📄 সন্তান প্রতিপালন
টিনেজারদের মা-বাবারা প্রায় সময়ই আমার কাছে এসে বলেন, 'জানেন, আমার ছেলেটা না, আজকাল আমার কথা শোনেই না। আপনি ওর সাথে একটু কথা বলবেন?' তারা এমনভাবে বলেন, যেন আমি কোনো মহৌষধ সাথে নিয়ে ঘুরি! যেন সেই ছেলেটা আমার কাছে আসলে আমি ওর গায়ে ফুঁ দিয়ে দেবো, আর সাথে সাথেই সে দারুণ ভদ্র ছেলে হয়ে যাবে! না; বরং আপনি আপনার ছেলের সাথে কেন কথা বলছেন না? যখন তার সাথে কথা বলার প্রকৃত সময় ছিল তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
আজকে আমি আপনাদের সাথে মা-বাবাদের নিয়ে একটু কথা বলব, তারপর বলব, স্বামী-স্ত্রীদের নিয়ে। খুবই মৌলিক দুটো সম্পর্ক। এটা আপনার সন্তানদের সাথে, আরেকটা আপনার জীবনসঙ্গীর সাথে। এই দুটো সম্পর্কের ব্যাপারেই আমরা খুব বেসিক কিছু ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করব।
আপনার সন্তান যখন খুব ছোটো, ধরুন- যখন তাদের বয়স পাঁচ, ছয়, সাত কিংবা দুই, তিন, চার। তখন তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন জিনিসটা বলুন তো? আমার নিজের পাঁচটা বাচ্চা আছে। তাই এ ব্যাপারে আমি খুব ভালো বলতে পারব। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার সমর্থন। তারা আপনাকে গর্বিত করতে চায়। তারা যা যা করেছে সব আপনাকে দেখাতে চায়।
ধরুন, ফোনে আমি জরুরি কোনো কাজের আলাপ করছি। জরুরি একটা ফোন, আর এ সময় আমার দুই বছরের ছেলে এসে বলবে, 'আব্বা, আব্বা, আব্বা, আব্বা, আব্বা।'
'ভাই, একটু লাইনে থাকেন।'
'কী হয়েছে বাবা?'
'হে হে হে।'
ব্যস! আমি আবার ফোনালাপে ফিরে গেলাম, সে আবার আমাকে ডাকা শুরু করল। আমি বললাম, 'আচ্ছা ঠিক আছে, কী হয়েছে বলো।'
'আমি তোমাকে একটা জিনিস দেখাব।'
'কী দেখাতে চাও বাবা?'
'আচ্ছা, ঠিক আছে।' ব্যস এতটুকু বলেই সে চুপ।
কিন্তু আমার এ ক্ষেত্রে কী করা উচিত বলুন তো? 'মাশাআল্লাহ! দারুণ তো! আবার করো দেখি। ভাই, আমি আপনাকে পরে ফোন দিচ্ছি।'
আপনার সন্তানরা যা করে আপনার উচিত তার কদর করা। এটা তাদের পরম আরাধ্য। অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি তারা এটাই চায় আপনার কাছে।
আমার তিনটি মেয়ে আছে। ছেলে আর মেয়েদের মধ্যে পার্থক্য কি জানেন? ছেলেরা এক জায়গায় বসে থাকতে পারে না, আর মেয়েরা কথা বলা থামাতে পারে না। তো আমি আমার মেয়েদের স্কুল থেকে যখন নিয়ে আসি, একজন ক্লাস ওয়ানে আরেকজন ক্লাস থ্রিতে পড়ে। আমি ওদের স্কুল থেকে ২৫ মিনিট গাড়ি চালিয়ে বাসায় নিয়ে আসি। আর এই পুরোটা সময় তারা কি করে জানেন? 'জানো আজকে ক্লাসে কি হয়েছে? আমরা একটা ডাইনোসর রং করেছি। এটা করেছি, ওটা করেছি। প্রথমে আমি বেগুনি রং করলাম, তারপর ভাবলাম একটু সবুজ রং-ও দিই।' সে এভাবে বলতে থাকল তো বলতেই থাকল। থামার কোনো নামই নেই। ওদের পক্ষে থামা সম্ভবই না। আর আমাকেও মনোযোগ দিয়ে অবশ্যই সেটা শুনতে হবে। আমি বললাম, 'ও তাই! নীল রং দাওনি?'
