📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 আল্লাহর সৃষ্ট জীবের সঙ্গে আচরণ

📄 আল্লাহর সৃষ্ট জীবের সঙ্গে আচরণ


কিন্তু ইবাদতের প্রতি এই আগ্রহ, দুনিয়া ও পার্থিব জগতের উপকরণাদির সঙ্গে সম্পর্কহীনতা, পরিপূর্ণ যুহদ, আল্লাহ্ তা'আলার দিকে পূর্ণ মনোনিবেশ এবং তাঁর দরবারে কান্নাকাটি, দু'আ ও মুনাজাতের ভেতর দিয়ে আত্মবিলোপ, তাঁর সবচেয়ে উত্তম আখলাক, স্নেহ-ভালবাসা, অন্তররাজ্য জয়, স্নেহপূর্ণ আচরণ এবং প্রত্যেক মানুষকে তার বৈধ অধিকার প্রদানে ও তার সম্মান ও মর্যাদামাফিক আচরণে কোনরূপ পার্থক্য সৃষ্টি করত না। আর এ দু'টো এমন বিষয় যে, দুটোকে একত্র করা অন্য কোন লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলতেন:
لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا. "আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তবে খুব কম হাসতে আর বেশি কাঁদতে।"৪
লোকের ভিতর তিনিই সবচেয়ে উদার হৃদয়ের ছিলেন, কোমল প্রকৃতির অধিকারী এবং খান্দানের দিক দিয়ে সর্বাধিক সম্মানিত ছিলেন। তদপুরি তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা) থেকে আলাদা হয়ে থাকতেন না, বরং তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আনন্দিত চিত্তে ও সহাস্য বদনে মিশতেন। তাঁদের বাচ্চাদের কোলে বসাতেন। স্বাধীন হোক বা ক্রীতদাস-দাসী, ফকীর-মিসকীন, সকলের দাওয়াতই তিনি কবুল করতেন। পীড়িতদের সেবা-শুশ্রূষা করতেন, তা সে শহরের শেষ প্রান্তেই থাকুক না কেন! মা'যূর-এর ওযর কবূল করতেন। 'সাহাবা-ই কিরাম (রা)-এর মজলিসে তাঁকে কখনো হাত-পা ছড়িয়ে বসতে দেখা যায়নি, যাতে অন্যের কোনরূপ কষ্ট হয়।
'আবদুল্লাহ ইবনুল-হারিছ (রা) বর্ণনা করেন: "আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে বেশি প্রফুল্ল ও হাসি-খুশি আর কাউকে দেখিনি।"'
জাবর ইবন সামুরা (রা) বর্ণনা করেন: "রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুবারক মজলিসে আমি শতবারের বেশি বসার সুযোগ পেয়েছি। আমি দেখেছি, তাঁর সাহাবা-ই কিরাম (রা) একে অন্যের থেকে কবিতা শুনছেন, শোনাচ্ছেন এবং জাহিলী যুগের কোন কথা ও ঘটনাসমূহের আলোচনাও করছেন আর তিনি চুপ করে আছেন অথবা কখনো কোন হাসির কথা হলে তিনিও তাঁদের সাথে মুচকি হাসছেন।"
মুরায়েদ (রা) বর্ণনা করেন: "রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে উমাইয়া ইবনুস সালত-এর কবিতা শোনাবার জন্য বললেন। তারপর আমি তাঁকে তার কবিতা শোনালাম।"২
তিনি অত্যন্ত কোমল অন্তঃকরণবিশিষ্ট, স্নেহ-ভালবাসা ও দয়ামায়ার সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি ছিলেন। মানবীয় আবেগ ও সূক্ষ্ণতার অনুভূতি তাঁর পবিত্র জীবনচরিতে সর্বোত্তম ও সুন্দরতম আকৃতিতে ছেঁয়েছিল।
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা)-কে বলতেন, আমার সন্তানদ্বয় (হাসান ও হুসায়ন)-কে ডাক দাও। ডাক দিতেই তাঁরা দৌড়ে আসতেন। তখন তিনি তাঁদের দু'জনকে চুমু খেতেন এবং টেনে নিতেন। একবার তিনি তাঁর দৌহিত্র হাসান ইবন আলী (রা)-কে ডাকলেন। তিনি দৌড়ে এলেন এবং তাঁর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এরপর তাঁর দাড়ি মুবারকের ভিতর আঙ্গুল ঢোকাতে লাগলেন। এরপর তিনি তাঁর নিজের পবিত্র মুখ খুলে দিলেন এবং তিনি (হাসান) আপন মুখ তাঁর (রাসূলের) বরকতময় মুখের ভেতর প্রবেশ করালেন।"৩
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেনঃ যায়দ ইবন হারিছা (রা) (যিনি রাসুল (সা)-এর গোলাম ছিলেন)। যখন মদীনায় এলো, তখন তিনি ঘরেই ছিলেন। সে ঘরে এলো এবং দরজায় আঘাত করল। রাসূলুল্লাহ (সা) তখনই উঠে পড়লেন। সে সময় তাঁর শরীরের সর্বত্র কাপড়-ঢাকা ছিল না, শরীর থেকে চাদর গড়িয়ে পড়ছিল। এ অবস্থায় তিনি তাকে (যায়দ) দেখে জড়িয়ে ধরলেন, কোলাকুলি করলেন এবং চুমু খেলেন।"'
উসামা ইবন যায়দ (রা) বর্ণনা করেনঃ "রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জনৈক কন্যা রাসূল (সা)-কে পয়গাম পাঠান, আমার বাচ্চা মরণাপন্ন, মেহেরবানি করে আসুন। তিনি তাকে সালাম পাঠালেন এবং বললেন, সবই আল্লাহর- যা তিনি নিয়েছেন এবং যা তিনি দিয়েছেন। প্রতিটি বস্তু তাঁর দরবারে নামাঙ্কিত ও নির্ধারিত। অতএব ধৈর্যধারণ কর এবং পুরস্কারের প্রত্যাশী হও, আশায় বুক বাঁধো।
কন্যা কসম দিয়ে পাঠালেন, যেন তিনি অবশ্যই একবার আসেন। তিনি যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন এবং আমরাও তাঁর সাথে উঠে দাঁড়ালাম। তিনি সেখানে গিয়ে বসলে কোলে করে শিশুটি সেখানে আনা হলো। তিনি তাকে কোলে তুলে নিলেন। ঐ সময় তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে। এ দেখে তাঁর চোখ ফেটে অবিরলধারায় পানি পড়তে লাগল। হযরত সা'দ (রা) আরয করলেন: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ কি (আপনিও কাঁদছেন)!' তিনি বললেনঃ এ স্নেহ-মমতার বহিঃপ্রকাশ- যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের ভেতর যাকে চান দান করে থাকেন। আর আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রহমদিল বান্দাদের ওপরই দয়া প্রদর্শন করে থাকেন।২
বদরের যুদ্ধবন্দীদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আপন চাচা আব্বাস (রা)- ও (তখনও তিনি মুসলমান হন নি) ছিলেন। অন্য যুদ্ধবন্দীদের মত তাঁকেও কষে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ফলে, তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন আর তাঁর কাতরানির কারণে তিনি ঘুমাতে পারছিলেন না। জনৈক সাহাবী বিষয়টি বুঝতে পেরে হযরত আব্বাস (রা)-এর বাঁধন একটু ঢিলা করে দিলেন। আনসার সাহাবীর এই মমতা দেখানো আল্লাহ্র রাসূল (সা)-কে উৎসাহিত করতে পারেনি। তিনি চাননি যে হযরত আব্বাস (রা) ও একজন সাধারণ যুদ্ধবন্দীর মধ্যে কোনরূপ ভিন্ন আচরণ করা হোক। ফলে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইচ্ছামতো অপরাপর বন্দীদের বাঁধনও অনুরূপ ঢিলা করে দেয়া হয়।
