📄 ফারসী ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মাদ (সা)
এবার দেখা যাক ফারসী ধর্মে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কি বর্ণিত হয়েছে। জরথুস্ট হলেন এ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। এটাকে পারসিজমও বলা হয়। এটার উৎপত্তি হয়েছে আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে পারসিয়াতে। এ পারসিমজকে আরো বলা হয় মেগিয়ানিজম অথবা যে ধর্মের অনুসারীরা অগ্নি পূজা করে। পারসিদের পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ হলো দশাতির এবং আভেস্তা। আভেস্তাকে আবার জেন্দ আভেস্তাও বলা হয়। দশাতির দুই ভাগ। ক্ষুরধা দশাতির ও করণ দশাতির। আভেস্তারও আবার দুই ভাগ, ক্ষুরধা আভেস্তা ও করণ আভেস্তা। অনেকে এগুলোকে বলে জেন্দ বা মহাজেন্দ। আপনারা যদি এই পারসি ধর্মগ্রন্থ পড়েন, সেখানে অনেক জায়গাতেই দেখবেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা বলা আছে।
জেন্দ আভেস্তার নফারভাস্তি ইয়াস্তের ২৮ অধ্যায়ের ১২৯ অনুচ্ছেদে আছে- তার নাম হবে আস্তাবেদ আরেতা অর্থাৎ জয়যুক্ত। তার আরেকটা নাম হবে সোশিম। বলা হয়েছে যে তাকে এখানে ডাকা হবে সোশিম। আমরা জানি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ জিতেছিলেন, অনেক যুদ্ধ জিতেছিলেন তাই তিনিই আস্তাবেদ আরেতা। ইতিহাসের বিশ্ব কোষের কথা অনুযায়ী সোশিয়েনথ অর্থ যে লোক প্রশংসার যোগ্য বা যে প্রশংসা করেছে। যার আরবি করলে হবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাহলে পারসি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম বর্ণিত হয়েছে। এর পরে বলা হয়েছে তিনি হবেন আস্তবেদ আরেতা। এর মানে হলো প্রশংসাকারী। এটা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরেকটা নাম আহমাদ। আহমাদ শব্দের অর্থ যে প্রশংসা করে।
জেন্দ আবেস্তার জামিয়াধ ইয়াস্তের ১৬ অধ্যায়ের ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- তার বন্ধুরা চলে আসবে। অর্থাৎ, আস্তবেদ আরেতার বন্ধুরা। তারা শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই করবে, তারা চিন্তা ভাবনা করবে, ভাল কথা বলবে, ভাল কাজ করবে আর তাদের জিহবায় কোন মিথ্যা থাকবে না। এখানে নবীজি সাহাবীগণের কথা বলা হচ্ছে। এখানে সাহাবীদের কথা বলা হচ্ছে অর্থাৎ নবীজি (স) এর সহচরেরা, তারা ভাল মানুষ হবে। তারা চিন্তা ভাবনা করে কাজ করবে, ভাল কথা বলবে, ভাল কাজ করবে তাদের জিহবায় মিথ্যা থাকবে না অর্থাৎ তারা মিথ্যা কথা বলে না। আর আমরা জানি সাহাবিগণ সর্বদা সত্য কথাই বলতেন।
দশাতিরেও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী আছে। এটা পারসিদের আরেকটা ধর্ম গ্রন্থ। দশাতির মানে দশ, আর তির মানে খন্ড অর্থাৎ যে বইটার দশটা ভাগ আছে। এটা দস্তুর শব্দের বহুবচন আর এর ধর্মীয় আইন। অর্থাৎ এ বইটাতে দশটা ভাগ আছে আর এটা ধর্মীয় আইন। দশাতিরে উল্লেখ আছে- পারসিরা যখন তাদের ধর্ম ত্যাগ করবে, যখন তারা নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে, তখন মরুভূমি থেকে একজন লোক আসবে তার অনুসারীরা পারসিদের বশে আনবে। আর তারা পারসিদের রাজ্য জয় করবে। তারা মানব জাতির জন্য একটা অনুগ্রহ হবে। তারা তাদের মন্দিরের ভেতর অগ্নি পূজা করবে না। তারা ইবরাহীমের ঈশ্বরের ঘরের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করবে। তারা কখনো মূর্তি পূজা করবে না। তারা পারসিয়ার প্রভু ও শাসক হবে। এছাড়াও তারা পারসিয়ার অন্যান্য ধর্মীয় স্থানেও রাজত্ব করবে।
তাদের নবী খুব যুক্তিবাদী হবেন আর অলৌকিক কাজ করবেন। এ ভবিষ্যত বাণী আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথাই বলেছেন। বুন্দাহিসোর ৩০ অধ্যায়ের ৬-২৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সোশিয়েন হবেন শেষ নবী। এটার অর্থ হলো প্রশংসনীয় অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর এখানে উল্লেখ রয়েছে যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হবেন শেষ নবী। এটা হলো সংক্ষেপে পারসী ধর্মগ্রন্থগুলোতে আমাদের নবীজির বর্ণনা।
📄 বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মাদ (সা)
প্রায় সব বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থেই আছে যে, ভবিষ্যতে একজন মাইত্রি আসবেন। চিক্কভাতি সিনহনাদ সুতানতার ডি- ১১১ ৭৬-এ বলা আছে- আরেকজন বুদ্ধ আসবেন, তিনি মাইত্রি। তিনি পবিত্র, সবার উপরে, তিনি আলোকপ্রাপ্ত। তিনি খুব জ্ঞানী আর বিনয়ী। তিনি মঙ্গলজনক, যার রয়েছে বিশ্ব জগতের জ্ঞান। তিনি অলৌকিকভাবে আহরিত জ্ঞান পুরো পৃথিবীতে প্রচার করবেন। তিনি একটা ধর্ম প্রচার করবেন, যেটা শুরুতে গৌরবময় থাকবে, চরম সময়ে গৌরবময় থাকবে আর শেষেও গৌরবময় থাকবে। তিনি একটা জীবন দর্শন প্রচার করবেন যেটা হবে সত্য এবং শাশ্বত। তার সাথে কয়েক হাজার সন্নাসী থাকবে। যেখানে আমার সাথে কয়েকশ সন্নাসী থাকে। একথা আরো বলা হয়েছে Sacerd Book of East-এর ৩৫নং খন্ডের ২২৫নং পৃষ্ঠায় একজন মাইত্রি আসবেন যার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আর গুণ থাকবে। এরপরে বলা হয়েছে যে, তিনি হাজার হাজার মানুষকে নেতৃত্ব দেবেন যেখানে আমি দিয়েছি মাত্র কয়েকশ মানুষকে।
গসপেল অব বুদ্ধ এর ২১৭ ও ২১৮ নং পৃষ্ঠায় আরো আছে যে, আনন্দ বুদ্ধকে প্রশ্ন করলেন, হে আশীর্বাদ প্রাপ্ত! আপনি চলে গেলে কে আমাদের পথ দেখাবে? জবাবে গৌতম বুদ্ধ বললেন- আমি পৃথিবীর প্রথম বুদ্ধ নই। এমনকি শেষ বুদ্ধও আমি নই। ভবিষ্যতে আরেকজন বুদ্ধ পৃথিবীতে আসবেন, তিনি পবিত্র, সবার উপরে, আলোক প্রাপ্ত, এবং খুব জ্ঞানী আর বিনয়ী হবেন। যিনি মঙ্গলজনক, যার রয়েছে বিশ্ব জগতের জ্ঞান। তিনি প্রচার করবেন সর্বোত্তম ধর্ম। তিনি যে ধর্ম প্রচার করবেন তা শুরুতে গৌরবময় থাকবে, চরম সময়ে গৌরবময় থাকবে আর শেষেও গৌরবময় থাকবে। তিনি যে ধর্ম প্রচার করবেন তার ভিত্তি হবে সত্য আর সেটাই হবে শাশ্বত জীবন দর্শন। আর তার থাকবে হাজার হাজার শিষ্য যেখানে আমার আছে মাত্র কয়েকশ। বুদ্ধের প্রধান শিষ্য আনন্দ তাকে প্রশ্ন করলেন- আমরা তাকে কিভাবে চিনতে পারব? বুদ্ধ উত্তর দিলেন, তাঁর নাম হবে মাইত্রি। মাইত্রি অর্থ ক্ষমাশীল, স্নেহময়, দয়ালু, করুণাময়। এ শব্দটার আরবি করলে হবে রাহমা। সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
অর্থঃ আমি তোমাকে সমগ্র মানুষ ও জীব জগতের প্রতি রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি। এই রাহমা শব্দ এবং এর সমার্থক শব্দ ক্ষমা কোরআনে এসেছে সব মিলিয়ে ৪০৯ বার। আর কোরআনের শুধুমাত্র সূরা তাওবা ছাড়া বাকী সব সূরাই "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" দিয়ে শুরু করা হয়েছে। তাহলে বৌদ্ধ ধর্মে মাইত্রি সম্পর্কে যে ভবিষ্যত বাণী করা হয়েছে তিনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
নবীজি সম্পর্কে বৌদ্ধ ধর্মে আরো অনেক ভবিষ্যতবাণী আছে। Sacerd Book of East-এর ১১নং খণ্ডের ৩৬ পৃষ্ঠায় আছে- মহা পরিনিব্বান সুত্তা ২নং অধ্যায়ের ৩২ অনুচ্ছেদে আছে- গৌতম বুদ্ধের ক্ষেত্রে তার কোন প্রকাশ্য অথবা গোপন শিক্ষা ছিল না। "হে আনন্দ তথাগতরা বা শিক্ষকরা জ্ঞান লুকিয়ে রাখবে না। জ্ঞানটা তোমাদের নিজের কাছে রেখে দেবে না। এটা প্রচার করতে হবে।" আমরা জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে ওহী হিসেবে যা পেয়েছিলেন, সেটা সবার মাঝে প্রচার করেছেন। আর সাহাবাগণকে বলেছেন এগুলো মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখ না। মানুষের মাঝে এগুলো প্রচার করো। ভবিষ্যৎবাণীতেও তাই বলা হয়েছে। এখানে প্রকাশ্য বা গুপ্ত কিছুই নেই, সবকিছুই মানুষের মাঝে প্রচার করতে হবে।
Sacerd Book of East-এর ১১ নং খণ্ডের ৫৭ নং পৃষ্ঠায় আরো আছে- মহা পরিনিব্বান সুত্তার ৫ অধ্যায়ের ৩৬ পৃষ্ঠায় বলা আছে যে, গৌতম বুদ্ধের যেমন এক পরিচারক আছে আনন্দ, তেমনি মাইত্রিরও এক পরিচারক থাকবে। ইতিহাস বা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সীরাত থেকে আমরা জানি, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিচারকের নাম ছিল হযরত আনাস (রা)। তিনি ছিলেন মালিকের পুত্র। হযরত আনাস (রা) বলেছেন- আট বছর বয়সে আমার বাবা-মা আমাকে নবীজির হাতে তুলে দেন। তার মা নবীজিকে বলেছিলেন- হে আল্লাহর রাসূল! একে আপনার পরিচারক হিসেবে গ্রহণ করুন। হযরত আনাস (রা) বলেছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের ছেলের মতই দেখতেন। আমরা জানি হযরত আনাস (রা) সব সময় নবীজির সঙ্গে থাকতেন, এমনকি বিপদের সময়ও। এভাবে আনন্দের সাথে তাকে তুলনা করা যায় যে, যখন গৌতম বুদ্ধের দিকে একটা পাগলা হাতী তেড়ে এল আনন্দ তখন বুদ্ধের সামনে দাড়িয়েছেন। একইভাবে ওহুদের যুদ্ধের সময় শত্রুরা যখন নবীজিকে ঘিরে ফেলল, হযরত আনাস (রা) নবীজির পাশেই ছিলেন তার বয়স ছিল এগার বছর। হুনাইনের যুদ্ধেও শত্রুর তীরন্দাজ বাহিনী নবীজিকে ঘিরে ফেলল আনাস (রা) তখনো নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পাশে ছিলেন। তাহলে এ ভবিষ্যত বাণীও সত্য হল যে, মাইত্রির এক পরিচারক থাকবে।
গসপেল অব বুদ্ধ এর ২১৪ নং পৃষ্ঠায় আছে যে মাইত্রির ছয়টা গুণ থাকবে। তিনি রাতের বেলা আলোকপ্রাপ্ত হবেন, আলোক প্রাপ্ত হওয়ার পর উজ্জ্বল হবেন, তিনি স্বাভাবিকভাবে মারা যাবেন, তিনি রাতের বেলা মারা যাবেন, মারা যাওয়ার সময় তিনি উজ্জ্বল হবেন, মারা যাওয়ার পর এ পৃথিবীতে আর কখনো তাকে সশরীরে দেখা যাবে না। এ ছয়টা গুণাবলী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছিল। প্রথমতঃ আমরা জানি নবীজি (স) রাতের বেলায়ই প্রথম ওহী লাভ করেন। কোরআনের সূরা দুখানের ২ ও ৩নং আয়াত এবং সূরা ক্বদরের ১নং আয়াতে আছে- কোরআন নাযিল হয়েছিল- মহিমান্বিত রাতে। দ্বিতীয়তঃ তিনি উজ্জ্বল হবেন। আমরা জানি যে, আমাদের নবীজি (স) তখন উজ্জ্বল হয়েছিলেন, আলোকিত হয়েছিলেন। তৃতীয়তঃ তিনি স্বাভাবিকভাবে মারা যাবেন। আমরা জানি তিনি স্বাভাবিকভাবেই মারা গেছেন। চতুর্থতঃ তিনি মারা যাবেন রাতের বেলা। আর আয়েশা (রা) এর হাদীস থেকে আমরা জানি যে, নবীজির ঘরে প্রদীপে তেল ছিল না; তিনি পাশের বাড়ি থেকে তেল ধার নিলেন। অর্থাৎ নবীজি (স) মারা যাবার সময় রাত ছিল। পঞ্চমতঃ তিনি মারা যাওয়ার সময় উজ্জ্বল হবেন। হযরত আনাস (রা) বলেছেন যে, নবীজি মারা যাবার সময় খুব উজ্জ্বল ছিলেন। সবশেষেঃ মারা যাবার পর তাকে আর কখনো সশরীরে পৃথিবীতে দেখা যাবে না। আমরাও জানি যে, তিনি আর ফিরে আসবেন না। মদীনায় তার রওজা রয়েছে। তাকে সশরীরে আর দেখা যাবে না। বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থে উল্লেখ করা এসব কথা শুধুমাত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বেলাতেই খাটে।
Sacerd Book of East-এর ১০ খন্ডে ৬৮ পৃষ্ঠায় আরো বলা হয়েছে- তথাগতরা শুধু প্রচার করবে। অর্থাৎ যে বুদ্ধরা আসবেন তারা শুধু প্রচার করবেন। সূরা গাসিয়ার ২১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-
فَذَكِّرْ إِنَّمَا أَنْتَ مُذَكِّرٌ
অর্থঃ তোমার কাজ শুধু ধর্ম প্রচার করা।
Sacerd Book of East-এর ১০ খণ্ডের ৬৭ পৃষ্ঠায় আরো আছে- স্বর্গে যেতে হলে তোমার ভাল কাজগুলোর দরকার হবে। সূরা আসরের ১-৩ নম্বর আয়াতের আল্লাহ বলেছেন- "আসরের শপথ, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে, তারা ব্যতীত যাদের বিশ্বাস আছে, যারা মানুষকে ধৈর্য্য আর অধ্যবসায়ের পথে আনে; বেহেশতে যাওয়ার জন্য শর্ত হলো ন্যায়-নিষ্ঠতা। যে কথা বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থেও আছে।
ধর্মপরা মাত্তা সত্তার ১৫১ তে সর্বশেষ বুদ্ধ বা মাইত্রির বর্ণনায় বলা আছে, তিনি হবেন মানব জাতির প্রতি করুণা। তিনি হবেন ভদ্র, মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত, দয়ালু, আর তিনি হবেন সত্যবাদী। এসব কথাগুলো শুধুমাত্র সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বেলায় প্রযোজ্য। এ হল সংক্ষেপে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনা।
📄 ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মাদ (সা)
খ্রিষ্টান ধর্মের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল। বাইবেলের দুইটা খণ্ড। ওল্ড টেস্টামেন্ট আর নিউ টেস্টামেন্ট। ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের মতে বাইবেলে ৭৩টা বই আছে। আর প্রোটেস্টান্টদের মতে, তারা ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে সাতটা বই বাদ দিয়েছে। তাই তাদের বাইবেলে আছে ৬৬ টা বই। এদিকে ক্যাথলিক আর প্রোটেস্টান্টদের নিউ টেস্টামেন্ট সেখানে সাতাশটা বই আছে। কিন্তু ক্যাথলিকদের মতে ওল্ড টেস্টামেন্টে আছে ৪৬ টা বই। প্রোটেস্টান্টদের মতে সেখানে ৩৯টি বই আছে। ওল্ড টেস্টামেন্টে সে সব নবীদের কথা বলা আছে যারা ঈসা (আ) এর পূর্বে এ পৃথিবীতে এসছিলেন। আর নিউ টেস্টামেন্টে যিশু খ্রিষ্টের জীবন আর তার সময়ের কথা বলা হয়েছে।
