📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 বুখারী-মুসলিমের মর্যাদা

📄 বুখারী-মুসলিমের মর্যাদা


নূর আলমী যুক্তিবাদীরা বলেন, 'যাঁরা উক্ত হাদীস নামক (?) গ্রন্থগুলির মধ্য থেকে জাল-ভুল-যয়ীফ ইত্যাদি বের করেন অথচ তাঁরাই গ্রন্থগুলিকে সহীহ সাব্যস্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এটা বড়ই যুক্তিহীন কর্ম।' (তত্ত্ব......২৩পৃঃ)
বটে যুক্তিবাদী! সোনা থেকে খাদ বের ক'রে খাঁটি সোনা ব্যবহার করা যুক্তিহীন কর্ম? ক্ষেত থেকে আগাছা বেছে ফেলে খাঁটি ফসল ব্যবহার করা অযৌক্তিক কর্ম? নাকি সোনা থেকে খাদ বের ক'রে পুরো সোনাটাও ফেলে দেওয়া যুক্তিহীন কর্ম? ক্ষেত থেকে আগাছা বেছে ফেলে পুরো ফসল বর্জন করা অযৌক্তিক কর্ম? কোন্টা জ্ঞানীদের এবং কোন্টা মূর্খদের কাজ?
নূর আলম সাহেব বলেন, 'ইতিহাস বিষয়ে যদি কোন গ্রন্থের মধ্যে জাল ও ভুল ধরা পড়ে, তাহলে সেই গ্রন্থটি আইনত সহীহ বলে দাবী করার অধিকার হারিয়ে বসে।' (তত্ত্ব... ২৩পৃঃ)
আর যদি ভুল যে ধরেছে, তারই ভুল হয়, তাহলে? সে ভুল যদি ভাঙ্গা যায়, তাহলে?
বুখারী গ্রন্থের যে ভুল যুক্তিবাদীরা বের করেছেন, তা আসলে বহু পূর্বেই ভাঙ্গা হয়েছে। কিন্তু দেখা বা অধ্যয়ন করার তওফীক তো তাঁদের হয়নি। কেবল অনুবাদ পড়ে কি যুক্তিবাদী হওয়া যায়? কুরআনের তফসীর ও হাদীসের শারাহ না পড়ে কি কুরআন-হাদীস বুঝা যায়?
'মূল কোরআন শরীফ ও হাদীছ বুঝিতে সক্ষম নয়, অনুবাদের উপর নির্ভরশীল; অথবা কোরআন-সুন্নাহর কেবল বিভিন্ন অংশ বিশেষের জ্ঞানই শেষ সীমা---এই শ্রেণীর ধার করা বা আংশিক জ্ঞানের পুঁজি লইয়া যাহারা ইজতেহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হয় তাহাদের কার্য অনধিকার চর্চা বৈ আর কিছুই নহে। এই শ্রেণীর অনধিকার চর্চার অভিলাষীদের সতর্ক করার জন্য ইমাম বোখারী (রঃ) পরবর্তী একটি পরিচ্ছেদে ইঙ্গিত করিয়াছেন যে, ঐ শ্রেণীর লোকদের অস্তিত্ব মুসলিম সমাজের জন্য আল্লাহর আযাব বটে।' (বাংলা বুখারী শরীফ ৭/২১৩)
বুখারী উম্মুল কুরআন?
'কোরাণে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু অন্য কোন গ্রন্থকে সহীহ জ্ঞান করলে তা কুরআনের সমকক্ষ বলে জ্ঞান হয়ে যায়---' (তত্ত্ব... ২৪৪পৃঃ) যুক্তিবাদীদের এ যুক্তি অত্যুক্তি ছাড়া কিছু নয়। নবী ﷺ-কে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ বলি, অতঃপর আবু বাক্স (রাঃ)-কে যদি সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবী বলি, তাহলে তাতে কি আবু বাক্সকে নবীর সমান জ্ঞান করা হয়? ইসলামের মনীষীগণ বলেন, 'আস্বাহহুল কুতুবি বা'দা কিতাবিল্লাহি স্বাহীহুল বুখারী।' অর্থাৎ, আল্লাহর কিতাবের পর সবচেয়ে সহীহ গ্রন্থ হল সহীহ বুখারী। যেমন তাঁরা বলেন, 'আফযালুন না-সি বা'দা রাসূলিল্লাহি আবূ বাক্স আস-সিদ্দীক্ব।' অর্থাৎ, আল্লাহর রসূল ﷺ-এর পরে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন আবু বাক্ সিদ্দীক (রাঃ)। তাতে তো কোন প্রকার সমকক্ষতা পরিদৃষ্ট হয় না।
পক্ষান্তরে যে আলেমরা সহীহ বুখারীকে 'উম্মুল কুরআন' বা কুরআনের মা বলেন, (তত্ত্ব... ৩৫পৃঃ দ্রঃ) তাঁরা নিশ্চয় জাহেল অথবা এটি ধারণাপ্রসূত একটি রটনা। কারণ হাদীসে সূরা ফাতিহাকেই উম্মুল কুরআন বলা হয়েছে, অন্য কিছুকে নয়।
বুখারী-মুসলিমের সমালোচনা
এ বিশ্বে এমন কোন কিতাব নেই যার বিষয়ে মানুষ সন্দেহ করেনি, তার সমালোচনা করা হয়নি। স্বয়ং আল্লাহর কিতাবকে মানুষ সন্দেহ করেছে, তার সমালোচনা করেছে। আল্লাহর কিতাবের পর মর্যাদায় রয়েছে দু'টি গ্রন্থ বুখারী ও মুসলিম। এ দুইয়ের সমালোচনা তো হবেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ ব্যাপারে ঘরের চিরাগে ঘর পুড়েছে, অর্থাৎ অমুসলিমদের সাথে সাথ দিয়ে অথবা সায়ে সায় দিয়ে অথবা তাদের সমালোচনার খণ্ডন না করতে পেরে কিছু মুসলিম উলামাও উক্ত গ্রন্থদ্বয়ের সমালোচনা করেছেন!
যাঁরা সহীহায়ন বুখারী-মুসলিমের সমালোচনা করেছেন, তাঁদেরকে আমরা দু'ভাগে ভাগ করতে পারি:-
এক: যাঁরা সহীহায়নের সনদের সমালোচনা করেছেন। আর তাঁদের জবাব ফাতহুল বারী ও শারহে নাওয়াবীতে দেওয়া হয়েছে।
দুই: অধুনা বিশ্বের কিছু আলেম-উলামা, যাঁদের অধিকাংশ বিদআতী, আকলানী, ইবাযী ও শিয়াগণ সহীহায়নের বহু হাদীসকে সরাসরি অস্বীকার করেছেন। কারণ, সে সকল হাদীস তাঁদের মযহাবের, মতের ও আক্কেলের অনুকূলে নয় তাই। আর তাঁদেরই ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে কিছু হিদায়াতী উলামার মাঝেও, ফলে তাঁদের দেখাদেখি প্রাচীনতার মাঝে আধুনিকতা প্রদর্শনের প্রয়াসে সহীহায়নে ভুল ও জাল হাদীস প্রমাণ ক'রে 'হাদীস-বাহাদুর' সাজতে চেয়েছেন!
