📄 ভূমিকা
الْحَمْدُ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَعُوذُ باللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فلا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لا إلهَ إلا اللهُ وَحْدَهُ لا শ্যারিক লَهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ ( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ ) ( يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا ) ( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَقُولُوا قَوْلاً سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا )
ভারত উপমহাদেশের মুসলিম ভাইয়েরা রুটি-রুজির সন্ধানে যখন সউদী আরব আগমন করেন, তখন এখানে তারা ইবাদত- বন্দেগীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত নিয়মের অনেক ব্যতিক্রম লক্ষ্য করেন। তম্মধ্যে বিতর নামায অন্যতম। এ নামায আমাদের দেশে সাধারণতঃ যে নিয়মে পড়া হয় তার সম্পূর্ণ বিপরীত নিয়ম তারা এদেশে দেখতে পান। বিশেষ করে রামাযান মাসে যখন জামাতের সাথে বিতর নামায পড়তে হয়। তখন তারা পেরেশান ও হয়রান হয়ে নিজ দেশের ইমাম ও মুফতী সাহেবানকে পত্র মারফত বা ফোন করে জিজ্ঞেস করেন যে, আমাদের করণীয় কি? তারাও নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী জবাব পাঠিয়ে দেন, 'ওদের সাথে বিতর পড়বে না, তোমরা আলাদা বিতর পড়ে নিবে।' এজন্য দেখা যায়- বিতর শুরু হওয়ার সময় বিরাট একটি দল, জামাত থেকে বের হয়ে কেউ মসজিদে কেউ নিজ ঘরে গিয়ে বিতর নামায আদায় করে থাকেন।
সউদী আরবের জুবাইল দা'ওয়া সেন্টারে দাঈ ও শিক্ষক হিসেবে আগমণ করার পর থেকে এমন কোন উপলক্ষ্য নেই যে, আমাকে উক্ত বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়নি। আমার জ্ঞান অনুযায়ী আমি রাসূলুলাহ্ (ছালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম) এর ছহীহ সুন্নাহর অনুসরণে তার জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছি এবং করে যাচ্ছি। ফলে সত্যানুসন্ধানী ও নবী প্রেমী লোকেরা সত্য গ্রহণ করেন এবং সে অনুযায়ী নিজেদের আমলকে শুধরে নেন। আমার জানা মতে এরকম লোকের সংখ্যা অগণিত যারা এক্ষেত্রে নিজেদের আমলকে ছহীহ সুন্নাত মোতাবেক বিশুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। (আল্লাহ্ তাদেরকে আরো তাওফীক দিন।)
উপরোক্ত কারণে এবং সত্যানুসন্ধানী ভাইদের বার বার অনুরোধ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে এবিষয়ে দলীল ভিত্তিক একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রণয়ন করতে। তাছাড়া ছহীহ সুন্নাতের প্রচার-প্রসার ও তার খেদমতের একটি দুর্বার আগ্রহ তো নিজের মধ্যে রয়েছেই। তাই পুঁজি অল্প হলেও সে পথে পা বাড়াতে দুঃসাহস করেছি। দু'আ করছি হে আল্লাহ্ তুমি আমাকে সত্য উদ্ঘাটনে তাওফীক দিও। তোমার প্রিয় হাবীব নবী মুহাম্মাদ (ছালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম) এর সুন্নাতের খেদমতে অংশ নিয়ে রোজ ক্বিয়ামতে তাঁর শাফায়াত নসীব করো।
এই পুস্তকটি পড়ার পূর্বে সম্মানিত পাঠক-পাঠিকিকার নিকট আমার নিবেদন, আমাদের সকলের উচিত হচ্ছে সার্বক্ষণিক নিম্ন লিখিত আয়াত ও হাদীছটি মানস্পটে রাখা।
মহান আল্লাহ বলেন, ( وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذا قضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضلالا مُبِينًا )
"আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল কোন আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করার কোন অধিকার নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করবে, সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হবে।”
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম) বলেছেন, ( كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّة إلا مَنْ أبَى قالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ يَأْبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّة وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى )
"আমার উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু ঐ ব্যক্তি নয় যে জান্নাতে যেতে অস্বীকার করে। তাঁরা বললেন, কে এমন আছে জান্নাতে যেতে অস্বীকার করে? তিনি বললেন, যে আমার আনুগত্য করবে সে জান্নাতে যাবে। আর যে আমার অবাধ্য হবে সেই জান্নাতে যেতে অস্বীকার করবে।”
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীছটি যে ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত জীবনের চলমান পথে স্মরণ রাখবে তার জন্য ইসলামের যাবতীয় বিধি- বিধান মান্য করা সহজসাধ্য হবে।
এ জন্যই আমাদের পূর্বসূরী মহামান্য ইমামগণ হাদীছ সম্পর্কে যে অমূল্য বাণী পেশ করে গেছেন-তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত নবী প্রেমীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। যেমনঃ ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) [মৃত্যু ১৫০ হিঃ] বলেন, “হাদীছ বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হলে ওটাই আমার মাযহাব।” ইমাম মালেক (রহঃ) [মৃত্যু ১৭৯ হিঃ] বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির কথা গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য কিন্তু শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ্ (ছালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম) এর সবকিছুই গ্রহণযোগ্য।” ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) [মৃত্যু ২০৪ হিঃ] বলেন, “আমি যা কিছু বলেছি তার বিরুদ্ধে নবী (ছালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম) থেকে ছহীহ সূত্রে কোন হাদীছ এসে গেলে নবী (ছালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম) এর হাদীছই হবে অগ্রগণ্য, অতএব তোমরা আমার অন্ধানুকরণ করো না।” ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) [মৃত্যু ২৪১ হিঃ] বলেন, "তুমি আমার তাক্বলীদ (অন্ধানুসরন) করো না, মালেক, শাফেয়ী, আওযায়ী, ছওরী এদের কারো অন্ধানুকরণ করো না; বরং তাঁরা যেখান থেকে (সমাধান) গ্রহণ করেছেন তুমিও সেখান থেকেই গ্রহণ কর।"
সম্মানিত পাঠক-পাঠিকাদের প্রতি আমার অনুরোধ, মাযহাবী গোঁড়ামী পরিহার করে আসুন আমরা একনিষ্ঠভাবে কুরআন-সুন্নাহ্ ও সালাফে সালেহীনের নীতির অনুসরণ করি। পাস্পারিক ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে কুরআন-সুন্নাহ্ ছায়াতলে সমবেত হই। গড়ে তুলি ঐক্য সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের অনন্য দৃষ্টান্ত।
