📄 পরীক্ষার নতুন ধারা
পাঠক শুনে অবাক হবেন যে, এক বিশেষ পদ্ধতিতে প্রত্যেক মানুষই ডাক্তার-সার্জেন হচ্ছেন। চাষী-ব্যবসায়ী, কামার-কুমোর সবাই ডাক্তার! এ সহজ পদ্ধতিতে আর বিশেষজ্ঞতার কোন মূল্য নেই, গুরুত্ব নেই। আর তখন বুঝতে পারবেন যে, আসলে তারা সার্জেন হবে, নাকি কসাই?
এবার হতে প্রত্যেক বাঙালীও চোখ বন্ধ ক'রে হাদীস সহীh, না জাল---তা বুঝতে পারবেন। হাদীস যাচাইয়ের নতুন এই কষ্টিপাথর লাভ ক'রে প্রত্যেকেই এখন থেকে 'মুহাদ্দিস' হয়ে উঠবেন।
আমরা তাঁদের সেই কষ্টিপাথর ও তার যাচাই-শক্তির মান নির্ণয় করব, ইন্ শাআল্লাহ।
নূর আলম সাহেব ৪০পৃষ্ঠায় লিখেছেন,
(১) 'কোরাণের বিপরীত যে কোন বর্ণনাই জাল; তা সনদের দিক দিয়ে যতই মজবুত হোক না কেন।'
এ কষ্টিপাথরটি সাধারণ পাথর। আসলে কোন সহীh হাদীস কুরআন মাজীদের উক্তির বিপরীত মনে হলে, সেই শ্রেণীর সমন্বয় সাধনের পথ গ্রহণ করতে হবে, যে শ্রেণীর পথ গ্রহণ করতে হয়, কোন একটি আয়াত অপর আয়াতের বিপরীত মনে হলে।
আর এ কথাও জ্ঞাতব্য যে, মু'জিযার হাদীসগুলি কুরআনী বক্তব্যের বিপরীত নয়। যেমন কুরআনে বর্ণিত কয়েকটি মু'জিযা কুরআনের বিপরীত নয়।
(২) 'যে সকল বর্ণনা সত্যের বিপরীত, সে সকল বর্ণনাই জাল; যদিও সনদের দিক দিয়ে সহীhও হয়।
যেমন বুখারীতে বর্ণিত আছে, রসূল সঃ বলেছেন, 'সংক্রামনিক রোগ বলে কোন রোগ নাই।’ এটা সম্পূর্ণ জাল। কারণ সারা বিশ্বেই সংক্রামনিক রোগ ব্যাপক। বর্তমানে কোন মূর্খকেও বোঝানো সম্ভব নয় যে, সংক্রামনিক রোগ বলে কিছু নাই। সে উদাহরণ দিবে যে, টিবি, এইট্স, বসন্ত, কলেরা ইত্যাদি। এই সত্যের বিপরীত কথা ওহী হতে পারে না।'
আমরা বলি, চামচিকা যদি সূর্যালোকে দেখতে না পায়, তাহলে তো সূর্যের কোন দোষ হয় না। সংক্রামক ব্যাধি যে আছে, তা নবী ﷺ জানতেন এবং বলতেনও। সংক্রামক ব্যাধি থেকে মুসলিমকে সতর্ক করতেন।
আসলে যুক্তির কাঠগোড়ায় হাদীসের যে অনুবাদ পেশ করা হয়েছে, সে অনুবাদ ঠিক নয়।
পাঠক হাদীস খেয়াল করুন, মহানবী ﷺ বলেছেন,
لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ وَفِرَّ مِنْ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الْأَسَدِ.
অর্থাৎ, রোগের সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই। পেঁচার ডাকে অশুভ কিছু নেই, সফর মাসেও অশুভ কিছু নেই, আর কুষ্ঠরোগী থেকে সেই রকম পলায়ন কর, যে রকম সিংহ থেকে পলায়ন কর। (বুখারী ৫৭০৭, মিশকাত ৪৫৭৭নং)
হাদীসের অর্থ হবে, সংক্রামক ব্যাধি আছে, তা থেকে দূরে থাক, সে রোগকে বাঘের মত ভয় কর। তবে এ কথাও মনে রেখো যে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোন রোগ তোমার শরীরে সংক্রমণ করতে পারে না।
উলামাগণ বলেছেন, নিজস্ব ক্ষমতায় কোন রোগ কারো দেহে সংক্রমণ করে না। কোন রোগী কোন নিরোগ ব্যক্তিকে রোগী বানাতে পারে না। বরং আল্লাহই তাঁর ইচ্ছায় এ সব ক'রে থাকেন। (আল-ইস্তিযকার ৮/৪২২, আদ্-দীবাজ ৫/২৩৫)
জাহেলী যুগের লোকেরা ধারণা করত যে, কোন রোগ নিজে নিজেই অন্য দেহে সংক্রমণ করে। নবী ﷺ তাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, ব্যাপারটা তা নয়। আসলে মহান আল্লাহই অসুস্থ করেন এবং তিনিই রোগ অবতীর্ণ করেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬/২৯৫)
যেমন যদি কেউ ধারণা করে যে, মেঘই বৃষ্টি বর্ষণ করে, তাহলে তাকে বলা হয় যে, মহান আল্লাহই বৃষ্টি বর্ষণ করেন। মেঘ জমলেই বৃষ্টি হওয়া জরুরী নয়, আল্লাহর হুকুমই আসল জিনিস।
এ জন্যই এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, (রোগগ্রস্ত কোন কিছুই অপরকে রোগগ্রস্ত করতে পারে না। তা করলে) “প্রথমটিকে কে সংক্রমিত করল?” যিনি প্রথমে সংক্রামক ব্যাধি সৃষ্টি করেছেন, তিনি ছাড়া অন্য কেউ অন্য দেহে সংক্রমিত করতে পারে না।