পাশ্চাত্যের উন্নয়নমুগ্ধ কিছু আলেম তাদের স্বেচ্ছাচারী চিন্তাধারায় প্রভাবান্বিত হয়ে সহীহায়নে নাপাক তীর মারলেও সে তীর উক্ত গ্রন্থদ্বয়ের সুউচ্চ মর্যাদায় পৌঁছবে না। কারণ সে গ্রন্থদ্বয়ের অবস্থান হল আকাশের ঝলমলে তারকার মাঝে। আর সেদিকে থুথু মারলে সে থুথু নিজের গায়ে এসে পড়বে, তার দিকে ধুলো ছুঁড়লে সে ধুলো নিজের চোখে এসে পড়বে।
পক্ষান্তরে সহীহায়নের শ্লীলতাহানি করা নিশ্চয় কোন ছোট অপরাধ নয়, সহীহ সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা নিশ্চয় কোন হাল্কা পাপ নয়। যে সুন্নাহকে মুসলিম উম্মাহ বরণীয় বলে মেনে নিয়ে আমল করছে, সেই সুন্নাহকে তাচ্ছিল্য করা কোন সহজ দুঃসাহসিকতা নয়।
সহীহায়নের মর্যাদার ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর অনুসরণীয় উলামাগণ কী বলেন শুনুনঃ-
হাফেয আবু নাস্ত্র ওয়ায়েলী বলেন, 'আহলে ইল্ম তথা ফুকাহাগণ এ কথায় একমত যে, যদি কেউ কসম ক'রে বলে, 'বুখারীতে যত হাদীস এসেছে, তার সবগুলি সহীহ, নিঃসন্দেহে সেগুলি আল্লাহর রসূল ﷺ-এর মুখনিঃসৃত বাণী, এ কথা সত্য না হলে আমার স্ত্রী তালাক।' তাহলে তার স্ত্রীর তালাক হবে না। (উলূমুল হাদীস ২২পৃঃ)
ইমামুল হারামাইন বলেন, যদি কেউ কসম খেয়ে বলে যে, 'বুখারী-মুসলিমে যত হাদীস এসেছে তার সবগুলি নবী ﷺ-এর উক্তি; তা না হলে আমার স্ত্রী তালাক।' তাহলে তালাক হবে না। যেহেতু উক্ত দুই কিতাবের সহীহ হওয়ার ব্যাপারে মুসলিমদের উলামাগণ একমত। (তাদরীবুর রাবী ১/১৩১-১৩২)
আবু ইসহাক ইসফারাইনী বলেন, 'হাদীস-বিশেষজ্ঞগণ এ ব্যাপারে একমত যে, বুখারী-মুসলিমের 'উসূল' ও 'মতন'-এ যত হাদীস আছে, নিঃসন্দেহে তা সহীহ।' (ফাতহুল মুগীস ১/৪৭)
ইবনে স্বালাহও প্রায় একই কথা বলেন। (দেখুনঃ শারহুন নাওয়াবী ১/১৯)
ইমাম নাওয়াবী বলেন, 'উলামা (রাহিমাহুমুল্লাহ)গণ এ ব্যাপারে একমত যে, কুরআনে আযীযের পর সবচেয়ে বেশী সহীহ কিতাব হল সহীহায়ন বুখারী ও মুসলিম। যেহেতু উম্মাহ (সহীহরূপে) তা বরণ ক'রে নিয়েছে।' (ঐ ১/১৪)
তিনি অন্যত্র বলেন, 'উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, এই কিতাবদ্বয় সহীহ এবং উভয়ের ভিত্তিতে আমল ওয়াজেব।' (তাহযীবুল আসমা অল-লুগাত ১/৭৩)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, 'আকাশের নিচে কুরআনের পর বুখারী-মুসলিম ছাড়া অন্য কোন কিতাব সবচেয়ে বেশী সহীহ নয়।' (মাকানাতুস সহীহায়ন ৬পৃঃ)
হাফেয মুহাদ্দিস আল-আলাঈ বলেন, 'উম্মত এ ব্যাপারে একমত যে, বুখারী ও মুসলিম তাঁদের কিতাব সহীহায়নে সনদসহ যে সকল হাদীস বর্ণনা করেছেন, তার সবটাই সহীহ, তা পুনঃ বিবেচ্য নয়।' (আন-নাক্বদুস সাহীহ, মুলতাক্ব আহলিল হাদীস ৮৮/৪৩৮ দ্রঃ)
শায়খ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী বলেন, 'বুখারী-মুসলিমের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ একমত যে, উভয় গ্রন্থে যে মুত্তাসিল মারফু হাদীস রয়েছে, তা সুনিশ্চিতভাবে সহীহ। উক্ত গ্রন্থদ্বয় গ্রন্থকার পর্যন্ত মুতাওয়াতির। যে ব্যক্তি উভয়ের ব্যাপারে অবজ্ঞা প্রদর্শন করবে, সে ব্যক্তি বিদআতী এবং মু'মিনীনদের পথ ছেড়ে অন্য পথের অনুসারী।' (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ১/২৮৩)
শায়খ আহমাদ শাকের বলেন, 'হাদীস বিষয়ক তাহকীককারী আহলে ইল্ম এবং দলীল দেখে তাঁদের পথ অনুসরণকারীদের নিকট সন্দেহহীন হক কথা এই যে, সহীহায়নের সমস্ত হাদীসই সহীহ। এর মধ্যে কোন একটি হাদীসের মধ্যে কোন খোঁচা মারা বা দুর্বলতার স্থান নেই। অবশ্য দারাকুত্বনী প্রমুখ কিছু হাদীসের হাফেযগণ তার কিছু হাদীসের সমালোচনা করেছেন। আর তা এই অর্থে যে, তাঁরা উভয়ে সহীহর যে শর্তে গ্রন্থ রচনা করেছেন, সেই শর্ত সব হাদীসের ক্ষেত্রে পূরণ হয়নি; অর্থাৎ, সব হাদীসগুলি উচ্চ পর্যায়ের সহীহ নয়। পক্ষান্তরে হাদীস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে কেউ মতবিরোধ করেননি।
সুতরাং রটনাকারীদের রটনা এবং ধারণাকারীদের ধারণা যেন আপনাকে শঙ্কিত না করে যে, সহীহায়নের হাদীস সহীহ নয়।' (আল-বাইসুল হাসীস ২৯পৃঃ)
ইমাম নাওয়াবী (রঃ)-এর অভিমত হলঃ-
১। বুখারী-মুসলিমের হাদীসসমূহকে উম্মাহ সাদরে গ্রহণ ক’রে নিয়েছে।
২। উভয় গ্রন্থের সকল হাদীসের উপর আমল ওয়াজেব।
৩। গ্রন্থ দু'টি কুরআনে আযীমের পর সবচেয়ে বেশী সহীহ গ্রন্থ।
৪। পরবর্তীকালের উভয়ের সনদ নিয়ে কোন প্রকার চিন্তা-গবেষণার কোন প্রয়োজন নেই।
৫। মুতাওয়াতির না হলে উভয় গ্রন্থের হাদীস সুদৃঢ় ধারণা সৃষ্টি করে। (দ্রঃ শারহে মুসলিম ১৪- ১৯পৃঃ)
নূর আলম স্বভাবী যুক্তিবাদীরা বলেন, 'আমাদের মনে রাখা উচিত ছিল যে, (মুহাম্মাদ বিন) ইসমাইল বুখারীও একজন মানুষ ছিলেন, সেহেতু তিনি কখনই নির্ভুল হতে পারেন না।' (তত্ত্ব..... ২৪পৃঃ)
অতএব নির্ভুল, বুদ্ধিমান, বিজ্ঞ যুক্তিবাদীরা তাঁর গ্রন্থকে 'সহীহ' বলে মেনে নেবেন কেন? তা মানলে তো তাঁদের ভ্রান্ততা, অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার পরিচয় হবে!
বুখারীও তো তাঁদের মতই একজন মানুষ। বুখারীর ভুল হতে পারে। তবে তাঁদের ভুল হতে পারে না।
হ্যাঁ, ভুলের ঊর্ধ্বে মানুষ নেই। কিন্তু বুখারী যে সকল কথা নকল করেছেন, তাতে তো আর ভুল থাকতে পারে না। যুক্তিবাদীদের জ্ঞানে ভুল থাকতে পারে, কারণ তাঁরাই বলেন, প্রত্যেক মানুষই ভুল করে। তাহলে ঠনঠনে জ্ঞানের উপর বিশ্বাস ভাল, নাকি সনদ-সম্বলিত একটি 'সহীহ' গ্রন্থের সেই হাদীসের বক্তব্যকে বিশ্বাস করা ভাল, যার বক্তা হলেন তিনি, যাঁর (শরীয়তের ব্যাপারে) কোন ভুল নেই?
সমস্ত সহীh হাদীসের উপর আমল করা এবং যা যুক্তি-বহির্ভূত মনে হয় তার ব্যাখ্যা খোঁজা ভাল, নাকি খেয়াল-খুশী মতো সহীহ-যয়ীফের তমীয না ক'রে যেটা ইচ্ছা সেটাকে মানা এবং যেটা খুশী সেটাকে প্রত্যাখ্যান করা ভাল?
কারা বেশী বুদ্ধিমান, যাঁরা নিজেদেরকে বেশী বুদ্ধিমান মনে করেন এবং হাদীস বুঝতে না পেরে তা প্রত্যাখ্যান করেন তাঁরা, নাকি যাঁরা সহীহ হাদীসের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা রেখে আমল করেন তাঁরা? কারা প্রকৃত ঈমানদার?
নূর আলম সাহেব বলেন, 'কোরাণ বলে কোরাণের প্রতি বিশ্বাস রাখাটাই হল ইমানের কাজ। কোরাণ ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থকে বিশ্বাস করাটা ইমানদারের কাজ নয়।' (তত্ত্ব....৩৫পৃঃ)
কুরআন কোথায় বলেছে যে, কুরআন ছাড়া অন্য কিতাবে বিশ্বাস করো না। কুরআন তো পূর্বেকার সমস্ত কিতাবে ঈমান রাখতে আদেশ করে। আমল রহিত হওয়ার কথা অথবা মানুষ কর্তৃক তা বিকৃত হওয়ার কথা আলাদা। পরম্ভ হাদীসের কিতাবের ব্যাপারে কুরআন বলে,
{ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ}
অর্থাৎ, রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। (সূরা হাশ্র ৭ আয়াত)
আর বুখারী-মুসলিম ইত্যাদি কিতাবে বিশ্বাস ও আস্থা না রাখলে সে আদেশ পালন হবে কিভাবে?
