📘 বন্ধন পারিবারিক জীবনে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 পুরুষেরা জান্নাতে হুর পাবে, নারীরা কী পাবে

📄 পুরুষেরা জান্নাতে হুর পাবে, নারীরা কী পাবে


টিটকারি করে অনেককে বলতে শুনবেন, 'কি, তোমাদের জন্য জান্নাতে নাকি ৭০টা করে পরি থাকবে? তোমরা নাকি এজন্য মানুষ মারো?'

জান্নাতে হুর পাওয়া নিয়ে লুকোছাপা বা লজ্জার কিছু নেই। আল্লাহ কুরআনে এই ব্যাপারে নিজেই বলেছেন। আমি যখন ইসলামের ব্যাপারে জানতে শুরু করলাম, তখন কিছু বিষয় ছিল যা আমি একা একা বের করতে পারিনি। তার মধ্যে একটা ছিল- পুরুষরা হুর পাবে, নারীরা কী পাবে?

আমার মাথায়ও কিন্তু এই প্রশ্ন এসেছিল। কেন এসব রোমাঞ্চকর পুরস্কার, সুন্দরী স্ত্রী- এই ধরনের জিনিসগুলোর কথা কুরআনে বলা হয়েছে। আর শুধু তাই না; এগুলোর বর্ণনাও খুব বিস্তারিতভাবে এসেছে।

একবার ড. ইসরার আহমেদ রাহিমাহুল্লাহর সাথে খুবই অল্প সময়ের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে কথা বলেছিলাম। তিনি বেশ রাশভারী চরিত্রের মানুষ ছিলেন। অবশ্য এখন তিনি মারা গেছেন।

তখন তিনি নিউইয়র্কে ছিলেন। আমি ওনাকে প্রথমবারের মতো ওনার মাথার বিশাল টুপিটা ছাড়া দেখেছিলাম। তিনি বেশ আরাম করে বসে ছিলেন। ওনার পাশে আরেক আংকেলও ছিলেন। ওনার চুলগুলো উলটো করে আঁচড়ানো।

আর উনি বসে কীসের চিন্তায় যেন মগ্ন ছিলেন। আমি ওনাকে দেখে বেশ ভয়ই পাচ্ছিলাম। তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম। বেশ একটা অস্বস্তিকর নীরবতা। আমার মনে অনেকগুলো প্রশ্ন খুটখুট করছিল। একপর্যায়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আল্লাহ কেন কুরআনে হুরের ব্যাপারে বলেছেন?'

তিনি আমাকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু কথা বলেছিলেন, যা আমার কাছে বেশ যৌক্তিক মনে হয়েছে। তিনি এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা ব্যাখ্যা করেছেন। এ ছাড়াও আরেকজন আলেম, তাঁর সাথেও আমার নিউইয়র্কেই দেখা হয়েছিল, তিনি আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। যাহোক, সেসব ব্যাখ্যাতে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমি জানি না, আপনারা সন্তুষ্ট হবেন কি না। কিন্তু আমি নিশ্চিত আমি সন্তুষ্ট।

তিনি বলেছেন, আমাদের সমাজে ছেলেরা সব সময় আশেপাশে অশ্লীলতা দেখে। নবিজি ﷺ ওনার উম্মাহর জন্য এই বেহায়াপনা/অশ্লীলতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। আর আমাদের ধর্ম অন্যান্য ধর্মের তুলনায় ছেলেমেয়েদের মেলামেশার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি রক্ষণশীল ও নিয়ন্ত্রিত। সেটা ছেলেমেয়েদের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে দুই বিপরীত লিঙ্গের মাঝে কী ধরনের কথোপকথন হবে, কোনো নন-মাহরামের সাথে একা থাকলে কী হবে, কোনো মজলিশে কী ধরনের আয়োজন হবে- ছেলেমেয়ের জন্য সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। এ ক্ষেত্রে অনেক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

এমনকী সূরা নুরে তো কেউ আপনার বাড়িতে এলে কীভাবে ঢুকতে হবে, সেটা পর্যন্ত শেখানো হয়েছে। কেউ দরজা নক করল আর ঢুকে পড়ল- এ রকম হবে না। মহিলাদের আগে নিজেদের ঠিকঠাক করার সুযোগ দিন। আলাদা রুমে যেতে দিন... ইত্যাদি। এত বিস্তারিত নিয়মকানুন বর্ণনা করা হয়েছে যে, দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় আছে যখন আপনার সন্তানও এমনকী আপনার রুমে প্রবেশ করতে পারবে না। তাদেরকে বাইরে থেকে নক করতে হবে। বাসার মাঝেও ছেলেমেয়েদের মেলামেশার জন্য কিছু নিয়মাবলি আছে। এটা বেশ চমৎকার একটা ব্যাপার। আপনারা হয়তো এ বিষয়টাও জানেন যে, ছেলেমেয়েরা একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর গায়ে দেওয়ার কাঁথাও শেয়ার করতে পারে না। আমাদের ধর্মে এ রকম অনেকগুলো অসাধারণ বিধিনিষেধ, ও সতর্কতা রয়েছে। এটা ভেবে দেখার মতো বিষয়।

আর এটার ঠিক উলটো বিবরণ হচ্ছে জান্নাতের। সেখানে যুবক ছেলেরা সুন্দরী স্ত্রী পাবে। সেখানে কোনো কিছুতে কোনো বাধা থাকবে না। সে যা মন চাইবে তাই পাবে। আর সেই স্ত্রীদের বিস্তারিত বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে।

ড. ইসরার আহমেদ ঠিকই বলেছিলেন- কোনো ছেলে কলেজে গিয়ে যখন, চোখ নিচু রাখে। যদিও সেখানে খুবই কম কাপড় পরিহিত মেয়েরা থাকে। মেয়েটিকে বলে- 'হেই, কেমন আছো?' কিন্তু সেই ছেলেটি ফিরে তাকায় না। সে বলে, 'আল্লাহ আমার জন্য উত্তম প্রতিদান রেখেছেন।' সে নিজেকে এর থেকে বাঁচিয়ে চলে। যদিও তার উত্তেজিত হরমোনগুলো তাকে বলে, একটু দেখিই না। তার চোখগুলো তার কাছে ভিক্ষা চায় তাকানোর জন্য। তার কৌতূহল তাকে তাকাতে উসকানি দেয়। সেখানে সুযোগ, স্বাধীনতা, যৌবন, তেজ, সৌন্দর্য সবকিছু থাকে তার জন্য। কিন্তু সে বলে, আমি ফিরে তাকাব না, আমি এটা করব না। এ ক্ষেত্রে আমি একটি ভুল পদক্ষেপও নেব না। আল্লাহর কাছে আমার জন্য উত্তম প্রতিদান আছে। তার সব বন্ধু সেই ভুল পথে যায়, কিন্তু সে যায় না।

