📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 মুসলিম বিচ্ছিন্নতা ও হাদিস

📄 মুসলিম বিচ্ছিন্নতা ও হাদিস


এতে কোন সন্দেহ নেই যে, হাদীসের সহীহ গ্রন্থগুলি লিপিবদ্ধ হওয়ার পূর্বে মুসলিম জাতি বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল এবং প্রত্যেক ভাগই নিজ নিজ মতের সমর্থনে হাদীস ও কাহিনী বানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সহীহ গ্রন্থাবলী তথা মুহাদ্দিসীনদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর সেসব জাল কাহিনী ও হাদীস চিহ্নিত হয়ে গেছে। প্রত্যেক দল সম্বন্ধে তাঁরা হকপন্থী মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক ক'রে গেছেন। উল্লেখযোগ্য ফির্কাগুলোর মধ্যে মু'তাযিলা ফির্কা ছিল যুক্তিভিত্তিক আক্কেলমার্কা ফির্কা। তারাই আক্কেলের নিকষে সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করেছে, কুরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করেছে, আম্বিয়াগণের মু'জিযাকে অস্বীকার করেছে।
মু'তাযিলার মনুষ্যমেধার আকলানী মাদ্রাসায় যাঁরা প্রতিপালিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে জামালুদ্দীন আফগানী, রশীদ রিযা, মুহাম্মাদ গাযালী, সার সাইয়েদ আহমাদ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। আর তাঁদেরই সুরে সুর মিলিয়েছেন আমাদের বাংলার আকরাম খাঁ ও তাঁর অনুসারীরা।
যেমন খাঁ সাহেবও তাদেরই মতো নিজের স্বাধীন চিন্তাধারা ও স্বেচ্ছাচারী জ্ঞান প্রয়োগের সমর্থনে হাদীস গড়ে অথবা গড়া হাদীস নকল ক'রে বলেছেন, 'মহানবী সঃ (বাইয়াত) প্রতিজ্ঞা গ্রহণকালে বলিতেন, “আমি যাহা বলিব অন্ধের ন্যায় তাহার অনুসরণ করিবে না। তা সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত কথা কি না প্রথমে তাহা তাহকীক করিয়া লইবে। যদি তোমরা তাহাকে ন্যায়সঙ্গত কাজ বলিয়া মনে কর, তবেই তাহার অনুসরণ করিও।” (মোস্তফা চরিত ৪৬১-৪৬২পৃঃ, তত্ত্ব... ১০ ও ১৫পৃঃ)
অথচ এই শ্রেণীর কথা আবূ বাক্স রাঃ-এর বাইয়াত গ্রহণকালে তাঁর কথা বলে প্রসিদ্ধ আছে। পরন্তু তিনি এই শ্রেণীর কথা সর্বশ্রেষ্ঠ রসূলের প্রতি আরোপ ক'রে তাঁর মর্যাদা খর্ব করেছেন।
খাঁ সাহেব যদিও সহীহ হাদীস অস্বীকার করেন, কারণ তা তাঁর জ্ঞানের প্রতিকূলে; তবুও জাল বা যয়ীফ হাদীস মানেন, কারণ তা তাঁর স্বাধীন চিন্তার সমর্থনে!
পক্ষান্তরে হকপন্থীরা মত অবলম্বন করার পর দলীল খোঁজেন না; বরং সহীহ দলীলে যা পান, সেটাই নিজেদের আকীদা ও আমল বলে বরণ করেন।

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 কুরআনের-হাদিসের উক্তির উপরে কোন যুক্তি প্রাধান্য পাবে না

📄 কুরআনের-হাদিসের উক্তির উপরে কোন যুক্তি প্রাধান্য পাবে না


শরীয়তের উপরে জ্ঞানের স্বাধীনতা নেই। মানুষের জ্ঞান সীমিত। স্বাধীন জ্ঞান নিয়ে চিন্তা ক'রে মানুষ সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করেছে। নবী-রসূলকে অস্বীকার করেছে। কুরআনকে অস্বীকার করেছে। সুন্নাহকে অস্বীকার করেছে। জ্বিন-ফিরিস্তা, মু'জিযা ও কারামতকে অস্বীকার করেছে? যে যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে অস্বীকার করে, আর যে তার প্রমাণ করে, কোন যুক্তিটা ঠিক? দলীলের কাছে সকল যুক্তি অকেজো।
'তা সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত কি না তাহা তাহকীক করিয়া লই......... (তত্ত্ব......১০০ ও ১৫পৃঃ) একি মহানবী ﷺ-এর উক্তি?
শরয়ী ব্যাপারে তাঁর এ উক্তি হতে পারে না। তাঁর এ উক্তি পার্থিব ব্যাপারে।
একদা তিনি সাহাবাদেরকে দেখলেন, তাঁরা খেজুর মোছার পরাগ-মিলন সাধন করছেন; অর্থাৎ, মাদা গাছের মোছা নিয়ে মাদী গাছের মোছার সাথে বেঁধে দিচ্ছেন। তিনি বললেন, “আমার মনে হয় ঐরূপ করাতে কোন লাভ নেই। ঐরূপ না করলেও খেজুর ফলবে।” তাঁর এ মন্তব্য শুনে সাহাবাগণ তা ত্যাগ করলেন। কিন্তু খেজুর ফলার সময় দেখা গেল, খেজুর পরিপুষ্ট হয়নি; ফলে তার ফলনও ভালো হয়নি। তিনি তা দেখে বললেন, “কী ব্যাপার, তোমাদের খেজুরের ফলন নেই কেন?” তাঁরা বললেন, যেহেতু আপনি পরাগ-মিলন ঘটাতে নিষেধ করেছিলেন, সেহেতু তা না করার ফলে ফলন কম হয়েছে। তিনি বললেন, “আমি ওটা ধারণা করে বলেছিলাম। তোমরা তোমাদের পার্থিব বিষয় সম্পর্কে অধিক জ্ঞান রাখ। অতএব তা ভালো হলে, তোমরা তা করতে পার।” (মুসলিম ২৩৬ ১-২৩৬৩নং)
এ জন্যই পার্থিব ব্যাপারে আল্লাহ তাঁকে আদেশ ক'রে বলেছিলেন,
{ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ} (١٥٩) سورة آل عمران
অর্থাৎ, অর্থাৎ, তাদের সাথে পরামর্শ কর। (সূরা আলে ইমরান ১৫৯ আয়াত)
যার ফলে তিনি যুদ্ধ-বিগ্রহ ও পার্থিব ব্যাপারে সাহাবাগণের রায় নিতেন। পক্ষান্তরে শরয়ী ব্যাপারে 'নবী'র জায়গায় তাঁদের 'রাসূল' শব্দও গ্রহণ করতেন না।
কুরআনে বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে, বিজ্ঞানের সাথে তার সংঘর্ষ নেই। তা বলে কুরআন বৈজ্ঞানিক তথ্য পরিবেশন করার জন্য অবতীর্ণ হয়নি। আল্লাহর নবী ﷺ ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, পার্থিব চাকচিক্যের উন্নয়ন শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরিত হননি। তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন চারিত্রিক ও পারত্রিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য, পারলৌকিক জীবনকে উন্নত থেকে উন্নততর করার জন্য। আর এ জন্য পার্থিব কোন নতুন কাজ বিদআত নয়। সুতরাং তাঁর পার্থিব বিষয়ের কোন রায় ইত্যাদি পার্থিব দৃষ্টিতে বিবেচ্য হতে পারে, কোন শরয়ী ব্যাপার নয়। এই জন্য তিনি বলেছিলেন, “দুনিয়ার ব্যাপারে কোন ধারণাপ্রসূত কথা বললে, তা গ্রহণ করো না (যেহেতু আমি একজন মানুষ)। কিন্তু যখন আল্লাহর তরফ থেকে কোন কথা বলব, তখন তা গ্রহণ কর। যেহেতু আমি আল্লাহর ব্যাপারে কখনই মিথ্যা বলব না।” (আর তখন তা প্রত্যাখ্যান করার কোন যুক্তি খাটবে না।) (মুসলিম ২৩৬ ১-২৩৬৩)
সুতরাং শরয়ী ব্যাপারে তাঁর কথাকে 'তাহকীক' ক'রে দেখে নেওয়ার অবকাশ কারো থাকতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন,
{ وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا} (٣٦) سورة الأحزاب
অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন বিশ্বাসী পুরুষ কিংবা বিশ্বাসী নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের অবাধ্য হলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে। (সূরা আহযাব ৩৬ আয়াত)
পক্ষান্তরে দ্বীন ও দুনিয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأَ فَتَبَيِّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نادمين} (٦) سورة الحجرات
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! যদি কোন পাপাচারী তোমাদের নিকট কোন বার্তা আনয়ন করে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা ক'রে দেখবে; যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়কে আঘাত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। (সূরা হুজুরাত ৬ আয়াত)
আর রসূল তো রসূলই! রসূলের খবর তাহকীক করতে হলে, কার কথা দিয়ে তার তাহকীক করবেন? বস্তুবাদী ও বাস্তববাদীদের কথা দিয়ে?
