📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 গুরু কথা

📄 গুরু কথা


হাতে এল একখানি পুস্তিকা। নাম---'তত্ত্ব ও বাস্তবের ভ্রান্তি আজকের ইসলাম'। লেখক--- মহম্মদ নূর আলম। নিবাস---কীর্ণাহার, বীরভূম। পুস্তিকাটি বিতর্কিত। পুস্তিকার নামটিও ভ্রান্তিমূলক। 'ইসলাম' আবার আজ-কাল-পরশুর ইসলাম হয় নাকি? ইসলাম তো চিরকালের। কালে কালে ইসলামকে খণ্ডিত করা যায় না।
বইটির লেখক নূর আলম সাহেব 'তত্ত্ব ও বাস্তবের ভ্রান্তি' প্রমাণ ক'রে 'আজকের ইসলাম'কে কলুষিত করেছেন। আসলে তাঁর লেখাতেই রয়েছে বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব, আসলেই তাঁর আলমে ও কলমে কোন হিদায়াতের নূর নেই।
বলা বাহুল্য, উক্ত পুস্তিকারই জবাব-স্বরূপ আমার এই 'বিভ্রান্তির বেড়াজালে মুসলিম সমাজ'।
ইসলাম যুক্তির ধর্ম। অবশ্যই। তবে দলীলের উপর যুক্তি খাটে না। যখন কোন জিনিসের দলীল না পাওয়া যায়, তখনই যিনি যেমন, তিনি তেমন যুক্তি দেখিয়ে সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকেন।
কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা বড় শয্যাবিলাসীর মত শুয়ে বলে দিতে পারেন, সাত-পুরু বিছানার কোন ফাঁকে চুল আছে! তাঁরা বড় ভোজনবিলাসীর মত খেতে খেতে বলে দিতে পারেন, ভাতের চালের ধান শ্মশানের ধারের জমির! তাঁরা কুরআন-হাদীসের উপরেও যুক্তি খাটান। হাদীসের শব্দ বা অনুবাদ পড়েই বলে দেন, সেটা হাদীস কি না!
তাঁরা নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি নিয়ে গর্বিত। তাঁরা কুরআন-হাদীসের উলামার প্রতি আস্থাশীল নন, শ্রদ্ধাশীল নন। তাঁরা বই পড়েন এবং সেখান থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। আর তার ফলে যা পড়েন এবং তাঁদের মনে যা ভাল মনে হয়, তাই মনের মণিকোঠায় স্থান দিয়ে থাকেন। প্রেমের আকর্ষণে প্রথমে যেই এসে যায়, সেই প্রেমিকের চোখে বিশ্বসুন্দরী হয়। সে অসুন্দরী হলেও অন্য সকলকে সুন্দরী লাগে না। আরবী কবি বলেছেন,
أتاني هواها قبل أن أعرف الهوى ... فصادف قلباً خالياً فتمكنا
অর্থাৎ, প্রেম জানার পূর্বে তার প্রেম আমার কাছে এল। অতঃপর শূন্য অন্তর পেয়ে স্থান ক'রে নিল।
মাআরিফুল কুরআনে নবী-অলীর বরাত দিয়ে দুআ বৈধ করা হয়েছে। সেই কারণে এবং অন্যান্য আরো অনেক কারণে সউদী আরবে ছেপে বিতরণের পর তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মওলানা আকরাম খাঁর 'মোস্তফা চরিত' ও তাঁর তফসীরে সহীহ হাদীসকে অস্বীকার ক'রে বহু মু'জিযা অস্বীকার করা হয়েছে। আপনি আপনার সত্যানুসন্ধিৎসার প্রথম দিকে পড়লে তা আপনার মনে-মগজে অবশ্যই স্থান পেয়ে যাবে। পিপাসার প্রথম পানে যে পানি পান করবেন, সেটাই ভাল লাগবে। এটাই স্বাভাবিক।
বিনা গাইডে কেবল বই পড়ে সঠিক জ্ঞান লাভ করা যায় না; যখন জানা না যাবে যে, যা পড়া হচ্ছে, তা সঠিক কি না।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি শুধুমাত্র কিতাবের উদর হতে জ্ঞান অন্বেষণ করবে (ও শরয়ী আলেম হতে চাইবে) সে সমস্ত আহকামকে ধ্বংস ক'রে ফেলবে।'
তাঁদের কেউ কেউ বলতেন, 'দ্বীনের জন্য বড় আপদ তারা, যারা কিতাব-পত্রকে নিজেদের শায়খ বা ওস্তাদ বানিয়ে আলেম হয়।' (তাযকেরাতুস সা-মে’ অল মুতাকাল্লিম ৮৭পৃঃ)
যেমন পূর্বে বলা হত যে, 'কিতাবই যার ওস্তাদ হয়, তার ঠিকের চেয়ে ভুলের ভাগই বেশী হয়।'
আবূ হাইয়ান নহবী বলেন, 'অনেক অবুঝ লোকের ধারণা যে, কেবল মাত্র বই-পত্র পড়েই ইল্ম (জ্ঞান) অর্জন করা যায় এবং ইচ্ছা করলে সবকিছু বোঝা যায়। কিন্তু জাহেল জানে না যে, তার মধ্যে এমন বাক্য ও কথা থাকবে, যা তার বোধগম্য নয় বা সহজে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তাই যদি তুমি বিনা ওস্তাদে ইল্ম লাভ করার আশা রাখ, তবে সঠিক পথ হতে অবশ্যই ভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আর সমস্ত বিষয় তোমার মস্তিষ্কে তালগোল পাকিয়ে তুলবে এবং ধর্মের পথে অধিক ভ্রান্ত হবে তুমিই।' (যেহেতু নিম-হাকীমে জানের খতরা এবং নিম-আলেমে ঈমানের খতরা থাকে। আর অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী।)
ইবনে বাত্তাল বলেছেন, 'কিতাবে এমন কতক ভ্রান্তকর (সন্দিগ্ধ) জিনিস থাকে, যার কারণে মূল বক্তব্য স্পষ্টভাবে বুঝা যায় না। কোন আলেম বা ওস্তাদের নিকট পড়লে তা ধরা পড়ে বা সে ভ্রান্তি হয় না। যেমন, মুদ্রাকর-প্রমাদ বা ছাপায় ভুল, দৃষ্টি-প্রমাদে পড়ায় ভুল, এ’রাব (আরবীতে কোথায় জের, জবর বা পেশ হবে তার) ভুল, (এই ভুলে কর্তাকে কর্মকারক এবং মানুষকে পশু বানিয়ে দেওয়া হয় এবং এইমত আরো কতশত ভুল হয়ে থাকে এই এ’রাব না জানার কারণে।) বিরাম বা থামার স্থান না জানায় ভুল, (বিশেষ করে সেই সব কিতাবে যাতে যতিচিহ্ন ব্যবহৃত হয়নি।) পুস্তকের পরিভাষা না জানায় ভুল, (নাসেখ-মানসূখ, সহীহ-যয়ীফ, আদেশ-উপদেশ প্রভৃতি না জানার প্রমাদ) ইত্যাদি।' (শারহু ইহয়্যায়ি উলুমিদ্দীন ১/৬৬)
উদাহরণ স্বরূপ এক তালেবে ইল্ম পড়েছিল,
المؤمن كيس فطن.