আমরা প্রথমে ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থে নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনা নিয়ে কথা বলবো। ওল্ড টেস্টামেন্টের Book of Deuteronomy এর ১৮ অধ্যায় ১৮ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- মহান ঈশ্বর বলেছেন, আমি তোমার মত করে তোমার ভাইদের মধ্য হতে একজন নবীকে পাঠাবো। আমি তাকে ধর্ম প্রচার করতে বলবো। সে আমার আদেশে সব কথা বলবে। ঈশ্বর বলছেন আমি একজন নবী পাঠাবো তোমার ভাইদের মধ্য হতে যে তোমার মত হবে। অর্থাৎ মূসা (আ) এর মত হবে। আর খ্রিষ্টানরা বলে যে এ কথাগুলো বলা হচ্ছে যিশু খ্রিস্ট বা ঈসা (আ) সম্পর্কে। তাদেরকে যদি বলি যে, এটা কিভাবে ঈসা (আ) সম্পর্কে হয়; তারা বলে যে, যে নবী আসবেন তিনি মূসা (আ) এর মত হবেন, আর ঈসা (আ) ছিলেন মূসা (আ) এর মতই। তারপর যদি বলি তাদের মধ্যে মিলটা কোথায়? তারা তখন বলে যে, মূসা ও ঈসা (আ) তারা দুজনেই আল্লাহর নবী ছিলেন। আর তারা দুজনেই ইহুদী। তাই এখানে যিশু বা ঈসা (আ) সম্পর্কেই বলা হয়েছে। এই দুটো ব্যাপার এক হলেই যদি দাবী করা হয় যে, তিনি নবী ছিলেন আর ইহুদী ছিলেন, তাহলে বাইবেলে যতজন নবীর উল্লেখ আছে মূসা (আ) এর পরে সবার বেলায় এটা খাটে। যেমন ধরেন সোলায়মান, ইজিফিয়েল, আইজেক, আইজায়া, দানিয়েল, হোসিয়া, জোয়েল, জন্দা ব্যাপ্টিস্ট। তাঁরা সবাই আল্লাহর নবী। সবার বেলারই এটা খাটে।
ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যায় এই ভবিষ্যদ্বাণী সবচেয়ে বেশী মিলে যায় আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে। আসুন দেখি ভবিষ্যদ্বাণীতে কি বলা হয়েছে? এখানে বলা হয়েছে যে, আমি একজন নবী পাঠাবো তোমার ভাইদের মধ্য হতে যে তোমার মত হবে অর্থাৎ মূসা (আ) এর মত। লক্ষণীয় যে, মূসা আর মুহাম্মদ (স) তারা দুজনেই জন্মেছিলেন স্বাভাবিক ভাবে। তবে যিশু বা ঈসা স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেননি, তিনি কোন পুরুষের ঔরসজাত হয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। পবিত্র কোরআনের সূরা ইমরানের ৪৫-৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- তিনি কোন পুরুষের ঔরসজাত হয়ে জন্মননি, তিনি অলৌকিকভাবে জন্মেছেন। এছাড়াও বাইবেলের গসপেল অফ ম্যাথিউর ১নং অধ্যায়ের ১৮ অনুচ্ছেদে ৩৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে এভাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মূসা (আ) এর মত। কিন্তু ঈসা (আ) মূসা (আ) এর মত ছিলেন না।
এরপর আরো দেখবেন, মূসা (আ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুজনেই বিবাহিত ছিলেন। তাদের সন্তান ছিলো। কিন্তু বাইবেলের কথা মতে ঈসা (আ) অবিবাহিত ছিলেন। তার কোন সন্তান ছিলো না। তাহলে যিশু মূসার মত ছিলেন না। বরং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসা (আ) এর মত ছিলেন।
মূসা (আ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুজনেরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু যিশু বা ঈসা (আ) স্বাভাবিকভাবে মারা যাননি। পবিত্র কোরআনের সূরা নিসার ১৫৭-১৫৮ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
অর্থঃ "আল্লাহ ঈসা (যিশুকে) তার কাছে তুলে নিয়েছেন।"
আমরা জানি তিনি মারা যাননি। আর ভালো করে বাইবেল পড়লেও প্রমাণ করা যায় তিনি মারা যাননি। কিন্তু খ্রিষ্টানরা মনে করে যে যিশু বা ঈসা ক্রশবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তবে তর্কের খাতিরে এই কথা মেনে নিলেও বলতে হবে, যিশু ঈসা (আ) এর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। খ্রিষ্টানরা বাইবেলের ভুল ব্যাখ্যা করে। তারপরও সেটা মানলে এটা জানবেন যে যিশুর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। আমরা মানি তাকে জীবিত তুলে নেয়া হয়েছে, তাহলে আমরাও জানি তার মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ ঈসা (আ) মূসা (আ) এর মত নয় বরং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসা (আ) এর মত।
মূসা (আ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, দুজনেই নতুন শরীয়ত এনেছেন। তবে বাইবেলের ভাষ্য মতে যিশু বা ঈসা (আ) নতুন কোন শরীয়ত আনেননি। বাইবেলের গসপেল অব ম্যাথিউ ৫নং অধ্যায়ের ১৭-১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ভেব না যে আমি নবীদের শরীয়ত ধ্বংস করতে এসেছি আমি ধ্বংস করতে আসিনি, পূর্ণ করতে এসেছি।
মুসা (আ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নবী হওয়ার পাশাপাশি পৃথিবীতে শাসক হিসেবে ছিলেন অর্থাৎ কেউ অপরাধ করলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ক্ষমতা রাখতেন। এক্ষেত্রে যিশু বা ঈসা (আ) এর এ ক্ষমতা ছিল না। গসপেল অব জন এর ১৮ অধ্যায়ের ৩৬ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, যিশু তার নিজের মুখে বলেছেন "আমার রাজত্ব এ পৃথিবীতে নয়।" মুসা (আ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তাদের সময়ের অনুসারীরা আল্লাহর নবী হিসেবে মেনে নিয়েছিল। যিশু খ্রিস্টের সময় বেশিরভাগ লোক তাকে আল্লাহর নবী বলে মেনে নেয়নি। গসপেল অব জনের ১নং অধ্যায়ের ১১ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে- সবাই তাকে ত্যাগ করেছিল। তাহলে ভাল ভাবে লক্ষ্য করলে আপনারাও বুঝবেন যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন মুসা (আ) এর মত। কিন্তু ঈসা (আ) মুসা (আ) এর মত নন। তাহলে এই ভবিষ্যত বাণীটা মূলত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কেই করা হয়েছে।
এখানে লক্ষণীয় বলা হয়েছে আমি একজন নবী পাঠাবো তোমার ভাইদের মধ্য হতে। আর আমরা জানি, আরবরা ইহুদীদের জ্ঞাতি ভাই। মুসা নবী ইহুদী ছিলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আরব। অর্থাৎ আরব আর ইহুদীরা জ্ঞাতি ভাই। এখানে আরো বলা হয়েছে যে, আমি একজন নবী পাঠাবো যে তোমার মত করে, আমার কথামত ধর্মপ্রচার করবে, সে আমার আদেশ পালন করবে। আমরা জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে ওহী প্রাপ্ত হয়েছিলেন আর যা শুনেছিলেন তাই প্রচার করেছিলেন। যেন তাঁর মুখ দিয়ে আল্লাহর কথাই বের হচ্ছে। আর আল্লাহর আদেশেই তিনি পালন করেছিলেন। তাই এ ভবিষ্যত বাণীতে আসলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথাই বলা হয়েছে।
Book of Deuteronomy-এর ১৮ নং অধ্যায়ের ১৯ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে- "তোমরা আমার কথা না মানলে আমি তোমাদের ওপর প্রতিশোধ নিবো।" তার মানে যারা এ নবী বা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা শুনবে না, আল্লাহ তাদের ওপর প্রতিশোধ নিবেন। বুক অব আইজায়া এর ২৯ নং অধ্যায়ের ১২ নং অনুচ্ছেদের আছে- আসমানী কিতাব যাকে দেয়া হবে সে শিক্ষিত নয়। কিতাব দেয়া হবে সেই নবীকে যে শিক্ষিত নয়। তাকে যখন বলা হবে যে এটা পড়, সে বলবে আমি পড়তে জানি না। আর আমরা জানি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ওহী নিয়ে এসে জিবরাঈল (আ) তাকে বললেন ইকরা, পড়। তিনি বললেন আমি পড়তে জানি না। এভাবে উক্ত বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী মতে আসমানি কিতাব যে নবীকে দেয়া হলো, তিনি হলেন অশিক্ষিত তা সত্যি হলো। আমরা জানি যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরক্ষর ছিলেন। তিনি ছিলেন উম্মী, আর যখন তাকে বলা হয়, পড় তিনি তখন বলেন, আমি পড়তে জানি না। নবীজি সেটাই বলেছিলেন।
এছাড়াও ওল্ড টেস্টামেন্টে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা নাম ধরেও বলা হয়েছে। এটা বলা হয়েছে Song of Solomon -এর ৫ অধ্যায়ের ১৬ অনুচ্ছেদে যে, তার কণ্ঠ খুব মিষ্টি, সে খুব প্রিয়পাত্র, সে আমার প্রিয়জন, সে আমার বন্ধু, শোন জেরুজালেমের কন্যারা।" হিব্রুতে মুহাম্মাদিন শব্দটার অনুবাদ করা হয়েছে যে, খুব প্রিয়পাত্র। তবে সেমেটিক ভাষায় আরবী বা হিব্রুতে ‘হুম’ দিয়ে সম্মান বোঝানো হয়। যেমন হলো, আল্লাহ এলোহিম অর্থাৎ সম্মান দেখানো। তেমনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মান দেখিয়ে মুহাম্মাদিন বলা হচ্ছে। অর্থাৎ ওল্ড টেস্টামেন্টে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এখন যদি পড়েন, দেখবেন এটার অনুবাদ করা হয়েছে অত্যন্ত প্রিয় পাত্র।
এবার দেখা যাক নিউ টেস্টামেন্টে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কি উল্লেখ করা হয়েছে। এখন আমি যদি খ্রিষ্টানদের কথা বলি, ওল্ড টেস্টামেন্টে যা বলা আছে সেটা তারা মেনে নেবে কারণ এটা তাদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলেরই একটা অংশ। সূরা আরাফের ১৫৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- তারা অনুসরণ করে নিরক্ষর নবীকে, যার উল্লেখ রয়েছে তাওরাত এবং ইঞ্জিলে।"
সূরা সফ এর ৬নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
অর্থঃ "যিশু বা ঈসা (আ) ইবনে মরিয়াম ইসরাইলবাসীদের বলছেন- আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল হিসেবে এসেছি। আমার পূর্বে যেসব নবী রাসূল এসেছেন আমি তাদের সমর্থক। আর সুসংবাদ দিচ্ছি যে, আমার পরে একজন নবী আসবেন যার নাম হবে আহমদ।"
নিউ টেস্টামেন্ট পড়লে দেখা যায় সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। গসপেল অব জন এর ১৪ নং অধ্যায়ের ১৬ অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে- যিশু বা ঈসা (আ) বলছেন- আমি পিতার কাছে প্রার্থনা করবো, তিনি সাহায্যকারী পাঠাবেন। সে সব সময় তোমাদের সাথেই থাকবে। গসপেল অব জন ১৫ অধ্যায়ের ৭নং অনুচ্ছেদে আছে- যখন সেই সাহায্যকারী আসবে, আমার পিতা যাকে পাঠাবেন সে আমার সম্মান বৃদ্ধি করবে। এরপর গসপেল অব জন এর ১৬ অধ্যায়ের ৭নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে- আমি তোমাদের সত্যি কথাটাই বলি। আমি চলে গেলেই তোমাদের সবার জন্য ভালো হবে। কারণ আমি না গেলে সেই সাহায্যকারী আসবে না আর আমি গেলেই সে এখানে আসবে।" খ্রিষ্টানরা এ সাহায্যকারী বলতে পবিত্র আত্মাকে বোঝায়।
এখন এ ভবিষ্যত বাণীটা ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এখানে বলা হচ্ছে আমি চলে গেলেই একজন সাহায্যকারী আসবেন। সাহায্যকারী আসার একমাত্র শর্তই হলো আমি চলে যাওয়া। তিনি চলে গেলে তারপরই সাহায্যকারী আসবেন। আমরা জানি যিশুকে যখন ব্যাপ্টাইজ করা হয় পবিত্র আত্মা তখনও ছিল। এমনকি যিশুখ্রিষ্ট জন্মের পূর্বেও পবিত্র আত্মা সেখানে ছিল। যখন তিনি মায়ের গর্ভে ছিলেন। তাহলে সাহায্যকারী কখনো পবিত্র আত্মা হতে পারে না। তারপর এ সাহাযকারী শব্দটা যদি গ্রীক বা অ্যারামাইক ভাষা দেখেন, তাহলে দেখবেন- গ্রীক ভাষায় এ শব্দটা হলো- পেরাক্লিট, শব্দটার অনুবাদ করা হয়েছে সাহায্যকারী। পেরাক্লিট শব্দের অর্থ আসলে সমর্থন করা। মূল শব্দটা হলো পেরাক্লিটস। যার অর্থ যে প্রশংসা করে। অথবা যে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। আমরা জানি যে, নবীজি (স)-এর দুটো নাম, আহমদ আর মুহাম্মদ। শব্দটা যাই ধরেন, হোক সমর্থন বা সাহায্যকারী কিংবা প্রশংসনীয় বা প্রশংসার যোগ্য এ কথাগুলো সবচেয়ে বেশি মিলে যায় শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ক্ষেত্রে।
গসপেল অব জনের ১৬ নং অধ্যায়ের ১২-১৪ অনুচ্ছেদে আছে- যিশু বা ঈসা (আ) বলেছেন- তোমাদের আমি অনেক কিছুই বলতে চাই, কিন্তু তোমরা এখন সেগুলো বুঝবে না। কারণ সত্য আত্মা তোমাদেরকে সত্যের পথে নিয়ে যাবে। সে তার নিজের কথাগুলো বলবে না, যে কথাগুলো শুনবে সে গুলোই বলবে। সে আমাকে মহিমান্বিত করবে। সে তোমাদের ভবিষ্যতের কথা বলবে।" এখানে বলা হয়েছে আমি তোমাদের অনেক কিছুই বলতে চাই কিন্তু এখন তোমরা সেটা বুঝবে না। সত্য আত্মা যখন আসবে সে তোমাদেরকে সত্য পথে নিয়ে যাবে। সে নিজের কথা বলবে না। সে যা শুনবে তাই বলবে। আমরা জানি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর যা ওহী এসেছিল তিনি সেটাই বলেছিলেন। "সে তার নিজের কথা বলবে না, যেগুলো শুনবে সেগুলোই বলবে। সে তোমাদের ভবিষ্যতের কথা বলবে। সে আমাকে মহিমান্বিত করবে।" আমরা জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিশুকে মহিমান্বিত করেছেন পবিত্র কোরআনে আর হাদীসে। আমরা বিশ্বাস করি যিশু বা ঈসা (আ) হলেন মসী বা খ্রিষ্ট। আমরা বিশ্বাস করি যে, তিনি অলৌকিক ভাবে জন্মেছিলেন কোন পুরুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই। আমরা আরো বিশ্বাস করি তিনি আল্লাহর আদেশে মৃত মানুষকে জীবিত করেছিলেন, জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীদের সুস্থ করেছিলেন। তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিশুকে মহিমান্বিত করেছেন। তাহলে এ ভবিষ্যত বাণীটাও আসলে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে করা হয়েছে।
এই হলো ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের ধর্ম গ্রন্থে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনা।
📄 প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: আমি জেরি থমাস। ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটিতে সাংবাদিকতার ওপর রিসার্চ করছি। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা ওয়েব সাইট খুলেছি, ওয়েবসাইটির নাম Shakkitime Com. আপনার কাছে আমার প্রশ্ন-
১. আমি সব সময় জানতাম যে হাদীস ছাড়া কোরআন অসম্পূর্ণ। এখন আপনি অন্য ধর্ম গ্রন্থের কথাও বললেন। আপনি বাইবেলের কথাও বলেছেন। কিন্তু বাইবেল বলছে- যে যিশু খ্রিস্ট বিশ্বাস করে না সে খ্রিস্টবিরোধীদের শামিল হয়। এটা একটা ভবিষ্যতবাণী। আমি এমনও শুনেছি যে হাদীস বলছে মুহাম্মদ যাদুবিদ্যার সাহায্য নিয়েছিলো। এ নিয়ে আপনার বক্তব্য কি?
