📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 মহানবী ﷺ-এর জীবনী, মোস্তফা চরিত ও মু'জিযা

📄 মহানবী ﷺ-এর জীবনী, মোস্তফা চরিত ও মু'জিযা


যে বাস্তববাদীরা কুরআন ছাড়া কোন মু'জিযাই মহানবী ﷺ-কে দেওয়া হয়নি বলে দাবী করেন, তাঁদের কেউ কেউ আবার এ কথাও বলেছেন, (যেমন নূর আলম সাহেব বলেছেন) 'রসূল সঃ এর মেহেরাজ হয়েছিল এর উপর বিশ্বাস করাটাই হল মোমিনত্বের পরিচয়! কেননা মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম রসূলকে যে কোন ভাবেই তাঁর কুদরতি বিষয়গুলি দেখাতে, শোনাতে এবং বোঝাতে সক্ষম।' (তত্ত্ব......৪৬পৃঃ)
চমৎকার! এটাই তো ঈমানদার যুক্তিবাদীর কথা। আর তাঁর 'মেহেরাজ' সশরীরে না হয়ে স্বপ্নে হলে, কাফেররা অবিশ্বাস করবে কেন? স্বপ্নকে অবিশ্বাস করার মত যুক্তি তো সে যুগে ছিল না। এইভাবে সহীহ হাদীসে বর্ণিত অন্যান্য মু'জিযাকেও বিশ্বাস ক'রে নেওয়াই 'মোমিনত্বের পরিচয়'।
কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, বুখারী-মুসলিম তথা আরো অন্যান্য গ্রন্থের সহীহ হাদীসে রয়েছে আরো বহু মু'জিযার কথা; যা বাস্তববাদীরা চোখ বন্ধ ক'রে ফুঁক দিয়ে ধুলো উড়াবার মত উড়িয়ে দেন এবং অন্ধের ক্ষুর চালাবার মত সে সকল হাদীসকে একবাক্যে 'কল্পিত ও জাল' আখ্যায়িত ক'রে চুল চাঁছার সাথে কানও চেঁছে ফেলেন!
অবশ্য মু'জিযা অস্বীকার করার মূলে কেবল আমাদের বাংলার নবোদ্ভূত যুক্তিবাদীরাই নন, তাঁদের বহু পূর্বে মু'তাযিলা প্রভৃতি গুমরাহ ফির্কা মু'জিযা অস্বীকার ক'রে গেছে এবং তাদেরই তফসীর (যেমন: তফসীর রাযী প্রভৃতি) ও অন্যান্য বই-পুস্তক পড়ে মওলানা আকরাম খাঁ ও তাঁর অনুসারিগণ ইচ্ছামত মু'জিযা অস্বীকার ক'রে চলেছেন।
যেমন ফিরিস্তা, জিন-জগৎ সত্য। গায়বী জগৎকে আমরা বিশ্বাস করি। তেমনি কুরআনে মু'জিযার কথা আছে, তাও আমরা বিশ্বাস করি। কুরআনে কি এ কথা আছে যে, হে মুহাম্মাদ! তোমাকে কুরআন ছাড়া অন্য কোন মু'জিযা দিইনি?
অবশ্য এ কথাও অনস্বীকার্য যে, মু'জিযার নামে অনেক জাল হাদীস বিভিন্ন ইসলামী কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। আর তার মানেই এ নয় যে, মু'জিযা সংক্রান্ত যত হাদীস আছে, সবই জাল। নিশ্চয়ই মু'জিযা ও কারামতের নামে অপ্রমাণিত গাল-গল্প স্বীকৃত নয়।
মহানবী ﷺ-এর জীবনী, মোস্তফা চরিত ও মু'জিযা
নূর আলমী প্রকৃতির যুক্তিবাদীরা সেই সন্দিগ্ধ (?) বুখারী-মুসলিমের হাদীস পেশ ক'রেই বলেন, 'মা আয়েশা বলিয়াছেন, মহানবী ﷺ-এর জীবনাদর্শ ছিল কুরআন। তাঁর জীবনাদর্শ কোরাণের বাইরে কিছু নেই!'
