📄 শরীয়তে জ্ঞান-ভিত্তিক যুক্তির মান
ইসলামী শরীয়তে যখন কুরআন ও সহীহ হাদীসের স্পষ্ট উক্তি বর্তমান থাকে, তখন জ্ঞান-ভিত্তিক যুক্তি কোন কাজে লাগে না। যেহেতু শরীয়ত-ওয়ালার জ্ঞান অপেক্ষা মানুষের জ্ঞান বড় ও শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। জ্ঞানে ধরার মত কথা না হলে তার ব্যাখ্যা খুঁজতে হয়; নচেৎ হুবহু ঈমান রাখতে হয়। কোনক্রমেই শরীয়তের উক্তির উপরে যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) 'দারউ তাআরুযিল আকুলি অন্-নাকুল' নামক মূল্যবান একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাতে তিনি আশায়েরাহ প্রভৃতি আক্কেলপন্থীদের প্রতিবাদ করেছেন, যারা শরয়ী উক্তির উপর নিজেদের জ্ঞান ও যুক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়। রাযী, গাযালী, জুওয়াইনী, কাযী আবু বাক্র ইবনুল আরাবী, বাক্বিল্লানী প্রমুখ যুক্তিবাদীদের খণ্ডন করেছেন।
নিঃসন্দেহে শরয়ী উক্তির উপর যুক্তির প্রাধান্য পাওয়ার বিষয়টি অতি বিপত্তি ও আপত্তিকর। যেহেতু এই ছিদ্রপথে জাহেল মানুষরাও শরীয়তের উক্তি নিয়ে খেল খেলতে শুরু ক'রে দেয়। জ্ঞানে ধরার কথা নয় মনে ক'রে তা প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকার ক'রে বসে! আর তার ফলে হাদীস না বুঝে নিজের দায় স্বীকার না ক'রে বুখারী-মুসলিমের হাদীস পর্যন্ত অস্বীকার ক'রে ফেলে!
এই কারণে ইমাম ইবনুল কাইয়েম তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আস্-স্বাওয়াইস্কুল মুরসালাহ'তে শরয়ী উক্তির উপর যুক্তিকে প্রাধান্যদাতাকে সেই চারটি তাগূতের মধ্যে গণ্য করেছেন, যারা ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। আর ২৪১ ভাবে সেই তাগুতের খণ্ডন করেছেন।
শায়খুল ইসলাম (রঃ) স্পষ্ট করেছেন যে, সুস্থ ও নিরপেক্ষ বিবেক সহীহ দলীলের অনুসারী অবশ্যই হবে। সঠিক যুক্তি ও সহীহ দলীলের মধ্যে কোন প্রকার সংঘর্ষ হতে পারে না। বিপরীত মনে হলে মানুষের সীমিত বিবেককেই দুষ্ট ও অসুস্থ জানতে হবে।
আবু মুযাফফার সামআনী বলেন, 'জেনে রাখুন যে, আমাদের ও বিদআতীদের মাঝে পার্থক্যকারী হল আক্কেলের বিষয়টি। বিদআতীরা তাদের আক্কেলের উপর নিজেদের দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অতঃপর অনুসরণ ও শরয়ী উক্তিকে তার অনুগামী করেছে। পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাহর নীতি হল দ্বীনের মূল বিষয় (শরয়ী উক্তির) অনুসরণ এবং আক্কেল ও যুক্তি তার অনুগামী। কেননা দ্বীনের ভিত্তি যদি আক্কেল হত, তাহলে মানুষ অহী ও আম্বিয়ার অমুখাপেক্ষী হত এবং আদেশ ও নিষেধ অর্থহীন হয়ে পড়ত। যার যা ইচ্ছা তাই বলত। দ্বীন যদি যুক্তির উপর ভিত্তিশীল হত, তাহলে যুক্তিগ্রাহ্য না হওয়া পর্যন্ত কোন মু'মিনের জন্য কিছু গ্রহণ করা বৈধ হত না।' (স্বাওনুল মানত্বিক্ব ১৮২পৃঃ)
তাহাবিয়ার ব্যাখ্যাকারী বলেন, 'দ্বীনের মৌলিক নীতি সম্বন্ধে সেই ব্যক্তি কিভাবে কথা বলে, যে ব্যক্তি তা কিতাব ও সুন্নাহ থেকে আহরণ করেনি? বরং সে অমুকের উক্তি থেকে তা গ্রহণ করে। আর যখন মনে করে যে, সে আল্লাহর কিতাব বোঝে, তখন তা রসূলের হাদীস থেকে সে তফসীর গ্রহণ করে না; বরং হাদীসের প্রতি সে ভ্রূক্ষেপই করে না। তফসীর গ্রহণ করে না সাহাবা-তাবেঈন কর্তৃক বর্ণিত আসার থেকে।'
বরং তারা বলে, 'সাহাবা-তাবেঈনদের কথা তৎকালীন যুগে উত্তম ছিল।' তার মানে এ যুগে তাঁদের কথা উত্তম নয়! কারণ এ যুগ তো টেলিভিশনের যুগ।
বরং এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যারা বলে 'হাদ্দাসানী ক্বালবী আর-রাব্বী।' (অর্থাৎ, আমার হৃদয় আমার রব থেকে হাদীস বর্ণনা করেছে......) অনুরূপ ঐ শ্রেণীর যুক্তিবাদীরা বলেন, 'হাদ্দাসানী আক্বলী আর-রাব্বী!' (অর্থাৎ, আমার আক্কেল আমার রব থেকে হাদীস বর্ণনা করেছে......।)