উত্তর: ভাই আপনি প্রশ্ন করলেন এবং বেশ কিছু মন্তব্যও করলেন। আপনি বললেন যে, আপনি জানেন হাদীস ছাড়া কোরআন অসম্পূর্ণ। এখানে আপনি অন্য ধর্ম গ্রন্থের কথাও বললেন। তার মানে ওনার মতে বাইবেলের উদ্ধৃতি হলেই সে কথা মানতে হবে। আর বাইবেল বলছে, যে যিশু বা ঈসা (আ) কে বিশ্বাস করবে না সে দোজখে যাবে। এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রথম হাদীস ছাড়া কোরআন অসম্পূর্ণ নয়। কোরআন একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ বই। তবে কোরআনের কথাগুলো বুঝতে হলে এর ব্যাখ্যাগুলো পড়ে দেখতে হবে। আর হাদীস হলো পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যা। যে কথাগুলো বলেছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পবিত্র কোরআন একটা অবশ্যই স্বয়ংসম্পূর্ণ বই। তবে যদি আপনি এর কথাগুলো ভালোভাবে বুঝতে চান, আপনি পড়বেন যে কথাগুলো বলে গেছেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থাৎ আমরা যে গুলোকে সহীহ হাদীস বলি।
একটা কথা বলি, অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছি বলে এই নয় যে আমি অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থগুলোও আল্লাহর বাণী হিসেবে মানি। প্লিজ আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি এখানে কোরআনের কথামত কাজ করেছি। সূরা আলে-ইমরানের ৬৪ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ
অর্থঃ "এসো সেই কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক।"
আমি সাদৃশ্যগুলো নিয়ে বলছি। সূরা রাদের ৩৮নং আয়াতে বলা হয়েছে- "প্রত্যেক যুগেই আমি কিতাব পাঠিয়েছি" আল্লাহ তায়ালা অনেক কিতাব নাযিল করেছেন। পবিত্র কোরআনের চারটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাওরাত, যাবুর, ইনজিল এবং কোরআন। তাওরাত মূসা (আ) এর উপর, দাউদ (আ) এর উপর যাবুর, ইনজিল ঈসা (আ) এর উপর, আর কোরআন মাজীদ যা সর্বশেষ ও চূড়ান্ত আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর।
আগের সবগুলো আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছিল নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য। আর সেই কিতাবের নির্দেশগুলো ছিলো একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। তাই আল্লাহ তায়ালা চাননি যে এই কিতাবগুলো চিরদিন অবিকৃত অবস্থায় থাকুক। কোরআন হলো সর্বশেষ আসমানী কিতাব। সূরা হিজরের ৯ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
অর্থঃ "আমি কোরআন নাযিল করেছি এবং আমিই সংরক্ষণ কারী।"
কোরআন হল একমাত্র পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ যেটা এখনো অবিকৃত রয়েছে। শুধু আমি বলছি না। ধর্মের উপর যত বিশেষজ্ঞ আছেন সবাই বলছেন। এমনই একজন উইলিয়াম মুর। তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোক ছিলেন। তিনি একজন খ্রিষ্টান ছিলেন। ২০০ বছর আগে তিনি বলেছেন- "আর কোন ধর্মীয় গ্রন্থ নেই যেটা এখনো অবিকৃত রয়েছে ১২০০ বছরের বেশী সময় ধরে।" একজন খ্রিষ্টান এবং ইসলামের তীব্র সমালোচক হয়েও তিনি সত্য কথাটা স্বীকার করেছেন। অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের সকলই কথাগুলো বদলে গেছে। এমনকি বাইবেলও। আমি বাইবেলকে আল্লাহর বলে মানি না। তবে আমরা মুসলিমরা সেই কিতাবে বিশ্বাস করি যেটা ঈসা (আ) কে দেয়া হয়েছিলো। আর সেটা হলো ইঞ্জিল। এখন আমরা যেই বাইবেল পাই সেটা একটা মিশ্রণ। এখানে আল্লাহর বাণী থাকতেও পারে। যদি তা কোরআনের সাথে মিলে তবে আমিও আপত্তি না করে মেনে নেবো এটা আল্লাহর বাণী। এছাড়াও নবীদের বলা কথা আছে এখানে, ঐতিহাসিকদের বলা কথাও আছে। দুঃখের সাথে বলছি বাইবেলে পর্নোগ্রাফিও আছে। আমি উদ্ধৃতি দিতে পারবো না। বাইবেলে অনেক পরস্পর বিরোধী বক্তব্য আছে। আছে বৈজ্ঞানিক ভুল, গাণিতিক ভুল। সেগুলোর কথা এখানে বলছি না। আমি বিতর্ক করেছিলাম ডঃ উইলিয়াম ক্যাম্পবেলের সাথে। ইনি ইসলামের বিরুদ্ধে "কোরআন, বাইবেল ইন দি লাইট অব হিস্ট্রি এন্ড সাইন্স নামে একটা বই লিখেছেন।" তিনি বলেছিলেন- তোমাদের একটা বৈজ্ঞানিক ভুল আছে। আমি আমেরিকায় গিয়েছিলাম সেখানে আমরা বিতর্ক করেছিলাম সময়টা ছিল ২০০১ সালের এপ্রিল, আর টপিক ছিলো ‘কোরআন, বাইবেল ইন দি লাইট অব হিস্ট্রি এন্ড সাইন্স। ‘আমি তার সব অভিযোগের উত্তর দিয়েছিলাম। তারপর আমি যখন বাইবেলের ৩৮টা ভুলের কথা উল্লেখ করলাম। তিনি সেগুলোর উত্তর দিতে পারেন নি।
সূরা বাক্বারার ৭৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- "দুর্ভোগ তাদের যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে আর বলে এটা আল্লাহর বাণী। উচ্চমূল্য পাওয়ার জন্য তারা এ কথা বলে, তাই তারা যা লিখেছে সে জন্য তাদের শাস্তি এবং যা উপার্জন করেছে সেজন্য তাদের শাস্তি।" তাই বর্তমানের বাইবেল তেমনি গ্রন্থ, হয়ত জানেন এ বাইবেল শব্দটা বাইবেলের মধ্যে কোথাও নেই। এটা এসেছে গ্রীক শব্দ "বিবলস" থেকে। যার অর্থ অনেক বই মিলে একটা বই। আর বিশেষজ্ঞরা এখন বলেন, এ বাইবেল লিখেছে অনেক লেখক। এটা খ্রিষ্টান বিশেষজ্ঞদের মতামত। তাই বর্তমান বাইবেলকে আমি আল্লাহর বাণী বলে মানি না। একইভাবে যদি জিজ্ঞেস করেন, বেদ, বৌদ্ধ বা পারসী ধর্মগ্রন্থগুলোকে আল্লাহর বাণী বলে মনে করি কি না? আমি এখন বলব, হতে পারে আল্লাহর বাণী আবার নাও হতে পারে। আল্লাহ অনেক ওহী নাযিল করেছেন অনেক কিতাব নাযিল করেছেন। তাই আমি বলবো এগুলো কিছু বাণী থাকতে পারে। হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলো, পারসী ধর্মগ্রন্থগুলো আল্লাহর বাণী হলেও হতে পারে। কিন্তু আসমানী কিতাব হলেও সেগুলো নির্দিষ্ট জাতি আর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এসেছিল। তাই আপনি অবশ্যই মানবেন সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কিতাব কোরআনকে। তাই কোন মানুষ হোক সে যে কোন দেশের সবাই সর্বশেষ আসমানী কিতাব কোরআন ও সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মেনে চলবে।
আমি বলছি না যে, হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো আল্লাহর বাণী আর হলেও সেগুলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জাতির জন্য এসে ছিল। হিন্দু বিশেষজ্ঞরাই বলেন তাদের ধর্মগ্রন্থগুলোও পরিবর্তন হয়েছে। একমাত্র ইসলাম ব্যতীত সব ধর্মের বিশেষজ্ঞরাই বলেন যে, তাদের ধর্মগ্রন্থগুলোর পরিবর্তন হয়েছে। তারপরও যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নিই যে সেগুলো আল্লাহর বাণী, তাহলে সেসব গ্রন্থের কথাগুলো তাদের অক্ষরে অক্ষরে মানা উচিত। হিন্দুরা যদি বলে তাদের গ্রন্থ আল্লাহর বাণী, বৌদ্ধরা, খ্রিষ্টানরাও যদি তাই বলে তাহলে সবাইকেই ইসলাম ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা মেনে নিতে হবে কারণ আপনাদের ওই গ্রন্থগুলোতেই তা বলা আছে। আপনি তো মনে করেন এটা আল্লাহর বাণী, আমি মনে করি এটা হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। আপনি মনে করেন সেটা আল্লাহর বাণী, তাহলে আপনি সেটা সম্পূর্ণ মেনে চলুন। সর্বশেষ আর চূড়ান্ত নবীকেও আপনি বিশ্বাস করেন।
আমি আগেও বলেছি, পবিত্র বাইবেলে গসপেল অব জন এর ১৬ নং অধ্যায়ের ১২-১৪ নং অনুচ্ছেদে আছে- ঈসা (আ) বলছেন, আমি তোমাদের অনেক কিছুই বলতে চাই কিন্তু তোমরা তা এখন বুঝবে না কারণ সত্য আত্মা তোমাদের কাছে আসবে এবং তোমাদেরকে সত্যের পথে নিয়ে যাবেন। সে তার নিজের কথা বলবে না, সে যা শুনবে তাই বলবে। সে তোমাদের ভবিষ্যতের কথা বলবে আর আমাকে মহিমান্বিত করবে। সেটা কে? সে হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভিন্ন আর কোন নবী ঈসা (আ) কে মহিমান্বিত করেছেন? আপনি ঠিকই বলেছেন যে, যে ঈসা (আ) কে স্বীকার করবে না সে দোযখে যাবে। আমি আপনার সাথে একমত। সে আসলে মুসলিম না, যে ঈসা (আ) কে বিশ্বাস করে না। আমরা এখানে বলি ঈসা আলাইহিস সালাম আর আপনি বলেন যিশু। আমি যেহেতু ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করি আমাকে ঈসা আলাইহিস সালাম বলতেই হবে। যদি আমি এ ঈসা আলাইহিস সালাম না বলি আমাকে ইসলাম হতে বের হতে হবে। অনভিজ্ঞ লোক এটা বলতে পারে কিন্তু আমাকে ঈসা আলাইহিস সালাম বলতেই হবে। তাহলে সেই মুসলিম আসলে মুসলিম না যে ঈসা (আ) কে বিশ্বাস করে না। আমরা অবশ্যই মানি যে ঈসা (আ) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। আমরা বিশ্বাস করি যে তিনি অলৌকিকভাবে কোন পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই জন্মে ছিলেন। যেটা অনেক আধুনিক খ্রিষ্টানেরাই বিশ্বাস করে না। আমরা মানি যে, তিনি আল্লাহর আদেশে মৃতকে জীবিত করেছিলেন এবং জন্মান্ধ আর কুষ্ঠ রোগীদের সুস্থ করেছিলেন। মুসলিম আর খ্রিষ্টানেরা এখানে এক। তবে আমি জানি আপনি কি বোঝাচ্ছেন। আপনি যিশু খ্রিষ্টকে বিশ্বাস করা বলতে তাকে ঈশ্বর হিসাবে বিশ্বাস করা বুঝিয়েছেন, তাই না?
প্রশ্ন: যিশুর এ কথাকে বিশ্বাস করি যে, "আমি সত্য আর জীবনের একমাত্র পথ।
ডা. নায়েক: এ কথার মানে কি?
প্রশ্নঃ এর মানে যিশু খ্রীস্ট হলেন ঈশ্বর।
ডা. নায়েক: ভাই আপনি বাইবেলের উদ্ধৃতি দিলেন। এটা গসপেল অব জনের ১৪ নং অধ্যায়ের ৬নং অনুচ্ছেদে আছে। আর আপনি বলছেন- ঈসা (আ) বলেছেন যে, তিনি ছিলেন ঈশ্বর। আপনার প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। গোটা বাইবেলের কোথাও এই রকম একটা কথাও নেই যে, ঈসা (আ) বলেছেন, আমি ঈশ্বর আর তোমরা আমার উপাসনা কর। যদি কোন খ্রিষ্টান দেখাতে পারে যে, বাইবেলের কোথাও এটা পরিষ্কারভাবে লেখা আছে যে, ঈসা (আ) বলছেন- আমি ঈশ্বর আর আমার উপাসনা কর- তাহলে আমি ডা. জাকির নায়েক আজকেই খ্রিষ্টান ধর্মে দিক্ষিত হব। আমি অন্য মুসলিম ভাইদের পক্ষে এ কথা বলছি না। আমি আমার মাথাটা তরবারির নিচে রাখছি। আমি বিভিন্ন ধর্মের উপর একজন ছাত্র। আপনি বাইবেল পড়েছেন, আমিও পড়েছি। ঈসা (আ) বলেছেন, সত্যকে খোঁজ কর, সত্যই তোমাকে মুক্ত করবে। ইনশা-আল্লাহ আজ আপনি সত্য দেখবেন।
আমি আবারো বলছি, গোটা বাইবেলের কোথাও একথা নেই যে, ঈসা (আ) বলছেন, আমি ঈশ্বর আমার উপাসনা কর। আপনারা যদি বাইবেল পড়েন, দেখবেন, ঈসা (আ) বলছেন, গসপেল অব জন ১৪ অধ্যায় ২৮ অনুচ্ছেদে আছে- আমার পিতা আমার চেয়েও মহান। গসপেল অব জন ১০ নং অধ্যায়ের ২৯ অনুচ্ছেদে আছে- আমার পিতা সবার চেয়ে মহান। গসপেল অব ম্যাথিউ ১২ অধ্যায় ২৮ অনুচ্ছেদে বলেছেন- আমি ঈশ্বরের আত্মার সাহায্যে শয়তানকে তাড়িয়ে দিই। গসপেল অব জন ৫ অধ্যায় ৩০ অনুচ্ছেদে আছে- "আমি নিজে থেকে কিছুই করতে পারি না। আমি এখানে বিচার করি। আর বিচার সঠিক কারণ আমি আমার ইচ্ছায় কাজ করি না, আমার পিতার ইচ্ছায় কাজ করি।” যদি কেউ বলে সে আল্লাহর ইচ্ছায় কাজ করে তবে সে একজন মুসলিম। এক্ষেত্রে ঈসা (আ) একজন মুসলিম। তিনি নিজেকে ঈশ্বর বলেন নি।
বুক অব অ্যাক্টস ২য় অধ্যায়ের ২২ অনুচ্ছেদে আছে- "হে ইসরাঈলের সন্তানেরা শোন, নাজারাত শহরের যিশু তোমাদের মাঝে ঈশ্বর প্রেরিত একজন মানুষ সে অনেক অলৌকিক কাজ করবে, এগুলো তাকে ঈশ্বর করাবে, আর তোমরা তার সাক্ষী থাকবে।" তাই বাইবেল স্পষ্ট করে বলছে যে, ঈসা (আ) ছিলেন একজন মানুষ, তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল কিন্তু আল্লাহ নন। গোটা বাইবেলের মধ্যে কোথাও নেই যে, ঈসা (আ) বলছেন তিনি ঈশ্বর আর আমার উপাসনা কর। আপনি একটা উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করতে চাইলেন। গসপেল অব জন ১৪ অধ্যায়ের ৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে- যিশু বা ঈসা (আ) নিজেই বলেছেন- "আমি সত্য বা জীবনের একমাত্র পথ, আমি ছাড়া আমার পিতার কাছে কেউ পৌঁছাতে পারবে না। এখানে প্রসঙ্গ ব্যতীত উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। লোকজন কোরআনের আয়াত নিয়ে দুর্নাম করতে প্রসঙ্গ ব্যতীত উদ্ধৃতি দেয়। একই ভাবে খ্রিষ্টান মিশনারীরাও প্রসঙ্গ ব্যতীত বাইবেলের উদ্ধৃতি দেয়। আপনাকে একটা সত্য কথা বলি, যদি সন্দেহ থাকে আপনারা বাইবেলটা খোলেন। গসপেল অব জন ১৪ অধ্যায়ের ১নং অনুচ্ছেদটা পড়েন। ১নং অনুচ্ছেদে আছে- ঈসা (আ) বলছে যে, তোমরা ভয় পাচ্ছ কেন? যদি তোমরা ঈশ্বরকে বিশ্বাস কর তাহলে আমাকে বিশ্বাস কর। আমার পিতার রাজ্যে অনেক ইমারত আছে। আমি সেখানে গিয়ে তোমাদের জন্য জায়গা তৈরি করবো। আমি যখন যাবো, তখন তোমাদের কথা বলবো। শিষ্যরা বললো আপনি কোথায় যাবেন? তোমরা জান না আমি কোথায় যাব? তারা বললো, না। শিষ্যরা তখন ঈসা (আ)-কে বললো- আমাদেরকে সেই পথ দেখান। ঈসা (আ) বললেন- আমি সত্য এবং জীবনের একমাত্র পথ, আমাকে ছাড়া আমার পিতার কাছে কেউ যেতে পারবে না।
আমরা মানি যে, নবীগণ যখন এসেছিলেন প্রত্যেক নবী ছিলেন সত্য এবং জীবন দেখানোর পথ। সেই নবীর দেখানো পথ ব্যতীত কোন মানুষই আল্লাহর কাছে যেতে পারতো না। আর যিশু খ্রিষ্টের সময়ে তিনি ছিলেন সত্য এবং জীবনের একমাত্র পথ। তার শিক্ষা ব্যতীত তখন কোন মানুষই আল্লাহর কাছে যেতে পারতো না। মুসা (আঃ) নবীর সময়ে তিনিই ছিলেন সত্য আর জীবনের একমাত্র পথ। তার শিক্ষা ছাড়া কোন মানুষই আল্লাহর কাছে যেতে পারত না। গসপেল অব জন এর ১৬ অধ্যায়ের ১২-১৪ অনুচ্ছেদে ঈসা (আ) বলছেন- আমি তোমাদের অনেক কিছু বলতে চাই। কিন্তু তোমরা এখন তা বুঝবে না। কারণ যখন সেই সত্য আত্মা আসবে এবং তোমাদের সত্যের পথে নিয়ে যাবে। সে তার নিজের কথা বলবে না, সে যা শুনবে তাই বলবে। সে তোমাদের ভবিষ্যতের কথা বলবে এবং আমাকে মহিমান্বিত করবে। আর এখন ভালো করেই দেখবেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য ও জীবনের একমাত্র পথ। তিনি মানুষকে যা শিখিয়েছেন সেগুলো ছাড়া কেউ আল্লাহর কাছে যেতে পারবে না। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশেষ আর চূড়ান্ত নবী। এখন পৃথিবীর সকল দেশের সকল মানুষের জন্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সত্য আর জীবনের একমাত্র পথ। তিনি যা শিখিয়েছেন সেগুলো ব্যতীত কেউ আল্লাহর কাছে যেতে পারবে না। আর সব ধর্মগ্রন্থই এমন কথাই বলছে।
প্রশ্ন: আমি এল রবি শংকর শ্রীধর। বর্তমানে বিইদি কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে আছি। আমি অন্য ধর্মগ্রন্থগুলোও পড়েছি। এছাড়া আমি নামাজ পড়ার নিয়মও শিখেছি। একটা হাদীসে বলা আছে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সিরিয়ানকে বলেছেন যে, ধর্ম বদলানোর দরকার নেই। আর তুমি কালিমাও বলো না। তখন প্রয়োজন ছিল। তবে এখন দেখি যে পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। আমাদের সমাজ ও সামাজিক অবস্থান বদলেছে। আরেকটা ব্যাপার জানতে চাচ্ছি যে কেউ ইসলাম পালন করতে চাইলে কোন ছাড় দেয়া আছে কি। আমরা জানি ইসলাম ধর্মের কিছু ব্যাপার ফিজিক্সের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন বিজ্ঞানী ক্যাপ্না আর স্টিফেন হকিং, যেমন সময় ও বিশ্ব জগত কিভাবে সৃষ্টি হলো। এখন আনাল হক বা আমিই খোদা, এ ধরনের কোন ধারণার স্থান আছে? পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লাম, ধর্ম মানলাম, এরপর আমরা অন্য সময় কি বলতে পারি যে, আনাল হক?"