আল-মু'মিনু কীসু কুতুন। অর্থাৎ, মু'মিন ব্যক্তি একটি তুলোর ব্যাগ! আসলে তা ছিল, 'আল-মু'মিনু কাইয়িসুন ফাত্বিন।' অর্থাৎ, মু'মিন হয় বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী।
ডাক্তারের বিনা পরামর্শে কেবল বই পড়ে ওষুধ ব্যবহার করলে যেমন অনেক সময় বিপদে পড়তে হয়, ঠিক তেমনিই কোন ওস্তাদ বিনা কেবল বই পড়ে আলেম হতে চাইলে একই অবস্থা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ প্রসঙ্গে পুঁথিগত পণ্ডিতের গল্প মনে পড়ে। তিনি কেবল পুঁথি পড়ে ঘরে বসে পণ্ডিত হয়েছিলেন। জীবন-চলার পথে সর্বদা নিজের কাছে পুঁথিও রাখতেন। একদা এক সফরে তিনি পথ ভুলে গেলেন। পথের দিশা পেতে পুঁথি খুলে পড়তে পড়তে এক জায়গায় দেখলেন লেখা আছে,
'বহুজন যায় যেদিকে,
পথ তারে কয় সর্বলোকে।'
মনে মনে খুশী হয়ে যেন পথের দিশা ফিরে পেলেন। কিছুক্ষণ পর দেখলেন অদূরে একদল লোক হেঁটে যাচ্ছে। পণ্ডিতজী তাদের পিছু ধরলেন এবং ভাবলেন, এটাই তার বাঞ্ছিত পথ। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে দেখলেন, লোকগুলি এক দুর্গম জায়গায় গিয়ে থেমে গেল। আসলে সে জায়গা ছিল শ্মশান।
পরিশেষে তিনি কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না। যেহেতু তিনি নিজের পাণ্ডিত্য নিয়ে গর্বিত ছিলেন। চলতে চলতে এক গ্রামে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি চরম ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলেন। এক অতিথিপরায়ণ বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করলে বাড়ির লোক তাঁকে আঁশকে বা চিতুই পিঠা খেতে দিল। তিনি ইতিপূর্বে সে পিঠা দর্শনও করেননি। দেখলেন, তার মাঝে মাঝে ছিদ্র বা ফুটা রয়েছে। এ কি খাদ্য না অখাদ্য, তা দেখার জন্য তিনি পুঁথি খুললেন। মনোদ্বন্দ্বের সমাধানে তিনি একটি শ্লোক লক্ষ্য করলেন,
'ছিদ্রটি আছে যেথা,
অনিষ্ট ঘটে সেথা।'
শ্লোকটির উদ্দেশ্য ছিল, মাঠে-জঙ্গলে বা অন্য কোন ভূমিতে ছিদ্র বা গর্ত থাকলে এবং তার পাশে আশ্রয় গ্রহণ করলে বা বসলে অনিষ্ট ঘটতে পারে। কারণ সেখানে সাপ-বিছু ইত্যাদি থাকতে পারে এবং অনিষ্ট সাধন করতে পারে। কিন্তু পণ্ডিতপ্রবর বুঝলেন, পিঠের ছিদ্রও তো ছিদ্র, তা খেলে যদি কোন অনিষ্ট হয়। সুতরাং এই আশঙ্কায় তিনি তা না খেয়ে আবার পথ চলতে লাগলেন।
ক্ষুধায় তিনি কাতর হয়ে পড়লেন। অন্য একটি গ্রামে এক বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করলে, তারা তাঁকে সেমাই খেতে দিল। তিনি সে খাবারও ইতিপূর্বে দর্শন করেননি। দীর্ঘ সূত্র বা লম্বা সুতোর মত দেখতে এই খাবার কেমন হয়, তা পরীক্ষা ক'রে নিতে তিনি আবার পুঁথি খুললেন। দেখলেন এক ছত্রে লেখা আছে,
'দীর্ঘসূত্রতাই অনিষ্টের মূল।'
সুতরাং আবারও অনিষ্টের আশঙ্কায় সে খাবার খেতে অস্বীকার করলেন। আর এইভাবে পুঁথিগত বোকা পণ্ডিত পথে পথে পদে পদে দিশাহারা হয়েই এক সময় জীবন হারিয়ে ফেললেন।
কেউ পারে না, তার নিজের জ্ঞানে সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করতে। এর জন্য প্রয়োজন হয় আসমানী অহীর। জ্ঞান, বিবেক ও যুক্তি তো মানুষ পরিবেশ, শিক্ষা ও পড়াশোনা অনুযায়ী গ্রহণ ও প্রয়োগ ক'রে থাকে। তার সঠিকতার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? ঐ দেখেন না, নিরীশ্বরবাদী নাস্তিক নিজ যুক্তিতে নাস্তিকতায় পারদর্শী। বহীশ্বরবাদী, সর্বেশ্বরবাদী, মানবতাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, কবরবাদী সবাই নিজ নিজ জ্ঞান ও যুক্তি অনুযায়ী নিজেকে সঠিক পথের অনুসারী মনে করে। কোন ঈমানদার যুক্তিবাদী মানুষ কি নাস্তিকের যুক্তি মেনে নেবে?
