📄 দ্বীনকে বাঁচিয়ে রাখায় মাদ্রাসার ভূমিকা
মাদ্রাসা সমাজের দ্বীন-দরদী মুসলিমদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে চালানো হয় মুসলিমদের যাকাত-ফিতরা ও দান দিয়ে। যেগুলিকে চালানো দরকার ছিল মুসলিম রাষ্ট্রকে। সে ব্যবস্থা না থাকার ফলে মাদ্রাসারই মুদারিস-তালেবে ইল্মরা চাইতে যায়। তাতে তারা কত লাঞ্ছনার শিকার হয়, তার ইয়ত্তা নেই। চাঁদা নয়; (পার্টি বা গান-বাজনার জন্য) চাঁদা চাইতে কোন লজ্জা নেই, দিতেও কুণ্ঠা নেই। কিন্তু মুশকিল হল, মাদ্রাসার জন্য কিছু চাইতে যাওয়া, কারণ তা হল ভিক্ষা (?) করা।
এই শ্রেণীর মাদ্রাসা-শিক্ষিত নাদুস-নুদুস চেহারা দেখে কতক আধুনিক শিক্ষিত ব্যর্থ যুবকের গায়ে হিংসার জ্বালা ধরে। 'মূর্খ'দেরকে ইমামতি করতে, সমাজের নেতৃত্ব দিতে ও লেকচার দিতে দেখে ঈর্ষায় ফেটে পড়ে। ফলে শতমুখে তাঁদের সমালোচনা করে। তাঁরা তাদের দ্বারে এলে শতমুখী দিয়ে পারলে বিদায় করে!
অধিকাংশ আলেম মূর্খ হলেও নীতি-নৈতিকতায় ভাল। কেউ আদর্শচ্যুত হলে সে কথা ভিন্ন। আরবী ভাষা আয়ত্ত করতে না পারলেও দ্বীন, ইবাদত ও চরিত্র আয়ত্ত করে। কোন মাদ্রাসা দ্বারা বছরে অথবা বিশ বছরে যদি একটি আলেম হয়, তাই যথেষ্ট।
মনুষ্যমেধা নষ্ট হয়? বিজ্ঞানী হতে পারেন না? খোঁড়া আলেম হলেও তাঁর আমল-আখলাক ঠিক থাকে। যুক্তিবাদী না হতে পারলেও আল্লাহবাদী হন, আর তাই তাঁর ইহকাল পার ক’রে পরকালের জন্য যথেষ্ট। আসল লাভ-নোকসান তো পরকালের খাতায়।
প্রবীর ঘোষের হাওয়ালায় সমাজের আলেম-উলামাকে মূর্খ বলে ব্যঙ্গ ও তুচ্ছ করা কোন মুসলমানের কাজ নয়। 'মাদ্রাসা কেন্দ্রিক শিক্ষা মুসলিম সমাজকে প্রতারণা করছে' (তত্ত্ব... ১১পৃঃ)---এ কথাও কোন ন্যায়পরায়ণ মানুষের নয়।
মাদ্রাসা-শিক্ষা কেবল আরবী বলার জন্য নয়। স্কুলের সবাই কি ইংরেজী বলতে পারে? সবাই কি ভাল ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে? সব বাঁশে কি বংশলোচন হয়?
মাদ্রাসা শিখায় ধর্ম ও নৈতিকতা, যেমন লেখক বলেছেন, 'ইসলাম ধর্ম টিকে আছে এ সকল আলেমদের অবদানের জন্যই।' (তত্ত্ব... ১১পৃঃ) তাহলে প্রতারণা কী ক'রে হল?
অবশ্য প্রতারক ও ধর্ম-ব্যবসায়ী যে আছে---সে কথা অস্বীকার করছি না।
যাঁরাই কুরআন নিয়ে গবেষণা করেছেন, যাঁদের প্রতি (তত্ত্ব.....৭ পৃষ্ঠায়) 'মাদ্রাসায় পড়ে মনুষ্যমেধা নষ্ট করেননি' বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তাঁরা কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি কৃতজ্ঞ। যেহেতু তাঁরা গবেষণার যে রসদ পেয়েছেন, তা মাদ্রাসা শিক্ষারই ফসল।
প্রতিভাধর ডঃ যাকির নায়েক সাহেব বহু কিছু জানেন, কিন্তু অনেক কিছু জানেন না। তাঁর দ্বারা কি দ্বীনের সবকিছুর সমাধান পাওয়া যাবে? কোন ফতোয়া জিজ্ঞাসা করলে কেন তিনি বলেন, 'উলামা সে পুছো। ম্যাঁয় তালেবে ইল্ম হুঁ'?