'এই হাদীস মুতাবিক রসূল সঃ এর জীবনাদর্শ কেমন ছিল তা সঠিকভাবে পেতে হলে মূলত কোরাণকেই অনুসরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে উঠেনি। বরং গুটিকয় (!) লেখকের সংগৃহীত তথ্যের উপর চরম নির্ভরশীল হওয়ায় কোরাণের বিপরীত বর্ণনাগুলি চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়নি। বর্তমানে কোরান ও হাদীস ব্যাপকভাবে অনুবাদ হওয়ার ফলে (নাকি মোস্তফা চরিত পড়ে?) আমরা বুঝতে পারছি যে, হাদীস গ্রন্থে অনেক বর্ণনা আছে যা মূলত কোরাণের পরিপন্থী।' (তত্ত্ব... ২.৫পৃঃ)
সুহৃদ পাঠক! আপনি অবশ্যই বুঝতে পারছেন যে, জীবনী ও জীবনাদর্শ এক নয়। হাদীসে বলা হয়েছে, মহানবী ﷺ-এর 'খুলুক' আখলাক বা চরিত্র ছিল কুরআন। হাদীসে 'হায়াত' বা জীবনী কেমন ছিল, তার বর্ণনা দেওয়া হয়নি। যদি 'তাঁর জীবনাদর্শ কোরাণের বাইরে কিছু নেই', তাহলে আবার 'মোস্তফা চরিত' কেন রচিত ও পঠিত হল? কেবল কুরআন পড়লেই তো তাঁর জীবনাদর্শ ও জীবনের খুঁটিনাটি সব পাওয়া যেত।
অনুবাদ হওয়ার আগে বাংলার মানুষ না হয় ধরেই নিলাম 'বুদ্ধ' ছিল। কিন্তু যাঁদের অনুবাদের দরকার নেই, তাঁরা ও তাঁদের আলেম-উলামারাও কি অনুরূপ ছিলেন? নাকি যুক্তিবাদী আধুনিক জ্ঞানচর্চা শুধু সোনার বাংলাতেই শুরু হল।
যাঁরা অনুবাদ সঠিক না ভুল---তাই বুঝেন না, তাঁরা আবার কোরাণের পরিপন্থী হাদীস কিভাবে বুঝতে পারছেন?
মহানবী ﷺ-এর জীবনাদর্শ নয়; বরং জীবনী থেকে 'মু'জিযা'কে মাথার চুল নেড়া করার মত নেড়া ক'রে মুছে দিতে চাওয়া হয়েছে। শুধু ঘটনা অস্বাভাবিক বলে সহীh হাদীসকেও এবং 'যার শিল তারই নোড়া, তারই ভাঙ্গ দাঁতের গোড়া'র মতো বুখারী-মুসলিমের হাদীস দিয়ে বুখারী-মুসলিমের হাদীসকে অস্বীকার করা হয়েছে! এটাই কি আসলে 'লায়ে চেপে লা ঠেলার মত' নয়? অথচ যুক্তিবাদীদের অনেকে আবার কুরআন-ভিত্তিক মু'জিযাকে মানেন এবং তখন 'আল্লাহর কুদরতি' স্বীকার ক'রে যুক্তিকে মুক্তি দেন।
পক্ষান্তরে হাদীসে বর্ণিত হলে, সে মু'জিযা মানেন না এবং তখন 'আল্লাহর কুদরতি' নজরে আসে না। এটা বড়ই আশ্চর্যের কথা। অবশ্য এই শ্রেণীর যুবকদের ওস্তাদগণ কুরআনে বর্ণিত আম্বিয়াগণের মু'জিযাকেও অস্বীকার করেন।