যদি কুরআন দিয়ে করেন, তাহলেও কোন সহীহ হাদীস কুরআনের বিপরীত হতে পারে না। অবশ্য ব্যাখ্যা স্বরূপ অনেক হাদীস কুরআনের বিধানের উপর অতিরিক্ত বিধান দেওয়া হয়েছে। আর তাও দ্বিতীয় অহী; যেমন অন্যত্র আলোচিত হয়েছে।
পক্ষান্তরে “আমার পক্ষ থেকে যা তোমাদের নিকট আসবে, তা আল্লাহর কিতাবের উপর পেশ কর। অতঃপর যে কথা কুরআনের অনুসারী হবে, তা আমার কথা। আর যা তার বিরোধী হবে, তা আমার কথা নয়।”---এ হাদীস এবং এই শ্রেণীর আরো হাদীসগুলি জাল। (দেখুন সিলসিলাহ যায়ীফাহ ৩/২০৯)
এই শ্রেণীর হাদীস 'যিন্দীক' (জরথুস্ত্রপন্থী)দের মনগড়া তৈরি। পক্ষান্তরে সহীহ হাদীসে এসেছে, মহানবী ﷺ বলেছেন, “শোন! আমাকে কুরআন দান করা হয়েছে এবং তারই সাথে তারই মত (সুন্নাহ) দান করা হয়েছে। শোন! সম্ভবতঃ নিজ গদিতে বসে থাকা কোন পরিতৃপ্ত লোক বলবে, 'তোমরা এই কুরআনের অনুসরণ কর; তাতে যা হালাল পাও, তাই হালাল মনে কর এবং তাতে যা হারাম পাও, তাই হারাম মনে কর। অথচ আল্লাহর রসূল যা হারাম করেন তাও আল্লাহর হারাম করার মতই।---” (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারেমী, মিশকাত ১৬৩নং)
অহীর উপরে কোন যুক্তি বা রায়ের চাকা সচল নয়। সেই জন্য সলফগণ সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন এবং যুক্তিবাদী বিদআতীদের ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহকে সাবধান করেছেন।
আলী (রাঃ) বলেছেন, 'রায় বা যুক্তি দ্বারা যদি দ্বীন প্রমাণিত হত, তাহলে মোজার উপরের অংশ অপেক্ষা নিচের অংশই মাসাহর অধিক উপযুক্ত ছিল। কিন্তু আমি আল্লাহর রসূল ﷺ-কে মোজার উপরের অংশে মাসাহ করতে দেখেছি।' (আবু দাউদ ১৬২,বাইহাকী ১/২২৯, দারেমী ৭ ১৫নং)
হাজারে আসওয়াদকে চুম্বনকালে উমার ফারূক (রাঃ) এই তত্ত্বকেই সামনে রেখে বলেছিলেন, 'আমি জানি যে, তুমি একটি পাথর; তুমি না কারো উপকার সাধন করতে পার, আর না-ই কারো অপকার। যদি রসূল ﷺ-কে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।' (বুখারী ১৫৯৭নং)
আওযায়ী বলেন, 'তুমি সলফের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চল; যদিও লোকে তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে। আর এঁর-ওঁর রায় থেকে দূরে থাক; যদিও কথা দ্বারা তা তোমার জন্য সুশোভিত করে পেশ করে।' (আশ্-শারীআহ ৬৩পৃঃ)
যে সকল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উক্ত প্রকার বিদআতে জড়িত হয়ে পড়ে, তারা তিনের মধ্যে এক অবশ্যই হবেঃ-
হয়তো সে এমন লোক হবে, যার তরীকা ভালো, মযহাব উত্তম, যে শান্তি পছন্দ করে এবং যে সরল পথে স্থির থাকতে চেষ্টা করে বলে আপনি জানেন। কিন্তু তার কর্ণকুহরে তাদের কথা গুঞ্জরিত হয়েছে, যাদের হৃদয়ে শয়তানের বাসা আছে এবং তার ফলে তারা তাদের জিভে নানাবিধ কুফরী কথা বলে থাকে। আর সে ঐ জড়িয়ে পড়া বিদআতের গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার পথ জানে না। তখন তার প্রশ্ন হয় জানার জন্য, পথ পাওয়ার জন্য। যে প্যাঁচে সে পড়েছে সে প্যাঁচ থেকে বের হওয়ার পথ অনুসন্ধান করে এবং যে রোগে সে ক্লিষ্ট হয়েছে সেই রোগ থেকে আরোগ্য লাভের ওষুধ খোঁজ করে। পরন্তু আপনি তার আনুগত্যের কথা অনুভব করেন এবং তার বিরোধিতা করা থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করেন, তাহলে এই হল সেই ব্যক্তি যাকে বাধা দেওয়া এবং শয়তানের চক্রান্ত-রশি থেকে বাঁচিয়ে সুপথ প্রদর্শন আপনার জন্য ফরয। আর আপনি যার মাধ্যমে তাকে পথ দেখাবেন ও জ্ঞানদান করবেন তা যেন কিতাব ও সুন্নাহ হয় এবং সাহাবা ও তাবেঈন তথা মুসলিম উম্মাহর সহীহ আসার হয়। তবে সে পথ প্রদর্শন যেন হিকমত ও সদুপদেশের সাথে হয়।
যে বিষয় আপনি জানেন না, সে বিষয়ে তাকাল্লুফ (কষ্টকল্পনা) করা থেকে, কোন রায় নিজের তরফ থেকে ব্যক্ত করা থেকে এবং অতি সূক্ষ্ম বিষয়ে মনোনিবেশ করা হতে দূরে থাকুন। কারণ এরূপ করা আপনার কর্মে বিদআত বলে পরিগণিত। আর যদি আপনি উক্ত কর্মের মাধ্যমে সুন্নাহ প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা পোষণ করে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন যে, হকের পথ ব্যতিরেকে হক প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা হল বাতিল এবং সুন্নাহর তরীকা ছাড়া সুন্নাহর কথা বলা হল বিদআহ। আর নিজেকে রোগাক্রান্ত করে আপনি আপনার সঙ্গীর আরোগ্য অন্বেষণ করবেন না এবং নিজেকে খারাপ করে তাকে ভালো করার চেষ্টাও নয়। কারণ, যে নিজেকে ধোঁকা দেয়, সে অপরের জন্য হিতাকাঙ্ক্ষী হতে পারে না এবং যার মধ্যে নিজের জন্য কোন মঙ্গল নেই, তার মধ্যে অপরের জন্যও কোন মঙ্গল থাকতে পারে না।
বলা বাহুল্য, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে তাওফীক দান করেন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে চলে, আল্লাহ তাকে সাহায্য ও মদদ করে থাকেন।' (আল-ইবানাহ, ইবনে বাত্মাহ ২/৫৪০-৫৪১, ৬৭৯নং)
ইউনুস বিন উবাইদ একদা তাঁর ছেলেকে বলেন, 'আমি তোমাকে ব্যভিচার, চুরি ও মদ্যপান করা হতে নিষেধ করছি। কিন্তু আম্র বিন উবাইদ ও তার সাথীদের (বিদআতী) রায় নিয়ে আল্লাহ আয্যা অজাল্লার সাথে সাক্ষাৎ করার চাইতে ঐ সকল পাপ নিয়ে সাক্ষাৎ করা আমার নিকট অপেক্ষাকৃত বেশী পছন্দনীয়।' (ঐ ২/৪৬৬, ৪৬৪নং)
আওয়াম বিন হাওশাব তাঁর ছেলে ঈসার জন্য বলেন, 'আল্লাহর কসম! ঈসাকে তর্কপ্রিয় বিদআতীদের সাথে ওঠা-বসা করতে দেখার চেয়ে তাকে বায়েন, মাতাল ও ফাসেক দলের সাথে ওঠা-বসা করতে দেখা আমার নিকট অপেক্ষাকৃত বেশী পছন্দনীয়।' (আল-বিদাউ অন্‌-নাহয়ু আনহা, ইবনে অয্যাহ ৫৬পৃঃ)
ইসলাম যুক্তির ধর্ম। সহীহ দলীল না পাওয়া গেলে যুক্তি প্রয়োগ করবেন উলামাগণ। অথবা দুই সহীহ দলীলে পরস্পর-বিরোধ ধারণা হলে যুক্তি প্রয়োগ করবেন উলামাগণ। সহীহ দলীলকে প্রয়োগ করার জন্য যুক্তি ব্যবহার করবেন উলামাগণ। সহীহ দলীলকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাঁরা ভাঙ্গা কুলোর বাতাস ব্যবহার করবেন না।

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 সুন্নাহর মূল্যমান

📄 সুন্নাহর মূল্যমান


নূর আলম সাহেব বলেন, 'প্রায় তিনশ বছর পরে হাদীস নামক (?) গ্রন্থগুলি রচিত হয়েছে।’ (তত্ত্ব......৫০পৃঃ)
তার মানে এই নয় যে, হাদীসগুলি পচা গুদামে পড়ে ছিল। আসলে যেভাবে কুরআন লেখা হত, সেইভাবে সুন্নাহ বা হাদীস লেখা হলে, কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে গোলমাল ও সংমিশ্রণ হওয়ার বড় আশঙ্কা ছিল। আর তাতে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে সন্দেহ প্রবেশ করার ভয় ছিল। আর তার জন্যই মহানবী ﷺ নিজে কুরআন ছাড়া অন্য কিছু লিখতে নিষেধও করেছিলেন। (মুসলিম ৭৭০২নং)
অবশ্য এ নিষেধ ছিল শুরুর দিকে। পরে লেখার অনুমতি দেওয়া হয়। বিশেষ ক'রে যাঁদের ব্যাপারে দুটি অহীর মাঝে গোলমাল সৃষ্টি করার ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না, তাঁদেরকে সুন্নাহ লেখারও অনুমতি দেওয়া হয়। প্রমাণিত যে, তিনি কাউকে কাউকে সুন্নাহ লিখে দিতে আদেশও করেছেন এবং অনেক সাহাবীর কাছে অনেক সুন্নাহ লিখিত অবস্থাতেও সংরক্ষিত হয়। (প্রায় ৫২ জন সাহাবীর কাছে বহু হাদীস লিখিত অবস্থায় পাওয়া যায়।) পরবর্তীকালে কুরআন গ্রন্থাকারে সঞ্চিত হয়ে গেলে সে ভয় একেবারেই দূর হয়ে যায়। আর তারপরেই শুরু হয় সুন্নাহ লেখার তৎপরতা। (দ্রঃ আস্-সুন্নাহ অমাকানাতুহা)
অবশ্য বুখারী-মুসলিম প্রভৃতি সহীহ গ্রন্থ প্রায় ২০০ বছর পরে রচিত হলেও, তার মানে এই নয় যে, হাদীসগুলি ভুঁইফোঁড় হয়ে উচক্কা প্রকাশ পেয়েছে। কুরআন যেমন শুরুর দিকে হাফেযদের বুকে ও লেখকের লেখায় সংরক্ষিত ছিল এবং পরবর্তীতে তৃতীয় খলীফার আমলে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেল, তেমনি হাদীসও সুরক্ষিত ছিল এবং সঙ্গত কারণেই ‘সহীহ'রূপে পরবর্তীতে প্রকাশ পেল।
কুরআন-বিরোধী মনে হলেই হাদীস অমান্য নয়। সামঞ্জস্য সাধন করেন উলামাগণ।
কুরআনী আয়াতের মাঝে পরস্পর-বিরোধিতা ধারণা হলে কী হয়?