আনসার সাহাবী যখন দেখতে পেলেন, হযরত আব্বাস-এর বাঁধন ঢিলা করে দেয়াতে আল্লাহ্র রাসূল খুশি হয়েছেন, তখন তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তাঁর চাচাকে মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দেয়া হোক। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর এই পরামর্শ গ্রহণ করেননি।'
একবার জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে উপস্থিত হলো এবং বলতে লাগল: "আপনারা কি আপনাদের ছেলেমেয়েদের স্নেহ করেন, মায়া করেন, ভালোবাসেন? আমরা তো তাদের মায়া করি না, ভালোবাসি না।" আল্লাহ্র রাসূল (সা) বললেন: “যদি আল্লাহ্ তা'আলা তোমার অন্তর থেকে দয়া-মায়া উঠিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমি আর তোমাদের জন্য কী করতে পারি?"২
তিনি শিশুদের প্রতি খুবই সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ ও কোমল আচরণ করতেন। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন: "একবার রাসূল (সা) খেলাধুলায় মত্ত কয়েকটি শিশুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দিলেন।"°
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের সঙ্গে একেবারে মিশে থাকতেন। আমার এক কনিষ্ঠ ভাইকে তিনি বলতেন, ওহে উমায়র! তোমার নুগায়র (একটা ছোট পাখি- যা নিয়ে শিশুরা বেশি সময় খেলা করে থাকে)-এর কি হলো?"৪
মুসলমানদের প্রতি তিনি অত্যন্ত সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন। তিনি তাদের অবস্থার প্রতি খুব লক্ষ্য করতেন। মানব স্বভাবে বিরক্তি ও ক্লান্তিবোধ এবং সাময়িকভাবে তাদের মাঝে ভীরুতা ও কাপুরুষতা সৃষ্টি হওয়া বিচিত্র নয়। এসবের দিকে তিনি বরাবর লক্ষ্য রাখতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে যে ওয়ায-নসীহত করতেন তা বিরতি দিয়ে করতেন এবং তা এজন্য করতেন যাতে তা আমাদের মাঝে বিরক্তি বা একঘেঁয়েমী সৃষ্টি না করে। সালাত বা নামাযের সঙ্গে এতটা প্রেম ও আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও যদি কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেতেন অমনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে দিতেন। তিনি নিজে বলেছেন: "আমি সালাতে দাঁড়াই এবং চাই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তা আদায় করি। অতঃপর কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। তখন এই ধারণায় সালাত সংক্ষিপ্ত করি যাতে তার মায়ের কোনরূপ উৎকণ্ঠা কিংবা মানসিক পীড়ার কারণ না হয়।"১
হযরত অবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) আরও বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে আরয করল, হে আল্লাহ্র রাসূল (সা)! আমি আমার মহল্লায় ফজরের নামাযে কেবল এজন্যই হাযির হই না যে, অমুক লোক সালাত খুবই দীর্ঘ আদায় করে থাকে। এরপর তিনি যে ওয়ায করলেন এর থেকে রাগান্বিত অবস্থায় আর কোন ওয়ায করতে আমি তাঁকে দেখিনি। তিনি বললেন: "তোমাদের মধ্যে সেইসব লোক রয়েছে যারা (ইবাদত ও সালাতের প্রতি) মানুষকে বিতৃষ্ণ ও বিরক্ত করে তুলছে। তোমাদের মধ্যে যারা সালাতে ইমামতি করবে, তাদের উচিত হবে তা সংক্ষিপ্ত করা। কেননা জামা'আতে উপস্থিত মুসল্লীদের মধ্যে দুর্বল লোক যেমন রয়েছে, তেমনি বৃদ্ধ ও প্রয়োজনের তাগিদে ব্যস্ত লোকও রয়েছে।"২
এই প্রসঙ্গে বলতে চাই, মহিলা যাত্রীদলে ছিল আনজাশা নামে জনৈক সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী- যার সুরেলা আবৃত্তিতে উট দ্রুত ছুটত। মহিলাদের এতে কষ্ট হতো। এই দেখে তিনি একদিন আনজাশাকে বললেন: “ওহে আনজাশা! একটু আস্তে। কাঁচের পাত্রগুলো ভেঙে যেতে পারে (অর্থাৎ দ্রুতগতির কারণে দুর্বল ও কোমল স্ত্রীলাকদের যেন কষ্ট না হয়)।"৩
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বক্ষ মুবারককে সব রকমের হিংসা-বিদ্বেষ ও অপরের ক্ষতি ও অমঙ্গল কামনা থেকে সযত্নে মুক্ত রেখেছিলেন। তাই তিনি বলতেন, "তোমাদের কেউ যেন আমার সামনে অপর কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ না করে। কেননা আমি চাই, তোমাদের সামনে যেন আমি এমন ভাবে হাযির হতে পারি যাতে, তোমাদের প্রতি আমার দিল সাফ থাকে।”১
মুসলমানের পক্ষে তিনি ছিলেন স্নেহশীল পিতার মতই, আর সমস্ত মুসলমান ছিল যেন তাঁর পরিবার-পরিজনের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের সকলের যিম্মাদারী যেন তাঁরই কাঁধে ন্যস্ত। তিনি তাদের উপর এতটা সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন যতটা হয়ে থাকেন একজন মা তার সন্তানের প্রতি। مسلمانوں নিকট তাদের ধন-সম্পদ ও তাদের জীবিকার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা'আলা যে প্রাচুর্য দান করেছিলেন তার সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তাদের ঋণ ও তাদের পিঠের ওপর চাপানো বোঝা হালকা করে তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, "কেউ সম্পত্তি রেখে-মারা গেলে, তা তার উত্তরাধিকারী তথা ওয়ারিসদের, আর কেউ ঋণ রেখে মারা গেলে তা পরিশোধের দায়িত্ব আমার। "২
অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি বলতেন, "এমন কোন মুমিন নেই যার দুনিয়া ও আখিরাতে আমার চেয়ে বড় কোন অভিভাবক আছে। যদি চাও এই আয়াত পড়তে পার:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِيْنَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ .
নবী মুমিনদের জন্য তাদের জীবনের চেয়েও বেশি বন্ধু ও সুহৃদ হয়ে থাকেন। [সূরা আহযাব: ৬]
এজন্যে কোন মুসলমান ইন্তিকাল করলে এবং তার পরিত্যক্ত কোন সম্পদ থাকলে, তা তার ওয়ারিস ও নিকটত্মীয়দের অধিকার হিসেবে গণ্য হবে, তা সে যেই হোক! কিন্তু যদি তার যিম্মায় কোন ঋণ থাকে, তবে সে যেন আমার কাছে আসে। তার অভিভাবক ও যিম্মাদার আমি।""

