📄 বিধবা বিয়ে : ভুলে যাওয়া সুন্নাহ
সূরা নুরের দুটো আয়াত নিয়ে কথা বলব এখন। আমরা শুধু বিয়ে নামক ব্যবস্থাটিকে না; সমাজে মানুষকে কীভাবে বিয়ে দেওয়া যায় সেটাও বুঝব।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার চেয়ে অলংকারময় ভাষায় আর কেউ, কখনো কথা বলেনি। অল্প কথায়, সহজভাবে তিনি বিভিন্ন বিষয় চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। যে আয়াতটা নিয়ে কথা বলব, সেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, কীভাবে একটা মুসলিম সমাজ ও মুসলিম পরিবার তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তা করবে। বিষয়টা শুধু আপনার নিজের ছেলেমেয়েদের বিয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
এই আয়াতগুলো যখন অবতীর্ণ হয়, তখন বহু মানুষ সবেমাত্র ইসলামে এসেছে। যে কারণে তাদের অনেকের কোনো মুসলিম পরিবার ছিল না। অনেক মেয়েদের মা-বাবা মুসলিম ছিলেন না। তারা তাকে কোনো ধরনের সহায়তা করছিলেন না। এই মানুষগুলো এখন সাহাবি। অবিবাহিত। আবার অনেকে ছিলেন যাদের বিয়ে ভেঙে গেছে। বাচ্চাকাচ্চা আছে অনেক।
সাধারণত পরিবারগুলোতে কী হয়? বাচ্চাকাচ্চা থাকে। এরা বড়ো হয়। বিয়ের বয়স হয়। তখন মা-বাবারা ছেলেমেয়ের বিয়ের কথা চিন্তা করেন।
কিন্তু একটু বড়ো পরিসরে চিন্তা করলে গোটা মুসলিম উম্মাহ একটা পরিবার।
আল্লাহর রাসূল সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে একই দেহের সাথে তুলনা করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা একে নাম দিয়েছেন 'ইখওয়া'। অর্থাৎ প্রায় রক্ত সম্পর্কে ভ্রাতৃত্ব। আমরা একে অপরের ভাই। আমরা সবাই মিলে বড়ো একটা পরিবারের মতো। এজন্য আমাদের সমাজে যখন কেউ বিয়েশাদি করতে সমস্যায় পড়ে, সেটা আসলে আমাদেরই সমস্যা। এর দায়ভার সামগ্রিকভাবে আমাদের সকলের কাঁধেই বর্তায়।
যে আয়াতটা নিয়ে কথা বলছি সেটা হচ্ছে-
وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ .
'তোমাদের মধ্যে অবিবাহিতদের বিয়ে দিয়ে দাও।' সূরা নূর: ৩২
আল্লাহ এভাবেই শুরু করেছেন। আরবিতে 'আয়ামা' শব্দটি নর-নারী উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। তবে বেশির ভাগ সময় নারীদের জন্য ব্যবহৃত হয়, আর কম সময় পুরুষদের জন্য। আরবীয় সমাজে শব্দটির ব্যবহার থেকে বোঝা যায়, যেসব পুরুষেরা বিয়ের জন্য সহজে বউ পাচ্ছে না, আরবরা 'আয়ামা' শব্দটি তাদের জন্য ব্যবহার করত। কিংবা যেসব পুরুষ যেকোনো কারণেই হোক বিয়েতে রাজি হচ্ছে না, তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য এই শব্দটি তারা বলত।
তবে এই শব্দটি নারীদের বেলাতেই বেশি বলা হতো। যেসব নারীদের তালাক হয়েছে, কিন্তু এখনো বিয়ে হয়নি এবং অমুসলিম পরিবার থেকে আসা মুসলিম নারীকেই 'আয়ামা' বলা হতো।
এখানে মজার একটা ব্যাপার আছে। খেয়াল করে শুনুন। আল্লাহ কিন্তু এখানে সবার আগে তালাকপ্রাপ্ত নারীদের কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের দিকে প্রথমে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। খেয়াল করলে অবাক হয়ে যাবেন, আল্লাহর রাসূলের বেশির ভাগ স্ত্রী ছিলেন তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা।
অথচ মানুষ এখন এটাকেই বাঁকা চোখে দেখে। কেউ তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা মেয়েকে বিয়ে করার কথা বললে লোকে তাকে বলে, 'পাগল নাকি তুমি'? কী আশ্চর্য, এটাই কিন্তু আমাদের নবিজি -এর সুন্নাহ!
