📄 সত্যান্বেষী যুবকদের পথভ্রষ্টতার কারণ
যে সকল মুসলিম যুবকদের মধ্যে দ্বীনী চেতনা ফিরে এসেছে, তাঁদের মধ্যে ইসলামকে জানার একটি পিপাসা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে দ্বীনী জ্ঞান চর্চার আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল তাঁদের কোন গাইড নেই। অথবা গাইডকে তাঁরা দুর্বল মনে করেন। যার ফলে তাঁদের পথের অন্বেষণ চলে অন্ধকারে---বিনা আলোয়, বিনা মানচিত্রে, বিনা রাহবারে। আর তার ফলে ভ্রষ্টতা অস্বাভাবিক নয়। কোথাও পিচ্ছল পথে পা পিছলে আছাড় খাওয়া অদ্ভুত ব্যাপার নয়।
সাধারণভাবে মুসলিম যুবকদের ভ্রষ্টতার কারণ যদি আমরা নির্ণয় করতে যাই, তাহলে একাধিক কারণ আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে। যেমনঃ
১। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা-ব্যবস্থা, প্রচার-মাধ্যম, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদি। এই পরিমণ্ডলে বসবাস ক'রে মুসলিম যুবক নিজেকে নতুন ছাঁচে ঢেলে গড়তে চায়। অন্য ধর্মের কাছাকাছি হতে চায়, অন্য ধর্মের মানুষকে নিজের কাছাকাছি করতে চায়। আর তার ফলে যদি কোন ত্যাগ স্বীকার অর্থাৎ, ধর্মীয় বিশ্বাসকে বাদ দিতে হয়, তাতেও রাজি। যেহেতু ভিন্ন ধর্মের মানুষদের নিকটে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আর তাতে তাঁরা বিব্রত হয়ে নিজের ধর্মে সন্দিহান হয়ে বসে।
২। কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশও মুসলিম যুবককে ভ্রষ্টতার কুহকে ফেলে। ধর্মের নামে কিছু বিশ্বাস, কুসংস্কার ও আচার এমন আছে, যা আসলে শরীয়তে বিদআত। যার কোন দলীল নেই, উপরন্তু তা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। যা দেখে অনুরূপ কোন শরয়ী বিধানকে সে সন্দেহের চোখে দেখে।
আমেরিকা থেকে ডাক্তার হয়ে সদ্যঃ প্রত্যাবৃত্ত এক যুবক দ্বীনদার বাবার সাথে জুমআর নামায পড়তে গেছে। বাবার পাশে দেখাদেখি সুন্নত পড়তে পড়তে তার হাওয়া সরে গেছে। বাবার কানে এলে ছেলেকে বলল, 'বাবা! তোমার ওযু ভেঙ্গে গেছে, ওযু ক'রে এসো।'
ছেলে বলল, 'কেন? ওযুও কি ভঙ্গুর জিনিস?'
বাবা বলল, 'হ্যাঁ, তোমার হাওয়া সরেছে।'
ছেলে বলল, 'তার মানে, আবার কি মুখ-হাত-পা ধুতে হবে?'
বাবা বলল, 'হ্যাঁ।'
ছেলে বলল, 'আর যেখান থেকে হাওয়া বের হল, সেখানটা ধুতে হবে না?'
বাবা বলল, 'না।'
ছেলে বলল, 'তা কোন্ যুক্তিতে?'
বাবা বলল, 'যে যুক্তিতে তোমরা এক জায়গায় ব্যথা আর অন্য জায়গায় ইঞ্জেকশন ফুঁড়ো!'
ছেলে যুক্তি মেনে নিতে পারল না। তবুও লোক-দেখানি ধর্ম মানতে তা করতে বাধ্য হল।
মনে সন্দেহ নিয়েই অনেকে ধর্ম পালন করে, অনেকে করে না, অনেকে তর্ক করে। মূলে কিন্তু সত্যিকারেরেরই কিছু কুসংস্কার।
৩। আদর্শচ্যুত আলেম-উলামা যুবকদের পথভ্রষ্টতার কারণ হয়। তাঁদের অতিরঞ্জন অথবা অবহেলার আমল দেখে, কুরআন-হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা শুনে বা পড়ে হকপথ থেকে দূরে সরে যায়।
৪। ইসলাম-বিরোধী লেখা প্রসিদ্ধ পত্র-পত্রিকা তথা অমুসলিমদের নিকট আদরণীয় হওয়ার ফলে প্রসিদ্ধির লোভে সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয় এবং তখন সে তাই বিশ্বাস করে ও লেখে, যা অমুসলিম অথবা ধর্মনিরপেক্ষবাদী মুসলিম অথবা মুনাফিকরা পছন্দ করে। সে নিজে ভ্রষ্ট হয়, অপরকেও ভ্রষ্ট করে। অপর দিকে হকপন্থী অসংখ্য মুসলিম ও তাদের আলেম-উলামাদের প্রতি অবজ্ঞার চাবুক হেনে নিজেকে প্রসিদ্ধির মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করে। আর তার ফলে কারও নিকট থেকে সে ফুল পায় এবং কারও নিকট থেকে অভিশাপ।
৫। পড়াশোনায় আহলে সুন্নাহ অল-জামাআতের মতাদর্শকে দৃষ্টিচ্যুত করলে অথবা কুরআন ও সহীহ হাদীস-ভিত্তিক জ্ঞানচর্চা না করলে যুবক ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার শিকার হয়। যেমন যয়ীফ ও জাল হাদীসের বেড়াজালে পড়ে পথচ্যুত হয়, তেমনি সহীহ হাদীসকে না বুঝে অস্বীকার করলেও পথহারা হয়।
