📘 বিতর নামায > 📄 বিতরে কোন সূরা পাঠ করবে

📄 বিতরে কোন সূরা পাঠ করবে


তিন রাকাত বিতর নামাযে সূরা ফাতিহার পর সুন্নাতী ক্বেরাত হচ্ছেঃ প্রথম রাকাতে সূরা আ'লা, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফেরূন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাছ পাঠ করা।

উবাই বিন কা'ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিন রাকাত বিতর পড়তেন। তখন তিনি প্রথম রাকাতে পাঠ করতেন সাব্বেহিস্না রাব্বিকাল্ আ'লা, দ্বিতীয় রাকাতে পাঠ করতেন কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফেরূন এবং তৃতীয় রাকাতে পাঠ করতেন কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ।”

বিতর নামাযের শেষ রাকাতে সূরা ইখলাছের সাথে সূরা ফালাক ও নাস পড়ারও প্রমাণ পাওয়া যায়।

আবদুল আযীয বিন জুরাইজ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর নামাযে কি পাঠ করতেন? তিনি বললেন, তিনি প্রথম রাকাতে (সব্বেহিসমা রাব্বিকাল আ'লা) পাঠ করতেন, দ্বিতীয় রাকাতে পাঠ করতেন (কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফেরূন) এবং তৃতীয় রাকাতে পাঠ করতেন, (কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ) এবং মুআব্বেযাতাইন।

টিকাঃ
১. নাসাঈ, অধ্যায়ঃ কিয়ামুল্লায় ও নফল নামায, অধ্যায়ঃ বিতরের ক্ষেত্রে উবাই বিন কা'বের হাদীছ বর্ণনায় বর্ণনাকারীদের বাক্যের মধ্যে বিভিন্নতা। হা/১৬৮১। আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ বিতরে কি পাঠ করবে, হা/১২১৩। হাদীছটি ছহীহ (দ্রঃ মেশকাত- আলবানী ১/৩৯৮পৃঃ হা/১২৭৪, ১২৭৫)
২. [ছহীহ] তিরমিযী, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামাযে কি পাঠ করবে। হা/ ৪২৫। আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামাযে যা পাঠ করবে। হা/ ১২১৩। ইবনু মাজাহ্ অধ্যায়ঃ নামায কায়েম করা এবং তার মধ্যে সুন্নাত। অনুচ্ছেদঃ বিতর নামাযে যা পাঠ করবে। হা/৪৬৩। শায়খ আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেন, দ্রঃ ছহীহ্ তিরমিযী হা/৪৬৩।

📘 বিতর নামায > 📄 দু'আ কূনূতের বিবরণ

📄 দু'আ কূনূতের বিবরণ


যেহেতু ইতোপূর্বে প্রমাণিত হয়েছে যে, বিতর নামায ওয়াজিব নয়; বরং তা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। তাই বিতরের মাঝে কুনূতও ওয়াজিব নয়; বরং দু'আ কুনূত বিতর নামাযের জন্য মুস্তাহাব।

শায়খ আলবানী বলেন, 'কখনো কখনো নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর তথা বেজোড় রাকাত বিশিষ্ট ছালাতে কুনূত করতেন।'

তিনি বলেন, “আমরা এজন্য 'কখনো কখনো' করতেন বলেছি যে, যে সমস্ত ছাহাবী বিতর সম্পর্কিত হাদীছ সমূহ বর্ণনা করেছেন, তাঁরা এর মধ্যে কুনূতের কথা উল্লেখ করেননি। যদি সর্বদা তিনি বিতরে কুনূত পড়তেন তবে ছাহাবীগণ তা উল্লেখ করতেন। তবে হ্যাঁ, বিতরে কুনূত পড়ার কথা শুধুমাত্র উবাই বিন কা'ব (রাঃ) কর্তৃক নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। এথেকেই প্রমাণ হয় যে, তিনি কখনো কখনো উহা করতেন।"

