📄 ইবরাহিম (আ.)-এর সন্তান ভাবনা
আল্লাহর ইচ্ছায় ও তাঁর অনুগ্রহে গত পাঁচ বছরে আমি পুরো আমেরিকায় ৮০টির মতো কমিউনিটিতে ঘুরেছি। প্রতিটি জায়গায় আমি দুই সপ্তাহের মতো ছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ।
আমি বড়ো হয়েছি নিউইয়র্কে। জানেন হয়তো, যখন আপনি এক জায়গায় দীর্ঘদিন থাকেন, তখন আপনার আশপাশ ছাড়া বাইরের পৃথিবীতে কী ঘটছে, সেটা সম্পর্কে আপনি অনেক সময়ই খবর রাখেন না। তো যেহেতু আমি বাইরে অনেক ঘুরি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাগুলো অনেক কিছুর ব্যাপারে চোখ খুলে দেয়। কখনো কখনো এমন কিছু হয়, যা আমি কখনোই আশা করি না। একদিক থেকে চিন্তা করলে এটা খুব ইতিবাচক।
কিন্তু অন্যদিকে আমি খেয়াল করেছি, আমাদের মুসলিম সমাজে কিছু কিছু সমস্যা আছে, যা প্রায় একই ধরনের। চাই সেটা আপনি ক্যালিফোর্নিয়া থাকেন বা বোস্টনে কিংবা টেক্সাসে অথবা আরকানসাসে। সমস্যাগুলো সব একই। এসব সমস্যার মধ্যে যা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মারাত্মক মনে হয় তা হলো- আমরা কত দ্রুত আমাদের তরুণ সমাজকে হারিয়ে ফেলছি! কত দ্রুত আমরা আমাদের সন্তানদের সাথে সম্পর্কগুলো খুইয়ে ফেলছি।
ইনশাআল্লাহ! এ বিষয়টার গুরুত্বের কথা আমি কুরআনের আলোকে আলোচনা করব। আমি আপনাদের সাথে ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করব, যেন আমরা এই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারি।
শেষে আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু তথ্য শেয়ার করব। আমরা যদি একটি সমস্যা সম্পর্কে সচেতনই না হই, তাহলে সমস্যা সমাধানের আশাই করতে পারি না। তাই প্রথম ধাপ হচ্ছে আমাদের সাবধান হতে হবে, সচেতন হতে হবে। সমস্যা যে একটা আছে- তা আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে। এরপরের ধাপ হলো, আমাদের সবাইকে একসাথে ভাবতে হবে। এর একটা সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। অবশ্যই সেটা হতে হবে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী। এরপর আমাদের মধ্যে যারা একই বিষয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের ভাবনাগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। কীভাবে আমরা পরবর্তী ধাপে এগোব, কীভাবে আমরা সমাধানে পৌঁছাব।
রোগী যদি নিজেকে অসুস্থ না মনে করি, তার তো কোনো ওষুধের দরকার নেই। কোনো প্রেসক্রিপশন নিয়ে সে চিন্তাই করবে না। একটা সমস্যা যে আছে, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া প্রথম কাজ।
আমি এখন সূরা আল-বাকারার কিছু আয়াত দিয়ে শুরু করব। খুব সংক্ষিপ্তভাবে এই আয়াতের ওপর আলোচনা করব। এটা কোনোভাবেই এই আয়াতের বিস্তারিত তাফসির নয়। কিছু রিমাইন্ডার মাত্র।
ইবরাহিম (আ.) অনেক অনেক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। হজের সময় আমরা ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে অনেক খুতবা শুনি। কত বিশাল উচ্চতা তিনি অর্জন করেছিলেন! উনি যখন ওগুলো অর্জন করলেন, সবকিছু অর্জনের পর আল্লাহ তাঁকে সার্টিফিকেট দিলেন। এই আয়াত হচ্ছে ওই সার্টিফিকেট সম্পর্কে। আল্লাহ তায়ালা বলছেন-
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَتَهُنَّ. 'যখন ইবরাহিম-কে তাঁর রব পরীক্ষা করলেন...' সূরা বাকারা: ১২৪
ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ খুবই ভালোভাবে পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি সবগুলো পরীক্ষাই অতিক্রম করলেন। সব পরীক্ষার শেষে আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে বলেছেন, 'আমি অবশ্যই তোমাকে মানুষের ইমাম বানালাম। আমি তোমাকে মানব সমাজের জন্য এক অনুসরণীয় ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলাম।'
এই হচ্ছে সেই সার্টিফিকেট। এই হচ্ছে সেই সম্মানের স্মারক; যা অনেক কঠিন পরীক্ষা দেওয়ার পর ইবরাহিম (আ.)-কে দেওয়া হয়েছিল। আমরা কল্পনাও করতে পারব না, একটা মানুষ কীভাবে এই ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে পারে, যেসব পরীক্ষা ইবরাহিম (আ.)-কে দিতে হয়েছিল!
এই যে আমরা কত সহজে বলে ফেলি, তিনি আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। আমরা কত সহজে বলি যে, তিনি নিজের সন্তানের গলায় ছুরি বসিয়েছিলেন। আমাদের বাচ্চা একটা কাঁটা চামচ ধরলেই আমরা বলি, 'এই! ওটা রেখে দাও, এটা বিপদজনক।' আপনি বিচলিত হয়ে পড়েন। যদি আপনার সন্তান চুলার একটু বেশি কাছে যায় আপনি কী করেন? আর এখানে এই মানুষটা যে নিজের সন্তানের গলায় ছুরি ধরেছে, সুবহানআল্লাহ। এটা বলা সহজ, কিন্তু নিজেকে সে জায়গায় বসানোর চেষ্টাটা অনেক কঠিন।
এরপর তাঁর সামনে এলো সেই পরীক্ষা, তাঁর পরিবারকে মরুভূমির মাঝে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে রেখে আসা। আমাদের পরিবারকে যখন আমরা কোথাও রেখে আসি, যেমন ধরুন- আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকে আপনার ফ্যামিলিকে আনতে হবে। আপনার হয়তো এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। আপনি ২০টা মিসড কল পাবেন। এদিকে আপনি বিচলিত। তোমরা কোথায়! সব ঠিক আছে? তারা হয়তো শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত এয়ারপোর্টের বিশাল পরিসরের কোনো এক বেঞ্চে বেশ নিরাপদেই বসে আছে। আর আপনি উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছেন। অথচ এখানে ইবরাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে মরুভূমির মাঝখানে রেখে এলেন! যেখানে মৃত্যু প্রায় সুনিশ্চিত। এরপরও তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওপর পুরো ভরসা করে তাঁদের রেখে এলেন। এটি কোনো সহজ কাজ নয়।
তো, উনি এই সমস্ত পরীক্ষাগুলোর মধ্যে দিয়ে গেলেন। আল্লাহ বললেন- 'তুমি পাশ করেছ, তুমি এখন থেকে মানব সমাজের ইমাম।' আপনারা জানেন ওই পরীক্ষাগুলো সহজ কিছু ছিল না। যখন তাঁর সাথে ভালো বা মন্দ যা কিছুই ঘটত, তিনি প্রথমেই স্মরণ করতেন আল্লাহ তায়ালাকে।
ইবরাহিম (আ.) বলেছেন- الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِيْنِ، وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ، وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ. 'তিনিই হচ্ছেন সেই সত্তা (আল্লাহ), যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনিই আমাকে পথ দেখান। তিনিই আমাকে আহার করতে দেন। তিনিই আমাকে পান করতে দেন। যখন আমি অসুস্থ হই, তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন।' সূরা শুআরা: ৭৮-৮০
যা কিছুই তাঁর জীবনে ঘটুক, তিনি কাকে মনে করেন? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে।
আল্লাহ বলেছেন, একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড়ো উপহার হলো আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এতগুলো কঠিন পরীক্ষার পর আল্লাহ যখন তাঁকে সবচেয়ে সেরা উপহারটি দিলেন, আপনি তখন কী আশা করেন? আপনি আশা করবেন উনি বলবেন, 'আলহামদুকা ইয়া রাব্বি' সমস্ত প্রশংসা আপনার, কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি। এটা আমার জন্য অনেক সম্মানের। আমি আপনার নগণ্য বান্দা।'
কিন্তু এর বদলে আপনি দেখবেন, ইবরাহিম (আ.) বললেন, 'ওয়ামিন জুররিয়্যাতি' আমার পরের প্রজন্মের কী হবে? 'জুররিয়্যা' কথাটা 'আবনায়ি ওয়া আওলাদি'র থেকে আলাদা। 'জুররিয়্যা' মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
আল্লাহ তাঁকে মানবজাতির ইমাম করলেন, আর তিনি চিন্তিত তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে। তিনি আগে থেকেই ভাবছেন ৩, ৪, ৫ প্রজন্ম, ১০, ২০, ৩০ প্রজন্মের কথা। এটা হচ্ছে একজন জিনিয়াসের ভাবনা। এটা হচ্ছে এমন একজনের মাইন্ডসেট, যিনি সত্যিকারভাবে এই পৃথিবীতে তাঁর ভূমিকা কী- তিনি তা ভালো করেই জানেন।
মুসলিমরা অমুসলিমদের থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা। তাদের সাথে আমাদের ভাবনার ধরন আলাদা। আমাদের ভাবনা-চিন্তা দীর্ঘমেয়াদি। দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা বলতে আমি বলছি না- ভবিষ্যতের কথা ভাবুন এবং বাড়ি নিন মর্টগেজে। আমি ওই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলছি না। আমি বলছি সেই দীর্ঘমেয়াদের কথা, যেখানে আল্লাহর কাছে আমরা বিনা মর্টগেজে ঘর পাব। এটা হচ্ছে আসল দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান।
আমরা মুসলিম। ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ যেকোনো সময়ে মারা যেতে পারে। তারপরও তিনি বীজ বুনে যাচ্ছেন এই ভেবে যে, একসময় গাছ বড়ো হবে এবং কেউ একজন এর ছায়ায় বসবে।
তিনি ওই গাছ দেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু তিনি ভাবছেন ভবিষ্যতের কথা। আমরা এ রকমই। এটা আমাদের সাদকায়ে জারিয়া। আমরা সব সময়ই আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত; আমাদের এ রকমই হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যে সমাজে ভবিষ্যতে কী হবে তা তারা ভাবে না। কীভাবে এই সমাজ ভবিষ্যতের পরোয়া করে না, তা ছোট্ট একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। এই দেশের কিছু ধনী ব্যক্তি ধনী হয়েছে কীভাবে? সুদভিত্তিক ব্যবসা করে।
এই সুদনির্ভর অর্থনীতিকে, খুবই সাদামাটাভাবে বললে, এই যে ডোনাল্ড ট্রাম্প!
এই লোকটি বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের অন্যতম তাই না? তিনি যদি এই মুহূর্তে তার সমস্ত দেনা শোধ করে দেন, দেনার প্রতিটি পাই-পয়সা মিটিয়ে দেন, তাহলে কী হবে? উনি শূন্যেও থাকবেন না। তিনি থাকবেন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মাইনাসে। উনি মিনিমাম পেমেন্ট দেন এই সম্পত্তিতে, মিনিমাম পেমেন্ট অন্যটাতে, সবগুলো ভাড়া দেন। এরপর আবার সব রিফাইন্যান্স করেন, তারপর আবার অন্য প্রপার্টি ধরেন। এই মানুষটির দেনার ওপর দেনা। দেনার পর দেনায় ডুবে আছেন, তিনি শুধু সবগুলোতে মিনিমাম পেমেন্ট দিয়ে যাচ্ছেন। তার দেনা সব শেষ করতে করতে হয়তো তিনশো বছর লাগবে। উনি কি এর আগে মারা যাবেন না? তিনি ভাবছেন আমি করে যাই, আর মারা গেলে ওটা তখন অন্যের সমস্যা, কাজেই আমার কীসের চিন্তা!
এগুলো আখিরাতে অবিশ্বাসী মানুষের চিন্তা। আমি আগে বাঁচি। আমি আমাকে নিয়ে চিন্তিত; অন্যদের নিয়ে নয়। তো আপনি জানেন আল গোর (২০০০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী) চেঁচাচ্ছেন ৫০ বছর পর গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে। তিনি বলতে পারতেন, আরে চিন্তা কীসের! আমি মরে যাব ১০ বছরের মধ্যে, আমি পাত্তা দিই না। এটা আমার সমস্যা না।
আমাদের সন্তানরা কী পরিমাণ ঋণের চাপে পড়বে, সেটা কে ভাবে? আমাদের নিজেদেরই এখনো কত সমস্যা! তো এই সমাজ হচ্ছে মানুষের অবস্থার একটা দৃষ্টান্ত। আমরা দ্রুত সবকিছু পেতে চাই। আমরা দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করি না। কিন্তু আল্লাহ তাঁর কিতাবে আমাদেরকে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে। তো আমরা যখন এই দেশে (আমেরিকায়) আসি অর্থাৎ মুসলমানেরা এই দেশে আসি, বেশির ভাগই ইমিগ্রান্ট। যখন আমরা দীর্ঘমেয়াদের কথা চিন্তা করি, আমরা ভাবি আমাদের সন্তান কোন স্কুলে যাবে, কোন কলেজে যাবে, কোথায় বাড়ি কিনব। এই হচ্ছে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা।
আমি বলছি অন্যরকম দীর্ঘমেয়াদের কথা। আমি কীভাবে নিশ্চিত করব যে, আমার পর আরও ৩, ৪, ৫ প্রজন্ম পর তারাও বলবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আর তারা অন্যদেরও শেখাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আমি কীভাবে এটা করব, এটা হচ্ছে আসল দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা। যদি আপনার সন্তান স্কুল থেকে বেরিয়ে ভালো ডিগ্রি নিয়ে, ভালো চাকরি পেল এবং খুব ধনী এক পরিবারে বিয়ে করল। কিন্তু এরপর 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' হারিয়ে ফেলল এক প্রজন্মেই! আপনি সফল হলেন নাকি ব্যর্থ হলেন, ভেবে দেখুন। এর জবাব কে দেবে?
ইবরাহিম (আ.) এটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই আল্লাহ যখন বললেন, 'আপনি ইমাম।' উনি বললেন- 'এটা যথেষ্ট নয়। আমি আমার সন্তানদের জন্য দায়ী। আর ওরা যদি ভালো না হয়, তাহলে ওদের সন্তানেরা হবে আরও খারাপ এবং তাদের সন্তানাদি হবে তার চেয়েও খারাপ। আমি তাদের জন্য জবাবদিহি করতে চাই না।'
একজন মানুষ যত ভালো কাজ করুক, শুধু একবার ভাবুন, আপনার মিলিয়ন মিলিয়ন ভালো কাজ আছে। পাহাড় সমান পুণ্য আপনার। কিন্তু আপনি যদি আপনার সন্তানদের ঠিকভাবে বড়ো করতে না পারেন এবং তারা ধর্ম হারিয়ে ফেলে! সেটা আকিদায় হোক, তাদের বিশ্বাসে বা ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে হোক। তারা যদি ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে এর শুরুটা হলো আপনার গাফলতি দিয়ে। বিচার দিবসে আপনার সমস্ত পুণ্য কি ওইসব সম্মিলিত খারাপের সাথে পাল্লা দিতে পারবে?
অসম্ভব! কক্ষনো না!
বাবা-মায়ের জন্য এটা অনেক বড়ো দায়িত্ব। অনেক বড়ো চ্যালেঞ্জ। প্রত্যেক বাবা-মা হলেন ইমাম। প্রত্যক বাবা পরিবারের ইমাম। যখন আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে ইমাম মনোনীত করলেন, তিনি কাদের ওপর তাঁর ইমামতি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন? তাঁর নিজের সন্তানদের নিয়ে, সবার আগে তাঁর নিজ সন্তানদের নিয়ে। আল্লাহ তাঁর দুআর জবাবে বললেন- قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ. 'আমার অঙ্গীকার অত্যাচারীরা লাভ করবে না।' সূরা বাকারা: ১২৪
উনি যখন এই বলে দুআ করলেন, আমার সন্তানদের কী হবে, তখন আল্লাহ বললেন- 'না! আমার প্রতিশ্রুতি অবিচারকারীদের জন্য নয়।'
ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ বললেন, 'এই কথাগুলোর মাঝেই যে, তোমার সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ হবে অবিচারকারী। এদের সবাই পুণ্যবান হবে না।' আমরা জানি, ইবরাহিম (আ.)-এর প্রজন্মের বেশি সংখ্যকই অবাধ্য। কুরাইশরা কি ইবরাহিম (আ.)-এর বংশধর ছিল না? তারা কি জালিম ছিল না? অবশ্যই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তো যখন ইবরাহিম (আ.) এ কথা শুনলেন, আমি নিশ্চিত কথাটা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল। তো উনি এরপর কী করলেন? উনি কি থেমে গিয়েছিলেন? না! উনি আল্লাহর কাছে আরেকটা দুআ করলেন।
তখন তাকে আল্লাহর ঘর নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। উনি যখন আল্লাহর ঘরের দিকে যাচ্ছেন তখন দুআ করলেন-
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقُ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ.
'হে প্রভু! এই শহরকে শান্তিময় করে দাও এবং এর বাসিন্দাদের জন্য সব ধরনের ফলমূল দান করো।' সূরা বাকারা: ১২৬
উনি দুই ভাগে দুআ করলেন। উনি বললেন, এই শহরকে নিরাপদ রাখো এবং দ্বিতীয়ত, ওরা যেন সব ধরনের জীবিকা অর্জন করতে পারে।
সাহিত্যে একটি কথা আছে, শান্তি ও সমৃদ্ধি। পলিটিক্যাল সাইন্সে আপনি জানবেন, একটা সমাজ সুষ্ঠুভাবে চলার জন্য প্রথম যা দরকার, তা হলো আইনের শাসন, অর্থাৎ শান্তি। যদি আপনার ঘর নিরাপদ না থাকে, আপনার দোকান, আপনার অফিস, আপনার টাকা-পয়সা নিরাপদ না থাকে, তাহলে সে রকম সমাজে আপনি চলতে পারবেন না। আবার আপনার যদি শান্তি থাকে, কিন্তু কোনো চাকরি-বাকরি না থাকে, আয়-রোজগারের কোনো উপায় না থাকে, যদি ব্যবসা করার পথ না থাকে, তাহলে সেই সমাজে কি টিকে থাকতে পারবেন? না! তো আপনার দরকার শান্তি এবং সমৃদ্ধি।
এই মানুষটির দুআয় কত চিন্তাশীলতা দেখুন। উনি বললেন, এই শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং এদেরকে সব ধরনের ফলমূল দান করুন। কিন্তু এর সাথে একদম শেষে উনি ছোট্ট একটা দাবি যোগ করলেন। ইবরাহিম (আ.) বললেন-
مَنْ آمَنَ مِنْهُمْ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ.
অর্থাৎ আপনি আমার সেই সন্তানদেরই শুধু দিন, যারা আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস রাখে। আল্লাহ ওনাকে বলেছিলেন- 'আমার প্রতিশ্রুতি অবিচারকারীদের জন্য নয়।' উনি বললেন- 'ঠিক আছে এই শহরকে শান্তির শহর করে দিন' এবং এর মানুষদের জন্য সব ধরনের রিজিকের ব্যবস্থা করে দিন; কিন্তু শুধু ঈমানদারদের জন্য। অন্যকথায়- অবিশ্বাসী, পাপী সন্তানদের জন্য নয়। ওরা দুর্ভিক্ষে পড়ুক। তাদের বংশ নির্বংশ হয়ে যাক। কারণ, আমি ওদের জন্য জবাবদিহি করতে পারব না। আমি শুধু আমার ঈমানদার সন্তানদের জন্য জবাব দেবো।'
কী ভীষণ বিচক্ষণ দুআ! সুবহানআল্লাহ। উনি বললেন, 'শুধু যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে'। আল্লাহ তায়ালা এর জবাবে বললেন-
وَمَنْ كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَى عَذَابِ النَّارِ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ.
