📄 স্ত্রী এবং শ্বশুর-শাশুড়ি
এক
কোনো এক প্রোগ্রাম শেষে একজন মহিলা আমাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার স্বামী নিয়ে কথা বলা শুরু করল। এটি আমার শোনা সবচেয়ে খারাপ ঘটনা নয়, কিন্তু যথেষ্ট জগঝাঁপিচুড়ি পাকানো একটি ঘটনা।
সে বলেছিল, আমার স্বামী যথেষ্ট ধার্মিক। সে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। সব সময় মসজিদে যায়। ইত্যাদি, ইত্যাদি। কিন্তু একই সাথে, সে আমাকে আমার পরিবারের সাথে দেখা করতে নিষেধ করে। আমি যখন তাদের কল করি, যখন তাদের সাথে দেখা করতে যাই, সে এটা পছন্দ করে না। আমাকে খুব কষ্ট করে লুকিয়ে লুকিয়ে আমার মাকে কল করতে হয়, দেখা করতে হয়। যদি আমার স্বামীকে না বলি যে, আমি আমার মায়ের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করি, তাহলে কি আমি গুনাহগার হব? কারণ, আমাকে তো আমার স্বামীর কথা মেনে চলতে হবে।
আমার স্বামী আমাকে বলে, স্ত্রীদের ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব রয়েছে। তাই সে যা বলে, আমাকে তা-ই করতে হবে। সে হচ্ছে ঘরবাড়ির আমির। সে বলে, আল্লাহ ও তাঁর দ্বীন মতে, সুন্নাহ ও শরিয়া মতে, তোমাকে আমার কথা মেনে চলতে হবে; যেহেতু তুমি আমার ঘরে বাস করো। তুমি তোমার পরিবারের সাথে,
ভাই-বোনদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে না। এ ছাড়াও এগুলোর সাথে সে তার ওপর আরও শর্ত আরোপ করে, আমি চাই না তুমি ঘর থেকে বের হও। বাড়িতে থাকো এবং কোথাও যাবে না, যতক্ষণ না আমি নিজে তোমাকে নিয়ে যাই।
ঘটনাটি এ রকমই ছিল। কাজেই মহিলাটি জিজ্ঞেস করেছিল, 'আমি কি এই কারণে গুনাহগার হব?' একবার সে বাড়ির পেছনে গিয়েছিল, তার জন্যও নাকি তাকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল! সে হতাশ হয়ে পড়েছে। তার স্বামী সেখানেই ছিল, সে বাথরুমে বা অন্য কোথাও ছিল। আর সেই সুযোগে মহিলাটি আমাকে প্রশ্ন করতে পেরেছিল। কী অদ্ভুত!
দুই অনেক সময় মানুষ অনেক কিছুই ইসলামের নামে করে। তারা কুরআন-সুন্নাহ, শরিয়ার উদ্ধৃতি দেয়। অথচ আমলের দিক দিয়ে বিষয়টা হয় উলটো। আমার স্ত্রীর সাথে আমার যেমন সম্পর্ক আছে, আমার স্ত্রীর সাথেও তেমন তার বাবা-মায়ের, ভাই-বোনের, বান্ধবীর সম্পর্ক আছে। একটা সম্পর্কের অন্য সম্পর্কগুলো ভেঙে দেওয়ার কোনো অধিকার আমার নেই।
প্রত্যেকেরই তার নিজস্ব একটি দুনিয়া থাকে। আমরা কোনো মানুষের দাস নই। কোনো মানুষই আসলে অন্য কোনো মানুষের দাস হতে পারে না। আমরা সবাই একমাত্র আল্লাহর দাস।
আমি আমার মায়ের কাছে কিছু জিনিসের জন্য ঋণী। আমার মা আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছু করার জন্য বলতে পারেন না। আমার স্ত্রীও আমার মায়ের বিরুদ্ধে কিছু করার জন্য বলতে পারে না! আবার আমি আমার স্ত্রীকে এমন কিছু করতে বলতে পারি না, যেটি তার বাবা-মায়ের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে।
সে কি আমার বাড়িঘর ছেড়ে তাদের সাথে চলে যাচ্ছে? সে তো শুধু একটি কল দিয়েছে! আমি তাকে এটি না করতে বলতে পারি না। কারণ, সে তার বাবা-মায়ের কাছে ঋণী। আর মা-বাবার খোঁজ নেওয়াটা তো আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ। এটি এমন কিছু না, যা সে নিজে থেকে করছে। এটি আল্লাহর হুকুম। তিনি বলেছেন-
بِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا. 'তোমরা মাতা-পিতার সাথে সদাচার করো।' সূরা বনি ইসরাইল: ২৩
এখানে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য এই আদেশ। তিনি কিন্তু এটি বলেননি, পুরুষরা! সব সময় মাতা-পিতার সাথে সর্বোত্তম আচরণ করো, আর 'মহিলারা' বিয়ে পর্যন্তই। জীবনের বাকি সময় মা-বাবা শুধুই ইতিহাস। মাঝে মাঝে খোঁজ খবর নিলেই হবে। যেমন, শুধু প্রতি ঈদে! আল্লাহ আমাদের এমনটি করতে বলেননি।
