📄 ব্যর্থ প্রজন্মের লক্ষণ
পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هُذَا الْأَدْنَى وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا وَإِنْ يَأْتِهِمْ عَرَضٌ مِثْلُهُ يَأْخُذُوهُ أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيثَاقُ الْكِتَابِ أَنْ لَا يَقُولُوا عَلَى اللهِ إِلَّا الْحَقَّ وَدَرَسُوا مَا فِيهِ وَالدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ.
'তাদের পর তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে এক (অধম) প্রজন্ম। যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে, কিন্তু তারা এই তুচ্ছ জগৎ-সামগ্রী গ্রহণ করে আর বলে- “আমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে." অথচ যদি তাদের কাছে এ রকম আরও সামগ্রী আসে-তাও তারা গ্রহণ করবে। তাদের থেকে কি কিতাবে অঙ্গীকার নেওয়া হয়নি, তারা আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া বলবে না? তারা তো কিতাবে যা আছে তা পাঠও করেছে। বস্তুত পরকালের আবাসই আল্লাহভীরুদের জন্য শ্রেয়। তোমরা কি তা বোঝ না?' সূরা আল আরাফ: ১৬৯
এই আয়াতে আল্লাহ এমন এক জাতির কথা বর্ণনা করেছেন, যে জাতি তাদের পূর্ববর্তীদের সকল আশা পূরণ করেছে। আরবিতে আপনি যখন বলেন,
'খালফ'-এর মানে এমন এক প্রজন্ম যেটি পরে এসেছে এবং আগের প্রজন্মের চেয়ে নিষ্ক্রিয় বা অপরিবর্তিত অথবা তার চেয়ে খারাপ। কিন্তু যখন আপনি বলেন, 'খালাফ' ওপরে ফাতহা তথা জবর যোগ করে, এর মানে হচ্ছে 'সফল প্রজন্ম'। এই আয়াতটি হচ্ছে-
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ
'অর্থাৎ একটি ব্যর্থ প্রজন্ম তাদের পরে দায়িত্ব নিল।' আমরা আমাদের বলি, আমাদের যুবসমাজ বলে, আমরা 'পরবর্তী প্রজন্ম'। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কী 'খালফ' নাকি 'খালাফ'? আমরা কি একটি সফল প্রজন্ম নাকি ব্যর্থ পরবর্তী প্রজন্ম? চলুন এই আয়াতের নিরিখে পরীক্ষা করে দেখি।
وَرِثُوا الْكِتَبَ.
প্রথমত, ব্যর্থ প্রজন্ম হলো যারা কিতাবটির উত্তরাধিকারী পেল। তারা ভাগ্যবান যে বইটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। অন্য অর্থে, তারা কোথাও গিয়ে মুসলিম হয়নি বা কিতাবটির অনুসন্ধান করেনি; বরং এটি পূর্ববর্তী প্রজন্ম থেকেই তারা পেয়েছে। আর কিতাবটি বংশানুক্রমে পাওয়া সত্ত্বেও-
يَأْخُذُونَ عَرَضَ هُذَا الْأَدْنَى.
তারা এই সর্বনিকৃষ্ট জীবনের অনুপ্রেরণাগুলো ধরে রাখে। এই নিকৃষ্ট জিনিস, এইখানের জীবন; এইসব তাদের মনকে কেড়ে নেয়। তারা এসব দুনিয়াবি জিনিস নিয়েই চিন্তা করে। তারা সারাক্ষণ এটাই ভাবে- পরবর্তী খেলা, পরবর্তী মুভি, পরবর্তী খেলনা, পরবর্তী গাড়ি, পরবর্তী বাড়ি, পরবর্তী ছুটি। শুধু এসব সম্বন্ধে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। পরবর্তী খাবার, পরবর্তী পোশাক, পরবর্তী জুতা- এসবই তাদের জীবনকে প্রাচীরের মতো ঘিরে থাকে।
আমি কিছুদিন আগে মুসলিম দুনিয়ার কিছু অংশে গিয়েছিলাম। আমি দেখলাম, সুবহানাল্লাহ! আমি তরুণদের দেখলাম। শুধু একটা শপিংমলে হেঁটে যাওয়ার সময়। আমার রীতিমতো কান্না পাচ্ছিল। তারা পুরোপুরি মেতে আছে, কী ব্র্যান্ডের তারা পরছে, কোন ব্র্যান্ডের ব্যাগ তারা নিচ্ছে এসব নিয়ে। তারা বেরই হয় এমনভাবে, যেন তারা আপনাকে দেখাতে পারে তারা একটা ব্র্যান্ডের নাম বয়ে নিচ্ছে। আপনি একটি ব্যাক্তি নন, আপনি হচ্ছেন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের একটি কোট হ্যাঙ্গার। আপনি আসলেই আর কোনো ব্যক্তি নন। এটা হলো-
يَأْخُذُونَ عَرَضَ هُذَا الْأَدْنَى.
'এটা হলো ব্যর্থ প্রজন্ম।'
وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا. আর এই বস্তুবাদী দুনিয়া থেকে, তারা এটা বলারও সাহস রাখে, 'ওহ আমাদেরকে মাফ করে দেওয়া হবে।'
سَيُغْفَرُ لَنَا. 'ওহ! আমাদের ঢেকে দেওয়া হবে। আমরাই বেঁচে যাওয়া প্রজন্ম।'
যখন জিজ্ঞেস করেন, 'কেন তোমাকে মাফ করে দেওয়া হবে? তোমার কী এমন গুণ আছে?' তারা তাদের পূর্ব প্রজন্মের সাফল্যের উদ্ধৃতি দেয়- وَإِنْ يَأْتِهِمْ عَرَضٌ مِثْلُهُ يَأْخُذُوهُ أَلَمْ يُؤْخَذُ عَلَيْهِمْ مِّيْثَاقُ الْكِتٰبِ أَنْ لَّا يَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ.
