📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 আল-ইলমুন নূর

📄 আল-ইলমুন নূর


নূর আলম সাহেব লিখেছেন, "আরবীতে একটি প্রবাদ আছে, 'আল-ইলমো ছিঁচরাতুল ফাকিচ্ছুহা।' তার মানে নাকি 'ইসলামী বিদ্যা এক ধরনের ছেঁচড়া গোন্তের মত, যার যেমন দাঁতের জোর, সে তেমনি টেনে খায়।” (তত্ত্ব...২৪পৃঃ)
আজ প্রায় ২২/২৩ বছর আরব দেশে বাস করছি, এই শ্রেণীর কোন আরবী কথা আমাদের জানা-শোনা নেই। হয়তো বা কোন জংলী বেদুঈন বাঙ্গালী-আরবদের ভাষা হবে। তাছাড়া ঐ 'ইয়ারকিমার্কা ফাকিচ্ছুহা' প্রবাদের অর্থ যদি সত্য হয়, তাহলে যার দাঁত নেই অথবা বাঁধানো দাঁত, তার কি ঐ গোন্ত মুখে নিয়ে রোমন্থন করা সাজে?
আসলে ওটি আরবী প্রবাদ নয়। ওর প্রথম শব্দটিই কেবল আরবী। কী জানি, বক্তা সে খবর রাখেন কি না? রাখলে অবশ্যই এটি শরয়ী ইল্মের প্রতি একটি নির্লজ্জ ব্যঙ্গ ও কটাক্ষ। আর তার পরিণাম অবশ্যই ভাল নয়।
পক্ষান্তরে শরয়ী জ্ঞান হল মানুষের জন্য নূর বা আলো। শরয়ী বিদ্যা নবুঅতের মীরাস। “নিশ্চয়ই আলেমগণ নবীগণের ওয়ারেসীন (উত্তরাধিকারী)। নবীগণ না কোন দীনারের উত্তরাধিকার করেছেন, না কোন দিরহামের। বরং তাঁরা ইলমেরই উত্তরাধিকার করে গেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করে সে পর্যাপ্ত অংশ গ্রহণ করে থাকে।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ, ইবনে হিব্বান, বাইহাকী, সহীহ তারগীব ৬৭নং)
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেছেন,
شكوت إلى وكيع سوء حفظي ... فأرشدني إلى ترك المعاصي
وأخبرني بأن العلم نور ... ونور الله لا يُهدى لعاصي
'আমি আমার ওস্তাদ অকী'র নিকট আমার মুখস্থশক্তি দুর্বল হওয়ার অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে পাপাচরণ পরিহার করতে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, 'জেনে রেখো, ইল্ম নূর। আর আল্লাহর নূর কোন পাপাচারকে দেওয়া হয় না।' (আল জওয়াবুল কাফী ৫৪ পৃঃ)

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 দ্বীনকে বাঁচিয়ে রাখায় মাদ্রাসার ভূমিকা

📄 দ্বীনকে বাঁচিয়ে রাখায় মাদ্রাসার ভূমিকা


মাদ্রাসা সমাজের দ্বীন-দরদী মুসলিমদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে চালানো হয় মুসলিমদের যাকাত-ফিতরা ও দান দিয়ে। যেগুলিকে চালানো দরকার ছিল মুসলিম রাষ্ট্রকে। সে ব্যবস্থা না থাকার ফলে মাদ্রাসারই মুদারিস-তালেবে ইল্মরা চাইতে যায়। তাতে তারা কত লাঞ্ছনার শিকার হয়, তার ইয়ত্তা নেই। চাঁদা নয়; (পার্টি বা গান-বাজনার জন্য) চাঁদা চাইতে কোন লজ্জা নেই, দিতেও কুণ্ঠা নেই। কিন্তু মুশকিল হল, মাদ্রাসার জন্য কিছু চাইতে যাওয়া, কারণ তা হল ভিক্ষা (?) করা।
এই শ্রেণীর মাদ্রাসা-শিক্ষিত নাদুস-নুদুস চেহারা দেখে কতক আধুনিক শিক্ষিত ব্যর্থ যুবকের গায়ে হিংসার জ্বালা ধরে। 'মূর্খ'দেরকে ইমামতি করতে, সমাজের নেতৃত্ব দিতে ও লেকচার দিতে দেখে ঈর্ষায় ফেটে পড়ে। ফলে শতমুখে তাঁদের সমালোচনা করে। তাঁরা তাদের দ্বারে এলে শতমুখী দিয়ে পারলে বিদায় করে!