কুরআনী আয়াত যদি জ্ঞান-বহির্ভূত হয়, তাহলে যেমন ধানাই-পানাই অপব্যাখ্যা চলে না, তেমনি সহীহ হাদীসও।
কুরআন-ভিত্তিক যুক্তিবাদীদের জেনে রাখা দরকার যে, পাশাপাশি সুন্নাহ-ভিত্তিক যুক্তি আবশ্যক। তা না হলে এক চাকায় বাইক অচল হয়ে যাবে। কুরআন কেবল কুরআনের উপরই ভরসা করতে বলে না। কুরআন সুন্নাহ তথা হাদীসের উপরেও ভরসা করতে বলে। পাঠকের অবগতির জন্য সেই উক্তির কিছু নিম্নে উদ্ধৃত হলঃ-
মহান আল্লাহ বলেন,
وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى (۱) مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى (۲) وَمَا يَنْطِقُ عَنْ الْهَوَى (۳) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (٤) عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى (٥) سورة النجم
অর্থাৎ, শপথ নক্ষত্রের, যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। তা তো অহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। তাকে শিক্ষা দান করে চরম শক্তিশালী, (ফিরিস্তা জিব্রাঈল)। (সূরা নাজম ১-৫ আয়াত)
{ وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ } (٤٤)
অর্থাৎ, তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দাও, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে। (সূরা নাহল ৪৪ আয়াত)
وَأَنزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا }
অর্থাৎ, আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং তুমি যা জানতে না, তা তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। আর তোমার প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ রয়েছে। (সূরা নিসা ১১৩ আয়াত) আর হিকমত ও প্রজ্ঞা হল সুন্নাহ।
{قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ فَإِن تَوَلَّوا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُم مَّا حُمِّلْتُمْ وَإِن تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ} (٥٤) سورة النــــــور
অর্থাৎ, বল, 'আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসূলের আনুগত্য কর।' অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী। তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে। আর রসূলের দায়িত্ব তো কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া। (সূরা নূর ৫৪ আয়াত)
{ مَّنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَن تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا } (۸۰)
অর্থাৎ, যে রসূলের আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তাদের উপর তোমাকে প্রহরীরূপে প্রেরণ করিনি। (সূরা নিসা ৮০ আয়াত)
{قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ}
অর্থাৎ, বল, 'তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (সূরা আলে ইমরান ৩১ আয়াত)
{ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ}
অর্থাৎ, রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। (সূরা হাশর ৭ আয়াত)
{لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا}
অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। (সূরা আহযাব ২ ১ আয়াত)
{فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا} (٦٥) سورة النساء
অর্থাৎ, কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা বিশ্বাসী (মু'মিন) হতে পারবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে, অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়। (সূরা নিসা ৬৫ আয়াত)
{فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (٦٣)
অর্থাৎ, যারা তার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় অথবা কঠিন শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে। (সূরা নূর ৬৩ আয়াত)
আর মহানবী ﷺ বলেন, “শোন! আমাকে কুরআন দান করা হয়েছে এবং তারই সাথে তারই মত (সুন্নাহ) দান করা হয়েছে। শোন! সম্ভবতঃ নিজ গদিতে বসে থাকা কোন পরিতৃপ্ত লোক বলবে, 'তোমরা এই কুরআনের অনুসরণ কর; তাতে যা হালাল পাও, তাই হালাল মনে কর এবং তাতে যা হারাম পাও, তাই হারাম মনে কর। অথচ আল্লাহর রসূল যা হারাম করেন, তাও আল্লাহর হারাম করার মতই।---” (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারেমী, মিশকাত ১৬৩নং)
ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণিত, বিদায়ী হজ্জে আল্লাহর রসূল ﷺ লোকেদের মাঝে খোতবা (ভাষণ) দিলেন। তাতে তিনি বললেন, “শয়তান এ বিষয়ে নিরাশ হয়ে গেছে যে, তোমাদের এই মাটিতে তার উপাসনা হবে। কিন্তু এতদ্ব্যতীত তোমরা যে সমস্ত কর্মসমূহকে অবজ্ঞা কর, তাতে তার আনুগত্য করা হবে---এ নিয়ে সে সন্তুষ্ট। সুতরাং তোমরা সতর্ক থেকো! অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি; যদি তা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করে থাকো তবে কখনই তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না; আর তা হল আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ (কুরআন ও হাদীস)” (হাকেম, সহীহ তারগীব ৩৬নং)
সুতরাং যে তফসীরকারী তাহকীক করবেন, তাঁর উচিত নয়, নিজের রায় দ্বারা তফসীর লেখা বা প্রচার করা; যদি সেখানে সলফ কর্তৃক তফসীর বর্ণিত থাকে। আর নবী ﷺ কর্তৃক সহীহ সনদে তা বর্ণিত থাকলে তো তার বিপরীত কোন তফসীরই গ্রহণযোগ্য হবে না।
হকপন্থী মুসলিমদের মাঝে এ কথা অবিসংবাদিত যে, সহীহ সুন্নাহ শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস। এ উৎস থেকেও মুসলিমদেরকে গায়বী বিষয়ে, আকীদাগত বিষয়ে, আহকামগত বিষয়ে, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং অন্যান্য নীতি ও তরবিয়তগত জীবনের যাবতীয় বিষয়ে বিধান গ্রহণ করতে হবে। কোন যুক্তি, রায় বা ইজতিহাদের অসীলায় কোন অবস্থায় তা প্রত্যাখ্যান করা যাবে না।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেছেন,
" لا يحل القياس والخبر موجود.
অর্থাৎ, হাদীস থাকতে কোন কিয়াস বা অনুমিতি বৈধ নয়। (আর-রিসালাহ ২/৬৭)
উসূলের উলামাগণ বলেন,
" إذا ورد الأثر بطل النظر . " " لا اجتهاد في مورد النص.
অর্থাৎ, হাদীস এসে গেলে যুক্তি-বিবেচনা বাতিল। স্পষ্ট উক্তির সামনে কোন ইজতিহাদ চলবে না। (মাউসূআতু উসূলিল ফিকুহ ৫৬/৩২৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ৫/৬ ১২)
মোটকথা, কোন শরয়ী বিষয়ে বিবেচকদের উচিত, প্রথমতঃ তার যোগ্যতা অর্জন করা। অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহকে পাশাপাশি রেখে উভয়-ভিত্তিক যুক্তিবাদী হওয়া। নচেৎ ভ্রষ্টতা স্বাভাবিক।
আর হ্যাঁ, 'হাদীস মানি' বলে ইচ্ছামতো মানলে হবে না। বরং যে হাদীস সহীহভাবে প্রমাণিত তার প্রত্যেকটা মানতে হবে; যদি না তা মনসূখ হয়।
সহীহ হাদীসের কোন ফায়সালা বাহ্যতঃ কুরআন-বিরোধী মনে হলে কী করবেন?
চট্ ক'রে তা অস্বীকার ক'রে বসলে হবে না যে, এটা হাদীস নয়।
উদাহরণ স্বরূপ আপনি হাদীস পড়লেন,
উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, “মৃত ব্যক্তিকে তার কবরের মধ্যে তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করার দরুন শাস্তি দেওয়া হবে।” (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত ১৭৪২নং) অন্য এক বর্ণনায় আছে, “যতক্ষণ তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করা হয়, (ততক্ষণ মৃতব্যক্তির আযাব হয়)।”
অবশ্যই মনে সমস্যা দেখা দেবে ও মনে হবে যে, এ হাদীসটি কুরআনের পরিপন্থী। কারণ, মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى} (١٦٤) سورة الأنعام
অর্থাৎ, প্রত্যেকেই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে এবং কেউ অন্য কারো ভার বহন করবে না। (সূরা আনআম ১৬৪ আয়াত)
এখন হাদীসটির প্রতি সন্দেহ হলে তা তো সহীহ হাদীস, তাকে রদ করার উপায় নেই। সুতরাং সমন্বয়-সাধনের পথ অবলম্বন করতে হবে। দেখতে হবে হাদীসের ব্যাখ্যাতাগণ কী বলেছেন।
দেখা যাবে, তাঁরা হাদীসের প্রেক্ষাপট বর্ণনা-সহ তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ঐ কান্নায় যদি মৃতব্যক্তির কোন প্রকার সহযোগিতা থাকে, তাহলে তার নিজস্ব কারণঘটিত অপরাধের ফলে তাকে কবরে আযাব ভোগ করতে হবে।
জাহেলী যুগে মৃতব্যক্তি মরার পূর্বে মাতম ক'রে কান্নার অসিয়ত ক'রে মরত, যাতে মরণের পরে তার চর্চা হয়।
অথবা মরণের পূর্বে সে তার আত্মীয়-স্বজনকে মাতম ক'রে কান্না করতে নিষেধ ক'রে মরেনি। তাতে সে শৈথিল্য প্রদর্শন করেছিল। অথচ সে জানত যে, তার পরিবারে মাতম ক'রে কান্নার রেওয়াজ আছে।
এর ফলে সে মহান আল্লাহর এই নির্দেশ পালন করেনি,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ} (٦) سورة التحريم
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর অগ্নি হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফিরিস্তাগণ, যারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। (সূরা তাহরীম ৬ আয়াত)
তাছাড়া এই শ্রেণীর পাপ সেই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যাতে বলা হয়েছে,
لِيَحْمِلُوا أَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمِنْ أَوْزَارِ الَّذِينَ يُضِلُّونَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ أَلَا سَاءِ مَا يَزِرُونَ}
অর্থাৎ, ফলে কিয়ামত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণমাত্রায় এবং তাদেরও পাপভার যাদেরকে তারা অজ্ঞতা হেতু বিভ্রান্ত করেছে। দেখ, তারা যা বহন করবে, তা কতই না নিকৃষ্ট। (সূরা নাহল ২৫ আয়াত)
এই শ্রেণীর তাহকীক করলে সহীহ হাদীসকে রদ করার মত পর্যায় আসবে না।
ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন, 'মুসলিমকে যা বিশ্বাস করা ওয়াজেব তা এই যে, আল্লাহর রসূল ﷺ-এর এমন কোন একটিও সহীহ হাদীস নেই, যা আল্লাহর কিতাবের পরিপন্থী হতে পারে। বরং আল্লাহর কিতাবের সাথে হাদীস হল তিন স্তরেরঃ-
প্রথমঃ কুরআনের অনুসারী; কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্য একই।
দ্বিতীয়ঃ কুরআনের ব্যাখ্যা; যা আল্লাহর উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে এবং ব্যাপক বর্ণনা নির্দিষ্ট করে।
তৃতীয়ঃ এমন এক বিধানের বর্ণনা, যার ব্যাপারে কুরআন নীরব আছে।
এই তিন শ্রেণীর সুন্নাহর মধ্যে কোন শ্রেণীকে প্রত্যাখ্যান করা বৈধ নয়। আর সুন্নাহর কোন চতুর্থ স্তরও নেই।.....