সূরা তাহরিমের এক জায়গায় আল্লাহ নবিপত্নীদের হুঁশিয়ার করে বলেছেন, তিনি নবিজি ﷺ-কে তাদের বদলে নতুন স্ত্রী দেবেন। সেই আয়াতে আল্লাহ প্রথমে বলেছেন, 'সায়্যিবাত', পরে 'আবকার'। 'সায়্যিবাত' মানে তালাকপ্রাপ্ত ও বিধবা অকুমারী নারী। আর 'আবকার' মানে কুমারী নারী; যাদের আগে কখনো বিয়ে হয়নি।
কুরআনে আল্লাহ যে এত চমৎকারভাবে শব্দ সাজিয়েছেন, সেটা কুরআনের মুফাসসিরগণ বেশ গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন। তারা বলেছেন, যাদের আগেও এক বা একাধিকবার বিয়ে হয়েছিল, আল্লাহ এখানে তাদেরকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ, সমাজের মানুষ এদের সহজেই ভুলে যায়। পেছনে ফেলে রাখে। কিন্তু আমাদের উম্মাহতে আমরা কাউকে ছুড়ে ফেলে রাখি না।
📄 কীভাবে সন্তানদের নামাজের জন্য উৎসাহিত করবেন
আল্লাহর রাসূল দশ বছর থেকে ছেলেমেয়েদের নামাজ পড়ার জন্য শাসন করতে বলেছেন। আর সাত বছর থেকে নামাজ পড়ার অভ্যাস করাতে বলেছেন।
নয় বছর বয়স বাচ্চাদের নামাজ শুরু করার জন্য ভালো সময়। সাত বা আট বছরে হলে তো আরও ভালো। তবে বাচ্চাদের নামাজ পড়ানোর জন্য কখনো রূঢ় আচরণ করতে যাবেন না, প্লিজ।
আমার বাচ্চাগুলোর মধ্যে কেউ কেউ বেশ ভালোই নামাজ পড়ে। আবার দু-একজন একটু আলসেমি দেখায়। সে যাহোক, আমরা সবাই একসাথেই নামাজ আদায় করি। ওদের কেউ আমাকে নামাজে দাঁড়ানো দেখলেও, লেগো নিয়েই খেলতে থাকে। কিন্তু সেজন্য আমি ওদের ধমকাই না। বলি না, 'অ্যাই, এদিকে আসো। নামাজ পড়ো।' আগে এমনটা করতাম।
বিষয়টা নিয়ে আমার স্ত্রী আমাকে একবার বলল, 'তুমি কেন ওদের সাথে এমন করো?' ওর কথা শুনে ভাবলাম, অন্যভাবে বিষয়টা নিয়ে বাচ্চাদের সাথে কাজ করলে কেমন হয়।
এখন আমি ওদের সাথে লেগো নিয়ে খেলি। কথায় কথায় বলি, 'তুমি যে নামাজে ছিলে না, আমার খুব মন খারাপ লেগেছে। পরেরবার তুমি আমার সাথে নামাজ পড়বে, ঠিক আছে?' ওরা তখন বলে, 'ঠিক আছে বাবা। পরেরবার তোমার সাথে থাকব।'
দেখা যায়, পরেরবার নামাজের সময় হলে, সে নিজেই দৌড়ে এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। উৎসাহভরে বলে, 'বাবা, আমি কিন্তু এখন তোমার পাশেই।' আমি চোখে- মুখে আনন্দ নিয়ে বলি, 'ইয়ে! চলো, এবার একসাথে নামাজ আদায় করি।'
এটি খুব আদর-ভালোবাসাময় একটি কাজ হবে। তবে এজন্য বাচ্চাদের সাথে ধৈর্য নিয়ে কাজ করতে হবে।
এমন কোনো নীতি নেই যে, বাচ্চাকাচ্চাকে ধামকি দিয়ে বলবেন, 'অ্যাই, এখন নামাজের সময়। তোমরা সব কই?' এ রকম করতে থাকলে দেখা যাবে, বাচ্চারা নামাজের সময় হলেই সোফার নিচে লুকোচ্ছে।
'বাবার জন্য দু-রাকাত নামাজ পড়ছি।' আমি চাই না বাচ্চাদের মধ্যে এমন মনমানসিকতা গড়ে উঠুক। আপনিও চাইবেন না নিশ্চই।