পক্ষান্তরে আরবী ভাষা? 'আরবী পারবি তো পারবি, না হয় হেগে-মুতে ছাড়বি।' 'ছিঁচরাতুল ফার্কিচ্ছুহা'র মত নয়। আরবী বলতে পারা বড় কঠিন। সরকারী মাদ্রাসার কথা বলছি না, বেসরকারী মাদ্রাসায় যেভাবে আরবী পড়ানো হয়, তাতেও একটি আরবী শুদ্ধ বাক্য বলতে হিমসিম খেতে হয়---সে কথা আমরা জানি।
আমি বাংলা পড়েছি, ইংরেজী পড়েছি, হিন্দী পড়েছি, উর্দু পড়েছি, ফারসী পড়েছি, আরবী পড়েছি। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পেয়েছি আরবীকে। আরবীতে কথা বলা সহজ নয়। যে সকল প্রবাসী এখানে কাজের জন্য আসে, তারাও আরবী বলে। কিন্তু সে আরবীর নাম 'আরাবিয়াতু বাতহা।' অর্থাৎ, রাজধানী রিয়াযস্থ বাতহা মার্কেটের আরবী। যে মার্কেটে প্রায় সবাই বাইরের লোক। আর তারা যে আরবী বলে, তা বড় সহজ।
উদাহরণ স্বরূপঃ বাংলায় ১জন ছেলে ও মেয়ে (এসেছে), ২জন (এসেছে), ৩জন (এসেছে)। বাতহার আরবীও অনুরূপ বাংলার মতইঃ ১জন ছেলে ও মেয়ে (ইজি), ২জন (ইজি), ৩জন (ইজি)। অথচ বর্তমান-ভবিষ্যতের জন্যও ঐ (ইজি) বলা হয়। সুতরাং তাদের জন্য ঐ আরবী ইজি। কিন্তু শুদ্ধ আরবী হলঃ ১জন ছেলে (জা-আ), ২জন (জা-আ-), ৩জন (জা-উ)। ১জন মেয়ে (জা-আত), ২জন (জা-আতা), ৩জন (জি'না)। আর এইভাবে প্রত্যেক ক্রিয়া নারী-পুরুষ, কাল ও বচনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণ হবে। অতএব এ ভাষা আয়ত্ত করা সহজ নয়।
হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের ত্রুটি আছে---সে কথা স্বীকার করতে দোষ নেই। যেমনঃ
আমরা আমাদের (বিশেষ ক'রে বাংলার) মাদ্রাসাগুলোতে আরবী পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় না। আমরা হিন্দুস্তানের মানুষ হিন্দী-উর্দু মাদ্রাসার সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য উর্দু মিডিয়াম ক'রে পড়ে থাকি। আগে ছিল এখনও হয়তো কোথাও কোথাও থেকে থাকবে, আরবী গ্রামার ফারসী ভাষায়, তার অনুবাদ উর্দুতে। ফলে নিজের ভাষায় ছাত্ররা আরবী বুঝতে পারে না। আর তার ফলে অনেক মার খেতে হয়।
পক্ষান্তরে ইংরেজী মিডিয়ামের মত যদি আরবী মিডিয়াম মাদ্রাসা করা যেত, তাহলে আরবী শুদ্ধ বাক্য বলা সহজ করা যেত। পক্ষান্তরে সরকারী মাদ্রাসাগুলোতে যে অন্যান্য সকল বিষয় আছে, তার চাপে আরবী আয়ত্ত করা কার সাধ্য?
এ কথাও অনস্বীকার্য যে, প্রাতিষ্ঠানিক কোন স্কুল-মাদ্রাসায় না পড়ে অথবা তত উচ্চ ক্লাশে না পড়ে অনেকে কবি-লেখক-বৈজ্ঞানিক হয়েছেন। কিন্তু তা হল প্রতিভা। ডঃ যাকির নায়েক সাহেবও একজন প্রতিভাধর।
তাছাড়া স্কুল-মাদ্রাসা 'রত্ন' তৈরী করে না, 'রত্ন'রূপে তৈরী হওয়ার পথ দেখায় মাত্র। অতিরিক্ত নিজস্ব প্রচেষ্টা ও স্টাডি না থাকলে কেউ 'রত্ন' হতে পারে না।
আবার প্রত্যেক শিক্ষার একটা লক্ষ্য থাকে। সেই লক্ষ্য অনুযায়ী ছাত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এখন চাকরি যদি কেবল সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে হয়, তাহলে তাই ধান্দা হবে ছাত্রের। আর চাকরি যদি আরবী বলার উপরে হয়, তাহলে আরবী বলতে পারবে ছাত্র। একে তো তাদের চাকরি নেই, তাতে আরবী বলার শর্ত নেই। তাহলে কেন বৃথা মেহনত করবে ছাত্রেরা? ধর্মকর্ম তো আরবী বলতে না পারলেও হবে; পড়ে মানে বুঝতে পারলেই তো যথেষ্ট।
আর এ কথাও ঠিক যে, অনেক আলেম জাহেল হয়েই থেকে যায়; তারা না আরবী শিখতে পারে, আর না বাংলা। অবশ্য দ্বীনদারী শেখে, আখলাক-চরিত্র শেখে। আর সেটাও তো বড় লাভ। পক্ষান্তরে স্কুলে পড়ে যারা আনপড় থেকে যায়, তাদের এ কূল-ও কূল দু'কূলই যায়।
নিজ মাতৃভাষায় শরয়ী ইল্ম বিতরণ না করতে পারাও একটা ত্রুটি আলেমদের। আর তার জন্য তাঁরা নিজেরা নন; বরং শিক্ষা-ব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী। বাংলার বেসরকারী মাদ্রাসাগুলোতে যদিও বাংলা ইদানীং ঢুকেছে, তবুও তাতে রচনা ও প্রবন্ধ লেখাবার সুষ্ঠু সুব্যবস্থা নেই অথবা সেই শ্রেণীর শিক্ষক নেই।
তবে এ কথাও বলছি না যে, আরবী বলার মত কোন আলেমই নেই। যাঁরা ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে হয়তো কেউ পারেননি। তাবলে হাঁড়ির ভাত দেখার মত, তাঁদের উপর কিয়াস ক'রে 'সারা বাংলার কোন আলেম একটি শুদ্ধ আরবী বাক্য বলতে পারেন না এবং সেহেতু মাদ্রাসা-শিক্ষা মুসলিম সমাজকে ধোঁকা দিচ্ছে' (তত্ত্ব... ১১পৃঃ)---এত বড় কথা বলার আস্পর্ধা রাখি না।
📄 কুরআন কেন অবতীর্ণ হয়েছে?
