📄 আমার স্ত্রী হিজাব করছে না, কী করব
আমাকে প্রশ্ন করা হয়, আমার স্ত্রী হিজাব করছে না- আমি এখন কী করব? প্রথম কথা হচ্ছে, তাকে আর হিজাব করার ব্যাপারে কিছুই বলবেন না। হিজাব বিষয়ে তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিন। একেবারেই বন্ধ করে দিন। কারণ, প্রায় সময়ই দেখা যায়, নিজ পরিবারের সদস্যরাই তার পরিবারে দাওয়াহ দিতে সবচেয়ে অকার্যকর পন্থা অবলম্বন করছে। তারা অপরিচিত কারও কাছ থেকে কথা শুনতে বেশি আগ্রহী। তার উপদেশ গ্রহণ করতে রাজি, কিন্তু নিজের পরিবারের কাছ থেকে তা শুনতে চাইবে না। এটা কিন্তু আমাদের মতো বক্তাদেরও সমস্যা। তারা সারা দুনিয়াকে দাওয়াহ দিতে পারে। কিন্তু দেখা যায়, বাড়িতে শোনানোর জন্য তারা অন্য কারও টেপ বা অন্য কারও সিডি নিয়ে আসে। কারণ, পরিবারের সদস্যরা বলতে থাকে- 'তোমার কথা আর শুনতে চাই না! অনেক শুনেছি!'
আপনাকে তাই বুঝতে হবে, যখন পরিবারের কাছে দ্বীনের শিক্ষা দেবেন, তখন আপনাকে একটু কৌশলী হতে হবে। আপনাকে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। খুব দক্ষ একজন বক্তা খুঁজে বের করুন; যিনি আখিরাত ও শেষ বিচারের দিন সম্পর্কে বলেছেন। হিজাব না করাটা আপনার স্ত্রীর সবচেয়ে বড়ো সমস্যা না। হিজাব কেবল রোগের লক্ষণ, আসল অসুখ নয়। তার অসুখ হলো দুর্বল ঈমান। বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তার ঈমানকে চাঙা করুন। আর এজন্য সবচেয়ে শক্তিশালী বই হচ্ছে আল-কুরআন।
কুরআনের যে আয়াতগুলোতে মানুষকে স্মরণ করার কথা বলা হয়েছে, সেখানে কী কী নিয়ে কথা বলা হয়েছে বলেন তো? আখিরাত নিয়ে। অতীতের বিভিন্ন অবাধ্য জাতির করুণ পরিণতি নিয়ে। এর চেয়ে শক্তিশালী উপদেশ আর হয় না। এসব আয়াতের মেসেজ হচ্ছে, 'যেই মানুষেরা উপদেশ গ্রাহ্য করেনি, দেখ তাদের সাথে সাথে কী হয়েছিল। দেখ, তাদের সাথে কী হতে যাচ্ছে।' তাই না? আপনি যদি আপনার পরিবারে এমন অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন যে, প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট আপনারা একসঙ্গে কুরআনের কথা শুনবেন, ভালো কোনো বক্তার কথা শুনবেন, তাহলেই যথেষ্ট। আজকাল অসংখ্য বক্তাদের রিসোর্স সহজেই পাবেন। এগুলো কাজে লাগান।
আরেকটি বিষয়। কারও কারও বেলায় দায়ি হিসেবে আপনি হয়তো সেরা নন। কেউ হয়তো অন্য কারও কাছ থেকে সহজে উপদেশ নেবে। আমরা সবাইকে দাওয়াহ দিতে পারব না। হয়তো কিছু কিছু মানুষের জন্য আমাদের পদ্ধতি কার্যকর, কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আমরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সবারই আলাদা আলাদা অনুসারী আছে। ইনশাআল্লাহ, এই কথাগুলো আপনার স্ত্রীর ব্যাপারে সাহায্য করবে।
আরেকটা কথা। আমার মন বলছে, আপনার স্ত্রীর হিজাবের ব্যাপারে কোনো যুক্তিগত সমস্যা নেই। এমনটা না যে, তিনি হিজাবের গুরুত্ব সম্পর্কে সন্দিহান। তার সমস্যা আসলে তিনি আল্লাহর প্রত্যেকটি আদেশ পালনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। এই সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে তিনি এমনিতেই হিজাব এবং অন্যান্য কর্তব্য পালন করবেন, ইনশাআল্লাহ।
📄 সন্তানকে কীভাবে ইসলামের শিক্ষা দেবেন
আমাদের সন্তানদের প্রতি যে সচেতনতা কাজ করে, এটা আসলে আমাদের দ্বীনের ভিত্তি। ব্যাপারটা কোনো নতুন কিছু নয় যে, আমরা মাত্র উপলব্ধি করতে শুরু করেছি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে চিন্তা কাজ করে, এটা আমরা পেয়েছি আমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর কাছ থেকে। আসলে তাঁরও আগে আমরা প্রথম যেই সচেতন বাবার কথা জানতে পেরেছি, তিনি ছিলেন নুহ (আ.)। নবি নুহ (আ.) তাঁর সন্তানের ব্যাপারে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছে তাঁর সন্তানকে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন।
আমাদের সন্তানের দ্বীনি বিষয়ে আমাদের সচেতনতা এই ধর্মের বহু পুরোনো ভিত্তি। এটা আমাদের ধর্মের একটি মৌলিক অংশ। সন্তান সচেতনতার বিষয়টা শেখানোর জন্য আল্লাহ আমাদের বেশ কয়েকবার এমন নবিদের ব্যাপারে জানিয়েছেন, যাদের নিজ সন্তানরা সমস্যাগ্রস্ত ছিল। একবার নয়, অনেকবার!
ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ অত্যন্ত নেককার দুজন সন্তান দিয়েছিলেন; ইসমাইল ও ইসহাক (আ.)। কিন্তু নুহ (আ.) তেমন পাননি। ইয়াকুব (আ.)-এর ছিল কয়েকজন অনুগত সন্তান, আবার কয়েকজন অবাধ্য। তবে বেশির ভাগই ছিলেন অবাধ্য। তার মানে আমাদের নবিদের মাঝেই এমন কেউ কেউ ছিলেন, যারা তাদের সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ কথাটা মাথায় রাখা জরুরি।
কারণ, যদি নবিদেরকে তাঁদের সন্তানের ব্যাপারে সমস্যায় পড়তে হয়, তাহলে আপনি-আমি যতই চেষ্টা করি না কেন, এসব সমস্যা আমরা এড়িয়ে যেতে পারব না! এটা আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্যের অংশ। আল্লাহ আমাদের কয়েকজনকে অনুগত সন্তান দান করবেন, কিংবা আমাদের কিছু সন্তান হবে অনুগত। আবার কিছু সন্তান আমাদের জন্য হবে পরীক্ষাস্বরূপ। সবাইকেই মানুষ করতে হবে। এটা আমাদের দ্বীনেরই একটা অংশ, আমাদের জীবনের অংশ।
দুটি বাচ্চা কখনোই এক রকমের হবে না। কেবল একটি সূত্র প্রয়োগ করে আপনার বাচ্চাদের বড়ো করতে পারবেন না। উদাহরণস্বরূপ ইয়াকুব (আ.)-এর কথাই ধরুন। আমরা এটা বিশ্বাস করি না যে, তিনি ইউসুফ (আ.)-কে বেশি স্নেহ করেছিলেন, আর অন্যদের কম যত্ন নিয়েছিলেন। তাই তারা ইউসুফের সাথে অন্যায় আচরণ করেছিল।
তিনি একজন নবি ছিলেন। অবশ্যই একজন নবির অন্যতম প্রধান কাজ ন্যায়নিষ্ঠভাবে জীবনযাপন করা। আর আপনি যদি আপনার এক সন্তানের প্রতি স্নেহশীল হন আর অন্য সন্তানের প্রতি তা না হন, তাহলে তাতে সুবিচার করা হলো না। একজন নবির পক্ষে এ রকম হওয়া অসম্ভব। অর্থাৎ বাবা হিসেবে যতটুকু করা সম্ভব ছিল, তিনি ততটুকু করেছিলেন। তবুও তার সন্তানরা তাকে পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ! শেষে তারাও তওবা করেছিলেন। কিন্তু নুহ (আ.)-এর বেলায় তাঁর ছেলে শেষ পর্যন্ত তওবা করেনি।
আবার তারা নবি ছিলেন দেখে আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, কারও খুব ভালো চাকরি থাকলে তাতে বাড়তি সুযোগ সুবিধা থাকে। যেমন: আপনাদের কেউ কেউ খুব ভালো চাকরি করেন। তাই আপনার পুরো পরিবারের জন্য আপনি হেলথ ইন্স্যুরেন্স পাচ্ছেন! তাই না? একজন নবির চাকরি তো বেশ ভালো পদের। তিনি আল্লাহর কর্মচারী! এখানে তো তিনি কিছু সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন; 'আমি অন্তত আমার পরিবারের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি।' অথচ কোনো নবিকেই তাঁর পরিবারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি; না তাঁর স্ত্রী আর না সন্তান। এমনকী আমাদের নবিজি -এর বেলাতেও না।
একটা অভাবনীয় হাদিস আছে, যেখানে তিনি তাঁর মেয়েকে বলছেন- 'ফাতিমা, মুহাম্মাদের কন্যা! আল্লাহর ব্যাপারে সতর্ক হও, আল্লাহর ব্যাপারে সাবধান থাকো। কারণ, তাঁর সামনে আমি তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারব না।
তোমার ওপরেও আমার কোনো অধিকার থাকবে না!' তিনি এই কথা বলছেন নিজের মেয়েকে! অন্য কথায়, তিনি আমাদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু শেখাতে চাইছেন। কেবল আমরা মুসলিম হয়েছি বলে বা মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলে পার পেয়ে যাব- ব্যাপারটা এমন না।
আমাদের যাদের মেয়ে সন্তান আছে তারা বিশেষভাবে অনুগৃহীত। আমরা নবিজির পরম্পরাকে বয়ে চলছি। তিনিও ছিলেন কন্যা সন্তানের বাবা। ওনার ছেলে হয়েছিল, কিন্তু তারা খুব অল্প বয়সেই মারা গিয়েছিলেন। আল্লাহ ওনাকে একাধিক মেয়ে সন্তান উপহার দিয়েছিলেন। তিনি তাদের লালন-পালনের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। কাজেই এমন মহৎ একটা দায়িত্ব পেয়ে আমাদের উচিত সম্মানিত বোধ করা।
ইসলামের আগে কিংবা বর্তমানে ভারত উপমহাদেশে, এই যুগেও মেয়ে সন্তান হলে মানুষের মুখ বিকৃত হয়ে যায়! এখন আমি সমাজকে মুখ দেখাব কীভাবে?
