📄 বিতর নামাযকে ওয়াজিব বলার পক্ষে দলীল এবং তার জবাব
নিম্নে ওয়াজিবের অর্থ বহণ করে এমন দলীল সমূহ উল্লেখ করে তার জবাব প্রদান করা হচ্ছেঃ
১) আমর বিন আস (রাঃ) একদা জুমআর খুতবা প্রদান কালে বলেন, আবু বাছরা (রাঃ) আমার কাছে হাদীছ বর্ণনা করেছেন যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের জন্য একটি নামায বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। উহা হচ্ছে বিতর নামায। তোমরা উহা ফজর ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে আদায় কর।”
বর্তমান যুগের শ্রেষ্ট মুহাদ্দিছ ও আলেম আল্লামা শায়খ আলবানী তাঁর বিখ্যাত হাদীছের সংকলন 'সিলসিলা ছহীহা' (১/২২২) গ্রন্থে এই হাদীছটি উল্লেখ করে বলেন, 'এই হাদীছের বাহ্যিক অর্থ অনুযায়ী বিতর নামায ওয়াজিব প্রমাণিত হয়। হানাফী আলেমগণ একথাই বলেন। কিন্তু ইহা জমহুর তথা অধিকাংশ বিদ্বানের বিপরীত মত। অকাট্য দলীল প্রমাণ দ্বারা যদি একথা প্রমাণিত না হত যে, দিন-রাতে শুধুমাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাযই ফরয এর বেশী নয়, তবে হানাফী ভাইদের কথা অধিক বিশুদ্ধ প্রমাণিত হত।' তিনি আরো বলেন, 'হানাফী বিদ্বানগণ তাদের দাবীর পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেন, বিতর নামায হুবহু পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মত ফরয নয়। উহা ফরয ও সুন্নাতের মধ্যবর্তী স্থানে একটি আবশ্যকীয় আমল। এই আমলটি প্রমাণের দিক থেকে ফরযের চাইতে নিম্নে কিন্তু তাগিদের দিক থেকে সুন্নাতের চাইতে অধিক শক্তিশালী। জেনে রাখা আবশ্যক যে, হানাফী মাযহাবের এই পরিভাষাটি তাদের নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ নতুন। ছাহাবায়ে কেরাম বা পূর্ববর্তী বিদ্বানগণ তার সাথে পরিচিত ছিলেন না। এই পরিভাষা মতে ওয়াজিব বিষয় মর্যাদা, গুরুত্ব ও প্রতিদানের ক্ষেত্রে ফরযের চাইতে কম। তাদের এই কথানুযায়ী এর অর্থ দাঁড়ায়: ক্বিয়ামত দিবসে বিতর নামায পরিত্যাগকারীর শাস্তি হবে ফরয নামায পরিত্যাগকারীর চাইতে কম। এই সময় তাদেরকে আমরা বলবঃ যে লোক পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের অতিরিক্ত কোন নামায আদায় না করার ব্যাপারে দৃঢ় কথা বলে, কিভাবে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সম্পর্কে বলতে পারেন, “লোকটি মুক্তি পেয়ে যাবে।"?'