মোটকথা, যাঁরা মাদ্রাসায় পড়ে মনুষ্যমেধা নষ্ট করেননি, তাঁরা যে কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা ক'রে মনুষ্যমেধার লালন করেছেন, তাতে কিন্তু কুরআনী তথ্য পাননি। বরং কুরআনের অর্থ বুঝার জন্য ঐ মেধা নষ্টকারী কোন-না-কোন মাদ্রাসা-শিক্ষিত লোকের সাহায্য প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে নিতে হয়েছে। এ কথা কোন অবিমৃশ্যকারী অস্বীকার করলেও, তাঁরা নিজেরা সে কথা স্বীকার করেন।
তাছাড়া সে সকল বিদ্যামন্দিরে পড়াশোনা ক'রে যদি কুরআনভিত্তিক যুক্তির সাথে শরয়ী জ্ঞান লাভ হতো, তাহলে আজ মুসলমানদেরকে ভিখেরী বিদ্যালয় খুলে বসে দয়ে পড়া হাতির মত চামচিকের কাছেও এত লাথি খেতে হতো না।
মনুষ্যমেধা নষ্টকারী কোন মাদ্রাসায় না পড়ে অন্য জেনারেল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পড়ে শরীয়তের মুফতী হয়েছেন---আছে কি এমন উদাহরণ?
নূর আলম বলেন, 'ইসলাম নিয়ে নতুন ক'রে ভাবতে হবে।' (তত্ত্ব... ১৪৪পৃঃ) কাদেরকে নিয়ে ভাববেন? যারা অনুবাদ নকল ক'রে তাহকীক করে এবং অনুবাদটা ঠিক কি না তাও জানে না, তাদেরকে নিয়ে? নাকি ধর্মনিরপেক্ষ বা সব-ধর্ম-সমান জ্ঞানকারী তথাকথিত চিন্তাবিদদেরকে নিয়ে?
কুরআন কেন অবতীর্ণ হয়েছে?
কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের ঈমান, জান, মান, জ্ঞান ও ধনকে রক্ষা করার জন্য। মানুষের মান ও হুঁশ বজায় রাখার জন্য। মানবকে মান্যবর করার জন্য। কুরআন যেমন মৃতব্যক্তির জন্য, জীবিত ব্যক্তির তাবীয বানাবার জন্য অবতীর্ণ হয়নি, তেমনি কমপিউটার বা রকেট বানাবার জন্যও অবতীর্ণ হয়নি।
কুরআনের সাথে বিজ্ঞানের সামঞ্জস্য সাধন ক'রে কোন অনুবাদ বা ব্যাখ্যা করা ভুল। কারণ বিজ্ঞান আজ যে তথ্য বলে, কাল তা ভুল প্রমাণ করে। আর তাতে কুরআনও ভুল প্রমাণিত হবে। মাদ্রাসায় পড়া আলেমরা কুরআনের বৈজ্ঞানিক তথ্য ও তত্ত্ব না দিতে পারেন, তাঁরা তো সেই তথ্য ও তত্ত্ব পরিবেশন করেন, যার জন্য কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
{ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنزَلَ عَلَيْكُمْ مِّنَ الْكِتَابِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُم بِهِ }
অর্থাৎ, তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ও কিতাব এবং প্রজ্ঞা (সুন্নাহ) যা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন ও যা দিয়ে তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, তা স্মরণ কর। (সূরা বাক্বারাহ ২৩ ১ আয়াত)
{ شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ}
অর্থাৎ, রমযান মাস, এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। (ঐ ১৮৫ আয়াত)
{إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كبيرًا} (٩) سورة الإسراء
অর্থাৎ, নিশ্চয় এ কুরআন এমন পথনির্দেশ করে, যা সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সৎকর্মপরায়ণ বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরা বানী ইস্রাঈল ৯ আয়াত)
{ وَلَقَدْ صَرَّفْنَا فِي هَذَا الْقُرْآنِ لِيَذَّكَّرُواْ وَمَا يَزِيدُهُمْ إِلَّا نُفُورًا} (٤١) سورة الإسراء
অর্থাৎ, এই কুরআনে বহু কথাই আমি বারবার (বিভিন্নভাবে) বিবৃত করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে; কিন্তু তাতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়। (ঐ ৪১ আয়াত)
{ وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاء وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا}
অর্থাৎ, আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও করুণা, কিন্তু তা সীমালংঘনকারীদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে। (ঐ ৮-২ আয়াত)