বাচ্চাকাচ্চাদের ভালোবাসতে হবে। উৎসাহ দিয়ে যেতে হবে। ধৈর্য ধরে রাখতে হবে। ওরা যদি কখনো না পড়ে, আলসেমি দেখায় বা তাদের মনে না চায়, তাহলে এটা স্বাভাবিক। ওরা এখনও বাচ্চা। কিশোর না। ওদেরকে সময় দিয়ে বোঝালে, ইনশাআল্লাহ একটা সময় ওদের মধ্যে নামাজের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হবে।
নামাজ তো আসলে আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক মজবুত করার জন্য। সম্পর্ক ভালোবেসে হয়। ভয়ে ভয়ে নয়।
আমি দুআ করি, আপনারা যেন ধৈর্যশীল বাবা-মা হন।
বাচ্চাদের কাছ থেকে আমরা নিখুঁত আচরণ আশা করতে পারি না। কীভাবে আশা করব। আমরা নিজেরাই তো নিখুঁত নই!
📄 স্ত্রী এবং শ্বশুর-শাশুড়ি
এক
কোনো এক প্রোগ্রাম শেষে একজন মহিলা আমাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার স্বামী নিয়ে কথা বলা শুরু করল। এটি আমার শোনা সবচেয়ে খারাপ ঘটনা নয়, কিন্তু যথেষ্ট জগঝাঁপিচুড়ি পাকানো একটি ঘটনা।
সে বলেছিল, আমার স্বামী যথেষ্ট ধার্মিক। সে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। সব সময় মসজিদে যায়। ইত্যাদি, ইত্যাদি। কিন্তু একই সাথে, সে আমাকে আমার পরিবারের সাথে দেখা করতে নিষেধ করে। আমি যখন তাদের কল করি, যখন তাদের সাথে দেখা করতে যাই, সে এটা পছন্দ করে না। আমাকে খুব কষ্ট করে লুকিয়ে লুকিয়ে আমার মাকে কল করতে হয়, দেখা করতে হয়। যদি আমার স্বামীকে না বলি যে, আমি আমার মায়ের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করি, তাহলে কি আমি গুনাহগার হব? কারণ, আমাকে তো আমার স্বামীর কথা মেনে চলতে হবে।
আমার স্বামী আমাকে বলে, স্ত্রীদের ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব রয়েছে। তাই সে যা বলে, আমাকে তা-ই করতে হবে। সে হচ্ছে ঘরবাড়ির আমির। সে বলে, আল্লাহ ও তাঁর দ্বীন মতে, সুন্নাহ ও শরিয়া মতে, তোমাকে আমার কথা মেনে চলতে হবে; যেহেতু তুমি আমার ঘরে বাস করো। তুমি তোমার পরিবারের সাথে,
ভাই-বোনদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে না। এ ছাড়াও এগুলোর সাথে সে তার ওপর আরও শর্ত আরোপ করে, আমি চাই না তুমি ঘর থেকে বের হও। বাড়িতে থাকো এবং কোথাও যাবে না, যতক্ষণ না আমি নিজে তোমাকে নিয়ে যাই।
ঘটনাটি এ রকমই ছিল। কাজেই মহিলাটি জিজ্ঞেস করেছিল, 'আমি কি এই কারণে গুনাহগার হব?' একবার সে বাড়ির পেছনে গিয়েছিল, তার জন্যও নাকি তাকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল! সে হতাশ হয়ে পড়েছে। তার স্বামী সেখানেই ছিল, সে বাথরুমে বা অন্য কোথাও ছিল। আর সেই সুযোগে মহিলাটি আমাকে প্রশ্ন করতে পেরেছিল। কী অদ্ভুত!