এটা শুধু আল্লাহর অসাধারণ ন্যায়বিচার যে, জান্নাতে তিনি সেই পানীয় প্রদান করবেন; যা এখানে আমাদের জন্য নিষিদ্ধ। সে আনন্দগুলো প্রদান করবেন, যেগুলো থেকে আমরা নিজেদের এই দুনিয়ায় নিবৃত রাখি। তিনি বলবেন- দেখ, তুমি কীভাবে নিজেকে বিরত রেখেছিলে। এই নাও, এখন উপভোগ করো। আমি তোমার জন্য দরজা অবারিত করে দিলাম। এগুলো হচ্ছে আসলে সেই বাধা-নিষেধের বিপরীত, যেগুলো আল্লাহ এই পৃথিবীতে দিয়েছিলেন। এই জন্য এখানে শালীনতা এত জরুরি। আপনারা জান্নাতে আনন্দ-ফুর্তি করতে চান? তাহলে এখানে নিজের শালীনতা বজায় রাখুন।

আল্লাহ জানেন আমাদের আকাঙ্ক্ষা আছে। তিনি আমাদের চিন্তাগুলোকেও অস্বীকার করেন না। তিনি জানেন, ওয়াসওয়াসা সব সময় আমাদের মনে আসে। সাইকোলজিতে পাবেন, একজন সাধারণ মানুষ এসব বিষয়ে দিনে কতবার চিন্তা করে। আপনারা এটা অস্বীকার করতে পারবেন না। আপনারা জানেন, এটা মানুষের মাঝে আছেই। মানুষের ভেতরে এগুলো আল্লাহই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-

زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ.

'মানুষের কাছে সুশোভিত করা হয়েছে নারী।' সূরা আল-ইমরান: ১৪

এখন প্রশ্ন হলো- আল্লাহ যখন পুরুষদের জন্য এমন পুরস্কারের বিবরণ দিয়েছেন, তাহলে নারীদের জন্য কেন দেননি? কোনো রাখঢাক না রেখে যদি বলেন, তাহলে প্রশ্নটা এ রকম যে, পুরুষরা একাধিক স্ত্রী পায়, কিন্তু তারা কেন একাধিক স্বামী পায় না?

আমার এক অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলি। একবার এক সানডে স্কুলে কিছু কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে আমাকে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা করতে বলা হয়েছিল। তাদের উভয়কেই একই প্রশ্ন করা হয়েছিল- যদি তোমাকে এমন কিছু চাইতে বলা হয়, যেটা তোমরা পাবে। যতবার ইচ্ছা চাও পাবে, কোনো বাধা থাকবে না। কেউ জানতে পারবে না, তোমরা কোনো সমস্যার সম্মুখীনও হবে না, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে না। তোমরা যা চাও এক্ষুনি পাবে, সেটা কী হবে? কী চাইবে?

এই প্রশ্নটা ১০০ কিশোর ও ১০০ কিশোরীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। উম্মাহর ছেলেদের মাঝে যেন ইজমা আছে এ ব্যাপারে! বানান ভুল বাদে সেখানে কোনো বৈচিত্র নেই। উত্তরে কোনো বৈচিত্র নেই।

মজার উত্তরগুলো এসেছিল মেয়েদের কাছ থেকে। আরেকটা ব্যাপার হলো- ছেলেদের উত্তর তা-ই ছিল, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন- 'মানুষের কাছে সুশোভিত করা হয়েছে নারী।' সূরা আল-ইমরান : ১৪

পুরুষদের মাঝে নারীদের আকাঙ্ক্ষা সহজাত। আল্লাহ পুরুষদের মাঝে এই আকাঙ্ক্ষা দিয়েছেন। এটা যেন তারই প্রমাণ।

মেয়েরা বেশ মজার উত্তর দিলো। একজন বলে, 'আমাকে কি আরও ৫ মিনিট সময় দেওয়া যাবে?' অনেকে আবার তাদের পেপারটা জমা দেওয়ার সময় বলে, 'না, না! আমি কি আমার পেপারটা ফেরত নিতে পারি কারণ, আমার মাথায় অন্য উত্তর এসেছে।' কেউ কেউ একবার কেটে লিখে, তারপর আবার কেটে লিখে। অনেকে একাধিক উত্তর দিয়েছিল কারণ, তাদের একটা উত্তরে হবে না। আমার কাছে প্রিয় উত্তরটি ছিল- 'এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।' অনেকজনকেই এ রকমটা লিখতে দেখলাম।

মেয়েদের কেউ লিখেছে, আমি শুধু আমার মায়ের সাথে থাকতে চাই। আবার কেউ বলেছে পনি (ক্ষুদ্রকায় ঘোড়া)। যাহোক, সব ধরনের উত্তর ছিল।

আবার কেউ লিখেছে, আমার ভালোবাসার পুরুষের সাথে থাকতে চাই। আমি সব ধরনের উত্তর পেয়েছিলাম। কোনো নির্দিষ্ট একটা উত্তর কিন্তু ছিল না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের পুরুষদের আবেগকে একমুখী বানিয়েছেন। আমরা শুধু একভাবেই চিন্তা করি। সাধারণভাবে বোঝাতে চাইছি যে, অন্যরকম কিছু পুরুষও আছে যারা নারীদের ভালোবাসার থেকেও বইকে বেশি ভালোবাসে। কিন্তু আমাদের বেশির ভাগকেই আল্লাহ একই চিন্তাধারার করেছেন এবং আল্লাহ এখানে সেটার কথাই উল্লেখ করেছেন। ঠিক কি না? আমি বোনদের খুশি করার জন্য বলছি না। এটা আমার নিজের বিশ্বাস। আর আল্লাহ যা বলেছেন, আমি সেটা ব্যাখ্যা করতে লজ্জিতও না। আল্লাহর কালামের ব্যাপারে আমাদের সৎ থাকতে হবে। কাউকে খুশি বা বেজার করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমি আল্লাহর কালাম সম্পর্কে যতটুকু বুঝেছি, সেটাই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি।

আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে জান্নাতে নারীদের জন্য পুরস্কার আরও বৈচিত্র্যময়, অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। আমি আপনাদের জন্য একটা আরবি বাক্য শেয়ার করব, 'রুব্বা সুকুতিন আদাল্লু মিন কালামিন' অর্থাৎ নীরবতা অনেক সময় কথা বলার থেকেও বেশি বোঝায়। আল্লাহ তায়ালা নীরব আছেন এই ব্যাপারে কারণ, এই নয় যে পুরস্কার নেই; বরং তা ভাষায় অবর্ণনীয়। আর এই বিষয়টি কুরআনে অন্য ক্ষেত্রেও আছে। বিভিন্ন আমলের জন্য বিভিন্ন পুরস্কার রয়েছে। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু আমল আল্লাহর কাছে এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে, সেই আমলগুলোর পুরস্কার ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তো ঐসব আমলের জন্য আল্লাহ কী বললেন? 'ফা আজরুহু আলাল্লাহ'- 'এগুলোর পুরস্কার আল্লাহর কাছে'। এগুলো আল্লাহ দেখবেন। এগুলো ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, তিনি খেয়াল রাখবেন, এই দায়িত্ব তাঁর। প্রসঙ্গক্রমে আরেকটা কথা বলছি। এই ধরনের অবর্ণনীয় পুরস্কার তাদের জন্যও আছে, যারা প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যদের মাফ করে দেয়। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মাফ করে দিলে সে এই অবর্ণনীয় পুরস্কার পাবে।

নারীদের পুরস্কারের কথা বলা হয়নি, তার মানে এই নয় যে তাদের কোনো পুরস্কার দেওয়া হবে না; বরং এটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কল্পনার ওপর। প্রসঙ্গক্রমে বলি, কোনো মুসলিম নারী-পুরুষের এমনটা ভাবা উচিত না যে তারা অল্প প্রতিদান পাবে। জান্নাতে যান, আপনারা হতাশ হবেন না।

'পাওয়ার পর যদি পছন্দ না হয়?' আমি শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, আপনাদের পছন্দ হবে। এর প্রমাণ কি আপনারা পছন্দ করবেন? সূরা ফুসসিলাতের ৩১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সমগ্র মানবজাতিকে বলেন- وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ.

'সেখানে তোমরা যা চাইবে, তা-ই পাবে। এটা সবার জন্য উন্মুক্ত।'

নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই। যা চাইবেন, সেখানে তা-ই থাকবে এবং তারপর আরও কিছু, তারপর আরও বেশি কিছু।

তারপর আল্লাহ তায়ালা বলছেন- وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُوْنَ. অর্থাৎ, তোমরা যা দাবি করবে, তা-ও সেখানে পাবে। মানে একবার একটা কিছু বলার পর পরে অন্য কিছু মাথায় আসতে পারে। আপনি অন্য কিছু অর্ডার করতে চান। দাঁড়াও, দাঁড়াও... আমি ওটাও চাই। কোনো সমস্যা নেই, আপনি সেটাও পাবেন। এটা এমন না যে, একবার অর্ডার করার পর আর করা যাবে না। আপনাকে সেখানে থেমে যেতে হবে না।

আপনি আপনার মন পরিবর্তন করতে পারবেন। আপনি অন্য কিছু অর্ডার করতে পারবেন, অসাধারণ! জান্নাতের সেই দরজা নারী-पुरुष উভয়ের জন্যই খোলা।

📘 বন্ধন পারিবারিক জীবনে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 ইসলামে স্ত্রীর অধিকার

📄 ইসলামে স্ত্রীর অধিকার


গালফ ট্যুরে থাকাকালীন একবার এক ই-মেইল পেলাম।

'আমি একজন অমুসলিম। কুয়েতে অল্প কয়েক বছর ধরে কাজ করছি। আমার অফিসের এক ধার্মিক মুসলিম কলিগকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাকে বিয়েও করতে চাচ্ছিলাম। যে কারণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলাম।

তাই আমি ইসলাম সম্পর্কে আরও জানতে চাচ্ছিলাম। আমি যাকে পছন্দ করেছি, তিনি একজন পাকিস্তানি। তার সংস্কৃতি আরও ভালোভাবে জানার জন্য আমি পাকিস্তানি এক মহিলা কলিগের সঙ্গে আলাপ করেছি। আমি ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য কুরআন পড়ছি। এখানে একজন স্ত্রীকে যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, তা খুবই হৃদয়গ্রাহী এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু যখন আমি আমার মেয়ে বন্ধুটির জীবনের দিকে তাকাই, তখন অন্য ধরনের চিত্র দেখি। তাকে তার শ্বশুরবাড়ির জন্য অনেক কিছু করতে হয়। আর তার স্বামীও তাকে জোর করে, সে যেন তার শাশুড়ির সেবা-যত্ন করে। তার শাশুড়ি তাকে অনেক যন্ত্রণা দেয়। তাদের স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়। এদিকে তার ননদেরা তাকে সব সময় কাজের মেয়ের মতো খাটিয়ে নেয়। তার স্বামীও এ ব্যাপারে অনেক কঠোর। আমি এ ক্ষেত্রে অনেক অবিচার দেখতে পাই। তিনি তাকে ভয় দেখান যে, তার কথা না শুনলে তিনি স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যাবেন। এটাই যদি ইসলামের আসল রূপ হয়, তাহলে আমি ঠিক নিশ্চিত না আমি মুসলিম হব কি না। এ ব্যাপারে আপনার উপদেশ কী?'