'না অল্প একটু নীল দিয়েছি।'
আমাকে মনোযোগ দিতে হবে। আর আমি এগুলো কেন বলছি জানেন? আচ্ছা সেটা বলার আগে অন্য একটা গল্প বলে নিই। তাতে আপনাদের বিরক্তিটা একটু কাটবে।
এই গল্পটা আমি প্রায়ই বলি। আমার বড়ো মেয়েটা হুসনা, যখন ছোটো ছিল তখন আঙুল দিয়ে ছবি আঁকতে খুব পছন্দ করত। সে তার আঙুলগুলো রঙের মধ্যে চুবিয়ে তারপর সেগুলো দিয়ে হাবিজাবি আঁকত। সে একদিন বিশাল এক কার্ডবোর্ড নিয়ে আমার কাছে হাজির! সেখানে নীল রং দিয়ে বিশাল কী যেন আঁকা, আগামাথা কিছুই বুঝলাম না। সে বলল, 'আব্বা, দেখো আমি কী এঁকেছি।'
'বাহ, দারুণ! একটা পাহাড়!'
'না, এটা তো আম্মু!'
'হ্যাঁ?'
'আম্মুকে এই কথা বলো না কিন্তু!'
যে কথাটা আমি বলতে চাচ্ছি তা হলো, ওরা আপনার সমর্থন পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। কিন্তু আপনাদের যাদের সন্তানরা টিনেজার, তাদের যখন স্কুল থেকে আনতে যান, তারা কি এমন কলকল করে কথা বলে যায়? তারা কি বলে, 'জানো আজকে স্কুলে কি হয়েছে? টিচার এটা বলেছে, ওটা করেছে, পরীক্ষায় “এ” পেয়েছি।'
না! তারা একদম চুপ করে থাকে!
তাহলে বরং আপনিই বলার চেষ্টা করবেন, 'কেমন গেল দিন?'
'মোটামুটি।'
'কী করলে সারা দিন?'
'কিছু একটা।'
'আজকে কোথায় যাবে?'
'যাব কোথাও।'
তারা কথাই বলে না! তাদের কথা বলানো অনেকটা পুলিশের আসামিকে জেরা করার মতো ব্যাপার। আপনাকে তারা কিছুই বলে না। আর যখন আপনি তাকে প্রশ্ন করছেন, তখন হয়তো সে তার বন্ধুকে এসএমএস পাঠাচ্ছে: 'আব্বা আজকে বেশি প্রশ্ন করছে! ঘটনা কী? তুমি ওনাকে কিছু বলেছ নাকি?'
ছোটো বয়সে আপনার বাচ্চারা আপনার মনোযোগ পাওয়ার জন্য পাগল থাকে। আর যখন তারা বড়ো হবে, আপনি তাদের মনোযোগ পাওয়ার জন্য পাগল হবেন।
কিন্তু তারা যখন ছোটো থাকে তখন যদি আপনি তাদের মনোযোগ না দেন, তাহলে ওরা বড়ো হতে হতে সম্পর্কটা শীতল হয়ে যাবে। তারা খেলনা নিয়ে আপনার কাছে এলো আর আপনি বললেন, 'ঘরে যাও! আমি সংবাদ দেখছি, এই, তুমি ওকে একটু সরাও তো! সারা দিন অনেক কাজ করেছি, এখন ওকে সামলাতে পারব না। বাসায় আমার বন্ধুরা এসেছে, কী বলবে ওরা? যাও ঘুমাতে যাও। যাও এখান থেকে।' আপনি যখন ওদের সাথে এমন আচরণ করবেন, তারাও পরে আপনার সাথে এ রকম আচরণ করবে। আপনার কাজ কি চাকরি করা, আর বাসায় এসেছেন শুধু বিশ্রাম নিতে? না রে ভাই! আপনার কাজ শুরু হয়েছে তখনই, যখন আপনি ঘরে ফিরেছেন। সেটাই আপনার আসল কাজ। চাকরিতে যে কাজ করেছেন সেটা শুধু এজন্য যেন, ঘরের আসল কাজটা ঠিকমতো করতে পারেন।