বইটি প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি হাদীছের রেফারেন্স উল্লেখ করে তার নম্বর দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন ছাপায় বিভিন্ন নম্বর থাকতে পারে, ফলে পাঠক তাতে বিভ্রান্ত হতে পারেন, তাই প্রতিটি হাদীছের অধ্যায় ও অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে যাতে করে মিলিয়ে নেয়া সহজ হয়। আর সাধ্যানুযায়ী সবগুলো হাদীছ ছহীহ-বিশুদ্ধই নির্বাচন করা হয়েছে। মাযহাবী গোঁড়ামী মুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ, নির্ভরযোগ্য ও মুহাক্কেক আলেমদের উক্তি উল্লেখ করা হয়েছে।
এই জন্য সহৃদয় পাঠক-পাঠিকাদের প্রতি আবারো সনির্বন্ধ নিবেদন, আপনাদের দৃষ্টিতে কোন ভুল-ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে তা ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন এবং প্রমাণ-পঞ্জি ও রেফারেন্সসহ সংশোধনের পরামর্শ দিবেন, উহা ধন্যবাদসহ সাদরে গ্রহণ করা হবে। (ইনশাআল্লাহ্) বইটিকে সুসজ্জিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও পরামর্শ দান করেছেন, জুবাইল দা'ওয়া সেন্টারের সুযোগ্য দাঈ শায়খ আবদুল্লাহ্ বিন শাহেদ এবং দাম্মাম ইসলামী কালচারাল সেন্টারের সনামধণ্য দাঈ শায়খ মুতিউর রহমান সালাফী। হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে তাদেরকে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ।
হে আল্লাহ্ এই বইয়ের লেখক, সম্পাদক, পাঠক-পাঠিকা ও ছাপানোর কাজে সহযোগিতা দানকারী সকলকে সর্বোত্তম পুরস্কারে ভূষিত করো। ক্বিয়ামতের মাঠে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পবিত্র হাত থেকে হাওযে কাউছারের পানি পান ও তাঁর শাফায়াত লাভে ধন্য করো। আমীন।
টিকাঃ
১. সূরা আহযাব- ৩৬
২. বুখারী, অধ্যায়ঃ কুরআন-সুন্নাহ্ আঁকড়ে ধরা, অনুচ্ছেদঃ রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাতের অনুসরণ, হা/৬৭৩৭।
📄 বিতর নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত
দৈনন্দিন জীবনে একজন মুসলমানের উপর ইসলামের দ্বিতীয় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুকন নামায শুধুমাত্র পাঁচ ওয়াক্তই ফরয; এর অতিরিক্ত নয়। এই পাঁচ ওয়াক্তে মোট ১৭ (সতের) রাকাত নামায ছাড়া আর যত নামায আদায় করার হাদীছ পাওয়া যায় তা সবই নফলের অন্তর্ভূক্ত। ঐ সমস্ত নামাযের মধ্যে কোনটার চাইতে কোনটার গুরুত্ব বেশী হওয়ার কারণে উলামায়ে দ্বীন কোনটার নাম দিয়েছেন সুন্নাতে মুআক্কাদা, কোনটা সুন্নাতে যায়েদা এবং কোনটা সাধারণ নফল নামায。
যে সমস্ত নামায আদায় করার ব্যাপারে অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং তাতে অফুরন্ত ছওয়াবের উল্লেখ হয়েছে তাকে বলা হয় সুন্নাতে মুআক্কাদা নামায। তম্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের সাথে সংশ্লিষ্ট ১২ রাকাত নামায, তাহাজ্জুদ নামায, বিতর নামায, চাশতের নামায, তওয়াফ শেষ করে দু'রাকাত নামায, ঈদের নামায ইত্যাদি。
এগুলোর মধ্যে বিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ নামায। এর গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় তা ওয়াজিবের কাছাকাছি। ওয়াজিবের অর্থ বহণ করে এরকম কিছু হাদীছও পাওয়া যায় তার পক্ষে। কিন্তু এ সম্পর্কে সমস্ত হাদীছ একত্রিত করলে বুঝা যায় তা ওয়াজিব নয়; বরং উহা সুন্নাতে মুআক্কাদা。