'যারা অবিশ্বাসী আমি তাদেরকেও উপভোগ করতে দেবো। এরপর তাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামের আগুনে ঠেলে দেবো। কী ভয়াবহ সেই আবাস!' সূরা বাকারা: ১২৬
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন, উনি কি সেটা একা করেছিলেন? ওনার সাথে কে ছিল? ইসমাইল (আ.)। তো ইবরাহিম (আ.)-এর বিচক্ষণতা আপনি দেখতে পারছেন।
আমরা মনে-প্রাণে কোনো কিছু আল্লাহর কাছে কখন চাই? যখন আমার কোনো কিছু খুব দরকার। খুব প্রয়োজন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ছাত্ররা এমন করে। আগামীকাল তোমার ফাইনাল পরীক্ষা, তুমি কোনো পড়াশোনা করনি এবং তুমি এই পাঁচ মিনিট আগে বললে, 'ইয়া আল্লাহ'... 'পরীক্ষা'। হঠাৎ তোমার মনে পড়ল আল্লাহর কথা। আল্লাহকে স্মরণ করছ সুবিধামতো, নিজের যখন দরকার। কিন্তু আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়ার সবচেয়ে সেরা সময় হচ্ছে যখন তুমি আল্লাহকে খুশি করার মতো কিছু করেছ। চাওয়ার জন্য সেটা হচ্ছে সবচেয়ে সেরা সময়। তুমি জানো সেরা সময় কখন? নামাজের পর!
তুমি এইমাত্র আল্লাহর কথা মানলে। এখন দুআ করো, আল্লাহর কাছে চাওয়ার সবচেয়ে সেরা জায়গার একটা হলো আল্লাহর ঘর। যখন তুমি ওখানে যাও, তা আল্লাহর প্রতি বাধ্যতার একটি শ্রেষ্ঠ কাজ। এটা হচ্ছে চাওয়ার জন্য সেরা সময় আল্লাহর কাছে চাওয়ার আরেকটা সেরা সময় হলো, রাতের শেষ ভাগ। কারণ, তখনই তুমি আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে ভালোভাবে বাধ্যতা দেখালে। দুআর জন্য শ্রেষ্ঠ সময় হলো রমজান মাস। কারণ, তখন তুমি আল্লাহর প্রতি বাধ্য থাকছ। তখন আল্লাহর কাছে চাও।
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর প্রতি বাধ্যতার সেরা একটি কাজ করছেন। তিনি তাঁর ছেলেকে সাথে নিয়ে এই পৃথিবীতে আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন। এটা সম্ভবত আবারও তাঁর কাছে চাইবার জন্য সেরা সময় তাই না? তো তিনি আবারও চাইলেন। কিন্তু তিনি জানেন, আল্লাহ একবার না বলেছেন। তিনি নিজের দুআ পরিমার্জিত করছেন।
প্রথম দুআ, রাব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না- 'হে আমাদের প্রভু, আপনি আমাদের থেকে কবুল করুন'। দেখুন আগের দুআয় ছিল, 'হে আমার প্রভু এই শহরকে শান্তিময় করে দিন'। 'রাব্বি' মানে আমার প্রভু। এখন উনি কী বললেন? 'রাব্বানা' আমাদের প্রভু! উনি কাকে সঙ্গে নিলেন? তাঁর ছেলেকে! এইবার আমি আল্লাহর ঘর নির্মাণ করছি এবং আমি দুআ করতে যাচ্ছি, কিন্তু আমি আমার সাথে আমার সন্তানকেও এই দুআয় শামিল করছি। যাতে অন্ততপক্ষে এই ছেলের ব্যাপারে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দেন।
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ .
'হে আমাদের প্রভু, আমাদের দুজন থেকে কবুল করে নিন। নিঃসন্দেহে আপনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞাতা।' সূরা বাকারা: ১২৭
সুবহানআল্লাহ। তো উনি একটা ছেলের ব্যাপারে নিশ্চিত করলেন। পরবর্তী আয়াত এই দুআরই ধারাবাহিকতা, যার মানে হলো আল্লাহ কিছু বললেন না। আল্লাহ জবাবে নীরব থাকলেন এবং নীরবতা মানে কী? কবুল করা। আল্লাহ তাঁর দুআ কবুল করলেন এবং তিনি আবারও বলতে শুরু করলেন। যেহেতু আরও আগেই আল্লাহ কবুল করেছেন, তাই উনি থামলেন না। বললেন-
رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُسْلِمَةً لَكَ.
'হে আমাদের প্রভু! আমাদের দুজনকেই আপনার কাছে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করার তাওফিক দিন। এবং আমাদের বংশধর থেকে এমন এক জাতি সৃষ্টি করুন, যারা হবে আপনার প্রতি সমর্পিত।' সূরা বাকারা: ১২৮
আল্লাহ তো তাঁকে ইমাম বানিয়েছেনই, তাহলে এই দুআ কেন? তিনি তো আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেনই। তিনি কি আগেই আল্লাহর কাছে পূর্ণ সমর্পন করেননি? সুবহানআল্লাহ! তাহলে তিনি এই দুআ এখন কেন করছেন? কারণ, তিনি তাঁর ছেলেকে এখানে অন্তর্ভুক্ত করছেন। তিনি বলেছেন, আমাদেরকে আপনার প্রতি পরিপূর্ণভাবে সমর্পিত করুন। আমার সন্তানদের মধ্য থেকে, সব সন্তানদের থেকে নয়, সন্তানদের মধ্য থেকে। কারণ, 'মিন' এখানে একটা অংশের কথা বলা হচ্ছে, তাই না? অন্তত আমার সন্তানদের মধ্য থেকে কেউ কেউ হবে মুসলিম উম্মাহ, এক উম্মাহ, এক দল, এক জাতি। যারা শুধু আপনার (আল্লাহ) কাছেই সমর্পণ করবে, অন্য কারও কাছে নয়।
এক দল হবে যারা শুধু আপনার কাছেই আত্মসমর্পণ করবে। আমার সন্তানদের কেউ কেউ হবে জালিম, কিন্তু অন্তত কিছু সন্তানদের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিন।
সবার ব্যাপারে না দিন, কিন্তু কিছু সন্তানের ব্যাপারে অন্তত প্রতিশ্রুতি দিন, যারা আপনার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করবে। আমাদেরকে আনুষ্ঠানিকতাগুলো দেখিয়ে দিন। আমরা ঘর নির্মাণ করেছি। আমরা জানি না, কীভাবে এই ঘরে প্রার্থনা করতে হয় এবং কীভাবে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে হয়। আমরা কীভাবে তাওয়াফ করব, কীভাবে নামাজ পড়ব; তা আমাদের শেখান। আমাদের এই ইবাদতগুলো শেখান এবং আমাদের তওবা কবুল করুন।
আপনারা জানেন, আমরা কখন তওবা করি, যখন কোনো গুনাহ করি, যখন কোনো পাপ করি, তখনই তওবা করি। উনি কেন তওবা করছেন? তিনি কি কোনো ভুল কিছু করেছিলেন? তিনি ছিলেন একজন সেরা রাসূল । তো কীসের তওবা করেছিলেন তিনি? এখান থেকে যে কল্যাণটা আমরা নেব, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যখন আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিছু করেন। ধরুন, এইমাত্র আমরা নামাজ পড়লাম। আমরা কি আমাদের নামাজে ভুল করি? আমাদের অজুতে কি ভুল থাকে? আমাদের মন কি বিক্ষিপ্ত থাকে? রাতে কী খাব? ওরা বলল, রাতে খাওয়া-দাওয়া হবে না। তো যখন রুকু থেকে উঠেন, আপনার পেট মোচড় দিয়ে উঠে, আর আপনি বলেন 'আহ, আমি ভাত চাই'। এসব আমাদের মাথায় ঘুরতে থাকে। তো এটা কি নামাজে গাফেলতি নয়? অবশ্যই। তো আপনি নামাজ পড়েছেন মানে এই নয়, আপনি সবচেয়ে ভালোভাবে নামাজ পড়েছেন। এজন্য আপনার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এমনকী যেসব কাজ শুধু তাঁর জন্যই করছেন, সেগুলোর জন্যও। তিনি আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন, অথচ দেখুন তাঁর বিনয়। আমি আপনার ঘর বানাচ্ছি, আমি হয়তো যে জায়গায় ইট রাখার কথা সেখানে রাখিনি। হয়তো আমি ভুল করেছি, হয়তো আমি জানিই না আমার ভুলটা কী। তো আমি যদি আমার অজান্তেই কোনো ভুল করে থাকি, আমি আমার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছি। আমাদের তওবা কবুল করুন।
এই জিনিসটা ইবরাহিম (আ.) থেকে আমাদের শেখার আছে। আমরা মানুষকে বলি ইস্তেগফারের কথা। আরে আমি তো কোনো ভুল করিনি! আমি কেন ইস্তেগফার করব? আপনি অনেক ভুল করেছেন। আমরা অনেক ভুল করেছি। জেনে হোক বা না জেনে। উনি তওবা করলেন। এরপর আল্লাহ কিছু বললেন না, এর মানে হলো, তিনি তার দুআ কবুল করে নিয়েছেন। এরপর তিনি আবারও শুরু করলেন।
তিনি বললেন-
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ .
'হে আমাদের রব! তাদের কাছে তাদের মধ্য হতে এমন একজন বার্তাবাহক প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন।' সূরা বাকারা: ১২৯
উনি খুব সাবধানে ভাবছেন, আল্লাহ ওনাকে কী বলেছেন। উনি খুব মেপে কথা বলছেন। উনি বললেন, 'হে আমাদের প্রভু! আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে একজনকে আপনি রাসূল হিসেবে মনোনীত করুন। শুধু একজন রাসূল নয়, তাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল। এটি অসাধারণ বিচক্ষণতা।
যদি একজন রাসূলের কথা বলা হয় এবং তিনি যদি বাইরের লোক হন, তখন মানুষ বলবে, আমি তোমার কথা শুনতে চাই না! তুমি তো ভিনদেশি। মানুষ ভিনদেশি মানুষের কথা শুনতে চায় না। যখন আপনাদের কেউ পাকিস্তান বা ভারত থেকে আসেন, আর আপনার সন্তানরা পুরো আমেরিকান; যখন ওরা পাকিস্তানে যায়, কেউ তাদের কথা শুনতে চায় না। মানুষ তাদের কথা বলা নিয়ে ঠাট্টা করে। আবার যখন আরব বিশ্বের কেউ এখানে আসে অথবা সুদান, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া থেকে, তারা ইংরেজি বলতে পারে না। তারা এখানে এসে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে চাইলে লোকজন কি তাদের কথা ভালো করে শোনে? না, শোনে না। তারা শোনে না কারণ, তারা পরিচিত নয়। তারা বহিরাগত। তো যেকোনো ধর্মেই বহিরাগতদের দেখা হয় অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে। তারা নেতা হতে পারে না। তারা বাইরের লোক।
উনি দুআ করলেন যেন, তাঁর প্রজন্মের মধ্য থেকে রাসূল মনোনীত করেন। যেন যখন তিনি কথা বলবেন, তখন অন্যরা শোনে। এমন একজন বার্তাবাহকের মানে কী, যদি মানুষ তাঁর কথা না-ই শোনে? তো তিনি বললেন যে, তিনি সাধারণ কোনো একজন রাসূল নয়; বরং তিনি তাদেরকে অত্যাশ্চর্য নিদর্শন পড়ে শোনাবেন। তিনি তাদেরকে এমন সব বিষয় পড়ে শোনাবেন যা তাদের মোহমুগ্ধ করবে এবং আপনার নিকটবর্তী করবে। যাতে তারা এক কাতারে থাকে। তারা মুসলিম থাকে। তিনি তাদের কিতাব শিক্ষা দেবেন এবং তিনি তাদের প্রজ্ঞার শিক্ষা দেবেন। সেইসাথে তিনি তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন।
এটা ইবরাহিম (আ.)-এর খুব চিন্তাশীল দুআ ছিল। আমরা আমাদের শৈশবে শিখেছি, তাঁর এই দুআর ফলেই আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ-এর আগমন। আপনি দুআর শক্তি বুঝতে পারছেন? ইবরাহিম (আ.) এই দুআ করলেন, কোন মোটিভেশন থেকে? ওনার মোটিভেশন ছিল, 'আমার সন্তানেরা'। একজন পিতা আন্তরিকভাবে তাঁর প্রভুর কাছে চাইলেন এবং তাঁর প্রভু এর জবাব দিলেন। ইবরাহিম (আ.)-এ দুআর সর্বশ্রেষ্ঠ জবাব মানবজাতি দেখল নবিজির আগমন। কখনো দুআর শক্তিকে তাই খাটো করে দেখবেন না। কখনো দুআর শক্তি তুচ্ছ করে দেখবেন না।
আমরা এখন এই যে ঐশী গ্রন্থ কুরআন পড়ছি, এটা এসেছে একটি দুআর ফলে। এটা এসেছে একটি দুআর জবাবে। পুরো বিশ্বের শতশত নয়, মিলিয়ন মিলিয়ন নয়, বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ বলছেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আল্লাহ একদিন তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন, পবিত্র করবেন, উনি তাদের জন্য কিতাব পড়বেন। এটা হচ্ছে একজন উদ্বিগ্ন পিতা, যিনি অগ্রিম ভাবেন, আগে থেকে চিন্তা করেন।
ইবরাহিম (আ.)-এর এই উত্তরাধিকার থেকে কে সরে যাবে? কে অত বোকা? আল্লাহ তায়ালা জানাচ্ছেন-
وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ.
'ইবরাহিমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফিরিয়ে নেয়! তবে সে ব্যক্তি, যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।' সূরা বাকারা: ১৩০
পিতৃত্ব বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য থাকায় আমি এ কথাগুলো শেয়ার করলাম। এতে আছে আগামী প্রজন্মের জন্য উদ্বেগের কথা। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
وَوَفَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيْهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ.
'ইবরাহিম (আ.) এবং ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের অসিয়ত করলেন যে, “হে আমার সন্তানেরা, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য এই ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা পরিপূর্ণ মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না." সূরা বাকারা: ১৩২
আমাদের সময়ে মা-বাবারা সন্তানদের বলেন, খবরদার! অঙ্কে ৯০-এর নিচে যেন না পাও। খবরদার! তোমার বন্ধুদের সাথে যাবে না। খবরদার! এটা করবে না, ওটা করবে না। আর উনি তাঁর সন্তানদের বলছেন, আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া খবরদার মারা যাবে না। এটা আল্লাহর তরফ থেকে এক উপহার তোমাদের জন্য। এটা তোমাদের জন্য উপহার। এই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-খবরদার! তোমরা এটা খোয়াবে না। এটা হচ্ছে একজন উদ্বিগ্ন বাবার উপদেশ।
এই সুন্দর দুআ যখন তিনি করলেন, 'রাব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না', তাঁর সাথে কে ছিল? ইসমাইল (আ.)। কিন্তু এরপরে যে নবির কথা এসেছে উনি কে? ইয়াকুব (আ.)। উনি কার সন্তান ছিলেন? ইসহাক (আ.)-এর। সেই ছেলে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তো আল্লাহ শুধু তাঁর সন্তান এবং তাঁর বংশধরদের দুআই কবুল করেননি। তিনি ইসহাক (আ.) এবং তাঁর বংশধরদের দুআরও জবাব দিয়েছেন। তাদের মধ্যকার অন্যদের প্রার্থনার জবাবও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দিয়েছেন। আর তারাও সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন পিতা হিসেবে বেড়ে উঠেছিল। ইয়াকুব (আ.) ছিলেন শ্রেষ্ঠ বাবাদের একজন, যাঁর কথা আমাদের কিতাবে একজন আদর্শ বাবা হিসেবে উল্লিখিত আছে।
তারপর কুরআনে বলা হলো- أَمْ كُنْتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِنْ بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَهَكَ وَإِلَهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَهَا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ.
'তোমরা কি উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বলল, "আমার পর তোমরা কার ইবাদাত করবে?” তারা বলল, আমরা তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের উপাস্যের ইবাদাত করব। তিনি একক উপাস্য। এবং আমরা তাঁর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পিত।"" সূরা বাকারা : ১৩৩
দেখুন, যখন মৃত্যু ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে উপস্থিত হলো, ওনার ছেলেরা ওনার পাশে, তাঁর সেবা করছে, পানি দিচ্ছে, কাঁদছে আর উনি ওদের নিয়ে চিন্তিত। উনি এটা নিয়ে চিন্তিত না যে, কাদেরকে ওরা বিয়ে করবে, কোথায় তারা থাকবে, কোথায় সম্পদ খরচ করবে, খেয়াল করে দেবে। ওসব কিছু না।
একদম না। অবশ্যই কলেজের পড়াশোনা শেষ করবে, ওসব নিয়ে কোনো চিন্তা না; বরং তিনি বলছেন, 'ও আমার ছেলেরা! নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দ্বীন মনোনীত করেছেন। সুতরাং খবরদার! মুসলিম হওয়া ছাড়া তোমরা মৃত্যুবরণ করবে না।' এরপর উনি বললেন, 'আমার মৃত্যুর পর তোমরা কীসের ইবাদত করবে? আমি চলে গেলে তোমরা কী করবে? কীসের প্রার্থনা করবে?' উনি এটা বলেননি, মান তা'বুদুনা- কার প্রার্থনা করবে? উনি বলছেন, 'মা তা'বুদুনা'-কীসের প্রার্থনা করবে? যার মানে হলো, উনি তাদেরকে ধাঁধায় ফেলে জানতে চাইছেন। তোমরা কী করবে? কী ধরনের উপাসক গ্রহণ করবে? তারা জবাব দিলো, 'আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার পিতা ইবরাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.) ও ইসহাক (আ.)-এর ইলাহর ইবাদত করব এবং আমরা সম্পূর্ণরূপে তাঁর কাছেই সমর্পিত।'
আমি এখানে কিছু সত্যিকার বাস্তবতা শেয়ার করছি। আসুন, আমরা এইমাত্র যা শিখলাম তার সাথে নিজেদের তুলনা করি। এটা আগেকার দিনের কাহিনি। ওনারা ছিলেন অসাধারণ সন্তান। এই প্যারার শেষে আল্লাহ কি বলছেন জানেন? আল্লাহ বলছেন-
تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُمْ مَّا كَسَبْتُمْ وَلَا تُسْأَلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ.
'তারা ছিল এক জাতি যারা বিগত হয়েছে। তারা যা করেছে তা তাদেরই জন্য। তোমরা যা অর্জন করবে তা তোমাদের জন্য। তাদের কর্ম সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না।' সূরা বাকারা: ১৩৪
ভাববেন না যে, 'ওহ! ওসব ছিল সুসময়'... না। তারা পেয়েছে তাদেরটা। আপনি পাবেন আপনারটা। আপনারটার জন্য আপনাকেই কাজ করতে হবে। তারা যা করেছেন, সেজন্য আপনাকে প্রশ্ন করা হবে না। আপনাকে প্রশ্ন করা হবে আপনি কী করেছেন তা নিয়ে।
সবশেষে আল্লাহর কথা হচ্ছে, এ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদেরকে বদলাও। আপনি ওসব ঐতিহাসিক নামগুলো জানেন কি না, সংখ্যাগুলো, তারিখগুলো বা ইয়াকুব (আ.)-এর সব সন্তানের নাম জানেন কি না, এসব নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করা হবে না। আপনাকে প্রশ্ন করা হবে আপনি আপনার সন্তানদের নিয়ে কী করেছেন?
