📄 বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মাদ (সা)
অনেক মানুষের ভুল ধারণা আছে যে, ইসলাম একটা নতুন ধর্ম। যে ধর্ম পৃথিবীর বুকে এসেছে ১৪শ বছর আগে। আর নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন এ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। মূলত ইসলাম এ পৃথিবীতে আছে সেই সুদূর অতীত থেকেই যখন প্রথম মানুষটা পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াত। আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিনি এ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নন। তবে তিনি হলেন সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী এবং আল্লাহর প্রেরিত শেষ রাসূল। তাকে পাঠানো হয়েছে সকল মানুষের জন্য। আমাদের পবিত্র কোরআন বলছে-
৬-“এমন কোন সম্প্রদায় নেই যেখানে আমি সতর্ককারী পাঠাইনি।” সূরা ফাতির, আয়াত-২৪,
পবিত্র কোরআনের সূরা রাদ এর ৭ নং আয়াতে হয়েছে- “প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আমি পথ প্রদর্শক পাঠিয়েছি।” পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা পঁচিশ জন নবীর নাম উল্লেখ করেছেন। যেমন- আদম, নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। তবে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে আরো বলেছেন- “আমি আগে তোমাকে বলেছি কিছু নবীদের কথা, কিছু রাসূলদের কথা, বাকিদের কথা বলিনি।” অর্থাৎ পবিত্র কোরআনে সব নবী-রাসূলের কথা উল্লেখ করা হয় নি।
আর আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা এ দুনিয়ায় প্রায় এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী পাঠিয়েছেন (এ সহীহ হাদীসটি সংকলিত আছে মিশকাত আল মাসাবাহ শরীফের তিন নং খণ্ডের হাদীস নং ৫৭৩৭) তবে নাম ধরে পবিত্র কোরআনে পঁচিশ জনের কথা বলা হয়েছে।” কিন্তু এই সব নবী রাসূল যারা এসেছেন সর্বশেষ ও রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আগে, তারা এসেছিলেন শুধু তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্য; আর তারা যে কথাগুলো প্রচার করেছেন সেই কথাগুলো মেনে চলা দরকার ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, ঐ সময়ের জন্য।
যেসব নবী রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আগে এসেছেন, তারা শুধুমাত্র তাদের সম্প্রদায়ের জন্য এসেছেন। যেমন- ঈসা (আ) যাকে খ্রিস্টানেরা যিশু খ্রিষ্ট বলে, তিনি এসেছিলেন শুধু ইহুদীদের জন্য, ইসরাইলের জন্য। সূরা ইমরানের ৪৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- “ঈসা নবী (বা যিশু খ্রিষ্ট) ছিলেন বনী ইসরাইলের জন্য একজন নবী।” এছাড়াও সূরা ছফের ছয় নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- “ঈসা ইসরাইলবাসীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আমাকে এখানে আল্লাহর রাসূল হিসেবে পাঠানো হয়েছে।” একই ধরনের কথা পবিত্র বাইবেলেও উল্লেখ আছে যে, যিশু খ্রিষ্ট তার অনুসারীদের বলেছেন যে, ‘তোমরা কেউ জেনটাইলদের পথ অনুসরণ করো না।’ (গসপেল অব মেথিউ, অধ্যায়-১০, ভারস- ৫-৬), এই জেনটাইল হলো অন-ইহুদী।
তিনি আরো বলেন, তোমরা কেউ সামারিটিল শহরে প্রবেশ করো না। তার বদলে তোমরা ইসরাইলে প্রবেশ করো।” একই ধরনের কথা আছে, গসপেল অব ম্যাথিউর ১৫নং অধ্যায়ের ২৪ অনুচ্ছেদে যেখানে যিশু খ্রিষ্ট তার মুখে বলেছেন, “আমাকে পাঠানো হয়েছে শুধুমাত্র ইসরাইলবাসীদের পথ প্রদর্শনের জন্য।” তার মানে হলো কোরআন এবং বাইবেলের কথা মতে যিশু খ্রিষ্টকে শুধুমাত্র বনী ইসরাইলীদের জন্য পাঠানো হয়েছে, ইহুদীদের সন্তানদের জন্য। তবে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত নবী।
শুরুতেই আমি পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত বলেছিলাম, যেটি সূরা আহযাবের ৪০ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে যে,
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلَكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْ عَلِيمًا
অর্থঃ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনি তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নন; তবে তিনি হলেন আল্লাহর প্রেরিত রাসূল এবং নবুয়াতের সিল মোহর। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সব বিষয়ে অবগত আছেন।
যেহেতু মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ ও চূড়ান্ত রাসূল, সে জন্য তাকে শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য বা আরবদের জন্য পাঠানো হয়নি। পবিত্র কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ১৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- “আমি তোমাকে বিশ্ব জগতের জন্য রহমত স্বরূপ পাঠিয়েছি।” তাকে পাঠানো হয়েছে প্রাণী জগত এবং মানব জাতির উপর রহমত হিসেবে।
সূরা সাবার ২৮ নম্বর আয়াতে আরো বলা হয়েছে-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
অর্থঃ আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সমগ্র মানব জাতির জন্য রাসূল হিসেবে। তুমি তাদের সুসংবাদ দেবে আর পাপ কাজে সর্তক করবে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এটা জানে না।
যেহেতু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী। তারপরে অন্য নবী বা রাসূল আসবেন না, সেহেতু তাকে শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য বা শুধু আরবদের জন্য পাঠানো হয়নি। তাকে পাঠানো হয়েছে পুরো মানব জাতির জন্য। আমরা মুসলিমরা বিশ্বাস করি যে, পবিত্র কোরআন মাজিদ আল্লাহ তায়ালার বাণী; এটা হলো আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত সর্বশেষ আসমানী কিতাব। তাই কোরআন যা বলছে আমরা তাই মানি। সেজন্য আমরা এটাও মানি যে, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী। আর এটাও মানি যে তাকে পাঠানো হয়েছে পুরো মানব জাতির কল্যাণের জন্য। তবে বেশিরভাগ অমুসলিম, সাধারণভাবে সব অমুসলিমই বিশ্বাস করে না যে, কোরআন আল্লাহর বাণী। আর তাই তারা মানতে নারাজ যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী এবং তিনি পুরো মানুষ জাতির জন্য। এ জন্য অমুসলিমদেরকে বুঝাতে আমি পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত থেকে সাহায্য আর নির্দেশনা নেবো। আর আমার মতে এ আয়াতে হেদায়াতের চাবিকাঠি ও অমুসলিমদেরকে বোঝানোর মূল মন্ত্র রয়েছে।
সূরা আল ইমরানের ৬৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَواءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ
অর্থঃ “এসো সেই কথায় যা আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে এক।”
যখন আমরা অন্য ধর্মের মানুষের সাথে কথা বলবো, সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি যেটা পবিত্র কোরআনে আছে- এসো সেই কথায় যা আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে এক। চলুন আমরা দেখি যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রধান প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলোতে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কি বলা রয়েছে? তাহলে এ অমুসলিমরা যদি বিশ্বাস করে যে, এই ধর্মগ্রন্থগুলো, যেটা তাদের ধর্মের, সেই ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ থাকে, যদি তারা মনে করে যে এটা আল্লাহর বাণী, তাহলে সেই ধর্মগ্রন্থের কথাগুলো তাদের মানতে হবে।