বিতর নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে অনেকগুলো হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। তম্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপঃ
১) খারেজাহ্ ইবনে হুযাফাহ্ (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা আমাদের নিকট এসে বললেন: "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে একটি নামায দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন। উহা তোমাদের জন্য লাল উটের চাইতে উত্তম। তা হচ্ছে 'বিতর নামায'। এ নামায আদায় করার জন্য তিনি সময় নির্ধারণ করেছেন, এশার নামাযের পর থেকে ফজর উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।”
২) আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতর নামায পড়েছেন এবং বলেছেন, "হে কুরআনের অনুসারীগণ তোমরা বিতর নামায পড়। কেননা আল্লাহ তা'আলা একক, তিনি বিতর নামায পছন্দ করেন।”
৩) রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ নামায গুরুত্ব সহকারে আদায় করতেন। এমনকি সফরে গেলেও এ নামায পড়া ছাড়তেন না। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফর অবস্থায় ফরয নামায ব্যতীত রাতের নফল নামায ইঙ্গিতের মাধ্যমে নিজ বাহনের উপর বসে- বাহন যে দিকে যায় সে দিকেই- পড়তেন। তিনি বিতর নামায আরোহীর উপর পড়তেন।” কিন্তু ফরয নামাযের সময় হলে তিনি তা বাহনের উপর পড়তেন না। জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আরোহী যে দিকেই যাক না কেন রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সে দিকেই মুখ করে তার উপর বসে নফল নামায আদায় করতেন। কিন্তু ফরয নামায আদায়ের ইচ্ছা করলে অবতরণ করতেন এবং কিবলামুখী হয়ে নামায আদায় করতেন।”
টিকাঃ
১. আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ নামায, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামায মুস্তাহাব, হা/১২০৮। তিরমিযি, অধ্যায়ঃ নামায, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামাযের ফযীলত, হা/৪১৪। ইবনে মাযাহ, অধ্যায়ঃ নামায প্রতিষ্ঠা করা, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামাযের বর্ণনা, হা/১১৫৮।
১. আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ বিতর নামায, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামায মুস্তাহাব হা/১৪১৬। নাসাঈ, অধ্যায়ঃ কিয়ামুল্লায়ল, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামায পড়ার নির্দেশ, হা/১৬৭৬। ইবনু মাজাহ্, অধ্যায়ঃ নামায প্রতিষ্ঠিত করা, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামায সম্পর্কে আলোচনা। সহীহ তারগীব হাদীছ নং ৫৯৪। ছহীহ ইবনু মাজাহ্- আলবানী হা/১/১৯৩。
২. বুখারী, অধ্যায়ঃ জুমআর নামায, অনুচ্ছেদঃ সফরে বিতর পড়া, হা/৯৪৫।
১. বুখারী, অধ্যায়ঃ নামায, অনুচ্ছেদঃ যেখানেই থাক ক্বিবলার দিক মুখ ফেরাবে। হা/৩৮৫।
📄 বিতর নামায কি ওয়াজিব না সুন্নাত?
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এর মতে বিতর নামায ওয়াজিব। ইমাম মালেক, শাফেয়ী ও আহমদ ইবনে হাম্বল (রঃ) সহ অধিকাংশ ইমাম, মুহাদ্দিছ ও আলেমের মতে বিতর নামায ওয়াজিব নয় বরং তা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্।