এ ধরনের প্রশ্ন আমার কাছে নতুন না। নারীর অধিকার সম্পর্কে জানতে চেয়ে, বিশেষ করে শ্বশুরবাড়িতে তাদের অধিকার কী, সে সম্পর্কে জানতে চেয়ে অনেকেই আমাকে এ ধরনের প্রশ্ন করেন।

বিষয়টা বেশ জটিল। আমি এ ব্যাপারে কিছু মৌলিক ধারণা সবার সাথে শেয়ার করছি। প্রথমত, এমন প্রশ্ন করার জন্য সেই বোনকে ধন্যবাদ। এটা শুধু আপনাকে না, আপনার মতো অগণিত নারীর উপকার করবে ইনশাআল্লাহ।

ইসলামে যেকোনো সম্পর্ক কিছু অধিকার আর কর্তব্যের ভিত্তিতে স্থাপিত। একজন পুরুষ হিসেবে আমার স্ত্রীর প্রতি আমার কিছু কর্তব্য রয়েছে। ঠিক যেমন আমার প্রতি তার কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আর বাবা-মায়ের প্রতি আমার কিছু দায়িত্ব রয়েছে, ঠিক যেমন আমার প্রতি তাদেরও দায়িত্ব আছে। তাদের কাছে আমার কিছু অধিকার আছে।

এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, আপনি যেকোনো একটি সম্পর্কের অধিকার আদায় করতে গিয়ে অন্য আরেকটি সম্পর্কের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারেন না। কথা হলো, আপনি কীভাবে সব অধিকারের সমন্বয় ঘটাবেন?

একজন ছেলে-সন্তান হিসেবে আমাকে আমার বাবা-মায়ের প্রতি অনুগত হতে হবে, তাদের সম্মান দেখাতে হবে, দয়া দেখাতে হবে। তারা আমার কাছে যা চান, তা পূরণ করতে হবে। যদি না তারা আমাকে ইসলামের বাইরে কিছু করতে আদেশ দেয় কিংবা আল্লাহকে অমান্য করতে আদেশ দেয়। এটা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে তাদের অনুগত থাকতে আমার কোনো সমস্যা থাকা উচিত নয়।

অন্যদিকে, আমার স্ত্রীকেও তাদের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, সাধারণ শিষ্টাচার বা আদব দেখাতে হবে। কিন্তু তাকে তাদের অনুগত হয়ে চলতে হবে না। আর স্বামী হিসেবে আমি যদি তার কাছে আমার বাবা-মায়ের সেবা দাবি করি, তাহলে আমি তার প্রতি অবিচার করছি। স্ত্রীকে তার নিজের বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্যশীল হতে হয়, তার তো নিজের অভিভাবক রয়েছে। এরা তার নিজের অভিভাবক নয়, আপনার অভিভাবক। রক্তের বন্ধনে যে সম্পর্ক হয় আর বিয়ের বন্ধনে সে সম্পর্ক হয়, তা মোটে এক নয়। কিছু মানুষ জিজ্ঞেস করে, 'কিন্তু আপনাকে তো আপনার স্বামীর আনুগত্য করতে হবে, সে যা-ই করতে বলুক না কেন!' এটাও সম্পূর্ণ সত্যি নয়। আমরা কোনো মানুষেরই এতটা অনুগত নই যে, সে যা-ই করতে বলুক না কেন তাই করতে হবে।

বাবা-মা আমাকে যা যা বলবে- আমি তার সবকিছুর আনুগত্য করতে পারব না। আমার বাবা যদি আমাকে স্টুডেন্ট লোন নিতে বলতেন, যেখানে সুদের কারবার আছে, আমি তা করতাম না। আমি এটা করতে পারি না। এতে আল্লাহর অবাধ্য হতে হবে। আমি এমনটা করব না। আর মাঝে মাঝে এমনও হয় যে, আপনাকে আদব বজায় রেখে আপনার বাবা-মায়ের অবাধ্য হতে হবে। কারণ, তারা অযৌক্তিক কাজ করতে বলছে।

এ রকমও হতে পারে আপনার বাবা আপনাকে বলছেন লোন নিতে, যা সুদের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু তিনি আপনাকে এমন ব্যবসায় যেতে বলছেন, যার ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত যে আপনার বেশ ক্ষতি হবে। আপনি নিশ্চিত জানেন যে, এই ব্যাবসা কোনোভাবেই চলবে না। অথচ তিনি চাইছেন, আপনি আপনার জীবনের সব পুঁজি সেই ব্যবসায় ঢেলে দেন। সেই মুহূর্তে আপনার বাবার কথা না শোনা তার অবাধ্যতা নয়।

আসলে অভিভাবকের অনুগত থাকার অর্থ যৌক্তিকতার ঊর্ধ্বে থাকা নয়। অবশ্যই আমরা যখন তাদের অবাধ্য হই, আমরা কখনো কোনোভাবেই তাদেরকে অসম্মান করে তা করি না। হ্যাঁ, এটাও ঠিক যে তাদের অনেক আদেশ আমাদের জন্য যদি কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বা আমাদের প্রতি যদি তারা কঠোরও হন, সেক্ষেত্রেও তাদের আনুগত্য করতে হবে। যদি তারা অযৌক্তিক কিছু করতে বলেন কিংবা এমন কিছু যা অন্যকে সমস্যার সম্মুখীন করে তোলে, তা আমি করতে পারি না। যেমন: আমি যদি সব পুঁজি দিয়ে তাদের কথামতো এমন ব্যবসায় নেমে পড়ি যেটা সফল হবে না, তাতে করে আমি তাদের ইচ্ছামতো কাজ করেছি ঠিকই, কিন্তু আমি আমার বাচ্চাদের কষ্টের মুখে ফেলে দিয়েছি। আমার স্ত্রীকে কষ্ট দিচ্ছি এবং যারা আমার ওপর নির্ভর করে আছে তাদের সকলকে সমস্যায় ফেলছি। আমি এমন কাজ করতে পারি না। তারা আমাকে যা খুশি তা করতে বলতে পারেন, কিন্তু তারা আমাকে দিয়ে অন্য কারও ওপর অত্যাচার করাতে পারেন না। এভাবে অধিকার আদায় করা যায় না।

কিছু পরিবার আছে যারা স্বামীকে জোর করেন কেবল একটা অ্যাকাউন্ট রাখতে। আর তার অভিভাবকেরা হলেন, সেই অ্যাকাউন্টের কো-সাইডার। এদিকে স্ত্রী প্রতি সপ্তাহে হয়তো দু-চার হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। এভাবে জীবনযাপন করলেও চলবে না। আপনি এটা করতে পারেন না।