টিকাঃ
৪. আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণিত
১. শামাইলে তিরমিযী
২. আল-আদাবুল-মুফরাদ, বুখারী
৩. আল-আদাবুল-মুফরাদ, বুখারীকৃত পৃঃ ৭৩
১. তিরমিযী
২. বুখারী, কিতাবুল মারদ্বা, কিতাবুজ জানাইয بأب قول النبي صلى الله عليه وسلم يعذب الميت ببكاء اهله
১. ফাতহুল বারী, ৮ম. খণ্ড, পৃঃ ৩২৪ মিসরী সংস্করণ
২. বুখারী, আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীস, কিতাবুল আদব
৩. বুখারী
৪. আল-আদাবুল মুফরাদ
১. বুখারী, কিতাবুস-সালাত
২. প্রাগুক্ত
৩. আল-আদাবুল মুফরাদ, এ ছাড়াও বুখারী ও মুসলিম
১. কিতাবুশ-শিফা, পৃঃ ৫৫, আবূ দাউদ সূত্রে বর্ণিত
২. বুখারী, কিতাবুল-ইসতিযকার
৩. বুখারী, কিতাবুল-ইসতিযকার

কিন্তু ইবাদতের প্রতি এই আগ্রহ, দুনিয়া ও পার্থিব জগতের উপকরণাদির সঙ্গে সম্পর্কহীনতা, পরিপূর্ণ যুহদ, আল্লাহ্ তা'আলার দিকে পূর্ণ মনোনিবেশ এবং তাঁর দরবারে কান্নাকাটি, দু'আ ও মুনাজাতের ভেতর দিয়ে আত্মবিলোপ, তাঁর সবচেয়ে উত্তম আখলাক, স্নেহ-ভালবাসা, অন্তররাজ্য জয়, স্নেহপূর্ণ আচরণ এবং প্রত্যেক মানুষকে তার বৈধ অধিকার প্রদানে ও তার সম্মান ও মর্যাদামাফিক আচরণে কোনরূপ পার্থক্য সৃষ্টি করত না। আর এ দু'টো এমন বিষয় যে, দুটোকে একত্র করা অন্য কোন লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলতেন:
لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا. "আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তবে খুব কম হাসতে আর বেশি কাঁদতে।"৪
লোকের ভিতর তিনিই সবচেয়ে উদার হৃদয়ের ছিলেন, কোমল প্রকৃতির অধিকারী এবং খান্দানের দিক দিয়ে সর্বাধিক সম্মানিত ছিলেন। তদপুরি তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা) থেকে আলাদা হয়ে থাকতেন না, বরং তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আনন্দিত চিত্তে ও সহাস্য বদনে মিশতেন। তাঁদের বাচ্চাদের কোলে বসাতেন। স্বাধীন হোক বা ক্রীতদাস-দাসী, ফকীর-মিসকীন, সকলের দাওয়াতই তিনি কবুল করতেন। পীড়িতদের সেবা-শুশ্রূষা করতেন, তা সে শহরের শেষ প্রান্তেই থাকুক না কেন! মা'যূর-এর ওযর কবূল করতেন। 'সাহাবা-ই কিরাম (রা)-এর মজলিসে তাঁকে কখনো হাত-পা ছড়িয়ে বসতে দেখা যায়নি, যাতে অন্যের কোনরূপ কষ্ট হয়।
'আবদুল্লাহ ইবনুল-হারিছ (রা) বর্ণনা করেন: "আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে বেশি প্রফুল্ল ও হাসি-খুশি আর কাউকে দেখিনি।"'
জাবর ইবন সামুরা (রা) বর্ণনা করেন: "রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুবারক মজলিসে আমি শতবারের বেশি বসার সুযোগ পেয়েছি। আমি দেখেছি, তাঁর সাহাবা-ই কিরাম (রা) একে অন্যের থেকে কবিতা শুনছেন, শোনাচ্ছেন এবং জাহিলী যুগের কোন কথা ও ঘটনাসমূহের আলোচনাও করছেন আর তিনি চুপ করে আছেন অথবা কখনো কোন হাসির কথা হলে তিনিও তাঁদের সাথে মুচকি হাসছেন।"
মুরায়েদ (রা) বর্ণনা করেন: "রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে উমাইয়া ইবনুস সালত-এর কবিতা শোনাবার জন্য বললেন। তারপর আমি তাঁকে তার কবিতা শোনালাম।"২
তিনি অত্যন্ত কোমল অন্তঃকরণবিশিষ্ট, স্নেহ-ভালবাসা ও দয়ামায়ার সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি ছিলেন। মানবীয় আবেগ ও সূক্ষ্ণতার অনুভূতি তাঁর পবিত্র জীবনচরিতে সর্বোত্তম ও সুন্দরতম আকৃতিতে ছেঁয়েছিল।
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা)-কে বলতেন, আমার সন্তানদ্বয় (হাসান ও হুসায়ন)-কে ডাক দাও। ডাক দিতেই তাঁরা দৌড়ে আসতেন। তখন তিনি তাঁদের দু'জনকে চুমু খেতেন এবং টেনে নিতেন। একবার তিনি তাঁর দৌহিত্র হাসান ইবন আলী (রা)-কে ডাকলেন। তিনি দৌড়ে এলেন এবং তাঁর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এরপর তাঁর দাড়ি মুবারকের ভিতর আঙ্গুল ঢোকাতে লাগলেন। এরপর তিনি তাঁর নিজের পবিত্র মুখ খুলে দিলেন এবং তিনি (হাসান) আপন মুখ তাঁর (রাসূলের) বরকতময় মুখের ভেতর প্রবেশ করালেন।"৩
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেনঃ যায়দ ইবন হারিছা (রা) (যিনি রাসুল (সা)-এর গোলাম ছিলেন)। যখন মদীনায় এলো, তখন তিনি ঘরেই ছিলেন। সে ঘরে এলো এবং দরজায় আঘাত করল। রাসূলুল্লাহ (সা) তখনই উঠে পড়লেন। সে সময় তাঁর শরীরের সর্বত্র কাপড়-ঢাকা ছিল না, শরীর থেকে চাদর গড়িয়ে পড়ছিল। এ অবস্থায় তিনি তাকে (যায়দ) দেখে জড়িয়ে ধরলেন, কোলাকুলি করলেন এবং চুমু খেলেন।"'
উসামা ইবন যায়দ (রা) বর্ণনা করেনঃ "রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জনৈক কন্যা রাসূল (সা)-কে পয়গাম পাঠান, আমার বাচ্চা মরণাপন্ন, মেহেরবানি করে আসুন। তিনি তাকে সালাম পাঠালেন এবং বললেন, সবই আল্লাহর- যা তিনি নিয়েছেন এবং যা তিনি দিয়েছেন। প্রতিটি বস্তু তাঁর দরবারে নামাঙ্কিত ও নির্ধারিত। অতএব ধৈর্যধারণ কর এবং পুরস্কারের প্রত্যাশী হও, আশায় বুক বাঁধো।
কন্যা কসম দিয়ে পাঠালেন, যেন তিনি অবশ্যই একবার আসেন। তিনি যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন এবং আমরাও তাঁর সাথে উঠে দাঁড়ালাম। তিনি সেখানে গিয়ে বসলে কোলে করে শিশুটি সেখানে আনা হলো। তিনি তাকে কোলে তুলে নিলেন। ঐ সময় তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে। এ দেখে তাঁর চোখ ফেটে অবিরলধারায় পানি পড়তে লাগল। হযরত সা'দ (রা) আরয করলেন: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ কি (আপনিও কাঁদছেন)!' তিনি বললেনঃ এ স্নেহ-মমতার বহিঃপ্রকাশ- যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের ভেতর যাকে চান দান করে থাকেন। আর আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রহমদিল বান্দাদের ওপরই দয়া প্রদর্শন করে থাকেন।২
বদরের যুদ্ধবন্দীদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আপন চাচা আব্বাস (রা)- ও (তখনও তিনি মুসলমান হন নি) ছিলেন। অন্য যুদ্ধবন্দীদের মত তাঁকেও কষে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ফলে, তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন আর তাঁর কাতরানির কারণে তিনি ঘুমাতে পারছিলেন না। জনৈক সাহাবী বিষয়টি বুঝতে পেরে হযরত আব্বাস (রা)-এর বাঁধন একটু ঢিলা করে দিলেন। আনসার সাহাবীর এই মমতা দেখানো আল্লাহ্র রাসূল (সা)-কে উৎসাহিত করতে পারেনি। তিনি চাননি যে হযরত আব্বাস (রা) ও একজন সাধারণ যুদ্ধবন্দীর মধ্যে কোনরূপ ভিন্ন আচরণ করা হোক। ফলে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইচ্ছামতো অপরাপর বন্দীদের বাঁধনও অনুরূপ ঢিলা করে দেয়া হয়।
