📄 বীরত্ব, সাহসিকতা ও লজ্জা-শরম
তাঁর চরিত্রে বীরত্ব, সাহসিকতা ও লজ্জা-শরম (যাকে অধিকাংশ মানুষ পরস্পর বিপরীত মনে করে) একই রূপ ছিল। তাঁর লজ্জাশীলতা সম্বন্ধে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, "তিনি পর্দানশীন কুমারী বালিকার চেয়েও অধিক লাজুক ছিলেন। কোন জিনিস তাঁর অপছন্দনীয় হলে তাঁর চেহারায় এর প্রতিক্রিয়া দেখা যেতো।"৬
অতিরিক্ত লজ্জা-শরমের কারণে কারো মুখের উপর এমন কথা বলতে পারতেন না- যা তার নিকট বিষাদের কারণ হবে। এটির ভার তিনি অন্যকে সোপর্দ করতেন। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন- একবার আল্লাহর রাসূল (সা)-এর মজলিসে জনৈক ব্যক্তির কাপড়ে হলদে রঙ বেশি দেখা যাচ্ছিল। যেহেতু তিনি কারো মুখের ওপর এমন কথা বলা পছন্দ করতেন না, যা তাঁর নিকট খারাপ লাগবে। এজন্য সে যখন উঠে পড়ল, তখন তিনি লোকদেরকে বললেন, "খুবই ভাল ছিল যদি তোমরা তাকে হলদে রঙের কাপড় ব্যবহার করা ছেড়ে দেবার জন্য বলে দিতে।"১
হযরত আয়েশা (রা) বলেন: যখন তিনি কারো সম্বন্ধে খারাপ কিছু জানতে পেতেন তখন তিনি তার নাম ধরে এ কথা বলতেন না যে, সে এ কাজ কেন করল। বরং তিনি এভাবে বলতেন, "লোকের কি হলো যে, তারা এ রকম বলে কিংবা এ রকম করে।" তিনি তার বিরোধিতা করতেন বটে, কিন্তু অভিযুক্তের নাম প্রকাশ করতেন না।’২
তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা সম্পর্কে শেরে আল্লাহ্ আলী মুর্তাযা (রা)-এর সাক্ষ্যই যথেষ্ট হবে বলে আশা করি। তিনি বলেন, "যুদ্ধ যখন তীব্র আকার ধারণ করত এবং মনে হতো চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে খুঁজে বেড়াতাম যাতে আমরা তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করতে পারি এবং দেখতে পেতাম তিনি শত্রু থেকে খুব বেশি দূরে নন; অর্থাৎ সে সময় অন্যদের তুলনায় তিনিই শত্রুর কাছাকাছি থাকতেন। বদর যুদ্ধে আমাদের এই অবস্থায়ই ছিল। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আশ্রয় নিচ্ছিলাম আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুর সবচেয়ে বেশি কাছে ছিলেন।"৩
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন: "আল্লাহ্র রাসূল (সা) সকলের চেয়ে বেশি সুন্দর ও দীপ্তিমান, সবচেয়ে বেশি দানশীল ও সবচেয়ে বেশি বীর বাহাদুর ছিলেন। এক রাতে মদীনার লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল এবং যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিল সেদিকে ছুটে গেল। পথিমধ্যে সকলের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাক্ষাত হলো। তিনি তখন ফিরে আসছিলেন। তিনি আওয়াজ পেতেই সকলের আগেই বেরিয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলছিলেন “ভয় পাবার কারণ নেই, কোন ভয় নেই।” তিনি সে সময় আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়ার পিঠে ছিলেন যার পিঠে জীনও ছিল না। তাঁর কাঁধে তখন তলোয়ার ঝুলছিল। তিনি ঘোড়ার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, "আমি একে সমুদ্রের মত গতিশীল, প্রবহমান ও দ্রুত গতিসম্পন্ন পেয়েছি।"১
ওহুদ ও হুনায়ন যুদ্ধে যখন বড় বড় বীর বাহাদুর শত্রুপক্ষের তীব্র আক্রমণে বিক্ষিপ্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ছিল এবং রণক্ষেত্র ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, সে সময়ও তিনি তাঁর খচ্চরের ওপর তেমনি প্রশান্ত চিত্তে ও দৃঢ়তার সঙ্গে আপন অবস্থানে অটল ছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন কিছুই হয়নি। তিনি তখন নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করে চলেছিলেন:
أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبُ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبُ .
"আমি নবী, মিথ্যা নই; আবদুল মুত্তালিবের বংশধর আমি (এও তেমনি মিথ্যা নয়)।"
টিকাঃ
৬. বুখারী, কিতাবুল-মানাকিব
১. শামাইলে তিরমিযী
২. আবূ দাউদ
৩. আশ-শিফা, পৃঃ ৮৯
১. আল-আদাবুল-মুফরাদ, পৃঃ ৪৬ বুখারী-মুসলিমের বর্ণনাসূত্রে
তাঁর চরিত্রে বীরত্ব, সাহসিকতা ও লজ্জা-শরম (যাকে অধিকাংশ মানুষ পরস্পর বিপরীত মনে করে) একই রূপ ছিল। তাঁর লজ্জাশীলতা সম্বন্ধে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, "তিনি পর্দানশীন কুমারী বালিকার চেয়েও অধিক লাজুক ছিলেন। কোন জিনিস তাঁর অপছন্দনীয় হলে তাঁর চেহারায় এর প্রতিক্রিয়া দেখা যেতো।"৬
অতিরিক্ত লজ্জা-শরমের কারণে কারো মুখের উপর এমন কথা বলতে পারতেন না- যা তার নিকট বিষাদের কারণ হবে। এটির ভার তিনি অন্যকে সোপর্দ করতেন। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন- একবার আল্লাহর রাসূল (সা)-এর মজলিসে জনৈক ব্যক্তির কাপড়ে হলদে রঙ বেশি দেখা যাচ্ছিল। যেহেতু তিনি কারো মুখের ওপর এমন কথা বলা পছন্দ করতেন না, যা তাঁর নিকট খারাপ লাগবে। এজন্য সে যখন উঠে পড়ল, তখন তিনি লোকদেরকে বললেন, "খুবই ভাল ছিল যদি তোমরা তাকে হলদে রঙের কাপড় ব্যবহার করা ছেড়ে দেবার জন্য বলে দিতে।"১
হযরত আয়েশা (রা) বলেন: যখন তিনি কারো সম্বন্ধে খারাপ কিছু জানতে পেতেন তখন তিনি তার নাম ধরে এ কথা বলতেন না যে, সে এ কাজ কেন করল। বরং তিনি এভাবে বলতেন, "লোকের কি হলো যে, তারা এ রকম বলে কিংবা এ রকম করে।" তিনি তার বিরোধিতা করতেন বটে, কিন্তু অভিযুক্তের নাম প্রকাশ করতেন না।’২
তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা সম্পর্কে শেরে আল্লাহ্ আলী মুর্তাযা (রা)-এর সাক্ষ্যই যথেষ্ট হবে বলে আশা করি। তিনি বলেন, "যুদ্ধ যখন তীব্র আকার ধারণ করত এবং মনে হতো চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে খুঁজে বেড়াতাম যাতে আমরা তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করতে পারি এবং দেখতে পেতাম তিনি শত্রু থেকে খুব বেশি দূরে নন; অর্থাৎ সে সময় অন্যদের তুলনায় তিনিই শত্রুর কাছাকাছি থাকতেন। বদর যুদ্ধে আমাদের এই অবস্থায়ই ছিল। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আশ্রয় নিচ্ছিলাম আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুর সবচেয়ে বেশি কাছে ছিলেন।"৩
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন: "আল্লাহ্র রাসূল (সা) সকলের চেয়ে বেশি সুন্দর ও দীপ্তিমান, সবচেয়ে বেশি দানশীল ও সবচেয়ে বেশি বীর বাহাদুর ছিলেন। এক রাতে মদীনার লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল এবং যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিল সেদিকে ছুটে গেল। পথিমধ্যে সকলের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাক্ষাত হলো। তিনি তখন ফিরে আসছিলেন। তিনি আওয়াজ পেতেই সকলের আগেই বেরিয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলছিলেন “ভয় পাবার কারণ নেই, কোন ভয় নেই।” তিনি সে সময় আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়ার পিঠে ছিলেন যার পিঠে জীনও ছিল না। তাঁর কাঁধে তখন তলোয়ার ঝুলছিল। তিনি ঘোড়ার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, "আমি একে সমুদ্রের মত গতিশীল, প্রবহমান ও দ্রুত গতিসম্পন্ন পেয়েছি।"১
ওহুদ ও হুনায়ন যুদ্ধে যখন বড় বড় বীর বাহাদুর শত্রুপক্ষের তীব্র আক্রমণে বিক্ষিপ্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ছিল এবং রণক্ষেত্র ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, সে সময়ও তিনি তাঁর খচ্চরের ওপর তেমনি প্রশান্ত চিত্তে ও দৃঢ়তার সঙ্গে আপন অবস্থানে অটল ছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন কিছুই হয়নি। তিনি তখন নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করে চলেছিলেন:
أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبُ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبُ .
"আমি নবী, মিথ্যা নই; আবদুল মুত্তালিবের বংশধর আমি (এও তেমনি মিথ্যা নয়)।"
টিকাঃ
৬. বুখারী, কিতাবুল-মানাকিব
১. শামাইলে তিরমিযী
২. আবূ দাউদ
৩. আশ-শিফা, পৃঃ ৮৯
১. আল-আদাবুল-মুফরাদ, পৃঃ ৪৬ বুখারী-মুসলিমের বর্ণনাসূত্রে
📄 স্নেহ-ভালবাসা ও সাধারণ দয়ামায়া
এই ধরনের বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে সাথেই তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তাঁর চক্ষু সহজেই অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠত। দুর্বল মানুষ, এমনকি অবলা পশুর প্রতি সদয় ব্যবহারের জন্যও তিনি নির্দেশ দিতেন। শাদ্দাদ ইবন আওস (রা) বলেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন, "আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে ভাল ব্যবহার ও কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য হত্যা করতে চাইলেও ভালভাবে কর, যবেহ করলেও ভালভাবে কর। তোমাদের কেউ পশু যবেহ করতে চাইলে সে যেন তার ছুরি ভালভাবে শান দিয়ে নেয় এবং যবেহর সময় যেন কষ্ট না দেয়।”২
হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- এক ব্যক্তি একটি বকরী যবেহর জন্য মাটিতে শুইয়ে দিয়ে ছুরিতে শান দিতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা) তা দেখে তাকে বললেন, "তুমি কি তাকে দু'বার মারতে চাও? তাকে শুইয়ে দেবার আগেই কেন তুমি ছুরিতে শান দিয়ে নিলে না?"৩
তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে জীব-জানোয়ারকে ঘাসপাতা খাবার দেবার জন্য নির্দেশ দিতেন এবং তাদেরকে পেরেশান করতে ও ওদের পিঠে ওদের সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপাতে নিষেধ করেন। পশুর কষ্ট দূর করা ও ওদের আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করাকে তিনি সাওয়াব বা পুরস্কারের কারণ এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভের মাধ্যম বলে মনে করেন। তিনি এর ফযীলতও বর্ণনা করেন।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন- রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন: “এক ব্যক্তি কোথাও সফরে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তার তীব্র পিপাসা লাগে। তিনি একটু দূরে একটি কুয়া পেলেন এবং এতে নেমে পড়লেন। পানি পানের পর তিনি ওপরে উঠে এসে দেখতে পেলেন, একটা কুকুর পিপাসায় পানির অভাবে কাদামাটি চাটছে। লোকটি মনে মনে ভাবলেন, পিপাসায় আমার যে অবস্থা হয়েছিল, এর অবস্থাও তো সেরূপই। তিনি পুনরায় কুয়ায় নামলেন। নিজের চামড়ার মোজায় পানি ভর্তি করলেন, অতঃপর পানিভর্তি মোজাটি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ওপরে উঠে এলেন এবং কুকুরটিকে পানি পান করালেন। আল্লাহ্ তা'আলা তার এই আমলকে কবুল করলেন এবং তার বিগত জীবনের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন। লোকেরা আরয করল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! পশু-পাখি ও জীব-জানেয়ারের ব্যাপারেও পুরস্কার রয়েছে?" তিনি বললেন: "সৃষ্টি জগতের এমন প্রতিটি বস্তুতে পুরস্কার রয়েছে, যার প্রাণ রয়েছে, যা তরতাজা ও জীবন্ত।”১
আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "জনৈক মহিলাকে কেবল এজন্যে শাস্তি দান করা হয়েছিল যে, সে তার বিড়ালটাকে খেতে দেয়নি, বিড়ালটাকে বেঁধে রাখার কারণে সে কোন কিছু শিকার করেও খেতে পারেনি। ফলে সেটা মারা গিয়েছিল।”২
সুহায়ল ইবন আমর (অন্য বর্ণনায় সুহায়ল ইবনুর রবী ইবন আমর) (রা) বর্ণনা করেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) একবার পথ চলতে একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উটটা অনাহারে থাকার দরুন শীর্ণকায় হয়ে গিয়েছিল এবং তার পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। এটা দেখে তিনি (উটের মালিককে ডেকে) বললেন, "এসব অবলা পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। এর পিঠে যখন উঠবে, তখন ভালভাবে উঠবে। যখন যবেহ করে তার গোশত খাবে, তখনও যেন সে ভাল অবস্থায় থাকে।”
আবদুল্লাহ ইবন জাফর (রা) বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ (সা) জনৈক আনসারীর ঘেরাও পাঁচিলের ভেতর প্রবেশ করলেন। ভেতরে একটি উট ছিল। রাসূল (সা)-কে দেখেই উটটি ডাকতে লাগল এবং তার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় পানি ঝরতে লাগল। আল্লাহ্র রাসূল (সা) তার কাছে গেলেন এবং তার কুঁজ ও পিঠের ওপর হাত বোলালেন। এতে উটটি শান্ত হলো। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, উটটির মালিক কে? এমন সময় এক আনসারী যুবক এলো এবং উটটি তার বলে জানাল। তিনি তাকে বললেন, "যে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে এ পশুর মালিক বানিয়েছেন, তাঁকে কি তুমি ভয় পাও না? সে তোমার বিরুদ্ধে আমার কাছে অভিযোগ করছে, তুমি তাকে কষ্ট দাও এবং সব সময় তাকে কাজে লাগিয়ে রাখ?"'
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন- আল্লাহ্ রাসূল (সা) বলেন: "যদি তোমরা সবুজ শ্যামল কোন জায়গায় যাও, তখন সেখানে জোরে হাঁটবে, যদি রাতে কোথাও ছাউনি ফেলতে হয়, তবে রাস্তার উপর ফেলবে না এজন্য যে, সেখানে জীব-জানোয়ার চলাফেরা করে থাকে এবং পোকা-মাকড় আশ্রয় নেয়।" ২
ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন- আমরা আল্লাহর রাসূল (সা)-এর সঙ্গে একবার সফরে ছিলাম। তিনি একটি জরুরী প্রয়োজনে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য অন্যত্র যান। ইতোমধ্যে আমরা একটি ছোট্ট পাখি দেখতে পেলাম, যার সাথে দু'টো ছানা ছিল। আমরা ছানা দু'টো নিয়ে এলাম। পাখিটা তা দেখে পাখা ঝাপটাতে লাগল। এমন সময় আল্লাহ্র রাসূল (সা) ফিরে এলেন এবং এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "ছানা দু'টো ছিনিয়ে এনে পাখিটাকে কে কষ্ট দিয়েছে?” এরপর তিনি ছানা দু'টো যথাস্থানে ফিরিয়ে দেবার নির্দেশ দিলেন। সেখানে আমরা পিঁপড়ার একটি টিবি দেখতে পাই এবং তা জ্বালিয়ে দিই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কে জ্বালিয়েছে?” আমরা বললাম, "আমরা এ কাজ করেছি।” তিনি বললেন, "আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেবার অধিকার কেবল আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের।"৩
খাদিম, চাকর-বাকর ও শ্রমিকদের সাথে- যারা আর পাঁচজন মানুষের মতই মানুষ, তাদের মনিব ও মালিকের ওপর তাদের হক রয়েছে। তিনি ভাল ব্যবহার করার যেই শিক্ষা দিয়েছেন, তা এর অতিরিক্ত। হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বলেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন, "তোমরা যা খাও তাদেরকেও তাই খেতে দাও, তোমরা যা পরো তাদেরকেও তাই পরাও। আর আল্লাহ্ তা'আলার মাখলুককে শাস্তিতে নিক্ষেপ করো না।"'
"যাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের অধীন করেছেন তারা তোমাদের ভাই, তোমাদের খাদিমও তোমাদেরই সাহায্যকারী, মদদগার। কাজেই যার ভাই যার অধীনে, তার উচিত হবে সে যা খাবে, তাকেও তাই খাওয়াবে। যা নিজে পরবে, তাকেও তাই পরতে দেবে। তাকে এমন কাজ করতে দেবে না- যা তার শক্তির বাইরে। যদি তাকে এমন কাজ করতে দিতেই হয়, তবে তুমি তার কাজে সহযোগী হবে, তাকে সাহায্য করবে।”২
আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা) বলেন- এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে এলো এবং জিজ্ঞেস করল, "আমি আমার নওকরকে দিনে কতবার ক্ষমা করব? তিনি বললেন, "সত্তরবার।"৩
বর্ণনকারী আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : "শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকাবার আগেই তার প্রাপ্য মজুরী দিয়ে দাও।"৪
টিকাঃ
২. মুসলিম, الامر باحسان الذبح শীর্ষক অধ্যায়; কিতাবুষ-যাবহ
৩. তাবারানী ও হাকিম-এর মতে হাদীসটি বুখারীর শর্ত মুতাবিক সহীহ
১. বুখারী, কিতাবুল-মুসকাত; মুসলিম, পশুকে পানি পান করানোর ফযীলত শীর্ষক অধ্যায়
২. ইমাম নববী, মুসলিম বর্ণিত ما يؤمر به من القيام على السواء ..
১. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত অধ্যায়
২. মুসলিম
৩. আবু দাউদ, কিতাবুল-জিহাদ
১. বুখারী, আল-আদাবুল-মুফরাদ, পৃঃ ৩৮
২. বুখারী ও আবু দাউদ
৩. তিরমিযী ও আবূ দাউদ
৪. ইবন মাজাহ, আবওয়াবুর রুহুন, শ্রমিকের পারিশ্রমিক অধ্যায়
এই ধরনের বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে সাথেই তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তাঁর চক্ষু সহজেই অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠত। দুর্বল মানুষ, এমনকি অবলা পশুর প্রতি সদয় ব্যবহারের জন্যও তিনি নির্দেশ দিতেন। শাদ্দাদ ইবন আওস (রা) বলেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন, "আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে ভাল ব্যবহার ও কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য হত্যা করতে চাইলেও ভালভাবে কর, যবেহ করলেও ভালভাবে কর। তোমাদের কেউ পশু যবেহ করতে চাইলে সে যেন তার ছুরি ভালভাবে শান দিয়ে নেয় এবং যবেহর সময় যেন কষ্ট না দেয়।”২
হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- এক ব্যক্তি একটি বকরী যবেহর জন্য মাটিতে শুইয়ে দিয়ে ছুরিতে শান দিতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা) তা দেখে তাকে বললেন, "তুমি কি তাকে দু'বার মারতে চাও? তাকে শুইয়ে দেবার আগেই কেন তুমি ছুরিতে শান দিয়ে নিলে না?"৩
তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে জীব-জানোয়ারকে ঘাসপাতা খাবার দেবার জন্য নির্দেশ দিতেন এবং তাদেরকে পেরেশান করতে ও ওদের পিঠে ওদের সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপাতে নিষেধ করেন। পশুর কষ্ট দূর করা ও ওদের আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করাকে তিনি সাওয়াব বা পুরস্কারের কারণ এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভের মাধ্যম বলে মনে করেন। তিনি এর ফযীলতও বর্ণনা করেন।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন- রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন: “এক ব্যক্তি কোথাও সফরে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তার তীব্র পিপাসা লাগে। তিনি একটু দূরে একটি কুয়া পেলেন এবং এতে নেমে পড়লেন। পানি পানের পর তিনি ওপরে উঠে এসে দেখতে পেলেন, একটা কুকুর পিপাসায় পানির অভাবে কাদামাটি চাটছে। লোকটি মনে মনে ভাবলেন, পিপাসায় আমার যে অবস্থা হয়েছিল, এর অবস্থাও তো সেরূপই। তিনি পুনরায় কুয়ায় নামলেন। নিজের চামড়ার মোজায় পানি ভর্তি করলেন, অতঃপর পানিভর্তি মোজাটি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ওপরে উঠে এলেন এবং কুকুরটিকে পানি পান করালেন। আল্লাহ্ তা'আলা তার এই আমলকে কবুল করলেন এবং তার বিগত জীবনের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন। লোকেরা আরয করল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! পশু-পাখি ও জীব-জানেয়ারের ব্যাপারেও পুরস্কার রয়েছে?" তিনি বললেন: "সৃষ্টি জগতের এমন প্রতিটি বস্তুতে পুরস্কার রয়েছে, যার প্রাণ রয়েছে, যা তরতাজা ও জীবন্ত।”১
আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "জনৈক মহিলাকে কেবল এজন্যে শাস্তি দান করা হয়েছিল যে, সে তার বিড়ালটাকে খেতে দেয়নি, বিড়ালটাকে বেঁধে রাখার কারণে সে কোন কিছু শিকার করেও খেতে পারেনি। ফলে সেটা মারা গিয়েছিল।”২
সুহায়ল ইবন আমর (অন্য বর্ণনায় সুহায়ল ইবনুর রবী ইবন আমর) (রা) বর্ণনা করেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) একবার পথ চলতে একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উটটা অনাহারে থাকার দরুন শীর্ণকায় হয়ে গিয়েছিল এবং তার পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। এটা দেখে তিনি (উটের মালিককে ডেকে) বললেন, "এসব অবলা পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। এর পিঠে যখন উঠবে, তখন ভালভাবে উঠবে। যখন যবেহ করে তার গোশত খাবে, তখনও যেন সে ভাল অবস্থায় থাকে।”
আবদুল্লাহ ইবন জাফর (রা) বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ (সা) জনৈক আনসারীর ঘেরাও পাঁচিলের ভেতর প্রবেশ করলেন। ভেতরে একটি উট ছিল। রাসূল (সা)-কে দেখেই উটটি ডাকতে লাগল এবং তার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় পানি ঝরতে লাগল। আল্লাহ্র রাসূল (সা) তার কাছে গেলেন এবং তার কুঁজ ও পিঠের ওপর হাত বোলালেন। এতে উটটি শান্ত হলো। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, উটটির মালিক কে? এমন সময় এক আনসারী যুবক এলো এবং উটটি তার বলে জানাল। তিনি তাকে বললেন, "যে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে এ পশুর মালিক বানিয়েছেন, তাঁকে কি তুমি ভয় পাও না? সে তোমার বিরুদ্ধে আমার কাছে অভিযোগ করছে, তুমি তাকে কষ্ট দাও এবং সব সময় তাকে কাজে লাগিয়ে রাখ?"'
