মাধ্যমে ২৫ হাজার লোক অংশগ্রহণ করে।
প্রসেস কী? কীভাবে এক্সেস পাব?
আমাদের মূল ফোকাস থাকবে তাঁর অনন্য রিসোর্স, যার মাধ্যমে আমরা পরিপূর্ণভাবে এবং বিশেষ করে আল-কুরআনের উপরোক্ত বিষয়গুলো জানতে পারি। এজন্য www.bayyinah.tv-তে আমাদের এক্সেস প্রয়োজন।
আর্থিক সমস্যার কথা চিন্তা করে তারা স্পন্সরশিপের ব্যবস্থা রেখেছেন। এখানে এক্সেস করতে লাগে ১১২ ইউরো (প্রায় ১২ হাজার টাকার মতো), এক বছরের জন্য সাবস্ক্রিপশন ফ্রি। কীভাবে স্পন্সরশিপ পাওয়া যাবে- প্রথমে www.gift.bayyinah.com- তে গিয়ে Apply Now-এ গিয়ে সবকিছু পূর্ণ করুন। এখানে Reason for Request হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটা যত ভালো লিখবেন। তত বেশি স্পন্সরশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ ক্ষেত্রে কীভাবে লিখলে স্পন্সরশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি তার জন্য এইটা একটু দেখুন- www.tinyurl.com/mjp8bpw.
স্পন্সরশিপ পেলে আপনাকে জানিয়ে দেবে ই-মেইলে। প্রতি শুক্রবার তারা স্পন্সরশিপের ই-মেইল পাঠিয়ে থাকে। আপনাকে ই-মেইল দিয়ে দেবে- চাইলে পরিবর্তনও করতে পারবেন। একজন ব্যক্তি এটার যোগ্য এবং সে চাইলে কেবল তার পরিবার নিয়ে দেখতে বা এই রিসোর্সগুলো ব্যবহার করতে পারবে।
এ ছাড়া কেউ এখানে সাদাকায়ে জারিয়াস্বরূপ দিতে চাইলে সেটাও দিতে পারেন। এখানে তাঁর এই সিস্টেমের পদ্ধতি হলো, অর্থবানদের কাছ থেকে নিয়ে আর্থিক সমস্যাগ্রস্তদের দিয়ে একটা সেতুবন্ধন তৈরি করা! সুবহানাল্লাহ কী সুন্দর পদ্ধতি।
এ ছাড়া যাদের টাকা আছে তারা www.bayyinah.com এখান থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারেন। একটিবার ঘুরেই আসুন না।
কী পাবেন এই বাইয়ি্যনাহ টিভিতে (Bayyinah.tv)?
Arabic with Husna
এটা মূলত উস্তাদ নোমান আলী খানের অন্যতম আকর্ষণের মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কারণ, এই অ্যারাবিক-ই তাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তিনি অ্যারাবিকে টপ ১০-এর মাঝ থেকে স্কলারশিপ পেয়ে নিজে অ্যারাবিক শিক্ষার মেথড আবিষ্কার করেছেন এবং এর সাথে যোগ হয়েছে তাঁর ইন্সস্ট্রাক্টর ড. আব্দুস সামি'র অসাধারণ ও ইউনিক মেথড। এটা আপনাকে অ্যাডভান্স অ্যারাবিক শেখাবে। ভয় নেই, আগেই বলেছি এটা ইউনিক মেথড দিয়ে সাজানো, যা যেকোনো বয়সের জন্য উপযোগী। একজন বাচ্চা থেকে শুরু করে সবাই এই মেথডে উচ্চতর অ্যারাবিক শিখে কুরআনকে আরবি ভাষা দিয়েই বোঝা সম্ভব। যা তার ছোটো মেয়েকে প্র্যাক্টিক্যালি শেখানোর মধ্য দিয়েই এর নাম (Arabic with Husna) এবং সাথে ক্ল্যাসিক্যাল ও আধুনিক আরবিও জানা সহজ হবে ইনশাআল্লাহ। কিছু দূর যাওয়ার পর কুরআন থেকেই গভীর ব্যাখ্যাসহ জানতে শুরু করবেন প্র্যাক্টিক্যালি! শুধু একটু প্রচেষ্টা, করেই দেখুন না আল-কুরআনের এই ভাষাটা কতটা মাধুর্যময় ও মুজিযার সাহচর্যে ভরা!