দুই অনেক সময় মানুষ অনেক কিছুই ইসলামের নামে করে। তারা কুরআন-সুন্নাহ, শরিয়ার উদ্ধৃতি দেয়। অথচ আমলের দিক দিয়ে বিষয়টা হয় উলটো। আমার স্ত্রীর সাথে আমার যেমন সম্পর্ক আছে, আমার স্ত্রীর সাথেও তেমন তার বাবা-মায়ের, ভাই-বোনের, বান্ধবীর সম্পর্ক আছে। একটা সম্পর্কের অন্য সম্পর্কগুলো ভেঙে দেওয়ার কোনো অধিকার আমার নেই।
প্রত্যেকেরই তার নিজস্ব একটি দুনিয়া থাকে। আমরা কোনো মানুষের দাস নই। কোনো মানুষই আসলে অন্য কোনো মানুষের দাস হতে পারে না। আমরা সবাই একমাত্র আল্লাহর দাস।
আমি আমার মায়ের কাছে কিছু জিনিসের জন্য ঋণী। আমার মা আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছু করার জন্য বলতে পারেন না। আমার স্ত্রীও আমার মায়ের বিরুদ্ধে কিছু করার জন্য বলতে পারে না! আবার আমি আমার স্ত্রীকে এমন কিছু করতে বলতে পারি না, যেটি তার বাবা-মায়ের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে।
সে কি আমার বাড়িঘর ছেড়ে তাদের সাথে চলে যাচ্ছে? সে তো শুধু একটি কল দিয়েছে! আমি তাকে এটি না করতে বলতে পারি না। কারণ, সে তার বাবা-মায়ের কাছে ঋণী। আর মা-বাবার খোঁজ নেওয়াটা তো আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ। এটি এমন কিছু না, যা সে নিজে থেকে করছে। এটি আল্লাহর হুকুম। তিনি বলেছেন-
بِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا. 'তোমরা মাতা-পিতার সাথে সদাচার করো।' সূরা বনি ইসরাইল: ২৩
এখানে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য এই আদেশ। তিনি কিন্তু এটি বলেননি, পুরুষরা! সব সময় মাতা-পিতার সাথে সর্বোত্তম আচরণ করো, আর 'মহিলারা' বিয়ে পর্যন্তই। জীবনের বাকি সময় মা-বাবা শুধুই ইতিহাস। মাঝে মাঝে খোঁজ খবর নিলেই হবে। যেমন, শুধু প্রতি ঈদে! আল্লাহ আমাদের এমনটি করতে বলেননি।
অন্যভাবে বলা যায়- আপনি অন্যকে দায়দায়িত্ব পালনে নিষেধ করতে পারেন না এবং অন্যের অধিকার থেকেও তাকে বঞ্চিত করতে পারেন না। প্রত্যেকের বিশুদ্ধ বাতাসের অধিকার রয়েছে। আবার কোনো মহিলারা ব্যাপারটিকে উগ্রভাবে গ্রহণ করতে পারে। কোনো মহিলা বলতে পারে, 'দেখুন আমি উমর (রা.)-এর একটা গল্প শুনেছি। উনি রাস্তায় ঘুরতেন, তাই আমিও রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে যাচ্ছি! আমি ক্যালিফোর্নিয়া যাচ্ছি। ওহে, স্বামী! পরে দেখা হবে!' অনেকেই এটি করতে পারেন। তাহলে এটি সম্পূর্ণই তাদের সমস্যা। এটি আরেক ধরনের মানসিক সমস্যা। আমাদের দ্বীন এমন নয়। যেমন কেউ বলল, 'আমি শুধুই বিদ্রোহী হব। কারণ, এটা হওয়ার অধিকার আমার আছে।'