📄 আকীদা, আমল ও পড়াশোনা কুরআন ও হাদিস উভয়ভিত্তিক হওয়া জরুরী
কিছু যুবক আছেন, যাঁরা সকল হাদীস অস্বীকার করেন না। তাঁরা যেটাকে পছন্দ করেন, যেটা তাঁদের জ্ঞানে ধরে, যুক্তিযুক্ত মনে হয়, সেটা মানেন। যে হাদীস তাঁদের জ্ঞানে ধরে না, সেটাকে মানেন না। তাঁরা কুরআন ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থে বিশ্বাস রাখেন না। তাঁরা লেখকের মতো পরিষ্কারভাবে ফতোয়া দিয়ে বলেন,
'ঈমানের প্রশ্নে কোরাণ ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থের উপর বিশ্বাস করা ঈমানদারের কাজ নয়।' (তত্ত্ব......৩৫পৃঃ)
‘যদি আমরা কোরাণ-ভিত্তিক যুক্তিবাদী (?) না হই, তাহলে প্রকাশ্য ভুলগুলি স্বীকার ও ত্যাগ করতে সক্ষম হব না।' (তত্ত্ব..... ২২পৃঃ)
'যেমন সোনা ও পিতলের পার্থক্য করে কষ্টিপাথর। তেমনি শরিয়তেরও কষ্টিপাথর হল গভীর ভাবনা ও বিশ্লেষণ!' (তত্ত্ব... ১পৃঃ)
মাশাআল্লাহ! এ নতুন নীতি যেন নব নবুয়তের অভিনব চিন্তাধারা! আল্লাহর শরীয়তকে মানুষ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ দিয়ে নয়, বরং 'গভীর ভাবনা ও বিশ্লেষণ' দিয়ে যাচাই-বাছাই করতে হবে। এ যেন স্বর্ণ যাচাই করতে কর্মকারের কাছে যাওয়া! দেহের সূক্ষ্ম অপারেশন করতে নাপিতের কাছে যাওয়া! কিন্তু তাতে যে, রোগ সারাতে গিয়ে রগ কাটা যাবে!
বলা বাহুল্য, সুন্নাহ বা হাদীস না মেনে ঈমান রক্ষা করা যাবে না। আর মানুষের সীমিত জ্ঞান দিয়ে সুন্নাহ বিচার করা যাবে না। সুন্নাহ মুহাদ্দিসীনদের নিকট সনদের তাহকীকে 'সহীহ' বলে প্রমাণিত হলে তা না মানার জন্য ধানাই-পানাই করা যাবে না। এটাই আহলে সুন্নাহর নীতি। বাকী কেউ তা না মানলে, সে যদি মুর্তাদও হয়ে যায়, তাতে কার কী বলার থাকতে পারে?
'যুক্তিহীন আবেগপূর্ণ অন্ধ-বিশ্বাস কখনই ইসলাম হতে পারে না।' (তত্ত্ব....৫ ১পৃঃ) এ কথা কুরআন ও সহীহ হাদীস ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নচেৎ কুরআন ও সহীহ হাদীসের প্রতি যদি কারো যুক্তিহীন আবেগপূর্ণ অন্ধ-বিশ্বাস না থাকে, তাহলে সে মুসলিম হতেই পারবে না।
📄 হাদিস অমান্য করার কারণ
বিভিন্ন শ্রেণীর হাদীস অমান্যকারী রয়েছে।
কুরআনী ফির্কা মোটেই হাদীস মানে না।
কেউ কেউ 'যওক' হিসাবে হাদীস গ্রহণ ও বর্জন করেন।
কেউ কেউ 'আক্কেল'-এর মীযানে হাদীস গ্রহণ ও বর্জন করেন। (যেন তাঁদের আক্কেলটাই সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর দূতের বাণীর কষ্টিপাথর! তাঁদের মূল বক্তব্য হল, যে হাদীস আমাদের জ্ঞানে ধরবে, সেটি হাদীস বলে মানব; যদিও তা জাল হাদীস হয়। আর যেটা আমাদের জ্ঞানে ধরবে না, তা মানব না; যদিও তা মুতাওয়াতির বা বুখারীর হাদীস হয়! এঁরা এঁদের শাকবেচা দাঁড়িপাল্লা নিয়ে সোনা অথবা পাহাড় ওজন করতে চান!
এঁরা যদি শোনেন যে, আল্লাহর রসূল (সঃ) বলিয়াছেন, “বিদ্যা যতই বাড়ে, ততই জানা যায় যে, কিছুই জানি না। টাকার সেই দশা; টাকা যতই বাড়ে, ততই মনে হয়, টাকা নাই বলিলে হয়।” তাহলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠবেন, 'অবশ্যই এটা হাদীস। কারণ, এতো খুব দামী কথা, যুক্তিগ্রাহ্য বাস্তব কথা।' তার সনদ বা সূত্র দেখার প্রয়োজন নেই। সত্যপক্ষেই তা আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন কি না, তা তলিয়ে দেখার কোন প্রয়োজন নেই।
পক্ষান্তরে এঁরা যখন শুনেন যে, বুখারী-মুসলিম শরীফে আছে, “আল্লাহর নবী ﷺ-এর আঙ্গুলের ইশারায় চাঁদ দু-টুকরা হয়েছিল।” তখন বলেন, তাই আবার হয় নাকি? এটা গাঁজাখুরি গল্প। কারো আঙ্গুলের ইশারায় কি চাঁদ দ্বিখণ্ড হয়? হলেই বা তিনি মহানবী। একটা সম্ভব-অসম্ভব তো আছে।
যদি বলা হয়, 'কুরআনেও তার ইঙ্গিত আছে।' তাহলে এঁরা বলেন, 'তা যে নবীর যুগে তাঁর আঙ্গুলের ইশারায় তার প্রমাণ কি?'