আনসার সাহাবী যখন দেখতে পেলেন, হযরত আব্বাস-এর বাঁধন ঢিলা করে দেয়াতে আল্লাহ্র রাসূল খুশি হয়েছেন, তখন তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তাঁর চাচাকে মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দেয়া হোক। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর এই পরামর্শ গ্রহণ করেননি।'
একবার জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে উপস্থিত হলো এবং বলতে লাগল: "আপনারা কি আপনাদের ছেলেমেয়েদের স্নেহ করেন, মায়া করেন, ভালোবাসেন? আমরা তো তাদের মায়া করি না, ভালোবাসি না।" আল্লাহ্র রাসূল (সা) বললেন: “যদি আল্লাহ্ তা'আলা তোমার অন্তর থেকে দয়া-মায়া উঠিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমি আর তোমাদের জন্য কী করতে পারি?"২
তিনি শিশুদের প্রতি খুবই সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ ও কোমল আচরণ করতেন। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন: "একবার রাসূল (সা) খেলাধুলায় মত্ত কয়েকটি শিশুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দিলেন।"°
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের সঙ্গে একেবারে মিশে থাকতেন। আমার এক কনিষ্ঠ ভাইকে তিনি বলতেন, ওহে উমায়র! তোমার নুগায়র (একটা ছোট পাখি- যা নিয়ে শিশুরা বেশি সময় খেলা করে থাকে)-এর কি হলো?"৪
মুসলমানদের প্রতি তিনি অত্যন্ত সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন। তিনি তাদের অবস্থার প্রতি খুব লক্ষ্য করতেন। মানব স্বভাবে বিরক্তি ও ক্লান্তিবোধ এবং সাময়িকভাবে তাদের মাঝে ভীরুতা ও কাপুরুষতা সৃষ্টি হওয়া বিচিত্র নয়। এসবের দিকে তিনি বরাবর লক্ষ্য রাখতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে যে ওয়ায-নসীহত করতেন তা বিরতি দিয়ে করতেন এবং তা এজন্য করতেন যাতে তা আমাদের মাঝে বিরক্তি বা একঘেঁয়েমী সৃষ্টি না করে। সালাত বা নামাযের সঙ্গে এতটা প্রেম ও আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও যদি কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেতেন অমনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে দিতেন। তিনি নিজে বলেছেন: "আমি সালাতে দাঁড়াই এবং চাই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তা আদায় করি। অতঃপর কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। তখন এই ধারণায় সালাত সংক্ষিপ্ত করি যাতে তার মায়ের কোনরূপ উৎকণ্ঠা কিংবা মানসিক পীড়ার কারণ না হয়।"১
হযরত অবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) আরও বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে আরয করল, হে আল্লাহ্র রাসূল (সা)! আমি আমার মহল্লায় ফজরের নামাযে কেবল এজন্যই হাযির হই না যে, অমুক লোক সালাত খুবই দীর্ঘ আদায় করে থাকে। এরপর তিনি যে ওয়ায করলেন এর থেকে রাগান্বিত অবস্থায় আর কোন ওয়ায করতে আমি তাঁকে দেখিনি। তিনি বললেন: "তোমাদের মধ্যে সেইসব লোক রয়েছে যারা (ইবাদত ও সালাতের প্রতি) মানুষকে বিতৃষ্ণ ও বিরক্ত করে তুলছে। তোমাদের মধ্যে যারা সালাতে ইমামতি করবে, তাদের উচিত হবে তা সংক্ষিপ্ত করা। কেননা জামা'আতে উপস্থিত মুসল্লীদের মধ্যে দুর্বল লোক যেমন রয়েছে, তেমনি বৃদ্ধ ও প্রয়োজনের তাগিদে ব্যস্ত লোকও রয়েছে।"২
এই প্রসঙ্গে বলতে চাই, মহিলা যাত্রীদলে ছিল আনজাশা নামে জনৈক সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী- যার সুরেলা আবৃত্তিতে উট দ্রুত ছুটত। মহিলাদের এতে কষ্ট হতো। এই দেখে তিনি একদিন আনজাশাকে বললেন: “ওহে আনজাশা! একটু আস্তে। কাঁচের পাত্রগুলো ভেঙে যেতে পারে (অর্থাৎ দ্রুতগতির কারণে দুর্বল ও কোমল স্ত্রীলাকদের যেন কষ্ট না হয়)।"৩
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বক্ষ মুবারককে সব রকমের হিংসা-বিদ্বেষ ও অপরের ক্ষতি ও অমঙ্গল কামনা থেকে সযত্নে মুক্ত রেখেছিলেন। তাই তিনি বলতেন, "তোমাদের কেউ যেন আমার সামনে অপর কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ না করে। কেননা আমি চাই, তোমাদের সামনে যেন আমি এমন ভাবে হাযির হতে পারি যাতে, তোমাদের প্রতি আমার দিল সাফ থাকে।”১
মুসলমানের পক্ষে তিনি ছিলেন স্নেহশীল পিতার মতই, আর সমস্ত মুসলমান ছিল যেন তাঁর পরিবার-পরিজনের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের সকলের যিম্মাদারী যেন তাঁরই কাঁধে ন্যস্ত। তিনি তাদের উপর এতটা সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন যতটা হয়ে থাকেন একজন মা তার সন্তানের প্রতি। مسلمانوں নিকট তাদের ধন-সম্পদ ও তাদের জীবিকার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা'আলা যে প্রাচুর্য দান করেছিলেন তার সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তাদের ঋণ ও তাদের পিঠের ওপর চাপানো বোঝা হালকা করে তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, "কেউ সম্পত্তি রেখে-মারা গেলে, তা তার উত্তরাধিকারী তথা ওয়ারিসদের, আর কেউ ঋণ রেখে মারা গেলে তা পরিশোধের দায়িত্ব আমার। "২
অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি বলতেন, "এমন কোন মুমিন নেই যার দুনিয়া ও আখিরাতে আমার চেয়ে বড় কোন অভিভাবক আছে। যদি চাও এই আয়াত পড়তে পার:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِيْنَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ .
নবী মুমিনদের জন্য তাদের জীবনের চেয়েও বেশি বন্ধু ও সুহৃদ হয়ে থাকেন। [সূরা আহযাব: ৬]
এজন্যে কোন মুসলমান ইন্তিকাল করলে এবং তার পরিত্যক্ত কোন সম্পদ থাকলে, তা তার ওয়ারিস ও নিকটত্মীয়দের অধিকার হিসেবে গণ্য হবে, তা সে যেই হোক! কিন্তু যদি তার যিম্মায় কোন ঋণ থাকে, তবে সে যেন আমার কাছে আসে। তার অভিভাবক ও যিম্মাদার আমি।""