দুনিয়ার বুকে বহু 'সিরাত্ব' আছে। আপনার-আমার 'স্বিরাত্বে মুস্তাক্বীম' কাম্য হওয়া উচিত। আর তা আছে অনুসরণে। কুরআন, সহীহ হাদীস ও সলফে সালেহীনের অনুসরণে।
পক্ষান্তরে মানুষ নিজের সীমিত জ্ঞান ও বিবেক অনুসারে পথ চললে ভ্রষ্ট হয়। স্বেচ্ছাচারিতার উপত্যকায় আপতিত হয়। কল্পনা ও ধারণার বশবর্তী হয়ে পথ চললে পথহারা হতে হয়। মহান আল্লাহ বলেন,
{أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غشَاوَةً فَمَن يَهْدِيه من بَعْد اللَّه أَفَلَا تَذَكَّرُونَ} (٢٣) سورة الجاثية
অর্থাৎ, তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজের উপাস্য ক'রে নিয়েছে? আল্লাহ জেনেশুনেই ওকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং ওর কর্ণ ও হৃদয় মোহর ক'রে দিয়েছেন এবং ওর চোখের ওপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, আল্লাহ মানুষকে বিভ্রান্ত করার পর কে তাকে পথনির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? (সূরা জাসিয়াহ ২৩ আয়াত)
{فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} (٥٠) سورة القصص
অর্থাৎ, অতঃপর ওরা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে জানবে ওরা তো কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অমান্য ক'রে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে? নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না। (সূরা ক্বাস্বাস ৫০ আয়াত)
বাংলা শিক্ষিত যুবক ভাইদের কাছে আমাদের অনুরোধ, তাঁরা যেন কেবল বই পড়েই ক্ষান্ত না হন। বরং সেই সাথে কী বই পড়ছেন, কার বই পড়ছেন, তা যাচাই-বাছাই করার জন্য হক্কানী উলামাদের পরামর্শ নিন।
প্রচেষ্টা শুধু একার নয়। আমরা প্রবাসী কয়েকজন মিলে, 'হক বয়ান' করার প্রয়াস করেছি মাত্র। আল্লাহ আমাদেরকে তওফীক দিন, যেন আমরা হককে হকরূপে দেখতে পাই এবং তার অনুসরণ করি। আর বাতিলকে বাতিলরূপে দেখতে পাই এবং তার নিকট হতে শতক্রোশ দূরে থাকি। আমীন।
বিনীত---
আব্দুল হামীদ মাদানী
আল-মাজমাআহ, সউদী আরব
মার্চ, ২০১০

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 সত্যান্বেষী যুবকদের পথভ্রষ্টতার কারণ

📄 সত্যান্বেষী যুবকদের পথভ্রষ্টতার কারণ


যে সকল মুসলিম যুবকদের মধ্যে দ্বীনী চেতনা ফিরে এসেছে, তাঁদের মধ্যে ইসলামকে জানার একটি পিপাসা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে দ্বীনী জ্ঞান চর্চার আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল তাঁদের কোন গাইড নেই। অথবা গাইডকে তাঁরা দুর্বল মনে করেন। যার ফলে তাঁদের পথের অন্বেষণ চলে অন্ধকারে---বিনা আলোয়, বিনা মানচিত্রে, বিনা রাহবারে। আর তার ফলে ভ্রষ্টতা অস্বাভাবিক নয়। কোথাও পিচ্ছল পথে পা পিছলে আছাড় খাওয়া অদ্ভুত ব্যাপার নয়।
সাধারণভাবে মুসলিম যুবকদের ভ্রষ্টতার কারণ যদি আমরা নির্ণয় করতে যাই, তাহলে একাধিক কারণ আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে। যেমনঃ
১। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা-ব্যবস্থা, প্রচার-মাধ্যম, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদি। এই পরিমণ্ডলে বসবাস ক'রে মুসলিম যুবক নিজেকে নতুন ছাঁচে ঢেলে গড়তে চায়। অন্য ধর্মের কাছাকাছি হতে চায়, অন্য ধর্মের মানুষকে নিজের কাছাকাছি করতে চায়। আর তার ফলে যদি কোন ত্যাগ স্বীকার অর্থাৎ, ধর্মীয় বিশ্বাসকে বাদ দিতে হয়, তাতেও রাজি। যেহেতু ভিন্ন ধর্মের মানুষদের নিকটে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আর তাতে তাঁরা বিব্রত হয়ে নিজের ধর্মে সন্দিহান হয়ে বসে।
২। কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশও মুসলিম যুবককে ভ্রষ্টতার কুহকে ফেলে। ধর্মের নামে কিছু বিশ্বাস, কুসংস্কার ও আচার এমন আছে, যা আসলে শরীয়তে বিদআত। যার কোন দলীল নেই, উপরন্তু তা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। যা দেখে অনুরূপ কোন শরয়ী বিধানকে সে সন্দেহের চোখে দেখে।
আমেরিকা থেকে ডাক্তার হয়ে সদ্যঃ প্রত্যাবৃত্ত এক যুবক দ্বীনদার বাবার সাথে জুমআর নামায পড়তে গেছে। বাবার পাশে দেখাদেখি সুন্নত পড়তে পড়তে তার হাওয়া সরে গেছে। বাবার কানে এলে ছেলেকে বলল, 'বাবা! তোমার ওযু ভেঙ্গে গেছে, ওযু ক'রে এসো।'
ছেলে বলল, 'কেন? ওযুও কি ভঙ্গুর জিনিস?'