Quran: Cover to Cover
সম্পূর্ণ কুরআনের ঐকতান-সামঞ্জস্য ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নিগূঢ় অনুবাদের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ অনুবাদে হারিয়ে গেছে। ভাবতে পারেন কত বড়ো কাজ এটি! সম্পূর্ণ কুরআনের সাথে অতি সূক্ষ্ম নিগূঢ় ও প্রত্যেকটি শব্দ, আয়াত, সূরা গুচ্ছ ইত্যাদির সামঞ্জস্য আনা হয়েছে এতে! সুবহানাল্লাহ। আমাদের হৃদয়ে কুরআন প্রবেশ না করার একটি দিক এটি। কেননা, কুরআনকে যেভাবে বোঝা উচিত সেভাবে আমরা বুঝতে পারি না, আর এই কষ্টের কাজটি আমাদের সামনে এখন হাজির, শুধু আল্লাহর রহমতে হাত বাড়িয়ে চেষ্টা করা।
Divine Speech
কুরআনের বিভিন্ন প্রশ্নের সাথে কুরআনের গোপন-আচ্ছন্ন সাহিত্যিক সৌন্দর্য ও প্রবল শক্তির ব্যাখ্যার একটা সিরিজ। কুরআনে কেন এত পুনরোক্তি, কেন গল্পসমূহের ক্রোনোলজিক্যাল শৃঙ্খলা নেই, কেন গল্পগুলো ছড়িয়ে আছে ও একই জায়গায় পূর্ণ নেই, কেন আল্লাহ বিভিন্ন জিনিসের কসম করেছেন- এইসব জিনিসের গোপন ও সৌন্দর্যের প্রবল শক্তির সাহিত্যিক ব্যাখ্যা। আমি সত্যিই অভিভূত। কারণ, আগে যা জানতাম তার থেকে এখন অনেকটা বিশুদ্ধ ও গভীরভাবে জানতে পারছি, আলহামদুলিল্লাহ।
Themes from the Quran
কল্পনা করতে পারেন, আল-কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ৭-১০ ঘণ্টার ইউনিক সিরিজ! Parenting, Shame, Hijab, The Greatest Mom, The Prophet Muhammad saws-সহ দৈনন্দিন জীবনের কাজে লাগে, এগুলোই আসবে সিরিজে। সহজ বিষয় বলে এড়িয়ে গেলে তার গভীর ব্যাখ্যার ছোঁয়া থেকে কিন্তু বঞ্চিত হবেন!
Quran In-Depth
এটা বুঝতেই পারছেন। সম্ভব হলে সূরা আর-রাহমানের লেকচারটাই একবার মাত্র শুনুন। তাহলেই এর গভীরতা বুঝতে পারবেন! Just অসাধারণ।
এ ছাড়া আরও কিছু ফিচার থাকছে যা আমি বলছি না। দেখতে দেখতে নাহয় অবাক হবেন, আল্লাহর এই বাণীর গভীর শক্তির সৌন্দর্য ও হিকমাহ দেখে!
হোক সূরা আর-রাহমানের তাফসির বা ক্ল্যাসিক্যাল বা মৌলিক অ্যারাবিক কোর্স অথবা হোক সে 'Night Story'- সর্বদা একই রকম থাকে তাঁর সেমিনার। শত শত ছেলেমেয়ে ও শিশুরা লাইন ধরে থাকে। কুরআন ও আরবির প্রফেসর হিসেবে তাঁর বাগ্মিতা সর্বদা মানুষকে আল্লাহর বাণী শিখতে প্রেরণা জোগায়।
যারা আল-কুরআনকে ভালোবেসে এর গভীরে প্রবেশ করতে চায়, যে চায় একে ভালোবেসে গভীর জ্ঞানের সাথে সংযুক্ত হয়ে ইসলামের কাজ করতে, অন্যকে আল্লাহর দিকে হিকমার সাথে সৌন্দর্য ও প্রবলতর শক্তি (মুজিযা) দিয়ে আহ্বান করতে, তারা যেন এখানে অ্যাপ্লাই করে।
'যারা এখানে উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের কাছে তা পৌঁছে দেয়। কেননা, এমন অনেক অনুপস্থিত লোক আছে, যারা উপস্থিত শ্রোতাদের তুলনায় অধিকতর ভাগ্যবান হয়ে থাকে।' (বিদায় হজের ভাষণ)
'যে কাউকে সৎ পথের দিকে ডাকল, সে আমলকারীর সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, অথচ তার থেকে কোনো কমতি করা হবে না।' (মিশকাত শরিফ, ইলম অধ্যায়)
www.bayyinah.tv
ww.gift.bayyinah.com
আমরাও কি পারব?