কিভাবে শাস্তির সাথে মুক্তি একত্রিত হতে পারে? কোন সন্দেহ নেই যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উক্ত বাণীই এটা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট যে, বিতর নামায ওয়াজিব নয়। আর এ জন্যই অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম ঐকমত্য হয়েছেন যে, বিতর নামায সুন্নাত; উহা ওয়াজিব নয়। আর এটাই হক ও ধ্রুব সত্য।'
২) আমর বিন শুআইব থেকে বর্ণিত। তিনি তাঁর পিতা থেকে তিনি তাঁর দাদা আবদুল্লাহ্ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের জন্য একটি নামায বৃদ্ধি করেছেন। তোমরা উহার সংরক্ষণ কর। উহা হচ্ছে বিতর নামায।”
এই হাদীছ দ্বারা বিতর নামায ওয়াজিব একথা সাব্যস্ত হয় না। এখানে বৃদ্ধি করার অর্থ ইহসান ও অনুগ্রহের দিক থেকে- তথা আল্লাহ্ আমাদের প্রতি একটি অনুগ্রহ বৃদ্ধি করেছেন। অথবা অর্থ হবে গুরুত্ব ও ফযীলতের দিক থেকে- তথা একটি ফযীলতপূর্ণ আমল আল্লাহ আমাদের জন্য বৃদ্ধি করেছেন। এই জন্য মুনাবী বলেন, বৃদ্ধিকৃত নামায যে মূল (ফরয) নামাযের মধ্যেই শামিল হতে হবে এটা আবশ্যক নয়। একথার পক্ষে দলীল হচ্ছে, মারফু' সূত্রে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ, তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "নিশ্চয় তোমাদের নামাযের সাথে আরেকটি নামায আল্লাহ্ বৃদ্ধি করেছেন। উহা তোমাদের জন্য একটি লাল উটের চাইতে উত্তম। আর তা হচ্ছে ফজর নামাযের পূর্বে দু'রাকাত নামায।"
৩) আবদুল্লাহ্ বিন বুরায়দা থেকে বর্ণিত। তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি শুনেছি রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "বিতর নামায হক বা আবশ্যক। যে বিতর পড়বে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" এই হাদীছটি যঈফ। কেননা এর সনদে উবাইদুল্লাহ্ বিন আবদুল্লাহ্ আল আতাক্বী আল মারওয়াযী যঈফ। এই কারণে এই হাদীছ দলীল হওয়ার উপযুক্ত নয়।
৪) আবদুল্লাহ্ বিন মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “বিতর নামায আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ওয়াজিব।” এর সনদে জাবের জু'ফী নামক জনৈক বর্ণনাকারী আছে, অধিকাংশ মুহাদ্দেছীনের মতে সে যঈফ বা দুর্বল। অতএব এই হাদীছ দ্বারাও দলীল গ্রহণ করা সঠিক হবে না。
৫) মুআ'য বিন জাবাল (রাঃ) একদা শাম গমণ করে দেখেন সেখানকার লোকেরা বিতর নামায পড়েনা। তিনি মুআ'বিয়া (রাঃ) কে বললেন, কি ব্যাপার এদেশের লোকেরা দেখছি বিতর নামায পড়ে না? মুআ'বিয়া বললেন, এ নামায কি ওয়াজিব নাকি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি শুনেছি রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “আমার পালনকর্তা আমার জন্য একটি নামায বৃদ্ধি করেছেন। উহা হচ্ছে বিতর নামায। এর সময় হচ্ছে এশা থেকে নিয়ে ফজর উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।” এই হাদীছটি যঈফ।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ হা/২২৭৩১, শায়খ আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেন, (দ্রঃ সিলসিলা ছহীহা হা/১০৮, ইরউয়া গালীল হা/৪২৩, ছহীহ ইবনু মাজাহ্ হা/৯৫৮।)
১. এই হাদীছটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্রঃ পৃঃ ১৭-১৮。
২. আল মাওসূআ আল ফেকুহিয়্যাহ্, ২/১১৪-১১৫পৃঃ。
১. মুসনাদে আহমাদ হা/ ৬৬২৫। (শায়খ আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেন, দ্রঃ তারতীব ছহীহুল জামে' হা/১৪৪৪।)