অন্যভাবে বলা যায়- আপনি অন্যকে দায়দায়িত্ব পালনে নিষেধ করতে পারেন না এবং অন্যের অধিকার থেকেও তাকে বঞ্চিত করতে পারেন না। প্রত্যেকের বিশুদ্ধ বাতাসের অধিকার রয়েছে। আবার কোনো মহিলারা ব্যাপারটিকে উগ্রভাবে গ্রহণ করতে পারে। কোনো মহিলা বলতে পারে, 'দেখুন আমি উমর (রা.)-এর একটা গল্প শুনেছি। উনি রাস্তায় ঘুরতেন, তাই আমিও রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে যাচ্ছি! আমি ক্যালিফোর্নিয়া যাচ্ছি। ওহে, স্বামী! পরে দেখা হবে!' অনেকেই এটি করতে পারেন। তাহলে এটি সম্পূর্ণই তাদের সমস্যা। এটি আরেক ধরনের মানসিক সমস্যা। আমাদের দ্বীন এমন নয়। যেমন কেউ বলল, 'আমি শুধুই বিদ্রোহী হব। কারণ, এটা হওয়ার অধিকার আমার আছে।'
পরিবার মানে এটি নয় যে, একে অন্যের কাঁধে শুধু নিয়মকানুন চাপাবেন এবং সব সময় একটি হাদিসের উদ্ধৃতি কিংবা আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে কোনো কাজ করাবেন। তাহলে কুরআন এবং সুন্নাহর বিষয়ের চেয়েও আপনার নিজের আরও গভীর সমস্যা আছে! আমাদের বৈবাহিক সম্পর্কগুলো তখন আর সুস্থ থাকে না! বিয়ে মানে হচ্ছে আলোচনা, একে অন্যকে ছাড় দেওয়া, আমার সঙ্গী সুখী কি না সেটা সব সময় খেয়াল রাখা। আর যখনই আপনার সঙ্গীকে দিয়ে কিছু করানোর জন্য রীতিমতো দ্বীনকে ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করতে হয়, তাহলে এটা চূড়ান্ত পর্যায়ের নোংরামি। একটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি জগাখিচুড়ি আর কিছুই চিন্তা করতে পারি না। অন্যের ওপরে জোর করে নিজের হুকুম চালানোর জন্য কুরআন এবং হাদিসের উদ্ধৃতি দেওয়া, যদিও সেটা সেখানে খাপ খায় না।
সুবহানাল্লাহ, আমার যতটুকু বলার ছিল তাকে বলেছিলাম। কিন্তু দিন শেষে সে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। আমি অথবা কেউই ওই পরিস্থিতিতে সাহায্য করতে পারব না। দিন শেষে তাকেই তার স্বামীর সাথে সরাসরি এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। হতে পারে আমার কথাগুলো কাজে লেগেছে। কমপক্ষে আমি মনে করি খোলাখুলি আলাপ-আলোচনা হওয়া জরুরি। আর যখন মানুষ ধর্মের অপব্যবহার করে, তাহলে সেটা তুলে ধরা উচিত। আপনারা জানেন, এ রকম ঘটনা দেখে আমার দুঃখ হয়। কিন্তু ইনশাআল্লাহ, দিন দিন পরিস্থিতি ভালো হচ্ছে। কমপক্ষে মানুষ আমার কাছে আসার মতো সাহস পাচ্ছে। আমি এই সাহসের তারিফ করছি। বাড়ির সমস্যা নিয়ে আসা এবং কথা বলা একটি অনেক বড়ো সাহসের ব্যাপার।
আমি দুআ করি, সবাই যেন এটা থেকে উপকৃত হয়। কারণ, তার যথেষ্ট সাহস ছিল আমার কাছে আসার এবং প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার। পরবর্তী সময়ে আবার দেখা হবে।
📄 আপনার সন্তানকে সময় দিন
মায়েদেরকে প্রাকৃতিকভাবে আল্লাহ কিছু উপহার দিয়েছেন। যেমন: মাতৃত্বের ব্যাপারটা তাদের মধ্যে অধিকতর সহজাতভাবে আসে। আল্লাহ এটি তাদের দান করেছেন। এ কারণেই তারা মমতাময়ী, কোমল, যত্নবান এবং বেশি উদ্বিগ্ন।
বাবাদের এটার জন্য চেষ্টা করতে হয়। আপনি বাসায় বসে আছেন, আপনার বাচ্চা পড়ে গেল। কে দ্রুত এগিয়ে আসবে? 'আহা বাবা কী হয়েছে বা আম্মু কী হয়েছে?' এ ধরনের কথা বলে মা-ই কিন্তু আগে দৌড়ে আসে।
অন্যদিকে দেখবেন, বাবা তার জায়গাতেই বসে আছে। বসে থেকেই বলে- 'নিজেই উঠতে পারবে, কিছু হয়নি, কিছু হয়নি। কোনো ব্যাপার না। ধুলা ঝেড়ে ফেলো। কিছু হয়নি বাবা। চিন্তার কিছু নেই। সামান্য ব্যথা পেয়েছ।'
এদিকে মা কিন্তু দিশেহারা হয়ে যান। এটি তার মধ্যে স্বভাবজাত। কিন্তু সন্তানকে ইসলামের ওপর মানুষ করার জন্য বাবা-মা দুজনকেই সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। আর আমি খেয়াল করে দেখেছি যে, এ জায়গাটিতেই আমরা অনেক পিছিয়ে।
