📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 স্বভাব-প্রকৃতিতে ভারসাম্য

📄 স্বভাব-প্রকৃতিতে ভারসাম্য


আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে যেই উন্নত স্তরের আখলাক এবং যেই সর্বোচ্চ শ্রেণীর স্বভাবজাত ও প্রকৃতিগত ভারসাম্য দান করেছিলেন, তা ছিল ভবিষ্যত শতাব্দীগুলোর এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পূর্ণতম বিকাশ। একে আমরা স্বভাবের ভারসাম্য, সুস্থ প্রকৃতি, অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও তীক্ষ্ণতা, ভারসাম্যপূর্ণ ও কম-বেশির বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত বলে আখ্যায়িত করতে পারি। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, "আল্লাহ্র রাসূল (সা) দু'টো কাজের মধ্যে যখন কোন একটিকে প্রাধান্য প্রদান করতেন, তখন সব সময় সহজতরটিকেই প্রাধান্য দিতেন; তবে এই শর্তে যে, এতে গুনাহের নাম-গন্ধও যেন না থাকে! যদি এতে গুনাহের সামান্যতম গন্ধও পাওয়া যেত, তবে তিনি এর থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে অবস্থান করতেন।"'
তিনি বেশি লৌকিকতা, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি যুহদ ও নির্লিপ্ততা এবং নফসের বৈধ অধিকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া থেকে অনেক দূরে ছিলেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন: "দ্বীন খুব সহজ; তবে কেউ যদি দ্বীনের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় এগিয়ে আসে, দ্বীন তার উপর বিজয়ী হবে, প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করবে। এজন্য মধ্যম পন্থায় ভারসাম্যপূর্ণ পথে চল। কাছের দিকগুলোর রেয়ায়াত কর, সন্তুষ্ট থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও অন্ধকার রাতের ইবাদত থেকে শক্তি অর্জন কর।"২
তিনি এও বলতেন: "থাম, ততটুকুই কর, যতটুকু করার শক্তি তোমার রয়েছে। আর তা এজন্য যে, আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ তা'আলা তো ক্লান্ত হয়ে পড়বেন না; বরং তোমরাই ক্লান্ত হয়ে পড়বে।"
ইবন আব্বাস (রা) বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট কোন ধরনের দ্বীন বা ধর্ম সবচেয়ে প্রিয় ও পছন্দনীয়? তিনি বললেন : "الْحَنِيفِيَّةُ السَّبْحَةُ " সহজ ও নিষ্ঠাপূর্ণ দ্বীনে ইব্রাহীমী।""
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন: "বাড়াবাড়ি ও জোর-যবরদস্তির সঙ্গে কাজ আদায়কারী ও খুঁত তালাশকারী ধ্বংস হয়েছে।"৪
তিনি যখন কোন সাহাবীকে কোথাও তালিম প্রদান ও ওয়ায-নসীহতের জন্য পাঠাতেন, তখন তাদেরকে বলতেন: "সহজ পন্থা অনুসরণ করবে, সংকীর্ণ করে তুলবে না। সুসংবাদ শোনাবে, হিংসুক ও ঘৃণ্য করে তুলবে না।”
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনিল আস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: "আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর দেয়া নিয়ামতের বাহ্যিক প্রকাশ তাঁর বান্দার ওপর দেখতে পছন্দ করেন।"১

টিকাঃ
১. মুসলিম
২. বুখারী, কিতাবুল ঈমান, দ্বীন সহজ শীর্ষক অধ্যায়
৩. আল-আদাবুল মুফরাদ
৪. মুসলিম, অর্থাৎ দ্বীনের ব্যাপারে যে জোরষবরদস্তি ও বাড়াবাড়ি করে
১. তিরমিযী এই হাদীস আবওয়াবুল আদব-এ বর্ণনা করেছেন: باب ان الله يحب ان يرى أثر نعمته على عبده অর্থাৎ আল্লাহ্ তাঁর বান্দাকে যেসব নিয়ামতে ভূষিত করেছেন, বান্দার জীবনে তার প্রকাশ ঘটুক তা তিনি পছন্দ করেন। প্রাচুর্যের অধিকারী লোকে দরিদ্রবেশে থাকুক এ আল্লাহ্ নিয়ামতের নাশোকরী এবং প্রয়োজন ছাড়া আপন দারিদ্র্য প্রকাশ করাও তেমনি তাঁর অপছন্দ।

আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে যেই উন্নত স্তরের আখলাক এবং যেই সর্বোচ্চ শ্রেণীর স্বভাবজাত ও প্রকৃতিগত ভারসাম্য দান করেছিলেন, তা ছিল ভবিষ্যত শতাব্দীগুলোর এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পূর্ণতম বিকাশ। একে আমরা স্বভাবের ভারসাম্য, সুস্থ প্রকৃতি, অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও তীক্ষ্ণতা, ভারসাম্যপূর্ণ ও কম-বেশির বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত বলে আখ্যায়িত করতে পারি। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, "আল্লাহ্র রাসূল (সা) দু'টো কাজের মধ্যে যখন কোন একটিকে প্রাধান্য প্রদান করতেন, তখন সব সময় সহজতরটিকেই প্রাধান্য দিতেন; তবে এই শর্তে যে, এতে গুনাহের নাম-গন্ধও যেন না থাকে! যদি এতে গুনাহের সামান্যতম গন্ধও পাওয়া যেত, তবে তিনি এর থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে অবস্থান করতেন।"'
তিনি বেশি লৌকিকতা, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি যুহদ ও নির্লিপ্ততা এবং নফসের বৈধ অধিকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া থেকে অনেক দূরে ছিলেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন: "দ্বীন খুব সহজ; তবে কেউ যদি দ্বীনের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় এগিয়ে আসে, দ্বীন তার উপর বিজয়ী হবে, প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করবে। এজন্য মধ্যম পন্থায় ভারসাম্যপূর্ণ পথে চল। কাছের দিকগুলোর রেয়ায়াত কর, সন্তুষ্ট থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও অন্ধকার রাতের ইবাদত থেকে শক্তি অর্জন কর।"২
তিনি এও বলতেন: "থাম, ততটুকুই কর, যতটুকু করার শক্তি তোমার রয়েছে। আর তা এজন্য যে, আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ তা'আলা তো ক্লান্ত হয়ে পড়বেন না; বরং তোমরাই ক্লান্ত হয়ে পড়বে।"
ইবন আব্বাস (রা) বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট কোন ধরনের দ্বীন বা ধর্ম সবচেয়ে প্রিয় ও পছন্দনীয়? তিনি বললেন : "الْحَنِيفِيَّةُ السَّبْحَةُ " সহজ ও নিষ্ঠাপূর্ণ দ্বীনে ইব্রাহীমী।""
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন: "বাড়াবাড়ি ও জোর-যবরদস্তির সঙ্গে কাজ আদায়কারী ও খুঁত তালাশকারী ধ্বংস হয়েছে।"৪
তিনি যখন কোন সাহাবীকে কোথাও তালিম প্রদান ও ওয়ায-নসীহতের জন্য পাঠাতেন, তখন তাদেরকে বলতেন: "সহজ পন্থা অনুসরণ করবে, সংকীর্ণ করে তুলবে না। সুসংবাদ শোনাবে, হিংসুক ও ঘৃণ্য করে তুলবে না।”
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনিল আস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: "আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর দেয়া নিয়ামতের বাহ্যিক প্রকাশ তাঁর বান্দার ওপর দেখতে পছন্দ করেন।"১

টিকাঃ
১. মুসলিম
২. বুখারী, কিতাবুল ঈমান, দ্বীন সহজ শীর্ষক অধ্যায়
৩. আল-আদাবুল মুফরাদ
৪. মুসলিম, অর্থাৎ দ্বীনের ব্যাপারে যে জোরষবরদস্তি ও বাড়াবাড়ি করে
১. তিরমিযী এই হাদীস আবওয়াবুল আদব-এ বর্ণনা করেছেন: باب ان الله يحب ان يرى أثر نعمته على عبده অর্থাৎ আল্লাহ্ তাঁর বান্দাকে যেসব নিয়ামতে ভূষিত করেছেন, বান্দার জীবনে তার প্রকাশ ঘটুক তা তিনি পছন্দ করেন। প্রাচুর্যের অধিকারী লোকে দরিদ্রবেশে থাকুক এ আল্লাহ্ নিয়ামতের নাশোকরী এবং প্রয়োজন ছাড়া আপন দারিদ্র্য প্রকাশ করাও তেমনি তাঁর অপছন্দ।

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 ঘরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে

📄 ঘরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে


তিনি তাঁর ঘরে সাধারণ মানুষের মতই থাকতেন। যেমন হযরত আয়েশা (রা) নিজেই বর্ণনা করেছেন: তিনি তাঁর কাপড়-চোপড়ও পরিষ্কার করতেন, তিনি বকরির দুধও নিজ হাতে দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই করতেন। তিনি নিজের কাপড়ে তালি লাগাতেন, জুতা সেলাই করতেন এবং এভাবেই আরও কাজ করতেন।
হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, "তিনি তাঁর ঘরে কিভাবে থাকতেন। জবাবে তিনি বললেন, তিনি ঘরে কাজকর্মের ভেতর থাকতেন। যখন সালাতের ওয়াক্ত হত, তখন সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে চলে যেতেন।"২
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি তাঁর নিজের জুতা মেরামত করে নিতেন, কাপড় সেলাই করতেন যেমন কেউ কেউ নিজেদের বাড়ি-ঘরে করে থাকে।
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, তিনি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কোমল ও সবচেয়ে বেশি মহানুভব ছিলেন। আর হাসির সময় মুচকি হাসি হাসতেন।৪
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, "আমি এমন কাউকে দেখিনি, যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে আপন পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক সদয় ও স্নেহশীল।"৫
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার পরিবার-পরিজনের নিকট সর্বোত্তম এবং আমি আমার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।"৬
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কখনো কোন খাদ্যবস্তুর দোষ খোঁজেন নি। যদি পছন্দ হয়েছে খেয়েছেন, পছন্দ না হলে তা খাননি।'
আপন আহলে বায়ত, পরিবার-পরিজন ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে তাঁর চিরদিনের অভ্যাস ছিল, যে যেই পরিমাণ তাঁর নিকটবর্তী হতো, বিপদাপদ ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে তাকে সেই পরিমাণ সামনে রাখতেন এবং পুরস্কার-পারিতোষিক ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের সময় তাকে সেই পরিমাণ পেছনে রাখতেন। যখন উৎবা, রবীআ, শায়বা ইবন রবীআ ও ওলীদ ইবন উৎবা (যারা ছিল আরবের নামী-দামী বীরপুরুষ ও রণনিপুণ সৈনিক) বদর প্রান্তরে কুরায়শদের পক্ষ থেকে مسلمانوںকে তাদের মুকাবিলায় চ্যালেঞ্জ করল এবং তাদের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বি আহ্বান করল, তখন তিনি আপন চাচা হামযা, চাচাত ভাই আলী ও নিকটাত্মীয় আবু উবায়দা (রা) ডেকে পাঠালেন এবং তাদের মুকাবিলায় প্রেরণ করলেন। অথচ তিনি মক্কায় এসব বাহাদুর সৈনিকের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে ভালোই জানতেন। মুহাজিরদের মধ্যে এমন অনেক বীরপুরুষ ও সাহসী যোদ্ধা ছিলেন- যারা তাদের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে অবতীর্ণ হতে পারতেন। বনু হাশিমের এই তিনজন ছিলেন তাঁরাই- যাঁরা রক্তসম্পর্কের দিক দিয়ে রাসূল (সা)-এর সবচেয়ে নিকটজন ছিলেন, ছিলেন একান্ত প্রিয়জন। কিন্তু তাদেরকে এই বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি অন্যদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেননি, বরং তাঁদেরকেই মুকাবিলার জন্য পাঠিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলার কুদরত দেখুন, এই তিনজনকেই তিনি তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী করেন। মুকাবিলায় হযরত হামযা ও আলী (রা) সাফল্যের সঙ্গে বিজয়ী বেশে ও নিরাপদে ফিরে এলেন। আর আবু উবায়দা (রা)-কে আহত অবস্থায় ময়দান থেকে উঠিয়ে আনা হলো।
তিনি যখন (বিদায় হজ্জের খুতবায়) সুদকে হারাম ও জাহিলী যুগের রক্তের বদলাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলেন, তখনও তার সূচনা করলেন তাঁরই শ্রদ্ধেয় চাচা আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব-এর পক্ষ থেকে। বিদায় হজ্জে দেয়া এই খুতবায় তিনি বলেন:
"জাহিলী যুগের সুদ প্রথা আজ থেকে রহিত ও বিলুপ্ত করা হলো এবং প্রথম যে সুদ আমি বিলুপ্ত করছি, তা আমারই আপনজন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। জাহিলী যুগের রক্তের প্রতিশোধও আজ বিলুপ্ত করা হলো আর সে ক্ষেত্রে প্রথম যে রক্তের প্রতিশোধ বিলুপ্ত করা হলো, তা আমাদের রাবীআ ইবনুল হারিছ-এর সন্তানদের রক্ত।
পক্ষান্তরে, আরাম-আয়েশ ও পুরস্কার কিংবা প্রতিদানের প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি সাধারণ রাজা-বাদশাহদের কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের আচরণ ও অভ্যাসের বিপরীতে এই সমস্ত বুযুর্গকে সবসময় পেছনে রেখেছেন এবং এঁদের মুকাবিলায় অন্যদের প্রাধান্য দিয়েছেন। হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু বর্ণনা করেন- গম ভাঙাতে ও যাঁতা ঘুরাতে ফাতেমা (রা)-এর খুবই কষ্ট হত। এ সময় তিনি জানতে পারলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে বেশ কিছু দাসী এসেছে। তিনি পিতার খিদমতে হাযির হলেন এবং তাঁর (ফাতিমার) খিদমতের জন্য, কাজেকর্মে তাকে কিছুটা সাহায্যের জন্য একজন দাসী প্রদানের আবেদন জানালেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সে সময় ঘরে ছিলেন না। তিনি হযরত আয়েশা (রা)-এর খিদমতে এর উল্লেখ করলেন। হযরত আয়েশা (রা) একথা আল্লাহর রাসূলের কানে তুললেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের ঘরে তাশরীফ আনলেন। সে সময় আমরা ঘুমাবার জন্য বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। তাঁকে দেখেই আমরা দাঁড়াতে গেলাম। তিনি আমাদেরকে উঠতে নিষেধ করলেন। তাঁর হাত মুবারকের শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি এ প্রসঙ্গের অবতারণা করে বললেন, "আমি কি তোমদেরাকে এর থেকে উত্তম কথা বলব না- যার আবেদন তুমি করেছিলে? যখন তুমি ঘুমাতে যাও, তখন ৩৩বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪বার আল্লাহু আকবার পড়বে। আমার কাছে তোমরা যা চেয়েছিলে, তার চেয়ে এটি উত্তম।"
অপর এক বর্ণনায় এই ঘটনার সাথে এও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁদেরকে বললেন, "আল্লাহ্র কসম! আহলে সুফফার সদস্যদের ক্ষুধায় পেট যখন পিঠের সাথে লেগে গেছে, তখন (তাদের জন্য একটা ব্যবস্থা না করে) তোমাদের জন্য আমি কিছুই দিতে পারি না। তাদের খরচ চালাবার মতো এ মুহূর্তে আমার কাছে কিছুই নেই। এদের (দাস-দাসীগুলো)-কে বিক্রি করে যা পাওয়া যাবে তা ওদের জন্য ব্যয় করব।'২

টিকাঃ
২. বুখারী, কিতাবুস-সালাত, আহমদ ও আবদুর রাযযাক সূত্রে
৩. মুসান্নিফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ২০৪৯২, ১১শ খণ্ড, পৃঃ ২৬০
৪. ইবনে আসাকির
৫. মুসনাদে আহমদ, আনাস (রা) বর্ণিত; মুসলিম
৬. ইবনে মাজাহ, باب حسن معاشر النساء
১. বুখারী, কিতাবুল আতইমা ও মুসলিম
১. বুখারী, কিতাবুল-জিহাদ
২. আহমাদ, ফাতহুল বারী, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ২৩, ২৪