আল্লাহর ইচ্ছায় ও তাঁর অনুগ্রহে গত পাঁচ বছরে আমি পুরো আমেরিকায় ৮০টির মতো কমিউনিটিতে ঘুরেছি। প্রতিটি জায়গায় আমি দুই সপ্তাহের মতো ছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ।
আমি বড়ো হয়েছি নিউইয়র্কে। জানেন হয়তো, যখন আপনি এক জায়গায় দীর্ঘদিন থাকেন, তখন আপনার আশপাশ ছাড়া বাইরের পৃথিবীতে কী ঘটছে, সেটা সম্পর্কে আপনি অনেক সময়ই খবর রাখেন না। তো যেহেতু আমি বাইরে অনেক ঘুরি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাগুলো অনেক কিছুর ব্যাপারে চোখ খুলে দেয়। কখনো কখনো এমন কিছু হয়, যা আমি কখনোই আশা করি না। একদিক থেকে চিন্তা করলে এটা খুব ইতিবাচক।
কিন্তু অন্যদিকে আমি খেয়াল করেছি, আমাদের মুসলিম সমাজে কিছু কিছু সমস্যা আছে, যা প্রায় একই ধরনের। চাই সেটা আপনি ক্যালিফোর্নিয়া থাকেন বা বোস্টনে কিংবা টেক্সাসে অথবা আরকানসাসে। সমস্যাগুলো সব একই। এসব সমস্যার মধ্যে যা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মারাত্মক মনে হয় তা হলো- আমরা কত দ্রুত আমাদের তরুণ সমাজকে হারিয়ে ফেলছি! কত দ্রুত আমরা আমাদের সন্তানদের সাথে সম্পর্কগুলো খুইয়ে ফেলছি।
ইনশাআল্লাহ! এ বিষয়টার গুরুত্বের কথা আমি কুরআনের আলোকে আলোচনা করব। আমি আপনাদের সাথে ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করব, যেন আমরা এই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারি।
শেষে আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু তথ্য শেয়ার করব। আমরা যদি একটি সমস্যা সম্পর্কে সচেতনই না হই, তাহলে সমস্যা সমাধানের আশাই করতে পারি না। তাই প্রথম ধাপ হচ্ছে আমাদের সাবধান হতে হবে, সচেতন হতে হবে। সমস্যা যে একটা আছে- তা আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে। এরপরের ধাপ হলো, আমাদের সবাইকে একসাথে ভাবতে হবে। এর একটা সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। অবশ্যই সেটা হতে হবে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী। এরপর আমাদের মধ্যে যারা একই বিষয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের ভাবনাগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। কীভাবে আমরা পরবর্তী ধাপে এগোব, কীভাবে আমরা সমাধানে পৌঁছাব।
রোগী যদি নিজেকে অসুস্থ না মনে করি, তার তো কোনো ওষুধের দরকার নেই। কোনো প্রেসক্রিপশন নিয়ে সে চিন্তাই করবে না। একটা সমস্যা যে আছে, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া প্রথম কাজ।
আমি এখন সূরা আল-বাকারার কিছু আয়াত দিয়ে শুরু করব। খুব সংক্ষিপ্তভাবে এই আয়াতের ওপর আলোচনা করব। এটা কোনোভাবেই এই আয়াতের বিস্তারিত তাফসির নয়। কিছু রিমাইন্ডার মাত্র।
ইবরাহিম (আ.) অনেক অনেক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। হজের সময় আমরা ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে অনেক খুতবা শুনি। কত বিশাল উচ্চতা তিনি অর্জন করেছিলেন! উনি যখন ওগুলো অর্জন করলেন, সবকিছু অর্জনের পর আল্লাহ তাঁকে সার্টিফিকেট দিলেন। এই আয়াত হচ্ছে ওই সার্টিফিকেট সম্পর্কে। আল্লাহ তায়ালা বলছেন-
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَتَهُنَّ. 'যখন ইবরাহিম-কে তাঁর রব পরীক্ষা করলেন...' সূরা বাকারা: ১২৪
ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ খুবই ভালোভাবে পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি সবগুলো পরীক্ষাই অতিক্রম করলেন। সব পরীক্ষার শেষে আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে বলেছেন, 'আমি অবশ্যই তোমাকে মানুষের ইমাম বানালাম। আমি তোমাকে মানব সমাজের জন্য এক অনুসরণীয় ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলাম।'
এই হচ্ছে সেই সার্টিফিকেট। এই হচ্ছে সেই সম্মানের স্মারক; যা অনেক কঠিন পরীক্ষা দেওয়ার পর ইবরাহিম (আ.)-কে দেওয়া হয়েছিল। আমরা কল্পনাও করতে পারব না, একটা মানুষ কীভাবে এই ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে পারে, যেসব পরীক্ষা ইবরাহিম (আ.)-কে দিতে হয়েছিল!
এই যে আমরা কত সহজে বলে ফেলি, তিনি আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। আমরা কত সহজে বলি যে, তিনি নিজের সন্তানের গলায় ছুরি বসিয়েছিলেন। আমাদের বাচ্চা একটা কাঁটা চামচ ধরলেই আমরা বলি, 'এই! ওটা রেখে দাও, এটা বিপদজনক।' আপনি বিচলিত হয়ে পড়েন। যদি আপনার সন্তান চুলার একটু বেশি কাছে যায় আপনি কী করেন? আর এখানে এই মানুষটা যে নিজের সন্তানের গলায় ছুরি ধরেছে, সুবহানআল্লাহ। এটা বলা সহজ, কিন্তু নিজেকে সে জায়গায় বসানোর চেষ্টাটা অনেক কঠিন।
এরপর তাঁর সামনে এলো সেই পরীক্ষা, তাঁর পরিবারকে মরুভূমির মাঝে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে রেখে আসা। আমাদের পরিবারকে যখন আমরা কোথাও রেখে আসি, যেমন ধরুন- আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকে আপনার ফ্যামিলিকে আনতে হবে। আপনার হয়তো এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। আপনি ২০টা মিসড কল পাবেন। এদিকে আপনি বিচলিত। তোমরা কোথায়! সব ঠিক আছে? তারা হয়তো শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত এয়ারপোর্টের বিশাল পরিসরের কোনো এক বেঞ্চে বেশ নিরাপদেই বসে আছে। আর আপনি উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছেন। অথচ এখানে ইবরাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে মরুভূমির মাঝখানে রেখে এলেন! যেখানে মৃত্যু প্রায় সুনিশ্চিত। এরপরও তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওপর পুরো ভরসা করে তাঁদের রেখে এলেন। এটি কোনো সহজ কাজ নয়।
তো, উনি এই সমস্ত পরীক্ষাগুলোর মধ্যে দিয়ে গেলেন। আল্লাহ বললেন- 'তুমি পাশ করেছ, তুমি এখন থেকে মানব সমাজের ইমাম।' আপনারা জানেন ওই পরীক্ষাগুলো সহজ কিছু ছিল না। যখন তাঁর সাথে ভালো বা মন্দ যা কিছুই ঘটত, তিনি প্রথমেই স্মরণ করতেন আল্লাহ তায়ালাকে।
ইবরাহিম (আ.) বলেছেন- الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِيْنِ، وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ، وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ. 'তিনিই হচ্ছেন সেই সত্তা (আল্লাহ), যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনিই আমাকে পথ দেখান। তিনিই আমাকে আহার করতে দেন। তিনিই আমাকে পান করতে দেন। যখন আমি অসুস্থ হই, তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন।' সূরা শুআরা: ৭৮-৮০
যা কিছুই তাঁর জীবনে ঘটুক, তিনি কাকে মনে করেন? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে।
আল্লাহ বলেছেন, একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড়ো উপহার হলো আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এতগুলো কঠিন পরীক্ষার পর আল্লাহ যখন তাঁকে সবচেয়ে সেরা উপহারটি দিলেন, আপনি তখন কী আশা করেন? আপনি আশা করবেন উনি বলবেন, 'আলহামদুকা ইয়া রাব্বি' সমস্ত প্রশংসা আপনার, কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি। এটা আমার জন্য অনেক সম্মানের। আমি আপনার নগণ্য বান্দা।'
কিন্তু এর বদলে আপনি দেখবেন, ইবরাহিম (আ.) বললেন, 'ওয়ামিন জুররিয়্যাতি' আমার পরের প্রজন্মের কী হবে? 'জুররিয়্যা' কথাটা 'আবনায়ি ওয়া আওলাদি'র থেকে আলাদা। 'জুররিয়্যা' মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
আল্লাহ তাঁকে মানবজাতির ইমাম করলেন, আর তিনি চিন্তিত তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে। তিনি আগে থেকেই ভাবছেন ৩, ৪, ৫ প্রজন্ম, ১০, ২০, ৩০ প্রজন্মের কথা। এটা হচ্ছে একজন জিনিয়াসের ভাবনা। এটা হচ্ছে এমন একজনের মাইন্ডসেট, যিনি সত্যিকারভাবে এই পৃথিবীতে তাঁর ভূমিকা কী- তিনি তা ভালো করেই জানেন।
মুসলিমরা অমুসলিমদের থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা। তাদের সাথে আমাদের ভাবনার ধরন আলাদা। আমাদের ভাবনা-চিন্তা দীর্ঘমেয়াদি। দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা বলতে আমি বলছি না- ভবিষ্যতের কথা ভাবুন এবং বাড়ি নিন মর্টগেজে। আমি ওই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলছি না। আমি বলছি সেই দীর্ঘমেয়াদের কথা, যেখানে আল্লাহর কাছে আমরা বিনা মর্টগেজে ঘর পাব। এটা হচ্ছে আসল দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান।
আমরা মুসলিম। ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ যেকোনো সময়ে মারা যেতে পারে। তারপরও তিনি বীজ বুনে যাচ্ছেন এই ভেবে যে, একসময় গাছ বড়ো হবে এবং কেউ একজন এর ছায়ায় বসবে।
তিনি ওই গাছ দেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু তিনি ভাবছেন ভবিষ্যতের কথা। আমরা এ রকমই। এটা আমাদের সাদকায়ে জারিয়া। আমরা সব সময়ই আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত; আমাদের এ রকমই হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যে সমাজে ভবিষ্যতে কী হবে তা তারা ভাবে না। কীভাবে এই সমাজ ভবিষ্যতের পরোয়া করে না, তা ছোট্ট একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। এই দেশের কিছু ধনী ব্যক্তি ধনী হয়েছে কীভাবে? সুদভিত্তিক ব্যবসা করে।
এই সুদনির্ভর অর্থনীতিকে, খুবই সাদামাটাভাবে বললে, এই যে ডোনাল্ড ট্রাম্প!
এই লোকটি বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের অন্যতম তাই না? তিনি যদি এই মুহূর্তে তার সমস্ত দেনা শোধ করে দেন, দেনার প্রতিটি পাই-পয়সা মিটিয়ে দেন, তাহলে কী হবে? উনি শূন্যেও থাকবেন না। তিনি থাকবেন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মাইনাসে। উনি মিনিমাম পেমেন্ট দেন এই সম্পত্তিতে, মিনিমাম পেমেন্ট অন্যটাতে, সবগুলো ভাড়া দেন। এরপর আবার সব রিফাইন্যান্স করেন, তারপর আবার অন্য প্রপার্টি ধরেন। এই মানুষটির দেনার ওপর দেনা। দেনার পর দেনায় ডুবে আছেন, তিনি শুধু সবগুলোতে মিনিমাম পেমেন্ট দিয়ে যাচ্ছেন। তার দেনা সব শেষ করতে করতে হয়তো তিনশো বছর লাগবে। উনি কি এর আগে মারা যাবেন না? তিনি ভাবছেন আমি করে যাই, আর মারা গেলে ওটা তখন অন্যের সমস্যা, কাজেই আমার কীসের চিন্তা!
এগুলো আখিরাতে অবিশ্বাসী মানুষের চিন্তা। আমি আগে বাঁচি। আমি আমাকে নিয়ে চিন্তিত; অন্যদের নিয়ে নয়। তো আপনি জানেন আল গোর (২০০০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী) চেঁচাচ্ছেন ৫০ বছর পর গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে। তিনি বলতে পারতেন, আরে চিন্তা কীসের! আমি মরে যাব ১০ বছরের মধ্যে, আমি পাত্তা দিই না। এটা আমার সমস্যা না।
আমাদের সন্তানরা কী পরিমাণ ঋণের চাপে পড়বে, সেটা কে ভাবে? আমাদের নিজেদেরই এখনো কত সমস্যা! তো এই সমাজ হচ্ছে মানুষের অবস্থার একটা দৃষ্টান্ত। আমরা দ্রুত সবকিছু পেতে চাই। আমরা দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করি না। কিন্তু আল্লাহ তাঁর কিতাবে আমাদেরকে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে। তো আমরা যখন এই দেশে (আমেরিকায়) আসি অর্থাৎ মুসলমানেরা এই দেশে আসি, বেশির ভাগই ইমিগ্রান্ট। যখন আমরা দীর্ঘমেয়াদের কথা চিন্তা করি, আমরা ভাবি আমাদের সন্তান কোন স্কুলে যাবে, কোন কলেজে যাবে, কোথায় বাড়ি কিনব। এই হচ্ছে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা।
আমি বলছি অন্যরকম দীর্ঘমেয়াদের কথা। আমি কীভাবে নিশ্চিত করব যে, আমার পর আরও ৩, ৪, ৫ প্রজন্ম পর তারাও বলবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আর তারা অন্যদেরও শেখাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আমি কীভাবে এটা করব, এটা হচ্ছে আসল দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা। যদি আপনার সন্তান স্কুল থেকে বেরিয়ে ভালো ডিগ্রি নিয়ে, ভালো চাকরি পেল এবং খুব ধনী এক পরিবারে বিয়ে করল। কিন্তু এরপর 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' হারিয়ে ফেলল এক প্রজন্মেই! আপনি সফল হলেন নাকি ব্যর্থ হলেন, ভেবে দেখুন। এর জবাব কে দেবে?
ইবরাহিম (আ.) এটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই আল্লাহ যখন বললেন, 'আপনি ইমাম।' উনি বললেন- 'এটা যথেষ্ট নয়। আমি আমার সন্তানদের জন্য দায়ী। আর ওরা যদি ভালো না হয়, তাহলে ওদের সন্তানেরা হবে আরও খারাপ এবং তাদের সন্তানাদি হবে তার চেয়েও খারাপ। আমি তাদের জন্য জবাবদিহি করতে চাই না।'
একজন মানুষ যত ভালো কাজ করুক, শুধু একবার ভাবুন, আপনার মিলিয়ন মিলিয়ন ভালো কাজ আছে। পাহাড় সমান পুণ্য আপনার। কিন্তু আপনি যদি আপনার সন্তানদের ঠিকভাবে বড়ো করতে না পারেন এবং তারা ধর্ম হারিয়ে ফেলে! সেটা আকিদায় হোক, তাদের বিশ্বাসে বা ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে হোক। তারা যদি ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে এর শুরুটা হলো আপনার গাফলতি দিয়ে। বিচার দিবসে আপনার সমস্ত পুণ্য কি ওইসব সম্মিলিত খারাপের সাথে পাল্লা দিতে পারবে?
অসম্ভব! কক্ষনো না!
বাবা-মায়ের জন্য এটা অনেক বড়ো দায়িত্ব। অনেক বড়ো চ্যালেঞ্জ। প্রত্যেক বাবা-মা হলেন ইমাম। প্রত্যক বাবা পরিবারের ইমাম। যখন আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে ইমাম মনোনীত করলেন, তিনি কাদের ওপর তাঁর ইমামতি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন? তাঁর নিজের সন্তানদের নিয়ে, সবার আগে তাঁর নিজ সন্তানদের নিয়ে। আল্লাহ তাঁর দুআর জবাবে বললেন- قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ. 'আমার অঙ্গীকার অত্যাচারীরা লাভ করবে না।' সূরা বাকারা: ১২৪
উনি যখন এই বলে দুআ করলেন, আমার সন্তানদের কী হবে, তখন আল্লাহ বললেন- 'না! আমার প্রতিশ্রুতি অবিচারকারীদের জন্য নয়।'
ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ বললেন, 'এই কথাগুলোর মাঝেই যে, তোমার সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ হবে অবিচারকারী। এদের সবাই পুণ্যবান হবে না।' আমরা জানি, ইবরাহিম (আ.)-এর প্রজন্মের বেশি সংখ্যকই অবাধ্য। কুরাইশরা কি ইবরাহিম (আ.)-এর বংশধর ছিল না? তারা কি জালিম ছিল না? অবশ্যই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তো যখন ইবরাহিম (আ.) এ কথা শুনলেন, আমি নিশ্চিত কথাটা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল। তো উনি এরপর কী করলেন? উনি কি থেমে গিয়েছিলেন? না! উনি আল্লাহর কাছে আরেকটা দুআ করলেন।
তখন তাকে আল্লাহর ঘর নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। উনি যখন আল্লাহর ঘরের দিকে যাচ্ছেন তখন দুআ করলেন-
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقُ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ.
'হে প্রভু! এই শহরকে শান্তিময় করে দাও এবং এর বাসিন্দাদের জন্য সব ধরনের ফলমূল দান করো।' সূরা বাকারা: ১২৬
উনি দুই ভাগে দুআ করলেন। উনি বললেন, এই শহরকে নিরাপদ রাখো এবং দ্বিতীয়ত, ওরা যেন সব ধরনের জীবিকা অর্জন করতে পারে।
সাহিত্যে একটি কথা আছে, শান্তি ও সমৃদ্ধি। পলিটিক্যাল সাইন্সে আপনি জানবেন, একটা সমাজ সুষ্ঠুভাবে চলার জন্য প্রথম যা দরকার, তা হলো আইনের শাসন, অর্থাৎ শান্তি। যদি আপনার ঘর নিরাপদ না থাকে, আপনার দোকান, আপনার অফিস, আপনার টাকা-পয়সা নিরাপদ না থাকে, তাহলে সে রকম সমাজে আপনি চলতে পারবেন না। আবার আপনার যদি শান্তি থাকে, কিন্তু কোনো চাকরি-বাকরি না থাকে, আয়-রোজগারের কোনো উপায় না থাকে, যদি ব্যবসা করার পথ না থাকে, তাহলে সেই সমাজে কি টিকে থাকতে পারবেন? না! তো আপনার দরকার শান্তি এবং সমৃদ্ধি।
এই মানুষটির দুআয় কত চিন্তাশীলতা দেখুন। উনি বললেন, এই শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং এদেরকে সব ধরনের ফলমূল দান করুন। কিন্তু এর সাথে একদম শেষে উনি ছোট্ট একটা দাবি যোগ করলেন। ইবরাহিম (আ.) বললেন-
مَنْ آمَنَ مِنْهُمْ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ.
অর্থাৎ আপনি আমার সেই সন্তানদেরই শুধু দিন, যারা আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস রাখে। আল্লাহ ওনাকে বলেছিলেন- 'আমার প্রতিশ্রুতি অবিচারকারীদের জন্য নয়।' উনি বললেন- 'ঠিক আছে এই শহরকে শান্তির শহর করে দিন' এবং এর মানুষদের জন্য সব ধরনের রিজিকের ব্যবস্থা করে দিন; কিন্তু শুধু ঈমানদারদের জন্য। অন্যকথায়- অবিশ্বাসী, পাপী সন্তানদের জন্য নয়। ওরা দুর্ভিক্ষে পড়ুক। তাদের বংশ নির্বংশ হয়ে যাক। কারণ, আমি ওদের জন্য জবাবদিহি করতে পারব না। আমি শুধু আমার ঈমানদার সন্তানদের জন্য জবাব দেবো।'
কী ভীষণ বিচক্ষণ দুআ! সুবহানআল্লাহ। উনি বললেন, 'শুধু যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে'। আল্লাহ তায়ালা এর জবাবে বললেন-
وَمَنْ كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَى عَذَابِ النَّارِ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ.