আমরা বলি, মহান আল্লাহ বলেছেন,
اقْتَرَبَتْ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ (۱) وَإِنْ يَرَوْا آيَةً يُعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُسْتَمِرٌّ (۲) وَكَذَّبُوا وَاتَّبَعُوا أَهْوَاءَهُمْ وَكُلُّ أَمْرٍ مُسْتَقِرٌّ (۳) وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مِنْ الْأَنْبَاءِ مَا فِيهِ مُزْدَجَرُ (٤) حِكْمَةٌ بَالِغَةٌ فَمَا تُغْنِ النُّذُرُ (٥) فَتَوَلَّ عَنْهُمْ يَوْمَ يَدْعُ الدَّاعِي إِلَى شَيْءٍ نُكُرٍ (٦) خُشَّعاً أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنْ الأَجْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادٌ مُنتَشِرُ (۷) مُهْطِعِينَ إِلَى الدَّاعِي يَقُولُ الْكَافِرُونَ هَذَا يَوْمٌ عَسِرٌ (۸)
অর্থাৎ, কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে। তারা কোন নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, 'এটা তো চিরাচরিত যাদু।' তারা মিথ্যা মনে করে এবং নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, আর প্রত্যেক কাজের জন্য একটি স্থিরীকৃত সময় রয়েছে। তাদের নিকট এসেছে সংবাদ, যাতে আছে ধমক। এটা পরিপূর্ণ জ্ঞান, তবে এই সতর্কবাণীসমূহ তাদের কোন উপকারে আসেনি। অতএব তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর। (সেদিনকে স্মরণ কর,) যেদিন আহবানকারী (ইস্রাফীল) আহবান করবে এক অপ্রিয় বিষয়ের দিকে। অপমানে অবনমিত নেত্রে কবর হতে বের হবে বিক্ষিপ্ত পঙ্গপালের ন্যায়। তারা আহবানকারীর দিকে ছুটে আসবে ভীত-বিহ্বল হয়ে। অবিশ্বাসীরা বলবে, 'এ তো কঠিন দিন।' (সূরা ক্বামার ১-৮ আয়াত)
দ্বিতীয় নং আয়াত থেকে ৮নং আয়াত পর্যন্ত বাক্যাবলীতে উদ্দিষ্ট কারা? কারা বলেছিল, 'এটা তো চিরাচরিত যাদু।' তারা কি মক্কার কাফেররা নয়?
আপনি যদি বলেন, 'আল্লাহ নিজ কুদরতে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করতে পারেন।'
তাহলে এঁরা বলবেন, 'আল্লাহ করিতে পারেন সব---তোমাকে বা আমাকে পাগল করিতে পারেন। তাই তুমি আমাকে বা আমি তোমাকে পাগল গণ্য করিব? ইহা যে ঘটিয়াছে---ঐতিহাসিকভাবে তাহার প্রমাণ দাও।'
কিন্তু আমরা বলি, 'কোন লোক যদি সত্যই পাগল হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাকে পাগল মানিতে অসুবিধাটা কোথায়? প্রমাণ তো বুখারী-মুসলিম প্রভৃতি গ্রন্থ। কিন্তু বাস্তববাদী মনে তাহা যদি গ্রহণ না করিয়া থাকেন, তাহা হইলে আমাদের বলিবার আর কি-ইবা থাকিতে পারে?'
এক সময় এমন ছিল, কিছু বস্তুবাদী বুখারী শরীফের পানিতে মাছি পড়লে তা ডুবিয়ে পানি খাওয়ার হাদীসকে অস্বীকার করত। বর্তমানের রিসার্চে মাছির এক ডানায় রোগজীবাণু ও অপর ডানায় তার প্রতিরোধক বস্তু থাকার কথা আবিষ্কার হওয়ায় তাঁদের অনেকে 'সুবহানাল্লাহ' পড়ছেন।
মুহাদ্দিসীন তথা আহলে সুন্নাহ অল-জামাআহ বা আহলে হাদীস মতে যয়ীফ ও জাল হাদীস মানা যাবে না। সুতরাং কোন হাদীস সামনে এলে মু'মিনের কর্তব্য হলঃ-
১। এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, হাদীস হল দুটি অহীর অন্যতম।
২। হাদীসের বক্তব্যকে নির্ভুল ও নিষ্কলুষ বলে নিঃসন্দেহে মেনে নেওয়া। যেহেতু হাদীস যাঁর তিনি হলেন নির্ভুল ও নিষ্পাপ মানুষ।
৩। সেটা সত্যপক্ষে তাঁর হাদীস কি না, তা অনুসন্ধান করা ওয়াজেব। তা সহীহ কি না, তা জানা জরুরী।
৪। সহীহ প্রমাণিত হলে তা সর্বান্তঃকরণে মেনে নেওয়া ওয়াজেব; যদিও তা নিজ জ্ঞান ও বিবেক বহির্ভূত মনে হয় এবং তার পিছনে যুক্তি ও হিকমত না বুঝা যায়।
৫। যয়ীফ (দুর্বল), বা মওযু' (জাল) প্রমাণিত হলে তা বর্জন করা।
৬। হাদীসের সঠিক অর্থ বুঝা। আপাতদৃষ্টিতে দুটি হাদীস পরস্পর-বিরোধী মনে হলে তা সমন্বয় ও সামঞ্জস্য সাধনের চেষ্টা করা। নিজে না পারলে বিশেষজ্ঞ আলেম-উলামাকে জিজ্ঞাসা করা।
৭। হাদীসের নাসেখ-মনসূখ (রহিত-অরহিত) নির্দেশ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা।
কুরআন-বিরোধী বা স্ববিরোধী হলে তার ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে। সে হাদীসকে ফুঁক দিয়ে ছাই বা ধুলো উড়ানোর মত উড়িয়ে দেওয়ার দুঃসাহসিকতা করা যাবে না।
যদি একান্তই কোন সহীহ হাদীসের অর্থ বুঝে না আসে অথবা বিবেক-বহির্ভূত মনে হয়, তাহলে কুরআনী আয়াতের ব্যাপারে যে নীতি অবলম্বন করা হয়, সেই নীতিই অবলম্বন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءِ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاء تَأْوِيلِهِ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُوا الأَلْبَابِ} (۷) سورة آل عمران
