📘 বন্ধন পারিবারিক জীবনে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 ইসলামে স্ত্রীর অধিকার

📄 ইসলামে স্ত্রীর অধিকার


গালফ ট্যুরে থাকাকালীন একবার এক ই-মেইল পেলাম।

'আমি একজন অমুসলিম। কুয়েতে অল্প কয়েক বছর ধরে কাজ করছি। আমার অফিসের এক ধার্মিক মুসলিম কলিগকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাকে বিয়েও করতে চাচ্ছিলাম। যে কারণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলাম।

তাই আমি ইসলাম সম্পর্কে আরও জানতে চাচ্ছিলাম। আমি যাকে পছন্দ করেছি, তিনি একজন পাকিস্তানি। তার সংস্কৃতি আরও ভালোভাবে জানার জন্য আমি পাকিস্তানি এক মহিলা কলিগের সঙ্গে আলাপ করেছি। আমি ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য কুরআন পড়ছি। এখানে একজন স্ত্রীকে যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, তা খুবই হৃদয়গ্রাহী এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু যখন আমি আমার মেয়ে বন্ধুটির জীবনের দিকে তাকাই, তখন অন্য ধরনের চিত্র দেখি। তাকে তার শ্বশুরবাড়ির জন্য অনেক কিছু করতে হয়। আর তার স্বামীও তাকে জোর করে, সে যেন তার শাশুড়ির সেবা-যত্ন করে। তার শাশুড়ি তাকে অনেক যন্ত্রণা দেয়। তাদের স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়। এদিকে তার ননদেরা তাকে সব সময় কাজের মেয়ের মতো খাটিয়ে নেয়। তার স্বামীও এ ব্যাপারে অনেক কঠোর। আমি এ ক্ষেত্রে অনেক অবিচার দেখতে পাই। তিনি তাকে ভয় দেখান যে, তার কথা না শুনলে তিনি স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যাবেন। এটাই যদি ইসলামের আসল রূপ হয়, তাহলে আমি ঠিক নিশ্চিত না আমি মুসলিম হব কি না। এ ব্যাপারে আপনার উপদেশ কী?'

এ ধরনের প্রশ্ন আমার কাছে নতুন না। নারীর অধিকার সম্পর্কে জানতে চেয়ে, বিশেষ করে শ্বশুরবাড়িতে তাদের অধিকার কী, সে সম্পর্কে জানতে চেয়ে অনেকেই আমাকে এ ধরনের প্রশ্ন করেন।

বিষয়টা বেশ জটিল। আমি এ ব্যাপারে কিছু মৌলিক ধারণা সবার সাথে শেয়ার করছি। প্রথমত, এমন প্রশ্ন করার জন্য সেই বোনকে ধন্যবাদ। এটা শুধু আপনাকে না, আপনার মতো অগণিত নারীর উপকার করবে ইনশাআল্লাহ।

ইসলামে যেকোনো সম্পর্ক কিছু অধিকার আর কর্তব্যের ভিত্তিতে স্থাপিত। একজন পুরুষ হিসেবে আমার স্ত্রীর প্রতি আমার কিছু কর্তব্য রয়েছে। ঠিক যেমন আমার প্রতি তার কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আর বাবা-মায়ের প্রতি আমার কিছু দায়িত্ব রয়েছে, ঠিক যেমন আমার প্রতি তাদেরও দায়িত্ব আছে। তাদের কাছে আমার কিছু অধিকার আছে।

এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, আপনি যেকোনো একটি সম্পর্কের অধিকার আদায় করতে গিয়ে অন্য আরেকটি সম্পর্কের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারেন না। কথা হলো, আপনি কীভাবে সব অধিকারের সমন্বয় ঘটাবেন?

একজন ছেলে-সন্তান হিসেবে আমাকে আমার বাবা-মায়ের প্রতি অনুগত হতে হবে, তাদের সম্মান দেখাতে হবে, দয়া দেখাতে হবে। তারা আমার কাছে যা চান, তা পূরণ করতে হবে। যদি না তারা আমাকে ইসলামের বাইরে কিছু করতে আদেশ দেয় কিংবা আল্লাহকে অমান্য করতে আদেশ দেয়। এটা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে তাদের অনুগত থাকতে আমার কোনো সমস্যা থাকা উচিত নয়।

অন্যদিকে, আমার স্ত্রীকেও তাদের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, সাধারণ শিষ্টাচার বা আদব দেখাতে হবে। কিন্তু তাকে তাদের অনুগত হয়ে চলতে হবে না। আর স্বামী হিসেবে আমি যদি তার কাছে আমার বাবা-মায়ের সেবা দাবি করি, তাহলে আমি তার প্রতি অবিচার করছি। স্ত্রীকে তার নিজের বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্যশীল হতে হয়, তার তো নিজের অভিভাবক রয়েছে। এরা তার নিজের অভিভাবক নয়, আপনার অভিভাবক। রক্তের বন্ধনে যে সম্পর্ক হয় আর বিয়ের বন্ধনে সে সম্পর্ক হয়, তা মোটে এক নয়। কিছু মানুষ জিজ্ঞেস করে, 'কিন্তু আপনাকে তো আপনার স্বামীর আনুগত্য করতে হবে, সে যা-ই করতে বলুক না কেন!' এটাও সম্পূর্ণ সত্যি নয়। আমরা কোনো মানুষেরই এতটা অনুগত নই যে, সে যা-ই করতে বলুক না কেন তাই করতে হবে।

বাবা-মা আমাকে যা যা বলবে- আমি তার সবকিছুর আনুগত্য করতে পারব না। আমার বাবা যদি আমাকে স্টুডেন্ট লোন নিতে বলতেন, যেখানে সুদের কারবার আছে, আমি তা করতাম না। আমি এটা করতে পারি না। এতে আল্লাহর অবাধ্য হতে হবে। আমি এমনটা করব না। আর মাঝে মাঝে এমনও হয় যে, আপনাকে আদব বজায় রেখে আপনার বাবা-মায়ের অবাধ্য হতে হবে। কারণ, তারা অযৌক্তিক কাজ করতে বলছে।

এ রকমও হতে পারে আপনার বাবা আপনাকে বলছেন লোন নিতে, যা সুদের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু তিনি আপনাকে এমন ব্যবসায় যেতে বলছেন, যার ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত যে আপনার বেশ ক্ষতি হবে। আপনি নিশ্চিত জানেন যে, এই ব্যাবসা কোনোভাবেই চলবে না। অথচ তিনি চাইছেন, আপনি আপনার জীবনের সব পুঁজি সেই ব্যবসায় ঢেলে দেন। সেই মুহূর্তে আপনার বাবার কথা না শোনা তার অবাধ্যতা নয়।

আসলে অভিভাবকের অনুগত থাকার অর্থ যৌক্তিকতার ঊর্ধ্বে থাকা নয়। অবশ্যই আমরা যখন তাদের অবাধ্য হই, আমরা কখনো কোনোভাবেই তাদেরকে অসম্মান করে তা করি না। হ্যাঁ, এটাও ঠিক যে তাদের অনেক আদেশ আমাদের জন্য যদি কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বা আমাদের প্রতি যদি তারা কঠোরও হন, সেক্ষেত্রেও তাদের আনুগত্য করতে হবে। যদি তারা অযৌক্তিক কিছু করতে বলেন কিংবা এমন কিছু যা অন্যকে সমস্যার সম্মুখীন করে তোলে, তা আমি করতে পারি না। যেমন: আমি যদি সব পুঁজি দিয়ে তাদের কথামতো এমন ব্যবসায় নেমে পড়ি যেটা সফল হবে না, তাতে করে আমি তাদের ইচ্ছামতো কাজ করেছি ঠিকই, কিন্তু আমি আমার বাচ্চাদের কষ্টের মুখে ফেলে দিয়েছি। আমার স্ত্রীকে কষ্ট দিচ্ছি এবং যারা আমার ওপর নির্ভর করে আছে তাদের সকলকে সমস্যায় ফেলছি। আমি এমন কাজ করতে পারি না। তারা আমাকে যা খুশি তা করতে বলতে পারেন, কিন্তু তারা আমাকে দিয়ে অন্য কারও ওপর অত্যাচার করাতে পারেন না। এভাবে অধিকার আদায় করা যায় না।