কুরআন বলেছে, তাতে আছে সবকিছুর বর্ণনা। কিন্তু হাদীস নিয়েই সবকিছুর বর্ণনা শামিল আছে। নচেৎ কুরআনে অনেক কিছুর বিস্তারিত বর্ণনা নেই। একটি হাদীসে এ কথা সুস্পষ্ট হবে, ইবনে মাসউদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলতেন, '(হাত বা চেহারায়) দেগে যারা নকশা ক'রে দেয় অথবা করায়, চেহারা থেকে যারা লোম তুলে ফেলে (ভ্রূ চাঁছে), সৌন্দর্য আনার জন্য যারা দাঁতের মাঝে ঘসে (ফাঁক ফাঁক করে) এবং আল্লাহর সৃষ্টি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন ঘটায় (যাতে তাঁর অনুমতি নেই) এমন সকল মহিলাদেরকে আল্লাহ অভিশাপ করুন।'
বনী আসাদ গোত্রের উম্মে ইয়াকুব নামক এক মহিলার নিকট এ খবর পৌঁছলে সে এসে ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বলল, 'আমি শুনলাম, আপনি অমুক অমুক (কাজের) মহিলাদেরকে অভিশাপ করেছেন।' তিনি বললেন, 'যাদেরকে আল্লাহর রসূল ﷺ অভিশাপ করেছেন এবং যার উল্লেখ আল্লাহর কিতাবে রয়েছে তাদেরকে অভিশাপ করতে আমার বাধা কিসের?' উম্মে ইয়াকুব বলল, 'আমি (কুরআন মাজীদের) আদ্যোপান্ত পাঠ করেছি, কিন্তু আপনি যে কথা বলছেন---তা তো কোথাও পাইনি।' ইবনে মসউদ (রাঃ) বললেন, 'তুমি যদি (গভীরভাবে) পড়তে, তাহলে অবশ্যই সে কথা পেয়ে যেতে। তুমি কি এ আয়াত পড়নি?'
{ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا }
অর্থাৎ, রসূল তোমাদেরকে যা(র নির্দেশ) দেয় তা গ্রহণ (ও পালন) কর এবং যা নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক।” (সূরা হাশ্র ৭ আয়াত)
উম্মে ইয়াকুব বলল, 'অবশ্যই পড়েছি।' ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেন, 'তাহলে শোন, তিনি ﷺ ঐ কাজ করতে নিষেধ করেছেন।' মহিলাটি বলল, 'কিন্তু আপনার পরিবারকে তো ঐ কাজ করতে দেখেছি।' ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেন, 'আচ্ছা তুমি গিয়ে দেখ তো।'
মহিলাটি তাঁর বাড়ি গিয়ে নিজ দাবী অনুযায়ী কিছুই দেখতে পেল না। পরিশেষে ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেন, 'যদি তাই হত তাহলে আমি তার সাথে সঙ্গমই করতাম না।' (বুখারী ৪৮৮৬নং, মুসলিম ২ ১২৫নং, আসহাবে সুনান)
বুখারী শরীফে ভুল হাদীস
বুখারী-মুসলিমকে সন্দিগ্ধ কিতাব প্রমাণ করার মানসে সেই পূর্ব যুগেই 'যিনদীক' ও মু'তাযিলারা বেশ কিছু ভুল বের করার চেষ্টা করেছে, তা আসলে ঠিক 'দেখতে লারি চলন বাঁকা'র মতোই। আর সেই যুক্তি নিয়েই চর্বিত-চর্বণ করছেন বর্তমানের যুক্তিবাদীরা। এ ব্যাপারে বুখারীর অনুবাদক মাওলানা আজীজুল হক সাহেব বলেন, “খাঁ মরহুম তাঁহার এই অপচেষ্টার পথ পরিষ্কারে স্থায়ী ব্যবস্থারূপে তাঁহার মোস্তফা চরিত গ্রন্থের সুদীর্ঘ উপক্রমণিকার কয়েকটি পরিচ্ছেদ ব্যয় করিয়াছেন। তাতে তিনি দুইটি জঘন্য বিষ সৃষ্টির চেষ্টা করিয়াছেন। একটি হইল---মুসলিম জাতির গৌরব, ইসলামের শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুরক্ষক, অতন্দ্র প্রহরী কুরআন-হাদীছ বিশেষজ্ঞ পূর্ববর্তী মহান ইমামগণকে শুধু উপেক্ষা ও কটাক্ষ করাই নহে; বরং তাহাদিগকে সমাজের নিকট পরিত্যাজ্য সাব্যস্ত করিবার জন্য অশালীন ভাষা প্রয়োগ করিয়াছেন। আর একটি হইল---মনীষী ইমামগণের জীবন সাধনালব্ধ মূল্যবান জ্ঞান-গবেষণার প্রতিও সমাজের আস্থা ভাঙ্গিয়া দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন।
তিনি তাঁহার দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে মাকালরূপী কতকগুলি যুক্তি সত্যের আবরণীতে ব্যক্ত করিয়াছেন। সেই যুক্তিগুলির ভিতরেও বিষ ঢুকাইয়াছেন অনেক। যদ্বারা তিনি সীমাহীন ধৃষ্টতায় পৌছিয়াছেন যে, তৃতীয় পরিচ্ছেদে পরিষ্কার ভাষায় ইসলাম ও মুসলিম জাতির গৌরব পূর্বতন আলেম এবং ইমামগণ সম্পর্কে বলিয়াছেন- 'বোযর্গানে দ্বীন ও সলফে সালেহীন' বলিয়া মুসলমান সমাজে যেসকল 'তাগুতের' সৃষ্টি করা হইয়াছে, তাহাই হইতেছে সর্বনাশের মূল।
পাঠক! আপনারা ভাবিতে পারেন এবং মরহুম এই ধারণা সৃষ্টির অপচেষ্টা করিয়াছেনও বটে যে, তাঁহার কটাক্ষ ও আক্রোশ শুধু কল্পিত ও ভুয়া বুজুর্গদের সম্পর্কে এবং নবীজী সাঃ-এর জীবনী সংক্রান্ত রচিত অপ্রামাণিক উর্দু, ফার্সী চটি বই-পুস্তক সম্পর্কে সীমাবদ্ধ।
খাঁ মরহুমের পান্ডিত্য ও বাকপটুতার আবরণে অসংখ্য ধোঁকা-ফাঁকির ইহাও একটি। তাঁহার অসার পেঁচালো মন্তব্যসমূহে তিনি ঐরূপ হাবভাব দেখাইয়া এবং ঐ শ্রেণীর শব্দ ব্যবহার করিয়া সমাজের ধিক্কার ও ক্ষোভ হইতে গা-ঢাকা দেওয়ার মতলب করিয়াছেন মাত্র। প্রকৃত প্রস্তাবে তাঁহার উদ্দেশ্যে ঐরূপ সীমাবদ্ধ নহে।
প্রথমতঃ পূর্ব যুগে 'ইমাম' আখ্যার ভুয়া কল্পিত পাত্র ছিল বলিয়া কোন ইতিহাস আমাদের জানা নাই। তবে আলেম ও পীর নামের ভুয়া লোক থাকা স্বাভাবিক। জগতের অন্যান্য শ্রেণীতেও তাহা আছে; যেমন, ডাক্তার, আইনজ্ঞ, বিভিন্ন প্রকাশক ইত্যাদিতেও ভুয়া ব্যক্তি আছে; সেই জন্য তাহাদিগকে শ্রেণীগতভাবে গালি দিয়া তাহাদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টির উক্তি কি ক্ষমার যোগ্য হইবে?.............
