📄 ঈসা (আঃ)-এর পুনরাগমন
যুক্তিবাদীদের প্রতিভূ নূর আলমের দাবী, ঈসা (আঃ)-এর পুনরাগমনের কথা 'বাইবেলে আছে, কুরআনে নেই।' (তত্ত্ব... ১৯পৃঃ)
কুরআন পূর্বের কিতাবগুলিকে বিকৃত করা হয়েছে বললেও তার সকল তথ্যকে মিথ্যা বলেনি। বিশেষ ক'রে যে তথ্যের সমর্থন কুরআন ও সহীh হাদীসে রয়েছে, সে তথ্য মুসলিমদের বিশ্বাস করতে কোন বাধা নেই। এ কথা যুক্তিযুক্ত নয় যে, কোন কথা পূর্ববর্তী কিতাবে আছে বলেই, সে কথা আমাদের কিতাবে থাকলে তা ভুল বা অবাস্তব; বিশ্বাসের অযোগ্য। মহানবী ﷺ-এর সুসংবাদ যে সকল পূর্ববর্তী কিতাবে আছে, সেগুলির তথ্য কি ভুল বলতে পারবেন?
যদি কোন খবর পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবে থাকে এবং আমাদের কুরআন অথবা সুন্নাহতে তার সমর্থন পাওয়া যায়, তাহলে তা মানতে বা বিশ্বাস করতে কোন দোষ নেই। সে কথা তওরাত-ইঞ্জীল আসমানী গ্রন্থে আছে বলেই তা ভিত্তিহীন হয় না। এমন বহু কথা কুরআনে আছে, যা তওরাত-ইঞ্জীলে আছে। যাতে মনে হয়, পূর্ববর্তী কিতাবগুলি মনুষ্য কর্তৃক বিকৃত হলেও তার কিছু কিছু তথ্য আসমানী থেকে গেছে। আর তারই সমর্থন কুরআন করেছে। অনুরূপভাবে যদি কোন কথার সমর্থন সহীh হাদীস দ্বারা হয়ে থাকে, তাহলে তা মানতে বা বিশ্বাস করতে 'আধুনিক ঈমান' নষ্ট হবে কেন?
শুধু বিশ্বাসই নয়, পূর্ববর্তী আসমানী শরীয়তও আমাদের শরীয়ত; যদি আমাদের শরীয়তে তা মনসূখ না হয়। বরং মহানবী ﷺ বলেছেন, “আমার নিকট থেকে পৌঁছে দাও; যদিও তা একটি আয়াত হয়। বানী ইস্রাঈল থেকে হাদীস বর্ণনা কর, কোন দোষ নেই। আর যে ব্যক্তি আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন নিজের ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” (আহমাদ ৬৪৮-৬, বুখারী ৩৪৬ ১, তিরমিযী ২৬৬৯নং)
নূর আলমের লিখিত একবাক্যে 'তখনকার আলেম থেকে শুরু করে আজকের আলেম পর্যন্ত সকল আলেমই হয় কোরাণ ঠিকমত পড়েননি, না হয় কোরাণ আদৌ বোঝেননি' (তত্ত্ব.....২০পৃঃ) বলা কি নেহাতই বেআদবী ও দুঃসাহসিকতার পরিচয় নয়? 'কোরাণ' কি আপনি আর আপনার রূহানী উস্তাযগণ একাই বুঝলেন? কুরআনের এক শ্রেণীর অনুবাদ পড়েই কুরআন-বুঝিলকার হয়ে গেলেন? সুবহানাকা হাযা বুহতানুন আযীম।
সত্যই মুসলিম সমাজ বড় বিভ্রান্তি ও ধোঁকার শিকার। সমাজ বড় বোকা। এ সমাজ রসূল, সাহাবা, তাবেঈন, আয়েম্মাহ, মুহাদ্দিসীন, মুফাস্সিরীন ও উলামায়ে কিরাম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছে; যাঁরা 'কোরাণ'ই পড়েননি অথবা বোঝেননি!
হ্যাঁ, বোকা বলেই তো সমাজ তাদেরকে কথা বলার সুযোগ দেয় অথবা তাদের কুযুক্তিযুক্ত কুচিন্তার কথা নীরবে মেনে নেয়, যারা আরবী অনুবাদ পড়ে 'মুজতাহিদ' সেজে বসে নিজ ময়দানের বাইরে আক্কেলের ঘোড়া ছোটায়!
হ্যাঁ, এ তো নতুন বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের অধিকার। চিন্তা-স্বাধীনতা, বাক্-স্বাধীনতা, যৌন-স্বাধীনতা না পেলে যে মানুষ পরাধীন থেকেই যায়। সুতরাং শ্রদ্ধেয়দেরকে শ্রদ্ধা করবে কেন? স্বেচ্ছাচারিতা যে বড় পবিত্র; বিশেষ ক'রে ভারতবর্ষের মতো (আসল অর্থে) 'ধর্মনিরপেক্ষ' দেশে।
নূর আলম লিখেছেন, 'মহান আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন, যাতে আহলে কিতাবরা আমাদেরকে 'কাফির' বানিয়ে না ফেলে।' (তত্ত্ব... ২০পৃঃ) কিন্তু ঈসা (আঃ)-এর পুনরাগমনকে বিশ্বাস করলে 'কাফির' হতে হয়, তার প্রমাণ কী? পক্ষান্তরে তাঁর পুনরাগমনকে অবিশ্বাস করলেই মানুষ 'কাফির' হতে পারে; কারণ সে অবিশ্বাসী সহীh হাদীসকে অস্বীকার করে।
পক্ষান্তরে কুরআনে তাঁর পুনরাগমনের ইঙ্গিত রয়েছে। আর সেই ইঙ্গিতকে স্পষ্ট ক'রে দিয়েছে সহীh হাদীস। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِينَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأَحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ} (٥٥)
অর্থাৎ, (স্মরণ কর) যখন আল্লাহ বললেন, 'হে ঈসা! নিশ্চয় আমি তোমার নির্দিষ্ট কাল পূর্ণ করব এবং আমার কাছে তোমাকে তুলে নেব এবং যারা অবিশ্বাস করেছে, তাদের মধ্যে থেকে তোমাকে পবিত্র (মুক্ত) করব। আর তোমার অনুসারিগণকে কিয়ামত পর্যন্ত অবিশ্বাসীদের উপর জয়ী করে রাখব, অতঃপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন (ঘটবে)। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটেছে, তার মীমাংসা করে দেব। (সূরা আলে ইমরান ৫৫ আয়াত)
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
{ وَإِنَّهُ لَعِلْمٌ لِّلسَّاعَةِ فَلَا تَمْتَرُنَّ بِهَا وَاتَّبِعُونِ هَذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيمٌ} (٦١) سورة الزخرف
অর্থাৎ, নিশ্চয় ঈসা কিয়ামতের একটি নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমার অনুসরণ কর। এটিই সরল পথ। (সূরা যুখরুফ ৬ ১ আয়াত)
কিয়ামতের 'নিদর্শন' হয়ে তিনি এ পৃথিবীতে পুনরায় অবতরণ করবেন, সে কথা হাদীসে বলা হয়েছে; যে সহীh হাদীসকে মু'তাযিলাপন্থী বাস্তববাদীরা অস্বীকার করেছেন।
পক্ষান্তরে আয়াতের মূল শব্দ 'ইল্ম' বা 'আলাম' শব্দের (ক্ষমতা নেই বলে) তাহকীক না ক'রে তার এক অনুবাদ 'অগ্রদূত' নিয়ে তাহকীক ক'রে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, তিনি তো অগ্রেই দূত বা রসূল হয়েই চলে গেছেন! কিন্তু 'অগ্রদূত' দ্বারা উপলব্ধ অর্থ কি ঐ 'ইল্ম' বা 'আলাম' শব্দে আছে?