প্রথমেই আমরা দেখি, হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোতে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে কি রয়েছে? হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোকে মোটামুটি দুইভাগে ভাগ করা যায়। যেমন শ্রুতি আর স্মৃতি। শ্রুতি হচ্ছে যেটা প্রকাশিত হয়েছে, যেটা সবাই বুঝতে পেরেছে, যেটা মানুষ শুনেছে। বিভিন্ন হিন্দু বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রুতি হলো ঈশ্বরের বাণী। শ্রুতি আবার দুই ভাগে বিভক্ত। বেদ ও উপনিষদ। বেদ সংস্কৃত শব্দ এসেছে ‘বিদ’ থেকে, যার অর্থ মানুষের জ্ঞান। আর বেদ প্রধানত চার প্রকার। ঋগবেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ। যদিও এ বেদগুলো ঠিক কোন সময় হতে পৃথিবীতে প্রচলিত আছে সেটা কেউ জানে না। তবে স্বামী দেবানন্দ স্বরস্বতীর (যিনি হলেন আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা) কথা অনুযায়ী এ বেদগুলোর বয়স একশ একত্রিশ কোটি বছর। তবে বিশেষজ্ঞদের বেশির ভাগের মতে, বেদের বয়স আনুমানিক চার হাজার বছর। পৃথিবীর কোন অংশে এই বেদ প্রথম এসেছিল সেটাও আমরা কেউ জানি না। কার উপর এটা নাজিল হয়েছিল সেটাও আমরা জানি না। যদিও এ ব্যাপারগুলো পরিষ্কার নয় তারপরও হিন্দুরা মনে করে যে এটাই আল্লাহর বাণী এবং হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ এবং পবিত্র হিন্দু গ্রন্থ। এর পরে গুরুত্ব পাবে উপনিষদ। উপনিষদ এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘উপা’ থেকে, যার অর্থ কাছে। ‘নি’ অর্থ নিচে এবং ‘ষদ’ অর্থ বসা। অর্থাৎ, কাছে এসে বসা। এক সময় ছাত্ররা তাদের শিক্ষকদের পায়ের কাছে বসত এটাকে বলা হচ্ছে উপনিষদ। এটার অর্থ হলো জ্ঞান যা যাবতীয় অজ্ঞতা দূর করে দেয়। পৃথিবীতে দুশো’র বেশী উপনিষদ রয়েছে তবে হিন্দুরীতি বলে এর সংখ্যা হলো একশ আট। এগুলোর মধ্যে কিছু উপনিষদকে প্রধান উপনিষদ বলা হয়েছে। কেউ বলে প্রধান উপনিষদ দশটা কেউ বারোটা, শ্রী রাধাকৃষ্ণ ১৮টি নিয়ে বই লিখেছেন। এগুলোকে বলে প্রধান উপনিষদ।
পরের স্তরের ধর্মগ্রন্থগুলো হলো স্মৃতি। স্মৃতি মানে যা মনে রাখা হয়, অর্থাৎ স্মরণে রাখা। হিন্দু বিশেষজ্ঞরা বলেন এই স্মৃতি নামক গ্রন্থগুলো মানুষ লিখেছে- অর্থাৎ ঋষিরা। আর এর অবস্থান শ্রুতির পরে। এগুলোকে বলে ধর্মশাস্ত্র। কারণ, এগুলো বলে যে মানুষ, সম্প্রদায়, সমাজ কিভাবে চলবে। স্মৃতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিভিন্ন ‘পুরাণ’। পুরাণ অর্থ প্রাচীন। এসব পুরাণে বিভিন্ন দেবতা, বিশ্ব সৃষ্টি, সাহিত্য প্রভৃতি উল্লেখ আছে। আর মহাঋষি ব্যাস এ পুরাণগুলোকে ১৮টি খণ্ডে ভাগ করেছেন। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটা হলো ভবিষ্যত পুরাণ। ভবিষ্যত মানে ভবিষ্যত। এ পুরাণ ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলছে। আর ভবিষ্যত পুরানের তৃতীয় পর্ব তৃতীয় খন্ড ৫-৮ অনুচ্ছেদে আছে যে, একজন ম্লেচ্ছ আসবেন তার সঙ্গীদের সাথে নিয়ে মরুস্থল থেকে। তার নাম হবে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। রাজা ভোজ এ দেবতুল্য মানুষকে স্নান করিয়ে পবিত্র করবেন। তাকে স্বাগত জানাবেন সম্মানের সাথে। তার সাথে কথা বলবেন শ্রদ্ধার সাথে। আর বলবেন, হে মানব জাতির গর্ব, আপনি শয়তানকে হারানোর জন্য এক বিশাল বাহিনী বানিয়েছেন। ম্লেচ্ছ সংস্কৃত শব্দটির অর্থ বিদেশী। তিনি আসবেন সঙ্গীদের নিয়ে। এখানে সঙ্গী মানে সাহাবাদের কথা বলা হচ্ছে। আসবেন মরুস্থল থেকে। সংস্কৃত মরুস্থল শব্দের অর্থ বালিময় স্থান বা মরুভূমি। তার নাম হবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। রাজা ভোজ এ বিদেশীর সাথে কথা বলবেন শ্রদ্ধার সাথে আর বলবেন- হে মানবজাতির গর্ব। আপনারা জানেন যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমগ্র মানব জাতির গর্ব।
পবিত্র কোরআনের সূরা কালামের ৪নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “নিশ্চয় আপনি সবচেয়ে মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।”
সূরা আহযাবের ২১ নং আয়াতে রয়েছে- “নিশ্চয় তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”
পুরাণ আরো বলছে যে, সেই লোক তার বাহিনী নিয়ে শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। আমরা জানি আমাদের প্রিয় নবীজি তাই করেছিলেন। এ ভবিষ্যত বাণীই স্পষ্ট করে যে এখানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা বলা হয়েছে। কিছু মানুষ বলতে পারে যে, বলা আছে ভোজ রাজার কথা যিনি ছিলেন এগার শতাব্দীতে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মেরও ৫শ বছর পরে। আর তিনি ছিলেন রাজা শিলাবাহনের দশম বংশধর। এই মানুষগুলো এটা বুঝতে পারে না যে, এটা মিশরের সম্রাটদের পদবীর মত, তারা রাজাদের পদবী দিত ফারাও। অতীতে অনেক ফারাও ছিল। মাত্র একজন ছিল না। আবার রোমের সম্রাটদের পদবী ছিল সিজার। সিজার একজন ছিলেন না, অনেক ছিলেন। একইভাবে ভারতীয় রাজাদের পদবী ছিল ভোজ। তাহলে ভোজ নামে একজন রাজা ছিলেন না অনেক রাজাই ছিলেন। এ ভোজ রাজা কিন্তু এগার শতাব্দীর ভোজ রাজা নন। ইনি তারও অনেক আগে রাজত্ব করেছিলেন।
এরপর ভবিষ্যত পুরাণের তৃতীয় পর্ব, তৃতীয় খণ্ডের ১০-১৭ অনুচ্ছেদে আছে- ম্লেচ্ছদের বসবাসের স্থান নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে যে শত্রুরা আগে রাজত্ব করতো, সেখানে এসেছে আরো শক্তিশালী শত্রু। আমি একজন কে পাঠাবো যার নাম হবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মানুষকে সরল পথে পরিচালিত করবেন। হে রাজা ভোজ, তুমি পিশাচের রাজ্যে কখনোই যাবে না। কারণ আমি আমার দয়া দিয়েই তোমাকে পবিত্র করবো। তারপর দেবতুল্য একজন মানুষ ভোজ রাজার কাছে এসে বললো যে, আর্য ধর্ম এ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হবে। এটা হবে ঈশ্বর পরমাত্মার আদেশে। আমার অনুসারীদের খাতনা দেয়া থাকবে। মাথার পিছনে কোন টিকি থাকবে না। তারা মুখে দাড়ি রাখবে। তারা একটা বিপ্লব করবে। তারা প্রার্থনার জন্য ডাকবে। তারা সব হালাল খাবার খাবে। তারা বিভিন্ন পশুর মাংস খাবে তবে শুকরের মাংস ব্যতীত। তারা লতাপাতার দ্বারা নিজদের পবিত্র করবে না; নিজেদের পবিত্র রাখবে যুদ্ধের মাধ্যমে। তাদের সম্প্রদায়কে বলা হবে মুসলমান। এ ভবিষ্যদ্বাণী আর কারো কথা বলছে না, বলছে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা।
‘বলা আছে আমার অনুসারী তারাই হবে যাদের খাতনা দেয়া থাকবে।’ আমরা সবাই জানি, মুসলিমরা খাতনা করে। তাদের মাথার পিছনে টিকি থাকবে না, অনেকে এটাকে বলে শিন্ডি। তাদের মুখে দাড়ি থাকবে। তারা একটা বিপ্লব করবে। তারা প্রার্থনার জন্য ডাকবে অর্থাৎ আযানের কথা বলা হচ্ছে। মুসলিমরা আযান দেয়। তারা সবাই হালাল খাদ্য গ্রহণ করবে, বিভিন্ন প্রাণীর মাংস খাবে তবে শুকরের মাংস খাবে না। একথা আল্লাহ পবিত্র কোরআনে মোট চার বার বলেছেন। যেমন আনামের ১৪৫ নং আয়াতে এবং সূরা নাহলের ১১৫ নং আয়াতে উল্লেখ করা আছে-
إِنَّمَا حُرِّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ .
অর্থঃ তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত পশু, শুকরের মাংস, রক্ত এবং যে পশু আল্লাহর নাম ছাড়া জবাই করা হয়েছে।
যেহেতু পবিত্র কোরআনে বেশ কয়েকবার বলা হয়েছে যে, শুকরের মাংস খাওয়া হারাম; মুসলিমরা আমরা শুকরের মাংস খাই না। ভবিষ্যত বাণীতে আরো বলছে যে, তারা লতাপাতার দ্বারা পবিত্র হবে না, তাঁরা যুদ্ধের মাধ্যমে পবিত্র হবে। আর তাদেরকে ডাকা হবে মুসলমান বলে। এ ভবিষ্যত বাণী নিশ্চিত ভাবেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলছে।
ভবিষ্যত পুরাণের তৃতীয় পর্ব, প্রথম খন্ডের তৃতীয় অধ্যায়ের ২১-২৩ অনুচ্ছেদে আরো বলা আছে- “সাতটা পবিত্র শহর কাশীতে, সেগুলো ভরে গেছে দুর্নীতিতে আর রাক্ষসে। সে সময় ম্লেচ্ছদের দেশে ম্লেচ্ছ ধর্মের অনুসারী ভাল মানুষ। তাদের মধ্যে সব ভালো গুণই আছে। আর এ দেশে সব ধরনের পাপই বিদ্যমান আছে। হে ঋষি! তোমার প্রভুর নামকে সমুন্নত রেখো।” এখানে আসলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার অনুসারীদের কথা বলা হচ্ছে।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা বেদেও ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। অথর্ববেদের ২০ নং গ্রন্থের ১২৭ নং অনুচ্ছেদের ১-১৪ নং মন্ত্র, এটাকে বলা হয় কুন্তাপ সুক্ত। কুন্তাপ অর্থ পেটের ভিতর লুকানো গ্রন্থি। অর্থাৎ এ মন্ত্রগুলোর অর্থ লুকানো আছে। কুন্তাপের আরেকটা অর্থ দুর্দশা থেকে মুক্ত। আরেকটা অর্থ শান্তি। ইসলামেরও একই অর্থ। এর আরেকটা অর্থ পৃথিবীর কেন্দ্র। আমরা জানি যে, পবিত্র মক্কা শহর পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত। পবিত্র কোরআনের সূরা ইমরানের ৯৬ নং আয়াতে বলা হচ্ছে-
ইন্না আওওয়ালা বাইতিন উদিয়া লিন্না-সি লিল্লাযী বি-বাক্কাতা মুবা-রাকাওঁ ওয়া হুদাল্লিল 'আ-লামীন
অর্থঃ মানুষ জাতির জন্য প্রথম ঘর বানানো হয়েছিল বাক্কায়। মক্কার আরেকটা নাম বাক্কা। আমি এখানে চারটি মন্ত্র সম্পর্কে বলবো।
অথর্ববেদের ২০ নং গ্রন্থের ১২৭ নং অনুচ্ছেদের ১নং মন্ত্রে বলা হচ্ছে- তিনি হলেন নরশাংসা। তিনি কাওরাসা, যাকে রক্ষা করা হয়েছে ষাট হাজার নব্বইজন শত্রুর হাত থেকে। ২নং মন্ত্রে বলা হচ্ছে- তিনি উটে চড়া ঋষি। ৩নং মন্ত্রে বলা হচ্ছে- তিনি মামা ঋষি। ৪নং মন্ত্রে বলা হচ্ছে- তিনি বৈশবী বের।
১নং মন্ত্র বলছে, তিনি হলেন নরশাংসা। সংস্কৃত নর এর অর্থ একজন মানুষ। শাংসা মানে প্রশংসা বা প্রশংসনীয়। আর আরবী শব্দ ‘মুহাম্মদ’ এর অর্থ একই। এটাই হলো সর্বশেষ সর্ব শ্রেষ্ঠ ও চূড়ান্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম। এর পরে বলছে, তিনি হলেন কাওরাসা। কাওরাসা শব্দের আরেকটা অর্থ হলো শান্তির রাজপুত্র। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্তির রাজপুত্রই ছিলেন। এর অন্য অর্থ হলো অভিবাসী বা হিজরতকারী। আমরা জানি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। তিনি অভিবাসী ছিলেন। এরপর বলছে, তাকে রক্ষা করা হয়েছে ষাট হাজার নব্বই জন শত্রুর হাত থেকে। আমরা জানি তখন মক্কায় যে সকল লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিপক্ষে ছিলেন তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ষাট হাজার।
২নং মন্ত্রে বলছে- তিনি হবেন উটে চড়া ঋষি। কোন ভারতীয় ঋষি বা ব্রাহ্মাণ কখনোই উটের পিঠে উঠবেন না কারণ, উটে চড়া ব্রাহ্মণদের জন্য নিষিদ্ধ। মনুস্মৃতি ১১ অধ্যায়ের ২০২ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “একজন ব্রাহ্মণ কখনো উট বা গাধার পিঠে চড়তে পারবে না।” তাই ইনি এমন কেউ যিনি বিদেশী বা ভারতের অধিবাসী নন।
৩নং মন্ত্রে বলছে তিনি হবেন মামা বা মহাঋষি। মামা, কেউ বলে, মুহাম্মদ কেউ বলে, মহান ঋষি।
৪নং মন্ত্রে বলছে, তিনি হবেন বের। বের অর্থ যিনি প্রশংসা করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরেক নাম ‘আহমদ’। আহমদ এর অর্থ, যে প্রশংসা করে।
অথর্ববেদে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আরো ভবিষ্যতবাণী রয়েছে। ২০ নং গ্রন্থে ২১ নং অনুচ্ছেদের ৬নং মন্ত্রে আহযাবের যুদ্ধের উল্লেখ রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে, এই ঋষিকে দশ হাজার শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করা হবে আর তিনি লড়াই না করেই জয়ী হবেন। তিনি একজন কারু। সংস্কৃত কারু শব্দের অর্থ যে ব্যক্তি প্রশংসা করে। আরবি করলে হবে আহমাদ যেটা নবীজির আরেকটা নাম। বলা হয়েছে তিনি লড়াই ব্যতীত এ যুদ্ধে জিতবেন। আহযাবের যুদ্ধে লড়াই না করে মুসলিমরা জয় লাভ করে। আমরা জানি, আহযাবের যুদ্ধে শত্রু পক্ষের সৈন্য ছিল প্রায় দশ হাজার।
অথর্ববেদের ২০ নং গ্রন্থের ২১ অনুচ্ছেদের ৭নং মন্ত্রে আছে- মহান ঈশ্বর ক্ষমতাচ্যুত করবেন ২০ জন রাজাকে। আর তিনি আবান্দুকে ষাট হাজার নব্বইজন শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করবেন। সংস্কৃত আবান্দু অর্থ এতিম। আবান্দু শব্দের আরেক অর্থ প্রশংসনীয়। নবীজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম মুহাম্মদ, যার অর্থ হলো প্রশংসনীয় এবং তিনি এতিম ছিলেন। আর আবান্দু শব্দের আরবী করলে হবে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বলা হয়েছে ঈশ্বর করবেন ২০ জন রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত। আর আমরা জানি তখনকার দিনে মক্কাতে আনুমানিক ভাবে ২০টি আলাদা গোত্র ছিল। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে জয় করেন। আর সে সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরোধিদের সংখ্যা ছিল প্রায় ষাট হাজার।
এ একই ভবিষ্যদ্বাণীটা ঋগবেদেও করা হয়েছে। ১নং গ্রন্থ ৫৩ নং অনুচ্ছেদের ৯নং মন্ত্রে বলা হচ্ছে- এখানে তাকে বলা হয়েছে সুষরামা। এর অর্থ যে ব্যক্তি প্রশংসনীয়। যেটা আমাদের নবীজির নামের অর্থ। নবীজির কথা ভবিষ্যতবাণী করে অগ্নির ৬৪ নং মন্ত্রে বলা হচ্ছে যে, ঋষি তার মায়ের দুধ পান করবেন না। আমরা জানি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মায়ের দুধ পান করেননি। আর বিবি হালিমা ছিলেন তার দাই মা। এছাড়াও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হয়েছে আহমাদ। অর্থাৎ যিনি প্রশংসা করেন।
উত্তরচিকার ১৫০০ নং মন্ত্রে, ইন্দ্রের ২নং অধ্যায়ের ১৫২ নং মন্ত্রে, যজুর্বেদের ৩১ অধ্যায়ের ১৮ নং অনুচ্ছেদে, বেদের ৮ নং গ্রন্থের ৬নং অনুচ্ছেদের ১০ নং মন্ত্রে, অথর্ববেদের ৮নং বইয়ের ৫নং অনুচ্ছেদের ১৬ নং মন্ত্রে, এবং ২০ নং বইয়ের ১২৬ অনুচ্ছেদের ১৪ নং মন্ত্রে আছে যে- নবীজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আহমদ এর পাশাপাশি আরেক নামে ডাকা হয়েছে। আর সেটা হলো নরশাংসী। এর প্রথম অংশ নর অর্থ মানুষ বা ব্যক্তি আর শাংসা এর (মূল শব্দ হলো প্রশংসা) অর্থ যে মানুষ প্রশংসনীয়। তাহলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মোহাম্মদ বলে হিন্দু ধর্ম গ্রন্থগুলোর অনেক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋগবেদের ১নং গ্রন্থের ১৩ নং অনুচ্ছেদের ৩নং মন্ত্রে, ১৮ নং অনুচ্ছেদের ৯নং মন্ত্রে, ১০৬ নং অনুচ্ছেদের ৪নং মন্ত্র, ১৪২ নং অনুচ্ছেদের ৩ মন্ত্র, ২নং গ্রন্থের ৩নং অনুচ্ছেদের ২নং মন্ত্র, ৫নং গ্রন্থের ৫নং অনুচ্ছেদের ২নং মন্ত্র, ৭নং গ্রন্থের ২য় অনুচ্ছেদের ২নং মন্ত্র, ১০ নং গ্রন্থের ৬৪ নং অনুচ্ছেদের ৩নং মন্ত্র, ১৮২ নং অধ্যায়ের ৫৭ নং অনুচ্ছেদে, যজুর্বেদের ২০ নং অধ্যায়ের ৩৭ অনুচ্ছদের ৫৭ নং অনুচ্ছেদে, ২১ অধ্যায়ের ৩১ অনুচ্ছেদে, ৫৫ অনুচ্ছেদে, ২৮ অধ্যায়ের ২নং অনুচ্ছেদে, ১৯ অনুচ্ছেদে, ৪২ নং অনুচ্ছেদ, এভাবে সারাদিন শুধু রেফারেন্স দেয়া যাবে যে হিন্দু ধর্ম গ্রন্থগুলোতে নবীজির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