আর তাদেরকে যদি তাদের দ্বীন ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে কাজ করতে দেওয়া হয়, তারা এটার জন্য দৌড়ে যাবে। পরবর্তী হাল ফ্যাশনের দিকে ছুটে যাবে। বর্তমানে যারা হুজুগ-তারা হচ্ছে সেটার মধ্যে। যদি কোনো কিছু এদিকে যায়, সেটা তাদের বিশ্বাসের মূল ভিত্তির সাথে যায় কি যায় না, তাতে কিছু যায় আসে না; তারা শুধু এটার পেছনে দৌড়াবে। কোনটা ঠিক বা ভুল তা চিন্তাও করবে না। একটা নতুন ছবি এলো, 'ওহ এখানে শুধু কয়েকটা খারাপ দৃশ্য আছে। ভাষা বা অন্য কিছুর জন্য রেটিং দেওয়া আছে। কিন্তু কী হবে, সবাই তো দেখছে, চলো আমরাও দেখি!' তাদেরকে যদি আরও অন্য বিষয়বস্তু দেওয়া হয়, তারা সেটিকে জড়িয়ে ধরবে। أَلَمْ يُؤْخَذُ عَلَيْهِمْ مِيثَاقُ.
তারা কি কোনো চুক্তির মধ্যে নেই? আল্লাহ এটি সহজ ভাষায় বলে দিয়েছেন। তরুণ সম্প্রদায়, পরবর্তী প্রজন্ম স্পষ্টভাষী হওয়ার কথা ছিল। আল্লাহর কিতাবের স্পষ্টভাষী মানুষ।
وَ دَرَسُوا مَا فِيهِ. এবং তাদের কি এমন মানুষ হওয়ার কথা ছিল না, যারা বইটিতে কি আছে তা নিয়ে অধ্যয়ন করে? তাহলেই তরুণ সম্প্রদায় তাদের পূর্ববর্তীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারবে। তাদের প্রার্থনা তখনই পূরণ হবে, যখন তারা সেই বইয়ের তথ্য উদ্ঘাটন করবে; এর বাণী অনুযায়ী বাঁচতে চাইবে। প্রচণ্ড আবেগ সহকারে এই বাণী অন্যদের কাছে পৌঁছে দেবে।
وَالدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِيْنَ يَتَّقُونَ. এবং আখিরাতের বাড়ি তাদের জন্য উত্তম, যারা আসলেই নিজেদের রক্ষা করতে চায়।
أَفَلَا تَعْقِلُونَ. তাহলে আপনারা কেন এটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছেন না? আমরা কি সেই সম্প্রদায়, যারা শেষ বিচারের দিন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরে উঠাব নাকি নিচে ফেলে দেবো?
আমাদের মধ্যে বেশির ভাগই আরব বা আরবদের বংশধর নন। যারা আরব বংশ থেকে এসেছেন, আপনাদের ইসলাম এসেছে হয়তো সাহাবাদের সময় থেকে। এরপর এটি বংশানুক্রমে আপনার পর্যন্ত এসেছে। যেমন ধরুন, আমরা যারা এশিয়া থেকে এসেছি, যারা আফ্রিকা থেকে এসেছি, যারা ইউরোপ থেকে এসেছি বা পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্ত থেকে এসেছি, আমরা ভাবতে পারি দুই, তিন অথবা চার প্রজন্ম পূর্বে হয়তো তারও আগে, আমাদের পূর্বপুরুষরা মুসলিম ছিলেন না। কেউ একজন শাহাদাহ নিয়েছিলেন। কেউ একজন মুসলিম হয়েছিলেন। যখন তাঁরা মুসলিম হলেন, তাঁরা পূর্ববর্তী নবিদের কাহিনি শুনলেন; যারা ইসলাম শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং এরপর তাদের পরের প্রজন্মের একটু অবনতি ঘটল। এরপরের প্রজন্মের আরেকটু অবনতি ঘটল এবং অবশেষে ইসলাম হারিয়ে গেল। তাই পরে আরেকজন নবিকে আসতে হলো। যখন তাঁরা এসব কাহিনি শুনতেন, তাঁরা কাঁদতেন এবং বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমাদের সন্তান হবে, আমাদের সন্তান এখনও ছোটো। হে আল্লাহ! তারা যেন ইসলামের মধ্যে থেকেই বড়ো হয়। তাদের لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বলার ক্ষমতা দান করো, তারা যেন এই বার্তা বহন করতে পারে। আমাকে ইসলাম দ্বারা পুরস্কৃত করা হয়েছে। আমার পুরোটা জীবন আমি শিরকের মধ্যে ছিলাম। আপনি আমাকে ইসলামের পথে পরিচালিত করেছেন। দয়া করে আমার সন্তানকেও ইসলামের পথে পরিচালিত করুন।' এরপর সেই সন্তানদের সন্তান হলো তাদের সন্তানদের সন্তান হলো এবং এখন আমরা কয়েক প্রজন্ম ধরে মুসলিম সন্তান জন্ম দিচ্ছি।
আমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে প্রথম যিনি মুসলিম হয়েছিলেন, তিনি হয়তো বৌদ্ধধর্ম, হিন্দুধর্ম বা খ্রিষ্টধর্মের ছিলেন। সেগুলো ছুড়ে ফেলে তিনি মুসলিম হয়েছিলেন।
তিনি যদি আমাদের আজকের অবস্থা দেখতেন, তাহলে ভীষণ কষ্ট পেতেন। আমরা কি তাদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রেখেছি? তাঁদের প্রার্থনা অনুযায়ী জীবনযাপন করছি? নাকি তাদের উত্তরাধিকারিত্বকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছি? আমরা কাদের মতো হয়েছি? অমুসলিম পূর্বপুরুষদের মতো? নাকি আমাদের মুসলিম পূর্বপুরুষদের মতো? আমরা কী খাল্ফ নাকি খালাফ?
আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে খলফ (খালাফ)-এ পরিণত করেন। আমাদের সকলকে আমাদের পূর্ববর্তীদের গর্ব হওয়ার তাওফিক দান করেন যেন, শেষ বিচারের দিন আমরা তাঁদের দেখতে পাই। আমি সেই ব্যক্তির সাথে দেখা করতে চাই, যিনি আমাদের বংশে প্রথম শাহাদাহ গ্রহণ করেছিলেন। কারণ, আমি জানি আমাদের পরিবার এসেছে আফগান অঞ্চল হতে। তাই তাঁরা হয়তোবা সেই সময় বৌদ্ধ ছিলেন। কেউ একজন শাহাদাহ গ্রহণ করে মুসলিম হয়েছিলেন। আমি তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে চাই এবং আমি তাঁদের বলতে চাই, আমি তাঁদের বলার মতো ক্ষমতা রাখতে চাই- 'আমরা সেই বার্তা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বহন করে এসেছি আপনার থেকে। আল্লাহ আপনাকে সেই ব্যক্তি বানিয়েছেন। তাই যা কিছু ভালো আমি আমার জীবনে করেছি এবং আমার সন্তানরা করেছে সব আপনার কাছেই এসেছে।' এটাই সেই আনন্দ যেটা শেষ বিচারের দিন আমরা পাব, আমাদের পূর্ববর্তীদের সাথে পুনর্মিলনীতে।
📄 সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের গুরুত্ব
আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আজকাল অনেক উদ্বেগের বিষয় আছে। প্রথম চিন্তার বিষয় তারা কথা বলার মানুষ খুঁজে পায় না।
এটা তাদের বিপথে যাওয়ার প্রধান কারণ। আপনার সন্তানকে আপনি স্কুলে পাঠান; ধরে নিই তারা জেনারেল স্কুলে যায়। অধিকাংশ মুসলিম অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের জেনারেল স্কুলে পাঠিয়ে থাকেন। কারণ, যেকোনো কারণেই হোক তাদের সন্তানদেরকে ইসলামিক স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য বা সুযোগ হয়ে উঠে না। আপনি বাংলাদেশের যেখানেই থাকুন না কেন, ক্লাস ফাইভ-সিক্সে উঠতে উঠতেই তারা বিভিন্ন নোংরা শব্দ শিখে ফেলে। তারা খুব জঘন্য ভাষা আয়ত্ত করে ফেলে। তারা কিছু বাজে ওয়েবসাইটে ঢোকা শিখে যায়। তারা তাদের স্মার্টফোন, ট্যাব, আইপ্যাড, আইফোনে বিভিন্ন নোংরা জিনিস ডাউনলোড করা শেখে। তারা কম বয়সেই এসবে পারদর্শী হয়ে যায়। যেসব জিনিস আপনি ২৫ বছর বয়সেও শেখেননি, সেগুলো তারা ১২ বছর বয়সেই জানতে পারে। এটাই বাস্তবতা। এগুলোই এখন হচ্ছে।
আপনারা ফেসবুক ইউটিউব সম্পর্কে জানেন এখন। আপনার সন্তানরাও এসব ওয়েবসাইটে যায়। সেখানে অচেনা শিকারিরা আপনার কিশোরী মেয়ে বা কিশোর ছেলের সাথে কথা বলতে পারে। একসময় তারা সম্পর্কে জড়িয়ে যায়, আর একে অপরের সাথে দেখাও করে।
এরপর বিভিন্ন কিছু ঘটে যায়। এটা বর্তমানে আমাদের মুসলিম ছেলেমেয়েদের বাস্তবতা। এগুলোই ঘটছে। এসবের ব্যাপারে আমাদেরকে চোখ বুজে থাকলে চলবে না, আমাদের চোখ খুলতে হবে।
আপনি হয়তো বলতে পারেন, 'না না, আমার সন্তানরা এমন না।' তাহলে আমি বলব- প্লিজ, জেগে উঠুন!