জাহেলী যুগের লোকেরা এ ব্যাপারে এত বাড়বাড়ি ধারণা রাখত যে, সংক্রমণের আশঙ্কায় কোন রোগীকে কেউ দেখা করতে যেত না, তার খিদমত করত না এবং এক সাথে বসবাস করত না। সেই বিশ্বাস ভাঙ্গার জন্য ঐ কথা বলা হয়েছে।
হাদীসের অন্য এক অর্থে বলা হয়েছে যে, 'লা আদওয়া' অর্থাৎ, সংক্রমণের মুখে পড়ো না। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, 'ফালা রাফাসা, অলা ফুসূক্বা অলা জিদালা ফিল হাজ্জ' অর্থাৎ হজ্জে যেন যৌনাচার না করে, পাপাচার না করে এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। অনুরূপ হাদীস 'লা যারারা অলা ফিরার' অর্থাৎ ক্ষতি করো না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না। 'লা স্বালাতা বা'দাল আস্ত্র...... অর্থাৎ আসরের পর (নফল) নামায পড়ো না ইত্যাদি। আর উক্ত হাদীসের শেষাংশটি এ কথারই ইঙ্গিত বহন করে।
যুক্তিবাদীর উল্লিখিত অনুবাদ অনুযায়ী যদি হাদীসের উদ্দেশ্য হত, তাহলে সত্যই তাতে সন্দেহ ছিল। বুঝা গেল, বুখারীর হাদীস জাল নয়, জাল হল ঐ যুক্তিবাদীর ভুয়ো যুক্তি।
উক্ত হাদীসের মর্ম নিয়ে একটি হাদীস দেখুন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, একদা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) সিরিয়ার দিকে যাত্রা করলেন। অতঃপর যখন তিনি 'সার্গ' (সউদিয়া ও সিরিয়ার সীমান্ত) এলাকায় গেলেন, তখন তাঁর সাথে সৈন্যবাহিনীর প্রধানগণ---আবু উবাইদাহ ইবনুল জারাহ (রাঃ) ও তাঁর সাথীগণ---সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা তাঁকে জানান যে, সিরিয়া এলাকায় (প্লেগ) মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখন উমার (রাঃ) আমাকে বললেন, আমার কাছে প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁরা হিজরত করেছিলেন সেই মুহাজিরদেরকে ডেকে আনো। আমি তাঁদেরকে ডেকে আনলাম। উমার (রাঃ) তাঁদেরকে সিরিয়ায় প্রাদুর্ভূত মহামারীর কথা জানিয়ে তাঁদের কাছে সুপরামর্শ চাইলেন। তখন তাঁদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হল। কেউ বললেন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বের হয়েছেন। তাই তা থেকে ফিরে যাওয়াকে আমরা পছন্দ করি না। আবার কেউ কেউ বললেন, আপনার সাথে রয়েছেন অবশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও নবী ﷺ-এর সাহাবীগণ। কাজেই আমাদের কাছে ভাল মনে হয় না যে, আপনি তাঁদেরকে এই মহামারীর মধ্যে ঠেলে দেবেন। উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে উঠে যাও। তারপর তিনি বললেন, আমার নিকট আনসারদেরকে ডেকে আনো। সুতরাং আমি তাঁদেরকে ডেকে আনলাম এবং তিনি তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। কিন্তু তাঁরাও মুহাজিরদের পথ অবলম্বন করলেন এবং তাঁদের মতই তাঁরাও মতভেদ করলেন। সুতরাং উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে উঠে যাও। তারপর আমাকে বললেন, এখানে যে সকল বয়োজ্যেষ্ঠ কুরাইশী আছেন, যাঁরা মক্কা বিজয়ের বছর হিজরত করেছিলেন তাঁদেরকে ডেকে আনো। আমি তাঁদেরকে ডেকে আনলাম। তখন তাঁরা পরস্পরে কোন মতবিরোধ করলেন না। তাঁরা বললেন, আমাদের রায় হল, আপনি লোকজনকে নিয়ে ফিরে যান এবং তাদেরকে এই মহামারীর কবলে ঠেলে দেবেন না। তখন উমার (রাঃ) লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আমি ভোরে সওয়ারীর পিঠে (ফিরে যাওয়ার জন্য) আরোহণ করব। অতএব তোমরাও তাই কর। আবু উবাইদাহ ইবনুল জারাহ (রাঃ) বললেন, আপনি কি আল্লাহর নির্ধারিত তকদীর থেকে পলায়ন করার জন্য ফিরে যাচ্ছেন? উমার (রাঃ) বললেন, হে আবু উবাইদাহ! যদি তুমি ছাড়া অন্য কেউ কথাটি বলত। আসলে উমার তাঁর বিরোধিতা করতে অপছন্দ করতেন। বললেন, হ্যাঁ। আমরা আল্লাহর তকদীর