হাতে সময় অল্প, না হলে হিন্দু ধর্ম গ্রন্থে প্রদত্ত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনা দিয়ে একটা লেকচার দেয়া যেত। তাই হিন্দু ধর্মে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনা নিয়ে আর একটা ভবিষ্যত বাণীর কথা বলবো। আর সেটা হল কলকি অবতার। ভগবত পুরাণে ১২ নং খন্ডের ২নং অধ্যায়ের ১৮-২০ নং শ্লোকে বলা হয়েছে যে, “বিষ্ণুয়াস নামে একজন মহত হৃদয়ের ব্রাহ্মণের ঘরে, যে সাম্বলা নামে একটা গ্রামের প্রধান ঘরে জন্মাবে কলকি। তাকে ঈশ্বর উৎকৃষ্ট গুণাবলী দেবেন। আর ঈশ্বর তাকে দিবেন আটটি অলৌকিক গুণ। তিনি সাদা ঘোড়ায় চড়বেন। তার ডান হাতে থাকবে একটি তরবারি।”
এরপর ভগবত পুরাণে ১নং খন্ডে তৃতীয় অধ্যায়ের ২৫ নং মন্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে- “কলি যুগে যখন রাজারা হবে ডাকাতের ন্যায়, তখন বিষ্ণুয়াসের ঘরে জন্ম নিবে কলি।” এছাড়াও পুরাণের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪নং মন্ত্রে বলা হয়েছে- “বিষ্ণুয়াস নামে এক ব্যক্তির ঘরে, যিনি মহত হৃদয় ব্রাহ্মণ, যিনি সাম্বলা গ্রামে প্রধান, তার ঘরে জন্ম নিবে কলি।” কলকি পুরাণের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫নং মন্ত্রে বলা হয়েছে- “কলকিকে চারজন সাহায্য করবে,” ৭নং মন্ত্রে বলা হয়েছে- “কলকিকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে দেবদূত বা ফেরেশতারা সাহায্য করবে।” কলকি পুরাণের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১১নং মন্ত্রে বলা হয়েছে- “বিষ্ণুয়াস নামে এক ব্যক্তির ঘরে সুমতির গর্ভে কলিক অবতার জন্মাবে।” আবার ১৫নং মন্ত্রে আছে- তিনি মাধব মাসের দ্বাদশ দিনে জন্ম নিবেন।
এক কথায় হিন্দু ধর্ম গ্রন্থের এ কথাগুলি কলিক অবতার সম্পর্কে বলা হয়েছে। কথাগুলি সাজিয়ে আরো সংক্ষেপে বলছি। প্রথমত- তাঁর বাবার নাম হবে বিষ্ণুয়াস। বিষ্ণু মানে ঈশ্বর আর ইয়াস মানে ভৃত্য। অর্থাৎ ঈশ্বরের ভৃত্য। এটার আরবি করলে হবে আব্দুল্লাহ। অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাবা। দ্বিতীয়ত তার মায়ের নাম হবে সুমতি। সুমতি এই সংস্কৃত শব্দের অর্থ প্রশান্ত, প্রশান্তি, শান্তি। এর আরবি শব্দ হবে আমিনাহ। অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাতা। তৃতীয়ত তিনি জন্ম নিবেন সাম্বালা নামে একটি গ্রাম। সাম্বালা মানে একটি প্রশান্ত এবং শান্তির জায়গা। আমরা জানি মক্কাকে বলে দারুল আমান বা শান্তির ঘর। নবীজি মক্কায় জন্ম গ্রহণ করেন। এরপর বলা হয়েছে, তিনি সাম্বালার প্রধান ব্যক্তির ঘরে জন্ম নিবেন। আমরা জানি তিনি মক্কার প্রধান ব্যক্তির ঘরে জন্ম নিয়ে ছিলেন। চতুর্থত বলা হয়েছে তিনি মাধব মাসের দ্বাদশ দিনে জন্মাবেন। আমরা জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে জন্মেছিলেন। আরো বলা হয়েছে যে তিনি হবেন শেষ বা শেষ নবী।
আমরা জানি, পবিত্র কোরআনের সূরা আহযাবের ৪০নং আয়তে বলা হয়েছে- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়, তবে তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল এবং নবুওয়াতের সীল মোহর। নিশ্চয় আল্লাহ সব বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত।” তাহলে কোরআন বলছে যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বশেষ রাসূল। এরপর বলা হয়েছে যে, এ ঋষি প্রথমবার- তার জ্ঞান বা আলোক প্রাপ্ত হবেন রাতের বেলা একটি গুহার ভিতর, তারপর তিনি উত্তর দিকে রওনা গিয়ে ফিরে আসবেন। আমরা জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম ওহী পেয়েছিলেন হেরা গুহায় রাতের বেলায় জাবলে নূর পর্বতে। পবিত্র কোরআনের সূরা দুখানের ২-৩ নং আয়াতে এবং সূরা ক্বদরের ১নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ .
অর্থঃ নিশ্চয় আমি মহিমান্বিত রাতে কোরআন নাযিল করেছি।
আমরা জানি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করেন, মদিনা মক্কার উত্তর দিকে এবং তিনি পরে আবার মক্কায় ফিরে আসেন। আরো বলা হয়েছে যে, ঈশ্বর তাকে দেবেন অতি উৎকৃষ্ট গুণাবলী এবং আটটি অলৌকিক শক্তি। হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ মতে এ আটটি অলৌকিক শক্তি হলো- জ্ঞান, আত্মসংযম, জ্ঞান বিতরণ, অভিজাত বংশ, সাহসিকতা, কম কথা বলা, মহানুভবতা এবং পরোপকারিতা। এ আটটি গুনের সবগুলিই সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে বিদ্যমান ছিল।
তারপর বলা হয়েছে তিনি হবেন পৃথিবীর সব মানুষের পথ প্রদর্শক। পবিত্র কোরআনের সূরা সাবার ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّাসِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْথَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
অর্থঃ আমি আপনাকে পাঠিয়েছি পুরো মানব জাতির দূত সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে। তবে অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।
এরপর বলা হয়েছে যে, কলকি অবতার একটি সাদা ঘোড়ায় চড়বেন। আমরা জানি যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোরাকে চড়েছিলেন যখন তিনি মিরাজে যান। এরপর আরো বলা হয়েছে যে, তার ডান হাতে একটি তরবারি থাকবে। আমরা জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং আত্মরক্ষার জন্য তার ডান হাতে তরবারি থাকত। আবার বলা হয়েছে যে, তিনি অজ্ঞ লোকদের সরল পথে পরিচালিত করবেন। আমরা জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবদেরকে পথ দেখিয়েছিলেন। আরবে সে সময়কে বলা হত আইয়ামে জাহেলিয়া বা অজ্ঞতার ও অন্ধকারের যুগ। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরআন ও আল্লাহর সাহায্যে আরবদের অন্ধকার থেকে আলোতে এনেছিলেন।
এরপর বলা হয়েছে, তাকে সাহায্য করবে চারজন সহচর। এখানে চারজন সাহাবীর কথা বলা হচ্ছে অর্থাৎ খোলাফায়ে রাশেদীন আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী (রা)। তারপর বলা হয়েছে যে, তাকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে দেবদূত বা ফেরেশতারা সাহায্য করবে। পবিত্র আল-কোরআনের সূরা ইমরানের ১২৩-১২৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنتُمْ أَذِلَّةٌ ۖ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَن يَكْفِيَكُمْ أَن يُمِدَّكُمْ رَبُّكُم بِثَلَاثَةِ آلَافٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُنزَلِينَ بَلَىٰ ۚ إِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُم مِّن فَوْরِهِمْ هَٰذَا يُمِدِدْكُمْ رَبُّكُم بِখَمْسَةِ آلَافٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ .
অর্থঃ এছাড়াও সূরা আনফালের ৪-৯ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বদরের যুদ্ধে ফেরেশতারা নবীজির সাহায্য করেছিল। আর মুসলমানরা সেই যুদ্ধে জয়লাভ করে। এখানে আমি সংক্ষেপে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোতে কলকি অবতার সম্পর্কে যে বর্ণনা আছে তা তুলে ধরলাম।
📄 ফারসী ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মাদ (সা)
এবার দেখা যাক ফারসী ধর্মে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কি বর্ণিত হয়েছে। জরথুস্ট হলেন এ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। এটাকে পারসিজমও বলা হয়। এটার উৎপত্তি হয়েছে আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে পারসিয়াতে। এ পারসিমজকে আরো বলা হয় মেগিয়ানিজম অথবা যে ধর্মের অনুসারীরা অগ্নি পূজা করে। পারসিদের পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ হলো দশাতির এবং আভেস্তা। আভেস্তাকে আবার জেন্দ আভেস্তাও বলা হয়। দশাতির দুই ভাগ। ক্ষুরধা দশাতির ও করণ দশাতির। আভেস্তারও আবার দুই ভাগ, ক্ষুরধা আভেস্তা ও করণ আভেস্তা। অনেকে এগুলোকে বলে জেন্দ বা মহাজেন্দ। আপনারা যদি এই পারসি ধর্মগ্রন্থ পড়েন, সেখানে অনেক জায়গাতেই দেখবেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা বলা আছে।
জেন্দ আভেস্তার নফারভাস্তি ইয়াস্তের ২৮ অধ্যায়ের ১২৯ অনুচ্ছেদে আছে- তার নাম হবে আস্তাবেদ আরেতা অর্থাৎ জয়যুক্ত। তার আরেকটা নাম হবে সোশিম। বলা হয়েছে যে তাকে এখানে ডাকা হবে সোশিম। আমরা জানি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ জিতেছিলেন, অনেক যুদ্ধ জিতেছিলেন তাই তিনিই আস্তাবেদ আরেতা। ইতিহাসের বিশ্ব কোষের কথা অনুযায়ী সোশিয়েনথ অর্থ যে লোক প্রশংসার যোগ্য বা যে প্রশংসা করেছে। যার আরবি করলে হবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাহলে পারসি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম বর্ণিত হয়েছে। এর পরে বলা হয়েছে তিনি হবেন আস্তবেদ আরেতা। এর মানে হলো প্রশংসাকারী। এটা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরেকটা নাম আহমাদ। আহমাদ শব্দের অর্থ যে প্রশংসা করে।
জেন্দ আবেস্তার জামিয়াধ ইয়াস্তের ১৬ অধ্যায়ের ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- তার বন্ধুরা চলে আসবে। অর্থাৎ, আস্তবেদ আরেতার বন্ধুরা। তারা শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই করবে, তারা চিন্তা ভাবনা করবে, ভাল কথা বলবে, ভাল কাজ করবে আর তাদের জিহবায় কোন মিথ্যা থাকবে না। এখানে নবীজি সাহাবীগণের কথা বলা হচ্ছে। এখানে সাহাবীদের কথা বলা হচ্ছে অর্থাৎ নবীজি (স) এর সহচরেরা, তারা ভাল মানুষ হবে। তারা চিন্তা ভাবনা করে কাজ করবে, ভাল কথা বলবে, ভাল কাজ করবে তাদের জিহবায় মিথ্যা থাকবে না অর্থাৎ তারা মিথ্যা কথা বলে না। আর আমরা জানি সাহাবিগণ সর্বদা সত্য কথাই বলতেন।
দশাতিরেও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী আছে। এটা পারসিদের আরেকটা ধর্ম গ্রন্থ। দশাতির মানে দশ, আর তির মানে খন্ড অর্থাৎ যে বইটার দশটা ভাগ আছে। এটা দস্তুর শব্দের বহুবচন আর এর ধর্মীয় আইন। অর্থাৎ এ বইটাতে দশটা ভাগ আছে আর এটা ধর্মীয় আইন। দশাতিরে উল্লেখ আছে- পারসিরা যখন তাদের ধর্ম ত্যাগ করবে, যখন তারা নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে, তখন মরুভূমি থেকে একজন লোক আসবে তার অনুসারীরা পারসিদের বশে আনবে। আর তারা পারসিদের রাজ্য জয় করবে। তারা মানব জাতির জন্য একটা অনুগ্রহ হবে। তারা তাদের মন্দিরের ভেতর অগ্নি পূজা করবে না। তারা ইবরাহীমের ঈশ্বরের ঘরের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করবে। তারা কখনো মূর্তি পূজা করবে না। তারা পারসিয়ার প্রভু ও শাসক হবে। এছাড়াও তারা পারসিয়ার অন্যান্য ধর্মীয় স্থানেও রাজত্ব করবে।
তাদের নবী খুব যুক্তিবাদী হবেন আর অলৌকিক কাজ করবেন। এ ভবিষ্যত বাণী আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথাই বলেছেন। বুন্দাহিসোর ৩০ অধ্যায়ের ৬-২৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সোশিয়েন হবেন শেষ নবী। এটার অর্থ হলো প্রশংসনীয় অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর এখানে উল্লেখ রয়েছে যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হবেন শেষ নবী। এটা হলো সংক্ষেপে পারসী ধর্মগ্রন্থগুলোতে আমাদের নবীজির বর্ণনা।
📄 বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মাদ (সা)
প্রায় সব বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থেই আছে যে, ভবিষ্যতে একজন মাইত্রি আসবেন। চিক্কভাতি সিনহনাদ সুতানতার ডি- ১১১ ৭৬-এ বলা আছে- আরেকজন বুদ্ধ আসবেন, তিনি মাইত্রি। তিনি পবিত্র, সবার উপরে, তিনি আলোকপ্রাপ্ত। তিনি খুব জ্ঞানী আর বিনয়ী। তিনি মঙ্গলজনক, যার রয়েছে বিশ্ব জগতের জ্ঞান। তিনি অলৌকিকভাবে আহরিত জ্ঞান পুরো পৃথিবীতে প্রচার করবেন। তিনি একটা ধর্ম প্রচার করবেন, যেটা শুরুতে গৌরবময় থাকবে, চরম সময়ে গৌরবময় থাকবে আর শেষেও গৌরবময় থাকবে। তিনি একটা জীবন দর্শন প্রচার করবেন যেটা হবে সত্য এবং শাশ্বত। তার সাথে কয়েক হাজার সন্নাসী থাকবে। যেখানে আমার সাথে কয়েকশ সন্নাসী থাকে। একথা আরো বলা হয়েছে Sacerd Book of East-এর ৩৫নং খন্ডের ২২৫নং পৃষ্ঠায় একজন মাইত্রি আসবেন যার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আর গুণ থাকবে। এরপরে বলা হয়েছে যে, তিনি হাজার হাজার মানুষকে নেতৃত্ব দেবেন যেখানে আমি দিয়েছি মাত্র কয়েকশ মানুষকে।
গসপেল অব বুদ্ধ এর ২১৭ ও ২১৮ নং পৃষ্ঠায় আরো আছে যে, আনন্দ বুদ্ধকে প্রশ্ন করলেন, হে আশীর্বাদ প্রাপ্ত! আপনি চলে গেলে কে আমাদের পথ দেখাবে? জবাবে গৌতম বুদ্ধ বললেন- আমি পৃথিবীর প্রথম বুদ্ধ নই। এমনকি শেষ বুদ্ধও আমি নই। ভবিষ্যতে আরেকজন বুদ্ধ পৃথিবীতে আসবেন, তিনি পবিত্র, সবার উপরে, আলোক প্রাপ্ত, এবং খুব জ্ঞানী আর বিনয়ী হবেন। যিনি মঙ্গলজনক, যার রয়েছে বিশ্ব জগতের জ্ঞান। তিনি প্রচার করবেন সর্বোত্তম ধর্ম। তিনি যে ধর্ম প্রচার করবেন তা শুরুতে গৌরবময় থাকবে, চরম সময়ে গৌরবময় থাকবে আর শেষেও গৌরবময় থাকবে। তিনি যে ধর্ম প্রচার করবেন তার ভিত্তি হবে সত্য আর সেটাই হবে শাশ্বত জীবন দর্শন। আর তার থাকবে হাজার হাজার শিষ্য যেখানে আমার আছে মাত্র কয়েকশ। বুদ্ধের প্রধান শিষ্য আনন্দ তাকে প্রশ্ন করলেন- আমরা তাকে কিভাবে চিনতে পারব? বুদ্ধ উত্তর দিলেন, তাঁর নাম হবে মাইত্রি। মাইত্রি অর্থ ক্ষমাশীল, স্নেহময়, দয়ালু, করুণাময়। এ শব্দটার আরবি করলে হবে রাহমা। সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