কুরআনের বাহ্যিক অর্থ বুঝে যদি মানুষ সুন্নাহ বর্জন করা বৈধ মনে করে, তাহলে এর ভিত্তিতে অধিকাংশ সুন্নাহ বর্জিত হবে এবং বিলকুল বাতিল গণ্য হবে।' (আত্-তুরুকুল হিকামিয়্যাহ ১০ ১পৃঃ)
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'কোন অবস্থাতেই আল্লাহর রসূলের কোন সুন্নাহ আল্লাহর কিতাবের পরিপন্থী হতে পারে না। (আর-রিসালাহ ৫৪৬পৃঃ)
আমাদের সলফগণ হাদীস প্রত্যাখ্যান করাকে বড় নিন্দনীয় কাজ বলে গণ্য করেছেন। হাদীস বিরোধী বা হাদীসের বর্ণনাকারী কোন সাহাবী বিরোধী মন্তব্যকে ভ্রষ্টতা বলে বিবেচনা করেছেন।
আবূ ক্বিলাবাহ বলেন, যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে কোন হাদীস বর্ণনা করবে এবং সে বলবে, 'এ কথা ছাড়ুন, কুরআনের কথা বলুন' তখন জেনে নেবে যে, সে একজন গোমরাহ লোক। (ত্বাবাক্বাতু ইবনে সা'দ ৭/১৮৪)
ইমাম যাহাবী উক্ত কথার টীকায় বলেন, আর যখন বিদআতী বক্তাকে বলতে দেখবে যে, 'কুরআন ও একক বর্ণনাকারীর বর্ণিত (খবরে ওয়াহেদ) ছাড়ো, তোমার জ্ঞান-বিবেক কী বলছে তাই মানো' তখন জেনে নেবে যে, সে আবু জাহেল। যখন কোন তাওহীদী (অদ্বৈতবাদ বা সর্বেশ্বরবাদ) মতাবলম্বী (সূফী) কে বলতে দেখবে যে, '(হাদীস) বর্ণনা ও জ্ঞান-বিবেক ছাড় এবং রুচি ও আবেগ যা বলছে তাই কর' তাহলে জেনে নেবে যে, ইবলীস মানুষের বেশে আবির্ভূত হয়েছে অথবা সে মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে। সুতরাং তাকে দেখে যদি তুমি ভয় পাও, তাহলে সেখান হতে পলায়ন কর। নচেৎ তাকে চিৎ করে ফেলে তার বুকে বসে তার উপর আয়াতুল কুরসী পড় এবং গলা টিপে তাকে (সেই ইবলীসকে) হত্যা কর। (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' ৪/৪৭২)
মুহাদ্দিস হাসান বিন আলী আল-বাবাহারী বলেন, 'যখন তুমি কাউকে দেখ যে, সে আল্লাহর রসূল ﷺ-এর সাহাবাবর্গের মধ্যে কোন সাহাবীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করছে, তখন জেনে নিও সে ব্যক্তি প্রবৃত্তিপূজারী বিদআতী।' (শারহুস্ সুন্নাহ, বাবাহারী ১১৫পৃঃ ১৩৩ নং)
তিনি আরো বলেন, 'যখন কাউকে শোনো যে, সে হাদীসের বিরুদ্ধে কটূক্তি করছে অথবা হাদীস প্রত্যাখ্যান করছে অথবা হাদীস ছাড়া অন্য কিছু মানতে চাচ্ছে, তখন তার ইসলামে সন্দেহ করো। আর সে যে একজন প্রবৃত্তিপূজক বিদআতী তাতে কোন সন্দেহই করো না।' (ঐ ১১৫-১১৬পৃঃ, ১৩৪নং, শারহুস সুন্নাহ ৫১পৃঃ)

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 বুখারী-মুসলিমের মর্যাদা

📄 বুখারী-মুসলিমের মর্যাদা


নূর আলমী যুক্তিবাদীরা বলেন, 'যাঁরা উক্ত হাদীস নামক (?) গ্রন্থগুলির মধ্য থেকে জাল-ভুল-যয়ীফ ইত্যাদি বের করেন অথচ তাঁরাই গ্রন্থগুলিকে সহীহ সাব্যস্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এটা বড়ই যুক্তিহীন কর্ম।' (তত্ত্ব......২৩পৃঃ)
বটে যুক্তিবাদী! সোনা থেকে খাদ বের ক'রে খাঁটি সোনা ব্যবহার করা যুক্তিহীন কর্ম? ক্ষেত থেকে আগাছা বেছে ফেলে খাঁটি ফসল ব্যবহার করা অযৌক্তিক কর্ম? নাকি সোনা থেকে খাদ বের ক'রে পুরো সোনাটাও ফেলে দেওয়া যুক্তিহীন কর্ম? ক্ষেত থেকে আগাছা বেছে ফেলে পুরো ফসল বর্জন করা অযৌক্তিক কর্ম? কোন্টা জ্ঞানীদের এবং কোন্টা মূর্খদের কাজ?
নূর আলম সাহেব বলেন, 'ইতিহাস বিষয়ে যদি কোন গ্রন্থের মধ্যে জাল ও ভুল ধরা পড়ে, তাহলে সেই গ্রন্থটি আইনত সহীহ বলে দাবী করার অধিকার হারিয়ে বসে।' (তত্ত্ব... ২৩পৃঃ)
আর যদি ভুল যে ধরেছে, তারই ভুল হয়, তাহলে? সে ভুল যদি ভাঙ্গা যায়, তাহলে?
বুখারী গ্রন্থের যে ভুল যুক্তিবাদীরা বের করেছেন, তা আসলে বহু পূর্বেই ভাঙ্গা হয়েছে। কিন্তু দেখা বা অধ্যয়ন করার তওফীক তো তাঁদের হয়নি। কেবল অনুবাদ পড়ে কি যুক্তিবাদী হওয়া যায়? কুরআনের তফসীর ও হাদীসের শারাহ না পড়ে কি কুরআন-হাদীস বুঝা যায়?
'মূল কোরআন শরীফ ও হাদীছ বুঝিতে সক্ষম নয়, অনুবাদের উপর নির্ভরশীল; অথবা কোরআন-সুন্নাহর কেবল বিভিন্ন অংশ বিশেষের জ্ঞানই শেষ সীমা---এই শ্রেণীর ধার করা বা আংশিক জ্ঞানের পুঁজি লইয়া যাহারা ইজতেহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হয় তাহাদের কার্য অনধিকার চর্চা বৈ আর কিছুই নহে। এই শ্রেণীর অনধিকার চর্চার অভিলাষীদের সতর্ক করার জন্য ইমাম বোখারী (রঃ) পরবর্তী একটি পরিচ্ছেদে ইঙ্গিত করিয়াছেন যে, ঐ শ্রেণীর লোকদের অস্তিত্ব মুসলিম সমাজের জন্য আল্লাহর আযাব বটে।' (বাংলা বুখারী শরীফ ৭/২১৩)
বুখারী উম্মুল কুরআন?
'কোরাণে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু অন্য কোন গ্রন্থকে সহীহ জ্ঞান করলে তা কুরআনের সমকক্ষ বলে জ্ঞান হয়ে যায়---' (তত্ত্ব... ২৪৪পৃঃ) যুক্তিবাদীদের এ যুক্তি অত্যুক্তি ছাড়া কিছু নয়। নবী ﷺ-কে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ বলি, অতঃপর আবু বাক্স (রাঃ)-কে যদি সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবী বলি, তাহলে তাতে কি আবু বাক্সকে নবীর সমান জ্ঞান করা হয়? ইসলামের মনীষীগণ বলেন, 'আস্বাহহুল কুতুবি বা'দা কিতাবিল্লাহি স্বাহীহুল বুখারী।' অর্থাৎ, আল্লাহর কিতাবের পর সবচেয়ে সহীহ গ্রন্থ হল সহীহ বুখারী। যেমন তাঁরা বলেন, 'আফযালুন না-সি বা'দা রাসূলিল্লাহি আবূ বাক্স আস-সিদ্দীক্ব।' অর্থাৎ, আল্লাহর রসূল ﷺ-এর পরে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন আবু বাক্ সিদ্দীক (রাঃ)। তাতে তো কোন প্রকার সমকক্ষতা পরিদৃষ্ট হয় না।
পক্ষান্তরে যে আলেমরা সহীহ বুখারীকে 'উম্মুল কুরআন' বা কুরআনের মা বলেন, (তত্ত্ব... ৩৫পৃঃ দ্রঃ) তাঁরা নিশ্চয় জাহেল অথবা এটি ধারণাপ্রসূত একটি রটনা। কারণ হাদীসে সূরা ফাতিহাকেই উম্মুল কুরআন বলা হয়েছে, অন্য কিছুকে নয়।
বুখারী-মুসলিমের সমালোচনা
এ বিশ্বে এমন কোন কিতাব নেই যার বিষয়ে মানুষ সন্দেহ করেনি, তার সমালোচনা করা হয়নি। স্বয়ং আল্লাহর কিতাবকে মানুষ সন্দেহ করেছে, তার সমালোচনা করেছে। আল্লাহর কিতাবের পর মর্যাদায় রয়েছে দু'টি গ্রন্থ বুখারী ও মুসলিম। এ দুইয়ের সমালোচনা তো হবেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ ব্যাপারে ঘরের চিরাগে ঘর পুড়েছে, অর্থাৎ অমুসলিমদের সাথে সাথ দিয়ে অথবা সায়ে সায় দিয়ে অথবা তাদের সমালোচনার খণ্ডন না করতে পেরে কিছু মুসলিম উলামাও উক্ত গ্রন্থদ্বয়ের সমালোচনা করেছেন!
