📄 গর্ভপাত
এক বোন আমাকে ই-মেইল করেছিলেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা, মাশাআল্লাহ। তার স্বামী তাকে বলেছেন, 'আমরা এখন সন্তানের ঝামেলা নিতে পারব না।' তাই তার উচিত গর্ভপাত করে ফেলা।
তিনি এটি কেমন করে বললেন, আমি বুঝতে পারছি না। তিনি বলেছেন, 'আমাদের পর্যাপ্ত রিজিক নেই, এটি সন্তান গ্রহণের জন্য উপযুক্ত সময় নয়।' আবার কিছু ধার্মিক জাস্টিফিকেশনও জুড়ে দিচ্ছেন। সুবহানাল্লাহ! তিনি আরও বলেছেন, 'প্রথম কয়েক মাসে ফেরেশতারা শরীরে রুহ প্রবেশ করান না, তাই বাচ্চাটিকে তখন মানুষ বলা যায় না। এটি কোনো ব্যাপার না।'
আমি অবশ্য ফতওয়া দেওয়ার মতো যোগ্যতা রাখি না। আর আমি এই কাজটি কখনো করবও না। অন্যান্য ধার্মিক বিচারের ব্যাপারে পরে আসি। এখানে প্রথম সমস্যা হচ্ছে, আমরা ভাবছি আমরা সন্তানের ভরণ-পোষণ করতে পারব না। আসল কারণ হলো- মানুষটা টাকা খরচ করতে চাইছে না, তাই না? এই টাকার জন্য তিনি একজন মানুষের জীবন নিতে রাজি আছেন। এটা তার চিন্তা। এটি সবচেয়ে জঘন্য আর অপমানজনক কাজ। আরবের মূর্তিপূজাররা যে এমনটা করত, সেটা কুরআনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা আছে-
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ .
'দারিদ্র্যের আশঙ্কায় তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমি তাদেরকে রিজিক দান করি এবং তোমাদেরকেও।' সূরা বনি ইসরাইল: ৩১
আর সে এই অংশটুকু ভুলে গেল! হ্যাঁ। এখন তুমি যদি এই আয়াতের এই অংশ না মানো, এর মানে হলো তুমি পুরো আয়াতটাই অগ্রাহ্য করলে, তাই না? তুমি বুঝতে পারছ এর মানে কি দাঁড়ায়? তাহলে আল্লাহ তোমাকে রিজিক দান করা থেকেও বিরত থাকবেন।
তুমি এই সন্তানের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বরাদ্দকৃত রিজিক পাঠানোর রাস্তা বন্ধ করে দিলে। আর বাচ্চাটির দেখাশোনা করতে পারবে না বলে বাচ্চাটাকে মেরে ফেললে। অথচ আল্লাহ এখানে বলছেন, তুমি কি ভেবেছিলে তাদের রিজিকের ব্যবস্থা তুমি করছিলে? না! তা আমার কাজ। যেন আল্লাহ নিজে এর দায়িত্বে আছেন। যদি তুমি এই আয়াত অস্বীকার করো, তবে তুমি তোমার জন্য পাঠানো রিজিকও ফেলে দিচ্ছ।
এই মানুষটা যদি পয়সা খরচ করাকে সত্যিই ভয় পায়, তাহলে তো তার এসব কাজ থেকেও বিরত থাকা উচিত।
আর সেই বোন আমি এখনও তাকে রিপ্লাই দেইনি, তবে সম্ভবত আমি তাকে বলব, সে যেন নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। এটা তারও সন্তান। এই সন্তানটি তার প্রতি আল্লাহর উপহার। কোনো স্বামীর এ ধরনের কথা বলার অধিকার নেই। এ ধরনের কাজে তাদের কোনো অধিকার নেই। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জানি না তারা কীভাবে ভাবল, তাদের এমন অধিকার থাকতে পারে।
সুবহানাল্লাহ! এটি একটি জীবন, যার মালিক আল্লাহ। আমরা নই। আমাদের এখানে কিছু বলার অধিকার নেই। সত্যিই নেই। আল্লাহ এমন * পরিস্থিতির শিকার হওয়া নারীদের জীবন সহজ করে দিক। কখনো কখনো স্ত্রীরা অবিবেচকের মতো কাজ করে, আবার কখনো স্বামীরা চরম গোলমেলে কাজ করে বসে।
আচ্ছা, তাদের বেলায় কী হবে- ধরুন, তারা বিয়ে করেনি কিংবা এমন কেউ যাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। শেষে তারা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন, আপনি তাদের ব্যাপারে কী বলবেন?
