📄 মাগরিবের মত তিন রাকাত বিতর পড়া
তিন রাকাত বিতরের ক্ষেত্রে উল্লেখিত দু'টি পদ্ধতি ছাড়া আরো একটি পদ্ধতি আছে তা হলো বিতর নামাযকে মাগরিবের নামাযের মত করে পড়া। অর্থাৎ- দু'রাকাত পড়ে তাশাহুদ পড়ে সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া ও এক রাকাত পড়া। যেমন আমাদের সমাজে সচরাচর হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিটির পক্ষে দলীল হলো- আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, وتر الليل ثلاث ركعات كوتر النهار রাতের বিতর তিন রাকাত, উহা হল দিনের বিতর মাগরিবের মত। এ হাদীছটি ইমাম দারাকুতনী বর্ণনা করে বলেন, হাদীছটি ছহীহ নয়; উহা যঈফ।
ইমাম বাইহাক্বী বলেন, হাদীছটি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত হলেও তা মূলতঃ ইবনে মাসউদের নিজস্ব কথা হিসেবে প্রমাণিত। বিতর নামায মাগরিবের মত আদায় করার ব্যাপারে আরেকটি যুক্তি পেশ করা হয়। তা হচ্ছেঃ ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, المغرب وتر النهار فأوتروا صلاة الليل "মাগরিব হচ্ছে দিনের বিতর নামায। অতএব তোমরা রাতের নামাযকে বিতর কর।”
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীছ থেকে বুঝা যায়, রাতের বিতর মাগরিবের মত করেই আদায় করতে হবে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা এখানে রাকাতের সংখ্যার দিক থেকে যেমন মাগরিব নামায বিতর তথা বেজোড় করা হয়, অনুরূপ রাতেও বিতর তথা বেজোড় নামায আদায় করবে- উক্ত নামায আদায় করার জন্য মাগরিবের মত দু'ই তাশাহুদে পড়তে হবে একথা বলা হয়নি। এখানে রাকাতের সংখ্যার দিক থেকে বিতরকে মাগরিবের মত বলা হয়েছে- পদ্ধতির দিক থেকে নয়। এই কারণেই অন্য হাদীছে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর নামাযকে মাগরিবের সাথে সাদৃশ্য করে পড়তে নিষেধ করেছেন।
আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, لا تُوتروا بثلاث تَشَبَّهُوا بِصَلَاةِ المَغْرِبِ، ولكِنْ أَوْتِرُوا بِخَمْس أو بسبع أو يتسع أَوْ ياحدَى عَشَرَة “তোমরা মাগরিবের নামাযের সাথে সাদৃশ্য করে তিন রাকাত বিতর পড়না; বরং পাঁচ রাকাত দ্বারা বা সাত রাকাত দ্বারা বা নয় রাকাত দ্বারা কিংবা এগার রাকাত দ্বারা বিতর পড়।
শায়খ আলবানী বলেন, 'তিন রাকাত বিতর দু'তাশাহুদে পড়লেই তা মাগরিবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়। আর হাদীছে এটাকেই নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু যদি একেবারে শেষ রাকাতে বসে তবে কোন সাদৃশ্য হবে না। হাফেয ইবনু হাজার ফাতহুল বারীতে একথাই উল্লেখ করেছেন এবং ছানআনী সুবুলস্ সালামে এই পদ্ধতিকে উত্তম বলেছেন।'
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, বিতর নামাযকে মাগরিবের মত করে আদায় করা তথা দু'তাশাহুদে অর্থাৎ- দু'রাকাতের পর তাশাহুদ পড়ে সালাম না ফিরিয়ে এক রাকাত পড়া সুন্নাতের পরিপন্থী যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। অনেকে বলতে পারেন, আমরা কুনূত, ক্বিরাত ও বর্ধিত তাকবীরের মাধ্যমে মাগরিব থেকে পার্থক্য করে নেই। কিন্তু একথা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা বিতর নামাযে কুনূত পাঠ করা ঐচ্ছিক বা মুস্তাহাব বিষয়। তাছাড়া নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাগরিবের নামাযেও কুনূত পড়েছেন। আর ছহীহ্ হাদীছের ভিত্তিতে ফরয ছালাতের সমস্ত রাকাতে সূরা