টিকাঃ
৪. আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণিত
১. শামাইলে তিরমিযী
২. আল-আদাবুল-মুফরাদ, বুখারী
৩. আল-আদাবুল-মুফরাদ, বুখারীকৃত পৃঃ ৭৩
১. তিরমিযী
২. বুখারী, কিতাবুল মারদ্বা, কিতাবুজ জানাইয بأب قول النبي صلى الله عليه وسلم يعذب الميت ببكاء اهله
১. ফাতহুল বারী, ৮ম. খণ্ড, পৃঃ ৩২৪ মিসরী সংস্করণ
২. বুখারী, আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীস, কিতাবুল আদব
৩. বুখারী
৪. আল-আদাবুল মুফরাদ
১. বুখারী, কিতাবুস-সালাত
২. প্রাগুক্ত
৩. আল-আদাবুল মুফরাদ, এ ছাড়াও বুখারী ও মুসলিম
১. কিতাবুশ-শিফা, পৃঃ ৫৫, আবূ দাউদ সূত্রে বর্ণিত
২. বুখারী, কিতাবুল-ইসতিযকার
৩. বুখারী, কিতাবুল-ইসতিযকার

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 স্বভাব-প্রকৃতিতে ভারসাম্য

📄 স্বভাব-প্রকৃতিতে ভারসাম্য


আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে যেই উন্নত স্তরের আখলাক এবং যেই সর্বোচ্চ শ্রেণীর স্বভাবজাত ও প্রকৃতিগত ভারসাম্য দান করেছিলেন, তা ছিল ভবিষ্যত শতাব্দীগুলোর এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পূর্ণতম বিকাশ। একে আমরা স্বভাবের ভারসাম্য, সুস্থ প্রকৃতি, অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও তীক্ষ্ণতা, ভারসাম্যপূর্ণ ও কম-বেশির বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত বলে আখ্যায়িত করতে পারি। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, "আল্লাহ্র রাসূল (সা) দু'টো কাজের মধ্যে যখন কোন একটিকে প্রাধান্য প্রদান করতেন, তখন সব সময় সহজতরটিকেই প্রাধান্য দিতেন; তবে এই শর্তে যে, এতে গুনাহের নাম-গন্ধও যেন না থাকে! যদি এতে গুনাহের সামান্যতম গন্ধও পাওয়া যেত, তবে তিনি এর থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে অবস্থান করতেন।"'
তিনি বেশি লৌকিকতা, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি যুহদ ও নির্লিপ্ততা এবং নফসের বৈধ অধিকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া থেকে অনেক দূরে ছিলেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন: "দ্বীন খুব সহজ; তবে কেউ যদি দ্বীনের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় এগিয়ে আসে, দ্বীন তার উপর বিজয়ী হবে, প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করবে। এজন্য মধ্যম পন্থায় ভারসাম্যপূর্ণ পথে চল। কাছের দিকগুলোর রেয়ায়াত কর, সন্তুষ্ট থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও অন্ধকার রাতের ইবাদত থেকে শক্তি অর্জন কর।"২
তিনি এও বলতেন: "থাম, ততটুকুই কর, যতটুকু করার শক্তি তোমার রয়েছে। আর তা এজন্য যে, আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ তা'আলা তো ক্লান্ত হয়ে পড়বেন না; বরং তোমরাই ক্লান্ত হয়ে পড়বে।"
ইবন আব্বাস (রা) বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট কোন ধরনের দ্বীন বা ধর্ম সবচেয়ে প্রিয় ও পছন্দনীয়? তিনি বললেন : "الْحَنِيفِيَّةُ السَّبْحَةُ " সহজ ও নিষ্ঠাপূর্ণ দ্বীনে ইব্রাহীমী।""
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন: "বাড়াবাড়ি ও জোর-যবরদস্তির সঙ্গে কাজ আদায়কারী ও খুঁত তালাশকারী ধ্বংস হয়েছে।"৪
তিনি যখন কোন সাহাবীকে কোথাও তালিম প্রদান ও ওয়ায-নসীহতের জন্য পাঠাতেন, তখন তাদেরকে বলতেন: "সহজ পন্থা অনুসরণ করবে, সংকীর্ণ করে তুলবে না। সুসংবাদ শোনাবে, হিংসুক ও ঘৃণ্য করে তুলবে না।”
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনিল আস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: "আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর দেয়া নিয়ামতের বাহ্যিক প্রকাশ তাঁর বান্দার ওপর দেখতে পছন্দ করেন।"১