সেটা তো সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি, কিন্তু সেক্ষেত্রেও গর্ভপাতের ব্যাপারটা আলাদা। এটি বলে রাখা উচিত যে, ওই ধরনের বাচ্চাদের অভিশাপ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সমাজ ওদেরকে 'আওলাদুজ-জিনাহ', এই-সেই আরও কত কী বলে। এই বাচ্চা বৈধ না হওয়ার কারণে সে অন্যদের চেয়ে নীচ- ইসলাম এমনটা বিবেচনা করে না। ওয়েস্টার্ন সোসাইটিতে তো এটা তেমন কোনো সমস্যাই না।
বিয়ে বহির্ভূত সন্তান সেখানে কোনো সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কিন্তু ইস্টার্ন সোসাইটিতে কিংবা ধর্মীয় সংস্কৃতিতে মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এটা খুব বড়ো সমস্যা।
এখন জিনাহ হলো একটি জঘন্য কাজ। ধর্ষণ কিংবা জিনাহ যেটাই হয়ে থাকুক না কেন, এটা এমন অপরাধ যার জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু অন্য একজনের অপরাধের দায় সেই বাচ্চার বয়ে বেড়ানোর পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। তাদের ক্ষেত্রে এমন হওয়া উচিত নয়। সেই মায়ের জন্য এমনিতেই এটি খুব কষ্টের সময়।
তবে, এ ক্ষেত্রে আমি গর্ভপাতের ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না। কারণ, আমার সেই যোগ্যতা নেই। আমি শুধু বলতে চাই, সেই বাচ্চাকে সমাজের কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
আর সেই বাচ্চাকে কলঙ্কের হাত থেকে রক্ষার্থে আল্লাহর একটি আয়াতই যথেষ্ট। এই আয়াতটি আমাদের সব বুঝিয়ে দেবে। وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ . 'আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।' সূরা বনি ইসরাইল: ৭০
সেই বাচ্চাও আদম সন্তান, যার অর্থ হলো আল্লাহ তাকেও সম্মানিত করেছেন। এর অর্থ হলো, প্রেগনেন্সির এক পর্যায়ে রুহ নিয়ে ফেরেশতারা তার মায়ের কাছে এসেছিল, আর সেই রুহ এসেছিল আল্লাহর তরফ থেকে। এটা আল্লাহর দান। পবিত্র ফেরেশতারা সেই মায়ের কাছে এসেছিল, তাই না? তাদের কাছ থেকে আমরা তাদের সম্মান কেড়ে নিতে পারি না।
তবে, এ ক্ষেত্রে একটি জটিল বিষয় হলো গর্ভপাত করার ব্যাপারটা। আমি গর্ভপাতের ক্ষেত্রে কোনো যৌক্তিকতা দেখি না। তবে এই বিষয়ে ভিন্নমত
থাকতে পারে, যা আমি জানি না। আমার এই বিষয়ে জ্ঞান নেই। এই মতামত দেওয়া ইসলামি আইনজ্ঞদের কাজ। তবে নৈতিক দিক থেকে ভাবলে, যা বাচ্চার জন্য সবচেয়ে ভালো হয়- সেটা অন্য ব্যাপার।
তো সবশেষে বলা যায়, সেই নারীর স্বামীর এই অধিকার নেই স্ত্রীকে গর্ভপাতের কথা বলার। এটা তার শরীর, সিদ্ধান্তও তার।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। সুবহানাআল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা মুসলিম নারীদের সহায় হোন।
সম্পাদকীয় ফুটনোট: গর্ভপাতের বিধান গর্ভপাতের বিধান অবস্থাভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণত গর্ভস্থ ভ্রূণকে চার ভাগে ভাগ করা হয়।
১. ভ্রূণের বয়স ছয় মাসের অধিক। এই অবস্থায় কোনোভাবেই বাচ্চা নষ্ট করা বৈধ নয়। কারণ, ছয় মাসের অধিক হলে সিজারের মাধ্যমে বাচ্চাকে বের করে আনলে সে জীবিত থাকে।
২. ভ্রূণের বয়স ছয় মাসের কম, চার মাসের অধিক। এই অবস্থায়ও গর্ভপাত হারাম। তবে মাকে বাঁচানোর জন্য যদি গর্ভপাত করা অত্যাবশ্যক হয়, তাহলে একাধিক অভিজ্ঞ ডাক্তারের স্বীকারোক্তির শর্তে গর্ভপাত বৈধ। কারণ, ছয় মাসের কম বয়সের বাচ্চা সিজারের মাধ্যমে বের করলেও জীবিত থাকে না। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে বাচ্চার জীবন অনিশ্চিত আর মায়ের জীবন নিশ্চিত। তাই নিশ্চিত জীবনকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে অনিশ্চিত জীবনকে হত্যা করাটা যুক্তিসংগত।
৩. ভ্রূণের বয়স চার মাসের কম। কিন্তু তার কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হয়ে গেছে। এই অবস্থায় বিনা কারণে গর্ভপাত করা মাকরূহে তাহরিমি। তবে শরঈ ওজরবশত গর্ভপাত করতে হলে মাকরূহ হবে না।
৪. ভ্রূণের বয়স এতটুকু যে, তার কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এখনও গঠিত হয়নি। এই অবস্থায় গর্ভপাত মাকরূহে তানযিহি। তবে শরঈ উজর থাকলে মাকরূহ নয়।
উল্লেখ্য যে, যেসব কারণকে ওজর হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে তার মধ্যে কিছু হলো: ক. মায়ের দুধের অভাব থাকা। যার ফলে বাচ্চার অনিষ্ট হতে পারে। খ. মায়ের শারীরিক দুর্বলতার কারণে, মা ও বাচ্চা উভয়ের জীবন হুমকির সম্মুখীন হওয়া। গ. প্রথম বাচ্চার বয়স এত কম যে, এমতাবস্থায় নতুন করে গর্ভধারণ করলে প্রথম বাচ্চা অপুষ্টিতে ভুগবে; যা তার জীবনের জন্য ক্ষতিকর। ঘ. প্রথম বাচ্চা এত ছোটো যে, নতুন বাচ্চা জন্ম নিলে দুজনকে একসাথে দেখভাল করাটা কষ্টকর হতে পারে।
[প্রমাণপঞ্জি: আদ্দুররুল মুখতার ১০/২৫৪), ফাতহুল আলিয়্যিল মালিক ১/৩৯৯, আলবাহরুর রায়েক ৮/৩৭৯, ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা-২৪৪]
