📄 সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের গুরুত্ব
আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আজকাল অনেক উদ্বেগের বিষয় আছে। প্রথম চিন্তার বিষয় তারা কথা বলার মানুষ খুঁজে পায় না।
এটা তাদের বিপথে যাওয়ার প্রধান কারণ। আপনার সন্তানকে আপনি স্কুলে পাঠান; ধরে নিই তারা জেনারেল স্কুলে যায়। অধিকাংশ মুসলিম অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের জেনারেল স্কুলে পাঠিয়ে থাকেন। কারণ, যেকোনো কারণেই হোক তাদের সন্তানদেরকে ইসলামিক স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য বা সুযোগ হয়ে উঠে না। আপনি বাংলাদেশের যেখানেই থাকুন না কেন, ক্লাস ফাইভ-সিক্সে উঠতে উঠতেই তারা বিভিন্ন নোংরা শব্দ শিখে ফেলে। তারা খুব জঘন্য ভাষা আয়ত্ত করে ফেলে। তারা কিছু বাজে ওয়েবসাইটে ঢোকা শিখে যায়। তারা তাদের স্মার্টফোন, ট্যাব, আইপ্যাড, আইফোনে বিভিন্ন নোংরা জিনিস ডাউনলোড করা শেখে। তারা কম বয়সেই এসবে পারদর্শী হয়ে যায়। যেসব জিনিস আপনি ২৫ বছর বয়সেও শেখেননি, সেগুলো তারা ১২ বছর বয়সেই জানতে পারে। এটাই বাস্তবতা। এগুলোই এখন হচ্ছে।
আপনারা ফেসবুক ইউটিউব সম্পর্কে জানেন এখন। আপনার সন্তানরাও এসব ওয়েবসাইটে যায়। সেখানে অচেনা শিকারিরা আপনার কিশোরী মেয়ে বা কিশোর ছেলের সাথে কথা বলতে পারে। একসময় তারা সম্পর্কে জড়িয়ে যায়, আর একে অপরের সাথে দেখাও করে।
এরপর বিভিন্ন কিছু ঘটে যায়। এটা বর্তমানে আমাদের মুসলিম ছেলেমেয়েদের বাস্তবতা। এগুলোই ঘটছে। এসবের ব্যাপারে আমাদেরকে চোখ বুজে থাকলে চলবে না, আমাদের চোখ খুলতে হবে।
আপনি হয়তো বলতে পারেন, 'না না, আমার সন্তানরা এমন না।' তাহলে আমি বলব- প্লিজ, জেগে উঠুন!
এসব ব্যাপারে প্রাথমিক সমাধান হলো বাসায় ওপেন অ্যাক্সেস ইন্টারনেট রাখবেন না। বিশেষ করে ১৪ বছরের ছোটো বাচ্চা থাকলে, এটা রাখবেন না! এটা একটা ভয়ানক কাজ। তাদের ল্যাপটপ দেবেন না। দিতে চাইলে এমন মোবাইল দেবেন- যেটাতে কেবল ফোন করা যায়, ইন্টারনেট চালানো যায় না। নতুবা আপনি নিজেই বিপদ ডেকে আনছেন। এ নিয়ে আপনিই পরবর্তী সময়ে আফসোস করবেন। আপনি ভাবছেন, এগুলো আপনি তাদের ভালোবেসে কিনে দিয়েছেন; আসলে আপনি তাদের ধ্বংস করছেন। তারা এখনো অত বড়ো হয়নি যে নিজেরাই বুঝে নেবে, এটা আমার করা উচিত নাকি উচিত না। আপনি ভালো পরিবার থেকে এসেছেন বলে ধরে নেবেন না যে, তারা একাই সব ভালো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে। প্লিজ এই ফাঁদে পড়বেন না। আল্লাহর দোহাই এসব জিনিস নিয়ে নিন। আপনার সন্তানদের বিনোদনের জন্য অনেক পথ আছে।
একটা সময় আপনার সন্তান বয়ঃসন্ধিতে পা রাখে। আমি বিভিন্ন দেশে ঘুরে যেটা দেখি, অনেক অভিভাবক আমার কাছে এসে বলেন, 'আমার একটা টিনেজ মেয়ে আছে', আমার একটা টিনেজ ছেলে আছে, 'আমি চাই আপনি তার সাথে কথা বলেন।' এ রকম ঘটনা আমার সাথে শতবার ঘটেছে। আক্ষরিক অর্থেই শতবার ঘটেছে।
আপনি জানেন, কেন তারা আমার কাছে আসে? বয়ঃসন্ধিতে এলে তারা স্বাধীন হয়ে যায়। যখন তারা স্বাধীন হয়ে যায়, তখন তারা আর আপনার কথা শোনে না। যখন তারা আপনার কথা শোনে না, তখন আপনি এমন কাউকে চান যার কথা তারা শুনবে।
নৌকা ইতোমধ্যেই ভেসে গেছে। যখন তারা প্রায় প্রাপ্তবয়স্কে পরিণত হয়নি, তখন আপনার হাতে সুযোগ ছিল। আমাদের বুঝাতে হবে, আমরা এখন আর
আগের পৃথিবীতে নেই। ছোটো থাকতে আপনি তাদের সাথে যে রকম আচরণ করতে পারতেন, এখানে তেমনটি পারবেন না।
আগে তাদেরকে আপনার ইচ্ছেমতো বকতে পারতেন, মারতে পারতেন। সবাই এমনটিই করে এসেছে। আর এখন আপনি তাদের সামান্য বকুনি দেবেন আর তারা বলে বেড়াবে, 'আরে আমার বাবা পুরো ফালতু একটা মানুষ'। তারা তাদের বন্ধুদের আপনার সম্পর্কে এ রকম বলে বেড়াবে।
আমি একটা সানডে স্কুল চালাতাম। সেখানকার হেড ছিলাম। কারিকুলাম ঠিক করা, আকিদা বা বই অর্ডার করা সেখানে আমার কাজ ছিল না। আমার প্রাইমারি কাজ ছিল বাচ্চাদের পেছনে গোয়েন্দাগিরি করা। তারা স্কুলে বিরতির সময় কী নিয়ে কথাবার্তা বলে- সেগুলো শোনা। 'আমার মা আমাকে NC-১৭ ভিডিও গেম কিনে দিয়েছে'। 'আমার গ্রান্ড থেফট অটো আছে', 'তুমি ওই মুভিটা দেখেছ, ওটা PG-১৩! ওটা দেখতেই হবে!' বা 'মুভিটা Rated-R আমি দেখেছি। সেটার ডিভিডিও আমার কাছে আছে।'
বাচ্চারা এসব নিয়েই কথা বলছে। তারা আপনার সন্তানদের নষ্ট করে ফেলছে। আর একে আপনি ভালোবাসা বলেন? ইবরাহিম (আ.) কি কখনো এগুলোর কাছাকাছিও কোনো কিছুর জন্য অনুমতি দিতেন? আজ এগুলো বাচ্চাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। প্লিজ চোখ খুলুন! সত্যিই, চোখ খুলুন!
আমরা সন্তানদের এমন সব জিনিসের সামনে উন্মুক্ত করে দিচ্ছি, যা তাদেরকে ধীরে ধীরে খারাপের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মিডিয়াতে। যেই মুভিটা ১০ বছর আগে ১৩ বছর বয়সের নিচে অনুমোদিত ছিল না, সেটা এখন অনুমোদিত হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড নিচে নেমে গেছে। আমি না; পশ্চিমারাই এসব নিয়ে কথা বলছে। এখন সমকামিতার মতো বাজে বিষয়গুলো এমনকী কার্টুনেও সাধারণ হয়ে গেছে। টম অ্যান্ড জেরিও আর আগের মতো নেই। সবকিছু বদলেছে।
চারিদিকে কী হচ্ছে, সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের সন্তানরা কী দেখছে, তারা কী ভাষায় কথা বলছে।
যখন আপনি মসজিদে যান তখন আপনি দাড়িওয়ালা মানুষদের দেখেন; তারা নামাজ পড়ে, ভিন্নভাবে কথা বলে। আপনার বাচ্চারা কী তাদের বেশি দেখতে পায় নাকি বাইরের পৃথিবীকে? তারা যেটা বেশি দেখতে পায়,
সেটাকেই স্বাভাবিক ধরে নেয়। তাদের কাছে এটা স্বাভাবিক না, ওইটা স্বাভাবিক। আর এটাই আসল সমস্যা। তারা এগুলোকে স্বাভাবিক মনে করে না। তারা বাইরের পৃথিবীকে স্বাভাবিক মনে করে।
আমরা কীভাবে সন্তানদের জন্য একে পরিবর্তন করতে পারি? প্রথমে এসব বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে। তারপর এসব সমাধানের ব্যাপারে কথা বলা যাবে।
আমাদের ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে প্রথম চিন্তার বিষয় কী? তারা কথা বলার জন্য মানুষ পায় না। যখন আপনার সন্তান পাবলিক স্কুলে যায়, আর একটা ছেলে আর মেয়েকে একসাথে দেখে বা কোনো মেয়ে আপনার ছেলের কাছে এসে বলে, 'আমার সাথে সিনেমা দেখতে যাবে?' অথবা 'আমরা একটা রেস্টুরেন্টে খেতে যাচ্ছি, তুমি যাবে? তুমি দেখতে অনেক কিউট।' এসব আপনার ক্লাস ফাইভের বা সেভেনের সন্তানের সাথেই হচ্ছে। তারা কি বাসায় এসে আপনার সাথে এগুলো নিয়ে কথা বলবে না? 'আব্বু, একটা মেয়ে না আমাকে বলেছে আমি দেখতে কিউট।' 'কি! তোমাকে কি এইজন্যই পড়ালেখা করতে পাঠিয়েছি?' ঠাশ! ঠাশ!
এই বাচ্চা জানে যে, তাঁর বাবা-মা এগুলো শুনে মেনে নিতে পারবে না। কিন্তু এসব কথা তো কারও না কারও সাথে শেয়ার করতে হবে। সে কাকে এগুলো বলবে? সে তার বন্ধুদের সাথে এগুলো শেয়ার করবে। আর জেনারেল স্কুলে তার বন্ধুরা কমবেশি তাদের মতোই। তারা তাকে ইসলামিক পরামর্শ দেবে নাকি অনৈসলামিক পরামর্শ দেবে? 'আরে চালিয়ে যা দোস্ত' তারা এ রকম পরামর্শই দেবে। আপনি বেশি কঠোর বলে, তারা আপনাদের থেকে তাদের বন্ধুদের সাথে বেশি খোলামেলাভাবে চলবে। আপনি তাদের সাথে কথা বলেন না। আপনি তাদের জন্য সেই দরজাটা খোলা রাখেননি। কারণ, আপনি তাদের ওপর সেই আধিপত্য দেখাতেন, যা আপনার বাবা আপনার ওপর খাটিয়েছিল। কিন্তু সেটা তো ছোটো বয়সে পেরেছেন ভাই, এখন সবকিছু ভিন্ন। আমাদেরকে সন্তানদের বন্ধু হতে হবে। তারা যেন খোলামেলাভাবে কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
এই সমস্যা আমারও আছে। আমি তিন মেয়ের বাবা। আর আমি অনেকটা রক্ষণশীল বাবা। তাই যখন আমার মেয়ে প্রি-স্কুলে ছিল, তখন একটা ছেলে তাঁর পাশে বসেছিল। আর সে বাড়ি ফিরে বলেছিল, 'হামজা আজকে আমার
পাশে বসেছিল আর আমরা একসাথে রং করেছিলাম।' আমি বললাম, 'কী?' তখন আমার স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুমি এখান থেকে যাও, আমি ওর সাথে কথা বলছি।' কারণ, আমি যদি এখন রাগ দেখাই তাহলে সে বুঝে ফেলবে, আমার বাবা হামজার ব্যাপারে কিছু শুনতে পছন্দ করে না।
তাই এর পরে হামজা যদি কোনো কিছু বলে বা করে তখন কি আমার মেয়ে সেটা আমাকে বলবে? না। সুতরাং সেটা বলে আমি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছি।
আমাদের এসব ব্যাপার মোকাবিলা করা শিখতে হবে। এর কিছু কৌশল আছে। আমাদেরকে সন্তানদের এসব ব্যাপারে ধৈর্য ধরতে হবে। এটা তাদের দোষ না। আমরাই তাদের সেই স্কুলে পাঠিয়েছি। আমরাই তো তাদের সেই পরিবেশে পাঠিয়েছি। তারা এটা চায়নি। তাই তারা যদি খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, সেটা কাদের কারণে হবে? নিশ্চয়ই আমাদের কারণে। তাই আমাদের নিজেদেরও এসবের দায়িত্ব নিতে হবে। 'তুমি এমন কথা বলতে পারলে?' 'তুমি কোত্থেকে এসব শব্দ শিখেছ?' এসব বলেই পার পাওয়া যাবে না। 'আরে তোমরাই তো আমাকে এই স্কুলে পাঠিয়েছ, তোমরাই আমাকে এমন অবস্থায় ফেলেছ', 'তোমরাই আমাকে ওই মুভিটা দেখতে দিয়েছ', 'তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করোনি, আমার বন্ধুরা কেমন, তারা কোথায় থাকে, আমরা একসাথে কী করি।' 'তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করোনি, এটা তোমাদের সমস্যা।'
তাই আপনার সন্তানদের জন্য কথা বলার দরজা খুলে দিন। দেরি হওয়ার আগেই এটা করুন। অনেক ছেলেমেয়েরা তাদের ঘর ছেড়ে চলে গেছে। আমাদের অনেক মেয়েরা তাদের বয়ফ্রেন্ডের সাথে পালিয়ে গেছে। আমি জানি, এসব শুনতে খুব খারাপ লাগে, কিন্তু এটাই বাস্তবতা। আমাদের এর মুখোমুখি হতে হবে। আমাদের অনেক ছেলেদের অন্যের সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। এটা পুরো অসুস্থ বাস্তবতা। শুধু কাঁদলেই চলবে না, আমাদের এসব বিষয় সমাধান করতে হবে।
তাই প্রথম কাজ হলো- সন্তানদের জন্য কথা বলার দ্বার খোলা রাখা।
দ্বিতীয় ব্যাপারটা টিনেজ ছেলেমেয়ের জন্য।
আর এখানে আমি ইয়াকুব (আ.)-এর উদাহরণ দেবো। তিনি একজন অসাধারণ নবি। ওনার ছেলেরা কি কোনো অন্যায় কাজ করেছিল? হ্যাঁ। সেটা কি কারও মনে আছে? তারা তাদের ভাইকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। বনের মধ্যে গিয়ে তাকে কুয়ায় ফেলে দিয়েছিল আর নকল রক্তমাখা জামা নিয়ে এসেছিল।
ইয়াকুব (আ.) কি বুঝতে পারেননি যে, তারা মিথ্যা বলেছিল? এখানে কয়েকজন তরুণ ছেলে আছে, একজন পিতা আছেন। তিনি জানেন যে, তাঁর ছেলেরা খুব খারাপ কিছু করেছে। তিনি কি বলেছিলেন, 'বদমাইশের দল! এক্ষুনি তাকে নিয়ে এসো!' আপনি কি ওনাকে এমন কিছু বলতে দেখেছেন? না; বরং তিনি ধৈর্য ধরেছিলেন। আমি যখন তাঁর এমন সাড়া দেখি, তখন ভাবি তিনি কেমন পিতা ছিলেন! তিনি তাদের বকলেন না, ধমক দিলেন না।