কিছু পরিবার আছে যারা স্বামীকে জোর করেন কেবল একটা অ্যাকাউন্ট রাখতে। আর তার অভিভাবকেরা হলেন, সেই অ্যাকাউন্টের কো-সাইডার। এদিকে স্ত্রী প্রতি সপ্তাহে হয়তো দু-চার হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। এভাবে জীবনযাপন করলেও চলবে না। আপনি এটা করতে পারেন না।

আপনি আপনার স্ত্রীকে বিয়ে করেছেন, আপনি তার অভিভাবক হয়ে তাকে তার বাবার কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন। আপনাকে এখন তার প্রতি সেসব কর্তব্য পালন করতে হবে, যা তার প্রতি তার বাবা করে এসেছেন। কিন্তু এখানে ঘরে সকলে তার সাথে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষের মতো আচরণ করে! যেন সে শ্বশুর-শাশুড়ির কাজের লোক কিংবা আপনার বোন অথবা অন্য কারও। এটা হবে চরম প্রতারণা। এটা এমন এক বিষয়, যার ব্যাপারে আপনাকে এবং আমাকে শেষ বিচারের দিন জিজ্ঞেস করা হবে।

অন্যদিকে আছে আরেক চরমপন্থিরা। একদিকে, আমরা দেখি বউকে বাড়ির কাজের মেয়ে বানিয়ে ফেলা হয়েছে, যা চরম অবমাননাকর এবং উদ্ভট। কোনোভাবেই যা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। আর অন্যদিকে আছে এমন সব স্ত্রী অথবা স্বামী, যারা তাদের শ্বশুরপক্ষের সকলের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ। যেমন: তারা বলেন, তোমার বাবার বাড়ির কারও সাথে আমি সম্পর্ক রাখতে চাই না। তাদের মুখও দেখতে চাই না। আমি চাই না তারা আমাদের বাসায় আসুক। আমি চাই না তুমি তোমার মায়ের বাসায় যাও, তার সাথে কথা বলো। আমি তাকে ঘৃণা করি, তাকে আমি সহ্য করতে পারি না ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে স্বামীর সাথে তার পরিবারের ভীষণ দূরত্ব সৃষ্টি করা হয়। এটাও এক ধরনের চরমপন্থা। এটাও অবিচার।

তারা আপনার স্বামীর অভিভাবক। আপনার স্বামীর ওপর তাদের অধিকার রয়েছে। তারা যেন তাদের নাতি-নাতনিকে দেখতে আসতে পারে। তারা যেন আপনার বাসায় ঝগড়া সৃষ্টি হবে- এমন দুশ্চিন্তা করা ছাড়াই আসতে পারে। অথবা তাদের দেখলে মুখটা কালো করে বসে থাকতে পারেন না।

এতে আপনি আপনার দিক থেকে আপনার স্বামীর ওপর অত্যাচার করছেন। কারণ, তার প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে আপনার অন্তত তার পরিবারের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করা উচিত। ভদ্রতা এবং শ্রদ্ধা করা এটুকুই তো! আপনার স্বামী আপনার ওপর এগুলো চাপিয়ে দিতে পারেন না ঠিকই, কিন্তু এই আচরণ তো আপনার নিজ থেকেই আসা উচিত। আর এগুলো তো এমন বিষয়, যা আপনাদের ঘোর কাটানোর জন্য বলছি, এই সৌজন্যমূলক আচরণগুলো তো সব মুসলিমই অন্য মুসলিমের সাথে করে থাকে।

হ্যাঁ, অনেক সময় জটিল অবস্থারও সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে। সত্যিই, সেগুলো খুব মারাত্মক পরিস্থিতিতে চলে যায়।

অন্যান্য অনেক কালচারের মধ্যে, বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারতে আমরা সকলে মিলে এক ছাদে থাকার প্রতি গুরুত্বারোপ করি। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের খরচাপাতি মা-বাবা চালাচ্ছেন। ভালো স্ত্রী হিসেবে পরিচয় পেতে তখন বউকে এই করতে হবে, সেই করতে হবে- এই নীতি বেশির ভাগ পরিবারের ক্ষেত্রেই কাজে দেয় না। আর যদি কাজে না দেয় আমি বলছি না আপনারা এ ক্ষেত্রে বিয়ে ভেঙে ফেলুন, তবে এটা বাস্তবিকই আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, এই পন্থা ইসলামিক নয়। যদিও আপনারা পুরো পরিবার মিলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তকে ইসলামের আড়ালে লুকিয়ে রেখে ভাববেন না যে, ইসলাম আপনার কাছে এটাই চায়। ইসলাম আপনার কাছে এমন কিছু প্রত্যাশা করেনি; এটা আপনার পরিবার চেয়েছে। কিছু ব্যাপারে আপনাকে পরিবারের সকলকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ.

'তোমরা যেসব নিয়ামত ভোগ করো, সে ব্যাপারে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে।' সূরা আত-তাকাছুর : ৮

আমার স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, মা-বাবা- এরা সবাই আল্লাহর নিয়ামত যা আমি উপভোগ করি। তাই আমার উচিত তাদের অধিকার আদায় করা।

আমি প্রার্থনা করছি, যারা ভাবেন বউকে দিয়ে ঝিয়ের কাজ করানোর বিষয়গুলো ইসলামের আদেশ, এই কথাগুলো যেন এসব ভ্রান্ত ধারণাকে কিছুটা হলেও কমিয়ে দেয়। ইসলাম এ ব্যাপারে এমন কিছু বলেনি। এটা কেবলই স্থানীয় সংস্কৃতির অপচর্চা। কুরআন একে সমর্থন করে না, রাসূল- এর সুন্নাহও না।

📘 বন্ধন পারিবারিক জীবনে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 বিয়ে আর ডেটিং কি এক

📄 বিয়ে আর ডেটিং কি এক


বিয়ের মাধ্যমে নিজের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ রাখার বিষয়টা নিয়ে একটু ভাবা যাক।

বর্তমান সময়ে একজন যুবক বিয়ে করার পূর্বে কী করছে? ধরুন, সে এদিক- সেদিক কিছু মুভি দেখেছে; মানে তওবা করে ধার্মিক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আরকি। আর এসব মুভির মাধ্যমে তার মধ্যে ভালোবাসা আর বিয়ে নিয়ে কিছু ধারণা গড়ে উঠছে। প্রায়ই ভাইয়েরা আমার কাছে এসে বলে, 'ভাই, আমার বিয়ে করা খুবই জরুরি।' তাদের ভেতর এমন একটা ধারণা হয়েছে যে, একবার বিয়ে হয়ে গেলেই যাবতীয় লালসা নিমিষেই উধাও হয়ে যাবে। জীবন শান্তিতে পূর্ণ হবে, আমরা একসাথে কুরআন পড়ব ইত্যাদি ইত্যাদি ফ্যান্টাসি সব চিন্তায় ভেসে বেড়ান তারা। তাদের মনে বিয়ে নিয়ে অতিরঞ্জিত একটি ধারণা গড়ে ওঠে।

আপনারা যারা বিবাহিত, তারা হয়তো ভাবছেন 'এই সব কী বলছে?' কারণ, আপনারা হয়তো- এসব অনুভূতির কথা ভুলেই গিয়েছেন। বিবাহিত জীবনে মাঝে মাঝেই আমাদের কঠিন কিছু চ্যালঞ্জের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু বিয়ে নিয়ে আধুনিক সময়ে নারী আর পুরুষের মাঝে ভালোবাসা, নির্ভরশীলতা বা বোঝাপড়ার যে ধারণা দেওয়া হয়, তার সাথে ডেটিং-এর ধারণার কোনো পার্থক্য নেই। ডেটিং মানে যত দিন সম্ভব আনন্দ করা। তারপর যখন কোনো কঠিন সময় আসে, আপনি সব ছেড়েছুড়ে দূরে সরে যান। এটাই ডেটিং, ঠিক কি না?