আপনি আপনার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সে প্রায় মরেই যাচ্ছিল। কিন্তু সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গে আপনার মা আপনাকে এসএমএস করলেন, 'খবর ভালো তো?' এ কথার মানে কী? তিনি আসলে জিজ্ঞেস করেছেন, ছেলে হয়েছে কি না। এরপর আপনি কোনো উত্তর না দিলে, তিনি আপনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, অসুবিধা নেই! এর পরেরবার হবে, ইনশাআল্লাহ। যেন মেয়ে হওয়ার ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক। সুবহানাল্লাহ, কত নিচে নেমে গিয়েছি আমরা।
যারা কন্যা সন্তানকে মর্যাদা দেয় না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন- 'যখন মেয়ে জন্ম নেয়, তার মুখ কালো হয়ে যায়'। যেন কালো মেঘ তার মুখকে ঢেকে রেখেছে। আর সে হতাশায় ডুবে ভাবছে, আমার এইমাত্র একটি মেয়ে হয়েছে। সুবহানাল্লাহ।
যুগ যুগ ধরে সন্তান বড়ো করার কাজে আমরা বেশ সফল। অবশ্যই নবি -এর সময় থেকে এখনকার সময় আলাদা। তবে বর্তমান সময়ের আগ পর্যন্ত, সন্তান লালন-পালনে মুসলিমদের সফলতা অন্য কিছুর তুলনায় অনেক ভালো ছিল।
দুনিয়া আজ চোখের পলকে বদলে যাচ্ছে। সরকার কীভাবে পরিচালিত হবে, তা থেকে নিয়ে আমাদের অর্থনীতি, দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক এমনকী পরিবারগুলোতেও
এই দ্রুত পরিবর্তনের দাগ লেগেছে। মুসলিম-অমুসলিম সব পরিবার এতে আক্রান্ত। আমাদের পরিবারের এখন যেমন অবস্থা দেখতে পাচ্ছি, এর আগে কখনো এমনটা ছিল না। সন্তানদের এখন যেভাবে বড়ো করা হচ্ছে, ইতিহাসের আর কোনো সময়ে কিংবা অন্য কোনো সংস্কৃতিতে এমনটা ছিল না। বিশ্বায়ন আর যোগাযোগ ব্যবস্থার বৃহৎ উন্নয়নের কারণে, তার ওপর ভোগবাদের চরম পর্যায় সৃষ্টি হওয়ায়, আমি একে পুঁজিবাদ বলি না; বরং বলি ভোগবাদ। আমরা পণ্যের আসক্ত ভোক্তায় পরিণত হয়েছি। আর এই মানসিকতা আমাদের ঘরের ভেতরেও দখল করেছে।
একটা ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি। বাচ্চারা আপনাদের কাছে কী নিয়ে সবচেয়ে বেশি আবদার করে বলুন তো? তারা কীসের জন্য সব সময় বায়না ধরে বসে থাকে?
স্মার্টফোন? ট্যাব? আইপ্যাড? ল্যাপটপ?
তারা এসবের খবর কোথায় পায়? নবি ইউসুফ (আ.)-এর মতো তারা কি স্বপ্নে দেখতে পায়? তারা কি স্বপ্নে দেখে বলে, 'আব্বু, আমি দেখেছি একটা আপেল একটা ফোনের ওপরে পড়েছে... এই স্বপ্নের মানে কি?' না! তারা কোথায় দেখেছে আইপ্যাড? হয় তাদের বন্ধুর কাছে অথবা টিভিতে দেখেছে। তারা যখন দেখল তার অন্য বন্ধুদের এসব আছে, তারা আপনাদের বলে- 'আমি ওরকম স্নিকার চাই, আমি ওরকম শার্ট চাই, আমি ওরকম খেলনা চাই।' এ সমস্ত খেলনার আইডিয়া তারা কোথায় পায়? এসবের ইলহাম কোথা থেকে আসে? এগুলো এসেছে মিডিয়া থেকে।
আমরা আমাদের বাচ্চাদের সামনে মিডিয়ার জগৎটা উন্মুক্ত করে দিই। এই মিডিয়াই মূলত, বাচ্চাদের এসব খেলনার জন্য করজোড় বায়না করতে শেখায়! যেন আমরা তাদের এ সমস্ত খেলনা কিনে দিই। আর তখন আমরা তাদের এগুলো কিনে দিই। তা ছাড়া বাচ্চারাই যে এসবের একমাত্র শিকার তা কিন্তু নয়, আমরাও এর ফাঁদে পড়ি। একটা ব্যান্ডের ঘড়ি বা জামা পরলে নিজেকে খুব উচ্চ শ্রেণির মনে হয়, ঠিক কি না? হঠাৎ যেন আপনার মনে হতে থাকে সব মানুষের ভিড়ে আপনার মান-মর্যাদা বেশি। যেই মুহূর্তে আপনি অ্যাপল স্টোর থেকে একটা আইফোন হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসেন, হঠাৎ যেন আপনার নিজেকে খুব হ্যান্ডসাম লাগে! নিজেকে খুব 'কুল' লাগে।
এসব পণ্য হাতে থাকায় আমরা আসলে ভেবে নিই, মানুষ হিসেবে আমাদের মর্যাদা বেড়ে গিয়েছে। আর আপনি যদি কোনো ব্যান্ডের কাপড় না পরেন, অথবা ওই ফোনটা যদি আপনার না থাকে কিংবা আপনার এই 'খেলনাটা' নিই অথবা ওই 'খেলনাটা' নিই, তাহলে আপনি যেন মূল্যহীন। কোনো কারণে আপনি তাদের ক্যাটাগরির নন। অন্যেরা আপনার চেয়ে শুধু এ কারণে ভালো যে, তাদের হাতে যেটা আছে সেটা আপনারটার থেকে ভালো। আমরা মুসলিমরা কেমন যেন অচেতন ভোক্তায় পরিণত হয়ে গিয়েছি। এমনটাই আমাদের বর্তমান অবস্থা।
সন্তান লালন-পালন নিয়ে কথা বলার আগে আমাদের তাই আগে বুঝতে হবে, আমাদের চারপাশের দুনিয়াতে কী হচ্ছে। ভেবে দেখতে হবে নিজের সাথে কী হচ্ছে, সারা দুনিয়াতে কী হচ্ছে। এটা বেশ বড়ো একটা সমস্যা।
দ্বিতীয় সমস্যাটা হলো, আপনার কাছে সাফল্যের মানে কী, কীসে আপনার মর্যাদা বাড়ায়। এখন তো বাচ্চাদের এই মানসিকতা দিয়ে বড়ো করা হচ্ছে যে, তাদের মূল্য এসব প্রোডাক্ট দ্বারা নির্ধারিত হয়। যে ব্যান্ডের কাপড় পরছেন, যে বাসায় থাকছেন, যেই গাড়িটা চালিয়ে তাকে স্কুলে দিয়ে আসছেন, যে ব্যান্ডের ব্যাগ কাঁধে নিচ্ছেন এসব ব্যাপার। এগুলোই মানুষ হিসেবে আপনার দাম ঠিক করছে। আর এর সাথে যোগ হয়েছে আরও একটা সমস্যা জীবনে সফল হওয়া বলতে কী বোঝায়?