এসব ব্যাপারে প্রাথমিক সমাধান হলো বাসায় ওপেন অ্যাক্সেস ইন্টারনেট রাখবেন না। বিশেষ করে ১৪ বছরের ছোটো বাচ্চা থাকলে, এটা রাখবেন না! এটা একটা ভয়ানক কাজ। তাদের ল্যাপটপ দেবেন না। দিতে চাইলে এমন মোবাইল দেবেন- যেটাতে কেবল ফোন করা যায়, ইন্টারনেট চালানো যায় না। নতুবা আপনি নিজেই বিপদ ডেকে আনছেন। এ নিয়ে আপনিই পরবর্তী সময়ে আফসোস করবেন। আপনি ভাবছেন, এগুলো আপনি তাদের ভালোবেসে কিনে দিয়েছেন; আসলে আপনি তাদের ধ্বংস করছেন। তারা এখনো অত বড়ো হয়নি যে নিজেরাই বুঝে নেবে, এটা আমার করা উচিত নাকি উচিত না। আপনি ভালো পরিবার থেকে এসেছেন বলে ধরে নেবেন না যে, তারা একাই সব ভালো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে। প্লিজ এই ফাঁদে পড়বেন না। আল্লাহর দোহাই এসব জিনিস নিয়ে নিন। আপনার সন্তানদের বিনোদনের জন্য অনেক পথ আছে।
একটা সময় আপনার সন্তান বয়ঃসন্ধিতে পা রাখে। আমি বিভিন্ন দেশে ঘুরে যেটা দেখি, অনেক অভিভাবক আমার কাছে এসে বলেন, 'আমার একটা টিনেজ মেয়ে আছে', আমার একটা টিনেজ ছেলে আছে, 'আমি চাই আপনি তার সাথে কথা বলেন।' এ রকম ঘটনা আমার সাথে শতবার ঘটেছে। আক্ষরিক অর্থেই শতবার ঘটেছে।
আপনি জানেন, কেন তারা আমার কাছে আসে? বয়ঃসন্ধিতে এলে তারা স্বাধীন হয়ে যায়। যখন তারা স্বাধীন হয়ে যায়, তখন তারা আর আপনার কথা শোনে না। যখন তারা আপনার কথা শোনে না, তখন আপনি এমন কাউকে চান যার কথা তারা শুনবে।
নৌকা ইতোমধ্যেই ভেসে গেছে। যখন তারা প্রায় প্রাপ্তবয়স্কে পরিণত হয়নি, তখন আপনার হাতে সুযোগ ছিল। আমাদের বুঝাতে হবে, আমরা এখন আর
আগের পৃথিবীতে নেই। ছোটো থাকতে আপনি তাদের সাথে যে রকম আচরণ করতে পারতেন, এখানে তেমনটি পারবেন না।
আগে তাদেরকে আপনার ইচ্ছেমতো বকতে পারতেন, মারতে পারতেন। সবাই এমনটিই করে এসেছে। আর এখন আপনি তাদের সামান্য বকুনি দেবেন আর তারা বলে বেড়াবে, 'আরে আমার বাবা পুরো ফালতু একটা মানুষ'। তারা তাদের বন্ধুদের আপনার সম্পর্কে এ রকম বলে বেড়াবে।
আমি একটা সানডে স্কুল চালাতাম। সেখানকার হেড ছিলাম। কারিকুলাম ঠিক করা, আকিদা বা বই অর্ডার করা সেখানে আমার কাজ ছিল না। আমার প্রাইমারি কাজ ছিল বাচ্চাদের পেছনে গোয়েন্দাগিরি করা। তারা স্কুলে বিরতির সময় কী নিয়ে কথাবার্তা বলে- সেগুলো শোনা। 'আমার মা আমাকে NC-১৭ ভিডিও গেম কিনে দিয়েছে'। 'আমার গ্রান্ড থেফট অটো আছে', 'তুমি ওই মুভিটা দেখেছ, ওটা PG-১৩! ওটা দেখতেই হবে!' বা 'মুভিটা Rated-R আমি দেখেছি। সেটার ডিভিডিও আমার কাছে আছে।'
বাচ্চারা এসব নিয়েই কথা বলছে। তারা আপনার সন্তানদের নষ্ট করে ফেলছে। আর একে আপনি ভালোবাসা বলেন? ইবরাহিম (আ.) কি কখনো এগুলোর কাছাকাছিও কোনো কিছুর জন্য অনুমতি দিতেন? আজ এগুলো বাচ্চাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। প্লিজ চোখ খুলুন! সত্যিই, চোখ খুলুন!
আমরা সন্তানদের এমন সব জিনিসের সামনে উন্মুক্ত করে দিচ্ছি, যা তাদেরকে ধীরে ধীরে খারাপের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মিডিয়াতে। যেই মুভিটা ১০ বছর আগে ১৩ বছর বয়সের নিচে অনুমোদিত ছিল না, সেটা এখন অনুমোদিত হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড নিচে নেমে গেছে। আমি না; পশ্চিমারাই এসব নিয়ে কথা বলছে। এখন সমকামিতার মতো বাজে বিষয়গুলো এমনকী কার্টুনেও সাধারণ হয়ে গেছে। টম অ্যান্ড জেরিও আর আগের মতো নেই। সবকিছু বদলেছে।
চারিদিকে কী হচ্ছে, সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের সন্তানরা কী দেখছে, তারা কী ভাষায় কথা বলছে।
যখন আপনি মসজিদে যান তখন আপনি দাড়িওয়ালা মানুষদের দেখেন; তারা নামাজ পড়ে, ভিন্নভাবে কথা বলে। আপনার বাচ্চারা কী তাদের বেশি দেখতে পায় নাকি বাইরের পৃথিবীকে? তারা যেটা বেশি দেখতে পায়,
সেটাকেই স্বাভাবিক ধরে নেয়। তাদের কাছে এটা স্বাভাবিক না, ওইটা স্বাভাবিক। আর এটাই আসল সমস্যা। তারা এগুলোকে স্বাভাবিক মনে করে না। তারা বাইরের পৃথিবীকে স্বাভাবিক মনে করে।
আমরা কীভাবে সন্তানদের জন্য একে পরিবর্তন করতে পারি? প্রথমে এসব বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে। তারপর এসব সমাধানের ব্যাপারে কথা বলা যাবে।
আমাদের ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে প্রথম চিন্তার বিষয় কী? তারা কথা বলার জন্য মানুষ পায় না। যখন আপনার সন্তান পাবলিক স্কুলে যায়, আর একটা ছেলে আর মেয়েকে একসাথে দেখে বা কোনো মেয়ে আপনার ছেলের কাছে এসে বলে, 'আমার সাথে সিনেমা দেখতে যাবে?' অথবা 'আমরা একটা রেস্টুরেন্টে খেতে যাচ্ছি, তুমি যাবে? তুমি দেখতে অনেক কিউট।' এসব আপনার ক্লাস ফাইভের বা সেভেনের সন্তানের সাথেই হচ্ছে। তারা কি বাসায় এসে আপনার সাথে এগুলো নিয়ে কথা বলবে না? 'আব্বু, একটা মেয়ে না আমাকে বলেছে আমি দেখতে কিউট।' 'কি! তোমাকে কি এইজন্যই পড়ালেখা করতে পাঠিয়েছি?' ঠাশ! ঠাশ!