তিনি আরো বলেন, "এ থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে, বিতরে কুনূত পড়া ওয়াজিব নয়। এজন্য হানাফী মাযহাবের গবেষক আলেম ইবনুল হুমাম ফাতহুল কাদীর গ্রন্থে [১/৩০৬, ৩৫৯, ৩৬০ পৃঃ স্বীকার করে বলেছেন, বিতরে কুনূত করা ওয়াজিব বলে যে মতটি রয়েছে তা অত্যন্ত দুর্বল যার পক্ষে কোন (ছহীহ) দলীল সাব্যস্ত হয়নি। নিঃসন্দেহে এ স্বীকৃতি তাঁর ন্যায়পরায়নতা ও গোঁড়ামী বর্জনের বড় দলীল। কেননা যে কথাকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন তা হচ্ছে তাঁর মাযহাবের বিপরীত।”

এ জন্য দু'আ কুনূত সারা বছর পড়তে পারে আবার কখনো পড়বে কখনো ছাড়বে- সবগুলোই জায়েয আছে। কেননা কোন কোন ছাহাবী ও তাবেঈ থেকে বিতরে কুনূত পরিত্যাগ প্রমাণিত হয়েছে। আবার কেউ কেউ শুধুমাত্র রামাযানের শেষ অর্ধেক ছাড়া সারা বছর আর কখনো কুনূত পড়েননি। আবার এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, অনেকে সারা বছরই কুনূত পড়েছেন।

ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রঃ) বলেন, 'এজন্য ইমাম মালেক কুনূত না পড়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। ইমাম শাফেয়ী শুধুমাত্র রামাযানের শেষ অর্ধেকে কুনূতের পক্ষপাতি ছিলেন। আর ইমাম আবু হানীফা ও আহমাদ সারাবছর কুনূত পড়ার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। সবগুল মতই জায়েয। যে কোন একটির উপর আমল করলে তাতে কোন দোষ নেই।’

টিকাঃ
১. কুনূত বলতে উদ্দেশ্য হচ্ছে, নামাযে নির্দিষ্টভাবে দাঁড়ানো অবস্থায় দু'আ করা।
১. আল মাওসূআ আল ফেকুহিয়্যাহ্ ১২৭-১২৮ পৃঃ। [দ্রঃ শায়খ আলবানী প্রণীত নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নামায ১৭৯ পৃঃ]
২. বুগইয়াতুল মুতাত্বওয়ে' ৭০ পৃঃ। [দ্রঃ মুছান্নাফ- ইবনু আবী শায়বা ২/৩০৫-৩০৬, মুখতাছার ক্বিয়ামুল্লায়ল লিল মারওয়াযী ১৩৫-১৩৬ পৃঃ, মাজমু' ফাতাওয়া ২২/২৭১]

📘 বিতর নামায > 📄 দু'আ কূনূত রুকূর আগে না পরে?

📄 দু'আ কূনূত রুকূর আগে না পরে?


বিতর নামাযের শেষ রাকাতে ক্বেরাত পড়ার পর রুকূর পূর্বে অথবা রুকু থেকে উঠার পর- উভয় অবস্থায় দু'আ কুনূত পড়া জায়েয।

রুকুর পূর্বে কুনূত পড়ার দলীলঃ উবাই বিন কা'ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর নামায পড়তেন, তখন রুকুর পূর্বে কুনূত পড়তেন।”
আলকুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবনে মাসউদ (রাঃ) ও নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ছাহাবীগণ বিতর নামাযে রুকুর পূর্বে কুনূত পড়তেন।

রুকুর পর কুনূত পড়ার দলীলঃ আবদুর রহামান বিন আবদুল আলক্বারী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন লোকদেরকে এক ইমামের পিছনে একত্রিত করলেন, তখন লোকেরা বিতরের কুনূতে কাফেরদের প্রতি লা'নত করতেন, অতঃপর দু'আ শেষ করে তাকবীর দিয়ে সিজদা করতেন।"