আপনাদের মধ্যে কারও কারও হয়তো শিক্ষার ভালো সুযোগ ছিল না। কিংবা আপনাদের বাবা মায়ের সেই সুযোগ হয়নি। আপনাকে শিক্ষিত করতে যা যা করতে হয়, তারা তাই করেছেন। সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। আপনিও আপনার জীবন থেকে এই শিক্ষা পেয়েছেন। তাই আপনি বলেন, 'আমার বাচ্চার জন্য আমি সর্বোচ্চ শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা রাখব।' এই ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে, তাকে প্রাইভেট স্কুলে পাঠাতে হলে হোক। বাড়ি ভাড়া করতে হলে হোক। ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে হলে হোক। অস্বস্তিকর পরিবেশে থাকতে হলেও সমস্যা নেই। তাদের সুশিক্ষার স্বার্থে আপনি সব করতে রাজি আছেন। এমনকী ধার-কর্জ করে, লোন নিয়ে ডোনেশন দিয়ে- এসব করতে হলেও তবু আমরা রাজি। কারণ, আপনাদের কাছে সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাচ্চার সুশিক্ষা।
আপনাদের সন্তানকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শিক্ষা না পেলে তুমি ব্যর্থ মানুষে পরিণত হবে। তোমাকে কলেজ পাস করতে হবে। এটা পাস করতে হবে, ওটা পাস করতে হবে।
আপনি যদি ভারত উপমহাদেশের হোন, তাহলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হলে আপনি ব্যর্থ। আপনি সার্জেন্ট হতে পারেননি দেখে আপনার বাবা-মা আপনার প্রতি আর সন্তুষ্ট হবেন না। আর ডেন্টিস্ট তো একেবারেই হবেন না, ডেন্টিস্ট হওয়া তো অপমাজনক! সেটা নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। এই আমাদের অবস্থা!
ডাক্তার হওয়া আমাদের একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ জানেন? কারণ, এতে সবচেয়ে বেশি টাকা আসে। এজন্য না যে আপনি কারও জীবন বাঁচাতে পারছেন কিংবা মানবতার সাহায্য করছেন। এ ধারণার সাথে ডাক্তার হওয়ার কোনো সম্পর্কই নেই! যদি ডাক্তার আর বাস ড্রাইভারদের বেতন সমান হতো, তবে দেশি কমিউনিটি বাচ্চাকে ডাক্তার বানানোর জন্য এত লাফালাফি করত না! আমাদের মাঝে নিজের সন্তানকে পৃথিবীর উদ্ধারকর্তা হিসেবে দেখার কোনো উৎসাহ নেই।
ছেলে ডাক্তার হয়ে ফিরলে মা-বাবার খুশি দেখে কে। কিন্তু সেই ছেলে যদি বলে, 'আমি তিন বছরের জন্য এনজিওতে চলে যাব। আমি বন্যা কবলিত এলাকায় তিন বছরের জন্য কাজ করব। এরপর আমি সোমালিয়া যাব, তারপর পাকিস্তানে, তারপর বাংলাদেশে, তারপর মালয়েশিয়াতে; আমি শুধু সেবা দান করব; বেতন নেব না, কোনো লাভের জন্য কাজ করব না। তখন সেই বাবা-মা বলবে, 'ইয়া আল্লাহ! তোমাকে ডাক্তার বানানোর জন্য আমরা আমাদের সব টাকা-পয়সা ঢেলে দিয়েছি। আর এখন তুমি এসব করবে? ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি আর ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর মতো তোমার তো রক্তচোষা মেশিনের অংশ হওয়া উচিত ছিল। আমরা তো তোমাকে তা- ই বানাতে চেয়েছিলাম! তুমি কেন মানুষের জীবন বাঁচাবে? তোমার সমস্যা কী?' এই হলো আমাদের অবস্থা। আর এদিকে আমরা ভাবি, আমাদের ছেলেমেয়েদের মাঝে ঝামেলা আছে! আমাদের উচিত আয়নায় নিজেদের দেখা। আমরা আসলে কাদের তৈরি করছি? আমাদের মানসিকতায় গোঁড়া থেকে খুব বড়ো একটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমাদের কাছে আজ সাফল্য মানে টাকা-পয়সা।
শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের ধারণা হলো, এমন একটা ক্যারিয়ার যাতে অনেক টাকা আসে। সবকিছুর মূলেই অর্থ-সম্পদ। আপনি যদি সফল হন, এর মানে এই যে আপনার অনেক টাকা আছে। আপনি যদি সফল হন, তার মানে এই যে আপনি শিক্ষা অর্জন করেছেন। শিক্ষা অর্জন করেছেন এমন কোনো ফিল্ডে, যেখানে আপনার একটা ভালো ক্যারিয়ার হবে। যার মানে যেখানে আপনি অনেক টাকা-পয়সা পাবেন। এটাই এখন সাফল্য। কথা শেষ পর্যন্ত একই। এই ধারণা কিন্তু আগেকার যুগ থেকে ভিন্ন।
আগে সবার ধারণা ছিল, আপনি শিক্ষিত হয়েছেন এর মানে আপনি নিজেকে বোঝেন। আপনার চারপাশের জগৎটাকে বোঝেন। আপনি পৃথিবীকে আরও সুন্দর বাসযোগ্য করে তোলার জন্য কাজ করছেন। এর জন্য কখনো আপনাকে ইতিহাস পড়তে হবে, কখনো সামাজিক বিজ্ঞান পড়তে হবে, কখনো পলিটিক্যাল সাইন্স পড়তে হবে। কখনো আপনার মিডিয়া নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে, কখনো সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। সমাজে অবদান রাখতে হলে বিভিন্ন ফিল্ডে পড়াশোনা করতে হবে। কেবল একটা ক্ষেত্র নিয়েই পড়ে থাকলে চলবে না। তা ছাড়া সবচেয়ে সফল কমিউনিটি যে দিক থেকেই বিচার করুন না কেন, আমেরিকার সবচেয়ে সফল কমিউনিটি হলো তারাই, যারা নিজেদের ছেলেমেয়েকে কেবল একটা ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে রাখেনি।