এই বাচ্চা জানে যে, তাঁর বাবা-মা এগুলো শুনে মেনে নিতে পারবে না। কিন্তু এসব কথা তো কারও না কারও সাথে শেয়ার করতে হবে। সে কাকে এগুলো বলবে? সে তার বন্ধুদের সাথে এগুলো শেয়ার করবে। আর জেনারেল স্কুলে তার বন্ধুরা কমবেশি তাদের মতোই। তারা তাকে ইসলামিক পরামর্শ দেবে নাকি অনৈসলামিক পরামর্শ দেবে? 'আরে চালিয়ে যা দোস্ত' তারা এ রকম পরামর্শই দেবে। আপনি বেশি কঠোর বলে, তারা আপনাদের থেকে তাদের বন্ধুদের সাথে বেশি খোলামেলাভাবে চলবে। আপনি তাদের সাথে কথা বলেন না। আপনি তাদের জন্য সেই দরজাটা খোলা রাখেননি। কারণ, আপনি তাদের ওপর সেই আধিপত্য দেখাতেন, যা আপনার বাবা আপনার ওপর খাটিয়েছিল। কিন্তু সেটা তো ছোটো বয়সে পেরেছেন ভাই, এখন সবকিছু ভিন্ন। আমাদেরকে সন্তানদের বন্ধু হতে হবে। তারা যেন খোলামেলাভাবে কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
এই সমস্যা আমারও আছে। আমি তিন মেয়ের বাবা। আর আমি অনেকটা রক্ষণশীল বাবা। তাই যখন আমার মেয়ে প্রি-স্কুলে ছিল, তখন একটা ছেলে তাঁর পাশে বসেছিল। আর সে বাড়ি ফিরে বলেছিল, 'হামজা আজকে আমার
পাশে বসেছিল আর আমরা একসাথে রং করেছিলাম।' আমি বললাম, 'কী?' তখন আমার স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুমি এখান থেকে যাও, আমি ওর সাথে কথা বলছি।' কারণ, আমি যদি এখন রাগ দেখাই তাহলে সে বুঝে ফেলবে, আমার বাবা হামজার ব্যাপারে কিছু শুনতে পছন্দ করে না।
তাই এর পরে হামজা যদি কোনো কিছু বলে বা করে তখন কি আমার মেয়ে সেটা আমাকে বলবে? না। সুতরাং সেটা বলে আমি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছি।
আমাদের এসব ব্যাপার মোকাবিলা করা শিখতে হবে। এর কিছু কৌশল আছে। আমাদেরকে সন্তানদের এসব ব্যাপারে ধৈর্য ধরতে হবে। এটা তাদের দোষ না। আমরাই তাদের সেই স্কুলে পাঠিয়েছি। আমরাই তো তাদের সেই পরিবেশে পাঠিয়েছি। তারা এটা চায়নি। তাই তারা যদি খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, সেটা কাদের কারণে হবে? নিশ্চয়ই আমাদের কারণে। তাই আমাদের নিজেদেরও এসবের দায়িত্ব নিতে হবে। 'তুমি এমন কথা বলতে পারলে?' 'তুমি কোত্থেকে এসব শব্দ শিখেছ?' এসব বলেই পার পাওয়া যাবে না। 'আরে তোমরাই তো আমাকে এই স্কুলে পাঠিয়েছ, তোমরাই আমাকে এমন অবস্থায় ফেলেছ', 'তোমরাই আমাকে ওই মুভিটা দেখতে দিয়েছ', 'তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করোনি, আমার বন্ধুরা কেমন, তারা কোথায় থাকে, আমরা একসাথে কী করি।' 'তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করোনি, এটা তোমাদের সমস্যা।'
তাই আপনার সন্তানদের জন্য কথা বলার দরজা খুলে দিন। দেরি হওয়ার আগেই এটা করুন। অনেক ছেলেমেয়েরা তাদের ঘর ছেড়ে চলে গেছে। আমাদের অনেক মেয়েরা তাদের বয়ফ্রেন্ডের সাথে পালিয়ে গেছে। আমি জানি, এসব শুনতে খুব খারাপ লাগে, কিন্তু এটাই বাস্তবতা। আমাদের এর মুখোমুখি হতে হবে। আমাদের অনেক ছেলেদের অন্যের সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। এটা পুরো অসুস্থ বাস্তবতা। শুধু কাঁদলেই চলবে না, আমাদের এসব বিষয় সমাধান করতে হবে।
তাই প্রথম কাজ হলো- সন্তানদের জন্য কথা বলার দ্বার খোলা রাখা।
দ্বিতীয় ব্যাপারটা টিনেজ ছেলেমেয়ের জন্য।
আর এখানে আমি ইয়াকুব (আ.)-এর উদাহরণ দেবো। তিনি একজন অসাধারণ নবি। ওনার ছেলেরা কি কোনো অন্যায় কাজ করেছিল? হ্যাঁ। সেটা কি কারও মনে আছে? তারা তাদের ভাইকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। বনের মধ্যে গিয়ে তাকে কুয়ায় ফেলে দিয়েছিল আর নকল রক্তমাখা জামা নিয়ে এসেছিল।
ইয়াকুব (আ.) কি বুঝতে পারেননি যে, তারা মিথ্যা বলেছিল? এখানে কয়েকজন তরুণ ছেলে আছে, একজন পিতা আছেন। তিনি জানেন যে, তাঁর ছেলেরা খুব খারাপ কিছু করেছে। তিনি কি বলেছিলেন, 'বদমাইশের দল! এক্ষুনি তাকে নিয়ে এসো!' আপনি কি ওনাকে এমন কিছু বলতে দেখেছেন? না; বরং তিনি ধৈর্য ধরেছিলেন। আমি যখন তাঁর এমন সাড়া দেখি, তখন ভাবি তিনি কেমন পিতা ছিলেন! তিনি তাদের বকলেন না, ধমক দিলেন না।