একজন প্রকৃত বাবা হোন। পুরুষ পাঠকদের বলছি- একজন প্রকৃত বাবা হোন। আপনার সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটান। তারা শুধু এজন্য নেই যে আপনি তাদের স্কুলে রেখে আসবেন, আর অফিস বাসায় ফিরে ঘুমাতে যাবেন। কোনো ঝামেলায় যাবেন না, তাদের সাথে কথা বলবেন না। তাদের সঙ্গে কথা না বলার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তাদের হাতে একটা আইপড টাচ অথবা আইফোন ধরিয়ে দেওয়া। তাদের নিজস্ব রুমে হাই-স্পিড ইন্টারনেটসহ একটা কম্পিউটার বা ল্যাপটপ দিয়ে দেওয়া।
এমন হলে আপনাকে তাদের চেহারাও দেখা লাগবে না। তারা সারা দিন তাদের ঘরে থেকেই ফেসবুকিং করতে থাকবে, নাহয় অনলাইনেই নিজেদের জন্য নতুন বাবা-মা খুঁজে নেবে। কিন্তু না, এমনটা কখনোই করবেন না।
সিরিয়াসলি বলছি। প্রকৃত বাবা হোন। প্রকৃত মা হোন। আপনার মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের বদলি হিসেবে এইসব জিনিসকে আসতে দেবেন না। কারণ, যদি দেন, তাহলে ওরা যখন স্বাবলম্বী হয়ে যাবে, তখন বেশির ভাগ বাবা-মায়ের কি হয় জানেন? আপনাদের বেশির ভাগের ছেলেমেয়েরা আপনাদেরকে কতগুলো টাকার মেশিন হিসেবে দেখে। শুধু কখন তারা আপনাদের কাছে আসে? 'বাবা, আমাকে ৫০ টাকা দাও তো।' জানি আজ-কাল কেউ আর ৫০ টাকা চায় না। কমপক্ষে ২০০ টাকা। কিছু বাচ্চাদের চিনি যারা এত কম টাকা দেখেইনি। ৫০ টাকার নোট চেনেই না তারা। 'আমাকে ৫০০টাকা দাও তো।' 'শপিংমলে যেতে চাই, আমাকে একটু পৌছে দাও তো।' 'বন্ধুদের বাসায় যাই।' 'এটা কিনতে পারি।' 'ওটা কিনতে পারি।'
যখন তাদের কোনো কিছুর দরকার তখন তারা আপনার কাছে আসে। এর বাইরে আপনি তাদের খুঁজে পাবেন না। আর যখন তারা বড়ো হবে, নিজেরাই একটু-আধটু কামাই করতে পারবে, তখন কী হবে? আর তাদের দেখাই পাবেন না। কারণ, আপনার টাকার মেশিনও এখন আর দরকার নেই। এর প্রয়োজন শেষ। আপনি যদি এই ধরনের সম্পর্ক তৈরি করেন, তাহলে নিশ্চিত বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছেন। আপনাকে এখনই পরিবর্তন আনতে হবে। আর পরিবর্তনের উপায় হলো, জানি এটা অনেকের জন্যই করাটা কঠিন হবে, আমাদেরকে আমাদের সন্তানদের সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে। আমাদের সাথে সময় কাটানোটা তাদের কাছে উপভোগ্য হতে হবে। আমাদেরকে হতে হবে তাদের কাছের মানুষ।
📄 জোর করে বিয়ে
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে বলেন- وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ.
'যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও, তার ব্যাপারে সচেতন হও।' সূরা নিসা : ৪
এরপর তিনি আরও বললেন, وَالْاَرْحَامَ -এর মানে সতর্ক হও, সচেতন হও। গর্ভের সম্পর্কের মানুষদের ব্যাপারে ঋণী থাকার বোধ জাগাও।
পুরো অর্থটা তাহলে এই দাঁড়াল যে, গর্ভের সাথে যুক্ত যেকোনো বিষয়কে আমাদের কদর করতে হবে। যে কারণে অন্যান্য পারিবারিক সম্পর্কগুলোর চেয়ে ইসলাম আমাদের মায়েদের অনেক সম্মান দেয়। তবে গর্ভের সাথে যুক্ত সম্পর্ক শুরু হয় বিয়ের মাধ্যমে। সেজন্য এই আয়াত শুরু হয়েছে এভাবে- يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا.
'হে লোকসকল, তোমাদের সেই প্রভুর ব্যাপারে সতর্ক থাকো, যিনি এক আত্মা থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং সেখান থেকে তার সঙ্গীকে সৃষ্টি করেছেন।' সূরা নিসা: ০১
এই আয়াতটি শুরু হয়েছে বিয়ের কথা বলে। আর তাই নবিজি বিয়ের অনুষ্ঠানে এই আয়াত দিয়ে খুতবা শুরু করতেন। মোটামুটি যেকোনো বিয়েতে উপস্থিত থাকলে আপনারা এই আয়াতটি শুনে থাকবেন।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অনেক পবিত্র একটি সম্পর্ক। একান্ত নিবিড় একটি সম্পর্ক। আল্লাহ কী বলছেন শুনুন- وَأَخَذْنَ مِنْكُمْ مِيْثَاقًا غَلِيظًا. যার অর্থ হলো- 'এই নারীরা তোমাদের থেকে এক পাকা কথা নিয়েছে।' সূরা নিসা: ২১ আল্লাহ তায়ালা অনেক জোরাল ভাষায় এটি বলেছেন।
আমরা পুরুষরা ভাবি- বিয়ের সব নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে, তাই না? অথচ এই আয়াতটার প্রকাশভঙ্গি অদ্ভুত। এখানে বলা হচ্ছে, 'আখাজনা', কিন্তু 'আখাজতুম মিনহুন্না' নয়। মানে তোমরা তাদের থেকে কথা নাওনি; বরং তারাই তোমাদের থেকে কথা নিয়েছে। তারা তোমাদের দায়বদ্ধ করেছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটা তারাই নিয়েছে।
এই বিষয়টি সামনে নিয়ে এলাম। কারণ, দুঃখজনকভাবে বেশির ভাগ মুসলিম সমাজে মেয়েদের নিজেদের পছন্দমতো বিয়ে করার সুযোগটা ছিনতাই করে নেওয়া হয়েছে। মা-বাবারা মনে করেন- তারাই সব ভালো বোঝেন। তাদের ছেলেমেয়েরা কিছু বোঝে না। সুতরাং, আমি আমার মেয়েকে যার সাথে ইচ্ছা, তার সাথে বিয়ে দেবো। যাকে যোগ্য মনে করি, তার সাথেই দেবো। তাকে সে পছন্দ করুক বা নাই করুক- এতে কিছু যায় আসে না। রাজি না থাকলে মেয়েটি বোকামি করছে। আমি যদি কিছুক্ষণ তার সাথে চেঁচামেচি করি, জোর গলায় কথা বলি, তাকে যথেষ্ট লজ্জিত করি, তাহলে একসময় তাকে মেনে নিতেই হবে। কারণ, সে তো আসলে কিছুই বোঝে না।
আমরা মেয়েদেরকে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে দিই না। নিদেনপক্ষে তাদেরকে ভাবারও অবকাশ দিই না। নির্মমভাবে তাদেরকে মানসিক চাপে ফেলে দিই।
📄 গর্ভপাত
এক বোন আমাকে ই-মেইল করেছিলেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা, মাশাআল্লাহ। তার স্বামী তাকে বলেছেন, 'আমরা এখন সন্তানের ঝামেলা নিতে পারব না।' তাই তার উচিত গর্ভপাত করে ফেলা।
তিনি এটি কেমন করে বললেন, আমি বুঝতে পারছি না। তিনি বলেছেন, 'আমাদের পর্যাপ্ত রিজিক নেই, এটি সন্তান গ্রহণের জন্য উপযুক্ত সময় নয়।' আবার কিছু ধার্মিক জাস্টিফিকেশনও জুড়ে দিচ্ছেন। সুবহানাল্লাহ! তিনি আরও বলেছেন, 'প্রথম কয়েক মাসে ফেরেশতারা শরীরে রুহ প্রবেশ করান না, তাই বাচ্চাটিকে তখন মানুষ বলা যায় না। এটি কোনো ব্যাপার না।'
আমি অবশ্য ফতওয়া দেওয়ার মতো যোগ্যতা রাখি না। আর আমি এই কাজটি কখনো করবও না। অন্যান্য ধার্মিক বিচারের ব্যাপারে পরে আসি। এখানে প্রথম সমস্যা হচ্ছে, আমরা ভাবছি আমরা সন্তানের ভরণ-পোষণ করতে পারব না। আসল কারণ হলো- মানুষটা টাকা খরচ করতে চাইছে না, তাই না? এই টাকার জন্য তিনি একজন মানুষের জীবন নিতে রাজি আছেন। এটা তার চিন্তা। এটি সবচেয়ে জঘন্য আর অপমানজনক কাজ। আরবের মূর্তিপূজাররা যে এমনটা করত, সেটা কুরআনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা আছে-
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ .
'দারিদ্র্যের আশঙ্কায় তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমি তাদেরকে রিজিক দান করি এবং তোমাদেরকেও।' সূরা বনি ইসরাইল: ৩১
আর সে এই অংশটুকু ভুলে গেল! হ্যাঁ। এখন তুমি যদি এই আয়াতের এই অংশ না মানো, এর মানে হলো তুমি পুরো আয়াতটাই অগ্রাহ্য করলে, তাই না? তুমি বুঝতে পারছ এর মানে কি দাঁড়ায়? তাহলে আল্লাহ তোমাকে রিজিক দান করা থেকেও বিরত থাকবেন।
তুমি এই সন্তানের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বরাদ্দকৃত রিজিক পাঠানোর রাস্তা বন্ধ করে দিলে। আর বাচ্চাটির দেখাশোনা করতে পারবে না বলে বাচ্চাটাকে মেরে ফেললে। অথচ আল্লাহ এখানে বলছেন, তুমি কি ভেবেছিলে তাদের রিজিকের ব্যবস্থা তুমি করছিলে? না! তা আমার কাজ। যেন আল্লাহ নিজে এর দায়িত্বে আছেন। যদি তুমি এই আয়াত অস্বীকার করো, তবে তুমি তোমার জন্য পাঠানো রিজিকও ফেলে দিচ্ছ।
এই মানুষটা যদি পয়সা খরচ করাকে সত্যিই ভয় পায়, তাহলে তো তার এসব কাজ থেকেও বিরত থাকা উচিত।
আর সেই বোন আমি এখনও তাকে রিপ্লাই দেইনি, তবে সম্ভবত আমি তাকে বলব, সে যেন নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। এটা তারও সন্তান। এই সন্তানটি তার প্রতি আল্লাহর উপহার। কোনো স্বামীর এ ধরনের কথা বলার অধিকার নেই। এ ধরনের কাজে তাদের কোনো অধিকার নেই। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জানি না তারা কীভাবে ভাবল, তাদের এমন অধিকার থাকতে পারে।
সুবহানাল্লাহ! এটি একটি জীবন, যার মালিক আল্লাহ। আমরা নই। আমাদের এখানে কিছু বলার অধিকার নেই। সত্যিই নেই। আল্লাহ এমন * পরিস্থিতির শিকার হওয়া নারীদের জীবন সহজ করে দিক। কখনো কখনো স্ত্রীরা অবিবেচকের মতো কাজ করে, আবার কখনো স্বামীরা চরম গোলমেলে কাজ করে বসে।
আচ্ছা, তাদের বেলায় কী হবে- ধরুন, তারা বিয়ে করেনি কিংবা এমন কেউ যাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। শেষে তারা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন, আপনি তাদের ব্যাপারে কী বলবেন?