থেকে আল্লাহর তকদীরের দিকেই ফিরে যাচ্ছি। তুমি বল তো, তুমি কিছু উটকে যদি এমন কোন উপত্যকায় দিয়ে এস, যেখানে আছে দু'টি প্রান্ত। তার মধ্যে একটি হল সবুজ-শ্যামল, আর অন্যটি হল বৃক্ষহীন। এবার ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ প্রান্তে চরাও, তাহলে তা আল্লাহর তকদীর অনুযায়ীই চরাবে। আর যদি তুমি বৃক্ষহীন প্রান্তে চরাও তাহলেও তা আল্লাহর তকদীর অনুযায়ীই চরাবে? বর্ণনাকারী (ইবনে আব্বাস) বলেন, এমন সময় আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এলেন। তিনি এতক্ষণ যাবৎ তাঁর কোন প্রয়োজনে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার নিকট একটি তথ্য আছে, আমি আল্লাহর রসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, “তোমরা যখন কোন এলাকায় (প্লেগের) প্রাদুর্ভাবের কথা শুনবে, তখন সেখানে যেও না। আর যদি এলাকায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব নেমে আসে আর তোমরা সেখানে থাক, তাহলে পলায়ন করে সেখান থেকে বেরিয়ে যেও না।” সুতরাং (এ হাদীস শুনে) উমার (রাঃ) আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং (মদীনা) ফিরে গেলেন। (বুখারী, মুসলিম)
আমি আমার তওহীদে লিখেছি, “মুসলিম কোন রোগ-ব্যাধির নিজস্ব সংক্রমণে বিশ্বাসী নয়। কারণ, আল্লাহর তরফ থেকেই (প্রথম) আক্রমণ এবং (পরে) সংক্রমণ হয়ে থাকে। (বুঃ ৫৭০৭, মুঃ ২২২০) আবার সংক্রামক ব্যাধি থেকে সাবধানও থাকে। কারণ, সে তকদীর ও তদবীর দুয়েই বিশ্বাসী। তাই যে স্থানে কলেরা, বসন্ত বা অন্য কোন মহামারী দেখা দেয়, সে স্থানে সে বর্তমান থাকলে সেখান হতে ভয়ে বের হয়ে পলায়ন করে না। কারণ তকদীর হতে পালাবার পথ কোথায়? কিন্তু সে স্থানের বাইরে থাকলে সেখানে প্রবেশ করে না। কারণ, তদবীরও ফল দেয়। (বুঃ ৫৭২৯, মুঃ ২২১৯, মুঃ আঃ ১/১৯২)
তদনুরূপই কোন সংক্রামী ব্যাধিগ্রস্ত মানুষের কাছে থাকলে দূরে সরে যায় না। বা তাকে দূর বাসে না এবং দূরে থাকলে কাছে আসেনা (মুমূর্ষের সাহায্য ও চিকিৎসা করার কথা স্বতন্ত্র)। কারণ, মানুষের কাজ তদবীর করা বা সাবধানতা অবলম্বন করা। তকদীর তার নিজের কাজ করবে। (বুঃ ৫৭০৭, মুঃ ২২৩১)
আবার তার কাছে যাওয়ার পর যদি তারও সেই ব্যাধি হয়ে যায়, তবে সে এ বিশ্বাস বা ধারণা করে না যে, তার কাছে এসেই রোগটা হল। বরং বিশ্বাস রাখে যে, এটা তার নিয়তির গতি বা আল্লাহপাকের ইচ্ছা।”
রোগের নিজস্ব সংক্রমণ নেই। আল্লাহর ইচ্ছা না হলে কোন রোগ সংক্রমণ করতে পারে না। এ কথা মূর্খরাও জানে যে, একই বাড়িতে কিছু লোকের সংক্রামক রোগ হলে অনেক লোকের তা হয় না। রোগ ছোঁয়াচে হলেই যে প্রত্যেককেই আক্রমণ করবে---তা জরুরী নয়। রোগের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ যেমন ছোঁয়াচে রোগ প্রথম ব্যক্তিকে আক্রমণ করার ক্ষমতা দেখান, তেমনি তা প্রসার লাভ করার পরেও অনেক লোককে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখেন। এটাই হল আকীদা।
বাকী থাকল, সাবধানতা অবলম্বন করার কথাও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। ছোঁয়াচে রোগীর সংস্পর্শে আসতে নিষেধ করা হয়েছে। মহামারীগ্রস্ত দেশ বা শহরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু যে রোগীর সংস্পর্শে আছে, সে কী করবে? তার মনকে শক্ত করার জন্য কি এই আকীদা জরুরী নয় যে, রোগের নিজস্ব সংক্রমণ নেই?
বলা বাহুল্য, 'সংক্রামনিক বলে কোন রোগ নাই' এ কথা ভুল। এটি হাদীসও নয়। নতুবা অনুবাদে ভুল। আর সেই ভুলে পড়েন তাঁরা, যাঁদের ওস্তাদ হয় 'কিতাব' সাহেব।
ঐ শ্রেণীর হাদীস যেমন অহী হতে পারে না, তেমনি হাদীস না বুঝে যে হৈচৈ করে, তার জ্ঞান সঠিক হতে পারে না। সুতরাং সে জ্ঞান কি অহী যাচাইয়ের কষ্টিপাথর হতে পারে?