উত্তর: আমি জানি না আপনি কোন হাদীসে পেয়েছেন। একটি হাদীস বলছে যে, জোরে আল্লাহু আকবার বোল না। এটা বলা হয়েছিল কারণ তখন যুদ্ধ চলছিল যুদ্ধের সময় তারা লুকিয়ে আছে। জোরে আল্লাহু আকবার বললে শত্রুরা তাদের অবস্থান জেনে যাবে। আরেকটা হাদীস বলছে জোরে বল যাতে অন্যান্য মুসলিমরা উৎসাহিত হয়। তাই পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। নবীজি একবার যুদ্ধের ময়দানে বলেছেন- উচ্চস্বরে বল আল্লাহু আকবার। এতে মুসলিমদের সাহস বাড়বে। কিন্তু অন্য সময়ে যখন লুকিয়ে আছেন, তখন শত্রুরা টের পাবে। তাই এক এক পরিস্থিতিতে একেক রকম সমাধান।
এখন ইসলামের পাশাপাশি অন্য কিছু মানা যাবে কি না? যেমন সক্রেটিস, বা অন্য কোন বিজ্ঞানীর কথা। এছাড়াও "আনাল হক"। ইসলামের পাশাপাশি অন্য ব্যাপারে যদি বলি- সেগুলো কোরআন এবং হাদীসের বিরুদ্ধে না গেলে তাহলে কোন সমস্যা নেই। কোরআন হাদীসের সাথে মিলে গেলে সেটা মানতে হবে। সেটা যে বিষয়ই হোক ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, হিন্দুইজম বা যে কোন কিছু। যদি সে কথাটার উল্লেখ কোরআনে না থাকে আর কোরআনের বিরুদ্ধে না যায় তবে সেটা মানা না মানা ঐচ্ছিক। কিন্তু যদি কোরআনের বিরুদ্ধে যায় তবে সেটা হারাম বা নিষিদ্ধ। তারপর আপনি বললেন, ইসলাম ‘আনাল হকে’ বিশ্বাস করে কি না? আনাল হক বা নিজেকে আল্লাহ দাবী করা এটা প্রকাশ্য শিরক। এটা তৌহিদের পরিপণ্ক্ষি। এটা বলতে পারেন না যে, আপনি তৌহিদ মানেন আবার একাধিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। দুটোই আসলে বিপরীত। যদি কেউ নিজেকে মনে করে যে, সে আল্লাহর একটা অংশ, তবে সে তৌহিদ মানতে পারে না এবং মুসলিম নয়। কিন্তু অন্য ব্যাপার কোরআনের সাথে মিললে সমস্যা নেই; কোরআনের বিরুদ্ধে না গেলে সমস্যা নেই।
প্রশ্ন: আমি নিলীমা, একজন শিক্ষিকা। এছাড়াও ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের ওপর গবেষণা করি। আপনার আলোচনার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে আমি কিছু ব্যাপারে একটু জানতে চাই। যেমন আপনি ভবিষ্যত পুরানের কথা বললেন, তৃতীয় খন্ডের তৃতীয় অধ্যায়ের ৫-৮ শ্লোকে, (আমি আরেকটা ব্যাপার জানিয়ে রাখি যে, হয়ত আপনিও জানেন, ঈশ্বর যে নবীকে পৃথিবীতে পাঠান সে নবী তার উদ্দেশ্যে বলা ভবিষ্যদ্বাণীগুলো পূরণ করবেন। যদি সে নবী অর্ধেক বা তার কম ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ করেন তাহলে তাকে নবী বলা যাবে না। এটা একটা সাধারণ যুক্তির ব্যাপার।) আপনি যে ম্লেচ্ছ নেতার কথা বললেন আর বললেন তিনি নবী মুহাম্মদ ছাড়া আর কেউ নন। আমি আপনার কথার প্রথম অংশটা মেনে নিচ্ছি; কিন্তু পরের অংশটা ব্যাখ্যা করেননি। আমার জানা মতে, ম্লেচ্ছ একটা সংস্কৃত শব্দ। আর সংস্কৃত অভিধান অনুযায়ী ম্লেচ্ছ শব্দটার অর্থ অনার্য, পাপী অথবা খারাপ লোক। তাহলে বলবেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিল পাপী অথবা খারাপ লোক? আরেকটা ব্যাপার হল-এ ভবিষ্যত বাণীর দ্বিতীয় শর্ত হল তিনি একটা মরুস্থলে জন্মাবেন। ‘মরুস্থল’ এর অর্থ মৃতদের স্থান। কারণ মরু শব্দটা এসেছে সংস্কৃত মু থেকে। যার অর্থ মৃত্যু। তাই এখানে অবশ্যই আরবের মরুভূমির কথা বলা হচ্ছে না। কারণ সেটা ছিল অনূর্বর ভূমি। আর যুদ্ধক্ষেত্র। এ ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছে যে, এ ম্লেচ্ছ নেতা পঞ্চগাভিয়া আর গঙ্গা নদীতে গোসল করেন। আর আমরা সবাই জানি যে, গঙ্গা নদী আরবে নয়। এবার পঞ্চগাভিয়ায় গোসল করা সম্পর্ক বলি। পঞ্চগাভিয়া হলো গরু থেকে প্রাপ্ত পাঁচটা উপাদান। উপাদানগুলো হল, দুধ, দই, ঘি, প্রস্রাব আর গোবর। এখন ভবিষ্যত বাণীটাকে সত্যি হতে হলে এ কথাটাকে সত্যি হতে হবে। আপনি কি আমাকে দেখাতে পারেন যে, কোরআনের কোথাও উল্লেখ আছে যে, মোহাম্মদ গোসল করেছিল গঙ্গা নদীতে বা পঞ্চগাভিয়া দিয়ে? প্রমাণ দিলে আজকেই ইসলাম গ্রহণ করবো।
উত্তর: আমি আপনার সাথে একমত। যে ভবিষ্যদ্বাণীর অর্ধেকের সঠিক না হয় সেটা ভুল। আমি আপনার তিনটা প্রশ্নের উত্তর দিবো, দেখা যাক আপনি ইসলাম গ্রহণ করেন কিনা। এটাও হতে পারে যে, আপনি আমার সাথে একমত হবেন না। ম্লেচ্ছ শব্দটার তিনটা অর্থ আছে, এর একটা অর্থ অনার্য বা বিদেশী, আরেকটা অর্থ পাপী, আরেকটা হলো খারাপ লোক। খেয়াল করবেন ইন্ডিয়ায় হিন্দুরা মুসলমানদের সাধারণত ম্লেচ্ছ বলে থাকে। তারা আসলে বোঝায় মুসলমানরা পাপী আর খারাপ লোক। কিন্তু এর আরেকটা অর্থ হলো বিদেশী। একটি শব্দের যদি অনেক অর্থ থাকে, মনে করুন একটা শব্দের চারটি অর্থ আছে, ব্যাপারটা এরকম না যে এখানে তিনটা অর্থ খাটে। মাত্র একটা ঠিক হলেও অর্থ সঠিক হতে পারে। যেমন কোরআন বলছে, তোমরা শুকর খেয়ো না। দেখবেন অভিধানে এই শুকর শব্দটার একটা অর্থ হলো পুলিশ। তাহলে একটা অর্থ শুকর আরেকটা অর্থ পুলিশ। তবে কোরআন, বাইবেল এটা বুঝয়নি। বাইবেলের বুক অব লেভিটিকাস ১১ অধ্যায় ৭-৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বুক অব ডিউটোরনমী ১৪ অধ্যায়ের ৮ অনুচ্ছেদ, বুক অব আইজা এর ৬৫ অধ্যায়ের ২-৫ অনুচ্ছেদে আছে যে, তোমরা শুকর খেয়ো না। বাইবেল কিন্তু পুলিশকে বুঝায় নি। যদি আপনি বিভিন্ন ধর্মের ছাত্রী হন তবে বুঝবেন কোন শব্দের ১০টা অর্থ থাকলেও সেখানে ১টা অর্থ খাটলেও দেখতে হবে সেটা সঠিক কিনা। ২টা সঠিক হতে পারে, ৩টি সঠিক হতে পারে, সবগুলোই সঠিক হতে পারে। কিন্তু যদি একটা অর্থও মিলে যায়, এতে ভবিষ্যদ্বাণীটা ফলে যেতে পারে। আমি আপনার সাথে একমত যে, ম্লেচ্ছ এর একটা অর্থ অনার্য। ইন্ডিয়ানদের দিক থেকে বিদেশী। আর আমি আমার আলোচনায় বলেছিলাম ম্লেচ্ছ শব্দের অর্থ বিদেশী। আর আপনি ভুল পথে গিয়ে বলছেন ম্লেচ্ছ মানে পাপী। আপনি আসলে ভুল বুঝেছেন। যদি আপনি বলেন কোরআন আর বাইবেল বলছে পুলিশদের খেয়ো না তাহলে আপনি বিভিন্ন ধর্মের ওপর ছাত্রী নন। আপনি তাহলে একপেশে।
আরেকটা বলেছেন মরুস্থল। আমিও একমত এর একটা অর্থ মৃতদের স্থান। তবে সংস্কৃতিতে মরুস্থল শব্দের আরেকটা অর্থ হলো বালিময় স্থান। আমি এটা মানছি যে, এর অর্থ হচ্ছে মৃতদের স্থান এবং বালিময় স্থান। কিন্তু ভুল অর্থ করছেন কেন? ভুল অর্থ নিলে তো আপনি ভুল পথে চলে যাবেন। যদি Permutation আর Combination দেখেন অন্য যে পয়েন্টগুলো বলেছি সেগুলো পুরোপুরি সঠিক। এখানে আপনাকে সঠিক অর্থটা বেছে নিতে হবে।
এবার আপনার তৃতীয় প্রশ্নে আসা যাক। আশা করি আপনি আজ ইসলাম গ্রহণ করবেন। যে ভবিষ্যদ্বাণীটা আছে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পঞ্চগর্ভে গঙ্গা নদীতে গোসল করেছিলেন। এখানে বুঝে নিতে হবে যে হিন্দুদের রীতি মতো যে কেউ গঙ্গায় বা পঞ্চগর্ভে গোসল করলে সে বিশুদ্ধ হবে। এর একটা অর্থ শারীরিকভাবে গঙ্গায় ডুব দিলেন। আমারো মনে হয় না যে, নবীজি (স) ইন্ডিয়ায় এসে গঙ্গায় গোসল করেছেন। এর আরেকটা অর্থ বিশুদ্ধ হওয়া। তখন এটা ব্যাখ্যা করিনি কারণ আলোচনা অনেক লম্বা ছিল। এখানে পঞ্চগর্ভে গোসল করা মানে হলো বিশুদ্ধ হওয়া। এখানে প্রসঙ্গটা বুঝতে হবে। শারীরিকভাবে গোসল বোঝানো হয়নি। আর আপনি গঙ্গার পানিতে গোসল করলেই বিশুদ্ধ হয়ে যাবেন এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। বিশুদ্ধ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। এটা হচ্ছে হিন্দুদের একটা মত। তাই বলা হয়েছে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পঞ্চগর্ভে গোসল করেছিলেন। তার মানে এ না যে তিনি এখানে এসে ছিলেন। এর মানে হলো আল্লাহ তাকে বিশুদ্ধ করেছিলেন। আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহর সব নবীই হোক ইব্রাহিম মুসা বা ঈসা, তারা সকলেই ছিলেন মানুষ। তারা ছিলেন নিষ্পাপ, ছিলেন বিশুদ্ধ। অর্থাৎ আল্লাহ যাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তারা সকলেই নিষ্পাপ, মাসুম ও বিশুদ্ধ। তাহলে আপনি আপনার উত্তরটাও পেলেন। আশা করি আপনি ইসলাম গ্রহণ করবেন বোন।
প্রশ্নঃ আমি প্রেম আদভানি। আমি নয়া দিল্লি থেকে এসেছি। রিটায়ার্ড চাকুরিজীবি আর অমুসলিম। আমার প্রশ্ন হলো- ইসলামের ইতিহাস খুব গৌরবের। বর্তমানেও ইসলাম মাথা উঁচু করে থাকার কথা ছিল। আমার মনে হয় মুসলিমদের কাজ কর্মের মধ্যে স্বচ্ছতা থাকা আবশ্যক। অন্যদের জানতে দেওয়া উচিত যে তারা মাদ্রাসা, মসজিদ ইত্যাদি জায়াগায়, কি কি কাজ করেছে? যাতে করে মানুষ জানতে পারে যে, এসব জায়গায় কী হচ্ছে। তখন ব্যাপারটা অনেক স্বচ্ছ হবে। কেউ তখন আর ভুল বুঝবে না।
উত্তর: ভাই আপনি খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন; তবে আপনার প্রশ্নের জবাব দেয়ার পূর্বে আগের বোন যে প্রশ্ন করেছেন সে ব্যাপারে কিছু বলে নিই। এখানে আমার মেয়ে রুশদা নায়েকের গানের কথাগুলো মনে পড়ল। শেষ যে গানটা, talk to me about Muhammad (Sm), আর Co-ordinator বলেছিলেন গানের কথাগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। আপনারা যদি কথাগুলো শুনে থাকেন, এটা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি সীরাত বা গুণ। একদিন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেটে যাচ্ছিলেন পথে এক পথচারীদের সঙ্গে তার দেখা হল। সে যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে কথা বলছে তা সে জানে না। সে নবীজি সম্পর্কে বলতে লাগলো যে, "এই নবী মুহাম্মদ, তার সঙ্গে কথা বলো না, সে খুবই খারাপ লোক। তার সাথে কথা বলো না, তার কথা শুন না। শুনলে বিপর্যয় হয়ে যাবে।" গানটাতে এ কথাগুলোই বলা হয়েছিলো। লোকটা নবীজিকে বললো তবে আপনি খুব ভাল মানুষ। আর আপনাকে সাবধান করছি ওই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটার কথা শুনবেন না। সে ভন্ড (নাউজুবিল্লাহ), সে খুব খারাপ মানুষ (নাউজুবিল্লাহ)। এরপর নবীজিকে জিজ্ঞেস করলো আপনার নামটা জানতে পারি? রাসূল নিজের পরিচয় দিলেন নাম শুনে সে বলল, কি? আপনি কি বললেন? আমি কি ঠিক শুনছি? আপনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যখনই সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে পারলো তখনই সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো। তাই আমার প্রিয় বোন, উনি একটু আগে যখন প্রশ্নগুলো করেছিলেন, তখন আমার মেয়ের গানের কথাগুলো মনে পড়েছিল।
ভাই আপনি খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন আর বললেন যে, ইসলামের অতীত ইতিহাস খুবই গৌরবের। তারপর বলছেন যে স্বচ্ছতা থাকার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে মাদ্রাসাগুলোতে। কে এর আপত্তি জানাবে? আমি একমত ভাই। আমি সম্পূর্ণ একমত। কে বলছে যে, এতে স্বচ্ছতা থাকবে না? শুধু স্বচ্ছতাই নয়, আমি চাই অমুসলিম ছাত্র-ছাত্রীরাও মাদ্রাসায় লেখাপড়া করুক। আমি এটাও জানি যে আপনি এখানে মিডিয়ার কথাগুলো বলছেন। মিডিয়া বলছে মাদ্রাসা হলো সন্ত্রাসবাদের আস্তানা। মিডিয়া বলছে, আপনি না। মাদ্রাসা আরবী শব্দটার অর্থ যেখানে শিক্ষা দেয়া হয়। অনেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত। স্কুল বলতে পারেন, কলেজ বলতে পারেন, ইউনিভার্সিটিও বলতে পারেন। তবে মিডিয়া মাদ্রাসাগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যে যদি কোন মাদ্রাসায় যান, আপনি সন্ত্রাসী হয়ে যাবেন। মিডিয়া বলে, আপনি না। একটা প্রশ্ন করি, এ পৃথিবীর ইতিহাসে যে লোকটা সবচেয়ে বেশী মানুষ হত্যা করেছে সে কোন মাদ্রাসার? তারপর মাফিয়া, পৃথিবী জুড়ে যারা চোরাচালান করে, এ স্মাগলারদের যারা জেলে যায়, তাদের কতজন মাদ্রাসায় পড়েছে? থাকতে পারে, খুব কম। বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয় পড়েছে কোন, আধুনিক, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। তাহলে কি বলবেন স্কুল বন্ধ দাও? এটা কি বলবো যে, আজকে থেকে স্কুল কলেজ বন্ধ? বি এ, বিএসসি, বি, কম পড়া বন্ধ? না, কারণ আমিও তো স্কুলে পড়াশোনা করেছি। স্কুলে শেখানো হয় না যে ডাকাতি করবেন, চোরাচালানি করবেন, দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। এ লোকগুলো স্কুলে পড়শোনা করেছে, কিন্তু তারা স্কুলগুলোর হাতে গোনা কিছু কুলাঙ্গার, আর হিটলারও আধুনিক শিক্ষা পেয়েছিলো, আমি নিশ্চিত যে, তার স্কুল তাকে শেখায়নি যে, তুমি ৬০ লক্ষ ইহুদী হত্যা কর। তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে, এরা কুলাঙ্গার। এ দেশে প্রতি বছর হাজার-হাজার ছাত্র মাদ্রাসা থেকে পাশ করে বের হয়। নাদভা থেকে, দেওবন্দ থেকে। হাজার হাজার ছাত্র। আপনি কি বলবেন এরা সবাই মানুষ হত্যা করছে? মোটেই তা নয়। মিডিয়া ব্যাপারটা এভাবে তুলে ধরছে। গত বছর বা তার আগের বছর সরকার নাদভা মাদ্রাসায় গিয়েছিল। তারা মাদ্রাসায় গিয়ে একটি সার্চ ওয়ারেন্ট বের করে বলল। চেক করবে। আর আলী মিয়া নাদভী (র) বললেন, ঠিক আছে, আপনারা চেক করেন। তারা সেখানে কিছুই পায়নি। হঠাৎ করে একবার, লাখে একবার, হাজার বারের মধ্যে একবার, কোটি বারের মধ্যে একবার এমন হতে পারে যে মাদ্রাসা থেকে পাশ করে কেউ বিপথে গেছে; তার মানে এই না মাদ্রাসা সন্ত্রাস শেখায়। বরং দেখবেন যারা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, তারাই তুলনামূলক বেশী অপরাধ করে। আপনি যদি স্বচ্ছতার কথা বলেন, আমিও একমত। কোন মাদ্রাসায় একথা বলবে না যে, আপনারা এখানে চেক করবেন না। আমাদের মাদ্রাসাগুলো উন্মুক্ত। মুসলমাদের স্কুলগুলোও উন্মুক্ত। আমাদের স্কুলে আমরা বিভিন্ন ধর্মের ওপর শিক্ষা দিই। আমার স্কুলের ছাত্ররা সাধারণ হিন্দুত্বের চাইতে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে অনেক বেশী জানে, সাধারণ খ্রিষ্টানদের চাইতে খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে বেশী জানে, সাধারণ মুসলমানের চাইতেও মুসলিম ধর্ম সম্পর্কে বেশি জানে। কারণ এখানে সব ধর্মের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। তাহলে ভাই আপনি যদি স্বচ্ছতার কথা বলেন, আপনার সাথে আমি একমত। আমি আপনার সঙ্গে আছি। একথা আপনাকে কেউ বলবে না, আমাদের পরীক্ষা করতে পাবেন না। আসেন, তবে নিন্দা করবেন না। নেগেটিভ মন নিয়ে আসবেন না, খোলা মনে আসেন, কে জানে আল্লাহ হয়ত আপনাকে হেদায়াত করবেন।
প্রশ্নঃ আমি স্বচ্ছতা বলতে বুঝাতে চাচ্ছি যে, অমুসলিমরা এখানে এসে নিজের চোখে দেখে যাবে কি হচ্ছে। যাতে তাদের মনে কোন সন্দেহ না থাকে যে, মাদ্রাসায় খারাপ কাজ হচ্ছে, সন্ত্রাসী বানানো হচ্ছে।
উত্তর: ভাই খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন। মাদ্রাসাগুলোকে স্বচ্ছ বানাবো যাতে অমুসলিমরা এসে এখানে পড়তে পারে। ভাই, প্রথমে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি আপনাকে, আপনার ছেলে-মেয়েকে। আইআরএফ-এ আসেন। আমি আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আর ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের একটা লাইব্রেরী আছে। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের উপর সংগ্রহের দিক থেকে ইন্ডিয়ার প্রথম শ্রেণীর লাইব্রেরীগুলোর একটি। আমাদের লাইব্রেরীতে দু'শোরও বেশী আলাদা আলাদা বাইবেল আছে। বাইবেলের পঞ্চাশটা সংস্করণ আছে। শুধু ভগবত গীতার অনুবাদই আছে পঞ্চাশটা। বেদের অনেকগুলো অনুবাদও রয়েছে। ঋগবেদ, অথর্ববেদ, যজুর্বেদ আছে, হয়ত সরকারি লাইব্রেরীতেও এতগুলো পাবেন না। হতে পারে আপনার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরীতেও এতগুলো পাবেন না, আমরা উৎসাহ দেই পড়েন, আর সত্যের পথে আসেন। আর অন্যদের কথা বাদ দেন। আমি আমন্ত্রণ জানাচ্ছি আপনাকে, আপনার ছেলে-মেয়েদের। আপনাদের প্লেনের টিকিটও দেব ফ্রি। IRF-এ আপনাকে আমরা স্বাগত জানাবো, তাহলে সত্যটা জানতে পারবো একসাথে ইনশা আল্লাহ।
প্রশ্ন: ডা. জাকির নায়েক। আমার নাম ভেঙ্কাটামা। আমি গত কয়েক বছর ধরে এক মুসলিম মহিলার সাথে আছি। আমার প্রশ্ন, সবাই বলে কোন ধর্মই খারাপ কথা বলে না। কিন্তু মুসলিমরা কেন অন্য ধর্মের লোকদের ইসলাম গ্রহণ করতে বলে?