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন- আল্লাহ্ রাসূল (সা) বলেন: "যদি তোমরা সবুজ শ্যামল কোন জায়গায় যাও, তখন সেখানে জোরে হাঁটবে, যদি রাতে কোথাও ছাউনি ফেলতে হয়, তবে রাস্তার উপর ফেলবে না এজন্য যে, সেখানে জীব-জানোয়ার চলাফেরা করে থাকে এবং পোকা-মাকড় আশ্রয় নেয়।" ২
ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন- আমরা আল্লাহর রাসূল (সা)-এর সঙ্গে একবার সফরে ছিলাম। তিনি একটি জরুরী প্রয়োজনে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য অন্যত্র যান। ইতোমধ্যে আমরা একটি ছোট্ট পাখি দেখতে পেলাম, যার সাথে দু'টো ছানা ছিল। আমরা ছানা দু'টো নিয়ে এলাম। পাখিটা তা দেখে পাখা ঝাপটাতে লাগল। এমন সময় আল্লাহ্র রাসূল (সা) ফিরে এলেন এবং এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "ছানা দু'টো ছিনিয়ে এনে পাখিটাকে কে কষ্ট দিয়েছে?” এরপর তিনি ছানা দু'টো যথাস্থানে ফিরিয়ে দেবার নির্দেশ দিলেন। সেখানে আমরা পিঁপড়ার একটি টিবি দেখতে পাই এবং তা জ্বালিয়ে দিই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কে জ্বালিয়েছে?” আমরা বললাম, "আমরা এ কাজ করেছি।” তিনি বললেন, "আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেবার অধিকার কেবল আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের।"৩
খাদিম, চাকর-বাকর ও শ্রমিকদের সাথে- যারা আর পাঁচজন মানুষের মতই মানুষ, তাদের মনিব ও মালিকের ওপর তাদের হক রয়েছে। তিনি ভাল ব্যবহার করার যেই শিক্ষা দিয়েছেন, তা এর অতিরিক্ত। হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বলেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন, "তোমরা যা খাও তাদেরকেও তাই খেতে দাও, তোমরা যা পরো তাদেরকেও তাই পরাও। আর আল্লাহ্ তা'আলার মাখলুককে শাস্তিতে নিক্ষেপ করো না।"'
"যাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের অধীন করেছেন তারা তোমাদের ভাই, তোমাদের খাদিমও তোমাদেরই সাহায্যকারী, মদদগার। কাজেই যার ভাই যার অধীনে, তার উচিত হবে সে যা খাবে, তাকেও তাই খাওয়াবে। যা নিজে পরবে, তাকেও তাই পরতে দেবে। তাকে এমন কাজ করতে দেবে না- যা তার শক্তির বাইরে। যদি তাকে এমন কাজ করতে দিতেই হয়, তবে তুমি তার কাজে সহযোগী হবে, তাকে সাহায্য করবে।”২
আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা) বলেন- এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে এলো এবং জিজ্ঞেস করল, "আমি আমার নওকরকে দিনে কতবার ক্ষমা করব? তিনি বললেন, "সত্তরবার।"৩
বর্ণনকারী আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : "শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকাবার আগেই তার প্রাপ্য মজুরী দিয়ে দাও।"৪
টিকাঃ
২. মুসলিম, الامر باحسان الذبح শীর্ষক অধ্যায়; কিতাবুষ-যাবহ
৩. তাবারানী ও হাকিম-এর মতে হাদীসটি বুখারীর শর্ত মুতাবিক সহীহ
১. বুখারী, কিতাবুল-মুসকাত; মুসলিম, পশুকে পানি পান করানোর ফযীলত শীর্ষক অধ্যায়
২. ইমাম নববী, মুসলিম বর্ণিত ما يؤمر به من القيام على السواء ..
১. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত অধ্যায়
২. মুসলিম
৩. আবু দাউদ, কিতাবুল-জিহাদ
১. বুখারী, আল-আদাবুল-মুফরাদ, পৃঃ ৩৮
২. বুখারী ও আবু দাউদ
৩. তিরমিযী ও আবূ দাউদ
৪. ইবন মাজাহ, আবওয়াবুর রুহুন, শ্রমিকের পারিশ্রমিক অধ্যায়
📄 বিশ্বজয়ী আদর্শ ও চিরন্তন নমুনা
হযরতুল উস্তাদ মাওলানা সায়্যিদ সুলায়মান নদভীর বিখ্যাত গ্রন্থ 'খুতবাতে মাদ্রাজ'-এর একটি অংশ উদ্ধৃত করার মাধ্যমে এই অধ্যায় শেষ করতে চাই যেখানে সায়্যিদ সাহেব রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পরিপূর্ণ, বিশ্বজয়ী ও অবিনশ্বর জীবনচিত্র, তাঁর ব্যাপকতা ও পরিপূর্ণতা, মানব জাতির সকল স্তর ও সকল শ্রেণীর, এছাড়াও সব রকমের পরিবেশ, সকল যুগ, সকল পেশা, মোটকথা সব ধরনের অবস্থা, জীবনের প্রতিটি স্তর ও পর্যায়ের জন্য তাঁর পরিপূর্ণ ও সামগ্রিক দিকনির্দেশনা ও মহোত্তম আদর্শ অত্যন্ত প্রভাবমণ্ডিত ও ভাষার অলঙ্কারপূর্ণ ভঙ্গিতে পেশ করেছেন। তিনি বলেন,
"সব শ্রেণীর মানুষের জন্য সব অবস্থায় আদর্শনীয় এবং মানুষের সকল প্রকার বিশুদ্ধ মানসিকতার সুষ্ঠু বিকাশ, পূর্ণাঙ্গ আচার-পদ্ধতি ও চরিত্রের মিলন যাঁঁর জীবনচরিতে ঘটেছে- তিনি একমাত্র মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা) ছাড়া আর কেউ নন।
আপনি যদি বিত্তশালী হয়ে থাকেন, তবে মক্কার আদর্শ ব্যবসায়ী ও বাহরায়নের বিত্তবান মহাপুরুষের মুহাম্মদুর রাসূল (সা) এর আদর্শ অনুসরণ করুন, দীনহীন দরিদ্র হয়ে থাকলে শি'বে আবূ তালিবের নিঃসহায় বন্দী ও মদীনায় আশ্রয় গ্রহণকারী মেহমানের হালচাল শুনুন, আপনি সম্রাট হয়ে থাকলে আরব সম্রাটের ইতিকাহিনী পাঠ করুন, শাসিত হয়ে থাকলে কুরায়শদের শাসিত শোষিত মুহাম্মদ (সা)-এর দিকে একটু খেয়াল করুন, বিজয়ী হয়ে থাকলে বদর ও হুনায়ন বিজয়ী মহাবীর সেনাপতির দিকে লক্ষ্য করুন, পরাজিত হয়ে থাকলে ওহুদ যুদ্ধের শিক্ষা গ্রহণ করুন, আপনি যদি উস্তাদ বা শিক্ষক হয়ে থাকেন, তবে সুফফা শিক্ষাগারের আদর্শ শিক্ষকের আদর্শ সামনে রাখুন, ছাত্র বা শাগরিদ হয়ে থাকলে জিবরাঈল রূহুল আমীনের সামনে বসে থাকা আদর্শ ছাত্রকে অনুসরণ করুন, আপনি যদি ওয়ায়েয, উপদেশদাতা বা বক্তা হন, তবে মদীনার মসজিদের মিম্বরে দণ্ডায়মান মহাপুরুষের আদর্শ বাণী শুনুন।
নিঃসঙ্গ নিঃসহায় অবস্থায় সত্যের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে যদি আপনি আগ্রহী হন, তবে মক্কার নিঃসহায় মহাপুরুষের আদর্শ আপনার সামনে রয়েছে, আল্লাহয়ী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দুশমনকে পরাজিত ও প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে থাকলে মক্কাবিজয়ী মহাপুরুষের আদর্শ দেখুন। বিষয়-সম্পত্তি ও পার্থিব ব্যাপার সমূহকে গোছানোর ব্যাপারে খায়বর, বনী নযীর ও ফাদাকের ভূ-সম্পত্তিসমূহের মালিকের আদর্শ আপনার সামনে রয়েছে, পিতৃহীন ইয়াতীমের জন্য রয়েছে আবদুল্লাহ ও আমেনার দুলালের আদর্শ, শিশু বালকের জন্য রয়েছে হালিমার গৃহে প্রতিপালিত বালক মুহাম্মদের আদর্শ, যুবকের জন্য রয়েছে মক্কী রাখাল যুবকের আদর্শ।
আপনি যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফরে থাকেন, তবে বসরার বিদেশী বণিকের দৃষ্টান্ত আপনার সামনে রয়েছে। আপনি যদি আদালতের বিচারপতি অথবা পঞ্চয়েতের সালিসী হন, তবে ভোরের সূর্য ওঠার আগে কাবায় প্রবেশকারী বিচারকের প্রতি লক্ষ্য করুন, তিনি হাজরে আসওয়াদকে কাবার এক কোণে কেমন করে রেখেছিলেন। মদীনার খেজুর পাতায় ছাওয়া মসজিদে বসা বিচারপতিকে লক্ষ্য করুন, আইনের বেলায় যাঁর কাছে বাদশাহ-ভিখারী ও আমীর-গরীবের মধ্যে পার্থক্যের কোন বালাই নেই।
আপনি স্বামী হয়ে থাকলে খাদীজা ও আয়েশার পুণ্যাত্মা স্বামীর আদর্শ চরিত পাঠ করুন। আপনার সন্তান-সন্ততি থাকলে ফাতেমার জনক ও হাসান- হুসায়নের নানার আদর্শ আপনার সম্মুখে রয়েছে।