পক্ষান্তরে 'সূর্যের তাপে তপ্ত পানিতে স্নান করিলে কুষ্ঠ রোগ হয়' (তত্ত্ব......৪১১পৃঃ)---এ হাদীসটি জাল ও গড়া হাদীস। হাদীসটির বক্তব্য বাস্তব-বিরোধী বলে নয়, বরং তার সনদেই জালিয়াতির কথা ধরা পড়েছে। এই জন্য হাদীসটির স্থান হয়েছে প্রায় সমস্ত 'মাওযূআত' গ্রন্থে। অথচ যুক্তিবাদীরা বুখারীকে ছোট করার জন্য উল্লেখ করেছেন, 'বুখারীতে বর্ণিত আছে!' এটি অবশ্যই অজ্ঞানতা অথবা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কারণ এ হাদীস বুখারীতে নেই। ফাল্লাহুল মুস্তাআন। পাঠক বুঝতেই পারছেন, কাস্তে-কুড়ুল নিয়ে অপারেশন করার কুফল।
৩। 'শব্দ ও ভাষার অসঙ্গতিপূর্ণ বর্ণনাও জাল।' এর উদাহরণে যে হাদীস পেশ করা হয়েছে সেটি পূর্বোক্ত হাদীস চেনার পদ্ধতির উদাহরণ। অর্থাৎ বাস্তব-বিরোধী প্রত্যেক হাদীসই জাল। হাদীসটি হল, “সকল প্রাণীর ছবিতোলা বা আঁকা হারাম। তবে গাছ-গাছারীর ছবিতোলা বা আঁকা জায়েয।” এই বর্ণনায় (নাকি) রসুল সঃকে সীমিত জ্ঞানের মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কারণ রসুল সঃ জানতেন না যে, গাছ গাছারীরও প্রাণ আছে। (তত্ত্ব....৪১পৃঃ)
প্রিয় পাঠক হাদীসে কী আছে, তা প্রণিধান করুনঃ-
إِنْ كُنْتَ لَا بُدَّ فَاعِلاً فَاصْنَعِ الشَّجَرَ وَمَا لَا نَفْسَ لَهُ)
'যদি করতেই হয়, তাহলে গাছ এবং সেই জিনিসের মূর্তি বা ছবি বানাও, যার প্রাণ নেই।'
এখানে গাছের প্রাণ না থাকার কথা তো প্রমাণ হয় না। হাদীসের উদ্দেশ্য হল, তুমি গাছের ছবি বানাতে পার। আর সেই সকল জড়পদার্থেরও ছবি বানাতে পার, যাতে প্রাণ নেই।
দ্বিতীয়তঃ যদি উক্ত হাদীস থেকে এ কথা বুঝাও যায় যে, গাছের প্রাণ নেই, তাহলে হাদীসে বর্ণিত 'রূহ' বা 'নাফক্স' বলতে উদ্দেশ্য হল, বিচরণশীল প্রাণীর প্রাণ। অর্থাৎ, যে প্রাণী চলেফিরে বেড়ায়, তাকে 'রূহ' বা 'নাক্স'-ওয়ালা প্রাণী বলা হয়। পক্ষান্তরে গাছের মধ্যে 'হায়াত' বা 'জীবন' থাকলেও, তাকে আরবীতে 'যাতুর রূহ' বা 'যাতুন নাক্স' বলা হয় না। এ কথা কেবল বিচরণশীল প্রাণীর জন্যই ব্যবহার হয়।
তৃতীয়তঃ এ উক্তি নবী ﷺ-এর নয়। বরং এ হল ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি।
সুতরাং যুক্তিবাদীর যুক্তির জাল যে আসলে মাকড়সার জাল, তাতে কি সন্দেহ আছে?
ওঁরা বলেন, 'হাদীসটি জাল হওয়ার আরো একটি প্রমাণ, মহান আল্লাহ বলেন, “আমি এমন বোঝা চাপাইনি যা মানব জাতি বহন করতে পারবে না।” অথচ বাস্তবে দেখা যায় পৃথিবীতে এমন কোন সাবালক ও সাবালিকা (?) নেই যে, সে ছবি ছাড়া চলতে পারে। অতএব ছবি তোলার বর্ণনাটি কল্পনার।' (তত্ত্ব.....৪০ ১পৃঃ)
হ্যাঁ, এই জন্যই তো কুরআনের পর্দার আয়াতকে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মানতে চায় না। হয়তো বা সে বর্ণনাটিও কল্পনার। কারণ, শরয়ী পর্দা মানা বড় কঠিন। ইত্যাদি।
অথচ মুফতী সাহেবগণ এই আয়াত প্রয়োগ করেন কোন হারাম জিনিসকে বাধ্য হয়ে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ, ছবিতোলা হারাম; কিন্তু নিরুপায়ের ক্ষেত্রে জায়েয। সূদী ঋণ নেওয়া হারাম; কিন্তু নিরুপায়ের ক্ষেত্রে জায়েয। পর্দা করা ওয়াজেব; কিন্তু নিরুপায়ের ক্ষেত্রে বেপর্দা হওয়া এমনকি নগ্ন হওয়াও জায়েয। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, “আমি এমন বোঝা চাপাইনি যা মানব জাতি বহন করতে পারবে না।” তাহলে কোন কাজ বাধ্য হয়ে করতে হলে, সে কাজ নিষেধ হওয়ার হাদীসকে চোখ বুজে চাঁদ দেখার মত 'কল্পনার' বলা কি 'মাতুরীদী' মার্কা স্বেচ্ছাচারিতা নয়?
📄 পরীক্ষার নতুন ধারার ইফতারীর দুয়া
বড় দুঃখ ও বড় বিপদের কথা তখন হয়, যখন শুনি যে, নাড়ীটেপা ডাক্তার অথবা কোন প্লাম্বার (সীসক কর্মকার) রোগীর অপারেশন করছে! সে ক্ষেত্রে যেমন রোগীর জীবনের ভরসা থাকে না, তেমনি আলেমদের নৌকার হাল যদি অনালেমরা ধরতে চায়, তাহলে ইসলামের যে কী দশা হতে পারে তা অনুমেয়।
আমার ভাবতে বড় অবাক লাগে, তাঁরা এই শ্রেণীর দুঃসাহসিকতা কেন করেন? যাঁদের সহীh-যয়ীফের বিচারবোধ নেই, ইসলামী মৌলনীতির জ্ঞান নেই, আরবী ভাষাজ্ঞান নেই, তাঁরা আলেমদের টেক্কা দিতে চান কোন্ সাহসে? কোন্ মানসে?
আবার মুখে মুখে হয়, তাও আচ্ছা। কিন্তু যুক্তিবাদী সেজে এইভাবে টাকা-পয়সা খরচ ক'রে বই প্রকাশ ক'রে নিজেদেরকে সমাজের কাছে হাসির পাত্র করেন কেন? (যদিও সম্ভাব্য যে, এর পিছনে ঐ শ্রেণীর কোন আলেম লুকিয়ে আছেন।)
সহীh হাদীসে আছে, আল্লাহর নবী ﷺ যখন ইফতার করতেন, তখন বলতেন,
ذَهَبَ الظَّمَا، وَابْتَلْت العُرُوقُ، وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ الله) .