তিনি তাঁর ঘরে সাধারণ মানুষের মতই থাকতেন। যেমন হযরত আয়েশা (রা) নিজেই বর্ণনা করেছেন: তিনি তাঁর কাপড়-চোপড়ও পরিষ্কার করতেন, তিনি বকরির দুধও নিজ হাতে দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই করতেন। তিনি নিজের কাপড়ে তালি লাগাতেন, জুতা সেলাই করতেন এবং এভাবেই আরও কাজ করতেন।
হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, "তিনি তাঁর ঘরে কিভাবে থাকতেন। জবাবে তিনি বললেন, তিনি ঘরে কাজকর্মের ভেতর থাকতেন। যখন সালাতের ওয়াক্ত হত, তখন সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে চলে যেতেন।"২
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি তাঁর নিজের জুতা মেরামত করে নিতেন, কাপড় সেলাই করতেন যেমন কেউ কেউ নিজেদের বাড়ি-ঘরে করে থাকে।
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, তিনি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কোমল ও সবচেয়ে বেশি মহানুভব ছিলেন। আর হাসির সময় মুচকি হাসি হাসতেন।৪
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, "আমি এমন কাউকে দেখিনি, যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে আপন পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক সদয় ও স্নেহশীল।"৫
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার পরিবার-পরিজনের নিকট সর্বোত্তম এবং আমি আমার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।"৬
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কখনো কোন খাদ্যবস্তুর দোষ খোঁজেন নি। যদি পছন্দ হয়েছে খেয়েছেন, পছন্দ না হলে তা খাননি।'
আপন আহলে বায়ত, পরিবার-পরিজন ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে তাঁর চিরদিনের অভ্যাস ছিল, যে যেই পরিমাণ তাঁর নিকটবর্তী হতো, বিপদাপদ ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে তাকে সেই পরিমাণ সামনে রাখতেন এবং পুরস্কার-পারিতোষিক ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের সময় তাকে সেই পরিমাণ পেছনে রাখতেন। যখন উৎবা, রবীআ, শায়বা ইবন রবীআ ও ওলীদ ইবন উৎবা (যারা ছিল আরবের নামী-দামী বীরপুরুষ ও রণনিপুণ সৈনিক) বদর প্রান্তরে কুরায়শদের পক্ষ থেকে مسلمانوںকে তাদের মুকাবিলায় চ্যালেঞ্জ করল এবং তাদের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বি আহ্বান করল, তখন তিনি আপন চাচা হামযা, চাচাত ভাই আলী ও নিকটাত্মীয় আবু উবায়দা (রা) ডেকে পাঠালেন এবং তাদের মুকাবিলায় প্রেরণ করলেন। অথচ তিনি মক্কায় এসব বাহাদুর সৈনিকের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে ভালোই জানতেন। মুহাজিরদের মধ্যে এমন অনেক বীরপুরুষ ও সাহসী যোদ্ধা ছিলেন- যারা তাদের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে অবতীর্ণ হতে পারতেন। বনু হাশিমের এই তিনজন ছিলেন তাঁরাই- যাঁরা রক্তসম্পর্কের দিক দিয়ে রাসূল (সা)-এর সবচেয়ে নিকটজন ছিলেন, ছিলেন একান্ত প্রিয়জন। কিন্তু তাদেরকে এই বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি অন্যদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেননি, বরং তাঁদেরকেই মুকাবিলার জন্য পাঠিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলার কুদরত দেখুন, এই তিনজনকেই তিনি তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী করেন। মুকাবিলায় হযরত হামযা ও আলী (রা) সাফল্যের সঙ্গে বিজয়ী বেশে ও নিরাপদে ফিরে এলেন। আর আবু উবায়দা (রা)-কে আহত অবস্থায় ময়দান থেকে উঠিয়ে আনা হলো।
তিনি যখন (বিদায় হজ্জের খুতবায়) সুদকে হারাম ও জাহিলী যুগের রক্তের বদলাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলেন, তখনও তার সূচনা করলেন তাঁরই শ্রদ্ধেয় চাচা আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব-এর পক্ষ থেকে। বিদায় হজ্জে দেয়া এই খুতবায় তিনি বলেন:
"জাহিলী যুগের সুদ প্রথা আজ থেকে রহিত ও বিলুপ্ত করা হলো এবং প্রথম যে সুদ আমি বিলুপ্ত করছি, তা আমারই আপনজন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। জাহিলী যুগের রক্তের প্রতিশোধও আজ বিলুপ্ত করা হলো আর সে ক্ষেত্রে প্রথম যে রক্তের প্রতিশোধ বিলুপ্ত করা হলো, তা আমাদের রাবীআ ইবনুল হারিছ-এর সন্তানদের রক্ত।
পক্ষান্তরে, আরাম-আয়েশ ও পুরস্কার কিংবা প্রতিদানের প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি সাধারণ রাজা-বাদশাহদের কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের আচরণ ও অভ্যাসের বিপরীতে এই সমস্ত বুযুর্গকে সবসময় পেছনে রেখেছেন এবং এঁদের মুকাবিলায় অন্যদের প্রাধান্য দিয়েছেন। হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু বর্ণনা করেন- গম ভাঙাতে ও যাঁতা ঘুরাতে ফাতেমা (রা)-এর খুবই কষ্ট হত। এ সময় তিনি জানতে পারলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে বেশ কিছু দাসী এসেছে। তিনি পিতার খিদমতে হাযির হলেন এবং তাঁর (ফাতিমার) খিদমতের জন্য, কাজেকর্মে তাকে কিছুটা সাহায্যের জন্য একজন দাসী প্রদানের আবেদন জানালেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সে সময় ঘরে ছিলেন না। তিনি হযরত আয়েশা (রা)-এর খিদমতে এর উল্লেখ করলেন। হযরত আয়েশা (রা) একথা আল্লাহর রাসূলের কানে তুললেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের ঘরে তাশরীফ আনলেন। সে সময় আমরা ঘুমাবার জন্য বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। তাঁকে দেখেই আমরা দাঁড়াতে গেলাম। তিনি আমাদেরকে উঠতে নিষেধ করলেন। তাঁর হাত মুবারকের শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি এ প্রসঙ্গের অবতারণা করে বললেন, "আমি কি তোমদেরাকে এর থেকে উত্তম কথা বলব না- যার আবেদন তুমি করেছিলে? যখন তুমি ঘুমাতে যাও, তখন ৩৩বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪বার আল্লাহু আকবার পড়বে। আমার কাছে তোমরা যা চেয়েছিলে, তার চেয়ে এটি উত্তম।"
অপর এক বর্ণনায় এই ঘটনার সাথে এও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁদেরকে বললেন, "আল্লাহ্র কসম! আহলে সুফফার সদস্যদের ক্ষুধায় পেট যখন পিঠের সাথে লেগে গেছে, তখন (তাদের জন্য একটা ব্যবস্থা না করে) তোমাদের জন্য আমি কিছুই দিতে পারি না। তাদের খরচ চালাবার মতো এ মুহূর্তে আমার কাছে কিছুই নেই। এদের (দাস-দাসীগুলো)-কে বিক্রি করে যা পাওয়া যাবে তা ওদের জন্য ব্যয় করব।'২

টিকাঃ
২. বুখারী, কিতাবুস-সালাত, আহমদ ও আবদুর রাযযাক সূত্রে
৩. মুসান্নিফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ২০৪৯২, ১১শ খণ্ড, পৃঃ ২৬০
৪. ইবনে আসাকির
৫. মুসনাদে আহমদ, আনাস (রা) বর্ণিত; মুসলিম
৬. ইবনে মাজাহ, باب حسن معاشر النساء
১. বুখারী, কিতাবুল আতইমা ও মুসলিম
১. বুখারী, কিতাবুল-জিহাদ
২. আহমাদ, ফাতহুল বারী, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ২৩, ২৪

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 সূক্ষ্মতর অনুভূতি, আবেগের মর্যাদা ও পবিত্রতা