অর্থাৎ, তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন; যার কিছু আয়াত সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, এগুলি কিতাবের মূল অংশ; যার অন্যগুলি রূপক; যাদের মনে বক্রতা আছে, তারা ফিতনা (বিশৃংখলা) সৃষ্টি ও ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে যা রূপক তার অনুসরণ করে। বস্তুতঃ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা সুবিজ্ঞ তারা বলে, 'আমরা এ বিশ্বাস করি। সমস্তই আমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে আগত।' বস্তুতঃ বুদ্ধিমান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা আলে ইমরান ৭ আয়াত)
আর দুআ ক'রে বলতে হবে,
{ رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذَ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ} (۸)
অর্থাৎ, হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে বক্র ক'রে দিও না এবং তোমার নিকট থেকে আমাদেরকে করুণা দান কর। নিশ্চয় তুমি মহাদাতা। (ঐ ৮ আয়াত)
কুরআনের এক আয়াত অন্য আয়াতের বিরোধী হতে পারে না। হলে মানসূখ হতে পারে। অনুরূপ হাদীসও। তেমনি কোন সহীহ হাদীস কুরআনের বিপরীত হতে পারে না। হলে মানসূখ হতে পারে। এ ছাড়া পরস্পরবিরোধী মনে হলে অন্য কোন সামঞ্জস্য ও সমন্বয়-পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যা উলামাগণ বর্ণনা ক'রে গেছেন। তাঁদের সে নীতি ও পদ্ধতি গ্রহণ না করে নিজের মনে 'হাদীস হতে পারে না' বলে অস্বীকার করা কোন জ্ঞানী মু'মিনের কাজ নয়।
‘যওক’-ভিত্তিক ও তথাকথিত কুরআন-ভিত্তিক তাহকীক ও যুক্তির নিকষে সহীহ হাদীসকে উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বহু পূর্বে মু'তাযিলা ফির্কা আক্কেলকে প্রাধান্য দিয়ে উক্ত কাজ ক'রে গেছে। গত শতাব্দীতে মওলানা মওদূদী ও আকরাম খাঁ সাহেবদ্বয়ও সহীহ হাদীসকে হাদীস বলে না মানার মত তাহকীক দেখিয়ে গেছেন। সমসাময়িককালে তার সমালোচনাও হয়েছে। আমরা ভাবতাম, আমাদের যুবকরা সে বিষয়ে সচেতন। কিন্তু এখন দেখছি, সেই আকলী মাদ্রাসার ছাত্র কোথাও কোথাও মাথা নাড়া দিয়ে উঠছে। শুধু মনের মধ্যেই সেই রোগে সংক্রমিত হয়ে রোগগ্রস্ত নয়, বরং বই লিখে তা আরো ব্যাপক করার প্রয়াসে তৎপর হয়েছেন! আমার মনে হয়, তাঁরা যদি তাঁদের ঐ আধুনিক তাহকীকের বিরুদ্ধে সমালোচনা পড়তেন, তাহলে হক বুঝে হকের সমালোচনা করতেন না।
উদাহরণ স্বরূপ সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করার ফলে এক যুক্তিবাদীর সমালোচনায় বলা হয়েছে, 'পূর্ব বর্ণিত জনৈক বাঙ্গালী পণ্ডিত হাদীছখানার তাৎপর্য বিপরীত বুঝিয়া তথাকথিত “তফসীরুল কুরআন”-এ এই হাদীছখানার সমালোচনা করিয়াছেন। তিনি নিজের স্বল্প জ্ঞানহেতু ভুলে পতিত হইয়া নানারূপ প্রলাপোক্তি করিয়াছেন---হাদীছকে এনকার করিয়াছেন, হাদীছ বর্ণনাকারীর প্রতি ক্ষেপিয়াছেন। এমনকি চরম ধৃষ্টতায় বিশিষ্ট সাহাবী আবু হোরায়রা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রতি বেআদবী করতঃ বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, এইটা আবু হোরায়রার গর্হিত বয়ান এবং বোখারী-মুসলিম শরীফে উল্লেখ হইয়া থাকিলেও পণ্ডিত মিয়া ইহাকে হাদীছ বলিয়া গ্রহণ করিবেন না।
এই সকল প্রলাপোক্তির একমাত্র কারণ হইল, হাদীছখানার মূল তাৎপর্যে পৌঁছিবার অসমর্থতা। তিনি বুঝিয়াছেন যে, ইহাতে হযরত ইব্রাহীমের মিথ্যা বলা প্রতিপন্ন হয়।
বস্তুতঃ ইহা এই হাদীছের তাৎপর্য নহে, বরং ইহা পণ্ডিত মিঞার অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী প্রসূত বক্র ও ভুল ধারণা হইতে সৃষ্ট।' (বাংলা বোখারী শরীফ ৪/৯৩)
আরো বলা হয়েছে,
'....এই সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করিয়াই একটা নিজের মনগড়া আজগুবি গোঁজামিলকে পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যারূপে প্রাধান্য দিয়াছেন। দুঃখের বিষয়, তিনি বাংলাভাষায় পাণ্ডিত্যের জোরে অন্যান্য ভাষাকেও ঠেলিয়া নিয়া যাইতে চেষ্টা করেন এবং লাগামহীনভাবে সিদ্ধান্ত করিয়া বসেন। তিনি যদি আরবী ভাষায় সাধারণ জ্ঞানও রাখিতেন তবে ঐরূপ বাস্তবের বিপরীত স্বপ্ন দেখিতেন না।' (ঐ ৪/১৩৪)
ভুল বুঝার আরো একটি কারণ যে, ঐ শ্রেণীর পাঠচক্রের যুবকরা যা পড়েন, তা কোন হক্কানী আলেম-উলামার কাছে বসে বুঝে নেন না। বরং সীমাবদ্ধ বুঝেই নিজের বুঝটাকে বড় মনে করেন। অথচ সে বুঝ তাঁর জন্য বোঝা স্বরূপ। আরবের উলামাগণ বলেন,
من كان كتابه شيخه كان خطأه أكثر من صوابه.