উচ্চারণঃ- যাহাবায যামা-উ অবতাল্লাতিল উরুকু অসাবাতাল আজরু ইন্শা-আল্লাহ।
অর্থ- পিপাসা দূরীভূত হল, শিরা-উপশিরা সতেজ হল এবং আল্লাহ চান (বা চেয়েছেন) তো সওয়াব সাব্যস্ত হল। (আবু দাউদ ২৩৫৭, নাসাঈ কুবরা, ইবনুস সুন্নী ৪৭২,দারাকুত্বনী ২৪০নং, হাকেম ১/৪২২, বাইহাক্বী ৪/২৩৯, মিশকাত ১৯৯৩, ইরওয়াউল গালীল ৯২০, সহীহুল জামে' ৪৬৭৮নং)
সুতরাং ইফতারীর পরে এ কথা বলা সুন্নত। কিন্তু যুক্তিবাদীদের দাবী হল, এটি হাদীস নয়। কারণঃ-
১। 'এটি দুআ নয়। কেননা দুআ অর্থ চাওয়া। আর এতে চাওয়া বা প্রার্থনার কোন কথা নেই।’ (তত্ত্ব......৫০পৃঃ)
আমরাও বলছি, এটি সেই অর্থে দুআ নয়, যে অর্থে যুক্তিবাদীরা মনে করেছেন। তাছাড়া হাদীসে 'এই দুআ করতেন' শব্দ নেই; বরং 'বলতেন' শব্দ আছে।
তবুও তাকে দুআ বলা হল কেন? দুআর আসল মানে ডাকা, আর তা হচ্ছে দুই প্রকার: দুআউল মাসআলাহ ও দুআউয যিক্র।
প্রথম প্রকার দুআতে ডাকা, আহবান করা, প্রার্থনা করার অর্থ থাকে। এই দুআর সাথে ভিখিরীর গৃহস্থের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার মিল রয়েছে।
আর দ্বিতীয় প্রকার দুআতে 'যিক্র' (স্মরণ) থাকে, সরাসরি প্রার্থনা থাকে না। যেমন ভিখিরী গৃহস্থের কাছে গিয়ে নিজের হাল বলে এবং গৃহস্থ তা বুঝে তাকে দান করে। লক্ষ্য করুন ইউনুসের দুআ,
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ} (۸۷) سورة الأنبياء
অর্থাৎ, তুমি ছাড়া কোন (সত্য) উপাস্য নেই; তুমি পবিত্র, মহান। নিশ্চয় আমি সীমালংঘনকারী। (সূরা আম্বিয়া ৮৭ আয়াত)
এ দুআতে প্রার্থনা নেই, তবুও তা দুআ ও প্রার্থনা। যেহেতু এ হল দুআয়ে যিক্র।
অনুরূপ মহানবী ﷺ বলেন,
( خَيْرُ الدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ).
অর্থাৎ, “শ্রেষ্ঠ দুআ আরাফার দিনের দুআ; আমি ও আমার পূর্বের নবীগণ যা বলেছেন তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কথা,
'লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু অহদাহু লা শারীকা লাহ, লাহুল মুলকু অলাহুল হামদু অহুওয়া আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদীর।' (আল্লাহ ছাড়া কেউ সত্য উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। তাঁরই সারা রাজত্ব এবং তাঁরই সকল প্রশংসা। আর তিনি সর্ব বস্তুর উপর সর্বশক্তিমান।)” (তিরমিযী ৩৫৮৫নং)
দেখুন, এই দুআ শ্রেষ্ঠ দুআ হওয়া সত্ত্বেও তাতে কোন প্রার্থনা নেই। কিন্তু যুক্তিবাদীরা হয়তো এটিকেও ফুঁক দিয়ে উড়িয়ে দেবেন।
বলা বাহুল্য, উক্ত ইফতারীর দুআতে প্রার্থনার অর্থ না থাকলেও যিক্রের অর্থ রয়েছে। অতএব তা অন্তঃসারশূন্য নয়। মহানবী ﷺ-এর বাণী কি অন্তঃসারশূন্য হতে পারে? অন্তঃসারশূন্য হল বেআদব যুক্তিবাদীদের ভুয়ো যুক্তি। তাঁদেরই হৃদয় মহানবী ﷺ-এর বাণীর প্রতি শ্রদ্ধা থেকে শূন্য।
২। দুআটি ইসলামের মূল নীতিবিরুদ্ধ। (তত্ত্ব... ৫০পৃঃ)
এটি সত্যিকারে ইসলামের মূল নীতিবিরুদ্ধ কি না, সে কথা তাঁরাই বলতে পারেন, যাঁরা ইসলামের মূল নীতি জানেন ও বোঝেন, আরবী ভাষা বোঝেন। নচেৎ 'কালা বলে গায় ভাল, কানা বলে নাচে ভাল' অবস্থা হলে কে আর মেনে নেবে?
মূলতঃ ইসলামী বিচারবোধ যদি কারো না থাকে, তাহলে সে ইসলাম সম্বন্ধে মুখ খুলতে এবং সহীh হাদীসের উপরে ক্ষুর চালাতে যায় কেন? বিশ্বের পার্থিব বিষয়ের বিচারবোধ দিয়ে কি ইসলামী কোন বিষয়ের বিচার করা যায়? ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে কি অপারেশন করা যায়? ডাক্তারি পড়ে কি উকালতি করা যায়?