সহীহ বুখারীর অনুবাদক মাওলানা আজিজুল হক সাহেব বলেন, 'বহু সমালোচিত পণ্ডিত আক্রম খাঁ মরহুম....... শ্রেণীর লোকদের একটি বাতিক রোগ আছে যে, কোরআন-হাদীছে বর্ণিত কোন অলৌকিক ঘটনাকে তাঁহারা অলৌকিক ও অসাধারণ রূপে গ্রহণ করিতে চান না, এই নীতি অনুসারেই পণ্ডিত সাহেব পবিত্র কোরআনে নবীগণের “মোজেযা” স্বরূপ যত ঘটনার উল্লেখ আছে সবগুলিকেই বিকৃত রূপ দান করিয়া পবিত্র কোরআনের অপব্যাখ্যা করিয়াছেন। এই ঘটনায় ত দেখা যায়, পণ্ডিত সাহেব আল্লাহর কুদরত সম্পর্কেও তদ্রূপ ঈমানই পোষণ করেন---সেখানেও তিনি কোন অলৌকিক অসাধারণ বিষয়কে স্থান দিতে রাজি নহেন। নাউযু বিল্লাহি মিন যালিকা---এইরূপ ধারণা হইতে আমরা আল্লাহ তাআলার আশ্রয় চাই।' (বাংলা বোখারী শরীফ ৪/১০৩)
'মোস্তফা চরিত সঙ্কলকের স্বভাবগত কুঅভ্যাসই ইহা যে, যাহা তাহার মনঃপূত না হইবে তাহাকে “গল্প” বলিয়া আখ্যা দিবে, যদিও তাহা জগতভরা ইতিহাসের পাতায়, এমনকি হাদীছ গ্রন্থেও বিদ্যমান থাকে।' (ঐ ৫/৬২)
'মোস্তফা চরিত গ্রন্থের সঙ্কলক মরহুম আকরম খাঁ সাহেবের দুর্ভাগ্য---যখনই নবীগণ সম্পর্কে কোন অসাধারণ অস্বাভাবিক (অসম্ভব নয়) ঘটনার উল্লেখ আসিয়াছে, তখনই তাঁহার পেটে ব্যথা সৃষ্টি হইয়াছে এবং উদরাময়গ্রস্তের ন্যায় বেসামালরূপে নানা পচা-গলা, মল-ময়লার উদ্গিরণ আরম্ভ করিয়াছেন।' (ঐ ৫/৬৯)
এই জন্যই 'মোস্তফা চরিত' বইটির জন্য বলা হয়েছে 'পবিত্র নামের অপবিত্র বই'। (ঐ ৬/১০১)
আমরা এখানে একটি কথা বলে রাখি যে, আমরাও যুক্তিকে অগ্রাহ্য করি না। তবে অহীর উপর আমরা যুক্তিপ্রদর্শনের দুঃসাহসিকতা করি না। অহীর বাণী আমাদের জ্ঞানে না ধরলে আমাদের জ্ঞানকে ছোট মনে করি।
দলীল না থাকলে যুক্তির আশ্রয় অবশ্যই নিতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ মহানবী ﷺ-এর ইসরা ও মি'রাজ ভ্রমণকে আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু ২৭ বছর অতিবাহিত হওয়ার কথা বিশ্বাস করি না। এ কথা অবিশ্বাস করার ফলে এক ইয়াহুদীর পানিতে গোসল করার জন্য ডুবে নারী হয়ে তার তিন সন্তান হওয়ার পর পুনরায় ডুবে সেই পূর্বেকার পুরুষ হয়ে যাওয়ার কথা আমরা অবিশ্বাস করি। কারণ, এর কোন সহীহ দলীল নেই এবং তা যুক্তিরও অগ্রাহ্য। উজ বিন উনুকের সমুদ্রে মাছ ধরে সূর্যের তাপে ভুনে খাওয়ার কথাও আমরা বিশ্বাস করি না। ইত্যাদি।
কুরআন একটি চিরন্তন মু'জিযা। এ মু'জিযার মর্তবা বয়ান করা দোষের কি? মহানবী ﷺ আমাদের জন্য মহাদান, তা বলে কি তাঁর মর্তবা বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই? নামায ফরয বলে কি তার ফযীলত বর্ণনা করা দোষের হবে? সমস্ত মঙ্গলামঙ্গলের মালিক আল্লাহ। তা বলে কি চিকিৎসা অবৈধ? যে চিকিৎসার অনুমতি রয়েছে শরীয়তে, সে চিকিৎসা করা অবৈধ নয়। কুরআনী আয়াত দ্বারা ঝাড়ফুঁক ক'রে চিকিৎসা অবৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন,
{ وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفاء وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا }
অর্থাৎ, আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও করুণা, কিন্তু তা সীমালংঘনকারীদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে। (সূরা বানী ইস্রাঈল ৮২ আয়াত)
কুরআন মানুষের হার্দিক, দৈহিক ও বিশেষ ক'রে মানসিক রোগের আরোগ্য। বিজ্ঞানও স্বীকার করেছে ঝাড়ফুঁক দ্বারা বিশেষ ক'রে মানসিক রোগের চিকিৎসায় উপকারিতার কথা।
যদি বলেন, অনেক সময় কাজ হয় না তো। আমরা বলব, সব সময় কাজ তো ওষুধ দ্বারাও হয় না। আর ঝাড়ফুঁক তো দুআর মত। দুআ যেমন সব সময় কবুল হয় না, অনুরূপ কোন কারণে ঝাড়ফুঁকও সব সময় কাজ না করতে পারে। তা বলে তা অস্বীকার তো করা যায় না। সহীh হাদীসে যখন সে চিকিৎসার কথা এসেছে, সূরা নাস-ফালাক যখন ঝাড়ফুঁকের পটভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তখন বস্তুবাদীদের এ অস্বীকার কেন? সিংহভাগ আলেমই কুরআন দিয়ে জীবিকা অর্জন করছেন বলে হিংসা হচ্ছে না তো?
অবশ্যই কুরআন দিয়ে জীবিকা অর্জন বৈধ নয়, কুরআনী আয়াত দিয়ে তাবীয, লকেট, বোর্ড বানিয়ে লটকানো ও টাঙ্গানো বৈধ নয়, কুরআন কেবল ফুঁ দেওয়ার গ্রন্থরূপে অবতীর্ণ হয়নি---এ কথা ঠিকই, কিন্তু যা শরয়ীভাবে বৈধ, তা অবৈধ ঘোষণা করা বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদীদের কাজ, নাকি আলেম-মুফতীদের কাজ? ইসলাম যুক্তির ধর্ম মানে এই নয় যে, যে যুক্তি দিয়ে নামায-রোযা উড়িয়ে দেবে, তার যুক্তিও মান্য হবে। তাছাড়া উলামা-মুহাদ্দিসীনদের যুক্তিও তো যুক্তি। কুরআনের উক্তির উপর যেমন জোর দেওয়া যায়, তেমনি সহীh হাদীসের উক্তির উপরে জোর দেওয়াও তো অযুক্তিকর নয়। আর কেবল দাবী ক'রে কোন হাদীসকে 'জাল' বা ভিত্তিহীন' বলে উড়িয়ে দেওয়াও যুক্তির কথা নয়।
আপনাকে আপনার বাড়ি থেকে বের ক'রে দিয়ে সে বাড়িতে বসে যদি কেউ বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে দাবী করে যে, সে বাড়িটা তার, তাহলে যুক্তি দিয়ে কি আপনার বাড়িটা দখল করা যাবে? আপনার কাছে দলীল-পর্চা থাকলে ঐ জবরদখলকারীর সমস্ত যুক্তি কি শুকতি হয়ে বাতাসে উড়ে যাবে না?