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফরয নামাযে কুনূত পড়ার সময় কখনো রুকুর আগে কখনো রুকুর পরে করেছেন। আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একমাস রুকূর পর কুনূত পাঠ করেছেন, তাতে তিনি আরবের কয়েকটি গোত্রের উপর বদদু'আ করছেন।”

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফজর নামাযের ক্বেরাত পাঠ শেষে তাকবীর দিয়ে রুকু করতেন। রুকু থেকে উঠে 'সামিয়্যাল্লাহুলিমান হামিদাহ্ রাব্বানা লাকাল হামদ্‌' বলে-দাঁড়ানো অবস্থাতেই তিনি দু'আ পড়তেন, 'আল্লাহুম্মা আন্জেল্ ওয়ালিদ বিন ওয়ালিদ ....।"'

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে বলা হয়েছে, “রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাঁচ ওয়াক্ত নামায যোহর, আছর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাযে লাগাতার একমাস কুনূত পাঠ করেছেন। প্রত্যেক নামাযের শেষ রাকাতে 'সাম্যিাল্লাহুলিমান হামিদাহ্' বলার পর তিনি দু'আ করতেন। সে সময় তিনি বানী সুলাইম গোত্রের কয়েকটি গোষ্ঠি- রি'ল, যাকওয়ান ও ঊছাই-এর উপর বদদু'আ করতেন। আর পিছনের মুছল্লীগণ তাঁর দু'আয় আমীন বলতেন।”

আনাস বিন মালেক (রাঃ) ফজরের নামাযে কুনূত পাঠ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেন, 'আমরা রুকুর আগে ও পরে কুনূত পাঠ করতাম।"

শায়খ আলবানী বলেন, 'হাসান সনদে প্রমাণিত হয়েছে যে, আবু বকর, ওমর ও উছমান (রাঃ) রুকুর পর কুনূত পাঠ করতেন।'

সারকথা, দু'আ কুনূত রুকুর আগে বা পরে যে কোন সময় পাঠ করা যায়। এতে কোন দোষ নেই। যখন যেভাবে ইচ্ছা পাঠ করতে পারবে।

টিকাঃ
১. ছালাতুল মু'মেন ৩৩০, মাজমু' ফাতাওয়া ২৩/৯৯, নায়লুল আওতার- শাওকানী ২/২২৬।
২. ইবনে মাজাহ্, অধ্যায়ঃ নামায প্রতিষ্ঠা করা ও তাতে সুন্নাত, অনুচ্ছেদঃ রুকুর পূর্বে বা পরে কুনূতের বর্ণনা। হা/১১৮২। নাসাঈ, অধ্যায়ঃ ক্বিয়ামুল্লায়ল ও নফল নামায, অধ্যায়ঃ বিতরের ক্ষেত্রে উবাই বিন কা'বের হাদীছ বর্ণনায় বর্ণনাকারীদের বাক্যের মধ্যে বিভিন্নতা। হা/১৬৮১। হাদীছটি ছহীহ, দ্রঃ ইরউয়াউল গালীল হা/৪২৬।
৩. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা ২/৩০২। বর্ণনাটি ছহীহ দ্রঃ ইরউয়াউল গালীল ২/১৬৬।
১. হাদীছটির প্রথমাংশ ছহীহ বুখারীতে রয়েছে, অধ্যায়ঃ তারাবীহ নামায, অনুচ্ছেদঃ রামাযানে ক্বিয়াম করার ফযীলত হা/২০১০। শেষাংশ রয়েছে ছহীহ ইবনু খুযায়মাতে ২/১৫৫-১৫৬ শায়খ আলবানী এর সনদকে ছহীহ বলেন, দ্রঃ ছালাতু তারাবীহ্ ৪১-৪২ পৃঃ
২. বুখারী, অধ্যায়ঃ বিতর, অনুচ্ছেদঃ রুকুর আগে ও পরে কুনূত পাঠ করা। হা/ ১০০২। মুসলিম, অধ্যায়ঃ মসজিদ ও নামাযের স্থান, অনুচ্ছেদঃ মুসলমানদের উপর কোন বিপদ আপতিত হলে সকল নামাযে কুনূত পাঠ করা মুস্তাহাব, হা/৬৭৭।
১. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মসজিদ ও নামাযের স্থান, অনুচ্ছেদঃ মুসলমানদের উপর কোন বিপদ আপতিত হলে সকল নামাযে কুনূত পাঠ করা মুস্তাহাব, হা/১০৮২।
২. আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ বিতর, অনুচ্ছেদঃ নামাযে কুনূত পাঠ করা, হা/১২৩১। শায়খ আলবানী হাদীছটির সনদকে হাসান বলেন, দ্রঃ ছহীহ আবু দাউদ, ১/২৭০।
৩. ইবনু মাজাহ্, অধ্যায়ঃ নামায প্রতিষ্ঠা করা, অনুচ্ছেদঃ রুকুর আগে-পরে কুনূতের বিবরণ হা/১১৭৩। শায়খ আলবানী হাদীছটির সনদকে হাসান বলেন, দ্রঃ ছহীহ ইবনু মাজাহ্ ১/১৯৫। ইরউয়াউল গালীল ২/১৬০।
১. ইরউয়াউল গালীল ২/১৬৪।