অধিকাংশ আলেম মূর্খ হলেও নীতি-নৈতিকতায় ভাল। কেউ আদর্শচ্যুত হলে সে কথা ভিন্ন। আরবী ভাষা আয়ত্ত করতে না পারলেও দ্বীন, ইবাদত ও চরিত্র আয়ত্ত করে। কোন মাদ্রাসা দ্বারা বছরে অথবা বিশ বছরে যদি একটি আলেম হয়, তাই যথেষ্ট।
মনুষ্যমেধা নষ্ট হয়? বিজ্ঞানী হতে পারেন না? খোঁড়া আলেম হলেও তাঁর আমল-আখলাক ঠিক থাকে। যুক্তিবাদী না হতে পারলেও আল্লাহবাদী হন, আর তাই তাঁর ইহকাল পার ক’রে পরকালের জন্য যথেষ্ট। আসল লাভ-নোকসান তো পরকালের খাতায়।
প্রবীর ঘোষের হাওয়ালায় সমাজের আলেম-উলামাকে মূর্খ বলে ব্যঙ্গ ও তুচ্ছ করা কোন মুসলমানের কাজ নয়। 'মাদ্রাসা কেন্দ্রিক শিক্ষা মুসলিম সমাজকে প্রতারণা করছে' (তত্ত্ব... ১১পৃঃ)---এ কথাও কোন ন্যায়পরায়ণ মানুষের নয়।
মাদ্রাসা-শিক্ষা কেবল আরবী বলার জন্য নয়। স্কুলের সবাই কি ইংরেজী বলতে পারে? সবাই কি ভাল ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে? সব বাঁশে কি বংশলোচন হয়?
মাদ্রাসা শিখায় ধর্ম ও নৈতিকতা, যেমন লেখক বলেছেন, 'ইসলাম ধর্ম টিকে আছে এ সকল আলেমদের অবদানের জন্যই।' (তত্ত্ব... ১১পৃঃ) তাহলে প্রতারণা কী ক'রে হল?
অবশ্য প্রতারক ও ধর্ম-ব্যবসায়ী যে আছে---সে কথা অস্বীকার করছি না।
যাঁরাই কুরআন নিয়ে গবেষণা করেছেন, যাঁদের প্রতি (তত্ত্ব.....৭ পৃষ্ঠায়) 'মাদ্রাসায় পড়ে মনুষ্যমেধা নষ্ট করেননি' বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তাঁরা কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি কৃতজ্ঞ। যেহেতু তাঁরা গবেষণার যে রসদ পেয়েছেন, তা মাদ্রাসা শিক্ষারই ফসল।
প্রতিভাধর ডঃ যাকির নায়েক সাহেব বহু কিছু জানেন, কিন্তু অনেক কিছু জানেন না। তাঁর দ্বারা কি দ্বীনের সবকিছুর সমাধান পাওয়া যাবে? কোন ফতোয়া জিজ্ঞাসা করলে কেন তিনি বলেন, 'উলামা সে পুছো। ম্যাঁয় তালেবে ইল্ম হুঁ'?