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 চন্দ্র দ্বিখণ্ডন

📄 চন্দ্র দ্বিখণ্ডন


মুহাদ্দিস কাযী ইয়ায (রঃ) তাঁর শিফা নামক গ্রন্থে বলেন, 'চন্দ্ৰ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ব্যাপারটি কুরআনের স্পষ্ট উক্তি দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন তা ঘটেছে বলে সংবাদ দিয়েছে। দলীল ছাড়া এর বাহ্যিক অর্থ বর্জন করা যাবে না। আর (নবুঅতকালে) ঘটনার সন্দেহ নিরসন ক'রে বহুধাসূত্রে বহু সহীহ হাদীস এসেছে। সুতরাং দ্বীনের বন্ধন শিথিলকারী কোন অপদার্থ মতভেদ আমাদের সুদৃঢ় প্রত্যয়কে দুর্বল করতে পারবে না। সেই বিদআতীর প্রলাপোক্তির প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা যাবে না, যে দুর্বল মু'মিনদের হৃদয়ে সন্দেহ প্রক্ষেপ করে। বরং আমরা তাকে এই প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী হতে বাধ্য করব এবং তার প্রলাপকে ফাঁকা মাঠে ছুঁড়ে ফেলব।' (আশ্-শিফা ১/১৮৩, নাযমুল মুতানাসির ২১১পৃঃ)

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 দাজ্জাল

📄 দাজ্জাল


কিয়ামত আসবে, তার পূর্বে দাজ্জাল বলে একটি লোক আসবে এবং ইয়াহুদীদের নেতা হবে---এ কথা বিশ্বাস করলে কি ইসলাম যুক্তিহীন হয়ে যাবে?
নূর আলম বলেন, 'এর সকল বর্ণনাই অসঙ্গতিপূর্ণ ও ভিত্তিহীন।' (তত্ত্ব... ১২পৃঃ) যে কথা মুহাদ্দিসীনগণ বলেননি, সে কথা অনুবাদ পড়ে বলে দিলেন! এটিও যেন এক অলৌকিক ও অসাধারণ ধারণা!
ইবনে সাইয়াদ ও দাজ্জাল একই লোক নয়, মদীনার একটি লোককে দাজ্জাল ধারণা করা হয়েছিল মাত্র। সুতরাং তার আসলত্বে অবিশ্বাস জন্মাবে কেন?
নূর আলম সাহেবের অভিমত, 'ঈসা আঃ ও মূসা আঃ এর সঙ্গে মেহেরাজে অবস্থানরত ছিল দাজ্জাল।' (তত্ত্ব..... ১৪পৃঃ)
আছে কোথাও এক সঙ্গে থাকার কথা? পাঠক লক্ষ্য করুন হাদীসঃ-
رَأَيْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي مُوسَى رَجُلًا آدَمَ طُوَالًا جَعْدًا كَأَنَّهُ مِنْ رِجَالِ شَنُوءَةَ وَرَأَيْتُ عِيسَى رَجُلًا مَرْبُوعًا مَرْبُوعَ الْخَلْقِ إِلَى الْحُمْرَةِ وَالْبَيَاضِ سَبِطَ الرَّأْسِ وَرَأَيْتُ مَالِكًا خَازِنَ النَّارِ وَالدَّجَّالَ فِي آيَاتِ أَرَاهُنَّ اللَّهُ إِيَّاهُ { فَلَا تَكُنْ فِي مَرْيَة من لقائه }
মহানবী ﷺ বলেন, “যে রাতে আমাকে ইসরায় নিয়ে যাওয়া হয়, সে রাতে আমি মূসাকে দেখি, তিনি ছিলেন দীর্ঘদেহী বাদামী রংবিশিষ্ট ও কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট। ঠিক যেন তিনি শানুআহ গোত্রের লোক। আমি ঈসাকেও দেখলাম, মাঝারি উচ্চতাসম্পন্ন সাদা-লালে মিশ্রিত মধ্যমদেহী এবং মাথার চুল সোজা। দোযখের দারোগা ও দাজ্জালকেও দেখলাম। আল্লাহ সে রাতে যে সকল নিদর্শন দেখিয়েছেন, সেগুলির মধ্যে এ হল কয়েকটি। (আল্লাহ বলেন,) 'সুতরাং তাঁর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে তুমি সন্দিহান হয়ো না।” (বুখারী ৩২৩৯নং)
উক্ত বর্ণনায় কি দাজ্জালকে ভাল লোক অথবা সে মুসা-ঈসার (মেহেরাজের) সাথী লোক বলে প্রমাণিত হচ্ছে? সুতরাং এমন 'তাহকীক’ কি ধোঁকা নয়?