উত্তর: বোন আপনি বললেন যে, আপনি একটা মুসলিম পরিবারের সঙ্গে থাকেন অনেক বছর ধরে। তারপর বললেন যে, সকল ধর্মেই ভালো কথা থাকে, কিন্তু মুসলমানরা আমাকে ইসলাম গ্রহণ করতে বলে কেন? প্রথমত: অন্য ধর্মগুলো যেসব কথা বলে তার বেশিরভাগ ভালো। তবে ইসলাম ধর্ম ভাল কথার পাশাপাশি আপনাকে দেখাবে কীভাবে সে ভালোটা অর্জন করতে হয়। আমি উদাহরণ দেখিয়েছি। যেমন সকল ধর্মে বলে চুরি কোরো না চুরি করা পাপ। ইসলামও একই কথা বলে। তবে ইসলাম আপনাকে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে সেই অবস্থানে যাবেন যেখানে কেউ চুরি করে না। ইসলাম বলছে যাকাত দেন, সাহায্য করেন। এরপর কেউ চুরি করলে তার হাত কেটে দেন। তাহলে চুরি বন্ধ হয়ে যাবে। কোন অপরাধ থাকবে না। এজন্যই আমি বলেছিলাম যে, ইসলাম ভাল কথার পাশাপাশি আপনাকে পথ দেখাবে কিভাবে সেটা অর্জন করতে হয়।
দ্বিতীয়ত : আমি বিভিন্ন ধর্মের একজন ছাত্র হিসেবে বলছি- যদি আপনি একজন ভাল হিন্দু হন, হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো মেনে চলেন, আপনাদের ধর্মগ্রন্থগুলোই বলছে ঈশ্বর মাত্র একজন। আপনাদের ধর্মগ্রন্থই বলছে মূর্তি পূজা করবে না। ভগবত গীতার ৭ অধ্যায়ের ২০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- জাগতিক আকাঙ্ক্ষা যাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে তারাই নকল ঈশ্বরের পূজা করে, তারা মূর্তি পূজা করে। এক ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখতে হবে। আজকে আমার বক্তব্যে বলেছিলাম বিশ্বাস করতে হবে অন্তিম ঋষিকে। কলিক অবতারকে। যার বাবার নাম হবে বিষ্ণুইয়াস- আব্দুল্লাহ, যার মাতার নাম হবে সুমতি-আমেনা। তিনি জন্ম নিবেন সাম্বালা নামক গ্রামে- মক্কা, তিনি জন্ম নিবেন সাম্বালা শহরের প্রধানের ঘরে- মক্কার প্রধানের ঘরে। তিনি হবেন পুরো মানব জাতির পথ প্রদর্শক, তিনি আলোকপ্রাপ্ত হবেন রাতের বেলায়, হেরা গুহায়। তিনি উত্তর দিকে গিয়ে আবার ফিরে আসবেন। ঈশ্বর তাকে আটটা গুণে গুণান্বিত করবেন। তিনি একটা ঘোড়ায় চড়বেন, ডান হাতে থাকবে তরবারী, চারজন সহচর থাকবে তার। তাকে বিভিন্ন সময়ে ফেরেশতাগণ সাহায্য করবেন, এরকম আরো অনেক অনেক গুণ। যদি ভালো হিন্দু হন তাহলে আপনি এ অন্তিম ঋষিকে বিশ্বাস করতে হবে। তা নাহলে আপনি ভালো হিন্দু নন। যদি ভালো হিন্দু হয়ে থাকেন তাহলে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখবেন, আপনি মূর্তি পূজা করবেন না। মহান ঈশ্বরের কোন প্রতিমূর্তি নেই, ফটোগ্রাফ নেই, কোন ভাস্কর্য নেই। আমি বিতর্ক করেছি পণ্ডিতদের সাথে। হিন্দু পন্ডিত শংকরাচার্য। সেখানে আমি এ কথা বলেছি। কোন শংকরাচার্য আমাকে বলেন নি ভাই আপনি ভুল বলেছেন, কেউ না। একটা বিতর্ক করেছিলাম শ্রী শ্রী রবিশংকরের সাথে ২১ জানুয়ারী। তিনি ভারতের হিন্দুদের মাঝে খুবই জনপ্রিয়। আর্ট অব লিভিং বিষয়ে। আমি তাকে বলেছিলাম আর্ট অব লিভিং এর শ্রেষ্ট বই হলো এই পবিত্র কোরআন। আমি তাকে মুসলিমদের এই আর্ট অব লিভিংয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। আমরা মুসলমানরা সংখ্যায় এখন একশ তিরিশ কোটি। আমি তাকে বলেছিলাম, যদি তিনি ধর্মগ্রন্থগুলো মানেন, (তিনি বেদের উপরে একজন বিশেষজ্ঞ, তাকে এটা মানতেই হবে) তবে আমাদের সাথে আসুন একইভাবে বোন আপনাকে বুঝতে হবে, অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলো হয়ত আল্লাহর বাণী। কিন্তু সময় বদলানোর সাথে সাথে সেগুলোও সম্পূর্ণ বদলে গেছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন বেদের ৯৯ ভাগই হারিয়ে গেছে। বাকী যে এক ভাগ আছে সেটা আমাদের কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। কঠোরভাবে মানলে, অন্তিম ঋষিকেও মানতে হবে। তাহলে কঠোরভাবে মানলে আপনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেও মানবেন, কোরআনকেও মানবেন। আর আমি আপনাকে এই শান্তির ধর্মে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। যাতে আপনি আল্লাহর কাছাকাছি আসতে পারেন।
প্রশ্ন: আমি অ্যান্থনি, দর্শনের একজন ছাত্র। আপনার বক্তব্য থেকে আজকে শিখলাম যে, সব ধর্মই একই কথা বলে। এমনকি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও। কিন্তু পবিত্র কোরআন কোন দিক থেকে আলাদা? কোরআন এমনকি বলছে যেটা অন্য ধর্মে বলা নেই? যেমন ধরেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার কথা সব ধর্মের বইতেই তো বলা হয়েছে।
উত্তর: ভাই খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন। আপনি বললেন যেটা কমন সেটা মেনে চলতে। সব ধর্মই বলে মুহাম্মদের (স) কথা আর কোরআনও ঠিক একই কথা বলে। কিন্তু এখানে নতুন কি আছে? অন্য সব ধর্ম বলে যে, পরবর্তীতে একজন নবী পৃথিবীতে আসবেন আর বাইবেলও তাই বলছে। সম্ভবত আপনি বাইবেল পড়েছেন। গসপেল অব জন ১৬ নং অধ্যায়ের ১২-১৪ অনুচ্ছেদে আছে, ঈসা (আ) তাঁর শিষ্যদের বলছেন, আমি তোমাদের অনেক কথা বলতে চাই, কিন্তু তোমরা এখন তা বুঝতে পারবে না। কারণ যখন সত্য আত্মা তোমাদের সামনে আসবে সে তোমাদের সত্যের পথে নিয়ে যাবে। সে তার নিজের কথা বলবে না, যা ঈশ্বরের থেকে তা শুনবে সে তাই বলবে। সে তোমাদের ভবিষ্যতের কথা বলবে, সে আমাকে মহিমান্বিত করবে।" তার মানে সব ধর্মগ্রন্থই বলছে একজন নবী পৃথিবীতে আসবেন। কিন্তু কোরআন এখানে আলাদা কোরআন বলছে ইনিই সেই নবী যার উপর কোরআন নাজিল হয়েছে। সেই নবী চলে এসেছেন। যখন আপনি ক্লাস ওয়ানে পড়ছেন আপনার লক্ষ্য স্কুলের সবার উপরের ক্লাশ টেন। আর টু’তে উঠলেন তখনো লক্ষ্য ক্লাশ টেন। এভাবে ক্লাশ নাইন পর্যন্ত আপনার লক্ষ্য ক্লাস টেনই। যখন ক্লাশ টেনে উঠবেন, এসএসসি পরীক্ষা দেবেন; ঠিক? তার মানে এই না যে, ক্লাশ ওয়ান আর ক্লাশ টেনের পড়া এক। আপনি ক্লাস টেনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। চৌদ্দশ’ বছর আগে আল্লাহ এ নবীকে পাঠিয়েছেন। কারণ যিশু খ্রিষ্ট বলেছেন- আমি তোমাদের এমন কিছু কথা বলতে চাই, কিন্তু তোমরা এখন তা বুঝতে পারবে না। কারণ সত্যের আত্মা যখন আসবে, তোমাদের কে সঠিক পথে নিয়ে যাবে। তাহলে আল্লাহ বুঝেছিলেন চৌদ্দশ’ বছর আগে সেটাই সঠিক সময়। এখন পৃথিবীর মানুষ এ কথাগুলো বুঝতে পারবে। অর্থাৎ পবিত্র কোরআন। অন্যান্য সব ধর্মে বলা হয়েছে যে, মহান ঈশ্বর একজন, বর্ণনাগুলো হয়ত আলাদা; কিন্তু সব ধর্মই এক স্রষ্টার কথা বলছে। আমরা মানবো নবীদের আর চূড়ান্ত নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। সারমর্ম একই, কথাগুলো হয়ত আলাদা। পবিত্র কোরআনের সূরা মায়িদা ৩নং আয়াতে বলা হয়েছে- "আজ এই দিনে আমি তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করলাম, ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, পুরো মানুষ জাতির জন্য।" পবিত্র কোরআন নাযিল হওয়ার পর নতুন কিছু যোগ করা যাবে না, কোন কিছু বাদ দেয়া যাবে না। আপনারা তো বলেন ওল্ড টেস্টামেন্ট, নিউ টেস্টামেন্ট, কিন্তু পবিত্র কোরআন হলো লাস্ট এন্ড ফাইনাল টেস্টামেন্ট। তাহলে সারমর্ম হলো এই পবিত্র কোরআন হলো আল্লাহর নাযিলকৃত লাস্ট টেস্টামেন্ট শেষ কিতাব। অন্য সব ধর্মগ্রন্থগুলো বলছে একটা বইয়ের কথা, সেটা হলো কোরআন পবিত্র কোরআন হল লাস্ট টেস্টামেন্ট। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অন্য ধর্মগ্রন্থগুলো বলে নবীজি আসবেন। আর ইসলাম আমাদের শেখায় আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন আর নবীজির হাদীসের মাধ্যমে যে, এটাই হল চূড়ান্ত ধর্ম। সমগ্র মানব জাতির জন্য, একেবারে আদম (আ) থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এখনো আছে শেষ দিন পর্যন্ত থাকবে। সব ধর্মই বলছে এক ঈশ্বরের কথা, বলছে যে শেষ নবী আসবেন। আপনাকে এটা মানতে হবে। এটা মানতে হবে প্রয়োগ করতে হবে তাহলে সত্যিকারের খ্রিস্টান হতে পারবেন। এজন্য আমি বলি, যে আমরা মুসলিমরা খ্রীস্টানদের চাইতেও অনেক বেশী খ্রিস্টান। আমরা যিশু খ্রীষ্টকে সাধারণ খ্রীষ্টানদের চাইতে অনেক বেশী মানি।
প্রশ্নঃ আমি লক্ষ্মী আইয়ার। আমি হিন্দু তবে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করি। আমি ইসলাম বিশ্বাস করি কারণ আমি সে রকম কিছু প্রমাণ পেয়েছি। আপনি বললেন আল্লাহ এক, ধর্মও এক। এখন উদাহরণ দেই তিনজন মানুষের কথা বলি একজন মুসলিম, একজন হিন্দু ও একজন খ্রিষ্টান। এখন তাদের শরীর যদি কেটে ফেলা হয়, সেখানে আপনি কী দেখতে পাবেন? শুধুই রক্তই পাবেন। দুধ পাবেন না, পানি পাবেন না অন্য কিছু না। এখন সব মানুষের শরীরে যদি একই রক্ত থাকে তাহলে মৃতদেহ সৎকারের নিয়মটা আলাদা কেন? মুসলমানরা কবর দেয় আর আমরা হিন্দুরা মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলি।
উত্তর: বোন জানালেন আপনি ইসলাম ধর্ম পছন্দ করেন, এজন্য আপনাকে অভিনন্দন আর এই শান্তির ধর্মে। সত্যের পথে আপনাকে স্বাগতম। আপনি প্রশ্ন করলেন, সবার শরীরে একই রক্ত আর একই উপাদান আছে তবুও হিন্দুরা কেন পুড়িয়ে ফেলে আর মুসলিমরা কেন কবর দেয়? আসুন আমরা ভালো করে দেখি, কোনটা ভাল?
হিন্দু ধর্মে কবর দেয়ার অনুমতিও আছে, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্ক লোক মারা গেলে তারা বলেন পুড়িয়ে ফেলতে হবে। অবশ্য হিন্দুদের কেউ কেউ বলেন কবর দিতে হবে। প্রথমত: দেখুন, মৃতদেহ পোড়ালে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। মৃতদেহ পোড়ালে পরিবেশ দূষণ হয়। ইসলাম ধর্মে আমরা কবর দিই। আমরা জানি যে মাটিতে যে উপাদান আছে তার কম-বেশী আমাদের শরীরেও আছে। আমরা মাটি থেকে এসেছি, মাটিতেই ফিরে যাবো। এটা বিজ্ঞানসম্মত। দাহ করলে পরিবেশ দূষণ হয়। আর কবর দিলে মাটি উর্বর হয়। পোড়ানো হয় না বলে পরিবেশ দূষণ হয় না।
দ্বিতীয়তঃ মৃতদেহ পোড়াতে হলে আপনাকে গাছ কাটতে হবে। গাছপালা কমে যাবে। পরিবেশের বিপর্যয় হবে। ইসলাম অনুযায়ী আমরা কবর দিই, জমি উর্বর হয় আরো গাছ জন্মায়। এখানে গাছ কাটার দরকার নেই, পরিবেশের জন্যেও ভাল। আমাদের সরকার এখন বলে গাছ কাটবেন না। গাছ না কাটলে মৃতদেহগুলো পোড়াবেন কিভাবে?
তৃতীয়তঃ পোড়ালে খরচ বাড়ে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতে প্রতিদিন, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে শুধু গাছের পিছনে। ইসলাম অনুযায়ী আমরা কবর দিই, ফ্রি।
চতুর্থত: মৃতদেহ পোড়ালে গাছের কাঠ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আবার ইসলামী মতে একটা জায়গায় কাউকে কবর দিলে কয়েক বছর পর আরেক জনকে কবর দেয়া যাবে। এটা সব সময় চলবে। আপনি রিসাইকল করতে পারবেন। একই জমি মৃতদেহের হাড়গোড় আলাদা হয়ে গেলে আবার কাউকে কবর দিতে পারবেন। তাহলে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে চিন্তা করলে কবর দেয়া অনেক ভাল, এটা অনেকটা মানবিক।
প্রশ্ন: আমার নাম রামকৃষ্ণ। আমি ফিজিওথেরাপীর ছাত্র। আমার প্রশ্ন হলো আল্লাহর আদম-হাওয়ার সৃষ্টির কি প্রয়োজন ছিল? অথবা এই বিশ্বজগত সৃষ্টির কারণ কি? আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো- সবকিছুই কেউ সৃষ্টি করেছে, তাহলে ঈশ্বরের স্রষ্টা কে? আল্লাহ শব্দটার অর্থ কি?
উত্তর: ভাই তিনটা প্রশ্ন করেছেন। আল্লাহ কেন আদম হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন? বিশ্বজগত সৃষ্টির কারণ কি?
আল্লাহ আদম আর হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন যাতে করে পৃথিবীতে মানবজাতি আসতে পারে। আদম-হাওয়া আমাদের সবার পূর্বপুরুষ। পবিত্র কোরআনের সূরা হুজুরাতের ১৩ নং আয়াতে আছে- "হে মানব জাতি আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে। তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি আর গোত্রে। যেন তোমরা অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার। এজন্য নয় যে অন্যকে ঘৃণা করবে। আর যে তাকওয়াবান সে আল্লাহর কাছে সব চেয়ে মর্যাদাবান। আল্লাহ যেটার মাধ্যমে মানুষের বিচার করেন তা টাকা পয়সা নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নয়, সেটা হল তাকওয়া। সেটা হল আল্লাহকে মানা, ন্যায়পরায়ণতা, ধার্মিকতা। আদম আর হাওয়া সবারই পূর্ব পুরুষ। সেজন্য আপনাকে ভাই বলে ডেকেছি। সব মানুষ ভাই-ভাই। সূরা ইসরার ৭০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- আল্লাহ তায়ালা সব আদম সন্তানকেই মর্যাদা দিয়েছেন। হোক আপনি জন্ম নেন ভারত, আমেরিকায়, হিন্দু বা খ্রিস্টান হয়ে। আল্লাহ বলেছেন তিনি সব মানুষকেই মর্যাদা দিয়েছেন। মানুষ হয়ে জন্মালে আল্লাহ তাকে মর্যাদা দেবেন। তা হোক আপনার নাম জাকির, রহমান, শংকর, সামু। মানুষ হয়ে জন্মালেই আল্লাহ মর্যাদা দেবেন।
তখন আপনার প্রশ্নে আসি। আল্লাহ কেন মানুষ সৃষ্টি করলেন? আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন কারণ আল্লাহ বলেছেন মানুষ হল সৃষ্টির সেরা জীব। আল্লাহ অন্য যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তারা আল্লাহকে মানে। ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ যে আদেশ দেন ফেরেশতাগণ তাই পালন করেন। তাদের নিজস্ব কোন ইচ্ছা নেই। মানুষ হল আল্লাহর এমন সৃষ্টি যার নিজের ইচ্ছা আছে। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আমরা আল্লাহ তায়ালার কথা মানতে পারি নাও মানতে পারি। যদি আল্লাহর আদেশ মানি তাহলে বেহেশতে যেতে পারব, স্বর্গে যাব। যদি আদেশ না মানি তাহলে জাহান্নামে যেতে হবে। তাহলে এ জীবনটা পরকালের জন্য পরীক্ষা। সূরা মূলক এর ২নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে- "আল্লাহ জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য। "সূরা সারিয়াতের ৫৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- "আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি যেন তারা আমার ইবাদাত করে।" তাই আমাদের উচিত আল্লাহর আদেশ নিষেধগুলো মেনে চলা, পবিত্র কোরআন বলছে অন্য সকল সৃষ্টি আল্লাহর সামনে নতজানু হয়, সিজদা করে এবং আল্লাহকে মানে। কিন্তু মানুষই একমাত্র জীব যার নিজস্ব ইচ্ছা আছে। সে আল্লাহকে মানতেও পারে নাও মানতে পারে। আপনার স্বাধীন ইচ্ছা নিয়ে আল্লাহকে মানলে ফেরেশতাদের উপরে চলে যাবেন। আর আল্লাহকে না মানলে হবেন শয়তানের সহযোগী। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন পরকালের পরীক্ষার জন্য।
আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন, সবকিছুর স্রষ্টা আছে তাহলে আল্লাহকে কে বানিয়েছে? যদি কেউ বলে সব কিছুর স্রষ্টা আছে, কথাটা ঠিক নয়। সব সৃষ্ট জিনিসের স্রষ্টা আছে। আল্লাহ তায়ালার সংজ্ঞা হচ্ছে, তাকে কেউ সৃষ্টি করেনি। যখনি বলবেন কেউ আল্লাহকে বানিয়েছেন সে আল্লাহ নয়। আল্লাহ তায়ালার সংজ্ঞা হচ্ছে তিনি সৃষ্টি হননি। মনে করেন, এক লোক আপনাকে বললো, ভাই আমার বন্ধু জন হাসপাতালে ভর্তি আছে। সে একটা বাচ্চার জন্ম দিয়েছে। বলতে পারবেন এ বাচ্চাটা ছেলে না মেয়ে? বলতে পারবেন? চেষ্টা করেন। পারবেন না, কেন?