'যারা অবিশ্বাসী আমি তাদেরকেও উপভোগ করতে দেবো। এরপর তাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামের আগুনে ঠেলে দেবো। কী ভয়াবহ সেই আবাস!' সূরা বাকারা: ১২৬
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন, উনি কি সেটা একা করেছিলেন? ওনার সাথে কে ছিল? ইসমাইল (আ.)। তো ইবরাহিম (আ.)-এর বিচক্ষণতা আপনি দেখতে পারছেন।
আমরা মনে-প্রাণে কোনো কিছু আল্লাহর কাছে কখন চাই? যখন আমার কোনো কিছু খুব দরকার। খুব প্রয়োজন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ছাত্ররা এমন করে। আগামীকাল তোমার ফাইনাল পরীক্ষা, তুমি কোনো পড়াশোনা করনি এবং তুমি এই পাঁচ মিনিট আগে বললে, 'ইয়া আল্লাহ'... 'পরীক্ষা'। হঠাৎ তোমার মনে পড়ল আল্লাহর কথা। আল্লাহকে স্মরণ করছ সুবিধামতো, নিজের যখন দরকার। কিন্তু আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়ার সবচেয়ে সেরা সময় হচ্ছে যখন তুমি আল্লাহকে খুশি করার মতো কিছু করেছ। চাওয়ার জন্য সেটা হচ্ছে সবচেয়ে সেরা সময়। তুমি জানো সেরা সময় কখন? নামাজের পর!
তুমি এইমাত্র আল্লাহর কথা মানলে। এখন দুআ করো, আল্লাহর কাছে চাওয়ার সবচেয়ে সেরা জায়গার একটা হলো আল্লাহর ঘর। যখন তুমি ওখানে যাও, তা আল্লাহর প্রতি বাধ্যতার একটি শ্রেষ্ঠ কাজ। এটা হচ্ছে চাওয়ার জন্য সেরা সময় আল্লাহর কাছে চাওয়ার আরেকটা সেরা সময় হলো, রাতের শেষ ভাগ। কারণ, তখনই তুমি আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে ভালোভাবে বাধ্যতা দেখালে। দুআর জন্য শ্রেষ্ঠ সময় হলো রমজান মাস। কারণ, তখন তুমি আল্লাহর প্রতি বাধ্য থাকছ। তখন আল্লাহর কাছে চাও।
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর প্রতি বাধ্যতার সেরা একটি কাজ করছেন। তিনি তাঁর ছেলেকে সাথে নিয়ে এই পৃথিবীতে আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন। এটা সম্ভবত আবারও তাঁর কাছে চাইবার জন্য সেরা সময় তাই না? তো তিনি আবারও চাইলেন। কিন্তু তিনি জানেন, আল্লাহ একবার না বলেছেন। তিনি নিজের দুআ পরিমার্জিত করছেন।
প্রথম দুআ, রাব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না- 'হে আমাদের প্রভু, আপনি আমাদের থেকে কবুল করুন'। দেখুন আগের দুআয় ছিল, 'হে আমার প্রভু এই শহরকে শান্তিময় করে দিন'। 'রাব্বি' মানে আমার প্রভু। এখন উনি কী বললেন? 'রাব্বানা' আমাদের প্রভু! উনি কাকে সঙ্গে নিলেন? তাঁর ছেলেকে! এইবার আমি আল্লাহর ঘর নির্মাণ করছি এবং আমি দুআ করতে যাচ্ছি, কিন্তু আমি আমার সাথে আমার সন্তানকেও এই দুআয় শামিল করছি। যাতে অন্ততপক্ষে এই ছেলের ব্যাপারে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দেন।
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ .
'হে আমাদের প্রভু, আমাদের দুজন থেকে কবুল করে নিন। নিঃসন্দেহে আপনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞাতা।' সূরা বাকারা: ১২৭
সুবহানআল্লাহ। তো উনি একটা ছেলের ব্যাপারে নিশ্চিত করলেন। পরবর্তী আয়াত এই দুআরই ধারাবাহিকতা, যার মানে হলো আল্লাহ কিছু বললেন না। আল্লাহ জবাবে নীরব থাকলেন এবং নীরবতা মানে কী? কবুল করা। আল্লাহ তাঁর দুআ কবুল করলেন এবং তিনি আবারও বলতে শুরু করলেন। যেহেতু আরও আগেই আল্লাহ কবুল করেছেন, তাই উনি থামলেন না। বললেন-
رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُسْلِمَةً لَكَ.
'হে আমাদের প্রভু! আমাদের দুজনকেই আপনার কাছে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করার তাওফিক দিন। এবং আমাদের বংশধর থেকে এমন এক জাতি সৃষ্টি করুন, যারা হবে আপনার প্রতি সমর্পিত।' সূরা বাকারা: ১২৮
আল্লাহ তো তাঁকে ইমাম বানিয়েছেনই, তাহলে এই দুআ কেন? তিনি তো আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেনই। তিনি কি আগেই আল্লাহর কাছে পূর্ণ সমর্পন করেননি? সুবহানআল্লাহ! তাহলে তিনি এই দুআ এখন কেন করছেন? কারণ, তিনি তাঁর ছেলেকে এখানে অন্তর্ভুক্ত করছেন। তিনি বলেছেন, আমাদেরকে আপনার প্রতি পরিপূর্ণভাবে সমর্পিত করুন। আমার সন্তানদের মধ্য থেকে, সব সন্তানদের থেকে নয়, সন্তানদের মধ্য থেকে। কারণ, 'মিন' এখানে একটা অংশের কথা বলা হচ্ছে, তাই না? অন্তত আমার সন্তানদের মধ্য থেকে কেউ কেউ হবে মুসলিম উম্মাহ, এক উম্মাহ, এক দল, এক জাতি। যারা শুধু আপনার (আল্লাহ) কাছেই সমর্পণ করবে, অন্য কারও কাছে নয়।
এক দল হবে যারা শুধু আপনার কাছেই আত্মসমর্পণ করবে। আমার সন্তানদের কেউ কেউ হবে জালিম, কিন্তু অন্তত কিছু সন্তানদের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিন।
সবার ব্যাপারে না দিন, কিন্তু কিছু সন্তানের ব্যাপারে অন্তত প্রতিশ্রুতি দিন, যারা আপনার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করবে। আমাদেরকে আনুষ্ঠানিকতাগুলো দেখিয়ে দিন। আমরা ঘর নির্মাণ করেছি। আমরা জানি না, কীভাবে এই ঘরে প্রার্থনা করতে হয় এবং কীভাবে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে হয়। আমরা কীভাবে তাওয়াফ করব, কীভাবে নামাজ পড়ব; তা আমাদের শেখান। আমাদের এই ইবাদতগুলো শেখান এবং আমাদের তওবা কবুল করুন।
আপনারা জানেন, আমরা কখন তওবা করি, যখন কোনো গুনাহ করি, যখন কোনো পাপ করি, তখনই তওবা করি। উনি কেন তওবা করছেন? তিনি কি কোনো ভুল কিছু করেছিলেন? তিনি ছিলেন একজন সেরা রাসূল । তো কীসের তওবা করেছিলেন তিনি? এখান থেকে যে কল্যাণটা আমরা নেব, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যখন আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিছু করেন। ধরুন, এইমাত্র আমরা নামাজ পড়লাম। আমরা কি আমাদের নামাজে ভুল করি? আমাদের অজুতে কি ভুল থাকে? আমাদের মন কি বিক্ষিপ্ত থাকে? রাতে কী খাব? ওরা বলল, রাতে খাওয়া-দাওয়া হবে না। তো যখন রুকু থেকে উঠেন, আপনার পেট মোচড় দিয়ে উঠে, আর আপনি বলেন 'আহ, আমি ভাত চাই'। এসব আমাদের মাথায় ঘুরতে থাকে। তো এটা কি নামাজে গাফেলতি নয়? অবশ্যই। তো আপনি নামাজ পড়েছেন মানে এই নয়, আপনি সবচেয়ে ভালোভাবে নামাজ পড়েছেন। এজন্য আপনার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এমনকী যেসব কাজ শুধু তাঁর জন্যই করছেন, সেগুলোর জন্যও। তিনি আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন, অথচ দেখুন তাঁর বিনয়। আমি আপনার ঘর বানাচ্ছি, আমি হয়তো যে জায়গায় ইট রাখার কথা সেখানে রাখিনি। হয়তো আমি ভুল করেছি, হয়তো আমি জানিই না আমার ভুলটা কী। তো আমি যদি আমার অজান্তেই কোনো ভুল করে থাকি, আমি আমার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছি। আমাদের তওবা কবুল করুন।
এই জিনিসটা ইবরাহিম (আ.) থেকে আমাদের শেখার আছে। আমরা মানুষকে বলি ইস্তেগফারের কথা। আরে আমি তো কোনো ভুল করিনি! আমি কেন ইস্তেগফার করব? আপনি অনেক ভুল করেছেন। আমরা অনেক ভুল করেছি। জেনে হোক বা না জেনে। উনি তওবা করলেন। এরপর আল্লাহ কিছু বললেন না, এর মানে হলো, তিনি তার দুআ কবুল করে নিয়েছেন। এরপর তিনি আবারও শুরু করলেন।
তিনি বললেন-
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ .
'হে আমাদের রব! তাদের কাছে তাদের মধ্য হতে এমন একজন বার্তাবাহক প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন।' সূরা বাকারা: ১২৯
উনি খুব সাবধানে ভাবছেন, আল্লাহ ওনাকে কী বলেছেন। উনি খুব মেপে কথা বলছেন। উনি বললেন, 'হে আমাদের প্রভু! আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে একজনকে আপনি রাসূল হিসেবে মনোনীত করুন। শুধু একজন রাসূল নয়, তাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল। এটি অসাধারণ বিচক্ষণতা।
যদি একজন রাসূলের কথা বলা হয় এবং তিনি যদি বাইরের লোক হন, তখন মানুষ বলবে, আমি তোমার কথা শুনতে চাই না! তুমি তো ভিনদেশি। মানুষ ভিনদেশি মানুষের কথা শুনতে চায় না। যখন আপনাদের কেউ পাকিস্তান বা ভারত থেকে আসেন, আর আপনার সন্তানরা পুরো আমেরিকান; যখন ওরা পাকিস্তানে যায়, কেউ তাদের কথা শুনতে চায় না। মানুষ তাদের কথা বলা নিয়ে ঠাট্টা করে। আবার যখন আরব বিশ্বের কেউ এখানে আসে অথবা সুদান, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া থেকে, তারা ইংরেজি বলতে পারে না। তারা এখানে এসে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে চাইলে লোকজন কি তাদের কথা ভালো করে শোনে? না, শোনে না। তারা শোনে না কারণ, তারা পরিচিত নয়। তারা বহিরাগত। তো যেকোনো ধর্মেই বহিরাগতদের দেখা হয় অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে। তারা নেতা হতে পারে না। তারা বাইরের লোক।
উনি দুআ করলেন যেন, তাঁর প্রজন্মের মধ্য থেকে রাসূল মনোনীত করেন। যেন যখন তিনি কথা বলবেন, তখন অন্যরা শোনে। এমন একজন বার্তাবাহকের মানে কী, যদি মানুষ তাঁর কথা না-ই শোনে? তো তিনি বললেন যে, তিনি সাধারণ কোনো একজন রাসূল নয়; বরং তিনি তাদেরকে অত্যাশ্চর্য নিদর্শন পড়ে শোনাবেন। তিনি তাদেরকে এমন সব বিষয় পড়ে শোনাবেন যা তাদের মোহমুগ্ধ করবে এবং আপনার নিকটবর্তী করবে। যাতে তারা এক কাতারে থাকে। তারা মুসলিম থাকে। তিনি তাদের কিতাব শিক্ষা দেবেন এবং তিনি তাদের প্রজ্ঞার শিক্ষা দেবেন। সেইসাথে তিনি তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন।
এটা ইবরাহিম (আ.)-এর খুব চিন্তাশীল দুআ ছিল। আমরা আমাদের শৈশবে শিখেছি, তাঁর এই দুআর ফলেই আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ-এর আগমন। আপনি দুআর শক্তি বুঝতে পারছেন? ইবরাহিম (আ.) এই দুআ করলেন, কোন মোটিভেশন থেকে? ওনার মোটিভেশন ছিল, 'আমার সন্তানেরা'। একজন পিতা আন্তরিকভাবে তাঁর প্রভুর কাছে চাইলেন এবং তাঁর প্রভু এর জবাব দিলেন। ইবরাহিম (আ.)-এ দুআর সর্বশ্রেষ্ঠ জবাব মানবজাতি দেখল নবিজির আগমন। কখনো দুআর শক্তিকে তাই খাটো করে দেখবেন না। কখনো দুআর শক্তি তুচ্ছ করে দেখবেন না।
আমরা এখন এই যে ঐশী গ্রন্থ কুরআন পড়ছি, এটা এসেছে একটি দুআর ফলে। এটা এসেছে একটি দুআর জবাবে। পুরো বিশ্বের শতশত নয়, মিলিয়ন মিলিয়ন নয়, বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ বলছেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আল্লাহ একদিন তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন, পবিত্র করবেন, উনি তাদের জন্য কিতাব পড়বেন। এটা হচ্ছে একজন উদ্বিগ্ন পিতা, যিনি অগ্রিম ভাবেন, আগে থেকে চিন্তা করেন।
ইবরাহিম (আ.)-এর এই উত্তরাধিকার থেকে কে সরে যাবে? কে অত বোকা? আল্লাহ তায়ালা জানাচ্ছেন-
وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ.
'ইবরাহিমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফিরিয়ে নেয়! তবে সে ব্যক্তি, যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।' সূরা বাকারা: ১৩০
পিতৃত্ব বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য থাকায় আমি এ কথাগুলো শেয়ার করলাম। এতে আছে আগামী প্রজন্মের জন্য উদ্বেগের কথা। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
وَوَفَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيْهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ.
'ইবরাহিম (আ.) এবং ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের অসিয়ত করলেন যে, “হে আমার সন্তানেরা, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য এই ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা পরিপূর্ণ মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না." সূরা বাকারা: ১৩২
আমাদের সময়ে মা-বাবারা সন্তানদের বলেন, খবরদার! অঙ্কে ৯০-এর নিচে যেন না পাও। খবরদার! তোমার বন্ধুদের সাথে যাবে না। খবরদার! এটা করবে না, ওটা করবে না। আর উনি তাঁর সন্তানদের বলছেন, আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া খবরদার মারা যাবে না। এটা আল্লাহর তরফ থেকে এক উপহার তোমাদের জন্য। এটা তোমাদের জন্য উপহার। এই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-খবরদার! তোমরা এটা খোয়াবে না। এটা হচ্ছে একজন উদ্বিগ্ন বাবার উপদেশ।
এই সুন্দর দুআ যখন তিনি করলেন, 'রাব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না', তাঁর সাথে কে ছিল? ইসমাইল (আ.)। কিন্তু এরপরে যে নবির কথা এসেছে উনি কে? ইয়াকুব (আ.)। উনি কার সন্তান ছিলেন? ইসহাক (আ.)-এর। সেই ছেলে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তো আল্লাহ শুধু তাঁর সন্তান এবং তাঁর বংশধরদের দুআই কবুল করেননি। তিনি ইসহাক (আ.) এবং তাঁর বংশধরদের দুআরও জবাব দিয়েছেন। তাদের মধ্যকার অন্যদের প্রার্থনার জবাবও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দিয়েছেন। আর তারাও সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন পিতা হিসেবে বেড়ে উঠেছিল। ইয়াকুব (আ.) ছিলেন শ্রেষ্ঠ বাবাদের একজন, যাঁর কথা আমাদের কিতাবে একজন আদর্শ বাবা হিসেবে উল্লিখিত আছে।
তারপর কুরআনে বলা হলো- أَمْ كُنْتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِنْ بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَهَكَ وَإِلَهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَهَا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ.
'তোমরা কি উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বলল, "আমার পর তোমরা কার ইবাদাত করবে?” তারা বলল, আমরা তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের উপাস্যের ইবাদাত করব। তিনি একক উপাস্য। এবং আমরা তাঁর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পিত।"" সূরা বাকারা : ১৩৩
দেখুন, যখন মৃত্যু ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে উপস্থিত হলো, ওনার ছেলেরা ওনার পাশে, তাঁর সেবা করছে, পানি দিচ্ছে, কাঁদছে আর উনি ওদের নিয়ে চিন্তিত। উনি এটা নিয়ে চিন্তিত না যে, কাদেরকে ওরা বিয়ে করবে, কোথায় তারা থাকবে, কোথায় সম্পদ খরচ করবে, খেয়াল করে দেবে। ওসব কিছু না।
একদম না। অবশ্যই কলেজের পড়াশোনা শেষ করবে, ওসব নিয়ে কোনো চিন্তা না; বরং তিনি বলছেন, 'ও আমার ছেলেরা! নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দ্বীন মনোনীত করেছেন। সুতরাং খবরদার! মুসলিম হওয়া ছাড়া তোমরা মৃত্যুবরণ করবে না।' এরপর উনি বললেন, 'আমার মৃত্যুর পর তোমরা কীসের ইবাদত করবে? আমি চলে গেলে তোমরা কী করবে? কীসের প্রার্থনা করবে?' উনি এটা বলেননি, মান তা'বুদুনা- কার প্রার্থনা করবে? উনি বলছেন, 'মা তা'বুদুনা'-কীসের প্রার্থনা করবে? যার মানে হলো, উনি তাদেরকে ধাঁধায় ফেলে জানতে চাইছেন। তোমরা কী করবে? কী ধরনের উপাসক গ্রহণ করবে? তারা জবাব দিলো, 'আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার পিতা ইবরাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.) ও ইসহাক (আ.)-এর ইলাহর ইবাদত করব এবং আমরা সম্পূর্ণরূপে তাঁর কাছেই সমর্পিত।'
আমি এখানে কিছু সত্যিকার বাস্তবতা শেয়ার করছি। আসুন, আমরা এইমাত্র যা শিখলাম তার সাথে নিজেদের তুলনা করি। এটা আগেকার দিনের কাহিনি। ওনারা ছিলেন অসাধারণ সন্তান। এই প্যারার শেষে আল্লাহ কি বলছেন জানেন? আল্লাহ বলছেন-
تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُمْ مَّا كَسَبْتُمْ وَلَا تُسْأَلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ.
'তারা ছিল এক জাতি যারা বিগত হয়েছে। তারা যা করেছে তা তাদেরই জন্য। তোমরা যা অর্জন করবে তা তোমাদের জন্য। তাদের কর্ম সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না।' সূরা বাকারা: ১৩৪
ভাববেন না যে, 'ওহ! ওসব ছিল সুসময়'... না। তারা পেয়েছে তাদেরটা। আপনি পাবেন আপনারটা। আপনারটার জন্য আপনাকেই কাজ করতে হবে। তারা যা করেছেন, সেজন্য আপনাকে প্রশ্ন করা হবে না। আপনাকে প্রশ্ন করা হবে আপনি কী করেছেন তা নিয়ে।
সবশেষে আল্লাহর কথা হচ্ছে, এ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদেরকে বদলাও। আপনি ওসব ঐতিহাসিক নামগুলো জানেন কি না, সংখ্যাগুলো, তারিখগুলো বা ইয়াকুব (আ.)-এর সব সন্তানের নাম জানেন কি না, এসব নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করা হবে না। আপনাকে প্রশ্ন করা হবে আপনি আপনার সন্তানদের নিয়ে কী করেছেন?