রসূলের সাথে দাজ্জালের তওয়াফের ব্যাপারে যখন বর্ণনা অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হচ্ছে, তখন সহীh হাদীসকে উড়িয়ে না দিয়ে উলামাদের কাছে ব্যাখ্যা নিন। তার কোন সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা খুঁজে বের করুন। যেমনঃ-
১। এটা হল স্বপ্নের কথা। জীবিত ও জাগরণ অবস্থায় সে মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না।
২। তওয়াফ করলেই দাজ্জাল ভাল লোক ধারণা করা ভুল। কারণ মক্কা বিজয়ের পূর্বে কাফের-মুশরিকরাও তওয়াফ করত, বরং উলঙ্গ নারী-পুরুষও তওয়াফ করত।
৩। স্বপ্নে একই সময় ঈসা ও দাজ্জালকে তওয়াফ করতে দেখা গেছে অতএব তাদের আপোসে কোন পার্থক্য নেই---এ ধারণা ভুল। বিধায় নূর আলম কথিত 'গ্রীনরুমে একই পাত্রে নাস্তা খাওয়া এবং স্টেজে এসে পরস্পর যুদ্ধ করার' (তত্ত্ব... ১৪পৃঃ) উদাহরণটি পরিহাস বৈ কিছু নয়।।
আসলে বর্ণনাসমূহকে গঠনমূলক করেন মুহাদ্দিসীনগণ। তাঁরাই বিভিন্ন বর্ণনার বিভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করেন। তাঁদেরকে এড়িয়ে অথবা কলা দেখিয়ে আপনি সরাসরি কুরআন-হাদীস বুঝতে গেলে অধিক বিভ্রান্ত হবেন। আর 'সম্ভবতঃ এই ছিল, মনে হয় এই ছিল' বলে জ্ঞানের আলো ছেড়ে কল্পনা ও ধারণার অন্ধকার জগতে বিচরণ হবে।
নূর আলম সাহেব বলেন, 'দাজ্জালের স্থায়ী ঠিকানা নাই।' (তত্ত্ব... ১৫পৃঃ)
দাজ্জালের স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে কী করবেন? তার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার তো আমাদের দরকার নেই। বরং তার নাম শুনলেই যথাসম্ভব তার কাছাকাছি না হওয়ার চেষ্টা করতে হবে আমাদেরকে; নচেৎ ফিতনায় পড়তে হবে। তবুও হাদীসে বলা হয়েছে, দাজ্জাল খুরাসানে আবির্ভূত হবে। (সিলসিলাহ সহীহাহ ১৫৯১নং) কিন্তু তার আসলত্বের পরিচিতি ও প্রচার হবে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী এলাকায়। (মুসলিম ২ ১৩৭নং)
নূর আলম সাহেবের জিজ্ঞাসা, 'বর্তমানে সে কোথায় আছে?' (তত্ত্ব... ১৫পৃঃ)
বর্তমানে সে রূহের জগতে আছে। পূর্বে যাদেরকে দেখা গেছে তারা দাজ্জাল নয়। মি'রাজ ও স্বপ্নের দেখা, আদম (আঃ)-এর দাউদ, মুহাম্মাদ (আলাইহিমাস সালাম)কে দেখার মত। মহানবী ﷺ-এর অন্যান্য নবীদেরকে দেখার মত, কিছু জাহান্নামী দেখার মত। ইত্যাদি।
নূর আলমের প্রশ্ন, 'তার বয়স কত?' (তত্ত্ব... ১৫পৃঃ)
তার বয়স আপনার-আমার বয়সের মতোই। আদম-হাওয়া ছাড়া দাজ্জালের বয়স এবং অন্যান্য মানুষ সকলের (রূহের) বয়স সমান।
নূর আলমের সিদ্ধান্ত, 'মহান আল্লাহ দুনিয়া দখল করার ক্ষমতা কোন নবী ও রসূলকে দেননি।' (তত্ত্ব... ১৬পৃঃ)---এ কথার দলীল কী? কুরআনের ঐ আয়াত তার দলীল নয়। গায়বী বিষয়ের সাথে সারা দুনিয়ার মালিক হওয়ার সাথ কী?