'অগ্রদূত' মানে অব্যবহিত পূর্বে পাঠানো বা আসা দূত। এখানে বাংলাতে 'দূত' মানে নবী বা রসূল নয়। যেমন চুম্বনকে মিলনের অগ্রদূত বা পূর্বদূত বলা হয়। আর সে 'দূত' মানে নবী বা রসূল নয়। 'কিয়ামতের অগ্রদূত' মানে তিনি কিয়ামতের আগে তার খবর নিয়ে আসবেন। তিনি তার নিদর্শন হয়ে আসবেন।
তিনি এ পৃথিবীতে আসবেন এবং স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন, সে কথা অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ আরো পরিষ্কার ক'রে বলেছেন,
{ وَإِن مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا }
অর্থাৎ, গ্রন্থধারীদের প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ঈসাকে) বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন সে (ঈসা) তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। (সূরা নিসা ১৫৯ আয়াত)
এই আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তাআলা নিজের অলৌকিক শক্তি দ্বারা ঈসা (আঃ)-কে জীবিত অবস্থায় সশরীরে আসমানে তুলে নিয়েছেন। বহুধা সূত্রে বর্ণিত হাদীসেও এ কথা প্রমাণিত আছে। এ সকল হাদীস হাদীসের সমস্ত গ্রন্থ ছাড়াও বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। সে সব হাদীসে ঈসা (আঃ)-কে আসমানে তুলে নেওয়া ছাড়াও পুনরায় প্রলয় দিবসের প্রাক্কালে পৃথিবীতে তাঁর অবতরণ এবং আরো বহু কথা তাঁর ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) এই সমস্ত হাদীসগুলিকে বর্ণনা করার পর শেষে লিখেছেন যে, উল্লিখিত হাদীসগুলি রসূল ﷺ হতে বহুধা সূত্রে প্রমাণিত। এই হাদীসগুলির বর্ণনাকারিগণ হলেন: আবু হুরাইরাহ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, উসমান বিন আবুল আ'স, আবু উমামা, নাওয়াস বিন সামআন, আব্দুল্লাহ বিন আম্র বিন আ'স, মুজাম্মে' বিন জারিয়াহ, আবু সারীহাহ এবং হুযাইফা বিন উসায়েদ (রাঃ) প্রমুখ সাহাবাবৃন্দ। এই সমস্ত হাদীসে তিনি কোথায় ও কিভাবে অবতরণ করবেন তা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দিমাশকের মিনারা শারক্বিয়াতে ফজরের নামাজের ইকামতের সময় অবতরণ করবেন। তিনি শূকর হত্যা করবেন, ক্রুস ভেঙ্গে ফেলবেন ও জিযিয়া কর বাতিল ক'রে দেবেন। তাঁর শাসনামলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মুসলমান হয়ে যাবে। তিনিই দাজ্জালকে হত্যা করবেন, তাঁর যুগেই ইয়া'জুজ ও মা'জুজ ও তাদের ফিতনা-ফাসাদের প্রকাশ ঘটবে এবং তাঁর বদ্দুআতে তারা বিনাশ ও ধ্বংস হয়ে যাবে।
আলোচ্য আয়াতে )قبل موته( এর মধ্যে (তার) সর্বনামটি থেকে কিছু মুফাস্সিরগণের মতে খ্রিষ্টানকে বুঝানো হয়েছে। এমতাবস্থায় আয়াতের ব্যাখ্যা এই যে, প্রত্যেক খ্রিষ্টানই নিজ অন্তিম মুহূর্তে ঈসা (আঃ)-এর নবুঅতের সত্যতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। কিন্তু সেই মুহূর্তের ঈমান তাদের আদৌ কোন উপকারে আসবে না। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা যা সালাফ ও বহু মুফাস্সির কর্তৃক সমর্থিত, তা হলো موته )তার মৃত্যু) শব্দের সর্বনামে ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এমতাবস্থায় আয়াতের অর্থ হবে, যখন তিনি দ্বিতীয়বার দুনিয়াতে অবতরণ করবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করার পর, ইসলামের প্রচার ও প্রসার কাজে মগ্ন হবেন এবং ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে যারা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করবে, তাদেরকে নিধন ও নিশ্চিহ্ন করবেন, সর্বত্র ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হবে। অবশিষ্ট আহলে কিতাবরা ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বেই তাঁর প্রতি যথাযথ ঈমান আনবে। সহীh হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, রসূল ﷺ বলেছেন, “যাঁর হাতে আমার জীবন আছে সেই সত্তার কসম! অবশ্যই এমন এক দিন আসবে, যেদিন তোমাদের মধ্যে ঈসা ইবনে মারয়্যাম একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে অবতরণ করবেন, ক্রুস ভেঙ্গে চুরমার করবেন, শূকর নিধন করবেন, জিযিয়া কর বাতিল করবেন, মাল-সম্পদ এত বেশী হবে যে, (দান বা সাদকা) গ্রহণ করার মত লোক থাকবে না। সেই সময় একটি সিজদাহ দুনিয়া এবং তার মধ্যে যা কিছু রয়েছে তার থেকেও উত্তম হবে।” (অর্থাৎ, কিয়ামত নিকটে জানার কারণে ইবাদত মানুষের কাছে অতি প্রিয় হবে।) এ হাদীস বর্ণনার পর আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বললেন, তোমরা ইচ্ছা করলে, কুরআন কারীমের এ আয়াত পাঠ করতে পার,
(وَإِنْ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِه) অর্থাৎ, আহলে কিতাবদের এমন কেউ থাকবে না, যে তার মৃত্যুর পূর্বে অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। (বুখারী : কিতাবুল আম্বিয়া, ৩৪৪৮নং) এই হাদীস এত অধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তার ফলে তা 'মুতাওয়াতির' হাদীসের পর্যায়ভুক্ত। আর এই 'মুতাওয়াতির' শুদ্ধ বর্ণনার ভিত্তিতেই আহলে সুন্নাহর সর্বসম্মত আক্বীদাহ মতে ঈসা (আঃ) আসমানে জীবিত আছেন এবং কিয়ামতের প্রাক্কালে তিনি দুনিয়াতে আসবেন, দাজ্জালকে হত্যা করবেন, সমস্ত ধর্মের অবসান ঘটাবেন, সর্বত্র ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করবেন। ইয়া'জুজ ও মা'জুজ তাঁর সময়েই প্রকাশ হবে এবং তাঁর বদ্দুআর কারণে ইয়া'জুজ ও মা'জুজের ফিতনার অবসান ঘটবে। (তফসীর আহসানুল বায়ান ১৫৪পৃঃ)
সবচেয়ে বড় হাস্যকর উক্তি যে, 'সকল নবী ও রসূলগণই কেয়ামতের অগ্রদূত।' আদম (আঃ) থেকে নিয়ে মুহাম্মাদ ﷺ পর্যন্ত সবাই 'কিয়ামতের অগ্রদূত', তাহলে পশ্চাতের দূত কে থাকল? অগ্রের অর্থ কি থাকল? আয়াতে সে কথার উল্লেখ কেন এল? আয়াতের উপকারিতাটা কি? ধারণাবশে 'হয়তো' 'সম্ভবত' বলে কি শিক্ষিত সমাজকে বোঝানো যায়? মহান আল্লাহ বলেন,
{ وَمَا يَتَّبِعُ أَكْثَرُهُمْ إِلَّا ظَنَّا إِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ عَلَيمٌ بِمَا يَفْعَلُونَ}
অর্থাৎ, তাদের অধিকাংশ লোক শুধু ধারণার অনুসরণ করে; নিশ্চয়ই বাস্তব ব্যাপারে ধারণা কোন কাজে আসে না। তারা যা করছে নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সুপরিজ্ঞাত। (সূরা ইউনুস ৩৬ আয়াত)
যদি বলেন, 'আমি আয়াতের দ্বিতীয় তফসীর মানি', তাহলে আমরা বলব, 'প্রথম তফসীরকে অমান্য করবেন কেন? আপনার মনঃপুত নয় বলে?'
নূর আলম সাহেব বলেছেন, মহানবী সঃ বলিয়াছেন, “আমি যাহা বলিব অন্ধের ন্যায় তাহার অনুসরণ করিবে না। তা সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত কথা কি না প্রথমে তাহা তাহকীক করিয়া লইবে। যদি তোমরা তাহাকে ন্যায়সঙ্গত কাজ বলিয়া মনে কর, তবেই তাহার অনুসরণ করিও। (মোস্তফা চরিত ৪৬১-৪৬২পৃঃ) 'অথচ তাহকীকের ব্যাপারে বর্ণনাকারী, লেখক, পাঠক, প্রচারক ও শ্রোতা সকলেই চরম অবহেলা করেছি, যার ফলে মিথ্যা জাল গল্পগুলিও ইসলাম ধর্মের প্রধান অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।' (তত্ত্ব... ১৫পৃঃ)
যে নবী ﷺ শরীয়তের ব্যাপারে নিজের মনগড়া কিছু বলেন না, সেই নবীর কথা তাহকীক কে করবে? মু'তাযিলা ও আকরাম খাঁয়ের মত আলেম ও তাঁর অন্ধ অনুসারীরা?
মহান আল্লাহ বলেন,
وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى (۱) مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى (۲) وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى (۳) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (٤) عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى} (٥) سورة النجم
অর্থাৎ, শপথ নক্ষত্রের, যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। তা তো অহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। তাকে শিক্ষা দান করে চরম শক্তিশালী, (ফিরিস্তা জিব্রাঈল)। (সূরা নাজম ১-৫ আয়াত)
সুতরাং ঐ হাদীস কি জাল ও ভিত্তিহীন নয়? নাকি মনের খোরাক বলে ঐ অচল হাদীসকে মানা যাবে?
পক্ষান্তরে জনাব! দাজ্জাল আসবে, ইমাম মাহদী নামক এক ইমাম আসবেন, ঈসা নবী আসবেন---এ কথা বিশ্বাস করা কি অযৌক্তিক? বিজ্ঞানের যুক্তিতে তা যুক্তিসঙ্গত না হলে, বিজ্ঞান তো জ্বিন, ফিরিস্তা, পুনরুত্থান, পুনরুজ্জীবন কিছুকেই স্বীকার করে না। আপনিও কি তাই করবেন? যদি তাই হয়, তাহলে বলার কিছু নেই।
নূর আলম সাহেব লিখেছেন, 'তবে এ কথা সত্য যে, সে যুগের লেখকগণ আজকের মত এতটা সুযোগ-সুবিধা পাননি। সে কারণে যাচাই-বাছাই করার অবকাশও তাঁরা পাননি।” (তত্ত্ব... ১.৫পৃঃ)
বড় আশ্চর্য কথা! আজকে তাহকীক করার মত সুযোগ-সুবিধার যন্ত্র কী পেয়ে গেলেন? কী সেই 'পরশমণি' যার পরশে তাহকীক ক'রে সহীh হাদীসকেও এমনকি কুরআনের প্রকাশ্য উক্তিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায়? কোন্ মানদণ্ডে আপনি ঠিক-বেঠিককে ওজন করবেন? বৈজ্ঞানিক, নাকি বেজ্ঞানিক? কোন্ কষ্টিপাথরে আপনি বিচার করবেন, সে সকল কাহিনী বাস্তব না গল্প? স্বেচ্ছাচারিতার, না অনুসরণের?