📄 বিয়ে : পছন্দ-অপছন্দ ও চাপানো
আমার কাছে অনেক খবর আসছে। বিয়ে করার জন্য মেয়েদের মানসিকভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। তাদের বলা হচ্ছে- 'তুমি যদি অমুককে বিয়ে না করো, তাহলে তোমাকে আর কেউ বিয়েই করবে না। তোমার নিজের অবস্থার দিকে তাকাও... ইত্যাদি ইত্যাদি।'
বাবা-মায়েরা তাদের মেয়েকে হয়রান করছেন। তাদের বলছেন, 'তোমাকে শিগগিরই বিয়ে করতে হবে। তোমার জন্য যেন আমাদের ছোটো হতে না হয়। তোমার কারণে আমাদের পরিবারের দুর্নাম যেন না হয়। এর পরের বার প্রস্তাব আসলে অবশ্যই রাজি হয়ে যাবে।' আর এভাবেই এই মেয়েগুলো প্রতিনিয়তই চাপের মুখোমুখি হতে থাকে। এটা হলো একটা দিক।
আরেকটা দিক হলো, মেয়েরা কাউকে পছন্দ করলে তা প্রকাশ করতে পারে না। আমি এই কথাটা তাদের উদ্দেশে বলছি না, যারা ডেটিং করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোনো মেয়ে যদি কারও ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে আমাদের সমাজে এটাকে জঘন্য কাজ হিসেবে দেখা হয়। যেন সে চরম কোনো অপরাধ করে ফেলেছে।
ইসলামে জোরজবরদস্তি করে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার কোনোই স্থান নেই। প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়েতে অবশ্যই মেয়ের সম্মতি থাকতে হবে।
তাও আবার 'অনিচ্ছাকৃত' সম্মতি নয়; রাজি হওয়ার ব্যাপারে তাকে খোলামেলা এবং খুশি থাকতে হবে। অর্থাৎ সে প্রকৃতপক্ষেই বিয়েতে সম্মত আছে।
এমন না যে, 'আমার বাবা-মা যেহেতু বলছে, তাই আমার আর কিছুই বলার নেই...'
হাদিসের এসেছে- 'খুনাসা (রা.) নামে এক নারীকে তার পিতা বিয়ে দেন। এই বিয়ে তার পছন্দ ছিল না। এরপর রাসূল -এর কাছে গেলে তিনি এই বিয়ে বাতিল করে দেন। সহিহ বুখারি: ৪৭৬২
আপনি চিন্তা করতে পারেন? লোকেরা কেন এমন করে? চাপ দিয়ে বিয়ে দেওয়া যে একদম নিষিদ্ধ, তা কেবল জানাই যথেষ্ট না। কারণ, মানুষ হারাম জানার পরেও অনেক কাজ করে থাকে। এর একটা মনস্তাত্ত্বিক দিকও আছে। এই মানুষগুলো তাদের সন্তানের সুখের চেয়ে নিজের সুখের ব্যাপারে বেশি সচেতন। তাদের নাম, বংশ, সমাজের সামনে তাদের কেমন লাগবে এসব ভুয়া চিন্তা যেগুলো বাস্তবে পুরো অর্থহীন, সেগুলোই কিনা তাদের কাছে সন্তানদের জীবনভর সুখ-শান্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিয়েটা এখন একটা অনুষ্ঠানসর্বস্ব বিষয় হয়ে গেছে। 'কতজন মানুষ বিয়েতে আসবে?', 'আমরা এই হলটায় অনুষ্ঠান করব।' 'আমরা এটা করব, সেটা করব।' 'ওই পরিবারের সাথে আমাদের বেশ ভালো সম্পর্ক হবে।' 'আমরা অনেক ভালো পাত্র পেয়েছি।' পুরো বিয়েশাদি এখন এ রকম কিছু বিষয়ের ব্যাপার হয়ে গেছে।
তারা আসলে ভালো পাত্র পায়নি, তারা কেবল একটা ভালো সিভি পেয়েছে। তারা খোঁজে পাত্র অমুক এলাকার কি না, তার এই এই যোগ্যতা আছে কি না। অনর্থক সব বিষয়।
আর পাত্রের ব্যাপারে আশেপাশে অনেক ভালো খবর শুনলেও, বাস্তব জীবনে সম্পূর্ণ খারাপ চরিত্রের হতে পারে। আমি অনেক ঘটনা জানি যে,
চুলচেরা সন্ধান চালিয়ে একই মহল্লার পাত্র খুঁজে তাঁর সাথে মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর দুসপ্তাহ পর দেখা যায় যে, সে মেয়েকে পিটিয়ে প্রায় মেরে ফেলার মতো অবস্থা করে ফেলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের উচিত ছিল, তাদের ভুল স্বীকার করা। কিন্তু তারা উলটো মেয়েকে বলবে- 'না না, তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে।' 'বাইরে যেন এ ব্যাপারে জানাজানি না হয়, তাহলে আমাদের মান-সম্মান থাকবে না।'
বিয়ে দ্বীনের অর্ধেক আর তারা মানুষের বিয়ে ধ্বংস করে বেড়াচ্ছে। এই লোকগুলো বাস্তবে ছেলেমেয়েদের দ্বীন থেকেই দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁদের সাবধান হওয়া উচিত। তারা শুধু তাঁদের সন্তানদেরই ঝামেলায় ফেলছেন না, তাঁরা নিজেরাই আল্লাহর সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছেন।
সন্তানদের সুখ ও সম্মতির বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আল্লাহর কাছে দুআ করছি, সন্তানের বিয়েশাদির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তিনি যেন আমাদেরকে বিজ্ঞ, ন্যায়পরায়ণ অভিভাবক বানিয়ে দেন। আল্লাহ যেন আমাদের ছেলেমেয়েদেরকেও বড়ো হওয়ার সাথে সাথে সঠিক, সুবিবেচিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।
বারাকাল্লাহু লি ওয়ালাকুম, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্।
📄 পতনপূর্ব অহংকার
কোনো কিছুর স্বীকৃতি পেলে মানুষের মধ্যে আত্মগৌরব তৈরি হয়। বাবা যদি কোনো এক সন্তানকে অন্য সন্তানদের সামনে প্রশংসা করে বলেন, 'আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত'। তখন অন্য সন্তানের কী হয়? মনে মনে সে রাগে ফুঁসে ওঠে। 'বাবা যদি এক সন্তানকে বলেন, 'আমার গাড়িটা পরিষ্কার করে দাও। তুমি এটা ভালো পারো'। অন্য সন্তান হয়তো গাড়ি পরিষ্কার করতে চায় না, সে বরং টিভি দেখতেই পছন্দ করে; কিন্তু তারপরও সে অসন্তুষ্ট! কারণ, বাবা আমাকে কেন বলল না? আমার কি সামান্য একটা গাড়ি পরিষ্কার করার মতো যোগ্যতাও নেই? তিনি বললে আমি হয়তো বলতাম, আমি বরং ভিডিও গেইমই খেলব'। কিন্তু ঘটনা হলো, তিনি আমাকে সামান্য জিজ্ঞেসও করলেন না? এটা তো আমার মনের ভেতর হাতুড়ি পেটা করছে। এখানে আসলে স্বীকৃতি পাওয়ার তীব্র বাসনা কাজ করছে।