ইমাম আবু হানীফা যে সকল হাদীসের আলোকে বিতর নামাযকে ওয়াজিব বলেন, তা অধিকাংশ যঈফ বা দূর্বল অথবা তা দিয়ে এ নামাযকে ওয়াজিব সাব্যস্ত করা যায় না। তাই তাঁর প্রসিদ্ধ দু'ছাত্র ইমাম ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান (রহঃ) স্বীয় ইমামের সাথে একমত না হয়ে অধিকাংশ ইমামের ন্যায় এ নামাযকে সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ হিসেবে আখ্যা দেন। এ জন্য ইবনুল মুনযির বলেন, এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার মতের সমর্থন করেছেন এরকম কারো নাম আমি জানি না।
ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, "বিতর নামায সুন্নাতে মুআক্কাদা। এব্যাপারে মুসলমানগণ ঐকমত্য। কোন মানুষ যদি বিতর নামায পরিত্যাগ করার ব্যাপারে দৃঢ় থাকে বা অবিরাম বিতর নামায না পড়ে, তবে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।”
টিকাঃ
১. ফিকহুস্ সুন্নাহ, বিতর নামাযের আলোচনা ১/১৮১।
২. মাজমূ ফাতাওয়া ২৩/৮৮ বুইয়াতুল মুতাত্বওয়ে' ফী ছালাতিল মুতাত্বওয়ে' ৪৮ পৃঃ।
📄 বিতর নামায ওয়াজিব নয় তার দলীল
বিতর নামায যে ওয়াজিব নয় তার পক্ষে স্পষ্ট দলীলঃ
১) আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ( الوتر ليس بحتم كصلاتكم المكتوبة ولكن سن رسول الله صلى الله عليه وسلم وقال إن الله وتر يحب الوثر فأوتروا يا أهل القرآن ) "বিতর নামায ফরজ নামাযের মত লাযেম ও আবশ্যক নয়; বরং সে নামায রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নত করেছেন। তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা বেজোড় বা একক, তাঁর কোন শরীক নেই, তিনি বিতর তথা বেজোড় নামায পছন্দ করেন এবং তাতে প্রচুর ছওয়াব দিয়ে থাকেন। সুতরাং হে কুরআনের অনুসারীগণ তোমরা বিতরের নামায পড়।”
এই হাদীছটি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বিতর নামায সুন্নাত। কারণ সেই সময় আলী (রাঃ) এর উল্লেখিত কথার কোন প্রতিবাদ কোন ছাহাবী থেকে পাওয়া যায় না। আর তিনি কথাটি তাঁদের উপস্থিতিতেই বলেছেন। সুতরাং বলা যায়, ইহা ছাহাবায়ে কেরামের 'এজমা সুকৃতী' বা নীরব ঐকমত্য। হাদীছ শাস্ত্রে একথা সকলের জানা যে, কোন ছাহাবী যদি বলেন, “সুন্নাত হচ্ছে এই রকম ...” তবে উহা মারফু হাদীছ হিসেবে গণ্য।
২) কেনানা গোত্রের মুখদাজী নামক এক ব্যক্তি শামে বসবাসকারী আবু মুহাম্মাদ নামে পরিচিত জনৈক ব্যক্তির নিকট থেকে শুনলেন, তিনি বলছেন যে, বিতর নামায ওয়াজিব। মুখদাজী বলেন, কথাটি শুনে আমি ছাহাবী উবাদা বিন ছামেতের (রাঃ) নিকট গেলাম। তিনি তখন মসজিদে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে আবু মুহাম্মাদের কথাটি বললাম। তিনি বললেন, আবু মুহাম্মাদ ভুল কথা বলেছে। কেননা আমি শুনেছি রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "আল্লাহ তায়ালা পাঁচ ওয়াক্ত নামায বান্দাদের উপর লিখে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এই নামাযগুলোকে হালকা মনে করে তার অধিকার ক্ষুন্ন করবে না, তার জন্য আল্লাহর কাছে রয়েছে অঙ্গীকার। তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যে ব্যক্তি এই নামাযগুলো আদায় করবে না তার জন্যে আল্লাহর কাছে কোন অঙ্গিকার নাই। আল্লাহ চাইলে তাকে শাস্তি দিবেন, চাইলে তাকে ক্ষমা করবেন।”