অর্থাৎ, কিতাব যার ওস্তাদ হয়, ঠিকের থেকে তার বেঠিক (জ্ঞান) বেশী হয়।
হয়তো তাঁরা অন্য শ্রেণীর আলেম-উলামার কাছে বসে দর্স নেওয়াটা 'মনুষ্যমেধা নষ্ট' করার সমতুল্য মনে করেন অথবা তাঁদেরকে কাঠমোল্লা ভাবেন।
সুবিধাবাদীরাও বহু সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করতে পারে। যেমনঃ-
যারা গান-বাজনা শুনতে অভ্যস্ত, তারা বলবে, 'গান-বাজনা হারাম হওয়ার কথা কুরআনে নেই। অতএব বুখারীর হাদীস ভিত্তিহীন।'
যে ব্যাংকের সূদ খায়, সে বলবে, 'ব্যাংকের সূদ হারাম হওয়ার কথা কুরআনে নেই।'
যে বিড়ি-সিগারেট বা তামাক-জর্দা খায়, সে বলবে, 'তা হারাম নয়। যেহেতু কুরআনে তা হারাম করা হয়নি। অতএব কোন হাদীস থেকে তা হারাম প্রমাণ করা হলে তা হবে কুরআনের পরিপন্থী।
যে দাড়ি চাঁছে ও অপরের চেঁছে পয়সা কামায় সে বলবে, 'দাড়ি চাঁছা হারাম হওয়ার কথা কুরআনে নেই।'
যে তাবীয-ব্যবসা করে, সে বলবে তাবীয-ব্যবসা হারাম হওয়ার কথা কুরআনে নেই।
দু'টি নামায (ফজর ও এশা) ছাড়া কুরআনে অন্য নামাযের নাম উল্লেখ নেই। কেউ বলতে পারে, 'সুতরাং অন্য নামায পড়তে হবে না।'
যারা ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়ে না, তারা সহীহ হাদীস রদ ক'রে বলে, 'তা কুরআন-বিরোধী।'
কেউ বলতে পারে, 'কুকুর খাওয়া হারাম নয়, কারণ সে কথা কুরআনে নেই।'
স্ত্রীর মাসিক হলে তার বিছানায় শোয়া যাবে না। শুলে কুরআন-বিরোধী আমল হবে। কারণ কুরআন বলে,
{فَاعْتَزِلُوا النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ} (٢٢٢) سورة البقرة
অর্থাৎ, তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন কর এবং যতদিন না তারা পবিত্র হয়, (সহবাসের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। (সূরা বাক্বারাহ ২২২ আয়াত)
সোনা-চাঁদি, টাকা-পয়সা মোটেই জমা করা যাবে না। কারণ তা কুরআন-বিরোধী আমল হবে। যেহেতু কুরআন বলে,
{ وَالَّذِينَ يَكْتِرُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ}
অর্থাৎ, যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দাও। (সূরা তাওবাহ ৩৪ আয়াত)
মহিলা নেতৃত্ব কুরআনে নিষেধ নেই। অতএব নেতৃত্ব অবৈধ হওয়ার হাদীসটি জাল।
ব্যভিচারের শাস্তি পাথর মারা কুরআনে নেই। মৃত্যুদণ্ড কুরআন-বিরোধী। কারণ কুরআনে ১০০ চাবুক মারার কথা বলা হয়েছে।
মৃত খাওয়া হারাম কুরআনে আছে। অতএব মৃত মাছ খাওয়া হাদীসে থাকলেও তা মান্য নয়। মাছ মারা গেলে খাওয়া যাবে না।
কুরআনে আছে নিজের আত্মীয় (ছেলে-মেয়ে)র নামে সম্পত্তি উইল করা যাবে। (সূরা বাক্বারাহ ১৮০ আয়াত) হাদীসে আছে কোন ওয়ারেসের নামে উইল বৈধ নয়। সে হাদীস সহীহ হলেও জাল।
স্ত্রীকে তিন তালাক দিলেও তার জীবনভর খোরপোশ দিতে হবে; কারণ কুরআনে আছে,
{ وَلِلْمُطَلَّقَاتِ مَتَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ} (٢٤١) سورة البقرة
অর্থাৎ, তালাকপ্রাপ্তা নারীগণও যথাবিহিত খরচপত্র (ক্ষতিপূরণ) পাবে। সাবধানীদের জন্য এ (দান) অবশ্য কর্তব্য। (সূরা বাক্বারাহ ২৪১ আয়াত)
'(কনের) অভিভাবক ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ নয়।' এ হাদীসকে সূরা বাক্বারার ২৩০নং আয়াতের পরিপন্থী মনে ক'রে মযহাবধারীরা রদ ক'রে থাকেন। অনুরূপ আরো হাদীস।
'নবীর সম্পত্তির কেউ ওয়ারেস হয় না।' এ হাদীসকে কুরআনের সূরা নিসার ১১নং আয়াতের বিরোধী ধারণা ক'রে শিয়ারা রদ ক'রে থাকে। অনুরূপ আরো হাদীস।