{ وَلَقَدْ ضَرَبْنَا لِلنَّاسِ فِي هَذَا الْقُرْآنِ مِن كُلِّ مَثَلٍ لَّعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ} (٢٧) سورة الزمر
অর্থাৎ, আমি এ কুরআনে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছি; যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা যুমার ২৭ আয়াত)
{وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ } (١٧) سورة القمر
অর্থাৎ, নিশ্চয় আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ ক'রে দিয়েছি। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? (সূরা ক্বামার ১৭ আয়াত)
তবে এ কথা অস্বীকার করার নয় যে, কুরআনে বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে। কিন্তু বিজ্ঞান যা প্রমাণ করছে, তার বিপরীত যদি কুরআনে থাকে, তাহলে জানতে হবে যে, হয় বিজ্ঞানের তথ্য ভুল, না হয় আমাদের কুরআন বুঝা ভুল। অনুরূপ হাদীসও।
যতই জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন হোক, মায়ের পেটে কী আছে তা কেউ বলতে পারবে না। অর্থাৎ, গায়বী খবর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আর গায়বী খবর সেই খবরকে বলা হয়, যা বিনা কোন মাধ্যম বা অসীলায় বলা হয়। আল্লাহর নবী ﷺ গায়েব জানতেন না। কিন্তু গায়বের খবর বলতেন। আল্লাহর নিকট থেকে অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়ে অনেক গায়বী খবর বলেছেন। আর যা কোন অসীলা, মাধ্যম বা যন্ত্রের সাহায্যে বলা হয়, তা গায়বী খবর নয়। বর্তমানে কোন যন্ত্রের সাহায্যে ছেলে, মেয়ে, না টিউমার জানতে পারলেও অথবা বীর্যবিন্দুর লিঙ্গ নির্ণয় করতে সক্ষম হলেও কুরআনের ঐ আয়াতের অর্থের কোন পরিবর্তনের দরকার নেই।
মহান আল্লাহর চ্যালেঞ্জ, আসমান-যমীনে কেউ গায়বী (অদৃশ্য) খবর জানে না। (সূরা নাম্ন ৬৫ আয়াত) কিন্তু কোন কিছুর মাধ্যমে জানলে, তা আর গায়বী থাকে না; বরং হাযরী (দৃশ্য) খবর হয়ে যায়। আর তা জানতে কোন বাধা নেই।
আল-কুরআন বিজ্ঞানময় গ্রন্থ, তা নিয়ে রিসার্চ করবেন বৈজ্ঞানিকগণ। কিন্তু কুরআন যে উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা করবেন উলামা ও ফুকাহাগণ। এই ধরুন নামায; নামায নিয়ে গবেষণা ক'রে উলামাগণ বলেন, 'তা হল আল্লাহ ও বান্দার সংলাপ-সেতু। সবচেয়ে বড় ইবাদত নামায।'
জিমন্যাস্টগণ বলবেন, 'নামায একটি সুন্দর ব্যায়াম। এতে ভাল শরীরচর্চা হয়।'
তা হতে পারে, তা বলতে পারেন, কিন্তু নামায এ জন্য নয়। আর শরীরচর্চার উদ্দেশ্যে কেউ নামায পড়লে, তার নামাযই শুদ্ধ নয়।
মনোবিজ্ঞানীগণ অন্য কিছু বলতে পারেন। নামাযে মানসিক উপকারিতার কথা আবিষ্কার করতে পারেন; তা বলে সে উদ্দেশ্য নামাযের নয়।
সমাজবিজ্ঞানীগণ আরো কিছু উপকারিতার কথা বলতে পারেন, আর তাতে তা থাকতে পারে। কিন্তু নামাযের উদ্দেশ্য তা নয়।
তাহলে তা নিয়ে শরয়ী উলামাগণকে তাচ্ছিল্য এবং বৈজ্ঞানিক গবেষকগণকে নিয়ে এত গর্ব কেন? আসল ছেড়ে কি নকল নিয়ে টানাটানি? আধ্যাত্মিকতা ছেড়ে কি বাহ্যিকতা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত? কিন্তু ইসলাম তো সে আনুষ্ঠানিকতা ও আড়ম্বরের ধর্ম নয়। ইসলাম ও কুরআন-সুন্নাহ বিজ্ঞানময়, তা প্রমাণ করতে রিসার্চের দরকার হয় না। কেবল নিজের যা আছে তা নিয়ে আত্মমর্যাদাবোধের দরকার আছে। আমাদেরই যে আছে, সে কথা অন্তরের অন্তস্তলে অনুভূতির প্রয়োজন আছে। মনের ভিতরে যদি বল রেখে বলা হয়, ইসলাম যুক্তির বাইরে নয়, তাহলে নিশ্চয়ই যুক্তি দিয়ে সেই কথার যৌক্তিকতা প্রমাণ করা সহজ, যাকে অমুসলিম ও দুর্বল ঈমানের লোকেরা অযৌক্তিক মনে করে।
তারা যুক্তিবাদী নয়, যারা পরের কথা শুনে ঘরের লোককে সন্দেহ করে। বউয়ের কথা শুনে মা-কে মারধর করে!