দ্বিতীয়তঃ খাঁ মরহুম প্রকৃত প্রস্তাবে ভুয়া ও কল্পিত বুজুর্গ নামীয় চুনোপুঁটি আটকাইবার জন্য সুবৃহৎ উপক্রমণিকার জাল ফেলেন নাই; তিনি ইমাম বোখারী, ইমাম মুসলিমের ন্যায় বড় বড় মোহাদ্দেস, ইসলাম ও মুসলিম জাতির গৌরব---রুই-কাতলা আটকাইবার উদ্দেশ্যে ঐ জাল ফেলিয়াছেন। তিনি উর্দু-ফারসী চটি বই মুছিবার জন্য এত এত পান্ডিত্য ব্যয় করেন নাই। তিনি ৬০০-৭০০ বৎসর হইতে প্রচলিত ৪০০০-৬০০০ পৃষ্ঠায় রচিত সুপ্রসিদ্ধ মোহাদ্দেস ও মোফাসসেরগণের জ্ঞানগর্ভময় জাতীয় সম্পদ ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলীকে উপেক্ষণীয় ও প্রক্ষিপ্ত সাব্যস্ত করার কুমতলব আটিয়াছেন।”
ক্ষোভ ও দুঃখের সীমা থাকিতে পারে কি? খাঁ মরহুম মাকড়সার জালের আশ্রয় লইয়া পাহাড়ের সহিত টক্কর দেওয়ার ন্যায় যেসব ছুতার আঁচল ধরিয়া বোখারী শরীফের হাদীছকে ভুল সাব্যস্ত করিয়াছেন, ঐসব কোনটাই তাঁহার আবিষ্কার নহে। মুসলিম জাতির ঈমানী বিশ্বাসকে শিথিল করিয়া তাহাদের দুর্বল করার সম্ভাব্য চেষ্টারূপে যেসব ছল-ছুতার জন্ম দেওয়া যাইতে পারে, উম্মতের হিতৈষীগণ পূর্ব আমলেই সেই সবের উদ্‌ঘাটন করিয়াছেন এবং বোখারী শরীফের গবেষণাকারীগণ নিজ নিজ রচনায় ঐ সবের ধূম্রজাল ছিন্ন করিয়া গিয়াছেন।
পন্ডিত খাঁ মরহুম কোথাও বিষজনিত ঐ সব ছল-ছুতার খোঁজ পাইয়াছেন; কিন্তু হাদীছ শাস্ত্রে তাঁহার জ্ঞান-গবেষণার দৌড় তাঁহাকে বোখারী শরীফের উল্লিখিত ব্যাখ্যা গ্রন্থসমূহ পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারে নাই। ফলে তিনি ঐ বিষয়ে প্রতিষেধক হইতে বঞ্চিত থাকিয়া গিয়াছেন এবং বাংলাভাষী ভাইদের জন্য ঐ বিষ আমদানী করিয়াছেন। বাংলাভাষী পাঠক ভাইগণ হাদীছ শাস্ত্রের কী জ্ঞান রাখেন যে, তাঁহারা এই বিষয়ে প্রতিষেধক খোঁজ করিয়া বাহির করিবেন? আরও পরিতাপের বিষয়---ভাষা সম্রাট বাক্সটু পন্ডিত খাঁ মরহুম নিজ প্রতিভা দ্বারা বিষকে এমন সুন্দর সাজে সাজাইয়াছেন হাদীছ শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ বাংলাভাষী পাঠক তাহা গলাধঃকরণ করিবেই। সুতরাং খাঁ মরহুম তাঁহার এই অপকর্ম দ্বারা বাংলাভাষী মুসলিম সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি করিয়াছেন; তাহাদের জন্য শুধু বিষের দোকান সাজাইয়া গিয়াছেন।
নবীগণের মোজেযা অস্বীকারের ন্যায় খাঁ মরহুম আরও অনেক সত্যকে অস্বীকার করিতেন। যথা---জ্বিন জাতির অস্তিত্ব, ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পৰ্কীয় অনেক তথ্য; ঈসা আলাইহিস সালামের কোন কোন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি। বোখারী-মুসলিম শরীফ এবং হাদীছ ভান্ডারের অনেক হাদীছ ঐ সত্য অস্বীকার করার অন্তরায় হয়; সে বাধা অপসারণে খাঁ মরহুম বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের ন্যায় মহাগ্রন্থাবলীকে ঘায়েল করার এই অপচেষ্টা করিয়াছেন। এতদ্ভিন্ন খাঁ মরহুমের তফসীর নামে পবিত্র কুরআনের অপব্যাখ্যা এবং 'মোস্তফা চরিত' পাঠ করিলে মনে হয় যেন বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের ন্যায় মহাগ্রন্থসমূহের হাদীছ অস্বীকার ও ভুল সাব্যস্ত করিয়া তিনি বাহাদুরী দেখাইবার স্বাদ অনুভব করিতেন। যেমন, কেহ পিতাকে খুন করিয়া বিশ্ব-রেকর্ড স্থাপন করার আনন্দ উপভোগ করে।
বাংলা বোখারী শরীফ তৃতীয় ও চতুর্থ খন্ডে ঐরূপ কোন কোন হাদীছ অস্বীকার এবং তাহা খন্ডনের বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে। এস্থলে সংক্ষেপে শুধু ঐ হাদীছ সম্পর্কে আলোচনা হইবে যাহা তিনি মোস্তফা চরিতের উপক্রমণিকায় তাঁহার কথিত হাদীছ 'পরীক্ষার নূতন ধারা' পরিচ্ছেদের ভুল হাদীসের নমুনারূপে পেশ করিয়া বলিয়াছেন 'সনদ সহীহ হওয়া সত্ত্বেও ঐ হাদীছগুলি নির্দোষ, প্রকৃত এবং সত্য হাদীছ বলিয়া কোন মতেই গৃহীত হইতে পারে না!'
বোখারী মুসলিম শরীফের হাদীছ সম্পর্কে এই দাবী যে, সত্য হাদীছ বলিয়া কোন মতেই গৃহীত হইতে পারে না; তাহাও নেহাত তুচ্ছ হেতুর অজুহাতে ইহা জঘন্য ধৃষ্টতা বৈ নহে।
খাঁ মরহুমের ভাষায় 'প্রথম প্রমাণ' অর্থাৎ বোখারী ও মুসলিম শরীফে যে ভুল হাদীছ রহিয়াছে তাহার প্রথম প্রমাণ বা নমুনা 'আনাছ রাঃ বলিতেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ ....} (٢) سورة الحجرات
'হে মোমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর আপনাদের স্বর উর্ধ্বে চড়াইও না....।”
এই আয়াতটি নাযিল হইলে সাবেত বিন কায়েস ছাহাবীর খুব ভয় হইল; তাঁহার কণ্ঠস্বর স্বভাবতঃ খুব উচ্চ ছিল। তাই তিনি হযরতের খেদমতে উপস্থিত হন না, বাড়ীতে থাকেন। কয়েক দিন ঐভাবে অতীত হইলে হযরত (সঃ) সাদ বিন মোআয নামক ছাহাবীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সাবেতকে দেখি না কেন, তাহার কি অসুখ হইয়াছে? সা'দ বিন মোআয সাবেতের বাড়িতে গমন করিলেন ও সাবেতকে হযরতের প্রশ্নের কথা জানাইলেন। সাবেত নিজের কণ্ঠস্বর ও সদ্য অবতীর্ণ উক্ত আয়াতের কথা উল্লেখ করিয়া নিজের নরকী হওয়ার আশঙ্কা জানাইলেন। সা'দ বিন মোআয সাবেতের আশঙ্কা প্রকাশ নবীজী সঃ কে জ্ঞাত করিলেন। তিনি বললেন, বরং সে বেহেস্তী।'
খাঁ মরহুমের বক্তব্য, এই হাদীছটি সত্য হইতে পারে না। কারণ, ঘটনায় উল্লিখিত আয়াতটি নবম হিজরীতে নাযিল হয়, আর সা'দ বিন মোআযের মৃত্যু হিজরী পঞ্চম সনে।
পাঠকবর্গ! হাদীছখানাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করার একটি ভিত্তি হইল, হাদীছটির আলোচ্য আয়াত নবম হিজরী সনে নাযিল হইয়াছে---এই বিষয়টি বিতর্কমূলক। প্রসিদ্ধ হাফেযে হাদীছ ইবনে হাজার (রঃ) ভিন্ন মতের অবকাশ দেখাইয়াছেন।
খাঁ মরহুম বোখারী শরীফ তফসীর অধ্যায়ের যে হাদীসের বরাত দিয়াছেন, বোখারী শরীফের উক্ত পৃষ্ঠায়ই হাফেয ইবনে হাজারের অবকাশ প্রকাশের সমর্থন বিদ্যমান রহিয়াছে। বিতর্কমূলক একটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া হাদীছকে অবাস্তব-অসত্য বলা ক্ষমাহীন অপরাধ নহে কি?
আরও একটি বিষয় সুস্পষ্ট হইল যে, ৬০০ শত বৎসর পূর্বে বোখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার হাফেয ইবনে হাজার (রঃ) যে প্রশ্নের খন্ডন করিয়া গিয়াছেন সেই প্রশ্নের মৃত লাশ বাহির করিয়া হাদীছ শাস্ত্রের অভিজ্ঞতাহীন বাংলাভাষী পাঠকদিগকে বিভ্রান্ত করা হইয়াছে---ইহা অপরাধ নহে কি?