আমার এক বন্ধু বলেছিল, 'যদি স্টিভেন স্পিলবার্গ পাকিস্তানি ঘরে জন্ম নিতেন, তিনি একজন ডাক্তার হতেন'। ওনার ফিল্মস্কুলে পড়ার কথা শুনে বাবা-মা বলতেন, 'তুমি ফিল্ম স্কুলে পড়তে চাও! এসবের মানে কী? তোমার সমস্যা কী? তুমি কি মেডিসিন শাস্ত্রে ফেল করেছ?' তাদের ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যেত।
সন্তান বড়ো করা সম্পর্কে এখন কিছু কথা বলি।
সবচেয়ে আগে আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। তারা যদি আমাদের মাঝে সফলতার সঠিক সংজ্ঞা খুঁজে না পায়, তারা যদি আমাদের ব্যক্তিত্বে, দৈনিক কথাবার্তায় এর প্রতিফলন না দেখতে পায়, তবে আমরাও এটা আশা করতে পারি না যে, তারা নিজেরা নিজেরাই সফলতার সঠিক মানে বুঝে নিয়েছে। তাদের কাছে এ দিকনির্দেশনা আমাদের কাছ থেকেই আসতে হবে।
সারা দিন আমরা সেসব বিষয় নিয়েই কথা বলি, যেগুলো আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যখন স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন, তখন বাচ্চারা তা শুনতে থাকে, তাই না? তাদের কান সব সময় খোলা থাকে।
এখন আপনারা যদি বিলসংক্রান্ত কথাবার্তা বলেন, বাড়ি ভাড়া নিয়ে কথা বলেন কিংবা আপনারা সব সময় মুভি নিয়ে কথা বলেন কিংবা অন্য পরিবার সম্পর্কে কেবল আজেবাজে কথা বলেন, তারা কী করে না করে এসব আলাপ-আলোচনা করেন, তাহলে তারা ভেবে নেবে বড়োরা এমনই। আমার বাবা-মা এসব করে। এগুলোই তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।
অন্যদিকে, আপনি আর আপনার স্ত্রী যদি কুরআন নিয়ে কথা বলেন, আখিরাত নিয়ে কথা বলেন, অন্যের জন্য ভালো কিছু করার কথা বলেন, কাউকে সাহায্য করার কথা বলেন, তাহলে তারা আপনারটা দেখেই শিখে নেবে। এ ব্যাপারে আপনার তাকে লেকচার দিতে হবে না। তারা কেবল আপনাকে দেখবে। সবচেয়ে কার্যকর প্যারেন্টিং তো সেটাই, যেখানে বাচ্চাকে কোনো কাজ করাতে বাবা-মায়ের কিছু বলতে হয় না; তারা দেখতে দেখতে শেখে।
আপনাদের মাঝে অনেকেই ভাবেন, 'আমি যদি নোমান ভাইয়ের লেকচারে নিয়ে এসে আমার বাচ্চাদের বসিয়ে শোনাতে পারি, ইনশাআল্লাহ এরপরে তারা নীতিবান হয়ে যাবে। শুধু কয়েকটা ইউটিউব ভিডিও সব মুশকিল আসান।' এতে আসলে কোনো উপকার হবে না।
আপনার সন্তানের প্রকৃত কাউন্সিলর আপনি। আমার সন্তানের প্রকৃত কাউন্সিলর আমি। আমাদেরকে তাদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হতে হবে।
আগেকার যুগে মা-বাবা আর সন্তানদের মাঝে একটা প্রকৃতজাত সম্পর্ক বিরাজ করত। কিন্তু আজকাল বাবারা দিনের বেশির ভাগ সময় কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাসায় আসেন ক্লান্ত হয়ে। আর যে সময়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে বাসায় আসেন, তার অধিকাংশ বাচ্চারা তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। আবার সকালে যখন তিনি অফিসে যান, বাচ্চারা তখনো ঘুম থেকেই উঠেনি। আর তেমন যদি না- ও ঘটে, তিনি হয়তো যাওয়ার আগে নাস্তার সময় বাচ্চাদের ৫ মিনিটের জন্য দেখতে পান। তিনিও চলে যান তারাও চলে যায়। তার মানে সাত দিনের মাঝে পাঁচ দিনই বাবা আর বাচ্চার মাঝে তেমন কোনো কথাবার্তা হয় না।
তাও যদি হয় সেটা 'তুমি হোমওয়ার্ক শেষ করেছ?' 'আচ্ছা, আমার জন্য পানি নিয়ে আসো।' এতটুকুর মাঝেই সীমাবদ্ধ। তারপর আসে ছুটির দিন। কিন্তু ছুটির দিনগুলোতে এখানে দাওয়াত থাকে, ওখানে পার্টি থাকে, আপনার ১২টা পর্যন্ত ঘুমানো লাগে, বাসায় কিছু কাজ করা লাগে ইত্যাদি ইত্যাদি।
আপনি তখনো সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান না। তাদের সঙ্গে সত্যিকারের কথাবার্তা বলেন না। তাদের সাথে আপনার আসলে কোনো যোগাযোগ হয় না। এটাই মূল সমস্যা।
সপ্তাহের মাঝে হোক, শেষে হোক, আমাদের বাচ্চাদের জন্য সময় বের করে নিতে হবে। এটাই আপনার এবং আমার জন্য কার্যকর উপদেশ। কেবল সন্তানদের সাথে কথা বলার জন্য আমাদের সময় খুঁজে নিতে হবে। তারা কী বলে শুনুন। আজগুবি কথাবার্তা বললে তা-ই শুনুন। আমাদের উচিত তাদের জীবনের একটা বড়ো অংশ হওয়া।
আপনাদের অনেকের ক্ষেত্রেই বাস্তবতা হচ্ছে সন্তানের কাছে আপনার একমাত্র ভূমিকা হলো- আপনি বাড়ির একটা দেয়ালের মতো। আপনি জানেন, এ ধরনের বাবা-মায়ের সাথে কী হয়। সন্তান যখন একটু বড়ো হয়, তখন তারা তাদের আচরণের প্রতিফল পায়।
যখন তাদের ১৪/১৫ বছর বয়স হয়, তারা কিছুটা স্বাধীন হয়ে যায়। ধরুন, তখন তারা আপনার কাছে এসে একটা গাড়ি কিনে দিতে বলছে। আর আপনি বললেন, 'না, তোমার এখন কেন গাড়ি লাগবে?' সন্তান তখন বলবে, 'ঠিক আছে, আমি আমার ফ্রেন্ডদের সাথে চলে যাচ্ছি। আমি একটা চাকরি জোগাড় করে টাকা জমিয়ে নিজের গাড়ি নিজেই কিনে ফেলব।' এরপর একদিন হঠাৎ করেই আপনি ছেলের কাছে শুনতে পাবেন-
'বাবা, আমি এখন আলাদা থাকছি।'
'আলাদা থাকছ মানে? তুমি কোথায় যাবে?'