পরন্তু ঐ তাহকীকও তো পুরনো। মুসলিম সমাজ এ কথা বিশ্বাস করে না যে, অনুরূপ সহীh হাদীস অস্বীকারকারী আক্কেল আলীদের দাবী আজকের আধুনিক। সেই মু'তাযিলা, জাহমিয়্যাহ প্রভৃতি ফির্কার তাহকীক আজকের ঐ আধুনিক তাহকীক। বাংলার মাটির মুসলমান গত ৫০/৬০ বছর আগে ঐ সকল যুক্তি ও তাহকীক শুনেছে এবং যে ঈমান খারাপ করার সে করেছে, বাকী যাঁরা খণ্ডন করার তাঁরা তা করেছেন এবং আহলে সুন্নাহর ঈমান বহাল রেখেছেন। তার কিছু অংশ আমরা উদ্ধৃত করেছি।
আগেই বলেছি, জাল হাদীসের জঞ্জাল থেকে সহীh হাদীসকে মুক্ত করার জন্য কারো বিবেক-বুদ্ধি, যওক-যুক্তি, ধারণা-বাসনা ফলপ্রসূ নয়। তার জন্য একমাত্র ফলপ্রসূ ছিল ইন্সুল ইসনাদ, ইলমুর রিজাল, ইলমুল জারহি অত-তা'দীল ইত্যাদি। আর তারই ফল স্বরূপ মুহাদ্দিসীনগণ চিহ্নিত করেন সহীh-যয়ীফ। তারই সারনির্যাস হল সহীহায়ন (বুখারী-মুসলিম)।
নূর আলমের যুক্তি, 'এত বড় সম্মানের পদে আসীন হওয়ার পর ইসা আঃকে সাধারণ ক’রে প্রেরণ করবেন এমন কথা প্রকৃত (?) ইমানদারগণের বিশ্বাস করা এবং মেনে নেওয়া বড়ই কষ্টকর এবং অসম্ভব।' (তত্ত্ব... ২ ১পৃঃ)
আল্লাহই জানেন, প্রকৃত ঈমানদার কে বা কারা? 'আল্লাহু আ'লামু বিঈমানিকুম।' ঈসা (আঃ) জননেতা হয়ে পুনরাগমন করবেন, শেষ রসূল ও শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মতি হয়ে আসবেন, তাতে তাঁর অসম্মানের কি আছে? এতে সম্মানের উপর আরো সম্মানের বৃদ্ধি, নূরের উপর নূর। এ কথা মেনে নিতে ঈমানদারদের কষ্টের কি আছে?
অতঃপর নূর আলমের সিদ্ধান্ত, 'ইমানের প্রশ্নে কোরাণ ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থের উপর বিশ্বাস করা ইমানদারের কাজ নয়।' (তত্ত্ব... ৩৫পৃঃ)
এ কথা হল সে যুগের কুরআন-ভিত্তিক যুক্তিবাদীদের; যারা নিজেদের সীমিত জ্ঞানের নিকষে সহীh হাদীস অস্বীকার করে। কুরআনের ব্যাখ্যা কেবল কুরআন হলে, অনেক আয়াত যুক্তিবাদীদের যুক্তিযুক্তি খেলায় পরিণত হবে, যেমন হয়েছেও। যেহেতু অধিকাংশ আয়াতের ব্যাখ্যা কুরআনে পাওয়া যায় না। কুরআনের ব্যাখ্যা হাদীসে আছে, আর সেই ব্যাখ্যা নিয়ে যুক্তিবাদীরা নামায-রোযা করেন। আবার সমস্ত ব্যাখ্যা হাদীসেও পাওয়া যায় না, ফলে সাহাবাগণের ব্যাখ্যাও নিতে হয়।
পাঠক বলুন তো, সহীh হাদীস তথা সাহাবীর ব্যাখ্যাকে আপনি প্রাধান্য দেবেন, নাকি আপনার মনোগত, জ্ঞানগত ব্যাখ্যাকে? কী জানি আপনার মন ও জ্ঞান আবার কোন্ কোন্ ঘাটের জল খেয়ে খেয়ে পরিপক্বতা লাভ করেছে? কী গ্যারান্টি আছে যে, আপনার জ্ঞান ও যুক্তিটাই সঠিক?
বলাই বাহুল্য যে, দাজ্জাল, মাহদী ও ঈসা---এ তিনের আগমনের মৌলিক ভিত্তি হল সেই সহীh হাদীস, যে সহীh হাদীস মেনে যুক্তিবাদীরা নিয়মিত নামায পড়েন, রোযা রাখেন। তাঁরা অবশ্য হাদীস নামক (?) গ্রন্থগুলিকে একেবারেই বর্জন করতে পারেন না। নচেৎ হয়তো তাঁরা দিল-কা'বায় নামায পড়তেন অথবা যুক্তিযুক্ত সংখ্যক রাকআতে নামায পড়তেন এবং নিজেদের মতলব হাসিলের সময়---জাল বা যয়ীফ হলেও---হাদীস পেশ ক'রে তথাকথিত যুক্তিকে সমৃদ্ধ করতেন না।
প্রিয় পাঠক! তাহলে বলুন, তাঁরা কি কুরআন-ভিত্তিক যুক্তিবাদী, নাকি হাদীস-ভিত্তিক অথবা খামখেয়াল-ভিত্তিক?
📄 স্বপ্ন
ইসলামী বিধানে যা পাওয়া যায়, তাতে বুঝা যায় যে, স্বপ্ন ৩ প্রকারঃ-
১। সত্য স্বপ্নঃ যা আল্লাহর তরফ থেকে বান্দাকে দেখানো হয়। ফিরিস্তা মানুষরূপে তার আত্মর সাথে কথা বলে অথবা উদাহরণ স্বরূপ কোন ঘটনা তাকে দেখানো হয়, অথবা আল্লাহর তরফ হতেই তার মনে সত্য কল্পনার ছবি ফুটে ওঠে এবং তা স্বপ্নে দৃষ্ট হয়। যা বাস্তবে সত্য ঘটে অথবা তার তা'বীর (তাৎপর্য) সত্য হয়। এই ধরনের স্বপ্ন নবুঅতের ৪৬তম অংশের এক অংশ। কারণ, সত্য স্বপ্ন নবুঅতের অহীর মত না হলেও তা আল্লাহরই তরফ হতে ইলহাম হয়। (মুসলিম ২২৬৩)
২। এমন বস্তুর স্বপ্ন দেখে যার ছবি মানুষ নিজ কল্পনায় ও খেয়ালে মনের পর্দায় খুব বেশীরূপে অঙ্কিত ও চিত্রিত করে থাকে। তাই যা কামনা অথবা আশঙ্কা করে তাই দেখে থাকে স্বপ্নে। এ ধরনের স্বপ্ন অলীক, যার কোনও তাৎপর্য নেই।
৩। এক ধরনের স্বপ্ন; যা দেখে মানুষ অত্যন্ত ভয় পায়। অথবা কষ্ট ও দুঃখ পায়। এ ধরনের স্বপ্ন শয়তানের তরফ থেকে হয়। কারণ, শয়তান মুসলিমকে কষ্ট ও দুঃখ দিয়ে খুব তৃপ্তি পায়। (কুঃ ৫৮/১০) যেহেতু শয়তান মুসলিমের প্রকৃত দুশমন।
শয়তানের স্বপ্ন দেখাবার ক্ষমতা আছে এবং তার মাধ্যমে মুসলিমকে ভ্রষ্ট অথবা দুঃখগ্রস্ত করতে পারে। নেক বান্দাদের উপর তার কোন আধিপত্য নেই ঠিকই। তবুও মহান আল্লাহ শয়তান থেকে আমাদেরকে সাবধান করেছেন। শয়তানের পদাঙ্কানুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। শয়তান মানুষকে ভুলিয়ে দেয়, নবীকেও ভুলিয়ে দেয়। নবী ও মুসলিমকে কষ্ট দেয়। উদাহরণ স্বরূপঃ-
ঐ (বক্তা) তো শয়তান; যে (তোমাদেরকে) তার (কাফের) বন্ধুদের ভয় দেখায়; সুতরাং যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তাহলে তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকেই ভয় কর। (সূরা আলে ইমরান ১৭৫ আয়াত)
তাদেরকে পথভ্রষ্ট করবই; তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করবই, আমি তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব, ফলে তারা পশুর কর্ণচ্ছেদ করবেই এবং তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবেই।' আর যে আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে, নিশ্চয় সে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে। আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ছলনা মাত্র। (সূরা নিসা ১১৯-১২০)
শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? (সূরা মাইদাহ ৯১ আয়াত)
স্মরণ কর, শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের দৃষ্টিতে সুশোভিত করেছিল এবং বলেছিল, 'আজ মানুষের মধ্যে কেউই তোমাদের উপর বিজয়ী হবে না, আর আমি অবশ্যই তোমাদের সহযোগী (প্রতিবেশী)।' অতঃপর দু'দল যখন পরস্পরের সম্মুখীন হল, তখন সে পিছু হটে সরে পড়ল ও বলল, 'নিশ্চয় তোমাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। নিশ্চয় আমি তা দেখি, যা তোমরা দেখতে পাও না। নিশ্চয় আমি আল্লাহকে ভয় করি।' আর আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। (সূরা আনফাল ৪৮ আয়াত)
(ইউসুফ) তাদের মধ্যে যে মুক্তি পাবে মনে করল, তাকে বলল, 'তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলো।' কিন্তু শয়তান তাকে তার প্রভুর কাছে তার বিষয় বলবার কথা ভুলিয়ে দিল; (অথবা শয়তান ইউসুফকে তার প্রভুর স্মরণ ভুলিয়ে দিল।) সুতরাং (ইউসুফ) কয়েক বছর কারাগারে থেকে গেল। (সূরা ইউসুফ ৪২ আয়াত)
মূসার সাথী (তাকে) বলল, 'আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন শিলাখন্ডে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তানই ওর কথা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল; মাছটি আশ্চর্যজনকভাবে নিজের পথ করে সমুদ্রে নেমে গেল।' (সূরা কাহফ ৬৩ আয়াত)
আমি তোমার পূর্বে যে সব রসূল কিংবা নবী প্রেরণ করেছি তাদের কেউ যখনই আকাঙ্ক্ষা করেছে, তখনই শয়তান তার আকাঙ্ক্ষায় কিছু প্রক্ষিপ্ত করেছে। কিন্তু শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে আল্লাহ তা বিদূরিত করেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে সুদৃঢ় করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সূরা হাজ্জ ৫২ আয়াত)