হাফেয ইবনে হাজার (রঃ) যে ধারায় প্রশ্নের খন্ডন করিয়াছেন তাহা হাদীছ ও তফসীরের শাস্ত্রীয় অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল। আমরা অন্য একটি সরল সহজ পয়েন্ট পেশ করিতেছি---তাহাও পূর্ব আমলের গবেষকগণই বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন।
আলোচ্য হাদীছখানা বোখারী শরীফের দুই স্থানে ৫১০ ও ৭১৮ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে একই সনদ তথা সাক্ষ্য সূত্রে। মুসলিম শরীফে হাদীছখানা একই জায়গায় পর পর ৪টি সনদে বর্ণিত হইয়াছে। (৩২৯-৩৩২নং হাদীস দ্রষ্টব্য) অতএব হাদীছখানার মোট সাক্ষ্য সূত্র বা সনদ হইল পাঁচটি।
পাঠক! ইহা একটি মহা সত্য যে, হাদীছকে তাহার আসল জায়গায় সরাসরিভাবে গবেষণা না করিয়া শুধু ধার করা জ্ঞানে তথা উদ্ধৃতি বা অনুবাদ দেখিয়া কোন হাদীছ সম্পর্কে মুখ খোলা মহাপাপ। এই মহাপাপের পরিণাম এখানে লক্ষ্য করুন। মরহুম খাঁ সাহেব একজন বিশিষ্ট পন্ডিত ও স্বভাব-জ্ঞানী ছিলেন। তিনি বোখারী শরীফ মূল গ্রন্থ হইতে দূরে থাকিয়া শুধু উদ্ধৃতি দেখার ধার করা জ্ঞানে দূর হইতে ঢিল ছুঁড়িয়াছেন। নতুবা তিনি উল্লিখিত হাদীসের সমালোচনা করিতে বোখারী শরীফের নাম মুখে বা লেখনীতে আনিতেন না। কারণ, তাঁহার সমালোচনার দ্বিতীয় ভিত্তি ছিল হাদীছটির বর্ণনায় সা'দ বিন মোআযের উল্লেখ; যেহেতু তার মৃত্যু হিজরী পঞ্চম সনে। পাঠক শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইবেন যে, বোখারী শরীফের দুই স্থানে হাদীছখানা বর্ণিত, কিন্তু তাহার কোন স্থানেই সা'দ বিন মোআযের নাম নাই। বরং আছে فقال رجل أنا أعلم অর্থাৎ নবীজী (সঃ) সাবেত বিন কায়সের আলোচনা করিলে এক ব্যক্তি বলিল, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার জন্য তাহার সংবাদ জানিয়া আসিব।'
পাঠক! লক্ষ্য করুন---সমালোচনার ভিত্তিটাই যখন বোখারী শরীফের হাদীসে বিদ্যমান নাই, তখন সমালোচনার ক্ষেত্রে এরূপ বলা যে, 'বোখারী ও মুসলিমে একটি হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে’---ইহা কতটুকু ঈমানদারী তাহা ভাবিয়া দেখিবেন।
তারপর আসুন! মুসলিম শরীফের হাদীছ খানার অবস্থা দেখুন! পূর্বেই বলা হইয়াছে, শুধু উদ্ধৃতি দেখার ন্যায় ধার করা জ্ঞানে হাদীছ সম্পর্কে কিছু বলা নিতান্তই অবান্তর। খাঁ মরহুমের সমালোচিত হাদীছখানা মুসলিম শরীফে চারটি সনদ তথা সাক্ষ্যসূত্রে বর্ণিত হইয়াছে। প্রথমে উল্লেখ হইয়াছে ঐ সাক্ষীর বর্ণনা যাহার বর্ণনায় খাঁ মরহুমের সমালোচনার ভিত্তি বস্তু তথা “সা'দ বিন মোআয” নাম বিদ্যমান রহিয়াছে। পাঠক আশ্চর্যান্বিত হইবেন, মুসলিম (রঃ) বিভ্রান্তি হইতে সতর্ক ও হুঁশিয়ার করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে যে ব্যবস্থা রাখিয়াছেন তাহা হইতে খাঁ মরহুম নিজে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকিয়া এবং পাঠককে অজ্ঞ রাখিয়া সেই বিভ্রান্তিতে নিজেও পতিত হইয়াছেন এবং অপরকেও পতিত করার ব্যবস্থা করিয়াছেন। এই কেলেঙ্কারির একমাত্র কারণ হইল মুসলিম শরীফ মূলগ্রন্থ দেখার সৌভাগ্য হইতে বঞ্চিত থাকা।
দেখুন মুসলিম শরীফে বিভ্রান্তি অবসানের কী সুন্দর ব্যবস্থা রহিয়াছে। একটি সাক্ষীসূত্রে ঐ সমালোচনার বস্তু সম্বলিত বিবরণ উল্লেখের সাথে সাথেই ঐ হাদীছটির উপর তিনটি সাক্ষ্যসূত্র বর্ণিত রহিয়াছে। এই সাক্ষীগণের বর্ণনায় স্পষ্ট বলা হইয়াছে,
ليس في حديثه ذكر سعد بن معاذ - لم يذكر سعد بن معاذ.
“এই সাক্ষীর বর্ণনায় সা'দ বিন মোআযের উল্লেখ নাই। এই সাক্ষ্য সা'দ বিন মোআযের নাম উল্লেখ করেন নাই।” (৩২৯-৩৩২নং হাদীস দ্রঃ)
ইমাম মুসলিমের বর্ণনায় প্রতীয়মান হইল যে, মূল হাদীছটির তথ্য অসত্য বা অপ্রকৃত বলা যাইতে পারে না। কারণ, শুধু একজন সাক্ষীর বর্ণনায় একটি নাম উল্লেখের বিভ্রাট থাকিলেও অপর তিনজন সাক্ষীর বর্ণনায় ঐ বিভ্রাটমুক্তি বিদ্যমান রহিয়াছে।
পাঠক! একটি ঘটনা সাব্যস্ত করিতে বাদী যদি পাঁচটি সাক্ষী পেশ করে---সে ক্ষেত্রে বিবাদী একটি সাক্ষীর বর্ণনায় দোষ দেখাইতে পারিলে ঘটনাটি মিথ্যা হইয়া যাইবে? ইমাম মুসলিম বিভ্রান্ত খন্ডনের জন্য প্রথমে বিভ্রাটযুক্ত সাক্ষ্যসূত্র উল্লেখ করিয়াছেন। সঙ্গে সঙ্গেই বিভ্রাটমুক্ত তিনটি সাক্ষ্যসূত্র উল্লেখ করিয়া প্রথমটির দোষ নির্ণয় এবং তাহার খন্ডন করিয়া দিয়াছেন। ইহা কি তাঁহার দোষ হইল?
মুসলিম শরীফের চারি সাক্ষ্যসূত্র এবং বোখারী শরীফের এক সাক্ষ্য সূত্র---এই পাঁচটি সাক্ষ্যসূত্রের একটি সাক্ষীর (মুসলিম শরীফের) বর্ণনায় যে সা'দ বিন মুআযের নাম উল্লেখের বিভ্রাট রহিয়াছে তাহাও অতি নগণ্য। সাহাবীগণের নাম পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাহাবীগণের মধ্যে একজন ছিলেন সা'দ বিন মোআয, আর একজন ছিলেন সা'দ বিন ওবাদাহ।
আলোচ্য হাদীসের ঘটনার ব্যক্তি প্রকৃতপ্রস্তাবে ছিলেন সা'দ বিন ওবাদাহ, যাঁহার মৃত্যু নবীজী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের অনেক পরে। সুতরাং তাঁহার নামের বেলায় কোন প্রশ্নের অবকাশ নাই। এখন ভাবিয়া দেখুন সাহাবীদের যুগে নহে; ইহার পরে; তথা ঘটনার অনেক বছর পরে একজন বিশিষ্ট জ্ঞানবান অতিশয় শ্রদ্ধাভাজন সা'দ নামও ঠিক বলিয়াছেন। শুধু কেবল বিন ওবাদাহ স্থলে বিন মোআয বলিয়া পিতার নাম ব্যতিক্রম বলিয়াছেন। ইমাম মুসলিম উক্ত সাক্ষীর বর্ণনা উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনজন সাক্ষীর বর্ণনা উল্লেখ করিয়া ঐ ব্যতিক্রমটা ধরাইয়াও দিয়াছেন। এখন শুধু ঐ ব্যতিক্রম পুঁজি করিয়া অন্য সব রকম দোষমুক্ত একটি সুদীর্ঘ হাদীসের সর্বময় বিবরণকে অপ্রকৃত ও অসত্য বলা এবং ইমাম মুসলিম কর্তৃক ব্যতিক্রমটা ধরাইয়া দেওয়ার কথা গোপন করিয়া বোখারী-মুসলিমে অসত্য হাদীছ আছে বলা কত দূর ঈমানদারী তাহা সুধীগণ বিচার করিবেন।
খাঁ মরহুম তাঁহার বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের জন্য পথ পরিষ্কারের উদ্দেশ্যে খেয়াল-খুশীমত হাদীছ এনকার-অস্বীকার করার জন্য 'পরীক্ষার নূতন ধারা' নামে একটি ফাঁদ তৈয়ার করিয়াছেন। মাকড়সার জালে তৈয়ারী সেই ফাঁদে তিনি বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের ন্যায় শক্তিশালী গ্রন্থাবলীর হাদীছ আটকাইতে যাওয়া দশটি নমুনা প্রমাণরূপে পেশ করিয়াছেন। তাঁহার সবগুলি প্রলাপের উত্তর দিতে গেলে অহেতুক সময় অপচয়ের যাতনা পোহাইতে হয়।... হাদীস মোটেই না বুঝিয়া, এমনকি প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা গ্রন্থাবলীতে ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও মূলগ্রন্থ তলাইয়া দেখার যোগ্যতার অভাবে অজ্ঞ থাকায় যেসব প্রলাপের সৃষ্টি হইয়াছে তা দেখিলে ত গাত্রদাহ এবং ক্ষোভ ও ঘৃণা জন্মে।” (বাংলা বোখারী শরীফ ৫খণ্ড উপক্রমণিকা দ্রঃ)
বুখারী-মুসলিম ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থে জাল ও ভুল হাদীস যে আছে, তা কেউ অস্বীকার করে না। (কোন্‌ কোন্ কারণে হাদীস জাল হয়েছে, তা আমি আমার 'হাদীস ও সুন্নাহর মূল্যমান' পুস্তিকায় উল্লেখ করেছি।) বহু জাল হাদীস তফসীর গ্রন্থগুলোতে যে ঢুকানো আছে, তাও কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু তার সাথে এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, সে সকল জাল হাদীস চিহ্নিত করার জন্য মুহাদ্দিসীনগণ সূক্ষ্ম ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন এবং আমীরুল মু'মিনীনা ফিল হাদীস ইমাম বুখারী ৬ লক্ষ হাদীস মুখস্থ করার পর মোট ৪ হাজার সহীহ হাদীস বাছাই ক'রে তাঁর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। অনুরূপ সহীহ-ধারায় ইমাম মুসলিম রচনা করেছেন সহীহ মুসলিম।
এইভাবে আয়েম্মায়ে হাদীস নিজ নিজ চেষ্টা-চরিত্রের সাথে যথাসম্ভব সহীহ-যয়ীফ-জান নির্ধারিত করেছেন। তারপরেও কি আর কোন ‘পরীক্ষার নূতন ধারা'র প্রয়োজন হয়?