আপনি আপনার স্ত্রীকে বিয়ে করেছেন, আপনি তার অভিভাবক হয়ে তাকে তার বাবার কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন। আপনাকে এখন তার প্রতি সেসব কর্তব্য পালন করতে হবে, যা তার প্রতি তার বাবা করে এসেছেন। কিন্তু এখানে ঘরে সকলে তার সাথে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষের মতো আচরণ করে! যেন সে শ্বশুর-শাশুড়ির কাজের লোক কিংবা আপনার বোন অথবা অন্য কারও। এটা হবে চরম প্রতারণা। এটা এমন এক বিষয়, যার ব্যাপারে আপনাকে এবং আমাকে শেষ বিচারের দিন জিজ্ঞেস করা হবে।

অন্যদিকে আছে আরেক চরমপন্থিরা। একদিকে, আমরা দেখি বউকে বাড়ির কাজের মেয়ে বানিয়ে ফেলা হয়েছে, যা চরম অবমাননাকর এবং উদ্ভট। কোনোভাবেই যা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। আর অন্যদিকে আছে এমন সব স্ত্রী অথবা স্বামী, যারা তাদের শ্বশুরপক্ষের সকলের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ। যেমন: তারা বলেন, তোমার বাবার বাড়ির কারও সাথে আমি সম্পর্ক রাখতে চাই না। তাদের মুখও দেখতে চাই না। আমি চাই না তারা আমাদের বাসায় আসুক। আমি চাই না তুমি তোমার মায়ের বাসায় যাও, তার সাথে কথা বলো। আমি তাকে ঘৃণা করি, তাকে আমি সহ্য করতে পারি না ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে স্বামীর সাথে তার পরিবারের ভীষণ দূরত্ব সৃষ্টি করা হয়। এটাও এক ধরনের চরমপন্থা। এটাও অবিচার।

তারা আপনার স্বামীর অভিভাবক। আপনার স্বামীর ওপর তাদের অধিকার রয়েছে। তারা যেন তাদের নাতি-নাতনিকে দেখতে আসতে পারে। তারা যেন আপনার বাসায় ঝগড়া সৃষ্টি হবে- এমন দুশ্চিন্তা করা ছাড়াই আসতে পারে। অথবা তাদের দেখলে মুখটা কালো করে বসে থাকতে পারেন না।

এতে আপনি আপনার দিক থেকে আপনার স্বামীর ওপর অত্যাচার করছেন। কারণ, তার প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে আপনার অন্তত তার পরিবারের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করা উচিত। ভদ্রতা এবং শ্রদ্ধা করা এটুকুই তো! আপনার স্বামী আপনার ওপর এগুলো চাপিয়ে দিতে পারেন না ঠিকই, কিন্তু এই আচরণ তো আপনার নিজ থেকেই আসা উচিত। আর এগুলো তো এমন বিষয়, যা আপনাদের ঘোর কাটানোর জন্য বলছি, এই সৌজন্যমূলক আচরণগুলো তো সব মুসলিমই অন্য মুসলিমের সাথে করে থাকে।

হ্যাঁ, অনেক সময় জটিল অবস্থারও সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে। সত্যিই, সেগুলো খুব মারাত্মক পরিস্থিতিতে চলে যায়।

অন্যান্য অনেক কালচারের মধ্যে, বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারতে আমরা সকলে মিলে এক ছাদে থাকার প্রতি গুরুত্বারোপ করি। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের খরচাপাতি মা-বাবা চালাচ্ছেন। ভালো স্ত্রী হিসেবে পরিচয় পেতে তখন বউকে এই করতে হবে, সেই করতে হবে- এই নীতি বেশির ভাগ পরিবারের ক্ষেত্রেই কাজে দেয় না। আর যদি কাজে না দেয় আমি বলছি না আপনারা এ ক্ষেত্রে বিয়ে ভেঙে ফেলুন, তবে এটা বাস্তবিকই আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, এই পন্থা ইসলামিক নয়। যদিও আপনারা পুরো পরিবার মিলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তকে ইসলামের আড়ালে লুকিয়ে রেখে ভাববেন না যে, ইসলাম আপনার কাছে এটাই চায়। ইসলাম আপনার কাছে এমন কিছু প্রত্যাশা করেনি; এটা আপনার পরিবার চেয়েছে। কিছু ব্যাপারে আপনাকে পরিবারের সকলকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ.

'তোমরা যেসব নিয়ামত ভোগ করো, সে ব্যাপারে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে।' সূরা আত-তাকাছুর : ৮

আমার স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, মা-বাবা- এরা সবাই আল্লাহর নিয়ামত যা আমি উপভোগ করি। তাই আমার উচিত তাদের অধিকার আদায় করা।

আমি প্রার্থনা করছি, যারা ভাবেন বউকে দিয়ে ঝিয়ের কাজ করানোর বিষয়গুলো ইসলামের আদেশ, এই কথাগুলো যেন এসব ভ্রান্ত ধারণাকে কিছুটা হলেও কমিয়ে দেয়। ইসলাম এ ব্যাপারে এমন কিছু বলেনি। এটা কেবলই স্থানীয় সংস্কৃতির অপচর্চা। কুরআন একে সমর্থন করে না, রাসূল- এর সুন্নাহও না।

📘 বন্ধন পারিবারিক জীবনে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 বিয়ে আর ডেটিং কি এক

📄 বিয়ে আর ডেটিং কি এক


বিয়ের মাধ্যমে নিজের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ রাখার বিষয়টা নিয়ে একটু ভাবা যাক।

বর্তমান সময়ে একজন যুবক বিয়ে করার পূর্বে কী করছে? ধরুন, সে এদিক- সেদিক কিছু মুভি দেখেছে; মানে তওবা করে ধার্মিক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আরকি। আর এসব মুভির মাধ্যমে তার মধ্যে ভালোবাসা আর বিয়ে নিয়ে কিছু ধারণা গড়ে উঠছে। প্রায়ই ভাইয়েরা আমার কাছে এসে বলে, 'ভাই, আমার বিয়ে করা খুবই জরুরি।' তাদের ভেতর এমন একটা ধারণা হয়েছে যে, একবার বিয়ে হয়ে গেলেই যাবতীয় লালসা নিমিষেই উধাও হয়ে যাবে। জীবন শান্তিতে পূর্ণ হবে, আমরা একসাথে কুরআন পড়ব ইত্যাদি ইত্যাদি ফ্যান্টাসি সব চিন্তায় ভেসে বেড়ান তারা। তাদের মনে বিয়ে নিয়ে অতিরঞ্জিত একটি ধারণা গড়ে ওঠে।

