📄 নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিয়ে করবেন ভাবছেন?
প্রবাস জীবনে দু'বছর ইউসুফ ভাই আমার অভিভাবক হিসেবে ছিলেন। গত সপ্তাহে প্রবাসকে বিদায় জানিয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে গেলেন। ১৯৭৬ সালে মেট্রিক পাশ করে পারিবারিক ব্যবসায় জড়িয়ে গেলেন। অর্থের পিছু পড়ে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে তিরানব্বই সনে এসে বিয়ে করেন। দু'বছর পরে তার কোলজুড়ে যখন কন্যা সন্তান এলো, আবারো টাকার পিছু নিয়ে পাড়ি জমালেন ইউরোপে। কয়েক বছরে প্রচুর পরিমান টাকা-পয়সা উপার্জন করেন। হৃদয়ে স্বপ্ন বুনেন দেশে এসে হাসপাতাল করবেন। দেশে আসা মাত্রই মা-বাবা, ভাই-বোনদের একের পর এক অসুস্থতা তাকে গ্রাস করলো। তার জমানো অর্থের অধিকাংশ ব্যয় করলেন তাদের সুস্থ করতে। দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন হাসপাতাল করা থেকে ফিরে এলেন। বাকি অর্থ দিয়ে চট্টগ্রাম এসে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করলেন। কয়েক বছরে ব্যবসা করেও পুঁজি উঠাতে হিমশিম খেতে হলো। তখন আবারো প্রবাসের ভূত মাথায় চেপে বসলো।
ছোট ভাইকে সেই ব্যবসা বুঝিয়ে দিয়ে ২০০৭ সালে মালয়েশিয়ায় আসলেন। দেশে থাকতেই তিনি আরো দু'সন্তানের জনক হলেন। প্রবাসে তিনি একে একে এগারোটি বৎসর কাটিয়ে দিলেন। বয়সের কোটা ষাট পেরিয়ে গেছে। এখন আর আগের মত কাজে গেলে শরীরের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারেননা। একটুতে হাঁপিয়ে উঠেন। অনেকের তাচ্ছিল্য দৃষ্টিও এড়িয়ে যান সন্তাদের ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। এখনো তার কোন সন্তানের লেখাপড়া শেষ হয়নি। মেয়ে এবং ছেলে অনার্স পড়ছে, আর ছোট ছেলে হিফজ পড়ছে। সব সময় পরিবার নিয়ে তিনি চিন্তিত থাকেন। ছেলের যদি একটা চাকরি হতো! এ যন্ত্রণার প্রবাস থেকে হয়তো তিনি মুক্তি পতেনে। রমজানের পাঁচদিন পূর্বে ছুটি কাটিয়ে যখন আবারো প্রবাসে এলেন। তখন জানতে পারলেন তার তেরো নাম্বার ভিসা আর লাগবেনা। সারা জীবনের কষ্টগুলো একত্রে জমাট বেঁধে এসে আরো কিছু কষ্ট চাপিয়ে গেলো তার নিয়তির উপর। যে প্রবাস তাকে পাঁচ ভাইয়ের চার ভাইয়ের মৃত্যুর সাথে উপহার দিয়েছে দু'বোনের মৃত্যুও! ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে শুয়ে থাকা একবোনকে জীবিত পাওয়ার আকুতি নিয়ে প্রবাসকে বিদায় জানালেন গত সপ্তাহে।
এভাবে অর্থের পিছনে ছুটে নিজ পরিবার, সন্তান থেকে দূরে থেকে, অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার জীবন আমাদের কি দিবে? শুধু প্রবাস জীবন নয় যারা অর্থের লোভে ছুটতে ছুটতে জীবন শেষে করছেন, বিবাহসহ বড় অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করে দিয়ে। কিংবা বিলম্বিত করছিলেন, তারা কি এর পরিণতি কল্পনা করতে পেরেছেন? উচিত তো ছিল আমাদের অল্পে তুষ্ট থাকা, এবং সুন্দর ঘর সংসার নির্মাণ করা, যার ভিত্তি হবে ভালোবাসা, সম্মান, দ্বীনদারিতা।
আমার চাচা জনাব মোস্তফা মাষ্টার। দীর্ঘদিন লেখাপড়া শেষে কয়েক বছর সরকারী চাকুরি করলেন। পঁয়ত্রিশের কোটায় এসে বিয়ে করলেন। তারও এক মেয়ে দুই ছেলে। বড় মেয়ে সবেমাত্র মেট্রিক পাশ করলো। নিজের বয়স আর ভবিষ্যত নিয়ে খুব হতাশ হয়ে পড়েন। এ হতাশা প্রায় সময় তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে সন্তানদের মানুষ করার বাসনায় দেরিতে বিয়ে করা হতাশাগ্রস্ত এমন অসংখ্য মানুষ আমাদের চারপাশে। এদের থেকেও কি আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারিনা? আজ আমরা শুধু ভাবি- নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিয়ে করবো, কিংবা এতো টাকা জমিয়ে বিয়ে করবো। এটা ঠিক নয়। বয়স থাকতে বিয়ে করুন। বিয়ে করলে দায়িত্বের চাপে নিজের পায়ে এমনিতেই দাঁড়িয়ে যাবেন, কাউকে বলতে হবে না।
📄 ভবিষ্যতে বউ ‘ফি সাবিলিল্লাহ’য় যেতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে?