📄 সূক্ষ্মতর অনুভূতি, আবেগের মর্যাদা ও পবিত্রতা


রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সীরাত তথা জীবনচরিত নবুয়ত ও দাওয়াত-ই হকের মহান দায়িত্ব, মানবতার জন্য দরদ ও মর্মজ্বালা এবং সেই চিন্তা-ভাবনা ও কর্তব্যের তাগিদের সাথে সাথে, পর্বতের পক্ষেও যার ভার বহন করা সহজসাধ্য ছিল না, সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতি পবিত্র ও সমুন্নত আবেগপূর্ণ মাত্রায় বিরাজ করছিল, সেই অস্বাভাবিক ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে- যা আম্বিয়া (আ)-এর চিহ্ন ও বিশেষ চরিত্র হয়ে থাকে এবং যারা দাওয়াত ইলাল্লাহ ও আল্লাহ্র কালামের অতি মর্যাদার পথে এবং তাঁর হুকুম-আহকাম পালন করবার ক্ষেত্রে কোনকিছুকেই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন না এবং কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেন না। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সাথীদেরকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত ভোলেননি- যাঁরা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন এবং সত্যের পথে নিজেদের সবকিছু সোপর্দ করে দিয়েছিলেন, যাঁরা ওহুদ যুদ্ধে শাহাদাত লাভ করে চিরন্তন ও চিরস্থায়ী জীবন লাভ করেছিলেন, তাঁদের কথা তিনি বারবার আলোচনা করেছেন, তাঁদের জন্য দু'আ করেছেন এবং তাঁদের শেষ বিশ্রামস্থলে যিয়ারতে গেছেন।
এই ভালবাসা ও আস্থা মানবীয় দেহ অতিক্রম করে সেইসব নিষ্প্রাণ পাথর, পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকা পর্যন্ত সঞ্চারিত হয়েছিল- যেখানে প্রেম ও বিশ্বস্ততা, কুরবানী ও আত্মোৎসর্গের এই অপূর্ব দৃশ্য বিশাল বিস্তৃত আসমান দেখছিল এবং যেই উপত্যকা ভূমি তাঁদের অবস্থানস্থলে পরিণত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিল। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) একবার ওহুদ পাহাড়কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, هَذَا جَبَلٌ يُحِبُّنَا وَنُحِبُّهُ "এই সেই পাহাড় যে আমাদেরকে ভালবাসে আর আমরাও যাকে ভালবাসি।"১
আবি হুমায়দ (রা) বর্ণনা করেন : "আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলাম। আমরা যখন মদীনার কাছাকাছি এলাম, তখন তিনি বললেন, هَذِهِ طَابَةٌ وَهُذَا جَبَلْ يُحِبُّنَا وَنَحْبُّهُ "এই মদীনা তায়্যিবা আর এই সেই পাহাড় যে আমাদেরকে ভালবাসে এবং আমরা তাকে ভালবাসি।২
উকবা (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন ওহুদের শহীদগণের কবর যিয়ারত করতে গেলেন এবং তাদের জন্য দু'আ ও মাগফিরাত কামনা করলেন।"
জাবির ইবন অবদুল্লাহ (রা) বলেন: আমি দেখলাম, আল্লাহ্র রাসূলের সামনে ওহুদের শহীদদের সম্পর্কে কথা উঠল। তখন তিনি বললেন: "আল্লাহ্র কসম! আমার ইচ্ছা ছিল আমিও যদি ওহুদের শহীদদের সাথে পাহাড়ের কোলে যেতে পারতাম!”
তিনি তাঁর প্রিয়তম চাচা ও দুধভাইয়ের শাহাদাতের বেদনায় ও শোকে (যিনি রাসূলের ভালবাসার টানে ও ইসলামের সাহায্য-সমর্থনে আপন জীবন বিলিয়ে দেন এবং তাঁর লাশ মুবারকের সঙ্গে যেই আচরণ করা হয়েছিল যা আর কারো সাথে করা হয়নি) উলুল-আজম (সুদৃঢ় ধৈর্যের অধিকারী) পয়গাম্বরদের ন্যায় ধৈর্যের সাথে বরদাশত করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ওহুদ থেকে মদীনায় ফিরলেন এবং বনী আবদিল আশহাল-এর ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় শহীদদের জন্য কান্নার আওয়াজ তাঁর কানে ভেসে এল। আর এটাই তাঁর সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতিতে অনুরণ সৃষ্টি করল, তাঁর চোখকে করে তুলল অশ্রুসিক্ত। তিনি বললেন, لَكِنَّ حَمْزَةَ لَا بَوَاتِيَ لَهُ “কিন্তু হামযার জন্য কোন ক্রন্দনকারী নেই।”১
তথাপি এই অভিজাত ও উন্নত মানবীয় আবেগ-অনুভূতি, নবুওয়াত ও ইসলামের দাওয়াতের মহান যিম্মাদারী, আল্লাহ্র সীমারেখা হিফাযতের ব্যাপারে কোনরূপ প্রভাব-প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করতে পারেনি। সীরাত তথা জীবনচরিতকার ও ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেন, সা'দ ইবন মু'আয ও উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) যখন বনী আব্দুল আশহাল-এর ঘরে ফিরে এলেন, তখন তারা নিজেদের ঘরের মহিলাদের তৈরি হওয়ার জন্য হুকুম দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ঘরে গিয়ে তাঁর চাচা সায়্যিদুনা হামযা (রা)-এর শাহাদাতে শোক প্রকাশের জন্য বললেন। মহিলারা তাই করল। রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে ফিরে মহিলাদেরকে মসজিদে নববীর দরজায় কান্নারত দেখতে পেলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, "আল্লাহ্ তোমাদের উপর রহম করুন। তোমরা যে যার ঘরে ফিরে যাও। তোমাদের এখানে আসাটাই শোক প্রকাশের সমান হয়ে গেছে।"
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এসব কী হচ্ছে?” তাঁকে বলা হলো, আনসাররা তাদের মহিলাদেরকে কোন উদ্দেশ্যে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহ্র কাছে মাফ চাইলেন এবং ভালভাবে ভদ্র ভাষায় সম্বোধন করে তাদেরকে বললেন, "আমার উদ্দেশ্য তা ছিল না যা তোমরা করছ, মৃতের জন্য কান্নাকাটি করা আমি পছন্দ করি না।" এরপর তিনি তাদেরকে মাতম করতে নিষেধ করলেন।'
এর থেকেও নাজুক মুহূর্ত দেখা দিয়েছিল আল্লাহ্র সিংহ সায়্যিদুনা হযরত হামযা (রা)-এর ঘাতক ওয়াহশীর ক্ষেত্রে। মুসলমানরা মক্কা জয় করলেন। ওয়াহশীর কাছে তখন গোটা পৃথিবী ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায় এবং সকল পথই সে অবরুদ্ধ দেখতে পায়। তার জন্য কুদরতীভাবেই সমস্যা সৃষ্টি হয়। সে সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে লুকাবার ইচ্ছা করে কিন্তু লোকে তাকে বলল, "আরে ভালো মানুষ! আল্লাহ্র রাসূল (সা) এমন কাউকেই হত্যা করেন না, যে তাঁর ধর্মে দাখিল হয় অর্থাৎ তিনি কোন মুসলমানকেই হত্যা করেন না।” বিষয়টা এবার সে বুঝতে পারলো এবং সাথে সাথে কালেমা শাহাদাত পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেল। মুসলমান হওয়ার পর সে যখন প্রথমবারের মত রাসূল পাক (সা)-এর দরবারে হাযির হলো, তখন তিনি তার ইসলাম গ্রহণকে কবুল করলেন এবং এমন কোন কথা বললেন না, যা তার মনে ভীতির সঞ্চার হতে পারে। এরপর তিনি তার থেকে হযরত হামযা (রা)-এর শাহাদতের বিবরণ শুনলেন অর্থাৎ হামযা (রা)-কে কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বিবরণ পেশ করতে তার ভিতর সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতি ও অবস্থা অবশ্যই সৃষ্টি হয়ে থাকবে। কিন্তু এই বিশেষ অবস্থা তাঁর নববী মেজাজ ও দায়িত্ববোধের উপর প্রাধান্য পায়নি- তিনি তার ইসলাম গ্রহণ মেনে নেবেন না, কিংবা ক্রোধের বশে তাকে হত্যাই করবেন (না, এমনটি হয়নি, হতে পারে না)। কেবল তাকে এটুকু বললেন, "আল্লাহ্র বান্দা! তুমি আমার সামনে এসো না। আমি চাই তুমি যেন আমার সামনে না পড়!" ওয়াহশী বললেন, এরপর থেকে আমি তাঁর সামনে যেতে চাইতাম না যাতে আমার উপর তাঁর চোখ পড়ে যায়। আর এভাবেই তাঁর নির্ধারিত ও প্রতিশ্রুত সময় এসে যায়।২
বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে: আমার উপর যখন তাঁর চোখ পড়ল, তখন তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি ওয়াহশী? আমি বললাম। হ্যাঁ (আমি ওয়াহশী)।
তিনি বললেন, "তাহলে তুমিই হামযাকে শহীদ করেছিলে?" আমি বললাম, "আপনি যা জেনেছেন তা সত্য।" তিনি বললেন, "তুমি কি এতটুকু করতে পার, তুমি আর আমার সামনে আসবে না?"৩
এই প্রকৃতিগত ও মানবীয় অবস্থা ও অনুভূতি এবং উন্নত ও সূক্ষ্ম আবেগের ঝলক আমরা সেখানেও দেখতে পাই। যখন তিনি মাটিতে মিশে যাওয়া একটি পুরনো কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন তখন নিজেকে আর স্থির রাখতে না পেরে কেঁদে ফেললেন। এরপর তিনি বললেন: "এ (আমার মা) আমিনার কবর।” এ ছিল তখনকার কথা যখন তাঁর (মা আমিনার) ইন্তেকালের পর বহুদিন গত হয়েছে।

টিকাঃ
১. বুখারী
২. প্রাগুক্ত
১. ইবন কাছীর, ৩য় খণ্ড, ৯৫; ইমাম আহমাদ এই হাদীস ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।
১. প্রাগুক্ত, পৃঃ ৯২
২. ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭২
৩. বুখারী, কিতাবুল মাগাযী