কেন বলেন তো? কারণ, তিনি একজন জিনিয়াস পিতা ছিলেন। একজন সচেতন পিতা জানেন যে, কোন বয়স পর্যন্ত সন্তানদের উপদেশ দেওয়া যায় আর কোন বয়সে তারা স্বাধীন হয়ে যায়; যখন তাদের কিছু বললেও তারা শুনবে না। তিনি জানেন, সেই অবস্থায় আপনি কী করতে পারেন? সাবরুন জামিল। সুন্দরভাবে ধৈর্য ধরার কাজটুকুই করতে পারেন। সময় আগেই পার হয়ে গেছে। তাই আপনার দায়িত্ব হলো, এর আগেই তাদের প্রতি খেয়াল রাখা। এখন তারা যদি সেই বয়স পার করেই ফেলে, তখন আপনি সর্বোচ্চ যা করতে পারেন তা হলো- তাদেরকে ভালো সঙ্গীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
আর মুসলিম তরুণ সংস্থাগুলোকে উৎসাহ দিন। এরাই আমাদের সন্তানদেরকে দাওয়াহ দেওয়ার হাতিয়ার। আমরা তাদের সাহায্য না করলে তারাও হারিয়ে যাবে। আপাতত ফিকাহের বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসুন। তারাবিহ ৮ রাকাত হোক বা ২০ রাকাত, আপনার সন্তান এসবকে পাত্তা দেয় না। অবস্থার উন্নতি হলে তখন সেগুলো নিয়েও আলোচনা করা যাবে। এখন সময় ভালো যাচ্ছে না। আমাদের সন্তানেরা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটাকেই অগ্রাধিকার দিন।
📄 আমার সবচেয়ে প্রিয় দুআ
যে দুআটির কথা বলব, দুটো কারণে তা আমার অত্যন্ত পছন্দের দুআ। এক. আমি বিয়ে করেছি এবং আমার স্ত্রী ও সন্তান আছে। দুই. পৃথিবীর বর্তমান সমস্যার কারণে আমাদের সবাইকে এই দুআর ক্ষমতা বুঝতে হবে।
এই পৃথিবীর মৌলিক প্রতিষ্ঠান পরিবার, আজ বিপদের সম্মুখীন। এখানকার অধিকাংশ মানুষ এমনকী মুসলমানরাও এই সমস্যা থেকে নিরাপদ নয়। যেই ঝড় থেকে বাঁচতে চাই, সেই ঝড় আমাদের সবার বাড়িতেই। মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। এইসব চিৎকার চেঁচামেচি, নাম ডাকাডাকি, হতাশা, দুঃখ, অপমান, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যকার বিভেদ থেকে বাঁচার জন্য।
আমাদের পরিবার বিভক্ত হচ্ছে, ভাই ভাইয়ের সাথে কথা বলে না, পিতা- মাতা সন্তানের সাথে কথা বলে না। আমি সম্পূর্ণ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, যারা ইসলামিক কাউন্সেলিং নিয়ে কাজ করেন, তাদের কাছে কোনো না কোনো মা, বাবা, স্বামী বা স্ত্রী বলেছে- আমি আমার সন্তানের সাথে কথা বলতে পারি না। সে আমার সাথে চিৎকার করে, আমরা কথা বলি না। সে এই কাজ করছে, আমি জানি না কীভাবে তাকে বিরত রাখব। আমার স্বামী এই করে, আমার স্ত্রী এই করে ইত্যাদি ইত্যাদি।
সুবহানাল্লাহ, এই সংকট বাড়ির ভেতরে। পরিবার এখন পরিণত হয়েছে এক দুঃখ, হতাশা, রাগের জায়গা। মানুষ যেখান থেকে পালানোর চিন্তা করে। এখানে আল্লাহ আমাদের অত্যন্ত উপযুক্তভাবে এবং সুন্দরভাবে চাইতে বলেছেন যে, পরিবারই হবে আশ্রয়স্থল; বাইরের পৃথিবী হলো ঝড়ের জায়গা। তুমি বাইরে যত দুর্ভোগ পাও, আশ্রয় খুঁজবে তোমার ঘরে। এই ঘর তোমাদের নিরাপদ দুর্গ। এখানে আছে তোমার সঙ্গী-সঙ্গিনী-সন্তান, যাদের দেখলে তোমার দুশ্চিন্তা দূর হয়। কিন্তু এখন হয় উলটো। পরিবারের লোকদের দেখলে আমাদের দুশ্চিন্তা শুরু হয়।
আপনারা জানেন, মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ সম্পর্কে। আমি মনে করি, সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ হলো সন্তানের জন্য মায়ের আবেগ। এটাই সবচেয়ে শক্ত বন্ধন। আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো বিবাহিত। বিয়ের পর প্রথমদিকে আপনারা একে অপরের প্রতি এতটাই আচ্ছন্ন ছিলেন যে, হয়তো বলেছেন, 'তুমি সত্যিই অসাধারণ। আমার বিশ্বাস হয় না তুমি আমার স্বামী' ইত্যাদি অনেক অদ্ভুত আচরণ। এগুলো অন্যের কাছে হাস্যকর লাগে। স্বামীর মুখে সব সময় একটা হাসি লেগেই থাকে, তেমনি স্বামীর নাম যখন নেওয়া হয় স্ত্রী লজ্জা পায়।
দশ বছর সংসারের পর এমন কী হয় যে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের নাম শুনলে বিরক্ত হন?
মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক যে সবচেয়ে আবেগি, তার একটা উদাহরণ দিই। ধরুন, স্বামী তার স্ত্রীর সাথে কথা বলছে। পাশের ঘরে বাচ্চা একটু কান্নার শব্দ করল। আর অমনি মা দৌড়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন বাচ্চার অবস্থা দেখতে। স্বামী হয়তো কথার মাঝখানে ছিল, খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছিল; কিন্তু বাচ্চার কান্নার শব্দ শোনার সাথে সাথে মা আর সেখানে থাকতে পারল না। মা আর সন্তানের মধ্যে কোনো কিছুই আসতে পারে না।
পাঠকদের মধ্যে যারা মা তাদের বলছি, আপনারা কি কল্পনা করতে পারেন, মুসা (আ.)-এর মায়ের মনের অবস্থা? তিনি শিশুকে পানিতে রেখে দিলেন। আপনি আপনার সন্তানকে সামান্য সময়ের জন্য ঘরের বাইরে রাখলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার স্বামী ফোন করা শুরু করবেন। কোথায় সে, তুমি কি তাকে দেখেছ, তাকে দেখেছ কি করে সে? আপনি আধা ঘণ্টা দেরি করে সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে গেলেই আপনার কেমন মনে হয়? আমি জানি কেমন লাগে।
আমিও একবার আমার সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে দেরি করেছিলাম। আমি জানি, তখন আমার স্ত্রী কী ধরনের মানসিক অস্থিরতার মধ্যে ছিল।
মাঝে মাঝে এমনও হয়, বাসার ভেতরেই আছেন কিন্তু সন্তানকে দেখতে পাচ্ছেন না। তখনিই বলে উঠেন, 'কোথায় গেলে বাবা সামিন, কোথায় তুমি?' 'আমি বাথরুমে মা, চিন্তার কিছু নেই। আমি এখানেই আছি।'
এখন মূসা (আ.)-এর মায়ের মনের অবস্থা চিন্তা করে দেখুন। তিনি তাঁর সন্তানকে এমন জায়গায় ছাড়ছেন যেখানে দৃশ্যত মৃত্যু অপেক্ষমাণ। কারণ, পেছনে যা আছে তা আরও নিষ্ঠুর শত্রুসৈন্য। তিনি জানেন না, কী হবে তাঁর সন্তানের সাথে। কী বিপদ অপেক্ষা করছে জানেন না। তারপরও কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করে পানিতে ছেড়ে দিলেন।
সুবহানাল্লাহ!
আরও দুজন নারীর কথা বলি। আরেকজন নারীও বিমর্ষ মানসিক অবস্থায় ছিলেন। এই কাহিনির মধ্যেই। একজন সত্যিকার খারাপ মানুষের সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। ফেরাউনের সাথে। আপনারা জানেন, নারীরা মাঝে মাঝে কী কঠিন পারিবারিক পরিস্থিতে থাকে। সাধারণত আমাদের মতো সমাজে আপনি চাইলেই দরকারি নম্বরে কল করতে পারেন। খারাপ কিছু হলে পুলিশকে কল করতে পারেন। এখন এই নারীর বেলায় আমরা কোনো শারীরিক অত্যাচারের কথা জানি না; তবে কুরআন আমাদের স্পষ্ট মানসিক অত্যাচারের কথা বলেছে। তা এত বেশি যে, তাকে সাহায্যের আবেদন পর্যন্ত করতে হয়েছে। তিনি একটা ভয়ংকর সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন। আবার তিনি পুলিশকেও বলতে পারছিলেন না। কারণ, তাঁর স্বামী ফেরাউন ছিলেন পুলিশের মালিক। তিনি সরকারের কাছেও অভিযোগ করতে পারছিলেন না। কারণ, ফেরাউন তখন নিজেই সরকার। ফেরাউন ছাড়া তার কোনো দিকে যাওয়ার উপায় নেই। তিনি ঝড়ের মধ্যে ছিলেন এবং কোনো আশ্রয়স্থল পাচ্ছিলেন না। কিন্তু যখন এই বাচ্চাটি ভেসে এলো, তিনি কি বলেছিলেন জানেন? তিনি শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন- 'কুররাতু আইনিন লি' অর্থাৎ সে হবে আমার চোখের প্রশান্তি। এই ঝড়ে সে হবে আমার আশ্রয়স্থল। সে হবে আমার একমাত্র আনন্দের উৎস। কারণ, আমি অত্যন্ত দুঃখের মধ্যে আছি। এই সন্তানহীন নারী একটি শিশু পেল।
আর মুহূর্তেই তাঁর সমস্যা হারিয়ে গেল। এমনকী ফেরাউন থেকেও নিজেকে আলাদা করলেন। সে শুধু তাঁর জন্য চোখের শান্তি হবে। অন্য কারও জন্য না। ফেরাউনের জন্য না।
আর একটি বিষয়। কেন এই দুআ এত সুন্দর, শক্তিশালী ও অলংকারপূর্ণ? আপনারা জানেন, যখন কোনো মা তার সন্তানকে হারান, যা এই ক্ষেত্রে ঘটেছে এবং তিনি যখন আবার সে সন্তানকে ফিরে পান, আপনারা কি ভাবতে পারেন, ওই মায়ের অনুভূতি? আনন্দ অশ্রু? আপনারা কি ভাবতে পারেন, সে সময়ের আবেগ? এখন বুঝুন কীভাবে আল্লাহ বর্ণনা করলেন সে আবেগ।
আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহের কথা মুসা (আ.)-কে বললেন- فَرَجَعْنَاكَ إِلَى أُمِّكَ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ. 'আমি তোমাকে তোমার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম। যাতে করে তাঁর চক্ষু শীতল হয় এবং সে ব্যথিত না হয়।' সূরা ত্বহা : ৪০
যাতে তাঁর নয়ন জুড়ায়। আল্লাহ এখানে বর্ণনা করেছেন, সবচেয়ে আশ্চর্যজনক আনন্দের কথা। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক শান্তির, মাতৃ-হৃদয়ের সবচেয়ে অবর্ণনীয় অনুভূতি। কী ধরনের বাক্যরীতি তিনি ব্যবহার করলেন? নয়ন জুড়ায়। অত্যন্ত মজবুত এই ভাব প্রকাশের জন্য। তাই আমরা আল্লাহর কাছে আবেদন করি, আমাদের স্ত্রী সন্তান যেন আমাদের নয়ন জুড়িয়ে দেয়।
আপনারা যখন কেউ বলেন, আমি বিয়ে করতে চাই, তখন আল্লাহর কাছে আরেকটু বাড়িয়ে বলুন, 'আল্লাহ! আমি এমন স্বামী/স্ত্রী চাই, যাকে দেখলে আমার নয়ন জুড়াবে; আর আমাকে দেখলে তার।'
📄 দেশি বিয়ে
বিয়ে পার্টি নিয়ে আপনাদের চিন্তার খোরাক জাগানোর জন্য কিছু কথা বলি।
খুবই সহজ কিছু উদাহরণ দিচ্ছি। আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে আজকাল লাখ লাখ টাকা লোন নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করা হয়। এতে থাকে আটটি পর্ব। প্রতিদিন একটা করে। পানচিনি, মেহেদি রাত, হলুদ সন্ধ্যা, ওয়ালিমা, বৌভাত ইত্যাদি ইত্যাদি।
অথচ ইসলামে নিকাহ মানে তো কেবল নিকাহ আর ওয়ালিমা। ব্যস শেষ! কত সহজ। কিন্তু না! আমাদের সব অনুষ্ঠান করতেই হবে। আর কেনই-বা করতে হবে? কারণ, আপনার কাজিনের বিয়েটা হয়েছিল সেই রকম করে। আমরা যদি সে রকম একটা উৎসবের আমেজ এনে দিতে না পারি, তাহলে সমাজে মুখ দেখাব কেমন করে? আপনার আংকেল কী বলবেন, আপনার দাদি কী বলবেন, অমুক কী বলবে, তমুক কী বলবে? মানুষ কী বলবে, তা ভেবে আপনি এতটাই বিচলিত যে, ক্রেডিট কার্ডের বিশাল ঋণের বোঝা নিতে আপনি প্রস্তুত। এই নতুন সংসারের শুরুটাই হলো ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে। আর তারা বিয়েতে উপহার হিসেবে যা পায়, এই ঋণ পরিশোধ করতেই তাদের দুই থেকে তিন বছর লেগে যায়।
আপনারা কি জানেন, দ্রুত বিয়ে ভেঙে যাওয়ার একটা অন্যতম প্রধান কারণ হলো অর্থনৈতিক চাপ? অথচ আপনারা বিবাহিত জীবন শুরু করেন ঋণের বোঝা নিয়ে। এই বাড়তি কষ্ট আপনাকে কে নিতে বলেছে?
