📄 উদারতা, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা
আল্লাহ্র রাসূল (সা) সর্বোত্তম আখলাক ও চরিত্র, দয়া, বদান্যতা ও বিনয়ের ক্ষেত্রে সমগ্র মানবতার ইমাম ও অগ্রনায়ক ছিলেন।
আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন : إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ "হে রাসূল! আপনি নিশ্চিতই মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।"
অপরদিকে আল্লাহ্র রাসূল (সা) স্বয়ং বলেছেন : أَدْبَنِي رَبِّي فَأَحْسَنَ تَأْدِيْبِي "আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং সর্বোত্তম প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।"
হযরত জাবির (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন: إِنَّ اللهَ تَعَالَى بَعَثَنِي لِإِثْمَامِ مَكَارِمِ الْأَخْلَاقِ كَمَالِ مَحَاسِنِ الْأَفْعَالِ "আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে সর্বোত্তম আখলাক-চরিত্র ও উত্তম কার্যাবলীর পূর্ণতাদানের জন্য পাঠিয়েছেন।"
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আখলাক-চরিত্র কেমন ছিল? এ সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন : كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنُ "আখলাক চরিত্রে তিনি কুরআনুল-কারীমের বাস্তব প্রতিমূর্তি ছিলেন।" [সহীহ মুসলিম, আয়েশা (রা) বর্ণিত]
ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য-সহ্য, প্রশস্ত হৃদয় ও সহনশীলতার ক্ষেত্রে তাঁর যে অবস্থানগত মর্যাদা ছিল, সে পর্যন্ত মেধার অধিকারীর মেধা ও কবির কল্পনাও পৌঁছতে পারে না।
যদি এসব ঘটনা সেই নির্দিষ্ট পন্থায় বর্ণনা না করা হতো- যা সকল সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে, তাহলে লোকের মেধা ও মনন আজ তা গ্রহণ করত না। কিন্তু এসব বর্ণনা এতটা সঠিক, নির্ভুল ও অব্যাহত সনদে একজন নির্ভরযোগ্য, ন্যায়পরায়ণ রাবী থেকে আরেকজন নির্ভরযোগ্য ন্যায়পরায়ণ রাবী পর্যন্ত এরূপ সংযত ও সতর্কতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসবের ভিতর এমন ধারাবাহিক সূত্র পাওয়া যায় যে, এর দরুন এসব বর্ণনা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলীল-দস্তাবেজের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
এ প্রসঙ্গে আমরা কতকগুলো ঘটনা বর্ণনা করব। তাঁর দয়া, দানশীলতা ও চরম থেকে চরমতম দুশমনকেও সৌজন্য প্রদর্শন ও সহানুভূতিমূলক আচরণের একটি নমুনা ছিল সেই ঘটনাটি, যখন মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সলুলকে' কবরে নামানো হয়। তিনি সেখানে গমন করেন এবং তাকে কবর থেকে বের করবার নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি তার লাশ হাঁটুর উপর নিলেন, পবিত্র মুখের থুথু তার উপর নিক্ষেপ করলেন এবং নিজের পরনের জামা দিয়ে তাকে কাফন পরালেন।’২
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে চলছিলাম। সে সময় তিনি নাজরানের কাপড় পরেছিলেন যার প্রান্তদেশ ছিল মোটা। পথিমধ্যে এক বেদুঈনের সঙ্গে দেখা। সে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাদর মুবারক ধরে জোরে টান দিল। আমি চোখ তুলে দেখতে পেলাম জোরে টান দেয়ার ফলে তাঁর গলায় দাগ পড়ে গেছে। এরপর সেই বেদুঈন বলল: ওহে মুহাম্মদ! আল্লাহ্র যে মাল আপনার কাছে রয়েছে, তা আমাদের দেয়ার জন্য হুকুম দিন। তিনি তার দিকে ঘুরে দেখলেন এবং হাসলেন, তারপর তাকে তার প্রার্থিত বস্তু দেয়ার ব্যবস্থা করলেন।৩
যায়দ ইবন সু'না (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) রাসূল (সা)-এর কাছে এলো এবং তাকে ধার পরিশোধের দাবি জানালো- যা তিনি তার কাছ থেকে নিয়েছিলেন। এরপর সে কাপড় ধরে তাঁর কাঁধে জড়িয়ে সজোরে টানা-হেঁচড়া করল। কাপড়ের প্রান্ত মুঠিতে ধরে রাখলো এবং রূঢ় ভাষায় কথা বলল। সে এরপর আরও বলল: তোমরা আব্দুল মুত্তালিবের বংশের লোক। বড় টালবাহানা কর তোমরা।
হযরত উমর (রা) সেখানে ছিলেন। তিনি লোকটির নিষ্ঠুর ও রূঢ় আচরণ লক্ষ্য করে তাকে ধমক লাগালেন এবং কড়া ভাষায় কথা বললেন। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুখে হাসি লেগেই ছিল। তিনি হযরত উমর (রা)- কে বললেন, "উমর! আমি ও এই লোক তোমার কাছে অন্যরকম ব্যবহার পাবার হকদার ছিলাম। দরকার তো ছিল, তুমি আমাকে সত্ত্বর কর্জ পরিশোধের পরামর্শ দিতে আর তাকে বলতে নরম ও মোলায়েম ভাষায় তাগাদা দিতে।" এরপর তিনি জানালেন যে, তার ঋণ-পরিশোধের এখনও তিনদিন সময় বাকী আছে। যাই হোক, তিনি হযরত উমর (রা)-কে এ ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দেশ দিলেন এবং আরও বিশ সা' বেশি দেবার জন্য বললেন এজন্য যে, হযরত উমর (রা) তাকে ভীত-শংকিত করে দিয়েছিলেন। আর এ কথাই তার অর্থাৎ পাওনাদার লোকটির (যায়দ ইবন সু'নার) ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিলো।'
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, "একবার মক্কা থেকে ৮০ জন সশস্ত্র লোক তানঈম পাহাড় বেয়ে হঠাৎ নেমে আসে এবং প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। তিনি সবাইকে বন্দী করেন, কিন্তু কাউকে প্রাণে না মেরে সবাইকে জীবিত রাখেন।”২
জাবির (রা) বর্ণনা করেন : আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে একবার নজদের দিকে অভিযান পরিচালনা করি। পথিমধ্যে দুপুর হয়ে গেল এবং আমরা বিশ্রাম নেবার প্রয়োজনবোধ করছিলাম। তলোয়ার ছিল গাছের ডালে ঝোলানো। লোকেরা এদিক-সেদিক বিভিন্ন গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। এ অবস্থায় আল্লাহ্র রাসূল (সা) আমাকে ডাক দিলেন। আমরা রাসুল (সা)-এর খিদমতে এসে দেখি এক বেদুঈন তাঁর সামনে বসা। তিনি বললেন: "আমি শুয়ে ছিলাম। এই লোক এসে আমার তলোয়ার টেনে নামায়। আমি জেগে দেখতে পেলাম সে তলোয়ার হাতে আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে। সে আমাকে বলল, এখন আমার হাত থেকে কে তোমাকে বাঁচাবে? আমি বললাম : আল্লাহ্! এরপর সে তলোয়ার খাপে বন্ধ করল এবং বসে পড়ল। এই সে লোক যে এখন তোমাদের সামনে বসা।" বর্ণনাকারী (হযরত জাবির) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) তাকে কোন শাস্তি দেননি।৪
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অবস্থা ছিল এরূপ যে, সমস্ত সাহাবায়ে কিরামের ধৈর্য একত্র করলেও তার সমকক্ষ হবে না। অথচ সাহাবায়ে কিরাম (রা) সকলেই ধৈর্যের প্রতিমূর্তি ছিলেন। ওপরের সকল ব্যাপারে সকলের জন্যই তাঁর ভূমিকা ছিল একজন স্নেহশীল উস্তাদ, একজন রহমদিল ও মেহেরবান সংস্কারক মুরুব্বীর। এর একটি নমুনা আমরা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর বর্ণনায় দেখতে পাই। তিনি বলেন- একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দিল। লোকেরা তা দেখতে পেয়ে তেড়েফুঁড়ে এলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে থামিয়ে দিয়ে বললেন: "তাকে তোমরা ছেড়ে দাও এবং যেখানে সে প্রস্রাব করেছে সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দাও। মনে রেখ, তোমাদেরকে আসানী সৃষ্টিকারী হিসাবে পাঠানো হয়েছে, দুর্বিষহ বিড়ম্বনা সৃষ্টিকারী হিসাবে নয়।"১