আমরা যদি আমাদের সন্তানদের ইসলামের মধ্যে বড়ো করতে চাই, তাহলে আমাদের প্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হলো- আমাদেরকে তাদের বন্ধু হতে হবে।
এজন্য পরিশ্রম করতে হবে। কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আপনাদের নিজেদেরকে বদলাতে হবে। নিজের জন্য নয়; আপনার সন্তানের জন্য। আপনি যখন বাসায় আসেন, তখন আপনার বাচ্চারা আপনার সঙ্গে খেলতে চায়। 'আব্বা, আমাকে কোলে তুলে নাও, আমাকে ঘোরাও, এটা করো, ওটা করো। আর একটুখানি করেই আপনি এমন কাহিল হয়ে যাওয়ার ভান করেন। 'আব্বাকে এখন একটু শুতে হবে, একটু অপেক্ষা করো।' এটা ঠিক না।
বাচ্চাদের নিয়ে পাহাড়ে উঠুন, তাদের সাথে খেলাধুলা করুন। বাড়ির আঙিনায় দৌড়াদৌড়ি করুন। তাকে সময় দিন। সন্তান আর আপনার মাঝের সংকোচ দূর করার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। তা নাহলে সে যেকোনো বিষয় নিয়ে আপনার সাথে কথা বলতে পারবে না। আমি এটা আপনাদের এ কারণে বলছি যে, যখন তারা একটি নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছাবে, তখনও কথা বলার মতো কারও সেই প্রয়োজনটা থেকেই যাবে। সেই মানুষটি আপনিই হয়ে যান না! বাইরের ছেলেপেলে, বড়ো ভাই, গালফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড লাগবে কেন? আপনিই হয়ে যান তার কাছের মানুষ।
হঠাৎ করে নিশ্চই আপনি আবিষ্কার করতে চান না যে, আপনার বাচ্চা যেন অন্য কেউ। অর্থাৎ অচেনা একজন। আপনি আলাপকালে হয়তো একসময় বুঝতে পারলেন, এই সন্তানকে আপনি চেনেন না। এত বছর এক ছাদের নিচে বসবাস করার পরও কীভাবে এমনটা ঘটল, সেটা ভেবে আপনি নিজেই অবাক।
'ও, এটা তো কবেই ঘটে গেছে বাবা। কবেই ঘটে গেছে।' শুধু আপনিই জানতেন না। আপনি ছিলেন মহা ব্যস্ত। আপনার সময় ছিল না। আপনি জানতে চাননি বা পারেননি।
আপনাকে আপনার সন্তানদের জন্য বিশেষ সময় তৈরি করে নিতে হবে। এটা হবে শুধু তাদের সময়। যদি আপনার অনেক সন্তান থাকে, তাহলে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে, প্রতিটা সন্তানই যেন আলাদা আলাদা মনোযোগ আর সময় পায়। অন্য কারও কাছ থেকে নয়, শুধু আপনার কাছ থেকে। কোনো খেলনা নয়, কোনো গ্যাজেট নয়, কোনো কিছুই নয়, শুধু আপনি। এটা করতেই হবে। ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
📄 পুরুষেরা জান্নাতে হুর পাবে, নারীরা কী পাবে
টিটকারি করে অনেককে বলতে শুনবেন, 'কি, তোমাদের জন্য জান্নাতে নাকি ৭০টা করে পরি থাকবে? তোমরা নাকি এজন্য মানুষ মারো?'
জান্নাতে হুর পাওয়া নিয়ে লুকোছাপা বা লজ্জার কিছু নেই। আল্লাহ কুরআনে এই ব্যাপারে নিজেই বলেছেন। আমি যখন ইসলামের ব্যাপারে জানতে শুরু করলাম, তখন কিছু বিষয় ছিল যা আমি একা একা বের করতে পারিনি। তার মধ্যে একটা ছিল- পুরুষরা হুর পাবে, নারীরা কী পাবে?
আমার মাথায়ও কিন্তু এই প্রশ্ন এসেছিল। কেন এসব রোমাঞ্চকর পুরস্কার, সুন্দরী স্ত্রী- এই ধরনের জিনিসগুলোর কথা কুরআনে বলা হয়েছে। আর শুধু তাই না; এগুলোর বর্ণনাও খুব বিস্তারিতভাবে এসেছে।
একবার ড. ইসরার আহমেদ রাহিমাহুল্লাহর সাথে খুবই অল্প সময়ের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে কথা বলেছিলাম। তিনি বেশ রাশভারী চরিত্রের মানুষ ছিলেন। অবশ্য এখন তিনি মারা গেছেন।
তখন তিনি নিউইয়র্কে ছিলেন। আমি ওনাকে প্রথমবারের মতো ওনার মাথার বিশাল টুপিটা ছাড়া দেখেছিলাম। তিনি বেশ আরাম করে বসে ছিলেন। ওনার পাশে আরেক আংকেলও ছিলেন। ওনার চুলগুলো উলটো করে আঁচড়ানো।
আর উনি বসে কীসের চিন্তায় যেন মগ্ন ছিলেন। আমি ওনাকে দেখে বেশ ভয়ই পাচ্ছিলাম। তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম। বেশ একটা অস্বস্তিকর নীরবতা। আমার মনে অনেকগুলো প্রশ্ন খুটখুট করছিল। একপর্যায়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আল্লাহ কেন কুরআনে হুরের ব্যাপারে বলেছেন?'