আকীদা ত্বাহাবিয়া ও তার ভাষ্যগ্রন্থে বলা হয়েছে, কোন মুসলিমের ইসলামের পা সুদৃঢ় হতে পারে না, যতক্ষণ না সে দুই অহীকে সর্বান্তঃকরণে মেনে নিয়েছে এবং আনুগত্যের জন্য আত্মসমর্পণ করেছে।
অর্থাৎ, বিনা দ্বিধায় দুই অহীর ফায়সালা মেনে না নিলে কারো ইসলাম তার মনের ভূমিতে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। যখন সে অহীর বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ আনবে না, মনের ভিতরে কোন 'কিন্তু' আনবে না, নিজের রায়, বিবেক ও যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে তার বিরোধিতা করবে না, নিজের জ্ঞানকে বড় মেনে অহীতে সন্দেহ পোষণ করবে না।
ইমাম মুহাম্মাদ বিন শিহাব যুহরী বলেছেন, 'আল্লাহর তরফ থেকে রিসালাত এসেছে, রসূলের দায়িত্বে ছিল, সে রিসালাত পৌছে দেওয়া। আর আমাদের দায়িত্ব হল তা মেনে নেওয়া।'
সুতরাং সেই অহীদ্বয় ব্যতীত জ্ঞান-ওয়ালার কোন পরিত্রাণ নেই। আল্লাহর তওহীদ এবং রসূলের আনুগত্যের তওহীদ ছাড়া মুক্তির কোন পথ নেই।
একটু চিন্তা ক'রে দেখলে দেখা যাবে যে, শরীয়তে নানা বিঘ্ন ও বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে তিন শ্রেণীর মানুষের কারণে।
১। স্বেচ্ছাচারী ও অত্যাচারী শাসক। এঁরা নিজেদের অবৈধ রাজনীতির খাতিরে শরীয়তের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন, তার বিধান পরিবর্তন করেন। শরীয়তের আইন অমান্য ক'রে নিজেদের গদি টিকিয়ে রাখেন।
২। আদর্শচ্যুত আলেম। এঁরা শরীয়তের উপরে নিজেদের রায় ও যুক্তিকে খেয়াল-খুশী মতো প্রাধান্য দেন। কুরআন-হাদীসের সুবিধামতো ব্যাখ্যা ক'রে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করেন।
৩। ইল্মহীন আবেদ। এঁরা অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতার সাথে আল্লাহর ইবাদত করেন। এঁদের অনেকে 'যওক', 'কাশফ', 'খেয়াল' ও স্বপ্ন থেকে শরীয়ত গ্রহণ করেন এবং সে মতে আল্লাহর ইবাদত করেন।
স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্রনেতা বলেন, 'ধর্মনীতির সাথে রাজনীতির সংঘর্ষ বাধলে, রাজনীতি প্রাধান্যযোগ্য।
আদর্শচ্যুত যুক্তিবাদী আলেম বলেন, 'কুরআন-হাদীস ও যুক্তির সংঘর্ষ বাধলে যুক্তিই প্রাধান্যযোগ্য।'
সূফীমার্কা জাহেল আবেদ বলেন, 'শরীয়ত এবং যওক ও কাশফ্ফের বিরোধ বাধলে যওক ও কাশ্যই প্রাধান্যযোগ্য।
এঁরা সকলেই ইসলামের দরদে মায়াকান্না প্রকাশ করলেও আসলে কিন্তু সে দরদ নেই। যেহেতু তাঁদের কাছে শরীয়ত আসলে অহী-ভিত্তিক নয়; বরং যুক্তি-ভিত্তিক।
অথচ কোন অহীর উপর যুক্তি বা বিবেক প্রাধান্য পাওয়ার কথা নয়; যদিও অহীকে বরণ ও স্বীকার করার পথ বিবেকই রচনা করেছে।
উদাহরণ স্বরূপ যুক্তির সাথে (অহীর) উক্তি জাহেল মুকাল্লিদের সাথে আলেম মুজতাহিদের মত; বরং তারও নিম্নে। কারণ জাহেল শিক্ষা লাভ ক'রে আলেম হতে পারে, কিন্তু আলেম নবী হতে পারেন না। জাহেল মুকাল্লিদ কোন মুজতাহিদ আলেমের খবর পেল এবং অন্য এক জাহেলকে সে খবর দিল। সুতরাং প্রথম জাহেল হল রাহবার এবং দ্বিতীয় জাহেল হল ফতোয়া তলবকারী। আর আলেম হলেন মুফতী। এবার কোন বিষয়ে রাহবার ও মুফতীর যদি মতবিরোধ হয়, তাহলে ফতোয়া তলবকারীর উচিত মুফতীর কথা মান্য করা, রাহবারের কথা নয়। এখন রাহবার যদি বলে, 'আমার কথা মানো, আমার কথাটাই ঠিক। মুফতীর কথা ঠিক নয়; কারণ আমিই তোমাকে মুফতীর খবর দিয়েছিলাম। আমার কারণেই তুমি মুফতী চিনতে পেরেছ। অতএব আমাকে ছেড়ে তার কথা মানবে কেন? আমিই তো মূল। মূল ছেড়ে শাখাকে প্রাধান্য দেবে কেন?'