ইবলিস নিজেকে বড়ো বলে অহংকারী স্বীকৃতি চাইত। কার কাছ থেকে? আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে। যদিও এর সাথে দায়দায়িত্ব পালনের ব্যাপার জড়িত। এটা কোনো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান নয় যে, সে পৃথিবীতে রাজত্ব পাবে বা যা চায় তা-ই পাবে। প্রকৃতপক্ষে, দুনিয়াতে মানব জীবন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي كَبَرٍ.
'নিশ্চয় আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।' সূরা বালাদ: ৪
নিজেকে আর নিজের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মানুষকে প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করতে হয়। দুইটা বাড়তি আয়ের জন্য, মানুষের সাথে চলার জন্য, সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বাস্তবে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। এসব সহজ কাজ নয়। তারপরও আদম আলাইহিস সালামকে যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তা ইবলিস সহ্য করতে পারেনি। কেন আদমকে স্বীকৃতি দেওয়া হলো? কেন আমাকে নয়? অন্যের থেকে বড়ো স্বীকৃতির এই তীব্র তৃষ্ণা মানুষকেও শয়তানে পরিণত করতে পারে।
ঘটনা প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলি। এটি সেই একই স্বীকৃতির তৃষ্ণা, যার ফলে মানব ইতিহাসের প্রথম হত্যাকাণ্ড হাবিল-কাবিলের মাঝে সংঘটিত হয়। এর বিবরণ সূরা আরাফে আছে। আর এই প্রথম হত্যাকাণ্ড কিন্তু টাকার জন্য হয়নি, সম্পত্তি বা এ রকম কোনো কারণেও না।
তারা দুজনেই কুরবানি পেশ করেছিল। একজনেরটা গ্রহণ করা হয়েছিল, অন্যজনেরটা হয়নি। একজনেরটা স্বীকৃতি পেয়েছিল, অন্যজনেরটা পায়নি। লক্ষ্য করুন, সেই একই হিংসা এখানে কাজ করছিল।
কী কারণে নবি ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা মারাত্মক প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে পড়েছিল? তারা তো তাকে প্রায় খুনই করে ফেলেছিল। তারা জঙ্গলের মধ্যে নির্জন কুয়ায় তাঁকে ফেলে দিয়েছিল। সেখানে তো সাপ-বিচ্ছু থাকার কথা। সেটি ছিল ভীষণ দুর্গম কোনো নির্জন প্রান্তরের একটা গর্ত। তবুও তারা তাদের ভাইকে সেখানে ফেলে দিয়েছিল। জানেন কেন? কারণ, তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে যে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন, তা অন্য ভাইয়েরা পায়নি। একারণে তারা হিংসাত্মক হয়ে উঠেছিল।
এখন এই 'স্বীকৃতি' জিনিসটাকে আপনারা ভালো করে বোঝার চেষ্টা করুন।
যখন আমরা আত্মমর্যাদা সম্পর্কে চিন্তা করি, তখন আত্মমর্যাদাকে অর্থ-বিত্ত, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা ইত্যাদির সাথে যুক্ত করি। কিন্তু আমি মনে করি, এসব বিষয় মানুষের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কাছে খুবই তুচ্ছ ব্যাপার। শয়তান আপনার ভেতর প্রশংসা পাওয়ার, স্বীকৃতি পাওয়ার, দৃষ্টি আকর্ষণ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষার বীজ বপন করবে।
আপনি সমাজে অনেক লোক পাবেন, যারা ইসলামের নামে কাজ করছেন, মসজিদের জন্য কাজ করছেন। এসব কাজ কিন্তু কোনো আরামের কাজ নয়।
জোনিং-এর জন্য আবেদন করা, পার্কিংলট মেরামত করা, কন্ট্রাক্টরদের সাথে কথা বলা, অজুর জায়গার রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং আরও অনেক কিছু-এগুলো কোনো মজার কাজ নয়। এসব লোকের মাঝে এমন লোকেরাও আছে যারা চাকরি থেকে সময় বের করে, পরিবারকে ফেলে রেখে, মসজিদের বোর্ড মেম্বার হন, ভলান্টিয়ার হন, কীভাবে টাকা খরচ করবেন এজন্য মিটিং-এর পর মিটিং করে যান। কী কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, কোন কোন জায়গা মেরামত করতে হবে ইত্যাদি নিয়ে ভাবেন।
এদের মধ্যে এমন কাউকে পাবেন, যে বিত্তশীল। তার ভেতর এই শক্ত মনোভাব কাজ করে যে, আমাকে মসজিদের প্রেসিডেন্ট হতেই হবে। আরে ভাই, আপনি হয়তো ইতোমধ্যে আপনার ডিপার্টমেন্টের প্রধান অথবা ডাক্তার; যার পেছনে নার্সরা আদেশের অপেক্ষায় থাকে। ওপরন্তু আপনার ঘরের প্রধানও আপনি। আপনার রয়েছে অর্থ-বিত্ত, এসব কিছুতে আপনিই প্রধান। কিন্তু এরপরও আপনি ভাবেন, এক জায়গায় আমাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তারা তো স্বীকৃতি দিচ্ছে না যে, আমি তাদের জন্য কত কিছু করলাম। আমি আমার মর্যাদার যথাযথ স্বীকৃতি মসজিদ থেকে পাচ্ছি না। আমাকে অবশ্যই মসজিদের মহীয়ান শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এমনকী মসজিদের ভেতরেও!