উত্তর: মেয়ে।
জাকির: ভাই পুরুষ লোক কি বাচ্চার জন্ম দিতে পারে? এখানেই আপনি ভুল করেছেন। একইভাবে ভুল করেছেন যখন বললেন কে আল্লাহকে বানিয়েছেন। যেহেতু পুরুষ লোক বাচ্চার জন্ম দিতে পারে না, তাই তার ছেলে বা মেয়ে জন্ম দেয়ায় প্রশ্নই আসে না। এখন কি আপনি বুঝতে পেরেছেন? আল্লাহর সংজ্ঞা হচ্ছে আল্লাহ সৃষ্টি হননি তিনি আদী অনন্ত। যখনই প্রশ্ন করবেন কে আল্লাহকে বানিয়েছে, সে আল্লাহ নয়। তার সমতুল্য কেউ নেই।
এবার আপনার শেষ প্রশ্নে আসি। আল্লাহর সবচেয়ে সেরা সংজ্ঞা আছে পবিত্র কোরআনের সূরা ইখলাসে। সূরা ইখলাসের ১নং থেকে চার নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- (১) "বল, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। (২) তিনি অবিনশ্বর চিরস্থায়ী। (৩) তিনি জন্ম নেননি কাউকে জন্ম দেননি। (৪) তার সমতুল্য কেউ নেই। এই হল চার লাইনের সংজ্ঞা। যদি কেউ এই চারটি শর্ত পূরণ করতে পারে তবে তাকে আল্লাহ বলে মেনে নিতে আমাদের মুসলিমদের কোন আপত্তি থাকবে না। এই যে চার লাইনের সংজ্ঞা। এটাই হল ধর্মের লিটমাস টেস্ট। আল্লাহ তায়ালার সংজ্ঞা, প্রথমত- বল তিনি এক ও অদ্বিতীয়। দ্বিতীয়ত- আল্লাহ অবিনশ্বর চিরস্থায়ী। তৃতীয়ত- তিনি জন্ম নেননি এবং জন্ম দেননি। চতুর্থত- তার সমতুল্য কেউ নেই। হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো তেও অনুরূপ কথা বলা হয়েছে। ছান্দাগ্য উপনিষদের ৬ অধ্যায়ের ২নং অনুচ্ছেদের ১নং পরিচ্ছেদে আছে ঈশ্বর মাত্র একজন, দ্বিতীয় কেউ নেই। ভগবত গীতার ১০ অধ্যায় ৩নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- "আমাকে বলা হয়, এই বিশ্ব জগতের প্রভু, জন্ম নেয়নি, তার কোন শুরু নেই।” শ্বেতাশ্বেত্র উপনিষদের ৬নং অধ্যায়ের ৯নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- "মহান ঈশ্বরের কোন বাবা নেই কোন মা নেই। শ্বেতাশ্বেত্র উপনিষদের ৪নং অধ্যায়ের ১৯ অনুচ্ছেদে এবং যজুর্বেদ ৩২ অধ্যায় ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছ- "মহান ঈশ্বরের কোন প্রতিমা নেই, ফটোগ্রাফ নেই, কোন মূর্তি নেই, কোন ভাস্কর্য নেই।"
যদি কোন লোক দাবী করে যে সে আল্লাহ এবং সে এ চারটি শর্ত পূরণ করতে পারে আমরা মুসলিমরা কোন রকম আপত্তি ব্যাতিরেকেই তাকে আল্লাহ বলে স্বীকার করব। যেমন- কিছু লোক বলে ভগবান রজনীশ ছিলেন মহান ঈশ্বর। আমি কখনই বলছি না হিন্দুরা ভগবান রজনীশকে ঈশ্বর বলে মানে, আমি বলেছি কিছু লোক তাকে ঈশ্বর বলে মানে। আসুন রজনীশকে আমরা টেস্ট করে দেখি। প্রথম টেস্ট হলো- আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তাই রজনীশ কি একমাত্র লোক যে নিজেকে ঈশ্বর দাবী করেছিলো? এরকম অনেক মানুষ ছিল আর এদেশে হাজার হাজার লোক নিজেকে ঈশ্বর দাবী করেছে। রজনীশ একমাত্র নয়। তবে রজনীশ ভক্তরা বলে, না না উনি একটু আলাদা। দ্বিতীয় টেস্ট। আল্লাহ অবিনশ্বর, চিরস্থায়ী। রজনীশ কি অবিনশ্বর, চিরস্থায়ী? তার আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, রজনীশ অ্যাজমা, ডায়াবেটিস আর পিঠের ব্যথায় ভুগছিলেন। চিন্তা করেন মহান ঈশ্বরের হয়েছে অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, পিঠের ব্যথা কত হাস্যকর। তৃতীয় টেস্ট- তিনি জন্ম নেননি, কাউকে জন্ম দেননি। রজনীশ জন্মেছিলেন মধ্য প্রদেশে। তার বাবা-মাও ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি আমেরিকায় গেলে সেখানে হাজারো আমেরিকান তার ভক্ত হয়ে গেল। তারপর আমেরিকার অরিগন প্রদেশে একটা সেন্টার বানিয়ে নাম দিলেন রজনীশ পুরম। পরবর্তীতে আমেরিকান সরকার তাকে অ্যারেস্ট করে কারাবন্দী করল। রজনীশ বলতো যে আমেরিকান সরকার তাকে স্লো পয়জনিং করেছে। চিন্তা করেন মহান ঈশ্বরকে স্লো পয়জনিং করা হয়েছে। ১৯৮৫ সালে আমেরিকান সরকার তাকে বের করে দিলে সে ভারতে এসে পুণায় আরেকটা সেন্টার খোলে নাম দিল "উশকমেয়ুন"। যদি রজনীশের সমাধির কাছে কখনো যান, দেখবেন তার সমাধির উপর লেখা আছে, ভগবান রজনীশ পোষ, কখনো জন্মাননি কখনো মরেননি, তবে পৃথিবীতে ভ্রমণ করেছেন ১৯৩১ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ৩১ জানুয়ারী পর্যন্ত। তবে তারা তার সমাধিতে এটা লিখতে ভুলে গেছে যে, পৃথিবীর ২১ টা দেশ তাকে ভিসা দেয়নি। ভেবে দেখুন মহান ঈশ্বর এ পৃথিবীতে আসলেন, বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করার জন্য, তার নাকি ভিসাও লাগে। তখন গ্রীসের আর্চবিশপ বলেছিলেন, যদি রজনীশকে এ দেশ থেকে বিতাড়িত করা না হয় তবে আগে তার ঘর পোড়াবো পরে ভক্তদের ঘর পোড়াবো।
শেষ টেস্ট- তার সমতুল্য সমকক্ষ কেউ নেই। পরীক্ষা এতই কঠিন যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউই পাশ করবে না। যখনই আল্লাহর সাথে কারো তুলনা করবেন, সে আল্লাহ নয়। এখন রজনীশের অন্য অনেক মানুষের মত মুখে দাড়ি ছিল, দুটা চোখ, নাক, দুটা হাত ছিল। যদি কেউ বলে যে আল্লাহ তায়ালা হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। আপনারা কি শোয়ার্জনিগারের নাম শুনেছেন? এ লোকের নাম কখনো শুনেছেন? এ লোক এক সময় ছিল মিষ্টার ওয়ার্ল্ড, মিষ্টার ইউনিভার্স। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী লোক। যখনই কোন কিছুকে আল্লাহর সাথে তুলনা করবেন, হোক সেটা আরনল্ড শোয়ার্জনিগার, হোক দারা সিং, হোক সেটা কিং কং। হোক সেটা হাজার গুণ বা লক্ষ গুণ শক্তিশালী। যখনই আল্লাহর সাথে পৃথিবীর কোন কিছুর তুলনা হবে- সে আল্লাহ নয়। তার সমতুল্য কেউ নেই কিছু নেই। এ হল আল্লাহর চার লাইনের সংজ্ঞা। আপনি যে ঈশ্বরের পূজা করছেন সেই ঈশ্বরকে সূরা এখলাস দিয়ে টেস্ট করুন- যদি পাশ করে তাহলে সত্যিকারের ঈশ্বর, তা না হলে নকল ঈশ্বর।
প্রশ্ন: ইসলাম ধর্মে পাপের সংজ্ঞাটা কি? পাপের প্রকারভেদ কি? আর এ পাপের সাথে হিন্দু বা খ্রিষ্টান ধর্মে যে পাপের কথা বলা হয়েছে তার পার্থক্য কি?
উত্তর: ভাই আপনি প্রশ্ন করলেন যে ইসলাম ধর্মে পাপের সংজ্ঞাটা কি? আর হিন্দু বা খ্রিষ্টান ধর্মের পাপের সাথে এ পাপের পার্থক্যটা কোথায়? এক কথায় ইসলাম ধর্মে পাপ মানে আল্লাহর আদেশ-নিষেধগুলো অমান্য করা। আল্লাহ আমাদের যা নির্দেশ দিয়েছেন, যদি তার বিরুদ্ধে যান সেটাই পাপ। যেমন- আল্লাহ বলেছেন তোমরা ইবাদত কর। যদি ইবাদত না করেন তাহলে পাপ করছেন। আল্লাহ বলেছেন তোমরা মদ খেয়ো না। যদি খান তাহলে পাপ করছেন। তাহলে আল্লাহর আদেশ অমান্য করাই পাপ। আর সব ধর্মে পাপের সংজ্ঞা এটাই। হিন্দু আর খ্রিষ্টান ধর্ম একই কথা বলছে। আশা করি উত্তরটা পেয়েছেন।
প্রশ্ন: আজকে এ অনুষ্ঠানে আসতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। আপনার এ মূল্যবান কথাগুলো সবার কাজে আসবে। আমরা আপনার কথা শুনে খুবই মুগ্ধ হয়েছি। অনেকের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেছে। আমি রামদাস। ইলেকশন বোর্ডের পার্সেস অফিসার। আমি একজন হিন্দু তারপরেও ইসলাম ধর্মকে অনেক শ্রদ্ধা, আর ভালোবাসি। আমি আপনার মতের সাথে একমত যে হিন্দু ধর্ম কখনোই মূর্তি পূজা সমর্থন করে না। আসলে আমাদের হিন্দু ধর্মকে প্রভাবিত করেছে তথাকথিত ধর্মীয় নেতারা। তারা মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। শতকরা নব্বই ভাগ হিন্দু ভুল পথে চলে যাচ্ছে। বেদ আর উপনিষদ কখনই মূর্তি পূজার কথা বলে না। যেটা বলা হয়েছে সেটা রুহ। এটার কথা বলা হয়েছে "রুহ খোদাকি এনায়েতে হ্যায়"। এ রুহকে খ্রিষ্ট ও হিন্দু ধর্মে বলা হয় আত্মা আর ইসলাম ধর্মে বলা হয় রুহ। এটা খুবই দুর্ভাগ্য যে, সব ধর্মের ধর্মীয় নেতাই মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে এবং করছে। আপনি একজন জ্ঞানী মানুষ। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন - আমার আগে এ ভদ্রলোক ঠিক কথাই বলেছিলেন যে ইসলামের অতীত ইতিহাস খুব গৌরবের। তবে বর্তমানে ইসলাম সবার কাছে একটা হাঁসির পাত্রে পরিণত হয়েছে। এর কারণ ইসলামের নেতারা ঠিক হিন্দু নেতাদের মতই তাদের অনুসারীদের ভুল বলছে। ভুল জিনিস শিখাচ্ছে। কোন হিন্দু কোন মুসলিমকে কিংবা কোন মুসলিম কোন হিন্দুকে যদি রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচায়, এখানে কি এমন হতে পারে যে, হিন্দু-মুসলিমের রক্ত নিলে সে মুসলিম হয়ে যাবে, কিংবা মুসলিম কোন হিন্দুর রক্ত নিলে সে হিন্দু হয়ে যাবে? এটা আমার প্রথম প্রশ্ন। এখানে যার জীবন বাঁচল সে তো দোয়া করবে, বলবে আসো বাবা আসো আমার জীবন বাঁচিয়েছো। এখানে তো জীবন বাঁচানোর প্রশ্ন। এখানে কি ধর্মের গুরুত্বটা বেশী। আর এখানকার লোকজন আত্মাকে চিনতে চায় না। বস্তুর চাহিদা মিটলেই তারা খুশি। ইসলাম সবাইকে ভালোবাসার কথা বলে। যদিও সব ধর্মই ভালোবাসার কথা বলে। কিন্তু ইসলাম ধর্ম সেই ভালোবাসা অর্জনের কথাও বলে। এজন্য ইসলামে যাকাত আছে যা দিয়ে গরীব ও প্রতিবেশীকে সাহায্য করা যায়। গরীবের মেয়ে বিয়ে হচ্ছে না বিয়ে দিয়ে দাও, গরীবকে সাহায্য করা। অন্য কোন ধর্মই ইসলামের মত এত মহান কিংবা উদার নয়। এটা খুবই মহান ধর্ম। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাস্তবে এর কোন প্রয়োগ হচ্ছে না। তাই আগের ভদ্রলোক বললেন মাদ্রাসাগুলো স্বচ্ছ হওয়া উচিত। সত্যি বলতে ধর্মীয় নেতাদের বোকামি ও অদূরদর্শিতার কারণে ইসলাম ধর্ম উপরে উঠছে না। বরং বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। খ্রিষ্টান ধর্ম পৃথিবীতে রাজত্ব করতে চায়, তারা ইসলামের ক্ষতি করতে চায়। ইসলামের প্রতি খ্রিষ্টানদের মনোভাব বিরূপ। হিন্দু ধর্ম এখানে ঠিক থাকতে চায়। এরাই ধর্মীয় নেতা। তারা জানে না রুহ কি? রুহ হল আল্লাহর দয়া। উপনিষদে আছে, ইসলামে আছে, বাইবেলে আছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন- হিন্দু ধর্ম নারীকে খারাপ চোখে দেখে। ইসলাম ও খ্রিষ্টান ধর্মও খারাপ চোখে দেখে। যে পুরুষকে জন্ম দিল নারী, সেই পুরুষই নারীকে ছোট করছে। সে হোক হিন্দু, খ্রিষ্টান বা মুসলিম। এভাবে দেখবেন সব ধর্মেই একই রকম অবস্থা চলছে। সব ধর্মই এখন ধ্বংসের পথে যাচ্ছে। নারীকে কোন ধর্মেই সম্মানের চোখে দেখা হয় না। সকল ধর্মই নারীকে সব সময় খারাপ চোখে দেখে। ইসলাম কি বলে? যে দিন কেয়ামত হবে তার মানে মহাপ্রলয়, ইসলাম ধর্ম কেয়ামত সম্পর্কে কি বলছে?"