স্মরণ কর, আমার দাস আইয়ুবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে। (সূরা স্বা-দ ৪১ আয়াত)
অবশ্য এ কথা সত্য যে, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোন ক্ষতিই হয় না, শয়তানও কোন ক্ষতি করতে পারে না; যদি না আল্লাহ চান।
শয়তানের দোহাই দিয়ে কেউ বাঁচতেও পারবে না। পাপ করলে তার শাস্তি ভুগতে হবে।
মোটকথা, অধিকাংশ স্বপ্ন মনের অবচেতন অবস্থার খেয়াল অথবা শয়তানের কারসাজি। আর প্রথম শ্রেণীর স্বপ্ন মু'মিনরা দেখে থাকে, যা ভাল স্বপ্ন এবং তা আল্লাহর তরফ থেকে দেখানো হয়। মহান আল্লাহ মুমিনের মনে যা ভালো দেখাবার ইচ্ছা তা প্রক্ষিপ্ত করেন। আর ভালোর মাপকাঠি হল শরীয়ত। তাকে সাবধান করেন, সতর্ক করেন, সুসংবাদ দেন ইত্যাদি। তবে স্বপ্ন দিব্য দর্শন নয়, স্বপ্নাদেশ কোন শরীয়ত নয়; যেহেতু শরীয়ত সম্পূর্ণ। বরং তার তাবীর ও ব্যাখ্যা করতে হয়। শয়তান স্বপ্ন দেখাতে পারে, যেহেতু সে তো আমাদের রক্তশিরায় চলমান হতে পারে। পক্ষান্তরে কোন মানুষ কাউকে স্বপ্ন দেখাতে পারে না।
আর মু'মিনের স্বপ্ন সত্য হওয়ার অর্থ এ নয় যে, সে যা দেখে তাই সত্য। ব্যভিচার করতে দেখলে তাই সত্য, পাপ করা দেখলে তার শাস্তি পাবে। বরং তার তা'বীর সঠিক হলে সত্যরূপে প্রকাশ পাবে। উদাহরণ স্বরূপঃ এক পাপী স্বপ্ন দেখল, সে স্বপ্নে পথ চলছে; কিন্তু তার পথ ভুল হয়ে যাচ্ছে অথবা যেখানে যাওয়ার কথা সেখানে সে পৌঁছতে পারছে না অথবা কোন ভয়ঙ্কর স্থানে সে পৌঁছচ্ছে। তখন কারো নিকট সে তার তা'বীর জানল যে, সে যে পথে চলছে, তা ভুল পথ। অতঃপর সে তওবা ক'রে খাঁটি মুসলিম ব্যক্তিতে পরিণত হল।
নবী ছাড়া অনবীর স্বপ্ন এবং তার তা'বীরের কথাও কুরআনে এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَيَانِ قَالَ أَحَدُهُمَا إِنِّي أَرَانِي أَعْصِرُ خَمْراً وَقَالَ الآخَرُ إِنِّي أَرَانِي أَحْمِلُ فَوْقَ رَأْسِي خُبْرًا تَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْهُ نَبِّئْنَا بِتَأْوِيلِهِ إِنَّا نَرَاكَ مِنْ الْمُحْسِنِينَ (٣٦) قَالَ لا يَأْتِيكُمَا طَعَam তُرْزَقَانِهِ إِلَّا نَبَّأْتُكُمَا بِتَأْوِيلِهِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَكُمَا ذَلِكُمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي ....... يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَمَّا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبَّهُ خَمْراً وَأَمَّا الْآخَرُ فَيُصْلَبُ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْ رَأْسِهِ قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ (٤١)
অর্থাৎ, তার সাথে দু'জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল, 'আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি (আঙ্গুর) নিড়ে মদ তৈরী করছি' এবং অপরজন বলল, 'আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি আমার মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখি তা হতে খাচ্ছে। আমাদেরকে আপনি এর তাৎপর্য জানিয়ে দিন, আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি।' ইউসুফ বলল, 'তোমাদেরকে যে খাদ্য দেওয়া হয়, তা আসবার পূর্বে আমি তোমাদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে দেব, এ জ্ঞান আমার প্রতিপালক আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তারই অন্তর্ভুক্ত।.......হ আমার কারাসঙ্গীদ্বয়! তোমাদের একজন সম্বন্ধে কথা এই যে, সে তার প্রভুকে মদ্য পান করাবে এবং অপরজন সম্বন্ধে কথা এই যে, সে শূলবিদ্ধ হবে, অতঃপর তার মস্তক হতে পাখি আহার করবে। যে বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছ তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।' (সূরা ইউসুফ ৩৬-৪১ আয়াত)
একই ঘটনা-বিবরণে তিনি আরো বলেন,
وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَى سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنبلاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ يَا أَيُّهَا الْمَلأَ أَفْتُونِي فِي رُؤْيَايَ إِنْ كُنتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُونَ (٤٣) قَالُوا أَضْغَاثُ أَحْلامٍ وَمَا نَحْنُ بِتَأْوِيلِ الْأَحْلامِ بِعَالِمِينَ (٤٤) وَقَالَ الَّذِي نَجَا مِنْهُمَا وَادَّكَرَ بَعْدَ أُمَّةٍ أَنَا أُنَبِّئُكُمْ بِتَأْوِيلِهِ فَأَرْسِلُونِ (٤٥) يُوسُفُ أَيُّهَا الصِّدِّيقُ أَفْتِنَا فِي سَبْعِ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعِ سُبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ لَعَلِّي أَرْجِعُ إِلَى النَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَعْلَمُونَ (٤٦) قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَأَبِاً فَمَا حَصَدْتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنبُلِهِ إِلا قَلِيلاً مِمَّا تَأْكُلُونَ (٤٧) ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ هُنَّ إِلَّا قَلِيلاً مِمَّا تُحْصِنُونَ (٤٨) ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ (٤٩)
অর্থাৎ, রাজা বলল, 'আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি স্থূলকায় গাভী; ওগুলিকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে প্রধানগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পার, তাহলে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও।' তারা বলল, 'এটা আবোল-তাবোল স্বপ্ন এবং আমরা এরূপ স্বপ্ন ব্যাখ্যায় অভিজ্ঞ নই।' দু'জন কারা-বন্দীর মধ্যে যে মুক্তি পেয়েছিল এবং দীর্ঘকাল পরে তার সারণ হল, সে বলল, 'আমি এর তাৎপর্য তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, সুতরাং তোমরা আমাকে পাঠিয়ে দাও।' সে বলল, 'হে ইউসুফ! হে মহা সত্যবাদী! সাতটি স্থূলকায় গাভী, ওগুলিকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক শীষ সম্বন্ধে আপনি আমাদেরকে ব্যাখ্যা দিন, যাতে আমি লোকদের কাছে ফিরে যেতে পারি এবং যাতে তারা অবগত হতে পারে।' (ইউসুফ) বলল, 'তোমরা সাত বছর একাদিক্রমে চাষ করবে, অতঃপর তোমরা যে শস্য সংগ্রহ করবে তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা ভক্ষণ করবে, তা ব্যতীত সমস্ত শস্য শীষ সমেত রেখে দেবে। এরপর আসবে সাতটি কঠিন (দুর্ভিক্ষের) বছর, এই সাত বছর যা পূর্বে সঞ্চয় ক'রে রাখবে, লোকে তা খাবে; শুধু সামান্য কিছু যা তোমরা সংরক্ষণ করবে তা ব্যতীত এবং এরপর আসবে এক বছর, সেই বছর মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং সেই বছর মানুষ ফলের রস নিড়াবে।' (ঐ ৪৩-৪৯ আয়াত)
নূর আলমের মতো যুক্তিবাদীরা স্বীকার করেন, 'আল্লাহর কুদরতির (?) দ্বারা তাদের চোখে ও অন্তরে ভ্রম সৃষ্টি করেছিলেন। যাতে তারা পরস্পর পরস্পরকে কম দেখে...।' (তত্ত্ব.....৪৮পৃঃ)
কিন্তু এ 'কুদরতি' কেবল রসূলদের জন্য স্বীকার করেন। অন্যদের জন্য স্বীকার করেন না। একই আয়াতে কাফেরদের অন্তরেও ঐ 'কুদরতির' প্রভাব স্বীকার করেন না। এটা বড় আজীব যুক্তি। অথচ ইউসুফ নবীর কাহিনীতেও লক্ষ্য করুন, তাঁর কারা সঙ্গীদ্বয় ও বাদশা কোন নবী বা রসূল ছিলেন না। তাহলে কুরআন-ভিত্তিক এই যুক্তিবাদীদের সহীh হাদীস অস্বীকার করার যুক্তি কি কুযুক্তি এবং আকীদা ও ঈমান-বিধ্বংসী প্রযুক্তি নয়?