যাঁরা সহীহায়ন বুখারী-মুসলিমের সমালোচনা করেছেন, তাঁদেরকে আমরা দু'ভাগে ভাগ করতে পারি:-
এক: যাঁরা সহীহায়নের সনদের সমালোচনা করেছেন। আর তাঁদের জবাব ফাতহুল বারী ও শারহে নাওয়াবীতে দেওয়া হয়েছে।
দুই: অধুনা বিশ্বের কিছু আলেম-উলামা, যাঁদের অধিকাংশ বিদআতী, আকলানী, ইবাযী ও শিয়াগণ সহীহায়নের বহু হাদীসকে সরাসরি অস্বীকার করেছেন। কারণ, সে সকল হাদীস তাঁদের মযহাবের, মতের ও আক্কেলের অনুকূলে নয় তাই। আর তাঁদেরই ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে কিছু হিদায়াতী উলামার মাঝেও, ফলে তাঁদের দেখাদেখি প্রাচীনতার মাঝে আধুনিকতা প্রদর্শনের প্রয়াসে সহীহায়নে ভুল ও জাল হাদীস প্রমাণ ক'রে 'হাদীস-বাহাদুর' সাজতে চেয়েছেন!
পাশ্চাত্যের উন্নয়নমুগ্ধ কিছু আলেম তাদের স্বেচ্ছাচারী চিন্তাধারায় প্রভাবান্বিত হয়ে সহীহায়নে নাপাক তীর মারলেও সে তীর উক্ত গ্রন্থদ্বয়ের সুউচ্চ মর্যাদায় পৌঁছবে না। কারণ সে গ্রন্থদ্বয়ের অবস্থান হল আকাশের ঝলমলে তারকার মাঝে। আর সেদিকে থুথু মারলে সে থুথু নিজের গায়ে এসে পড়বে, তার দিকে ধুলো ছুঁড়লে সে ধুলো নিজের চোখে এসে পড়বে।
পক্ষান্তরে সহীহায়নের শ্লীলতাহানি করা নিশ্চয় কোন ছোট অপরাধ নয়, সহীহ সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা নিশ্চয় কোন হাল্কা পাপ নয়। যে সুন্নাহকে মুসলিম উম্মাহ বরণীয় বলে মেনে নিয়ে আমল করছে, সেই সুন্নাহকে তাচ্ছিল্য করা কোন সহজ দুঃসাহসিকতা নয়।
সহীহায়নের মর্যাদার ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর অনুসরণীয় উলামাগণ কী বলেন শুনুনঃ-
হাফেয আবু নাস্ত্র ওয়ায়েলী বলেন, 'আহলে ইল্ম তথা ফুকাহাগণ এ কথায় একমত যে, যদি কেউ কসম ক'রে বলে, 'বুখারীতে যত হাদীস এসেছে, তার সবগুলি সহীহ, নিঃসন্দেহে সেগুলি আল্লাহর রসূল ﷺ-এর মুখনিঃসৃত বাণী, এ কথা সত্য না হলে আমার স্ত্রী তালাক।' তাহলে তার স্ত্রীর তালাক হবে না। (উলূমুল হাদীস ২২পৃঃ)
ইমামুল হারামাইন বলেন, যদি কেউ কসম খেয়ে বলে যে, 'বুখারী-মুসলিমে যত হাদীস এসেছে তার সবগুলি নবী ﷺ-এর উক্তি; তা না হলে আমার স্ত্রী তালাক।' তাহলে তালাক হবে না। যেহেতু উক্ত দুই কিতাবের সহীহ হওয়ার ব্যাপারে মুসলিমদের উলামাগণ একমত। (তাদরীবুর রাবী ১/১৩১-১৩২)
আবু ইসহাক ইসফারাইনী বলেন, 'হাদীস-বিশেষজ্ঞগণ এ ব্যাপারে একমত যে, বুখারী-মুসলিমের 'উসূল' ও 'মতন'-এ যত হাদীস আছে, নিঃসন্দেহে তা সহীহ।' (ফাতহুল মুগীস ১/৪৭)
ইবনে স্বালাহও প্রায় একই কথা বলেন। (দেখুনঃ শারহুন নাওয়াবী ১/১৯)
ইমাম নাওয়াবী বলেন, 'উলামা (রাহিমাহুমুল্লাহ)গণ এ ব্যাপারে একমত যে, কুরআনে আযীযের পর সবচেয়ে বেশী সহীহ কিতাব হল সহীহায়ন বুখারী ও মুসলিম। যেহেতু উম্মাহ (সহীহরূপে) তা বরণ ক'রে নিয়েছে।' (ঐ ১/১৪)
তিনি অন্যত্র বলেন, 'উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, এই কিতাবদ্বয় সহীহ এবং উভয়ের ভিত্তিতে আমল ওয়াজেব।' (তাহযীবুল আসমা অল-লুগাত ১/৭৩)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, 'আকাশের নিচে কুরআনের পর বুখারী-মুসলিম ছাড়া অন্য কোন কিতাব সবচেয়ে বেশী সহীহ নয়।' (মাকানাতুস সহীহায়ন ৬পৃঃ)
হাফেয মুহাদ্দিস আল-আলাঈ বলেন, 'উম্মত এ ব্যাপারে একমত যে, বুখারী ও মুসলিম তাঁদের কিতাব সহীহায়নে সনদসহ যে সকল হাদীস বর্ণনা করেছেন, তার সবটাই সহীহ, তা পুনঃ বিবেচ্য নয়।' (আন-নাক্বদুস সাহীহ, মুলতাক্ব আহলিল হাদীস ৮৮/৪৩৮ দ্রঃ)
শায়খ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী বলেন, 'বুখারী-মুসলিমের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ একমত যে, উভয় গ্রন্থে যে মুত্তাসিল মারফু হাদীস রয়েছে, তা সুনিশ্চিতভাবে সহীহ। উক্ত গ্রন্থদ্বয় গ্রন্থকার পর্যন্ত মুতাওয়াতির। যে ব্যক্তি উভয়ের ব্যাপারে অবজ্ঞা প্রদর্শন করবে, সে ব্যক্তি বিদআতী এবং মু'মিনীনদের পথ ছেড়ে অন্য পথের অনুসারী।' (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ১/২৮৩)
শায়খ আহমাদ শাকের বলেন, 'হাদীস বিষয়ক তাহকীককারী আহলে ইল্ম এবং দলীল দেখে তাঁদের পথ অনুসরণকারীদের নিকট সন্দেহহীন হক কথা এই যে, সহীহায়নের সমস্ত হাদীসই সহীহ। এর মধ্যে কোন একটি হাদীসের মধ্যে কোন খোঁচা মারা বা দুর্বলতার স্থান নেই। অবশ্য দারাকুত্বনী প্রমুখ কিছু হাদীসের হাফেযগণ তার কিছু হাদীসের সমালোচনা করেছেন। আর তা এই অর্থে যে, তাঁরা উভয়ে সহীহর যে শর্তে গ্রন্থ রচনা করেছেন, সেই শর্ত সব হাদীসের ক্ষেত্রে পূরণ হয়নি; অর্থাৎ, সব হাদীসগুলি উচ্চ পর্যায়ের সহীহ নয়। পক্ষান্তরে হাদীস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে কেউ মতবিরোধ করেননি।
সুতরাং রটনাকারীদের রটনা এবং ধারণাকারীদের ধারণা যেন আপনাকে শঙ্কিত না করে যে, সহীহায়নের হাদীস সহীহ নয়।' (আল-বাইসুল হাসীস ২৯পৃঃ)
ইমাম নাওয়াবী (রঃ)-এর অভিমত হলঃ-
১। বুখারী-মুসলিমের হাদীসসমূহকে উম্মাহ সাদরে গ্রহণ ক’রে নিয়েছে।
২। উভয় গ্রন্থের সকল হাদীসের উপর আমল ওয়াজেব।
৩। গ্রন্থ দু'টি কুরআনে আযীমের পর সবচেয়ে বেশী সহীহ গ্রন্থ।
৪। পরবর্তীকালের উভয়ের সনদ নিয়ে কোন প্রকার চিন্তা-গবেষণার কোন প্রয়োজন নেই।
৫। মুতাওয়াতির না হলে উভয় গ্রন্থের হাদীস সুদৃঢ় ধারণা সৃষ্টি করে। (দ্রঃ শারহে মুসলিম ১৪- ১৯পৃঃ)
নূর আলম স্বভাবী যুক্তিবাদীরা বলেন, 'আমাদের মনে রাখা উচিত ছিল যে, (মুহাম্মাদ বিন) ইসমাইল বুখারীও একজন মানুষ ছিলেন, সেহেতু তিনি কখনই নির্ভুল হতে পারেন না।' (তত্ত্ব..... ২৪পৃঃ)
অতএব নির্ভুল, বুদ্ধিমান, বিজ্ঞ যুক্তিবাদীরা তাঁর গ্রন্থকে 'সহীহ' বলে মেনে নেবেন কেন? তা মানলে তো তাঁদের ভ্রান্ততা, অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার পরিচয় হবে!
বুখারীও তো তাঁদের মতই একজন মানুষ। বুখারীর ভুল হতে পারে। তবে তাঁদের ভুল হতে পারে না।
হ্যাঁ, ভুলের ঊর্ধ্বে মানুষ নেই। কিন্তু বুখারী যে সকল কথা নকল করেছেন, তাতে তো আর ভুল থাকতে পারে না। যুক্তিবাদীদের জ্ঞানে ভুল থাকতে পারে, কারণ তাঁরাই বলেন, প্রত্যেক মানুষই ভুল করে। তাহলে ঠনঠনে জ্ঞানের উপর বিশ্বাস ভাল, নাকি সনদ-সম্বলিত একটি 'সহীহ' গ্রন্থের সেই হাদীসের বক্তব্যকে বিশ্বাস করা ভাল, যার বক্তা হলেন তিনি, যাঁর (শরীয়তের ব্যাপারে) কোন ভুল নেই?