উত্তর: ভাই আপনাকে ধন্যবাদ এই ছোট্ট বক্তব্যের জন্য। ভালো কথাগুলোর জন্যও ধন্যবাদ। আপনি আমার কথা, ইসলাম ধর্মের কথা বললেন। আমার কথা যদি বলেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার। বললেন আমি জানি, অনেক জানি। কিন্তু আমি নিজেকে বিভিন্ন ধর্মের উপর একজন ছাত্র মনে করি। আপনি দুটো প্রশ্ন করলেন প্রথমটা রুহ নিয়ে, এরপর নারী নিয়ে, এ ছাড়াও আপনি বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন। আপনি বললেন তথাকথিত ধর্মীয় নেতারা সমস্যার মূল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমি একমত। এ ছাড়াও আপনি বললেন যে, ইসলামের বদনাম করা হচ্ছে। ইসলামের ধর্মীয় নেতাদের কারণে এটা হচ্ছে। আমি ইসলামের ধর্মীয় নেতাদের উপর দোষ চাপাবো না। দু’একটা কুলাঙ্গার থাকতে পারে, খুবই সামান্য। হাতে গোনা কয়েকজন নেতা থাকতে পারে যারা ভুল পথে নিচ্ছে, কিন্তু এরা সংখ্যায় নগণ্য। মিডিয়া তাদের বেছে নেয় আর এমনভাবে তুলে ধরে যেন ইসলামের প্রত্যেক ধর্মীয় নেতারাই এরকম। তাই ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন নেতা, বিশেষজ্ঞ, ওলামার কথা যদি বলেন, তাদের আমি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি। হাতে গোণা কয়েকজন মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যায়, তবে সামগ্রিকভাবে তারা ভালো কথা বলেন, তারা ইসলামের কথা বলেন, আমরা তাদের ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি। অন্য ধর্মের চিত্রটা আলাদা। অন্যান্য ধর্মের অধিকাংশ ধর্মীয় নেতারা তাদের অনুসারীদের ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে দিতে নারাজ। যেমন আপনি বললেন, হিন্দু ধর্মে মূর্তি পূজার কথা বলে না কিন্তু ৯০ ভাগ হিন্দু মূর্তি পূজা করে কারণ নেতারা চায় না যে অনুসারীরা তাদের ধর্মগ্রন্থ পড়ুক।
আপনার প্রশ্নে আসি। বললেন যে, কোন হিন্দু এক মুসলিমকে রক্ত দিল, সেই মুসলিমের জীবন বাঁচল। জীবন বাঁচানোই বড় কথা, এখানে সমস্যা কি? সেই মুসলিম কি হিন্দু হয়ে যায়? বা হিন্দুকে রক্ত দিলে কি সেই হিন্দু মুসলিম হয়ে যায়? সূরা মায়িদার ৩২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
অর্থঃ "যদি কেউ কোন মানুষের জীবন বাঁচায়, তবে সে যেন সমগ্র মানব জাতিকে বাঁচালো।"
অর্থাৎ, যদি কেউ কারো জীবন বাঁচায়, মুসলিমকে হিন্দুকে রক্ত দিক বা মুসলিম রক্ত দিক, সে যেন পুরো মানব জাতিকেই বাঁচালো। একই আয়াতে আরো বলা হয়েছে, যদি কোন মানুষ কাউকে হত্যা করে আর সেটা হত্যা বা বিশৃঙ্খলা তৈরির অপরাধ না হয়, সে যেন সমগ্র মানব মানুষ জাতিকেই হত্যা করলো। কোন মানুষের জীবন বাঁচানো অত্যন্ত ভালো কাজ, উঁচুমানের কাজ, কিন্তু কারো আখেরাত বাঁচানো তার চেয়ে আরো ভালো কাজ। আমি আগে ডাক্তার ছিলাম। মনে করেছি এটাই হলো শ্রেষ্ঠ পেশা। মানুষের জীবন বাঁচানো। আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম ভেবেছিলাম একটা মহান পেশা। ঠিক তাই। তবে এর চাইতেও ভালো কাজ আছে- পবিত্র কোরআনের সূরা ফুসিলাতের ৩৩ আয়াতে উল্লেখ করা আছে- ‘কোথায় সেই লোক যে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করে। যে সৎকর্ম করে আর বলে যে, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত যে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে।" তাই একজন শরীরের ডাক্তার থেকে হয়েছি আত্মার ডাক্তার। এটা আরো ভালো পেশা। তাহলে রক্ত দিয়ে কারো জীবন বাঁচানো ভালো কথা, তবে কাউকে সত্যিটা জানানো তার আখেরাত বাঁচানো আরো ভালো কাজ। আমার কাজ হলো মানুষের কাছে ধর্ম প্রচার করা। মুসলিমদের বলি কোরআন মেনে চলুন, আর শেষ নবীকে মেনে চলুন অনুসরণ করুন। আর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানদের বলি যেটা কমন অন্তত সেটা মেনে নেন। আমাদের মাঝে যেগুলো একই রকম যেগুলো মেনে নেন। যেগুলো আলাদা সেগুলো নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। আমি বাঁচাতে চাইছি তার আখেরাতকে। আখেরাত বাঁচানো ইহকালের জীবন বাঁচানোর চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এটা জীবনটাও ভালো গুরুত্বপূর্ণ, যখন দোয়া করি দুটোর জন্যই করি। হে আল্লাহ! আমাকে ইহকাল ও পরকালে ভালো রাখো। এবং আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। তবে এ জীবনের চাইতে পরকাল অনেক উপরে। সূরা তাহরিমের ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِنْدَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ
অর্থঃ "ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়া (রা) আল্লাহর কাছে বলেছিলেন, হে আল্লাহ! আমি এ পৃথিবীর সমস্ত ধন-সম্পদের বিনিময়ে তোমার কাছে জান্নাতে একটি ঘর চাই।"
দেখুন পৃথিবীর সব চাইতে ধনী লোক, রাজা ফেরাউনের স্ত্রী তার সমস্ত সম্পদের বিনিময়ে চাচ্ছেন আখিরাত। আপনার সঙ্গে একমত, মানুষকে ভালোবাসতে হবে। মানুষের জীবন বাঁচানো খুব ভালো কাজ। তবে কারো পরকালের জীবন বাঁচানো আরো ভালো কাজ। আমি এখানে কি করছি- মানুষকে বলছি, সাদৃশ্যগুলো অন্তত মেনে চলেন, যেগুলো আলাদা সেগুলো বাদ দেন। যেমন- মূর্তি পূজা করা যাবে না, আল্লাহ কেবল একজন, অন্তিম ঋষিকে মানতে হবে। তাহলে আমরা এক হবো। কেবল নাম দিয়ে কেউ কখনো মুসলিম হয় না। আব্দুল্লাহ, জাকির, সুলতান নাম হলেই মুসলমান নয়। মুসলিম মানে যে আল্লাহর কাছে নিজের ইচ্ছাকে সমর্পণ করে। আগে এক বোনকে আমি বলেছিলাম, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করুন, আপনাকেও বলছি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করুন। আর আল্লাহ তায়ালার লাস্ট ও ফাইনাল টেস্টামেন্ট হলো পবিত্র কোরআন। এটার কথা আপনাদের ধর্মগ্রন্থে আছে, সেটার কথা মানতে হবে। বাইবেলেও আছে সেটাও মানতে হবে। আমি অনুরোধ করবো আসেন, আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি, সবাই একসাথে থাকি আর আল্লাহ তায়ালার কাছে আত্মসমর্পণ করি। মানুষ সাধারণত লেবেল জিনিসটা পছন্দ করে না। যেন লেবেলটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সূরা ইমরানের ১৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে- "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম।" যদি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেন আপনার পরকালের জীবনটা বেঁচে যাবে।
আপনি নারীদের কথা বললেন। বললেন সব ধর্মই নারীদের খারাপ চোখে দেখে। হিন্দু ধর্ম, খ্রিষ্টান ধর্ম, ইসলামের কথাও বললেন। বলেছেন, মুসলিমরাও খারাপ চোখে দেখে। মুসলিম মানে যে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে। আর সত্যিকারের মুসলমান কখনো নারীর দিকে খারাপ চোখে তাকাবে না। যদি কেউ এমনটি করে সে মুসলিম নয়। মানুষ শুধু নারীর হিজাবের কথা বলে। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে শুরুতেই বলেছেন পুরুষের হিজাবের কথা। পবিত্র কোরআনের সূরা নূরের ৩০ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَيْرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
অর্থঃ "মুমিন পুরুষদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে আর লজ্জাস্থান হেফাজত করে।"
কোন পুরুষ কোন নারীর দিকে তাকালে, তার মনে যদি কোন খারাপ চিন্তা আসে তবে সে দৃষ্টি নিচু করবে। আপনাদের বেদেও একথা আছে। ঋগবেদের ৮নং গ্রন্থের ৩৩ অনুচ্ছেদের ১৯ নং মন্ত্রে বলা হয়েছে- "ব্রাহ্ম তোমাদের নারী করে বানিয়েছেন। সুতরাং দৃষ্টি নিচু রাখ আর মাথার উপর কাপড় দাও।" হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো নারীদের সম্মান করে তবে নারীদের ছোট করে এমন কথাও আছে, সেগুলো বলতে চাই না। যদি মনু স্মৃতি পড়েন, সেখানে নারীদের বিরুদ্ধে অনেক কথা আছে, আমি সেগুলো এখানে বলব না। কারণ আমি চাই না কেউ একথা বলুক ডা. জাকির নায়েক হিন্দু ধর্মের সমালোচনা করছেন। পবিত্র বাইবেলেও নারীদের সম্পর্কে ভালো কথা আছে আবার খারাপ কথাও আছে। ভালোগুলো এখানে বলতে পারি, খারাপ কথাগুলো এখানে বলতে চাচ্ছি না। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, পবিত্র কোরআনের এমন একটা আয়াত দেখান যেটা নারীদের বিরুদ্ধে বলছে। একটা সহীহ হাদীস দেখান যেটা নারীদের বিরুদ্ধে বলেছে। হ্যাঁ, প্রত্যেক সম্প্রদায়ে কিছু কুলাঙ্গার থাকে। এমন কি কিছু মুসলিম আছে তারা শুধু নামেই মুসলিম। তারা মেয়েদের দিকে তাকাতে পারে, মেয়েদের উত্যক্ত করতে পারে। তবে তারা সত্যিকারের মুসলিম নয়। আপনি বললেন ইসলাম আর মুসলমানরা মেয়েদের খারাপ চোখে দেখে।
যদি এ কথাটা বলে থাকেন, ভুল বলেছেন। যদি হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোর কথা বলেন, যে নারীদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলে। আমি মেনে নেব। যদি বাইবেলে নারীদের বিরুদ্ধে বলা কথাগুলো উদ্ধৃতি দেন, আমি মেনে নেব। তবে আমি চ্যালেঞ্জ করছি, পবিত্র কোরআনের এমন একটা আয়াতও নেই যেটা নারীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। এমন একটা সহীহ হাদীসও নেই যেটা নারীদের বিরুদ্ধে বলেছে। সত্য কথা হলো- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীর প্রথম মানুষ যিনি নারীদের উপরে তুলেছেন। আর তাদের সমান অধিকার দিয়েছেন। আপনি যখন বললেন ইসলাম নারীদের অসম্মান করে, কথাটা ঠিক নয়। তবে, কিছু বাজে লোক আছে যারা এগুলো করতে পারে। এখন ধরেন- মার্সিডিজ গাড়ি কত ভালো এটা জানার জন্য ড্রাইভিং সিটে যদি কোন আনাড়িকে বসান আর গাড়িটা যদি এক্সিডেন্ট করে, কাকে দোষ দেবেন? গাড়ি, না ড্রাইভারকে? ড্রাইভারকে দোষ দেবেন। মার্সিডিজ কেমন এটা জানতে চেক করেন এতে কি কি আছে, এভারেজ স্পীড কেমন, পিকআপ কেমন, গিয়ার রেশিও কেমন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো কি কি? তেমনি ইসলামকে বিচার করতে চাইলে পবিত্র কোরআন আর সহীহ হাদীস পড়েন। নাম মাত্র মুসলিমদের দেখবেন না। যদি গাড়িকে পরীক্ষা করতে চান তাহলে পাকা ড্রাইভার বসান। শ্রেষ্ঠ মুসলিমের দৃষ্টান্ত হচ্ছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
বাইবেলের বুক অব জেনেসিস তৃতীয় অধ্যায়ের ১৬ অনুচ্ছেদে মহান ঈশ্বর বলেছেন, তোমরা নারী, তোমরা খুব যন্ত্রণা নিয়ে সন্তানের জন্ম দেবে। এটা নারীদের প্রতি ঈশ্বরের অভিশাপ, গর্ভধারণ নারীদের শাস্তি। একই ক্ষেত্রে ইসলাম উদার ইসলাম ধর্মে গর্ভধারণ নারীদের জন্য সম্মানের। সূরা নিসার ১নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে- "গর্ভধারিণী মাকে সম্মান করো।"
সূরা লোকমানের ১৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ
অর্থঃ আমি মানুষকে তাদের বাবা-মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি। মা অনেক কষ্ট সহ্য করে সন্তান গর্ভধারণ করেন। অনেক কষ্ট পেয়ে সন্তানের জন্ম দেন।
নবীজি বলেছেন- "তোমরা যদি তোমাদের মাকে সোনার পাহাড় এনে দাও তারপরেও তোমাকে গর্ভধারণের ঋণ শোধ হবে না" ইসলাম এমন সম্মানের কথাই বলছে। সহীহ বুখারীর ৮ খণ্ডের বুক আদাব ২য় অধ্যায়ের ২নং হাদীসে উল্লেখ আছে- "একবার এক লোক নবীজির কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর নবী! এই পৃথিবীতে কাকে সবচেয়ে বেশী সম্মান দেখাবো? নবীজি বললেন, তোমার মা। লোকটা বলল, এরপর কাকে? নবীজি বললেন, তোমার মা। লোকটা বলল, এরপর কাকে? নবীজি বললেন, তোমার মা। লোকটা বলল, এরপর কাকে? নবীজি বললেন তোমার বাবা।" তার মানে চার ভাগের তিন ভাগ পাচ্ছেন মা আর বাবা পাচ্ছেন এক ভাগ। অর্থাৎ এক্ষেত্রে মা গোল্ড মেডেল পাচ্ছেন, সিলভার পাচ্ছেন এবং ব্রোঞ্জ মেডেলও পাচ্ছেন। আর বাবা একটি সান্ত্বনা পুরস্কার নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। ইসলাম আমাদের এমনটাই শেখায়। তবে আপনার কথা মানি। পশ্চিমা বিশ্ব নারীদের স্বাধীনতার কথা বলে অথচ তারাই নারীদের ছোট করছে। আসলে তারা স্বাধীনতার কথা বলে শারীরিক অত্যাচার করে। তাদের সম্মান কেড়ে নেয়, আত্মার অবমাননা করে। পশ্চিমা বিশ্ব বলে তারা নারীদের উঁচুতে বসিয়েছে। আসলে নিচে নামিয়েছে। তাদেরকে বানিয়েছে উপপত্নী, রক্ষিতা আর সমাজের প্রজাপতি। যারা রয়েছে আর্ট আর কালচারের রঙিন ক্যানভাসে। আর্ট আর কালচারের দোহাই দিয়ে তারা কি করছে? তাদের মেয়েদের বিক্রি করছে। তাদের মায়েদের বিক্রি করছে। তারা নাকি মেয়েদের উপরে তুলছে। সাধারণত বেশির ভাগ বিজ্ঞাপনেই দেখবেন নারী আছে। পণ্যটার সাথে হয়ত নারীর কোন সম্পর্কই নেই। মোটর সাইকেলের বেশির ভাগ বিজ্ঞাপনেই দেখবেন মেয়ে আছে। কতজন মেয়ে মোটর সাইকেল চালায়? কিন্তু বিজ্ঞাপনে মেয়ে থাকবেই। তারপর মোটর গাড়ির বিজ্ঞাপন, সেখানেও মেয়েরা। আমার এক বন্ধু একবার বলেছিলো, বিএমডব্লিউর একটা বিজ্ঞাপন, মার্সিডিজ বেঞ্জ খুব ভাল গাড়ি। তরুণদের প্রিয় হলো বিএমডব্লিউ। এর স্পিড বেশী। পিকআপ ভালো। তো বিএমডব্লিউর একটা অ্যাডে বিকিনি পরা একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে। আর নিচে লেখা "এখনি চালানো শুরু করুন।" কার কথা বলা হয়েছে মেয়েটা না গাড়িটা? বিক্রি করছে মেয়েদের, বিক্রি করছে মায়েদের। ইসলাম ধর্ম নারীদের সম্মান করে, মায়েদের সম্মান করে, বোনদের সম্মান করে। তাদের শ্রদ্ধা করি, ভক্তি করি আমরা সম্মান করি।
প্রশ্ন: আমি বিনয় কুমার। আমি একজন পেইন্টার। আপনাকে আমি একটা প্রশ্ন করবো। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কথা বাইবেল বা অন্য বই থেকে কপি করা নিয়ে আপনার ওয়েবসাইটে দুটা যুক্তি দেখিয়েছেন। সেখানে আপনি বলেছেন যে, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সময়ে বাইবেলের কোন আরবী অনুবাদ ছিল না। কিন্তু সহীহ আল বুখারী ৬ খণ্ডের ৬০ নং গ্রন্থ ৪৭৮ নম্বর হাদীস বলছে যে গসপেল গুলো আরবীতে অনুবাদ করা হয়েছিল। এটা অনুবাদ করেছিলেন বারাক। এখানে আরেকটা ব্যাপার হলো- আপনি বললেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরক্ষর ছিলেন বলে পড়তে পারতেন না। যেমন পবিত্র বাইবেল। কিন্তু আমি এ উত্তরে সন্তুষ্ট নই। কারণ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলোর কথা ধার করার জন্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে শিক্ষিত হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। সেখানে প্রয়োজন ছিল মুহাম্মদ (সঃ) শুনবেন আর নিজের ইচ্ছেমত কিছু বেছে নিবেন। এ কথাগুলো শোনার পর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো সংশোধন করেছেন। তারপর তিনি ধর্মীয় আবরণে সেটাকে ঢেকে দিয়েছেন। আর দাবী করেছেন এটা আল্লাহর আসমানী কিতাব।
উত্তর : ভাই আপনি খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন। আমাদের ওয়েবসাইটে গিয়েছেন শুনে খুব ভালো লাগছে। ইনশাআল্লাহ আপনি সত্যের পথে আসবেন। আমার মনে হয় আপনি খ্রিষ্টান। আপনার নাম বিনয় কুমার। ভাই বললেন- আমি দুটো যুক্তি দেখিয়েছি। দুটো না, অনেকগুলো যুক্তি দেখিয়েছি। আপনি বেছে নিয়েছেন ওই দুটো। ওই দুটো আপনার চোখে পড়েছে। তবে আমি শুধু দুটো যুক্তি দেখাইনি। এ দুটো ছাড়া আরও যুক্তি দেখিয়েছি। একটি যুক্তি দেখিয়েছিলাম যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন উম্মী। সূরা আনকাবুতের ৪৮ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