সেটা তো সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি, কিন্তু সেক্ষেত্রেও গর্ভপাতের ব্যাপারটা আলাদা। এটি বলে রাখা উচিত যে, ওই ধরনের বাচ্চাদের অভিশাপ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সমাজ ওদেরকে 'আওলাদুজ-জিনাহ', এই-সেই আরও কত কী বলে। এই বাচ্চা বৈধ না হওয়ার কারণে সে অন্যদের চেয়ে নীচ- ইসলাম এমনটা বিবেচনা করে না। ওয়েস্টার্ন সোসাইটিতে তো এটা তেমন কোনো সমস্যাই না।
বিয়ে বহির্ভূত সন্তান সেখানে কোনো সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কিন্তু ইস্টার্ন সোসাইটিতে কিংবা ধর্মীয় সংস্কৃতিতে মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এটা খুব বড়ো সমস্যা।
এখন জিনাহ হলো একটি জঘন্য কাজ। ধর্ষণ কিংবা জিনাহ যেটাই হয়ে থাকুক না কেন, এটা এমন অপরাধ যার জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু অন্য একজনের অপরাধের দায় সেই বাচ্চার বয়ে বেড়ানোর পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। তাদের ক্ষেত্রে এমন হওয়া উচিত নয়। সেই মায়ের জন্য এমনিতেই এটি খুব কষ্টের সময়।
তবে, এ ক্ষেত্রে আমি গর্ভপাতের ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না। কারণ, আমার সেই যোগ্যতা নেই। আমি শুধু বলতে চাই, সেই বাচ্চাকে সমাজের কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
আর সেই বাচ্চাকে কলঙ্কের হাত থেকে রক্ষার্থে আল্লাহর একটি আয়াতই যথেষ্ট। এই আয়াতটি আমাদের সব বুঝিয়ে দেবে। وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ . 'আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।' সূরা বনি ইসরাইল: ৭০
সেই বাচ্চাও আদম সন্তান, যার অর্থ হলো আল্লাহ তাকেও সম্মানিত করেছেন। এর অর্থ হলো, প্রেগনেন্সির এক পর্যায়ে রুহ নিয়ে ফেরেশতারা তার মায়ের কাছে এসেছিল, আর সেই রুহ এসেছিল আল্লাহর তরফ থেকে। এটা আল্লাহর দান। পবিত্র ফেরেশতারা সেই মায়ের কাছে এসেছিল, তাই না? তাদের কাছ থেকে আমরা তাদের সম্মান কেড়ে নিতে পারি না।
তবে, এ ক্ষেত্রে একটি জটিল বিষয় হলো গর্ভপাত করার ব্যাপারটা। আমি গর্ভপাতের ক্ষেত্রে কোনো যৌক্তিকতা দেখি না। তবে এই বিষয়ে ভিন্নমত
থাকতে পারে, যা আমি জানি না। আমার এই বিষয়ে জ্ঞান নেই। এই মতামত দেওয়া ইসলামি আইনজ্ঞদের কাজ। তবে নৈতিক দিক থেকে ভাবলে, যা বাচ্চার জন্য সবচেয়ে ভালো হয়- সেটা অন্য ব্যাপার।
তো সবশেষে বলা যায়, সেই নারীর স্বামীর এই অধিকার নেই স্ত্রীকে গর্ভপাতের কথা বলার। এটা তার শরীর, সিদ্ধান্তও তার।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। সুবহানাআল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা মুসলিম নারীদের সহায় হোন।
সম্পাদকীয় ফুটনোট: গর্ভপাতের বিধান গর্ভপাতের বিধান অবস্থাভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণত গর্ভস্থ ভ্রূণকে চার ভাগে ভাগ করা হয়।
১. ভ্রূণের বয়স ছয় মাসের অধিক। এই অবস্থায় কোনোভাবেই বাচ্চা নষ্ট করা বৈধ নয়। কারণ, ছয় মাসের অধিক হলে সিজারের মাধ্যমে বাচ্চাকে বের করে আনলে সে জীবিত থাকে।
