📘 বিতর নামায 📄 ক) এক রাকাত বিতর

📄 ক) এক রাকাত বিতর


এক রাকাত বিতর পড়ার নিয়ম হল, নিয়ত বেঁধে ছানা, সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা পড়ে রুকু করবে। রুকু থেকে উঠে দু'আ কুনূত পড়বে। তারপর দু'টি সিজদা করে তাশাহুদ, দরূদ ও দু'আ পড়ে সালাম ফিরাবে।

আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ مَثْنَى مَثْنَى وَيُوتِرُ بِرَكْعَةٍ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাতের নফল নামায দু'দু রাকাত করে পড়তেন এবং এক রাকাত বিতর পড়তেন।

আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আরো বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, الْوِتْرُ رَكْعَةٌ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ “বিতর হচ্ছে শেষ রাতে এক রাকাত নামায।”

আবু মিজলায হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ)কে বিতর নামায সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আমি শুনেছি রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "বিতর হচ্ছে শেষ রাতে এক রাকাত নামায।” তিনি বলেন, ইবনু ওমরকেও এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছি। তিনিও বলেন, আমি শুনেছি রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "বিতর হচ্ছে শেষ রাতে এক রাকাত নামায।”

ইমাম নবুবী বলেন, এসকল হাদীছ থেকে দলীল পাওয়া যায় যে, বিতর নামায এক রাকাত পড়া বিশুদ্ধ এবং তা শেষ রাতে আদায় করা মুস্তাহাব। আবু আইয়্যুব আনছারী (রাঃ) বর্ণিত হাদীছেও এক রাকাতের কথা প্রমাণিত হয়েছে। সেই হাদীছে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "... যে এক রাকাত বিতর পড়তে চায় সে এক রাকাত পড়তে পারে।"

সাহাবীদের মধ্যে আবু বকর, ওমর, ওছমান, আলী, সা'দ ইবনে আবী অক্কাস, মুআয বিন জাবাল, উবাই বিন কা'ব, আবু মূসা আশআরী, আবু দারদা, হুযায়ফা, ইবনে মাসঊদ, ইবনে ওমর, ইবনে আব্বাস, আবু হুরায়রা, মুআবিয়া, তামীম দারী, আবু আইয়্যুব আনসারী (রাযিআল্লাহu আনহুম) প্রমুখ এবং তাবেঈদের মধ্যে ইমাম যুহরী, হাসান বাছরী, মুহাম্মাদ বিন সীরীন, সাঈদ বিন যুবাইর (রহঃ) প্রমুখ আর প্রচলিত চার মাযহাবের তিন ইমাম ইমাম মালেক, শাফেয়ী, আহমাদ (রহঃ) প্রমুখও এক রাকাত বিতর পড়ার পক্ষপাতি ছিলেন।

সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মসজিদে এশা নামায আদায় করতেন, অতঃপর এক রাকাত বিতর পড়তেন, এর বেশী নয়। তাঁকে বলা হত, আবু ইসহাকু? আপনি এক রাকাতের বেশী বিতর আদায় করেন না? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমি শুনেছি রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি বিতর না পড়ে নিদ্রা যায় না সে দৃঢ়তা সম্পন্ন লোক।”

শায়খ আলবানী বলেন, হানাফী মাযহাবের কোন কোন আলেম বলেন, তিন রাকাতের নীচে কোন নামায নেই। তথা তিন রাকাত বিতর পড়ার ব্যাপারে এজমা (সকলের ঐক্যমত) হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের এই দাবী দলীল বিহীন। কেননা আমরা দেখেছি ছাহাবীদের মধ্যে অনেকেই এক রাকাত বিতর পড়েছেন। অতএব যারা বলেন, এক রাকাত কোন নামাযই নেই, তাদের জন্য উল্লেখিত আলোচনায় শিক্ষণীয় বিষয় আছে। কেননা স্বয়ং নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক রাকাত বিতর নামায আদায় করতেন। ছাহাবায়ে কেরামের মধ্যেও অনেকে এক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণ করেছেন। ইমাম শাফেয়ী বলেন, মুসলমানগণ একথার উপর ঐকমত্য হয়েছে যে, কারো নিকট যদি রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাত সুষ্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়, তবে কারো কথা মত উহা পরিত্যাগ করা বৈধ নয়। মহান আল্লাহ্ বলেন, فَلْيَحْذَرْ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ “যারা তাঁর (রাসূলের) নির্দেশের বিপরীত চলে, তারা সতর্ক হয়ে যাক যে, তারা ফেতনায় পড়ে যাবে অথবা কঠিন শাস্তি তাদেরকে স্পর্শ করবে।”