হ্যাঁ, আমরাও পারব ইনশাআল্লাহ। তাঁর রিসোর্স আমাদের সামনে আছে। তাঁর দিকে অগ্রগামিতাই আমাদেরকে কুরআনের আরও গভীরে নিয়ে যাবে। আমাদের ইসলামি কাজকে আরও শতগুণে কোয়ালিফাই করতে পারে। আমাদের ইসলামের দাওয়াতের পদ্ধতিতে আনতে পারে এক সৌন্দর্যময় ও প্রবলতর পরিবর্তন, যা মানুষকে ইসলামের দিকে তীব্রভাবে আহ্বান করতে প্রয়োজন হবে।
উস্তাদ নোমান আলী খান যতই পড়াশোনা করতে লাগলেন, ততই আল-কুরআনের সৌন্দর্য ও মুজিযা উপলব্ধি করতে পারলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, কুরআনের অনুবাদে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। একজন ব্যক্তি অনুবাদ পড়ে আল-কুরআনের বাণী পেতে পারে, কিন্তু সে মুজিযা পায় না। তিনি আশা করতেন যে, তিনি যেভাবে উত্তরণের পথে গিয়েছেন, সেভাবেই অন্যরাও যাক। আর এজন্য আল-কুরআনকে তাক থেকে তুলে এনে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে চাইলেন। তিনি তাঁর Information Technology-এর জব ছেড়ে দিয়ে মানুষ যাতে নিজে আল-কুরআন বুঝতে পারে, সেই স্বপ্নময় পথের দিকে ধাবিত হলেন।
যদিও তিনি ছোটো থাকা অবস্থায় রিয়াদে আরবি ভাষার ট্রেনিং শুরু করেন, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণ নেন পাকিস্তানে। তিনি পাকিস্তান জাতীয় অ্যারাবিক শিক্ষাতে শীর্ষ ১০ জনের মধ্যে থাকার কারণে স্কলারশিপ পান এবং তখন থেকেই ড. আব্দুস সামি'র তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায়ই অ্যারাবিক গ্রামারের ওপর মেথডলজিক্যালি গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। আব্দুস সামি'র ইউনিক অ্যারাবিক শিক্ষার পদ্ধতি তাকে অনেক সাহায্য করে এবং তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের জন্য আব্দুস সামি'র অনেক কাজ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তিনি অ্যারাবিকের প্রফেসরও (Nassau Community College)। তিনি আধুনিক ও ক্ল্যাসিক্যাল আরবি শিক্ষা দেন গত ছয় বছর ধরে এবং তাঁর অ্যারাবিক বই কানাডার
Jaamiah-Al-Uloom Al-Islamiyyah, Institute of Islamic Education in Ajax, Canada-তে পাঠ্য হিসেবেও আছে।
তিনি 'The Bayyinah Institute for Arabic & Quranic Studies'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এবং প্রধান ইনস্ট্রাক্টর। এ ছাড়া তিনি তাঁর অবদানের জন্য 'The 500 Most Influential Muslims'-এর মাঝেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
বর্তমানে টেক্সাসসহ ৪০টি লোকেশনে তাঁর নিয়মিত সেমিনার চলে কুরআন, তাফসির ও অ্যারাবিকের ওপর। ২০০৮ সালে ১০ দিনের 'Fundamental Arabic Course'-এ পোডকাস্টের মাধ্যমে ২৫ হাজার লোক অংশগ্রহণ করে।
প্রসেস কী? কীভাবে এক্সেস পাব?