নূরা আলম সাহেবের ধারায় বুখারীর মান হননকারীরা আবার বলেন, 'আমরা কিন্তু হাদীস শাস্ত্রের শিরোমণি (?) মহাম্মদ বিন ইসমাইল বুখারীর সমালোচনা করছি না।' (তত্ত্ব... ২৪পৃঃ) তাঁর গ্রন্থের সমালোচনা করছি। মানে তাঁর কান ধরছি না, তাঁকে জুতো মারছি আর কি? আর সেই সাথে বুখারীর অজ্ঞ, ভ্রান্ত ও নির্বুদ্ধি অন্ধভক্তদেরও মাথা নেড়া করছি মাত্র!

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 আল-ইলমুন নূর

📄 আল-ইলমুন নূর


নূর আলম সাহেব লিখেছেন, "আরবীতে একটি প্রবাদ আছে, 'আল-ইলমো ছিঁচরাতুল ফাকিচ্ছুহা।' তার মানে নাকি 'ইসলামী বিদ্যা এক ধরনের ছেঁচড়া গোন্তের মত, যার যেমন দাঁতের জোর, সে তেমনি টেনে খায়।” (তত্ত্ব...২৪পৃঃ)
আজ প্রায় ২২/২৩ বছর আরব দেশে বাস করছি, এই শ্রেণীর কোন আরবী কথা আমাদের জানা-শোনা নেই। হয়তো বা কোন জংলী বেদুঈন বাঙ্গালী-আরবদের ভাষা হবে। তাছাড়া ঐ 'ইয়ারকিমার্কা ফাকিচ্ছুহা' প্রবাদের অর্থ যদি সত্য হয়, তাহলে যার দাঁত নেই অথবা বাঁধানো দাঁত, তার কি ঐ গোন্ত মুখে নিয়ে রোমন্থন করা সাজে?
আসলে ওটি আরবী প্রবাদ নয়। ওর প্রথম শব্দটিই কেবল আরবী। কী জানি, বক্তা সে খবর রাখেন কি না? রাখলে অবশ্যই এটি শরয়ী ইল্মের প্রতি একটি নির্লজ্জ ব্যঙ্গ ও কটাক্ষ। আর তার পরিণাম অবশ্যই ভাল নয়।
পক্ষান্তরে শরয়ী জ্ঞান হল মানুষের জন্য নূর বা আলো। শরয়ী বিদ্যা নবুঅতের মীরাস। “নিশ্চয়ই আলেমগণ নবীগণের ওয়ারেসীন (উত্তরাধিকারী)। নবীগণ না কোন দীনারের উত্তরাধিকার করেছেন, না কোন দিরহামের। বরং তাঁরা ইলমেরই উত্তরাধিকার করে গেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করে সে পর্যাপ্ত অংশ গ্রহণ করে থাকে।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ, ইবনে হিব্বান, বাইহাকী, সহীহ তারগীব ৬৭নং)
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেছেন,
شكوت إلى وكيع سوء حفظي ... فأرشدني إلى ترك المعاصي
وأخبرني بأن العلم نور ... ونور الله لا يُهدى لعاصي
'আমি আমার ওস্তাদ অকী'র নিকট আমার মুখস্থশক্তি দুর্বল হওয়ার অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে পাপাচরণ পরিহার করতে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, 'জেনে রেখো, ইল্ম নূর। আর আল্লাহর নূর কোন পাপাচারকে দেওয়া হয় না।' (আল জওয়াবুল কাফী ৫৪ পৃঃ)

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 দ্বীনকে বাঁচিয়ে রাখায় মাদ্রাসার ভূমিকা

📄 দ্বীনকে বাঁচিয়ে রাখায় মাদ্রাসার ভূমিকা


মাদ্রাসা সমাজের দ্বীন-দরদী মুসলিমদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে চালানো হয় মুসলিমদের যাকাত-ফিতরা ও দান দিয়ে। যেগুলিকে চালানো দরকার ছিল মুসলিম রাষ্ট্রকে। সে ব্যবস্থা না থাকার ফলে মাদ্রাসারই মুদারিস-তালেবে ইল্মরা চাইতে যায়। তাতে তারা কত লাঞ্ছনার শিকার হয়, তার ইয়ত্তা নেই। চাঁদা নয়; (পার্টি বা গান-বাজনার জন্য) চাঁদা চাইতে কোন লজ্জা নেই, দিতেও কুণ্ঠা নেই। কিন্তু মুশকিল হল, মাদ্রাসার জন্য কিছু চাইতে যাওয়া, কারণ তা হল ভিক্ষা (?) করা।
এই শ্রেণীর মাদ্রাসা-শিক্ষিত নাদুস-নুদুস চেহারা দেখে কতক আধুনিক শিক্ষিত ব্যর্থ যুবকের গায়ে হিংসার জ্বালা ধরে। 'মূর্খ'দেরকে ইমামতি করতে, সমাজের নেতৃত্ব দিতে ও লেকচার দিতে দেখে ঈর্ষায় ফেটে পড়ে। ফলে শতমুখে তাঁদের সমালোচনা করে। তাঁরা তাদের দ্বারে এলে শতমুখী দিয়ে পারলে বিদায় করে!
অধিকাংশ আলেম মূর্খ হলেও নীতি-নৈতিকতায় ভাল। কেউ আদর্শচ্যুত হলে সে কথা ভিন্ন। আরবী ভাষা আয়ত্ত করতে না পারলেও দ্বীন, ইবাদত ও চরিত্র আয়ত্ত করে। কোন মাদ্রাসা দ্বারা বছরে অথবা বিশ বছরে যদি একটি আলেম হয়, তাই যথেষ্ট।
মনুষ্যমেধা নষ্ট হয়? বিজ্ঞানী হতে পারেন না? খোঁড়া আলেম হলেও তাঁর আমল-আখলাক ঠিক থাকে। যুক্তিবাদী না হতে পারলেও আল্লাহবাদী হন, আর তাই তাঁর ইহকাল পার ক’রে পরকালের জন্য যথেষ্ট। আসল লাভ-নোকসান তো পরকালের খাতায়।
প্রবীর ঘোষের হাওয়ালায় সমাজের আলেম-উলামাকে মূর্খ বলে ব্যঙ্গ ও তুচ্ছ করা কোন মুসলমানের কাজ নয়। 'মাদ্রাসা কেন্দ্রিক শিক্ষা মুসলিম সমাজকে প্রতারণা করছে' (তত্ত্ব... ১১পৃঃ)---এ কথাও কোন ন্যায়পরায়ণ মানুষের নয়।
মাদ্রাসা-শিক্ষা কেবল আরবী বলার জন্য নয়। স্কুলের সবাই কি ইংরেজী বলতে পারে? সবাই কি ভাল ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে? সব বাঁশে কি বংশলোচন হয়?