বাবা বলল, 'হ্যাঁ, তোমার হাওয়া সরেছে।'
ছেলে বলল, 'তার মানে, আবার কি মুখ-হাত-পা ধুতে হবে?'
বাবা বলল, 'হ্যাঁ।'
ছেলে বলল, 'আর যেখান থেকে হাওয়া বের হল, সেখানটা ধুতে হবে না?'
বাবা বলল, 'না।'
ছেলে বলল, 'তা কোন্ যুক্তিতে?'
বাবা বলল, 'যে যুক্তিতে তোমরা এক জায়গায় ব্যথা আর অন্য জায়গায় ইঞ্জেকশন ফুঁড়ো!'
ছেলে যুক্তি মেনে নিতে পারল না। তবুও লোক-দেখানি ধর্ম মানতে তা করতে বাধ্য হল।
মনে সন্দেহ নিয়েই অনেকে ধর্ম পালন করে, অনেকে করে না, অনেকে তর্ক করে। মূলে কিন্তু সত্যিকারেরেরই কিছু কুসংস্কার।
৩। আদর্শচ্যুত আলেম-উলামা যুবকদের পথভ্রষ্টতার কারণ হয়। তাঁদের অতিরঞ্জন অথবা অবহেলার আমল দেখে, কুরআন-হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা শুনে বা পড়ে হকপথ থেকে দূরে সরে যায়।
৪। ইসলাম-বিরোধী লেখা প্রসিদ্ধ পত্র-পত্রিকা তথা অমুসলিমদের নিকট আদরণীয় হওয়ার ফলে প্রসিদ্ধির লোভে সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয় এবং তখন সে তাই বিশ্বাস করে ও লেখে, যা অমুসলিম অথবা ধর্মনিরপেক্ষবাদী মুসলিম অথবা মুনাফিকরা পছন্দ করে। সে নিজে ভ্রষ্ট হয়, অপরকেও ভ্রষ্ট করে। অপর দিকে হকপন্থী অসংখ্য মুসলিম ও তাদের আলেম-উলামাদের প্রতি অবজ্ঞার চাবুক হেনে নিজেকে প্রসিদ্ধির মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করে। আর তার ফলে কারও নিকট থেকে সে ফুল পায় এবং কারও নিকট থেকে অভিশাপ।
৫। পড়াশোনায় আহলে সুন্নাহ অল-জামাআতের মতাদর্শকে দৃষ্টিচ্যুত করলে অথবা কুরআন ও সহীহ হাদীস-ভিত্তিক জ্ঞানচর্চা না করলে যুবক ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার শিকার হয়। যেমন যয়ীফ ও জাল হাদীসের বেড়াজালে পড়ে পথচ্যুত হয়, তেমনি সহীহ হাদীসকে না বুঝে অস্বীকার করলেও পথহারা হয়।

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 আকীদা, আমল ও পড়াশোনা কুরআন ও হাদিস উভয়ভিত্তিক হওয়া জরুরী

📄 আকীদা, আমল ও পড়াশোনা কুরআন ও হাদিস উভয়ভিত্তিক হওয়া জরুরী


কিছু যুবক আছেন, যাঁরা সকল হাদীস অস্বীকার করেন না। তাঁরা যেটাকে পছন্দ করেন, যেটা তাঁদের জ্ঞানে ধরে, যুক্তিযুক্ত মনে হয়, সেটা মানেন। যে হাদীস তাঁদের জ্ঞানে ধরে না, সেটাকে মানেন না। তাঁরা কুরআন ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থে বিশ্বাস রাখেন না। তাঁরা লেখকের মতো পরিষ্কারভাবে ফতোয়া দিয়ে বলেন,
'ঈমানের প্রশ্নে কোরাণ ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থের উপর বিশ্বাস করা ঈমানদারের কাজ নয়।' (তত্ত্ব......৩৫পৃঃ)
‘যদি আমরা কোরাণ-ভিত্তিক যুক্তিবাদী (?) না হই, তাহলে প্রকাশ্য ভুলগুলি স্বীকার ও ত্যাগ করতে সক্ষম হব না।' (তত্ত্ব..... ২২পৃঃ)
'যেমন সোনা ও পিতলের পার্থক্য করে কষ্টিপাথর। তেমনি শরিয়তেরও কষ্টিপাথর হল গভীর ভাবনা ও বিশ্লেষণ!' (তত্ত্ব... ১পৃঃ)
মাশাআল্লাহ! এ নতুন নীতি যেন নব নবুয়তের অভিনব চিন্তাধারা! আল্লাহর শরীয়তকে মানুষ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ দিয়ে নয়, বরং 'গভীর ভাবনা ও বিশ্লেষণ' দিয়ে যাচাই-বাছাই করতে হবে। এ যেন স্বর্ণ যাচাই করতে কর্মকারের কাছে যাওয়া! দেহের সূক্ষ্ম অপারেশন করতে নাপিতের কাছে যাওয়া! কিন্তু তাতে যে, রোগ সারাতে গিয়ে রগ কাটা যাবে!
বলা বাহুল্য, সুন্নাহ বা হাদীস না মেনে ঈমান রক্ষা করা যাবে না। আর মানুষের সীমিত জ্ঞান দিয়ে সুন্নাহ বিচার করা যাবে না। সুন্নাহ মুহাদ্দিসীনদের নিকট সনদের তাহকীকে 'সহীহ' বলে প্রমাণিত হলে তা না মানার জন্য ধানাই-পানাই করা যাবে না। এটাই আহলে সুন্নাহর নীতি। বাকী কেউ তা না মানলে, সে যদি মুর্তাদও হয়ে যায়, তাতে কার কী বলার থাকতে পারে?