📄 পরীক্ষার নতুন ধারা
পাঠক শুনে অবাক হবেন যে, এক বিশেষ পদ্ধতিতে প্রত্যেক মানুষই ডাক্তার-সার্জেন হচ্ছেন। চাষী-ব্যবসায়ী, কামার-কুমোর সবাই ডাক্তার! এ সহজ পদ্ধতিতে আর বিশেষজ্ঞতার কোন মূল্য নেই, গুরুত্ব নেই। আর তখন বুঝতে পারবেন যে, আসলে তারা সার্জেন হবে, নাকি কসাই?
এবার হতে প্রত্যেক বাঙালীও চোখ বন্ধ ক'রে হাদীস সহীh, না জাল---তা বুঝতে পারবেন। হাদীস যাচাইয়ের নতুন এই কষ্টিপাথর লাভ ক'রে প্রত্যেকেই এখন থেকে 'মুহাদ্দিস' হয়ে উঠবেন।
আমরা তাঁদের সেই কষ্টিপাথর ও তার যাচাই-শক্তির মান নির্ণয় করব, ইন্ শাআল্লাহ।
নূর আলম সাহেব ৪০পৃষ্ঠায় লিখেছেন,
(১) 'কোরাণের বিপরীত যে কোন বর্ণনাই জাল; তা সনদের দিক দিয়ে যতই মজবুত হোক না কেন।'
এ কষ্টিপাথরটি সাধারণ পাথর। আসলে কোন সহীh হাদীস কুরআন মাজীদের উক্তির বিপরীত মনে হলে, সেই শ্রেণীর সমন্বয় সাধনের পথ গ্রহণ করতে হবে, যে শ্রেণীর পথ গ্রহণ করতে হয়, কোন একটি আয়াত অপর আয়াতের বিপরীত মনে হলে।
আর এ কথাও জ্ঞাতব্য যে, মু'জিযার হাদীসগুলি কুরআনী বক্তব্যের বিপরীত নয়। যেমন কুরআনে বর্ণিত কয়েকটি মু'জিযা কুরআনের বিপরীত নয়।
(২) 'যে সকল বর্ণনা সত্যের বিপরীত, সে সকল বর্ণনাই জাল; যদিও সনদের দিক দিয়ে সহীhও হয়।
যেমন বুখারীতে বর্ণিত আছে, রসূল সঃ বলেছেন, 'সংক্রামনিক রোগ বলে কোন রোগ নাই।’ এটা সম্পূর্ণ জাল। কারণ সারা বিশ্বেই সংক্রামনিক রোগ ব্যাপক। বর্তমানে কোন মূর্খকেও বোঝানো সম্ভব নয় যে, সংক্রামনিক রোগ বলে কিছু নাই। সে উদাহরণ দিবে যে, টিবি, এইট্স, বসন্ত, কলেরা ইত্যাদি। এই সত্যের বিপরীত কথা ওহী হতে পারে না।'
আমরা বলি, চামচিকা যদি সূর্যালোকে দেখতে না পায়, তাহলে তো সূর্যের কোন দোষ হয় না। সংক্রামক ব্যাধি যে আছে, তা নবী ﷺ জানতেন এবং বলতেনও। সংক্রামক ব্যাধি থেকে মুসলিমকে সতর্ক করতেন।
আসলে যুক্তির কাঠগোড়ায় হাদীসের যে অনুবাদ পেশ করা হয়েছে, সে অনুবাদ ঠিক নয়।
পাঠক হাদীস খেয়াল করুন, মহানবী ﷺ বলেছেন,
لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ وَفِرَّ مِنْ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الْأَسَدِ.
অর্থাৎ, রোগের সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই। পেঁচার ডাকে অশুভ কিছু নেই, সফর মাসেও অশুভ কিছু নেই, আর কুষ্ঠরোগী থেকে সেই রকম পলায়ন কর, যে রকম সিংহ থেকে পলায়ন কর। (বুখারী ৫৭০৭, মিশকাত ৪৫৭৭নং)
হাদীসের অর্থ হবে, সংক্রামক ব্যাধি আছে, তা থেকে দূরে থাক, সে রোগকে বাঘের মত ভয় কর। তবে এ কথাও মনে রেখো যে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোন রোগ তোমার শরীরে সংক্রমণ করতে পারে না।
উলামাগণ বলেছেন, নিজস্ব ক্ষমতায় কোন রোগ কারো দেহে সংক্রমণ করে না। কোন রোগী কোন নিরোগ ব্যক্তিকে রোগী বানাতে পারে না। বরং আল্লাহই তাঁর ইচ্ছায় এ সব ক'রে থাকেন। (আল-ইস্তিযকার ৮/৪২২, আদ্-দীবাজ ৫/২৩৫)
জাহেলী যুগের লোকেরা ধারণা করত যে, কোন রোগ নিজে নিজেই অন্য দেহে সংক্রমণ করে। নবী ﷺ তাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, ব্যাপারটা তা নয়। আসলে মহান আল্লাহই অসুস্থ করেন এবং তিনিই রোগ অবতীর্ণ করেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬/২৯৫)
যেমন যদি কেউ ধারণা করে যে, মেঘই বৃষ্টি বর্ষণ করে, তাহলে তাকে বলা হয় যে, মহান আল্লাহই বৃষ্টি বর্ষণ করেন। মেঘ জমলেই বৃষ্টি হওয়া জরুরী নয়, আল্লাহর হুকুমই আসল জিনিস।
এ জন্যই এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, (রোগগ্রস্ত কোন কিছুই অপরকে রোগগ্রস্ত করতে পারে না। তা করলে) “প্রথমটিকে কে সংক্রমিত করল?” যিনি প্রথমে সংক্রামক ব্যাধি সৃষ্টি করেছেন, তিনি ছাড়া অন্য কেউ অন্য দেহে সংক্রমিত করতে পারে না।
জাহেলী যুগের লোকেরা এ ব্যাপারে এত বাড়বাড়ি ধারণা রাখত যে, সংক্রমণের আশঙ্কায় কোন রোগীকে কেউ দেখা করতে যেত না, তার খিদমত করত না এবং এক সাথে বসবাস করত না। সেই বিশ্বাস ভাঙ্গার জন্য ঐ কথা বলা হয়েছে।
হাদীসের অন্য এক অর্থে বলা হয়েছে যে, 'লা আদওয়া' অর্থাৎ, সংক্রমণের মুখে পড়ো না। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, 'ফালা রাফাসা, অলা ফুসূক্বা অলা জিদালা ফিল হাজ্জ' অর্থাৎ হজ্জে যেন যৌনাচার না করে, পাপাচার না করে এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। অনুরূপ হাদীস 'লা যারারা অলা ফিরার' অর্থাৎ ক্ষতি করো না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না। 'লা স্বালাতা বা'দাল আস্ত্র...... অর্থাৎ আসরের পর (নফল) নামায পড়ো না ইত্যাদি। আর উক্ত হাদীসের শেষাংশটি এ কথারই ইঙ্গিত বহন করে।
যুক্তিবাদীর উল্লিখিত অনুবাদ অনুযায়ী যদি হাদীসের উদ্দেশ্য হত, তাহলে সত্যই তাতে সন্দেহ ছিল। বুঝা গেল, বুখারীর হাদীস জাল নয়, জাল হল ঐ যুক্তিবাদীর ভুয়ো যুক্তি।