মোটকথা, আপনি যে কেউ হোন না কেন, সবক্ষেত্রে আপনার জীবনপথে চলার জন্য আদর্শ ও আলোর দিশা মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যাপক জীবনচরিতে নিহিত রয়েছে। এজন্য সকল শ্রেণীর আদর্শ অনুসন্ধিৎসু ও নূরে ঈমানের তলবগারদের জন্য একমাত্র মোস্তফা-চরিতেই আলোর দিশা ও মুক্তির পথ নিহিত রয়েছে। মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনাদর্শ- যার সম্মুখে রয়েছে, একাধারে নূহ, ইবরাহীম, আইয়ুব, ইউনূস ও মূসা-ঈসা (আ) প্রমুখ মহাপুরুষগণের আদর্শ জীবনচরিতসমূহ। অন্য সকল নবীর জীবনচরিতসমূহ যেন একই ধরণের দ্রব্যসামগ্রীর বিপণীমালা আর মহানবী (সা)-এর আচার-ব্যবহার ও জীবনচরিত দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ বিপণীকেন্দ্র- যেখানে সকল ধরণের ক্রেতা ও সব রকমের পণ্যসামগ্রীর ছড়াছড়ি রয়েছে।""
একদিকে তিনি রাত জেগে জেগে ইবাদত-বন্দেগীতে থাকতেন মশগুল, অপরদিকে শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণের প্রতিও রাখতেন সতর্ক দৃষ্টি। শাসক- শাসিতের মাঝে কোথাও অমিল বা বিরোধ ছিল না, সবাই তাদের অনুগত। আরেকটু উল্টে যান ইতিহাসের পাতা। অবাক হবেন তাঁদের ইবাদত, দুনিয়াবিমুখতা, দু'আ ও মুনাজাত, চারিত্রিক উৎকর্ষ, মাহাত্ম্যবোধ, ছোট ও দুর্বলদের প্রতি ভালোবাসা ও প্রেমবোধ, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তাদের মধুর বিনম্র আচরণ, দয়া ও করুণা এবং জানের দুশমনকে অকপটে ক্ষমা করে দেয়ার কাহিনী পড়ে মনে হবে, কবি-সাহিত্যিকের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয় তাদের উর্বর কল্পনা ও তাদের বিরল প্রতিভার সিঁড়ি বেয়ে সেই চূড়ায় উপনীত হওয়া- যেখানে উপনীত হয়েছিলেন তাঁরা বাস্তবতার সিঁড়ি বেয়ে। সত্যি কথা বলতে কি, অবিচ্ছিন্ন সূত্র ও সনদ আমাদের সংরক্ষণে না থাকলে এবং নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের সাক্ষ্য না পেলে, অনায়াসে এই সত্য ঘটনাকে কল্পকাহিনী ও উপকথা বলে চালিয়ে দেয়া হতো। সত্যি এই মহান ইনকিলাব, এই গৌরবদীপ্ত নতুন যুগের সূচনা মুহাম্মদ (সা)-এর প্রধান মু'জিযা এবং তাঁর এক মহাঅনুগ্রহ। সর্বোপরি তা রহমতে ইলাহী, এক মহাদান- যা সীমাবদ্ধ নয় স্থান-কাল-পাত্রের কোন সংকীর্ণ গণ্ডিতে। মহান আল্লাহ্ সত্যি বলেছেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ.
"আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।" [সূরা আম্বিয়া: ১০৭]
টিকাঃ
১. আব্দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী কর্তৃক অনূদিত 'খুতবাতে মাদ্রাজ'-এর বাংলা অনুবাদ 'নবী চিরন্তন' থেকে গৃহীত- অনুবাদক।
হযরতুল উস্তাদ মাওলানা সায়্যিদ সুলায়মান নদভীর বিখ্যাত গ্রন্থ 'খুতবাতে মাদ্রাজ'-এর একটি অংশ উদ্ধৃত করার মাধ্যমে এই অধ্যায় শেষ করতে চাই যেখানে সায়্যিদ সাহেব রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পরিপূর্ণ, বিশ্বজয়ী ও অবিনশ্বর জীবনচিত্র, তাঁর ব্যাপকতা ও পরিপূর্ণতা, মানব জাতির সকল স্তর ও সকল শ্রেণীর, এছাড়াও সব রকমের পরিবেশ, সকল যুগ, সকল পেশা, মোটকথা সব ধরনের অবস্থা, জীবনের প্রতিটি স্তর ও পর্যায়ের জন্য তাঁর পরিপূর্ণ ও সামগ্রিক দিকনির্দেশনা ও মহোত্তম আদর্শ অত্যন্ত প্রভাবমণ্ডিত ও ভাষার অলঙ্কারপূর্ণ ভঙ্গিতে পেশ করেছেন। তিনি বলেন,
"সব শ্রেণীর মানুষের জন্য সব অবস্থায় আদর্শনীয় এবং মানুষের সকল প্রকার বিশুদ্ধ মানসিকতার সুষ্ঠু বিকাশ, পূর্ণাঙ্গ আচার-পদ্ধতি ও চরিত্রের মিলন যাঁঁর জীবনচরিতে ঘটেছে- তিনি একমাত্র মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা) ছাড়া আর কেউ নন।
আপনি যদি বিত্তশালী হয়ে থাকেন, তবে মক্কার আদর্শ ব্যবসায়ী ও বাহরায়নের বিত্তবান মহাপুরুষের মুহাম্মদুর রাসূল (সা) এর আদর্শ অনুসরণ করুন, দীনহীন দরিদ্র হয়ে থাকলে শি'বে আবূ তালিবের নিঃসহায় বন্দী ও মদীনায় আশ্রয় গ্রহণকারী মেহমানের হালচাল শুনুন, আপনি সম্রাট হয়ে থাকলে আরব সম্রাটের ইতিকাহিনী পাঠ করুন, শাসিত হয়ে থাকলে কুরায়শদের শাসিত শোষিত মুহাম্মদ (সা)-এর দিকে একটু খেয়াল করুন, বিজয়ী হয়ে থাকলে বদর ও হুনায়ন বিজয়ী মহাবীর সেনাপতির দিকে লক্ষ্য করুন, পরাজিত হয়ে থাকলে ওহুদ যুদ্ধের শিক্ষা গ্রহণ করুন, আপনি যদি উস্তাদ বা শিক্ষক হয়ে থাকেন, তবে সুফফা শিক্ষাগারের আদর্শ শিক্ষকের আদর্শ সামনে রাখুন, ছাত্র বা শাগরিদ হয়ে থাকলে জিবরাঈল রূহুল আমীনের সামনে বসে থাকা আদর্শ ছাত্রকে অনুসরণ করুন, আপনি যদি ওয়ায়েয, উপদেশদাতা বা বক্তা হন, তবে মদীনার মসজিদের মিম্বরে দণ্ডায়মান মহাপুরুষের আদর্শ বাণী শুনুন।