আমাদের মূল ফোকাস থাকবে তাঁর অনন্য রিসোর্স, যার মাধ্যমে আমরা পরিপূর্ণভাবে এবং বিশেষ করে আল-কুরআনের উপরোক্ত বিষয়গুলো জানতে পারি। এজন্য www.bayyinah.tv-তে আমাদের এক্সেস প্রয়োজন।
আর্থিক সমস্যার কথা চিন্তা করে তারা স্পন্সরশিপের ব্যবস্থা রেখেছেন। এখানে এক্সেস করতে লাগে ১১২ ইউরো (প্রায় ১২ হাজার টাকার মতো), এক বছরের জন্য সাবস্ক্রিপশন ফ্রি। কীভাবে স্পন্সরশিপ পাওয়া যাবে- প্রথমে www.gift.bayyinah.com- তে গিয়ে Apply Now-এ গিয়ে সবকিছু পূর্ণ করুন। এখানে Reason for Request হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটা যত ভালো লিখবেন। তত বেশি স্পন্সরশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ ক্ষেত্রে কীভাবে লিখলে স্পন্সরশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি তার জন্য এইটা একটু দেখুন- www.tinyurl.com/mjp8bpw.
স্পন্সরশিপ পেলে আপনাকে জানিয়ে দেবে ই-মেইলে। প্রতি শুক্রবার তারা স্পন্সরশিপের ই-মেইল পাঠিয়ে থাকে। আপনাকে ই-মেইল দিয়ে দেবে- চাইলে পরিবর্তনও করতে পারবেন। একজন ব্যক্তি এটার যোগ্য এবং সে চাইলে কেবল তার পরিবার নিয়ে দেখতে বা এই রিসোর্সগুলো ব্যবহার করতে পারবে।
এ ছাড়া কেউ এখানে সাদাকায়ে জারিয়াস্বরূপ দিতে চাইলে সেটাও দিতে পারেন। এখানে তাঁর এই সিস্টেমের পদ্ধতি হলো, অর্থবানদের কাছ থেকে নিয়ে আর্থিক সমস্যাগ্রস্তদের দিয়ে একটা সেতুবন্ধন তৈরি করা! সুবহানাল্লাহ কী সুন্দর পদ্ধতি।
এ ছাড়া যাদের টাকা আছে তারা www.bayyinah.com এখান থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারেন। একটিবার ঘুরেই আসুন না।
কী পাবেন এই বাইয়ি্যনাহ টিভিতে (Bayyinah.tv)?
Arabic with Husna
এটা মূলত উস্তাদ নোমান আলী খানের অন্যতম আকর্ষণের মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কারণ, এই অ্যারাবিক-ই তাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তিনি অ্যারাবিকে টপ ১০-এর মাঝ থেকে স্কলারশিপ পেয়ে নিজে অ্যারাবিক শিক্ষার মেথড আবিষ্কার করেছেন এবং এর সাথে যোগ হয়েছে তাঁর ইন্সস্ট্রাক্টর ড. আব্দুস সামি'র অসাধারণ ও ইউনিক মেথড। এটা আপনাকে অ্যাডভান্স অ্যারাবিক শেখাবে। ভয় নেই, আগেই বলেছি এটা ইউনিক মেথড দিয়ে সাজানো, যা যেকোনো বয়সের জন্য উপযোগী। একজন বাচ্চা থেকে শুরু করে সবাই এই মেথডে উচ্চতর অ্যারাবিক শিখে কুরআনকে আরবি ভাষা দিয়েই বোঝা সম্ভব। যা তার ছোটো মেয়েকে প্র্যাক্টিক্যালি শেখানোর মধ্য দিয়েই এর নাম (Arabic with Husna) এবং সাথে ক্ল্যাসিক্যাল ও আধুনিক আরবিও জানা সহজ হবে ইনশাআল্লাহ। কিছু দূর যাওয়ার পর কুরআন থেকেই গভীর ব্যাখ্যাসহ জানতে শুরু করবেন প্র্যাক্টিক্যালি! শুধু একটু প্রচেষ্টা, করেই দেখুন না আল-কুরআনের এই ভাষাটা কতটা মাধুর্যময় ও মুজিযার সাহচর্যে ভরা!