উক্ত হাদীসের মর্ম নিয়ে একটি হাদীস দেখুন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, একদা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) সিরিয়ার দিকে যাত্রা করলেন। অতঃপর যখন তিনি 'সার্গ' (সউদিয়া ও সিরিয়ার সীমান্ত) এলাকায় গেলেন, তখন তাঁর সাথে সৈন্যবাহিনীর প্রধানগণ---আবু উবাইদাহ ইবনুল জারাহ (রাঃ) ও তাঁর সাথীগণ---সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা তাঁকে জানান যে, সিরিয়া এলাকায় (প্লেগ) মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখন উমার (রাঃ) আমাকে বললেন, আমার কাছে প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁরা হিজরত করেছিলেন সেই মুহাজিরদেরকে ডেকে আনো। আমি তাঁদেরকে ডেকে আনলাম। উমার (রাঃ) তাঁদেরকে সিরিয়ায় প্রাদুর্ভূত মহামারীর কথা জানিয়ে তাঁদের কাছে সুপরামর্শ চাইলেন। তখন তাঁদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হল। কেউ বললেন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বের হয়েছেন। তাই তা থেকে ফিরে যাওয়াকে আমরা পছন্দ করি না। আবার কেউ কেউ বললেন, আপনার সাথে রয়েছেন অবশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও নবী ﷺ-এর সাহাবীগণ। কাজেই আমাদের কাছে ভাল মনে হয় না যে, আপনি তাঁদেরকে এই মহামারীর মধ্যে ঠেলে দেবেন। উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে উঠে যাও। তারপর তিনি বললেন, আমার নিকট আনসারদেরকে ডেকে আনো। সুতরাং আমি তাঁদেরকে ডেকে আনলাম এবং তিনি তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। কিন্তু তাঁরাও মুহাজিরদের পথ অবলম্বন করলেন এবং তাঁদের মতই তাঁরাও মতভেদ করলেন। সুতরাং উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে উঠে যাও। তারপর আমাকে বললেন, এখানে যে সকল বয়োজ্যেষ্ঠ কুরাইশী আছেন, যাঁরা মক্কা বিজয়ের বছর হিজরত করেছিলেন তাঁদেরকে ডেকে আনো। আমি তাঁদেরকে ডেকে আনলাম। তখন তাঁরা পরস্পরে কোন মতবিরোধ করলেন না। তাঁরা বললেন, আমাদের রায় হল, আপনি লোকজনকে নিয়ে ফিরে যান এবং তাদেরকে এই মহামারীর কবলে ঠেলে দেবেন না। তখন উমার (রাঃ) লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আমি ভোরে সওয়ারীর পিঠে (ফিরে যাওয়ার জন্য) আরোহণ করব। অতএব তোমরাও তাই কর। আবু উবাইদাহ ইবনুল জারাহ (রাঃ) বললেন, আপনি কি আল্লাহর নির্ধারিত তকদীর থেকে পলায়ন করার জন্য ফিরে যাচ্ছেন? উমার (রাঃ) বললেন, হে আবু উবাইদাহ! যদি তুমি ছাড়া অন্য কেউ কথাটি বলত। আসলে উমার তাঁর বিরোধিতা করতে অপছন্দ করতেন। বললেন, হ্যাঁ। আমরা আল্লাহর তকদীর থেকে আল্লাহর তকদীরের দিকেই ফিরে যাচ্ছি। তুমি বল তো, তুমি কিছু উটকে যদি এমন কোন উপত্যকায় দিয়ে এস, যেখানে আছে দু'টি প্রান্ত। তার মধ্যে একটি হল সবুজ-শ্যামল, আর অন্যটি হল বৃক্ষহীন। এবার ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ প্রান্তে চরাও, তাহলে তা আল্লাহর তকদীর অনুযায়ীই চরাবে। আর যদি তুমি বৃক্ষহীন প্রান্তে চরাও তাহলেও তা আল্লাহর তকদীর অনুযায়ীই চরাবে? বর্ণনাকারী (ইবনে আব্বাস) বলেন, এমন সময় আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এলেন। তিনি এতক্ষণ যাবৎ তাঁর কোন প্রয়োজনে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার নিকট একটি তথ্য আছে, আমি আল্লাহর রসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, “তোমরা যখন কোন এলাকায় (প্লেগের) প্রাদুর্ভাবের কথা শুনবে, তখন সেখানে যেও না। আর যদি এলাকায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব নেমে আসে আর তোমরা সেখানে থাক, তাহলে পলায়ন করে সেখান থেকে বেরিয়ে যেও না।” সুতরাং (এ হাদীস শুনে) উমার (রাঃ) আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং (মদীনা) ফিরে গেলেন। (বুখারী, মুসলিম)
আমি আমার তওহীদে লিখেছি, “মুসলিম কোন রোগ-ব্যাধির নিজস্ব সংক্রমণে বিশ্বাসী নয়। কারণ, আল্লাহর তরফ থেকেই (প্রথম) আক্রমণ এবং (পরে) সংক্রমণ হয়ে থাকে। (বুঃ ৫৭০৭, মুঃ ২২২০) আবার সংক্রামক ব্যাধি থেকে সাবধানও থাকে। কারণ, সে তকদীর ও তদবীর দুয়েই বিশ্বাসী। তাই যে স্থানে কলেরা, বসন্ত বা অন্য কোন মহামারী দেখা দেয়, সে স্থানে সে বর্তমান থাকলে সেখান হতে ভয়ে বের হয়ে পলায়ন করে না। কারণ তকদীর হতে পালাবার পথ কোথায়? কিন্তু সে স্থানের বাইরে থাকলে সেখানে প্রবেশ করে না। কারণ, তদবীরও ফল দেয়। (বুঃ ৫৭২৯, মুঃ ২২১৯, মুঃ আঃ ১/১৯২)
তদনুরূপই কোন সংক্রামী ব্যাধিগ্রস্ত মানুষের কাছে থাকলে দূরে সরে যায় না। বা তাকে দূর বাসে না এবং দূরে থাকলে কাছে আসেনা (মুমূর্ষের সাহায্য ও চিকিৎসা করার কথা স্বতন্ত্র)। কারণ, মানুষের কাজ তদবীর করা বা সাবধানতা অবলম্বন করা। তকদীর তার নিজের কাজ করবে। (বুঃ ৫৭০৭, মুঃ ২২৩১)
আবার তার কাছে যাওয়ার পর যদি তারও সেই ব্যাধি হয়ে যায়, তবে সে এ বিশ্বাস বা ধারণা করে না যে, তার কাছে এসেই রোগটা হল। বরং বিশ্বাস রাখে যে, এটা তার নিয়তির গতি বা আল্লাহপাকের ইচ্ছা।”
রোগের নিজস্ব সংক্রমণ নেই। আল্লাহর ইচ্ছা না হলে কোন রোগ সংক্রমণ করতে পারে না। এ কথা মূর্খরাও জানে যে, একই বাড়িতে কিছু লোকের সংক্রামক রোগ হলে অনেক লোকের তা হয় না। রোগ ছোঁয়াচে হলেই যে প্রত্যেককেই আক্রমণ করবে---তা জরুরী নয়। রোগের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ যেমন ছোঁয়াচে রোগ প্রথম ব্যক্তিকে আক্রমণ করার ক্ষমতা দেখান, তেমনি তা প্রসার লাভ করার পরেও অনেক লোককে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখেন। এটাই হল আকীদা।
বাকী থাকল, সাবধানতা অবলম্বন করার কথাও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। ছোঁয়াচে রোগীর সংস্পর্শে আসতে নিষেধ করা হয়েছে। মহামারীগ্রস্ত দেশ বা শহরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু যে রোগীর সংস্পর্শে আছে, সে কী করবে? তার মনকে শক্ত করার জন্য কি এই আকীদা জরুরী নয় যে, রোগের নিজস্ব সংক্রমণ নেই?
বলা বাহুল্য, 'সংক্রামনিক বলে কোন রোগ নাই' এ কথা ভুল। এটি হাদীসও নয়। নতুবা অনুবাদে ভুল। আর সেই ভুলে পড়েন তাঁরা, যাঁদের ওস্তাদ হয় 'কিতাব' সাহেব।
ঐ শ্রেণীর হাদীস যেমন অহী হতে পারে না, তেমনি হাদীস না বুঝে যে হৈচৈ করে, তার জ্ঞান সঠিক হতে পারে না। সুতরাং সে জ্ঞান কি অহী যাচাইয়ের কষ্টিপাথর হতে পারে?