'আমরা আলেমদের নিকট হতে যতটা জানতে পেরেছি তাতে দোয়া অর্থে চাওয়া। যদিও সব চাওয়া দোয়া নয়।' (তত্ত্ব....৪৯পৃঃ) তাহলে আলেমদের নিকট হতে এ কথাও জেনে অথবা মেনে নিলেন না কেন যে, সব দুআর অর্থ চাওয়া নয়।
কোথায় পেলেন যে, প্রত্যেক কর্মের শেষে 'আল-হামদু লিল্লাহ' বলে দুআ করতে হয়। (যদিও যুক্তিবাদীর মতে 'আল-হামদু' দুআ নয়।) যে কোন কর্মের পূর্বে 'ইন্ শাআল্লাহ' বলতে হয় এবং পরে বলা যায় না, (তত্ত্ব... ৫০পৃঃ দ্রঃ) কেবল এ নীতিই শিখেই অন্য সকল নীতির খণ্ডন করা যায়? আসলে আধা-শিক্ষিত লোকেদের অবস্থা এটাই। একবার একজনকে বলা হল, 'যোহরের পরে চার রাকআত সুন্নত আছে।' সে বলে উঠল, 'আজীবন দু'রাকআত পড়ে এলাম, শুনে এলাম, আজ আবার চার এল কোত্থেকে?' কোন মতেই সে মানল না।
অনুরূপ মানুষ একটি বিষয় জেনে নিয়ে, সেই বিষয়েই অন্য কোন পদ্ধতি, তরীকা, নীতিকে কোন মতেই মানতে রাযী হয় না। অথচ এ সকল অজানা ক্ষেত্রে মেনে নিতে না পারলেও মানুষের চুপ থাকা ভাল। তাতে অন্ততঃপক্ষে মান-ইজ্জত রক্ষা পায়। পক্ষান্তরে না জেনে জাননে-ওয়ালা লোকদের সাথে তর্ক করলে, বোকামির পরিচয় দেওয়া হয়।
'ইন্শাআল্লাহ' তিন অর্থে ব্যবহার হয়:-
(ক) তাকীদের অর্থে। 'ইন্ শাআল্লাহ আমি যাব।'
(খ) আল্লাহর ইচ্ছার উপর লটকে দেওয়ার অর্থে। অর্থাৎ, 'আল্লাহ চাইলে আমি যাব।’ অর্থাৎ, যেতে না পারলে আমার দোষ হবে না।
(গ) তাযকিয়াতুন নাক্স (আত্মশ্লাঘা) থেকে বাঁচার অর্থে।
যেমন যদি কেউ আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, 'আপনি কি মুত্তাকী?' তাহলে আপনি বলবেন, 'ইন্ শাআল্লাহ আমি মুত্তাকী।' কারণ, তা না বললে আপনার আত্মশ্লাঘা হবে। অথচ হয়তো বা আপনি আল্লাহর কাছে 'মুত্তাকী' নন। আর সেই জন্য আল্লাহর ইচ্ছায় লটকে দেওয়া হয়।
যেমন আপনি পরীক্ষা দিয়ে এলেন। পরীক্ষা কেমন হয়েছে তা নিশ্চিত নয়। কেউ আপনাকে জিজ্ঞাসা করল, 'পরীক্ষা কেমন হয়েছে?' তখন আপনি বলতে পারেন, 'ইন্ শাআল্লাহ ভাল হয়েছে।' কারণ, এখনো আপনার ফলাফল অজানা। আর তার জন্যই তা আল্লাহর ইচ্ছার উপরে লটকে দেবেন।
যেমন আমি চিঠি পাঠালাম। মা ফোনে বললেন, 'চিঠি পৌঁছেনি।' আমি বললাম, 'আজ গুসকরায় পৌঁছে গেছে ইন্ শাআল্লাহ।' কেননা গুসকরায় চিঠি পৌঁছেছে কি না আমি নিশ্চিত নই। তা অতীতের খবর হলেও সন্দেহের কারণে আল্লাহর ইচ্ছার উপর লটকে দিলাম।
বলা বাহুল্য, উক্ত দুআয় 'ইন্ শাআল্লাহ' বলা ভুল নয়। আর ভুল হবে কেন? এ যে আরবের সবচেয়ে বড় ভাষাবিদের উক্তি!
'সওয়াব সাব্যস্ত হল'---এ কথা নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় না বলেই 'ইন্ শাআল্লাহ' বলে আল্লাহর ইচ্ছাধীন করা হয়েছে। এতে রয়েছে আল্লাহর সাথে বড় আদব। যেহেতু আমলের প্রতিদান দেওয়া আল্লাহর উপর ওয়াজেব নয়। 'রোযা রাখলাম ইন্ শাআল্লাহ নয়। রোযার সওয়াব পেলাম ইন্ শাআল্লাহ।'
বলা বাহুল্য, উক্ত ইফতারীর দুআতে 'ইন্ শাআল্লাহ' ইসলামী মূল-নীতির বিপরীত নয়। এই শ্রেণীর আরো একটি দুআ, রোগী দেখার দুআঃ 'লা বা'সা ত্বাহুরুন ইন্ শাআল্লাহ।'
৩। 'দুআটির আদ্যোপান্ত কোথাও আল্লাহর প্রশংসাসূচক শব্দ ব্যবহার হয়নি......কার নিকট বর্ণনা করা হচ্ছে, তার কোন লক্ষ্যস্থল নেই।' (তত্ত্ব.....৫০পৃঃ)
গভীর ভাবনা নিয়ে ভেবে দেখলে এবং সূক্ষ্মভাবে এর বিশ্লেষণ করলে আপনিও বুঝতে পারবেন, দুআটির আদ্যন্ত গোটাটাই প্রশংসা। দুআটির কোন লক্ষ্যস্থল উল্লেখ নেই। কিন্তু দুআ তো আল্লাহর জন্যই হয়, আল্লাহর যিক্রের জন্য, তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য, তাঁর কাছে কিছু পাওয়ার জন্য। দুআ তো কেবল মুখে বলে বাতাসে ছেড়ে আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হয় না। আর এতে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা রয়েছে এই বলে যে, 'পিপাসা দূরীভূত হল, শিরা-উপশিরা তরতাজা হল।' কারণ আল্লাহই তো এ সব করেন।
সারাদিন অনাহারে থেকে আল্লাহর স্মরণ হয়েছে। তাঁরই অনুমতিক্রমে এখন পানাহার করলাম। তাই তো খুশীতে বললাম, 'শিরা-উপশিরা সতেজ হল।' যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই উপবাসে থেকে শুষ্কপ্রায় হয়ে গিয়েছিল। আর সেই সাথে এ কাজের 'প্রতিদানও পেলাম।' এ কথা কি প্রশংসা নয়? এই অভিব্যক্তি কি কৃতজ্ঞতা নয়? এটা কি আল্লাহর যিক্র নয়?