২. দেখুন নাসবুর্ রায়া- ইমাম যায়লাঈ হানাফী ২/১১১ পৃঃ。
৩. আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ যে বিতর পড়ে না তার বিধান, হা/১২০৯。
১ দ্রঃ মেশকাত- আলবানী ১/৩৯৯ পৃঃ হা/১২৭৮。
২. হাদীছটি বর্ণনা করেছেন বায্যার। মাজমাউয যাওয়ায়েদ ২/২৪০পৃঃ。
৩. নায়লুল আওতার, শাওকানী, ৩/৩২。
১. মুসনাদে আহমাদ হা/২১০৮১。
২. যে হাদীছের সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে- তথা সনদের কোন এক স্থানে এক বা একাধিক বর্ণনাকারীর নাম বাদ পড়েছে তাকে মুনকাতা হাদীছ বলে। আর মুনকাতা' হাদীছ যঈফ হাদীছের অন্তর্ভুক্ত。
৩. বিস্তারিত দেখুন নসবুর রায়া- ইমাম যায়লাঈ ২/১১২পৃঃ।
📄 বিতর নামাযের সময়
এ নামাযের সময় হল, এশার নামাযের পর থেকে নিয়ে ফজর উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত। উক্ত সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে এ নামায আদায় করবে; যেমন ইতিপূর্বে খারেজা ইবনে হুযাফা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শেষ রাত্রে অর্থাৎ ফজরের পূর্বে আদায় করা উত্তম। ছহীহ হাদীছে প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো রাতের প্রথম ভাগে কখনো দ্বিতীয় ভাগে এবং অধিকাংশ সময় শেষ ভাগে বিতর নামায পড়েছেন।
আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাতের প্রত্যেকভাগে রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর নামায পড়েছেন। রাতের প্রথমভাগে, রাতের মধ্যভাগে অতঃপর রাতের শেষভাগে বিতর পড়া তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়।”
জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "যে ব্যক্তি এই আশংকা করে যে, শেষ রাতে নফল নামায পড়ার জন্য উঠতে পারবে না, তবে সে যেন রাতের প্রথমভাগেই বিতর নামায পড়ে নেয়। আর যে ব্যক্তি শেষ রাতে ক্বিয়াম করার আগ্রহ রাখে সে যেন শেষ রাতেই বিতর নামায পড়ে। কেননা শেষ রাতের নামাযে ফেরেশতাগণ উপস্থিত হন। আর এটাই উত্তম।”
আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "তোমরা তোমাদের রাতের নামাযের সর্বশেষে বিতর নামায আদায় করবে।”
রাতের শেষভাগে বিতর নামায পড়া মর্যাদা সম্পন্ন ও উত্তম হওয়ার জন্য নিম্ন লিখিত হাদীছটিতেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়ঃ আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "রাতের অর্ধেক অথবা দুই তৃতীয়াংশ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন অতঃপর বলেন, আছে কি কোন প্রার্থনাকারী তাকে প্রদান করা হবে, আছে কি কোন আহবানকারী তার দু'আ কবুল করা হবে, আছে কি কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী তাকে ক্ষমা করা হবে। এভাবে ফজর পর্যন্ত ডাকতে থাকেন।”
কিন্তু কোন লোক শেষ রাতে জাগতে পারবে না যদি এরকম আশংকা রাখে তবে তার জন্য রাতের প্রথমাংশেই বিতর পড়ে নেয়া উত্তম। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু আমাকে তিনটি বিষয়ে উপদেশ দিয়েছেন, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আমি উহা পরিত্যাগ করব না। ১) প্রত্যেক মাসে তিনটি নফল রোযা (প্রত্যেক আরবী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) ২) চাশতের নামায (ছালাতুয যুহা), ৩) নিদ্রা যাওয়ার পূর্বে বিতর নামায পড়া।”