মাদ্রাসা শিখায় ধর্ম ও নৈতিকতা, যেমন লেখক বলেছেন, 'ইসলাম ধর্ম টিকে আছে এ সকল আলেমদের অবদানের জন্যই।' (তত্ত্ব... ১১পৃঃ) তাহলে প্রতারণা কী ক'রে হল?
অবশ্য প্রতারক ও ধর্ম-ব্যবসায়ী যে আছে---সে কথা অস্বীকার করছি না।
যাঁরাই কুরআন নিয়ে গবেষণা করেছেন, যাঁদের প্রতি (তত্ত্ব.....৭ পৃষ্ঠায়) 'মাদ্রাসায় পড়ে মনুষ্যমেধা নষ্ট করেননি' বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তাঁরা কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি কৃতজ্ঞ। যেহেতু তাঁরা গবেষণার যে রসদ পেয়েছেন, তা মাদ্রাসা শিক্ষারই ফসল।
প্রতিভাধর ডঃ যাকির নায়েক সাহেব বহু কিছু জানেন, কিন্তু অনেক কিছু জানেন না। তাঁর দ্বারা কি দ্বীনের সবকিছুর সমাধান পাওয়া যাবে? কোন ফতোয়া জিজ্ঞাসা করলে কেন তিনি বলেন, 'উলামা সে পুছো। ম্যাঁয় তালেবে ইল্ম হুঁ'?
পক্ষান্তরে আরবী ভাষা? 'আরবী পারবি তো পারবি, না হয় হেগে-মুতে ছাড়বি।' 'ছিঁচরাতুল ফার্কিচ্ছুহা'র মত নয়। আরবী বলতে পারা বড় কঠিন। সরকারী মাদ্রাসার কথা বলছি না, বেসরকারী মাদ্রাসায় যেভাবে আরবী পড়ানো হয়, তাতেও একটি আরবী শুদ্ধ বাক্য বলতে হিমসিম খেতে হয়---সে কথা আমরা জানি।
আমি বাংলা পড়েছি, ইংরেজী পড়েছি, হিন্দী পড়েছি, উর্দু পড়েছি, ফারসী পড়েছি, আরবী পড়েছি। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পেয়েছি আরবীকে। আরবীতে কথা বলা সহজ নয়। যে সকল প্রবাসী এখানে কাজের জন্য আসে, তারাও আরবী বলে। কিন্তু সে আরবীর নাম 'আরাবিয়াতু বাতহা।' অর্থাৎ, রাজধানী রিয়াযস্থ বাতহা মার্কেটের আরবী। যে মার্কেটে প্রায় সবাই বাইরের লোক। আর তারা যে আরবী বলে, তা বড় সহজ।
উদাহরণ স্বরূপঃ বাংলায় ১জন ছেলে ও মেয়ে (এসেছে), ২জন (এসেছে), ৩জন (এসেছে)। বাতহার আরবীও অনুরূপ বাংলার মতইঃ ১জন ছেলে ও মেয়ে (ইজি), ২জন (ইজি), ৩জন (ইজি)। অথচ বর্তমান-ভবিষ্যতের জন্যও ঐ (ইজি) বলা হয়। সুতরাং তাদের জন্য ঐ আরবী ইজি। কিন্তু শুদ্ধ আরবী হলঃ ১জন ছেলে (জা-আ), ২জন (জা-আ-), ৩জন (জা-উ)। ১জন মেয়ে (জা-আত), ২জন (জা-আতা), ৩জন (জি'না)। আর এইভাবে প্রত্যেক ক্রিয়া নারী-পুরুষ, কাল ও বচনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণ হবে। অতএব এ ভাষা আয়ত্ত করা সহজ নয়।
হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের ত্রুটি আছে---সে কথা স্বীকার করতে দোষ নেই। যেমনঃ
আমরা আমাদের (বিশেষ ক'রে বাংলার) মাদ্রাসাগুলোতে আরবী পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় না। আমরা হিন্দুস্তানের মানুষ হিন্দী-উর্দু মাদ্রাসার সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য উর্দু মিডিয়াম ক'রে পড়ে থাকি। আগে ছিল এখনও হয়তো কোথাও কোথাও থেকে থাকবে, আরবী গ্রামার ফারসী ভাষায়, তার অনুবাদ উর্দুতে। ফলে নিজের ভাষায় ছাত্ররা আরবী বুঝতে পারে না। আর তার ফলে অনেক মার খেতে হয়।
পক্ষান্তরে ইংরেজী মিডিয়ামের মত যদি আরবী মিডিয়াম মাদ্রাসা করা যেত, তাহলে আরবী শুদ্ধ বাক্য বলা সহজ করা যেত। পক্ষান্তরে সরকারী মাদ্রাসাগুলোতে যে অন্যান্য সকল বিষয় আছে, তার চাপে আরবী আয়ত্ত করা কার সাধ্য?
এ কথাও অনস্বীকার্য যে, প্রাতিষ্ঠানিক কোন স্কুল-মাদ্রাসায় না পড়ে অথবা তত উচ্চ ক্লাশে না পড়ে অনেকে কবি-লেখক-বৈজ্ঞানিক হয়েছেন। কিন্তু তা হল প্রতিভা। ডঃ যাকির নায়েক সাহেবও একজন প্রতিভাধর।
তাছাড়া স্কুল-মাদ্রাসা 'রত্ন' তৈরী করে না, 'রত্ন'রূপে তৈরী হওয়ার পথ দেখায় মাত্র। অতিরিক্ত নিজস্ব প্রচেষ্টা ও স্টাডি না থাকলে কেউ 'রত্ন' হতে পারে না।
আবার প্রত্যেক শিক্ষার একটা লক্ষ্য থাকে। সেই লক্ষ্য অনুযায়ী ছাত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এখন চাকরি যদি কেবল সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে হয়, তাহলে তাই ধান্দা হবে ছাত্রের। আর চাকরি যদি আরবী বলার উপরে হয়, তাহলে আরবী বলতে পারবে ছাত্র। একে তো তাদের চাকরি নেই, তাতে আরবী বলার শর্ত নেই। তাহলে কেন বৃথা মেহনত করবে ছাত্রেরা? ধর্মকর্ম তো আরবী বলতে না পারলেও হবে; পড়ে মানে বুঝতে পারলেই তো যথেষ্ট।
আর এ কথাও ঠিক যে, অনেক আলেম জাহেল হয়েই থেকে যায়; তারা না আরবী শিখতে পারে, আর না বাংলা। অবশ্য দ্বীনদারী শেখে, আখলাক-চরিত্র শেখে। আর সেটাও তো বড় লাভ। পক্ষান্তরে স্কুলে পড়ে যারা আনপড় থেকে যায়, তাদের এ কূল-ও কূল দু'কূলই যায়।
নিজ মাতৃভাষায় শরয়ী ইল্ম বিতরণ না করতে পারাও একটা ত্রুটি আলেমদের। আর তার জন্য তাঁরা নিজেরা নন; বরং শিক্ষা-ব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী। বাংলার বেসরকারী মাদ্রাসাগুলোতে যদিও বাংলা ইদানীং ঢুকেছে, তবুও তাতে রচনা ও প্রবন্ধ লেখাবার সুষ্ঠু সুব্যবস্থা নেই অথবা সেই শ্রেণীর শিক্ষক নেই।
তবে এ কথাও বলছি না যে, আরবী বলার মত কোন আলেমই নেই। যাঁরা ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে হয়তো কেউ পারেননি। তাবলে হাঁড়ির ভাত দেখার মত, তাঁদের উপর কিয়াস ক'রে 'সারা বাংলার কোন আলেম একটি শুদ্ধ আরবী বাক্য বলতে পারেন না এবং সেহেতু মাদ্রাসা-শিক্ষা মুসলিম সমাজকে ধোঁকা দিচ্ছে' (তত্ত্ব... ১১পৃঃ)---এত বড় কথা বলার আস্পর্ধা রাখি না।

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 কুরআন কেন অবতীর্ণ হয়েছে?

📄 কুরআন কেন অবতীর্ণ হয়েছে?


মোটকথা, যাঁরা মাদ্রাসায় পড়ে মনুষ্যমেধা নষ্ট করেননি, তাঁরা যে কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা ক'রে মনুষ্যমেধার লালন করেছেন, তাতে কিন্তু কুরআনী তথ্য পাননি। বরং কুরআনের অর্থ বুঝার জন্য ঐ মেধা নষ্টকারী কোন-না-কোন মাদ্রাসা-শিক্ষিত লোকের সাহায্য প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে নিতে হয়েছে। এ কথা কোন অবিমৃশ্যকারী অস্বীকার করলেও, তাঁরা নিজেরা সে কথা স্বীকার করেন।
তাছাড়া সে সকল বিদ্যামন্দিরে পড়াশোনা ক'রে যদি কুরআনভিত্তিক যুক্তির সাথে শরয়ী জ্ঞান লাভ হতো, তাহলে আজ মুসলমানদেরকে ভিখেরী বিদ্যালয় খুলে বসে দয়ে পড়া হাতির মত চামচিকের কাছেও এত লাথি খেতে হতো না।
মনুষ্যমেধা নষ্টকারী কোন মাদ্রাসায় না পড়ে অন্য জেনারেল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পড়ে শরীয়তের মুফতী হয়েছেন---আছে কি এমন উদাহরণ?