তাই আমরা যখন বিয়ে নিয়ে চিন্তা করি, ভাইয়েরা, এমনকী বোনেরাও যখন বিয়ে নিয়ে চিন্তা করেন, তারা বিয়েকে ডেটিং-এর মতোই ভাবেন।

কিন্তু আপনারা নিশ্চয় জানেন, বিয়ে আসলে ডেটিং-এর চেয়েও অনেক বড়ো কিছু। পরিবারের পেছনে টাকা পয়সা খরচ, ঘরের কাজকর্ম, আরেকজন মানুষের সাথে থাকতে শেখা, মাঝে মাঝে এগুলো খুবই কঠিন মনে হয়। আপনি আপনার মতো করতে চান, সে তার মতো করতে চায়। কখনো তোয়ালে বাঁকাভাবে রাখা নিয়ে বা ব্রাশ ভুল জায়গায় রাখা নিয়ে অথবা হয়তো কফিতে চিনি একটু বেশি হওয়া নিয়ে আস্তে আস্তে ক্ষোভ জমা হয়। প্রথম প্রথম ভালোবাসার কারণে হয়তো আপনি কিছু বলেন না। ভাবেন, নিজেই সামলাতে পারবেন। কিন্তু কয়েক বছর পর এত কিছু জমা হয়ে যায় যে, আপনি বলেন- 'আবার চিনি বেশি?' পাশের বাড়ি থেকেও আপনার গলা শোনা যায়।

কিন্তু ডেটিং-এ এমন কিছু হয় না। কারণ, আপনার যখন একজন মেয়েকে আর ভালো লাগে না, তখন আপনি আরেকজনকে জোগাড় করে নেন। অথবা সেই মেয়ের যখন মন উঠে যায় সে বলে, 'আমি তোমার গন্ধও পেতে চাই না; আমি গেলাম।' অর্থাৎ কিছু হলেই ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া। সব ছেড়ে দূরে সরে যাওয়া।

কিন্তু বিয়ে একটি শক্ত প্রতিজ্ঞা। জীবনভর একটা প্রতিশ্রুতি। কুরআনেও এই ব্যাপারে খুব গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবাহিত মহিলাকে কুরআনে আল মুহসানাত এবং পুরুষকে আল মুহসিনিন বলা হয়েছে।

আরবিতে 'ইহসান' মানে হলো কাউকে নিরাপদ দুর্গের মধ্যে রাখা। অনেকটা মিলিটারি ক্যাম্পের মতো। উদাহারণটা এমন যে, বাইরে শত্রু আছে। আর তাই যে মিলিটারি ক্যাম্পের ভেতরে আছে সে নিরাপদ। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, 'নারীরা যেন নিরাপদ প্রাচীরের মধ্যে আছে; আর কে তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে?' তাদের নিজ নিজ স্বামীরা। সবকিছু থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে। দুঃখ-কষ্ট, লজ্জাহীনতা, এমনকী অজ্ঞানতা থেকেও। কারণ, তাকে সঠিক শিক্ষা দেওয়াও তার স্বামীর দায়িত্ব। সে তাকে সব দিক থেকে নিরাপদ রাখছে।

আর যারা বিয়ে করতে ইচ্ছুক তাদেরকে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন- 'মুহসিনিনা গাইরা মুসাফিহিন'। তারা হলো সেসব মানুষ, যারা পরিবার গঠনের উদ্দেশ্যে নিজেদের পরিচর্যায় নারীদের এরূপ নিরাপত্তায় আনতে আগ্রহী।

শুধু তাদের নিজেদের কামনা পূরণ করার জন্য নয়। 'মুসাফিহ' বলতে এমন কাউকে বোঝায়, যে নিজের হরমোনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এ কারনেই সে বিয়ে করতে চায়। এটাই একমাত্র কারণ। তাই আল্লাহ বিয়ের সম্পর্কে আমাদের মনোভাব পরিবর্তন করেছেন। যদি আপনি সঠিক কারণে বিয়েতে আবদ্ধ হন, তাহলে আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে উঠবে। আর যদি আপনি ভুল কারণে বিয়ে করেন, তাহলে অবশ্যই আপনার সংসার অশান্তির হবে, আর আপনি কখনই সন্তুষ্ট হবেন না। ভুল কারণ কী কী হতে পারে? আমার হরমোনের সমস্যা আছে, তাই আমি বিয়ে করতে চাই। আর খুব সম্ভবত আপনাদের অনেকেই এটা কঠিন উপায়ে অনুধাবন করেছেন। কারণ, আপনার নিয়তে ভুল ছিল। আপনার নিয়ত থাকতে হবে একটি পরিবার শুরু করা, আল্লাহকে খুশি করা এবং সমাজে ভালো কিছু বৃদ্ধি করার।

তাই আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীনের অন্যান্য সবকিছুর মতো বিয়ের মূলনীতিও হলো, আপনি নিজের দায়িত্ব নিয়ে চিন্তিত থাকুন। আর আপনার অধিকার আদায়ের কথা ভুলে যান। আমি জানি যে এটা খুবই রুক্ষ শোনাচ্ছে। কিন্তু আপনি যদি এটা করতে পারেন, ছয় মাস চেষ্টা করে দেখুন কী সুন্দর ফলাফল আসে।

নিজের অধিকার নিয়ে ভুলে যান, শুধু নিজের দায়িত্বটুকু ভালোভাবে পালন করুন। এটা ভাবুন, আমি আমার স্ত্রীর জন্য কী করতে পারি? তার জন্য আমি আরও কী করতে পারি? আমি কি তাকে কোনো উপহার কিনে দেবো? কারণ, আমি অনেক দিন তাকে কিছু কিনে দিইনি? তারপর সে যদি কোনো ভুল করে থাকে, তাহলে এমন ভান করুন যেন আপনি তা লক্ষ্য করেননি।

দেখুন, কুরআনে তা কীভাবে বলা হয়েছে- وَإِنْ تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. 'যদি তোমরা ক্ষমা করো, এড়িয়ে যাও এবং মার্জনা করো, তবে (জেনে রেখো) নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল ও দয়ালু।' সূরা আত-তাগাবুন: ১৪

তাসফাহু মানে হলো পৃষ্ঠা দিয়ে ঢেকে রাখা। আপনি যখন একটি পৃষ্ঠা ঢেকে ফেলেন, তখন নিচের পৃষ্ঠায় কী আছে দেখা যায় না, তাই না? সেভাবে আপনার স্ত্রী যদি কোনো ভুল করে, তাহলে আপনি এমন ভান করুন যে, আপনি তা দেখেননি। এটাকে সরাসরি বলার দরকার নেই- 'তুমি আবার এমন কেন করেছ?' এভাবে আপনি তার ভুলগুলো ঢেকে রাখুন এবং পাশাপাশি আর আরও বেশি নিজের দায়িত্বগুলোর প্রতি যত্নবান হোন। আরও বেশি ধৈর্যশীল এবং সহনশীল হোন।

আর সে যখন আপনাকে আঘাত দিয়ে কথা বলবে, তখন আপনি হাসিমুখে তা গ্রহণ করুন এবং জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। নিজের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সীমা ছাড়িয়ে যান।

স্ত্রীর কাছ থেকে সবাই কিছু নির্দিষ্ট জিনিস চায়। সে আমার যত্ন নেবে, আমার চাহিদার ব্যাপারে খেয়াল রাখবে। আমার কিছু চাহিদা আছে, মানসিক প্রয়োজন আছে, সে আমাকে সঙ্গ দেবে। আরও বেশি ভালো ব্যবহার করবে। আমি যখন বাসায় ফিরি, তখন তার হাসিমুখে থাকা উচিত, সব সময় আমার ভুল ধরা উচিত না। সব সময় আমাকে বাজারের লিস্ট আর লন্ড্রির ব্যাপারে কথা বলবে না, ভালোভাবে কথা বলবে। আপনার মাথায় সব সময় এসব চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। কিন্তু জানেন কি, একজন মুমিন কার কাছে তার চাহিদার কথা বলে? একজন মুমিন সর্বদা তার মালিকের কাছে নিজের জন্য আশা করে। কারণ, আল্লাহ ছাড়া আপনি অন্য যার কাছেই কিছু আশা করবেন, আপনি হতাশ হবেন। এটা আল্লাহ প্রদত্ত একটি সর্বব্যাপী পন্থা। যতক্ষণ আপনি কোনো সৃষ্ট কিছুর প্রতি আশা পোষণ করবেন, আপনি অবশ্যই হতাশ হবেন।