'কোথায় থাকব সেটা কোনো ব্যাপার না। আমি এখন বড়ো হয়েছি।'
আর তখন আপনি দৌড়ে মসজিদে আসেন, 'ইমাম সাহেব! আমাকে একটা সূরা বলে দিন, একটা দুআ বলে দিন যাতে আমার ছেলেটা ভালো হয়ে যায়।'
এভাবে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। ১৭-১৮ বছর বয়সে গিয়ে যখন সংকটে পড়েন, তখন এসব ভাবলে চলবে না। তাদের গড়ে তুলতে হবে আরও অনেক অনেক আগে থেকে।
এখন আমি ১০ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের মা-বাবার জন্য কিছু পরামর্শ দিচ্ছি। আমি নিজেও এই দলে। আমার সবচেয়ে বড়ো সন্তানের বয়সও দশ বছর।
আমাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব হলো- সন্তানকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়া। যখন নবিরা (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) দ্বীন শিক্ষা দিতেন, তারা সকলের জন্যই তা করতেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআনে খুব কম জায়গাতেই বাচ্চাদের শেখার বা উপদেশ নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু যখনি তিনি এ সম্পর্কে বলেছেন, সেটা সব সময়ই বাচ্চার মা-বাবার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কথাটা আবার খেয়াল করুন। আল্লাহ যখনই কুরআনে বাচ্চাদের সঠিক পথপ্রাপ্ত হওয়ার কথা বলেছেন, সেটা সব সময়ই বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে হয়েছে। আর অভিভাবকের মধ্য থেকে তা সব সময়ই বাবার তরফ থেকে হয়েছে। কারণ, মা তো সারাক্ষণ বাচ্চার পাশেই থাকেন। একজন মা'কে বাচ্চার পাশে সব সময় থাকার জন্য কোনো অতিরিক্ত কষ্ট পোহাতে হয় না। কিংবা বাচ্চার সব সময় খেয়াল রাখতে বা তাকে উপদেশ দিতে হয় না। মাকে কখনো মা হওয়ার ব্যাপারে ট্রেনিং নিতে হয় না; এটা প্রকৃতিগতভাবেই হয়। আল্লাহ তাদের মাঝে এই অনুভূতি দিয়ে রেখেছেন।
অন্যদিকে বাবাদের অবস্থা শোচনীয়। সত্যিকারের বাবা হওয়ার জন্য আমাদের একটা ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রকৃতিগতভাবে আমাদের মাঝে এই অনুভূতি আসে না।
যখন একজন মা তার সন্তানকে জন্ম দেন, তার সব আবেগ-অনুভূতি বদলে যায়। মুহূর্তেই সব বদলে যায়। কিন্তু একজন বাবার ক্ষেত্রে ৩-৪ দিন পার হওয়ার পর বন্ধু যখন জিজ্ঞেস করে, 'তোমার তো শুনেছি বাবু হয়েছে'। আপনি বলেন, 'হ্যাঁ, কিন্তু আমি এখনও ধরতে পারিনি কী হয়েছে!'
কেউ আপনাকে বুঝিয়ে দিলে আপনি বুঝতে পারেন ব্যাপারটা। আমি কি বলছি বুঝতে পারছেন? আপনি যেন এখনও ধরতেই পারছেন না কী হয়েছে। কারণ, বাবা হওয়ার যে উপলব্ধি তা স্বভাবগতভাবে আমাদের মাঝে আসে না। আমাদের এই অনুভূতি গড়ে তুলতে হয়, এর পেছনে শ্রম দিতে হয়, তাই না? এজন্যই আল্লাহ বলছেন- লোকমান (আ.) সময় করে নিচ্ছেন, সঠিক সুযোগটা বেছে নিচ্ছেন বাচ্চার সঙ্গে কথা বলার জন্য। আমরা দেখেছি ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের সাথে বলছেন-
يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ.
'আমরা ইবরাহিম (আ.)-কে পেয়েছি, তিনি তাঁর সন্তানদের ঠিক একই উপদেশ দিয়েছেন, যা ইয়াকুব (আ.) বলেছেন। বিষয়টা খুবই চমৎকার।'
নিজেকে কীভাবে গড়ে তুলতে হবে বাবারা শুধু সেটাই শেখাননি, ভবিষ্যতে তাকে কীভাবে ভালো বাবা হতে হবে তাকে সেটাও শেখাচ্ছেন। এই মহান দায়িত্ব আমাদের, বাবাদের। আমরাই আমাদের সন্তানকে শেখাব কীভাবে একদিন ভালো বাবা হতে হবে।
📄 সন্তানহীনতা কি আল্লাহর শাস্তি
গালফ ট্যুরে লেকচার দেওয়ার সময় এক বোন এক করুণ প্রশ্ন করেছিলেন। তার বিয়ের বয়স দশ বছর। এখনও সন্তান হয়নি। এ নিয়ে শাশুড়ি তাকে বেশ কটু কথা বলেন। ছেলেকে বলেন, 'তোমার বউ একটা বন্ধ্যা'। কখনো সরাসরি, কখনো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। এটা তার পুত্রবধূর কলঙ্ক।
সন্তান চাচ্ছেন অথচ হচ্ছে না, এমন মহিলাকে স্বামীর ঘরে নানা মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেসব শাশুড়িরা আরও চাপ সৃষ্টি করেন, তারা এসব বউদের কোনো ধরনের সাহায্য করতে পারেন না।
বোনটি বলেছিলেন, অনবরত তার শাশুড়ি এসব কথা বলে যাচ্ছেন। তার স্বামী এগুলো বলা থেকে মাকে বিরত রাখতে পারছে না। তার স্বামীও আছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। কারণ, যিনি এসব বলছেন তিনি তার মা। তিনি তার মাকে কীভাবে এইসব কথা বলা বন্ধ করাবেন। এ রকম অনেক মহিলা আছেন, এ রকম অনেক বিশ্বাসী মহিলা আছেন, যারা একই ধরনের অবস্থার মধ্যে দিয়ে যান। তাদের সন্তান ধারণের অক্ষমতার জন্য তাদের যেই কথাগুলো বলা হয় তা খুবই অমানবিক।