📄 মু'জিযা বা অলৌকিক ঘটনা
মহানবী ﷺ মহামানব ছিলেন। তিনি স্বাভাবিক আড়ম্বরহীন জীবন-যাপন করতেন। কাফেররা তাঁকে নবী বলে অস্বীকার করলে অথবা কুরআনকে আল্লাহর কালাম বলে অস্বীকার করলে তিনি মনে মনে মু'জিযা কামনা করতেন। কিন্তু মহান আল্লাহর হিকমত ছিল অন্য কিছুতে, তাই তিনি কোন নবীকে তাঁর চাওয়া অনুপাতে মু'জিযা দান করেননি। তবে যে তিনি তাঁদেরকে মোটেই মু'জিযা দান করেননি---তা নয়। তাঁর যখন ইচ্ছা হয়েছে, তখন তিনি মু'জিযা প্রয়োজনে দান করেছেন। সুতরাং মু'জিযা নবী বা তাঁর বিরোধীর চাওয়া অনুপাতে দেওয়া হয় না; বরং আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমত অনুপাতে নবী মু'জিযা লাভ করেন। আর এটাই হল মু'জিযা ও যাদুর মধ্যে পার্থক্য। যাদু ইচ্ছামত যাদুকর প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু নবী নিজ ইচ্ছামত মু'জিযা প্রদর্শন করতে পারেন না। কুরআনে এ কথা বলা হয়নি যে, মহানবী ﷺ-কে মু'জিযা দেওয়াই হয়নি। তবে কুরআন হতে এ কথা বুঝা যায় যে, তাঁর চাহিদা মোতাবেক তাঁকে তা দেওয়া হয়নি। যেহেতু কুরআনেই আছে, তাঁকে কুরআন ছাড়া অন্যান্য কিছু মু'জিযা দেওয়া হয়েছে।
যেমন কুরআনে আছে চাঁদ দু-টুকরা হওয়ার কথা; যদিও নানা অপব্যাখ্যায় বাস্তববাদীরা তা অস্বীকার করেছেন।
কুরআনে আছে 'ইসরা' (রাত্রি মধ্যে মক্কা থেকে জেরুজালেম) সফরের কথা। মহান আল্লাহ বলেন,
{ سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ} (۱) سورة الإسراء
অর্থাৎ, পবিত্র ও মহিমময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতারাতি ভ্রমণ করিয়েছেন (মক্কার) মাসজিদুল হারাম হতে (ফিলিস্তীনের) মাসজিদুল আক্বসায়, যার পরিবেশকে আমি করেছি বর্কতময়, যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাই; নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা । (সূরা ইসরা ১ আয়াত)
কুরআনে আছে মি'রাজের ইঙ্গিত; যদিও 'মি'রাজ' শব্দ কুরআনে নেই। মহান আল্লাহ বলেন,
مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى (۱۱) أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى (۱۲) وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى (۱۳) عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى (١٤) عِنْدَهَا جَنَّةُ المَأْوَى (١٥) إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى (١٦) مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى (۱۷) لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى ] (۱۸)
অর্থাৎ, যা সে দেখেছে, তার হৃদয় তা অস্বীকার করেনি। সে যা দেখেছে, তোমরা কি সে বিষয়ে তার সঙ্গে বিতর্ক করবে? নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল। সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। যার নিকট অবস্থিত (জান্নাতুল মা'ওয়া) বাসোদ্যান। যখন (বদরী) বৃক্ষটিকে, যা আচ্ছাদিত করার ছিল তা আচ্ছাদিত করল, তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। নিঃসন্দেহে সে তার প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলী দেখেছিল। (সূরা নাজম ১১-১৮ আয়াত)
📄 মহানবী ﷺ-এর জীবনী, মোস্তফা চরিত ও মু'জিযা
যে বাস্তববাদীরা কুরআন ছাড়া কোন মু'জিযাই মহানবী ﷺ-কে দেওয়া হয়নি বলে দাবী করেন, তাঁদের কেউ কেউ আবার এ কথাও বলেছেন, (যেমন নূর আলম সাহেব বলেছেন) 'রসূল সঃ এর মেহেরাজ হয়েছিল এর উপর বিশ্বাস করাটাই হল মোমিনত্বের পরিচয়! কেননা মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম রসূলকে যে কোন ভাবেই তাঁর কুদরতি বিষয়গুলি দেখাতে, শোনাতে এবং বোঝাতে সক্ষম।' (তত্ত্ব......৪৬পৃঃ)