নবিজি -এর সুন্নাহ অনুসরণ করুন। তা কত সহজ ও নির্ভেজাল!
আমার একজন খুব ভালো বন্ধু ইমাম ইশা। তিনি রুজভেল্ট লং আইল্যান্ডে থাকেন। আমি একবার তার মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য গিয়েছিলাম। আমি মাগরিবের নামাজের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সেই সময়ে এক ভাই মসজিদে ঢুকে বললেন, 'শেখ, আপনি কি একটা নিকাহ পড়াতে পারবেন?' ইশা বললেন, 'হ্যাঁ পারব।' 'তাহলে আমি মাগরিবের পরে আসি?' ইশা বললেন, 'আসুন, কোনো সমস্যা নেই।' আমি ভাবছিলাম, এমন বিয়ে দেখা দরকার। মাগরিবের পর কিছু মানুষ দলবেঁধে মসজিদে ঢুকলেন। সম্ভবত ৮ জন হবে। যার বিয়ে হওয়ার কথা তার গায়ে রক্তের দাগ ভরা একটা অ্যাপ্রোন। এশার নামাজের পর ওয়ালিমা হবে। একটু আগে সেই ওয়ালিমার পশু তিনি নিজেই জবাই করে এসেছেন। মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছিল। আমরা কোলাকুলি করলাম। আনন্দ করলাম। ব্যস শেষ! এটাই বিয়ের অনুষ্ঠানের নিয়ম। আমাদের দ্বীন এতটাই সরল।
নিকাহ এই দ্বীনের একটি সৌন্দর্য। সত্যিই এটা এক সৌন্দর্য। কিন্তু যখন আমরা নিজেরাই ব্যাপারটিকে জটিল করে ফেলি, আমাদের সকল সমস্যার শুরু হয় সেখানেই। ফলে সৃষ্টি হয় মানসিক চাপ, কদর্যতা।
আপনি মনে করে দেখুন, বিয়ের অনুষ্ঠানে কতগুলো ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল! কত বিতর্ক, কত নোংরামি! একজনের এই সমস্যা তো আরেকজনের এই অভিযোগ। কেন তাকে হোটেল রুমে থাকতে দেওয়া হলো না? আমরা কেন প্রথম সারির চেয়ারে বসতে পারলাম না? আর একজন আপনার পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেছিল। অযথা ফালতু কিছু বিষয়! আমরা নিজেরাই নিজের জীবনকে দুঃসহ করে ফেলি। অথচ শারিয়াহ চায় সহজ কিছু।
📄 ইবরাহিম (আ.)-এর সন্তান ভাবনা
আল্লাহর ইচ্ছায় ও তাঁর অনুগ্রহে গত পাঁচ বছরে আমি পুরো আমেরিকায় ৮০টির মতো কমিউনিটিতে ঘুরেছি। প্রতিটি জায়গায় আমি দুই সপ্তাহের মতো ছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ।
আমি বড়ো হয়েছি নিউইয়র্কে। জানেন হয়তো, যখন আপনি এক জায়গায় দীর্ঘদিন থাকেন, তখন আপনার আশপাশ ছাড়া বাইরের পৃথিবীতে কী ঘটছে, সেটা সম্পর্কে আপনি অনেক সময়ই খবর রাখেন না। তো যেহেতু আমি বাইরে অনেক ঘুরি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাগুলো অনেক কিছুর ব্যাপারে চোখ খুলে দেয়। কখনো কখনো এমন কিছু হয়, যা আমি কখনোই আশা করি না। একদিক থেকে চিন্তা করলে এটা খুব ইতিবাচক।
কিন্তু অন্যদিকে আমি খেয়াল করেছি, আমাদের মুসলিম সমাজে কিছু কিছু সমস্যা আছে, যা প্রায় একই ধরনের। চাই সেটা আপনি ক্যালিফোর্নিয়া থাকেন বা বোস্টনে কিংবা টেক্সাসে অথবা আরকানসাসে। সমস্যাগুলো সব একই। এসব সমস্যার মধ্যে যা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মারাত্মক মনে হয় তা হলো- আমরা কত দ্রুত আমাদের তরুণ সমাজকে হারিয়ে ফেলছি! কত দ্রুত আমরা আমাদের সন্তানদের সাথে সম্পর্কগুলো খুইয়ে ফেলছি।
ইনশাআল্লাহ! এ বিষয়টার গুরুত্বের কথা আমি কুরআনের আলোকে আলোচনা করব। আমি আপনাদের সাথে ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করব, যেন আমরা এই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারি।
শেষে আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু তথ্য শেয়ার করব। আমরা যদি একটি সমস্যা সম্পর্কে সচেতনই না হই, তাহলে সমস্যা সমাধানের আশাই করতে পারি না। তাই প্রথম ধাপ হচ্ছে আমাদের সাবধান হতে হবে, সচেতন হতে হবে। সমস্যা যে একটা আছে- তা আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে। এরপরের ধাপ হলো, আমাদের সবাইকে একসাথে ভাবতে হবে। এর একটা সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। অবশ্যই সেটা হতে হবে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী। এরপর আমাদের মধ্যে যারা একই বিষয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের ভাবনাগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। কীভাবে আমরা পরবর্তী ধাপে এগোব, কীভাবে আমরা সমাধানে পৌঁছাব।
রোগী যদি নিজেকে অসুস্থ না মনে করি, তার তো কোনো ওষুধের দরকার নেই। কোনো প্রেসক্রিপশন নিয়ে সে চিন্তাই করবে না। একটা সমস্যা যে আছে, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া প্রথম কাজ।
আমি এখন সূরা আল-বাকারার কিছু আয়াত দিয়ে শুরু করব। খুব সংক্ষিপ্তভাবে এই আয়াতের ওপর আলোচনা করব। এটা কোনোভাবেই এই আয়াতের বিস্তারিত তাফসির নয়। কিছু রিমাইন্ডার মাত্র।
ইবরাহিম (আ.) অনেক অনেক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। হজের সময় আমরা ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে অনেক খুতবা শুনি। কত বিশাল উচ্চতা তিনি অর্জন করেছিলেন! উনি যখন ওগুলো অর্জন করলেন, সবকিছু অর্জনের পর আল্লাহ তাঁকে সার্টিফিকেট দিলেন। এই আয়াত হচ্ছে ওই সার্টিফিকেট সম্পর্কে। আল্লাহ তায়ালা বলছেন-
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَتَهُنَّ. 'যখন ইবরাহিম-কে তাঁর রব পরীক্ষা করলেন...' সূরা বাকারা: ১২৪
ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ খুবই ভালোভাবে পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি সবগুলো পরীক্ষাই অতিক্রম করলেন। সব পরীক্ষার শেষে আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে বলেছেন, 'আমি অবশ্যই তোমাকে মানুষের ইমাম বানালাম। আমি তোমাকে মানব সমাজের জন্য এক অনুসরণীয় ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলাম।'
এই হচ্ছে সেই সার্টিফিকেট। এই হচ্ছে সেই সম্মানের স্মারক; যা অনেক কঠিন পরীক্ষা দেওয়ার পর ইবরাহিম (আ.)-কে দেওয়া হয়েছিল। আমরা কল্পনাও করতে পারব না, একটা মানুষ কীভাবে এই ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে পারে, যেসব পরীক্ষা ইবরাহিম (আ.)-কে দিতে হয়েছিল!
এই যে আমরা কত সহজে বলে ফেলি, তিনি আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। আমরা কত সহজে বলি যে, তিনি নিজের সন্তানের গলায় ছুরি বসিয়েছিলেন। আমাদের বাচ্চা একটা কাঁটা চামচ ধরলেই আমরা বলি, 'এই! ওটা রেখে দাও, এটা বিপদজনক।' আপনি বিচলিত হয়ে পড়েন। যদি আপনার সন্তান চুলার একটু বেশি কাছে যায় আপনি কী করেন? আর এখানে এই মানুষটা যে নিজের সন্তানের গলায় ছুরি ধরেছে, সুবহানআল্লাহ। এটা বলা সহজ, কিন্তু নিজেকে সে জায়গায় বসানোর চেষ্টাটা অনেক কঠিন।
এরপর তাঁর সামনে এলো সেই পরীক্ষা, তাঁর পরিবারকে মরুভূমির মাঝে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে রেখে আসা। আমাদের পরিবারকে যখন আমরা কোথাও রেখে আসি, যেমন ধরুন- আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকে আপনার ফ্যামিলিকে আনতে হবে। আপনার হয়তো এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। আপনি ২০টা মিসড কল পাবেন। এদিকে আপনি বিচলিত। তোমরা কোথায়! সব ঠিক আছে? তারা হয়তো শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত এয়ারপোর্টের বিশাল পরিসরের কোনো এক বেঞ্চে বেশ নিরাপদেই বসে আছে। আর আপনি উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছেন। অথচ এখানে ইবরাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে মরুভূমির মাঝখানে রেখে এলেন! যেখানে মৃত্যু প্রায় সুনিশ্চিত। এরপরও তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওপর পুরো ভরসা করে তাঁদের রেখে এলেন। এটি কোনো সহজ কাজ নয়।
তো, উনি এই সমস্ত পরীক্ষাগুলোর মধ্যে দিয়ে গেলেন। আল্লাহ বললেন- 'তুমি পাশ করেছ, তুমি এখন থেকে মানব সমাজের ইমাম।' আপনারা জানেন ওই পরীক্ষাগুলো সহজ কিছু ছিল না। যখন তাঁর সাথে ভালো বা মন্দ যা কিছুই ঘটত, তিনি প্রথমেই স্মরণ করতেন আল্লাহ তায়ালাকে।
ইবরাহিম (আ.) বলেছেন- الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِيْنِ، وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ، وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ. 'তিনিই হচ্ছেন সেই সত্তা (আল্লাহ), যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনিই আমাকে পথ দেখান। তিনিই আমাকে আহার করতে দেন। তিনিই আমাকে পান করতে দেন। যখন আমি অসুস্থ হই, তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন।' সূরা শুআরা: ৭৮-৮০
যা কিছুই তাঁর জীবনে ঘটুক, তিনি কাকে মনে করেন? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে।
আল্লাহ বলেছেন, একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড়ো উপহার হলো আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এতগুলো কঠিন পরীক্ষার পর আল্লাহ যখন তাঁকে সবচেয়ে সেরা উপহারটি দিলেন, আপনি তখন কী আশা করেন? আপনি আশা করবেন উনি বলবেন, 'আলহামদুকা ইয়া রাব্বি' সমস্ত প্রশংসা আপনার, কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি। এটা আমার জন্য অনেক সম্মানের। আমি আপনার নগণ্য বান্দা।'
কিন্তু এর বদলে আপনি দেখবেন, ইবরাহিম (আ.) বললেন, 'ওয়ামিন জুররিয়্যাতি' আমার পরের প্রজন্মের কী হবে? 'জুররিয়্যা' কথাটা 'আবনায়ি ওয়া আওলাদি'র থেকে আলাদা। 'জুররিয়্যা' মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
আল্লাহ তাঁকে মানবজাতির ইমাম করলেন, আর তিনি চিন্তিত তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে। তিনি আগে থেকেই ভাবছেন ৩, ৪, ৫ প্রজন্ম, ১০, ২০, ৩০ প্রজন্মের কথা। এটা হচ্ছে একজন জিনিয়াসের ভাবনা। এটা হচ্ছে এমন একজনের মাইন্ডসেট, যিনি সত্যিকারভাবে এই পৃথিবীতে তাঁর ভূমিকা কী- তিনি তা ভালো করেই জানেন।
মুসলিমরা অমুসলিমদের থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা। তাদের সাথে আমাদের ভাবনার ধরন আলাদা। আমাদের ভাবনা-চিন্তা দীর্ঘমেয়াদি। দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা বলতে আমি বলছি না- ভবিষ্যতের কথা ভাবুন এবং বাড়ি নিন মর্টগেজে। আমি ওই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলছি না। আমি বলছি সেই দীর্ঘমেয়াদের কথা, যেখানে আল্লাহর কাছে আমরা বিনা মর্টগেজে ঘর পাব। এটা হচ্ছে আসল দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান।
আমরা মুসলিম। ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ যেকোনো সময়ে মারা যেতে পারে। তারপরও তিনি বীজ বুনে যাচ্ছেন এই ভেবে যে, একসময় গাছ বড়ো হবে এবং কেউ একজন এর ছায়ায় বসবে।
তিনি ওই গাছ দেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু তিনি ভাবছেন ভবিষ্যতের কথা। আমরা এ রকমই। এটা আমাদের সাদকায়ে জারিয়া। আমরা সব সময়ই আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত; আমাদের এ রকমই হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যে সমাজে ভবিষ্যতে কী হবে তা তারা ভাবে না। কীভাবে এই সমাজ ভবিষ্যতের পরোয়া করে না, তা ছোট্ট একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। এই দেশের কিছু ধনী ব্যক্তি ধনী হয়েছে কীভাবে? সুদভিত্তিক ব্যবসা করে।
এই সুদনির্ভর অর্থনীতিকে, খুবই সাদামাটাভাবে বললে, এই যে ডোনাল্ড ট্রাম্প!