وَمَا كُنْتَ تَتْلُو مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ
অর্থঃ "আমি সর্বশেষ নবীকে পাঠিয়েছি নিরক্ষর যাতে করে মিথ্যাচারীরা কোন রকম সন্দেহ পোষণ না করে।"
একজন নিরক্ষর লোকের জন্য কাজটা অত্যন্ত কঠিন, এটা অবশ্যই মানবেন। আর যে লোক পড়তে পারে- তার পক্ষে নকল করা সহজ কাজ। কারণ সে পড়তেও পারে, শুনতেও পারে। যে মানুষটা নিরক্ষর সে শুধু শুনতে পারে তার জন্য আরো কঠিন হবে। তাহলে তর্কের খাতিরে অন্তত এটুকু মেনে নেবেন যে কাজটা কঠিন। এটা মানেন? আমি অনেক পয়েন্ট এবং যুক্তি বলেছিলাম, এটা একমাত্র পয়েন্ট না। অনেকগুলো পয়েন্টের মধ্যে এটা একটা। এরপরে আরো অনেক যুক্তি আছে।
আপনি বললেন যে, আমি সেখানে বলেছি তখন বাইবেলের আরবী সংস্করণ ছিল না। আমি এখনো সেই কথাই বলছি। আপনি সহীহ বুখারীর উদ্ধৃতি দিয়ে বারাকার কথা বললেন, হ্যাঁ- বারাকা গসপেল সম্পর্কে জানতেন। কিন্তু কোথাও এ কথা বলা নেই তিনি অনুবাদ করেছিলেন। না ভাই আমি আপনাকে এ ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ করছি। আমি খ্রীষ্টানদের কথাই বলছি। প্রথম বার বাইবেল লেখা হয়েছিলো দশম শতাব্দীতে। তার মানে খ্রিষ্টান বিশেষজ্ঞরা অনেক দেরী করে লিখেছেন। আর বাইবেলের প্রথম যে আরবী অনুবাদ হয়েছিল সেটা নবীজির কয়েকশ’ বছর পরের কথা। বারাকা আসলে বনী ইসরাঈল ছিলেন। খ্রিষ্টান ধর্ম সম্পর্কে জানতেন। আরবীও জানতেন। তিনি আসলে অনুবাদ করেননি। হয়ত কিছু নোট লিখেছেন। তবে পুরো বাইবেলের অনুবাদ অসম্ভব। সহীহ বুখারীর কোথাও একথার উল্লেখ নেই যে, বারাকা বাইবেল অনুবাদ করেছেন। আপনাকে এ ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ করতে পারি। এটা বলা আছে যে, বারাকা খ্রীষ্টানদের আইন আর বাইবেল সম্পর্কে জানতেন। হয়ত কিছু নোটও লিখেছিলেন। সালমান রুশদীর কথা তো শুনেছেন? সালমান রুশদীর বইতেও কোরআনের কিছু আয়াত আছে, কিন্তু বইটাকে তাই বলে তো কোরআন বলা যাবে না। সালমান রুশদী বই লিখেছেন কোরআনের বিরুদ্ধে। আর সেই বইতে পবিত্র কোরআনের কিছু আয়াত ছিল। তার মানে এই না যে, সেটা কোরআন। এছাড়া আমিও অনেক বই লিখেছি। আমার বইতেও কোরআনের আয়াত দিয়েছি। তার মানে সেগুলোকে কোরআন বলা যাবে না। এটা বলতে পারবেন না যে, ডা. জাকির নায়েক কোরআনের অনুবাদ করেছেন। আপনারা আমাদের ওয়েবসাইটে গেলে দেখবেন, সেখানে অনেক কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়েছি। সেগুলোকে কোরআন বলা যাবে না। এগুলো তো উদ্ধৃতি।
এ ছাড়াও আরো বললেন যে, নবীজি বাইবেলের ভুলগুলোকে শুধরে নিয়েছেন। আচ্ছা আপনার পয়েন্টটা খুব সুন্দর। আমি একটা বক্তব্য দিয়েছিলাম, "বাইবেল এন্ড কোরআন ইন দি লাইট অব সায়েন্স।” সেখানে প্রমাণ করেছিলাম যে, বাইবেলের অনেক বৈজ্ঞানিক ভুল আছে। যেমন বুক অব জেনেসিসের ১ম অধ্যায়ে বলা আছে, এ বিশ্বজগত সৃষ্টি হয়েছে চব্বিশ ঘন্টার হিসেবে ছয় দিনে। বলা হয়েছে যে, চাঁদের নিজস্ব আলো আছে। বুক অব জেনেসিসের ১ম অধ্যায় ১৬-১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- সূর্য সৃষ্টি হয়েছে চতুর্থ দিনে। এরকম আরো অনেক কথা আছে। আপনি যদি বলেন নবীজি এগুলো নিয়ে শুদ্ধ করেছেন যেমন চাঁদের যে আলো তার নিজস্ব আলো না, প্রতিফলিত আলো; সূরা ফুরকানের ৬১ নং আয়াতে আছে- চাঁদের আলো প্রতিফলিত আলো। কোরআন বলছে, বিশ্বজগত সৃষ্টি হয়েছে ছয়টা লম্বা সময়কাল ধরে। আপনি কি তাহলে বলছেন নবীজি এগুলো শুদ্ধ করে নিয়েছেন? তিনি কি বিজ্ঞানী ছিলেন? অবশ্যই না। এটা আল্লাহর আসমানী কিতাব। আমার পুরো বক্তব্য শোনেন। কোন একটা অংশ বিশেষ শুনে আমার কথা নিয়ে মন্তব্য করবেন না। যদি তর্কের খাতিরে এটা মেনেও নিই, যে তিনি বাইবেল থেকে অনুবাদ করে পরে শুদ্ধ করে নিয়েছেন, কোন মানুষের পক্ষে এটা কি সম্ভব? চৌদ্দশ বছর আগে বাইবেলের সবগুলো ভুল শুদ্ধ করবেন তিনি? এটা অসম্ভব। এতে প্রমাণ হয় যে, তিনি এটা লেখেন নি। এটা লিখেছেন আমাদের মহান স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে এসেছে।
প্রশ্ন: আমার নাম ময়ূর। আমি আমার এক অমুসলিম ভাইয়ের পক্ষে একটা প্রশ্ন করতে চাচ্ছি। সে মাইকের সামনে আসতে লজ্জা পাচ্ছে। প্রশ্নটা হলো- জাকির ভাই যেসব প্রশ্নের কথা বলেছেন এমন কি হতে পারে এই ভবিষ্যত বাণীগুলো পরে কেউ লিখেছে? যাতে ইসলাম ধর্মকে অন্য উপায়ে প্রচার করা যায়।
উত্তর: ভাই খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন। এটা কি সম্ভব যে সকল গ্রন্থের ভবিষ্যদ্বাণীগুলো পরে কেউ লিখেছে? হ্যাঁ হতে পারে। যদি পরে কেউ না লেখে, যদি ধর্মগ্রন্থগুলো বিশুদ্ধ হয় তাহলে মানবেন যে, এটাই আল্লাহর বাণী, তাহলে নবীজিকেও মানবেন। যদি বলেন এগুলো পরে কেউ লিখেছে তাহলে আপনার ধর্মগ্রন্থগুলো অশুদ্ধ। তাহলেও সেগুলোকে বাদ দিতে হবে। আপনার ধর্মগ্রন্থগুলো বাদ দিলে একমাত্র বিশুদ্ধ গ্রন্থ হলো এই কোরআন। দুভাবেই আপনি হারবেন।
প্রশ্ন: আমি রমেশ কুমার। নয়াদিল্লি থেকে এসেছি। আমি একজন ধর্মযাজক। আপনার বক্তব্যে বললেন কোরআন হল চূড়ান্ত। আমার একটা প্রশ্ন আছে। ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক কোরআনের হাফেজ মারা গিয়েছিলেন। তাই অনেকে মনে করেন যে, আবু বকরের সময় পবিত্র কোরআন হারিয়ে গেছে। সহীহ বুখারীর ৬নং খন্ডের ৫১০ নং হাদীস বলছে- ইসলামের তৃতীয় খলিফা হাকেমীয়ার লোকদের সাথে যুদ্ধ করছিলেন। তখন তিনি পবিত্র কোরআনের কিছু আলাদা সংস্করণ পেলেন, তখন ওসমান কোরআন লিখলেন। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন- আমি কোরআন নাযিল করেছি আমিই সংরক্ষণ করবো। কিন্তু কোরআন সংরক্ষিত হয়নি। আমি জানতে চাই, কোরআন, কখন, কোথায়, কিভাবে, কার মাধ্যমে বিকৃত হয়েছে?
উত্তর: ভাই আপনি সূরা হিজরের ৯নং আয়াতের উদ্ধৃতি দিলেন যেখানে আল্লাহ বলেছেন, আমি কোরআন নাযিল করেছি আর আমিই এর সংরক্ষণ করবো। তাহলে কোরআন বলছে যে, কোরআন বিকৃত হয়নি। আল্লাহ বলছেন যে, কোরআন বিশুদ্ধ। তাহলে সহীহ বুখারী কেন বলছে যে, হযরত আবু বকরের সময়ে কোরআন হারিয়ে গেছে? তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান কোরআনের অনেক সংস্করণ পেলেন। এটা কিভাবে হল? ভাই সহীহ বুখারীর যে কথাটা বলছেন সেটা ঠিক। যেটা হযরত ওসমান (রা) পেয়েছেন সেটা হল বিভিন্ন আঞ্চলিক বাচনভঙ্গি। যেমন ইংরেজ ভাষায় দেখবেন অনেক আঞ্চলিক বাচনভঙ্গি আছে। একই ইংরেজি সাউথ-ইন্ডিয়ানরা একভাবে বলে, ইংরেজরা একভাবে বলে। হায়দ্রাবাদীদের বাচনভঙ্গীটা আলাদা। আমি সে ভাষায় বক্তব্য দিতে পারবো। আমার স্ত্রী একবার আমাকে বলেছিলেন, তুমি হায়দ্রাবাদী ভাষায় বক্তব্য দাও না কেন? বোম্বের ভাষা আবার অন্যরকম। তাহলে একেক জায়গার ভাষা-বাচনভঙ্গি একেক রকম। সেই একইভাবে সে সময় হযরত ওসমান (রা) দেখলেন অনেক বাচনভঙ্গী। আমাদের নবীজি সাতটা বাচনভঙ্গীর অনুমতি দিয়েছিলেন। তাই আঞ্চলিক উচ্চারণ করতে গিয়ে ভুল হয়েছিলো। এই ভুল শুধরানোর জন্য হযরত ওসমান বললেন এটাকে চূড়ান্ত করো। আমরা এখানে শুদ্ধভাবে সবাই এক উচ্চারণ করবো। তাহলে বুঝতে পারলেন যে, তিনি বাচনভঙ্গি শুদ্ধ করেছেন। আমেরিকান বাচনভঙ্গি আলাদা, ব্রিটিশ বাচনভঙ্গি আলাদা, নিউজিল্যান্ডের বাচনভঙ্গি আলাদা। কিছু গ্রহণযোগ্য, কিছু গ্রহণযোগ্য নয়। ওসমান (রা) সংশোধন করেছিলেন বাচনভঙ্গি।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় যখন কোরআন নাযিল হত, লেখক থাকতো। নবীজি যা শুনেছেন, লেখকদের তা বলতেন, সাহাবাগণ লিখে নিতেন। নবীজি আবার চেক করতেন। যায়েদ বিন ছাবিত ছিলেন প্রধান ওহী লেখক। আরো অনেকে ছিলেন। এছাড়া অনেক সাহাবী নবীজির কাছে আয়াতগুলো শুনতেন আর বাসায় গিয়ে লিখে রাখতেন। এখানে ধরেন কেউ আমার লেকচার শুনল, তারপর বাসায় গিয়ে লিখলো। এটা ঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। অবিকল আমার মত হবে না। আমি যদি চেক করে নোট দিই, এটা লিখেন, আবার পড়েন, এটা ভুল হয়েছে শুধরে নেন। তাহলে কোরআনের যে কপিটা আমাদের নবীজির কাছে ছিল সেটা তিনি নিজেই চেক করেছিলেন। এটা দেয়া হয়েছিল তাঁর স্ত্রী, হযরত ওমর (রা)-এর মেয়ে বিবি হাফছা (রা)-এর কাছে। এটা বিবি হাফছার কাছে ছিল। পরে মানুষজন নিজে থেকেই লেখা শুরু করলো। তাদের স্মৃতি থেকে সেখানে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। পবিত্র কোরআন কিন্তু ভুল নয়। যদিও সেখানে বেশ কিছু লোকের লেখা নোট ছিল অন্যরা বুঝতে পারতো না যে এটাই শুদ্ধ কোরআন না ভুল কোরআন। হযরত ওসমান দেখলেন এখন তো মানুষ ভুল বুঝতে শুরু করবে। সিদ্ধান্ত নিলেন এখন আমি কোরআনের সঠিক কপি করবো, তারপর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সেটাকে ছড়িয়ে দেব। আর মুসলিমরা বুঝতে পারবে যে এটাই আসল। কোরআনের পরিবর্তন হয়নি। হযরত ওসমান ছাহাবাগণকে নিয়ে একটি কমিটি বানালেন। তারপর অরিজিনাল থেকে কপি করলেন। তারপর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিলেন। এরকম একটা কপি এখনো তাসখন্দে আছে। এছাড়া তুরস্কের তোপকপি মিউজিয়ামে একটা আছে। যদি পরীক্ষা করেন, অবিকল একই কথা। এ ছাড়াও হাফেজরা আছেন। কথার কথা, যদি পৃথিবীর কোরআনের সব কপি পুড়িয়ে ফেলাও হয়, পৃথিবী ব্যাপি হাজার-হাজার হাফিজে কোরআন আছেন তারা আবার কোরআনের হুবহু কপি তৈরি করতে পারবেন।
প্রশ্ন: আমি সুতপা সরকার। পেশায় একজন শিক্ষিকা। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন। ইসলাম ধর্মে কর্ম আর মোক্ষলাভ সম্পর্কে কি বলা আছে? আর এ ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মের ধারণার সাথে পার্থক্যটা কি?
উত্তর: বোন আপনি প্রশ্ন করলেন ইসলাম ধর্মে কর্ম আর মোক্ষ লাভ সম্পর্কে কি বলা হয়েছে। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী কর্ম মানে কাজ। আমরা যে কাজগুলো করি, এ কর্ম করতে হবে ধর্ম অনুযায়ী। কিন্তু ধর্মীয় গুরুরা একটা দর্শনে বিশ্বাস করেন, যেটাকে সানসকারা বলা হয়। অর্থাৎ জন্ম আর মৃত্যুর চক্র। জন্ম-মৃত্যু এর পর আবার জীবিত হওয়া। অথবা মানুষের আত্মার ভ্রমণ করার থিওরী। তারা বিশ্বাস করে কেউ ভাল কাজ করলে পরবর্তী জীবনে সে জন্ম নেবে কোন উঁচু স্তরে। যদি খারাপ কাজ করে পরবর্তী জীবনে জন্ম নেবে কোন নিচু স্তরে। ভাল কাজ করলে মানুষ হয়ে জন্মাবে আর খারাপ কাজ করলে পশু হয়ে জন্মাবে। হয়ত ইঁদুর, বিড়াল বা তেলাপোকা হয়ে জন্ম নেবে। আর যদি ভাল-খারাপ এর মাঝে থাকে তবে মোক্ষ লাভ করবেন। জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে বের হয়ে আসবেন। এটা হিন্দু ধর্মীয় গুরুদের দর্শন। তবে বেদে এর কোন কথা উল্লেখ নেই। বেদ হল হিন্দুদের সর্বোচ্চ ধর্মগ্রন্থ অথচ সেখানে এর উল্লেখ নেই। তারা বলে যে, এ কথাগুলো ভগবত গীতায় আছে। ভগবত গীতার দুই অধ্যায়ের বাইশ অনুচ্ছেদে বলা আছে শরীর পোশাক বদলিয়ে নতুন পোশাক পরে তেমনি আত্মা নতুন শরীরে প্রবেশ করে।
হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোতে পুনর্জন্ম বলে একটা কথা আছে। ঋগবেদের ১০ নং গ্রন্থের ১৬ অধ্যায়ের ৪-৫ অনুচ্ছেদে আছে- পুন মানে পরবর্তী, জন্ম মানে জীবন। পুনর্জন্ম মানে পরবর্তী জীবন। আমরা পরের জীবনে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি যে, আমরা পৃথিবীতে একবার আসবো, মাত্র একবারই আসবো, আর আল্লাহর আদেশে মারা যাবো। একবারই মারা যাবো। আখেরাতে আবার জীবিত হব। তাহলে ইসলাম অনুযায়ী আমরা পৃথিবীতে একবারই আসবো, তারপর আল্লাহর আদেশে কেয়ামতের দিনে আবার জীবিত হব। কৃতকর্মের উপর ভিত্তি করে বেহেশত বা দোজখে যাবে। বেদও এমন কথাই বলছে। কিন্তু হিন্দু বিশেষজ্ঞরা এটা বোঝে না যে, কেন মানুষ ধনী হয়, গরীব হয়, বোবা হয়, কেউবা স্বাস্থ্যবান। ঈশ্বরতো কোন অন্যায় করেন না। তাই তারা একটা দর্শন দাঁড় করালো জন্ম-মৃত্যু-জন্ম-মৃত্যু, আত্মার ভ্রমণ করে বেড়ানো। বেদের কোথাও একথা নেই। এমনকি ভগবত গীতাও এমন কথাই বলছে। পুরনো জামা বাদ দিয়ে মানুষ যেমন নতুন জামা পরে একইভাবে আত্মা পুরনো শরীর ছেড়ে নতুন শরীরে যায়, একবার। একবার মারা যাবেন। একবারই পুনর্জীবিত হবেন।
তবে ইসলামে এ প্রশ্নটার উত্তর রয়েছে। হিন্দু ধর্মগুরু এটা বুঝতে পারে না যে ঈশ্বর কেন এমন করবেন? কিছু মানুষ জন্ম থেকে বোবা, কেউবা স্বাস্থ্যবান, কারো হার্টের সমস্যা, কেউ গরীব আবার কেউ ধনী। কোরআনের সূরা মূলক এর ২নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে-
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
অর্থঃ আল্লাহ জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য।
এ জীবনটা পরকালের জন্য একটা পরীক্ষা। কেউ জন্মায় গরীব হয়ে, কেউ ধনী হয়ে ধনীদের ক্ষেত্রে কোরআন যাকাত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ধনীরা যাকাত দিতে পারে, নাও দিতে পারে। অর্ধেকও দিতে পারে। হয় সে একশতে একশ পাবে, না হয় পঞ্চাশ পাবে। কোন যাকাত না দিলে সে শুন্য পাবে। কিন্তু গরীব লোকেরা এক্ষেত্রে একশতে একশ’ পাবে। কারণ গরীব লোককে তো যাকাতের পরীক্ষা দিতে হবে না। আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন গরীব লোকের চাইতে ধনী লোকের বেহেশতে যাওয়া অনেক শক্ত। ধনীরা ভাববে, আমাকে এত যাকাত দিতে হবে। সে দিতেও পারে, আবার নাও দিতে পারে। তাই একেক জনের পরীক্ষা একেক রকম। এটা আমরা মানি না, মানাও যায় না যে আগের জন্মের পাপের কারণে কেউ অন্ধ হয়ে জন্মেছে। এটা পরকালের জন্য পরীক্ষা। হয়ত এটা বাবা-মায়ের জন্য পরীক্ষা। সূরা আনফালের ২৮ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ
অর্থঃ এবং জেনে রাখ যে, তোমাদের সম্পদ ও সন্তানেরা তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ।
এমনও দেখা যায় বাবা-মা ধার্মিক কিন্তু তাদের সন্তান একেবারে জন্ম থেকেই অসুস্থ। দেখে কেউ হয়ত বলবে আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি না। যারা ইমানদার তারা বলবে এখনো আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি। যত কঠিন পরীক্ষা হবে তত বড় পুরস্কার হবে। হয়ত আল্লাহ তাদের জান্নাতুল ফেরদৌস দেবেন। যদি গ্র্যাজুয়েশন পাশ করেন আপনি হবেন বিএ, বিএসসি। আর এমবিবিএস পাশ করলে হবেন ডাক্তার। যত কঠিন পরীক্ষা তত বড় ডিগ্রি। আমরা মানি কেউ পাপী হয়ে জন্মায় না। সবাই মাসুম হয়ে জন্ম গ্রহণ করে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে এ পৃথিবীতে বার বার আসবেন। ভাল কাজ করলে মানুষ হয়ে আসবেন আর খারাপ কাজ করলে পশু বা অন্য কিছু হয়ে জন্মাবেন। এ কথাটা বেদের কোথাও বলা নেই। আর আপনি একটু চিন্তা করেন। পৃথিবীতে অপরাধের মাত্রা বাড়ছে না কমছে? বাড়ছে। পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে না কি কমছে? বাড়ছে। তাহলে যুক্তি বলে- অপরাধের মাত্রা যদি বাড়ে তাহলে মানুষ তো কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু মানুষ কমছে না। এতেই প্রমাণ হয়, এ দর্শনটা ভুল।