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا .
'মসজিদগুলো আল্লাহর জন্য। তাই তোমরা আল্লাহ তায়ালার সাথে কাউকে ডেকো না।' সূরা জিন: ১৮
কথা প্রসঙ্গে বলে রাখি, আমি বিশেষভাবে কারও প্রতি ইঙ্গিত করছি না। এটা আমার উদ্ভাবনী কল্পনা মাত্র। এই অবস্থা যে কারও ব্যাপারেই হতে পারে। এমনকী হয়তো কারও কোনো পেশাই নেই। কিন্তু সে যখন মসজিদে আসে, তখন স্বীকৃতি, ভোটাভোটি, নির্বাচন ইত্যাদি ব্যাপারগুলো নিয়ে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এ তো যেন রিপাবলিকান বনাম ডেমোক্রেটের মতো অবস্থা!
তাও আবার মসজিদের ভেতর! কিন্তু কেন? আপনি কি জিতছেন? অন্য সবার থেকে বড়ো হতে চাওয়া, সবার চোখে বড়ো হতে চাওয়া, সবার বিবেচনায় বড়ো হতে চাওয়া, সমস্ত কৃতিত্ব নিজের দিকে টেনে নেওয়া- এগুলো আসলে কী?
এই যে মাথার ভেতর গেঁথে আছে, মানুষ আপনাকে আপনার অবদান দেখে সম্মান দেবে, এটাই তো আসলে ইস্তিকবার। বড়োত্ব, দাম্ভিকতা, অহমিকা, এখানে কিন্তু কোনো বৈষয়িক প্রাপ্তিই নেই। বাহ্যিক কোনো উপকারই এসব আচরণ থেকে বের হয়ে আসে না।
এটা কিন্তু একটা রোগ। এটা যেমন আপনার বৈষয়িক জীবনে ক্ষতি করে, তেমনি মানবতার প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই এই অহংকার ক্ষতি করে। মানুষের প্রত্যেকটি সম্পর্ককেই এটি আঘাতের মাধ্যমে ক্ষতি করে। অহংকার পারিবারিক সম্পর্ককেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরিবারের ভেতর এমন স্বামী থাকতে পারেন, যিনি সারাক্ষণ তার অবদানের স্বীকৃতি খুঁজছেন। তিনি সারাক্ষণ রাগ ঝেড়েই যাচ্ছেন, আমি তোমাদের জন্য এত কিছু করলাম আর তোমরা আমার কোনো মর্যাদাই দিলে না! সর্বশেষ, তোমরা কখনো আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছিলে? তিনি যেন সারাক্ষণ স্বীকৃতির জন্য উত্তেজিত। তিনি যেন নিজের সামান্য এক ঘরের অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরই এক ফেরাউন। তার যেন ফেরাউনের সেই 'আমিই তোমাদের সেরা পালনকর্তা' ঘোষণার দরকার।
আপনি হয়তো এক ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। সেখানে মাত্র পাঁচ-ছয়জন একত্রে কাজ করে। আমি নিশ্চিত, এমনও সামান্য কাজ আছে যা হয়তো আপনি খুব ঠেকে না গেলে করবেনই না। যেমন, পরিচ্ছন্নতা ডিপার্টমেন্টের ট্রাক একজন ড্রাইভ করেন। আর অন্যজন পেছনে ঝুলে থাকেন, তিনি আবর্জনা কুড়িয়ে ট্রাকে ভরেন। অন্যদিকে, যিনি সামনে আছেন, তিনি অহংকারে ভাবছেন, হুম..., আমিই তো ড্রাইভার। আসলে এই ছোট্ট জগতের তিনিই তো ফেরাউন। তিনিই ইস্তিকবারে আক্রান্ত হয়েছেন। কারণ, তিনি বিরাট কিছু একটা হয়ে গেছেন বলে নিজেকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। এই ইগো বা আত্মঅহমিকার প্রতিযোগিতা আপনার অফিসের ভেতর, আপনার ডিপার্টমেন্টের ভেতর, আপনার টিমের ভেতর, বিভিন্ন টিমের ভেতর, এমনকী এটা বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, এই আত্মঅহমিকার প্রতিযোগিতা পরিবারের ভেতরে, এমনকী আপন ভাই-বোনদের ভেতরেও কাজ করে।
বাস্তবতা হলো, ভাই-বোনদের ভেতর আত্মহমিকার প্রতিযোগিতা তো সবচেয়ে মারাত্মক। বলা যায়, এটা এক ধরনের অনিবার্য সংঘাত। এজন্যই কোনো এক সন্তান ভাবে অন্যজনের ওপর বাবার সমস্ত আগ্রহ চলে গেছে। সে বেশি লম্বা বা স্কুলে ভালো গ্রেড পায় এজন্য। অন্যজনকে বাবা কি আমার থেকে বেশি ভালো বলে মনে করে?