এই লোকটি বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের অন্যতম তাই না? তিনি যদি এই মুহূর্তে তার সমস্ত দেনা শোধ করে দেন, দেনার প্রতিটি পাই-পয়সা মিটিয়ে দেন, তাহলে কী হবে? উনি শূন্যেও থাকবেন না। তিনি থাকবেন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মাইনাসে। উনি মিনিমাম পেমেন্ট দেন এই সম্পত্তিতে, মিনিমাম পেমেন্ট অন্যটাতে, সবগুলো ভাড়া দেন। এরপর আবার সব রিফাইন্যান্স করেন, তারপর আবার অন্য প্রপার্টি ধরেন। এই মানুষটির দেনার ওপর দেনা। দেনার পর দেনায় ডুবে আছেন, তিনি শুধু সবগুলোতে মিনিমাম পেমেন্ট দিয়ে যাচ্ছেন। তার দেনা সব শেষ করতে করতে হয়তো তিনশো বছর লাগবে। উনি কি এর আগে মারা যাবেন না? তিনি ভাবছেন আমি করে যাই, আর মারা গেলে ওটা তখন অন্যের সমস্যা, কাজেই আমার কীসের চিন্তা!
এগুলো আখিরাতে অবিশ্বাসী মানুষের চিন্তা। আমি আগে বাঁচি। আমি আমাকে নিয়ে চিন্তিত; অন্যদের নিয়ে নয়। তো আপনি জানেন আল গোর (২০০০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী) চেঁচাচ্ছেন ৫০ বছর পর গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে। তিনি বলতে পারতেন, আরে চিন্তা কীসের! আমি মরে যাব ১০ বছরের মধ্যে, আমি পাত্তা দিই না। এটা আমার সমস্যা না।
আমাদের সন্তানরা কী পরিমাণ ঋণের চাপে পড়বে, সেটা কে ভাবে? আমাদের নিজেদেরই এখনো কত সমস্যা! তো এই সমাজ হচ্ছে মানুষের অবস্থার একটা দৃষ্টান্ত। আমরা দ্রুত সবকিছু পেতে চাই। আমরা দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করি না। কিন্তু আল্লাহ তাঁর কিতাবে আমাদেরকে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে। তো আমরা যখন এই দেশে (আমেরিকায়) আসি অর্থাৎ মুসলমানেরা এই দেশে আসি, বেশির ভাগই ইমিগ্রান্ট। যখন আমরা দীর্ঘমেয়াদের কথা চিন্তা করি, আমরা ভাবি আমাদের সন্তান কোন স্কুলে যাবে, কোন কলেজে যাবে, কোথায় বাড়ি কিনব। এই হচ্ছে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা।
আমি বলছি অন্যরকম দীর্ঘমেয়াদের কথা। আমি কীভাবে নিশ্চিত করব যে, আমার পর আরও ৩, ৪, ৫ প্রজন্ম পর তারাও বলবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আর তারা অন্যদেরও শেখাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আমি কীভাবে এটা করব, এটা হচ্ছে আসল দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা। যদি আপনার সন্তান স্কুল থেকে বেরিয়ে ভালো ডিগ্রি নিয়ে, ভালো চাকরি পেল এবং খুব ধনী এক পরিবারে বিয়ে করল। কিন্তু এরপর 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' হারিয়ে ফেলল এক প্রজন্মেই! আপনি সফল হলেন নাকি ব্যর্থ হলেন, ভেবে দেখুন। এর জবাব কে দেবে?
ইবরাহিম (আ.) এটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই আল্লাহ যখন বললেন, 'আপনি ইমাম।' উনি বললেন- 'এটা যথেষ্ট নয়। আমি আমার সন্তানদের জন্য দায়ী। আর ওরা যদি ভালো না হয়, তাহলে ওদের সন্তানেরা হবে আরও খারাপ এবং তাদের সন্তানাদি হবে তার চেয়েও খারাপ। আমি তাদের জন্য জবাবদিহি করতে চাই না।'
একজন মানুষ যত ভালো কাজ করুক, শুধু একবার ভাবুন, আপনার মিলিয়ন মিলিয়ন ভালো কাজ আছে। পাহাড় সমান পুণ্য আপনার। কিন্তু আপনি যদি আপনার সন্তানদের ঠিকভাবে বড়ো করতে না পারেন এবং তারা ধর্ম হারিয়ে ফেলে! সেটা আকিদায় হোক, তাদের বিশ্বাসে বা ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে হোক। তারা যদি ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে এর শুরুটা হলো আপনার গাফলতি দিয়ে। বিচার দিবসে আপনার সমস্ত পুণ্য কি ওইসব সম্মিলিত খারাপের সাথে পাল্লা দিতে পারবে?
অসম্ভব! কক্ষনো না!
বাবা-মায়ের জন্য এটা অনেক বড়ো দায়িত্ব। অনেক বড়ো চ্যালেঞ্জ। প্রত্যেক বাবা-মা হলেন ইমাম। প্রত্যক বাবা পরিবারের ইমাম। যখন আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে ইমাম মনোনীত করলেন, তিনি কাদের ওপর তাঁর ইমামতি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন? তাঁর নিজের সন্তানদের নিয়ে, সবার আগে তাঁর নিজ সন্তানদের নিয়ে। আল্লাহ তাঁর দুআর জবাবে বললেন- قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ. 'আমার অঙ্গীকার অত্যাচারীরা লাভ করবে না।' সূরা বাকারা: ১২৪
উনি যখন এই বলে দুআ করলেন, আমার সন্তানদের কী হবে, তখন আল্লাহ বললেন- 'না! আমার প্রতিশ্রুতি অবিচারকারীদের জন্য নয়।'
ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ বললেন, 'এই কথাগুলোর মাঝেই যে, তোমার সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ হবে অবিচারকারী। এদের সবাই পুণ্যবান হবে না।' আমরা জানি, ইবরাহিম (আ.)-এর প্রজন্মের বেশি সংখ্যকই অবাধ্য। কুরাইশরা কি ইবরাহিম (আ.)-এর বংশধর ছিল না? তারা কি জালিম ছিল না? অবশ্যই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তো যখন ইবরাহিম (আ.) এ কথা শুনলেন, আমি নিশ্চিত কথাটা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল। তো উনি এরপর কী করলেন? উনি কি থেমে গিয়েছিলেন? না! উনি আল্লাহর কাছে আরেকটা দুআ করলেন।
তখন তাকে আল্লাহর ঘর নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। উনি যখন আল্লাহর ঘরের দিকে যাচ্ছেন তখন দুআ করলেন-
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقُ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ.
'হে প্রভু! এই শহরকে শান্তিময় করে দাও এবং এর বাসিন্দাদের জন্য সব ধরনের ফলমূল দান করো।' সূরা বাকারা: ১২৬
উনি দুই ভাগে দুআ করলেন। উনি বললেন, এই শহরকে নিরাপদ রাখো এবং দ্বিতীয়ত, ওরা যেন সব ধরনের জীবিকা অর্জন করতে পারে।
সাহিত্যে একটি কথা আছে, শান্তি ও সমৃদ্ধি। পলিটিক্যাল সাইন্সে আপনি জানবেন, একটা সমাজ সুষ্ঠুভাবে চলার জন্য প্রথম যা দরকার, তা হলো আইনের শাসন, অর্থাৎ শান্তি। যদি আপনার ঘর নিরাপদ না থাকে, আপনার দোকান, আপনার অফিস, আপনার টাকা-পয়সা নিরাপদ না থাকে, তাহলে সে রকম সমাজে আপনি চলতে পারবেন না। আবার আপনার যদি শান্তি থাকে, কিন্তু কোনো চাকরি-বাকরি না থাকে, আয়-রোজগারের কোনো উপায় না থাকে, যদি ব্যবসা করার পথ না থাকে, তাহলে সেই সমাজে কি টিকে থাকতে পারবেন? না! তো আপনার দরকার শান্তি এবং সমৃদ্ধি।
এই মানুষটির দুআয় কত চিন্তাশীলতা দেখুন। উনি বললেন, এই শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং এদেরকে সব ধরনের ফলমূল দান করুন। কিন্তু এর সাথে একদম শেষে উনি ছোট্ট একটা দাবি যোগ করলেন। ইবরাহিম (আ.) বললেন-
مَنْ آمَنَ مِنْهُمْ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ.
অর্থাৎ আপনি আমার সেই সন্তানদেরই শুধু দিন, যারা আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস রাখে। আল্লাহ ওনাকে বলেছিলেন- 'আমার প্রতিশ্রুতি অবিচারকারীদের জন্য নয়।' উনি বললেন- 'ঠিক আছে এই শহরকে শান্তির শহর করে দিন' এবং এর মানুষদের জন্য সব ধরনের রিজিকের ব্যবস্থা করে দিন; কিন্তু শুধু ঈমানদারদের জন্য। অন্যকথায়- অবিশ্বাসী, পাপী সন্তানদের জন্য নয়। ওরা দুর্ভিক্ষে পড়ুক। তাদের বংশ নির্বংশ হয়ে যাক। কারণ, আমি ওদের জন্য জবাবদিহি করতে পারব না। আমি শুধু আমার ঈমানদার সন্তানদের জন্য জবাব দেবো।'
কী ভীষণ বিচক্ষণ দুআ! সুবহানআল্লাহ। উনি বললেন, 'শুধু যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে'। আল্লাহ তায়ালা এর জবাবে বললেন-
وَمَنْ كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَى عَذَابِ النَّارِ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ.
'যারা অবিশ্বাসী আমি তাদেরকেও উপভোগ করতে দেবো। এরপর তাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামের আগুনে ঠেলে দেবো। কী ভয়াবহ সেই আবাস!' সূরা বাকারা: ১২৬
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন, উনি কি সেটা একা করেছিলেন? ওনার সাথে কে ছিল? ইসমাইল (আ.)। তো ইবরাহিম (আ.)-এর বিচক্ষণতা আপনি দেখতে পারছেন।
আমরা মনে-প্রাণে কোনো কিছু আল্লাহর কাছে কখন চাই? যখন আমার কোনো কিছু খুব দরকার। খুব প্রয়োজন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ছাত্ররা এমন করে। আগামীকাল তোমার ফাইনাল পরীক্ষা, তুমি কোনো পড়াশোনা করনি এবং তুমি এই পাঁচ মিনিট আগে বললে, 'ইয়া আল্লাহ'... 'পরীক্ষা'। হঠাৎ তোমার মনে পড়ল আল্লাহর কথা। আল্লাহকে স্মরণ করছ সুবিধামতো, নিজের যখন দরকার। কিন্তু আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়ার সবচেয়ে সেরা সময় হচ্ছে যখন তুমি আল্লাহকে খুশি করার মতো কিছু করেছ। চাওয়ার জন্য সেটা হচ্ছে সবচেয়ে সেরা সময়। তুমি জানো সেরা সময় কখন? নামাজের পর!
তুমি এইমাত্র আল্লাহর কথা মানলে। এখন দুআ করো, আল্লাহর কাছে চাওয়ার সবচেয়ে সেরা জায়গার একটা হলো আল্লাহর ঘর। যখন তুমি ওখানে যাও, তা আল্লাহর প্রতি বাধ্যতার একটি শ্রেষ্ঠ কাজ। এটা হচ্ছে চাওয়ার জন্য সেরা সময় আল্লাহর কাছে চাওয়ার আরেকটা সেরা সময় হলো, রাতের শেষ ভাগ। কারণ, তখনই তুমি আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে ভালোভাবে বাধ্যতা দেখালে। দুআর জন্য শ্রেষ্ঠ সময় হলো রমজান মাস। কারণ, তখন তুমি আল্লাহর প্রতি বাধ্য থাকছ। তখন আল্লাহর কাছে চাও।
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর প্রতি বাধ্যতার সেরা একটি কাজ করছেন। তিনি তাঁর ছেলেকে সাথে নিয়ে এই পৃথিবীতে আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন। এটা সম্ভবত আবারও তাঁর কাছে চাইবার জন্য সেরা সময় তাই না? তো তিনি আবারও চাইলেন। কিন্তু তিনি জানেন, আল্লাহ একবার না বলেছেন। তিনি নিজের দুআ পরিমার্জিত করছেন।
প্রথম দুআ, রাব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না- 'হে আমাদের প্রভু, আপনি আমাদের থেকে কবুল করুন'। দেখুন আগের দুআয় ছিল, 'হে আমার প্রভু এই শহরকে শান্তিময় করে দিন'। 'রাব্বি' মানে আমার প্রভু। এখন উনি কী বললেন? 'রাব্বানা' আমাদের প্রভু! উনি কাকে সঙ্গে নিলেন? তাঁর ছেলেকে! এইবার আমি আল্লাহর ঘর নির্মাণ করছি এবং আমি দুআ করতে যাচ্ছি, কিন্তু আমি আমার সাথে আমার সন্তানকেও এই দুআয় শামিল করছি। যাতে অন্ততপক্ষে এই ছেলের ব্যাপারে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দেন।
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ .
'হে আমাদের প্রভু, আমাদের দুজন থেকে কবুল করে নিন। নিঃসন্দেহে আপনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞাতা।' সূরা বাকারা: ১২৭
সুবহানআল্লাহ। তো উনি একটা ছেলের ব্যাপারে নিশ্চিত করলেন। পরবর্তী আয়াত এই দুআরই ধারাবাহিকতা, যার মানে হলো আল্লাহ কিছু বললেন না। আল্লাহ জবাবে নীরব থাকলেন এবং নীরবতা মানে কী? কবুল করা। আল্লাহ তাঁর দুআ কবুল করলেন এবং তিনি আবারও বলতে শুরু করলেন। যেহেতু আরও আগেই আল্লাহ কবুল করেছেন, তাই উনি থামলেন না। বললেন-
رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُسْلِمَةً لَكَ.
'হে আমাদের প্রভু! আমাদের দুজনকেই আপনার কাছে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করার তাওফিক দিন। এবং আমাদের বংশধর থেকে এমন এক জাতি সৃষ্টি করুন, যারা হবে আপনার প্রতি সমর্পিত।' সূরা বাকারা: ১২৮
আল্লাহ তো তাঁকে ইমাম বানিয়েছেনই, তাহলে এই দুআ কেন? তিনি তো আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেনই। তিনি কি আগেই আল্লাহর কাছে পূর্ণ সমর্পন করেননি? সুবহানআল্লাহ! তাহলে তিনি এই দুআ এখন কেন করছেন? কারণ, তিনি তাঁর ছেলেকে এখানে অন্তর্ভুক্ত করছেন। তিনি বলেছেন, আমাদেরকে আপনার প্রতি পরিপূর্ণভাবে সমর্পিত করুন। আমার সন্তানদের মধ্য থেকে, সব সন্তানদের থেকে নয়, সন্তানদের মধ্য থেকে। কারণ, 'মিন' এখানে একটা অংশের কথা বলা হচ্ছে, তাই না? অন্তত আমার সন্তানদের মধ্য থেকে কেউ কেউ হবে মুসলিম উম্মাহ, এক উম্মাহ, এক দল, এক জাতি। যারা শুধু আপনার (আল্লাহ) কাছেই সমর্পণ করবে, অন্য কারও কাছে নয়।
এক দল হবে যারা শুধু আপনার কাছেই আত্মসমর্পণ করবে। আমার সন্তানদের কেউ কেউ হবে জালিম, কিন্তু অন্তত কিছু সন্তানদের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিন।
সবার ব্যাপারে না দিন, কিন্তু কিছু সন্তানের ব্যাপারে অন্তত প্রতিশ্রুতি দিন, যারা আপনার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করবে। আমাদেরকে আনুষ্ঠানিকতাগুলো দেখিয়ে দিন। আমরা ঘর নির্মাণ করেছি। আমরা জানি না, কীভাবে এই ঘরে প্রার্থনা করতে হয় এবং কীভাবে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে হয়। আমরা কীভাবে তাওয়াফ করব, কীভাবে নামাজ পড়ব; তা আমাদের শেখান। আমাদের এই ইবাদতগুলো শেখান এবং আমাদের তওবা কবুল করুন।
আপনারা জানেন, আমরা কখন তওবা করি, যখন কোনো গুনাহ করি, যখন কোনো পাপ করি, তখনই তওবা করি। উনি কেন তওবা করছেন? তিনি কি কোনো ভুল কিছু করেছিলেন? তিনি ছিলেন একজন সেরা রাসূল । তো কীসের তওবা করেছিলেন তিনি? এখান থেকে যে কল্যাণটা আমরা নেব, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যখন আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিছু করেন। ধরুন, এইমাত্র আমরা নামাজ পড়লাম। আমরা কি আমাদের নামাজে ভুল করি? আমাদের অজুতে কি ভুল থাকে? আমাদের মন কি বিক্ষিপ্ত থাকে? রাতে কী খাব? ওরা বলল, রাতে খাওয়া-দাওয়া হবে না। তো যখন রুকু থেকে উঠেন, আপনার পেট মোচড় দিয়ে উঠে, আর আপনি বলেন 'আহ, আমি ভাত চাই'। এসব আমাদের মাথায় ঘুরতে থাকে। তো এটা কি নামাজে গাফেলতি নয়? অবশ্যই। তো আপনি নামাজ পড়েছেন মানে এই নয়, আপনি সবচেয়ে ভালোভাবে নামাজ পড়েছেন। এজন্য আপনার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এমনকী যেসব কাজ শুধু তাঁর জন্যই করছেন, সেগুলোর জন্যও। তিনি আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন, অথচ দেখুন তাঁর বিনয়। আমি আপনার ঘর বানাচ্ছি, আমি হয়তো যে জায়গায় ইট রাখার কথা সেখানে রাখিনি। হয়তো আমি ভুল করেছি, হয়তো আমি জানিই না আমার ভুলটা কী। তো আমি যদি আমার অজান্তেই কোনো ভুল করে থাকি, আমি আমার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছি। আমাদের তওবা কবুল করুন।
এই জিনিসটা ইবরাহিম (আ.) থেকে আমাদের শেখার আছে। আমরা মানুষকে বলি ইস্তেগফারের কথা। আরে আমি তো কোনো ভুল করিনি! আমি কেন ইস্তেগফার করব? আপনি অনেক ভুল করেছেন। আমরা অনেক ভুল করেছি। জেনে হোক বা না জেনে। উনি তওবা করলেন। এরপর আল্লাহ কিছু বললেন না, এর মানে হলো, তিনি তার দুআ কবুল করে নিয়েছেন। এরপর তিনি আবারও শুরু করলেন।
তিনি বললেন-
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ .
'হে আমাদের রব! তাদের কাছে তাদের মধ্য হতে এমন একজন বার্তাবাহক প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন।' সূরা বাকারা: ১২৯
উনি খুব সাবধানে ভাবছেন, আল্লাহ ওনাকে কী বলেছেন। উনি খুব মেপে কথা বলছেন। উনি বললেন, 'হে আমাদের প্রভু! আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে একজনকে আপনি রাসূল হিসেবে মনোনীত করুন। শুধু একজন রাসূল নয়, তাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল। এটি অসাধারণ বিচক্ষণতা।
যদি একজন রাসূলের কথা বলা হয় এবং তিনি যদি বাইরের লোক হন, তখন মানুষ বলবে, আমি তোমার কথা শুনতে চাই না! তুমি তো ভিনদেশি। মানুষ ভিনদেশি মানুষের কথা শুনতে চায় না। যখন আপনাদের কেউ পাকিস্তান বা ভারত থেকে আসেন, আর আপনার সন্তানরা পুরো আমেরিকান; যখন ওরা পাকিস্তানে যায়, কেউ তাদের কথা শুনতে চায় না। মানুষ তাদের কথা বলা নিয়ে ঠাট্টা করে। আবার যখন আরব বিশ্বের কেউ এখানে আসে অথবা সুদান, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া থেকে, তারা ইংরেজি বলতে পারে না। তারা এখানে এসে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে চাইলে লোকজন কি তাদের কথা ভালো করে শোনে? না, শোনে না। তারা শোনে না কারণ, তারা পরিচিত নয়। তারা বহিরাগত। তো যেকোনো ধর্মেই বহিরাগতদের দেখা হয় অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে। তারা নেতা হতে পারে না। তারা বাইরের লোক।
উনি দুআ করলেন যেন, তাঁর প্রজন্মের মধ্য থেকে রাসূল মনোনীত করেন। যেন যখন তিনি কথা বলবেন, তখন অন্যরা শোনে। এমন একজন বার্তাবাহকের মানে কী, যদি মানুষ তাঁর কথা না-ই শোনে? তো তিনি বললেন যে, তিনি সাধারণ কোনো একজন রাসূল নয়; বরং তিনি তাদেরকে অত্যাশ্চর্য নিদর্শন পড়ে শোনাবেন। তিনি তাদেরকে এমন সব বিষয় পড়ে শোনাবেন যা তাদের মোহমুগ্ধ করবে এবং আপনার নিকটবর্তী করবে। যাতে তারা এক কাতারে থাকে। তারা মুসলিম থাকে। তিনি তাদের কিতাব শিক্ষা দেবেন এবং তিনি তাদের প্রজ্ঞার শিক্ষা দেবেন। সেইসাথে তিনি তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন।
এটা ইবরাহিম (আ.)-এর খুব চিন্তাশীল দুআ ছিল। আমরা আমাদের শৈশবে শিখেছি, তাঁর এই দুআর ফলেই আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ-এর আগমন। আপনি দুআর শক্তি বুঝতে পারছেন? ইবরাহিম (আ.) এই দুআ করলেন, কোন মোটিভেশন থেকে? ওনার মোটিভেশন ছিল, 'আমার সন্তানেরা'। একজন পিতা আন্তরিকভাবে তাঁর প্রভুর কাছে চাইলেন এবং তাঁর প্রভু এর জবাব দিলেন। ইবরাহিম (আ.)-এ দুআর সর্বশ্রেষ্ঠ জবাব মানবজাতি দেখল নবিজির আগমন। কখনো দুআর শক্তিকে তাই খাটো করে দেখবেন না। কখনো দুআর শক্তি তুচ্ছ করে দেখবেন না।
আমরা এখন এই যে ঐশী গ্রন্থ কুরআন পড়ছি, এটা এসেছে একটি দুআর ফলে। এটা এসেছে একটি দুআর জবাবে। পুরো বিশ্বের শতশত নয়, মিলিয়ন মিলিয়ন নয়, বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ বলছেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আল্লাহ একদিন তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন, পবিত্র করবেন, উনি তাদের জন্য কিতাব পড়বেন। এটা হচ্ছে একজন উদ্বিগ্ন পিতা, যিনি অগ্রিম ভাবেন, আগে থেকে চিন্তা করেন।
ইবরাহিম (আ.)-এর এই উত্তরাধিকার থেকে কে সরে যাবে? কে অত বোকা? আল্লাহ তায়ালা জানাচ্ছেন-
وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ.
'ইবরাহিমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফিরিয়ে নেয়! তবে সে ব্যক্তি, যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।' সূরা বাকারা: ১৩০
পিতৃত্ব বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য থাকায় আমি এ কথাগুলো শেয়ার করলাম। এতে আছে আগামী প্রজন্মের জন্য উদ্বেগের কথা। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
وَوَفَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيْهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ.
'ইবরাহিম (আ.) এবং ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের অসিয়ত করলেন যে, “হে আমার সন্তানেরা, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য এই ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা পরিপূর্ণ মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না." সূরা বাকারা: ১৩২
আমাদের সময়ে মা-বাবারা সন্তানদের বলেন, খবরদার! অঙ্কে ৯০-এর নিচে যেন না পাও। খবরদার! তোমার বন্ধুদের সাথে যাবে না। খবরদার! এটা করবে না, ওটা করবে না। আর উনি তাঁর সন্তানদের বলছেন, আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া খবরদার মারা যাবে না। এটা আল্লাহর তরফ থেকে এক উপহার তোমাদের জন্য। এটা তোমাদের জন্য উপহার। এই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-খবরদার! তোমরা এটা খোয়াবে না। এটা হচ্ছে একজন উদ্বিগ্ন বাবার উপদেশ।
এই সুন্দর দুআ যখন তিনি করলেন, 'রাব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না', তাঁর সাথে কে ছিল? ইসমাইল (আ.)। কিন্তু এরপরে যে নবির কথা এসেছে উনি কে? ইয়াকুব (আ.)। উনি কার সন্তান ছিলেন? ইসহাক (আ.)-এর। সেই ছেলে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তো আল্লাহ শুধু তাঁর সন্তান এবং তাঁর বংশধরদের দুআই কবুল করেননি। তিনি ইসহাক (আ.) এবং তাঁর বংশধরদের দুআরও জবাব দিয়েছেন। তাদের মধ্যকার অন্যদের প্রার্থনার জবাবও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দিয়েছেন। আর তারাও সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন পিতা হিসেবে বেড়ে উঠেছিল। ইয়াকুব (আ.) ছিলেন শ্রেষ্ঠ বাবাদের একজন, যাঁর কথা আমাদের কিতাবে একজন আদর্শ বাবা হিসেবে উল্লিখিত আছে।
তারপর কুরআনে বলা হলো- أَمْ كُنْتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِنْ بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَهَكَ وَإِلَهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَهَا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ.
'তোমরা কি উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বলল, "আমার পর তোমরা কার ইবাদাত করবে?” তারা বলল, আমরা তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের উপাস্যের ইবাদাত করব। তিনি একক উপাস্য। এবং আমরা তাঁর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পিত।"" সূরা বাকারা : ১৩৩
দেখুন, যখন মৃত্যু ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে উপস্থিত হলো, ওনার ছেলেরা ওনার পাশে, তাঁর সেবা করছে, পানি দিচ্ছে, কাঁদছে আর উনি ওদের নিয়ে চিন্তিত। উনি এটা নিয়ে চিন্তিত না যে, কাদেরকে ওরা বিয়ে করবে, কোথায় তারা থাকবে, কোথায় সম্পদ খরচ করবে, খেয়াল করে দেবে। ওসব কিছু না।
একদম না। অবশ্যই কলেজের পড়াশোনা শেষ করবে, ওসব নিয়ে কোনো চিন্তা না; বরং তিনি বলছেন, 'ও আমার ছেলেরা! নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দ্বীন মনোনীত করেছেন। সুতরাং খবরদার! মুসলিম হওয়া ছাড়া তোমরা মৃত্যুবরণ করবে না।' এরপর উনি বললেন, 'আমার মৃত্যুর পর তোমরা কীসের ইবাদত করবে? আমি চলে গেলে তোমরা কী করবে? কীসের প্রার্থনা করবে?' উনি এটা বলেননি, মান তা'বুদুনা- কার প্রার্থনা করবে? উনি বলছেন, 'মা তা'বুদুনা'-কীসের প্রার্থনা করবে? যার মানে হলো, উনি তাদেরকে ধাঁধায় ফেলে জানতে চাইছেন। তোমরা কী করবে? কী ধরনের উপাসক গ্রহণ করবে? তারা জবাব দিলো, 'আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার পিতা ইবরাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.) ও ইসহাক (আ.)-এর ইলাহর ইবাদত করব এবং আমরা সম্পূর্ণরূপে তাঁর কাছেই সমর্পিত।'
আমি এখানে কিছু সত্যিকার বাস্তবতা শেয়ার করছি। আসুন, আমরা এইমাত্র যা শিখলাম তার সাথে নিজেদের তুলনা করি। এটা আগেকার দিনের কাহিনি। ওনারা ছিলেন অসাধারণ সন্তান। এই প্যারার শেষে আল্লাহ কি বলছেন জানেন? আল্লাহ বলছেন-
تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُمْ مَّا كَسَبْتُمْ وَلَا تُسْأَلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ.