যারা বিয়ের সামর্থ রাখেন এবং কোনো শরঈ উজর ছাড়া বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শুধুমাত্র এই ভেবে যে-ভবিষ্যতে বউ 'ফি সাবিলিল্লাহ'র কাজে যেতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে-তারা নিশ্চিত নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকার মধ্যে আছেন। যে যেতে পারবে, সে বিয়ে করলেও পারবে। আর যে পারবে না, সে না করলেও পারবে না। এখানে আল্লাহর কবুলিয়াত শর্ত। কবুলিয়াতের জন্য দুআ না করে আপনি কাজের আগেই বৈরাগ্যতা বেছে নিচ্ছেন। তাও আবার এই ফিতনার স্বর্ণযুগে! সুবহানাল্লাহ, আপনিতো বেশ পরহেজগার! আপনি চেষ্টা করলে আর আল্লাহ কবুল করলে কে আপনাকে আটকাতে পারে? আপনি এখনি যেহেতু সন্দেহের মধ্যে আছেন 'যদি যেতে না পারেন', কাজের সময় আপনি আসলেই পিছুটান মারতে পারেন, বিয়ে না করলেও।
জনৈক সাহাবি বলেছিলেন "আমি যদি জানি যে, আর মাত্র ১০ দিন বাঁচবো, তবুও ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য বিয়ে করবো।" আর আপনি যদি সাহাবির চেয়েও মহাপুরুষ হন এই নব্য জাহিলিয়্যাতের যুগে, নারী ফেতনার যুগে, তবে তো আপনাকে স্যালুট! জনৈক ভাইয়ের একটা কথা মনে পড়লো- "বিয়ে না করলেই ইবনে তাইমিয়্যাহ হওয়া যায় না।" ৪৭
টিকাঃ
* সম্পাদক কর্তৃক সংযোজিত। লিখেছেন: Monirul Islam
৪৭. লিখেছেন: Nazim Shakil II
📄 বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে?
একজন দ্বীনহীন মানুষকে বিয়ে করার আগে আপনি যদি ভাবেন-বিয়ের পর বুঝিয়ে মানিয়ে ঠিক করে নিবেন তবে এটা ভুল। অনেকেই ভাবে এই দুরন্তপনা, আনমনা বয়সে একটু আধটু উদ্ভট উশৃঙ্খল তো হবেই। বিয়ের পরই সব ঠিক হয়ে যাবে। নিজ সন্তান হলে তো একেবারে পাক্কা মুমিন-মুসলমান! তাদের জন্য। এই দুরন্তপনা, আনমনা, উঠতি, চঞ্চল বয়সটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই বয়সে যদি কারো ভিতর ধর্মের বিধিবিধান মানার ক্ষেত্রে উদাসিনতা দেখা দেয়, তো তার দ্বারা বাকি বয়সটায় ধর্ম মেনে চলার সম্ভাবনা নেহায়েত অসম্ভবে পরিণত হয়।
একজন দ্বীনহীন মানুষকে বিয়ে করার আগে আপনি যদি ভাবেন বিয়ের পর বুঝিয়ে মানিয়ে ঠিক করে নিব তবে এটা ভুল। আপনি যদি ভাবেন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো মাটির মত, ইচ্ছে হলেই দাওয়াত দিয়ে সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারব। এটা ভাবাও ভুল। প্রিয় ভাই! হেদায়েত আল্লাহর হাতে, আপনার হাতে নয়। আপনি যাকে চাইবেন তাকেই সঠিক পথে আনতে পারবেন না, যদি আল্লাহ তাকে হেদায়াতের পথ না দেখান। অনেকে বলে কৌশল খাটিয়েই তো স্বামী স্ত্রীকে, অথবা স্ত্রী স্বামীকে পথে নিয়ে আসতে পারে। যত কৌশল অবলম্বন করুক, কিছুই এত সহজে হয়না। ঐ মানুষটিকে কিভাবে এত সহজে ঐ লেভেল থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা যায়, যাকে তার বাবা মা ইসলামের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়নি? যারা নামকা ওয়াস্তে মুসলিম, আল্লাহর হুকুম পালনের ধারে কাছেও যায়না, তাদেরকে কিভাবে এত সহজে ঠিক করা যায়? সুরা নূরের এই আয়াতটির সঠিক ব্যাখ্যাটা জানতে মন চায়, যেখানে বলা হয়েছে-"ভালোর জন্য ভালো, আর খারাপের জন্য খারাপ।"