টিকাঃ
১. মুসলিম
২. বুখারী, কিতাবুল ঈমান, দ্বীন সহজ শীর্ষক অধ্যায়
৩. আল-আদাবুল মুফরাদ
৪. মুসলিম, অর্থাৎ দ্বীনের ব্যাপারে যে জোরষবরদস্তি ও বাড়াবাড়ি করে
১. তিরমিযী এই হাদীস আবওয়াবুল আদব-এ বর্ণনা করেছেন: باب ان الله يحب ان يرى أثر نعمته على عبده অর্থাৎ আল্লাহ্ তাঁর বান্দাকে যেসব নিয়ামতে ভূষিত করেছেন, বান্দার জীবনে তার প্রকাশ ঘটুক তা তিনি পছন্দ করেন। প্রাচুর্যের অধিকারী লোকে দরিদ্রবেশে থাকুক এ আল্লাহ্ নিয়ামতের নাশোকরী এবং প্রয়োজন ছাড়া আপন দারিদ্র্য প্রকাশ করাও তেমনি তাঁর অপছন্দ।

আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে যেই উন্নত স্তরের আখলাক এবং যেই সর্বোচ্চ শ্রেণীর স্বভাবজাত ও প্রকৃতিগত ভারসাম্য দান করেছিলেন, তা ছিল ভবিষ্যত শতাব্দীগুলোর এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পূর্ণতম বিকাশ। একে আমরা স্বভাবের ভারসাম্য, সুস্থ প্রকৃতি, অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও তীক্ষ্ণতা, ভারসাম্যপূর্ণ ও কম-বেশির বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত বলে আখ্যায়িত করতে পারি। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, "আল্লাহ্র রাসূল (সা) দু'টো কাজের মধ্যে যখন কোন একটিকে প্রাধান্য প্রদান করতেন, তখন সব সময় সহজতরটিকেই প্রাধান্য দিতেন; তবে এই শর্তে যে, এতে গুনাহের নাম-গন্ধও যেন না থাকে! যদি এতে গুনাহের সামান্যতম গন্ধও পাওয়া যেত, তবে তিনি এর থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে অবস্থান করতেন।"'
তিনি বেশি লৌকিকতা, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি যুহদ ও নির্লিপ্ততা এবং নফসের বৈধ অধিকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া থেকে অনেক দূরে ছিলেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন: "দ্বীন খুব সহজ; তবে কেউ যদি দ্বীনের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় এগিয়ে আসে, দ্বীন তার উপর বিজয়ী হবে, প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করবে। এজন্য মধ্যম পন্থায় ভারসাম্যপূর্ণ পথে চল। কাছের দিকগুলোর রেয়ায়াত কর, সন্তুষ্ট থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও অন্ধকার রাতের ইবাদত থেকে শক্তি অর্জন কর।"২
তিনি এও বলতেন: "থাম, ততটুকুই কর, যতটুকু করার শক্তি তোমার রয়েছে। আর তা এজন্য যে, আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ তা'আলা তো ক্লান্ত হয়ে পড়বেন না; বরং তোমরাই ক্লান্ত হয়ে পড়বে।"
ইবন আব্বাস (রা) বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট কোন ধরনের দ্বীন বা ধর্ম সবচেয়ে প্রিয় ও পছন্দনীয়? তিনি বললেন : "الْحَنِيفِيَّةُ السَّبْحَةُ " সহজ ও নিষ্ঠাপূর্ণ দ্বীনে ইব্রাহীমী।""
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন: "বাড়াবাড়ি ও জোর-যবরদস্তির সঙ্গে কাজ আদায়কারী ও খুঁত তালাশকারী ধ্বংস হয়েছে।"৪
তিনি যখন কোন সাহাবীকে কোথাও তালিম প্রদান ও ওয়ায-নসীহতের জন্য পাঠাতেন, তখন তাদেরকে বলতেন: "সহজ পন্থা অনুসরণ করবে, সংকীর্ণ করে তুলবে না। সুসংবাদ শোনাবে, হিংসুক ও ঘৃণ্য করে তুলবে না।”
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনিল আস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: "আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর দেয়া নিয়ামতের বাহ্যিক প্রকাশ তাঁর বান্দার ওপর দেখতে পছন্দ করেন।"১

টিকাঃ
১. মুসলিম
২. বুখারী, কিতাবুল ঈমান, দ্বীন সহজ শীর্ষক অধ্যায়
৩. আল-আদাবুল মুফরাদ
৪. মুসলিম, অর্থাৎ দ্বীনের ব্যাপারে যে জোরষবরদস্তি ও বাড়াবাড়ি করে
১. তিরমিযী এই হাদীস আবওয়াবুল আদব-এ বর্ণনা করেছেন: باب ان الله يحب ان يرى أثر نعمته على عبده অর্থাৎ আল্লাহ্ তাঁর বান্দাকে যেসব নিয়ামতে ভূষিত করেছেন, বান্দার জীবনে তার প্রকাশ ঘটুক তা তিনি পছন্দ করেন। প্রাচুর্যের অধিকারী লোকে দরিদ্রবেশে থাকুক এ আল্লাহ্ নিয়ামতের নাশোকরী এবং প্রয়োজন ছাড়া আপন দারিদ্র্য প্রকাশ করাও তেমনি তাঁর অপছন্দ।

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 ঘরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে

📄 ঘরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে


তিনি তাঁর ঘরে সাধারণ মানুষের মতই থাকতেন। যেমন হযরত আয়েশা (রা) নিজেই বর্ণনা করেছেন: তিনি তাঁর কাপড়-চোপড়ও পরিষ্কার করতেন, তিনি বকরির দুধও নিজ হাতে দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই করতেন। তিনি নিজের কাপড়ে তালি লাগাতেন, জুতা সেলাই করতেন এবং এভাবেই আরও কাজ করতেন।
হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, "তিনি তাঁর ঘরে কিভাবে থাকতেন। জবাবে তিনি বললেন, তিনি ঘরে কাজকর্মের ভেতর থাকতেন। যখন সালাতের ওয়াক্ত হত, তখন সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে চলে যেতেন।"২
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি তাঁর নিজের জুতা মেরামত করে নিতেন, কাপড় সেলাই করতেন যেমন কেউ কেউ নিজেদের বাড়ি-ঘরে করে থাকে।
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, তিনি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কোমল ও সবচেয়ে বেশি মহানুভব ছিলেন। আর হাসির সময় মুচকি হাসি হাসতেন।৪
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, "আমি এমন কাউকে দেখিনি, যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে আপন পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক সদয় ও স্নেহশীল।"৫
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার পরিবার-পরিজনের নিকট সর্বোত্তম এবং আমি আমার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।"৬
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কখনো কোন খাদ্যবস্তুর দোষ খোঁজেন নি। যদি পছন্দ হয়েছে খেয়েছেন, পছন্দ না হলে তা খাননি।'
আপন আহলে বায়ত, পরিবার-পরিজন ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে তাঁর চিরদিনের অভ্যাস ছিল, যে যেই পরিমাণ তাঁর নিকটবর্তী হতো, বিপদাপদ ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে তাকে সেই পরিমাণ সামনে রাখতেন এবং পুরস্কার-পারিতোষিক ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের সময় তাকে সেই পরিমাণ পেছনে রাখতেন। যখন উৎবা, রবীআ, শায়বা ইবন রবীআ ও ওলীদ ইবন উৎবা (যারা ছিল আরবের নামী-দামী বীরপুরুষ ও রণনিপুণ সৈনিক) বদর প্রান্তরে কুরায়শদের পক্ষ থেকে مسلمانوںকে তাদের মুকাবিলায় চ্যালেঞ্জ করল এবং তাদের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বি আহ্বান করল, তখন তিনি আপন চাচা হামযা, চাচাত ভাই আলী ও নিকটাত্মীয় আবু উবায়দা (রা) ডেকে পাঠালেন এবং তাদের মুকাবিলায় প্রেরণ করলেন। অথচ তিনি মক্কায় এসব বাহাদুর সৈনিকের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে ভালোই জানতেন। মুহাজিরদের মধ্যে এমন অনেক বীরপুরুষ ও সাহসী যোদ্ধা ছিলেন- যারা তাদের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে অবতীর্ণ হতে পারতেন। বনু হাশিমের এই তিনজন ছিলেন তাঁরাই- যাঁরা রক্তসম্পর্কের দিক দিয়ে রাসূল (সা)-এর সবচেয়ে নিকটজন ছিলেন, ছিলেন একান্ত প্রিয়জন। কিন্তু তাদেরকে এই বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি অন্যদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেননি, বরং তাঁদেরকেই মুকাবিলার জন্য পাঠিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলার কুদরত দেখুন, এই তিনজনকেই তিনি তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী করেন। মুকাবিলায় হযরত হামযা ও আলী (রা) সাফল্যের সঙ্গে বিজয়ী বেশে ও নিরাপদে ফিরে এলেন। আর আবু উবায়দা (রা)-কে আহত অবস্থায় ময়দান থেকে উঠিয়ে আনা হলো।
তিনি যখন (বিদায় হজ্জের খুতবায়) সুদকে হারাম ও জাহিলী যুগের রক্তের বদলাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলেন, তখনও তার সূচনা করলেন তাঁরই শ্রদ্ধেয় চাচা আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব-এর পক্ষ থেকে। বিদায় হজ্জে দেয়া এই খুতবায় তিনি বলেন:
"জাহিলী যুগের সুদ প্রথা আজ থেকে রহিত ও বিলুপ্ত করা হলো এবং প্রথম যে সুদ আমি বিলুপ্ত করছি, তা আমারই আপনজন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। জাহিলী যুগের রক্তের প্রতিশোধও আজ বিলুপ্ত করা হলো আর সে ক্ষেত্রে প্রথম যে রক্তের প্রতিশোধ বিলুপ্ত করা হলো, তা আমাদের রাবীআ ইবনুল হারিছ-এর সন্তানদের রক্ত।
পক্ষান্তরে, আরাম-আয়েশ ও পুরস্কার কিংবা প্রতিদানের প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি সাধারণ রাজা-বাদশাহদের কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের আচরণ ও অভ্যাসের বিপরীতে এই সমস্ত বুযুর্গকে সবসময় পেছনে রেখেছেন এবং এঁদের মুকাবিলায় অন্যদের প্রাধান্য দিয়েছেন। হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু বর্ণনা করেন- গম ভাঙাতে ও যাঁতা ঘুরাতে ফাতেমা (রা)-এর খুবই কষ্ট হত। এ সময় তিনি জানতে পারলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে বেশ কিছু দাসী এসেছে। তিনি পিতার খিদমতে হাযির হলেন এবং তাঁর (ফাতিমার) খিদমতের জন্য, কাজেকর্মে তাকে কিছুটা সাহায্যের জন্য একজন দাসী প্রদানের আবেদন জানালেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সে সময় ঘরে ছিলেন না। তিনি হযরত আয়েশা (রা)-এর খিদমতে এর উল্লেখ করলেন। হযরত আয়েশা (রা) একথা আল্লাহর রাসূলের কানে তুললেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের ঘরে তাশরীফ আনলেন। সে সময় আমরা ঘুমাবার জন্য বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। তাঁকে দেখেই আমরা দাঁড়াতে গেলাম। তিনি আমাদেরকে উঠতে নিষেধ করলেন। তাঁর হাত মুবারকের শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি এ প্রসঙ্গের অবতারণা করে বললেন, "আমি কি তোমদেরাকে এর থেকে উত্তম কথা বলব না- যার আবেদন তুমি করেছিলে? যখন তুমি ঘুমাতে যাও, তখন ৩৩বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪বার আল্লাহু আকবার পড়বে। আমার কাছে তোমরা যা চেয়েছিলে, তার চেয়ে এটি উত্তম।"
অপর এক বর্ণনায় এই ঘটনার সাথে এও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁদেরকে বললেন, "আল্লাহ্র কসম! আহলে সুফফার সদস্যদের ক্ষুধায় পেট যখন পিঠের সাথে লেগে গেছে, তখন (তাদের জন্য একটা ব্যবস্থা না করে) তোমাদের জন্য আমি কিছুই দিতে পারি না। তাদের খরচ চালাবার মতো এ মুহূর্তে আমার কাছে কিছুই নেই। এদের (দাস-দাসীগুলো)-কে বিক্রি করে যা পাওয়া যাবে তা ওদের জন্য ব্যয় করব।'২