সমস্ত সহীh হাদীসের উপর আমল করা এবং যা যুক্তি-বহির্ভূত মনে হয় তার ব্যাখ্যা খোঁজা ভাল, নাকি খেয়াল-খুশী মতো সহীহ-যয়ীফের তমীয না ক'রে যেটা ইচ্ছা সেটাকে মানা এবং যেটা খুশী সেটাকে প্রত্যাখ্যান করা ভাল?
কারা বেশী বুদ্ধিমান, যাঁরা নিজেদেরকে বেশী বুদ্ধিমান মনে করেন এবং হাদীস বুঝতে না পেরে তা প্রত্যাখ্যান করেন তাঁরা, নাকি যাঁরা সহীহ হাদীসের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা রেখে আমল করেন তাঁরা? কারা প্রকৃত ঈমানদার?
নূর আলম সাহেব বলেন, 'কোরাণ বলে কোরাণের প্রতি বিশ্বাস রাখাটাই হল ইমানের কাজ। কোরাণ ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থকে বিশ্বাস করাটা ইমানদারের কাজ নয়।' (তত্ত্ব....৩৫পৃঃ)
কুরআন কোথায় বলেছে যে, কুরআন ছাড়া অন্য কিতাবে বিশ্বাস করো না। কুরআন তো পূর্বেকার সমস্ত কিতাবে ঈমান রাখতে আদেশ করে। আমল রহিত হওয়ার কথা অথবা মানুষ কর্তৃক তা বিকৃত হওয়ার কথা আলাদা। পরম্ভ হাদীসের কিতাবের ব্যাপারে কুরআন বলে,
{ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ}
অর্থাৎ, রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। (সূরা হাশ্র ৭ আয়াত)
আর বুখারী-মুসলিম ইত্যাদি কিতাবে বিশ্বাস ও আস্থা না রাখলে সে আদেশ পালন হবে কিভাবে?
কুরআন বলেছে, তাতে আছে সবকিছুর বর্ণনা। কিন্তু হাদীস নিয়েই সবকিছুর বর্ণনা শামিল আছে। নচেৎ কুরআনে অনেক কিছুর বিস্তারিত বর্ণনা নেই। একটি হাদীসে এ কথা সুস্পষ্ট হবে, ইবনে মাসউদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলতেন, '(হাত বা চেহারায়) দেগে যারা নকশা ক'রে দেয় অথবা করায়, চেহারা থেকে যারা লোম তুলে ফেলে (ভ্রূ চাঁছে), সৌন্দর্য আনার জন্য যারা দাঁতের মাঝে ঘসে (ফাঁক ফাঁক করে) এবং আল্লাহর সৃষ্টি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন ঘটায় (যাতে তাঁর অনুমতি নেই) এমন সকল মহিলাদেরকে আল্লাহ অভিশাপ করুন।'
বনী আসাদ গোত্রের উম্মে ইয়াকুব নামক এক মহিলার নিকট এ খবর পৌঁছলে সে এসে ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বলল, 'আমি শুনলাম, আপনি অমুক অমুক (কাজের) মহিলাদেরকে অভিশাপ করেছেন।' তিনি বললেন, 'যাদেরকে আল্লাহর রসূল ﷺ অভিশাপ করেছেন এবং যার উল্লেখ আল্লাহর কিতাবে রয়েছে তাদেরকে অভিশাপ করতে আমার বাধা কিসের?' উম্মে ইয়াকুব বলল, 'আমি (কুরআন মাজীদের) আদ্যোপান্ত পাঠ করেছি, কিন্তু আপনি যে কথা বলছেন---তা তো কোথাও পাইনি।' ইবনে মসউদ (রাঃ) বললেন, 'তুমি যদি (গভীরভাবে) পড়তে, তাহলে অবশ্যই সে কথা পেয়ে যেতে। তুমি কি এ আয়াত পড়নি?'
{ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا }
অর্থাৎ, রসূল তোমাদেরকে যা(র নির্দেশ) দেয় তা গ্রহণ (ও পালন) কর এবং যা নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক।” (সূরা হাশ্র ৭ আয়াত)
উম্মে ইয়াকুব বলল, 'অবশ্যই পড়েছি।' ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেন, 'তাহলে শোন, তিনি ﷺ ঐ কাজ করতে নিষেধ করেছেন।' মহিলাটি বলল, 'কিন্তু আপনার পরিবারকে তো ঐ কাজ করতে দেখেছি।' ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেন, 'আচ্ছা তুমি গিয়ে দেখ তো।'
মহিলাটি তাঁর বাড়ি গিয়ে নিজ দাবী অনুযায়ী কিছুই দেখতে পেল না। পরিশেষে ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেন, 'যদি তাই হত তাহলে আমি তার সাথে সঙ্গমই করতাম না।' (বুখারী ৪৮৮৬নং, মুসলিম ২ ১২৫নং, আসহাবে সুনান)
বুখারী শরীফে ভুল হাদীস
বুখারী-মুসলিমকে সন্দিগ্ধ কিতাব প্রমাণ করার মানসে সেই পূর্ব যুগেই 'যিনদীক' ও মু'তাযিলারা বেশ কিছু ভুল বের করার চেষ্টা করেছে, তা আসলে ঠিক 'দেখতে লারি চলন বাঁকা'র মতোই। আর সেই যুক্তি নিয়েই চর্বিত-চর্বণ করছেন বর্তমানের যুক্তিবাদীরা। এ ব্যাপারে বুখারীর অনুবাদক মাওলানা আজীজুল হক সাহেব বলেন, “খাঁ মরহুম তাঁহার এই অপচেষ্টার পথ পরিষ্কারে স্থায়ী ব্যবস্থারূপে তাঁহার মোস্তফা চরিত গ্রন্থের সুদীর্ঘ উপক্রমণিকার কয়েকটি পরিচ্ছেদ ব্যয় করিয়াছেন। তাতে তিনি দুইটি জঘন্য বিষ সৃষ্টির চেষ্টা করিয়াছেন। একটি হইল---মুসলিম জাতির গৌরব, ইসলামের শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুরক্ষক, অতন্দ্র প্রহরী কুরআন-হাদীছ বিশেষজ্ঞ পূর্ববর্তী মহান ইমামগণকে শুধু উপেক্ষা ও কটাক্ষ করাই নহে; বরং তাহাদিগকে সমাজের নিকট পরিত্যাজ্য সাব্যস্ত করিবার জন্য অশালীন ভাষা প্রয়োগ করিয়াছেন। আর একটি হইল---মনীষী ইমামগণের জীবন সাধনালব্ধ মূল্যবান জ্ঞান-গবেষণার প্রতিও সমাজের আস্থা ভাঙ্গিয়া দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন।
তিনি তাঁহার দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে মাকালরূপী কতকগুলি যুক্তি সত্যের আবরণীতে ব্যক্ত করিয়াছেন। সেই যুক্তিগুলির ভিতরেও বিষ ঢুকাইয়াছেন অনেক। যদ্বারা তিনি সীমাহীন ধৃষ্টতায় পৌছিয়াছেন যে, তৃতীয় পরিচ্ছেদে পরিষ্কার ভাষায় ইসলাম ও মুসলিম জাতির গৌরব পূর্বতন আলেম এবং ইমামগণ সম্পর্কে বলিয়াছেন- 'বোযর্গানে দ্বীন ও সলফে সালেহীন' বলিয়া মুসলমান সমাজে যেসকল 'তাগুতের' সৃষ্টি করা হইয়াছে, তাহাই হইতেছে সর্বনাশের মূল।
পাঠক! আপনারা ভাবিতে পারেন এবং মরহুম এই ধারণা সৃষ্টির অপচেষ্টা করিয়াছেনও বটে যে, তাঁহার কটাক্ষ ও আক্রোশ শুধু কল্পিত ও ভুয়া বুজুর্গদের সম্পর্কে এবং নবীজী সাঃ-এর জীবনী সংক্রান্ত রচিত অপ্রামাণিক উর্দু, ফার্সী চটি বই-পুস্তক সম্পর্কে সীমাবদ্ধ।
খাঁ মরহুমের পান্ডিত্য ও বাকপটুতার আবরণে অসংখ্য ধোঁকা-ফাঁকির ইহাও একটি। তাঁহার অসার পেঁচালো মন্তব্যসমূহে তিনি ঐরূপ হাবভাব দেখাইয়া এবং ঐ শ্রেণীর শব্দ ব্যবহার করিয়া সমাজের ধিক্কার ও ক্ষোভ হইতে গা-ঢাকা দেওয়ার মতলب করিয়াছেন মাত্র। প্রকৃত প্রস্তাবে তাঁহার উদ্দেশ্যে ঐরূপ সীমাবদ্ধ নহে।
প্রথমতঃ পূর্ব যুগে 'ইমাম' আখ্যার ভুয়া কল্পিত পাত্র ছিল বলিয়া কোন ইতিহাস আমাদের জানা নাই। তবে আলেম ও পীর নামের ভুয়া লোক থাকা স্বাভাবিক। জগতের অন্যান্য শ্রেণীতেও তাহা আছে; যেমন, ডাক্তার, আইনজ্ঞ, বিভিন্ন প্রকাশক ইত্যাদিতেও ভুয়া ব্যক্তি আছে; সেই জন্য তাহাদিগকে শ্রেণীগতভাবে গালি দিয়া তাহাদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টির উক্তি কি ক্ষমার যোগ্য হইবে?.............