'তারা ছিল এক জাতি যারা বিগত হয়েছে। তারা যা করেছে তা তাদেরই জন্য। তোমরা যা অর্জন করবে তা তোমাদের জন্য। তাদের কর্ম সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না।' সূরা বাকারা: ১৩৪
ভাববেন না যে, 'ওহ! ওসব ছিল সুসময়'... না। তারা পেয়েছে তাদেরটা। আপনি পাবেন আপনারটা। আপনারটার জন্য আপনাকেই কাজ করতে হবে। তারা যা করেছেন, সেজন্য আপনাকে প্রশ্ন করা হবে না। আপনাকে প্রশ্ন করা হবে আপনি কী করেছেন তা নিয়ে।
সবশেষে আল্লাহর কথা হচ্ছে, এ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদেরকে বদলাও। আপনি ওসব ঐতিহাসিক নামগুলো জানেন কি না, সংখ্যাগুলো, তারিখগুলো বা ইয়াকুব (আ.)-এর সব সন্তানের নাম জানেন কি না, এসব নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করা হবে না। আপনাকে প্রশ্ন করা হবে আপনি আপনার সন্তানদের নিয়ে কী করেছেন?
আল্লাহর ইচ্ছায় ও তাঁর অনুগ্রহে গত পাঁচ বছরে আমি পুরো আমেরিকায় ৮০টির মতো কমিউনিটিতে ঘুরেছি। প্রতিটি জায়গায় আমি দুই সপ্তাহের মতো ছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ।
আমি বড়ো হয়েছি নিউইয়র্কে। জানেন হয়তো, যখন আপনি এক জায়গায় দীর্ঘদিন থাকেন, তখন আপনার আশপাশ ছাড়া বাইরের পৃথিবীতে কী ঘটছে, সেটা সম্পর্কে আপনি অনেক সময়ই খবর রাখেন না। তো যেহেতু আমি বাইরে অনেক ঘুরি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাগুলো অনেক কিছুর ব্যাপারে চোখ খুলে দেয়। কখনো কখনো এমন কিছু হয়, যা আমি কখনোই আশা করি না। একদিক থেকে চিন্তা করলে এটা খুব ইতিবাচক।
কিন্তু অন্যদিকে আমি খেয়াল করেছি, আমাদের মুসলিম সমাজে কিছু কিছু সমস্যা আছে, যা প্রায় একই ধরনের। চাই সেটা আপনি ক্যালিফোর্নিয়া থাকেন বা বোস্টনে কিংবা টেক্সাসে অথবা আরকানসাসে। সমস্যাগুলো সব একই। এসব সমস্যার মধ্যে যা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মারাত্মক মনে হয় তা হলো- আমরা কত দ্রুত আমাদের তরুণ সমাজকে হারিয়ে ফেলছি! কত দ্রুত আমরা আমাদের সন্তানদের সাথে সম্পর্কগুলো খুইয়ে ফেলছি।
ইনশাআল্লাহ! এ বিষয়টার গুরুত্বের কথা আমি কুরআনের আলোকে আলোচনা করব। আমি আপনাদের সাথে ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করব, যেন আমরা এই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারি।
শেষে আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু তথ্য শেয়ার করব। আমরা যদি একটি সমস্যা সম্পর্কে সচেতনই না হই, তাহলে সমস্যা সমাধানের আশাই করতে পারি না। তাই প্রথম ধাপ হচ্ছে আমাদের সাবধান হতে হবে, সচেতন হতে হবে। সমস্যা যে একটা আছে- তা আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে। এরপরের ধাপ হলো, আমাদের সবাইকে একসাথে ভাবতে হবে। এর একটা সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। অবশ্যই সেটা হতে হবে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী। এরপর আমাদের মধ্যে যারা একই বিষয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের ভাবনাগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। কীভাবে আমরা পরবর্তী ধাপে এগোব, কীভাবে আমরা সমাধানে পৌঁছাব।
রোগী যদি নিজেকে অসুস্থ না মনে করি, তার তো কোনো ওষুধের দরকার নেই। কোনো প্রেসক্রিপশন নিয়ে সে চিন্তাই করবে না। একটা সমস্যা যে আছে, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া প্রথম কাজ।
আমি এখন সূরা আল-বাকারার কিছু আয়াত দিয়ে শুরু করব। খুব সংক্ষিপ্তভাবে এই আয়াতের ওপর আলোচনা করব। এটা কোনোভাবেই এই আয়াতের বিস্তারিত তাফসির নয়। কিছু রিমাইন্ডার মাত্র।
ইবরাহিম (আ.) অনেক অনেক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। হজের সময় আমরা ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে অনেক খুতবা শুনি। কত বিশাল উচ্চতা তিনি অর্জন করেছিলেন! উনি যখন ওগুলো অর্জন করলেন, সবকিছু অর্জনের পর আল্লাহ তাঁকে সার্টিফিকেট দিলেন। এই আয়াত হচ্ছে ওই সার্টিফিকেট সম্পর্কে। আল্লাহ তায়ালা বলছেন-
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَتَهُنَّ. 'যখন ইবরাহিম-কে তাঁর রব পরীক্ষা করলেন...' সূরা বাকারা: ১২৪
ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ খুবই ভালোভাবে পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি সবগুলো পরীক্ষাই অতিক্রম করলেন। সব পরীক্ষার শেষে আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে বলেছেন, 'আমি অবশ্যই তোমাকে মানুষের ইমাম বানালাম। আমি তোমাকে মানব সমাজের জন্য এক অনুসরণীয় ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলাম।'
এই হচ্ছে সেই সার্টিফিকেট। এই হচ্ছে সেই সম্মানের স্মারক; যা অনেক কঠিন পরীক্ষা দেওয়ার পর ইবরাহিম (আ.)-কে দেওয়া হয়েছিল। আমরা কল্পনাও করতে পারব না, একটা মানুষ কীভাবে এই ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে পারে, যেসব পরীক্ষা ইবরাহিম (আ.)-কে দিতে হয়েছিল!
এই যে আমরা কত সহজে বলে ফেলি, তিনি আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। আমরা কত সহজে বলি যে, তিনি নিজের সন্তানের গলায় ছুরি বসিয়েছিলেন। আমাদের বাচ্চা একটা কাঁটা চামচ ধরলেই আমরা বলি, 'এই! ওটা রেখে দাও, এটা বিপদজনক।' আপনি বিচলিত হয়ে পড়েন। যদি আপনার সন্তান চুলার একটু বেশি কাছে যায় আপনি কী করেন? আর এখানে এই মানুষটা যে নিজের সন্তানের গলায় ছুরি ধরেছে, সুবহানআল্লাহ। এটা বলা সহজ, কিন্তু নিজেকে সে জায়গায় বসানোর চেষ্টাটা অনেক কঠিন।
এরপর তাঁর সামনে এলো সেই পরীক্ষা, তাঁর পরিবারকে মরুভূমির মাঝে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে রেখে আসা। আমাদের পরিবারকে যখন আমরা কোথাও রেখে আসি, যেমন ধরুন- আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকে আপনার ফ্যামিলিকে আনতে হবে। আপনার হয়তো এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। আপনি ২০টা মিসড কল পাবেন। এদিকে আপনি বিচলিত। তোমরা কোথায়! সব ঠিক আছে? তারা হয়তো শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত এয়ারপোর্টের বিশাল পরিসরের কোনো এক বেঞ্চে বেশ নিরাপদেই বসে আছে। আর আপনি উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছেন। অথচ এখানে ইবরাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে মরুভূমির মাঝখানে রেখে এলেন! যেখানে মৃত্যু প্রায় সুনিশ্চিত। এরপরও তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওপর পুরো ভরসা করে তাঁদের রেখে এলেন। এটি কোনো সহজ কাজ নয়।
তো, উনি এই সমস্ত পরীক্ষাগুলোর মধ্যে দিয়ে গেলেন। আল্লাহ বললেন- 'তুমি পাশ করেছ, তুমি এখন থেকে মানব সমাজের ইমাম।' আপনারা জানেন ওই পরীক্ষাগুলো সহজ কিছু ছিল না। যখন তাঁর সাথে ভালো বা মন্দ যা কিছুই ঘটত, তিনি প্রথমেই স্মরণ করতেন আল্লাহ তায়ালাকে।
ইবরাহিম (আ.) বলেছেন- الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِيْنِ، وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ، وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ. 'তিনিই হচ্ছেন সেই সত্তা (আল্লাহ), যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনিই আমাকে পথ দেখান। তিনিই আমাকে আহার করতে দেন। তিনিই আমাকে পান করতে দেন। যখন আমি অসুস্থ হই, তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন।' সূরা শুআরা: ৭৮-৮০
যা কিছুই তাঁর জীবনে ঘটুক, তিনি কাকে মনে করেন? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে।
আল্লাহ বলেছেন, একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড়ো উপহার হলো আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এতগুলো কঠিন পরীক্ষার পর আল্লাহ যখন তাঁকে সবচেয়ে সেরা উপহারটি দিলেন, আপনি তখন কী আশা করেন? আপনি আশা করবেন উনি বলবেন, 'আলহামদুকা ইয়া রাব্বি' সমস্ত প্রশংসা আপনার, কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি। এটা আমার জন্য অনেক সম্মানের। আমি আপনার নগণ্য বান্দা।'
কিন্তু এর বদলে আপনি দেখবেন, ইবরাহিম (আ.) বললেন, 'ওয়ামিন জুররিয়্যাতি' আমার পরের প্রজন্মের কী হবে? 'জুররিয়্যা' কথাটা 'আবনায়ি ওয়া আওলাদি'র থেকে আলাদা। 'জুররিয়্যা' মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
আল্লাহ তাঁকে মানবজাতির ইমাম করলেন, আর তিনি চিন্তিত তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে। তিনি আগে থেকেই ভাবছেন ৩, ৪, ৫ প্রজন্ম, ১০, ২০, ৩০ প্রজন্মের কথা। এটা হচ্ছে একজন জিনিয়াসের ভাবনা। এটা হচ্ছে এমন একজনের মাইন্ডসেট, যিনি সত্যিকারভাবে এই পৃথিবীতে তাঁর ভূমিকা কী- তিনি তা ভালো করেই জানেন।
মুসলিমরা অমুসলিমদের থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা। তাদের সাথে আমাদের ভাবনার ধরন আলাদা। আমাদের ভাবনা-চিন্তা দীর্ঘমেয়াদি। দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা বলতে আমি বলছি না- ভবিষ্যতের কথা ভাবুন এবং বাড়ি নিন মর্টগেজে। আমি ওই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলছি না। আমি বলছি সেই দীর্ঘমেয়াদের কথা, যেখানে আল্লাহর কাছে আমরা বিনা মর্টগেজে ঘর পাব। এটা হচ্ছে আসল দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান।
আমরা মুসলিম। ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ যেকোনো সময়ে মারা যেতে পারে। তারপরও তিনি বীজ বুনে যাচ্ছেন এই ভেবে যে, একসময় গাছ বড়ো হবে এবং কেউ একজন এর ছায়ায় বসবে।
তিনি ওই গাছ দেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু তিনি ভাবছেন ভবিষ্যতের কথা। আমরা এ রকমই। এটা আমাদের সাদকায়ে জারিয়া। আমরা সব সময়ই আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত; আমাদের এ রকমই হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যে সমাজে ভবিষ্যতে কী হবে তা তারা ভাবে না। কীভাবে এই সমাজ ভবিষ্যতের পরোয়া করে না, তা ছোট্ট একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। এই দেশের কিছু ধনী ব্যক্তি ধনী হয়েছে কীভাবে? সুদভিত্তিক ব্যবসা করে।
এই সুদনির্ভর অর্থনীতিকে, খুবই সাদামাটাভাবে বললে, এই যে ডোনাল্ড ট্রাম্প!
এই লোকটি বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের অন্যতম তাই না? তিনি যদি এই মুহূর্তে তার সমস্ত দেনা শোধ করে দেন, দেনার প্রতিটি পাই-পয়সা মিটিয়ে দেন, তাহলে কী হবে? উনি শূন্যেও থাকবেন না। তিনি থাকবেন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মাইনাসে। উনি মিনিমাম পেমেন্ট দেন এই সম্পত্তিতে, মিনিমাম পেমেন্ট অন্যটাতে, সবগুলো ভাড়া দেন। এরপর আবার সব রিফাইন্যান্স করেন, তারপর আবার অন্য প্রপার্টি ধরেন। এই মানুষটির দেনার ওপর দেনা। দেনার পর দেনায় ডুবে আছেন, তিনি শুধু সবগুলোতে মিনিমাম পেমেন্ট দিয়ে যাচ্ছেন। তার দেনা সব শেষ করতে করতে হয়তো তিনশো বছর লাগবে। উনি কি এর আগে মারা যাবেন না? তিনি ভাবছেন আমি করে যাই, আর মারা গেলে ওটা তখন অন্যের সমস্যা, কাজেই আমার কীসের চিন্তা!