২. ভ্রূণের বয়স ছয় মাসের কম, চার মাসের অধিক। এই অবস্থায়ও গর্ভপাত হারাম। তবে মাকে বাঁচানোর জন্য যদি গর্ভপাত করা অত্যাবশ্যক হয়, তাহলে একাধিক অভিজ্ঞ ডাক্তারের স্বীকারোক্তির শর্তে গর্ভপাত বৈধ। কারণ, ছয় মাসের কম বয়সের বাচ্চা সিজারের মাধ্যমে বের করলেও জীবিত থাকে না। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে বাচ্চার জীবন অনিশ্চিত আর মায়ের জীবন নিশ্চিত। তাই নিশ্চিত জীবনকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে অনিশ্চিত জীবনকে হত্যা করাটা যুক্তিসংগত।
৩. ভ্রূণের বয়স চার মাসের কম। কিন্তু তার কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হয়ে গেছে। এই অবস্থায় বিনা কারণে গর্ভপাত করা মাকরূহে তাহরিমি। তবে শরঈ ওজরবশত গর্ভপাত করতে হলে মাকরূহ হবে না।
৪. ভ্রূণের বয়স এতটুকু যে, তার কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এখনও গঠিত হয়নি। এই অবস্থায় গর্ভপাত মাকরূহে তানযিহি। তবে শরঈ উজর থাকলে মাকরূহ নয়।
উল্লেখ্য যে, যেসব কারণকে ওজর হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে তার মধ্যে কিছু হলো: ক. মায়ের দুধের অভাব থাকা। যার ফলে বাচ্চার অনিষ্ট হতে পারে। খ. মায়ের শারীরিক দুর্বলতার কারণে, মা ও বাচ্চা উভয়ের জীবন হুমকির সম্মুখীন হওয়া। গ. প্রথম বাচ্চার বয়স এত কম যে, এমতাবস্থায় নতুন করে গর্ভধারণ করলে প্রথম বাচ্চা অপুষ্টিতে ভুগবে; যা তার জীবনের জন্য ক্ষতিকর। ঘ. প্রথম বাচ্চা এত ছোটো যে, নতুন বাচ্চা জন্ম নিলে দুজনকে একসাথে দেখভাল করাটা কষ্টকর হতে পারে।
[প্রমাণপঞ্জি: আদ্দুররুল মুখতার ১০/২৫৪), ফাতহুল আলিয়্যিল মালিক ১/৩৯৯, আলবাহরুর রায়েক ৮/৩৭৯, ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা-২৪৪]
📄 বিয়ে : পছন্দ-অপছন্দ ও চাপানো
আমার কাছে অনেক খবর আসছে। বিয়ে করার জন্য মেয়েদের মানসিকভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। তাদের বলা হচ্ছে- 'তুমি যদি অমুককে বিয়ে না করো, তাহলে তোমাকে আর কেউ বিয়েই করবে না। তোমার নিজের অবস্থার দিকে তাকাও... ইত্যাদি ইত্যাদি।'
বাবা-মায়েরা তাদের মেয়েকে হয়রান করছেন। তাদের বলছেন, 'তোমাকে শিগগিরই বিয়ে করতে হবে। তোমার জন্য যেন আমাদের ছোটো হতে না হয়। তোমার কারণে আমাদের পরিবারের দুর্নাম যেন না হয়। এর পরের বার প্রস্তাব আসলে অবশ্যই রাজি হয়ে যাবে।' আর এভাবেই এই মেয়েগুলো প্রতিনিয়তই চাপের মুখোমুখি হতে থাকে। এটা হলো একটা দিক।
আরেকটা দিক হলো, মেয়েরা কাউকে পছন্দ করলে তা প্রকাশ করতে পারে না। আমি এই কথাটা তাদের উদ্দেশে বলছি না, যারা ডেটিং করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোনো মেয়ে যদি কারও ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে আমাদের সমাজে এটাকে জঘন্য কাজ হিসেবে দেখা হয়। যেন সে চরম কোনো অপরাধ করে ফেলেছে।
ইসলামে জোরজবরদস্তি করে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার কোনোই স্থান নেই। প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়েতে অবশ্যই মেয়ের সম্মতি থাকতে হবে।
তাও আবার 'অনিচ্ছাকৃত' সম্মতি নয়; রাজি হওয়ার ব্যাপারে তাকে খোলামেলা এবং খুশি থাকতে হবে। অর্থাৎ সে প্রকৃতপক্ষেই বিয়েতে সম্মত আছে।
এমন না যে, 'আমার বাবা-মা যেহেতু বলছে, তাই আমার আর কিছুই বলার নেই...'