Quran: Cover to Cover
সম্পূর্ণ কুরআনের ঐকতান-সামঞ্জস্য ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নিগূঢ় অনুবাদের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ অনুবাদে হারিয়ে গেছে। ভাবতে পারেন কত বড়ো কাজ এটি! সম্পূর্ণ কুরআনের সাথে অতি সূক্ষ্ম নিগূঢ় ও প্রত্যেকটি শব্দ, আয়াত, সূরা গুচ্ছ ইত্যাদির সামঞ্জস্য আনা হয়েছে এতে! সুবহানাল্লাহ। আমাদের হৃদয়ে কুরআন প্রবেশ না করার একটি দিক এটি। কেননা, কুরআনকে যেভাবে বোঝা উচিত সেভাবে আমরা বুঝতে পারি না, আর এই কষ্টের কাজটি আমাদের সামনে এখন হাজির, শুধু আল্লাহর রহমতে হাত বাড়িয়ে চেষ্টা করা।
Divine Speech
কুরআনের বিভিন্ন প্রশ্নের সাথে কুরআনের গোপন-আচ্ছন্ন সাহিত্যিক সৌন্দর্য ও প্রবল শক্তির ব্যাখ্যার একটা সিরিজ। কুরআনে কেন এত পুনরোক্তি, কেন গল্পসমূহের ক্রোনোলজিক্যাল শৃঙ্খলা নেই, কেন গল্পগুলো ছড়িয়ে আছে ও একই জায়গায় পূর্ণ নেই, কেন আল্লাহ বিভিন্ন জিনিসের কসম করেছেন- এইসব জিনিসের গোপন ও সৌন্দর্যের প্রবল শক্তির সাহিত্যিক ব্যাখ্যা। আমি সত্যিই অভিভূত। কারণ, আগে যা জানতাম তার থেকে এখন অনেকটা বিশুদ্ধ ও গভীরভাবে জানতে পারছি, আলহামদুলিল্লাহ।
Themes from the Quran
কল্পনা করতে পারেন, আল-কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ৭-১০ ঘণ্টার ইউনিক সিরিজ! Parenting, Shame, Hijab, The Greatest Mom, The Prophet Muhammad saws-সহ দৈনন্দিন জীবনের কাজে লাগে, এগুলোই আসবে সিরিজে। সহজ বিষয় বলে এড়িয়ে গেলে তার গভীর ব্যাখ্যার ছোঁয়া থেকে কিন্তু বঞ্চিত হবেন!
Quran In-Depth
এটা বুঝতেই পারছেন। সম্ভব হলে সূরা আর-রাহমানের লেকচারটাই একবার মাত্র শুনুন। তাহলেই এর গভীরতা বুঝতে পারবেন! Just অসাধারণ।
এ ছাড়া আরও কিছু ফিচার থাকছে যা আমি বলছি না। দেখতে দেখতে নাহয় অবাক হবেন, আল্লাহর এই বাণীর গভীর শক্তির সৌন্দর্য ও হিকমাহ দেখে!
হোক সূরা আর-রাহমানের তাফসির বা ক্ল্যাসিক্যাল বা মৌলিক অ্যারাবিক কোর্স অথবা হোক সে 'Night Story'- সর্বদা একই রকম থাকে তাঁর সেমিনার। শত শত ছেলেমেয়ে ও শিশুরা লাইন ধরে থাকে। কুরআন ও আরবির প্রফেসর হিসেবে তাঁর বাগ্মিতা সর্বদা মানুষকে আল্লাহর বাণী শিখতে প্রেরণা জোগায়।
যারা আল-কুরআনকে ভালোবেসে এর গভীরে প্রবেশ করতে চায়, যে চায় একে ভালোবেসে গভীর জ্ঞানের সাথে সংযুক্ত হয়ে ইসলামের কাজ করতে, অন্যকে আল্লাহর দিকে হিকমার সাথে সৌন্দর্য ও প্রবলতর শক্তি (মুজিযা) দিয়ে আহ্বান করতে, তারা যেন এখানে অ্যাপ্লাই করে।
'যারা এখানে উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের কাছে তা পৌঁছে দেয়। কেননা, এমন অনেক অনুপস্থিত লোক আছে, যারা উপস্থিত শ্রোতাদের তুলনায় অধিকতর ভাগ্যবান হয়ে থাকে।' (বিদায় হজের ভাষণ)
'যে কাউকে সৎ পথের দিকে ডাকল, সে আমলকারীর সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, অথচ তার থেকে কোনো কমতি করা হবে না।' (মিশকাত শরিফ, ইলম অধ্যায়)