দুঃখজনকভাবে আমরা পিতা-মাতারা সন্তানদের এই পরিস্থিতিতে কোনো সাহায্য তো করিই না; ওপরন্তু একজনের একশত পাওয়াকে অন্যসব সন্তানদের গালে শক্ত চপটোঘাতের মতো করে কালিমা লেপন করি। তার মার্কশিট উঁচু করে ধরে অন্যদের বলি, এজন্যই অন্য সবার থেকে আমি তাকে বেশি ভালোবাসি। এজন্যই এই... 'এজন্যই সেই... সে যেমন দেখতেও ভালো, বুদ্ধিতেও তেমন।'
যে বাচ্চাগুলোকে শোনাচ্ছেন, এগুলো তাদের মনে অন্তরজ্বালা দিচ্ছে। তারা রাগে ফুঁসেই যাচ্ছে। আর আপনি অবাক হন, কেন তারা এত হিংস্রভাবে মারামারি করে। সে তার ভাইয়ের খেলনা নিয়েই ভেঙে ফেলে। খেলে না, ধরেই দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে চুপ করে থাকে। বাবা-মা দৌড়ে এসে ধমক দিয়ে যখন জিজ্ঞেস করে, কেন তুমি এটা সব সময় করো? তখন সে ফোঁপাতে থাকে। মনে মনে বলে, তুমি তাকে বেশি ভালোবাসো। এমনকী তুমি তার খেলনাকেও আমার থেকে বেশি ভালোবাসো। ছোটোবেলা থেকেই এটা তাদের ভেতরে কাজ করে।
একেই বলে ইস্তিকবার বা বড়োত্ববোধ। শয়তানের এটা ছিল। তাই সে মানুষের ভেতরেও তার অনুপ্রবেশ করাতে চায়। এটাই তাকে ধ্বংস করেছে। তাই সে নিশ্চিত করতে চায়, যেন প্রত্যেকটা মানুষের ভেতরই তা কাজ করে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই সমস্যাকে আমরা কীভাবে মোকাবিলা করব।
📄 মা-বাবার সাথে
وَ قَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلْهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا- وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَ قُلْ رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيْنِي صَغِيرًا.
'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে "উফ” শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদেরকে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো। তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলো, হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।'
এটি সূরা আল-ইসরার ২৩ ও ২৪ নাম্বার আয়াত। এই আয়াতের আলোকে আমি মা-বাবার সাথে সন্তানের আচার-আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সেটা নিয়ে কথা বলব।
আল্লাহ আয়াতটার শুরু করলেন এই বলে- وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ
যার অর্থ হলো, তোমাদের রব আদেশ করছেন, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারও ইবাদাত করবে না। আয়াতের প্রথম অংশ আমাদের ওপর আল্লাহর অধিকারের ব্যাপারে দাবি জানাচ্ছে। আর দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে- وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
'তুমি অবশ্যই তোমার পিতা-মাতার সাথে সর্বোত্তম আচরণ করবে।' ভাষাগত ব্যাকরণে না গিয়ে বলা যায় যে, 'ইহসানা' শব্দটি দ্বারা এখানে জোরালো উপদেশ দেওয়া হয়েছে। আপনি তাদের সাথে যথাসম্ভব ভালো ব্যবহার করবেন। আয়াতের বাকি অংশ শুধুই মা-বাবার সঙ্গে আচরণের ব্যাপারে। প্রথমে আল্লাহ বলছেন, 'তুমি তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করবে', এরপর তিনি বলেন- إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ.
'তারা যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়' أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَهُمَا .
'...তাদের মধ্যে একজন অথবা উভয়েই...' فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ.
'...তাদেরকে “উফ” শব্দটিও বলো না' আমি এ ব্যাপারটায় একটু পরেই ফিরে আসব। وَلَا تَنْهَرْهُمَا.
'... আর তাদেরকে ধমক দিয়ো না বা দূরে ঠেলে দিও না...' وَقُلْ لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا.
'আর তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো।'
একটার পর আরেকটা, তারপর আরেকটা। এভাবে একের পর এক শুধুই পিতা-মাতাকে নিয়ে বলা হয়েছে। মাত্র একবার আল্লাহর সম্পর্কে বলা হয়েছে, আর বাকি সব অংশ পিতা-মাতার ব্যাপারে কথা বলছে। চিন্তা করে দেখুন, এ বিষয়টি কত গুরুত্বপূর্ণ!