পক্ষান্তরে আরবী ভাষা? 'আরবী পারবি তো পারবি, না হয় হেগে-মুতে ছাড়বি।' 'ছিঁচরাতুল ফার্কিচ্ছুহা'র মত নয়। আরবী বলতে পারা বড় কঠিন। সরকারী মাদ্রাসার কথা বলছি না, বেসরকারী মাদ্রাসায় যেভাবে আরবী পড়ানো হয়, তাতেও একটি আরবী শুদ্ধ বাক্য বলতে হিমসিম খেতে হয়---সে কথা আমরা জানি।
আমি বাংলা পড়েছি, ইংরেজী পড়েছি, হিন্দী পড়েছি, উর্দু পড়েছি, ফারসী পড়েছি, আরবী পড়েছি। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পেয়েছি আরবীকে। আরবীতে কথা বলা সহজ নয়। যে সকল প্রবাসী এখানে কাজের জন্য আসে, তারাও আরবী বলে। কিন্তু সে আরবীর নাম 'আরাবিয়াতু বাতহা।' অর্থাৎ, রাজধানী রিয়াযস্থ বাতহা মার্কেটের আরবী। যে মার্কেটে প্রায় সবাই বাইরের লোক। আর তারা যে আরবী বলে, তা বড় সহজ।
উদাহরণ স্বরূপঃ বাংলায় ১জন ছেলে ও মেয়ে (এসেছে), ২জন (এসেছে), ৩জন (এসেছে)। বাতহার আরবীও অনুরূপ বাংলার মতইঃ ১জন ছেলে ও মেয়ে (ইজি), ২জন (ইজি), ৩জন (ইজি)। অথচ বর্তমান-ভবিষ্যতের জন্যও ঐ (ইজি) বলা হয়। সুতরাং তাদের জন্য ঐ আরবী ইজি। কিন্তু শুদ্ধ আরবী হলঃ ১জন ছেলে (জা-আ), ২জন (জা-আ-), ৩জন (জা-উ)। ১জন মেয়ে (জা-আত), ২জন (জা-আতা), ৩জন (জি'না)। আর এইভাবে প্রত্যেক ক্রিয়া নারী-পুরুষ, কাল ও বচনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণ হবে। অতএব এ ভাষা আয়ত্ত করা সহজ নয়।
হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের ত্রুটি আছে---সে কথা স্বীকার করতে দোষ নেই। যেমনঃ
আমরা আমাদের (বিশেষ ক'রে বাংলার) মাদ্রাসাগুলোতে আরবী পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় না। আমরা হিন্দুস্তানের মানুষ হিন্দী-উর্দু মাদ্রাসার সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য উর্দু মিডিয়াম ক'রে পড়ে থাকি। আগে ছিল এখনও হয়তো কোথাও কোথাও থেকে থাকবে, আরবী গ্রামার ফারসী ভাষায়, তার অনুবাদ উর্দুতে। ফলে নিজের ভাষায় ছাত্ররা আরবী বুঝতে পারে না। আর তার ফলে অনেক মার খেতে হয়।
পক্ষান্তরে ইংরেজী মিডিয়ামের মত যদি আরবী মিডিয়াম মাদ্রাসা করা যেত, তাহলে আরবী শুদ্ধ বাক্য বলা সহজ করা যেত। পক্ষান্তরে সরকারী মাদ্রাসাগুলোতে যে অন্যান্য সকল বিষয় আছে, তার চাপে আরবী আয়ত্ত করা কার সাধ্য?