আপনারা যারা বিবাহিত, তারা হয়তো ভাবছেন 'এই সব কী বলছে?' কারণ, আপনারা হয়তো- এসব অনুভূতির কথা ভুলেই গিয়েছেন। বিবাহিত জীবনে মাঝে মাঝেই আমাদের কঠিন কিছু চ্যালঞ্জের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু বিয়ে নিয়ে আধুনিক সময়ে নারী আর পুরুষের মাঝে ভালোবাসা, নির্ভরশীলতা বা বোঝাপড়ার যে ধারণা দেওয়া হয়, তার সাথে ডেটিং-এর ধারণার কোনো পার্থক্য নেই। ডেটিং মানে যত দিন সম্ভব আনন্দ করা। তারপর যখন কোনো কঠিন সময় আসে, আপনি সব ছেড়েছুড়ে দূরে সরে যান। এটাই ডেটিং, ঠিক কি না?

তাই আমরা যখন বিয়ে নিয়ে চিন্তা করি, ভাইয়েরা, এমনকী বোনেরাও যখন বিয়ে নিয়ে চিন্তা করেন, তারা বিয়েকে ডেটিং-এর মতোই ভাবেন।

কিন্তু আপনারা নিশ্চয় জানেন, বিয়ে আসলে ডেটিং-এর চেয়েও অনেক বড়ো কিছু। পরিবারের পেছনে টাকা পয়সা খরচ, ঘরের কাজকর্ম, আরেকজন মানুষের সাথে থাকতে শেখা, মাঝে মাঝে এগুলো খুবই কঠিন মনে হয়। আপনি আপনার মতো করতে চান, সে তার মতো করতে চায়। কখনো তোয়ালে বাঁকাভাবে রাখা নিয়ে বা ব্রাশ ভুল জায়গায় রাখা নিয়ে অথবা হয়তো কফিতে চিনি একটু বেশি হওয়া নিয়ে আস্তে আস্তে ক্ষোভ জমা হয়। প্রথম প্রথম ভালোবাসার কারণে হয়তো আপনি কিছু বলেন না। ভাবেন, নিজেই সামলাতে পারবেন। কিন্তু কয়েক বছর পর এত কিছু জমা হয়ে যায় যে, আপনি বলেন- 'আবার চিনি বেশি?' পাশের বাড়ি থেকেও আপনার গলা শোনা যায়।

কিন্তু ডেটিং-এ এমন কিছু হয় না। কারণ, আপনার যখন একজন মেয়েকে আর ভালো লাগে না, তখন আপনি আরেকজনকে জোগাড় করে নেন। অথবা সেই মেয়ের যখন মন উঠে যায় সে বলে, 'আমি তোমার গন্ধও পেতে চাই না; আমি গেলাম।' অর্থাৎ কিছু হলেই ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া। সব ছেড়ে দূরে সরে যাওয়া।

কিন্তু বিয়ে একটি শক্ত প্রতিজ্ঞা। জীবনভর একটা প্রতিশ্রুতি। কুরআনেও এই ব্যাপারে খুব গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবাহিত মহিলাকে কুরআনে আল মুহসানাত এবং পুরুষকে আল মুহসিনিন বলা হয়েছে।

আরবিতে 'ইহসান' মানে হলো কাউকে নিরাপদ দুর্গের মধ্যে রাখা। অনেকটা মিলিটারি ক্যাম্পের মতো। উদাহারণটা এমন যে, বাইরে শত্রু আছে। আর তাই যে মিলিটারি ক্যাম্পের ভেতরে আছে সে নিরাপদ। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, 'নারীরা যেন নিরাপদ প্রাচীরের মধ্যে আছে; আর কে তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে?' তাদের নিজ নিজ স্বামীরা। সবকিছু থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে। দুঃখ-কষ্ট, লজ্জাহীনতা, এমনকী অজ্ঞানতা থেকেও। কারণ, তাকে সঠিক শিক্ষা দেওয়াও তার স্বামীর দায়িত্ব। সে তাকে সব দিক থেকে নিরাপদ রাখছে।

আর যারা বিয়ে করতে ইচ্ছুক তাদেরকে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন- 'মুহসিনিনা গাইরা মুসাফিহিন'। তারা হলো সেসব মানুষ, যারা পরিবার গঠনের উদ্দেশ্যে নিজেদের পরিচর্যায় নারীদের এরূপ নিরাপত্তায় আনতে আগ্রহী।

শুধু তাদের নিজেদের কামনা পূরণ করার জন্য নয়। 'মুসাফিহ' বলতে এমন কাউকে বোঝায়, যে নিজের হরমোনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এ কারনেই সে বিয়ে করতে চায়। এটাই একমাত্র কারণ। তাই আল্লাহ বিয়ের সম্পর্কে আমাদের মনোভাব পরিবর্তন করেছেন। যদি আপনি সঠিক কারণে বিয়েতে আবদ্ধ হন, তাহলে আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে উঠবে। আর যদি আপনি ভুল কারণে বিয়ে করেন, তাহলে অবশ্যই আপনার সংসার অশান্তির হবে, আর আপনি কখনই সন্তুষ্ট হবেন না। ভুল কারণ কী কী হতে পারে? আমার হরমোনের সমস্যা আছে, তাই আমি বিয়ে করতে চাই। আর খুব সম্ভবত আপনাদের অনেকেই এটা কঠিন উপায়ে অনুধাবন করেছেন। কারণ, আপনার নিয়তে ভুল ছিল। আপনার নিয়ত থাকতে হবে একটি পরিবার শুরু করা, আল্লাহকে খুশি করা এবং সমাজে ভালো কিছু বৃদ্ধি করার।

তাই আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীনের অন্যান্য সবকিছুর মতো বিয়ের মূলনীতিও হলো, আপনি নিজের দায়িত্ব নিয়ে চিন্তিত থাকুন। আর আপনার অধিকার আদায়ের কথা ভুলে যান। আমি জানি যে এটা খুবই রুক্ষ শোনাচ্ছে। কিন্তু আপনি যদি এটা করতে পারেন, ছয় মাস চেষ্টা করে দেখুন কী সুন্দর ফলাফল আসে।