পক্ষান্তরে 'সূর্যের তাপে তপ্ত পানিতে স্নান করিলে কুষ্ঠ রোগ হয়' (তত্ত্ব......৪১১পৃঃ)---এ হাদীসটি জাল ও গড়া হাদীস। হাদীসটির বক্তব্য বাস্তব-বিরোধী বলে নয়, বরং তার সনদেই জালিয়াতির কথা ধরা পড়েছে। এই জন্য হাদীসটির স্থান হয়েছে প্রায় সমস্ত 'মাওযূআত' গ্রন্থে। অথচ যুক্তিবাদীরা বুখারীকে ছোট করার জন্য উল্লেখ করেছেন, 'বুখারীতে বর্ণিত আছে!' এটি অবশ্যই অজ্ঞানতা অথবা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কারণ এ হাদীস বুখারীতে নেই। ফাল্লাহুল মুস্তাআন। পাঠক বুঝতেই পারছেন, কাস্তে-কুড়ুল নিয়ে অপারেশন করার কুফল।
৩। 'শব্দ ও ভাষার অসঙ্গতিপূর্ণ বর্ণনাও জাল।' এর উদাহরণে যে হাদীস পেশ করা হয়েছে সেটি পূর্বোক্ত হাদীস চেনার পদ্ধতির উদাহরণ। অর্থাৎ বাস্তব-বিরোধী প্রত্যেক হাদীসই জাল। হাদীসটি হল, “সকল প্রাণীর ছবিতোলা বা আঁকা হারাম। তবে গাছ-গাছারীর ছবিতোলা বা আঁকা জায়েয।” এই বর্ণনায় (নাকি) রসুল সঃকে সীমিত জ্ঞানের মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কারণ রসুল সঃ জানতেন না যে, গাছ গাছারীরও প্রাণ আছে। (তত্ত্ব....৪১পৃঃ)
প্রিয় পাঠক হাদীসে কী আছে, তা প্রণিধান করুনঃ-
إِنْ كُنْتَ لَا بُدَّ فَاعِلاً فَاصْنَعِ الشَّجَرَ وَمَا لَا نَفْسَ لَهُ)
'যদি করতেই হয়, তাহলে গাছ এবং সেই জিনিসের মূর্তি বা ছবি বানাও, যার প্রাণ নেই।'
এখানে গাছের প্রাণ না থাকার কথা তো প্রমাণ হয় না। হাদীসের উদ্দেশ্য হল, তুমি গাছের ছবি বানাতে পার। আর সেই সকল জড়পদার্থেরও ছবি বানাতে পার, যাতে প্রাণ নেই।
দ্বিতীয়তঃ যদি উক্ত হাদীস থেকে এ কথা বুঝাও যায় যে, গাছের প্রাণ নেই, তাহলে হাদীসে বর্ণিত 'রূহ' বা 'নাফক্স' বলতে উদ্দেশ্য হল, বিচরণশীল প্রাণীর প্রাণ। অর্থাৎ, যে প্রাণী চলেফিরে বেড়ায়, তাকে 'রূহ' বা 'নাক্স'-ওয়ালা প্রাণী বলা হয়। পক্ষান্তরে গাছের মধ্যে 'হায়াত' বা 'জীবন' থাকলেও, তাকে আরবীতে 'যাতুর রূহ' বা 'যাতুন নাক্স' বলা হয় না। এ কথা কেবল বিচরণশীল প্রাণীর জন্যই ব্যবহার হয়।
তৃতীয়তঃ এ উক্তি নবী ﷺ-এর নয়। বরং এ হল ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি।
সুতরাং যুক্তিবাদীর যুক্তির জাল যে আসলে মাকড়সার জাল, তাতে কি সন্দেহ আছে?
ওঁরা বলেন, 'হাদীসটি জাল হওয়ার আরো একটি প্রমাণ, মহান আল্লাহ বলেন, “আমি এমন বোঝা চাপাইনি যা মানব জাতি বহন করতে পারবে না।” অথচ বাস্তবে দেখা যায় পৃথিবীতে এমন কোন সাবালক ও সাবালিকা (?) নেই যে, সে ছবি ছাড়া চলতে পারে। অতএব ছবি তোলার বর্ণনাটি কল্পনার।' (তত্ত্ব.....৪০ ১পৃঃ)
হ্যাঁ, এই জন্যই তো কুরআনের পর্দার আয়াতকে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মানতে চায় না। হয়তো বা সে বর্ণনাটিও কল্পনার। কারণ, শরয়ী পর্দা মানা বড় কঠিন। ইত্যাদি।
অথচ মুফতী সাহেবগণ এই আয়াত প্রয়োগ করেন কোন হারাম জিনিসকে বাধ্য হয়ে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ, ছবিতোলা হারাম; কিন্তু নিরুপায়ের ক্ষেত্রে জায়েয। সূদী ঋণ নেওয়া হারাম; কিন্তু নিরুপায়ের ক্ষেত্রে জায়েয। পর্দা করা ওয়াজেব; কিন্তু নিরুপায়ের ক্ষেত্রে বেপর্দা হওয়া এমনকি নগ্ন হওয়াও জায়েয। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, “আমি এমন বোঝা চাপাইনি যা মানব জাতি বহন করতে পারবে না।” তাহলে কোন কাজ বাধ্য হয়ে করতে হলে, সে কাজ নিষেধ হওয়ার হাদীসকে চোখ বুজে চাঁদ দেখার মত 'কল্পনার' বলা কি 'মাতুরীদী' মার্কা স্বেচ্ছাচারিতা নয়?
📄 পরীক্ষার নতুন ধারার ইফতারীর দুয়া
বড় দুঃখ ও বড় বিপদের কথা তখন হয়, যখন শুনি যে, নাড়ীটেপা ডাক্তার অথবা কোন প্লাম্বার (সীসক কর্মকার) রোগীর অপারেশন করছে! সে ক্ষেত্রে যেমন রোগীর জীবনের ভরসা থাকে না, তেমনি আলেমদের নৌকার হাল যদি অনালেমরা ধরতে চায়, তাহলে ইসলামের যে কী দশা হতে পারে তা অনুমেয়।
আমার ভাবতে বড় অবাক লাগে, তাঁরা এই শ্রেণীর দুঃসাহসিকতা কেন করেন? যাঁদের সহীh-যয়ীফের বিচারবোধ নেই, ইসলামী মৌলনীতির জ্ঞান নেই, আরবী ভাষাজ্ঞান নেই, তাঁরা আলেমদের টেক্কা দিতে চান কোন্ সাহসে? কোন্ মানসে?
আবার মুখে মুখে হয়, তাও আচ্ছা। কিন্তু যুক্তিবাদী সেজে এইভাবে টাকা-পয়সা খরচ ক'রে বই প্রকাশ ক'রে নিজেদেরকে সমাজের কাছে হাসির পাত্র করেন কেন? (যদিও সম্ভাব্য যে, এর পিছনে ঐ শ্রেণীর কোন আলেম লুকিয়ে আছেন।)
সহীh হাদীসে আছে, আল্লাহর নবী ﷺ যখন ইফতার করতেন, তখন বলতেন,
ذَهَبَ الظَّمَا، وَابْتَلْت العُرُوقُ، وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ الله) .
উচ্চারণঃ- যাহাবায যামা-উ অবতাল্লাতিল উরুকু অসাবাতাল আজরু ইন্শা-আল্লাহ।
অর্থ- পিপাসা দূরীভূত হল, শিরা-উপশিরা সতেজ হল এবং আল্লাহ চান (বা চেয়েছেন) তো সওয়াব সাব্যস্ত হল। (আবু দাউদ ২৩৫৭, নাসাঈ কুবরা, ইবনুস সুন্নী ৪৭২,দারাকুত্বনী ২৪০নং, হাকেম ১/৪২২, বাইহাক্বী ৪/২৩৯, মিশকাত ১৯৯৩, ইরওয়াউল গালীল ৯২০, সহীহুল জামে' ৪৬৭৮নং)
সুতরাং ইফতারীর পরে এ কথা বলা সুন্নত। কিন্তু যুক্তিবাদীদের দাবী হল, এটি হাদীস নয়। কারণঃ-
১। 'এটি দুআ নয়। কেননা দুআ অর্থ চাওয়া। আর এতে চাওয়া বা প্রার্থনার কোন কথা নেই।’ (তত্ত্ব......৫০পৃঃ)
আমরাও বলছি, এটি সেই অর্থে দুআ নয়, যে অর্থে যুক্তিবাদীরা মনে করেছেন। তাছাড়া হাদীসে 'এই দুআ করতেন' শব্দ নেই; বরং 'বলতেন' শব্দ আছে।
তবুও তাকে দুআ বলা হল কেন? দুআর আসল মানে ডাকা, আর তা হচ্ছে দুই প্রকার: দুআউল মাসআলাহ ও দুআউয যিক্র।
প্রথম প্রকার দুআতে ডাকা, আহবান করা, প্রার্থনা করার অর্থ থাকে। এই দুআর সাথে ভিখিরীর গৃহস্থের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার মিল রয়েছে।
আর দ্বিতীয় প্রকার দুআতে 'যিক্র' (স্মরণ) থাকে, সরাসরি প্রার্থনা থাকে না। যেমন ভিখিরী গৃহস্থের কাছে গিয়ে নিজের হাল বলে এবং গৃহস্থ তা বুঝে তাকে দান করে। লক্ষ্য করুন ইউনুসের দুআ,
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ} (۸۷) سورة الأنبياء
অর্থাৎ, তুমি ছাড়া কোন (সত্য) উপাস্য নেই; তুমি পবিত্র, মহান। নিশ্চয় আমি সীমালংঘনকারী। (সূরা আম্বিয়া ৮৭ আয়াত)
এ দুআতে প্রার্থনা নেই, তবুও তা দুআ ও প্রার্থনা। যেহেতু এ হল দুআয়ে যিক্র।
অনুরূপ মহানবী ﷺ বলেন,
( خَيْرُ الدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ).
অর্থাৎ, “শ্রেষ্ঠ দুআ আরাফার দিনের দুআ; আমি ও আমার পূর্বের নবীগণ যা বলেছেন তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কথা,
'লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু অহদাহু লা শারীকা লাহ, লাহুল মুলকু অলাহুল হামদু অহুওয়া আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদীর।' (আল্লাহ ছাড়া কেউ সত্য উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। তাঁরই সারা রাজত্ব এবং তাঁরই সকল প্রশংসা। আর তিনি সর্ব বস্তুর উপর সর্বশক্তিমান।)” (তিরমিযী ৩৫৮৫নং)
দেখুন, এই দুআ শ্রেষ্ঠ দুআ হওয়া সত্ত্বেও তাতে কোন প্রার্থনা নেই। কিন্তু যুক্তিবাদীরা হয়তো এটিকেও ফুঁক দিয়ে উড়িয়ে দেবেন।
বলা বাহুল্য, উক্ত ইফতারীর দুআতে প্রার্থনার অর্থ না থাকলেও যিক্রের অর্থ রয়েছে। অতএব তা অন্তঃসারশূন্য নয়। মহানবী ﷺ-এর বাণী কি অন্তঃসারশূন্য হতে পারে? অন্তঃসারশূন্য হল বেআদব যুক্তিবাদীদের ভুয়ো যুক্তি। তাঁদেরই হৃদয় মহানবী ﷺ-এর বাণীর প্রতি শ্রদ্ধা থেকে শূন্য।
২। দুআটি ইসলামের মূল নীতিবিরুদ্ধ। (তত্ত্ব... ৫০পৃঃ)
এটি সত্যিকারে ইসলামের মূল নীতিবিরুদ্ধ কি না, সে কথা তাঁরাই বলতে পারেন, যাঁরা ইসলামের মূল নীতি জানেন ও বোঝেন, আরবী ভাষা বোঝেন। নচেৎ 'কালা বলে গায় ভাল, কানা বলে নাচে ভাল' অবস্থা হলে কে আর মেনে নেবে?