এ কথাও অনস্বীকার্য যে, প্রাতিষ্ঠানিক কোন স্কুল-মাদ্রাসায় না পড়ে অথবা তত উচ্চ ক্লাশে না পড়ে অনেকে কবি-লেখক-বৈজ্ঞানিক হয়েছেন। কিন্তু তা হল প্রতিভা। ডঃ যাকির নায়েক সাহেবও একজন প্রতিভাধর।
তাছাড়া স্কুল-মাদ্রাসা 'রত্ন' তৈরী করে না, 'রত্ন'রূপে তৈরী হওয়ার পথ দেখায় মাত্র। অতিরিক্ত নিজস্ব প্রচেষ্টা ও স্টাডি না থাকলে কেউ 'রত্ন' হতে পারে না।
আবার প্রত্যেক শিক্ষার একটা লক্ষ্য থাকে। সেই লক্ষ্য অনুযায়ী ছাত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এখন চাকরি যদি কেবল সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে হয়, তাহলে তাই ধান্দা হবে ছাত্রের। আর চাকরি যদি আরবী বলার উপরে হয়, তাহলে আরবী বলতে পারবে ছাত্র। একে তো তাদের চাকরি নেই, তাতে আরবী বলার শর্ত নেই। তাহলে কেন বৃথা মেহনত করবে ছাত্রেরা? ধর্মকর্ম তো আরবী বলতে না পারলেও হবে; পড়ে মানে বুঝতে পারলেই তো যথেষ্ট।
আর এ কথাও ঠিক যে, অনেক আলেম জাহেল হয়েই থেকে যায়; তারা না আরবী শিখতে পারে, আর না বাংলা। অবশ্য দ্বীনদারী শেখে, আখলাক-চরিত্র শেখে। আর সেটাও তো বড় লাভ। পক্ষান্তরে স্কুলে পড়ে যারা আনপড় থেকে যায়, তাদের এ কূল-ও কূল দু'কূলই যায়।
নিজ মাতৃভাষায় শরয়ী ইল্ম বিতরণ না করতে পারাও একটা ত্রুটি আলেমদের। আর তার জন্য তাঁরা নিজেরা নন; বরং শিক্ষা-ব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী। বাংলার বেসরকারী মাদ্রাসাগুলোতে যদিও বাংলা ইদানীং ঢুকেছে, তবুও তাতে রচনা ও প্রবন্ধ লেখাবার সুষ্ঠু সুব্যবস্থা নেই অথবা সেই শ্রেণীর শিক্ষক নেই।
তবে এ কথাও বলছি না যে, আরবী বলার মত কোন আলেমই নেই। যাঁরা ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে হয়তো কেউ পারেননি। তাবলে হাঁড়ির ভাত দেখার মত, তাঁদের উপর কিয়াস ক'রে 'সারা বাংলার কোন আলেম একটি শুদ্ধ আরবী বাক্য বলতে পারেন না এবং সেহেতু মাদ্রাসা-শিক্ষা মুসলিম সমাজকে ধোঁকা দিচ্ছে' (তত্ত্ব... ১১পৃঃ)---এত বড় কথা বলার আস্পর্ধা রাখি না।

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 কুরআন কেন অবতীর্ণ হয়েছে?

📄 কুরআন কেন অবতীর্ণ হয়েছে?


মোটকথা, যাঁরা মাদ্রাসায় পড়ে মনুষ্যমেধা নষ্ট করেননি, তাঁরা যে কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা ক'রে মনুষ্যমেধার লালন করেছেন, তাতে কিন্তু কুরআনী তথ্য পাননি। বরং কুরআনের অর্থ বুঝার জন্য ঐ মেধা নষ্টকারী কোন-না-কোন মাদ্রাসা-শিক্ষিত লোকের সাহায্য প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে নিতে হয়েছে। এ কথা কোন অবিমৃশ্যকারী অস্বীকার করলেও, তাঁরা নিজেরা সে কথা স্বীকার করেন।
তাছাড়া সে সকল বিদ্যামন্দিরে পড়াশোনা ক'রে যদি কুরআনভিত্তিক যুক্তির সাথে শরয়ী জ্ঞান লাভ হতো, তাহলে আজ মুসলমানদেরকে ভিখেরী বিদ্যালয় খুলে বসে দয়ে পড়া হাতির মত চামচিকের কাছেও এত লাথি খেতে হতো না।
মনুষ্যমেধা নষ্টকারী কোন মাদ্রাসায় না পড়ে অন্য জেনারেল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পড়ে শরীয়তের মুফতী হয়েছেন---আছে কি এমন উদাহরণ?