৩) ত্বলহা ইবনে উবাউদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নজদের অধিবাসী এক বেদুইন (ছাহাবী রাঃ) মাথার চুল উস্কু-খুস্কু অবস্থায় গুনগুন করে দুর্বধ্য কিছু কথা বলতে বলতে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দরবারে এলো। নবীজীর নিকটবর্তী হয়ে ইসলাম সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করল। তিনি (ছাঃ) বললেনঃ রাত ও দিনে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায আদায় করতে হবে। সে বলল: এ পাঁচ নামায ছাড়া আমার উপর অন্য কোন নামায আবশ্যক আছে কি? তিনি বললেন না, তবে তুমি যদি অতিরিক্ত কোন নামায পড়তে চাও তো পড়তে পারবে। রামাযান মাসে ছিয়াম পালন করতে হবে। সে বলল, এ ছাড়া অন্য কি ছিয়াম আমার উপর আবশ্যক কি? তিনি বললেন, না, তবে তুমি যদি নফল আদায় করে থাক। এভাবে রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার নিকট যাকাতের কথা উল্লেখ করলেন। সে বলল, এ ছাড়া অন্য কিছু আমার উপর আবশ্যক কি? তিনি বললেন, না, তবে তুমি যদি নফল আদায় করে থাক। তখন লোকটি সেখান থেকে উঠে গেল এবং বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ আমার উপর যা ফরয করা হয়েছে আমি তার চাইতে বেশী কিছু করবনা এবং এর থেকে কমও কিছু করব না। লোকটি যখন চলে গেল তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “এ লোক তার কথায় যদি সত্যবাদী হয় তবে সে মুক্তি পেয়ে যাবে।” অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, “সে যদি সত্যবাদী হয়, তবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
এ হাদীসে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, বিতর নামায ওয়াজিব নয়। কেননা যদি ওয়াজিব হত তবে লোকটি যখন প্রশ্ন করল যে, "এছাড়া আমার উপর আর কোন নামায আছে কি না" তখন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে 'না' বলতেন না; বরং তাকে বিতর নামাযও আবশ্যক এ কথা বলতেন। তাছাড়া বিতর নামায যদি ওয়াজিব হয় তাহলে উহা না পড়লে নিঃসন্দেহে গুনাহগার হওয়ার কথা।
কিন্তু এ হাদীছে দেখা যায় লোকটি যখন আল্লাহর কসম করে বলল আমি আমার উপর ফরযের অতিরিক্ত কিছু করব না, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে মুক্তির গ্যারান্টি দিয়ে বললেন, 'বাস্তবিকই লোকটি যদি সত্যবাদী হয়, ফরয ইবাদত সঠিকভাবে আদায় করে তবে সে মুক্তি পেয়ে যাবে'। কিভাবে একজন মানুষ ওয়াজিব কাজ পরিত্যাগ করে মুক্তি পেয়ে যায়? তাহলে এ হাদীছ থেকে স্পষ্টভাবে একথা কি প্রমাণিত হয় না যে, বিতর নামায ওয়াজিব নয় বরং সুন্নাত বা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ?
৪) ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মুআ'য বিন জাবাল (রাঃ)কে (গভর্ণর করে) ইয়ামান প্রেরণ করেন তখন বলেন, "... তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর ফরয করেছেন দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায।"
এ হাদীছেও প্রমাণিত হয় যে, বিতর নামায যদি ফরযের মত অতি আবশ্যক হত, তবে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উহা জানানোর জন্য মুআ'য (রাঃ)কে অবশ্যই নির্দেশ দিতেন। ইবনু হিব্বান বলেন, মুআ'যের ইয়ামান গমণ রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জীবনের শেষ লগ্নে মৃত্যুর অল্প কিছু দিন পূর্বে ছিল।