পরন্ত সবশেষে আল্লাহর সর্বোপরি ইচ্ছার কথাও স্বীকার হয়েছে। কারণ পরীক্ষা তো দিয়েছি, কিন্তু তা কেমন হয়েছে জানি না। তবে আশা করি ভাল হয়েছে। রোযা তো রাখলাম, কিন্তু তা কেমন হয়েছে জানি না। তবে আশা করি ভাল হয়েছে, মহান আল্লাহ তা কবুল ক'রে নিয়েছেন এবং তাঁর ইচ্ছা হলে তার সওয়াব দান করেছেন। এতে কি প্রশংসার সৌরভ আসে না? এতে কি আল্লাহর কাছে বিনয় প্রকাশ হয় না?
৪। 'ওটি দুআ নয়, ওটি একটি শরীর-ভিত্তিক কবিতা!' (তত্ত্ব... ১পৃঃ)
ছন্দের মিল না থাকলেও অমিত্রাক্ষর কবিতা!
নূর আলম সাহেব বলেন, 'এতবড় একটা ভুল পনেরোটা মাদ্রাসার তাবড় তাবড় আলেমগণ বুঝে উঠতে পারলেন না!' (তত্ত্ব..... ১পৃঃ)
📄 অনুবাদ-ভিত্তিক বিভ্রান্তির কতিপয় নমুনা
আরে দূর! ভুল কথা। সারা বাংলার কোন আলেম বুঝতে পারলেন না। আসলে তাঁরা বুঝবেন কী ক'রে? তাঁরা তো আর বাংলা জানেন না। তাঁরা তো আরবী-উর্দু পড়েছেন, কিন্তু বাংলাতে মূর্খ। আর বাংলাতে মূর্খ হলে আরবী কোন বাক্য গদ্য, না পদ্য অথবা অন্য কিছু---তা কিভাবে ধরতে পারবেন?
আরবী মহাকবি কুরআনকে 'আল্লাহর কালাম' বলে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন জওহরী, জওহর তো চিনবেনই। মনে হয় কোন বাঙ্গালী মহাকবি হলে আরো ভালোরূপে চিনতে পারতেন।
মহানবী ﷺ-এর আরবী দুআ কোন আরবী পণ্ডিতে বলতে পারলেন না, সেটা আদৌ দুআ নয়, কবিতা। সারা বিশ্বের আরব-আজমের কোন আলেমে বলতে পারলেন না, সেটা দুআ নয়, কবিতা মাত্র। মুহাদ্দিসীনগণ বলতে পারলেন না, সেটা দুআ নয়, কবিতাছত্র। শারেহীনে হাদীসগণ ধরতে পারলেন না, সেটা দুআ নয়, কবিতা। আর বাংলার একজন যুক্তিবাদী হাদীস-গবেষক সুগভীর ভাবনা ও বিশ্লেষণের কষ্টিপাথরে যাচাই ক'রে বলে দিলেন, 'ওটা একটি শরীর-ভিত্তিক কবিতা!' 'সোনা ও পিতলের পার্থক্য করে কষ্টিপাথর। আর ইসলামী শরীয়তের কষ্টিপাথর হল তাঁর গভীর ভাবনা ও বিশ্লেষণ!' (তত্ত্ব... ১পৃঃ)
সত্যপক্ষে তিনি পুরস্কারের যোগ্য। বরং তিনি নবী হওয়ার যোগ্য।
فإنا لله وإنا إليه راجعون.
অনুবাদ-ভিত্তিক বিভ্রান্তির কতিপয় নমুনা
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ: আল্লাহ ছাড়া কোন হুকুমকর্তা বিধান দাতা নেই। আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই। আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টিকর্তা নেই।
লা ইসলামা ইল্লা বিল-জামাআহঃ দল ছাড়া ইসলাম নেই।
মান খারাজা মিনাল জামাআতি.....: যে ব্যক্তি জামাআত (ইসলামী) থেকে বের হয়ে যাবে, সে ইসলামের রশিকে গলা থেকে খুলে ফেলবে।
খাদেমুল হারামাইন মালেক আব্দুল্লাহ : মক্কা-মদীনার দুই মসজিদের রক্ষাকর্তা বাদশা আব্দুল্লাহ। (আনন্দবাজার পত্রিকা ২/৩/১০)
লা তাক্বরাবা হাযিহিশ শাজারাহঃ এই গাছের নিকট যেও না, অর্থাৎ হে আদম! তুমি হাওয়ার কাছে যেও না। এখানে 'বৃক্ষ' আদি মাতা বিবি 'হাওয়া'। (কোরআন শরীফ, ডঃ ওসমান গনী ১২৭পৃঃ)
অথচ আরবী ভাষা যাঁরা জানেন, তাঁরা বুঝতে পারবেন যে, 'এ গাছটির নিকটবর্তী হয়ো না' কেবল আদমকেই বলা হয়নি; বরং 'লা তাক্বরাবা' দ্বিবচনের শব্দ দিয়ে আদম-হাওয়া উভয়কেই বলা হয়েছিল। সুতরাং এটা কি অনুবাদের বিভ্রান্তি নয়?