পরীক্ষা স্বরূপ আল্লাহ দাজ্জালকে সারা দুনিয়ায় স্বাধীনতা দেবেন, দখল করার ক্ষমতা নয়। পরন্তু ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, পূর্বে চার ব্যক্তি দুনিয়ার মালিক হয়েছে। তাদের মধ্যে দু'জন মু'মিন : সুলাইমান ও যুলক্বারনাইন এবং দু'জন কাফেরঃ নমরূদ ও বুখতে নাস্ত্র। (তফসীর বাহরুল মুহীত্ব ৬/১ ১৬ প্রভৃতি)
নূর আলম সাহেব বলেছেন, 'দাজ্জালের কথা কুরআনে আসেনি।' (তত্ত্ব... সংযোজনী ২পৃঃ)
কিন্তু দ্বিতীয় অহীতে যখন সে কথা এসেছে, তখন মু'মিনদের সে কথা মেনে নেওয়া ওয়াজেব। আর মেনে নিতে বাধা কোথায়? এতে তার দ্বীন-দুনিয়ার কোন্ ক্ষতি সাধিত হবে?
আল-কুরআনে তো বহু কিছু আসেনি। তা বলে কি সে সব অস্বীকার করবেন, যদিও তা সহীh হাদীসে এসেছে?
আল-কুরআনে অধিকাংশ নবীর নাম আসেনি, তাহলে তাঁদের প্রতি কি ঈমান রাখবেন না?
আল-কুরআনে মাক্কামে ইব্রাহীমের কথা এসেছে, কিন্তু হাজারে আসওয়াদ ও যমযমের কথা আসেনি, তাহলে কি তার প্রকৃতত্বকে অমান্য করবেন?
আল-কুরআনে তো 'মেহেরাজ' (মি'রাজ) শব্দ আসেনি, তা বলে কি তা অবিশ্বাস করবেন? আপনি যদি বিশ্বাস না করেন, না করতে পারেন। কিন্তু মু'তাযিলা ফির্কার বিশ্বাস আহলে সুন্নাহর ঘাড়ে কেন চাপাতে চান? আকরাম খাঁয়ের আশ্রম থেকে আক্কেলের ঘোড়ায় চড়ে যুক্তির চাবুক মেরে সহীh হাদীস তথা ইসলামের সাহাবা, তাবেঈন, আয়েম্মা, মুহাদ্দিসীন, মুফাস্সিরীন ও হক্কানী উলামার উপর আক্রমণ কেন চালান? ইসলামের দরদে, নাকি ইসলামকে বস্তুবাদের কাছাকাছি করার লক্ষ্যে?