তিনি আমাকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু কথা বলেছিলেন, যা আমার কাছে বেশ যৌক্তিক মনে হয়েছে। তিনি এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা ব্যাখ্যা করেছেন। এ ছাড়াও আরেকজন আলেম, তাঁর সাথেও আমার নিউইয়র্কেই দেখা হয়েছিল, তিনি আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। যাহোক, সেসব ব্যাখ্যাতে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমি জানি না, আপনারা সন্তুষ্ট হবেন কি না। কিন্তু আমি নিশ্চিত আমি সন্তুষ্ট।
তিনি বলেছেন, আমাদের সমাজে ছেলেরা সব সময় আশেপাশে অশ্লীলতা দেখে। নবিজি ﷺ ওনার উম্মাহর জন্য এই বেহায়াপনা/অশ্লীলতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। আর আমাদের ধর্ম অন্যান্য ধর্মের তুলনায় ছেলেমেয়েদের মেলামেশার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি রক্ষণশীল ও নিয়ন্ত্রিত। সেটা ছেলেমেয়েদের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে দুই বিপরীত লিঙ্গের মাঝে কী ধরনের কথোপকথন হবে, কোনো নন-মাহরামের সাথে একা থাকলে কী হবে, কোনো মজলিশে কী ধরনের আয়োজন হবে- ছেলেমেয়ের জন্য সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। এ ক্ষেত্রে অনেক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এমনকী সূরা নুরে তো কেউ আপনার বাড়িতে এলে কীভাবে ঢুকতে হবে, সেটা পর্যন্ত শেখানো হয়েছে। কেউ দরজা নক করল আর ঢুকে পড়ল- এ রকম হবে না। মহিলাদের আগে নিজেদের ঠিকঠাক করার সুযোগ দিন। আলাদা রুমে যেতে দিন... ইত্যাদি। এত বিস্তারিত নিয়মকানুন বর্ণনা করা হয়েছে যে, দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় আছে যখন আপনার সন্তানও এমনকী আপনার রুমে প্রবেশ করতে পারবে না। তাদেরকে বাইরে থেকে নক করতে হবে। বাসার মাঝেও ছেলেমেয়েদের মেলামেশার জন্য কিছু নিয়মাবলি আছে। এটা বেশ চমৎকার একটা ব্যাপার। আপনারা হয়তো এ বিষয়টাও জানেন যে, ছেলেমেয়েরা একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর গায়ে দেওয়ার কাঁথাও শেয়ার করতে পারে না। আমাদের ধর্মে এ রকম অনেকগুলো অসাধারণ বিধিনিষেধ, ও সতর্কতা রয়েছে। এটা ভেবে দেখার মতো বিষয়।
আর এটার ঠিক উলটো বিবরণ হচ্ছে জান্নাতের। সেখানে যুবক ছেলেরা সুন্দরী স্ত্রী পাবে। সেখানে কোনো কিছুতে কোনো বাধা থাকবে না। সে যা মন চাইবে তাই পাবে। আর সেই স্ত্রীদের বিস্তারিত বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে।
ড. ইসরার আহমেদ ঠিকই বলেছিলেন- কোনো ছেলে কলেজে গিয়ে যখন, চোখ নিচু রাখে। যদিও সেখানে খুবই কম কাপড় পরিহিত মেয়েরা থাকে। মেয়েটিকে বলে- 'হেই, কেমন আছো?' কিন্তু সেই ছেলেটি ফিরে তাকায় না। সে বলে, 'আল্লাহ আমার জন্য উত্তম প্রতিদান রেখেছেন।' সে নিজেকে এর থেকে বাঁচিয়ে চলে। যদিও তার উত্তেজিত হরমোনগুলো তাকে বলে, একটু দেখিই না। তার চোখগুলো তার কাছে ভিক্ষা চায় তাকানোর জন্য। তার কৌতূহল তাকে তাকাতে উসকানি দেয়। সেখানে সুযোগ, স্বাধীনতা, যৌবন, তেজ, সৌন্দর্য সবকিছু থাকে তার জন্য। কিন্তু সে বলে, আমি ফিরে তাকাব না, আমি এটা করব না। এ ক্ষেত্রে আমি একটি ভুল পদক্ষেপও নেব না। আল্লাহর কাছে আমার জন্য উত্তম প্রতিদান আছে। তার সব বন্ধু সেই ভুল পথে যায়, কিন্তু সে যায় না।
এটা শুধু আল্লাহর অসাধারণ ন্যায়বিচার যে, জান্নাতে তিনি সেই পানীয় প্রদান করবেন; যা এখানে আমাদের জন্য নিষিদ্ধ। সে আনন্দগুলো প্রদান করবেন, যেগুলো থেকে আমরা নিজেদের এই দুনিয়ায় নিবৃত রাখি। তিনি বলবেন- দেখ, তুমি কীভাবে নিজেকে বিরত রেখেছিলে। এই নাও, এখন উপভোগ করো। আমি তোমার জন্য দরজা অবারিত করে দিলাম। এগুলো হচ্ছে আসলে সেই বাধা-নিষেধের বিপরীত, যেগুলো আল্লাহ এই পৃথিবীতে দিয়েছিলেন। এই জন্য এখানে শালীনতা এত জরুরি। আপনারা জান্নাতে আনন্দ-ফুর্তি করতে চান? তাহলে এখানে নিজের শালীনতা বজায় রাখুন।
আল্লাহ জানেন আমাদের আকাঙ্ক্ষা আছে। তিনি আমাদের চিন্তাগুলোকেও অস্বীকার করেন না। তিনি জানেন, ওয়াসওয়াসা সব সময় আমাদের মনে আসে। সাইকোলজিতে পাবেন, একজন সাধারণ মানুষ এসব বিষয়ে দিনে কতবার চিন্তা করে। আপনারা এটা অস্বীকার করতে পারবেন না। আপনারা জানেন, এটা মানুষের মাঝে আছেই। মানুষের ভেতরে এগুলো আল্লাহই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ.