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সীরাত তথা জীবনচরিত নবুয়ত ও দাওয়াত-ই হকের মহান দায়িত্ব, মানবতার জন্য দরদ ও মর্মজ্বালা এবং সেই চিন্তা-ভাবনা ও কর্তব্যের তাগিদের সাথে সাথে, পর্বতের পক্ষেও যার ভার বহন করা সহজসাধ্য ছিল না, সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতি পবিত্র ও সমুন্নত আবেগপূর্ণ মাত্রায় বিরাজ করছিল, সেই অস্বাভাবিক ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে- যা আম্বিয়া (আ)-এর চিহ্ন ও বিশেষ চরিত্র হয়ে থাকে এবং যারা দাওয়াত ইলাল্লাহ ও আল্লাহ্র কালামের অতি মর্যাদার পথে এবং তাঁর হুকুম-আহকাম পালন করবার ক্ষেত্রে কোনকিছুকেই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন না এবং কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেন না। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সাথীদেরকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত ভোলেননি- যাঁরা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন এবং সত্যের পথে নিজেদের সবকিছু সোপর্দ করে দিয়েছিলেন, যাঁরা ওহুদ যুদ্ধে শাহাদাত লাভ করে চিরন্তন ও চিরস্থায়ী জীবন লাভ করেছিলেন, তাঁদের কথা তিনি বারবার আলোচনা করেছেন, তাঁদের জন্য দু'আ করেছেন এবং তাঁদের শেষ বিশ্রামস্থলে যিয়ারতে গেছেন।
এই ভালবাসা ও আস্থা মানবীয় দেহ অতিক্রম করে সেইসব নিষ্প্রাণ পাথর, পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকা পর্যন্ত সঞ্চারিত হয়েছিল- যেখানে প্রেম ও বিশ্বস্ততা, কুরবানী ও আত্মোৎসর্গের এই অপূর্ব দৃশ্য বিশাল বিস্তৃত আসমান দেখছিল এবং যেই উপত্যকা ভূমি তাঁদের অবস্থানস্থলে পরিণত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিল। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) একবার ওহুদ পাহাড়কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, هَذَا جَبَلٌ يُحِبُّنَا وَنُحِبُّهُ "এই সেই পাহাড় যে আমাদেরকে ভালবাসে আর আমরাও যাকে ভালবাসি।"১
আবি হুমায়দ (রা) বর্ণনা করেন : "আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলাম। আমরা যখন মদীনার কাছাকাছি এলাম, তখন তিনি বললেন, هَذِهِ طَابَةٌ وَهُذَا جَبَلْ يُحِبُّنَا وَنَحْبُّهُ "এই মদীনা তায়্যিবা আর এই সেই পাহাড় যে আমাদেরকে ভালবাসে এবং আমরা তাকে ভালবাসি।২
উকবা (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন ওহুদের শহীদগণের কবর যিয়ারত করতে গেলেন এবং তাদের জন্য দু'আ ও মাগফিরাত কামনা করলেন।"
জাবির ইবন অবদুল্লাহ (রা) বলেন: আমি দেখলাম, আল্লাহ্র রাসূলের সামনে ওহুদের শহীদদের সম্পর্কে কথা উঠল। তখন তিনি বললেন: "আল্লাহ্র কসম! আমার ইচ্ছা ছিল আমিও যদি ওহুদের শহীদদের সাথে পাহাড়ের কোলে যেতে পারতাম!”
তিনি তাঁর প্রিয়তম চাচা ও দুধভাইয়ের শাহাদাতের বেদনায় ও শোকে (যিনি রাসূলের ভালবাসার টানে ও ইসলামের সাহায্য-সমর্থনে আপন জীবন বিলিয়ে দেন এবং তাঁর লাশ মুবারকের সঙ্গে যেই আচরণ করা হয়েছিল যা আর কারো সাথে করা হয়নি) উলুল-আজম (সুদৃঢ় ধৈর্যের অধিকারী) পয়গাম্বরদের ন্যায় ধৈর্যের সাথে বরদাশত করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ওহুদ থেকে মদীনায় ফিরলেন এবং বনী আবদিল আশহাল-এর ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় শহীদদের জন্য কান্নার আওয়াজ তাঁর কানে ভেসে এল। আর এটাই তাঁর সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতিতে অনুরণ সৃষ্টি করল, তাঁর চোখকে করে তুলল অশ্রুসিক্ত। তিনি বললেন, لَكِنَّ حَمْزَةَ لَا بَوَاتِيَ لَهُ “কিন্তু হামযার জন্য কোন ক্রন্দনকারী নেই।”১
তথাপি এই অভিজাত ও উন্নত মানবীয় আবেগ-অনুভূতি, নবুওয়াত ও ইসলামের দাওয়াতের মহান যিম্মাদারী, আল্লাহ্র সীমারেখা হিফাযতের ব্যাপারে কোনরূপ প্রভাব-প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করতে পারেনি। সীরাত তথা জীবনচরিতকার ও ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেন, সা'দ ইবন মু'আয ও উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) যখন বনী আব্দুল আশহাল-এর ঘরে ফিরে এলেন, তখন তারা নিজেদের ঘরের মহিলাদের তৈরি হওয়ার জন্য হুকুম দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ঘরে গিয়ে তাঁর চাচা সায়্যিদুনা হামযা (রা)-এর শাহাদাতে শোক প্রকাশের জন্য বললেন। মহিলারা তাই করল। রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে ফিরে মহিলাদেরকে মসজিদে নববীর দরজায় কান্নারত দেখতে পেলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, "আল্লাহ্ তোমাদের উপর রহম করুন। তোমরা যে যার ঘরে ফিরে যাও। তোমাদের এখানে আসাটাই শোক প্রকাশের সমান হয়ে গেছে।"
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এসব কী হচ্ছে?” তাঁকে বলা হলো, আনসাররা তাদের মহিলাদেরকে কোন উদ্দেশ্যে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহ্র কাছে মাফ চাইলেন এবং ভালভাবে ভদ্র ভাষায় সম্বোধন করে তাদেরকে বললেন, "আমার উদ্দেশ্য তা ছিল না যা তোমরা করছ, মৃতের জন্য কান্নাকাটি করা আমি পছন্দ করি না।" এরপর তিনি তাদেরকে মাতম করতে নিষেধ করলেন।'
এর থেকেও নাজুক মুহূর্ত দেখা দিয়েছিল আল্লাহ্র সিংহ সায়্যিদুনা হযরত হামযা (রা)-এর ঘাতক ওয়াহশীর ক্ষেত্রে। মুসলমানরা মক্কা জয় করলেন। ওয়াহশীর কাছে তখন গোটা পৃথিবী ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায় এবং সকল পথই সে অবরুদ্ধ দেখতে পায়। তার জন্য কুদরতীভাবেই সমস্যা সৃষ্টি হয়। সে সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে লুকাবার ইচ্ছা করে কিন্তু লোকে তাকে বলল, "আরে ভালো মানুষ! আল্লাহ্র রাসূল (সা) এমন কাউকেই হত্যা করেন না, যে তাঁর ধর্মে দাখিল হয় অর্থাৎ তিনি কোন মুসলমানকেই হত্যা করেন না।” বিষয়টা এবার সে বুঝতে পারলো এবং সাথে সাথে কালেমা শাহাদাত পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেল। মুসলমান হওয়ার পর সে যখন প্রথমবারের মত রাসূল পাক (সা)-এর দরবারে হাযির হলো, তখন তিনি তার ইসলাম গ্রহণকে কবুল করলেন এবং এমন কোন কথা বললেন না, যা তার মনে ভীতির সঞ্চার হতে পারে। এরপর তিনি তার থেকে হযরত হামযা (রা)-এর শাহাদতের বিবরণ শুনলেন অর্থাৎ হামযা (রা)-কে কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বিবরণ পেশ করতে তার ভিতর সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতি ও অবস্থা অবশ্যই সৃষ্টি হয়ে থাকবে। কিন্তু এই বিশেষ অবস্থা তাঁর নববী মেজাজ ও দায়িত্ববোধের উপর প্রাধান্য পায়নি- তিনি তার ইসলাম গ্রহণ মেনে নেবেন না, কিংবা ক্রোধের বশে তাকে হত্যাই করবেন (না, এমনটি হয়নি, হতে পারে না)। কেবল তাকে এটুকু বললেন, "আল্লাহ্র বান্দা! তুমি আমার সামনে এসো না। আমি চাই তুমি যেন আমার সামনে না পড়!" ওয়াহশী বললেন, এরপর থেকে আমি তাঁর সামনে যেতে চাইতাম না যাতে আমার উপর তাঁর চোখ পড়ে যায়। আর এভাবেই তাঁর নির্ধারিত ও প্রতিশ্রুত সময় এসে যায়।২
বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে: আমার উপর যখন তাঁর চোখ পড়ল, তখন তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি ওয়াহশী? আমি বললাম। হ্যাঁ (আমি ওয়াহশী)।
তিনি বললেন, "তাহলে তুমিই হামযাকে শহীদ করেছিলে?" আমি বললাম, "আপনি যা জেনেছেন তা সত্য।" তিনি বললেন, "তুমি কি এতটুকু করতে পার, তুমি আর আমার সামনে আসবে না?"৩
এই প্রকৃতিগত ও মানবীয় অবস্থা ও অনুভূতি এবং উন্নত ও সূক্ষ্ম আবেগের ঝলক আমরা সেখানেও দেখতে পাই। যখন তিনি মাটিতে মিশে যাওয়া একটি পুরনো কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন তখন নিজেকে আর স্থির রাখতে না পেরে কেঁদে ফেললেন। এরপর তিনি বললেন: "এ (আমার মা) আমিনার কবর।” এ ছিল তখনকার কথা যখন তাঁর (মা আমিনার) ইন্তেকালের পর বহুদিন গত হয়েছে।

টিকাঃ
১. বুখারী
২. প্রাগুক্ত
১. ইবন কাছীর, ৩য় খণ্ড, ৯৫; ইমাম আহমাদ এই হাদীস ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।
১. প্রাগুক্ত, পৃঃ ৯২
২. ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭২
৩. বুখারী, কিতাবুল মাগাযী

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 উদারতা, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা

📄 উদারতা, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা


আল্লাহ্র রাসূল (সা) সর্বোত্তম আখলাক ও চরিত্র, দয়া, বদান্যতা ও বিনয়ের ক্ষেত্রে সমগ্র মানবতার ইমাম ও অগ্রনায়ক ছিলেন।
আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন : إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ "হে রাসূল! আপনি নিশ্চিতই মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।"
অপরদিকে আল্লাহ্র রাসূল (সা) স্বয়ং বলেছেন : أَدْبَنِي رَبِّي فَأَحْسَنَ تَأْدِيْبِي "আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং সর্বোত্তম প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।"
হযরত জাবির (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন: إِنَّ اللهَ تَعَالَى بَعَثَنِي لِإِثْمَامِ مَكَارِمِ الْأَخْلَاقِ كَمَالِ مَحَاسِنِ الْأَفْعَالِ "আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে সর্বোত্তম আখলাক-চরিত্র ও উত্তম কার্যাবলীর পূর্ণতাদানের জন্য পাঠিয়েছেন।"
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আখলাক-চরিত্র কেমন ছিল? এ সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন : كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنُ "আখলাক চরিত্রে তিনি কুরআনুল-কারীমের বাস্তব প্রতিমূর্তি ছিলেন।" [সহীহ মুসলিম, আয়েশা (রা) বর্ণিত]
ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য-সহ্য, প্রশস্ত হৃদয় ও সহনশীলতার ক্ষেত্রে তাঁর যে অবস্থানগত মর্যাদা ছিল, সে পর্যন্ত মেধার অধিকারীর মেধা ও কবির কল্পনাও পৌঁছতে পারে না।
যদি এসব ঘটনা সেই নির্দিষ্ট পন্থায় বর্ণনা না করা হতো- যা সকল সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে, তাহলে লোকের মেধা ও মনন আজ তা গ্রহণ করত না। কিন্তু এসব বর্ণনা এতটা সঠিক, নির্ভুল ও অব্যাহত সনদে একজন নির্ভরযোগ্য, ন্যায়পরায়ণ রাবী থেকে আরেকজন নির্ভরযোগ্য ন্যায়পরায়ণ রাবী পর্যন্ত এরূপ সংযত ও সতর্কতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসবের ভিতর এমন ধারাবাহিক সূত্র পাওয়া যায় যে, এর দরুন এসব বর্ণনা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলীল-দস্তাবেজের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
এ প্রসঙ্গে আমরা কতকগুলো ঘটনা বর্ণনা করব। তাঁর দয়া, দানশীলতা ও চরম থেকে চরমতম দুশমনকেও সৌজন্য প্রদর্শন ও সহানুভূতিমূলক আচরণের একটি নমুনা ছিল সেই ঘটনাটি, যখন মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সলুলকে' কবরে নামানো হয়। তিনি সেখানে গমন করেন এবং তাকে কবর থেকে বের করবার নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি তার লাশ হাঁটুর উপর নিলেন, পবিত্র মুখের থুথু তার উপর নিক্ষেপ করলেন এবং নিজের পরনের জামা দিয়ে তাকে কাফন পরালেন।’২
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে চলছিলাম। সে সময় তিনি নাজরানের কাপড় পরেছিলেন যার প্রান্তদেশ ছিল মোটা। পথিমধ্যে এক বেদুঈনের সঙ্গে দেখা। সে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাদর মুবারক ধরে জোরে টান দিল। আমি চোখ তুলে দেখতে পেলাম জোরে টান দেয়ার ফলে তাঁর গলায় দাগ পড়ে গেছে। এরপর সেই বেদুঈন বলল: ওহে মুহাম্মদ! আল্লাহ্র যে মাল আপনার কাছে রয়েছে, তা আমাদের দেয়ার জন্য হুকুম দিন। তিনি তার দিকে ঘুরে দেখলেন এবং হাসলেন, তারপর তাকে তার প্রার্থিত বস্তু দেয়ার ব্যবস্থা করলেন।৩
যায়দ ইবন সু'না (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) রাসূল (সা)-এর কাছে এলো এবং তাকে ধার পরিশোধের দাবি জানালো- যা তিনি তার কাছ থেকে নিয়েছিলেন। এরপর সে কাপড় ধরে তাঁর কাঁধে জড়িয়ে সজোরে টানা-হেঁচড়া করল। কাপড়ের প্রান্ত মুঠিতে ধরে রাখলো এবং রূঢ় ভাষায় কথা বলল। সে এরপর আরও বলল: তোমরা আব্দুল মুত্তালিবের বংশের লোক। বড় টালবাহানা কর তোমরা।
হযরত উমর (রা) সেখানে ছিলেন। তিনি লোকটির নিষ্ঠুর ও রূঢ় আচরণ লক্ষ্য করে তাকে ধমক লাগালেন এবং কড়া ভাষায় কথা বললেন। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুখে হাসি লেগেই ছিল। তিনি হযরত উমর (রা)- কে বললেন, "উমর! আমি ও এই লোক তোমার কাছে অন্যরকম ব্যবহার পাবার হকদার ছিলাম। দরকার তো ছিল, তুমি আমাকে সত্ত্বর কর্জ পরিশোধের পরামর্শ দিতে আর তাকে বলতে নরম ও মোলায়েম ভাষায় তাগাদা দিতে।" এরপর তিনি জানালেন যে, তার ঋণ-পরিশোধের এখনও তিনদিন সময় বাকী আছে। যাই হোক, তিনি হযরত উমর (রা)-কে এ ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দেশ দিলেন এবং আরও বিশ সা' বেশি দেবার জন্য বললেন এজন্য যে, হযরত উমর (রা) তাকে ভীত-শংকিত করে দিয়েছিলেন। আর এ কথাই তার অর্থাৎ পাওনাদার লোকটির (যায়দ ইবন সু'নার) ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিলো।'
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, "একবার মক্কা থেকে ৮০ জন সশস্ত্র লোক তানঈম পাহাড় বেয়ে হঠাৎ নেমে আসে এবং প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। তিনি সবাইকে বন্দী করেন, কিন্তু কাউকে প্রাণে না মেরে সবাইকে জীবিত রাখেন।”২
জাবির (রা) বর্ণনা করেন : আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে একবার নজদের দিকে অভিযান পরিচালনা করি। পথিমধ্যে দুপুর হয়ে গেল এবং আমরা বিশ্রাম নেবার প্রয়োজনবোধ করছিলাম। তলোয়ার ছিল গাছের ডালে ঝোলানো। লোকেরা এদিক-সেদিক বিভিন্ন গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। এ অবস্থায় আল্লাহ্র রাসূল (সা) আমাকে ডাক দিলেন। আমরা রাসুল (সা)-এর খিদমতে এসে দেখি এক বেদুঈন তাঁর সামনে বসা। তিনি বললেন: "আমি শুয়ে ছিলাম। এই লোক এসে আমার তলোয়ার টেনে নামায়। আমি জেগে দেখতে পেলাম সে তলোয়ার হাতে আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে। সে আমাকে বলল, এখন আমার হাত থেকে কে তোমাকে বাঁচাবে? আমি বললাম : আল্লাহ্! এরপর সে তলোয়ার খাপে বন্ধ করল এবং বসে পড়ল। এই সে লোক যে এখন তোমাদের সামনে বসা।" বর্ণনাকারী (হযরত জাবির) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) তাকে কোন শাস্তি দেননি।৪
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অবস্থা ছিল এরূপ যে, সমস্ত সাহাবায়ে কিরামের ধৈর্য একত্র করলেও তার সমকক্ষ হবে না। অথচ সাহাবায়ে কিরাম (রা) সকলেই ধৈর্যের প্রতিমূর্তি ছিলেন। ওপরের সকল ব্যাপারে সকলের জন্যই তাঁর ভূমিকা ছিল একজন স্নেহশীল উস্তাদ, একজন রহমদিল ও মেহেরবান সংস্কারক মুরুব্বীর। এর একটি নমুনা আমরা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর বর্ণনায় দেখতে পাই। তিনি বলেন- একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দিল। লোকেরা তা দেখতে পেয়ে তেড়েফুঁড়ে এলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে থামিয়ে দিয়ে বললেন: "তাকে তোমরা ছেড়ে দাও এবং যেখানে সে প্রস্রাব করেছে সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দাও। মনে রেখ, তোমাদেরকে আসানী সৃষ্টিকারী হিসাবে পাঠানো হয়েছে, দুর্বিষহ বিড়ম্বনা সৃষ্টিকারী হিসাবে নয়।"১
মু'আবিয়া ইবনুল হাকাম (রা) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে সালাত আদায় করছিলাম। এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। আমি জওয়াবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বললাম। লোকে আমাকে জওয়াব দিতে শুনে রাগে আমার দিকে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, তোমাদের মা তোমাদেরকে কাঁদাক! কী হয়েছে যে, তোমরা আমার দিকে এভাবে রেগে তাকাচ্ছ? শুনে লোকেরা তাদের নিজেদের রানের ওপর থাপ্পড় মারতে লাগল।
যখন আমি বুঝতে পারলাম তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে, তখন আমি চুপ করলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সা) সালাত আদায় থেকে মুক্ত হলেন। আমার পিতামাতা তাঁর জন্য কুরবান হোক! আমি এর আগে তাঁর মত মুরুব্বী ও শিক্ষক দেখিনি এবং এরপরও দেখিনি। আল্লাহ্র কসম করে বলছি, তিনি আমাকে শাসাননি, আমাকে ভালমন্দও কিছু বলেননি। কেবল এতটুকু বলেছেন, "সালাত আদায়রত অবস্থায় সাধারণত মানুষ যেভাবে কথা বলে, সেভাবে কথা বলা উচিত নয়। সালাত কেবল তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য।"২
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) খুবই রহমদিল ছিলেন। তাঁর নিকট কোন অভাবী লোক কিংবা কোন লোক প্রয়োজন নিয়ে এলে তিনি অবশ্যই তাকে কিছু দেবার কথা দিতেন। কিছু থাকলে (দেবার মত) তখনই দিয়ে তার প্রয়োজন মেটাতেন। একবার সালাত দাঁড়িয়ে গেছে। এমন সময় জনৈক বেদুঈন সামনে এগিয়ে এলো এবং তাঁর কাপড় ধরে বলতে লাগল, "আমার একটা মামুলী প্রয়োজন বাকি আছে। আমার ভয় হয়, না জানি আমি ভুলে যাই!” তিনি তার সাথে গেলেন। সে তার কাজ শেষ করলে তিনি ফিরে এলেন এবং সালাত আদায় করলেন।'
তাঁর ধৈর্য, সহনশীলতা ও সহ্যশক্তি, উদার হৃদয় ও অটুট ইচ্ছাশক্তি সম্বন্ধে সাক্ষ্য তাঁরই খাদিম হযরত আনাস (রা) প্রদত্ত সাক্ষ্য থেকে পাওয়া যাবে। সে সময় তিনি খুবই অল্পবয়স্ক ছিলেন। তিনি বলেন- আমি দশ বছর ধরে আল্লাহ্ রাসূল (সা)-এর খিদমত করেছি। তিনি কখনও উহ্ বলেননি এবং কখনও এও বলেননি যে, "অমুক কাজ তুমি কেন করলে আর অমুক কাজ তুমি কেন করলে না?"২
সু'আদ ইবন উমর (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে হাযির হলাম। আমার কাপড়ে জাফরানমিশ্রিত খোশবুর চিহ্ন দিল। তিনি দেখে বললেন, ورس، روس "ফেলে দাও, ফেলে দাও"৩। তারপর তিনি ছড়ি দিয়ে আমার পেটের উপর আঘাত করলেন। এতে আমি কষ্ট পাই। আমি বললাম, "হে আল্লাহ্র রাসূল! এখন আমার উপর কিসাস (বদলা, বিনিময়) গ্রহণের অধিকার এসে বর্তেছে।" অমনি রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পেটের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে দিলেন এবং বললেন, "কিসাস নিয়ে নাও”৪।