📄 ওস্তাদ নোমান আলী খান-এর জীবনী
কুরআন তার সৌন্দর্যে চিত্তবিমোহনকারী, শব্দের দিক থেকে বিমোহিতকারী, বাণীর দিক থেকে প্রবলতর শক্তিশালী, সংগতি ও ঐক্যতানের দিক থেকে মন্ত্রমুগ্ধকারী এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক থেকে অন্যকে হতবুদ্ধকারী।
উস্তাদ নোমান আলী খান আল-কুরআনের শব্দচয়ন, শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের সাথে বাস্তব উদাহরণ, বাক্যের ধরন-গঠন, উপমা, একটি সূরার সাথে অন্য সূরার সংগতি ও সেতুবন্ধন, প্রতিটির ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য অথচ একটি সাথে আরেকটির অর্থগত ও শাব্দিক তুলনায় কত মিল এবং আল-কুরআনের গভীর ব্যাখ্যা ইত্যাদি মুজিযাভিত্তিক ও অর্থের দিক থেকে চমৎকার আলোচনার জন্য সারা বিশ্বেই বেশ সমাদৃত। তাঁর কুরআনের আলোচনা এতটাই প্রিয় যে, সরাসরি অনলাইন ওয়েবিনারে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯০টিরও অধিক দেশের মানুষজন অংশগ্রহণ করেছিলেন।
কুরআনের চমৎকার শৈল্পিক সৌন্দর্য উপস্থাপনার জন্য তিনি বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের মুসলিম তরুণ প্রজন্মের কাছে এক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। কুরআনের শব্দচয়ন কতটা সৃজনশীল, ভাষা কতটা মনোমুগ্ধকর, অর্থ কতটা যৌক্তিক। এগুলোই নোমান আলী খানের চিন্তা-ভাবনা ও আলোচনার বিষয়। তাঁর বক্তব্যে কুরআনের অন্তর্গত সৌন্দর্য ও মুজিযা মানুষের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনার ও অনলাইনে তাঁর বক্তব্য শুনে অসংখ্য মানুষ ইসলামের দিকে ফিরে আসছে এবং ইসলাম গ্রহণ করছে। তিনি প্রায় ২০টিরও অধিক তাফসির গ্রন্থ পাঠ করেছেন। ফলে কুরআন নাজিলের ইতিহাস, শব্দচয়নের কারণ, ভাষার অলঙ্কার, অর্থের গভীরতা, যুক্তির প্রখরতা এবং ব্যাকরণগত শুদ্ধতার বিষয়গুলো তাঁর আলোচনায় ফুটে ওঠে। তাই অনেক ইসলামি স্কলার নোমান আলী খানকে আল কুরআনের ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এ ছাড়াও বিশ্বের ৫০০ প্রভাবশালী ইসলামি স্কলারের মাঝে তাঁর স্থান অন্যতম।
এ মানুষটি জন্মগ্রহণ করেন জার্মানির রাজধানী বার্লিন শহরে। কিন্তু শিশু নোমান সেখানে ছয় মাসও থাকেননি। তাঁর বাবা পাকিস্তান দূতাবাসে কাজ করতেন বলে পরিবারসহ ছয় মাস বয়সে তাঁকে পাকিস্তানে চলে আসতে হয়। এখানেও তাঁর পরিবার দুমাসের বেশি থাকেননি; চলে যান সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় রিয়াদে, একটি পাকিস্তানি উর্দু মিডিয়াম স্কুলে। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছয় বছর তাঁর পরিবার রিয়াদে অবস্থান করেন। এরপর তাঁরা চলে যান আমেরিকায়। সেখানে তিনি খ্রিষ্টানদের পরিচালিত একটি হাইস্কুলে ভর্তি হন।
ফলে সবকিছুই তাঁর কাছে ভিন্ন মনে হলো। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন পরিবেশ। বন্ধুরা সব ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন সংস্কৃতি লালন করে এবং চলাফেরা করে ভিন্নভাবে। এতে তাঁর কাছে অনেক অসহায় লেগেছিল তখন। প্রায় দুই বছর পর্যন্ত তিনি কোনো মুসলিমের দেখা পাননি। শুক্রবারে ক্লাস থাকায় দুই বছর তিনি জুমার সালাতও পড়তে পারেননি। অথচ তখন তিনি হাইস্কুলের ছাত্র। তাঁর বন্ধুদের আচার-আচরণের মধ্যে নৈতিকতা ও ধর্মের কোনো ছোঁয়া ছিল না। ফলে তিনিও ধীরে ধীরে তাদের আচার-আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁকে বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না; এমনকী তাঁর পরিবারও না। একসময় তাঁর মাঝে প্রবল অপরাধবোধ জেগে ওঠে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। হয় তাঁকে ধর্ম ত্যাগ করতে হবে, নাহয় স্কুল ত্যাগ করতে হবে। দুর্ভাগ্য, অন্য কোথাও ভালো স্কুল নেই বলে পরিবার তাঁকে স্কুল ত্যাগ করতে দিলো না। স্কুল শেষে তিনি কলেজে ভর্তি হলেন। আগের মতোই বন্ধুদের সাথে চলাফেরা, সবকিছু। এবার তিনি আস্ত নাস্তিক হয়ে গেলেন। প্রায় দুই বছর তিনি নাস্তিকতার চর্চা করেন। ইসলাম থেকে তখন তিনি অনেক অনেক দূরে চলে গেলেন।
তারপর সময় হলো ফিরে আসার। নোমান আলী খান ইসলামে ফিরে আসলেন আগের চেয়ে শতগুণ গতিতে। হঠাৎ একদিন আমেরিকান মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (MSA) দুজন সদস্যের সাথে তাঁর দেখা হয়।
তাঁরা নিজেদের মধ্যে কুরআনের আলোচনা করছিলেন; তিনি তা শুনছিলেন। যদিও এসব ধর্ম-কর্মের আলাপ তাঁর কাছে তখন ভালো লাগত না। তাঁরা নিজেরাই নোমান আলী খানের সাথে পরিচিত হলেন এবং ছায়ার মতো তাঁর সাথে চলাফেরা শুরু করলেন। তবে তাঁরা কখনো সরাসরি নোমান আলী খানকে কুরআন পড়তে কিংবা সালাত আদায় করতে বলেননি। এমনকী কখনো ইসলামের দাওয়াতও দেননি। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন তাঁরা নোমান আলী খানের সাথে সময় কাটাতে লাগলেন। এতেই নোমান আলী খানের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়।
একদিন তাঁদের একজন নোমান আলী খানের সামনে সালাত পড়লেন। নোমান আলী খানের কাছে খুব খারাপ লাগল। কারণ, তিনি সালাতের অনেক কিছুই ভুলে গেছেন দুই বছরের নাস্তিকতার কারণে; এমনকী মাগরিবের সালাত কয় রাকাত,
তিনি ভুলে গেছেন! নিজের অজান্তেই তিনি মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের এ দুজন ভাইকে বন্ধু ভাবতে লাগলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতেও লাগলেন। ধীরে ধীরে তাঁর অন্তরে ইসলাম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়তে থাকে। তিনি কুরআনের অনুবাদ পড়া শুরু করলেন। আল্লামা ইউসুফ আলীর ইংরেজি অনুবাদ পড়তে লাগলেন।
কিন্তু অনুবাদের মাধ্যমে কুরআন বোঝা খুবই কষ্টকর। কোথায় বাক্যের শুরু আর কোথায় বাক্যের শেষ- কিছুই তিনি বুঝতে পারছিলেন না। কেন আল্লাহ হঠাৎ করে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে চলে যান- এসব কিছুই তিনি অনুবাদ পড়ে বুঝতে পারেননি। তখন তিনি ভালোভাবে কুরআন বোঝার জন্য গুগল সার্চ করতে লাগলেন। ইন্টারনেটে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচুর লেকচার পেলেন, কিন্তু কুরআনের ধারাবাহিক কোনো আলোচনা তখনও তিনি পাননি।
কুরআনের ধারাবাহিক আলোচনা প্রথম তিনি শোনেন তাঁর মহল্লার একটি মসজিদে। রমজান মাস উপলক্ষ্যে সে মসজিদে পাকিস্তান থেকে একজন আলেম আসেন। তাঁর নাম ছিল ইমাম ডক্টর আব্দুস সামি। তিনি প্রতিদিন এক পারা করে কুরআনের অনুবাদ এবং সংক্ষিপ্ত তাফসির করতেন। সকালে দুই ঘণ্টা, বিকালে চার ঘণ্টা এবং তারাবির পর রাত ১০টা পর্যন্ত কুরআনের ধারাবাহিক আলোচনা হতো। নোমান আলী খান ডক্টর আব্দুস সামির সকল আলোচনায় অংশ নেন। এভাবে তিনি সম্পূর্ণ কুরআনের তাফসির শুনে শেষ করেন। কুরআনের এই ধারাবাহিক আলোচনা শুনে তাঁর কাছে মনে হয়েছে, তিনি এবারই প্রথম কুরআন শুনেছেন। এতে কুরআনের প্রতি তাঁর ভীষণ আগ্রহ জন্মে।
তিনি তাঁর উস্তাদ ডক্টর আব্দুস সামিকে বলেন, 'আপনি যেভাবে তাফসির করেছেন, আমিও সেভাবে তাফসির করতে চাই।' ডক্টর আব্দুস সামি তাঁকে বললেন- 'তাহলে আগে আরবি শেখো।' নোমান আলী খান তাঁকে বললেন, 'আমি থাকি নিউইয়র্কে, সারা দিন কাজ থাকে, কলেজে যেতে হয়, আমি কীভাবে সৌদি আরব গিয়ে আরবি শিখব?' ডক্টর আব্দুস সামি (এখনও জীবিত আছেন ও তাঁর একটা ফাউন্ডেশনও আছে পাকিস্তানে) তাঁকে বললেন- 'তুমি আগামী সপ্তাহ থেকে এ মসজিদে আমার আরবি ক্লাসে আসতে পারো'। এভাবে তিনি ডক্টর আব্দুস সামির কাছে আরবি শেখা শুরু করেন।
পরবর্তীকালে তিনি ডক্টর আব্দুস সামির ব্যাপারে স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'আমি তাঁর কাছে গিয়ে কুরআন তাফসির শুনতাম। আমার জীবনে এ রকম কুরআনের আলোচনা আমি শুনিনি। তাঁর আলোচনা শুনে মনে হতো, এই বুঝি এক্ষুনি কুরআন নাজিল হচ্ছে আমার ওপর, আমারই বিভিন্ন বিষয়ে। এতটাই জীবন্ত ছিল আল্লাহর বাণীর সেসব আলোচনা, এই তাফসিরই তাকে আরবি শেখার দিকে উদ্বুদ্ধ করে, আল্লাহর দিকে গভীরভাবে ফিরে আসতে সহায়তাস্বরূপ কাজ করে।
তিনি আরবি ব্যাকরণ শিখেন পাকিস্তানে। সেখানে তিনি ১৯৯৩ সালে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় জাতীয় পর্যায়ের মেধা তালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে স্থান দখল করেন।
কিন্তু আরবিতে তাঁর গভীর পড়াশোনা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডক্টর আব্দুস সামি-এর তত্ত্বাবধানে। ডক্টর আব্দুস সামি পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের কুরআন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, যিনি মাঝে মাঝে আমেরিকাতে যেতেন আরবি শিক্ষা এবং কুরঅনের তাফসিরের ওপরে গভীরতাপূর্ণ বক্তব্য রাখতে। তাঁর অধীনে পড়াশোনায় নোমান আলী খান আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের ওপরে তীক্ষ্ম এবং গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি পরবর্তীকালে ডক্টর আব্দুস সামির কাছে আরও উপকৃত হন তাঁর সম্পূর্ণ শিক্ষাদান পদ্ধতিকে আত্মস্থ করে। তিনি ডক্টর সামির করা কাজগুলোকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন; তাঁর নিজের ছাত্রদের উপকারের জন্য।
আরবি শেখা অবস্থায় তিনি ইন্টারনেটে খুঁজতে খুঁজতে একদিন পেয়ে গেলেন ড. তারিক আল-সোয়াইদানের কুরআনের মুজিযা বিষয়ক প্রায় ১৫ ঘণ্টার একটি ভিডিও সিরিজ আলোচনা। এটি ছিল আরবিতে। তিনি রাত-দিন এগুলো শুনতে থাকলেন, কিন্তু তেমন কিছুই বুঝতেন না। পরে সম্পূর্ণ লেকচারটা লিখে ফেললেন। অভিধান থেকে প্রত্যেকটি শব্দের অর্থ বের করলেন।
এভাবে আস্তে আস্তে তিনি আরবি লেকচার বুঝতে শুরু করলেন। এর কিছুদিন পর তিনি ইন্টারনেটে পেলেন শাইখ মুতাওল্লিকে। তাঁর লেকচারগুলো নোমান আলী খানকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে। এরপর পেলেন কুরআনের ওপর লেখা ডা. ফাদেল আল সামারাইয়ের বিভিন্ন বই ও বক্তৃতা। এগুলো পেয়ে তাঁর কাছে মনে হলো, তিনি জ্ঞানের সাগর পেয়ে গেছেন। তিনি এসব পড়তে ও শুনতে শুরু করলেন। একের পর এক স্কলারকে আবিষ্কার করলেন, আর তাঁদের থেকে জ্ঞান আহরণ করতে থাকলেন। দিনের পর দিন পরিশ্রম করলেন। নিজেকে নিজে বারবার বাধ্য করলেন- যেভাবেই হোক আরবি শিখতে হবে, আরবি বুঝতে হবে। মানুষ যা চায় তা-ই পায়। আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেছেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নোমান আলী খান আরবি ভাষা ও কুরআনের ওপর অসাধারণ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। চমৎকার উপস্থাপনা, যুক্তিযুক্ত কথা, সহজ-সরল পদ্ধতির কারণে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ আজ কুরআন শেখার জন্য তাঁর কাছে ভিড় করছে। কেবল অনলাইনে বর্তমানে ১০ হাজারেরও বেশি তরুণ তাঁর কাছে কুরআন ও আরবি ভাষা শিখছে।
আরবি ভাষায় কুরআন উপলব্ধির ব্যাপারে তিনি বলেন-
'কুরআনের এই অলৌকিকতার মাঝেই যে অনিন্দ্য হেদায়াত রয়েছে, শুধু কুরআনের অনুবাদ পড়ে কোনোভাবেই তা আহরণ করা সম্ভব নয়। কারণ, অনুবাদে আসতে পারে কিছুটা মেসেজ, কিন্তু আল্লাহর অলৌকিকত্ব ও তাঁর বাণীর যে গভীরতা, সেটা কোনোভাবেই আসে না।'
তিনি সিদ্ধান্ত নেন- যত কষ্ট করে তিনি ইসলাম ও কুরআন শিখেছেন, ততটা কষ্ট যাতে অন্য কোনো মুসলিমের করতে না হয়, সেজন্য তিনি অনলাইনে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। সিদ্ধান্তানুযায়ী ২০০৫ সালে তিনি বাইয়্যিনাহ ইন্সটিটিউট নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন এবং বাইয়্যিনাহ টিভি নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। এই সাইটে কুরআনের সৌন্দর্য, আরবি ভাষা ও ইসলামের ইতিহাসের ওপর বর্তমানে পাঁচ শতাধিক ভিডিও ক্লাস রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে বাইয়্যিনাহ টিভি নামে বিশ্বব্যাপী একটি চ্যানেলও চালু হবে। মূলত দুটো উদ্দেশ্যে তিনি এসব কাজ করছেন। প্রথমত, মানুষের জন্য আরবি ভাষাকে একেবারে সহজ করে তোলা; যাতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে কেউ ইচ্ছা করলেই আরবি ভাষায় দক্ষ হয়ে যেতে পারে। তিনি বাইয়্যিনাহ টিভিতে চমৎকার চমৎকার কিছু কৌশলে মানুষকে আরবি শেখান। যেহেতু তিনি অনেক সংগ্রাম করে আরবি শিখেছেন, তাই তিনি জানেন- কীভাবে শেখালে মানুষ তাড়াতাড়ি আরবি ভাষায় দক্ষ হতে পারে। তাঁর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো- মানুষকে কুরআনের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। তাঁর বিশ্বাস, মানুষকে আগে আরবি শেখানের ভয় দেখালে সে কখনো কুরআনের স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে না। তাই মানুষকে আগে কুরআনের স্বাদ পাইয়ে দিতে হবে। তারপর মানুষ নিজ থেকেই আরবি শিখতে চাইবে, যেমনটি স্বয়ং তাঁর নিজের ক্ষেত্রে ঘটেছে।
তিনি মনে করেন, তাঁর মতো লাখো তরুণ দিশেহারা হয়ে আছে। তাদের কাছে একবার যদি কুরআনের মুজিযা তুলে ধরা যায়, তাহলে তাদের জীবনই পরিবর্তন হয়ে যাবে।
অনেকে অভিযোগ করে, আধুনিক তরুণরা কুরআন পড়ে না, আরবি পড়তে চায় না। নোমান আলী খান এমন অভিযোগ করেন না। তাঁর কথা হলো- 'আমরা যদি তরুণদের জন্য আরবি ভাষাকে সহজ করে দিতে পারতাম, অবশ্যই তারা আরবি শিখত। আমরা যদি কুরআনকে তাদের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে পারতাম, অবশ্যই তারা তা গ্রহণ করত। কারণ, ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। সবাই বলে- আরবি ভাষা ও কুরআন শেখার জন্য আমার কাছে এসো, কিন্তু আমি নিজেই কুরআন শেখানোর জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে উপস্থিত হতে চাই।'
দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকলে শক্তিশালী লোহাতেও মরিচাতে পড়ে ক্ষয়ে যায়। একজন মুসলমানের ঈমানের যত্ন না নিলে তেমনি কালবের ওপরে প্রলেপ পড়ে যায়, নষ্ট হয়ে যেতে থাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস- আমাদের আত্মা। একটা প্র্যাকটিসিং মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও আমাদের অনেকেই ইসলাম থেকে, আল্লাহর ভালোবাসা থেকে দূরে সরে যায়। ফলে কোনো কাজেই শান্তি থাকে না, কোনো কিছুতেই স্বস্তি পাওয়া যায় না। জীবন তখন যেন ছন্নছাড়া হয়ে যায়। ফলে জীবনের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যায়।
এসব বিবেচনায় উস্তাদ নোমান আলী খানের লেকচারের মাঝে রয়েছে আত্মিক জ্ঞানের, আল্লাহর দ্বীন উপলব্ধির সুন্দরতম দিক; যেগুলো জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিক এবং অর্থপূর্ণ। ফলে এসব আলোচনার মাধ্যমে আমাদের আল্লাহকে ভুলে যাওয়া ক্ষুদ্র আত্মা এক অন্য দিগন্তের খোঁজ পায়, আল্লাহর দিকে পুনরায় ফিরে আসার প্রেরণা জোগায়।
উস্তাদ নোমান আলী খানের অনন্য বিশেষত্ব কী? দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুই মনে হয়- এটা কেন এমন, ওটা কেন অমন হয়, কেন এসব এমন হয় না, সবকিছু এ রকম কেন হয় টাইপের। এটা নিশ্চিত যে, এসবের পরিষ্কার উত্তর আমাদের রব আল্লাহ তায়ালার দেওয়া জীবনবিধানে পরিষ্কারভাবেই আছে।
কিন্তু সেগুলো কীভাবে বুঝতে হয়, সেগুলোর গূঢ় কারণ কী? কীভাবে মনের এই সময়গুলোকে 'ডিল' করতে হয়, তা আমাদের মতো অধিকাংশদের কাছেই অজানা। এসব প্রশ্নগুলো দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির যার সাথে আত্মিক বিশ্বাস যুক্ত- এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর যারা অমন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। কিন্তু নোমান আলী খানের লেকচারে সেসবের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক উত্তর রয়েছে। ফলে আমাদের মতো যুবকদের মনে জেগে উঠা সাধারণ ও সমস্যামূলক অনেক জিজ্ঞাসার অসাধারণ সুন্দর সমাধান পাওয়া যায় উস্তাদের কথায়।
আমাদের অনেকেরই জীবনের একটা বাস্তব অথচ অমসৃণ অভিজ্ঞতা হলো, সাধারণত কিশোর-তরুণরা গড়ে উঠার সময়ে মনে মনে দ্বীন-ইসলামসংক্রান্ত প্রচুর প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। হতে পারে সেটা পর্দা নিয়ে, কোনো ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন নিয়ে, ফিকহ অথবা ধর্মীয় তত্ত্বসংক্রান্ত প্রশ্ন, হয়তো কোনো অশ্লীল বিষয়কে কীভাবে ডিল করতে হবে তা নিয়ে, অথবা কীভাবে দান করতে হয়, নিয়াত কেমন থাকা উচিত- এ রকম হাজারো প্রশ্নের উত্তর জানতে ইচ্ছে করে। অথচ এই বিশ্বাসী তরুণ-তরুণীরা উত্তর না পেয়ে শেষে ভুল করতে থাকে। একদিন হয়তো তাদের ইচ্ছেটাই হারিয়ে যায়... কুরআনের স্বতঃস্ফূর্ত পড়াশোনা, ইসলামকে তরুণ প্রজন্মের কাছে সুন্দর করে উপস্থাপনার আয়োজন বাংলাদেশে, আমাদের সমাজে খুবই কম। এই অদ্ভুত অবস্থায় আমার মতো ছেলেদের জন্য অশেষ রহমত অনলাইনের রিসোর্সে পাওয়া স্কলাররা- যারা তরুণ প্রজন্মের সাথে খোলামেলা আলাপ করেন, কীভাবে চিন্তা করতে হবে শেখান, কীভাবে ভাবতে হয় সেটা শেখান। আর সেগুলোর ভিডিও অ্যাভেইলেবল পাওয়া যায় ইন্টারনেটে। এসবের মাঝে উস্তাদ একজন অন্যতম শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন। বস্তুত হেদায়াতের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা।
উস্তাদ নোমান আলী খানের বক্তব্যের সুন্দর দিক হলো- তিনি সাধারণ আর সরল ভাষায় তরুণদের বোধগম্য হওয়ার মতো করে বিষয়গুলো আলোচনা করেন।
তার একেকটা লেকচার শোনার পর ওই বিষয়ক খটকা এবং প্রশ্ন থাকে না এবং পালন করার ব্যাপারে সন্দেহ আর অজুহাত থাকে না। এইটুকু বুঝতে হলে হয়তো আমাদেরকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়তে হতো। এই সহজ-সরল অথচ গভীর ও বহুমুখী প্রজ্ঞার কারণে আমাদেরকে আল্লাহর বাণী আরও কাছে টানে, আল্লাহর দ্বীন পালনে নিজেদের আরও উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।
উস্তাদ নিজেই একটি ঘটনা তুলে ধরেছিলেন, যেখানে আমরা উস্তাদের আল্লাহর বাণী আল-কুরআন মাজিদের আলোচনায় তার অনন্যতা উঠে আসে।
তিনি বলেন, অনেক মা তাদের সন্তানকে জোর করে তাঁর লেকচার ও সেমিনারে পাঠান বা নিজে নিয়ে আসেন, যাতে করে তারা তাঁর লেকচার শুনতে পারে এবং ইসলামের পথে আসতে পারে। কিন্তু একবার যখন উস্তাদের কুরআনের আলোচনা শুনে, এরপর অনেকেই আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেছেন- 'আমি যেন এই জীবনে এই প্রথম আল্লাহর বাণী শ্রবণ করলাম!' এত গভীর ও অলৌকিকতার সহিত এর আগে আমি আর কখনোও শুনিনি। এরপর থেকে নিজেরাই আসত! কী অসাধারণ চমৎকারিত্বের বর্ণনা হলে এই সব প্রায় বখে যাওয়া, ইসলামের প্রতি অনীহাপ্রবণ ছেলেমেয়েরা নিজ ইচ্ছায় আসে ও অন্যদের নিয়ে আসে উস্তাদ নোমান আলী খানের সেমিনার ও লেকচার শুনতে!