কেন বলেন তো? কারণ, তিনি একজন জিনিয়াস পিতা ছিলেন। একজন সচেতন পিতা জানেন যে, কোন বয়স পর্যন্ত সন্তানদের উপদেশ দেওয়া যায় আর কোন বয়সে তারা স্বাধীন হয়ে যায়; যখন তাদের কিছু বললেও তারা শুনবে না। তিনি জানেন, সেই অবস্থায় আপনি কী করতে পারেন? সাবরুন জামিল। সুন্দরভাবে ধৈর্য ধরার কাজটুকুই করতে পারেন। সময় আগেই পার হয়ে গেছে। তাই আপনার দায়িত্ব হলো, এর আগেই তাদের প্রতি খেয়াল রাখা। এখন তারা যদি সেই বয়স পার করেই ফেলে, তখন আপনি সর্বোচ্চ যা করতে পারেন তা হলো- তাদেরকে ভালো সঙ্গীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
আর মুসলিম তরুণ সংস্থাগুলোকে উৎসাহ দিন। এরাই আমাদের সন্তানদেরকে দাওয়াহ দেওয়ার হাতিয়ার। আমরা তাদের সাহায্য না করলে তারাও হারিয়ে যাবে। আপাতত ফিকাহের বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসুন। তারাবিহ ৮ রাকাত হোক বা ২০ রাকাত, আপনার সন্তান এসবকে পাত্তা দেয় না। অবস্থার উন্নতি হলে তখন সেগুলো নিয়েও আলোচনা করা যাবে। এখন সময় ভালো যাচ্ছে না। আমাদের সন্তানেরা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটাকেই অগ্রাধিকার দিন।
📄 আমার সবচেয়ে প্রিয় দুআ
যে দুআটির কথা বলব, দুটো কারণে তা আমার অত্যন্ত পছন্দের দুআ। এক. আমি বিয়ে করেছি এবং আমার স্ত্রী ও সন্তান আছে। দুই. পৃথিবীর বর্তমান সমস্যার কারণে আমাদের সবাইকে এই দুআর ক্ষমতা বুঝতে হবে।
এই পৃথিবীর মৌলিক প্রতিষ্ঠান পরিবার, আজ বিপদের সম্মুখীন। এখানকার অধিকাংশ মানুষ এমনকী মুসলমানরাও এই সমস্যা থেকে নিরাপদ নয়। যেই ঝড় থেকে বাঁচতে চাই, সেই ঝড় আমাদের সবার বাড়িতেই। মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। এইসব চিৎকার চেঁচামেচি, নাম ডাকাডাকি, হতাশা, দুঃখ, অপমান, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যকার বিভেদ থেকে বাঁচার জন্য।
আমাদের পরিবার বিভক্ত হচ্ছে, ভাই ভাইয়ের সাথে কথা বলে না, পিতা- মাতা সন্তানের সাথে কথা বলে না। আমি সম্পূর্ণ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, যারা ইসলামিক কাউন্সেলিং নিয়ে কাজ করেন, তাদের কাছে কোনো না কোনো মা, বাবা, স্বামী বা স্ত্রী বলেছে- আমি আমার সন্তানের সাথে কথা বলতে পারি না। সে আমার সাথে চিৎকার করে, আমরা কথা বলি না। সে এই কাজ করছে, আমি জানি না কীভাবে তাকে বিরত রাখব। আমার স্বামী এই করে, আমার স্ত্রী এই করে ইত্যাদি ইত্যাদি।
সুবহানাল্লাহ, এই সংকট বাড়ির ভেতরে। পরিবার এখন পরিণত হয়েছে এক দুঃখ, হতাশা, রাগের জায়গা। মানুষ যেখান থেকে পালানোর চিন্তা করে। এখানে আল্লাহ আমাদের অত্যন্ত উপযুক্তভাবে এবং সুন্দরভাবে চাইতে বলেছেন যে, পরিবারই হবে আশ্রয়স্থল; বাইরের পৃথিবী হলো ঝড়ের জায়গা। তুমি বাইরে যত দুর্ভোগ পাও, আশ্রয় খুঁজবে তোমার ঘরে। এই ঘর তোমাদের নিরাপদ দুর্গ। এখানে আছে তোমার সঙ্গী-সঙ্গিনী-সন্তান, যাদের দেখলে তোমার দুশ্চিন্তা দূর হয়। কিন্তু এখন হয় উলটো। পরিবারের লোকদের দেখলে আমাদের দুশ্চিন্তা শুরু হয়।
আপনারা জানেন, মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ সম্পর্কে। আমি মনে করি, সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ হলো সন্তানের জন্য মায়ের আবেগ। এটাই সবচেয়ে শক্ত বন্ধন। আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো বিবাহিত। বিয়ের পর প্রথমদিকে আপনারা একে অপরের প্রতি এতটাই আচ্ছন্ন ছিলেন যে, হয়তো বলেছেন, 'তুমি সত্যিই অসাধারণ। আমার বিশ্বাস হয় না তুমি আমার স্বামী' ইত্যাদি অনেক অদ্ভুত আচরণ। এগুলো অন্যের কাছে হাস্যকর লাগে। স্বামীর মুখে সব সময় একটা হাসি লেগেই থাকে, তেমনি স্বামীর নাম যখন নেওয়া হয় স্ত্রী লজ্জা পায়।
দশ বছর সংসারের পর এমন কী হয় যে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের নাম শুনলে বিরক্ত হন?
মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক যে সবচেয়ে আবেগি, তার একটা উদাহরণ দিই। ধরুন, স্বামী তার স্ত্রীর সাথে কথা বলছে। পাশের ঘরে বাচ্চা একটু কান্নার শব্দ করল। আর অমনি মা দৌড়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন বাচ্চার অবস্থা দেখতে। স্বামী হয়তো কথার মাঝখানে ছিল, খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছিল; কিন্তু বাচ্চার কান্নার শব্দ শোনার সাথে সাথে মা আর সেখানে থাকতে পারল না। মা আর সন্তানের মধ্যে কোনো কিছুই আসতে পারে না।
পাঠকদের মধ্যে যারা মা তাদের বলছি, আপনারা কি কল্পনা করতে পারেন, মুসা (আ.)-এর মায়ের মনের অবস্থা? তিনি শিশুকে পানিতে রেখে দিলেন। আপনি আপনার সন্তানকে সামান্য সময়ের জন্য ঘরের বাইরে রাখলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার স্বামী ফোন করা শুরু করবেন। কোথায় সে, তুমি কি তাকে দেখেছ, তাকে দেখেছ কি করে সে? আপনি আধা ঘণ্টা দেরি করে সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে গেলেই আপনার কেমন মনে হয়? আমি জানি কেমন লাগে।
আমিও একবার আমার সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে দেরি করেছিলাম। আমি জানি, তখন আমার স্ত্রী কী ধরনের মানসিক অস্থিরতার মধ্যে ছিল।
মাঝে মাঝে এমনও হয়, বাসার ভেতরেই আছেন কিন্তু সন্তানকে দেখতে পাচ্ছেন না। তখনিই বলে উঠেন, 'কোথায় গেলে বাবা সামিন, কোথায় তুমি?' 'আমি বাথরুমে মা, চিন্তার কিছু নেই। আমি এখানেই আছি।'
এখন মূসা (আ.)-এর মায়ের মনের অবস্থা চিন্তা করে দেখুন। তিনি তাঁর সন্তানকে এমন জায়গায় ছাড়ছেন যেখানে দৃশ্যত মৃত্যু অপেক্ষমাণ। কারণ, পেছনে যা আছে তা আরও নিষ্ঠুর শত্রুসৈন্য। তিনি জানেন না, কী হবে তাঁর সন্তানের সাথে। কী বিপদ অপেক্ষা করছে জানেন না। তারপরও কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করে পানিতে ছেড়ে দিলেন।
সুবহানাল্লাহ!
আরও দুজন নারীর কথা বলি। আরেকজন নারীও বিমর্ষ মানসিক অবস্থায় ছিলেন। এই কাহিনির মধ্যেই। একজন সত্যিকার খারাপ মানুষের সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। ফেরাউনের সাথে। আপনারা জানেন, নারীরা মাঝে মাঝে কী কঠিন পারিবারিক পরিস্থিতে থাকে। সাধারণত আমাদের মতো সমাজে আপনি চাইলেই দরকারি নম্বরে কল করতে পারেন। খারাপ কিছু হলে পুলিশকে কল করতে পারেন। এখন এই নারীর বেলায় আমরা কোনো শারীরিক অত্যাচারের কথা জানি না; তবে কুরআন আমাদের স্পষ্ট মানসিক অত্যাচারের কথা বলেছে। তা এত বেশি যে, তাকে সাহায্যের আবেদন পর্যন্ত করতে হয়েছে। তিনি একটা ভয়ংকর সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন। আবার তিনি পুলিশকেও বলতে পারছিলেন না। কারণ, তাঁর স্বামী ফেরাউন ছিলেন পুলিশের মালিক। তিনি সরকারের কাছেও অভিযোগ করতে পারছিলেন না। কারণ, ফেরাউন তখন নিজেই সরকার। ফেরাউন ছাড়া তার কোনো দিকে যাওয়ার উপায় নেই। তিনি ঝড়ের মধ্যে ছিলেন এবং কোনো আশ্রয়স্থল পাচ্ছিলেন না। কিন্তু যখন এই বাচ্চাটি ভেসে এলো, তিনি কি বলেছিলেন জানেন? তিনি শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন- 'কুররাতু আইনিন লি' অর্থাৎ সে হবে আমার চোখের প্রশান্তি। এই ঝড়ে সে হবে আমার আশ্রয়স্থল। সে হবে আমার একমাত্র আনন্দের উৎস। কারণ, আমি অত্যন্ত দুঃখের মধ্যে আছি। এই সন্তানহীন নারী একটি শিশু পেল।
আর মুহূর্তেই তাঁর সমস্যা হারিয়ে গেল। এমনকী ফেরাউন থেকেও নিজেকে আলাদা করলেন। সে শুধু তাঁর জন্য চোখের শান্তি হবে। অন্য কারও জন্য না। ফেরাউনের জন্য না।
আর একটি বিষয়। কেন এই দুআ এত সুন্দর, শক্তিশালী ও অলংকারপূর্ণ? আপনারা জানেন, যখন কোনো মা তার সন্তানকে হারান, যা এই ক্ষেত্রে ঘটেছে এবং তিনি যখন আবার সে সন্তানকে ফিরে পান, আপনারা কি ভাবতে পারেন, ওই মায়ের অনুভূতি? আনন্দ অশ্রু? আপনারা কি ভাবতে পারেন, সে সময়ের আবেগ? এখন বুঝুন কীভাবে আল্লাহ বর্ণনা করলেন সে আবেগ।
আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহের কথা মুসা (আ.)-কে বললেন- فَرَجَعْنَاكَ إِلَى أُمِّكَ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ. 'আমি তোমাকে তোমার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম। যাতে করে তাঁর চক্ষু শীতল হয় এবং সে ব্যথিত না হয়।' সূরা ত্বহা : ৪০
যাতে তাঁর নয়ন জুড়ায়। আল্লাহ এখানে বর্ণনা করেছেন, সবচেয়ে আশ্চর্যজনক আনন্দের কথা। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক শান্তির, মাতৃ-হৃদয়ের সবচেয়ে অবর্ণনীয় অনুভূতি। কী ধরনের বাক্যরীতি তিনি ব্যবহার করলেন? নয়ন জুড়ায়। অত্যন্ত মজবুত এই ভাব প্রকাশের জন্য। তাই আমরা আল্লাহর কাছে আবেদন করি, আমাদের স্ত্রী সন্তান যেন আমাদের নয়ন জুড়িয়ে দেয়।
আপনারা যখন কেউ বলেন, আমি বিয়ে করতে চাই, তখন আল্লাহর কাছে আরেকটু বাড়িয়ে বলুন, 'আল্লাহ! আমি এমন স্বামী/স্ত্রী চাই, যাকে দেখলে আমার নয়ন জুড়াবে; আর আমাকে দেখলে তার।'
📄 দেশি বিয়ে
বিয়ে পার্টি নিয়ে আপনাদের চিন্তার খোরাক জাগানোর জন্য কিছু কথা বলি।
খুবই সহজ কিছু উদাহরণ দিচ্ছি। আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে আজকাল লাখ লাখ টাকা লোন নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করা হয়। এতে থাকে আটটি পর্ব। প্রতিদিন একটা করে। পানচিনি, মেহেদি রাত, হলুদ সন্ধ্যা, ওয়ালিমা, বৌভাত ইত্যাদি ইত্যাদি।
অথচ ইসলামে নিকাহ মানে তো কেবল নিকাহ আর ওয়ালিমা। ব্যস শেষ! কত সহজ। কিন্তু না! আমাদের সব অনুষ্ঠান করতেই হবে। আর কেনই-বা করতে হবে? কারণ, আপনার কাজিনের বিয়েটা হয়েছিল সেই রকম করে। আমরা যদি সে রকম একটা উৎসবের আমেজ এনে দিতে না পারি, তাহলে সমাজে মুখ দেখাব কেমন করে? আপনার আংকেল কী বলবেন, আপনার দাদি কী বলবেন, অমুক কী বলবে, তমুক কী বলবে? মানুষ কী বলবে, তা ভেবে আপনি এতটাই বিচলিত যে, ক্রেডিট কার্ডের বিশাল ঋণের বোঝা নিতে আপনি প্রস্তুত। এই নতুন সংসারের শুরুটাই হলো ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে। আর তারা বিয়েতে উপহার হিসেবে যা পায়, এই ঋণ পরিশোধ করতেই তাদের দুই থেকে তিন বছর লেগে যায়।
আপনারা কি জানেন, দ্রুত বিয়ে ভেঙে যাওয়ার একটা অন্যতম প্রধান কারণ হলো অর্থনৈতিক চাপ? অথচ আপনারা বিবাহিত জীবন শুরু করেন ঋণের বোঝা নিয়ে। এই বাড়তি কষ্ট আপনাকে কে নিতে বলেছে?
নবিজি -এর সুন্নাহ অনুসরণ করুন। তা কত সহজ ও নির্ভেজাল!
আমার একজন খুব ভালো বন্ধু ইমাম ইশা। তিনি রুজভেল্ট লং আইল্যান্ডে থাকেন। আমি একবার তার মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য গিয়েছিলাম। আমি মাগরিবের নামাজের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সেই সময়ে এক ভাই মসজিদে ঢুকে বললেন, 'শেখ, আপনি কি একটা নিকাহ পড়াতে পারবেন?' ইশা বললেন, 'হ্যাঁ পারব।' 'তাহলে আমি মাগরিবের পরে আসি?' ইশা বললেন, 'আসুন, কোনো সমস্যা নেই।' আমি ভাবছিলাম, এমন বিয়ে দেখা দরকার। মাগরিবের পর কিছু মানুষ দলবেঁধে মসজিদে ঢুকলেন। সম্ভবত ৮ জন হবে। যার বিয়ে হওয়ার কথা তার গায়ে রক্তের দাগ ভরা একটা অ্যাপ্রোন। এশার নামাজের পর ওয়ালিমা হবে। একটু আগে সেই ওয়ালিমার পশু তিনি নিজেই জবাই করে এসেছেন। মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছিল। আমরা কোলাকুলি করলাম। আনন্দ করলাম। ব্যস শেষ! এটাই বিয়ের অনুষ্ঠানের নিয়ম। আমাদের দ্বীন এতটাই সরল।
নিকাহ এই দ্বীনের একটি সৌন্দর্য। সত্যিই এটা এক সৌন্দর্য। কিন্তু যখন আমরা নিজেরাই ব্যাপারটিকে জটিল করে ফেলি, আমাদের সকল সমস্যার শুরু হয় সেখানেই। ফলে সৃষ্টি হয় মানসিক চাপ, কদর্যতা।
আপনি মনে করে দেখুন, বিয়ের অনুষ্ঠানে কতগুলো ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল! কত বিতর্ক, কত নোংরামি! একজনের এই সমস্যা তো আরেকজনের এই অভিযোগ। কেন তাকে হোটেল রুমে থাকতে দেওয়া হলো না? আমরা কেন প্রথম সারির চেয়ারে বসতে পারলাম না? আর একজন আপনার পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেছিল। অযথা ফালতু কিছু বিষয়! আমরা নিজেরাই নিজের জীবনকে দুঃসহ করে ফেলি। অথচ শারিয়াহ চায় সহজ কিছু।