নিঃসঙ্গ নিঃসহায় অবস্থায় সত্যের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে যদি আপনি আগ্রহী হন, তবে মক্কার নিঃসহায় মহাপুরুষের আদর্শ আপনার সামনে রয়েছে, আল্লাহয়ী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দুশমনকে পরাজিত ও প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে থাকলে মক্কাবিজয়ী মহাপুরুষের আদর্শ দেখুন। বিষয়-সম্পত্তি ও পার্থিব ব্যাপার সমূহকে গোছানোর ব্যাপারে খায়বর, বনী নযীর ও ফাদাকের ভূ-সম্পত্তিসমূহের মালিকের আদর্শ আপনার সামনে রয়েছে, পিতৃহীন ইয়াতীমের জন্য রয়েছে আবদুল্লাহ ও আমেনার দুলালের আদর্শ, শিশু বালকের জন্য রয়েছে হালিমার গৃহে প্রতিপালিত বালক মুহাম্মদের আদর্শ, যুবকের জন্য রয়েছে মক্কী রাখাল যুবকের আদর্শ।
আপনি যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফরে থাকেন, তবে বসরার বিদেশী বণিকের দৃষ্টান্ত আপনার সামনে রয়েছে। আপনি যদি আদালতের বিচারপতি অথবা পঞ্চয়েতের সালিসী হন, তবে ভোরের সূর্য ওঠার আগে কাবায় প্রবেশকারী বিচারকের প্রতি লক্ষ্য করুন, তিনি হাজরে আসওয়াদকে কাবার এক কোণে কেমন করে রেখেছিলেন। মদীনার খেজুর পাতায় ছাওয়া মসজিদে বসা বিচারপতিকে লক্ষ্য করুন, আইনের বেলায় যাঁর কাছে বাদশাহ-ভিখারী ও আমীর-গরীবের মধ্যে পার্থক্যের কোন বালাই নেই।
আপনি স্বামী হয়ে থাকলে খাদীজা ও আয়েশার পুণ্যাত্মা স্বামীর আদর্শ চরিত পাঠ করুন। আপনার সন্তান-সন্ততি থাকলে ফাতেমার জনক ও হাসান- হুসায়নের নানার আদর্শ আপনার সম্মুখে রয়েছে।
মোটকথা, আপনি যে কেউ হোন না কেন, সবক্ষেত্রে আপনার জীবনপথে চলার জন্য আদর্শ ও আলোর দিশা মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যাপক জীবনচরিতে নিহিত রয়েছে। এজন্য সকল শ্রেণীর আদর্শ অনুসন্ধিৎসু ও নূরে ঈমানের তলবগারদের জন্য একমাত্র মোস্তফা-চরিতেই আলোর দিশা ও মুক্তির পথ নিহিত রয়েছে। মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনাদর্শ- যার সম্মুখে রয়েছে, একাধারে নূহ, ইবরাহীম, আইয়ুব, ইউনূস ও মূসা-ঈসা (আ) প্রমুখ মহাপুরুষগণের আদর্শ জীবনচরিতসমূহ। অন্য সকল নবীর জীবনচরিতসমূহ যেন একই ধরণের দ্রব্যসামগ্রীর বিপণীমালা আর মহানবী (সা)-এর আচার-ব্যবহার ও জীবনচরিত দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ বিপণীকেন্দ্র- যেখানে সকল ধরণের ক্রেতা ও সব রকমের পণ্যসামগ্রীর ছড়াছড়ি রয়েছে।""
একদিকে তিনি রাত জেগে জেগে ইবাদত-বন্দেগীতে থাকতেন মশগুল, অপরদিকে শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণের প্রতিও রাখতেন সতর্ক দৃষ্টি। শাসক- শাসিতের মাঝে কোথাও অমিল বা বিরোধ ছিল না, সবাই তাদের অনুগত। আরেকটু উল্টে যান ইতিহাসের পাতা। অবাক হবেন তাঁদের ইবাদত, দুনিয়াবিমুখতা, দু'আ ও মুনাজাত, চারিত্রিক উৎকর্ষ, মাহাত্ম্যবোধ, ছোট ও দুর্বলদের প্রতি ভালোবাসা ও প্রেমবোধ, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তাদের মধুর বিনম্র আচরণ, দয়া ও করুণা এবং জানের দুশমনকে অকপটে ক্ষমা করে দেয়ার কাহিনী পড়ে মনে হবে, কবি-সাহিত্যিকের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয় তাদের উর্বর কল্পনা ও তাদের বিরল প্রতিভার সিঁড়ি বেয়ে সেই চূড়ায় উপনীত হওয়া- যেখানে উপনীত হয়েছিলেন তাঁরা বাস্তবতার সিঁড়ি বেয়ে। সত্যি কথা বলতে কি, অবিচ্ছিন্ন সূত্র ও সনদ আমাদের সংরক্ষণে না থাকলে এবং নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের সাক্ষ্য না পেলে, অনায়াসে এই সত্য ঘটনাকে কল্পকাহিনী ও উপকথা বলে চালিয়ে দেয়া হতো। সত্যি এই মহান ইনকিলাব, এই গৌরবদীপ্ত নতুন যুগের সূচনা মুহাম্মদ (সা)-এর প্রধান মু'জিযা এবং তাঁর এক মহাঅনুগ্রহ। সর্বোপরি তা রহমতে ইলাহী, এক মহাদান- যা সীমাবদ্ধ নয় স্থান-কাল-পাত্রের কোন সংকীর্ণ গণ্ডিতে। মহান আল্লাহ্ সত্যি বলেছেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ.
"আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।" [সূরা আম্বিয়া: ১০৭]
টিকাঃ
১. আব্দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী কর্তৃক অনূদিত 'খুতবাতে মাদ্রাজ'-এর বাংলা অনুবাদ 'নবী চিরন্তন' থেকে গৃহীত- অনুবাদক।