মু'আবিয়া ইবনুল হাকাম (রা) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে সালাত আদায় করছিলাম। এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। আমি জওয়াবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বললাম। লোকে আমাকে জওয়াব দিতে শুনে রাগে আমার দিকে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, তোমাদের মা তোমাদেরকে কাঁদাক! কী হয়েছে যে, তোমরা আমার দিকে এভাবে রেগে তাকাচ্ছ? শুনে লোকেরা তাদের নিজেদের রানের ওপর থাপ্পড় মারতে লাগল।
যখন আমি বুঝতে পারলাম তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে, তখন আমি চুপ করলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সা) সালাত আদায় থেকে মুক্ত হলেন। আমার পিতামাতা তাঁর জন্য কুরবান হোক! আমি এর আগে তাঁর মত মুরুব্বী ও শিক্ষক দেখিনি এবং এরপরও দেখিনি। আল্লাহ্র কসম করে বলছি, তিনি আমাকে শাসাননি, আমাকে ভালমন্দও কিছু বলেননি। কেবল এতটুকু বলেছেন, "সালাত আদায়রত অবস্থায় সাধারণত মানুষ যেভাবে কথা বলে, সেভাবে কথা বলা উচিত নয়। সালাত কেবল তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য।"২
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) খুবই রহমদিল ছিলেন। তাঁর নিকট কোন অভাবী লোক কিংবা কোন লোক প্রয়োজন নিয়ে এলে তিনি অবশ্যই তাকে কিছু দেবার কথা দিতেন। কিছু থাকলে (দেবার মত) তখনই দিয়ে তার প্রয়োজন মেটাতেন। একবার সালাত দাঁড়িয়ে গেছে। এমন সময় জনৈক বেদুঈন সামনে এগিয়ে এলো এবং তাঁর কাপড় ধরে বলতে লাগল, "আমার একটা মামুলী প্রয়োজন বাকি আছে। আমার ভয় হয়, না জানি আমি ভুলে যাই!” তিনি তার সাথে গেলেন। সে তার কাজ শেষ করলে তিনি ফিরে এলেন এবং সালাত আদায় করলেন।'
তাঁর ধৈর্য, সহনশীলতা ও সহ্যশক্তি, উদার হৃদয় ও অটুট ইচ্ছাশক্তি সম্বন্ধে সাক্ষ্য তাঁরই খাদিম হযরত আনাস (রা) প্রদত্ত সাক্ষ্য থেকে পাওয়া যাবে। সে সময় তিনি খুবই অল্পবয়স্ক ছিলেন। তিনি বলেন- আমি দশ বছর ধরে আল্লাহ্ রাসূল (সা)-এর খিদমত করেছি। তিনি কখনও উহ্ বলেননি এবং কখনও এও বলেননি যে, "অমুক কাজ তুমি কেন করলে আর অমুক কাজ তুমি কেন করলে না?"২
সু'আদ ইবন উমর (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে হাযির হলাম। আমার কাপড়ে জাফরানমিশ্রিত খোশবুর চিহ্ন দিল। তিনি দেখে বললেন, ورس، روس "ফেলে দাও, ফেলে দাও"৩। তারপর তিনি ছড়ি দিয়ে আমার পেটের উপর আঘাত করলেন। এতে আমি কষ্ট পাই। আমি বললাম, "হে আল্লাহ্র রাসূল! এখন আমার উপর কিসাস (বদলা, বিনিময়) গ্রহণের অধিকার এসে বর্তেছে।" অমনি রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পেটের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে দিলেন এবং বললেন, "কিসাস নিয়ে নাও”৪।
টিকাঃ
১. ৯ম হিজরীতে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর যিলকাদাহ মাসে তার মৃত্যু হয়। আয- যারকানী, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১১২-১১৩
২. বুখারী, কিতাবুষ জানাইয, সংক্ষিপ্ত
৩. বুখারী, কিতাবুজ জিহাদ كان النبي صلعم يعطى المولفة قلوبهم শীর্ষক অধ্যায়। এ ছাড়াও ইমাম আহমদ, ৩য়, খণ্ড, ১৫৩, (শব্দের সামান্য পরিবর্তনসহ)
১. বায়হাকী (বিস্তারিতভাবে): আহমদ, ৩য় খণ্ড, ১৫৩, (কিছুটা শাব্দিক পার্থক্যসহ)
২. মুসলিম, কিতাবুজ জিহাদ ওয়াস সিয়ার, আল্লাহর বাণী: وهو الذي كف أيديهم عنكم
৩. এখানে ৩৬ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে- যার দু'টো অর্থ হতে পারে : এক, সে তলোয়ার খাপে বন্ধ করল। দুই, সে তলোয়ার টেনে নিল এবং তা দেখল (মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার)
৪. বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, মুস্তালিক যুদ্ধ শীর্ষক অধ্যায়
১. বুখারী, কিতাবুল-উযূ
২. মুসলিম, 'সালাতে কথা বলা হারাম' শীর্ষক অধ্যায়
১. মুসলিম কিতাবুল-ফাযাইল (حسن خلق صلی) শীর্ষক অধ্যায়
২. মুসলিম, কিতাবুল-ফাযাইল
৩. এক ধরনের হলদে রং, যা দিয়ে কাপড় রঞ্জিত করা হয়।
৪. কিতাবুশ-শিফা, প্রতিশোধের কামনায় নয়, ভালবাসার টানে বলেছিল।
আল্লাহ্র রাসূল (সা) সর্বোত্তম আখলাক ও চরিত্র, দয়া, বদান্যতা ও বিনয়ের ক্ষেত্রে সমগ্র মানবতার ইমাম ও অগ্রনায়ক ছিলেন।
আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন : إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ "হে রাসূল! আপনি নিশ্চিতই মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।"
অপরদিকে আল্লাহ্র রাসূল (সা) স্বয়ং বলেছেন : أَدْبَنِي رَبِّي فَأَحْسَنَ تَأْدِيْبِي "আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং সর্বোত্তম প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।"
হযরত জাবির (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন: إِنَّ اللهَ تَعَالَى بَعَثَنِي لِإِثْمَامِ مَكَارِمِ الْأَخْلَاقِ كَمَالِ مَحَاسِنِ الْأَفْعَالِ "আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে সর্বোত্তম আখলাক-চরিত্র ও উত্তম কার্যাবলীর পূর্ণতাদানের জন্য পাঠিয়েছেন।"
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আখলাক-চরিত্র কেমন ছিল? এ সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন : كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنُ "আখলাক চরিত্রে তিনি কুরআনুল-কারীমের বাস্তব প্রতিমূর্তি ছিলেন।" [সহীহ মুসলিম, আয়েশা (রা) বর্ণিত]
ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য-সহ্য, প্রশস্ত হৃদয় ও সহনশীলতার ক্ষেত্রে তাঁর যে অবস্থানগত মর্যাদা ছিল, সে পর্যন্ত মেধার অধিকারীর মেধা ও কবির কল্পনাও পৌঁছতে পারে না।
যদি এসব ঘটনা সেই নির্দিষ্ট পন্থায় বর্ণনা না করা হতো- যা সকল সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে, তাহলে লোকের মেধা ও মনন আজ তা গ্রহণ করত না। কিন্তু এসব বর্ণনা এতটা সঠিক, নির্ভুল ও অব্যাহত সনদে একজন নির্ভরযোগ্য, ন্যায়পরায়ণ রাবী থেকে আরেকজন নির্ভরযোগ্য ন্যায়পরায়ণ রাবী পর্যন্ত এরূপ সংযত ও সতর্কতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসবের ভিতর এমন ধারাবাহিক সূত্র পাওয়া যায় যে, এর দরুন এসব বর্ণনা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলীল-দস্তাবেজের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
এ প্রসঙ্গে আমরা কতকগুলো ঘটনা বর্ণনা করব। তাঁর দয়া, দানশীলতা ও চরম থেকে চরমতম দুশমনকেও সৌজন্য প্রদর্শন ও সহানুভূতিমূলক আচরণের একটি নমুনা ছিল সেই ঘটনাটি, যখন মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সলুলকে' কবরে নামানো হয়। তিনি সেখানে গমন করেন এবং তাকে কবর থেকে বের করবার নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি তার লাশ হাঁটুর উপর নিলেন, পবিত্র মুখের থুথু তার উপর নিক্ষেপ করলেন এবং নিজের পরনের জামা দিয়ে তাকে কাফন পরালেন।’২