মহান আল্লাহর হাত-পা ইত্যাদির সহীহ হাদীসকে জাহমিয়্যাহরা প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ তাদের ধারণামতে তা সূরা শূরার ১১নং আয়াতের পরিপন্থী। অনুরূপ আরো হাদীস।
খাওয়ারেজরাও তাদের মযহাব-বিরোধী সকল সহীহ হাদীসকে কুরআনের বিপরীত ধারণা ক'রে রদ করেছে।
ক্বাদারিয়্যাহরাও তাদের মযহাব-বিরোধী সকল সহীহ হাদীসকে কুরআনের কোন কোন আয়াতের পরিপন্থী ধারণা ক'রে রদ করেছে।
জাবারিয়্যাহরা তাদের মযহাব-বিরোধী সকল সহীহ হাদীসকে কুরআনের কোন কোন আয়াতের পরিপন্থী ধারণা ক'রে প্রত্যাখ্যান করেছে।
অনুরূপ আরো বহু ফির্কা বহু সহীহ হাদীসকে শুধু এই জন্য রদ করেছে যে, তা তাদের ধারণামতে কুরআনের বিরোধী!
আসলে হাদীস মানবে না। কিন্তু সরাসরি রদ করতে পারে না। কারণ তাহলে তো লোকে 'কাফের' বলবে। সুতরাং না মানার অজুহাতে কুরআনী-দলীল খুঁজে বের করে, অতঃপর তা রদ করে।
কবরের আযাবকে অনেকে স্বীকার করে না, কারণ এত বড় বড় আযাবের কথা কুরআনে নেই।
কুরআনে 'মেহেরাজ' শব্দ নেই। অতএব তাও অবিশ্বাস্য হওয়ার কথা। যেমন দাজ্জাল শব্দ নেই, অতএব তার আগমনের কথা আজগুবি গল্প মাত্র!
আল্লাহর নবী ﷺ-কে কত মু'জিযা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সে কথা কুরআনে নেই। অতএব মু'জিযার যাবতীয় হাদীস ভিত্তিহীন!
যদিও মু'জিযা নবী বা তাঁর বিরোধীদের দাবী ও চাওয়া অনুপাতে দেওয়া হয় না। কেবল আল্লাহর ইচ্ছা অনুপাতে দেওয়া হয়। উল্লেখ না থাকলে কি তা অস্বীকার করা যায়?
কুরআনে যদি (ধারণামতে) কুরআন-বিরোধী অথবা পরস্পরবিরোধী কথা পান, তাহলে জ্ঞানীরা কী বলেন?
অনুরূপ সহীহ হাদীসে যদি কুরআন বিরোধী কথা আসে, তাহলে কেন জ্ঞানীদের কথা মান্য নয়?
ঐ স্বেচ্ছাচারিতা ও ফির্কাবন্দীর ফলেই বিভিন্ন দলের সৃষ্টি হয়েছে। আর তার একটি মু'তাযিলা ফির্কা। যারা আক্কেলের ঘোড়া ছুটিয়ে সহীহ হাদীস তথা মু'জিযা ও অনেক কিছুকে অস্বীকার করেছে। আর খাঁ সাহেব ও তাঁর যুক্তিমুগ্ধরা ঐ মাদ্রাসারই ছাত্র।
📄 শরীয়তে জ্ঞান-ভিত্তিক যুক্তির মান
ইসলামী শরীয়তে যখন কুরআন ও সহীহ হাদীসের স্পষ্ট উক্তি বর্তমান থাকে, তখন জ্ঞান-ভিত্তিক যুক্তি কোন কাজে লাগে না। যেহেতু শরীয়ত-ওয়ালার জ্ঞান অপেক্ষা মানুষের জ্ঞান বড় ও শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। জ্ঞানে ধরার মত কথা না হলে তার ব্যাখ্যা খুঁজতে হয়; নচেৎ হুবহু ঈমান রাখতে হয়। কোনক্রমেই শরীয়তের উক্তির উপরে যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) 'দারউ তাআরুযিল আকুলি অন্-নাকুল' নামক মূল্যবান একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাতে তিনি আশায়েরাহ প্রভৃতি আক্কেলপন্থীদের প্রতিবাদ করেছেন, যারা শরয়ী উক্তির উপর নিজেদের জ্ঞান ও যুক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়। রাযী, গাযালী, জুওয়াইনী, কাযী আবু বাক্র ইবনুল আরাবী, বাক্বিল্লানী প্রমুখ যুক্তিবাদীদের খণ্ডন করেছেন।
নিঃসন্দেহে শরয়ী উক্তির উপর যুক্তির প্রাধান্য পাওয়ার বিষয়টি অতি বিপত্তি ও আপত্তিকর। যেহেতু এই ছিদ্রপথে জাহেল মানুষরাও শরীয়তের উক্তি নিয়ে খেল খেলতে শুরু ক'রে দেয়। জ্ঞানে ধরার কথা নয় মনে ক'রে তা প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকার ক'রে বসে! আর তার ফলে হাদীস না বুঝে নিজের দায় স্বীকার না ক'রে বুখারী-মুসলিমের হাদীস পর্যন্ত অস্বীকার ক'রে ফেলে!