এগুলো আখিরাতে অবিশ্বাসী মানুষের চিন্তা। আমি আগে বাঁচি। আমি আমাকে নিয়ে চিন্তিত; অন্যদের নিয়ে নয়। তো আপনি জানেন আল গোর (২০০০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী) চেঁচাচ্ছেন ৫০ বছর পর গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে। তিনি বলতে পারতেন, আরে চিন্তা কীসের! আমি মরে যাব ১০ বছরের মধ্যে, আমি পাত্তা দিই না। এটা আমার সমস্যা না।
আমাদের সন্তানরা কী পরিমাণ ঋণের চাপে পড়বে, সেটা কে ভাবে? আমাদের নিজেদেরই এখনো কত সমস্যা! তো এই সমাজ হচ্ছে মানুষের অবস্থার একটা দৃষ্টান্ত। আমরা দ্রুত সবকিছু পেতে চাই। আমরা দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করি না। কিন্তু আল্লাহ তাঁর কিতাবে আমাদেরকে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে। তো আমরা যখন এই দেশে (আমেরিকায়) আসি অর্থাৎ মুসলমানেরা এই দেশে আসি, বেশির ভাগই ইমিগ্রান্ট। যখন আমরা দীর্ঘমেয়াদের কথা চিন্তা করি, আমরা ভাবি আমাদের সন্তান কোন স্কুলে যাবে, কোন কলেজে যাবে, কোথায় বাড়ি কিনব। এই হচ্ছে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা।
আমি বলছি অন্যরকম দীর্ঘমেয়াদের কথা। আমি কীভাবে নিশ্চিত করব যে, আমার পর আরও ৩, ৪, ৫ প্রজন্ম পর তারাও বলবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আর তারা অন্যদেরও শেখাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আমি কীভাবে এটা করব, এটা হচ্ছে আসল দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা। যদি আপনার সন্তান স্কুল থেকে বেরিয়ে ভালো ডিগ্রি নিয়ে, ভালো চাকরি পেল এবং খুব ধনী এক পরিবারে বিয়ে করল। কিন্তু এরপর 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' হারিয়ে ফেলল এক প্রজন্মেই! আপনি সফল হলেন নাকি ব্যর্থ হলেন, ভেবে দেখুন। এর জবাব কে দেবে?
ইবরাহিম (আ.) এটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই আল্লাহ যখন বললেন, 'আপনি ইমাম।' উনি বললেন- 'এটা যথেষ্ট নয়। আমি আমার সন্তানদের জন্য দায়ী। আর ওরা যদি ভালো না হয়, তাহলে ওদের সন্তানেরা হবে আরও খারাপ এবং তাদের সন্তানাদি হবে তার চেয়েও খারাপ। আমি তাদের জন্য জবাবদিহি করতে চাই না।'
একজন মানুষ যত ভালো কাজ করুক, শুধু একবার ভাবুন, আপনার মিলিয়ন মিলিয়ন ভালো কাজ আছে। পাহাড় সমান পুণ্য আপনার। কিন্তু আপনি যদি আপনার সন্তানদের ঠিকভাবে বড়ো করতে না পারেন এবং তারা ধর্ম হারিয়ে ফেলে! সেটা আকিদায় হোক, তাদের বিশ্বাসে বা ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে হোক। তারা যদি ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে এর শুরুটা হলো আপনার গাফলতি দিয়ে। বিচার দিবসে আপনার সমস্ত পুণ্য কি ওইসব সম্মিলিত খারাপের সাথে পাল্লা দিতে পারবে?
অসম্ভব! কক্ষনো না!
বাবা-মায়ের জন্য এটা অনেক বড়ো দায়িত্ব। অনেক বড়ো চ্যালেঞ্জ। প্রত্যেক বাবা-মা হলেন ইমাম। প্রত্যক বাবা পরিবারের ইমাম। যখন আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে ইমাম মনোনীত করলেন, তিনি কাদের ওপর তাঁর ইমামতি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন? তাঁর নিজের সন্তানদের নিয়ে, সবার আগে তাঁর নিজ সন্তানদের নিয়ে। আল্লাহ তাঁর দুআর জবাবে বললেন- قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ. 'আমার অঙ্গীকার অত্যাচারীরা লাভ করবে না।' সূরা বাকারা: ১২৪
উনি যখন এই বলে দুআ করলেন, আমার সন্তানদের কী হবে, তখন আল্লাহ বললেন- 'না! আমার প্রতিশ্রুতি অবিচারকারীদের জন্য নয়।'
ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ বললেন, 'এই কথাগুলোর মাঝেই যে, তোমার সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ হবে অবিচারকারী। এদের সবাই পুণ্যবান হবে না।' আমরা জানি, ইবরাহিম (আ.)-এর প্রজন্মের বেশি সংখ্যকই অবাধ্য। কুরাইশরা কি ইবরাহিম (আ.)-এর বংশধর ছিল না? তারা কি জালিম ছিল না? অবশ্যই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তো যখন ইবরাহিম (আ.) এ কথা শুনলেন, আমি নিশ্চিত কথাটা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল। তো উনি এরপর কী করলেন? উনি কি থেমে গিয়েছিলেন? না! উনি আল্লাহর কাছে আরেকটা দুআ করলেন।
তখন তাকে আল্লাহর ঘর নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। উনি যখন আল্লাহর ঘরের দিকে যাচ্ছেন তখন দুআ করলেন-
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقُ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ.
'হে প্রভু! এই শহরকে শান্তিময় করে দাও এবং এর বাসিন্দাদের জন্য সব ধরনের ফলমূল দান করো।' সূরা বাকারা: ১২৬
উনি দুই ভাগে দুআ করলেন। উনি বললেন, এই শহরকে নিরাপদ রাখো এবং দ্বিতীয়ত, ওরা যেন সব ধরনের জীবিকা অর্জন করতে পারে।
সাহিত্যে একটি কথা আছে, শান্তি ও সমৃদ্ধি। পলিটিক্যাল সাইন্সে আপনি জানবেন, একটা সমাজ সুষ্ঠুভাবে চলার জন্য প্রথম যা দরকার, তা হলো আইনের শাসন, অর্থাৎ শান্তি। যদি আপনার ঘর নিরাপদ না থাকে, আপনার দোকান, আপনার অফিস, আপনার টাকা-পয়সা নিরাপদ না থাকে, তাহলে সে রকম সমাজে আপনি চলতে পারবেন না। আবার আপনার যদি শান্তি থাকে, কিন্তু কোনো চাকরি-বাকরি না থাকে, আয়-রোজগারের কোনো উপায় না থাকে, যদি ব্যবসা করার পথ না থাকে, তাহলে সেই সমাজে কি টিকে থাকতে পারবেন? না! তো আপনার দরকার শান্তি এবং সমৃদ্ধি।
এই মানুষটির দুআয় কত চিন্তাশীলতা দেখুন। উনি বললেন, এই শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং এদেরকে সব ধরনের ফলমূল দান করুন। কিন্তু এর সাথে একদম শেষে উনি ছোট্ট একটা দাবি যোগ করলেন। ইবরাহিম (আ.) বললেন-
مَنْ آمَنَ مِنْهُمْ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ.
অর্থাৎ আপনি আমার সেই সন্তানদেরই শুধু দিন, যারা আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস রাখে। আল্লাহ ওনাকে বলেছিলেন- 'আমার প্রতিশ্রুতি অবিচারকারীদের জন্য নয়।' উনি বললেন- 'ঠিক আছে এই শহরকে শান্তির শহর করে দিন' এবং এর মানুষদের জন্য সব ধরনের রিজিকের ব্যবস্থা করে দিন; কিন্তু শুধু ঈমানদারদের জন্য। অন্যকথায়- অবিশ্বাসী, পাপী সন্তানদের জন্য নয়। ওরা দুর্ভিক্ষে পড়ুক। তাদের বংশ নির্বংশ হয়ে যাক। কারণ, আমি ওদের জন্য জবাবদিহি করতে পারব না। আমি শুধু আমার ঈমানদার সন্তানদের জন্য জবাব দেবো।'
কী ভীষণ বিচক্ষণ দুআ! সুবহানআল্লাহ। উনি বললেন, 'শুধু যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে'। আল্লাহ তায়ালা এর জবাবে বললেন-
وَمَنْ كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَى عَذَابِ النَّارِ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ.
'যারা অবিশ্বাসী আমি তাদেরকেও উপভোগ করতে দেবো। এরপর তাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামের আগুনে ঠেলে দেবো। কী ভয়াবহ সেই আবাস!' সূরা বাকারা: ১২৬
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন, উনি কি সেটা একা করেছিলেন? ওনার সাথে কে ছিল? ইসমাইল (আ.)। তো ইবরাহিম (আ.)-এর বিচক্ষণতা আপনি দেখতে পারছেন।
আমরা মনে-প্রাণে কোনো কিছু আল্লাহর কাছে কখন চাই? যখন আমার কোনো কিছু খুব দরকার। খুব প্রয়োজন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ছাত্ররা এমন করে। আগামীকাল তোমার ফাইনাল পরীক্ষা, তুমি কোনো পড়াশোনা করনি এবং তুমি এই পাঁচ মিনিট আগে বললে, 'ইয়া আল্লাহ'... 'পরীক্ষা'। হঠাৎ তোমার মনে পড়ল আল্লাহর কথা। আল্লাহকে স্মরণ করছ সুবিধামতো, নিজের যখন দরকার। কিন্তু আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়ার সবচেয়ে সেরা সময় হচ্ছে যখন তুমি আল্লাহকে খুশি করার মতো কিছু করেছ। চাওয়ার জন্য সেটা হচ্ছে সবচেয়ে সেরা সময়। তুমি জানো সেরা সময় কখন? নামাজের পর!
তুমি এইমাত্র আল্লাহর কথা মানলে। এখন দুআ করো, আল্লাহর কাছে চাওয়ার সবচেয়ে সেরা জায়গার একটা হলো আল্লাহর ঘর। যখন তুমি ওখানে যাও, তা আল্লাহর প্রতি বাধ্যতার একটি শ্রেষ্ঠ কাজ। এটা হচ্ছে চাওয়ার জন্য সেরা সময় আল্লাহর কাছে চাওয়ার আরেকটা সেরা সময় হলো, রাতের শেষ ভাগ। কারণ, তখনই তুমি আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে ভালোভাবে বাধ্যতা দেখালে। দুআর জন্য শ্রেষ্ঠ সময় হলো রমজান মাস। কারণ, তখন তুমি আল্লাহর প্রতি বাধ্য থাকছ। তখন আল্লাহর কাছে চাও।
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর প্রতি বাধ্যতার সেরা একটি কাজ করছেন। তিনি তাঁর ছেলেকে সাথে নিয়ে এই পৃথিবীতে আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন। এটা সম্ভবত আবারও তাঁর কাছে চাইবার জন্য সেরা সময় তাই না? তো তিনি আবারও চাইলেন। কিন্তু তিনি জানেন, আল্লাহ একবার না বলেছেন। তিনি নিজের দুআ পরিমার্জিত করছেন।
প্রথম দুআ, রাব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না- 'হে আমাদের প্রভু, আপনি আমাদের থেকে কবুল করুন'। দেখুন আগের দুআয় ছিল, 'হে আমার প্রভু এই শহরকে শান্তিময় করে দিন'। 'রাব্বি' মানে আমার প্রভু। এখন উনি কী বললেন? 'রাব্বানা' আমাদের প্রভু! উনি কাকে সঙ্গে নিলেন? তাঁর ছেলেকে! এইবার আমি আল্লাহর ঘর নির্মাণ করছি এবং আমি দুআ করতে যাচ্ছি, কিন্তু আমি আমার সাথে আমার সন্তানকেও এই দুআয় শামিল করছি। যাতে অন্ততপক্ষে এই ছেলের ব্যাপারে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দেন।
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ .
'হে আমাদের প্রভু, আমাদের দুজন থেকে কবুল করে নিন। নিঃসন্দেহে আপনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞাতা।' সূরা বাকারা: ১২৭
সুবহানআল্লাহ। তো উনি একটা ছেলের ব্যাপারে নিশ্চিত করলেন। পরবর্তী আয়াত এই দুআরই ধারাবাহিকতা, যার মানে হলো আল্লাহ কিছু বললেন না। আল্লাহ জবাবে নীরব থাকলেন এবং নীরবতা মানে কী? কবুল করা। আল্লাহ তাঁর দুআ কবুল করলেন এবং তিনি আবারও বলতে শুরু করলেন। যেহেতু আরও আগেই আল্লাহ কবুল করেছেন, তাই উনি থামলেন না। বললেন-
رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُسْلِمَةً لَكَ.