মুসলিম উম্মাহর ব্যাপারে অনেকে যেখানে কেবল অভিযোগ আর সমস্যা চিহ্নিত করে, সেখানে নোমান আলী দেখেন সম্ভাবনা ও স্বপ্নের দ্বার। তিনি তরুণদের মাঝে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা দেখতে পান। উম্মাহর ৭০ ভাগ তরুণকে যদি কেবল সঠিক অনুপ্রেরণা দেওয়া যায়, তাঁর বিশ্বাস, বিশ্বের চেহারাটাই পালটে যাবে। তিনি মনে করেন- মুসলিমদের দায়িত্ব হলো কেবল তরুণদের কাছে উন্নত ও সহজ পদ্ধতিতে কুরআনের বাণী পৌছে দেওয়া; বাকি দায়িত্ব আল্লাহর। তিনিই সব করবেন। একই মাটিতে একই বৃষ্টির পানি পড়ার পরও যেভাবে ভিন্ন ভিন্ন ফুলের জন্ম হয়, একই ওহি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে সে রকম হাজার রকমের সম্ভাবনা ও পরিবর্তনের সূচনা হবে। নোমান আলী খানের চিন্তাভাবনা সব তরুণদের জন্যই। এ কারণেই সম্ভবত সারা পৃথিবীর তরুণরা নোমান আলী খানকে তাদের জন্য আদর্শ মনে করে। তাঁর বক্তব্যগুলো সারা বিশ্বের তরুণদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, বিশ্বের নানা প্রান্তের তরুণরা তাদের নিজেদের ভাষায় নোমান আলী খানের বক্তব্যগুলো ভাষান্তরিত করছে। বাংলা ভাষায় তাঁর ১০০ টিরও অধিক বক্তৃতা ডাবিং, সাবটাইটেল, নোট এবং আর্টিকেল হিসেবে পরিবেশন করেছে আমাদের NAK Bangla ওয়েবসাইট। আল-কুরআনকে দর্শকদের সামনে জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে সত্যিই নোমান আলী খান এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব এবং একটি অসাধারণ প্রতিষ্ঠান।
কুরআন তার সৌন্দর্যে চিত্তবিমোহনকারী, শব্দের দিক থেকে বিমোহিতকারী, বাণীর দিক থেকে প্রবলতর শক্তিশালী, সংগতি ও ঐক্যতানের দিক থেকে মন্ত্রমুগ্ধকারী এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক থেকে অন্যকে হতবুদ্ধকারী।
উস্তাদ নোমান আলী খান আল-কুরআনের শব্দচয়ন, শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের সাথে বাস্তব উদাহরণ, বাক্যের ধরন-গঠন, উপমা, একটি সূরার সাথে অন্য সূরার সংগতি ও সেতুবন্ধন, প্রতিটির ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য অথচ একটি সাথে আরেকটির অর্থগত ও শাব্দিক তুলনায় কত মিল এবং আল-কুরআনের গভীর ব্যাখ্যা ইত্যাদি মুজিযাভিত্তিক ও অর্থের দিক থেকে চমৎকার আলোচনার জন্য সারা বিশ্বেই বেশ সমাদৃত। তাঁর কুরআনের আলোচনা এতটাই প্রিয় যে, সরাসরি অনলাইন ওয়েবিনারে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯০টিরও অধিক দেশের মানুষজন অংশগ্রহণ করেছিলেন।
কুরআনের চমৎকার শৈল্পিক সৌন্দর্য উপস্থাপনার জন্য তিনি বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের মুসলিম তরুণ প্রজন্মের কাছে এক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। কুরআনের শব্দচয়ন কতটা সৃজনশীল, ভাষা কতটা মনোমুগ্ধকর, অর্থ কতটা যৌক্তিক। এগুলোই নোমান আলী খানের চিন্তা-ভাবনা ও আলোচনার বিষয়। তাঁর বক্তব্যে কুরআনের অন্তর্গত সৌন্দর্য ও মুজিযা মানুষের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনার ও অনলাইনে তাঁর বক্তব্য শুনে অসংখ্য মানুষ ইসলামের দিকে ফিরে আসছে এবং ইসলাম গ্রহণ করছে। তিনি প্রায় ২০টিরও অধিক তাফসির গ্রন্থ পাঠ করেছেন। ফলে কুরআন নাজিলের ইতিহাস, শব্দচয়নের কারণ, ভাষার অলঙ্কার, অর্থের গভীরতা, যুক্তির প্রখরতা এবং ব্যাকরণগত শুদ্ধতার বিষয়গুলো তাঁর আলোচনায় ফুটে ওঠে। তাই অনেক ইসলামি স্কলার নোমান আলী খানকে আল কুরআনের ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এ ছাড়াও বিশ্বের ৫০০ প্রভাবশালী ইসলামি স্কলারের মাঝে তাঁর স্থান অন্যতম।
এ মানুষটি জন্মগ্রহণ করেন জার্মানির রাজধানী বার্লিন শহরে। কিন্তু শিশু নোমান সেখানে ছয় মাসও থাকেননি। তাঁর বাবা পাকিস্তান দূতাবাসে কাজ করতেন বলে পরিবারসহ ছয় মাস বয়সে তাঁকে পাকিস্তানে চলে আসতে হয়। এখানেও তাঁর পরিবার দুমাসের বেশি থাকেননি; চলে যান সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় রিয়াদে, একটি পাকিস্তানি উর্দু মিডিয়াম স্কুলে। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছয় বছর তাঁর পরিবার রিয়াদে অবস্থান করেন। এরপর তাঁরা চলে যান আমেরিকায়। সেখানে তিনি খ্রিষ্টানদের পরিচালিত একটি হাইস্কুলে ভর্তি হন।
ফলে সবকিছুই তাঁর কাছে ভিন্ন মনে হলো। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন পরিবেশ। বন্ধুরা সব ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন সংস্কৃতি লালন করে এবং চলাফেরা করে ভিন্নভাবে। এতে তাঁর কাছে অনেক অসহায় লেগেছিল তখন। প্রায় দুই বছর পর্যন্ত তিনি কোনো মুসলিমের দেখা পাননি। শুক্রবারে ক্লাস থাকায় দুই বছর তিনি জুমার সালাতও পড়তে পারেননি। অথচ তখন তিনি হাইস্কুলের ছাত্র। তাঁর বন্ধুদের আচার-আচরণের মধ্যে নৈতিকতা ও ধর্মের কোনো ছোঁয়া ছিল না। ফলে তিনিও ধীরে ধীরে তাদের আচার-আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁকে বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না; এমনকী তাঁর পরিবারও না। একসময় তাঁর মাঝে প্রবল অপরাধবোধ জেগে ওঠে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। হয় তাঁকে ধর্ম ত্যাগ করতে হবে, নাহয় স্কুল ত্যাগ করতে হবে। দুর্ভাগ্য, অন্য কোথাও ভালো স্কুল নেই বলে পরিবার তাঁকে স্কুল ত্যাগ করতে দিলো না। স্কুল শেষে তিনি কলেজে ভর্তি হলেন। আগের মতোই বন্ধুদের সাথে চলাফেরা, সবকিছু। এবার তিনি আস্ত নাস্তিক হয়ে গেলেন। প্রায় দুই বছর তিনি নাস্তিকতার চর্চা করেন। ইসলাম থেকে তখন তিনি অনেক অনেক দূরে চলে গেলেন।
তারপর সময় হলো ফিরে আসার। নোমান আলী খান ইসলামে ফিরে আসলেন আগের চেয়ে শতগুণ গতিতে। হঠাৎ একদিন আমেরিকান মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (MSA) দুজন সদস্যের সাথে তাঁর দেখা হয়।
তাঁরা নিজেদের মধ্যে কুরআনের আলোচনা করছিলেন; তিনি তা শুনছিলেন। যদিও এসব ধর্ম-কর্মের আলাপ তাঁর কাছে তখন ভালো লাগত না। তাঁরা নিজেরাই নোমান আলী খানের সাথে পরিচিত হলেন এবং ছায়ার মতো তাঁর সাথে চলাফেরা শুরু করলেন। তবে তাঁরা কখনো সরাসরি নোমান আলী খানকে কুরআন পড়তে কিংবা সালাত আদায় করতে বলেননি। এমনকী কখনো ইসলামের দাওয়াতও দেননি। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন তাঁরা নোমান আলী খানের সাথে সময় কাটাতে লাগলেন। এতেই নোমান আলী খানের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়।
একদিন তাঁদের একজন নোমান আলী খানের সামনে সালাত পড়লেন। নোমান আলী খানের কাছে খুব খারাপ লাগল। কারণ, তিনি সালাতের অনেক কিছুই ভুলে গেছেন দুই বছরের নাস্তিকতার কারণে; এমনকী মাগরিবের সালাত কয় রাকাত,
তিনি ভুলে গেছেন! নিজের অজান্তেই তিনি মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের এ দুজন ভাইকে বন্ধু ভাবতে লাগলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতেও লাগলেন। ধীরে ধীরে তাঁর অন্তরে ইসলাম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়তে থাকে। তিনি কুরআনের অনুবাদ পড়া শুরু করলেন। আল্লামা ইউসুফ আলীর ইংরেজি অনুবাদ পড়তে লাগলেন।
কিন্তু অনুবাদের মাধ্যমে কুরআন বোঝা খুবই কষ্টকর। কোথায় বাক্যের শুরু আর কোথায় বাক্যের শেষ- কিছুই তিনি বুঝতে পারছিলেন না। কেন আল্লাহ হঠাৎ করে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে চলে যান- এসব কিছুই তিনি অনুবাদ পড়ে বুঝতে পারেননি। তখন তিনি ভালোভাবে কুরআন বোঝার জন্য গুগল সার্চ করতে লাগলেন। ইন্টারনেটে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচুর লেকচার পেলেন, কিন্তু কুরআনের ধারাবাহিক কোনো আলোচনা তখনও তিনি পাননি।
কুরআনের ধারাবাহিক আলোচনা প্রথম তিনি শোনেন তাঁর মহল্লার একটি মসজিদে। রমজান মাস উপলক্ষ্যে সে মসজিদে পাকিস্তান থেকে একজন আলেম আসেন। তাঁর নাম ছিল ইমাম ডক্টর আব্দুস সামি। তিনি প্রতিদিন এক পারা করে কুরআনের অনুবাদ এবং সংক্ষিপ্ত তাফসির করতেন। সকালে দুই ঘণ্টা, বিকালে চার ঘণ্টা এবং তারাবির পর রাত ১০টা পর্যন্ত কুরআনের ধারাবাহিক আলোচনা হতো। নোমান আলী খান ডক্টর আব্দুস সামির সকল আলোচনায় অংশ নেন। এভাবে তিনি সম্পূর্ণ কুরআনের তাফসির শুনে শেষ করেন। কুরআনের এই ধারাবাহিক আলোচনা শুনে তাঁর কাছে মনে হয়েছে, তিনি এবারই প্রথম কুরআন শুনেছেন। এতে কুরআনের প্রতি তাঁর ভীষণ আগ্রহ জন্মে।
তিনি তাঁর উস্তাদ ডক্টর আব্দুস সামিকে বলেন, 'আপনি যেভাবে তাফসির করেছেন, আমিও সেভাবে তাফসির করতে চাই।' ডক্টর আব্দুস সামি তাঁকে বললেন- 'তাহলে আগে আরবি শেখো।' নোমান আলী খান তাঁকে বললেন, 'আমি থাকি নিউইয়র্কে, সারা দিন কাজ থাকে, কলেজে যেতে হয়, আমি কীভাবে সৌদি আরব গিয়ে আরবি শিখব?' ডক্টর আব্দুস সামি (এখনও জীবিত আছেন ও তাঁর একটা ফাউন্ডেশনও আছে পাকিস্তানে) তাঁকে বললেন- 'তুমি আগামী সপ্তাহ থেকে এ মসজিদে আমার আরবি ক্লাসে আসতে পারো'। এভাবে তিনি ডক্টর আব্দুস সামির কাছে আরবি শেখা শুরু করেন।
পরবর্তীকালে তিনি ডক্টর আব্দুস সামির ব্যাপারে স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'আমি তাঁর কাছে গিয়ে কুরআন তাফসির শুনতাম। আমার জীবনে এ রকম কুরআনের আলোচনা আমি শুনিনি। তাঁর আলোচনা শুনে মনে হতো, এই বুঝি এক্ষুনি কুরআন নাজিল হচ্ছে আমার ওপর, আমারই বিভিন্ন বিষয়ে। এতটাই জীবন্ত ছিল আল্লাহর বাণীর সেসব আলোচনা, এই তাফসিরই তাকে আরবি শেখার দিকে উদ্বুদ্ধ করে, আল্লাহর দিকে গভীরভাবে ফিরে আসতে সহায়তাস্বরূপ কাজ করে।
তিনি আরবি ব্যাকরণ শিখেন পাকিস্তানে। সেখানে তিনি ১৯৯৩ সালে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় জাতীয় পর্যায়ের মেধা তালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে স্থান দখল করেন।
কিন্তু আরবিতে তাঁর গভীর পড়াশোনা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডক্টর আব্দুস সামি-এর তত্ত্বাবধানে। ডক্টর আব্দুস সামি পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের কুরআন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, যিনি মাঝে মাঝে আমেরিকাতে যেতেন আরবি শিক্ষা এবং কুরঅনের তাফসিরের ওপরে গভীরতাপূর্ণ বক্তব্য রাখতে। তাঁর অধীনে পড়াশোনায় নোমান আলী খান আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের ওপরে তীক্ষ্ম এবং গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি পরবর্তীকালে ডক্টর আব্দুস সামির কাছে আরও উপকৃত হন তাঁর সম্পূর্ণ শিক্ষাদান পদ্ধতিকে আত্মস্থ করে। তিনি ডক্টর সামির করা কাজগুলোকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন; তাঁর নিজের ছাত্রদের উপকারের জন্য।
আরবি শেখা অবস্থায় তিনি ইন্টারনেটে খুঁজতে খুঁজতে একদিন পেয়ে গেলেন ড. তারিক আল-সোয়াইদানের কুরআনের মুজিযা বিষয়ক প্রায় ১৫ ঘণ্টার একটি ভিডিও সিরিজ আলোচনা। এটি ছিল আরবিতে। তিনি রাত-দিন এগুলো শুনতে থাকলেন, কিন্তু তেমন কিছুই বুঝতেন না। পরে সম্পূর্ণ লেকচারটা লিখে ফেললেন। অভিধান থেকে প্রত্যেকটি শব্দের অর্থ বের করলেন।
এভাবে আস্তে আস্তে তিনি আরবি লেকচার বুঝতে শুরু করলেন। এর কিছুদিন পর তিনি ইন্টারনেটে পেলেন শাইখ মুতাওল্লিকে। তাঁর লেকচারগুলো নোমান আলী খানকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে। এরপর পেলেন কুরআনের ওপর লেখা ডা. ফাদেল আল সামারাইয়ের বিভিন্ন বই ও বক্তৃতা। এগুলো পেয়ে তাঁর কাছে মনে হলো, তিনি জ্ঞানের সাগর পেয়ে গেছেন। তিনি এসব পড়তে ও শুনতে শুরু করলেন। একের পর এক স্কলারকে আবিষ্কার করলেন, আর তাঁদের থেকে জ্ঞান আহরণ করতে থাকলেন। দিনের পর দিন পরিশ্রম করলেন। নিজেকে নিজে বারবার বাধ্য করলেন- যেভাবেই হোক আরবি শিখতে হবে, আরবি বুঝতে হবে। মানুষ যা চায় তা-ই পায়। আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেছেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নোমান আলী খান আরবি ভাষা ও কুরআনের ওপর অসাধারণ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। চমৎকার উপস্থাপনা, যুক্তিযুক্ত কথা, সহজ-সরল পদ্ধতির কারণে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ আজ কুরআন শেখার জন্য তাঁর কাছে ভিড় করছে। কেবল অনলাইনে বর্তমানে ১০ হাজারেরও বেশি তরুণ তাঁর কাছে কুরআন ও আরবি ভাষা শিখছে।
আরবি ভাষায় কুরআন উপলব্ধির ব্যাপারে তিনি বলেন-
'কুরআনের এই অলৌকিকতার মাঝেই যে অনিন্দ্য হেদায়াত রয়েছে, শুধু কুরআনের অনুবাদ পড়ে কোনোভাবেই তা আহরণ করা সম্ভব নয়। কারণ, অনুবাদে আসতে পারে কিছুটা মেসেজ, কিন্তু আল্লাহর অলৌকিকত্ব ও তাঁর বাণীর যে গভীরতা, সেটা কোনোভাবেই আসে না।'
তিনি সিদ্ধান্ত নেন- যত কষ্ট করে তিনি ইসলাম ও কুরআন শিখেছেন, ততটা কষ্ট যাতে অন্য কোনো মুসলিমের করতে না হয়, সেজন্য তিনি অনলাইনে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। সিদ্ধান্তানুযায়ী ২০০৫ সালে তিনি বাইয়্যিনাহ ইন্সটিটিউট নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন এবং বাইয়্যিনাহ টিভি নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। এই সাইটে কুরআনের সৌন্দর্য, আরবি ভাষা ও ইসলামের ইতিহাসের ওপর বর্তমানে পাঁচ শতাধিক ভিডিও ক্লাস রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে বাইয়্যিনাহ টিভি নামে বিশ্বব্যাপী একটি চ্যানেলও চালু হবে। মূলত দুটো উদ্দেশ্যে তিনি এসব কাজ করছেন। প্রথমত, মানুষের জন্য আরবি ভাষাকে একেবারে সহজ করে তোলা; যাতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে কেউ ইচ্ছা করলেই আরবি ভাষায় দক্ষ হয়ে যেতে পারে। তিনি বাইয়্যিনাহ টিভিতে চমৎকার চমৎকার কিছু কৌশলে মানুষকে আরবি শেখান। যেহেতু তিনি অনেক সংগ্রাম করে আরবি শিখেছেন, তাই তিনি জানেন- কীভাবে শেখালে মানুষ তাড়াতাড়ি আরবি ভাষায় দক্ষ হতে পারে। তাঁর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো- মানুষকে কুরআনের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। তাঁর বিশ্বাস, মানুষকে আগে আরবি শেখানের ভয় দেখালে সে কখনো কুরআনের স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে না। তাই মানুষকে আগে কুরআনের স্বাদ পাইয়ে দিতে হবে। তারপর মানুষ নিজ থেকেই আরবি শিখতে চাইবে, যেমনটি স্বয়ং তাঁর নিজের ক্ষেত্রে ঘটেছে।
তিনি মনে করেন, তাঁর মতো লাখো তরুণ দিশেহারা হয়ে আছে। তাদের কাছে একবার যদি কুরআনের মুজিযা তুলে ধরা যায়, তাহলে তাদের জীবনই পরিবর্তন হয়ে যাবে।
অনেকে অভিযোগ করে, আধুনিক তরুণরা কুরআন পড়ে না, আরবি পড়তে চায় না। নোমান আলী খান এমন অভিযোগ করেন না। তাঁর কথা হলো- 'আমরা যদি তরুণদের জন্য আরবি ভাষাকে সহজ করে দিতে পারতাম, অবশ্যই তারা আরবি শিখত। আমরা যদি কুরআনকে তাদের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে পারতাম, অবশ্যই তারা তা গ্রহণ করত। কারণ, ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। সবাই বলে- আরবি ভাষা ও কুরআন শেখার জন্য আমার কাছে এসো, কিন্তু আমি নিজেই কুরআন শেখানোর জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে উপস্থিত হতে চাই।'
দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকলে শক্তিশালী লোহাতেও মরিচাতে পড়ে ক্ষয়ে যায়। একজন মুসলমানের ঈমানের যত্ন না নিলে তেমনি কালবের ওপরে প্রলেপ পড়ে যায়, নষ্ট হয়ে যেতে থাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস- আমাদের আত্মা। একটা প্র্যাকটিসিং মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও আমাদের অনেকেই ইসলাম থেকে, আল্লাহর ভালোবাসা থেকে দূরে সরে যায়। ফলে কোনো কাজেই শান্তি থাকে না, কোনো কিছুতেই স্বস্তি পাওয়া যায় না। জীবন তখন যেন ছন্নছাড়া হয়ে যায়। ফলে জীবনের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যায়।
এসব বিবেচনায় উস্তাদ নোমান আলী খানের লেকচারের মাঝে রয়েছে আত্মিক জ্ঞানের, আল্লাহর দ্বীন উপলব্ধির সুন্দরতম দিক; যেগুলো জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিক এবং অর্থপূর্ণ। ফলে এসব আলোচনার মাধ্যমে আমাদের আল্লাহকে ভুলে যাওয়া ক্ষুদ্র আত্মা এক অন্য দিগন্তের খোঁজ পায়, আল্লাহর দিকে পুনরায় ফিরে আসার প্রেরণা জোগায়।