টিকাঃ
১. দ্র: বুখারী (বাংলা) হাদীস নং ৯৩৬, ৯৩২, ৯৩৪, মুসলিম হা/১২৫১।
২. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায, অনুচ্ছেদঃ রাতের নামায দু'দুরাকাত করে এবং বিতর শেষ রাতে এক রাকাত হা/ ১২৪৭।
১. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায, অনুচ্ছেদঃ রাতের নামায দু'দুরাকাত করে এবং বিতর শেষ রাতে এক রাকাত হা/ ১২৪৯।
২. শরহে নবুবী ছহীহ মুসলিম, ৬/২৭৭।
৩. আবু দাউদ হা/১২১২, ইবনু মাজাহ হা/১১৮০।
১. নায়লুল আওতার থেকে আইনী তোহফা ১/২২২পৃঃ।
২. মুসনাদে আহমাদ হা/১৩৮২।
৩. ছালাতু তারাবীহ্ পৃঃ ৮৫। বিস্তারিত দেখুনঃ ফাতহুল বারী ২/৩৮৫, নাসবুর রায়া ২/১২২।
১. সূরা নূরঃ আয়াত নং- ৬৩।

📘 বিতর নামায 📄 খ) তিন রাকাত বিতর

📄 খ) তিন রাকাত বিতর


এ নামায পড়ার বিশুদ্ধ পদ্ধতি হচ্ছে দু'টি।

প্রথম পদ্ধতিঃ দু'রাকাত পড়ে সালাম ফেরানো। অতঃপর এক রাকাত পড়া। এ পদ্ধতির দলীল হলো- আবদুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, اَنَّ رَجُلاً سَأَلَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّমَ عَنْ صَلَاةِ اللَّيْلِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ عَلَيْهِ السَّلام صَلاةُ اللَّيْلِ মַثْنَى مَثْنَى فَإِذَا خَشِيَ أَحَدُكُمُ الصُّبْحَ صَلَّى رَكَعَة وَاحِدَةً تُوتِرُ لَهُ مَا قَدْ صلى জনৈক ছাহাবী রাতের নামায সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “রাতের নামায দু'দু রাকাত করে, যখন ফজর হওয়ার আশংকা করবে তখন এক রাকাত বিতর পড়ে নিবে।”

এ পদ্ধতি অনুযায়ী বিতর মূলত এক রাকাতই। দু'রাকাত পড়ে সালাম ফিরানো অতঃপর এক রাকাত পড়া। যেমন ইবনে ওমর (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হল দু'দু রাকাত মানে কি? তিনি বললেন: প্রত্যেক দু'রাকাত পর পর সালাম ফিরাবে। ইবনে ওমর (রাঃ), ইমাম মালেক, শাফেয়ী, আহমাদ, ইসহাক, প্রমুখ এভাবেই বিতর পড়তেন। ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহu আনহুমা) থেকে আরো বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বিতর নামায সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, দু'রাকাত এবং এক রাকাতের মাঝে সালাম ফিরে পার্থক্য করে নিবে।

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: عَنْ عَائِشَة قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي فِي الحُجْرَةِ وَأَنَا فِي الْبَيْتِ فَيَفْصِلُ بَيْنَ الشَّفْعِ وَالْوَتْرِ بِتَسْلِيمٍ يُسْمِعُنَا আমি বাড়ীতে থাকাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কক্ষের মধ্যে নামায পড়তেন। তিনি দু'রাকাত এবং এক রাকাতের মাঝে পৃথক করতেন, এসময় তিনি আমাদেরকে শুনিয়ে জোরে সালাম দিতেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) আরো বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক রাকাত বিতর পড়তেন। তিনি দু'রাকাত এবং এক রাকাতের মাঝে কথা বলতেন।