তাহলে ফতোয়া তলবকারী অবশ্যই রাহবারকে বলবে যে, 'তুমি যখন প্রথমে সাক্ষ্য দিয়েছ যে, উনি মুফতী। উনার কথা মেনে চলা ওয়াজেব। এখন তোমার এই কথা মেনে নেওয়ার মানে এ নয় যে, তোমার সব কথাকেই মানতে হবে। বরং মুফতীর কথাই তো মান্য, যেহেতু তিনি তোমার থেকে বেশী জ্ঞান রাখেন।'
বলা বাহুল্য, মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক হল রাহবারের মত। আর মুফতী হল কুরআন ও সহীহ হাদীস। ফতোয়া তলবকারী প্রত্যেক মুসলিমের উচিত, প্রত্যেক বিষয়ে রাহবারের কথা না মেনে মুফতীর কথা মানা; যদিও রাহবার তার কাছে তুচ্ছ নয়।
ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন,
لا يستقل العقل دون هداية ... بالوحي تأصيلا ولا تفصيلا
كالطرف دون النور ليس بمدرك ... حتى يراه بكرة وأصيلا
وإذا الظلام تلاطمت أمواجه ... وطمعت بالإبصار كنت محيلا
فإذا النبوة لم ينلك ضياؤها ... فالعقل لا يهديك قط سبيلا
نور النبوة مثل نور الشمس ... للعين البصيرة فاتخذه دليلا
طرق الهدى مسدودة إلا على ... من أم هذا الوحي والتنزيلا
فإذا عدلت عن الطريق تعمدا ... فاعلم بأنك ما أردت وصولا
یا طالبا درك الهدى بالعقل ... دون النقل لن تلق لذاك دليلا
کم رام قبلك ذاك من متلذذ ... حيران عاش مدى الزمان جهولا
অর্থাৎ, অহীর পথনির্দেশ ছাড়া জ্ঞান-যুক্তি স্বাতন্ত্র্য লাভ করতে পারে না; না মৌলিক ক্ষেত্রে, আর না বিশদ ক্ষেত্রে।
📄 মুসলিম বিচ্ছিন্নতা ও হাদিস
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, হাদীসের সহীহ গ্রন্থগুলি লিপিবদ্ধ হওয়ার পূর্বে মুসলিম জাতি বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল এবং প্রত্যেক ভাগই নিজ নিজ মতের সমর্থনে হাদীস ও কাহিনী বানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সহীহ গ্রন্থাবলী তথা মুহাদ্দিসীনদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর সেসব জাল কাহিনী ও হাদীস চিহ্নিত হয়ে গেছে। প্রত্যেক দল সম্বন্ধে তাঁরা হকপন্থী মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক ক'রে গেছেন। উল্লেখযোগ্য ফির্কাগুলোর মধ্যে মু'তাযিলা ফির্কা ছিল যুক্তিভিত্তিক আক্কেলমার্কা ফির্কা। তারাই আক্কেলের নিকষে সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করেছে, কুরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করেছে, আম্বিয়াগণের মু'জিযাকে অস্বীকার করেছে।
মু'তাযিলার মনুষ্যমেধার আকলানী মাদ্রাসায় যাঁরা প্রতিপালিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে জামালুদ্দীন আফগানী, রশীদ রিযা, মুহাম্মাদ গাযালী, সার সাইয়েদ আহমাদ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। আর তাঁদেরই সুরে সুর মিলিয়েছেন আমাদের বাংলার আকরাম খাঁ ও তাঁর অনুসারীরা।
যেমন খাঁ সাহেবও তাদেরই মতো নিজের স্বাধীন চিন্তাধারা ও স্বেচ্ছাচারী জ্ঞান প্রয়োগের সমর্থনে হাদীস গড়ে অথবা গড়া হাদীস নকল ক'রে বলেছেন, 'মহানবী সঃ (বাইয়াত) প্রতিজ্ঞা গ্রহণকালে বলিতেন, “আমি যাহা বলিব অন্ধের ন্যায় তাহার অনুসরণ করিবে না। তা সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত কথা কি না প্রথমে তাহা তাহকীক করিয়া লইবে। যদি তোমরা তাহাকে ন্যায়সঙ্গত কাজ বলিয়া মনে কর, তবেই তাহার অনুসরণ করিও।” (মোস্তফা চরিত ৪৬১-৪৬২পৃঃ, তত্ত্ব... ১০ ও ১৫পৃঃ)
অথচ এই শ্রেণীর কথা আবূ বাক্স রাঃ-এর বাইয়াত গ্রহণকালে তাঁর কথা বলে প্রসিদ্ধ আছে। পরন্তু তিনি এই শ্রেণীর কথা সর্বশ্রেষ্ঠ রসূলের প্রতি আরোপ ক'রে তাঁর মর্যাদা খর্ব করেছেন।
খাঁ সাহেব যদিও সহীহ হাদীস অস্বীকার করেন, কারণ তা তাঁর জ্ঞানের প্রতিকূলে; তবুও জাল বা যয়ীফ হাদীস মানেন, কারণ তা তাঁর স্বাধীন চিন্তার সমর্থনে!
পক্ষান্তরে হকপন্থীরা মত অবলম্বন করার পর দলীল খোঁজেন না; বরং সহীহ দলীলে যা পান, সেটাই নিজেদের আকীদা ও আমল বলে বরণ করেন।
📄 কুরআনের-হাদিসের উক্তির উপরে কোন যুক্তি প্রাধান্য পাবে না
শরীয়তের উপরে জ্ঞানের স্বাধীনতা নেই। মানুষের জ্ঞান সীমিত। স্বাধীন জ্ঞান নিয়ে চিন্তা ক'রে মানুষ সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করেছে। নবী-রসূলকে অস্বীকার করেছে। কুরআনকে অস্বীকার করেছে। সুন্নাহকে অস্বীকার করেছে। জ্বিন-ফিরিস্তা, মু'জিযা ও কারামতকে অস্বীকার করেছে? যে যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে অস্বীকার করে, আর যে তার প্রমাণ করে, কোন যুক্তিটা ঠিক? দলীলের কাছে সকল যুক্তি অকেজো।
'তা সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত কি না তাহা তাহকীক করিয়া লই......... (তত্ত্ব......১০০ ও ১৫পৃঃ) একি মহানবী ﷺ-এর উক্তি?