দেখুন, সন্তান ধারণের সক্ষমতা কোনোভাবেই মানুষের ক্ষমতার মধ্যে পড়ে না। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি উপহার। আর যে পরীক্ষাগুলো আল্লাহ আমাদের করেন সেগুলোর মানে এই না যে, তিনি কতটুকু আমাদের ভালোবাসেন
অথবা বাসেন না! আল্লাহ প্রত্যেক মানুষকেই পরীক্ষা করেন। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কঠিন সময় আসে। প্রকৃতপক্ষে আপনারা জানেন যে, নবিগণ সন্তানের জন্য দুআ করতেন। যেন তাদের সন্তানরা ইসলামের আহ্বান পরবর্তী লোকদের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। অনেক নবির কিন্তু অনেকদিন পর্যন্ত কোনো সন্তান ছিল না। দেখা গেল, জীবনের শেষের দিকে গিয়ে একটা সন্তান হলো। তা-ও আবার হয়তো কন্যা সন্তান। এটি ছিল আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা।
নূহ (আ.)-এর একজন সন্তান ছিল। কিন্তু নূহ (আ.)-এর সন্তানের মতো একজন সন্তান যেন আমার কখনো না হয়! যে অবাধ্যতা করবে। যার কোনো ভালো কাজ নেই। সে ভালো সন্তান তো নয়ই; বরং তার ভালো কোনো কাজও নেই। কুরআনে এই যুবক ছেলে বা পুরুষ সম্পর্কে ভয়ানক চিত্রায়ণ করা হয়েছে। কাজেই প্রথম এবং প্রধানত বিষয় হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষামূলক বিষয়ে আমরা মানুষকে যেভাবে দোষারোপ করি, তা থেকে আমাদের পিছু হটতে হবে। এটা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এটা খুবই ভয়ানক কাজ। এটি উদ্ধত এবং অজ্ঞতাপ্রসূত একটা কাজ।
কিন্তু আমি এই মহিলাকে বলেছি এবং সেইসাথে আমার বোনদেরকেও বলছি, আপনাদের বাস্তববাদী হওয়া উচিত। তার মানে আমি এটা বলতে চেয়েছি যে, মাঝে মাঝে কিছু মানুষ আছে যারা তাদের মতামত দেবে, তাদের অনুভূতি জানাবে তা যতই আনাড়ি হোক না কেন, আপনি তাদেরকে পরিবর্তন করতে পারবেন না। কেউ তাদের পরিবর্তন করতে পারবে না। যত তাড়াতাড়ি আপনি উপলব্ধি করবেন এবং গ্রহণ করবেন, সে এইসব ভয়ানক কথা বলা বন্ধ করবে না। যখনই সে সুযোগ পাবে তখনই সে ভয়ংকর চোখের চাহনি দেবে। মুখভঙ্গি তৈরি করবে অথবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আপনার বা অন্য কারও উদ্দেশ্যে পিছলানো মন্তব্য করবেই। কখনোই, কোনো দিনই, কোনোভাবেই তা বন্ধ হবে না।
আপনি মানুষকে পরিবর্তন করতে পারবেন না। আপনার কাজ হচ্ছে মানুষের সাথে কীভাবে চলাফেরা করতে হয় তা শেখা। মাঝে মাঝে মানুষের সাথে চলাফেরা করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু আপনাকে তাদের সাথেই চলাফেরা করতে হবে। যেই মুহূর্তে আপনি তার কাছ থেকে ভালো কিছু পাওয়ার আশা বন্ধ করে দেবেন, সেই মুহূর্তে আপনি শিখবেন, কীভাবে তাদের কটূক্তি ধুয়ে ফেলে দিতে হয়। আপনি সেটা গ্রহণ করুন।
হয়তো এটাই তার দুর্বলতা। সে এর থেকে বের হতে পারে না। এরপর যখন সে কিছু বলবে- তখন আপনি বুঝতে পারবেন সে এটা কেন বলছে, তাই সেটা ভুলে যান। আপনি ওই কথা ধরে থাকবেন না। আপনার কাছেও আসতে দেবেন না।
এগুলোর থেকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আপনি কীভাবে অন্য কাউকে পরিবর্তন না করে এইসব কটূক্তি সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে শিখছেন। আমরা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করি না, করতে পারি না। আমরা যা করতে পারি তা হলো, কোনো কিছু সম্পর্কে আমরা যেভাবে ভাবি তা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিণত করতে।
আমি আপনার কষ্ট বুঝতে পারছি। আসলেই পারছি। আপনি যে অবস্থানে আছেন তার জন্য আমার নিদারুণ কষ্ট হয়। আপনারা জানেন। একইসাথে, আপনি আপনার জীবনে যেভাবে খুশি হতে পারেন তা হলো- এইসব কথা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা বন্ধ করে দিন। আর আপনার স্বামী যদি শুনে থাকে তাহলে তার প্রতি আমার উপদেশ হচ্ছে, শুনুন! আপনার মাকে একপাশে সরিয়ে নিন। তাঁকে বলুন এইসব কথা বলা বন্ধ করতে। তাকে আপনার এইসব কথা বলা দরকার। আর এটা তাদের অসম্মানিত করবে না। যদি মাতা-পিতা ভুল করে কোনো কিছু করে, কাউকে কটূক্তি করে, তাদের শুধরানো অসম্মানের কাজ নয়। ফেরেশতারা এগুলো পাপ হিসেবে লিখছে। আপনি আপনার মাকে কেয়ামতের দিনে বিপদে ফেলবেন কেন? আপনি কি তাকে ওই বিপদ থেকে রক্ষা করবেন না?