দ্বিতীয়তঃ খাঁ মরহুম প্রকৃত প্রস্তাবে ভুয়া ও কল্পিত বুজুর্গ নামীয় চুনোপুঁটি আটকাইবার জন্য সুবৃহৎ উপক্রমণিকার জাল ফেলেন নাই; তিনি ইমাম বোখারী, ইমাম মুসলিমের ন্যায় বড় বড় মোহাদ্দেস, ইসলাম ও মুসলিম জাতির গৌরব---রুই-কাতলা আটকাইবার উদ্দেশ্যে ঐ জাল ফেলিয়াছেন। তিনি উর্দু-ফারসী চটি বই মুছিবার জন্য এত এত পান্ডিত্য ব্যয় করেন নাই। তিনি ৬০০-৭০০ বৎসর হইতে প্রচলিত ৪০০০-৬০০০ পৃষ্ঠায় রচিত সুপ্রসিদ্ধ মোহাদ্দেস ও মোফাসসেরগণের জ্ঞানগর্ভময় জাতীয় সম্পদ ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলীকে উপেক্ষণীয় ও প্রক্ষিপ্ত সাব্যস্ত করার কুমতলব আটিয়াছেন।”
ক্ষোভ ও দুঃখের সীমা থাকিতে পারে কি? খাঁ মরহুম মাকড়সার জালের আশ্রয় লইয়া পাহাড়ের সহিত টক্কর দেওয়ার ন্যায় যেসব ছুতার আঁচল ধরিয়া বোখারী শরীফের হাদীছকে ভুল সাব্যস্ত করিয়াছেন, ঐসব কোনটাই তাঁহার আবিষ্কার নহে। মুসলিম জাতির ঈমানী বিশ্বাসকে শিথিল করিয়া তাহাদের দুর্বল করার সম্ভাব্য চেষ্টারূপে যেসব ছল-ছুতার জন্ম দেওয়া যাইতে পারে, উম্মতের হিতৈষীগণ পূর্ব আমলেই সেই সবের উদ্‌ঘাটন করিয়াছেন এবং বোখারী শরীফের গবেষণাকারীগণ নিজ নিজ রচনায় ঐ সবের ধূম্রজাল ছিন্ন করিয়া গিয়াছেন।
পন্ডিত খাঁ মরহুম কোথাও বিষজনিত ঐ সব ছল-ছুতার খোঁজ পাইয়াছেন; কিন্তু হাদীছ শাস্ত্রে তাঁহার জ্ঞান-গবেষণার দৌড় তাঁহাকে বোখারী শরীফের উল্লিখিত ব্যাখ্যা গ্রন্থসমূহ পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারে নাই। ফলে তিনি ঐ বিষয়ে প্রতিষেধক হইতে বঞ্চিত থাকিয়া গিয়াছেন এবং বাংলাভাষী ভাইদের জন্য ঐ বিষ আমদানী করিয়াছেন। বাংলাভাষী পাঠক ভাইগণ হাদীছ শাস্ত্রের কী জ্ঞান রাখেন যে, তাঁহারা এই বিষয়ে প্রতিষেধক খোঁজ করিয়া বাহির করিবেন? আরও পরিতাপের বিষয়---ভাষা সম্রাট বাক্সটু পন্ডিত খাঁ মরহুম নিজ প্রতিভা দ্বারা বিষকে এমন সুন্দর সাজে সাজাইয়াছেন হাদীছ শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ বাংলাভাষী পাঠক তাহা গলাধঃকরণ করিবেই। সুতরাং খাঁ মরহুম তাঁহার এই অপকর্ম দ্বারা বাংলাভাষী মুসলিম সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি করিয়াছেন; তাহাদের জন্য শুধু বিষের দোকান সাজাইয়া গিয়াছেন।
নবীগণের মোজেযা অস্বীকারের ন্যায় খাঁ মরহুম আরও অনেক সত্যকে অস্বীকার করিতেন। যথা---জ্বিন জাতির অস্তিত্ব, ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পৰ্কীয় অনেক তথ্য; ঈসা আলাইহিস সালামের কোন কোন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি। বোখারী-মুসলিম শরীফ এবং হাদীছ ভান্ডারের অনেক হাদীছ ঐ সত্য অস্বীকার করার অন্তরায় হয়; সে বাধা অপসারণে খাঁ মরহুম বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের ন্যায় মহাগ্রন্থাবলীকে ঘায়েল করার এই অপচেষ্টা করিয়াছেন। এতদ্ভিন্ন খাঁ মরহুমের তফসীর নামে পবিত্র কুরআনের অপব্যাখ্যা এবং 'মোস্তফা চরিত' পাঠ করিলে মনে হয় যেন বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের ন্যায় মহাগ্রন্থসমূহের হাদীছ অস্বীকার ও ভুল সাব্যস্ত করিয়া তিনি বাহাদুরী দেখাইবার স্বাদ অনুভব করিতেন। যেমন, কেহ পিতাকে খুন করিয়া বিশ্ব-রেকর্ড স্থাপন করার আনন্দ উপভোগ করে।
বাংলা বোখারী শরীফ তৃতীয় ও চতুর্থ খন্ডে ঐরূপ কোন কোন হাদীছ অস্বীকার এবং তাহা খন্ডনের বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে। এস্থলে সংক্ষেপে শুধু ঐ হাদীছ সম্পর্কে আলোচনা হইবে যাহা তিনি মোস্তফা চরিতের উপক্রমণিকায় তাঁহার কথিত হাদীছ 'পরীক্ষার নূতন ধারা' পরিচ্ছেদের ভুল হাদীসের নমুনারূপে পেশ করিয়া বলিয়াছেন 'সনদ সহীহ হওয়া সত্ত্বেও ঐ হাদীছগুলি নির্দোষ, প্রকৃত এবং সত্য হাদীছ বলিয়া কোন মতেই গৃহীত হইতে পারে না!'
বোখারী মুসলিম শরীফের হাদীছ সম্পর্কে এই দাবী যে, সত্য হাদীছ বলিয়া কোন মতেই গৃহীত হইতে পারে না; তাহাও নেহাত তুচ্ছ হেতুর অজুহাতে ইহা জঘন্য ধৃষ্টতা বৈ নহে।
খাঁ মরহুমের ভাষায় 'প্রথম প্রমাণ' অর্থাৎ বোখারী ও মুসলিম শরীফে যে ভুল হাদীছ রহিয়াছে তাহার প্রথম প্রমাণ বা নমুনা 'আনাছ রাঃ বলিতেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ ....} (٢) سورة الحجرات
'হে মোমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর আপনাদের স্বর উর্ধ্বে চড়াইও না....।”
এই আয়াতটি নাযিল হইলে সাবেত বিন কায়েস ছাহাবীর খুব ভয় হইল; তাঁহার কণ্ঠস্বর স্বভাবতঃ খুব উচ্চ ছিল। তাই তিনি হযরতের খেদমতে উপস্থিত হন না, বাড়ীতে থাকেন। কয়েক দিন ঐভাবে অতীত হইলে হযরত (সঃ) সাদ বিন মোআয নামক ছাহাবীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সাবেতকে দেখি না কেন, তাহার কি অসুখ হইয়াছে? সা'দ বিন মোআয সাবেতের বাড়িতে গমন করিলেন ও সাবেতকে হযরতের প্রশ্নের কথা জানাইলেন। সাবেত নিজের কণ্ঠস্বর ও সদ্য অবতীর্ণ উক্ত আয়াতের কথা উল্লেখ করিয়া নিজের নরকী হওয়ার আশঙ্কা জানাইলেন। সা'দ বিন মোআয সাবেতের আশঙ্কা প্রকাশ নবীজী সঃ কে জ্ঞাত করিলেন। তিনি বললেন, বরং সে বেহেস্তী।'
খাঁ মরহুমের বক্তব্য, এই হাদীছটি সত্য হইতে পারে না। কারণ, ঘটনায় উল্লিখিত আয়াতটি নবম হিজরীতে নাযিল হয়, আর সা'দ বিন মোআযের মৃত্যু হিজরী পঞ্চম সনে।
পাঠকবর্গ! হাদীছখানাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করার একটি ভিত্তি হইল, হাদীছটির আলোচ্য আয়াত নবম হিজরী সনে নাযিল হইয়াছে---এই বিষয়টি বিতর্কমূলক। প্রসিদ্ধ হাফেযে হাদীছ ইবনে হাজার (রঃ) ভিন্ন মতের অবকাশ দেখাইয়াছেন।
খাঁ মরহুম বোখারী শরীফ তফসীর অধ্যায়ের যে হাদীসের বরাত দিয়াছেন, বোখারী শরীফের উক্ত পৃষ্ঠায়ই হাফেয ইবনে হাজারের অবকাশ প্রকাশের সমর্থন বিদ্যমান রহিয়াছে। বিতর্কমূলক একটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া হাদীছকে অবাস্তব-অসত্য বলা ক্ষমাহীন অপরাধ নহে কি?
আরও একটি বিষয় সুস্পষ্ট হইল যে, ৬০০ শত বৎসর পূর্বে বোখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার হাফেয ইবনে হাজার (রঃ) যে প্রশ্নের খন্ডন করিয়া গিয়াছেন সেই প্রশ্নের মৃত লাশ বাহির করিয়া হাদীছ শাস্ত্রের অভিজ্ঞতাহীন বাংলাভাষী পাঠকদিগকে বিভ্রান্ত করা হইয়াছে---ইহা অপরাধ নহে কি?