টিকাঃ
১. ৯ম হিজরীতে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর যিলকাদাহ মাসে তার মৃত্যু হয়। আয- যারকানী, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১১২-১১৩
২. বুখারী, কিতাবুষ জানাইয, সংক্ষিপ্ত
৩. বুখারী, কিতাবুজ জিহাদ كان النبي صلعم يعطى المولفة قلوبهم শীর্ষক অধ্যায়। এ ছাড়াও ইমাম আহমদ, ৩য়, খণ্ড, ১৫৩, (শব্দের সামান্য পরিবর্তনসহ)
১. বায়হাকী (বিস্তারিতভাবে): আহমদ, ৩য় খণ্ড, ১৫৩, (কিছুটা শাব্দিক পার্থক্যসহ)
২. মুসলিম, কিতাবুজ জিহাদ ওয়াস সিয়ার, আল্লাহর বাণী: وهو الذي كف أيديهم عنكم
৩. এখানে ৩৬ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে- যার দু'টো অর্থ হতে পারে : এক, সে তলোয়ার খাপে বন্ধ করল। দুই, সে তলোয়ার টেনে নিল এবং তা দেখল (মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার)
৪. বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, মুস্তালিক যুদ্ধ শীর্ষক অধ্যায়
১. বুখারী, কিতাবুল-উযূ
২. মুসলিম, 'সালাতে কথা বলা হারাম' শীর্ষক অধ্যায়
১. মুসলিম কিতাবুল-ফাযাইল (حسن خلق صلی) শীর্ষক অধ্যায়
২. মুসলিম, কিতাবুল-ফাযাইল
৩. এক ধরনের হলদে রং, যা দিয়ে কাপড় রঞ্জিত করা হয়।
৪. কিতাবুশ-শিফা, প্রতিশোধের কামনায় নয়, ভালবাসার টানে বলেছিল।