নূর আলম বলেন, 'ইসলাম নিয়ে নতুন ক'রে ভাবতে হবে।' (তত্ত্ব... ১৪৪পৃঃ) কাদেরকে নিয়ে ভাববেন? যারা অনুবাদ নকল ক'রে তাহকীক করে এবং অনুবাদটা ঠিক কি না তাও জানে না, তাদেরকে নিয়ে? নাকি ধর্মনিরপেক্ষ বা সব-ধর্ম-সমান জ্ঞানকারী তথাকথিত চিন্তাবিদদেরকে নিয়ে?
কুরআন কেন অবতীর্ণ হয়েছে?
কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের ঈমান, জান, মান, জ্ঞান ও ধনকে রক্ষা করার জন্য। মানুষের মান ও হুঁশ বজায় রাখার জন্য। মানবকে মান্যবর করার জন্য। কুরআন যেমন মৃতব্যক্তির জন্য, জীবিত ব্যক্তির তাবীয বানাবার জন্য অবতীর্ণ হয়নি, তেমনি কমপিউটার বা রকেট বানাবার জন্যও অবতীর্ণ হয়নি।
কুরআনের সাথে বিজ্ঞানের সামঞ্জস্য সাধন ক'রে কোন অনুবাদ বা ব্যাখ্যা করা ভুল। কারণ বিজ্ঞান আজ যে তথ্য বলে, কাল তা ভুল প্রমাণ করে। আর তাতে কুরআনও ভুল প্রমাণিত হবে। মাদ্রাসায় পড়া আলেমরা কুরআনের বৈজ্ঞানিক তথ্য ও তত্ত্ব না দিতে পারেন, তাঁরা তো সেই তথ্য ও তত্ত্ব পরিবেশন করেন, যার জন্য কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
{ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنزَلَ عَلَيْكُمْ مِّنَ الْكِتَابِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُم بِهِ }
অর্থাৎ, তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ও কিতাব এবং প্রজ্ঞা (সুন্নাহ) যা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন ও যা দিয়ে তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, তা স্মরণ কর। (সূরা বাক্বারাহ ২৩ ১ আয়াত)
{ شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ}
অর্থাৎ, রমযান মাস, এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। (ঐ ১৮৫ আয়াত)
{إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كبيرًا} (٩) سورة الإسراء
অর্থাৎ, নিশ্চয় এ কুরআন এমন পথনির্দেশ করে, যা সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সৎকর্মপরায়ণ বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরা বানী ইস্রাঈল ৯ আয়াত)
{ وَلَقَدْ صَرَّفْنَا فِي هَذَا الْقُرْآنِ لِيَذَّكَّرُواْ وَمَا يَزِيدُهُمْ إِلَّا نُفُورًا} (٤١) سورة الإسراء
অর্থাৎ, এই কুরআনে বহু কথাই আমি বারবার (বিভিন্নভাবে) বিবৃত করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে; কিন্তু তাতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়। (ঐ ৪১ আয়াত)
{ وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاء وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا}
অর্থাৎ, আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও করুণা, কিন্তু তা সীমালংঘনকারীদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে। (ঐ ৮-২ আয়াত)
{ وَلَقَدْ ضَرَبْنَا لِلنَّاسِ فِي هَذَا الْقُرْآنِ مِن كُلِّ مَثَلٍ لَّعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ} (٢٧) سورة الزمر
অর্থাৎ, আমি এ কুরআনে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছি; যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা যুমার ২৭ আয়াত)
{وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ } (١٧) سورة القمر
অর্থাৎ, নিশ্চয় আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ ক'রে দিয়েছি। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? (সূরা ক্বামার ১৭ আয়াত)
তবে এ কথা অস্বীকার করার নয় যে, কুরআনে বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে। কিন্তু বিজ্ঞান যা প্রমাণ করছে, তার বিপরীত যদি কুরআনে থাকে, তাহলে জানতে হবে যে, হয় বিজ্ঞানের তথ্য ভুল, না হয় আমাদের কুরআন বুঝা ভুল। অনুরূপ হাদীসও।
যতই জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন হোক, মায়ের পেটে কী আছে তা কেউ বলতে পারবে না। অর্থাৎ, গায়বী খবর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আর গায়বী খবর সেই খবরকে বলা হয়, যা বিনা কোন মাধ্যম বা অসীলায় বলা হয়। আল্লাহর নবী ﷺ গায়েব জানতেন না। কিন্তু গায়বের খবর বলতেন। আল্লাহর নিকট থেকে অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়ে অনেক গায়বী খবর বলেছেন। আর যা কোন অসীলা, মাধ্যম বা যন্ত্রের সাহায্যে বলা হয়, তা গায়বী খবর নয়। বর্তমানে কোন যন্ত্রের সাহায্যে ছেলে, মেয়ে, না টিউমার জানতে পারলেও অথবা বীর্যবিন্দুর লিঙ্গ নির্ণয় করতে সক্ষম হলেও কুরআনের ঐ আয়াতের অর্থের কোন পরিবর্তনের দরকার নেই।
মহান আল্লাহর চ্যালেঞ্জ, আসমান-যমীনে কেউ গায়বী (অদৃশ্য) খবর জানে না। (সূরা নাম্ন ৬৫ আয়াত) কিন্তু কোন কিছুর মাধ্যমে জানলে, তা আর গায়বী থাকে না; বরং হাযরী (দৃশ্য) খবর হয়ে যায়। আর তা জানতে কোন বাধা নেই।
আল-কুরআন বিজ্ঞানময় গ্রন্থ, তা নিয়ে রিসার্চ করবেন বৈজ্ঞানিকগণ। কিন্তু কুরআন যে উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা করবেন উলামা ও ফুকাহাগণ। এই ধরুন নামায; নামায নিয়ে গবেষণা ক'রে উলামাগণ বলেন, 'তা হল আল্লাহ ও বান্দার সংলাপ-সেতু। সবচেয়ে বড় ইবাদত নামায।'
জিমন্যাস্টগণ বলবেন, 'নামায একটি সুন্দর ব্যায়াম। এতে ভাল শরীরচর্চা হয়।'
তা হতে পারে, তা বলতে পারেন, কিন্তু নামায এ জন্য নয়। আর শরীরচর্চার উদ্দেশ্যে কেউ নামায পড়লে, তার নামাযই শুদ্ধ নয়।
মনোবিজ্ঞানীগণ অন্য কিছু বলতে পারেন। নামাযে মানসিক উপকারিতার কথা আবিষ্কার করতে পারেন; তা বলে সে উদ্দেশ্য নামাযের নয়।
সমাজবিজ্ঞানীগণ আরো কিছু উপকারিতার কথা বলতে পারেন, আর তাতে তা থাকতে পারে। কিন্তু নামাযের উদ্দেশ্য তা নয়।
তাহলে তা নিয়ে শরয়ী উলামাগণকে তাচ্ছিল্য এবং বৈজ্ঞানিক গবেষকগণকে নিয়ে এত গর্ব কেন? আসল ছেড়ে কি নকল নিয়ে টানাটানি? আধ্যাত্মিকতা ছেড়ে কি বাহ্যিকতা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত? কিন্তু ইসলাম তো সে আনুষ্ঠানিকতা ও আড়ম্বরের ধর্ম নয়। ইসলাম ও কুরআন-সুন্নাহ বিজ্ঞানময়, তা প্রমাণ করতে রিসার্চের দরকার হয় না। কেবল নিজের যা আছে তা নিয়ে আত্মমর্যাদাবোধের দরকার আছে। আমাদেরই যে আছে, সে কথা অন্তরের অন্তস্তলে অনুভূতির প্রয়োজন আছে। মনের ভিতরে যদি বল রেখে বলা হয়, ইসলাম যুক্তির বাইরে নয়, তাহলে নিশ্চয়ই যুক্তি দিয়ে সেই কথার যৌক্তিকতা প্রমাণ করা সহজ, যাকে অমুসলিম ও দুর্বল ঈমানের লোকেরা অযৌক্তিক মনে করে।
তারা যুক্তিবাদী নয়, যারা পরের কথা শুনে ঘরের লোককে সন্দেহ করে। বউয়ের কথা শুনে মা-কে মারধর করে!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00