পরিবার মানে এটি নয় যে, একে অন্যের কাঁধে শুধু নিয়মকানুন চাপাবেন এবং সব সময় একটি হাদিসের উদ্ধৃতি কিংবা আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে কোনো কাজ করাবেন। তাহলে কুরআন এবং সুন্নাহর বিষয়ের চেয়েও আপনার নিজের আরও গভীর সমস্যা আছে! আমাদের বৈবাহিক সম্পর্কগুলো তখন আর সুস্থ থাকে না! বিয়ে মানে হচ্ছে আলোচনা, একে অন্যকে ছাড় দেওয়া, আমার সঙ্গী সুখী কি না সেটা সব সময় খেয়াল রাখা। আর যখনই আপনার সঙ্গীকে দিয়ে কিছু করানোর জন্য রীতিমতো দ্বীনকে ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করতে হয়, তাহলে এটা চূড়ান্ত পর্যায়ের নোংরামি। একটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি জগাখিচুড়ি আর কিছুই চিন্তা করতে পারি না। অন্যের ওপরে জোর করে নিজের হুকুম চালানোর জন্য কুরআন এবং হাদিসের উদ্ধৃতি দেওয়া, যদিও সেটা সেখানে খাপ খায় না।
সুবহানাল্লাহ, আমার যতটুকু বলার ছিল তাকে বলেছিলাম। কিন্তু দিন শেষে সে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। আমি অথবা কেউই ওই পরিস্থিতিতে সাহায্য করতে পারব না। দিন শেষে তাকেই তার স্বামীর সাথে সরাসরি এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। হতে পারে আমার কথাগুলো কাজে লেগেছে। কমপক্ষে আমি মনে করি খোলাখুলি আলাপ-আলোচনা হওয়া জরুরি। আর যখন মানুষ ধর্মের অপব্যবহার করে, তাহলে সেটা তুলে ধরা উচিত। আপনারা জানেন, এ রকম ঘটনা দেখে আমার দুঃখ হয়। কিন্তু ইনশাআল্লাহ, দিন দিন পরিস্থিতি ভালো হচ্ছে। কমপক্ষে মানুষ আমার কাছে আসার মতো সাহস পাচ্ছে। আমি এই সাহসের তারিফ করছি। বাড়ির সমস্যা নিয়ে আসা এবং কথা বলা একটি অনেক বড়ো সাহসের ব্যাপার।
আমি দুআ করি, সবাই যেন এটা থেকে উপকৃত হয়। কারণ, তার যথেষ্ট সাহস ছিল আমার কাছে আসার এবং প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার। পরবর্তী সময়ে আবার দেখা হবে।
📄 আপনার সন্তানকে সময় দিন
মায়েদেরকে প্রাকৃতিকভাবে আল্লাহ কিছু উপহার দিয়েছেন। যেমন: মাতৃত্বের ব্যাপারটা তাদের মধ্যে অধিকতর সহজাতভাবে আসে। আল্লাহ এটি তাদের দান করেছেন। এ কারণেই তারা মমতাময়ী, কোমল, যত্নবান এবং বেশি উদ্বিগ্ন।
বাবাদের এটার জন্য চেষ্টা করতে হয়। আপনি বাসায় বসে আছেন, আপনার বাচ্চা পড়ে গেল। কে দ্রুত এগিয়ে আসবে? 'আহা বাবা কী হয়েছে বা আম্মু কী হয়েছে?' এ ধরনের কথা বলে মা-ই কিন্তু আগে দৌড়ে আসে।
অন্যদিকে দেখবেন, বাবা তার জায়গাতেই বসে আছে। বসে থেকেই বলে- 'নিজেই উঠতে পারবে, কিছু হয়নি, কিছু হয়নি। কোনো ব্যাপার না। ধুলা ঝেড়ে ফেলো। কিছু হয়নি বাবা। চিন্তার কিছু নেই। সামান্য ব্যথা পেয়েছ।'