'যুক্তিহীন আবেগপূর্ণ অন্ধ-বিশ্বাস কখনই ইসলাম হতে পারে না।' (তত্ত্ব....৫ ১পৃঃ) এ কথা কুরআন ও সহীহ হাদীস ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নচেৎ কুরআন ও সহীহ হাদীসের প্রতি যদি কারো যুক্তিহীন আবেগপূর্ণ অন্ধ-বিশ্বাস না থাকে, তাহলে সে মুসলিম হতেই পারবে না।

📘 বিভ্রান্তির বেড়া জালে মুসলিম সমাজ > 📄 হাদিস অমান্য করার কারণ

📄 হাদিস অমান্য করার কারণ


বিভিন্ন শ্রেণীর হাদীস অমান্যকারী রয়েছে।
কুরআনী ফির্কা মোটেই হাদীস মানে না।
কেউ কেউ 'যওক' হিসাবে হাদীস গ্রহণ ও বর্জন করেন।
কেউ কেউ 'আক্কেল'-এর মীযানে হাদীস গ্রহণ ও বর্জন করেন। (যেন তাঁদের আক্কেলটাই সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর দূতের বাণীর কষ্টিপাথর! তাঁদের মূল বক্তব্য হল, যে হাদীস আমাদের জ্ঞানে ধরবে, সেটি হাদীস বলে মানব; যদিও তা জাল হাদীস হয়। আর যেটা আমাদের জ্ঞানে ধরবে না, তা মানব না; যদিও তা মুতাওয়াতির বা বুখারীর হাদীস হয়! এঁরা এঁদের শাকবেচা দাঁড়িপাল্লা নিয়ে সোনা অথবা পাহাড় ওজন করতে চান!
এঁরা যদি শোনেন যে, আল্লাহর রসূল (সঃ) বলিয়াছেন, “বিদ্যা যতই বাড়ে, ততই জানা যায় যে, কিছুই জানি না। টাকার সেই দশা; টাকা যতই বাড়ে, ততই মনে হয়, টাকা নাই বলিলে হয়।” তাহলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠবেন, 'অবশ্যই এটা হাদীস। কারণ, এতো খুব দামী কথা, যুক্তিগ্রাহ্য বাস্তব কথা।' তার সনদ বা সূত্র দেখার প্রয়োজন নেই। সত্যপক্ষেই তা আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন কি না, তা তলিয়ে দেখার কোন প্রয়োজন নেই।
পক্ষান্তরে এঁরা যখন শুনেন যে, বুখারী-মুসলিম শরীফে আছে, “আল্লাহর নবী ﷺ-এর আঙ্গুলের ইশারায় চাঁদ দু-টুকরা হয়েছিল।” তখন বলেন, তাই আবার হয় নাকি? এটা গাঁজাখুরি গল্প। কারো আঙ্গুলের ইশারায় কি চাঁদ দ্বিখণ্ড হয়? হলেই বা তিনি মহানবী। একটা সম্ভব-অসম্ভব তো আছে।
যদি বলা হয়, 'কুরআনেও তার ইঙ্গিত আছে।' তাহলে এঁরা বলেন, 'তা যে নবীর যুগে তাঁর আঙ্গুলের ইশারায় তার প্রমাণ কি?'
আমরা বলি, মহান আল্লাহ বলেছেন,
اقْتَرَبَتْ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ (۱) وَإِنْ يَرَوْا آيَةً يُعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُسْتَمِرٌّ (۲) وَكَذَّبُوا وَاتَّبَعُوا أَهْوَاءَهُمْ وَكُلُّ أَمْرٍ مُسْتَقِرٌّ (۳) وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مِنْ الْأَنْبَاءِ مَا فِيهِ مُزْدَجَرُ (٤) حِكْمَةٌ بَالِغَةٌ فَمَا تُغْنِ النُّذُرُ (٥) فَتَوَلَّ عَنْهُمْ يَوْمَ يَدْعُ الدَّاعِي إِلَى شَيْءٍ نُكُرٍ (٦) خُشَّعاً أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنْ الأَجْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادٌ مُنتَشِرُ (۷) مُهْطِعِينَ إِلَى الدَّاعِي يَقُولُ الْكَافِرُونَ هَذَا يَوْمٌ عَسِرٌ (۸)
অর্থাৎ, কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে। তারা কোন নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, 'এটা তো চিরাচরিত যাদু।' তারা মিথ্যা মনে করে এবং নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, আর প্রত্যেক কাজের জন্য একটি স্থিরীকৃত সময় রয়েছে। তাদের নিকট এসেছে সংবাদ, যাতে আছে ধমক। এটা পরিপূর্ণ জ্ঞান, তবে এই সতর্কবাণীসমূহ তাদের কোন উপকারে আসেনি। অতএব তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর। (সেদিনকে স্মরণ কর,) যেদিন আহবানকারী (ইস্রাফীল) আহবান করবে এক অপ্রিয় বিষয়ের দিকে। অপমানে অবনমিত নেত্রে কবর হতে বের হবে বিক্ষিপ্ত পঙ্গপালের ন্যায়। তারা আহবানকারীর দিকে ছুটে আসবে ভীত-বিহ্বল হয়ে। অবিশ্বাসীরা বলবে, 'এ তো কঠিন দিন।' (সূরা ক্বামার ১-৮ আয়াত)
দ্বিতীয় নং আয়াত থেকে ৮নং আয়াত পর্যন্ত বাক্যাবলীতে উদ্দিষ্ট কারা? কারা বলেছিল, 'এটা তো চিরাচরিত যাদু।' তারা কি মক্কার কাফেররা নয়?