নাফে' বলেন, আবদুল্লাহ্ বিন ওমর (রাঃ) বিতরের দু'রাকাত এবং এক রাকাতের মাঝে সালাম ফিরাতেন এবং কোন দরকারী বিষয় থাকলে তার নির্দেশ দিতেন।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ দু'রাকাত পড়ে তাশাহুদের জন্য না বসে সালাম না ফিরিয়ে একাধারে তিন রাকাত পড়ে সালাম ফেরানো। এ কথার দলীল, হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিনি রাকাত বিতর নামায পড়তেন। এর মধ্যে তাশাহুদের জন্যে বসতেন না, একাধারে তিন রাকাত পড়ে শেষ রাকাতে বসতেন ও তাশাহুদ পড়তেন। এভাবেই বিতর পড়তেন আমীরুল মু'মেনীন হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ)।

একাধারে তিন রাকাত বিতর পড়ার ইঙ্গিতে আরেকটি হাদীছ পাওয়া যায়। উবাই বিন কা'ব (রাঃ) বলেন, كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّমَ يَقْرَأْ فِي الوثر (بِسَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى) وَفِي الرَّكْعَةِ الثَّانِيَةِ (بِقُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ) وَفِي الثَّالِثَةِ (بِقُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ) وَلَا يُسَلِّمُ إِلَّا فِي آخِرِهِنَّ রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর নামাযে প্রথম রাকাতে ‘সাব্বেহিসমা রাব্বিকাল আ'লা’, দ্বিতীয় রাকাতে ‘কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফেরূন' এবং তৃতীয় রাকাতে ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ' পড়তেন। আর সবগুলো রাকাত শেষ করেই সালাম ফেরাতেন।

টিকাঃ
১. ছহীহ বুখারী, অধ্যায়ঃ বিতর নামায, অনুচ্ছেদঃ বিতরের বর্ণনা। হা/৯৩২ (বাংলা বুখারী)। মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায, হা/১২৩৯।
২. মুসলিম- হা/১২৫২।
৩. আল মুগনী ২/৫৮৮।
৪. আসরাম স্বীয় সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেন। দ্রঃ আল মুগনী ২/৫৮৯।
১. আহমাদ হা/২৩৩৯৮। এক্ষেত্রে ইবনু উমার থেকে আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায়ঃ আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহu আনহুমা) বিতরের দু'রাকাত এবং এক রাকাতের মধ্যে সালাম ফিরিয়ে পৃথক করতেন এবং তিনি বলেছেন যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরূপ করতেন। (ছহীহ্ ইবনু হিব্বান হা/২৪৩৩। হাফেয ইবনু হাজার বলেন, হাদীছটির সনদ শক্তিশালী, দ্রঃ ফাতহুল বারী ২/৪৮২।
২. মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, শায়খ আলবানী বলেন, হাদীছটির সনদ শায়খায়ন (বুখারী মুসলিমের) শর্তানুযায়ী ছহীহ। দ্রঃ ইরওয়াউল গালীল হা/৪২০।
১. ছহীহ বুখারী, অধ্যায়ঃ বিতর নামায, অনুচ্ছেদঃ বিতরের বর্ণনা। হা/৯৩২ (বাংলা বুখারী)। শায়খ বিন বায (রহঃ) বলেন, এ হাদীছটি মাওকুফ হলেও তা মারফু হাদীছকে শক্তিশালী করছে। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তিন রাকাত বিতর পড়তে চায়, তার জন্যে এ পদ্ধতিই সবচেয়ে উত্তম। (দ্রঃ ছালাতুল মু'মেন- সাঈদ কাহতানী পৃঃ ৩২৫।)
২. হাদীছটি বর্ণনা করেন ইমাম হাকেম, তিনি হাদীটিকে ছহীহ বলেন।
১. নাসাঈ, অধ্যায়ঃ কিয়ামুল্লায়ল ও নফল নামায, অধ্যায়ঃ বিতরের ক্ষেত্রে উবাই বিন কা'বের হাদীছ বর্ণনায় বর্ণনাকারীদের বাক্যের মধ্যে বিভিন্নতা। হা/১৬৮১।