হাফেয ইবনে হাজার (রঃ) যে ধারায় প্রশ্নের খন্ডন করিয়াছেন তাহা হাদীছ ও তফসীরের শাস্ত্রীয় অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল। আমরা অন্য একটি সরল সহজ পয়েন্ট পেশ করিতেছি---তাহাও পূর্ব আমলের গবেষকগণই বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন।
আলোচ্য হাদীছখানা বোখারী শরীফের দুই স্থানে ৫১০ ও ৭১৮ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে একই সনদ তথা সাক্ষ্য সূত্রে। মুসলিম শরীফে হাদীছখানা একই জায়গায় পর পর ৪টি সনদে বর্ণিত হইয়াছে। (৩২৯-৩৩২নং হাদীস দ্রষ্টব্য) অতএব হাদীছখানার মোট সাক্ষ্য সূত্র বা সনদ হইল পাঁচটি।
পাঠক! ইহা একটি মহা সত্য যে, হাদীছকে তাহার আসল জায়গায় সরাসরিভাবে গবেষণা না করিয়া শুধু ধার করা জ্ঞানে তথা উদ্ধৃতি বা অনুবাদ দেখিয়া কোন হাদীছ সম্পর্কে মুখ খোলা মহাপাপ। এই মহাপাপের পরিণাম এখানে লক্ষ্য করুন। মরহুম খাঁ সাহেব একজন বিশিষ্ট পন্ডিত ও স্বভাব-জ্ঞানী ছিলেন। তিনি বোখারী শরীফ মূল গ্রন্থ হইতে দূরে থাকিয়া শুধু উদ্ধৃতি দেখার ধার করা জ্ঞানে দূর হইতে ঢিল ছুঁড়িয়াছেন। নতুবা তিনি উল্লিখিত হাদীসের সমালোচনা করিতে বোখারী শরীফের নাম মুখে বা লেখনীতে আনিতেন না। কারণ, তাঁহার সমালোচনার দ্বিতীয় ভিত্তি ছিল হাদীছটির বর্ণনায় সা'দ বিন মোআযের উল্লেখ; যেহেতু তার মৃত্যু হিজরী পঞ্চম সনে। পাঠক শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইবেন যে, বোখারী শরীফের দুই স্থানে হাদীছখানা বর্ণিত, কিন্তু তাহার কোন স্থানেই সা'দ বিন মোআযের নাম নাই। বরং আছে فقال رجل أنا أعلم অর্থাৎ নবীজী (সঃ) সাবেত বিন কায়সের আলোচনা করিলে এক ব্যক্তি বলিল, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার জন্য তাহার সংবাদ জানিয়া আসিব।'
পাঠক! লক্ষ্য করুন---সমালোচনার ভিত্তিটাই যখন বোখারী শরীফের হাদীসে বিদ্যমান নাই, তখন সমালোচনার ক্ষেত্রে এরূপ বলা যে, 'বোখারী ও মুসলিমে একটি হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে’---ইহা কতটুকু ঈমানদারী তাহা ভাবিয়া দেখিবেন।
তারপর আসুন! মুসলিম শরীফের হাদীছ খানার অবস্থা দেখুন! পূর্বেই বলা হইয়াছে, শুধু উদ্ধৃতি দেখার ন্যায় ধার করা জ্ঞানে হাদীছ সম্পর্কে কিছু বলা নিতান্তই অবান্তর। খাঁ মরহুমের সমালোচিত হাদীছখানা মুসলিম শরীফে চারটি সনদ তথা সাক্ষ্যসূত্রে বর্ণিত হইয়াছে। প্রথমে উল্লেখ হইয়াছে ঐ সাক্ষীর বর্ণনা যাহার বর্ণনায় খাঁ মরহুমের সমালোচনার ভিত্তি বস্তু তথা “সা'দ বিন মোআয” নাম বিদ্যমান রহিয়াছে। পাঠক আশ্চর্যান্বিত হইবেন, মুসলিম (রঃ) বিভ্রান্তি হইতে সতর্ক ও হুঁশিয়ার করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে যে ব্যবস্থা রাখিয়াছেন তাহা হইতে খাঁ মরহুম নিজে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকিয়া এবং পাঠককে অজ্ঞ রাখিয়া সেই বিভ্রান্তিতে নিজেও পতিত হইয়াছেন এবং অপরকেও পতিত করার ব্যবস্থা করিয়াছেন। এই কেলেঙ্কারির একমাত্র কারণ হইল মুসলিম শরীফ মূলগ্রন্থ দেখার সৌভাগ্য হইতে বঞ্চিত থাকা।
দেখুন মুসলিম শরীফে বিভ্রান্তি অবসানের কী সুন্দর ব্যবস্থা রহিয়াছে। একটি সাক্ষীসূত্রে ঐ সমালোচনার বস্তু সম্বলিত বিবরণ উল্লেখের সাথে সাথেই ঐ হাদীছটির উপর তিনটি সাক্ষ্যসূত্র বর্ণিত রহিয়াছে। এই সাক্ষীগণের বর্ণনায় স্পষ্ট বলা হইয়াছে,
ليس في حديثه ذكر سعد بن معاذ - لم يذكر سعد بن معاذ.
“এই সাক্ষীর বর্ণনায় সা'দ বিন মোআযের উল্লেখ নাই। এই সাক্ষ্য সা'দ বিন মোআযের নাম উল্লেখ করেন নাই।” (৩২৯-৩৩২নং হাদীস দ্রঃ)
ইমাম মুসলিমের বর্ণনায় প্রতীয়মান হইল যে, মূল হাদীছটির তথ্য অসত্য বা অপ্রকৃত বলা যাইতে পারে না। কারণ, শুধু একজন সাক্ষীর বর্ণনায় একটি নাম উল্লেখের বিভ্রাট থাকিলেও অপর তিনজন সাক্ষীর বর্ণনায় ঐ বিভ্রাটমুক্তি বিদ্যমান রহিয়াছে।
পাঠক! একটি ঘটনা সাব্যস্ত করিতে বাদী যদি পাঁচটি সাক্ষী পেশ করে---সে ক্ষেত্রে বিবাদী একটি সাক্ষীর বর্ণনায় দোষ দেখাইতে পারিলে ঘটনাটি মিথ্যা হইয়া যাইবে? ইমাম মুসলিম বিভ্রান্ত খন্ডনের জন্য প্রথমে বিভ্রাটযুক্ত সাক্ষ্যসূত্র উল্লেখ করিয়াছেন। সঙ্গে সঙ্গেই বিভ্রাটমুক্ত তিনটি সাক্ষ্যসূত্র উল্লেখ করিয়া প্রথমটির দোষ নির্ণয় এবং তাহার খন্ডন করিয়া দিয়াছেন। ইহা কি তাঁহার দোষ হইল?
মুসলিম শরীফের চারি সাক্ষ্যসূত্র এবং বোখারী শরীফের এক সাক্ষ্য সূত্র---এই পাঁচটি সাক্ষ্যসূত্রের একটি সাক্ষীর (মুসলিম শরীফের) বর্ণনায় যে সা'দ বিন মুআযের নাম উল্লেখের বিভ্রাট রহিয়াছে তাহাও অতি নগণ্য। সাহাবীগণের নাম পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাহাবীগণের মধ্যে একজন ছিলেন সা'দ বিন মোআয, আর একজন ছিলেন সা'দ বিন ওবাদাহ।
আলোচ্য হাদীসের ঘটনার ব্যক্তি প্রকৃতপ্রস্তাবে ছিলেন সা'দ বিন ওবাদাহ, যাঁহার মৃত্যু নবীজী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের অনেক পরে। সুতরাং তাঁহার নামের বেলায় কোন প্রশ্নের অবকাশ নাই। এখন ভাবিয়া দেখুন সাহাবীদের যুগে নহে; ইহার পরে; তথা ঘটনার অনেক বছর পরে একজন বিশিষ্ট জ্ঞানবান অতিশয় শ্রদ্ধাভাজন সা'দ নামও ঠিক বলিয়াছেন। শুধু কেবল বিন ওবাদাহ স্থলে বিন মোআয বলিয়া পিতার নাম ব্যতিক্রম বলিয়াছেন। ইমাম মুসলিম উক্ত সাক্ষীর বর্ণনা উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনজন সাক্ষীর বর্ণনা উল্লেখ করিয়া ঐ ব্যতিক্রমটা ধরাইয়াও দিয়াছেন। এখন শুধু ঐ ব্যতিক্রম পুঁজি করিয়া অন্য সব রকম দোষমুক্ত একটি সুদীর্ঘ হাদীসের সর্বময় বিবরণকে অপ্রকৃত ও অসত্য বলা এবং ইমাম মুসলিম কর্তৃক ব্যতিক্রমটা ধরাইয়া দেওয়ার কথা গোপন করিয়া বোখারী-মুসলিমে অসত্য হাদীছ আছে বলা কত দূর ঈমানদারী তাহা সুধীগণ বিচার করিবেন।
খাঁ মরহুম তাঁহার বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের জন্য পথ পরিষ্কারের উদ্দেশ্যে খেয়াল-খুশীমত হাদীছ এনকার-অস্বীকার করার জন্য 'পরীক্ষার নূতন ধারা' নামে একটি ফাঁদ তৈয়ার করিয়াছেন। মাকড়সার জালে তৈয়ারী সেই ফাঁদে তিনি বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের ন্যায় শক্তিশালী গ্রন্থাবলীর হাদীছ আটকাইতে যাওয়া দশটি নমুনা প্রমাণরূপে পেশ করিয়াছেন। তাঁহার সবগুলি প্রলাপের উত্তর দিতে গেলে অহেতুক সময় অপচয়ের যাতনা পোহাইতে হয়।... হাদীস মোটেই না বুঝিয়া, এমনকি প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা গ্রন্থাবলীতে ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও মূলগ্রন্থ তলাইয়া দেখার যোগ্যতার অভাবে অজ্ঞ থাকায় যেসব প্রলাপের সৃষ্টি হইয়াছে তা দেখিলে ত গাত্রদাহ এবং ক্ষোভ ও ঘৃণা জন্মে।” (বাংলা বোখারী শরীফ ৫খণ্ড উপক্রমণিকা দ্রঃ)
বুখারী-মুসলিম ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থে জাল ও ভুল হাদীস যে আছে, তা কেউ অস্বীকার করে না। (কোন্‌ কোন্ কারণে হাদীস জাল হয়েছে, তা আমি আমার 'হাদীস ও সুন্নাহর মূল্যমান' পুস্তিকায় উল্লেখ করেছি।) বহু জাল হাদীস তফসীর গ্রন্থগুলোতে যে ঢুকানো আছে, তাও কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু তার সাথে এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, সে সকল জাল হাদীস চিহ্নিত করার জন্য মুহাদ্দিসীনগণ সূক্ষ্ম ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন এবং আমীরুল মু'মিনীনা ফিল হাদীস ইমাম বুখারী ৬ লক্ষ হাদীস মুখস্থ করার পর মোট ৪ হাজার সহীহ হাদীস বাছাই ক'রে তাঁর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। অনুরূপ সহীহ-ধারায় ইমাম মুসলিম রচনা করেছেন সহীহ মুসলিম।
এইভাবে আয়েম্মায়ে হাদীস নিজ নিজ চেষ্টা-চরিত্রের সাথে যথাসম্ভব সহীহ-যয়ীফ-জান নির্ধারিত করেছেন। তারপরেও কি আর কোন ‘পরীক্ষার নূতন ধারা'র প্রয়োজন হয়?
নূরা আলম সাহেবের ধারায় বুখারীর মান হননকারীরা আবার বলেন, 'আমরা কিন্তু হাদীস শাস্ত্রের শিরোমণি (?) মহাম্মদ বিন ইসমাইল বুখারীর সমালোচনা করছি না।' (তত্ত্ব... ২৪পৃঃ) তাঁর গ্রন্থের সমালোচনা করছি। মানে তাঁর কান ধরছি না, তাঁকে জুতো মারছি আর কি? আর সেই সাথে বুখারীর অজ্ঞ, ভ্রান্ত ও নির্বুদ্ধি অন্ধভক্তদেরও মাথা নেড়া করছি মাত্র!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00