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে চলছিলাম। সে সময় তিনি নাজরানের কাপড় পরেছিলেন যার প্রান্তদেশ ছিল মোটা। পথিমধ্যে এক বেদুঈনের সঙ্গে দেখা। সে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাদর মুবারক ধরে জোরে টান দিল। আমি চোখ তুলে দেখতে পেলাম জোরে টান দেয়ার ফলে তাঁর গলায় দাগ পড়ে গেছে। এরপর সেই বেদুঈন বলল: ওহে মুহাম্মদ! আল্লাহ্র যে মাল আপনার কাছে রয়েছে, তা আমাদের দেয়ার জন্য হুকুম দিন। তিনি তার দিকে ঘুরে দেখলেন এবং হাসলেন, তারপর তাকে তার প্রার্থিত বস্তু দেয়ার ব্যবস্থা করলেন।৩
যায়দ ইবন সু'না (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) রাসূল (সা)-এর কাছে এলো এবং তাকে ধার পরিশোধের দাবি জানালো- যা তিনি তার কাছ থেকে নিয়েছিলেন। এরপর সে কাপড় ধরে তাঁর কাঁধে জড়িয়ে সজোরে টানা-হেঁচড়া করল। কাপড়ের প্রান্ত মুঠিতে ধরে রাখলো এবং রূঢ় ভাষায় কথা বলল। সে এরপর আরও বলল: তোমরা আব্দুল মুত্তালিবের বংশের লোক। বড় টালবাহানা কর তোমরা।
হযরত উমর (রা) সেখানে ছিলেন। তিনি লোকটির নিষ্ঠুর ও রূঢ় আচরণ লক্ষ্য করে তাকে ধমক লাগালেন এবং কড়া ভাষায় কথা বললেন। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুখে হাসি লেগেই ছিল। তিনি হযরত উমর (রা)- কে বললেন, "উমর! আমি ও এই লোক তোমার কাছে অন্যরকম ব্যবহার পাবার হকদার ছিলাম। দরকার তো ছিল, তুমি আমাকে সত্ত্বর কর্জ পরিশোধের পরামর্শ দিতে আর তাকে বলতে নরম ও মোলায়েম ভাষায় তাগাদা দিতে।" এরপর তিনি জানালেন যে, তার ঋণ-পরিশোধের এখনও তিনদিন সময় বাকী আছে। যাই হোক, তিনি হযরত উমর (রা)-কে এ ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দেশ দিলেন এবং আরও বিশ সা' বেশি দেবার জন্য বললেন এজন্য যে, হযরত উমর (রা) তাকে ভীত-শংকিত করে দিয়েছিলেন। আর এ কথাই তার অর্থাৎ পাওনাদার লোকটির (যায়দ ইবন সু'নার) ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিলো।'
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, "একবার মক্কা থেকে ৮০ জন সশস্ত্র লোক তানঈম পাহাড় বেয়ে হঠাৎ নেমে আসে এবং প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। তিনি সবাইকে বন্দী করেন, কিন্তু কাউকে প্রাণে না মেরে সবাইকে জীবিত রাখেন।”২
জাবির (রা) বর্ণনা করেন : আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে একবার নজদের দিকে অভিযান পরিচালনা করি। পথিমধ্যে দুপুর হয়ে গেল এবং আমরা বিশ্রাম নেবার প্রয়োজনবোধ করছিলাম। তলোয়ার ছিল গাছের ডালে ঝোলানো। লোকেরা এদিক-সেদিক বিভিন্ন গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। এ অবস্থায় আল্লাহ্র রাসূল (সা) আমাকে ডাক দিলেন। আমরা রাসুল (সা)-এর খিদমতে এসে দেখি এক বেদুঈন তাঁর সামনে বসা। তিনি বললেন: "আমি শুয়ে ছিলাম। এই লোক এসে আমার তলোয়ার টেনে নামায়। আমি জেগে দেখতে পেলাম সে তলোয়ার হাতে আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে। সে আমাকে বলল, এখন আমার হাত থেকে কে তোমাকে বাঁচাবে? আমি বললাম : আল্লাহ্! এরপর সে তলোয়ার খাপে বন্ধ করল এবং বসে পড়ল। এই সে লোক যে এখন তোমাদের সামনে বসা।" বর্ণনাকারী (হযরত জাবির) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) তাকে কোন শাস্তি দেননি।৪
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অবস্থা ছিল এরূপ যে, সমস্ত সাহাবায়ে কিরামের ধৈর্য একত্র করলেও তার সমকক্ষ হবে না। অথচ সাহাবায়ে কিরাম (রা) সকলেই ধৈর্যের প্রতিমূর্তি ছিলেন। ওপরের সকল ব্যাপারে সকলের জন্যই তাঁর ভূমিকা ছিল একজন স্নেহশীল উস্তাদ, একজন রহমদিল ও মেহেরবান সংস্কারক মুরুব্বীর। এর একটি নমুনা আমরা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর বর্ণনায় দেখতে পাই। তিনি বলেন- একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দিল। লোকেরা তা দেখতে পেয়ে তেড়েফুঁড়ে এলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে থামিয়ে দিয়ে বললেন: "তাকে তোমরা ছেড়ে দাও এবং যেখানে সে প্রস্রাব করেছে সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দাও। মনে রেখ, তোমাদেরকে আসানী সৃষ্টিকারী হিসাবে পাঠানো হয়েছে, দুর্বিষহ বিড়ম্বনা সৃষ্টিকারী হিসাবে নয়।"১
মু'আবিয়া ইবনুল হাকাম (রা) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে সালাত আদায় করছিলাম। এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। আমি জওয়াবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বললাম। লোকে আমাকে জওয়াব দিতে শুনে রাগে আমার দিকে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, তোমাদের মা তোমাদেরকে কাঁদাক! কী হয়েছে যে, তোমরা আমার দিকে এভাবে রেগে তাকাচ্ছ? শুনে লোকেরা তাদের নিজেদের রানের ওপর থাপ্পড় মারতে লাগল।
যখন আমি বুঝতে পারলাম তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে, তখন আমি চুপ করলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সা) সালাত আদায় থেকে মুক্ত হলেন। আমার পিতামাতা তাঁর জন্য কুরবান হোক! আমি এর আগে তাঁর মত মুরুব্বী ও শিক্ষক দেখিনি এবং এরপরও দেখিনি। আল্লাহ্র কসম করে বলছি, তিনি আমাকে শাসাননি, আমাকে ভালমন্দও কিছু বলেননি। কেবল এতটুকু বলেছেন, "সালাত আদায়রত অবস্থায় সাধারণত মানুষ যেভাবে কথা বলে, সেভাবে কথা বলা উচিত নয়। সালাত কেবল তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য।"২
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) খুবই রহমদিল ছিলেন। তাঁর নিকট কোন অভাবী লোক কিংবা কোন লোক প্রয়োজন নিয়ে এলে তিনি অবশ্যই তাকে কিছু দেবার কথা দিতেন। কিছু থাকলে (দেবার মত) তখনই দিয়ে তার প্রয়োজন মেটাতেন। একবার সালাত দাঁড়িয়ে গেছে। এমন সময় জনৈক বেদুঈন সামনে এগিয়ে এলো এবং তাঁর কাপড় ধরে বলতে লাগল, "আমার একটা মামুলী প্রয়োজন বাকি আছে। আমার ভয় হয়, না জানি আমি ভুলে যাই!” তিনি তার সাথে গেলেন। সে তার কাজ শেষ করলে তিনি ফিরে এলেন এবং সালাত আদায় করলেন।'
তাঁর ধৈর্য, সহনশীলতা ও সহ্যশক্তি, উদার হৃদয় ও অটুট ইচ্ছাশক্তি সম্বন্ধে সাক্ষ্য তাঁরই খাদিম হযরত আনাস (রা) প্রদত্ত সাক্ষ্য থেকে পাওয়া যাবে। সে সময় তিনি খুবই অল্পবয়স্ক ছিলেন। তিনি বলেন- আমি দশ বছর ধরে আল্লাহ্ রাসূল (সা)-এর খিদমত করেছি। তিনি কখনও উহ্ বলেননি এবং কখনও এও বলেননি যে, "অমুক কাজ তুমি কেন করলে আর অমুক কাজ তুমি কেন করলে না?"২