হাফেয ইবনু হাজার বলেন, এ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নিদ্রা যাওয়ার পূর্বে বিতর পড়া মুস্তাহাব। এটা ঐ ব্যক্তির জন্য যে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়ে বিতর পড়ার ব্যাপারে নিশ্চিত থাকবে না। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতরের শেষ সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "ফজর হওয়ার পূর্বে তোমরা বিতর নামায আদায় করে নাও।”
অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "সকাল হওয়ার আগেই তোমরা দ্রুত বিতর পড়ে নাও।” কেননা ফজর উদিত হয়ে গেলে রাতের নামাযের আর সময় অবশিষ্ট থাকে না। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "ফজর উদিত হয়ে গেলে রাতের সকল নামায এবং বিতর নামাযের সময় শেষ হয়ে যায়। অতএব তোমরা ফজরের পূর্বেই বিতর নামায আদায় করে নাও।”
টিকাঃ
১. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায হা/১২৩১। বুখারী, অধ্যায়ঃ জুমআ হা/৯৪১。
১. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায হা/১২৫৫। তিরমিযী, ইবনু মাজাহ্。
২. বুখারী, অধ্যায়ঃ জুমআর নামায, অনুচ্ছেদঃ সর্বশেষে বিতর নামায পড়া, হা/৯৪৩। ও মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায, অনুচ্ছেদঃ রাতের নামায দু'দু রাকাত এবং শেষ রাতে বিতর এক রাকাত, হা/১২৪৫。
১. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায হা/১২৬৩。
১. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায হা/১২৬৩。
২. বুখারী, অধ্যায়ঃ ছিয়াম, অনুচ্ছেদঃ আইয়্যামে বীযের ছিয়াম পালন করা। হা/১১০৭ মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায, অনুচ্ছেদঃ চাশতের নামায মুস্তাহাব হা/১১৮২。
১. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায, অনুচ্ছেদঃ রাতের নামায দু'দু' রাকাত করে এবং শেষ রাতে এক রাকাত বিতর। হা/১২৫৩。
২. মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফিরের নামায হা/ ১২৪৩。
১. তিরমিযী, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ ফজর হওয়ার আগেই দ্রুত বিতর পড়ে নেয়া হা/৪৬৯। ছহীহ তিরমিযী- আলবানী হা/ ১/১৪৬। ইরউয়াউল গালীল ২/১৫৪।
📄 বিতরে কোন সূরা পাঠ করবে
তিন রাকাত বিতর নামাযে সূরা ফাতিহার পর সুন্নাতী ক্বেরাত হচ্ছেঃ প্রথম রাকাতে সূরা আ'লা, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফেরূন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাছ পাঠ করা।
উবাই বিন কা'ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিন রাকাত বিতর পড়তেন। তখন তিনি প্রথম রাকাতে পাঠ করতেন সাব্বেহিস্না রাব্বিকাল্ আ'লা, দ্বিতীয় রাকাতে পাঠ করতেন কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফেরূন এবং তৃতীয় রাকাতে পাঠ করতেন কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ।”
বিতর নামাযের শেষ রাকাতে সূরা ইখলাছের সাথে সূরা ফালাক ও নাস পড়ারও প্রমাণ পাওয়া যায়।
আবদুল আযীয বিন জুরাইজ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর নামাযে কি পাঠ করতেন? তিনি বললেন, তিনি প্রথম রাকাতে (সব্বেহিসমা রাব্বিকাল আ'লা) পাঠ করতেন, দ্বিতীয় রাকাতে পাঠ করতেন (কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফেরূন) এবং তৃতীয় রাকাতে পাঠ করতেন, (কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ) এবং মুআব্বেযাতাইন।
টিকাঃ
১. নাসাঈ, অধ্যায়ঃ কিয়ামুল্লায় ও নফল নামায, অধ্যায়ঃ বিতরের ক্ষেত্রে উবাই বিন কা'বের হাদীছ বর্ণনায় বর্ণনাকারীদের বাক্যের মধ্যে বিভিন্নতা। হা/১৬৮১। আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ বিতরে কি পাঠ করবে, হা/১২১৩। হাদীছটি ছহীহ (দ্রঃ মেশকাত- আলবানী ১/৩৯৮পৃঃ হা/১২৭৪, ১২৭৫)
২. [ছহীহ] তিরমিযী, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামাযে কি পাঠ করবে। হা/ ৪২৫। আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামাযে যা পাঠ করবে। হা/ ১২১৩। ইবনু মাজাহ্ অধ্যায়ঃ নামায কায়েম করা এবং তার মধ্যে সুন্নাত। অনুচ্ছেদঃ বিতর নামাযে যা পাঠ করবে। হা/৪৬৩। শায়খ আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেন, দ্রঃ ছহীহ্ তিরমিযী হা/৪৬৩।
📄 দু'আ কূনূতের বিবরণ
যেহেতু ইতোপূর্বে প্রমাণিত হয়েছে যে, বিতর নামায ওয়াজিব নয়; বরং তা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। তাই বিতরের মাঝে কুনূতও ওয়াজিব নয়; বরং দু'আ কুনূত বিতর নামাযের জন্য মুস্তাহাব।
শায়খ আলবানী বলেন, 'কখনো কখনো নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর তথা বেজোড় রাকাত বিশিষ্ট ছালাতে কুনূত করতেন।'
তিনি বলেন, “আমরা এজন্য 'কখনো কখনো' করতেন বলেছি যে, যে সমস্ত ছাহাবী বিতর সম্পর্কিত হাদীছ সমূহ বর্ণনা করেছেন, তাঁরা এর মধ্যে কুনূতের কথা উল্লেখ করেননি। যদি সর্বদা তিনি বিতরে কুনূত পড়তেন তবে ছাহাবীগণ তা উল্লেখ করতেন। তবে হ্যাঁ, বিতরে কুনূত পড়ার কথা শুধুমাত্র উবাই বিন কা'ব (রাঃ) কর্তৃক নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। এথেকেই প্রমাণ হয় যে, তিনি কখনো কখনো উহা করতেন।"
তিনি আরো বলেন, "এ থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে, বিতরে কুনূত পড়া ওয়াজিব নয়। এজন্য হানাফী মাযহাবের গবেষক আলেম ইবনুল হুমাম ফাতহুল কাদীর গ্রন্থে [১/৩০৬, ৩৫৯, ৩৬০ পৃঃ স্বীকার করে বলেছেন, বিতরে কুনূত করা ওয়াজিব বলে যে মতটি রয়েছে তা অত্যন্ত দুর্বল যার পক্ষে কোন (ছহীহ) দলীল সাব্যস্ত হয়নি। নিঃসন্দেহে এ স্বীকৃতি তাঁর ন্যায়পরায়নতা ও গোঁড়ামী বর্জনের বড় দলীল। কেননা যে কথাকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন তা হচ্ছে তাঁর মাযহাবের বিপরীত।”
এ জন্য দু'আ কুনূত সারা বছর পড়তে পারে আবার কখনো পড়বে কখনো ছাড়বে- সবগুলোই জায়েয আছে। কেননা কোন কোন ছাহাবী ও তাবেঈ থেকে বিতরে কুনূত পরিত্যাগ প্রমাণিত হয়েছে। আবার কেউ কেউ শুধুমাত্র রামাযানের শেষ অর্ধেক ছাড়া সারা বছর আর কখনো কুনূত পড়েননি। আবার এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, অনেকে সারা বছরই কুনূত পড়েছেন।
ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রঃ) বলেন, 'এজন্য ইমাম মালেক কুনূত না পড়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। ইমাম শাফেয়ী শুধুমাত্র রামাযানের শেষ অর্ধেকে কুনূতের পক্ষপাতি ছিলেন। আর ইমাম আবু হানীফা ও আহমাদ সারাবছর কুনূত পড়ার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। সবগুল মতই জায়েয। যে কোন একটির উপর আমল করলে তাতে কোন দোষ নেই।’
টিকাঃ
১. কুনূত বলতে উদ্দেশ্য হচ্ছে, নামাযে নির্দিষ্টভাবে দাঁড়ানো অবস্থায় দু'আ করা।
১. আল মাওসূআ আল ফেকুহিয়্যাহ্ ১২৭-১২৮ পৃঃ। [দ্রঃ শায়খ আলবানী প্রণীত নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নামায ১৭৯ পৃঃ]
২. বুগইয়াতুল মুতাত্বওয়ে' ৭০ পৃঃ। [দ্রঃ মুছান্নাফ- ইবনু আবী শায়বা ২/৩০৫-৩০৬, মুখতাছার ক্বিয়ামুল্লায়ল লিল মারওয়াযী ১৩৫-১৩৬ পৃঃ, মাজমু' ফাতাওয়া ২২/২৭১]