শরয়ী ব্যাপারে তাঁর এ উক্তি হতে পারে না। তাঁর এ উক্তি পার্থিব ব্যাপারে।
একদা তিনি সাহাবাদেরকে দেখলেন, তাঁরা খেজুর মোছার পরাগ-মিলন সাধন করছেন; অর্থাৎ, মাদা গাছের মোছা নিয়ে মাদী গাছের মোছার সাথে বেঁধে দিচ্ছেন। তিনি বললেন, “আমার মনে হয় ঐরূপ করাতে কোন লাভ নেই। ঐরূপ না করলেও খেজুর ফলবে।” তাঁর এ মন্তব্য শুনে সাহাবাগণ তা ত্যাগ করলেন। কিন্তু খেজুর ফলার সময় দেখা গেল, খেজুর পরিপুষ্ট হয়নি; ফলে তার ফলনও ভালো হয়নি। তিনি তা দেখে বললেন, “কী ব্যাপার, তোমাদের খেজুরের ফলন নেই কেন?” তাঁরা বললেন, যেহেতু আপনি পরাগ-মিলন ঘটাতে নিষেধ করেছিলেন, সেহেতু তা না করার ফলে ফলন কম হয়েছে। তিনি বললেন, “আমি ওটা ধারণা করে বলেছিলাম। তোমরা তোমাদের পার্থিব বিষয় সম্পর্কে অধিক জ্ঞান রাখ। অতএব তা ভালো হলে, তোমরা তা করতে পার।” (মুসলিম ২৩৬ ১-২৩৬৩নং)
এ জন্যই পার্থিব ব্যাপারে আল্লাহ তাঁকে আদেশ ক'রে বলেছিলেন,
{ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ} (١٥٩) سورة آل عمران
অর্থাৎ, অর্থাৎ, তাদের সাথে পরামর্শ কর। (সূরা আলে ইমরান ১৫৯ আয়াত)
যার ফলে তিনি যুদ্ধ-বিগ্রহ ও পার্থিব ব্যাপারে সাহাবাগণের রায় নিতেন। পক্ষান্তরে শরয়ী ব্যাপারে 'নবী'র জায়গায় তাঁদের 'রাসূল' শব্দও গ্রহণ করতেন না।
কুরআনে বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে, বিজ্ঞানের সাথে তার সংঘর্ষ নেই। তা বলে কুরআন বৈজ্ঞানিক তথ্য পরিবেশন করার জন্য অবতীর্ণ হয়নি। আল্লাহর নবী ﷺ ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, পার্থিব চাকচিক্যের উন্নয়ন শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরিত হননি। তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন চারিত্রিক ও পারত্রিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য, পারলৌকিক জীবনকে উন্নত থেকে উন্নততর করার জন্য। আর এ জন্য পার্থিব কোন নতুন কাজ বিদআত নয়। সুতরাং তাঁর পার্থিব বিষয়ের কোন রায় ইত্যাদি পার্থিব দৃষ্টিতে বিবেচ্য হতে পারে, কোন শরয়ী ব্যাপার নয়। এই জন্য তিনি বলেছিলেন, “দুনিয়ার ব্যাপারে কোন ধারণাপ্রসূত কথা বললে, তা গ্রহণ করো না (যেহেতু আমি একজন মানুষ)। কিন্তু যখন আল্লাহর তরফ থেকে কোন কথা বলব, তখন তা গ্রহণ কর। যেহেতু আমি আল্লাহর ব্যাপারে কখনই মিথ্যা বলব না।” (আর তখন তা প্রত্যাখ্যান করার কোন যুক্তি খাটবে না।) (মুসলিম ২৩৬ ১-২৩৬৩)
সুতরাং শরয়ী ব্যাপারে তাঁর কথাকে 'তাহকীক' ক'রে দেখে নেওয়ার অবকাশ কারো থাকতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন,
{ وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا} (٣٦) سورة الأحزاب
অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন বিশ্বাসী পুরুষ কিংবা বিশ্বাসী নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের অবাধ্য হলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে। (সূরা আহযাব ৩৬ আয়াত)
পক্ষান্তরে দ্বীন ও দুনিয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأَ فَتَبَيِّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نادمين} (٦) سورة الحجرات
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! যদি কোন পাপাচারী তোমাদের নিকট কোন বার্তা আনয়ন করে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা ক'রে দেখবে; যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়কে আঘাত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। (সূরা হুজুরাত ৬ আয়াত)
আর রসূল তো রসূলই! রসূলের খবর তাহকীক করতে হলে, কার কথা দিয়ে তার তাহকীক করবেন? বস্তুবাদী ও বাস্তববাদীদের কথা দিয়ে?
যদি কুরআন দিয়ে করেন, তাহলেও কোন সহীহ হাদীস কুরআনের বিপরীত হতে পারে না। অবশ্য ব্যাখ্যা স্বরূপ অনেক হাদীস কুরআনের বিধানের উপর অতিরিক্ত বিধান দেওয়া হয়েছে। আর তাও দ্বিতীয় অহী; যেমন অন্যত্র আলোচিত হয়েছে।
পক্ষান্তরে “আমার পক্ষ থেকে যা তোমাদের নিকট আসবে, তা আল্লাহর কিতাবের উপর পেশ কর। অতঃপর যে কথা কুরআনের অনুসারী হবে, তা আমার কথা। আর যা তার বিরোধী হবে, তা আমার কথা নয়।”---এ হাদীস এবং এই শ্রেণীর আরো হাদীসগুলি জাল। (দেখুন সিলসিলাহ যায়ীফাহ ৩/২০৯)
এই শ্রেণীর হাদীস 'যিন্দীক' (জরথুস্ত্রপন্থী)দের মনগড়া তৈরি। পক্ষান্তরে সহীহ হাদীসে এসেছে, মহানবী ﷺ বলেছেন, “শোন! আমাকে কুরআন দান করা হয়েছে এবং তারই সাথে তারই মত (সুন্নাহ) দান করা হয়েছে। শোন! সম্ভবতঃ নিজ গদিতে বসে থাকা কোন পরিতৃপ্ত লোক বলবে, 'তোমরা এই কুরআনের অনুসরণ কর; তাতে যা হালাল পাও, তাই হালাল মনে কর এবং তাতে যা হারাম পাও, তাই হারাম মনে কর। অথচ আল্লাহর রসূল যা হারাম করেন তাও আল্লাহর হারাম করার মতই।---” (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারেমী, মিশকাত ১৬৩নং)