আপনি চান আপনার বস আপনাকে প্রমোশন দিক; এটা ঘটবে না। আপনি বন্ধুর ওপর আশা করেন। ভাবছেন যে সে তার দেওয়া সময়মতো আসবে, সে দেরি করবে অথবা সে আসতেই পারবে না। আপনি সৃষ্টির প্রতি আশা করবেন, কোনো জিনিসের ওপর আশা করবেন; আপনাকে হতাশ হতে হবে।

আল্লাহ চান আমরা এটা শিখি যে, শুধু তাঁর কাছেই আশা করা উচিত। আর যখন আপনি মন থেকে এটা গ্রহণ করবেন, তখন কি ঘটবে জানেন? আপনার স্ত্রী যখন আপনার জন্য খুব অল্প কিছুও করবে, আপনি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হবেন। কারণ, আপনি তার কাছ থেকে কিছু আশা করেননি।

অনেক সময় এমন ঘটে, আমরা কিছু ইসলামি বইয়ে বা কিছু হাদিসে পড়ি স্বামীর অধিকার বা স্ত্রীর অধিকার নিয়ে। আর তারপর যা ঘটে তা হলো- স্বামীরা শুধু স্বামীদের অধিকার আর স্ত্রীরা শুধু স্ত্রীর অধিকার নিয়ে পড়া শুরু করে। সত্য আসলে উলটোটা। স্বামীদের কী নিয়ে পড়া উচিত? স্ত্রীর অধিকার নিয়ে। কিন্তু সবাই নিজেকে নিয়ে মত্ত। সবাই স্বার্থপর। এমনকী ইসলামের ব্যাপারেও তারা শুধু তাই জানে- যেটা তাদের কাজে লাগবে।

যেমন ধরুন, পিতা-মাতা কুরআনের ব্যাপারে কিছু না জানলেও এতটুকু ঠিকই জানে যে, কুরআনে সন্তানদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে- তোমরা মাতা-পিতার প্রতি সদয় আচরণ করো। তারা শুধু এতটুকুই জানে। এমনকী এটাও জানে না যে, এটা কুরআনের কোথায় আছে। তারা কেন শুধু এতটুকুই মনে রাখে? কারণ, এতটুকুই তাদের কাজে লাগে। তারপর যেমন পুরুষরা হয়তো কুরআন নিয়ে খুব বেশি জানে না! কিন্তু যখনি স্ত্রী কিছু বলে, সাথে সাথে স্বামী বলে উঠে ‘আর রিজালু কাওয়ামুনা আলান্নিসা’। কারণ, এটাই তাদের কাজে লাগে। তার মানে আপনি আল্লাহর কথামতো চলছেন না; বরং আল্লাহর দ্বীনকে নিজের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, ঠিক কি না?

আমাদের বুঝতে হবে যে, আমাদের দ্বীনে সর্বপ্রথম হলো নিজের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করা। তাই আমরা পড়ব আর এটা শিখব যে, কীভাবে আমরা নিজেদের স্ত্রীদের জন্য আরও ভালো স্বামী হব, আর স্ত্রীরা কীভাবে আরও ভালো স্ত্রী হবে।

কয়েকদিন আগে, স্বামী আর স্ত্রীর অধিকার নিয়ে আমি একটা খুতবা দিয়েছিলাম। আমি দুই ধরনের নোট বানিয়েছিলাম, একটাতে ছিল স্বামীদের প্রতি উপদেশ। আরেকটাতে ছিল স্ত্রীদের প্রতি উপদেশ। আর আমি খুতবাতে বারবার পুরুষদের বলেছি, স্বামীদের অধিকার নিয়ে পড়বেন না। শুধু স্ত্রীদের অধিকার নিয়ে পড়ুন। আমি আপনার জন্য নোট বানিয়েছি, আপনার স্ত্রীরটা আপনি পড়বেন না। শুধু নিজেরটা পড়ুন। কিন্তু খুতবা শেষে প্রায় ২০ জন আমার কাছে ছুটে এলো। ‘ভাই, আপনি স্ত্রীদের জন্য যে নোট বানিয়েছেন, আমাদের একটা কপি দিন।’ আমি বললাম- ‘না, আমি আপনাদের কপি দেবো না। কারণ, আপনারা বাসায় গিয়েই স্ত্রীদের দেখাবেন, এই যে পয়েন্ট নম্বর ৪ দেখ, দেখেছ? তুমি গত ৬ মাস এটা করোনি।’ এটা সত্যি সত্যি একটি সমস্যা। এটা সংসারে অনেক অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই যদি আপনি বিয়ের মাধ্যমে একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান, আপনাকে নিজ দায়িত্বের প্রতি আরও যত্নবান হতে হবে।

📘 বন্ধন পারিবারিক জীবনে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 আমার স্ত্রী হিজাব করছে না, কী করব

📄 আমার স্ত্রী হিজাব করছে না, কী করব


আমাকে প্রশ্ন করা হয়, আমার স্ত্রী হিজাব করছে না- আমি এখন কী করব? প্রথম কথা হচ্ছে, তাকে আর হিজাব করার ব্যাপারে কিছুই বলবেন না। হিজাব বিষয়ে তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিন। একেবারেই বন্ধ করে দিন। কারণ, প্রায় সময়ই দেখা যায়, নিজ পরিবারের সদস্যরাই তার পরিবারে দাওয়াহ দিতে সবচেয়ে অকার্যকর পন্থা অবলম্বন করছে। তারা অপরিচিত কারও কাছ থেকে কথা শুনতে বেশি আগ্রহী। তার উপদেশ গ্রহণ করতে রাজি, কিন্তু নিজের পরিবারের কাছ থেকে তা শুনতে চাইবে না। এটা কিন্তু আমাদের মতো বক্তাদেরও সমস্যা। তারা সারা দুনিয়াকে দাওয়াহ দিতে পারে। কিন্তু দেখা যায়, বাড়িতে শোনানোর জন্য তারা অন্য কারও টেপ বা অন্য কারও সিডি নিয়ে আসে। কারণ, পরিবারের সদস্যরা বলতে থাকে- 'তোমার কথা আর শুনতে চাই না! অনেক শুনেছি!'

আপনাকে তাই বুঝতে হবে, যখন পরিবারের কাছে দ্বীনের শিক্ষা দেবেন, তখন আপনাকে একটু কৌশলী হতে হবে। আপনাকে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। খুব দক্ষ একজন বক্তা খুঁজে বের করুন; যিনি আখিরাত ও শেষ বিচারের দিন সম্পর্কে বলেছেন। হিজাব না করাটা আপনার স্ত্রীর সবচেয়ে বড়ো সমস্যা না। হিজাব কেবল রোগের লক্ষণ, আসল অসুখ নয়। তার অসুখ হলো দুর্বল ঈমান। বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তার ঈমানকে চাঙা করুন। আর এজন্য সবচেয়ে শক্তিশালী বই হচ্ছে আল-কুরআন।

কুরআনের যে আয়াতগুলোতে মানুষকে স্মরণ করার কথা বলা হয়েছে, সেখানে কী কী নিয়ে কথা বলা হয়েছে বলেন তো? আখিরাত নিয়ে। অতীতের বিভিন্ন অবাধ্য জাতির করুণ পরিণতি নিয়ে। এর চেয়ে শক্তিশালী উপদেশ আর হয় না। এসব আয়াতের মেসেজ হচ্ছে, 'যেই মানুষেরা উপদেশ গ্রাহ্য করেনি, দেখ তাদের সাথে সাথে কী হয়েছিল। দেখ, তাদের সাথে কী হতে যাচ্ছে।' তাই না? আপনি যদি আপনার পরিবারে এমন অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন যে, প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট আপনারা একসঙ্গে কুরআনের কথা শুনবেন, ভালো কোনো বক্তার কথা শুনবেন, তাহলেই যথেষ্ট। আজকাল অসংখ্য বক্তাদের রিসোর্স সহজেই পাবেন। এগুলো কাজে লাগান।