নূর আলম বলেন, 'ইসলাম নিয়ে নতুন ক'রে ভাবতে হবে।' (তত্ত্ব... ১৪৪পৃঃ) কাদেরকে নিয়ে ভাববেন? যারা অনুবাদ নকল ক'রে তাহকীক করে এবং অনুবাদটা ঠিক কি না তাও জানে না, তাদেরকে নিয়ে? নাকি ধর্মনিরপেক্ষ বা সব-ধর্ম-সমান জ্ঞানকারী তথাকথিত চিন্তাবিদদেরকে নিয়ে?
কুরআন কেন অবতীর্ণ হয়েছে?
কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের ঈমান, জান, মান, জ্ঞান ও ধনকে রক্ষা করার জন্য। মানুষের মান ও হুঁশ বজায় রাখার জন্য। মানবকে মান্যবর করার জন্য। কুরআন যেমন মৃতব্যক্তির জন্য, জীবিত ব্যক্তির তাবীয বানাবার জন্য অবতীর্ণ হয়নি, তেমনি কমপিউটার বা রকেট বানাবার জন্যও অবতীর্ণ হয়নি।
কুরআনের সাথে বিজ্ঞানের সামঞ্জস্য সাধন ক'রে কোন অনুবাদ বা ব্যাখ্যা করা ভুল। কারণ বিজ্ঞান আজ যে তথ্য বলে, কাল তা ভুল প্রমাণ করে। আর তাতে কুরআনও ভুল প্রমাণিত হবে। মাদ্রাসায় পড়া আলেমরা কুরআনের বৈজ্ঞানিক তথ্য ও তত্ত্ব না দিতে পারেন, তাঁরা তো সেই তথ্য ও তত্ত্ব পরিবেশন করেন, যার জন্য কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
{ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنزَلَ عَلَيْكُمْ مِّنَ الْكِتَابِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُم بِهِ }
অর্থাৎ, তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ও কিতাব এবং প্রজ্ঞা (সুন্নাহ) যা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন ও যা দিয়ে তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, তা স্মরণ কর। (সূরা বাক্বারাহ ২৩ ১ আয়াত)
{ شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ}
অর্থাৎ, রমযান মাস, এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। (ঐ ১৮৫ আয়াত)
{إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كبيرًا} (٩) سورة الإسراء
অর্থাৎ, নিশ্চয় এ কুরআন এমন পথনির্দেশ করে, যা সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সৎকর্মপরায়ণ বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরা বানী ইস্রাঈল ৯ আয়াত)
{ وَلَقَدْ صَرَّفْنَا فِي هَذَا الْقُرْآنِ لِيَذَّكَّرُواْ وَمَا يَزِيدُهُمْ إِلَّا نُفُورًا} (٤١) سورة الإسراء
অর্থাৎ, এই কুরআনে বহু কথাই আমি বারবার (বিভিন্নভাবে) বিবৃত করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে; কিন্তু তাতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়। (ঐ ৪১ আয়াত)
{ وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاء وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا}
অর্থাৎ, আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও করুণা, কিন্তু তা সীমালংঘনকারীদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে। (ঐ ৮-২ আয়াত)
{ وَلَقَدْ ضَرَبْنَا لِلنَّاسِ فِي هَذَا الْقُرْآنِ مِن كُلِّ مَثَلٍ لَّعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ} (٢٧) سورة الزمر
অর্থাৎ, আমি এ কুরআনে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছি; যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা যুমার ২৭ আয়াত)
{وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ } (١٧) سورة القمر