নূর আলম বলেছেন, 'সে .....জন্ম নেবে.... না অবতরণ করবে? এর কোন সুব্যাখ্যা হাদীসে নাই। কাজেই দাজ্জালের বর্ণনাগুলি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।' (তত্ত্ব... সংযোজনী ২পৃঃ)
বাঃ! যুক্তিবাদীদের কী চমৎকার যুক্তি! মুখের জোরে ও কলমের ক্ষুরে উড়িয়ে দিতে পারলেই তো হল। যেহেতু সেই কিয়ামত ছাড়া তার হিসাব নেওয়ার তো কেউ নেই। অথচ কোন বিষয়ের বিশদ বর্ণনা না থাকলেও সহীh দলীলকে ভিত্তি ক'রে তার প্রতি ইজমালী ঈমান আনতে আমরা বাধ্য।
ঐ দেখুন না, 'ইয়া'জুজ-মা'জুজ' ও 'দা-ব্বাতুল আর্য' সম্বন্ধে আমরা বিস্তারিত কিছু জানতে পারি না, তবুও তা কুরআনে এসেছে বলে ঈমান রাখি। অতএব দাজ্জালের কথা সহীh হাদীসে আসার কারণে তার এত সব গায়বী খুঁটিনাটি ব্যাপার যদি না-ই জানতে পারলাম, তাহলে কি তার আগমনের প্রতি ঈমান রাখা জরুরী নয়?

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 ইমাম মাহদী

📄 ইমাম মাহদী


যুক্তিবাদীরা ইমাম মাহদীর আগমনকে অস্বীকার করেছেন, অথচ তা অবিশ্বাস্য বিবেক-বহির্ভূত নয়।
শিয়াপন্থীরাও নিজেদের মতের সমর্থনে বহু হাদীস গড়েছে। কিন্তু ইমাম মাহদীর হাদীস তাদের গড়া নয়। কারণ ঐ ইমাম ও তাদের ইমামের মাঝে নাম ছাড়া অন্য কোন সাদৃশ্য নেই।
নূর আলম বলেন, 'শিয়াদের ইমাম মেহেদী হলেন তাদের ১২তম ইমাম। তাদের মতে তিনি অন্তর্ধান হয়েছেন। তাঁকে জীবিত অথবা মৃত খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের মতে তিনি ফিরে আসবেন।' (তত্ত্ব... ১৭পৃঃ) তাই শিয়ারা সিরদাবের দরজায় তাঁর অপেক্ষা ক'রে প্রত্যহ আশায় থেকে বলে, 'উখরুজ ইলাইনা ইয়া মাওলানা!' (আপনি আমাদের মাঝে আবির্ভূত হন, হে আমাদের সর্দার!) অতঃপর নিরাশ হয়ে ফিরে আসে।
পক্ষান্তরে সহীh হাদীসে যে ইমামের কথা আছে, তিনি জন্ম নেবেন। আহলে বায়ত হযরত ফাতেমার বংশে তাঁর জন্ম হবে। আল্লাহর রসূল ﷺ-এর নাম ও তাঁর নাম এবং উভয়ের পিতার নাম এক হবে। তিনি বড় সুদর্শন পুরুষ হবেন। আল্লাহ তাঁর দ্বারায় ইসলামের সার্বিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ বাদশা হবেন। তখন পৃথিবী শান্তি ও ইনসাফে ভরে উঠবে। যেমন, তাঁর আগে অশান্তি ও যুলমে পরিপূর্ণ থাকবে। (সহীহুল জামে’ ৫ ১৮০নং)
যদি মাহদী, ঈসা ও দাজ্জালের আগমনকে সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে আপনার ঈমান ও ইসলামের কী ক্ষতি হবে? পক্ষান্তরে যদি মেনে না নেন, তাহলে সহীh হাদীসকে অস্বীকার করা হবে। আর তার পরিণাম নিশ্চয়ই শুভ নয়। ইয়া'জুজ-মা'জুজের কথা তো কুরআনে আছে। কিন্তু তার সঠিক হদীস কি পেয়েছেন? যুল-ক্বারনাইনের প্রাচীরের সন্ধান কি লাভ করেছেন? সুতরাং গায়বী বিষয়ে গায়বীভাবে ঈমান রাখতে দোষ কি? বস্তুবাদী হঠকারী ছাড়া সহীh প্রমাণ থাকতেও কোন মুসলিম কি তা অস্বীকার করে? ভবিষ্যতে একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশা আগমন করবেন---এই বিশ্বাসে কি ইসলাম অযৌক্তিক হয়ে যায়?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00