উস্তাদ নোমান আলী খানের অনন্য বিশেষত্ব কী? দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুই মনে হয়- এটা কেন এমন, ওটা কেন অমন হয়, কেন এসব এমন হয় না, সবকিছু এ রকম কেন হয় টাইপের। এটা নিশ্চিত যে, এসবের পরিষ্কার উত্তর আমাদের রব আল্লাহ তায়ালার দেওয়া জীবনবিধানে পরিষ্কারভাবেই আছে।
কিন্তু সেগুলো কীভাবে বুঝতে হয়, সেগুলোর গূঢ় কারণ কী? কীভাবে মনের এই সময়গুলোকে 'ডিল' করতে হয়, তা আমাদের মতো অধিকাংশদের কাছেই অজানা। এসব প্রশ্নগুলো দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির যার সাথে আত্মিক বিশ্বাস যুক্ত- এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর যারা অমন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। কিন্তু নোমান আলী খানের লেকচারে সেসবের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক উত্তর রয়েছে। ফলে আমাদের মতো যুবকদের মনে জেগে উঠা সাধারণ ও সমস্যামূলক অনেক জিজ্ঞাসার অসাধারণ সুন্দর সমাধান পাওয়া যায় উস্তাদের কথায়।
আমাদের অনেকেরই জীবনের একটা বাস্তব অথচ অমসৃণ অভিজ্ঞতা হলো, সাধারণত কিশোর-তরুণরা গড়ে উঠার সময়ে মনে মনে দ্বীন-ইসলামসংক্রান্ত প্রচুর প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। হতে পারে সেটা পর্দা নিয়ে, কোনো ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন নিয়ে, ফিকহ অথবা ধর্মীয় তত্ত্বসংক্রান্ত প্রশ্ন, হয়তো কোনো অশ্লীল বিষয়কে কীভাবে ডিল করতে হবে তা নিয়ে, অথবা কীভাবে দান করতে হয়, নিয়াত কেমন থাকা উচিত- এ রকম হাজারো প্রশ্নের উত্তর জানতে ইচ্ছে করে। অথচ এই বিশ্বাসী তরুণ-তরুণীরা উত্তর না পেয়ে শেষে ভুল করতে থাকে। একদিন হয়তো তাদের ইচ্ছেটাই হারিয়ে যায়... কুরআনের স্বতঃস্ফূর্ত পড়াশোনা, ইসলামকে তরুণ প্রজন্মের কাছে সুন্দর করে উপস্থাপনার আয়োজন বাংলাদেশে, আমাদের সমাজে খুবই কম। এই অদ্ভুত অবস্থায় আমার মতো ছেলেদের জন্য অশেষ রহমত অনলাইনের রিসোর্সে পাওয়া স্কলাররা- যারা তরুণ প্রজন্মের সাথে খোলামেলা আলাপ করেন, কীভাবে চিন্তা করতে হবে শেখান, কীভাবে ভাবতে হয় সেটা শেখান। আর সেগুলোর ভিডিও অ্যাভেইলেবল পাওয়া যায় ইন্টারনেটে। এসবের মাঝে উস্তাদ একজন অন্যতম শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন। বস্তুত হেদায়াতের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা।
উস্তাদ নোমান আলী খানের বক্তব্যের সুন্দর দিক হলো- তিনি সাধারণ আর সরল ভাষায় তরুণদের বোধগম্য হওয়ার মতো করে বিষয়গুলো আলোচনা করেন।
তার একেকটা লেকচার শোনার পর ওই বিষয়ক খটকা এবং প্রশ্ন থাকে না এবং পালন করার ব্যাপারে সন্দেহ আর অজুহাত থাকে না। এইটুকু বুঝতে হলে হয়তো আমাদেরকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়তে হতো। এই সহজ-সরল অথচ গভীর ও বহুমুখী প্রজ্ঞার কারণে আমাদেরকে আল্লাহর বাণী আরও কাছে টানে, আল্লাহর দ্বীন পালনে নিজেদের আরও উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।
উস্তাদ নিজেই একটি ঘটনা তুলে ধরেছিলেন, যেখানে আমরা উস্তাদের আল্লাহর বাণী আল-কুরআন মাজিদের আলোচনায় তার অনন্যতা উঠে আসে।
তিনি বলেন, অনেক মা তাদের সন্তানকে জোর করে তাঁর লেকচার ও সেমিনারে পাঠান বা নিজে নিয়ে আসেন, যাতে করে তারা তাঁর লেকচার শুনতে পারে এবং ইসলামের পথে আসতে পারে। কিন্তু একবার যখন উস্তাদের কুরআনের আলোচনা শুনে, এরপর অনেকেই আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেছেন- 'আমি যেন এই জীবনে এই প্রথম আল্লাহর বাণী শ্রবণ করলাম!' এত গভীর ও অলৌকিকতার সহিত এর আগে আমি আর কখনোও শুনিনি। এরপর থেকে নিজেরাই আসত! কী অসাধারণ চমৎকারিত্বের বর্ণনা হলে এই সব প্রায় বখে যাওয়া, ইসলামের প্রতি অনীহাপ্রবণ ছেলেমেয়েরা নিজ ইচ্ছায় আসে ও অন্যদের নিয়ে আসে উস্তাদ নোমান আলী খানের সেমিনার ও লেকচার শুনতে!
মুসলিম উম্মাহর ব্যাপারে অনেকে যেখানে কেবল অভিযোগ আর সমস্যা চিহ্নিত করে, সেখানে নোমান আলী দেখেন সম্ভাবনা ও স্বপ্নের দ্বার। তিনি তরুণদের মাঝে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা দেখতে পান। উম্মাহর ৭০ ভাগ তরুণকে যদি কেবল সঠিক অনুপ্রেরণা দেওয়া যায়, তাঁর বিশ্বাস, বিশ্বের চেহারাটাই পালটে যাবে। তিনি মনে করেন- মুসলিমদের দায়িত্ব হলো কেবল তরুণদের কাছে উন্নত ও সহজ পদ্ধতিতে কুরআনের বাণী পৌছে দেওয়া; বাকি দায়িত্ব আল্লাহর। তিনিই সব করবেন। একই মাটিতে একই বৃষ্টির পানি পড়ার পরও যেভাবে ভিন্ন ভিন্ন ফুলের জন্ম হয়, একই ওহি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে সে রকম হাজার রকমের সম্ভাবনা ও পরিবর্তনের সূচনা হবে। নোমান আলী খানের চিন্তাভাবনা সব তরুণদের জন্যই। এ কারণেই সম্ভবত সারা পৃথিবীর তরুণরা নোমান আলী খানকে তাদের জন্য আদর্শ মনে করে। তাঁর বক্তব্যগুলো সারা বিশ্বের তরুণদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, বিশ্বের নানা প্রান্তের তরুণরা তাদের নিজেদের ভাষায় নোমান আলী খানের বক্তব্যগুলো ভাষান্তরিত করছে। বাংলা ভাষায় তাঁর ১০০ টিরও অধিক বক্তৃতা ডাবিং, সাবটাইটেল, নোট এবং আর্টিকেল হিসেবে পরিবেশন করেছে আমাদের NAK Bangla ওয়েবসাইট। আল-কুরআনকে দর্শকদের সামনে জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে সত্যিই নোমান আলী খান এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব এবং একটি অসাধারণ প্রতিষ্ঠান।
📄 পরিশিষ্ট : শারঈ সম্পাদকের কথা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মাদ -এর ওপর।
নোমান আলী খানের লেকচার থেকে চয়নকৃত কিছু আলোচনার মলাটবদ্ধ রূপ বন্ধন-এর শরঈ সম্পাদনা সমাপ্ত হলো। সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে কাজগুলো আমাকে করতে হয়েছে, শুরুতেই সে বিষয়ে কিছু কথা বলে নিই। যাতে করে পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে পাঠক একটা ধারণা লাভ করতে পারেন।
এই বইটিতে করা সম্পাদনার কাজগুলোকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক. যা মূল পাণ্ডুলিপি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন বিষয়গুলো আবার দুই ধরনের। প্রথম হলো- যেগুলোতে শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি উঠার সুযোগ আছে। দ্বিতীয় হলো, শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে মৌলিক বিচারে সমস্যা না থাকলেও বাংলাভাষী মানুষদের পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় তা না থাকাটাই উত্তম মনে হয়েছে। দুই. আয়াতসমূহের আরবি পাঠ সংযোজন, এর অনুবাদ সংযুক্তকরণ ও উপস্থাপনাগত সৌন্দর্যের দিক লক্ষ রেখে কোনো কোনো বাক্যকে একটু-আধটু পরিমার্জন।
এর বাইরে এক জায়গায় প্রয়োজন মনে হওয়ায় টীকা যুক্ত করা হয়েছে; যাতে করে পাঠকের মধ্যে কোনো ভুল জানা বা অর্ধ-জানা তৈরি হতে না পারে। মূল পাণ্ডুলিপির বিষয় সূচিতেও কিছু রদবদল করা হয়েছে। হৃদয়গ্রাহী আলোচনা ও কিছুটা রুক্ষ আলোচনাকে সমতা রক্ষা করে সাজানো হয়েছে। এই ছিল শরঈ সম্পাদনার মোটামুটি বর্ণনা।
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। প্রসঙ্গের মূল ফটকে প্রবেশ করার আগে প্রস্তুতিমূলক কিছু কথা আরজ করব। আশা করি, পাঠক এতে চিন্তার খোরাক পাবেন এবং নিজেদের পাথেয় হিসেবে তা গ্রহণ করে নেবেন।
মানুষকে যাচাই-বাছাই করার ইসলামসম্মত শাস্ত্রটির নাম হচ্ছে- 'ইলমুল জারহি- ওয়াত তাদিল'। 'ব্যক্তি নির্ণয় বিদ্যা' হিসেবে এটি স্বীকৃত ও সমাদৃত। এই শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞদের একটা কথা খুবই প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য। তা হলো- লি কুলু ফন্নিন রিজাল। অর্থাৎ প্রত্যেক শাস্ত্রের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন। সেই ব্যক্তিদের কাছ থেকেই ওই শাস্ত্রের বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু যিনি যে শাস্ত্রের পণ্ডিত, তার দক্ষতা সেই শাস্ত্রতেই, সুতরাং এর বাইরের অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে তার মতামত অতটা গ্রহণযোগ্যতা ও স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার রাখে না। এই বিষয়টিকে অনেকেই তাদের গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। তাদের মধ্যে ভারতের বিশ্ব বিখ্যাত আলেম, ফকিহ, মুহাদ্দিস আল্লামা আবদুল হাই লাখনবি (রহ.) অন্যতম।
এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের বাংলা ভাষ্য হুবহু তুলে ধরছি : 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি স্থানের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের কথা ও প্রতিটি শাস্ত্রের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ব্যক্তিবর্গ তৈরি করেছেন। তাঁর সৃষ্টিজগতের প্রত্যেককে বিভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্যাবলি প্রদান করেছেন। যা একজনের মধ্যে পাওয়া যায়; অন্যজনের মধ্যে পাওয়া যায় না। যেমন: মুহাদ্দিসদের মধ্যে অনেকে এমন রয়েছেন যারা কেবল হাদিস বর্ণনা করেন, কিন্তু হাদিসের অন্তর্নিহিত মর্ম বোঝা ও সেখান থেকে মাসআলা-মাসায়েল উদ্ঘাটন করার মতো সক্ষমতা তাদের থাকে না। আবার এর বিপরীতে অনেক ফুকাহায়ে কেরাম রয়েছেন, যারা কেবল মাসআলা-মাসায়েল মুখস্থ করেন। হাদিস বর্ণনায় তারা দক্ষতা রাখেন না। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে- তাদের প্রত্যেককে স্ব স্ব স্থানে অবস্থান দেওয়া এবং তাদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া।'
এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি উদাহরণ পেশ করা হয় যার মাধ্যমে তিনি হলেন ইমাম গাজালি (রহ.)। তাঁর রচনা করা 'ইহয়াউ উলুমিদ্দিন' একটি জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ। এটি রচনাকাল থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর অধিক পঠিত গ্রন্থগুলোর অন্যতম। কিন্তু এই গ্রন্থে উল্লিখিত অনেক হাদিসের ওপরই প্রাজ্ঞ হাদিসবিশারদগণ আপত্তি করেছেন। সেগুলোর কোনোটিকে বাতিল আর কোনোটিকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অবহিত করেছেন। এই গ্রন্থে উল্লিখিত হাদিসগুলোর অবস্থা ও সূত্র নির্ণয় করে আল্লামা ইরাকি (রহ.) একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার নাম হলো- 'আলমুগনি আন হামলিল আসফারি ফিল আসফার ফি তাখরিজি মা ফিল ইহয়াই মিনাল আখবার।'
আল্লামা লাখনবি (রহ.) এই বিষয়ে বলছেন, 'ইহয়াউ উলুমিদ্দিনের গ্রন্থাকারের ব্যাপারটাই চিন্তা করুন। তার মর্যাদা ও অবস্থানের বিষয়টি তো স্বীকৃত। তবুও দেখা যায়, তাঁর গ্রন্থে তিনি এমন কিছু হাদিস নিয়ে এসেছেন, যার কোনো ভিত্তি নেই। সুতরাং এসব হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়; যেমনটা আল্লামা ইরাকির গ্রন্থ অধ্যয়ন করলে বুঝে আসে।'
মোটকথা, আমি যে বিষয়টি বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো- সবার মধ্যে সব ধরনের বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা থাকে না। আল্লাহ একেকজনকে একেক ধরনের বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা দান করেন। তো যে বিষয়ে যার যোগ্যতা আছে- সেই বিষয়ে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া ও সেই ক্ষেত্রে, আবারও বলছি, 'সেই ক্ষেত্রে' তাকে গ্রহণীয় মনে করা যেতে পারে। বাকি এর বাইরে অন্যান্য বিষয়ে তাঁর মন্তব্য অতটা গ্রহণযোগ্যতা রাখে না। সেটা যদি সঠিক হয় তবে তো ভালো। অন্যথায় সম্মানের সাথে তা বর্জন করতে হবে।
এবার চলুন মূল ফটকে প্রবেশ করি। আপনি যদি নোমান আলী খানের জীবনী পড়েন তাহলে দেখবেন যে, তাঁর মূল পাণ্ডিত্য ও দক্ষতার ক্ষেত্র হচ্ছে কুরআনের ভাষা তথা আরবি ভাষা ও সাহিত্যে। পবিত্র কুরআনের আলংকারিক সৌন্দর্যের বর্ণনা, নান্দনিকতার দিকগুলোর উপস্থাপনা ও বিভিন্ন আয়াতের আলোকে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন ইত্যাদিকে ব্যাখ্যা করা ও সামাজিক নানা অসংগতির সংশোধনকল্পে নাসিহাহ প্রদান করা।
সে হিসেবে তাঁর মূল অবস্থান হচ্ছে, তিনি একজন দায়ি ও কুরআনের মুজিযা তথা ভাষা-সৌন্দর্যের অভিলাষী ও মানুষের মাঝে কুরআনের বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাকারী। আরবি ভাষা শেখানোও তাঁর পছন্দের একটা কাজ। ফিকাহ-ফতোয়া বা হাদিস শাস্ত্র তাঁর পাণ্ডিত্যের বিষয় নয়। এই জায়গাটা স্পষ্ট হলেই আমাদের জন্য কর্মপন্থার পদ্ধতি বোঝাটা সহজ হয়ে যাবে।
নোমান আলী খান যেহেতু একজন মানুষ, সুতরাং তাঁর ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কিছু ভুল মানুষ করে থাকে তার চিন্তাগত অবস্থান থেকে। তো তিনি যেহেতু পশ্চিমা দেশে বেড়ে উঠেছেন এবং সেখানকার আবহাওয়াতে তিনি দাওয়াতি কাজ করেন, ফলে সেখানকার পরিবেশগত কিছু প্রভাবও কখনো কখনো তাকে প্রভাবিত করে; যা অনেক সময় তাঁর আলোচনাতেও প্রকাশ পায়ে যায়। সুতরাং এই বিষয়টার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত।
এর জন্য আপনাকে যে কাজগুলো করতে হবে তা হলো- দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানকে আরও শাণিত করা। কুরআনের জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধু লেকচারের ওপর সীমাবদ্ধ না থেকে নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থগুলোও অধ্যয়নের প্রতি মনোযোগ প্রদান করা। সালাফদের বুঝ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের কর্মপন্থা, তাদের আদর্শ ইত্যাদি বিষয়ে যত বেশি পারা যায় ধারণা অর্জন করা এবং এর আলোকেই পরবর্তীদের বক্তব্যকে নিরীক্ষণ করা।
কারণ, পূর্ববর্তী মনীষীদের অনুসরণের ব্যাপারে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) লোকদের নসিহত করে বলতেন, 'তোমাদের মধ্য হতে কেউ যদি কারও অনুসরণ করতে চায়, তবে যেন সে তাদের অনুসরণ করে, যাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। কারণ, জীবিতরা ফিতনা থেকে মুক্ত নয়।'
লেকচার শোনাটাও দ্বীনের জ্ঞান বৃদ্ধি করার একটা আধুনিক মাধ্যম। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, এটি দ্বীন শেখার মৌলিক কোনো মাধ্যম নয়; বরং সহায়ক মাত্র। তাই যারা প্রচুর পরিমাণে লেকচার শোনেন তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো- লেকচার শোনার সাথে সাথে আলেমদের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্ক সৃষ্টি করুন। সম্পর্ক যদি মোটামুটি থেকে থাকে তবে তাকে আরও উন্নত করুন। তাদের থেকে সরাসরি দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করতে বেশি সচেষ্ট হোন। এটাই দ্বীন শেখার সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। আপনি নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, সরাসরি কারও সংস্পর্শে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা আর ডিভাইসের সহায়তায় তা অর্জন করার মধ্যে কত বিস্তর ফারাক রয়েছে।
ওপরে যে মতামত প্রদান করা হলো, তা একান্তই আমার। আর এই বইয়ের শরঈ সম্পাদনা করার মানে এই নয় যে, নোমান আলী খানের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর সব আলোচনার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি বা ঢালাওভাবে সব শ্রেণির শ্রোতার জন্য তাঁর আলোচনা শোনাকে আমি সমর্থন ও উৎসাহিত করি। তবে উপকারী দ্বীনি জ্ঞান অর্জনকে আমি সব সময় উৎসাহিত করি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপকারী জ্ঞান দান করুন। ক্ষতিকর জ্ঞান থেকে হেফাজত করুন। ভালো কাজগুলো কবুল করে নিন। মন্দ কাজগুলো ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিন। আমিন।
আবদুল্লাহ আল মাসউদ ১৫-০১-১৮
টিকাঃ
১. উমদাতুর রিআয়াহ ১/১৩
২. আলআজওয়িবাতুল ফাদিলা, আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর টীকাসহ- ৩৩পৃ.