অর্থঃ আমি তোমাকে সমগ্র মানুষ ও জীব জগতের প্রতি রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি। এই রাহমা শব্দ এবং এর সমার্থক শব্দ ক্ষমা কোরআনে এসেছে সব মিলিয়ে ৪০৯ বার। আর কোরআনের শুধুমাত্র সূরা তাওবা ছাড়া বাকী সব সূরাই "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" দিয়ে শুরু করা হয়েছে। তাহলে বৌদ্ধ ধর্মে মাইত্রি সম্পর্কে যে ভবিষ্যত বাণী করা হয়েছে তিনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
নবীজি সম্পর্কে বৌদ্ধ ধর্মে আরো অনেক ভবিষ্যতবাণী আছে। Sacerd Book of East-এর ১১নং খণ্ডের ৩৬ পৃষ্ঠায় আছে- মহা পরিনিব্বান সুত্তা ২নং অধ্যায়ের ৩২ অনুচ্ছেদে আছে- গৌতম বুদ্ধের ক্ষেত্রে তার কোন প্রকাশ্য অথবা গোপন শিক্ষা ছিল না। "হে আনন্দ তথাগতরা বা শিক্ষকরা জ্ঞান লুকিয়ে রাখবে না। জ্ঞানটা তোমাদের নিজের কাছে রেখে দেবে না। এটা প্রচার করতে হবে।" আমরা জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে ওহী হিসেবে যা পেয়েছিলেন, সেটা সবার মাঝে প্রচার করেছেন। আর সাহাবাগণকে বলেছেন এগুলো মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখ না। মানুষের মাঝে এগুলো প্রচার করো। ভবিষ্যৎবাণীতেও তাই বলা হয়েছে। এখানে প্রকাশ্য বা গুপ্ত কিছুই নেই, সবকিছুই মানুষের মাঝে প্রচার করতে হবে।
Sacerd Book of East-এর ১১ নং খণ্ডের ৫৭ নং পৃষ্ঠায় আরো আছে- মহা পরিনিব্বান সুত্তার ৫ অধ্যায়ের ৩৬ পৃষ্ঠায় বলা আছে যে, গৌতম বুদ্ধের যেমন এক পরিচারক আছে আনন্দ, তেমনি মাইত্রিরও এক পরিচারক থাকবে। ইতিহাস বা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সীরাত থেকে আমরা জানি, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিচারকের নাম ছিল হযরত আনাস (রা)। তিনি ছিলেন মালিকের পুত্র। হযরত আনাস (রা) বলেছেন- আট বছর বয়সে আমার বাবা-মা আমাকে নবীজির হাতে তুলে দেন। তার মা নবীজিকে বলেছিলেন- হে আল্লাহর রাসূল! একে আপনার পরিচারক হিসেবে গ্রহণ করুন। হযরত আনাস (রা) বলেছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের ছেলের মতই দেখতেন। আমরা জানি হযরত আনাস (রা) সব সময় নবীজির সঙ্গে থাকতেন, এমনকি বিপদের সময়ও। এভাবে আনন্দের সাথে তাকে তুলনা করা যায় যে, যখন গৌতম বুদ্ধের দিকে একটা পাগলা হাতী তেড়ে এল আনন্দ তখন বুদ্ধের সামনে দাড়িয়েছেন। একইভাবে ওহুদের যুদ্ধের সময় শত্রুরা যখন নবীজিকে ঘিরে ফেলল, হযরত আনাস (রা) নবীজির পাশেই ছিলেন তার বয়স ছিল এগার বছর। হুনাইনের যুদ্ধেও শত্রুর তীরন্দাজ বাহিনী নবীজিকে ঘিরে ফেলল আনাস (রা) তখনো নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পাশে ছিলেন। তাহলে এ ভবিষ্যত বাণীও সত্য হল যে, মাইত্রির এক পরিচারক থাকবে।
গসপেল অব বুদ্ধ এর ২১৪ নং পৃষ্ঠায় আছে যে মাইত্রির ছয়টা গুণ থাকবে। তিনি রাতের বেলা আলোকপ্রাপ্ত হবেন, আলোক প্রাপ্ত হওয়ার পর উজ্জ্বল হবেন, তিনি স্বাভাবিকভাবে মারা যাবেন, তিনি রাতের বেলা মারা যাবেন, মারা যাওয়ার সময় তিনি উজ্জ্বল হবেন, মারা যাওয়ার পর এ পৃথিবীতে আর কখনো তাকে সশরীরে দেখা যাবে না। এ ছয়টা গুণাবলী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছিল। প্রথমতঃ আমরা জানি নবীজি (স) রাতের বেলায়ই প্রথম ওহী লাভ করেন। কোরআনের সূরা দুখানের ২ ও ৩নং আয়াত এবং সূরা ক্বদরের ১নং আয়াতে আছে- কোরআন নাযিল হয়েছিল- মহিমান্বিত রাতে। দ্বিতীয়তঃ তিনি উজ্জ্বল হবেন। আমরা জানি যে, আমাদের নবীজি (স) তখন উজ্জ্বল হয়েছিলেন, আলোকিত হয়েছিলেন। তৃতীয়তঃ তিনি স্বাভাবিকভাবে মারা যাবেন। আমরা জানি তিনি স্বাভাবিকভাবেই মারা গেছেন। চতুর্থতঃ তিনি মারা যাবেন রাতের বেলা। আর আয়েশা (রা) এর হাদীস থেকে আমরা জানি যে, নবীজির ঘরে প্রদীপে তেল ছিল না; তিনি পাশের বাড়ি থেকে তেল ধার নিলেন। অর্থাৎ নবীজি (স) মারা যাবার সময় রাত ছিল। পঞ্চমতঃ তিনি মারা যাওয়ার সময় উজ্জ্বল হবেন। হযরত আনাস (রা) বলেছেন যে, নবীজি মারা যাবার সময় খুব উজ্জ্বল ছিলেন। সবশেষেঃ মারা যাবার পর তাকে আর কখনো সশরীরে পৃথিবীতে দেখা যাবে না। আমরাও জানি যে, তিনি আর ফিরে আসবেন না। মদীনায় তার রওজা রয়েছে। তাকে সশরীরে আর দেখা যাবে না। বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থে উল্লেখ করা এসব কথা শুধুমাত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বেলাতেই খাটে।
Sacerd Book of East-এর ১০ খন্ডে ৬৮ পৃষ্ঠায় আরো বলা হয়েছে- তথাগতরা শুধু প্রচার করবে। অর্থাৎ যে বুদ্ধরা আসবেন তারা শুধু প্রচার করবেন। সূরা গাসিয়ার ২১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-
فَذَكِّرْ إِنَّمَا أَنْتَ مُذَكِّرٌ
অর্থঃ তোমার কাজ শুধু ধর্ম প্রচার করা।
Sacerd Book of East-এর ১০ খণ্ডের ৬৭ পৃষ্ঠায় আরো আছে- স্বর্গে যেতে হলে তোমার ভাল কাজগুলোর দরকার হবে। সূরা আসরের ১-৩ নম্বর আয়াতের আল্লাহ বলেছেন- "আসরের শপথ, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে, তারা ব্যতীত যাদের বিশ্বাস আছে, যারা মানুষকে ধৈর্য্য আর অধ্যবসায়ের পথে আনে; বেহেশতে যাওয়ার জন্য শর্ত হলো ন্যায়-নিষ্ঠতা। যে কথা বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থেও আছে।
ধর্মপরা মাত্তা সত্তার ১৫১ তে সর্বশেষ বুদ্ধ বা মাইত্রির বর্ণনায় বলা আছে, তিনি হবেন মানব জাতির প্রতি করুণা। তিনি হবেন ভদ্র, মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত, দয়ালু, আর তিনি হবেন সত্যবাদী। এসব কথাগুলো শুধুমাত্র সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বেলায় প্রযোজ্য। এ হল সংক্ষেপে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনা।
📄 ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মাদ (সা)
খ্রিষ্টান ধর্মের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল। বাইবেলের দুইটা খণ্ড। ওল্ড টেস্টামেন্ট আর নিউ টেস্টামেন্ট। ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের মতে বাইবেলে ৭৩টা বই আছে। আর প্রোটেস্টান্টদের মতে, তারা ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে সাতটা বই বাদ দিয়েছে। তাই তাদের বাইবেলে আছে ৬৬ টা বই। এদিকে ক্যাথলিক আর প্রোটেস্টান্টদের নিউ টেস্টামেন্ট সেখানে সাতাশটা বই আছে। কিন্তু ক্যাথলিকদের মতে ওল্ড টেস্টামেন্টে আছে ৪৬ টা বই। প্রোটেস্টান্টদের মতে সেখানে ৩৯টি বই আছে। ওল্ড টেস্টামেন্টে সে সব নবীদের কথা বলা আছে যারা ঈসা (আ) এর পূর্বে এ পৃথিবীতে এসছিলেন। আর নিউ টেস্টামেন্টে যিশু খ্রিষ্টের জীবন আর তার সময়ের কথা বলা হয়েছে।