৫) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফর অবস্থায় ফরয নামায ব্যতীত রাতের নফল নামায ইঙ্গিতের মাধ্যমে নিজ বাহনের উপর বসে- বাহন যে দিকে যায় সেদিকেই- পড়তেন। তিনি বিতর নামায আরোহীর উপর পড়তেন।” আর জাবের (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আরোহী যে দিকেই যাক না কেন রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সে দিকেই মুখ করে তার উপর বসে নফল নামায আদায় করতেন। কিন্তু ফরয নামায আদায়ের ইচ্ছা করলে অবতরণ করতেন এবং কিবলা মুখী হয়ে নামায আদায় করতেন। সুতরাং বিতর নামায যদি ফরয বা ওয়াজিব হত তবে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনই তা আরোহীর উপর বসে পড়তেন না。
৬) অনুরূপভাবে কোন ফরয বা ওয়াজিব নামাযের রাকাত সংখ্যায় মুছল্লীকে এমন কোন স্বাধীনতা দেয়া হয়নি যে, মনে চাইলে এত রাকাত পড়বে বা পড়বে না। কিন্তু সুন্নাত-নফল নামাযের রাকাতের ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। যেমন বিতর নামাযের ব্যাপারে বলা হয়েছেঃ আবু আইয়্যুব আনছারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “প্রত্যেক মুসলামনের উপর হক হচ্ছে বিতর নামায আদায় করা। অতএব যে পাঁচ রাকাত বিতর পড়তে চায় সে পাঁচ, যে তিন রাকাত পড়তে চায় সে তিন এবং এক রাকাত বিতর পড়তে চায় সে এক রাকাত পড়তে পারে।”
এই হাদীছ থেকে বুঝা যায়, যদি বিতর নামায ফরযের মত অবশ্যই পড়তে হবে এমন নামায হত, তবে নির্দিষ্ট করে তার রাকাত সংখ্যা বেঁধে দেয়া হত এবং কখনই তা মুছল্লীর ইচ্ছা- স্বাধীনতার উপর ছেড়ে দেয়া হত না। অবশ্য বিতর নামায ওয়াজিব না হলেও তা বিনা কারণে ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। এতে ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। সুতরাং এ ব্যাপারে অলসতা করা কোন মু'মিন ব্যক্তির উচিত নয়। কেননা উহা একটি লাল উট তথা মূল্যবান সম্পদের চাইতে বেশী উত্তম。
টিকাঃ
১. তিরমিযী, অধ্যায়: ছালাত হা/৪১৫। ইবনে মাজাহ্, অধ্যায় নামায কায়েম করা ও তার মধ্যে সুন্নত, হা/১১৫৯। শায়খ আলবানী বলেন, হাদীছটি ছহীহ দ্রঃ ছহীহ তারগীব তারহীব হা/৫৯২।
২. বুইয়াতুল মুতাত্বাওয়ে' পৃঃ ৫০。
৩. যে হাদীছকে রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দিকে সম্বধিত করা হয়েছে তাকে মারফু হাদীছ বলা হয়。
১. আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ ছালাত হা/ ১২১০। মুসনাদে আহমাদ, হা/ ২১৬৩৫। হাদীছটি ছহীহ (দ্রঃ ছহীহ তারগীব তারহীব আলবানী হা/৩৭০。
১. বুখারী, অধ্যায়ঃ ঈমান, অনুচ্ছেদঃ যাকাতের ইসলামের অন্তর্ভুক্ত, হা/৪৪। মুসলিম, অধ্যায়ঃ ঈমান, অনুচ্ছেদঃ নামায সমূহ ইসলামের অন্যতম রুকন, হা/১২。
১. বিস্তারিত দেখুন নসবুর রায়া- ইমাম যায়লাঈ ২/১১৩পৃঃ。
২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর বরাতে মুসনাদে আহমাদ হা/১৯৪৬। ত্ববরানী, দারাকুতনী, বায়হাকী ও হাকেম। এর সনদে 'আবু জনাব আল কালবী' নামক জনৈক বর্ণনাকারী আছে, মুহাদ্দীছগণ যাকে যঈফ বলেছেন। এই জন্য এই হাদীছ দলীল হিসেবে প্রযোজ্য নয়。
১. মুসনাদে আহমাদ হা/১৯৭৭。
২. বুখারী, অধ্যায়ঃ জুমআর নামায, অনুচ্ছেদঃ সফরে বিতর পড়া, হা/৯৪৫。
১. বুখারী, অধ্যায়ঃ নামায, অনুচ্ছেদঃ যেখানেই থাক ক্বিবলার দিক মুখ ফেরাবে। হা/৩৮৫。
১. আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ নামায, অনুচ্ছেদঃ বিতর কত রাকাত, হা/১২১২, ইবনু মাজাহ, অধ্যায়ঃ নামায প্রতিষ্ঠা করা, অনুচ্ছেদঃ বিতর নামায তিন, পাঁচ, সাত ও নয় রাকাতের বর্ণনা হা/১১৮০।