চমৎকার! এটাই তো ঈমানদার যুক্তিবাদীর কথা। আর তাঁর 'মেহেরাজ' সশরীরে না হয়ে স্বপ্নে হলে, কাফেররা অবিশ্বাস করবে কেন? স্বপ্নকে অবিশ্বাস করার মত যুক্তি তো সে যুগে ছিল না। এইভাবে সহীহ হাদীসে বর্ণিত অন্যান্য মু'জিযাকেও বিশ্বাস ক'রে নেওয়াই 'মোমিনত্বের পরিচয়'।
কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, বুখারী-মুসলিম তথা আরো অন্যান্য গ্রন্থের সহীহ হাদীসে রয়েছে আরো বহু মু'জিযার কথা; যা বাস্তববাদীরা চোখ বন্ধ ক'রে ফুঁক দিয়ে ধুলো উড়াবার মত উড়িয়ে দেন এবং অন্ধের ক্ষুর চালাবার মত সে সকল হাদীসকে একবাক্যে 'কল্পিত ও জাল' আখ্যায়িত ক'রে চুল চাঁছার সাথে কানও চেঁছে ফেলেন!
অবশ্য মু'জিযা অস্বীকার করার মূলে কেবল আমাদের বাংলার নবোদ্ভূত যুক্তিবাদীরাই নন, তাঁদের বহু পূর্বে মু'তাযিলা প্রভৃতি গুমরাহ ফির্কা মু'জিযা অস্বীকার ক'রে গেছে এবং তাদেরই তফসীর (যেমন: তফসীর রাযী প্রভৃতি) ও অন্যান্য বই-পুস্তক পড়ে মওলানা আকরাম খাঁ ও তাঁর অনুসারিগণ ইচ্ছামত মু'জিযা অস্বীকার ক'রে চলেছেন।
যেমন ফিরিস্তা, জিন-জগৎ সত্য। গায়বী জগৎকে আমরা বিশ্বাস করি। তেমনি কুরআনে মু'জিযার কথা আছে, তাও আমরা বিশ্বাস করি। কুরআনে কি এ কথা আছে যে, হে মুহাম্মাদ! তোমাকে কুরআন ছাড়া অন্য কোন মু'জিযা দিইনি?
অবশ্য এ কথাও অনস্বীকার্য যে, মু'জিযার নামে অনেক জাল হাদীস বিভিন্ন ইসলামী কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। আর তার মানেই এ নয় যে, মু'জিযা সংক্রান্ত যত হাদীস আছে, সবই জাল। নিশ্চয়ই মু'জিযা ও কারামতের নামে অপ্রমাণিত গাল-গল্প স্বীকৃত নয়।
মহানবী ﷺ-এর জীবনী, মোস্তফা চরিত ও মু'জিযা
নূর আলমী প্রকৃতির যুক্তিবাদীরা সেই সন্দিগ্ধ (?) বুখারী-মুসলিমের হাদীস পেশ ক'রেই বলেন, 'মা আয়েশা বলিয়াছেন, মহানবী ﷺ-এর জীবনাদর্শ ছিল কুরআন। তাঁর জীবনাদর্শ কোরাণের বাইরে কিছু নেই!'
'এই হাদীস মুতাবিক রসূল সঃ এর জীবনাদর্শ কেমন ছিল তা সঠিকভাবে পেতে হলে মূলত কোরাণকেই অনুসরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে উঠেনি। বরং গুটিকয় (!) লেখকের সংগৃহীত তথ্যের উপর চরম নির্ভরশীল হওয়ায় কোরাণের বিপরীত বর্ণনাগুলি চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়নি। বর্তমানে কোরান ও হাদীস ব্যাপকভাবে অনুবাদ হওয়ার ফলে (নাকি মোস্তফা চরিত পড়ে?) আমরা বুঝতে পারছি যে, হাদীস গ্রন্থে অনেক বর্ণনা আছে যা মূলত কোরাণের পরিপন্থী।' (তত্ত্ব... ২.৫পৃঃ)
সুহৃদ পাঠক! আপনি অবশ্যই বুঝতে পারছেন যে, জীবনী ও জীবনাদর্শ এক নয়। হাদীসে বলা হয়েছে, মহানবী ﷺ-এর 'খুলুক' আখলাক বা চরিত্র ছিল কুরআন। হাদীসে 'হায়াত' বা জীবনী কেমন ছিল, তার বর্ণনা দেওয়া হয়নি। যদি 'তাঁর জীবনাদর্শ কোরাণের বাইরে কিছু নেই', তাহলে আবার 'মোস্তফা চরিত' কেন রচিত ও পঠিত হল? কেবল কুরআন পড়লেই তো তাঁর জীবনাদর্শ ও জীবনের খুঁটিনাটি সব পাওয়া যেত।
অনুবাদ হওয়ার আগে বাংলার মানুষ না হয় ধরেই নিলাম 'বুদ্ধ' ছিল। কিন্তু যাঁদের অনুবাদের দরকার নেই, তাঁরা ও তাঁদের আলেম-উলামারাও কি অনুরূপ ছিলেন? নাকি যুক্তিবাদী আধুনিক জ্ঞানচর্চা শুধু সোনার বাংলাতেই শুরু হল।
যাঁরা অনুবাদ সঠিক না ভুল---তাই বুঝেন না, তাঁরা আবার কোরাণের পরিপন্থী হাদীস কিভাবে বুঝতে পারছেন?