মিলানো যায়। বিতর নামাযে বর্ধিত তাকবীরের তো কোন ভিত্তিই নেই। সুতরাং প্রচলিত নিয়মে বিতর পড়লে তথা দু'রাকাত পড়ে তাশাহুদে বসে সালাম না ফিরিয়েই আরেক রাকাত পড়লে তা মাগরিবের সাথে মিলে যায় এবং হাদীছের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত হয়। অতএব এই নিয়মে বিতর পড়া উচিত নয়। শায়খ আলবানী বলেন, মাগরিবের মত করে দু'তাশাহুদে বিতর নামায সুস্পষ্ট ছহীহ্ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। এই কারণে আমরা বলব, তিন রাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে মধ্যখানে তাশাহুদের জন্য বসবে না। আর বসলে সালাম ফিরিয়ে দিবে। তারপর এক রাকাত পড়বে। আর তিন রাকাতের ক্ষেত্রে এটাই উত্তম পদ্ধতি।
টিকাঃ
১. নাসাঈ, অধ্যায়ঃ কিয়ামুল্লায়ল ও নফল নামায, অধ্যায়ঃ বিতরের ক্ষেত্রে উবাই বিন কা'বের হাদীছ বর্ণনায় বর্ণনাকারীদের বাক্যের মধ্যে বিভিন্নতা। হা/১৬৮১।
২. দারাকুতনী, ২/২৭,২৮। ও বায়হাকী হা/৪৮১২।
১. নাসবুর রায়া ২/১১৬।
২ হাদীছটি ইবনু ওমরের বরাতে ত্ববরানী বর্ণনা করেন। (দ্রঃ ছহীহুল জামে- আলবানী অনুচ্ছেদঃ রাতের নামায, হা/১৪৫৬।
১. তাহাভী, দারাকুতনী, ইবনু হিব্বান ও হাকিম হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। হাকিম হাদীছটিকে বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী ছহীহ আখ্যা দিয়েছেন এবং ইমাম যাহাবী সমর্থন করেছেন। ইবনু হাজার ও শাওকানীও ছহীহ্ বলেছেন। (দ্রঃ ফাতহুল বারী, ২/৫৫৮, নায়লুল আউতার ৩/৪২-৪৩। শায়খ আলবানীও ছহীহ আখ্যা দিয়েছেন (দ্রঃ ছালাতু তারাবীহ্- ৮৪ ও ৯৭ পৃঃ)
২. ফাতহুলবারী, ৪/৩০১।
৩. সুবুলুস্ সালাম, ১/১২২।
৪. ছালাতুত্ তারাবীহ্- আলবানী, পৃঃ ৯৭।
১. এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসবে। ইনশাআল্লাহ।
২. ছহীহ মুসলিম, অধ্যায়ঃ মসজিদ ও সিজদার স্থান, হা/১০৯৩, ১০৯৪।
৩. দেখুন মুসলিম শরীফ নবভীর ভাষ্যসহ। ৪/১৭২, ১৭৪।
৪. এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসবে। ইনশাআল্লাহ।
১. ছালাতুত্ তারাবীহ্- শায়খ আলবানী, পৃঃ ৯৮।
📄 গ) পাঁচ রাকাত বিতর
আবু আইয়্যুব আনছারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “প্রত্যেক মুসলমানের উপর হক হচ্ছে বিতর নামায আদায় করা। অতএব যে পাঁচ রাকাত বিতর পড়তে চায় সে পাঁচ, যে তিন রাকাত পড়তে চায় সে তিন এবং এক রাকাত বিতর পড়তে চায় সে এক রাকাত পড়তে পারে।”
عَنْ عَائِشَة أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُوتِرُ بِخَمْسٍ وَلَا يَجْلِسُ إِلَّا فِي آخِرِهِنَّ আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাঁচ রাকাত বিতর পড়তেন। এর মধ্যে কোথাও বসতেন না একেবারে শেষ রাকাতে বসতেন।”
টিকাঃ
২. আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামায কত রাকাত। হা/১২১২, ইবনু মাজাহ, অধ্যায়ঃ ছালাত প্রতিষ্ঠা করা, অনুচ্ছেদঃ বিতরের বর্ণনা তিন রাকাত, পাঁচ, সাত ও নয় রাকাত, হা/১১৮০।
১. মুসনাদে আহমাদ হা/২৪৫২০। সুনান নাসাঈ, অধ্যায়ঃ ক্বিয়ামুল্লায়ল ও নফল নামায, অনুচ্ছেদঃ কিভাবে পাঁচ রাকাত বিতর পড়বে, হা/১৬৯৮।
📄 ঘ) সাত রাকাত বিতর
আয়েশা (রাঃ) বলেন, فَلَمَّا সَنَّ نَبِيُّ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّমَ وَأَخَذَهُ اللَّحْمُ أَوْتَرَ بسبع “নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স্ক হয়ে যাওয়ার কারণে শরীর ভারি হয়ে গেলে সাত রাকাত বিতর পড়েছেন।”