আল্লাহ্র রাসূল (সা) সর্বোত্তম আখলাক ও চরিত্র, দয়া, বদান্যতা ও বিনয়ের ক্ষেত্রে সমগ্র মানবতার ইমাম ও অগ্রনায়ক ছিলেন।
আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন : إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ "হে রাসূল! আপনি নিশ্চিতই মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।"
অপরদিকে আল্লাহ্র রাসূল (সা) স্বয়ং বলেছেন : أَدْبَنِي رَبِّي فَأَحْسَنَ تَأْدِيْبِي "আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং সর্বোত্তম প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।"
হযরত জাবির (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন: إِنَّ اللهَ تَعَالَى بَعَثَنِي لِإِثْمَامِ مَكَارِمِ الْأَخْلَاقِ كَمَالِ مَحَاسِنِ الْأَفْعَالِ "আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে সর্বোত্তম আখলাক-চরিত্র ও উত্তম কার্যাবলীর পূর্ণতাদানের জন্য পাঠিয়েছেন।"
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আখলাক-চরিত্র কেমন ছিল? এ সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন : كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنُ "আখলাক চরিত্রে তিনি কুরআনুল-কারীমের বাস্তব প্রতিমূর্তি ছিলেন।" [সহীহ মুসলিম, আয়েশা (রা) বর্ণিত]
ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য-সহ্য, প্রশস্ত হৃদয় ও সহনশীলতার ক্ষেত্রে তাঁর যে অবস্থানগত মর্যাদা ছিল, সে পর্যন্ত মেধার অধিকারীর মেধা ও কবির কল্পনাও পৌঁছতে পারে না।
যদি এসব ঘটনা সেই নির্দিষ্ট পন্থায় বর্ণনা না করা হতো- যা সকল সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে, তাহলে লোকের মেধা ও মনন আজ তা গ্রহণ করত না। কিন্তু এসব বর্ণনা এতটা সঠিক, নির্ভুল ও অব্যাহত সনদে একজন নির্ভরযোগ্য, ন্যায়পরায়ণ রাবী থেকে আরেকজন নির্ভরযোগ্য ন্যায়পরায়ণ রাবী পর্যন্ত এরূপ সংযত ও সতর্কতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসবের ভিতর এমন ধারাবাহিক সূত্র পাওয়া যায় যে, এর দরুন এসব বর্ণনা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলীল-দস্তাবেজের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
এ প্রসঙ্গে আমরা কতকগুলো ঘটনা বর্ণনা করব। তাঁর দয়া, দানশীলতা ও চরম থেকে চরমতম দুশমনকেও সৌজন্য প্রদর্শন ও সহানুভূতিমূলক আচরণের একটি নমুনা ছিল সেই ঘটনাটি, যখন মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সলুলকে' কবরে নামানো হয়। তিনি সেখানে গমন করেন এবং তাকে কবর থেকে বের করবার নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি তার লাশ হাঁটুর উপর নিলেন, পবিত্র মুখের থুথু তার উপর নিক্ষেপ করলেন এবং নিজের পরনের জামা দিয়ে তাকে কাফন পরালেন।’২
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে চলছিলাম। সে সময় তিনি নাজরানের কাপড় পরেছিলেন যার প্রান্তদেশ ছিল মোটা। পথিমধ্যে এক বেদুঈনের সঙ্গে দেখা। সে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাদর মুবারক ধরে জোরে টান দিল। আমি চোখ তুলে দেখতে পেলাম জোরে টান দেয়ার ফলে তাঁর গলায় দাগ পড়ে গেছে। এরপর সেই বেদুঈন বলল: ওহে মুহাম্মদ! আল্লাহ্র যে মাল আপনার কাছে রয়েছে, তা আমাদের দেয়ার জন্য হুকুম দিন। তিনি তার দিকে ঘুরে দেখলেন এবং হাসলেন, তারপর তাকে তার প্রার্থিত বস্তু দেয়ার ব্যবস্থা করলেন।৩
যায়দ ইবন সু'না (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) রাসূল (সা)-এর কাছে এলো এবং তাকে ধার পরিশোধের দাবি জানালো- যা তিনি তার কাছ থেকে নিয়েছিলেন। এরপর সে কাপড় ধরে তাঁর কাঁধে জড়িয়ে সজোরে টানা-হেঁচড়া করল। কাপড়ের প্রান্ত মুঠিতে ধরে রাখলো এবং রূঢ় ভাষায় কথা বলল। সে এরপর আরও বলল: তোমরা আব্দুল মুত্তালিবের বংশের লোক। বড় টালবাহানা কর তোমরা।
হযরত উমর (রা) সেখানে ছিলেন। তিনি লোকটির নিষ্ঠুর ও রূঢ় আচরণ লক্ষ্য করে তাকে ধমক লাগালেন এবং কড়া ভাষায় কথা বললেন। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুখে হাসি লেগেই ছিল। তিনি হযরত উমর (রা)- কে বললেন, "উমর! আমি ও এই লোক তোমার কাছে অন্যরকম ব্যবহার পাবার হকদার ছিলাম। দরকার তো ছিল, তুমি আমাকে সত্ত্বর কর্জ পরিশোধের পরামর্শ দিতে আর তাকে বলতে নরম ও মোলায়েম ভাষায় তাগাদা দিতে।" এরপর তিনি জানালেন যে, তার ঋণ-পরিশোধের এখনও তিনদিন সময় বাকী আছে। যাই হোক, তিনি হযরত উমর (রা)-কে এ ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দেশ দিলেন এবং আরও বিশ সা' বেশি দেবার জন্য বললেন এজন্য যে, হযরত উমর (রা) তাকে ভীত-শংকিত করে দিয়েছিলেন। আর এ কথাই তার অর্থাৎ পাওনাদার লোকটির (যায়দ ইবন সু'নার) ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিলো।'
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, "একবার মক্কা থেকে ৮০ জন সশস্ত্র লোক তানঈম পাহাড় বেয়ে হঠাৎ নেমে আসে এবং প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। তিনি সবাইকে বন্দী করেন, কিন্তু কাউকে প্রাণে না মেরে সবাইকে জীবিত রাখেন।”২
জাবির (রা) বর্ণনা করেন : আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে একবার নজদের দিকে অভিযান পরিচালনা করি। পথিমধ্যে দুপুর হয়ে গেল এবং আমরা বিশ্রাম নেবার প্রয়োজনবোধ করছিলাম। তলোয়ার ছিল গাছের ডালে ঝোলানো। লোকেরা এদিক-সেদিক বিভিন্ন গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। এ অবস্থায় আল্লাহ্র রাসূল (সা) আমাকে ডাক দিলেন। আমরা রাসুল (সা)-এর খিদমতে এসে দেখি এক বেদুঈন তাঁর সামনে বসা। তিনি বললেন: "আমি শুয়ে ছিলাম। এই লোক এসে আমার তলোয়ার টেনে নামায়। আমি জেগে দেখতে পেলাম সে তলোয়ার হাতে আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে। সে আমাকে বলল, এখন আমার হাত থেকে কে তোমাকে বাঁচাবে? আমি বললাম : আল্লাহ্! এরপর সে তলোয়ার খাপে বন্ধ করল এবং বসে পড়ল। এই সে লোক যে এখন তোমাদের সামনে বসা।" বর্ণনাকারী (হযরত জাবির) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) তাকে কোন শাস্তি দেননি।৪
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অবস্থা ছিল এরূপ যে, সমস্ত সাহাবায়ে কিরামের ধৈর্য একত্র করলেও তার সমকক্ষ হবে না। অথচ সাহাবায়ে কিরাম (রা) সকলেই ধৈর্যের প্রতিমূর্তি ছিলেন। ওপরের সকল ব্যাপারে সকলের জন্যই তাঁর ভূমিকা ছিল একজন স্নেহশীল উস্তাদ, একজন রহমদিল ও মেহেরবান সংস্কারক মুরুব্বীর। এর একটি নমুনা আমরা হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর বর্ণনায় দেখতে পাই। তিনি বলেন- একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দিল। লোকেরা তা দেখতে পেয়ে তেড়েফুঁড়ে এলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে থামিয়ে দিয়ে বললেন: "তাকে তোমরা ছেড়ে দাও এবং যেখানে সে প্রস্রাব করেছে সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দাও। মনে রেখ, তোমাদেরকে আসানী সৃষ্টিকারী হিসাবে পাঠানো হয়েছে, দুর্বিষহ বিড়ম্বনা সৃষ্টিকারী হিসাবে নয়।"১
মু'আবিয়া ইবনুল হাকাম (রা) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে সালাত আদায় করছিলাম। এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। আমি জওয়াবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বললাম। লোকে আমাকে জওয়াব দিতে শুনে রাগে আমার দিকে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, তোমাদের মা তোমাদেরকে কাঁদাক! কী হয়েছে যে, তোমরা আমার দিকে এভাবে রেগে তাকাচ্ছ? শুনে লোকেরা তাদের নিজেদের রানের ওপর থাপ্পড় মারতে লাগল।
যখন আমি বুঝতে পারলাম তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে, তখন আমি চুপ করলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সা) সালাত আদায় থেকে মুক্ত হলেন। আমার পিতামাতা তাঁর জন্য কুরবান হোক! আমি এর আগে তাঁর মত মুরুব্বী ও শিক্ষক দেখিনি এবং এরপরও দেখিনি। আল্লাহ্র কসম করে বলছি, তিনি আমাকে শাসাননি, আমাকে ভালমন্দও কিছু বলেননি। কেবল এতটুকু বলেছেন, "সালাত আদায়রত অবস্থায় সাধারণত মানুষ যেভাবে কথা বলে, সেভাবে কথা বলা উচিত নয়। সালাত কেবল তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য।"২
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) খুবই রহমদিল ছিলেন। তাঁর নিকট কোন অভাবী লোক কিংবা কোন লোক প্রয়োজন নিয়ে এলে তিনি অবশ্যই তাকে কিছু দেবার কথা দিতেন। কিছু থাকলে (দেবার মত) তখনই দিয়ে তার প্রয়োজন মেটাতেন। একবার সালাত দাঁড়িয়ে গেছে। এমন সময় জনৈক বেদুঈন সামনে এগিয়ে এলো এবং তাঁর কাপড় ধরে বলতে লাগল, "আমার একটা মামুলী প্রয়োজন বাকি আছে। আমার ভয় হয়, না জানি আমি ভুলে যাই!” তিনি তার সাথে গেলেন। সে তার কাজ শেষ করলে তিনি ফিরে এলেন এবং সালাত আদায় করলেন।'
তাঁর ধৈর্য, সহনশীলতা ও সহ্যশক্তি, উদার হৃদয় ও অটুট ইচ্ছাশক্তি সম্বন্ধে সাক্ষ্য তাঁরই খাদিম হযরত আনাস (রা) প্রদত্ত সাক্ষ্য থেকে পাওয়া যাবে। সে সময় তিনি খুবই অল্পবয়স্ক ছিলেন। তিনি বলেন- আমি দশ বছর ধরে আল্লাহ্ রাসূল (সা)-এর খিদমত করেছি। তিনি কখনও উহ্ বলেননি এবং কখনও এও বলেননি যে, "অমুক কাজ তুমি কেন করলে আর অমুক কাজ তুমি কেন করলে না?"২
সু'আদ ইবন উমর (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে হাযির হলাম। আমার কাপড়ে জাফরানমিশ্রিত খোশবুর চিহ্ন দিল। তিনি দেখে বললেন, ورس، روس "ফেলে দাও, ফেলে দাও"৩। তারপর তিনি ছড়ি দিয়ে আমার পেটের উপর আঘাত করলেন। এতে আমি কষ্ট পাই। আমি বললাম, "হে আল্লাহ্র রাসূল! এখন আমার উপর কিসাস (বদলা, বিনিময়) গ্রহণের অধিকার এসে বর্তেছে।" অমনি রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পেটের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে দিলেন এবং বললেন, "কিসাস নিয়ে নাও”৪।

টিকাঃ
১. ৯ম হিজরীতে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর যিলকাদাহ মাসে তার মৃত্যু হয়। আয- যারকানী, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১১২-১১৩
২. বুখারী, কিতাবুষ জানাইয, সংক্ষিপ্ত
৩. বুখারী, কিতাবুজ জিহাদ كان النبي صلعم يعطى المولفة قلوبهم শীর্ষক অধ্যায়। এ ছাড়াও ইমাম আহমদ, ৩য়, খণ্ড, ১৫৩, (শব্দের সামান্য পরিবর্তনসহ)
১. বায়হাকী (বিস্তারিতভাবে): আহমদ, ৩য় খণ্ড, ১৫৩, (কিছুটা শাব্দিক পার্থক্যসহ)
২. মুসলিম, কিতাবুজ জিহাদ ওয়াস সিয়ার, আল্লাহর বাণী: وهو الذي كف أيديهم عنكم
৩. এখানে ৩৬ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে- যার দু'টো অর্থ হতে পারে : এক, সে তলোয়ার খাপে বন্ধ করল। দুই, সে তলোয়ার টেনে নিল এবং তা দেখল (মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার)
৪. বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, মুস্তালিক যুদ্ধ শীর্ষক অধ্যায়
১. বুখারী, কিতাবুল-উযূ
২. মুসলিম, 'সালাতে কথা বলা হারাম' শীর্ষক অধ্যায়
১. মুসলিম কিতাবুল-ফাযাইল (حسن خلق صلی) শীর্ষক অধ্যায়
২. মুসলিম, কিতাবুল-ফাযাইল
৩. এক ধরনের হলদে রং, যা দিয়ে কাপড় রঞ্জিত করা হয়।
৪. কিতাবুশ-শিফা, প্রতিশোধের কামনায় নয়, ভালবাসার টানে বলেছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00