📘 বিতর নামায 📄 মাগরিবের মত তিন রাকাত বিতর পড়া

📄 মাগরিবের মত তিন রাকাত বিতর পড়া


তিন রাকাত বিতরের ক্ষেত্রে উল্লেখিত দু'টি পদ্ধতি ছাড়া আরো একটি পদ্ধতি আছে তা হলো বিতর নামাযকে মাগরিবের নামাযের মত করে পড়া। অর্থাৎ- দু'রাকাত পড়ে তাশাহুদ পড়ে সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া ও এক রাকাত পড়া। যেমন আমাদের সমাজে সচরাচর হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিটির পক্ষে দলীল হলো- আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, وتر الليل ثلاث ركعات كوتر النهار রাতের বিতর তিন রাকাত, উহা হল দিনের বিতর মাগরিবের মত। এ হাদীছটি ইমাম দারাকুতনী বর্ণনা করে বলেন, হাদীছটি ছহীহ নয়; উহা যঈফ।

ইমাম বাইহাক্বী বলেন, হাদীছটি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত হলেও তা মূলতঃ ইবনে মাসউদের নিজস্ব কথা হিসেবে প্রমাণিত। বিতর নামায মাগরিবের মত আদায় করার ব্যাপারে আরেকটি যুক্তি পেশ করা হয়। তা হচ্ছেঃ ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, المغرب وتر النهار فأوتروا صلاة الليل "মাগরিব হচ্ছে দিনের বিতর নামায। অতএব তোমরা রাতের নামাযকে বিতর কর।”

ব্যাখ্যাঃ এ হাদীছ থেকে বুঝা যায়, রাতের বিতর মাগরিবের মত করেই আদায় করতে হবে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা এখানে রাকাতের সংখ্যার দিক থেকে যেমন মাগরিব নামায বিতর তথা বেজোড় করা হয়, অনুরূপ রাতেও বিতর তথা বেজোড় নামায আদায় করবে- উক্ত নামায আদায় করার জন্য মাগরিবের মত দু'ই তাশাহুদে পড়তে হবে একথা বলা হয়নি। এখানে রাকাতের সংখ্যার দিক থেকে বিতরকে মাগরিবের মত বলা হয়েছে- পদ্ধতির দিক থেকে নয়। এই কারণেই অন্য হাদীছে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর নামাযকে মাগরিবের সাথে সাদৃশ্য করে পড়তে নিষেধ করেছেন।

আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, لا تُوتروا بثلاث تَشَبَّهُوا بِصَلَاةِ المَغْرِبِ، ولكِنْ أَوْتِرُوا بِخَمْس أو بسبع أو يتسع أَوْ ياحدَى عَشَرَة “তোমরা মাগরিবের নামাযের সাথে সাদৃশ্য করে তিন রাকাত বিতর পড়না; বরং পাঁচ রাকাত দ্বারা বা সাত রাকাত দ্বারা বা নয় রাকাত দ্বারা কিংবা এগার রাকাত দ্বারা বিতর পড়।

শায়খ আলবানী বলেন, 'তিন রাকাত বিতর দু'তাশাহুদে পড়লেই তা মাগরিবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়। আর হাদীছে এটাকেই নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু যদি একেবারে শেষ রাকাতে বসে তবে কোন সাদৃশ্য হবে না। হাফেয ইবনু হাজার ফাতহুল বারীতে একথাই উল্লেখ করেছেন এবং ছানআনী সুবুলস্ সালামে এই পদ্ধতিকে উত্তম বলেছেন।'

সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, বিতর নামাযকে মাগরিবের মত করে আদায় করা তথা দু'তাশাহুদে অর্থাৎ- দু'রাকাতের পর তাশাহুদ পড়ে সালাম না ফিরিয়ে এক রাকাত পড়া সুন্নাতের পরিপন্থী যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। অনেকে বলতে পারেন, আমরা কুনূত, ক্বিরাত ও বর্ধিত তাকবীরের মাধ্যমে মাগরিব থেকে পার্থক্য করে নেই। কিন্তু একথা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা বিতর নামাযে কুনূত পাঠ করা ঐচ্ছিক বা মুস্তাহাব বিষয়। তাছাড়া নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাগরিবের নামাযেও কুনূত পড়েছেন। আর ছহীহ্ হাদীছের ভিত্তিতে ফরয ছালাতের সমস্ত রাকাতে সূরা মিলানো যায়। বিতর নামাযে বর্ধিত তাকবীরের তো কোন ভিত্তিই নেই। সুতরাং প্রচলিত নিয়মে বিতর পড়লে তথা দু'রাকাত পড়ে তাশাহুদে বসে সালাম না ফিরিয়েই আরেক রাকাত পড়লে তা মাগরিবের সাথে মিলে যায় এবং হাদীছের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত হয়। অতএব এই নিয়মে বিতর পড়া উচিত নয়। শায়খ আলবানী বলেন, মাগরিবের মত করে দু'তাশাহুদে বিতর নামায সুস্পষ্ট ছহীহ্ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। এই কারণে আমরা বলব, তিন রাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে মধ্যখানে তাশাহুদের জন্য বসবে না। আর বসলে সালাম ফিরিয়ে দিবে। তারপর এক রাকাত পড়বে। আর তিন রাকাতের ক্ষেত্রে এটাই উত্তম পদ্ধতি।