'মানুষের কাছে সুশোভিত করা হয়েছে নারী।' সূরা আল-ইমরান: ১৪
এখন প্রশ্ন হলো- আল্লাহ যখন পুরুষদের জন্য এমন পুরস্কারের বিবরণ দিয়েছেন, তাহলে নারীদের জন্য কেন দেননি? কোনো রাখঢাক না রেখে যদি বলেন, তাহলে প্রশ্নটা এ রকম যে, পুরুষরা একাধিক স্ত্রী পায়, কিন্তু তারা কেন একাধিক স্বামী পায় না?
আমার এক অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলি। একবার এক সানডে স্কুলে কিছু কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে আমাকে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা করতে বলা হয়েছিল। তাদের উভয়কেই একই প্রশ্ন করা হয়েছিল- যদি তোমাকে এমন কিছু চাইতে বলা হয়, যেটা তোমরা পাবে। যতবার ইচ্ছা চাও পাবে, কোনো বাধা থাকবে না। কেউ জানতে পারবে না, তোমরা কোনো সমস্যার সম্মুখীনও হবে না, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে না। তোমরা যা চাও এক্ষুনি পাবে, সেটা কী হবে? কী চাইবে?
এই প্রশ্নটা ১০০ কিশোর ও ১০০ কিশোরীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। উম্মাহর ছেলেদের মাঝে যেন ইজমা আছে এ ব্যাপারে! বানান ভুল বাদে সেখানে কোনো বৈচিত্র নেই। উত্তরে কোনো বৈচিত্র নেই।
মজার উত্তরগুলো এসেছিল মেয়েদের কাছ থেকে। আরেকটা ব্যাপার হলো- ছেলেদের উত্তর তা-ই ছিল, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন- 'মানুষের কাছে সুশোভিত করা হয়েছে নারী।' সূরা আল-ইমরান : ১৪
পুরুষদের মাঝে নারীদের আকাঙ্ক্ষা সহজাত। আল্লাহ পুরুষদের মাঝে এই আকাঙ্ক্ষা দিয়েছেন। এটা যেন তারই প্রমাণ।
মেয়েরা বেশ মজার উত্তর দিলো। একজন বলে, 'আমাকে কি আরও ৫ মিনিট সময় দেওয়া যাবে?' অনেকে আবার তাদের পেপারটা জমা দেওয়ার সময় বলে, 'না, না! আমি কি আমার পেপারটা ফেরত নিতে পারি কারণ, আমার মাথায় অন্য উত্তর এসেছে।' কেউ কেউ একবার কেটে লিখে, তারপর আবার কেটে লিখে। অনেকে একাধিক উত্তর দিয়েছিল কারণ, তাদের একটা উত্তরে হবে না। আমার কাছে প্রিয় উত্তরটি ছিল- 'এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।' অনেকজনকেই এ রকমটা লিখতে দেখলাম।
মেয়েদের কেউ লিখেছে, আমি শুধু আমার মায়ের সাথে থাকতে চাই। আবার কেউ বলেছে পনি (ক্ষুদ্রকায় ঘোড়া)। যাহোক, সব ধরনের উত্তর ছিল।
আবার কেউ লিখেছে, আমার ভালোবাসার পুরুষের সাথে থাকতে চাই। আমি সব ধরনের উত্তর পেয়েছিলাম। কোনো নির্দিষ্ট একটা উত্তর কিন্তু ছিল না।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের পুরুষদের আবেগকে একমুখী বানিয়েছেন। আমরা শুধু একভাবেই চিন্তা করি। সাধারণভাবে বোঝাতে চাইছি যে, অন্যরকম কিছু পুরুষও আছে যারা নারীদের ভালোবাসার থেকেও বইকে বেশি ভালোবাসে। কিন্তু আমাদের বেশির ভাগকেই আল্লাহ একই চিন্তাধারার করেছেন এবং আল্লাহ এখানে সেটার কথাই উল্লেখ করেছেন। ঠিক কি না? আমি বোনদের খুশি করার জন্য বলছি না। এটা আমার নিজের বিশ্বাস। আর আল্লাহ যা বলেছেন, আমি সেটা ব্যাখ্যা করতে লজ্জিতও না। আল্লাহর কালামের ব্যাপারে আমাদের সৎ থাকতে হবে। কাউকে খুশি বা বেজার করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমি আল্লাহর কালাম সম্পর্কে যতটুকু বুঝেছি, সেটাই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি।
আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে জান্নাতে নারীদের জন্য পুরস্কার আরও বৈচিত্র্যময়, অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। আমি আপনাদের জন্য একটা আরবি বাক্য শেয়ার করব, 'রুব্বা সুকুতিন আদাল্লু মিন কালামিন' অর্থাৎ নীরবতা অনেক সময় কথা বলার থেকেও বেশি বোঝায়। আল্লাহ তায়ালা নীরব আছেন এই ব্যাপারে কারণ, এই নয় যে পুরস্কার নেই; বরং তা ভাষায় অবর্ণনীয়। আর এই বিষয়টি কুরআনে অন্য ক্ষেত্রেও আছে। বিভিন্ন আমলের জন্য বিভিন্ন পুরস্কার রয়েছে। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু আমল আল্লাহর কাছে এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে, সেই আমলগুলোর পুরস্কার ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তো ঐসব আমলের জন্য আল্লাহ কী বললেন? 'ফা আজরুহু আলাল্লাহ'- 'এগুলোর পুরস্কার আল্লাহর কাছে'। এগুলো আল্লাহ দেখবেন। এগুলো ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, তিনি খেয়াল রাখবেন, এই দায়িত্ব তাঁর। প্রসঙ্গক্রমে আরেকটা কথা বলছি। এই ধরনের অবর্ণনীয় পুরস্কার তাদের জন্যও আছে, যারা প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যদের মাফ করে দেয়। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মাফ করে দিলে সে এই অবর্ণনীয় পুরস্কার পাবে।
নারীদের পুরস্কারের কথা বলা হয়নি, তার মানে এই নয় যে তাদের কোনো পুরস্কার দেওয়া হবে না; বরং এটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কল্পনার ওপর। প্রসঙ্গক্রমে বলি, কোনো মুসলিম নারী-পুরুষের এমনটা ভাবা উচিত না যে তারা অল্প প্রতিদান পাবে। জান্নাতে যান, আপনারা হতাশ হবেন না।
'পাওয়ার পর যদি পছন্দ না হয়?' আমি শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, আপনাদের পছন্দ হবে। এর প্রমাণ কি আপনারা পছন্দ করবেন? সূরা ফুসসিলাতের ৩১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সমগ্র মানবজাতিকে বলেন- وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ.