যে বিন্দু পরিমাণ ইসলাম মেনে চলতে চান তাদের প্রতি অনুরোধ-নেককার পুরুষ অথবা নারীকে বিয়ে করুন। যাকে বিয়ে করলে আপনার আমল অনেক ভালো হবে। আপনার ঈমান আরো বৃদ্ধি পাবে। ইসলামের উপর চলা সহজ হবে। এমন যেন না হয়—কাউকে হেদায়াতের সঠিক পথ দেখাতে গিয়ে নিজেই বিয়ে করে অন্ধকারে হারিয়ে যান। নিজেই তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আবার গোমরাহ হয়ে যান। ৪৮
ইসলামে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বর্তমানের উপর ভিত্তি করে করে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার উপর ভিত্তি করে নয়। একজন দ্বীনদার ছেলে বা মেয়েকে বেদ্বীন ছেলে বা মেয়ের সাথে বিয়ে দেয়া যাবে না। এটা অন্যায় ও যুলুম। আপনি ঠিকই ভবিষ্যতে ছেলে দ্বীনদার হবে এই আশা করে নিজ সন্তানকে ধনী ছেলের সাথে বিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু একজন দ্বীনদার ছেলে ভবিষ্যতে ধনী হবে এই আশা করে নিজ মেয়েকে তার বিয়ে দেন না। এটা কী তাওয়াক্কুল? এটা ঈমানের দুর্বলতা বৈ আর কিছু নয়। ৪৯
টিকাঃ
৪৮. সংগৃহীত।
৪৯. সম্পাদক কর্তৃক সংযোজিত।
📄 বর্তমান সময়ে ২০-২২ বছরের কোন যুবক যদি বিবাহ করতে চায়!
২০-২২ বছরের কোন যুবক যদি বিয়ে করতে চায় তাহলে সমাজ বলবে ছেলেটার লাজ-লজ্জা সব গেল। কিন্তু ২০-২২ বছরের কোন যুবককে পার্কে, রিক্সায় কোন মেয়ের সাথে অশালীন অবস্থায় দেখা গেলে তখন সমাজের লাজ-লজ্জা যায় না। কারণ, সমাজের চোখে সেটা আধুনিকতা। যে আধুনিকতা একজন যুবকের বেহায়াপনা থেকে বাঁচার আকুতি শুনতে চায়না কিন্তু একজন যুবককে একজন যুবতীর সাথে নষ্টামি করার অনুমতি দেয়, সে আধুনিকতাকে ছুঁড়ে ফেলুন।
একজন ২২ বছরের যুবক তার মোটামুটি আয়ের উপর ভরসা করে যখন বাসায় বিবাহ করার ইঙ্গিত দিবে, তখন বাসায় ছেলেটাকে নির্লজ্জ ভাবা হবে। কিন্তু রাত ১ টার পরও যখন ঐ ছেলের রুম থেকে ফোনে কথালাপের শব্দ শোনা যাবে, তখন অভিভাবকরা ভাববে ছেলে বড় হয়েছে, ছেলেকে স্বাধীনতা দেয়া দরকার। ছেলে বিয়ে করার জন্য বড় হয়নি কিন্তু ঠিকই ফালতু-হারাম কাজের জন্য বড় হয়েছে। একসময় দেখা যায়, ঐ ফালতু কাজের জন্য বড় হওয়া ছেলেটি মা-বাবার মুখে চুন-কালি মেখে পালিয়ে বিয়ে করে। বাবা-মায়ের দেখাশোনা মেয়ে বিয়ে করে না। আর বিয়ে করতে চাওয়া আল্লাহভীরু সেই ছেলেটি ঠিকই মা-বাবার হৃদয় নরম হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকে। যদিও তার অভিভাবক ছাড়া বিয়ে জায়েজ আছে। এই হচ্ছে আমাদের কলুষিত সমাজ ব্যবস্থা!
টিকাঃ
সংগৃহীত।