'হে আমাদের প্রভু! আমাদের দুজনকেই আপনার কাছে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করার তাওফিক দিন। এবং আমাদের বংশধর থেকে এমন এক জাতি সৃষ্টি করুন, যারা হবে আপনার প্রতি সমর্পিত।' সূরা বাকারা: ১২৮
আল্লাহ তো তাঁকে ইমাম বানিয়েছেনই, তাহলে এই দুআ কেন? তিনি তো আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেনই। তিনি কি আগেই আল্লাহর কাছে পূর্ণ সমর্পন করেননি? সুবহানআল্লাহ! তাহলে তিনি এই দুআ এখন কেন করছেন? কারণ, তিনি তাঁর ছেলেকে এখানে অন্তর্ভুক্ত করছেন। তিনি বলেছেন, আমাদেরকে আপনার প্রতি পরিপূর্ণভাবে সমর্পিত করুন। আমার সন্তানদের মধ্য থেকে, সব সন্তানদের থেকে নয়, সন্তানদের মধ্য থেকে। কারণ, 'মিন' এখানে একটা অংশের কথা বলা হচ্ছে, তাই না? অন্তত আমার সন্তানদের মধ্য থেকে কেউ কেউ হবে মুসলিম উম্মাহ, এক উম্মাহ, এক দল, এক জাতি। যারা শুধু আপনার (আল্লাহ) কাছেই সমর্পণ করবে, অন্য কারও কাছে নয়।
এক দল হবে যারা শুধু আপনার কাছেই আত্মসমর্পণ করবে। আমার সন্তানদের কেউ কেউ হবে জালিম, কিন্তু অন্তত কিছু সন্তানদের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিন।
সবার ব্যাপারে না দিন, কিন্তু কিছু সন্তানের ব্যাপারে অন্তত প্রতিশ্রুতি দিন, যারা আপনার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করবে। আমাদেরকে আনুষ্ঠানিকতাগুলো দেখিয়ে দিন। আমরা ঘর নির্মাণ করেছি। আমরা জানি না, কীভাবে এই ঘরে প্রার্থনা করতে হয় এবং কীভাবে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে হয়। আমরা কীভাবে তাওয়াফ করব, কীভাবে নামাজ পড়ব; তা আমাদের শেখান। আমাদের এই ইবাদতগুলো শেখান এবং আমাদের তওবা কবুল করুন।
আপনারা জানেন, আমরা কখন তওবা করি, যখন কোনো গুনাহ করি, যখন কোনো পাপ করি, তখনই তওবা করি। উনি কেন তওবা করছেন? তিনি কি কোনো ভুল কিছু করেছিলেন? তিনি ছিলেন একজন সেরা রাসূল । তো কীসের তওবা করেছিলেন তিনি? এখান থেকে যে কল্যাণটা আমরা নেব, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যখন আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিছু করেন। ধরুন, এইমাত্র আমরা নামাজ পড়লাম। আমরা কি আমাদের নামাজে ভুল করি? আমাদের অজুতে কি ভুল থাকে? আমাদের মন কি বিক্ষিপ্ত থাকে? রাতে কী খাব? ওরা বলল, রাতে খাওয়া-দাওয়া হবে না। তো যখন রুকু থেকে উঠেন, আপনার পেট মোচড় দিয়ে উঠে, আর আপনি বলেন 'আহ, আমি ভাত চাই'। এসব আমাদের মাথায় ঘুরতে থাকে। তো এটা কি নামাজে গাফেলতি নয়? অবশ্যই। তো আপনি নামাজ পড়েছেন মানে এই নয়, আপনি সবচেয়ে ভালোভাবে নামাজ পড়েছেন। এজন্য আপনার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এমনকী যেসব কাজ শুধু তাঁর জন্যই করছেন, সেগুলোর জন্যও। তিনি আল্লাহর ঘর বানাচ্ছেন, অথচ দেখুন তাঁর বিনয়। আমি আপনার ঘর বানাচ্ছি, আমি হয়তো যে জায়গায় ইট রাখার কথা সেখানে রাখিনি। হয়তো আমি ভুল করেছি, হয়তো আমি জানিই না আমার ভুলটা কী। তো আমি যদি আমার অজান্তেই কোনো ভুল করে থাকি, আমি আমার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছি। আমাদের তওবা কবুল করুন।
এই জিনিসটা ইবরাহিম (আ.) থেকে আমাদের শেখার আছে। আমরা মানুষকে বলি ইস্তেগফারের কথা। আরে আমি তো কোনো ভুল করিনি! আমি কেন ইস্তেগফার করব? আপনি অনেক ভুল করেছেন। আমরা অনেক ভুল করেছি। জেনে হোক বা না জেনে। উনি তওবা করলেন। এরপর আল্লাহ কিছু বললেন না, এর মানে হলো, তিনি তার দুআ কবুল করে নিয়েছেন। এরপর তিনি আবারও শুরু করলেন।
তিনি বললেন-
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ .
'হে আমাদের রব! তাদের কাছে তাদের মধ্য হতে এমন একজন বার্তাবাহক প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন।' সূরা বাকারা: ১২৯
উনি খুব সাবধানে ভাবছেন, আল্লাহ ওনাকে কী বলেছেন। উনি খুব মেপে কথা বলছেন। উনি বললেন, 'হে আমাদের প্রভু! আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে একজনকে আপনি রাসূল হিসেবে মনোনীত করুন। শুধু একজন রাসূল নয়, তাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল। এটি অসাধারণ বিচক্ষণতা।
যদি একজন রাসূলের কথা বলা হয় এবং তিনি যদি বাইরের লোক হন, তখন মানুষ বলবে, আমি তোমার কথা শুনতে চাই না! তুমি তো ভিনদেশি। মানুষ ভিনদেশি মানুষের কথা শুনতে চায় না। যখন আপনাদের কেউ পাকিস্তান বা ভারত থেকে আসেন, আর আপনার সন্তানরা পুরো আমেরিকান; যখন ওরা পাকিস্তানে যায়, কেউ তাদের কথা শুনতে চায় না। মানুষ তাদের কথা বলা নিয়ে ঠাট্টা করে। আবার যখন আরব বিশ্বের কেউ এখানে আসে অথবা সুদান, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া থেকে, তারা ইংরেজি বলতে পারে না। তারা এখানে এসে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে চাইলে লোকজন কি তাদের কথা ভালো করে শোনে? না, শোনে না। তারা শোনে না কারণ, তারা পরিচিত নয়। তারা বহিরাগত। তো যেকোনো ধর্মেই বহিরাগতদের দেখা হয় অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে। তারা নেতা হতে পারে না। তারা বাইরের লোক।
উনি দুআ করলেন যেন, তাঁর প্রজন্মের মধ্য থেকে রাসূল মনোনীত করেন। যেন যখন তিনি কথা বলবেন, তখন অন্যরা শোনে। এমন একজন বার্তাবাহকের মানে কী, যদি মানুষ তাঁর কথা না-ই শোনে? তো তিনি বললেন যে, তিনি সাধারণ কোনো একজন রাসূল নয়; বরং তিনি তাদেরকে অত্যাশ্চর্য নিদর্শন পড়ে শোনাবেন। তিনি তাদেরকে এমন সব বিষয় পড়ে শোনাবেন যা তাদের মোহমুগ্ধ করবে এবং আপনার নিকটবর্তী করবে। যাতে তারা এক কাতারে থাকে। তারা মুসলিম থাকে। তিনি তাদের কিতাব শিক্ষা দেবেন এবং তিনি তাদের প্রজ্ঞার শিক্ষা দেবেন। সেইসাথে তিনি তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন।
এটা ইবরাহিম (আ.)-এর খুব চিন্তাশীল দুআ ছিল। আমরা আমাদের শৈশবে শিখেছি, তাঁর এই দুআর ফলেই আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ-এর আগমন। আপনি দুআর শক্তি বুঝতে পারছেন? ইবরাহিম (আ.) এই দুআ করলেন, কোন মোটিভেশন থেকে? ওনার মোটিভেশন ছিল, 'আমার সন্তানেরা'। একজন পিতা আন্তরিকভাবে তাঁর প্রভুর কাছে চাইলেন এবং তাঁর প্রভু এর জবাব দিলেন। ইবরাহিম (আ.)-এ দুআর সর্বশ্রেষ্ঠ জবাব মানবজাতি দেখল নবিজির আগমন। কখনো দুআর শক্তিকে তাই খাটো করে দেখবেন না। কখনো দুআর শক্তি তুচ্ছ করে দেখবেন না।
আমরা এখন এই যে ঐশী গ্রন্থ কুরআন পড়ছি, এটা এসেছে একটি দুআর ফলে। এটা এসেছে একটি দুআর জবাবে। পুরো বিশ্বের শতশত নয়, মিলিয়ন মিলিয়ন নয়, বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ বলছেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আল্লাহ একদিন তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন, পবিত্র করবেন, উনি তাদের জন্য কিতাব পড়বেন। এটা হচ্ছে একজন উদ্বিগ্ন পিতা, যিনি অগ্রিম ভাবেন, আগে থেকে চিন্তা করেন।
ইবরাহিম (আ.)-এর এই উত্তরাধিকার থেকে কে সরে যাবে? কে অত বোকা? আল্লাহ তায়ালা জানাচ্ছেন-
وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ.
'ইবরাহিমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফিরিয়ে নেয়! তবে সে ব্যক্তি, যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।' সূরা বাকারা: ১৩০
পিতৃত্ব বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য থাকায় আমি এ কথাগুলো শেয়ার করলাম। এতে আছে আগামী প্রজন্মের জন্য উদ্বেগের কথা। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
وَوَفَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيْهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ.
'ইবরাহিম (আ.) এবং ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের অসিয়ত করলেন যে, “হে আমার সন্তানেরা, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য এই ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা পরিপূর্ণ মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না." সূরা বাকারা: ১৩২
আমাদের সময়ে মা-বাবারা সন্তানদের বলেন, খবরদার! অঙ্কে ৯০-এর নিচে যেন না পাও। খবরদার! তোমার বন্ধুদের সাথে যাবে না। খবরদার! এটা করবে না, ওটা করবে না। আর উনি তাঁর সন্তানদের বলছেন, আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া খবরদার মারা যাবে না। এটা আল্লাহর তরফ থেকে এক উপহার তোমাদের জন্য। এটা তোমাদের জন্য উপহার। এই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-খবরদার! তোমরা এটা খোয়াবে না। এটা হচ্ছে একজন উদ্বিগ্ন বাবার উপদেশ।
এই সুন্দর দুআ যখন তিনি করলেন, 'রাব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না', তাঁর সাথে কে ছিল? ইসমাইল (আ.)। কিন্তু এরপরে যে নবির কথা এসেছে উনি কে? ইয়াকুব (আ.)। উনি কার সন্তান ছিলেন? ইসহাক (আ.)-এর। সেই ছেলে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তো আল্লাহ শুধু তাঁর সন্তান এবং তাঁর বংশধরদের দুআই কবুল করেননি। তিনি ইসহাক (আ.) এবং তাঁর বংশধরদের দুআরও জবাব দিয়েছেন। তাদের মধ্যকার অন্যদের প্রার্থনার জবাবও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দিয়েছেন। আর তারাও সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন পিতা হিসেবে বেড়ে উঠেছিল। ইয়াকুব (আ.) ছিলেন শ্রেষ্ঠ বাবাদের একজন, যাঁর কথা আমাদের কিতাবে একজন আদর্শ বাবা হিসেবে উল্লিখিত আছে।
তারপর কুরআনে বলা হলো- أَمْ كُنْتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِنْ بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَهَكَ وَإِلَهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَهَا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ.
'তোমরা কি উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বলল, "আমার পর তোমরা কার ইবাদাত করবে?” তারা বলল, আমরা তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের উপাস্যের ইবাদাত করব। তিনি একক উপাস্য। এবং আমরা তাঁর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পিত।"" সূরা বাকারা : ১৩৩
দেখুন, যখন মৃত্যু ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে উপস্থিত হলো, ওনার ছেলেরা ওনার পাশে, তাঁর সেবা করছে, পানি দিচ্ছে, কাঁদছে আর উনি ওদের নিয়ে চিন্তিত। উনি এটা নিয়ে চিন্তিত না যে, কাদেরকে ওরা বিয়ে করবে, কোথায় তারা থাকবে, কোথায় সম্পদ খরচ করবে, খেয়াল করে দেবে। ওসব কিছু না।
একদম না। অবশ্যই কলেজের পড়াশোনা শেষ করবে, ওসব নিয়ে কোনো চিন্তা না; বরং তিনি বলছেন, 'ও আমার ছেলেরা! নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দ্বীন মনোনীত করেছেন। সুতরাং খবরদার! মুসলিম হওয়া ছাড়া তোমরা মৃত্যুবরণ করবে না।' এরপর উনি বললেন, 'আমার মৃত্যুর পর তোমরা কীসের ইবাদত করবে? আমি চলে গেলে তোমরা কী করবে? কীসের প্রার্থনা করবে?' উনি এটা বলেননি, মান তা'বুদুনা- কার প্রার্থনা করবে? উনি বলছেন, 'মা তা'বুদুনা'-কীসের প্রার্থনা করবে? যার মানে হলো, উনি তাদেরকে ধাঁধায় ফেলে জানতে চাইছেন। তোমরা কী করবে? কী ধরনের উপাসক গ্রহণ করবে? তারা জবাব দিলো, 'আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার পিতা ইবরাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.) ও ইসহাক (আ.)-এর ইলাহর ইবাদত করব এবং আমরা সম্পূর্ণরূপে তাঁর কাছেই সমর্পিত।'
আমি এখানে কিছু সত্যিকার বাস্তবতা শেয়ার করছি। আসুন, আমরা এইমাত্র যা শিখলাম তার সাথে নিজেদের তুলনা করি। এটা আগেকার দিনের কাহিনি। ওনারা ছিলেন অসাধারণ সন্তান। এই প্যারার শেষে আল্লাহ কি বলছেন জানেন? আল্লাহ বলছেন-
تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُمْ مَّا كَسَبْتُمْ وَلَا تُسْأَلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ.
'তারা ছিল এক জাতি যারা বিগত হয়েছে। তারা যা করেছে তা তাদেরই জন্য। তোমরা যা অর্জন করবে তা তোমাদের জন্য। তাদের কর্ম সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না।' সূরা বাকারা: ১৩৪
ভাববেন না যে, 'ওহ! ওসব ছিল সুসময়'... না। তারা পেয়েছে তাদেরটা। আপনি পাবেন আপনারটা। আপনারটার জন্য আপনাকেই কাজ করতে হবে। তারা যা করেছেন, সেজন্য আপনাকে প্রশ্ন করা হবে না। আপনাকে প্রশ্ন করা হবে আপনি কী করেছেন তা নিয়ে।
সবশেষে আল্লাহর কথা হচ্ছে, এ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদেরকে বদলাও। আপনি ওসব ঐতিহাসিক নামগুলো জানেন কি না, সংখ্যাগুলো, তারিখগুলো বা ইয়াকুব (আ.)-এর সব সন্তানের নাম জানেন কি না, এসব নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করা হবে না। আপনাকে প্রশ্ন করা হবে আপনি আপনার সন্তানদের নিয়ে কী করেছেন?