এই কারণে ইমাম ইবনুল কাইয়েম তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আস্-স্বাওয়াইস্কুল মুরসালাহ'তে শরয়ী উক্তির উপর যুক্তিকে প্রাধান্যদাতাকে সেই চারটি তাগূতের মধ্যে গণ্য করেছেন, যারা ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। আর ২৪১ ভাবে সেই তাগুতের খণ্ডন করেছেন।
শায়খুল ইসলাম (রঃ) স্পষ্ট করেছেন যে, সুস্থ ও নিরপেক্ষ বিবেক সহীহ দলীলের অনুসারী অবশ্যই হবে। সঠিক যুক্তি ও সহীহ দলীলের মধ্যে কোন প্রকার সংঘর্ষ হতে পারে না। বিপরীত মনে হলে মানুষের সীমিত বিবেককেই দুষ্ট ও অসুস্থ জানতে হবে।
আবু মুযাফফার সামআনী বলেন, 'জেনে রাখুন যে, আমাদের ও বিদআতীদের মাঝে পার্থক্যকারী হল আক্কেলের বিষয়টি। বিদআতীরা তাদের আক্কেলের উপর নিজেদের দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অতঃপর অনুসরণ ও শরয়ী উক্তিকে তার অনুগামী করেছে। পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাহর নীতি হল দ্বীনের মূল বিষয় (শরয়ী উক্তির) অনুসরণ এবং আক্কেল ও যুক্তি তার অনুগামী। কেননা দ্বীনের ভিত্তি যদি আক্কেল হত, তাহলে মানুষ অহী ও আম্বিয়ার অমুখাপেক্ষী হত এবং আদেশ ও নিষেধ অর্থহীন হয়ে পড়ত। যার যা ইচ্ছা তাই বলত। দ্বীন যদি যুক্তির উপর ভিত্তিশীল হত, তাহলে যুক্তিগ্রাহ্য না হওয়া পর্যন্ত কোন মু'মিনের জন্য কিছু গ্রহণ করা বৈধ হত না।' (স্বাওনুল মানত্বিক্ব ১৮২পৃঃ)
তাহাবিয়ার ব্যাখ্যাকারী বলেন, 'দ্বীনের মৌলিক নীতি সম্বন্ধে সেই ব্যক্তি কিভাবে কথা বলে, যে ব্যক্তি তা কিতাব ও সুন্নাহ থেকে আহরণ করেনি? বরং সে অমুকের উক্তি থেকে তা গ্রহণ করে। আর যখন মনে করে যে, সে আল্লাহর কিতাব বোঝে, তখন তা রসূলের হাদীস থেকে সে তফসীর গ্রহণ করে না; বরং হাদীসের প্রতি সে ভ্রূক্ষেপই করে না। তফসীর গ্রহণ করে না সাহাবা-তাবেঈন কর্তৃক বর্ণিত আসার থেকে।'
বরং তারা বলে, 'সাহাবা-তাবেঈনদের কথা তৎকালীন যুগে উত্তম ছিল।' তার মানে এ যুগে তাঁদের কথা উত্তম নয়! কারণ এ যুগ তো টেলিভিশনের যুগ।
বরং এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যারা বলে 'হাদ্দাসানী ক্বালবী আর-রাব্বী।' (অর্থাৎ, আমার হৃদয় আমার রব থেকে হাদীস বর্ণনা করেছে......) অনুরূপ ঐ শ্রেণীর যুক্তিবাদীরা বলেন, 'হাদ্দাসানী আক্বলী আর-রাব্বী!' (অর্থাৎ, আমার আক্কেল আমার রব থেকে হাদীস বর্ণনা করেছে......।)
আকীদা ত্বাহাবিয়া ও তার ভাষ্যগ্রন্থে বলা হয়েছে, কোন মুসলিমের ইসলামের পা সুদৃঢ় হতে পারে না, যতক্ষণ না সে দুই অহীকে সর্বান্তঃকরণে মেনে নিয়েছে এবং আনুগত্যের জন্য আত্মসমর্পণ করেছে।
অর্থাৎ, বিনা দ্বিধায় দুই অহীর ফায়সালা মেনে না নিলে কারো ইসলাম তার মনের ভূমিতে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। যখন সে অহীর বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ আনবে না, মনের ভিতরে কোন 'কিন্তু' আনবে না, নিজের রায়, বিবেক ও যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে তার বিরোধিতা করবে না, নিজের জ্ঞানকে বড় মেনে অহীতে সন্দেহ পোষণ করবে না।
ইমাম মুহাম্মাদ বিন শিহাব যুহরী বলেছেন, 'আল্লাহর তরফ থেকে রিসালাত এসেছে, রসূলের দায়িত্বে ছিল, সে রিসালাত পৌছে দেওয়া। আর আমাদের দায়িত্ব হল তা মেনে নেওয়া।'
সুতরাং সেই অহীদ্বয় ব্যতীত জ্ঞান-ওয়ালার কোন পরিত্রাণ নেই। আল্লাহর তওহীদ এবং রসূলের আনুগত্যের তওহীদ ছাড়া মুক্তির কোন পথ নেই।
একটু চিন্তা ক'রে দেখলে দেখা যাবে যে, শরীয়তে নানা বিঘ্ন ও বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে তিন শ্রেণীর মানুষের কারণে।