৩. জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহী ২/৪৭
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মাদ -এর ওপর।
নোমান আলী খানের লেকচার থেকে চয়নকৃত কিছু আলোচনার মলাটবদ্ধ রূপ বন্ধন-এর শরঈ সম্পাদনা সমাপ্ত হলো। সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে কাজগুলো আমাকে করতে হয়েছে, শুরুতেই সে বিষয়ে কিছু কথা বলে নিই। যাতে করে পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে পাঠক একটা ধারণা লাভ করতে পারেন।
এই বইটিতে করা সম্পাদনার কাজগুলোকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক. যা মূল পাণ্ডুলিপি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন বিষয়গুলো আবার দুই ধরনের। প্রথম হলো- যেগুলোতে শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি উঠার সুযোগ আছে। দ্বিতীয় হলো, শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে মৌলিক বিচারে সমস্যা না থাকলেও বাংলাভাষী মানুষদের পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় তা না থাকাটাই উত্তম মনে হয়েছে। দুই. আয়াতসমূহের আরবি পাঠ সংযোজন, এর অনুবাদ সংযুক্তকরণ ও উপস্থাপনাগত সৌন্দর্যের দিক লক্ষ রেখে কোনো কোনো বাক্যকে একটু-আধটু পরিমার্জন।
এর বাইরে এক জায়গায় প্রয়োজন মনে হওয়ায় টীকা যুক্ত করা হয়েছে; যাতে করে পাঠকের মধ্যে কোনো ভুল জানা বা অর্ধ-জানা তৈরি হতে না পারে। মূল পাণ্ডুলিপির বিষয় সূচিতেও কিছু রদবদল করা হয়েছে। হৃদয়গ্রাহী আলোচনা ও কিছুটা রুক্ষ আলোচনাকে সমতা রক্ষা করে সাজানো হয়েছে। এই ছিল শরঈ সম্পাদনার মোটামুটি বর্ণনা।
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। প্রসঙ্গের মূল ফটকে প্রবেশ করার আগে প্রস্তুতিমূলক কিছু কথা আরজ করব। আশা করি, পাঠক এতে চিন্তার খোরাক পাবেন এবং নিজেদের পাথেয় হিসেবে তা গ্রহণ করে নেবেন।
মানুষকে যাচাই-বাছাই করার ইসলামসম্মত শাস্ত্রটির নাম হচ্ছে- 'ইলমুল জারহি- ওয়াত তাদিল'। 'ব্যক্তি নির্ণয় বিদ্যা' হিসেবে এটি স্বীকৃত ও সমাদৃত। এই শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞদের একটা কথা খুবই প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য। তা হলো- লি কুলু ফন্নিন রিজাল। অর্থাৎ প্রত্যেক শাস্ত্রের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন। সেই ব্যক্তিদের কাছ থেকেই ওই শাস্ত্রের বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু যিনি যে শাস্ত্রের পণ্ডিত, তার দক্ষতা সেই শাস্ত্রতেই, সুতরাং এর বাইরের অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে তার মতামত অতটা গ্রহণযোগ্যতা ও স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার রাখে না। এই বিষয়টিকে অনেকেই তাদের গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। তাদের মধ্যে ভারতের বিশ্ব বিখ্যাত আলেম, ফকিহ, মুহাদ্দিস আল্লামা আবদুল হাই লাখনবি (রহ.) অন্যতম।
এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের বাংলা ভাষ্য হুবহু তুলে ধরছি : 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি স্থানের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের কথা ও প্রতিটি শাস্ত্রের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ব্যক্তিবর্গ তৈরি করেছেন। তাঁর সৃষ্টিজগতের প্রত্যেককে বিভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্যাবলি প্রদান করেছেন। যা একজনের মধ্যে পাওয়া যায়; অন্যজনের মধ্যে পাওয়া যায় না। যেমন: মুহাদ্দিসদের মধ্যে অনেকে এমন রয়েছেন যারা কেবল হাদিস বর্ণনা করেন, কিন্তু হাদিসের অন্তর্নিহিত মর্ম বোঝা ও সেখান থেকে মাসআলা-মাসায়েল উদ্ঘাটন করার মতো সক্ষমতা তাদের থাকে না। আবার এর বিপরীতে অনেক ফুকাহায়ে কেরাম রয়েছেন, যারা কেবল মাসআলা-মাসায়েল মুখস্থ করেন। হাদিস বর্ণনায় তারা দক্ষতা রাখেন না। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে- তাদের প্রত্যেককে স্ব স্ব স্থানে অবস্থান দেওয়া এবং তাদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া।'
এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি উদাহরণ পেশ করা হয় যার মাধ্যমে তিনি হলেন ইমাম গাজালি (রহ.)। তাঁর রচনা করা 'ইহয়াউ উলুমিদ্দিন' একটি জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ। এটি রচনাকাল থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর অধিক পঠিত গ্রন্থগুলোর অন্যতম। কিন্তু এই গ্রন্থে উল্লিখিত অনেক হাদিসের ওপরই প্রাজ্ঞ হাদিসবিশারদগণ আপত্তি করেছেন। সেগুলোর কোনোটিকে বাতিল আর কোনোটিকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অবহিত করেছেন। এই গ্রন্থে উল্লিখিত হাদিসগুলোর অবস্থা ও সূত্র নির্ণয় করে আল্লামা ইরাকি (রহ.) একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার নাম হলো- 'আলমুগনি আন হামলিল আসফারি ফিল আসফার ফি তাখরিজি মা ফিল ইহয়াই মিনাল আখবার।'
আল্লামা লাখনবি (রহ.) এই বিষয়ে বলছেন, 'ইহয়াউ উলুমিদ্দিনের গ্রন্থাকারের ব্যাপারটাই চিন্তা করুন। তার মর্যাদা ও অবস্থানের বিষয়টি তো স্বীকৃত। তবুও দেখা যায়, তাঁর গ্রন্থে তিনি এমন কিছু হাদিস নিয়ে এসেছেন, যার কোনো ভিত্তি নেই। সুতরাং এসব হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়; যেমনটা আল্লামা ইরাকির গ্রন্থ অধ্যয়ন করলে বুঝে আসে।'
মোটকথা, আমি যে বিষয়টি বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো- সবার মধ্যে সব ধরনের বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা থাকে না। আল্লাহ একেকজনকে একেক ধরনের বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা দান করেন। তো যে বিষয়ে যার যোগ্যতা আছে- সেই বিষয়ে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া ও সেই ক্ষেত্রে, আবারও বলছি, 'সেই ক্ষেত্রে' তাকে গ্রহণীয় মনে করা যেতে পারে। বাকি এর বাইরে অন্যান্য বিষয়ে তাঁর মন্তব্য অতটা গ্রহণযোগ্যতা রাখে না। সেটা যদি সঠিক হয় তবে তো ভালো। অন্যথায় সম্মানের সাথে তা বর্জন করতে হবে।
এবার চলুন মূল ফটকে প্রবেশ করি। আপনি যদি নোমান আলী খানের জীবনী পড়েন তাহলে দেখবেন যে, তাঁর মূল পাণ্ডিত্য ও দক্ষতার ক্ষেত্র হচ্ছে কুরআনের ভাষা তথা আরবি ভাষা ও সাহিত্যে। পবিত্র কুরআনের আলংকারিক সৌন্দর্যের বর্ণনা, নান্দনিকতার দিকগুলোর উপস্থাপনা ও বিভিন্ন আয়াতের আলোকে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন ইত্যাদিকে ব্যাখ্যা করা ও সামাজিক নানা অসংগতির সংশোধনকল্পে নাসিহাহ প্রদান করা।
সে হিসেবে তাঁর মূল অবস্থান হচ্ছে, তিনি একজন দায়ি ও কুরআনের মুজিযা তথা ভাষা-সৌন্দর্যের অভিলাষী ও মানুষের মাঝে কুরআনের বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাকারী। আরবি ভাষা শেখানোও তাঁর পছন্দের একটা কাজ। ফিকাহ-ফতোয়া বা হাদিস শাস্ত্র তাঁর পাণ্ডিত্যের বিষয় নয়। এই জায়গাটা স্পষ্ট হলেই আমাদের জন্য কর্মপন্থার পদ্ধতি বোঝাটা সহজ হয়ে যাবে।
নোমান আলী খান যেহেতু একজন মানুষ, সুতরাং তাঁর ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কিছু ভুল মানুষ করে থাকে তার চিন্তাগত অবস্থান থেকে। তো তিনি যেহেতু পশ্চিমা দেশে বেড়ে উঠেছেন এবং সেখানকার আবহাওয়াতে তিনি দাওয়াতি কাজ করেন, ফলে সেখানকার পরিবেশগত কিছু প্রভাবও কখনো কখনো তাকে প্রভাবিত করে; যা অনেক সময় তাঁর আলোচনাতেও প্রকাশ পায়ে যায়। সুতরাং এই বিষয়টার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত।
এর জন্য আপনাকে যে কাজগুলো করতে হবে তা হলো- দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানকে আরও শাণিত করা। কুরআনের জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধু লেকচারের ওপর সীমাবদ্ধ না থেকে নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থগুলোও অধ্যয়নের প্রতি মনোযোগ প্রদান করা। সালাফদের বুঝ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের কর্মপন্থা, তাদের আদর্শ ইত্যাদি বিষয়ে যত বেশি পারা যায় ধারণা অর্জন করা এবং এর আলোকেই পরবর্তীদের বক্তব্যকে নিরীক্ষণ করা।
কারণ, পূর্ববর্তী মনীষীদের অনুসরণের ব্যাপারে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) লোকদের নসিহত করে বলতেন, 'তোমাদের মধ্য হতে কেউ যদি কারও অনুসরণ করতে চায়, তবে যেন সে তাদের অনুসরণ করে, যাদের মৃত্যু হয়ে গেছে। কারণ, জীবিতরা ফিতনা থেকে মুক্ত নয়।'
লেকচার শোনাটাও দ্বীনের জ্ঞান বৃদ্ধি করার একটা আধুনিক মাধ্যম। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, এটি দ্বীন শেখার মৌলিক কোনো মাধ্যম নয়; বরং সহায়ক মাত্র। তাই যারা প্রচুর পরিমাণে লেকচার শোনেন তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো- লেকচার শোনার সাথে সাথে আলেমদের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্ক সৃষ্টি করুন। সম্পর্ক যদি মোটামুটি থেকে থাকে তবে তাকে আরও উন্নত করুন। তাদের থেকে সরাসরি দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করতে বেশি সচেষ্ট হোন। এটাই দ্বীন শেখার সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। আপনি নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, সরাসরি কারও সংস্পর্শে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা আর ডিভাইসের সহায়তায় তা অর্জন করার মধ্যে কত বিস্তর ফারাক রয়েছে।
ওপরে যে মতামত প্রদান করা হলো, তা একান্তই আমার। আর এই বইয়ের শরঈ সম্পাদনা করার মানে এই নয় যে, নোমান আলী খানের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর সব আলোচনার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি বা ঢালাওভাবে সব শ্রেণির শ্রোতার জন্য তাঁর আলোচনা শোনাকে আমি সমর্থন ও উৎসাহিত করি। তবে উপকারী দ্বীনি জ্ঞান অর্জনকে আমি সব সময় উৎসাহিত করি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপকারী জ্ঞান দান করুন। ক্ষতিকর জ্ঞান থেকে হেফাজত করুন। ভালো কাজগুলো কবুল করে নিন। মন্দ কাজগুলো ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিন। আমিন।
আবদুল্লাহ আল মাসউদ ১৫-০১-১৮
টিকাঃ
১. উমদাতুর রিআয়াহ ১/১৩
২. আলআজওয়িবাতুল ফাদিলা, আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর টীকাসহ- ৩৩পৃ.
৩. জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহী ২/৪৭
📄 পরিশিষ্ট : নোমান আলী খানের কাজসমূহ যেখানে পাবেন
Free Quran Education (Video Illustration) https://www.fqetv.com/
Nouman Ali Khan Collection http://www.nakcollection.com/
বাংলা সাইট: www.nakbangla.com
ইউটিউব :
Bayyinah Institute https://www.youtube.com/user/BayyinahInstitute
Quran Weekly https://www.youtube.com/user/QuranWeekly
Nouman Ali Khan Collection http://www.youtube.com/user/NAKcollection/videos
Free Quran Education (Video Illustration) https://www.youtube.com/user/NAKcollection
ফেইসবুক:
Nouman Ali Khan Official Page https://www.facebook.com/noumanbayyinah
Bayyinah Institute https://www.facebook.com/bayyinahinst/
Nouman Ali Khan Collection in Bangla (বাংলা) https://www.facebook.com/NAKBangla
টুইটার :
Nouman Ali Khan https://twitter.com/noumanbayyinah
Bayyinah Institute https://twitter.com/bayyinahinst
Quran Weekly https://twitter.com/quranweekly
অ্যাপস :
Android Lecture (NAK Collection) https://play.google.com/store/apps/details?id=com.dawathnaklectures
Juz Amma English Tafseer (MP3) https://play.google.com/store/apps/details?id=com.andromo.dev391844.app578675
Bayyinah TV https://play.google.com/store/apps/details?id=com.bayyinah.tv&hl=en
iPhone App (Nouman Ali Khan) https://itunes.apple.com/za/podcast/muslim-central-lecture-speaker/id593432991
Free Quran Education (Video Illustration) https://www.fqetv.com/
Nouman Ali Khan Collection http://www.nakcollection.com/
বাংলা সাইট: www.nakbangla.com
ইউটিউব :
Bayyinah Institute https://www.youtube.com/user/BayyinahInstitute
Quran Weekly https://www.youtube.com/user/QuranWeekly
Nouman Ali Khan Collection http://www.youtube.com/user/NAKcollection/videos
Free Quran Education (Video Illustration) https://www.youtube.com/user/NAKcollection
ফেইসবুক:
Nouman Ali Khan Official Page https://www.facebook.com/noumanbayyinah
Bayyinah Institute https://www.facebook.com/bayyinahinst/
Nouman Ali Khan Collection in Bangla (বাংলা) https://www.facebook.com/NAKBangla
টুইটার :
Nouman Ali Khan https://twitter.com/noumanbayyinah
Bayyinah Institute https://twitter.com/bayyinahinst
Quran Weekly https://twitter.com/quranweekly
অ্যাপস :
Android Lecture (NAK Collection) https://play.google.com/store/apps/details?id=com.dawathnaklectures
Juz Amma English Tafseer (MP3) https://play.google.com/store/apps/details?id=com.andromo.dev391844.app578675
Bayyinah TV https://play.google.com/store/apps/details?id=com.bayyinah.tv&hl=en
iPhone App (Nouman Ali Khan) https://itunes.apple.com/za/podcast/muslim-central-lecture-speaker/id593432991