এ আয়াতের সুন্দর দিক হচ্ছে, শুরুতে আল্লাহ নিজেকে উল্লেখ করেছেন। এরপর মা-বাবার ব্যাপারটা। আপনি যদি আল্লাহর একজন ভালো বান্দা হতে না পারেন, তাহলে মা-বাবার সাথেও আপনার আচার-আচরণ ভালো হবে না।
প্রথম অংশটি যথার্থভাবে পালন না করলে দ্বিতীয় অংশে এসেও আপনি ব্যর্থ হবেন। মা-বাবার সাথে আপনাদের কারও আচার-আচরণ খারাপ হওয়ার অর্থ আপনি আসলে এখনও আল্লাহর ভালো বান্দা হতে পারেননি। আপনার প্রথম করণীয় কাজটি এখনও করেননি। পরেরটা করা আপনার জন্য সহজ হয়ে যেত, যদি আপনি তার আগেরটা করতেন। এটি হলো প্রথম পয়েন্ট।
দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো, সর্বোত্তম হওয়া বলতে আসলে কী বোঝায়? এখানে বলা হচ্ছে, 'ওয়াবিল-ওয়ালিদাইনি...' এখানে 'ওয়া ইহসানান বিল ওয়ালিদাইনি' বলা হয়নি। তাহলে এটার ভিন্ন অর্থ হতো। 'ওয়াবিল ওয়ালিদাইনি ইহসানান'-এর মানে হচ্ছে, 'বিশেষভাবে' আপনার পিতা-মাতার কথা বলা হচ্ছে। অন্যদের সাপেক্ষে যখনই মাতা-পিতার ব্যাপার চলে আসে, আপনি তাদের কাছে সর্বোত্তম হবেন। অন্য কথায়, নিজের বসের কাছে ভালো হওয়া খুবই সহজ। কেননা, আপনি তার সাথে ঝামেলায় জড়ালে নিজেই বিপদে পড়বেন। আপনার প্রফেসরের সাথে ভালো আচরণ করা স্বাভাবিক। কারণ, তিনি আপনাকে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দিতে পারেন। একইভাবে আপনার বন্ধুদের কাছেও, কেননা আপনি তাদের হারাতে চান না। কিন্তু যখনই আপনার মাতা-পিতার কথা আসে, তখন আপনি অনেকটা রিলাক্সড! ও, মা-বাবা? ওনারা তো সারা জীবন আমারই। তাই আল্লাহ বলছেন, নাহ। ব্যাপারটা এত হালকা না। আল্লাহ তায়ালার অধিকারের পরেই পিতা-মাতার অধিকারের ব্যাপারটা আলোচনা করার বিশেষ একটা গুরুত্ব আছে।
ধরুন, আপনি ফোনে বন্ধুর সাথে কথা বলছেন, আর আপনার মা আপনাকে ডাক দিলো। আপনি তখনই তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যাবেন। ব্যাস! এখানে আর কোনো 'কিন্তু' নেই। আপনি ভিডিও গেমস খেলছেন আর আপনার মা বললেন, 'নাস্তা রেডি!' আপনি বলবেন না, 'দাঁড়াও না! বললাম তো আসছি! একটু বসে থাকো!' এগুলো চলবে না। সাথেই সাথেই সেটাকে রেখে দিন। চলে যান। আমি আপনার বাসায় থাকলে আপনার টিভিটাই ভেঙে ফেলতাম। বলতাম 'যান, আপনার মায়ের কথা শুনে আসুন।' এটা আমাদের দ্বীনের একটি প্রাথমিক দায়িত্ব।
এরপর আল্লাহ বলেন, 'তাদের একজন বা দুজনই যখন বার্ধক্যে উপনীত হোন' তখন বিষয়টা আরও গুরুতর। কেননা, যখন আমাদের মাতা-পিতার বয়স বাড়তে থাকে, তার সাথে সাথে তাদের প্রয়োজনও বাড়তে থাকে।
অন্যদিকে তাদের বয়স বাড়ছে আর আপনি স্বাধীন হচ্ছেন। প্রাপ্তবয়স্ক হচ্ছেন। আপনি তখন ভাবেন, নিজের সিদ্ধান্তগুলো নিজেই নেবেন। এখন আপনার নিজের একটা জীবন আছে। তারা এখনও আপনাকে বাচ্চা হিসেবে দেখছে, তারা আপনাকে বুঝতে পারে না- এ রকম নানা অভিযোগ আপনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আপনি আপনার বন্ধুদের কাছে এগুলো বলে বেড়ান।
কিন্তু আল্লাহ বলছেন যে, 'বিশেষভাবে' যখন তারা বৃদ্ধ হয়ে পড়ে, 'বিশেষভাবে' যখন তারা অযৌক্তিক হয়ে যায়, 'বিশেষভাবে' যখন তারা আর আপনার অবস্থা বুঝতে পারে না, আপনার ওপর নানা দাবি-দাওয়া চাপাতে থাকে, তখনই সময় তাদের কাছে সর্বোত্তম হওয়ার। আর যে আল্লাহর ভালো বান্দা নয়, তার কাছে এটা মোটেও সহজ হবে না। এগুলো তাদের জন্য না; বরং আল্লাহর জন্য করতে হবে। এটা হলো দ্বিতীয় দিক।
তারপর তিনি বলেন, 'ওয়ালা তানহার হুমা'। 'তাদেরকে ধমক দিও না কিংবা দূরে সরিয়ে দিও না'। ভিক্ষুকদের ব্যাপারে ঠিক একই আদেশ নবি ﷺ-কে দেওয়া হয়েছিল। ওয়া আম্মাসসা-ইলা ফালা তানহার। একই রকম শব্দ তাই না? 'ভিক্ষুকদের ধমক দিও না, তাদের দূরে ঠেলে দিও না।'
মা-বাবাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবেন না। আপনার মা আপনার সাথে কথা বলছে, আর আপনি হুট করে চলে যান অথবা আপনি কথা বলার সময় তার দিকে তাকানও না। আপনার লজ্জা হওয়া উচিত। মায়ের সাথে কীভাবে আপনি এমনটা করতে পারেন? আপনার জন্য তিনি কতই-না কষ্টের মধ্যে দিয়ে গেছেন। আর আপনি তার সব কষ্টের কথা ভুলে গিয়ে বলতে থাকেন 'আরে বুড়িটা সারাক্ষণ চেঁচামেচি করে, বকবক করে...'