📘 বিতর নামায > 📄 ফরয নামাযে কূনূত

📄 ফরয নামাযে কূনূত


পর্বেল্লেখিত হাদীছ সমূহের ভিত্তিতে কাফেরদের পক্ষ থেকে যদি মুসলমানদের উপর বিশেষ কোন বিপদ উপস্থিত হয়, তখন কুনূত পাঠ করা মুস্তাহাব। যে কোন ফরয নামাযে তা পাঠ করতে পারে। এটাকে বলা হয় 'কুনূতে নাযেলা'। কাফেরদের উপর বদদু'আ অথবা দুর্বল মুসলমানদের উদ্ধারের জন্য দু'আ করতে এই কুনূত পাঠ করবে। কারণ দূরীভূত হলে কুনূত পড়া পরিত্যাগ করবে। সর্বদা ইহা পাঠ করা উচিত নয়। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একমাস কাফেরদের উপর বদদু'আ করেছেন। অনুরূপভাবে খোলাফায়ে রাশাদাও কুনূত পাঠ করতেন। কিন্তু তারা উহা সর্বদাই পাঠ করতেন না।

টিকাঃ
২. ইমাম ইবনে তায়মিয়া বলেন, ফরয নামাযে কুনূত পাঠের ব্যাপারে আলেমগণ তিনভাগে বিভক্ত হয়েছেনঃ
১) ফরয নামাযে কুনূত পাঠ করা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। সুতরাং উহা বিদআত। কেননা নবী উহা একমাস পড়ার পর ছেড়ে দিয়েছেন। তার এই ছেড়ে দেয়ায় প্রমাণ করে যে, উহা রহিত।
২) কুনূত পাঠ করা সর্বদাই বিধিসম্মত ও সুন্নাত। বিশেষ তরে ফজরের নামাযে।
৩) প্রয়োজনের সময় উহা সুন্নাত। অন্য সময় নয়। যেমনটি রাসূলুল্লাহ্ এবং তাঁর পর খোলাফায়ে রাশেদা করেছিলেন। এটাই বিশুদ্ধ কথা। তাঁরা বিপদ দূর হলে কুনূত পড়া ছেড়ে দিয়েছেন। যদি উহা মানসূখ হত, তবে খোলাফায়ে রাশেদা পড়তেন না। (বিস্তারিত দ্রঃ মাজমু ফাতাওয়া ২৩/৯৯, ১০৫-১০৮)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00