'সেখানে তোমরা যা চাইবে, তা-ই পাবে। এটা সবার জন্য উন্মুক্ত।'
নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই। যা চাইবেন, সেখানে তা-ই থাকবে এবং তারপর আরও কিছু, তারপর আরও বেশি কিছু।
তারপর আল্লাহ তায়ালা বলছেন- وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُوْنَ. অর্থাৎ, তোমরা যা দাবি করবে, তা-ও সেখানে পাবে। মানে একবার একটা কিছু বলার পর পরে অন্য কিছু মাথায় আসতে পারে। আপনি অন্য কিছু অর্ডার করতে চান। দাঁড়াও, দাঁড়াও... আমি ওটাও চাই। কোনো সমস্যা নেই, আপনি সেটাও পাবেন। এটা এমন না যে, একবার অর্ডার করার পর আর করা যাবে না। আপনাকে সেখানে থেমে যেতে হবে না।
আপনি আপনার মন পরিবর্তন করতে পারবেন। আপনি অন্য কিছু অর্ডার করতে পারবেন, অসাধারণ! জান্নাতের সেই দরজা নারী-पुरुष উভয়ের জন্যই খোলা।
📄 ইসলামে স্ত্রীর অধিকার
গালফ ট্যুরে থাকাকালীন একবার এক ই-মেইল পেলাম।
'আমি একজন অমুসলিম। কুয়েতে অল্প কয়েক বছর ধরে কাজ করছি। আমার অফিসের এক ধার্মিক মুসলিম কলিগকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাকে বিয়েও করতে চাচ্ছিলাম। যে কারণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলাম।
তাই আমি ইসলাম সম্পর্কে আরও জানতে চাচ্ছিলাম। আমি যাকে পছন্দ করেছি, তিনি একজন পাকিস্তানি। তার সংস্কৃতি আরও ভালোভাবে জানার জন্য আমি পাকিস্তানি এক মহিলা কলিগের সঙ্গে আলাপ করেছি। আমি ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য কুরআন পড়ছি। এখানে একজন স্ত্রীকে যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, তা খুবই হৃদয়গ্রাহী এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু যখন আমি আমার মেয়ে বন্ধুটির জীবনের দিকে তাকাই, তখন অন্য ধরনের চিত্র দেখি। তাকে তার শ্বশুরবাড়ির জন্য অনেক কিছু করতে হয়। আর তার স্বামীও তাকে জোর করে, সে যেন তার শাশুড়ির সেবা-যত্ন করে। তার শাশুড়ি তাকে অনেক যন্ত্রণা দেয়। তাদের স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়। এদিকে তার ননদেরা তাকে সব সময় কাজের মেয়ের মতো খাটিয়ে নেয়। তার স্বামীও এ ব্যাপারে অনেক কঠোর। আমি এ ক্ষেত্রে অনেক অবিচার দেখতে পাই। তিনি তাকে ভয় দেখান যে, তার কথা না শুনলে তিনি স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যাবেন। এটাই যদি ইসলামের আসল রূপ হয়, তাহলে আমি ঠিক নিশ্চিত না আমি মুসলিম হব কি না। এ ব্যাপারে আপনার উপদেশ কী?'
এ ধরনের প্রশ্ন আমার কাছে নতুন না। নারীর অধিকার সম্পর্কে জানতে চেয়ে, বিশেষ করে শ্বশুরবাড়িতে তাদের অধিকার কী, সে সম্পর্কে জানতে চেয়ে অনেকেই আমাকে এ ধরনের প্রশ্ন করেন।
বিষয়টা বেশ জটিল। আমি এ ব্যাপারে কিছু মৌলিক ধারণা সবার সাথে শেয়ার করছি। প্রথমত, এমন প্রশ্ন করার জন্য সেই বোনকে ধন্যবাদ। এটা শুধু আপনাকে না, আপনার মতো অগণিত নারীর উপকার করবে ইনশাআল্লাহ।
ইসলামে যেকোনো সম্পর্ক কিছু অধিকার আর কর্তব্যের ভিত্তিতে স্থাপিত। একজন পুরুষ হিসেবে আমার স্ত্রীর প্রতি আমার কিছু কর্তব্য রয়েছে। ঠিক যেমন আমার প্রতি তার কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আর বাবা-মায়ের প্রতি আমার কিছু দায়িত্ব রয়েছে, ঠিক যেমন আমার প্রতি তাদেরও দায়িত্ব আছে। তাদের কাছে আমার কিছু অধিকার আছে।
এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, আপনি যেকোনো একটি সম্পর্কের অধিকার আদায় করতে গিয়ে অন্য আরেকটি সম্পর্কের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারেন না। কথা হলো, আপনি কীভাবে সব অধিকারের সমন্বয় ঘটাবেন?