কী চরম অকৃতজ্ঞতা! শুধু আপনার মায়ের প্রতি না, প্রথমে আল্লাহর ওপর, তারপর আপনার মায়ের ওপর। আপনি কি ভুলে গেছেন, আপনি তার গর্ভের মধ্যে ছিলেন? যে কারণে একটু পরপরই তার বমি হতো। ভেতর থেকে আপনি তার পাঁজরে লাথি মারতেন। আর পেট থেকে বের হওয়ার সময়
আপনি তাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলেন। কত ব্যথা-বেদনার মধ্য দিয়ে তিনি আপনাকে লালন-পালন করেছেন। রাতে কখনো কখনো ঘুমোতে পর্যন্ত যাননি।
অথচ এখন সব দিব্যি ভুলে গেছেন। আর তাই এমন আচরণ করছেন। আপনার মনে নেই বলে আপনি তাদের সাথে যাচ্ছেতাইভাবে কথা বলেন।
'ওয়া কুল লাহুমা কওলান কারিমা, অর্থাৎ 'তাদের উভয়ের সাথে সম্মানের সাথে, শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো।'
আপনাদের অনেকেরই মুখ দিয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মতো বাজে শব্দ, খারাপ ভাষা বের হতে থাকে। আপনি এগুলো বলার সময় একটুও চিন্তা করেন না। মাতা-পিতার সাথে কথা বলার সময় আপনার অবশ্যই এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর এমনিতেও এসব ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে মাতা-পিতার সাথে তো তা কোনোভাবেই না।
এরপরে আরও একটি আয়াত মাতা-পিতাকে কেন্দ্র করে নাজিল হয়েছে। যেখানে বলা হচ্ছে- وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ.
'তাদের দুজনের জন্য তোমার কোমলতা ও বিনয়ের ডানা অবনত করো।' সূরা বনি ইসরাইল: ২৪ আরবিতে ডানা নত করার অর্থ হলো, আপনার পাখির মতো উড়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু তারপরেও আপনি নিচে যেকোনো জায়গায় নেমে আসেন। আপনার চলে যাওয়ার ক্ষমতা আছে; তাদের মুখের সামনে জোরে দরজা লাগিয়ে দিতে পারেন কিংবা ফোন কেটে দিতে পারেন। তবুও এগুলো সহ্য করেন, তাদের বকবকানি মেনে নেন।
আপনি হয়তো আমাকে বলেন বা ফেসবুক পেজে লিখবেন, 'নোমান ভাই, আপনি বুঝতে পারছেন না। আমার মাতা-পিতার মাথা পুরো নষ্ট হয়ে গেছে' অথবা 'আমার ব্যাপারটা পুরো আলাদা...'
কী মনে হচ্ছে? প্রত্যেকেই ভাবে যে, তাদের অবস্থাটা অন্যদের থেকে আলাদা। কেউ ভাবে না যে, এগুলো তাদের ক্ষেত্রে খাটে। সবাই মনে করে, এই কথাগুলো পাশের কাউকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে।
আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে খুব ভালো করেই জানেন। তিনি আমাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত থেকেই এ কথাগুলো বলেছেন। তাই তাদের প্রতি বিনয়ের ডানা অবনত করুন।
আমার শেষ মন্তব্য আয়াতের শেষ অংশকে নিয়ে। যেখানে বলা হয়েছে, 'মিনার রহমাহ' অর্থাৎ দয়া পরবশ হয়ে। এটি অন্তত তিনটি দিক বোঝায়।
প্রথমত, আপনি তাদের প্রতি বিনয়ী হবেন, যদিও তার বিপরীত হওয়ার ক্ষমতা আপনার আছে। আপনি তা করবেন কারণ, তারা এমন বয়সে উপনীত হয়েছে, যখন আপনার দয়া তাদের খুব প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, আপনি ছোটো থাকা অবস্থায় তারা আপনার প্রতি দয়া করেছিল। আর তারা কিন্তু এসব কিছু রেকর্ডে লিখে রেখে বিল বানিয়ে আপনাকে দিয়ে বলেনি, 'দেখ, আমরা তোমার এত সেবা-যত্ন করেছি, এত ঘণ্টা তোমার পেছনে শ্রম দিয়েছি। এখন এর মূল্য পরিশোধ করো।'
না, তারা আপনাকে দয়া দেখিয়েছে; এখন আপনারও তাদের প্রতি দয়া করার সময় এসেছে।
তৃতীয় এবং সর্বশেষ পয়েন্ট হলো, আপনি যদি চান আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুক, আপনি তাদের প্রতি দয়া দেখান।
আল্লাহ আমাদেরকে মাতা-পিতার সাথে সর্বোত্তম বানিয়ে দিন। আর তিনি যেন আমাদের এই আয়াতগুলো উপলব্ধি ও তদানুযায়ী জীবনযাপন করার তাওফিক দান করেন। বারাকাল্লাহু লি ওয়ালাকুম ফিল কুরআনিল হাকিম।