এদিকে মা কিন্তু দিশেহারা হয়ে যান। এটি তার মধ্যে স্বভাবজাত। কিন্তু সন্তানকে ইসলামের ওপর মানুষ করার জন্য বাবা-মা দুজনকেই সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। আর আমি খেয়াল করে দেখেছি যে, এ জায়গাটিতেই আমরা অনেক পিছিয়ে।
আমরা যদি আমাদের সন্তানদের ইসলামের মধ্যে বড়ো করতে চাই, তাহলে আমাদের প্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হলো- আমাদেরকে তাদের বন্ধু হতে হবে।
এজন্য পরিশ্রম করতে হবে। কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আপনাদের নিজেদেরকে বদলাতে হবে। নিজের জন্য নয়; আপনার সন্তানের জন্য। আপনি যখন বাসায় আসেন, তখন আপনার বাচ্চারা আপনার সঙ্গে খেলতে চায়। 'আব্বা, আমাকে কোলে তুলে নাও, আমাকে ঘোরাও, এটা করো, ওটা করো। আর একটুখানি করেই আপনি এমন কাহিল হয়ে যাওয়ার ভান করেন। 'আব্বাকে এখন একটু শুতে হবে, একটু অপেক্ষা করো।' এটা ঠিক না।
বাচ্চাদের নিয়ে পাহাড়ে উঠুন, তাদের সাথে খেলাধুলা করুন। বাড়ির আঙিনায় দৌড়াদৌড়ি করুন। তাকে সময় দিন। সন্তান আর আপনার মাঝের সংকোচ দূর করার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। তা নাহলে সে যেকোনো বিষয় নিয়ে আপনার সাথে কথা বলতে পারবে না। আমি এটা আপনাদের এ কারণে বলছি যে, যখন তারা একটি নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছাবে, তখনও কথা বলার মতো কারও সেই প্রয়োজনটা থেকেই যাবে। সেই মানুষটি আপনিই হয়ে যান না! বাইরের ছেলেপেলে, বড়ো ভাই, গালফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড লাগবে কেন? আপনিই হয়ে যান তার কাছের মানুষ।
হঠাৎ করে নিশ্চই আপনি আবিষ্কার করতে চান না যে, আপনার বাচ্চা যেন অন্য কেউ। অর্থাৎ অচেনা একজন। আপনি আলাপকালে হয়তো একসময় বুঝতে পারলেন, এই সন্তানকে আপনি চেনেন না। এত বছর এক ছাদের নিচে বসবাস করার পরও কীভাবে এমনটা ঘটল, সেটা ভেবে আপনি নিজেই অবাক।
'ও, এটা তো কবেই ঘটে গেছে বাবা। কবেই ঘটে গেছে।' শুধু আপনিই জানতেন না। আপনি ছিলেন মহা ব্যস্ত। আপনার সময় ছিল না। আপনি জানতে চাননি বা পারেননি।
আপনাকে আপনার সন্তানদের জন্য বিশেষ সময় তৈরি করে নিতে হবে। এটা হবে শুধু তাদের সময়। যদি আপনার অনেক সন্তান থাকে, তাহলে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে, প্রতিটা সন্তানই যেন আলাদা আলাদা মনোযোগ আর সময় পায়। অন্য কারও কাছ থেকে নয়, শুধু আপনার কাছ থেকে। কোনো খেলনা নয়, কোনো গ্যাজেট নয়, কোনো কিছুই নয়, শুধু আপনি। এটা করতেই হবে। ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।