আরেকটি বিষয়। কারও কারও বেলায় দায়ি হিসেবে আপনি হয়তো সেরা নন। কেউ হয়তো অন্য কারও কাছ থেকে সহজে উপদেশ নেবে। আমরা সবাইকে দাওয়াহ দিতে পারব না। হয়তো কিছু কিছু মানুষের জন্য আমাদের পদ্ধতি কার্যকর, কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আমরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সবারই আলাদা আলাদা অনুসারী আছে। ইনশাআল্লাহ, এই কথাগুলো আপনার স্ত্রীর ব্যাপারে সাহায্য করবে।

আরেকটা কথা। আমার মন বলছে, আপনার স্ত্রীর হিজাবের ব্যাপারে কোনো যুক্তিগত সমস্যা নেই। এমনটা না যে, তিনি হিজাবের গুরুত্ব সম্পর্কে সন্দিহান। তার সমস্যা আসলে তিনি আল্লাহর প্রত্যেকটি আদেশ পালনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। এই সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে তিনি এমনিতেই হিজাব এবং অন্যান্য কর্তব্য পালন করবেন, ইনশাআল্লাহ।

📘 বন্ধন পারিবারিক জীবনে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 সন্তানকে কীভাবে ইসলামের শিক্ষা দেবেন

📄 সন্তানকে কীভাবে ইসলামের শিক্ষা দেবেন


আমাদের সন্তানদের প্রতি যে সচেতনতা কাজ করে, এটা আসলে আমাদের দ্বীনের ভিত্তি। ব্যাপারটা কোনো নতুন কিছু নয় যে, আমরা মাত্র উপলব্ধি করতে শুরু করেছি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে চিন্তা কাজ করে, এটা আমরা পেয়েছি আমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর কাছ থেকে। আসলে তাঁরও আগে আমরা প্রথম যেই সচেতন বাবার কথা জানতে পেরেছি, তিনি ছিলেন নুহ (আ.)। নবি নুহ (আ.) তাঁর সন্তানের ব্যাপারে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছে তাঁর সন্তানকে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন।

আমাদের সন্তানের দ্বীনি বিষয়ে আমাদের সচেতনতা এই ধর্মের বহু পুরোনো ভিত্তি। এটা আমাদের ধর্মের একটি মৌলিক অংশ। সন্তান সচেতনতার বিষয়টা শেখানোর জন্য আল্লাহ আমাদের বেশ কয়েকবার এমন নবিদের ব্যাপারে জানিয়েছেন, যাদের নিজ সন্তানরা সমস্যাগ্রস্ত ছিল। একবার নয়, অনেকবার!

ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ অত্যন্ত নেককার দুজন সন্তান দিয়েছিলেন; ইসমাইল ও ইসহাক (আ.)। কিন্তু নুহ (আ.) তেমন পাননি। ইয়াকুব (আ.)-এর ছিল কয়েকজন অনুগত সন্তান, আবার কয়েকজন অবাধ্য। তবে বেশির ভাগই ছিলেন অবাধ্য। তার মানে আমাদের নবিদের মাঝেই এমন কেউ কেউ ছিলেন, যারা তাদের সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ কথাটা মাথায় রাখা জরুরি।

কারণ, যদি নবিদেরকে তাঁদের সন্তানের ব্যাপারে সমস্যায় পড়তে হয়, তাহলে আপনি-আমি যতই চেষ্টা করি না কেন, এসব সমস্যা আমরা এড়িয়ে যেতে পারব না! এটা আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্যের অংশ। আল্লাহ আমাদের কয়েকজনকে অনুগত সন্তান দান করবেন, কিংবা আমাদের কিছু সন্তান হবে অনুগত। আবার কিছু সন্তান আমাদের জন্য হবে পরীক্ষাস্বরূপ। সবাইকেই মানুষ করতে হবে। এটা আমাদের দ্বীনেরই একটা অংশ, আমাদের জীবনের অংশ।

দুটি বাচ্চা কখনোই এক রকমের হবে না। কেবল একটি সূত্র প্রয়োগ করে আপনার বাচ্চাদের বড়ো করতে পারবেন না। উদাহরণস্বরূপ ইয়াকুব (আ.)-এর কথাই ধরুন। আমরা এটা বিশ্বাস করি না যে, তিনি ইউসুফ (আ.)-কে বেশি স্নেহ করেছিলেন, আর অন্যদের কম যত্ন নিয়েছিলেন। তাই তারা ইউসুফের সাথে অন্যায় আচরণ করেছিল।

তিনি একজন নবি ছিলেন। অবশ্যই একজন নবির অন্যতম প্রধান কাজ ন্যায়নিষ্ঠভাবে জীবনযাপন করা। আর আপনি যদি আপনার এক সন্তানের প্রতি স্নেহশীল হন আর অন্য সন্তানের প্রতি তা না হন, তাহলে তাতে সুবিচার করা হলো না। একজন নবির পক্ষে এ রকম হওয়া অসম্ভব। অর্থাৎ বাবা হিসেবে যতটুকু করা সম্ভব ছিল, তিনি ততটুকু করেছিলেন। তবুও তার সন্তানরা তাকে পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ! শেষে তারাও তওবা করেছিলেন। কিন্তু নুহ (আ.)-এর বেলায় তাঁর ছেলে শেষ পর্যন্ত তওবা করেনি।

আবার তারা নবি ছিলেন দেখে আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, কারও খুব ভালো চাকরি থাকলে তাতে বাড়তি সুযোগ সুবিধা থাকে। যেমন: আপনাদের কেউ কেউ খুব ভালো চাকরি করেন। তাই আপনার পুরো পরিবারের জন্য আপনি হেলথ ইন্স্যুরেন্স পাচ্ছেন! তাই না? একজন নবির চাকরি তো বেশ ভালো পদের। তিনি আল্লাহর কর্মচারী! এখানে তো তিনি কিছু সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন; 'আমি অন্তত আমার পরিবারের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি।' অথচ কোনো নবিকেই তাঁর পরিবারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি; না তাঁর স্ত্রী আর না সন্তান। এমনকী আমাদের নবিজি -এর বেলাতেও না।

একটা অভাবনীয় হাদিস আছে, যেখানে তিনি তাঁর মেয়েকে বলছেন- 'ফাতিমা, মুহাম্মাদের কন্যা! আল্লাহর ব্যাপারে সতর্ক হও, আল্লাহর ব্যাপারে সাবধান থাকো। কারণ, তাঁর সামনে আমি তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারব না।

তোমার ওপরেও আমার কোনো অধিকার থাকবে না!' তিনি এই কথা বলছেন নিজের মেয়েকে! অন্য কথায়, তিনি আমাদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু শেখাতে চাইছেন। কেবল আমরা মুসলিম হয়েছি বলে বা মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলে পার পেয়ে যাব- ব্যাপারটা এমন না।

আমাদের যাদের মেয়ে সন্তান আছে তারা বিশেষভাবে অনুগৃহীত। আমরা নবিজির পরম্পরাকে বয়ে চলছি। তিনিও ছিলেন কন্যা সন্তানের বাবা। ওনার ছেলে হয়েছিল, কিন্তু তারা খুব অল্প বয়সেই মারা গিয়েছিলেন। আল্লাহ ওনাকে একাধিক মেয়ে সন্তান উপহার দিয়েছিলেন। তিনি তাদের লালন-পালনের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। কাজেই এমন মহৎ একটা দায়িত্ব পেয়ে আমাদের উচিত সম্মানিত বোধ করা।

ইসলামের আগে কিংবা বর্তমানে ভারত উপমহাদেশে, এই যুগেও মেয়ে সন্তান হলে মানুষের মুখ বিকৃত হয়ে যায়! এখন আমি সমাজকে মুখ দেখাব কীভাবে?