আপনি যদি বলেন, 'আল্লাহ নিজ কুদরতে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করতে পারেন।'
তাহলে এঁরা বলবেন, 'আল্লাহ করিতে পারেন সব---তোমাকে বা আমাকে পাগল করিতে পারেন। তাই তুমি আমাকে বা আমি তোমাকে পাগল গণ্য করিব? ইহা যে ঘটিয়াছে---ঐতিহাসিকভাবে তাহার প্রমাণ দাও।'
কিন্তু আমরা বলি, 'কোন লোক যদি সত্যই পাগল হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাকে পাগল মানিতে অসুবিধাটা কোথায়? প্রমাণ তো বুখারী-মুসলিম প্রভৃতি গ্রন্থ। কিন্তু বাস্তববাদী মনে তাহা যদি গ্রহণ না করিয়া থাকেন, তাহা হইলে আমাদের বলিবার আর কি-ইবা থাকিতে পারে?'
এক সময় এমন ছিল, কিছু বস্তুবাদী বুখারী শরীফের পানিতে মাছি পড়লে তা ডুবিয়ে পানি খাওয়ার হাদীসকে অস্বীকার করত। বর্তমানের রিসার্চে মাছির এক ডানায় রোগজীবাণু ও অপর ডানায় তার প্রতিরোধক বস্তু থাকার কথা আবিষ্কার হওয়ায় তাঁদের অনেকে 'সুবহানাল্লাহ' পড়ছেন।
মুহাদ্দিসীন তথা আহলে সুন্নাহ অল-জামাআহ বা আহলে হাদীস মতে যয়ীফ ও জাল হাদীস মানা যাবে না। সুতরাং কোন হাদীস সামনে এলে মু'মিনের কর্তব্য হলঃ-
১। এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, হাদীস হল দুটি অহীর অন্যতম।
২। হাদীসের বক্তব্যকে নির্ভুল ও নিষ্কলুষ বলে নিঃসন্দেহে মেনে নেওয়া। যেহেতু হাদীস যাঁর তিনি হলেন নির্ভুল ও নিষ্পাপ মানুষ।
৩। সেটা সত্যপক্ষে তাঁর হাদীস কি না, তা অনুসন্ধান করা ওয়াজেব। তা সহীহ কি না, তা জানা জরুরী।
৪। সহীহ প্রমাণিত হলে তা সর্বান্তঃকরণে মেনে নেওয়া ওয়াজেব; যদিও তা নিজ জ্ঞান ও বিবেক বহির্ভূত মনে হয় এবং তার পিছনে যুক্তি ও হিকমত না বুঝা যায়।
৫। যয়ীফ (দুর্বল), বা মওযু' (জাল) প্রমাণিত হলে তা বর্জন করা।
৬। হাদীসের সঠিক অর্থ বুঝা। আপাতদৃষ্টিতে দুটি হাদীস পরস্পর-বিরোধী মনে হলে তা সমন্বয় ও সামঞ্জস্য সাধনের চেষ্টা করা। নিজে না পারলে বিশেষজ্ঞ আলেম-উলামাকে জিজ্ঞাসা করা।
৭। হাদীসের নাসেখ-মনসূখ (রহিত-অরহিত) নির্দেশ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা।
কুরআন-বিরোধী বা স্ববিরোধী হলে তার ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে। সে হাদীসকে ফুঁক দিয়ে ছাই বা ধুলো উড়ানোর মত উড়িয়ে দেওয়ার দুঃসাহসিকতা করা যাবে না।
যদি একান্তই কোন সহীহ হাদীসের অর্থ বুঝে না আসে অথবা বিবেক-বহির্ভূত মনে হয়, তাহলে কুরআনী আয়াতের ব্যাপারে যে নীতি অবলম্বন করা হয়, সেই নীতিই অবলম্বন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءِ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاء تَأْوِيلِهِ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُوا الأَلْبَابِ} (۷) سورة آل عمران
অর্থাৎ, তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন; যার কিছু আয়াত সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, এগুলি কিতাবের মূল অংশ; যার অন্যগুলি রূপক; যাদের মনে বক্রতা আছে, তারা ফিতনা (বিশৃংখলা) সৃষ্টি ও ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে যা রূপক তার অনুসরণ করে। বস্তুতঃ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা সুবিজ্ঞ তারা বলে, 'আমরা এ বিশ্বাস করি। সমস্তই আমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে আগত।' বস্তুতঃ বুদ্ধিমান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা আলে ইমরান ৭ আয়াত)
আর দুআ ক'রে বলতে হবে,
{ رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذَ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ} (۸)
অর্থাৎ, হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে বক্র ক'রে দিও না এবং তোমার নিকট থেকে আমাদেরকে করুণা দান কর। নিশ্চয় তুমি মহাদাতা। (ঐ ৮ আয়াত)
কুরআনের এক আয়াত অন্য আয়াতের বিরোধী হতে পারে না। হলে মানসূখ হতে পারে। অনুরূপ হাদীসও। তেমনি কোন সহীহ হাদীস কুরআনের বিপরীত হতে পারে না। হলে মানসূখ হতে পারে। এ ছাড়া পরস্পরবিরোধী মনে হলে অন্য কোন সামঞ্জস্য ও সমন্বয়-পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যা উলামাগণ বর্ণনা ক'রে গেছেন। তাঁদের সে নীতি ও পদ্ধতি গ্রহণ না করে নিজের মনে 'হাদীস হতে পারে না' বলে অস্বীকার করা কোন জ্ঞানী মু'মিনের কাজ নয়।