টিকাঃ
১. নাসাঈ, অধ্যায়ঃ কিয়ামুল্লায়ল ও নফল নামায, অধ্যায়ঃ বিতরের ক্ষেত্রে উবাই বিন কা'বের হাদীছ বর্ণনায় বর্ণনাকারীদের বাক্যের মধ্যে বিভিন্নতা। হা/১৬৮১।
২. দারাকুতনী, ২/২৭,২৮। ও বায়হাকী হা/৪৮১২।
১. নাসবুর রায়া ২/১১৬।
২ হাদীছটি ইবনু ওমরের বরাতে ত্ববরানী বর্ণনা করেন। (দ্রঃ ছহীহুল জামে- আলবানী অনুচ্ছেদঃ রাতের নামায, হা/১৪৫৬।
১. তাহাভী, দারাকুতনী, ইবনু হিব্বান ও হাকিম হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। হাকিম হাদীছটিকে বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী ছহীহ আখ্যা দিয়েছেন এবং ইমাম যাহাবী সমর্থন করেছেন। ইবনু হাজার ও শাওকানীও ছহীহ্ বলেছেন। (দ্রঃ ফাতহুল বারী, ২/৫৫৮, নায়লুল আউতার ৩/৪২-৪৩। শায়খ আলবানীও ছহীহ আখ্যা দিয়েছেন (দ্রঃ ছালাতু তারাবীহ্- ৮৪ ও ৯৭ পৃঃ)
২. ফাতহুলবারী, ৪/৩০১।
৩. সুবুলুস্ সালাম, ১/১২২।
৪. ছালাতুত্ তারাবীহ্- আলবানী, পৃঃ ৯৭।
১. এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসবে। ইনশাআল্লাহ।
২. ছহীহ মুসলিম, অধ্যায়ঃ মসজিদ ও সিজদার স্থান, হা/১০৯৩, ১০৯৪।
৩. দেখুন মুসলিম শরীফ নবভীর ভাষ্যসহ। ৪/১৭২, ১৭৪।
৪. এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসবে। ইনশাআল্লাহ।
১. ছালাতুত্ তারাবীহ্- শায়খ আলবানী, পৃঃ ৯৮।

📘 বিতর নামায 📄 গ) পাঁচ রাকাত বিতর

📄 গ) পাঁচ রাকাত বিতর


আবু আইয়্যুব আনছারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “প্রত্যেক মুসলমানের উপর হক হচ্ছে বিতর নামায আদায় করা। অতএব যে পাঁচ রাকাত বিতর পড়তে চায় সে পাঁচ, যে তিন রাকাত পড়তে চায় সে তিন এবং এক রাকাত বিতর পড়তে চায় সে এক রাকাত পড়তে পারে।”

عَنْ عَائِشَة أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُوتِرُ بِخَمْسٍ وَلَا يَجْلِسُ إِلَّا فِي آخِرِهِنَّ আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাঁচ রাকাত বিতর পড়তেন। এর মধ্যে কোথাও বসতেন না একেবারে শেষ রাকাতে বসতেন।”

টিকাঃ
২. আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামায কত রাকাত। হা/১২১২, ইবনু মাজাহ, অধ্যায়ঃ ছালাত প্রতিষ্ঠা করা, অনুচ্ছেদঃ বিতরের বর্ণনা তিন রাকাত, পাঁচ, সাত ও নয় রাকাত, হা/১১৮০।
১. মুসনাদে আহমাদ হা/২৪৫২০। সুনান নাসাঈ, অধ্যায়ঃ ক্বিয়ামুল্লায়ল ও নফল নামায, অনুচ্ছেদঃ কিভাবে পাঁচ রাকাত বিতর পড়বে, হা/১৬৯৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px