নিজের অধিকার নিয়ে ভুলে যান, শুধু নিজের দায়িত্বটুকু ভালোভাবে পালন করুন। এটা ভাবুন, আমি আমার স্ত্রীর জন্য কী করতে পারি? তার জন্য আমি আরও কী করতে পারি? আমি কি তাকে কোনো উপহার কিনে দেবো? কারণ, আমি অনেক দিন তাকে কিছু কিনে দিইনি? তারপর সে যদি কোনো ভুল করে থাকে, তাহলে এমন ভান করুন যেন আপনি তা লক্ষ্য করেননি।

দেখুন, কুরআনে তা কীভাবে বলা হয়েছে- وَإِنْ تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. 'যদি তোমরা ক্ষমা করো, এড়িয়ে যাও এবং মার্জনা করো, তবে (জেনে রেখো) নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল ও দয়ালু।' সূরা আত-তাগাবুন: ১৪

তাসফাহু মানে হলো পৃষ্ঠা দিয়ে ঢেকে রাখা। আপনি যখন একটি পৃষ্ঠা ঢেকে ফেলেন, তখন নিচের পৃষ্ঠায় কী আছে দেখা যায় না, তাই না? সেভাবে আপনার স্ত্রী যদি কোনো ভুল করে, তাহলে আপনি এমন ভান করুন যে, আপনি তা দেখেননি। এটাকে সরাসরি বলার দরকার নেই- 'তুমি আবার এমন কেন করেছ?' এভাবে আপনি তার ভুলগুলো ঢেকে রাখুন এবং পাশাপাশি আর আরও বেশি নিজের দায়িত্বগুলোর প্রতি যত্নবান হোন। আরও বেশি ধৈর্যশীল এবং সহনশীল হোন।

আর সে যখন আপনাকে আঘাত দিয়ে কথা বলবে, তখন আপনি হাসিমুখে তা গ্রহণ করুন এবং জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। নিজের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সীমা ছাড়িয়ে যান।

স্ত্রীর কাছ থেকে সবাই কিছু নির্দিষ্ট জিনিস চায়। সে আমার যত্ন নেবে, আমার চাহিদার ব্যাপারে খেয়াল রাখবে। আমার কিছু চাহিদা আছে, মানসিক প্রয়োজন আছে, সে আমাকে সঙ্গ দেবে। আরও বেশি ভালো ব্যবহার করবে। আমি যখন বাসায় ফিরি, তখন তার হাসিমুখে থাকা উচিত, সব সময় আমার ভুল ধরা উচিত না। সব সময় আমাকে বাজারের লিস্ট আর লন্ড্রির ব্যাপারে কথা বলবে না, ভালোভাবে কথা বলবে। আপনার মাথায় সব সময় এসব চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। কিন্তু জানেন কি, একজন মুমিন কার কাছে তার চাহিদার কথা বলে? একজন মুমিন সর্বদা তার মালিকের কাছে নিজের জন্য আশা করে। কারণ, আল্লাহ ছাড়া আপনি অন্য যার কাছেই কিছু আশা করবেন, আপনি হতাশ হবেন। এটা আল্লাহ প্রদত্ত একটি সর্বব্যাপী পন্থা। যতক্ষণ আপনি কোনো সৃষ্ট কিছুর প্রতি আশা পোষণ করবেন, আপনি অবশ্যই হতাশ হবেন।

আপনি চান আপনার বস আপনাকে প্রমোশন দিক; এটা ঘটবে না। আপনি বন্ধুর ওপর আশা করেন। ভাবছেন যে সে তার দেওয়া সময়মতো আসবে, সে দেরি করবে অথবা সে আসতেই পারবে না। আপনি সৃষ্টির প্রতি আশা করবেন, কোনো জিনিসের ওপর আশা করবেন; আপনাকে হতাশ হতে হবে।

আল্লাহ চান আমরা এটা শিখি যে, শুধু তাঁর কাছেই আশা করা উচিত। আর যখন আপনি মন থেকে এটা গ্রহণ করবেন, তখন কি ঘটবে জানেন? আপনার স্ত্রী যখন আপনার জন্য খুব অল্প কিছুও করবে, আপনি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হবেন। কারণ, আপনি তার কাছ থেকে কিছু আশা করেননি।

অনেক সময় এমন ঘটে, আমরা কিছু ইসলামি বইয়ে বা কিছু হাদিসে পড়ি স্বামীর অধিকার বা স্ত্রীর অধিকার নিয়ে। আর তারপর যা ঘটে তা হলো- স্বামীরা শুধু স্বামীদের অধিকার আর স্ত্রীরা শুধু স্ত্রীর অধিকার নিয়ে পড়া শুরু করে। সত্য আসলে উলটোটা। স্বামীদের কী নিয়ে পড়া উচিত? স্ত্রীর অধিকার নিয়ে। কিন্তু সবাই নিজেকে নিয়ে মত্ত। সবাই স্বার্থপর। এমনকী ইসলামের ব্যাপারেও তারা শুধু তাই জানে- যেটা তাদের কাজে লাগবে।

যেমন ধরুন, পিতা-মাতা কুরআনের ব্যাপারে কিছু না জানলেও এতটুকু ঠিকই জানে যে, কুরআনে সন্তানদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে- তোমরা মাতা-পিতার প্রতি সদয় আচরণ করো। তারা শুধু এতটুকুই জানে। এমনকী এটাও জানে না যে, এটা কুরআনের কোথায় আছে। তারা কেন শুধু এতটুকুই মনে রাখে? কারণ, এতটুকুই তাদের কাজে লাগে। তারপর যেমন পুরুষরা হয়তো কুরআন নিয়ে খুব বেশি জানে না! কিন্তু যখনি স্ত্রী কিছু বলে, সাথে সাথে স্বামী বলে উঠে ‘আর রিজালু কাওয়ামুনা আলান্নিসা’। কারণ, এটাই তাদের কাজে লাগে। তার মানে আপনি আল্লাহর কথামতো চলছেন না; বরং আল্লাহর দ্বীনকে নিজের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, ঠিক কি না?