মোহাজের অর্থ হাজিরান বা উপস্থিত ব্যক্তি। যাঁরা মহানবীর হিযরত কালে মদীনায় তাঁর নিকট হাজির হয়ে তথায় বসবাস স্থাপন করেছিলেন। (কোরআন শরীফ, ডঃ ওসমান গনী ১৪৯পৃঃ)
পাঠক! বুঝতেই পারছেন, محاضر আর مهاجر এক নয়। আর এ কথাও বুঝতে পারছেন যে, আরবী কিন্তু সহজ জিনিস নয়।
অবিল-আখেরাতি হুম ইউকিনূন: তারা শেষ নবীর উপরেও একীন রাখে। (মুহাম্মাদ ﷺ শেষ নবী নন।)
ভুল বুঝা অনুবাদের কাস্তে দ্বারা আরো ফসল দেখুনঃ-
ইসলামে সকলের অধিকার সমান।
নর-নারীর সমান অধিকার আছে ইসলামে।
ইসলামে সাম্যবাদ (কমিউনিজম) আছে।
আল্লাহ সব জায়গায় আছেন। আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। আল্লাহ সর্বময়। (কোরআন শরীফ, ডঃ ওসমান গনী ৩৪পৃঃ)
আল্লাহ মানব অন্তরে থাকেন। (ঐ ৪২পৃঃ)
আল্লাহ কুদরতের আসনে আসীন আছেন। (তফসীরঃ আকরাম খাঁ)
আরশ : সিংহাসন---আকাশ ও পৃথিবী জুড়ে অবস্থিত, যা বিশ্বাসীদের অন্তরে অবস্থিত। (কোরআন শরীফ, ডঃ ওসমান গনী ১১৫পৃঃ)
আল্লাহর কুদরতী হাতে আদমকে সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহ নিরাকার। (কোরআন শরীফ, ডঃ ওসমান গনীঃ মুখবন্ধ ৭৭পৃঃ)
আল্লাহ দিক-বর্জিত, অসীম, তিনি সীমা-পরিধির ঊর্ধ্বে।
জিহাদের নামে সন্ত্রাস।
আরো অনেক কিছু।
📄 বই লেখার পথ যাঁদের
পরিশেষে বলি, লেখার যদি কারো নেশা হয়, অথবা পেশা, কেউ ভাড়াটিয়া লেখক হন অথবা ক্রীতকলম, যদি আপনি মুসলিম হন, তাহলে আমাদের এই নসীহত গ্রহণ করুন, পরকালে মুক্তি পাবেন।
وما من كاتب إلا سيفنى ... ويبقى الدهر ما كتبت يداه
فلا تكتب بكفك غير شيء ... يسرك في القيامة أن تراه
অর্থাৎ, প্রত্যেক লেখকই এ দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে থেকে যাবে তা, যা তার হস্ত লিপিবদ্ধ করেছে। সুতরাং তুমি তোমার হস্ত দ্বারা এমন জিনিস ছাড়া অন্য কিছু লিপিবদ্ধ করবে না, যা দর্শন করে কিয়ামতে আনন্দবোধ করতে পার।
আর যদি অল্প বিদ্যার লেখক হন, অথবা ধার করা বুদ্ধির লেখক হন অথবা অনুবাদ পড়ুয়া লেখক হন এবং বলেন, 'অনুবাদ ভুল হলে সেই অনুযায়ী আমার ভুল' (তত্ত্ব....৫পৃঃ)--- তাহলে বলব, আপনার লেখার কী প্রয়োজন? মুসলিমরা কি আপনার ঐ লেখার মুখাপেক্ষী? ইমাম যাহাবী এই শ্রেণীর লেখককে সম্বোধন ক'রে বলেন,
دع عنك الكتابة لست منها ... ولو سودت وجهك بالمداد
অর্থাৎ, বর্জন কর লেখালেখি করা, তুমি তার যোগ্য নও। বরং তার চেয়ে কালি দিয়ে তুমি নিজ চেহারা কালো কর, (সেটাই ভাল)। (তাযকিরাতুল হুফ্ফায ১/৪)
মা আয়েশা (রাঃ) আল্লাহর রসূল ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'মহিলাদের দায়িত্বে কি জিহাদ আছে?' জওয়াবে তিনি বলেছিলেন, “তাদের দায়িত্বে এমন জিহাদ আছে, যাতে কোন প্রকার মারকাট নেই; হজ্জ ও উমরাহ।” (ইবনে মাজাহ, মিশকাত ২৫৩৪নং) সুতরাং যুক্তিবাদীদের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য হল, যুদ্ধ যদি না জানা থাকে, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে না নামাই উত্তম। তাতে ইজ্জত বাঁচবে, জান বাঁচবে।
أقول لها إذا جشأت وجاشت ... مكانك تحمدي أو تستريحي
অর্থাৎ, যখনই মহিলা নাচন-কুদন দেখায়, তখনই আমি তাকে বলি, 'স্বস্থানে অবস্থান কর। তাতে তুমি প্রশংসিতা হবে অথবা আরামে থাকবে।'
উদারচিত্ত পাঠক! রাগ করবেন না। এতে আমি নিজেকেও নসীহত করি। কিন্তু আমার লেখা পেশা না হলেও, নেশা বটে। বরং ওয়াজেব না হলে লিখতামই না। বাংলায় দুর্বল হয়েও ওয়াজেব আদায়ে ত্রুটি করি না। আর মনকে বলি, 'নিজের ঘর যদি কাচ-নির্মিত হয়, তাহলে খবরদার অপরকে পাথর ছুঁড়িস না।'
--(সমাপ্ত)--