অর্থাৎ, নিশ্চয় আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ ক'রে দিয়েছি। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? (সূরা ক্বামার ১৭ আয়াত)
তবে এ কথা অস্বীকার করার নয় যে, কুরআনে বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে। কিন্তু বিজ্ঞান যা প্রমাণ করছে, তার বিপরীত যদি কুরআনে থাকে, তাহলে জানতে হবে যে, হয় বিজ্ঞানের তথ্য ভুল, না হয় আমাদের কুরআন বুঝা ভুল। অনুরূপ হাদীসও।
যতই জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন হোক, মায়ের পেটে কী আছে তা কেউ বলতে পারবে না। অর্থাৎ, গায়বী খবর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আর গায়বী খবর সেই খবরকে বলা হয়, যা বিনা কোন মাধ্যম বা অসীলায় বলা হয়। আল্লাহর নবী ﷺ গায়েব জানতেন না। কিন্তু গায়বের খবর বলতেন। আল্লাহর নিকট থেকে অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়ে অনেক গায়বী খবর বলেছেন। আর যা কোন অসীলা, মাধ্যম বা যন্ত্রের সাহায্যে বলা হয়, তা গায়বী খবর নয়। বর্তমানে কোন যন্ত্রের সাহায্যে ছেলে, মেয়ে, না টিউমার জানতে পারলেও অথবা বীর্যবিন্দুর লিঙ্গ নির্ণয় করতে সক্ষম হলেও কুরআনের ঐ আয়াতের অর্থের কোন পরিবর্তনের দরকার নেই।
মহান আল্লাহর চ্যালেঞ্জ, আসমান-যমীনে কেউ গায়বী (অদৃশ্য) খবর জানে না। (সূরা নাম্ন ৬৫ আয়াত) কিন্তু কোন কিছুর মাধ্যমে জানলে, তা আর গায়বী থাকে না; বরং হাযরী (দৃশ্য) খবর হয়ে যায়। আর তা জানতে কোন বাধা নেই।
আল-কুরআন বিজ্ঞানময় গ্রন্থ, তা নিয়ে রিসার্চ করবেন বৈজ্ঞানিকগণ। কিন্তু কুরআন যে উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা করবেন উলামা ও ফুকাহাগণ। এই ধরুন নামায; নামায নিয়ে গবেষণা ক'রে উলামাগণ বলেন, 'তা হল আল্লাহ ও বান্দার সংলাপ-সেতু। সবচেয়ে বড় ইবাদত নামায।'
জিমন্যাস্টগণ বলবেন, 'নামায একটি সুন্দর ব্যায়াম। এতে ভাল শরীরচর্চা হয়।'
তা হতে পারে, তা বলতে পারেন, কিন্তু নামায এ জন্য নয়। আর শরীরচর্চার উদ্দেশ্যে কেউ নামায পড়লে, তার নামাযই শুদ্ধ নয়।
মনোবিজ্ঞানীগণ অন্য কিছু বলতে পারেন। নামাযে মানসিক উপকারিতার কথা আবিষ্কার করতে পারেন; তা বলে সে উদ্দেশ্য নামাযের নয়।
সমাজবিজ্ঞানীগণ আরো কিছু উপকারিতার কথা বলতে পারেন, আর তাতে তা থাকতে পারে। কিন্তু নামাযের উদ্দেশ্য তা নয়।
তাহলে তা নিয়ে শরয়ী উলামাগণকে তাচ্ছিল্য এবং বৈজ্ঞানিক গবেষকগণকে নিয়ে এত গর্ব কেন? আসল ছেড়ে কি নকল নিয়ে টানাটানি? আধ্যাত্মিকতা ছেড়ে কি বাহ্যিকতা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত? কিন্তু ইসলাম তো সে আনুষ্ঠানিকতা ও আড়ম্বরের ধর্ম নয়। ইসলাম ও কুরআন-সুন্নাহ বিজ্ঞানময়, তা প্রমাণ করতে রিসার্চের দরকার হয় না। কেবল নিজের যা আছে তা নিয়ে আত্মমর্যাদাবোধের দরকার আছে। আমাদেরই যে আছে, সে কথা অন্তরের অন্তস্তলে অনুভূতির প্রয়োজন আছে। মনের ভিতরে যদি বল রেখে বলা হয়, ইসলাম যুক্তির বাইরে নয়, তাহলে নিশ্চয়ই যুক্তি দিয়ে সেই কথার যৌক্তিকতা প্রমাণ করা সহজ, যাকে অমুসলিম ও দুর্বল ঈমানের লোকেরা অযৌক্তিক মনে করে।
তারা যুক্তিবাদী নয়, যারা পরের কথা শুনে ঘরের লোককে সন্দেহ করে। বউয়ের কথা শুনে মা-কে মারধর করে!