মহানবী ﷺ-এর জীবনাদর্শ নয়; বরং জীবনী থেকে 'মু'জিযা'কে মাথার চুল নেড়া করার মত নেড়া ক'রে মুছে দিতে চাওয়া হয়েছে। শুধু ঘটনা অস্বাভাবিক বলে সহীh হাদীসকেও এবং 'যার শিল তারই নোড়া, তারই ভাঙ্গ দাঁতের গোড়া'র মতো বুখারী-মুসলিমের হাদীস দিয়ে বুখারী-মুসলিমের হাদীসকে অস্বীকার করা হয়েছে! এটাই কি আসলে 'লায়ে চেপে লা ঠেলার মত' নয়? অথচ যুক্তিবাদীদের অনেকে আবার কুরআন-ভিত্তিক মু'জিযাকে মানেন এবং তখন 'আল্লাহর কুদরতি' স্বীকার ক'রে যুক্তিকে মুক্তি দেন।
পক্ষান্তরে হাদীসে বর্ণিত হলে, সে মু'জিযা মানেন না এবং তখন 'আল্লাহর কুদরতি' নজরে আসে না। এটা বড়ই আশ্চর্যের কথা। অবশ্য এই শ্রেণীর যুবকদের ওস্তাদগণ কুরআনে বর্ণিত আম্বিয়াগণের মু'জিযাকেও অস্বীকার করেন।
সহীহ বুখারীর অনুবাদক মাওলানা আজিজুল হক সাহেব বলেন, 'বহু সমালোচিত পণ্ডিত আক্রম খাঁ মরহুম....... শ্রেণীর লোকদের একটি বাতিক রোগ আছে যে, কোরআন-হাদীছে বর্ণিত কোন অলৌকিক ঘটনাকে তাঁহারা অলৌকিক ও অসাধারণ রূপে গ্রহণ করিতে চান না, এই নীতি অনুসারেই পণ্ডিত সাহেব পবিত্র কোরআনে নবীগণের “মোজেযা” স্বরূপ যত ঘটনার উল্লেখ আছে সবগুলিকেই বিকৃত রূপ দান করিয়া পবিত্র কোরআনের অপব্যাখ্যা করিয়াছেন। এই ঘটনায় ত দেখা যায়, পণ্ডিত সাহেব আল্লাহর কুদরত সম্পর্কেও তদ্রূপ ঈমানই পোষণ করেন---সেখানেও তিনি কোন অলৌকিক অসাধারণ বিষয়কে স্থান দিতে রাজি নহেন। নাউযু বিল্লাহি মিন যালিকা---এইরূপ ধারণা হইতে আমরা আল্লাহ তাআলার আশ্রয় চাই।' (বাংলা বোখারী শরীফ ৪/১০৩)
'মোস্তফা চরিত সঙ্কলকের স্বভাবগত কুঅভ্যাসই ইহা যে, যাহা তাহার মনঃপূত না হইবে তাহাকে “গল্প” বলিয়া আখ্যা দিবে, যদিও তাহা জগতভরা ইতিহাসের পাতায়, এমনকি হাদীছ গ্রন্থেও বিদ্যমান থাকে।' (ঐ ৫/৬২)
'মোস্তফা চরিত গ্রন্থের সঙ্কলক মরহুম আকরম খাঁ সাহেবের দুর্ভাগ্য---যখনই নবীগণ সম্পর্কে কোন অসাধারণ অস্বাভাবিক (অসম্ভব নয়) ঘটনার উল্লেখ আসিয়াছে, তখনই তাঁহার পেটে ব্যথা সৃষ্টি হইয়াছে এবং উদরাময়গ্রস্তের ন্যায় বেসামালরূপে নানা পচা-গলা, মল-ময়লার উদ্গিরণ আরম্ভ করিয়াছেন।' (ঐ ৫/৬৯)
এই জন্যই 'মোস্তফা চরিত' বইটির জন্য বলা হয়েছে 'পবিত্র নামের অপবিত্র বই'। (ঐ ৬/১০১)
আমরা এখানে একটি কথা বলে রাখি যে, আমরাও যুক্তিকে অগ্রাহ্য করি না। তবে অহীর উপর আমরা যুক্তিপ্রদর্শনের দুঃসাহসিকতা করি না। অহীর বাণী আমাদের জ্ঞানে না ধরলে আমাদের জ্ঞানকে ছোট মনে করি।
দলীল না থাকলে যুক্তির আশ্রয় অবশ্যই নিতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ মহানবী ﷺ-এর ইসরা ও মি'রাজ ভ্রমণকে আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু ২৭ বছর অতিবাহিত হওয়ার কথা বিশ্বাস করি না। এ কথা অবিশ্বাস করার ফলে এক ইয়াহুদীর পানিতে গোসল করার জন্য ডুবে নারী হয়ে তার তিন সন্তান হওয়ার পর পুনরায় ডুবে সেই পূর্বেকার পুরুষ হয়ে যাওয়ার কথা আমরা অবিশ্বাস করি। কারণ, এর কোন সহীহ দলীল নেই এবং তা যুক্তিরও অগ্রাহ্য। উজ বিন উনুকের সমুদ্রে মাছ ধরে সূর্যের তাপে ভুনে খাওয়ার কথাও আমরা বিশ্বাস করি না। ইত্যাদি।