একজন ছেলে-সন্তান হিসেবে আমাকে আমার বাবা-মায়ের প্রতি অনুগত হতে হবে, তাদের সম্মান দেখাতে হবে, দয়া দেখাতে হবে। তারা আমার কাছে যা চান, তা পূরণ করতে হবে। যদি না তারা আমাকে ইসলামের বাইরে কিছু করতে আদেশ দেয় কিংবা আল্লাহকে অমান্য করতে আদেশ দেয়। এটা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে তাদের অনুগত থাকতে আমার কোনো সমস্যা থাকা উচিত নয়।
অন্যদিকে, আমার স্ত্রীকেও তাদের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, সাধারণ শিষ্টাচার বা আদব দেখাতে হবে। কিন্তু তাকে তাদের অনুগত হয়ে চলতে হবে না। আর স্বামী হিসেবে আমি যদি তার কাছে আমার বাবা-মায়ের সেবা দাবি করি, তাহলে আমি তার প্রতি অবিচার করছি। স্ত্রীকে তার নিজের বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্যশীল হতে হয়, তার তো নিজের অভিভাবক রয়েছে। এরা তার নিজের অভিভাবক নয়, আপনার অভিভাবক। রক্তের বন্ধনে যে সম্পর্ক হয় আর বিয়ের বন্ধনে সে সম্পর্ক হয়, তা মোটে এক নয়। কিছু মানুষ জিজ্ঞেস করে, 'কিন্তু আপনাকে তো আপনার স্বামীর আনুগত্য করতে হবে, সে যা-ই করতে বলুক না কেন!' এটাও সম্পূর্ণ সত্যি নয়। আমরা কোনো মানুষেরই এতটা অনুগত নই যে, সে যা-ই করতে বলুক না কেন তাই করতে হবে।
বাবা-মা আমাকে যা যা বলবে- আমি তার সবকিছুর আনুগত্য করতে পারব না। আমার বাবা যদি আমাকে স্টুডেন্ট লোন নিতে বলতেন, যেখানে সুদের কারবার আছে, আমি তা করতাম না। আমি এটা করতে পারি না। এতে আল্লাহর অবাধ্য হতে হবে। আমি এমনটা করব না। আর মাঝে মাঝে এমনও হয় যে, আপনাকে আদব বজায় রেখে আপনার বাবা-মায়ের অবাধ্য হতে হবে। কারণ, তারা অযৌক্তিক কাজ করতে বলছে।
এ রকমও হতে পারে আপনার বাবা আপনাকে বলছেন লোন নিতে, যা সুদের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু তিনি আপনাকে এমন ব্যবসায় যেতে বলছেন, যার ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত যে আপনার বেশ ক্ষতি হবে। আপনি নিশ্চিত জানেন যে, এই ব্যাবসা কোনোভাবেই চলবে না। অথচ তিনি চাইছেন, আপনি আপনার জীবনের সব পুঁজি সেই ব্যবসায় ঢেলে দেন। সেই মুহূর্তে আপনার বাবার কথা না শোনা তার অবাধ্যতা নয়।
আসলে অভিভাবকের অনুগত থাকার অর্থ যৌক্তিকতার ঊর্ধ্বে থাকা নয়। অবশ্যই আমরা যখন তাদের অবাধ্য হই, আমরা কখনো কোনোভাবেই তাদেরকে অসম্মান করে তা করি না। হ্যাঁ, এটাও ঠিক যে তাদের অনেক আদেশ আমাদের জন্য যদি কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বা আমাদের প্রতি যদি তারা কঠোরও হন, সেক্ষেত্রেও তাদের আনুগত্য করতে হবে। যদি তারা অযৌক্তিক কিছু করতে বলেন কিংবা এমন কিছু যা অন্যকে সমস্যার সম্মুখীন করে তোলে, তা আমি করতে পারি না। যেমন: আমি যদি সব পুঁজি দিয়ে তাদের কথামতো এমন ব্যবসায় নেমে পড়ি যেটা সফল হবে না, তাতে করে আমি তাদের ইচ্ছামতো কাজ করেছি ঠিকই, কিন্তু আমি আমার বাচ্চাদের কষ্টের মুখে ফেলে দিয়েছি। আমার স্ত্রীকে কষ্ট দিচ্ছি এবং যারা আমার ওপর নির্ভর করে আছে তাদের সকলকে সমস্যায় ফেলছি। আমি এমন কাজ করতে পারি না। তারা আমাকে যা খুশি তা করতে বলতে পারেন, কিন্তু তারা আমাকে দিয়ে অন্য কারও ওপর অত্যাচার করাতে পারেন না। এভাবে অধিকার আদায় করা যায় না।
কিছু পরিবার আছে যারা স্বামীকে জোর করেন কেবল একটা অ্যাকাউন্ট রাখতে। আর তার অভিভাবকেরা হলেন, সেই অ্যাকাউন্টের কো-সাইডার। এদিকে স্ত্রী প্রতি সপ্তাহে হয়তো দু-চার হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। এভাবে জীবনযাপন করলেও চলবে না। আপনি এটা করতে পারেন না।