হাদিসের এসেছে- 'খুনাসা (রা.) নামে এক নারীকে তার পিতা বিয়ে দেন। এই বিয়ে তার পছন্দ ছিল না। এরপর রাসূল -এর কাছে গেলে তিনি এই বিয়ে বাতিল করে দেন। সহিহ বুখারি: ৪৭৬২
আপনি চিন্তা করতে পারেন? লোকেরা কেন এমন করে? চাপ দিয়ে বিয়ে দেওয়া যে একদম নিষিদ্ধ, তা কেবল জানাই যথেষ্ট না। কারণ, মানুষ হারাম জানার পরেও অনেক কাজ করে থাকে। এর একটা মনস্তাত্ত্বিক দিকও আছে। এই মানুষগুলো তাদের সন্তানের সুখের চেয়ে নিজের সুখের ব্যাপারে বেশি সচেতন। তাদের নাম, বংশ, সমাজের সামনে তাদের কেমন লাগবে এসব ভুয়া চিন্তা যেগুলো বাস্তবে পুরো অর্থহীন, সেগুলোই কিনা তাদের কাছে সন্তানদের জীবনভর সুখ-শান্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিয়েটা এখন একটা অনুষ্ঠানসর্বস্ব বিষয় হয়ে গেছে। 'কতজন মানুষ বিয়েতে আসবে?', 'আমরা এই হলটায় অনুষ্ঠান করব।' 'আমরা এটা করব, সেটা করব।' 'ওই পরিবারের সাথে আমাদের বেশ ভালো সম্পর্ক হবে।' 'আমরা অনেক ভালো পাত্র পেয়েছি।' পুরো বিয়েশাদি এখন এ রকম কিছু বিষয়ের ব্যাপার হয়ে গেছে।
তারা আসলে ভালো পাত্র পায়নি, তারা কেবল একটা ভালো সিভি পেয়েছে। তারা খোঁজে পাত্র অমুক এলাকার কি না, তার এই এই যোগ্যতা আছে কি না। অনর্থক সব বিষয়।
আর পাত্রের ব্যাপারে আশেপাশে অনেক ভালো খবর শুনলেও, বাস্তব জীবনে সম্পূর্ণ খারাপ চরিত্রের হতে পারে। আমি অনেক ঘটনা জানি যে,
চুলচেরা সন্ধান চালিয়ে একই মহল্লার পাত্র খুঁজে তাঁর সাথে মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর দুসপ্তাহ পর দেখা যায় যে, সে মেয়েকে পিটিয়ে প্রায় মেরে ফেলার মতো অবস্থা করে ফেলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের উচিত ছিল, তাদের ভুল স্বীকার করা। কিন্তু তারা উলটো মেয়েকে বলবে- 'না না, তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে।' 'বাইরে যেন এ ব্যাপারে জানাজানি না হয়, তাহলে আমাদের মান-সম্মান থাকবে না।'
বিয়ে দ্বীনের অর্ধেক আর তারা মানুষের বিয়ে ধ্বংস করে বেড়াচ্ছে। এই লোকগুলো বাস্তবে ছেলেমেয়েদের দ্বীন থেকেই দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁদের সাবধান হওয়া উচিত। তারা শুধু তাঁদের সন্তানদেরই ঝামেলায় ফেলছেন না, তাঁরা নিজেরাই আল্লাহর সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছেন।
সন্তানদের সুখ ও সম্মতির বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আল্লাহর কাছে দুআ করছি, সন্তানের বিয়েশাদির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তিনি যেন আমাদেরকে বিজ্ঞ, ন্যায়পরায়ণ অভিভাবক বানিয়ে দেন। আল্লাহ যেন আমাদের ছেলেমেয়েদেরকেও বড়ো হওয়ার সাথে সাথে সঠিক, সুবিবেচিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।
বারাকাল্লাহু লি ওয়ালাকুম, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্।