আপনি আপনার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সে প্রায় মরেই যাচ্ছিল। কিন্তু সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গে আপনার মা আপনাকে এসএমএস করলেন, 'খবর ভালো তো?' এ কথার মানে কী? তিনি আসলে জিজ্ঞেস করেছেন, ছেলে হয়েছে কি না। এরপর আপনি কোনো উত্তর না দিলে, তিনি আপনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, অসুবিধা নেই! এর পরেরবার হবে, ইনশাআল্লাহ। যেন মেয়ে হওয়ার ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক। সুবহানাল্লাহ, কত নিচে নেমে গিয়েছি আমরা।

যারা কন্যা সন্তানকে মর্যাদা দেয় না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন- 'যখন মেয়ে জন্ম নেয়, তার মুখ কালো হয়ে যায়'। যেন কালো মেঘ তার মুখকে ঢেকে রেখেছে। আর সে হতাশায় ডুবে ভাবছে, আমার এইমাত্র একটি মেয়ে হয়েছে। সুবহানাল্লাহ।

যুগ যুগ ধরে সন্তান বড়ো করার কাজে আমরা বেশ সফল। অবশ্যই নবি -এর সময় থেকে এখনকার সময় আলাদা। তবে বর্তমান সময়ের আগ পর্যন্ত, সন্তান লালন-পালনে মুসলিমদের সফলতা অন্য কিছুর তুলনায় অনেক ভালো ছিল।

দুনিয়া আজ চোখের পলকে বদলে যাচ্ছে। সরকার কীভাবে পরিচালিত হবে, তা থেকে নিয়ে আমাদের অর্থনীতি, দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক এমনকী পরিবারগুলোতেও

এই দ্রুত পরিবর্তনের দাগ লেগেছে। মুসলিম-অমুসলিম সব পরিবার এতে আক্রান্ত। আমাদের পরিবারের এখন যেমন অবস্থা দেখতে পাচ্ছি, এর আগে কখনো এমনটা ছিল না। সন্তানদের এখন যেভাবে বড়ো করা হচ্ছে, ইতিহাসের আর কোনো সময়ে কিংবা অন্য কোনো সংস্কৃতিতে এমনটা ছিল না। বিশ্বায়ন আর যোগাযোগ ব্যবস্থার বৃহৎ উন্নয়নের কারণে, তার ওপর ভোগবাদের চরম পর্যায় সৃষ্টি হওয়ায়, আমি একে পুঁজিবাদ বলি না; বরং বলি ভোগবাদ। আমরা পণ্যের আসক্ত ভোক্তায় পরিণত হয়েছি। আর এই মানসিকতা আমাদের ঘরের ভেতরেও দখল করেছে।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি। বাচ্চারা আপনাদের কাছে কী নিয়ে সবচেয়ে বেশি আবদার করে বলুন তো? তারা কীসের জন্য সব সময় বায়না ধরে বসে থাকে?

স্মার্টফোন? ট্যাব? আইপ্যাড? ল্যাপটপ?

তারা এসবের খবর কোথায় পায়? নবি ইউসুফ (আ.)-এর মতো তারা কি স্বপ্নে দেখতে পায়? তারা কি স্বপ্নে দেখে বলে, 'আব্বু, আমি দেখেছি একটা আপেল একটা ফোনের ওপরে পড়েছে... এই স্বপ্নের মানে কি?' না! তারা কোথায় দেখেছে আইপ্যাড? হয় তাদের বন্ধুর কাছে অথবা টিভিতে দেখেছে। তারা যখন দেখল তার অন্য বন্ধুদের এসব আছে, তারা আপনাদের বলে- 'আমি ওরকম স্নিকার চাই, আমি ওরকম শার্ট চাই, আমি ওরকম খেলনা চাই।' এ সমস্ত খেলনার আইডিয়া তারা কোথায় পায়? এসবের ইলহাম কোথা থেকে আসে? এগুলো এসেছে মিডিয়া থেকে।

আমরা আমাদের বাচ্চাদের সামনে মিডিয়ার জগৎটা উন্মুক্ত করে দিই। এই মিডিয়াই মূলত, বাচ্চাদের এসব খেলনার জন্য করজোড় বায়না করতে শেখায়! যেন আমরা তাদের এ সমস্ত খেলনা কিনে দিই। আর তখন আমরা তাদের এগুলো কিনে দিই। তা ছাড়া বাচ্চারাই যে এসবের একমাত্র শিকার তা কিন্তু নয়, আমরাও এর ফাঁদে পড়ি। একটা ব্যান্ডের ঘড়ি বা জামা পরলে নিজেকে খুব উচ্চ শ্রেণির মনে হয়, ঠিক কি না? হঠাৎ যেন আপনার মনে হতে থাকে সব মানুষের ভিড়ে আপনার মান-মর্যাদা বেশি। যেই মুহূর্তে আপনি অ্যাপল স্টোর থেকে একটা আইফোন হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসেন, হঠাৎ যেন আপনার নিজেকে খুব হ্যান্ডসাম লাগে! নিজেকে খুব 'কুল' লাগে।

এসব পণ্য হাতে থাকায় আমরা আসলে ভেবে নিই, মানুষ হিসেবে আমাদের মর্যাদা বেড়ে গিয়েছে। আর আপনি যদি কোনো ব্যান্ডের কাপড় না পরেন, অথবা ওই ফোনটা যদি আপনার না থাকে কিংবা আপনার এই 'খেলনাটা' নিই অথবা ওই 'খেলনাটা' নিই, তাহলে আপনি যেন মূল্যহীন। কোনো কারণে আপনি তাদের ক্যাটাগরির নন। অন্যেরা আপনার চেয়ে শুধু এ কারণে ভালো যে, তাদের হাতে যেটা আছে সেটা আপনারটার থেকে ভালো। আমরা মুসলিমরা কেমন যেন অচেতন ভোক্তায় পরিণত হয়ে গিয়েছি। এমনটাই আমাদের বর্তমান অবস্থা।

সন্তান লালন-পালন নিয়ে কথা বলার আগে আমাদের তাই আগে বুঝতে হবে, আমাদের চারপাশের দুনিয়াতে কী হচ্ছে। ভেবে দেখতে হবে নিজের সাথে কী হচ্ছে, সারা দুনিয়াতে কী হচ্ছে। এটা বেশ বড়ো একটা সমস্যা।

দ্বিতীয় সমস্যাটা হলো, আপনার কাছে সাফল্যের মানে কী, কীসে আপনার মর্যাদা বাড়ায়। এখন তো বাচ্চাদের এই মানসিকতা দিয়ে বড়ো করা হচ্ছে যে, তাদের মূল্য এসব প্রোডাক্ট দ্বারা নির্ধারিত হয়। যে ব্যান্ডের কাপড় পরছেন, যে বাসায় থাকছেন, যেই গাড়িটা চালিয়ে তাকে স্কুলে দিয়ে আসছেন, যে ব্যান্ডের ব্যাগ কাঁধে নিচ্ছেন এসব ব্যাপার। এগুলোই মানুষ হিসেবে আপনার দাম ঠিক করছে। আর এর সাথে যোগ হয়েছে আরও একটা সমস্যা জীবনে সফল হওয়া বলতে কী বোঝায়?

আপনাদের মধ্যে কারও কারও হয়তো শিক্ষার ভালো সুযোগ ছিল না। কিংবা আপনাদের বাবা মায়ের সেই সুযোগ হয়নি। আপনাকে শিক্ষিত করতে যা যা করতে হয়, তারা তাই করেছেন। সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। আপনিও আপনার জীবন থেকে এই শিক্ষা পেয়েছেন। তাই আপনি বলেন, 'আমার বাচ্চার জন্য আমি সর্বোচ্চ শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা রাখব।' এই ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে, তাকে প্রাইভেট স্কুলে পাঠাতে হলে হোক। বাড়ি ভাড়া করতে হলে হোক। ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে হলে হোক। অস্বস্তিকর পরিবেশে থাকতে হলেও সমস্যা নেই। তাদের সুশিক্ষার স্বার্থে আপনি সব করতে রাজি আছেন। এমনকী ধার-কর্জ করে, লোন নিয়ে ডোনেশন দিয়ে- এসব করতে হলেও তবু আমরা রাজি। কারণ, আপনাদের কাছে সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাচ্চার সুশিক্ষা।

আপনাদের সন্তানকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শিক্ষা না পেলে তুমি ব্যর্থ মানুষে পরিণত হবে। তোমাকে কলেজ পাস করতে হবে। এটা পাস করতে হবে, ওটা পাস করতে হবে।

আপনি যদি ভারত উপমহাদেশের হোন, তাহলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হলে আপনি ব্যর্থ। আপনি সার্জেন্ট হতে পারেননি দেখে আপনার বাবা-মা আপনার প্রতি আর সন্তুষ্ট হবেন না। আর ডেন্টিস্ট তো একেবারেই হবেন না, ডেন্টিস্ট হওয়া তো অপমাজনক! সেটা নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। এই আমাদের অবস্থা!