অহীর উপরে কোন যুক্তি বা রায়ের চাকা সচল নয়। সেই জন্য সলফগণ সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন এবং যুক্তিবাদী বিদআতীদের ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহকে সাবধান করেছেন।
আলী (রাঃ) বলেছেন, 'রায় বা যুক্তি দ্বারা যদি দ্বীন প্রমাণিত হত, তাহলে মোজার উপরের অংশ অপেক্ষা নিচের অংশই মাসাহর অধিক উপযুক্ত ছিল। কিন্তু আমি আল্লাহর রসূল ﷺ-কে মোজার উপরের অংশে মাসাহ করতে দেখেছি।' (আবু দাউদ ১৬২,বাইহাকী ১/২২৯, দারেমী ৭ ১৫নং)
হাজারে আসওয়াদকে চুম্বনকালে উমার ফারূক (রাঃ) এই তত্ত্বকেই সামনে রেখে বলেছিলেন, 'আমি জানি যে, তুমি একটি পাথর; তুমি না কারো উপকার সাধন করতে পার, আর না-ই কারো অপকার। যদি রসূল ﷺ-কে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।' (বুখারী ১৫৯৭নং)
আওযায়ী বলেন, 'তুমি সলফের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চল; যদিও লোকে তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে। আর এঁর-ওঁর রায় থেকে দূরে থাক; যদিও কথা দ্বারা তা তোমার জন্য সুশোভিত করে পেশ করে।' (আশ্-শারীআহ ৬৩পৃঃ)
যে সকল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উক্ত প্রকার বিদআতে জড়িত হয়ে পড়ে, তারা তিনের মধ্যে এক অবশ্যই হবেঃ-
হয়তো সে এমন লোক হবে, যার তরীকা ভালো, মযহাব উত্তম, যে শান্তি পছন্দ করে এবং যে সরল পথে স্থির থাকতে চেষ্টা করে বলে আপনি জানেন। কিন্তু তার কর্ণকুহরে তাদের কথা গুঞ্জরিত হয়েছে, যাদের হৃদয়ে শয়তানের বাসা আছে এবং তার ফলে তারা তাদের জিভে নানাবিধ কুফরী কথা বলে থাকে। আর সে ঐ জড়িয়ে পড়া বিদআতের গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার পথ জানে না। তখন তার প্রশ্ন হয় জানার জন্য, পথ পাওয়ার জন্য। যে প্যাঁচে সে পড়েছে সে প্যাঁচ থেকে বের হওয়ার পথ অনুসন্ধান করে এবং যে রোগে সে ক্লিষ্ট হয়েছে সেই রোগ থেকে আরোগ্য লাভের ওষুধ খোঁজ করে। পরন্তু আপনি তার আনুগত্যের কথা অনুভব করেন এবং তার বিরোধিতা করা থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করেন, তাহলে এই হল সেই ব্যক্তি যাকে বাধা দেওয়া এবং শয়তানের চক্রান্ত-রশি থেকে বাঁচিয়ে সুপথ প্রদর্শন আপনার জন্য ফরয। আর আপনি যার মাধ্যমে তাকে পথ দেখাবেন ও জ্ঞানদান করবেন তা যেন কিতাব ও সুন্নাহ হয় এবং সাহাবা ও তাবেঈন তথা মুসলিম উম্মাহর সহীহ আসার হয়। তবে সে পথ প্রদর্শন যেন হিকমত ও সদুপদেশের সাথে হয়।
যে বিষয় আপনি জানেন না, সে বিষয়ে তাকাল্লুফ (কষ্টকল্পনা) করা থেকে, কোন রায় নিজের তরফ থেকে ব্যক্ত করা থেকে এবং অতি সূক্ষ্ম বিষয়ে মনোনিবেশ করা হতে দূরে থাকুন। কারণ এরূপ করা আপনার কর্মে বিদআত বলে পরিগণিত। আর যদি আপনি উক্ত কর্মের মাধ্যমে সুন্নাহ প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা পোষণ করে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন যে, হকের পথ ব্যতিরেকে হক প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা হল বাতিল এবং সুন্নাহর তরীকা ছাড়া সুন্নাহর কথা বলা হল বিদআহ। আর নিজেকে রোগাক্রান্ত করে আপনি আপনার সঙ্গীর আরোগ্য অন্বেষণ করবেন না এবং নিজেকে খারাপ করে তাকে ভালো করার চেষ্টাও নয়। কারণ, যে নিজেকে ধোঁকা দেয়, সে অপরের জন্য হিতাকাঙ্ক্ষী হতে পারে না এবং যার মধ্যে নিজের জন্য কোন মঙ্গল নেই, তার মধ্যে অপরের জন্যও কোন মঙ্গল থাকতে পারে না।
বলা বাহুল্য, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে তাওফীক দান করেন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে চলে, আল্লাহ তাকে সাহায্য ও মদদ করে থাকেন।' (আল-ইবানাহ, ইবনে বাত্মাহ ২/৫৪০-৫৪১, ৬৭৯নং)
ইউনুস বিন উবাইদ একদা তাঁর ছেলেকে বলেন, 'আমি তোমাকে ব্যভিচার, চুরি ও মদ্যপান করা হতে নিষেধ করছি। কিন্তু আম্র বিন উবাইদ ও তার সাথীদের (বিদআতী) রায় নিয়ে আল্লাহ আয্যা অজাল্লার সাথে সাক্ষাৎ করার চাইতে ঐ সকল পাপ নিয়ে সাক্ষাৎ করা আমার নিকট অপেক্ষাকৃত বেশী পছন্দনীয়।' (ঐ ২/৪৬৬, ৪৬৪নং)
আওয়াম বিন হাওশাব তাঁর ছেলে ঈসার জন্য বলেন, 'আল্লাহর কসম! ঈসাকে তর্কপ্রিয় বিদআতীদের সাথে ওঠা-বসা করতে দেখার চেয়ে তাকে বায়েন, মাতাল ও ফাসেক দলের সাথে ওঠা-বসা করতে দেখা আমার নিকট অপেক্ষাকৃত বেশী পছন্দনীয়।' (আল-বিদাউ অন্-নাহয়ু আনহা, ইবনে অয্যাহ ৫৬পৃঃ)
ইসলাম যুক্তির ধর্ম। সহীহ দলীল না পাওয়া গেলে যুক্তি প্রয়োগ করবেন উলামাগণ। অথবা দুই সহীহ দলীলে পরস্পর-বিরোধ ধারণা হলে যুক্তি প্রয়োগ করবেন উলামাগণ। সহীহ দলীলকে প্রয়োগ করার জন্য যুক্তি ব্যবহার করবেন উলামাগণ। সহীহ দলীলকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাঁরা ভাঙ্গা কুলোর বাতাস ব্যবহার করবেন না।
📄 সুন্নাহর মূল্যমান
নূর আলম সাহেব বলেন, 'প্রায় তিনশ বছর পরে হাদীস নামক (?) গ্রন্থগুলি রচিত হয়েছে।’ (তত্ত্ব......৫০পৃঃ)