কুরআন একটি চিরন্তন মু'জিযা। এ মু'জিযার মর্তবা বয়ান করা দোষের কি? মহানবী ﷺ আমাদের জন্য মহাদান, তা বলে কি তাঁর মর্তবা বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই? নামায ফরয বলে কি তার ফযীলত বর্ণনা করা দোষের হবে? সমস্ত মঙ্গলামঙ্গলের মালিক আল্লাহ। তা বলে কি চিকিৎসা অবৈধ? যে চিকিৎসার অনুমতি রয়েছে শরীয়তে, সে চিকিৎসা করা অবৈধ নয়। কুরআনী আয়াত দ্বারা ঝাড়ফুঁক ক'রে চিকিৎসা অবৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন,
{ وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفاء وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا }
অর্থাৎ, আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও করুণা, কিন্তু তা সীমালংঘনকারীদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে। (সূরা বানী ইস্রাঈল ৮২ আয়াত)
কুরআন মানুষের হার্দিক, দৈহিক ও বিশেষ ক'রে মানসিক রোগের আরোগ্য। বিজ্ঞানও স্বীকার করেছে ঝাড়ফুঁক দ্বারা বিশেষ ক'রে মানসিক রোগের চিকিৎসায় উপকারিতার কথা।
যদি বলেন, অনেক সময় কাজ হয় না তো। আমরা বলব, সব সময় কাজ তো ওষুধ দ্বারাও হয় না। আর ঝাড়ফুঁক তো দুআর মত। দুআ যেমন সব সময় কবুল হয় না, অনুরূপ কোন কারণে ঝাড়ফুঁকও সব সময় কাজ না করতে পারে। তা বলে তা অস্বীকার তো করা যায় না। সহীh হাদীসে যখন সে চিকিৎসার কথা এসেছে, সূরা নাস-ফালাক যখন ঝাড়ফুঁকের পটভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তখন বস্তুবাদীদের এ অস্বীকার কেন? সিংহভাগ আলেমই কুরআন দিয়ে জীবিকা অর্জন করছেন বলে হিংসা হচ্ছে না তো?
অবশ্যই কুরআন দিয়ে জীবিকা অর্জন বৈধ নয়, কুরআনী আয়াত দিয়ে তাবীয, লকেট, বোর্ড বানিয়ে লটকানো ও টাঙ্গানো বৈধ নয়, কুরআন কেবল ফুঁ দেওয়ার গ্রন্থরূপে অবতীর্ণ হয়নি---এ কথা ঠিকই, কিন্তু যা শরয়ীভাবে বৈধ, তা অবৈধ ঘোষণা করা বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদীদের কাজ, নাকি আলেম-মুফতীদের কাজ? ইসলাম যুক্তির ধর্ম মানে এই নয় যে, যে যুক্তি দিয়ে নামায-রোযা উড়িয়ে দেবে, তার যুক্তিও মান্য হবে। তাছাড়া উলামা-মুহাদ্দিসীনদের যুক্তিও তো যুক্তি। কুরআনের উক্তির উপর যেমন জোর দেওয়া যায়, তেমনি সহীh হাদীসের উক্তির উপরে জোর দেওয়াও তো অযুক্তিকর নয়। আর কেবল দাবী ক'রে কোন হাদীসকে 'জাল' বা ভিত্তিহীন' বলে উড়িয়ে দেওয়াও যুক্তির কথা নয়।
আপনাকে আপনার বাড়ি থেকে বের ক'রে দিয়ে সে বাড়িতে বসে যদি কেউ বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে দাবী করে যে, সে বাড়িটা তার, তাহলে যুক্তি দিয়ে কি আপনার বাড়িটা দখল করা যাবে? আপনার কাছে দলীল-পর্চা থাকলে ঐ জবরদখলকারীর সমস্ত যুক্তি কি শুকতি হয়ে বাতাসে উড়ে যাবে না?