আমরা প্রথমে ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থে নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনা নিয়ে কথা বলবো। ওল্ড টেস্টামেন্টের Book of Deuteronomy এর ১৮ অধ্যায় ১৮ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- মহান ঈশ্বর বলেছেন, আমি তোমার মত করে তোমার ভাইদের মধ্য হতে একজন নবীকে পাঠাবো। আমি তাকে ধর্ম প্রচার করতে বলবো। সে আমার আদেশে সব কথা বলবে। ঈশ্বর বলছেন আমি একজন নবী পাঠাবো তোমার ভাইদের মধ্য হতে যে তোমার মত হবে। অর্থাৎ মূসা (আ) এর মত হবে। আর খ্রিষ্টানরা বলে যে এ কথাগুলো বলা হচ্ছে যিশু খ্রিস্ট বা ঈসা (আ) সম্পর্কে। তাদেরকে যদি বলি যে, এটা কিভাবে ঈসা (আ) সম্পর্কে হয়; তারা বলে যে, যে নবী আসবেন তিনি মূসা (আ) এর মত হবেন, আর ঈসা (আ) ছিলেন মূসা (আ) এর মতই। তারপর যদি বলি তাদের মধ্যে মিলটা কোথায়? তারা তখন বলে যে, মূসা ও ঈসা (আ) তারা দুজনেই আল্লাহর নবী ছিলেন। আর তারা দুজনেই ইহুদী। তাই এখানে যিশু বা ঈসা (আ) সম্পর্কেই বলা হয়েছে। এই দুটো ব্যাপার এক হলেই যদি দাবী করা হয় যে, তিনি নবী ছিলেন আর ইহুদী ছিলেন, তাহলে বাইবেলে যতজন নবীর উল্লেখ আছে মূসা (আ) এর পরে সবার বেলায় এটা খাটে। যেমন ধরেন সোলায়মান, ইজিফিয়েল, আইজেক, আইজায়া, দানিয়েল, হোসিয়া, জোয়েল, জন্দা ব্যাপ্টিস্ট। তাঁরা সবাই আল্লাহর নবী। সবার বেলারই এটা খাটে।
ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যায় এই ভবিষ্যদ্বাণী সবচেয়ে বেশী মিলে যায় আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে। আসুন দেখি ভবিষ্যদ্বাণীতে কি বলা হয়েছে? এখানে বলা হয়েছে যে, আমি একজন নবী পাঠাবো তোমার ভাইদের মধ্য হতে যে তোমার মত হবে অর্থাৎ মূসা (আ) এর মত। লক্ষণীয় যে, মূসা আর মুহাম্মদ (স) তারা দুজনেই জন্মেছিলেন স্বাভাবিক ভাবে। তবে যিশু বা ঈসা স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেননি, তিনি কোন পুরুষের ঔরসজাত হয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। পবিত্র কোরআনের সূরা ইমরানের ৪৫-৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- তিনি কোন পুরুষের ঔরসজাত হয়ে জন্মননি, তিনি অলৌকিকভাবে জন্মেছেন। এছাড়াও বাইবেলের গসপেল অফ ম্যাথিউর ১নং অধ্যায়ের ১৮ অনুচ্ছেদে ৩৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে এভাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মূসা (আ) এর মত। কিন্তু ঈসা (আ) মূসা (আ) এর মত ছিলেন না।
এরপর আরো দেখবেন, মূসা (আ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুজনেই বিবাহিত ছিলেন। তাদের সন্তান ছিলো। কিন্তু বাইবেলের কথা মতে ঈসা (আ) অবিবাহিত ছিলেন। তার কোন সন্তান ছিলো না। তাহলে যিশু মূসার মত ছিলেন না। বরং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসা (আ) এর মত ছিলেন।
মূসা (আ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুজনেরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু যিশু বা ঈসা (আ) স্বাভাবিকভাবে মারা যাননি। পবিত্র কোরআনের সূরা নিসার ১৫৭-১৫৮ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
অর্থঃ "আল্লাহ ঈসা (যিশুকে) তার কাছে তুলে নিয়েছেন।"
আমরা জানি তিনি মারা যাননি। আর ভালো করে বাইবেল পড়লেও প্রমাণ করা যায় তিনি মারা যাননি। কিন্তু খ্রিষ্টানরা মনে করে যে যিশু বা ঈসা ক্রশবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তবে তর্কের খাতিরে এই কথা মেনে নিলেও বলতে হবে, যিশু ঈসা (আ) এর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। খ্রিষ্টানরা বাইবেলের ভুল ব্যাখ্যা করে। তারপরও সেটা মানলে এটা জানবেন যে যিশুর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। আমরা মানি তাকে জীবিত তুলে নেয়া হয়েছে, তাহলে আমরাও জানি তার মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ ঈসা (আ) মূসা (আ) এর মত নয় বরং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসা (আ) এর মত।
মূসা (আ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, দুজনেই নতুন শরীয়ত এনেছেন। তবে বাইবেলের ভাষ্য মতে যিশু বা ঈসা (আ) নতুন কোন শরীয়ত আনেননি। বাইবেলের গসপেল অব ম্যাথিউ ৫নং অধ্যায়ের ১৭-১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ভেব না যে আমি নবীদের শরীয়ত ধ্বংস করতে এসেছি আমি ধ্বংস করতে আসিনি, পূর্ণ করতে এসেছি।
মুসা (আ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নবী হওয়ার পাশাপাশি পৃথিবীতে শাসক হিসেবে ছিলেন অর্থাৎ কেউ অপরাধ করলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ক্ষমতা রাখতেন। এক্ষেত্রে যিশু বা ঈসা (আ) এর এ ক্ষমতা ছিল না। গসপেল অব জন এর ১৮ অধ্যায়ের ৩৬ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, যিশু তার নিজের মুখে বলেছেন "আমার রাজত্ব এ পৃথিবীতে নয়।" মুসা (আ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তাদের সময়ের অনুসারীরা আল্লাহর নবী হিসেবে মেনে নিয়েছিল। যিশু খ্রিস্টের সময় বেশিরভাগ লোক তাকে আল্লাহর নবী বলে মেনে নেয়নি। গসপেল অব জনের ১নং অধ্যায়ের ১১ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে- সবাই তাকে ত্যাগ করেছিল। তাহলে ভাল ভাবে লক্ষ্য করলে আপনারাও বুঝবেন যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন মুসা (আ) এর মত। কিন্তু ঈসা (আ) মুসা (আ) এর মত নন। তাহলে এই ভবিষ্যত বাণীটা মূলত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কেই করা হয়েছে।
এখানে লক্ষণীয় বলা হয়েছে আমি একজন নবী পাঠাবো তোমার ভাইদের মধ্য হতে। আর আমরা জানি, আরবরা ইহুদীদের জ্ঞাতি ভাই। মুসা নবী ইহুদী ছিলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আরব। অর্থাৎ আরব আর ইহুদীরা জ্ঞাতি ভাই। এখানে আরো বলা হয়েছে যে, আমি একজন নবী পাঠাবো যে তোমার মত করে, আমার কথামত ধর্মপ্রচার করবে, সে আমার আদেশ পালন করবে। আমরা জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে ওহী প্রাপ্ত হয়েছিলেন আর যা শুনেছিলেন তাই প্রচার করেছিলেন। যেন তাঁর মুখ দিয়ে আল্লাহর কথাই বের হচ্ছে। আর আল্লাহর আদেশেই তিনি পালন করেছিলেন। তাই এ ভবিষ্যত বাণীতে আসলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথাই বলা হয়েছে।