তার মানে এই নয় যে, হাদীসগুলি পচা গুদামে পড়ে ছিল। আসলে যেভাবে কুরআন লেখা হত, সেইভাবে সুন্নাহ বা হাদীস লেখা হলে, কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে গোলমাল ও সংমিশ্রণ হওয়ার বড় আশঙ্কা ছিল। আর তাতে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে সন্দেহ প্রবেশ করার ভয় ছিল। আর তার জন্যই মহানবী ﷺ নিজে কুরআন ছাড়া অন্য কিছু লিখতে নিষেধও করেছিলেন। (মুসলিম ৭৭০২নং)
অবশ্য এ নিষেধ ছিল শুরুর দিকে। পরে লেখার অনুমতি দেওয়া হয়। বিশেষ ক'রে যাঁদের ব্যাপারে দুটি অহীর মাঝে গোলমাল সৃষ্টি করার ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না, তাঁদেরকে সুন্নাহ লেখারও অনুমতি দেওয়া হয়। প্রমাণিত যে, তিনি কাউকে কাউকে সুন্নাহ লিখে দিতে আদেশও করেছেন এবং অনেক সাহাবীর কাছে অনেক সুন্নাহ লিখিত অবস্থাতেও সংরক্ষিত হয়। (প্রায় ৫২ জন সাহাবীর কাছে বহু হাদীস লিখিত অবস্থায় পাওয়া যায়।) পরবর্তীকালে কুরআন গ্রন্থাকারে সঞ্চিত হয়ে গেলে সে ভয় একেবারেই দূর হয়ে যায়। আর তারপরেই শুরু হয় সুন্নাহ লেখার তৎপরতা। (দ্রঃ আস্-সুন্নাহ অমাকানাতুহা)
অবশ্য বুখারী-মুসলিম প্রভৃতি সহীহ গ্রন্থ প্রায় ২০০ বছর পরে রচিত হলেও, তার মানে এই নয় যে, হাদীসগুলি ভুঁইফোঁড় হয়ে উচক্কা প্রকাশ পেয়েছে। কুরআন যেমন শুরুর দিকে হাফেযদের বুকে ও লেখকের লেখায় সংরক্ষিত ছিল এবং পরবর্তীতে তৃতীয় খলীফার আমলে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেল, তেমনি হাদীসও সুরক্ষিত ছিল এবং সঙ্গত কারণেই ‘সহীহ'রূপে পরবর্তীতে প্রকাশ পেল।
কুরআন-বিরোধী মনে হলেই হাদীস অমান্য নয়। সামঞ্জস্য সাধন করেন উলামাগণ।
কুরআনী আয়াতের মাঝে পরস্পর-বিরোধিতা ধারণা হলে কী হয়?
কুরআনী আয়াত যদি জ্ঞান-বহির্ভূত হয়, তাহলে যেমন ধানাই-পানাই অপব্যাখ্যা চলে না, তেমনি সহীহ হাদীসও।
কুরআন-ভিত্তিক যুক্তিবাদীদের জেনে রাখা দরকার যে, পাশাপাশি সুন্নাহ-ভিত্তিক যুক্তি আবশ্যক। তা না হলে এক চাকায় বাইক অচল হয়ে যাবে। কুরআন কেবল কুরআনের উপরই ভরসা করতে বলে না। কুরআন সুন্নাহ তথা হাদীসের উপরেও ভরসা করতে বলে। পাঠকের অবগতির জন্য সেই উক্তির কিছু নিম্নে উদ্ধৃত হলঃ-
মহান আল্লাহ বলেন,
وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى (۱) مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى (۲) وَمَا يَنْطِقُ عَنْ الْهَوَى (۳) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (٤) عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى (٥) سورة النجم
অর্থাৎ, শপথ নক্ষত্রের, যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। তা তো অহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। তাকে শিক্ষা দান করে চরম শক্তিশালী, (ফিরিস্তা জিব্রাঈল)। (সূরা নাজম ১-৫ আয়াত)
{ وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ } (٤٤)
অর্থাৎ, তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দাও, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে। (সূরা নাহল ৪৪ আয়াত)
وَأَنزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا }
অর্থাৎ, আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং তুমি যা জানতে না, তা তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। আর তোমার প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ রয়েছে। (সূরা নিসা ১১৩ আয়াত) আর হিকমত ও প্রজ্ঞা হল সুন্নাহ।
{قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ فَإِن تَوَلَّوا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُم مَّا حُمِّلْتُمْ وَإِن تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ} (٥٤) سورة النــــــور
অর্থাৎ, বল, 'আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসূলের আনুগত্য কর।' অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী। তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে। আর রসূলের দায়িত্ব তো কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া। (সূরা নূর ৫৪ আয়াত)
{ مَّنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَن تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا } (۸۰)
অর্থাৎ, যে রসূলের আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তাদের উপর তোমাকে প্রহরীরূপে প্রেরণ করিনি। (সূরা নিসা ৮০ আয়াত)
{قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ}
অর্থাৎ, বল, 'তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (সূরা আলে ইমরান ৩১ আয়াত)
{ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ}
অর্থাৎ, রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। (সূরা হাশর ৭ আয়াত)
{لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا}
অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। (সূরা আহযাব ২ ১ আয়াত)
{فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا} (٦٥) سورة النساء
অর্থাৎ, কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা বিশ্বাসী (মু'মিন) হতে পারবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে, অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়। (সূরা নিসা ৬৫ আয়াত)
{فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (٦٣)
অর্থাৎ, যারা তার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় অথবা কঠিন শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে। (সূরা নূর ৬৩ আয়াত)
আর মহানবী ﷺ বলেন, “শোন! আমাকে কুরআন দান করা হয়েছে এবং তারই সাথে তারই মত (সুন্নাহ) দান করা হয়েছে। শোন! সম্ভবতঃ নিজ গদিতে বসে থাকা কোন পরিতৃপ্ত লোক বলবে, 'তোমরা এই কুরআনের অনুসরণ কর; তাতে যা হালাল পাও, তাই হালাল মনে কর এবং তাতে যা হারাম পাও, তাই হারাম মনে কর। অথচ আল্লাহর রসূল যা হারাম করেন, তাও আল্লাহর হারাম করার মতই।---” (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারেমী, মিশকাত ১৬৩নং)
ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণিত, বিদায়ী হজ্জে আল্লাহর রসূল ﷺ লোকেদের মাঝে খোতবা (ভাষণ) দিলেন। তাতে তিনি বললেন, “শয়তান এ বিষয়ে নিরাশ হয়ে গেছে যে, তোমাদের এই মাটিতে তার উপাসনা হবে। কিন্তু এতদ্ব্যতীত তোমরা যে সমস্ত কর্মসমূহকে অবজ্ঞা কর, তাতে তার আনুগত্য করা হবে---এ নিয়ে সে সন্তুষ্ট। সুতরাং তোমরা সতর্ক থেকো! অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি; যদি তা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করে থাকো তবে কখনই তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না; আর তা হল আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ (কুরআন ও হাদীস)” (হাকেম, সহীহ তারগীব ৩৬নং)
সুতরাং যে তফসীরকারী তাহকীক করবেন, তাঁর উচিত নয়, নিজের রায় দ্বারা তফসীর লেখা বা প্রচার করা; যদি সেখানে সলফ কর্তৃক তফসীর বর্ণিত থাকে। আর নবী ﷺ কর্তৃক সহীহ সনদে তা বর্ণিত থাকলে তো তার বিপরীত কোন তফসীরই গ্রহণযোগ্য হবে না।
হকপন্থী মুসলিমদের মাঝে এ কথা অবিসংবাদিত যে, সহীহ সুন্নাহ শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস। এ উৎস থেকেও মুসলিমদেরকে গায়বী বিষয়ে, আকীদাগত বিষয়ে, আহকামগত বিষয়ে, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং অন্যান্য নীতি ও তরবিয়তগত জীবনের যাবতীয় বিষয়ে বিধান গ্রহণ করতে হবে। কোন যুক্তি, রায় বা ইজতিহাদের অসীলায় কোন অবস্থায় তা প্রত্যাখ্যান করা যাবে না।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেছেন,
" لا يحل القياس والخبر موجود.
অর্থাৎ, হাদীস থাকতে কোন কিয়াস বা অনুমিতি বৈধ নয়। (আর-রিসালাহ ২/৬৭)
উসূলের উলামাগণ বলেন,
" إذا ورد الأثر بطل النظر . " " لا اجتهاد في مورد النص.
অর্থাৎ, হাদীস এসে গেলে যুক্তি-বিবেচনা বাতিল। স্পষ্ট উক্তির সামনে কোন ইজতিহাদ চলবে না। (মাউসূআতু উসূলিল ফিকুহ ৫৬/৩২৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ৫/৬ ১২)
মোটকথা, কোন শরয়ী বিষয়ে বিবেচকদের উচিত, প্রথমতঃ তার যোগ্যতা অর্জন করা। অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহকে পাশাপাশি রেখে উভয়-ভিত্তিক যুক্তিবাদী হওয়া। নচেৎ ভ্রষ্টতা স্বাভাবিক।
আর হ্যাঁ, 'হাদীস মানি' বলে ইচ্ছামতো মানলে হবে না। বরং যে হাদীস সহীহভাবে প্রমাণিত তার প্রত্যেকটা মানতে হবে; যদি না তা মনসূখ হয়।
সহীহ হাদীসের কোন ফায়সালা বাহ্যতঃ কুরআন-বিরোধী মনে হলে কী করবেন?
চট্ ক'রে তা অস্বীকার ক'রে বসলে হবে না যে, এটা হাদীস নয়।
উদাহরণ স্বরূপ আপনি হাদীস পড়লেন,
উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, “মৃত ব্যক্তিকে তার কবরের মধ্যে তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করার দরুন শাস্তি দেওয়া হবে।” (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত ১৭৪২নং) অন্য এক বর্ণনায় আছে, “যতক্ষণ তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করা হয়, (ততক্ষণ মৃতব্যক্তির আযাব হয়)।”
অবশ্যই মনে সমস্যা দেখা দেবে ও মনে হবে যে, এ হাদীসটি কুরআনের পরিপন্থী। কারণ, মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى} (١٦٤) سورة الأنعام
অর্থাৎ, প্রত্যেকেই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে এবং কেউ অন্য কারো ভার বহন করবে না। (সূরা আনআম ১৬৪ আয়াত)
এখন হাদীসটির প্রতি সন্দেহ হলে তা তো সহীহ হাদীস, তাকে রদ করার উপায় নেই। সুতরাং সমন্বয়-সাধনের পথ অবলম্বন করতে হবে। দেখতে হবে হাদীসের ব্যাখ্যাতাগণ কী বলেছেন।