আমাদের বুঝতে হবে যে, আমাদের দ্বীনে সর্বপ্রথম হলো নিজের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করা। তাই আমরা পড়ব আর এটা শিখব যে, কীভাবে আমরা নিজেদের স্ত্রীদের জন্য আরও ভালো স্বামী হব, আর স্ত্রীরা কীভাবে আরও ভালো স্ত্রী হবে।

কয়েকদিন আগে, স্বামী আর স্ত্রীর অধিকার নিয়ে আমি একটা খুতবা দিয়েছিলাম। আমি দুই ধরনের নোট বানিয়েছিলাম, একটাতে ছিল স্বামীদের প্রতি উপদেশ। আরেকটাতে ছিল স্ত্রীদের প্রতি উপদেশ। আর আমি খুতবাতে বারবার পুরুষদের বলেছি, স্বামীদের অধিকার নিয়ে পড়বেন না। শুধু স্ত্রীদের অধিকার নিয়ে পড়ুন। আমি আপনার জন্য নোট বানিয়েছি, আপনার স্ত্রীরটা আপনি পড়বেন না। শুধু নিজেরটা পড়ুন। কিন্তু খুতবা শেষে প্রায় ২০ জন আমার কাছে ছুটে এলো। ‘ভাই, আপনি স্ত্রীদের জন্য যে নোট বানিয়েছেন, আমাদের একটা কপি দিন।’ আমি বললাম- ‘না, আমি আপনাদের কপি দেবো না। কারণ, আপনারা বাসায় গিয়েই স্ত্রীদের দেখাবেন, এই যে পয়েন্ট নম্বর ৪ দেখ, দেখেছ? তুমি গত ৬ মাস এটা করোনি।’ এটা সত্যি সত্যি একটি সমস্যা। এটা সংসারে অনেক অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই যদি আপনি বিয়ের মাধ্যমে একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান, আপনাকে নিজ দায়িত্বের প্রতি আরও যত্নবান হতে হবে।

📘 বন্ধন পারিবারিক জীবনে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 আমার স্ত্রী হিজাব করছে না, কী করব

📄 আমার স্ত্রী হিজাব করছে না, কী করব


আমাকে প্রশ্ন করা হয়, আমার স্ত্রী হিজাব করছে না- আমি এখন কী করব? প্রথম কথা হচ্ছে, তাকে আর হিজাব করার ব্যাপারে কিছুই বলবেন না। হিজাব বিষয়ে তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিন। একেবারেই বন্ধ করে দিন। কারণ, প্রায় সময়ই দেখা যায়, নিজ পরিবারের সদস্যরাই তার পরিবারে দাওয়াহ দিতে সবচেয়ে অকার্যকর পন্থা অবলম্বন করছে। তারা অপরিচিত কারও কাছ থেকে কথা শুনতে বেশি আগ্রহী। তার উপদেশ গ্রহণ করতে রাজি, কিন্তু নিজের পরিবারের কাছ থেকে তা শুনতে চাইবে না। এটা কিন্তু আমাদের মতো বক্তাদেরও সমস্যা। তারা সারা দুনিয়াকে দাওয়াহ দিতে পারে। কিন্তু দেখা যায়, বাড়িতে শোনানোর জন্য তারা অন্য কারও টেপ বা অন্য কারও সিডি নিয়ে আসে। কারণ, পরিবারের সদস্যরা বলতে থাকে- 'তোমার কথা আর শুনতে চাই না! অনেক শুনেছি!'

আপনাকে তাই বুঝতে হবে, যখন পরিবারের কাছে দ্বীনের শিক্ষা দেবেন, তখন আপনাকে একটু কৌশলী হতে হবে। আপনাকে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। খুব দক্ষ একজন বক্তা খুঁজে বের করুন; যিনি আখিরাত ও শেষ বিচারের দিন সম্পর্কে বলেছেন। হিজাব না করাটা আপনার স্ত্রীর সবচেয়ে বড়ো সমস্যা না। হিজাব কেবল রোগের লক্ষণ, আসল অসুখ নয়। তার অসুখ হলো দুর্বল ঈমান। বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তার ঈমানকে চাঙা করুন। আর এজন্য সবচেয়ে শক্তিশালী বই হচ্ছে আল-কুরআন।

কুরআনের যে আয়াতগুলোতে মানুষকে স্মরণ করার কথা বলা হয়েছে, সেখানে কী কী নিয়ে কথা বলা হয়েছে বলেন তো? আখিরাত নিয়ে। অতীতের বিভিন্ন অবাধ্য জাতির করুণ পরিণতি নিয়ে। এর চেয়ে শক্তিশালী উপদেশ আর হয় না। এসব আয়াতের মেসেজ হচ্ছে, 'যেই মানুষেরা উপদেশ গ্রাহ্য করেনি, দেখ তাদের সাথে সাথে কী হয়েছিল। দেখ, তাদের সাথে কী হতে যাচ্ছে।' তাই না? আপনি যদি আপনার পরিবারে এমন অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন যে, প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট আপনারা একসঙ্গে কুরআনের কথা শুনবেন, ভালো কোনো বক্তার কথা শুনবেন, তাহলেই যথেষ্ট। আজকাল অসংখ্য বক্তাদের রিসোর্স সহজেই পাবেন। এগুলো কাজে লাগান।

আরেকটি বিষয়। কারও কারও বেলায় দায়ি হিসেবে আপনি হয়তো সেরা নন। কেউ হয়তো অন্য কারও কাছ থেকে সহজে উপদেশ নেবে। আমরা সবাইকে দাওয়াহ দিতে পারব না। হয়তো কিছু কিছু মানুষের জন্য আমাদের পদ্ধতি কার্যকর, কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আমরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সবারই আলাদা আলাদা অনুসারী আছে। ইনশাআল্লাহ, এই কথাগুলো আপনার স্ত্রীর ব্যাপারে সাহায্য করবে।

আরেকটা কথা। আমার মন বলছে, আপনার স্ত্রীর হিজাবের ব্যাপারে কোনো যুক্তিগত সমস্যা নেই। এমনটা না যে, তিনি হিজাবের গুরুত্ব সম্পর্কে সন্দিহান। তার সমস্যা আসলে তিনি আল্লাহর প্রত্যেকটি আদেশ পালনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। এই সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে তিনি এমনিতেই হিজাব এবং অন্যান্য কর্তব্য পালন করবেন, ইনশাআল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00