এই সাত রাকাত পড়ার ক্ষেত্রে দু'রকম নিয়ম পাওয়া যায়। (১) সাত রাকাত একাধারে পড়বে। মধ্যখানে বসবে না তাশাহুদ পড়বে না। (২) ছয় রাকাত একাধারে পড়ে তাশাহুদ পড়বে। অতঃপর সালাম না ফিরিয়েই সপ্তম রাকাতের জন্য দাঁড়িয়ে পড়বে এবং তাশাহুদ পড়ে সালাম ফিরাবে।
প্রথম নিয়মের পক্ষে দলীল হচ্ছেঃ আয়েশা (রাঃ) বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স্ক হয়ে গেলে এবং তাঁর শরীর ভারী হয়ে গেলে তিনি সাত রাকাত বিতর পড়েছেন, একেবারে শেষ রাকাতে তাশাহুদে বসেছেন।”
উম্মে সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ﴿كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّমَ يُوتِرُ بِخَمْسٍ وَبِسَبْعِ لا يَفْصِلُ بَيْنَهَا بِسَلَامٍ وَلَا بِكَلامٍ﴾ “রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাঁচ রাকাত এবং সাত রাকাত বিতর পড়তেন। এ পাঁচ বা সাত রাকাতের মাঝে তিনি সালাম ফেরাতেন না বা কোন কথাও বলতেন না। অর্থাৎ একাধারে পাঁচ বা সাত রাকাত নামায পড়তেন।”
দ্বিতীয় পদ্ধতির দলীল হচ্ছেঃ আশেয়া (রাঃ) বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়বৃদ্ধ হয়ে গেলে এবং দুর্বল হয়ে পড়লে সাত রাকাত বিতর পড়েছেন। একাধারে ছয় রাকাত পড়ে তাশাহুদে বসেছেন। তারপর সালাম না ফিরিয়েই দাঁড়িয়ে পড়েছেন এবং সপ্তম রাকাত পড়েছেন তারপর সালাম ফিরিয়েছেন।”
টিকাঃ
২. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায। হা/১২৩৩।
১. সুনান নাসাঈ, অধ্যায়ঃ ক্বিয়ামুল্লায়ল ও নফল নামায, অনুচ্ছেদঃ কিভাবে সাত রাকাত বিতর পড়বে, হা/১৬৯৯।
২. নাসাঈ, অধ্যায়ঃ ক্বিয়ামুল্লায়ল ও নফল নামায, অনুচ্ছেদঃ কিভাবে সাত রাকাত বিতর পড়বে, হা/১৬৯৫। ছহীহ্ নাসাঈ- আলবানী হা/১/৩৭৫। ইবনে মাজাহ, অধ্যায়ঃ নামায প্রতিষ্ঠা করা, অনুচ্ছেদঃ বিতরের বর্ণনা তিন রাকাত, পাঁচ, সাত ও নয় রাকাত, হা/১১৮২। ছহীহ্ ইবনু মাজাহ্- আলবানী হা/১/১৯৭।
১. সুনান নাসাঈ, অধ্যায়ঃ ক্বিয়ামুল্লায় ও নফল নামায, অনুচ্ছেদঃ কিভাবে সাত রাকাত বিতর পড়বে, হা/১৭০০।
📄 ঙ) নয় রাকাত বিতর
এ নামায পড়ার পদ্ধতি হচ্ছে একাধারে আট রাকাত পড়ে বসে তাশাহুদ পড়বে। তারপর দাঁড়িয়ে নবম রাকাত পড়বে এবং তাশাহুদ পড়ে সালাম ফেরাবে। সা'দ বিন হিশাম (রঃ) বলেন, আমি উম্মুল মুমেনীন আয়েশা (রাঃ) কে প্রশ্ন করলাম, আপনি রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বিতর নামায সম্পর্কে আমাকে বলুন? তিনি বললেন, আমরা তাঁর জন্য মেসওয়াক এবং ওযুর পানি প্রস্তুত করে রাখতাম। আল্লাহর ইচ্ছায় যখন তিনি জাগ্রত হতেন তখন মেসওয়াক করতেন এবং ওযু করতেন অতঃপর নয় রাকাত নামায আদায় করতেন। এ সময় মধ্যখানে না বসে অষ্টম রাকাতে বসতেন। বসে আল্লাহর যিকির করতেন, তাঁর প্রশংসা করতেন ও দু'আ করতেন। অতঃপর সালাম না ফিরিয়েই দাঁড়িয়ে পড়তেন এবং নবম রাকাত আদায় করতেন। এরপর তাশাহুদে বসে আল্লাহর যিকির করতেন, তাঁর প্রশংসা করতেন ও দু'আ করতেন। অতঃপর আমাদেরকে শুনিয়ে জোরে সালাম ফিরাতেন।
উম্মু সালামা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তের রাকাত বিতর পড়তেন। যখন বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে গেছেন তখন নয় রাকাত বিতর পড়েছেন।”
টিকাঃ
১. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায। হা/১২৩৩।
২. নাসাঈ, অধ্যায়ঃ ক্বিয়ামুল্লায়ল ও নফল নামায, হা/ ১৬৮৯।