সু'আদ ইবন উমর (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে হাযির হলাম। আমার কাপড়ে জাফরানমিশ্রিত খোশবুর চিহ্ন দিল। তিনি দেখে বললেন, ورس، روس "ফেলে দাও, ফেলে দাও"৩। তারপর তিনি ছড়ি দিয়ে আমার পেটের উপর আঘাত করলেন। এতে আমি কষ্ট পাই। আমি বললাম, "হে আল্লাহ্র রাসূল! এখন আমার উপর কিসাস (বদলা, বিনিময়) গ্রহণের অধিকার এসে বর্তেছে।" অমনি রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পেটের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে দিলেন এবং বললেন, "কিসাস নিয়ে নাও”৪।
টিকাঃ
১. ৯ম হিজরীতে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর যিলকাদাহ মাসে তার মৃত্যু হয়। আয- যারকানী, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১১২-১১৩
২. বুখারী, কিতাবুষ জানাইয, সংক্ষিপ্ত
৩. বুখারী, কিতাবুজ জিহাদ كان النبي صلعم يعطى المولفة قلوبهم শীর্ষক অধ্যায়। এ ছাড়াও ইমাম আহমদ, ৩য়, খণ্ড, ১৫৩, (শব্দের সামান্য পরিবর্তনসহ)
১. বায়হাকী (বিস্তারিতভাবে): আহমদ, ৩য় খণ্ড, ১৫৩, (কিছুটা শাব্দিক পার্থক্যসহ)
২. মুসলিম, কিতাবুজ জিহাদ ওয়াস সিয়ার, আল্লাহর বাণী: وهو الذي كف أيديهم عنكم
৩. এখানে ৩৬ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে- যার দু'টো অর্থ হতে পারে : এক, সে তলোয়ার খাপে বন্ধ করল। দুই, সে তলোয়ার টেনে নিল এবং তা দেখল (মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার)
৪. বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, মুস্তালিক যুদ্ধ শীর্ষক অধ্যায়
১. বুখারী, কিতাবুল-উযূ
২. মুসলিম, 'সালাতে কথা বলা হারাম' শীর্ষক অধ্যায়
১. মুসলিম কিতাবুল-ফাযাইল (حسن خلق صلی) শীর্ষক অধ্যায়
২. মুসলিম, কিতাবুল-ফাযাইল
৩. এক ধরনের হলদে রং, যা দিয়ে কাপড় রঞ্জিত করা হয়।
৪. কিতাবুশ-শিফা, প্রতিশোধের কামনায় নয়, ভালবাসার টানে বলেছিল।
📄 তাঁর বিনয়
তাঁর বিনয় ছিল অত্যধিক মাত্রায়। কোনকিছুতেই ও কোন ক্ষেত্রেই তিনি বিশিষ্ট ও দীপ্তিমান হওয়া পছন্দ করতেন না এবং এও ভাল মনে করতেন না যে, লোকে তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে পড়ুক কিংবা তাঁর প্রশংসা ও স্তুতির ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি বা সীমালংঘন করুক, যেমনটি অতীতের বহু উম্মত তাদের নবীদের বেলায় করেছে অথবা কেউ তাঁকে আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল হওয়া থেকেও তাঁর মর্যাদা ঊর্ধ্বে তুলে ধরুক তাও তিনি পছন্দ করতেন না। হযরত আনাস (রা) বলেন, "আমাদের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে বেশি প্রিয় আর কিছুই ছিল না।
আমরা তাঁকে দেখতাম এবং এই ধারণায় দাঁড়াতাম না যে, তিনি তা পছন্দ করেন না।”১
তাঁকে বলা হয়েছে, يا خير البرية অর্থাৎ “যে সৃষ্টির সর্বোত্তম মানুষ!” তখন তিনি বলেন, ذاك ابراهيم عليه السلام “এ মর্যাদা তো ইব্রাহীম (আ)-এর জন্য নির্ধারিত।”২
হযরত উমর (রা) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন: "আমার প্রশংসা এভাবে বাড়িয়ে করো না যেভাবে খ্রিস্টানরা ঈসা ইবন মরিয়ম (আ)-এর করেছিল। আমি তো কেবল আল্লাহ্র একজন বান্দা! তোমরা আমাকে আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল বলবে।"৩
আবদুল্লাহ ইবন আবী আওফা (রা) বর্ণনা করেন, "আল্লাহ্র রাসূল (সা) কোন গোলাম কিংবা বিধবার সঙ্গে পথ চলতে এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে কোনরূপ লোক-লজ্জা অনুভব করতেন না।"৪
হযরত আনাস (রা) বলেন, "মদীনার দাসী-বাঁদীরা কেউ এসে তাঁর হাত ধরত এবং যা কিছু বলার বলত, যতদূর পারত হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত।৫
আদী ইবন হাতিম আত-তাঈ (রা) যখন তাঁর খিদমতে হাযির হলেন, তখন তিনি তাঁকে নিজের ঘরে ডেকে নিলেন। একজন দাসী হেলান দেবার জন্য একটি বালিশ এগিয়ে দিল। তিনি বালিশটা নিয়ে আদী ও তাঁর মাঝে রেখে দিলেন এবং নিজে মাটির উপর বসে পড়লেন। আদী (রা) বলেন, এ থেকেই আমি বুঝতে পারলাম তিনি কোন বাদশাহ নন।৬
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন: "আল্লাহ্র রাসূল (সা) পীড়িতের সেবা করতেন, জানাযায় শরীক হতেন, গাধার ওপরও চড়তেন এবং ক্রীতদাসের দাওয়াতও কবুল করতেন।"৭
জাবির (রা) বর্ণনা করেন : "আল্লাহ্র রাসূল (সা) চলার সময় দুর্বল লোকদের কথা ভেবে চলার গতি শ্লথ করে দিতেন এবং তাদের জন্য দু'আ করতেন।"১
আনাস (রা) বর্ণনা করেন : "আল্লাহ্র রাসূল (সা)-কে যবের রুটি ও স্বাদ নষ্ট হতে যাচ্ছে এমন তরকারির দাওয়াত দেয়া হলেও তিনি তা কবুল করতেন।"২
তাঁর থেকেই আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, আল্লাহ্র রাসূল (সা) ইরশাদ করেন : "আমি একজন দাস, দাসের মতই খাই এবং দাসের মতই বসি।"৩
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনিল 'আস (রা) বর্ণনা করেন, "আল্লাহ্র রাসূল (সা) আমার ঘরে তশরীফ নিলেন। আমি ছালভর্তি চামড়ার একটি বালিশ তাঁর খিদমতে পেশ করলাম। তিনি মাটির ওপরই বসে পড়লেন এবং বালিশটি আমার ও তাঁর মাঝে রেখে দিলেন।"৪
আল্লাহ্র রাসূল (সা) নিজের ঘর নিজেই পরিষ্কার করতেন, উট বাঁধতেন, পশুর ঘাসপাতাও দিতেন, খিদমতগারের সঙ্গে বসে একই আসনে খানা খেতেন, আটা মাখতে তাকে সাহায্য করতেন এবং বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সওদা নিজেই নিয়ে আসতেন।"৫
টিকাঃ
১. তিরমিযী ও মুসনাদ আহমদ, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১৩২
২. মুসলিম, কিতাবুল-ফাযাইল
৩. বুখারী, কিতাবুল-আম্বিয়া
৪. বায়হাকী, রাসূলুল্লাহর বিনয় শীর্ষক অধ্যায়
৫. মুসনাদে আহমদ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৯৮-২১৫ ও জামউল-ফাওয়াইদ, ২য় খণ্ড, কিতাবুল-মানাকিব
৬. যাদুল-মাআদ, ১ম খণ্ড, ৪৩
৭. শামাইলে তিরমিযী, রাসূল (সা)-এর বিনয়
১. মুনযিরীকৃত আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব
২. শামাইলে তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদ, ৩য় খ., পৃঃ ২১১-২৮৯
৩. আশ-শিফা ১০১ পৃঃ
৪. আল-আদাবুল মুফরাদ পৃঃ ১৭২
৫. কিতাবুশ-শিফা, ১০১ পৃঃ বুখারীর বর্ণনামতে
তাঁর বিনয় ছিল অত্যধিক মাত্রায়। কোনকিছুতেই ও কোন ক্ষেত্রেই তিনি বিশিষ্ট ও দীপ্তিমান হওয়া পছন্দ করতেন না এবং এও ভাল মনে করতেন না যে, লোকে তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে পড়ুক কিংবা তাঁর প্রশংসা ও স্তুতির ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি বা সীমালংঘন করুক, যেমনটি অতীতের বহু উম্মত তাদের নবীদের বেলায় করেছে অথবা কেউ তাঁকে আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল হওয়া থেকেও তাঁর মর্যাদা ঊর্ধ্বে তুলে ধরুক তাও তিনি পছন্দ করতেন না। হযরত আনাস (রা) বলেন, "আমাদের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে বেশি প্রিয় আর কিছুই ছিল না।
আমরা তাঁকে দেখতাম এবং এই ধারণায় দাঁড়াতাম না যে, তিনি তা পছন্দ করেন না।”১
তাঁকে বলা হয়েছে, يا خير البرية অর্থাৎ “যে সৃষ্টির সর্বোত্তম মানুষ!” তখন তিনি বলেন, ذاك ابراهيم عليه السلام “এ মর্যাদা তো ইব্রাহীম (আ)-এর জন্য নির্ধারিত।”২