ডাক্তার হওয়া আমাদের একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ জানেন? কারণ, এতে সবচেয়ে বেশি টাকা আসে। এজন্য না যে আপনি কারও জীবন বাঁচাতে পারছেন কিংবা মানবতার সাহায্য করছেন। এ ধারণার সাথে ডাক্তার হওয়ার কোনো সম্পর্কই নেই! যদি ডাক্তার আর বাস ড্রাইভারদের বেতন সমান হতো, তবে দেশি কমিউনিটি বাচ্চাকে ডাক্তার বানানোর জন্য এত লাফালাফি করত না! আমাদের মাঝে নিজের সন্তানকে পৃথিবীর উদ্ধারকর্তা হিসেবে দেখার কোনো উৎসাহ নেই।

ছেলে ডাক্তার হয়ে ফিরলে মা-বাবার খুশি দেখে কে। কিন্তু সেই ছেলে যদি বলে, 'আমি তিন বছরের জন্য এনজিওতে চলে যাব। আমি বন্যা কবলিত এলাকায় তিন বছরের জন্য কাজ করব। এরপর আমি সোমালিয়া যাব, তারপর পাকিস্তানে, তারপর বাংলাদেশে, তারপর মালয়েশিয়াতে; আমি শুধু সেবা দান করব; বেতন নেব না, কোনো লাভের জন্য কাজ করব না। তখন সেই বাবা-মা বলবে, 'ইয়া আল্লাহ! তোমাকে ডাক্তার বানানোর জন্য আমরা আমাদের সব টাকা-পয়সা ঢেলে দিয়েছি। আর এখন তুমি এসব করবে? ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি আর ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর মতো তোমার তো রক্তচোষা মেশিনের অংশ হওয়া উচিত ছিল। আমরা তো তোমাকে তা- ই বানাতে চেয়েছিলাম! তুমি কেন মানুষের জীবন বাঁচাবে? তোমার সমস্যা কী?' এই হলো আমাদের অবস্থা। আর এদিকে আমরা ভাবি, আমাদের ছেলেমেয়েদের মাঝে ঝামেলা আছে! আমাদের উচিত আয়নায় নিজেদের দেখা। আমরা আসলে কাদের তৈরি করছি? আমাদের মানসিকতায় গোঁড়া থেকে খুব বড়ো একটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমাদের কাছে আজ সাফল্য মানে টাকা-পয়সা।

শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের ধারণা হলো, এমন একটা ক্যারিয়ার যাতে অনেক টাকা আসে। সবকিছুর মূলেই অর্থ-সম্পদ। আপনি যদি সফল হন, এর মানে এই যে আপনার অনেক টাকা আছে। আপনি যদি সফল হন, তার মানে এই যে আপনি শিক্ষা অর্জন করেছেন। শিক্ষা অর্জন করেছেন এমন কোনো ফিল্ডে, যেখানে আপনার একটা ভালো ক্যারিয়ার হবে। যার মানে যেখানে আপনি অনেক টাকা-পয়সা পাবেন। এটাই এখন সাফল্য। কথা শেষ পর্যন্ত একই। এই ধারণা কিন্তু আগেকার যুগ থেকে ভিন্ন।

আগে সবার ধারণা ছিল, আপনি শিক্ষিত হয়েছেন এর মানে আপনি নিজেকে বোঝেন। আপনার চারপাশের জগৎটাকে বোঝেন। আপনি পৃথিবীকে আরও সুন্দর বাসযোগ্য করে তোলার জন্য কাজ করছেন। এর জন্য কখনো আপনাকে ইতিহাস পড়তে হবে, কখনো সামাজিক বিজ্ঞান পড়তে হবে, কখনো পলিটিক্যাল সাইন্স পড়তে হবে। কখনো আপনার মিডিয়া নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে, কখনো সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। সমাজে অবদান রাখতে হলে বিভিন্ন ফিল্ডে পড়াশোনা করতে হবে। কেবল একটা ক্ষেত্র নিয়েই পড়ে থাকলে চলবে না। তা ছাড়া সবচেয়ে সফল কমিউনিটি যে দিক থেকেই বিচার করুন না কেন, আমেরিকার সবচেয়ে সফল কমিউনিটি হলো তারাই, যারা নিজেদের ছেলেমেয়েকে কেবল একটা ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে রাখেনি।

আমার এক বন্ধু বলেছিল, 'যদি স্টিভেন স্পিলবার্গ পাকিস্তানি ঘরে জন্ম নিতেন, তিনি একজন ডাক্তার হতেন'। ওনার ফিল্মস্কুলে পড়ার কথা শুনে বাবা-মা বলতেন, 'তুমি ফিল্ম স্কুলে পড়তে চাও! এসবের মানে কী? তোমার সমস্যা কী? তুমি কি মেডিসিন শাস্ত্রে ফেল করেছ?' তাদের ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যেত।

সন্তান বড়ো করা সম্পর্কে এখন কিছু কথা বলি।

সবচেয়ে আগে আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। তারা যদি আমাদের মাঝে সফলতার সঠিক সংজ্ঞা খুঁজে না পায়, তারা যদি আমাদের ব্যক্তিত্বে, দৈনিক কথাবার্তায় এর প্রতিফলন না দেখতে পায়, তবে আমরাও এটা আশা করতে পারি না যে, তারা নিজেরা নিজেরাই সফলতার সঠিক মানে বুঝে নিয়েছে। তাদের কাছে এ দিকনির্দেশনা আমাদের কাছ থেকেই আসতে হবে।

সারা দিন আমরা সেসব বিষয় নিয়েই কথা বলি, যেগুলো আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যখন স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন, তখন বাচ্চারা তা শুনতে থাকে, তাই না? তাদের কান সব সময় খোলা থাকে।

এখন আপনারা যদি বিলসংক্রান্ত কথাবার্তা বলেন, বাড়ি ভাড়া নিয়ে কথা বলেন কিংবা আপনারা সব সময় মুভি নিয়ে কথা বলেন কিংবা অন্য পরিবার সম্পর্কে কেবল আজেবাজে কথা বলেন, তারা কী করে না করে এসব আলাপ-আলোচনা করেন, তাহলে তারা ভেবে নেবে বড়োরা এমনই। আমার বাবা-মা এসব করে। এগুলোই তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।

অন্যদিকে, আপনি আর আপনার স্ত্রী যদি কুরআন নিয়ে কথা বলেন, আখিরাত নিয়ে কথা বলেন, অন্যের জন্য ভালো কিছু করার কথা বলেন, কাউকে সাহায্য করার কথা বলেন, তাহলে তারা আপনারটা দেখেই শিখে নেবে। এ ব্যাপারে আপনার তাকে লেকচার দিতে হবে না। তারা কেবল আপনাকে দেখবে। সবচেয়ে কার্যকর প্যারেন্টিং তো সেটাই, যেখানে বাচ্চাকে কোনো কাজ করাতে বাবা-মায়ের কিছু বলতে হয় না; তারা দেখতে দেখতে শেখে।

আপনাদের মাঝে অনেকেই ভাবেন, 'আমি যদি নোমান ভাইয়ের লেকচারে নিয়ে এসে আমার বাচ্চাদের বসিয়ে শোনাতে পারি, ইনশাআল্লাহ এরপরে তারা নীতিবান হয়ে যাবে। শুধু কয়েকটা ইউটিউব ভিডিও সব মুশকিল আসান।' এতে আসলে কোনো উপকার হবে না।

আপনার সন্তানের প্রকৃত কাউন্সিলর আপনি। আমার সন্তানের প্রকৃত কাউন্সিলর আমি। আমাদেরকে তাদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হতে হবে।