কিছু না বলা কোনো সঠিক কাজ নয়। আপনি আপনার পরিবারে একটি ভুলকে মৌনভাবে সমর্থন জানাচ্ছেন। নিজের মাকে তার ভুলটা আড়ালে বুঝিয়ে দেওয়া, সম্পূর্ণভাবে সঠিক কাজ। আর আপনি যখন বলবেন, তখন সম্মান আর ভালোবাসা নিয়েই বলবেন। তাহলেই সব ঠিক থাকবে। শুধু সম্মান এবং ভালোবাসা নিয়ে বলুন।
আল্লাহ তায়ালা যেন আপনাদের আরও ভালো স্বামী, স্ত্রীদের শক্ত স্ত্রী হওয়ার তাওফিক দেন। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের মাতা-পিতাকে ধৈর্যশীল, স্নেহময়ী, সদয় হওয়ার এবং শব্দ প্রয়োগে আরও অনুগ্রাহী হওয়ার তাওফিক দেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে জ্ঞানহীন কথাবার্তা বলা থেকে দূরে থাকার তাওফিক দিন।
📄 অর্ধাঙ্গিনী না কষ্টাঙ্গিনী
একটি সুন্দর সমাজের জন্য পারিবারিক শৃঙ্খলা মৌলিক ও প্রধান উপাদান। পরিবারে সামঞ্জস্যতা তৈরি করতে না পারলে দাওয়াহর কথা, ইসলামিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলাটা ভালো দেখায় না। বাস্তবতা হলো- আমাদের পরিবার হচ্ছে চরম বিশৃঙ্খলার জায়গা। যেখানে আমাদের পরিবারে অশান্তি! স্বামী-স্ত্রী সারা দিন বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে থাকে। আমাদের পরিবারের ভেতর চলে তিক্ত মন্তব্য চালাচালি। সেখানে আমরা কীভাবে উচ্চতর দাওয়াহ আর আদর্শের কথা বলতে পারি?
আমাদের পরিবারগুলোতে চলে জঘন্য টিপ্পনী...
স্বামী : 'তুমি দেখতে একদম সুন্দর না।'
স্ত্রী : 'ও! তুমিও তো ইউসুফ (আ.)-এর মতো না! তোমাকে দেখে তো আর আমি হাত কাটছি না!'
অপ্রয়োজনীয় রঙ্গ! একে অপরের সাথে অপ্রয়োজনীয় তিক্ত মন্তব্য চালিয়ে যাওয়া। অনেক সময় আপনি জানেন আপনার স্ত্রী কীসে বিরক্ত হয়, আর আপনি ঠিক সেটাই করেন। আবার অনেক সময় স্ত্রীরাও ওই জিনিসটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানেন, যেটা ওনার স্বামীর চামড়ার নিচে গিয়ে সুঁচের মতো গিয়ে বিঁধবে। তারপরেও তারা সেটা বলবেন শুধু এইটুকু দেখার জন্য যে কী ঘটে!
আর এই সবকিছু কে দেখছে? আপনারা যা কিছু করছেন, এগুলো কে দেখছে? এই ধরনের কটূক্তির খেলা, আপনার পরিবারে যে যুদ্ধ চলছে- এগুলো কে দেখছে? সত্যিকারার্থে এইসবের শিকার কে হচ্ছে? পরিবারের শিশুরা। শিশুরা এই ধরনের ব্যবহার শিখছে। যখন তারা বড়ো হবে, তখন তারা কেমন ধরনের পিতা-মাতা হবে? তারা শিখবে- বিয়ের মধ্যে ক্ষমা করার কোনো ব্যাপারই নেই!
আপনারা জানেন, মুসলিম পুরুষদের কর্মক্ষেত্রে তাদের নারী সহকর্মীরা যখন অত্যন্ত অসংগত পোশাক পরে হেসে হেসে জিজ্ঞেস করে, 'কেমন আছেন? আপনার দিন কেমন কাটছে?' তখন ঠিকই হেসে হেসে মধুমাখা কণ্ঠে গদগদ হয়ে বলেন, 'হ্যাঁ, ভালোই। বেশ ভালোই।' এরপর হয়তো ৪-৫ মিনিট কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর বাড়িতে ফিরে আপনার স্ত্রী যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করে, 'সারা দিন কেমন কাটল তোমার?' আপনি বলেন, 'আমি কথা বলতে পারব না! সারা দিন অফিসে অনেক পরিশ্রম হয়েছে।' আমরা আমাদের পরিবারের ভেতর এটাই করছি। আমাদের স্ত্রীদের সাথে সম্পর্কগুলো এভাবেই ধ্বংস করে দিচ্ছি।
ভাইদের আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই; শেষ কবে আপনি তাকে কোনো উপহার দিয়েছেন? আপনি হয়তো তাকে নিয়ে বাজারে গিয়েছেন, আপনার স্ত্রী হয়তো কিছু একটা হাতে নিয়েছে আর আপনি বলেছেন- 'না না, এটা রাখো! রাখো।' শেষ কবে আপনি তাকে তার চাওয়া ব্যতীত কিছু একটা দিয়েছেন? শেষ কবে তাকে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিলেন? শুধু একটু বাইরে নিয়ে যাওয়া আর একটা আইসক্রিম কিনে দেওয়া কোনো কারণ ছাড়াই?
তারা আপনার কাছে বেশি কিছু চায় না। তারা আপনার কাছে কিছু সময় চায়। তারা শুধু আপনার একটু সময় চায়।
কিছু কিছু বোন আমাকে এমনসব অভিযোগ করেন, আমি আমার নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারি না। তারা আমার কাছে অভিযোগ করেন, তারা বুঝতেই পারেন না, তাদের স্বামী ঘরে আছে কী নেই। কারণ, যখন তারা বাড়িতে আসেন, তখন তারা কম্পিউটারে বসেন। ফেইসবুক, ইউটিউবেই সারা রাত পার করে দেন। তারা স্বামীদের দেখতে পায় না, আর তারা কাঁদতে থাকেন। এটা এমন যেন- তারা আর বিবাহিত নেই।
কম্পিউটার বন্ধ করুন। আপনার স্ত্রী-সন্তানদের সাথে সময় কাটান। এটার অগ্রাধিকার সবচেয়ে বেশি।