হযরত উমর (রা) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন: "আমার প্রশংসা এভাবে বাড়িয়ে করো না যেভাবে খ্রিস্টানরা ঈসা ইবন মরিয়ম (আ)-এর করেছিল। আমি তো কেবল আল্লাহ্র একজন বান্দা! তোমরা আমাকে আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল বলবে।"৩
আবদুল্লাহ ইবন আবী আওফা (রা) বর্ণনা করেন, "আল্লাহ্র রাসূল (সা) কোন গোলাম কিংবা বিধবার সঙ্গে পথ চলতে এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে কোনরূপ লোক-লজ্জা অনুভব করতেন না।"৪
হযরত আনাস (রা) বলেন, "মদীনার দাসী-বাঁদীরা কেউ এসে তাঁর হাত ধরত এবং যা কিছু বলার বলত, যতদূর পারত হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত।৫
আদী ইবন হাতিম আত-তাঈ (রা) যখন তাঁর খিদমতে হাযির হলেন, তখন তিনি তাঁকে নিজের ঘরে ডেকে নিলেন। একজন দাসী হেলান দেবার জন্য একটি বালিশ এগিয়ে দিল। তিনি বালিশটা নিয়ে আদী ও তাঁর মাঝে রেখে দিলেন এবং নিজে মাটির উপর বসে পড়লেন। আদী (রা) বলেন, এ থেকেই আমি বুঝতে পারলাম তিনি কোন বাদশাহ নন।৬
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন: "আল্লাহ্র রাসূল (সা) পীড়িতের সেবা করতেন, জানাযায় শরীক হতেন, গাধার ওপরও চড়তেন এবং ক্রীতদাসের দাওয়াতও কবুল করতেন।"৭
জাবির (রা) বর্ণনা করেন : "আল্লাহ্র রাসূল (সা) চলার সময় দুর্বল লোকদের কথা ভেবে চলার গতি শ্লথ করে দিতেন এবং তাদের জন্য দু'আ করতেন।"১
আনাস (রা) বর্ণনা করেন : "আল্লাহ্র রাসূল (সা)-কে যবের রুটি ও স্বাদ নষ্ট হতে যাচ্ছে এমন তরকারির দাওয়াত দেয়া হলেও তিনি তা কবুল করতেন।"২
তাঁর থেকেই আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, আল্লাহ্র রাসূল (সা) ইরশাদ করেন : "আমি একজন দাস, দাসের মতই খাই এবং দাসের মতই বসি।"৩
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনিল 'আস (রা) বর্ণনা করেন, "আল্লাহ্র রাসূল (সা) আমার ঘরে তশরীফ নিলেন। আমি ছালভর্তি চামড়ার একটি বালিশ তাঁর খিদমতে পেশ করলাম। তিনি মাটির ওপরই বসে পড়লেন এবং বালিশটি আমার ও তাঁর মাঝে রেখে দিলেন।"৪
আল্লাহ্র রাসূল (সা) নিজের ঘর নিজেই পরিষ্কার করতেন, উট বাঁধতেন, পশুর ঘাসপাতাও দিতেন, খিদমতগারের সঙ্গে বসে একই আসনে খানা খেতেন, আটা মাখতে তাকে সাহায্য করতেন এবং বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সওদা নিজেই নিয়ে আসতেন।"৫
টিকাঃ
১. তিরমিযী ও মুসনাদ আহমদ, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১৩২
২. মুসলিম, কিতাবুল-ফাযাইল
৩. বুখারী, কিতাবুল-আম্বিয়া
৪. বায়হাকী, রাসূলুল্লাহর বিনয় শীর্ষক অধ্যায়
৫. মুসনাদে আহমদ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৯৮-২১৫ ও জামউল-ফাওয়াইদ, ২য় খণ্ড, কিতাবুল-মানাকিব
৬. যাদুল-মাআদ, ১ম খণ্ড, ৪৩
৭. শামাইলে তিরমিযী, রাসূল (সা)-এর বিনয়
১. মুনযিরীকৃত আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব
২. শামাইলে তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদ, ৩য় খ., পৃঃ ২১১-২৮৯
৩. আশ-শিফা ১০১ পৃঃ
৪. আল-আদাবুল মুফরাদ পৃঃ ১৭২
৫. কিতাবুশ-শিফা, ১০১ পৃঃ বুখারীর বর্ণনামতে
📄 বীরত্ব, সাহসিকতা ও লজ্জা-শরম
তাঁর চরিত্রে বীরত্ব, সাহসিকতা ও লজ্জা-শরম (যাকে অধিকাংশ মানুষ পরস্পর বিপরীত মনে করে) একই রূপ ছিল। তাঁর লজ্জাশীলতা সম্বন্ধে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, "তিনি পর্দানশীন কুমারী বালিকার চেয়েও অধিক লাজুক ছিলেন। কোন জিনিস তাঁর অপছন্দনীয় হলে তাঁর চেহারায় এর প্রতিক্রিয়া দেখা যেতো।"৬
অতিরিক্ত লজ্জা-শরমের কারণে কারো মুখের উপর এমন কথা বলতে পারতেন না- যা তার নিকট বিষাদের কারণ হবে। এটির ভার তিনি অন্যকে সোপর্দ করতেন। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন- একবার আল্লাহর রাসূল (সা)-এর মজলিসে জনৈক ব্যক্তির কাপড়ে হলদে রঙ বেশি দেখা যাচ্ছিল। যেহেতু তিনি কারো মুখের ওপর এমন কথা বলা পছন্দ করতেন না, যা তাঁর নিকট খারাপ লাগবে। এজন্য সে যখন উঠে পড়ল, তখন তিনি লোকদেরকে বললেন, "খুবই ভাল ছিল যদি তোমরা তাকে হলদে রঙের কাপড় ব্যবহার করা ছেড়ে দেবার জন্য বলে দিতে।"১
হযরত আয়েশা (রা) বলেন: যখন তিনি কারো সম্বন্ধে খারাপ কিছু জানতে পেতেন তখন তিনি তার নাম ধরে এ কথা বলতেন না যে, সে এ কাজ কেন করল। বরং তিনি এভাবে বলতেন, "লোকের কি হলো যে, তারা এ রকম বলে কিংবা এ রকম করে।" তিনি তার বিরোধিতা করতেন বটে, কিন্তু অভিযুক্তের নাম প্রকাশ করতেন না।’২
তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা সম্পর্কে শেরে আল্লাহ্ আলী মুর্তাযা (রা)-এর সাক্ষ্যই যথেষ্ট হবে বলে আশা করি। তিনি বলেন, "যুদ্ধ যখন তীব্র আকার ধারণ করত এবং মনে হতো চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে খুঁজে বেড়াতাম যাতে আমরা তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করতে পারি এবং দেখতে পেতাম তিনি শত্রু থেকে খুব বেশি দূরে নন; অর্থাৎ সে সময় অন্যদের তুলনায় তিনিই শত্রুর কাছাকাছি থাকতেন। বদর যুদ্ধে আমাদের এই অবস্থায়ই ছিল। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আশ্রয় নিচ্ছিলাম আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুর সবচেয়ে বেশি কাছে ছিলেন।"৩
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন: "আল্লাহ্র রাসূল (সা) সকলের চেয়ে বেশি সুন্দর ও দীপ্তিমান, সবচেয়ে বেশি দানশীল ও সবচেয়ে বেশি বীর বাহাদুর ছিলেন। এক রাতে মদীনার লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল এবং যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিল সেদিকে ছুটে গেল। পথিমধ্যে সকলের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাক্ষাত হলো। তিনি তখন ফিরে আসছিলেন। তিনি আওয়াজ পেতেই সকলের আগেই বেরিয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলছিলেন “ভয় পাবার কারণ নেই, কোন ভয় নেই।” তিনি সে সময় আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়ার পিঠে ছিলেন যার পিঠে জীনও ছিল না। তাঁর কাঁধে তখন তলোয়ার ঝুলছিল। তিনি ঘোড়ার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, "আমি একে সমুদ্রের মত গতিশীল, প্রবহমান ও দ্রুত গতিসম্পন্ন পেয়েছি।"১
ওহুদ ও হুনায়ন যুদ্ধে যখন বড় বড় বীর বাহাদুর শত্রুপক্ষের তীব্র আক্রমণে বিক্ষিপ্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ছিল এবং রণক্ষেত্র ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, সে সময়ও তিনি তাঁর খচ্চরের ওপর তেমনি প্রশান্ত চিত্তে ও দৃঢ়তার সঙ্গে আপন অবস্থানে অটল ছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন কিছুই হয়নি। তিনি তখন নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করে চলেছিলেন:
أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبُ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبُ .
"আমি নবী, মিথ্যা নই; আবদুল মুত্তালিবের বংশধর আমি (এও তেমনি মিথ্যা নয়)।"
টিকাঃ
৬. বুখারী, কিতাবুল-মানাকিব
১. শামাইলে তিরমিযী
২. আবূ দাউদ
৩. আশ-শিফা, পৃঃ ৮৯
১. আল-আদাবুল-মুফরাদ, পৃঃ ৪৬ বুখারী-মুসলিমের বর্ণনাসূত্রে
তাঁর চরিত্রে বীরত্ব, সাহসিকতা ও লজ্জা-শরম (যাকে অধিকাংশ মানুষ পরস্পর বিপরীত মনে করে) একই রূপ ছিল। তাঁর লজ্জাশীলতা সম্বন্ধে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, "তিনি পর্দানশীন কুমারী বালিকার চেয়েও অধিক লাজুক ছিলেন। কোন জিনিস তাঁর অপছন্দনীয় হলে তাঁর চেহারায় এর প্রতিক্রিয়া দেখা যেতো।"৬
অতিরিক্ত লজ্জা-শরমের কারণে কারো মুখের উপর এমন কথা বলতে পারতেন না- যা তার নিকট বিষাদের কারণ হবে। এটির ভার তিনি অন্যকে সোপর্দ করতেন। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন- একবার আল্লাহর রাসূল (সা)-এর মজলিসে জনৈক ব্যক্তির কাপড়ে হলদে রঙ বেশি দেখা যাচ্ছিল। যেহেতু তিনি কারো মুখের ওপর এমন কথা বলা পছন্দ করতেন না, যা তাঁর নিকট খারাপ লাগবে। এজন্য সে যখন উঠে পড়ল, তখন তিনি লোকদেরকে বললেন, "খুবই ভাল ছিল যদি তোমরা তাকে হলদে রঙের কাপড় ব্যবহার করা ছেড়ে দেবার জন্য বলে দিতে।"১
হযরত আয়েশা (রা) বলেন: যখন তিনি কারো সম্বন্ধে খারাপ কিছু জানতে পেতেন তখন তিনি তার নাম ধরে এ কথা বলতেন না যে, সে এ কাজ কেন করল। বরং তিনি এভাবে বলতেন, "লোকের কি হলো যে, তারা এ রকম বলে কিংবা এ রকম করে।" তিনি তার বিরোধিতা করতেন বটে, কিন্তু অভিযুক্তের নাম প্রকাশ করতেন না।’২
তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা সম্পর্কে শেরে আল্লাহ্ আলী মুর্তাযা (রা)-এর সাক্ষ্যই যথেষ্ট হবে বলে আশা করি। তিনি বলেন, "যুদ্ধ যখন তীব্র আকার ধারণ করত এবং মনে হতো চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে খুঁজে বেড়াতাম যাতে আমরা তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করতে পারি এবং দেখতে পেতাম তিনি শত্রু থেকে খুব বেশি দূরে নন; অর্থাৎ সে সময় অন্যদের তুলনায় তিনিই শত্রুর কাছাকাছি থাকতেন। বদর যুদ্ধে আমাদের এই অবস্থায়ই ছিল। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আশ্রয় নিচ্ছিলাম আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুর সবচেয়ে বেশি কাছে ছিলেন।"৩
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন: "আল্লাহ্র রাসূল (সা) সকলের চেয়ে বেশি সুন্দর ও দীপ্তিমান, সবচেয়ে বেশি দানশীল ও সবচেয়ে বেশি বীর বাহাদুর ছিলেন। এক রাতে মদীনার লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল এবং যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিল সেদিকে ছুটে গেল। পথিমধ্যে সকলের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাক্ষাত হলো। তিনি তখন ফিরে আসছিলেন। তিনি আওয়াজ পেতেই সকলের আগেই বেরিয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলছিলেন “ভয় পাবার কারণ নেই, কোন ভয় নেই।” তিনি সে সময় আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়ার পিঠে ছিলেন যার পিঠে জীনও ছিল না। তাঁর কাঁধে তখন তলোয়ার ঝুলছিল। তিনি ঘোড়ার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, "আমি একে সমুদ্রের মত গতিশীল, প্রবহমান ও দ্রুত গতিসম্পন্ন পেয়েছি।"১
ওহুদ ও হুনায়ন যুদ্ধে যখন বড় বড় বীর বাহাদুর শত্রুপক্ষের তীব্র আক্রমণে বিক্ষিপ্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ছিল এবং রণক্ষেত্র ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, সে সময়ও তিনি তাঁর খচ্চরের ওপর তেমনি প্রশান্ত চিত্তে ও দৃঢ়তার সঙ্গে আপন অবস্থানে অটল ছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন কিছুই হয়নি। তিনি তখন নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করে চলেছিলেন:
أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبُ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبُ .
"আমি নবী, মিথ্যা নই; আবদুল মুত্তালিবের বংশধর আমি (এও তেমনি মিথ্যা নয়)।"
টিকাঃ
৬. বুখারী, কিতাবুল-মানাকিব
১. শামাইলে তিরমিযী
২. আবূ দাউদ
৩. আশ-শিফা, পৃঃ ৮৯
১. আল-আদাবুল-মুফরাদ, পৃঃ ৪৬ বুখারী-মুসলিমের বর্ণনাসূত্রে
📄 স্নেহ-ভালবাসা ও সাধারণ দয়ামায়া
এই ধরনের বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে সাথেই তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তাঁর চক্ষু সহজেই অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠত। দুর্বল মানুষ, এমনকি অবলা পশুর প্রতি সদয় ব্যবহারের জন্যও তিনি নির্দেশ দিতেন। শাদ্দাদ ইবন আওস (রা) বলেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন, "আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে ভাল ব্যবহার ও কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য হত্যা করতে চাইলেও ভালভাবে কর, যবেহ করলেও ভালভাবে কর। তোমাদের কেউ পশু যবেহ করতে চাইলে সে যেন তার ছুরি ভালভাবে শান দিয়ে নেয় এবং যবেহর সময় যেন কষ্ট না দেয়।”২
হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- এক ব্যক্তি একটি বকরী যবেহর জন্য মাটিতে শুইয়ে দিয়ে ছুরিতে শান দিতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা) তা দেখে তাকে বললেন, "তুমি কি তাকে দু'বার মারতে চাও? তাকে শুইয়ে দেবার আগেই কেন তুমি ছুরিতে শান দিয়ে নিলে না?"৩
তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে জীব-জানোয়ারকে ঘাসপাতা খাবার দেবার জন্য নির্দেশ দিতেন এবং তাদেরকে পেরেশান করতে ও ওদের পিঠে ওদের সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপাতে নিষেধ করেন। পশুর কষ্ট দূর করা ও ওদের আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করাকে তিনি সাওয়াব বা পুরস্কারের কারণ এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভের মাধ্যম বলে মনে করেন। তিনি এর ফযীলতও বর্ণনা করেন।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন- রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন: “এক ব্যক্তি কোথাও সফরে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তার তীব্র পিপাসা লাগে। তিনি একটু দূরে একটি কুয়া পেলেন এবং এতে নেমে পড়লেন। পানি পানের পর তিনি ওপরে উঠে এসে দেখতে পেলেন, একটা কুকুর পিপাসায় পানির অভাবে কাদামাটি চাটছে। লোকটি মনে মনে ভাবলেন, পিপাসায় আমার যে অবস্থা হয়েছিল, এর অবস্থাও তো সেরূপই। তিনি পুনরায় কুয়ায় নামলেন। নিজের চামড়ার মোজায় পানি ভর্তি করলেন, অতঃপর পানিভর্তি মোজাটি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ওপরে উঠে এলেন এবং কুকুরটিকে পানি পান করালেন। আল্লাহ্ তা'আলা তার এই আমলকে কবুল করলেন এবং তার বিগত জীবনের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন। লোকেরা আরয করল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! পশু-পাখি ও জীব-জানেয়ারের ব্যাপারেও পুরস্কার রয়েছে?" তিনি বললেন: "সৃষ্টি জগতের এমন প্রতিটি বস্তুতে পুরস্কার রয়েছে, যার প্রাণ রয়েছে, যা তরতাজা ও জীবন্ত।”১
আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "জনৈক মহিলাকে কেবল এজন্যে শাস্তি দান করা হয়েছিল যে, সে তার বিড়ালটাকে খেতে দেয়নি, বিড়ালটাকে বেঁধে রাখার কারণে সে কোন কিছু শিকার করেও খেতে পারেনি। ফলে সেটা মারা গিয়েছিল।”২
সুহায়ল ইবন আমর (অন্য বর্ণনায় সুহায়ল ইবনুর রবী ইবন আমর) (রা) বর্ণনা করেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) একবার পথ চলতে একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উটটা অনাহারে থাকার দরুন শীর্ণকায় হয়ে গিয়েছিল এবং তার পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। এটা দেখে তিনি (উটের মালিককে ডেকে) বললেন, "এসব অবলা পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। এর পিঠে যখন উঠবে, তখন ভালভাবে উঠবে। যখন যবেহ করে তার গোশত খাবে, তখনও যেন সে ভাল অবস্থায় থাকে।”
আবদুল্লাহ ইবন জাফর (রা) বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ (সা) জনৈক আনসারীর ঘেরাও পাঁচিলের ভেতর প্রবেশ করলেন। ভেতরে একটি উট ছিল। রাসূল (সা)-কে দেখেই উটটি ডাকতে লাগল এবং তার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় পানি ঝরতে লাগল। আল্লাহ্র রাসূল (সা) তার কাছে গেলেন এবং তার কুঁজ ও পিঠের ওপর হাত বোলালেন। এতে উটটি শান্ত হলো। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, উটটির মালিক কে? এমন সময় এক আনসারী যুবক এলো এবং উটটি তার বলে জানাল। তিনি তাকে বললেন, "যে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে এ পশুর মালিক বানিয়েছেন, তাঁকে কি তুমি ভয় পাও না? সে তোমার বিরুদ্ধে আমার কাছে অভিযোগ করছে, তুমি তাকে কষ্ট দাও এবং সব সময় তাকে কাজে লাগিয়ে রাখ?"'
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন- আল্লাহ্ রাসূল (সা) বলেন: "যদি তোমরা সবুজ শ্যামল কোন জায়গায় যাও, তখন সেখানে জোরে হাঁটবে, যদি রাতে কোথাও ছাউনি ফেলতে হয়, তবে রাস্তার উপর ফেলবে না এজন্য যে, সেখানে জীব-জানোয়ার চলাফেরা করে থাকে এবং পোকা-মাকড় আশ্রয় নেয়।" ২
ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন- আমরা আল্লাহর রাসূল (সা)-এর সঙ্গে একবার সফরে ছিলাম। তিনি একটি জরুরী প্রয়োজনে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য অন্যত্র যান। ইতোমধ্যে আমরা একটি ছোট্ট পাখি দেখতে পেলাম, যার সাথে দু'টো ছানা ছিল। আমরা ছানা দু'টো নিয়ে এলাম। পাখিটা তা দেখে পাখা ঝাপটাতে লাগল। এমন সময় আল্লাহ্র রাসূল (সা) ফিরে এলেন এবং এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "ছানা দু'টো ছিনিয়ে এনে পাখিটাকে কে কষ্ট দিয়েছে?” এরপর তিনি ছানা দু'টো যথাস্থানে ফিরিয়ে দেবার নির্দেশ দিলেন। সেখানে আমরা পিঁপড়ার একটি টিবি দেখতে পাই এবং তা জ্বালিয়ে দিই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কে জ্বালিয়েছে?” আমরা বললাম, "আমরা এ কাজ করেছি।” তিনি বললেন, "আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেবার অধিকার কেবল আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের।"৩
খাদিম, চাকর-বাকর ও শ্রমিকদের সাথে- যারা আর পাঁচজন মানুষের মতই মানুষ, তাদের মনিব ও মালিকের ওপর তাদের হক রয়েছে। তিনি ভাল ব্যবহার করার যেই শিক্ষা দিয়েছেন, তা এর অতিরিক্ত। হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বলেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন, "তোমরা যা খাও তাদেরকেও তাই খেতে দাও, তোমরা যা পরো তাদেরকেও তাই পরাও। আর আল্লাহ্ তা'আলার মাখলুককে শাস্তিতে নিক্ষেপ করো না।"'
"যাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের অধীন করেছেন তারা তোমাদের ভাই, তোমাদের খাদিমও তোমাদেরই সাহায্যকারী, মদদগার। কাজেই যার ভাই যার অধীনে, তার উচিত হবে সে যা খাবে, তাকেও তাই খাওয়াবে। যা নিজে পরবে, তাকেও তাই পরতে দেবে। তাকে এমন কাজ করতে দেবে না- যা তার শক্তির বাইরে। যদি তাকে এমন কাজ করতে দিতেই হয়, তবে তুমি তার কাজে সহযোগী হবে, তাকে সাহায্য করবে।”২
আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা) বলেন- এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে এলো এবং জিজ্ঞেস করল, "আমি আমার নওকরকে দিনে কতবার ক্ষমা করব? তিনি বললেন, "সত্তরবার।"৩
বর্ণনকারী আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : "শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকাবার আগেই তার প্রাপ্য মজুরী দিয়ে দাও।"৪
টিকাঃ
২. মুসলিম, الامر باحسان الذبح শীর্ষক অধ্যায়; কিতাবুষ-যাবহ
৩. তাবারানী ও হাকিম-এর মতে হাদীসটি বুখারীর শর্ত মুতাবিক সহীহ
১. বুখারী, কিতাবুল-মুসকাত; মুসলিম, পশুকে পানি পান করানোর ফযীলত শীর্ষক অধ্যায়
২. ইমাম নববী, মুসলিম বর্ণিত ما يؤمر به من القيام على السواء ..
১. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত অধ্যায়
২. মুসলিম
৩. আবু দাউদ, কিতাবুল-জিহাদ
১. বুখারী, আল-আদাবুল-মুফরাদ, পৃঃ ৩৮
২. বুখারী ও আবু দাউদ
৩. তিরমিযী ও আবূ দাউদ
৪. ইবন মাজাহ, আবওয়াবুর রুহুন, শ্রমিকের পারিশ্রমিক অধ্যায়
এই ধরনের বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে সাথেই তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তাঁর চক্ষু সহজেই অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠত। দুর্বল মানুষ, এমনকি অবলা পশুর প্রতি সদয় ব্যবহারের জন্যও তিনি নির্দেশ দিতেন। শাদ্দাদ ইবন আওস (রা) বলেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন, "আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে ভাল ব্যবহার ও কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য হত্যা করতে চাইলেও ভালভাবে কর, যবেহ করলেও ভালভাবে কর। তোমাদের কেউ পশু যবেহ করতে চাইলে সে যেন তার ছুরি ভালভাবে শান দিয়ে নেয় এবং যবেহর সময় যেন কষ্ট না দেয়।”২
হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- এক ব্যক্তি একটি বকরী যবেহর জন্য মাটিতে শুইয়ে দিয়ে ছুরিতে শান দিতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা) তা দেখে তাকে বললেন, "তুমি কি তাকে দু'বার মারতে চাও? তাকে শুইয়ে দেবার আগেই কেন তুমি ছুরিতে শান দিয়ে নিলে না?"৩
তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে জীব-জানোয়ারকে ঘাসপাতা খাবার দেবার জন্য নির্দেশ দিতেন এবং তাদেরকে পেরেশান করতে ও ওদের পিঠে ওদের সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপাতে নিষেধ করেন। পশুর কষ্ট দূর করা ও ওদের আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করাকে তিনি সাওয়াব বা পুরস্কারের কারণ এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভের মাধ্যম বলে মনে করেন। তিনি এর ফযীলতও বর্ণনা করেন।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন- রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন: “এক ব্যক্তি কোথাও সফরে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তার তীব্র পিপাসা লাগে। তিনি একটু দূরে একটি কুয়া পেলেন এবং এতে নেমে পড়লেন। পানি পানের পর তিনি ওপরে উঠে এসে দেখতে পেলেন, একটা কুকুর পিপাসায় পানির অভাবে কাদামাটি চাটছে। লোকটি মনে মনে ভাবলেন, পিপাসায় আমার যে অবস্থা হয়েছিল, এর অবস্থাও তো সেরূপই। তিনি পুনরায় কুয়ায় নামলেন। নিজের চামড়ার মোজায় পানি ভর্তি করলেন, অতঃপর পানিভর্তি মোজাটি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ওপরে উঠে এলেন এবং কুকুরটিকে পানি পান করালেন। আল্লাহ্ তা'আলা তার এই আমলকে কবুল করলেন এবং তার বিগত জীবনের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন। লোকেরা আরয করল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! পশু-পাখি ও জীব-জানেয়ারের ব্যাপারেও পুরস্কার রয়েছে?" তিনি বললেন: "সৃষ্টি জগতের এমন প্রতিটি বস্তুতে পুরস্কার রয়েছে, যার প্রাণ রয়েছে, যা তরতাজা ও জীবন্ত।”১
আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "জনৈক মহিলাকে কেবল এজন্যে শাস্তি দান করা হয়েছিল যে, সে তার বিড়ালটাকে খেতে দেয়নি, বিড়ালটাকে বেঁধে রাখার কারণে সে কোন কিছু শিকার করেও খেতে পারেনি। ফলে সেটা মারা গিয়েছিল।”২
সুহায়ল ইবন আমর (অন্য বর্ণনায় সুহায়ল ইবনুর রবী ইবন আমর) (রা) বর্ণনা করেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) একবার পথ চলতে একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উটটা অনাহারে থাকার দরুন শীর্ণকায় হয়ে গিয়েছিল এবং তার পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। এটা দেখে তিনি (উটের মালিককে ডেকে) বললেন, "এসব অবলা পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। এর পিঠে যখন উঠবে, তখন ভালভাবে উঠবে। যখন যবেহ করে তার গোশত খাবে, তখনও যেন সে ভাল অবস্থায় থাকে।”
আবদুল্লাহ ইবন জাফর (রা) বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ (সা) জনৈক আনসারীর ঘেরাও পাঁচিলের ভেতর প্রবেশ করলেন। ভেতরে একটি উট ছিল। রাসূল (সা)-কে দেখেই উটটি ডাকতে লাগল এবং তার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় পানি ঝরতে লাগল। আল্লাহ্র রাসূল (সা) তার কাছে গেলেন এবং তার কুঁজ ও পিঠের ওপর হাত বোলালেন। এতে উটটি শান্ত হলো। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, উটটির মালিক কে? এমন সময় এক আনসারী যুবক এলো এবং উটটি তার বলে জানাল। তিনি তাকে বললেন, "যে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে এ পশুর মালিক বানিয়েছেন, তাঁকে কি তুমি ভয় পাও না? সে তোমার বিরুদ্ধে আমার কাছে অভিযোগ করছে, তুমি তাকে কষ্ট দাও এবং সব সময় তাকে কাজে লাগিয়ে রাখ?"'
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন- আল্লাহ্ রাসূল (সা) বলেন: "যদি তোমরা সবুজ শ্যামল কোন জায়গায় যাও, তখন সেখানে জোরে হাঁটবে, যদি রাতে কোথাও ছাউনি ফেলতে হয়, তবে রাস্তার উপর ফেলবে না এজন্য যে, সেখানে জীব-জানোয়ার চলাফেরা করে থাকে এবং পোকা-মাকড় আশ্রয় নেয়।" ২
ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন- আমরা আল্লাহর রাসূল (সা)-এর সঙ্গে একবার সফরে ছিলাম। তিনি একটি জরুরী প্রয়োজনে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য অন্যত্র যান। ইতোমধ্যে আমরা একটি ছোট্ট পাখি দেখতে পেলাম, যার সাথে দু'টো ছানা ছিল। আমরা ছানা দু'টো নিয়ে এলাম। পাখিটা তা দেখে পাখা ঝাপটাতে লাগল। এমন সময় আল্লাহ্র রাসূল (সা) ফিরে এলেন এবং এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "ছানা দু'টো ছিনিয়ে এনে পাখিটাকে কে কষ্ট দিয়েছে?” এরপর তিনি ছানা দু'টো যথাস্থানে ফিরিয়ে দেবার নির্দেশ দিলেন। সেখানে আমরা পিঁপড়ার একটি টিবি দেখতে পাই এবং তা জ্বালিয়ে দিই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কে জ্বালিয়েছে?” আমরা বললাম, "আমরা এ কাজ করেছি।” তিনি বললেন, "আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেবার অধিকার কেবল আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের।"৩
খাদিম, চাকর-বাকর ও শ্রমিকদের সাথে- যারা আর পাঁচজন মানুষের মতই মানুষ, তাদের মনিব ও মালিকের ওপর তাদের হক রয়েছে। তিনি ভাল ব্যবহার করার যেই শিক্ষা দিয়েছেন, তা এর অতিরিক্ত। হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বলেন- আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন, "তোমরা যা খাও তাদেরকেও তাই খেতে দাও, তোমরা যা পরো তাদেরকেও তাই পরাও। আর আল্লাহ্ তা'আলার মাখলুককে শাস্তিতে নিক্ষেপ করো না।"'
"যাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের অধীন করেছেন তারা তোমাদের ভাই, তোমাদের খাদিমও তোমাদেরই সাহায্যকারী, মদদগার। কাজেই যার ভাই যার অধীনে, তার উচিত হবে সে যা খাবে, তাকেও তাই খাওয়াবে। যা নিজে পরবে, তাকেও তাই পরতে দেবে। তাকে এমন কাজ করতে দেবে না- যা তার শক্তির বাইরে। যদি তাকে এমন কাজ করতে দিতেই হয়, তবে তুমি তার কাজে সহযোগী হবে, তাকে সাহায্য করবে।”২
আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা) বলেন- এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে এলো এবং জিজ্ঞেস করল, "আমি আমার নওকরকে দিনে কতবার ক্ষমা করব? তিনি বললেন, "সত্তরবার।"৩
বর্ণনকারী আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : "শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকাবার আগেই তার প্রাপ্য মজুরী দিয়ে দাও।"৪
টিকাঃ
২. মুসলিম, الامر باحسان الذبح শীর্ষক অধ্যায়; কিতাবুষ-যাবহ
৩. তাবারানী ও হাকিম-এর মতে হাদীসটি বুখারীর শর্ত মুতাবিক সহীহ
১. বুখারী, কিতাবুল-মুসকাত; মুসলিম, পশুকে পানি পান করানোর ফযীলত শীর্ষক অধ্যায়
২. ইমাম নববী, মুসলিম বর্ণিত ما يؤمر به من القيام على السواء ..
১. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত অধ্যায়
২. মুসলিম
৩. আবু দাউদ, কিতাবুল-জিহাদ
১. বুখারী, আল-আদাবুল-মুফরাদ, পৃঃ ৩৮
২. বুখারী ও আবু দাউদ
৩. তিরমিযী ও আবূ দাউদ
৪. ইবন মাজাহ, আবওয়াবুর রুহুন, শ্রমিকের পারিশ্রমিক অধ্যায়