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 মু'জিযা বা অলৌকিক ঘটনা

📄 মু'জিযা বা অলৌকিক ঘটনা


মহানবী ﷺ মহামানব ছিলেন। তিনি স্বাভাবিক আড়ম্বরহীন জীবন-যাপন করতেন। কাফেররা তাঁকে নবী বলে অস্বীকার করলে অথবা কুরআনকে আল্লাহর কালাম বলে অস্বীকার করলে তিনি মনে মনে মু'জিযা কামনা করতেন। কিন্তু মহান আল্লাহর হিকমত ছিল অন্য কিছুতে, তাই তিনি কোন নবীকে তাঁর চাওয়া অনুপাতে মু'জিযা দান করেননি। তবে যে তিনি তাঁদেরকে মোটেই মু'জিযা দান করেননি---তা নয়। তাঁর যখন ইচ্ছা হয়েছে, তখন তিনি মু'জিযা প্রয়োজনে দান করেছেন। সুতরাং মু'জিযা নবী বা তাঁর বিরোধীর চাওয়া অনুপাতে দেওয়া হয় না; বরং আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমত অনুপাতে নবী মু'জিযা লাভ করেন। আর এটাই হল মু'জিযা ও যাদুর মধ্যে পার্থক্য। যাদু ইচ্ছামত যাদুকর প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু নবী নিজ ইচ্ছামত মু'জিযা প্রদর্শন করতে পারেন না। কুরআনে এ কথা বলা হয়নি যে, মহানবী ﷺ-কে মু'জিযা দেওয়াই হয়নি। তবে কুরআন হতে এ কথা বুঝা যায় যে, তাঁর চাহিদা মোতাবেক তাঁকে তা দেওয়া হয়নি। যেহেতু কুরআনেই আছে, তাঁকে কুরআন ছাড়া অন্যান্য কিছু মু'জিযা দেওয়া হয়েছে।
যেমন কুরআনে আছে চাঁদ দু-টুকরা হওয়ার কথা; যদিও নানা অপব্যাখ্যায় বাস্তববাদীরা তা অস্বীকার করেছেন।
কুরআনে আছে 'ইসরা' (রাত্রি মধ্যে মক্কা থেকে জেরুজালেম) সফরের কথা। মহান আল্লাহ বলেন,
{ سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ} (۱) سورة الإسراء
অর্থাৎ, পবিত্র ও মহিমময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতারাতি ভ্রমণ করিয়েছেন (মক্কার) মাসজিদুল হারাম হতে (ফিলিস্তীনের) মাসজিদুল আক্বসায়, যার পরিবেশকে আমি করেছি বর্কতময়, যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাই; নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা । (সূরা ইসরা ১ আয়াত)
কুরআনে আছে মি'রাজের ইঙ্গিত; যদিও 'মি'রাজ' শব্দ কুরআনে নেই। মহান আল্লাহ বলেন,
مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى (۱۱) أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى (۱۲) وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى (۱۳) عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى (١٤) عِنْدَهَا جَنَّةُ المَأْوَى (١٥) إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى (١٦) مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى (۱۷) لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى ] (۱۸)
অর্থাৎ, যা সে দেখেছে, তার হৃদয় তা অস্বীকার করেনি। সে যা দেখেছে, তোমরা কি সে বিষয়ে তার সঙ্গে বিতর্ক করবে? নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল। সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। যার নিকট অবস্থিত (জান্নাতুল মা'ওয়া) বাসোদ্যান। যখন (বদরী) বৃক্ষটিকে, যা আচ্ছাদিত করার ছিল তা আচ্ছাদিত করল, তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। নিঃসন্দেহে সে তার প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলী দেখেছিল। (সূরা নাজম ১১-১৮ আয়াত)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00