১। স্বেচ্ছাচারী ও অত্যাচারী শাসক। এঁরা নিজেদের অবৈধ রাজনীতির খাতিরে শরীয়তের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন, তার বিধান পরিবর্তন করেন। শরীয়তের আইন অমান্য ক'রে নিজেদের গদি টিকিয়ে রাখেন।
২। আদর্শচ্যুত আলেম। এঁরা শরীয়তের উপরে নিজেদের রায় ও যুক্তিকে খেয়াল-খুশী মতো প্রাধান্য দেন। কুরআন-হাদীসের সুবিধামতো ব্যাখ্যা ক'রে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করেন।
৩। ইল্মহীন আবেদ। এঁরা অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতার সাথে আল্লাহর ইবাদত করেন। এঁদের অনেকে 'যওক', 'কাশফ', 'খেয়াল' ও স্বপ্ন থেকে শরীয়ত গ্রহণ করেন এবং সে মতে আল্লাহর ইবাদত করেন।
স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্রনেতা বলেন, 'ধর্মনীতির সাথে রাজনীতির সংঘর্ষ বাধলে, রাজনীতি প্রাধান্যযোগ্য।
আদর্শচ্যুত যুক্তিবাদী আলেম বলেন, 'কুরআন-হাদীস ও যুক্তির সংঘর্ষ বাধলে যুক্তিই প্রাধান্যযোগ্য।'
সূফীমার্কা জাহেল আবেদ বলেন, 'শরীয়ত এবং যওক ও কাশফ্ফের বিরোধ বাধলে যওক ও কাশ্যই প্রাধান্যযোগ্য।
এঁরা সকলেই ইসলামের দরদে মায়াকান্না প্রকাশ করলেও আসলে কিন্তু সে দরদ নেই। যেহেতু তাঁদের কাছে শরীয়ত আসলে অহী-ভিত্তিক নয়; বরং যুক্তি-ভিত্তিক।
অথচ কোন অহীর উপর যুক্তি বা বিবেক প্রাধান্য পাওয়ার কথা নয়; যদিও অহীকে বরণ ও স্বীকার করার পথ বিবেকই রচনা করেছে।
উদাহরণ স্বরূপ যুক্তির সাথে (অহীর) উক্তি জাহেল মুকাল্লিদের সাথে আলেম মুজতাহিদের মত; বরং তারও নিম্নে। কারণ জাহেল শিক্ষা লাভ ক'রে আলেম হতে পারে, কিন্তু আলেম নবী হতে পারেন না। জাহেল মুকাল্লিদ কোন মুজতাহিদ আলেমের খবর পেল এবং অন্য এক জাহেলকে সে খবর দিল। সুতরাং প্রথম জাহেল হল রাহবার এবং দ্বিতীয় জাহেল হল ফতোয়া তলবকারী। আর আলেম হলেন মুফতী। এবার কোন বিষয়ে রাহবার ও মুফতীর যদি মতবিরোধ হয়, তাহলে ফতোয়া তলবকারীর উচিত মুফতীর কথা মান্য করা, রাহবারের কথা নয়। এখন রাহবার যদি বলে, 'আমার কথা মানো, আমার কথাটাই ঠিক। মুফতীর কথা ঠিক নয়; কারণ আমিই তোমাকে মুফতীর খবর দিয়েছিলাম। আমার কারণেই তুমি মুফতী চিনতে পেরেছ। অতএব আমাকে ছেড়ে তার কথা মানবে কেন? আমিই তো মূল। মূল ছেড়ে শাখাকে প্রাধান্য দেবে কেন?'
তাহলে ফতোয়া তলবকারী অবশ্যই রাহবারকে বলবে যে, 'তুমি যখন প্রথমে সাক্ষ্য দিয়েছ যে, উনি মুফতী। উনার কথা মেনে চলা ওয়াজেব। এখন তোমার এই কথা মেনে নেওয়ার মানে এ নয় যে, তোমার সব কথাকেই মানতে হবে। বরং মুফতীর কথাই তো মান্য, যেহেতু তিনি তোমার থেকে বেশী জ্ঞান রাখেন।'
বলা বাহুল্য, মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক হল রাহবারের মত। আর মুফতী হল কুরআন ও সহীহ হাদীস। ফতোয়া তলবকারী প্রত্যেক মুসলিমের উচিত, প্রত্যেক বিষয়ে রাহবারের কথা না মেনে মুফতীর কথা মানা; যদিও রাহবার তার কাছে তুচ্ছ নয়।
ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন,
لا يستقل العقل دون هداية ... بالوحي تأصيلا ولا تفصيلا
كالطرف دون النور ليس بمدرك ... حتى يراه بكرة وأصيلا
وإذا الظلام تلاطمت أمواجه ... وطمعت بالإبصار كنت محيلا
فإذا النبوة لم ينلك ضياؤها ... فالعقل لا يهديك قط سبيلا
نور النبوة مثل نور الشمس ... للعين البصيرة فاتخذه دليلا
طرق الهدى مسدودة إلا على ... من أم هذا الوحي والتنزيلا
فإذا عدلت عن الطريق تعمدا ... فاعلم بأنك ما أردت وصولا
یا طالبا درك الهدى بالعقل ... دون النقل لن تلق لذاك دليلا
کم رام قبلك ذاك من متلذذ ... حيران عاش مدى الزمان جهولا
অর্থাৎ, অহীর পথনির্দেশ ছাড়া জ্ঞান-যুক্তি স্বাতন্ত্র্য লাভ করতে পারে না; না মৌলিক ক্ষেত্রে, আর না বিশদ ক্ষেত্রে।