দেখা যাবে, তাঁরা হাদীসের প্রেক্ষাপট বর্ণনা-সহ তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ঐ কান্নায় যদি মৃতব্যক্তির কোন প্রকার সহযোগিতা থাকে, তাহলে তার নিজস্ব কারণঘটিত অপরাধের ফলে তাকে কবরে আযাব ভোগ করতে হবে।
জাহেলী যুগে মৃতব্যক্তি মরার পূর্বে মাতম ক'রে কান্নার অসিয়ত ক'রে মরত, যাতে মরণের পরে তার চর্চা হয়।
অথবা মরণের পূর্বে সে তার আত্মীয়-স্বজনকে মাতম ক'রে কান্না করতে নিষেধ ক'রে মরেনি। তাতে সে শৈথিল্য প্রদর্শন করেছিল। অথচ সে জানত যে, তার পরিবারে মাতম ক'রে কান্নার রেওয়াজ আছে।
এর ফলে সে মহান আল্লাহর এই নির্দেশ পালন করেনি,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ} (٦) سورة التحريم
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর অগ্নি হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফিরিস্তাগণ, যারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। (সূরা তাহরীম ৬ আয়াত)
তাছাড়া এই শ্রেণীর পাপ সেই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যাতে বলা হয়েছে,
لِيَحْمِلُوا أَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمِنْ أَوْزَارِ الَّذِينَ يُضِلُّونَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ أَلَا سَاءِ مَا يَزِرُونَ}
অর্থাৎ, ফলে কিয়ামত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণমাত্রায় এবং তাদেরও পাপভার যাদেরকে তারা অজ্ঞতা হেতু বিভ্রান্ত করেছে। দেখ, তারা যা বহন করবে, তা কতই না নিকৃষ্ট। (সূরা নাহল ২৫ আয়াত)
এই শ্রেণীর তাহকীক করলে সহীহ হাদীসকে রদ করার মত পর্যায় আসবে না।
ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন, 'মুসলিমকে যা বিশ্বাস করা ওয়াজেব তা এই যে, আল্লাহর রসূল ﷺ-এর এমন কোন একটিও সহীহ হাদীস নেই, যা আল্লাহর কিতাবের পরিপন্থী হতে পারে। বরং আল্লাহর কিতাবের সাথে হাদীস হল তিন স্তরেরঃ-
প্রথমঃ কুরআনের অনুসারী; কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্য একই।
দ্বিতীয়ঃ কুরআনের ব্যাখ্যা; যা আল্লাহর উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে এবং ব্যাপক বর্ণনা নির্দিষ্ট করে।
তৃতীয়ঃ এমন এক বিধানের বর্ণনা, যার ব্যাপারে কুরআন নীরব আছে।
এই তিন শ্রেণীর সুন্নাহর মধ্যে কোন শ্রেণীকে প্রত্যাখ্যান করা বৈধ নয়। আর সুন্নাহর কোন চতুর্থ স্তরও নেই।.....
কুরআনের বাহ্যিক অর্থ বুঝে যদি মানুষ সুন্নাহ বর্জন করা বৈধ মনে করে, তাহলে এর ভিত্তিতে অধিকাংশ সুন্নাহ বর্জিত হবে এবং বিলকুল বাতিল গণ্য হবে।' (আত্-তুরুকুল হিকামিয়্যাহ ১০ ১পৃঃ)
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'কোন অবস্থাতেই আল্লাহর রসূলের কোন সুন্নাহ আল্লাহর কিতাবের পরিপন্থী হতে পারে না। (আর-রিসালাহ ৫৪৬পৃঃ)
আমাদের সলফগণ হাদীস প্রত্যাখ্যান করাকে বড় নিন্দনীয় কাজ বলে গণ্য করেছেন। হাদীস বিরোধী বা হাদীসের বর্ণনাকারী কোন সাহাবী বিরোধী মন্তব্যকে ভ্রষ্টতা বলে বিবেচনা করেছেন।
আবূ ক্বিলাবাহ বলেন, যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে কোন হাদীস বর্ণনা করবে এবং সে বলবে, 'এ কথা ছাড়ুন, কুরআনের কথা বলুন' তখন জেনে নেবে যে, সে একজন গোমরাহ লোক। (ত্বাবাক্বাতু ইবনে সা'দ ৭/১৮৪)
ইমাম যাহাবী উক্ত কথার টীকায় বলেন, আর যখন বিদআতী বক্তাকে বলতে দেখবে যে, 'কুরআন ও একক বর্ণনাকারীর বর্ণিত (খবরে ওয়াহেদ) ছাড়ো, তোমার জ্ঞান-বিবেক কী বলছে তাই মানো' তখন জেনে নেবে যে, সে আবু জাহেল। যখন কোন তাওহীদী (অদ্বৈতবাদ বা সর্বেশ্বরবাদ) মতাবলম্বী (সূফী) কে বলতে দেখবে যে, '(হাদীস) বর্ণনা ও জ্ঞান-বিবেক ছাড় এবং রুচি ও আবেগ যা বলছে তাই কর' তাহলে জেনে নেবে যে, ইবলীস মানুষের বেশে আবির্ভূত হয়েছে অথবা সে মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে। সুতরাং তাকে দেখে যদি তুমি ভয় পাও, তাহলে সেখান হতে পলায়ন কর। নচেৎ তাকে চিৎ করে ফেলে তার বুকে বসে তার উপর আয়াতুল কুরসী পড় এবং গলা টিপে তাকে (সেই ইবলীসকে) হত্যা কর। (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' ৪/৪৭২)
মুহাদ্দিস হাসান বিন আলী আল-বাবাহারী বলেন, 'যখন তুমি কাউকে দেখ যে, সে আল্লাহর রসূল ﷺ-এর সাহাবাবর্গের মধ্যে কোন সাহাবীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করছে, তখন জেনে নিও সে ব্যক্তি প্রবৃত্তিপূজারী বিদআতী।' (শারহুস্ সুন্নাহ, বাবাহারী ১১৫পৃঃ ১৩৩ নং)
তিনি আরো বলেন, 'যখন কাউকে শোনো যে, সে হাদীসের বিরুদ্ধে কটূক্তি করছে অথবা হাদীস প্রত্যাখ্যান করছে অথবা হাদীস ছাড়া অন্য কিছু মানতে চাচ্ছে, তখন তার ইসলামে সন্দেহ করো। আর সে যে একজন প্রবৃত্তিপূজক বিদআতী তাতে কোন সন্দেহই করো না।' (ঐ ১১৫-১১৬পৃঃ, ১৩৪নং, শারহুস সুন্নাহ ৫১পৃঃ)