‘যওক’-ভিত্তিক ও তথাকথিত কুরআন-ভিত্তিক তাহকীক ও যুক্তির নিকষে সহীহ হাদীসকে উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বহু পূর্বে মু'তাযিলা ফির্কা আক্কেলকে প্রাধান্য দিয়ে উক্ত কাজ ক'রে গেছে। গত শতাব্দীতে মওলানা মওদূদী ও আকরাম খাঁ সাহেবদ্বয়ও সহীহ হাদীসকে হাদীস বলে না মানার মত তাহকীক দেখিয়ে গেছেন। সমসাময়িককালে তার সমালোচনাও হয়েছে। আমরা ভাবতাম, আমাদের যুবকরা সে বিষয়ে সচেতন। কিন্তু এখন দেখছি, সেই আকলী মাদ্রাসার ছাত্র কোথাও কোথাও মাথা নাড়া দিয়ে উঠছে। শুধু মনের মধ্যেই সেই রোগে সংক্রমিত হয়ে রোগগ্রস্ত নয়, বরং বই লিখে তা আরো ব্যাপক করার প্রয়াসে তৎপর হয়েছেন! আমার মনে হয়, তাঁরা যদি তাঁদের ঐ আধুনিক তাহকীকের বিরুদ্ধে সমালোচনা পড়তেন, তাহলে হক বুঝে হকের সমালোচনা করতেন না।
উদাহরণ স্বরূপ সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করার ফলে এক যুক্তিবাদীর সমালোচনায় বলা হয়েছে, 'পূর্ব বর্ণিত জনৈক বাঙ্গালী পণ্ডিত হাদীছখানার তাৎপর্য বিপরীত বুঝিয়া তথাকথিত “তফসীরুল কুরআন”-এ এই হাদীছখানার সমালোচনা করিয়াছেন। তিনি নিজের স্বল্প জ্ঞানহেতু ভুলে পতিত হইয়া নানারূপ প্রলাপোক্তি করিয়াছেন---হাদীছকে এনকার করিয়াছেন, হাদীছ বর্ণনাকারীর প্রতি ক্ষেপিয়াছেন। এমনকি চরম ধৃষ্টতায় বিশিষ্ট সাহাবী আবু হোরায়রা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রতি বেআদবী করতঃ বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, এইটা আবু হোরায়রার গর্হিত বয়ান এবং বোখারী-মুসলিম শরীফে উল্লেখ হইয়া থাকিলেও পণ্ডিত মিয়া ইহাকে হাদীছ বলিয়া গ্রহণ করিবেন না।
এই সকল প্রলাপোক্তির একমাত্র কারণ হইল, হাদীছখানার মূল তাৎপর্যে পৌঁছিবার অসমর্থতা। তিনি বুঝিয়াছেন যে, ইহাতে হযরত ইব্রাহীমের মিথ্যা বলা প্রতিপন্ন হয়।
বস্তুতঃ ইহা এই হাদীছের তাৎপর্য নহে, বরং ইহা পণ্ডিত মিঞার অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী প্রসূত বক্র ও ভুল ধারণা হইতে সৃষ্ট।' (বাংলা বোখারী শরীফ ৪/৯৩)
আরো বলা হয়েছে,
'....এই সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করিয়াই একটা নিজের মনগড়া আজগুবি গোঁজামিলকে পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যারূপে প্রাধান্য দিয়াছেন। দুঃখের বিষয়, তিনি বাংলাভাষায় পাণ্ডিত্যের জোরে অন্যান্য ভাষাকেও ঠেলিয়া নিয়া যাইতে চেষ্টা করেন এবং লাগামহীনভাবে সিদ্ধান্ত করিয়া বসেন। তিনি যদি আরবী ভাষায় সাধারণ জ্ঞানও রাখিতেন তবে ঐরূপ বাস্তবের বিপরীত স্বপ্ন দেখিতেন না।' (ঐ ৪/১৩৪)
ভুল বুঝার আরো একটি কারণ যে, ঐ শ্রেণীর পাঠচক্রের যুবকরা যা পড়েন, তা কোন হক্কানী আলেম-উলামার কাছে বসে বুঝে নেন না। বরং সীমাবদ্ধ বুঝেই নিজের বুঝটাকে বড় মনে করেন। অথচ সে বুঝ তাঁর জন্য বোঝা স্বরূপ। আরবের উলামাগণ বলেন,
من كان كتابه شيخه كان خطأه أكثر من صوابه.
অর্থাৎ, কিতাব যার ওস্তাদ হয়, ঠিকের থেকে তার বেঠিক (জ্ঞান) বেশী হয়।
হয়তো তাঁরা অন্য শ্রেণীর আলেম-উলামার কাছে বসে দর্স নেওয়াটা 'মনুষ্যমেধা নষ্ট' করার সমতুল্য মনে করেন অথবা তাঁদেরকে কাঠমোল্লা ভাবেন।
সুবিধাবাদীরাও বহু সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করতে পারে। যেমনঃ-
যারা গান-বাজনা শুনতে অভ্যস্ত, তারা বলবে, 'গান-বাজনা হারাম হওয়ার কথা কুরআনে নেই। অতএব বুখারীর হাদীস ভিত্তিহীন।'
যে ব্যাংকের সূদ খায়, সে বলবে, 'ব্যাংকের সূদ হারাম হওয়ার কথা কুরআনে নেই।'
যে বিড়ি-সিগারেট বা তামাক-জর্দা খায়, সে বলবে, 'তা হারাম নয়। যেহেতু কুরআনে তা হারাম করা হয়নি। অতএব কোন হাদীস থেকে তা হারাম প্রমাণ করা হলে তা হবে কুরআনের পরিপন্থী।
যে দাড়ি চাঁছে ও অপরের চেঁছে পয়সা কামায় সে বলবে, 'দাড়ি চাঁছা হারাম হওয়ার কথা কুরআনে নেই।'
যে তাবীয-ব্যবসা করে, সে বলবে তাবীয-ব্যবসা হারাম হওয়ার কথা কুরআনে নেই।
দু'টি নামায (ফজর ও এশা) ছাড়া কুরআনে অন্য নামাযের নাম উল্লেখ নেই। কেউ বলতে পারে, 'সুতরাং অন্য নামায পড়তে হবে না।'
যারা ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়ে না, তারা সহীহ হাদীস রদ ক'রে বলে, 'তা কুরআন-বিরোধী।'