আপনি আপনার স্ত্রীকে বিয়ে করেছেন, আপনি তার অভিভাবক হয়ে তাকে তার বাবার কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন। আপনাকে এখন তার প্রতি সেসব কর্তব্য পালন করতে হবে, যা তার প্রতি তার বাবা করে এসেছেন। কিন্তু এখানে ঘরে সকলে তার সাথে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষের মতো আচরণ করে! যেন সে শ্বশুর-শাশুড়ির কাজের লোক কিংবা আপনার বোন অথবা অন্য কারও। এটা হবে চরম প্রতারণা। এটা এমন এক বিষয়, যার ব্যাপারে আপনাকে এবং আমাকে শেষ বিচারের দিন জিজ্ঞেস করা হবে।
অন্যদিকে আছে আরেক চরমপন্থিরা। একদিকে, আমরা দেখি বউকে বাড়ির কাজের মেয়ে বানিয়ে ফেলা হয়েছে, যা চরম অবমাননাকর এবং উদ্ভট। কোনোভাবেই যা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। আর অন্যদিকে আছে এমন সব স্ত্রী অথবা স্বামী, যারা তাদের শ্বশুরপক্ষের সকলের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ। যেমন: তারা বলেন, তোমার বাবার বাড়ির কারও সাথে আমি সম্পর্ক রাখতে চাই না। তাদের মুখও দেখতে চাই না। আমি চাই না তারা আমাদের বাসায় আসুক। আমি চাই না তুমি তোমার মায়ের বাসায় যাও, তার সাথে কথা বলো। আমি তাকে ঘৃণা করি, তাকে আমি সহ্য করতে পারি না ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে স্বামীর সাথে তার পরিবারের ভীষণ দূরত্ব সৃষ্টি করা হয়। এটাও এক ধরনের চরমপন্থা। এটাও অবিচার।
তারা আপনার স্বামীর অভিভাবক। আপনার স্বামীর ওপর তাদের অধিকার রয়েছে। তারা যেন তাদের নাতি-নাতনিকে দেখতে আসতে পারে। তারা যেন আপনার বাসায় ঝগড়া সৃষ্টি হবে- এমন দুশ্চিন্তা করা ছাড়াই আসতে পারে। অথবা তাদের দেখলে মুখটা কালো করে বসে থাকতে পারেন না।
এতে আপনি আপনার দিক থেকে আপনার স্বামীর ওপর অত্যাচার করছেন। কারণ, তার প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে আপনার অন্তত তার পরিবারের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করা উচিত। ভদ্রতা এবং শ্রদ্ধা করা এটুকুই তো! আপনার স্বামী আপনার ওপর এগুলো চাপিয়ে দিতে পারেন না ঠিকই, কিন্তু এই আচরণ তো আপনার নিজ থেকেই আসা উচিত। আর এগুলো তো এমন বিষয়, যা আপনাদের ঘোর কাটানোর জন্য বলছি, এই সৌজন্যমূলক আচরণগুলো তো সব মুসলিমই অন্য মুসলিমের সাথে করে থাকে।
হ্যাঁ, অনেক সময় জটিল অবস্থারও সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে। সত্যিই, সেগুলো খুব মারাত্মক পরিস্থিতিতে চলে যায়।
অন্যান্য অনেক কালচারের মধ্যে, বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারতে আমরা সকলে মিলে এক ছাদে থাকার প্রতি গুরুত্বারোপ করি। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের খরচাপাতি মা-বাবা চালাচ্ছেন। ভালো স্ত্রী হিসেবে পরিচয় পেতে তখন বউকে এই করতে হবে, সেই করতে হবে- এই নীতি বেশির ভাগ পরিবারের ক্ষেত্রেই কাজে দেয় না। আর যদি কাজে না দেয় আমি বলছি না আপনারা এ ক্ষেত্রে বিয়ে ভেঙে ফেলুন, তবে এটা বাস্তবিকই আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, এই পন্থা ইসলামিক নয়। যদিও আপনারা পুরো পরিবার মিলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তকে ইসলামের আড়ালে লুকিয়ে রেখে ভাববেন না যে, ইসলাম আপনার কাছে এটাই চায়। ইসলাম আপনার কাছে এমন কিছু প্রত্যাশা করেনি; এটা আপনার পরিবার চেয়েছে। কিছু ব্যাপারে আপনাকে পরিবারের সকলকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ.
'তোমরা যেসব নিয়ামত ভোগ করো, সে ব্যাপারে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে।' সূরা আত-তাকাছুর : ৮
আমার স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, মা-বাবা- এরা সবাই আল্লাহর নিয়ামত যা আমি উপভোগ করি। তাই আমার উচিত তাদের অধিকার আদায় করা।
আমি প্রার্থনা করছি, যারা ভাবেন বউকে দিয়ে ঝিয়ের কাজ করানোর বিষয়গুলো ইসলামের আদেশ, এই কথাগুলো যেন এসব ভ্রান্ত ধারণাকে কিছুটা হলেও কমিয়ে দেয়। ইসলাম এ ব্যাপারে এমন কিছু বলেনি। এটা কেবলই স্থানীয় সংস্কৃতির অপচর্চা। কুরআন একে সমর্থন করে না, রাসূল- এর সুন্নাহও না।