মূলতঃ ইসলামী বিচারবোধ যদি কারো না থাকে, তাহলে সে ইসলাম সম্বন্ধে মুখ খুলতে এবং সহীh হাদীসের উপরে ক্ষুর চালাতে যায় কেন? বিশ্বের পার্থিব বিষয়ের বিচারবোধ দিয়ে কি ইসলামী কোন বিষয়ের বিচার করা যায়? ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে কি অপারেশন করা যায়? ডাক্তারি পড়ে কি উকালতি করা যায়?
'আমরা আলেমদের নিকট হতে যতটা জানতে পেরেছি তাতে দোয়া অর্থে চাওয়া। যদিও সব চাওয়া দোয়া নয়।' (তত্ত্ব....৪৯পৃঃ) তাহলে আলেমদের নিকট হতে এ কথাও জেনে অথবা মেনে নিলেন না কেন যে, সব দুআর অর্থ চাওয়া নয়।
কোথায় পেলেন যে, প্রত্যেক কর্মের শেষে 'আল-হামদু লিল্লাহ' বলে দুআ করতে হয়। (যদিও যুক্তিবাদীর মতে 'আল-হামদু' দুআ নয়।) যে কোন কর্মের পূর্বে 'ইন্ শাআল্লাহ' বলতে হয় এবং পরে বলা যায় না, (তত্ত্ব... ৫০পৃঃ দ্রঃ) কেবল এ নীতিই শিখেই অন্য সকল নীতির খণ্ডন করা যায়? আসলে আধা-শিক্ষিত লোকেদের অবস্থা এটাই। একবার একজনকে বলা হল, 'যোহরের পরে চার রাকআত সুন্নত আছে।' সে বলে উঠল, 'আজীবন দু'রাকআত পড়ে এলাম, শুনে এলাম, আজ আবার চার এল কোত্থেকে?' কোন মতেই সে মানল না।
অনুরূপ মানুষ একটি বিষয় জেনে নিয়ে, সেই বিষয়েই অন্য কোন পদ্ধতি, তরীকা, নীতিকে কোন মতেই মানতে রাযী হয় না। অথচ এ সকল অজানা ক্ষেত্রে মেনে নিতে না পারলেও মানুষের চুপ থাকা ভাল। তাতে অন্ততঃপক্ষে মান-ইজ্জত রক্ষা পায়। পক্ষান্তরে না জেনে জাননে-ওয়ালা লোকদের সাথে তর্ক করলে, বোকামির পরিচয় দেওয়া হয়।
'ইন্শাআল্লাহ' তিন অর্থে ব্যবহার হয়:-
(ক) তাকীদের অর্থে। 'ইন্ শাআল্লাহ আমি যাব।'
(খ) আল্লাহর ইচ্ছার উপর লটকে দেওয়ার অর্থে। অর্থাৎ, 'আল্লাহ চাইলে আমি যাব।’ অর্থাৎ, যেতে না পারলে আমার দোষ হবে না।
(গ) তাযকিয়াতুন নাক্স (আত্মশ্লাঘা) থেকে বাঁচার অর্থে।
যেমন যদি কেউ আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, 'আপনি কি মুত্তাকী?' তাহলে আপনি বলবেন, 'ইন্ শাআল্লাহ আমি মুত্তাকী।' কারণ, তা না বললে আপনার আত্মশ্লাঘা হবে। অথচ হয়তো বা আপনি আল্লাহর কাছে 'মুত্তাকী' নন। আর সেই জন্য আল্লাহর ইচ্ছায় লটকে দেওয়া হয়।
যেমন আপনি পরীক্ষা দিয়ে এলেন। পরীক্ষা কেমন হয়েছে তা নিশ্চিত নয়। কেউ আপনাকে জিজ্ঞাসা করল, 'পরীক্ষা কেমন হয়েছে?' তখন আপনি বলতে পারেন, 'ইন্ শাআল্লাহ ভাল হয়েছে।' কারণ, এখনো আপনার ফলাফল অজানা। আর তার জন্যই তা আল্লাহর ইচ্ছার উপরে লটকে দেবেন।
যেমন আমি চিঠি পাঠালাম। মা ফোনে বললেন, 'চিঠি পৌঁছেনি।' আমি বললাম, 'আজ গুসকরায় পৌঁছে গেছে ইন্ শাআল্লাহ।' কেননা গুসকরায় চিঠি পৌঁছেছে কি না আমি নিশ্চিত নই। তা অতীতের খবর হলেও সন্দেহের কারণে আল্লাহর ইচ্ছার উপর লটকে দিলাম।
বলা বাহুল্য, উক্ত দুআয় 'ইন্ শাআল্লাহ' বলা ভুল নয়। আর ভুল হবে কেন? এ যে আরবের সবচেয়ে বড় ভাষাবিদের উক্তি!
'সওয়াব সাব্যস্ত হল'---এ কথা নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় না বলেই 'ইন্ শাআল্লাহ' বলে আল্লাহর ইচ্ছাধীন করা হয়েছে। এতে রয়েছে আল্লাহর সাথে বড় আদব। যেহেতু আমলের প্রতিদান দেওয়া আল্লাহর উপর ওয়াজেব নয়। 'রোযা রাখলাম ইন্ শাআল্লাহ নয়। রোযার সওয়াব পেলাম ইন্ শাআল্লাহ।'
বলা বাহুল্য, উক্ত ইফতারীর দুআতে 'ইন্ শাআল্লাহ' ইসলামী মূল-নীতির বিপরীত নয়। এই শ্রেণীর আরো একটি দুআ, রোগী দেখার দুআঃ 'লা বা'সা ত্বাহুরুন ইন্ শাআল্লাহ।'
৩। 'দুআটির আদ্যোপান্ত কোথাও আল্লাহর প্রশংসাসূচক শব্দ ব্যবহার হয়নি......কার নিকট বর্ণনা করা হচ্ছে, তার কোন লক্ষ্যস্থল নেই।' (তত্ত্ব.....৫০পৃঃ)
গভীর ভাবনা নিয়ে ভেবে দেখলে এবং সূক্ষ্মভাবে এর বিশ্লেষণ করলে আপনিও বুঝতে পারবেন, দুআটির আদ্যন্ত গোটাটাই প্রশংসা। দুআটির কোন লক্ষ্যস্থল উল্লেখ নেই। কিন্তু দুআ তো আল্লাহর জন্যই হয়, আল্লাহর যিক্রের জন্য, তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য, তাঁর কাছে কিছু পাওয়ার জন্য। দুআ তো কেবল মুখে বলে বাতাসে ছেড়ে আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হয় না। আর এতে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা রয়েছে এই বলে যে, 'পিপাসা দূরীভূত হল, শিরা-উপশিরা তরতাজা হল।' কারণ আল্লাহই তো এ সব করেন।
সারাদিন অনাহারে থেকে আল্লাহর স্মরণ হয়েছে। তাঁরই অনুমতিক্রমে এখন পানাহার করলাম। তাই তো খুশীতে বললাম, 'শিরা-উপশিরা সতেজ হল।' যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই উপবাসে থেকে শুষ্কপ্রায় হয়ে গিয়েছিল। আর সেই সাথে এ কাজের 'প্রতিদানও পেলাম।' এ কথা কি প্রশংসা নয়? এই অভিব্যক্তি কি কৃতজ্ঞতা নয়? এটা কি আল্লাহর যিক্র নয়?
পরন্ত সবশেষে আল্লাহর সর্বোপরি ইচ্ছার কথাও স্বীকার হয়েছে। কারণ পরীক্ষা তো দিয়েছি, কিন্তু তা কেমন হয়েছে জানি না। তবে আশা করি ভাল হয়েছে। রোযা তো রাখলাম, কিন্তু তা কেমন হয়েছে জানি না। তবে আশা করি ভাল হয়েছে, মহান আল্লাহ তা কবুল ক'রে নিয়েছেন এবং তাঁর ইচ্ছা হলে তার সওয়াব দান করেছেন। এতে কি প্রশংসার সৌরভ আসে না? এতে কি আল্লাহর কাছে বিনয় প্রকাশ হয় না?
৪। 'ওটি দুআ নয়, ওটি একটি শরীর-ভিত্তিক কবিতা!' (তত্ত্ব... ১পৃঃ)
ছন্দের মিল না থাকলেও অমিত্রাক্ষর কবিতা!
নূর আলম সাহেব বলেন, 'এতবড় একটা ভুল পনেরোটা মাদ্রাসার তাবড় তাবড় আলেমগণ বুঝে উঠতে পারলেন না!' (তত্ত্ব..... ১পৃঃ)