কেউ বলতে পারে, 'কুকুর খাওয়া হারাম নয়, কারণ সে কথা কুরআনে নেই।'
স্ত্রীর মাসিক হলে তার বিছানায় শোয়া যাবে না। শুলে কুরআন-বিরোধী আমল হবে। কারণ কুরআন বলে,
{فَاعْتَزِلُوا النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ} (٢٢٢) سورة البقرة
অর্থাৎ, তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন কর এবং যতদিন না তারা পবিত্র হয়, (সহবাসের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। (সূরা বাক্বারাহ ২২২ আয়াত)
সোনা-চাঁদি, টাকা-পয়সা মোটেই জমা করা যাবে না। কারণ তা কুরআন-বিরোধী আমল হবে। যেহেতু কুরআন বলে,
{ وَالَّذِينَ يَكْتِرُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ}
অর্থাৎ, যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দাও। (সূরা তাওবাহ ৩৪ আয়াত)
মহিলা নেতৃত্ব কুরআনে নিষেধ নেই। অতএব নেতৃত্ব অবৈধ হওয়ার হাদীসটি জাল।
ব্যভিচারের শাস্তি পাথর মারা কুরআনে নেই। মৃত্যুদণ্ড কুরআন-বিরোধী। কারণ কুরআনে ১০০ চাবুক মারার কথা বলা হয়েছে।
মৃত খাওয়া হারাম কুরআনে আছে। অতএব মৃত মাছ খাওয়া হাদীসে থাকলেও তা মান্য নয়। মাছ মারা গেলে খাওয়া যাবে না।
কুরআনে আছে নিজের আত্মীয় (ছেলে-মেয়ে)র নামে সম্পত্তি উইল করা যাবে। (সূরা বাক্বারাহ ১৮০ আয়াত) হাদীসে আছে কোন ওয়ারেসের নামে উইল বৈধ নয়। সে হাদীস সহীহ হলেও জাল।
স্ত্রীকে তিন তালাক দিলেও তার জীবনভর খোরপোশ দিতে হবে; কারণ কুরআনে আছে,
{ وَلِلْمُطَلَّقَاتِ مَتَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ} (٢٤١) سورة البقرة
অর্থাৎ, তালাকপ্রাপ্তা নারীগণও যথাবিহিত খরচপত্র (ক্ষতিপূরণ) পাবে। সাবধানীদের জন্য এ (দান) অবশ্য কর্তব্য। (সূরা বাক্বারাহ ২৪১ আয়াত)
'(কনের) অভিভাবক ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ নয়।' এ হাদীসকে সূরা বাক্বারার ২৩০নং আয়াতের পরিপন্থী মনে ক'রে মযহাবধারীরা রদ ক'রে থাকেন। অনুরূপ আরো হাদীস।
'নবীর সম্পত্তির কেউ ওয়ারেস হয় না।' এ হাদীসকে কুরআনের সূরা নিসার ১১নং আয়াতের বিরোধী ধারণা ক'রে শিয়ারা রদ ক'রে থাকে। অনুরূপ আরো হাদীস।
মহান আল্লাহর হাত-পা ইত্যাদির সহীহ হাদীসকে জাহমিয়্যাহরা প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ তাদের ধারণামতে তা সূরা শূরার ১১নং আয়াতের পরিপন্থী। অনুরূপ আরো হাদীস।
খাওয়ারেজরাও তাদের মযহাব-বিরোধী সকল সহীহ হাদীসকে কুরআনের বিপরীত ধারণা ক'রে রদ করেছে।
ক্বাদারিয়্যাহরাও তাদের মযহাব-বিরোধী সকল সহীহ হাদীসকে কুরআনের কোন কোন আয়াতের পরিপন্থী ধারণা ক'রে রদ করেছে।
জাবারিয়্যাহরা তাদের মযহাব-বিরোধী সকল সহীহ হাদীসকে কুরআনের কোন কোন আয়াতের পরিপন্থী ধারণা ক'রে প্রত্যাখ্যান করেছে।
অনুরূপ আরো বহু ফির্কা বহু সহীহ হাদীসকে শুধু এই জন্য রদ করেছে যে, তা তাদের ধারণামতে কুরআনের বিরোধী!
আসলে হাদীস মানবে না। কিন্তু সরাসরি রদ করতে পারে না। কারণ তাহলে তো লোকে 'কাফের' বলবে। সুতরাং না মানার অজুহাতে কুরআনী-দলীল খুঁজে বের করে, অতঃপর তা রদ করে।
কবরের আযাবকে অনেকে স্বীকার করে না, কারণ এত বড় বড় আযাবের কথা কুরআনে নেই।
কুরআনে 'মেহেরাজ' শব্দ নেই। অতএব তাও অবিশ্বাস্য হওয়ার কথা। যেমন দাজ্জাল শব্দ নেই, অতএব তার আগমনের কথা আজগুবি গল্প মাত্র!
আল্লাহর নবী ﷺ-কে কত মু'জিযা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সে কথা কুরআনে নেই। অতএব মু'জিযার যাবতীয় হাদীস ভিত্তিহীন!
যদিও মু'জিযা নবী বা তাঁর বিরোধীদের দাবী ও চাওয়া অনুপাতে দেওয়া হয় না। কেবল আল্লাহর ইচ্ছা অনুপাতে দেওয়া হয়। উল্লেখ না থাকলে কি তা অস্বীকার করা যায়?
কুরআনে যদি (ধারণামতে) কুরআন-বিরোধী অথবা পরস্পরবিরোধী কথা পান, তাহলে জ্ঞানীরা কী বলেন?
অনুরূপ সহীহ হাদীসে যদি কুরআন বিরোধী কথা আসে, তাহলে কেন জ্ঞানীদের কথা মান্য নয়?
ঐ স্বেচ্ছাচারিতা ও ফির্কাবন্দীর ফলেই বিভিন্ন দলের সৃষ্টি হয়েছে। আর তার একটি মু'তাযিলা ফির্কা। যারা আক্কেলের ঘোড়া ছুটিয়ে সহীহ হাদীস তথা মু'জিযা ও অনেক কিছুকে অস্বীকার করেছে। আর খাঁ সাহেব ও তাঁর যুক্তিমুগ্ধরা ঐ মাদ্রাসারই ছাত্র।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00