Book of Deuteronomy-এর ১৮ নং অধ্যায়ের ১৯ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে- "তোমরা আমার কথা না মানলে আমি তোমাদের ওপর প্রতিশোধ নিবো।" তার মানে যারা এ নবী বা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা শুনবে না, আল্লাহ তাদের ওপর প্রতিশোধ নিবেন। বুক অব আইজায়া এর ২৯ নং অধ্যায়ের ১২ নং অনুচ্ছেদের আছে- আসমানী কিতাব যাকে দেয়া হবে সে শিক্ষিত নয়। কিতাব দেয়া হবে সেই নবীকে যে শিক্ষিত নয়। তাকে যখন বলা হবে যে এটা পড়, সে বলবে আমি পড়তে জানি না। আর আমরা জানি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ওহী নিয়ে এসে জিবরাঈল (আ) তাকে বললেন ইকরা, পড়। তিনি বললেন আমি পড়তে জানি না। এভাবে উক্ত বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী মতে আসমানি কিতাব যে নবীকে দেয়া হলো, তিনি হলেন অশিক্ষিত তা সত্যি হলো। আমরা জানি যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরক্ষর ছিলেন। তিনি ছিলেন উম্মী, আর যখন তাকে বলা হয়, পড় তিনি তখন বলেন, আমি পড়তে জানি না। নবীজি সেটাই বলেছিলেন।
এছাড়াও ওল্ড টেস্টামেন্টে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা নাম ধরেও বলা হয়েছে। এটা বলা হয়েছে Song of Solomon -এর ৫ অধ্যায়ের ১৬ অনুচ্ছেদে যে, তার কণ্ঠ খুব মিষ্টি, সে খুব প্রিয়পাত্র, সে আমার প্রিয়জন, সে আমার বন্ধু, শোন জেরুজালেমের কন্যারা।" হিব্রুতে মুহাম্মাদিন শব্দটার অনুবাদ করা হয়েছে যে, খুব প্রিয়পাত্র। তবে সেমেটিক ভাষায় আরবী বা হিব্রুতে ‘হুম’ দিয়ে সম্মান বোঝানো হয়। যেমন হলো, আল্লাহ এলোহিম অর্থাৎ সম্মান দেখানো। তেমনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মান দেখিয়ে মুহাম্মাদিন বলা হচ্ছে। অর্থাৎ ওল্ড টেস্টামেন্টে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এখন যদি পড়েন, দেখবেন এটার অনুবাদ করা হয়েছে অত্যন্ত প্রিয় পাত্র।
এবার দেখা যাক নিউ টেস্টামেন্টে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কি উল্লেখ করা হয়েছে। এখন আমি যদি খ্রিষ্টানদের কথা বলি, ওল্ড টেস্টামেন্টে যা বলা আছে সেটা তারা মেনে নেবে কারণ এটা তাদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলেরই একটা অংশ। সূরা আরাফের ১৫৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- তারা অনুসরণ করে নিরক্ষর নবীকে, যার উল্লেখ রয়েছে তাওরাত এবং ইঞ্জিলে।"
সূরা সফ এর ৬নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
অর্থঃ "যিশু বা ঈসা (আ) ইবনে মরিয়াম ইসরাইলবাসীদের বলছেন- আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল হিসেবে এসেছি। আমার পূর্বে যেসব নবী রাসূল এসেছেন আমি তাদের সমর্থক। আর সুসংবাদ দিচ্ছি যে, আমার পরে একজন নবী আসবেন যার নাম হবে আহমদ।"
নিউ টেস্টামেন্ট পড়লে দেখা যায় সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। গসপেল অব জন এর ১৪ নং অধ্যায়ের ১৬ অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে- যিশু বা ঈসা (আ) বলছেন- আমি পিতার কাছে প্রার্থনা করবো, তিনি সাহায্যকারী পাঠাবেন। সে সব সময় তোমাদের সাথেই থাকবে। গসপেল অব জন ১৫ অধ্যায়ের ৭নং অনুচ্ছেদে আছে- যখন সেই সাহায্যকারী আসবে, আমার পিতা যাকে পাঠাবেন সে আমার সম্মান বৃদ্ধি করবে। এরপর গসপেল অব জন এর ১৬ অধ্যায়ের ৭নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে- আমি তোমাদের সত্যি কথাটাই বলি। আমি চলে গেলেই তোমাদের সবার জন্য ভালো হবে। কারণ আমি না গেলে সেই সাহায্যকারী আসবে না আর আমি গেলেই সে এখানে আসবে।" খ্রিষ্টানরা এ সাহায্যকারী বলতে পবিত্র আত্মাকে বোঝায়।
এখন এ ভবিষ্যত বাণীটা ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এখানে বলা হচ্ছে আমি চলে গেলেই একজন সাহায্যকারী আসবেন। সাহায্যকারী আসার একমাত্র শর্তই হলো আমি চলে যাওয়া। তিনি চলে গেলে তারপরই সাহায্যকারী আসবেন। আমরা জানি যিশুকে যখন ব্যাপ্টাইজ করা হয় পবিত্র আত্মা তখনও ছিল। এমনকি যিশুখ্রিষ্ট জন্মের পূর্বেও পবিত্র আত্মা সেখানে ছিল। যখন তিনি মায়ের গর্ভে ছিলেন। তাহলে সাহায্যকারী কখনো পবিত্র আত্মা হতে পারে না। তারপর এ সাহাযকারী শব্দটা যদি গ্রীক বা অ্যারামাইক ভাষা দেখেন, তাহলে দেখবেন- গ্রীক ভাষায় এ শব্দটা হলো- পেরাক্লিট, শব্দটার অনুবাদ করা হয়েছে সাহায্যকারী। পেরাক্লিট শব্দের অর্থ আসলে সমর্থন করা। মূল শব্দটা হলো পেরাক্লিটস। যার অর্থ যে প্রশংসা করে। অথবা যে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। আমরা জানি যে, নবীজি (স)-এর দুটো নাম, আহমদ আর মুহাম্মদ। শব্দটা যাই ধরেন, হোক সমর্থন বা সাহায্যকারী কিংবা প্রশংসনীয় বা প্রশংসার যোগ্য এ কথাগুলো সবচেয়ে বেশি মিলে যায় শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ক্ষেত্রে।
গসপেল অব জনের ১৬ নং অধ্যায়ের ১২-১৪ অনুচ্ছেদে আছে- যিশু বা ঈসা (আ) বলেছেন- তোমাদের আমি অনেক কিছুই বলতে চাই, কিন্তু তোমরা এখন সেগুলো বুঝবে না। কারণ সত্য আত্মা তোমাদেরকে সত্যের পথে নিয়ে যাবে। সে তার নিজের কথাগুলো বলবে না, যে কথাগুলো শুনবে সে গুলোই বলবে। সে আমাকে মহিমান্বিত করবে। সে তোমাদের ভবিষ্যতের কথা বলবে।" এখানে বলা হয়েছে আমি তোমাদের অনেক কিছুই বলতে চাই কিন্তু এখন তোমরা সেটা বুঝবে না। সত্য আত্মা যখন আসবে সে তোমাদেরকে সত্য পথে নিয়ে যাবে। সে নিজের কথা বলবে না। সে যা শুনবে তাই বলবে। আমরা জানি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর যা ওহী এসেছিল তিনি সেটাই বলেছিলেন। "সে তার নিজের কথা বলবে না, যেগুলো শুনবে সেগুলোই বলবে। সে তোমাদের ভবিষ্যতের কথা বলবে। সে আমাকে মহিমান্বিত করবে।" আমরা জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিশুকে মহিমান্বিত করেছেন পবিত্র কোরআনে আর হাদীসে। আমরা বিশ্বাস করি যিশু বা ঈসা (আ) হলেন মসী বা খ্রিষ্ট। আমরা বিশ্বাস করি যে, তিনি অলৌকিক ভাবে জন্মেছিলেন কোন পুরুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই। আমরা আরো বিশ্বাস করি তিনি আল্লাহর আদেশে মৃত মানুষকে জীবিত করেছিলেন, জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীদের সুস্থ করেছিলেন। তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিশুকে মহিমান্বিত করেছেন। তাহলে এ ভবিষ্যত বাণীটাও আসলে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে করা হয়েছে।
এই হলো ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের ধর্ম গ্রন্থে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনা।