📘 বিতর নামায 📄 দু'আ কুনূতের সময় তাকবীর দেয়া ও তাকবীরে তাহরীমার মত দু'হাত উত্তোলন

📄 দু'আ কুনূতের সময় তাকবীর দেয়া ও তাকবীরে তাহরীমার মত দু'হাত উত্তোলন


সাধারন মানুষ এটাকে উল্টা তাকবীর বলে থাকে। হেদায়ার গ্রন্থকার লিখেছেন, দু'আ কুনূত পড়ার সময় তাকবীর দিবে এবং দু'হাত উত্তোলন করবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “সাতটি স্থান ব্যতীত অন্য কোথাও হাত উত্তোলন করা যাবে না। সে সাতটি স্থানের মধ্যে একটি হলো কুনুতের সময়।”

ইমাম যায়লাঈ আল্ হানাফী স্বীয় গ্রন্থে বলেন: এ হাদীছটি হেদায়ার লেখক উল্লেখ করেছেন, কিন্তু হাদীসের মূল এবারতে (বাক্যে) কুনূত শব্দটির উল্লেখ কোথাও নেই।

সুতরাং কুনূতের সময় তাকবীর দিয়ে হাত উত্তোলনের কথাটি নিছক হেদায়ার লেখকের কথা, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কথা তো নয়ই, এমন কি কোন সাহাবী বা তাবেঈর কথা নয়। তাছাড়া (সাত স্থান ব্যতীত অন্য কোথাও হাত উত্তোলন করা যাবে না) হাদীছটি মারফু' ও মাওকুফ কোন সূত্রেই ছহীহ নয় তথা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা কোন ছাহাবী থেকে প্রমাণিত নয়।

অবশ্য মুহাম্মদ বিন নসর আল মারওয়াযী স্বীয় 'কিয়ামুল লাইল' নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কতিপয় ছাহাবী কুনূতের সময় তাকবীর দিতেন। কিন্তু আল্লামা মোবারকপুরী বলেন, যে সকল ছাহাবী কুনূতের সময় তাকবীর দিতেন বলে দাবী করা হয়, তার পক্ষে কোন সনদ খুজে পাওয়া যায় না।

হাদীছ শাস্ত্রের কষ্টি পাথরে যাচাই করে প্রমাণিত হলো দু'আ কুনূতের জন্য তাকবীর দেয়া এবং (কাঁধ বা কান বরাবর) উভয় হাত উত্তোলন করা কোন হাদীছের কথা নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহর অনুসরনকারীর জন্য উচিত হল আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছাড়া অন্য কারো কথার প্রতি কর্ণপাত না করা, একমাত্র তাঁরই আনুগত্য করা।

টিকাঃ
১. বিস্তারিত দেখুন ইমাম যায়লাঈ হানাফী (রহঃ) প্রণীত নসবুর রয়া ১ম খন্ড ছালাত অধ্যায়ঃ হাদীস নং ৩৮এর আলোচনা। (১/৪৬৯-৪৭১পৃঃ।) এ হাদীছটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। যেমন ত্ববরানী মু'জাম কাবীর গ্রন্থে কয়েকটি সূত্রে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। কোন বর্ণনাই বিশুদ্ধ নয়। ইমাম বুখারী (রফউল ইয়াদায়ন) গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন অতঃপর উহাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অনুরূপভাবে বায্যার স্বীয় সনদে ইবনে আব্বাস ও ইবনে ওমার থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেন এবং মত প্রকাশ করেন যে হাদীছটি বিশুদ্ধ নয়। এমনিভাবে হাকেম (মুস্তাদরাক) গ্রন্থে ইবনে আব্বাস ও ইবনে ওমার থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই ইবনে ওমার ও ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে একাধিক ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, উক্ত সাতটি স্থানের বাইরেও দু'হাত উঠানো যায়। যেমন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রুকুর পূর্বে ও পরে হাত উঠিয়েছেন, ইস্তেস্কার নামাযে হাত তুলেছেন।
১. দেখুন তোহফাতুল আহওয়াযী ৪৬৪ নং হাদীসের আলোচনা।

📘 বিতর নামায 📄 দু'হাত তুলে দু'আ কূনূত পড়া

📄 দু'হাত তুলে দু'আ কূনূত পড়া


এ সময় দু'হাত তুলে দু'আ কুনূত পড়তে পারবে। কেননা সাধারণ ভাবে দু'আ করার সময় দু'হাত উত্তোলন করা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

সালমান ফারেসী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "নিশ্চয় তোমাদের পালনকর্তা লজ্জাশীল সম্মানিত। কোন বান্দা তাঁর কাছে দু'হাত তুলে প্রার্থনা করলে তিনি উহা খালি ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।"

কুনূত একটি দু'আ, তাই এ অবস্থায় হাত তুলা উচিত। তাছাড়া হাত তুলে দু'আ কুনূত পড়ার ব্যপারে সাহাবায়ে কেরাম থেকেও প্রমাণ পাওয়া যায়। ইবনে মাসউদ, উমর বিন খাত্তাব, ইবনে আব্বাস, আবু হুরায়রা (রাঃ) প্রমূখ সাহাবী দু'আ কুনূত পড়ার সময় বুক বরাবর দু'হাত তুলতেন। ইমাম আহমাদ, ইমাম ইসহাকও এরূপ করতেন। আবু রাফে' থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এর পিছনে নামায পড়েছি। তিনি রুকূর পর কুনূত পড়েছেন। তখন হাত উঠিয়েছেন এবং দু'আ জোরে জোরে পড়েছেন।''

দু'আ শেষে দু'হাত মুখে মোছাঃ
দু'আ শেষ করার পর হাত দু'টিকে মুখে মুছার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোন হাদীছ প্রমাণিত হয়নি। তাই উহা না করাই শ্রেয়। এ সম্পর্কে একটি হাদীছ বর্ণিত হয়েছেঃ উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু'হাত উঠিয়ে দু'আ করলে, উহা মুখমন্ডলে না মুছে নীচে নামাতেন না।” কিন্তু এই হাদীছটি যঈফ।

ইমাম বায়হাক্বী বলেন, 'উত্তম হচ্ছে এরূপ না করা এবং সালাফে সালেহীন যা করেছেন তাকেই যথেষ্ট মনে করা। অর্থাৎ- শুধু হাত উঠিয়ে দু'আ করা কিন্তু উহা মুখে না মুছা।"

টিকাঃ
১. আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ বিতর নামায, অনুচ্ছেদঃ দু'আ হা/১২৭৩। তিরমিযী, অধ্যায়ঃ দু'আ, অনুচ্ছেদঃ হাদ্দাছানা মুহাম্মাদ বিন বাশার হা/৩৪৭৯। শায়খ আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেন, দ্রঃ ছহীহ সুন্নাত তিরমিযী, ৩/১৬৯।
২. বিস্তারিত দেখুন আল মুগনী ২/৫৮৪, তোহফাতুল আহওয়াযী ৪৬৪ নং হাদীসের আলোচনা দ্রষ্টব্য।
১. বায়হাক্বী, ২/২১২। বাইহাকী বলেন, এই বর্ণনার সূত্র ছহীহ। বায়হাক্বী আরো কতিপয় ছাহাবীর নাম উল্লেখ করেছেন, যারা কুনূতের সময় হাত উঠিয়ে দু'আ করেছেন। (দ্রঃ মুগনী ২/৫৮৪, শারহ মুমতে' ৪/২৬, ছহীহ মুসলিম শরহে নবভী ৫/৮৩।
২. তিরমিযী, অধ্যায়ঃ দু'আ, অনুচ্ছেদঃ দু'আয় দু'হাত উত্তোলন করা হা/৩৩০৮।
৩. ফিকুহুস্ সুন্নাহ্- সাইয়্যেদ সাবেক ১/১৮৫।

📘 বিতর নামায 📄 দু'আ কূনূত না জানলে

📄 দু'আ কূনূত না জানলে


আমাদের দেশের কতিপয় আলেম বলে থাকেন, যার দু'আ কুনূত মুখস্ত নেই সে তিনবার সূরায়ে এখলাছ অবশ্যই পড়বে। নতুবা বিতর আদায় হবে না। এ ব্যাপারে আল্লামা আবু মুহাম্মাদ আবদুল ওয়াহহাব সাদরী বলেন, একথাটি বেদলীল ও সনদহীন এবং সম্পূর্ণ মনগড়া কথা। কুরআন ও প্রিয় নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীছে যার কোন প্রমাণ ও সমর্থন নেই।

অতএব দু'আ কুনূত না জানলে তা পড়তে হবে না। কেননা আমার পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, দু'আ কুনূত পাঠ করা যেমন ওয়াজিব নয়, তেমনি উহা জানলেও যে সারা বছর পড়তে হবে তাও আবশ্যক নয়। বরং কখনো পড়বে কখনো ছাড়বে। এটাই সুন্নাত এবং সালাফে সালেহীন তথা ছাহাবায়ে কেরামের নীতি।
সালাফে সালেহীনের নীতি অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

টিকাঃ
১. হেদায়াতুন্ন নবী থেকে আইনী তোহফা ১/২২৭।

📘 বিতর নামায 📄 বিতর নামায শেষ করলে

📄 বিতর নামায শেষ করলে


বিতর নামাযের শেষে সালাম ফিরিয়েই অন্যান্য তাসবীহ দু'আ ইত্যাদি বলার পূর্বে 'সুবহানাল মালিকিল্ কুদ্দুস' কথাটি তিনবার বলা সুন্নাত। শেষেরবার একটু টেনে বলতে হয়। উবাই বিন কা'ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

فَإِذَا فَرَغَ قَالَ عِنْدَ فَرَاغِهِ سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْقُدُّوسُ ثَلاثَ مَرَّاتٍ يُطِيلُ فِي آخِرِهِنَّ

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর নামায শেষ করে তিনবার বলতেন, 'সুবহানাল মালিকিল কুদ্দুস' (আমি মহা পবিত্র বাদশার পবিত্রতা বর্ণনা করছি।) শেষ বার তিনি এই শব্দগুলো একটু বেশী টেনে উচ্চৈঃস্বরে বলতেন।”

টিকাঃ
১. নাসাঈ, অধ্যায়ঃ ক্বিয়ামুল্লায় ও নফল নামায, অধ্যায়ঃ বিতরের ক্ষেত্রে উবাই বিন কা'বের হাদীছ বর্ণনায় বর্ণনাকারীদের বাক্যের মধ্যে বিভিন্নতা। হা/১৬৮১। হাদীছটি ছহীহ (দ্রঃ মেশকাত- আলবানী ১/৩৯৮পৃঃ হা/১২৭৪, ১২৭৫)

ফন্ট সাইজ
15px
17px