আগেকার যুগে মা-বাবা আর সন্তানদের মাঝে একটা প্রকৃতজাত সম্পর্ক বিরাজ করত। কিন্তু আজকাল বাবারা দিনের বেশির ভাগ সময় কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাসায় আসেন ক্লান্ত হয়ে। আর যে সময়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে বাসায় আসেন, তার অধিকাংশ বাচ্চারা তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। আবার সকালে যখন তিনি অফিসে যান, বাচ্চারা তখনো ঘুম থেকেই উঠেনি। আর তেমন যদি না- ও ঘটে, তিনি হয়তো যাওয়ার আগে নাস্তার সময় বাচ্চাদের ৫ মিনিটের জন্য দেখতে পান। তিনিও চলে যান তারাও চলে যায়। তার মানে সাত দিনের মাঝে পাঁচ দিনই বাবা আর বাচ্চার মাঝে তেমন কোনো কথাবার্তা হয় না।

তাও যদি হয় সেটা 'তুমি হোমওয়ার্ক শেষ করেছ?' 'আচ্ছা, আমার জন্য পানি নিয়ে আসো।' এতটুকুর মাঝেই সীমাবদ্ধ। তারপর আসে ছুটির দিন। কিন্তু ছুটির দিনগুলোতে এখানে দাওয়াত থাকে, ওখানে পার্টি থাকে, আপনার ১২টা পর্যন্ত ঘুমানো লাগে, বাসায় কিছু কাজ করা লাগে ইত্যাদি ইত্যাদি।

আপনি তখনো সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান না। তাদের সঙ্গে সত্যিকারের কথাবার্তা বলেন না। তাদের সাথে আপনার আসলে কোনো যোগাযোগ হয় না। এটাই মূল সমস্যা।

সপ্তাহের মাঝে হোক, শেষে হোক, আমাদের বাচ্চাদের জন্য সময় বের করে নিতে হবে। এটাই আপনার এবং আমার জন্য কার্যকর উপদেশ। কেবল সন্তানদের সাথে কথা বলার জন্য আমাদের সময় খুঁজে নিতে হবে। তারা কী বলে শুনুন। আজগুবি কথাবার্তা বললে তা-ই শুনুন। আমাদের উচিত তাদের জীবনের একটা বড়ো অংশ হওয়া।

আপনাদের অনেকের ক্ষেত্রেই বাস্তবতা হচ্ছে সন্তানের কাছে আপনার একমাত্র ভূমিকা হলো- আপনি বাড়ির একটা দেয়ালের মতো। আপনি জানেন, এ ধরনের বাবা-মায়ের সাথে কী হয়। সন্তান যখন একটু বড়ো হয়, তখন তারা তাদের আচরণের প্রতিফল পায়।

যখন তাদের ১৪/১৫ বছর বয়স হয়, তারা কিছুটা স্বাধীন হয়ে যায়। ধরুন, তখন তারা আপনার কাছে এসে একটা গাড়ি কিনে দিতে বলছে। আর আপনি বললেন, 'না, তোমার এখন কেন গাড়ি লাগবে?' সন্তান তখন বলবে, 'ঠিক আছে, আমি আমার ফ্রেন্ডদের সাথে চলে যাচ্ছি। আমি একটা চাকরি জোগাড় করে টাকা জমিয়ে নিজের গাড়ি নিজেই কিনে ফেলব।' এরপর একদিন হঠাৎ করেই আপনি ছেলের কাছে শুনতে পাবেন-

'বাবা, আমি এখন আলাদা থাকছি।'

'আলাদা থাকছ মানে? তুমি কোথায় যাবে?'

'কোথায় থাকব সেটা কোনো ব্যাপার না। আমি এখন বড়ো হয়েছি।'

আর তখন আপনি দৌড়ে মসজিদে আসেন, 'ইমাম সাহেব! আমাকে একটা সূরা বলে দিন, একটা দুআ বলে দিন যাতে আমার ছেলেটা ভালো হয়ে যায়।'

এভাবে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। ১৭-১৮ বছর বয়সে গিয়ে যখন সংকটে পড়েন, তখন এসব ভাবলে চলবে না। তাদের গড়ে তুলতে হবে আরও অনেক অনেক আগে থেকে।

এখন আমি ১০ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের মা-বাবার জন্য কিছু পরামর্শ দিচ্ছি। আমি নিজেও এই দলে। আমার সবচেয়ে বড়ো সন্তানের বয়সও দশ বছর।

আমাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব হলো- সন্তানকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়া। যখন নবিরা (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) দ্বীন শিক্ষা দিতেন, তারা সকলের জন্যই তা করতেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআনে খুব কম জায়গাতেই বাচ্চাদের শেখার বা উপদেশ নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু যখনি তিনি এ সম্পর্কে বলেছেন, সেটা সব সময়ই বাচ্চার মা-বাবার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কথাটা আবার খেয়াল করুন। আল্লাহ যখনই কুরআনে বাচ্চাদের সঠিক পথপ্রাপ্ত হওয়ার কথা বলেছেন, সেটা সব সময়ই বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে হয়েছে। আর অভিভাবকের মধ্য থেকে তা সব সময়ই বাবার তরফ থেকে হয়েছে। কারণ, মা তো সারাক্ষণ বাচ্চার পাশেই থাকেন। একজন মা'কে বাচ্চার পাশে সব সময় থাকার জন্য কোনো অতিরিক্ত কষ্ট পোহাতে হয় না। কিংবা বাচ্চার সব সময় খেয়াল রাখতে বা তাকে উপদেশ দিতে হয় না। মাকে কখনো মা হওয়ার ব্যাপারে ট্রেনিং নিতে হয় না; এটা প্রকৃতিগতভাবেই হয়। আল্লাহ তাদের মাঝে এই অনুভূতি দিয়ে রেখেছেন।

অন্যদিকে বাবাদের অবস্থা শোচনীয়। সত্যিকারের বাবা হওয়ার জন্য আমাদের একটা ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রকৃতিগতভাবে আমাদের মাঝে এই অনুভূতি আসে না।

যখন একজন মা তার সন্তানকে জন্ম দেন, তার সব আবেগ-অনুভূতি বদলে যায়। মুহূর্তেই সব বদলে যায়। কিন্তু একজন বাবার ক্ষেত্রে ৩-৪ দিন পার হওয়ার পর বন্ধু যখন জিজ্ঞেস করে, 'তোমার তো শুনেছি বাবু হয়েছে'। আপনি বলেন, 'হ্যাঁ, কিন্তু আমি এখনও ধরতে পারিনি কী হয়েছে!'

কেউ আপনাকে বুঝিয়ে দিলে আপনি বুঝতে পারেন ব্যাপারটা। আমি কি বলছি বুঝতে পারছেন? আপনি যেন এখনও ধরতেই পারছেন না কী হয়েছে। কারণ, বাবা হওয়ার যে উপলব্ধি তা স্বভাবগতভাবে আমাদের মাঝে আসে না। আমাদের এই অনুভূতি গড়ে তুলতে হয়, এর পেছনে শ্রম দিতে হয়, তাই না? এজন্যই আল্লাহ বলছেন- লোকমান (আ.) সময় করে নিচ্ছেন, সঠিক সুযোগটা বেছে নিচ্ছেন বাচ্চার সঙ্গে কথা বলার জন্য। আমরা দেখেছি ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের সাথে বলছেন-

يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ.

'আমরা ইবরাহিম (আ.)-কে পেয়েছি, তিনি তাঁর সন্তানদের ঠিক একই উপদেশ দিয়েছেন, যা ইয়াকুব (আ.) বলেছেন। বিষয়টা খুবই চমৎকার।'

নিজেকে কীভাবে গড়ে তুলতে হবে বাবারা শুধু সেটাই শেখাননি, ভবিষ্যতে তাকে কীভাবে ভালো বাবা হতে হবে তাকে সেটাও শেখাচ্ছেন। এই মহান দায়িত্ব আমাদের, বাবাদের। আমরাই আমাদের সন্তানকে শেখাব কীভাবে একদিন ভালো বাবা হতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00