টিকাঃ
২. বুখারী, কিতাবুস-সালাত, আহমদ ও আবদুর রাযযাক সূত্রে
৩. মুসান্নিফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ২০৪৯২, ১১শ খণ্ড, পৃঃ ২৬০
৪. ইবনে আসাকির
৫. মুসনাদে আহমদ, আনাস (রা) বর্ণিত; মুসলিম
৬. ইবনে মাজাহ, باب حسن معاشر النساء
১. বুখারী, কিতাবুল আতইমা ও মুসলিম
১. বুখারী, কিতাবুল-জিহাদ
২. আহমাদ, ফাতহুল বারী, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ২৩, ২৪

তিনি তাঁর ঘরে সাধারণ মানুষের মতই থাকতেন। যেমন হযরত আয়েশা (রা) নিজেই বর্ণনা করেছেন: তিনি তাঁর কাপড়-চোপড়ও পরিষ্কার করতেন, তিনি বকরির দুধও নিজ হাতে দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই করতেন। তিনি নিজের কাপড়ে তালি লাগাতেন, জুতা সেলাই করতেন এবং এভাবেই আরও কাজ করতেন।
হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, "তিনি তাঁর ঘরে কিভাবে থাকতেন। জবাবে তিনি বললেন, তিনি ঘরে কাজকর্মের ভেতর থাকতেন। যখন সালাতের ওয়াক্ত হত, তখন সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে চলে যেতেন।"২
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি তাঁর নিজের জুতা মেরামত করে নিতেন, কাপড় সেলাই করতেন যেমন কেউ কেউ নিজেদের বাড়ি-ঘরে করে থাকে।
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, তিনি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কোমল ও সবচেয়ে বেশি মহানুভব ছিলেন। আর হাসির সময় মুচকি হাসি হাসতেন।৪
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, "আমি এমন কাউকে দেখিনি, যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে আপন পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক সদয় ও স্নেহশীল।"৫
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার পরিবার-পরিজনের নিকট সর্বোত্তম এবং আমি আমার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।"৬
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কখনো কোন খাদ্যবস্তুর দোষ খোঁজেন নি। যদি পছন্দ হয়েছে খেয়েছেন, পছন্দ না হলে তা খাননি।'
আপন আহলে বায়ত, পরিবার-পরিজন ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে তাঁর চিরদিনের অভ্যাস ছিল, যে যেই পরিমাণ তাঁর নিকটবর্তী হতো, বিপদাপদ ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে তাকে সেই পরিমাণ সামনে রাখতেন এবং পুরস্কার-পারিতোষিক ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের সময় তাকে সেই পরিমাণ পেছনে রাখতেন। যখন উৎবা, রবীআ, শায়বা ইবন রবীআ ও ওলীদ ইবন উৎবা (যারা ছিল আরবের নামী-দামী বীরপুরুষ ও রণনিপুণ সৈনিক) বদর প্রান্তরে কুরায়শদের পক্ষ থেকে مسلمانوںকে তাদের মুকাবিলায় চ্যালেঞ্জ করল এবং তাদের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বি আহ্বান করল, তখন তিনি আপন চাচা হামযা, চাচাত ভাই আলী ও নিকটাত্মীয় আবু উবায়দা (রা) ডেকে পাঠালেন এবং তাদের মুকাবিলায় প্রেরণ করলেন। অথচ তিনি মক্কায় এসব বাহাদুর সৈনিকের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে ভালোই জানতেন। মুহাজিরদের মধ্যে এমন অনেক বীরপুরুষ ও সাহসী যোদ্ধা ছিলেন- যারা তাদের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে অবতীর্ণ হতে পারতেন। বনু হাশিমের এই তিনজন ছিলেন তাঁরাই- যাঁরা রক্তসম্পর্কের দিক দিয়ে রাসূল (সা)-এর সবচেয়ে নিকটজন ছিলেন, ছিলেন একান্ত প্রিয়জন। কিন্তু তাদেরকে এই বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি অন্যদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেননি, বরং তাঁদেরকেই মুকাবিলার জন্য পাঠিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলার কুদরত দেখুন, এই তিনজনকেই তিনি তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী করেন। মুকাবিলায় হযরত হামযা ও আলী (রা) সাফল্যের সঙ্গে বিজয়ী বেশে ও নিরাপদে ফিরে এলেন। আর আবু উবায়দা (রা)-কে আহত অবস্থায় ময়দান থেকে উঠিয়ে আনা হলো।
তিনি যখন (বিদায় হজ্জের খুতবায়) সুদকে হারাম ও জাহিলী যুগের রক্তের বদলাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলেন, তখনও তার সূচনা করলেন তাঁরই শ্রদ্ধেয় চাচা আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব-এর পক্ষ থেকে। বিদায় হজ্জে দেয়া এই খুতবায় তিনি বলেন:
"জাহিলী যুগের সুদ প্রথা আজ থেকে রহিত ও বিলুপ্ত করা হলো এবং প্রথম যে সুদ আমি বিলুপ্ত করছি, তা আমারই আপনজন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। জাহিলী যুগের রক্তের প্রতিশোধও আজ বিলুপ্ত করা হলো আর সে ক্ষেত্রে প্রথম যে রক্তের প্রতিশোধ বিলুপ্ত করা হলো, তা আমাদের রাবীআ ইবনুল হারিছ-এর সন্তানদের রক্ত।
পক্ষান্তরে, আরাম-আয়েশ ও পুরস্কার কিংবা প্রতিদানের প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি সাধারণ রাজা-বাদশাহদের কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের আচরণ ও অভ্যাসের বিপরীতে এই সমস্ত বুযুর্গকে সবসময় পেছনে রেখেছেন এবং এঁদের মুকাবিলায় অন্যদের প্রাধান্য দিয়েছেন। হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু বর্ণনা করেন- গম ভাঙাতে ও যাঁতা ঘুরাতে ফাতেমা (রা)-এর খুবই কষ্ট হত। এ সময় তিনি জানতে পারলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে বেশ কিছু দাসী এসেছে। তিনি পিতার খিদমতে হাযির হলেন এবং তাঁর (ফাতিমার) খিদমতের জন্য, কাজেকর্মে তাকে কিছুটা সাহায্যের জন্য একজন দাসী প্রদানের আবেদন জানালেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সে সময় ঘরে ছিলেন না। তিনি হযরত আয়েশা (রা)-এর খিদমতে এর উল্লেখ করলেন। হযরত আয়েশা (রা) একথা আল্লাহর রাসূলের কানে তুললেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের ঘরে তাশরীফ আনলেন। সে সময় আমরা ঘুমাবার জন্য বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। তাঁকে দেখেই আমরা দাঁড়াতে গেলাম। তিনি আমাদেরকে উঠতে নিষেধ করলেন। তাঁর হাত মুবারকের শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি এ প্রসঙ্গের অবতারণা করে বললেন, "আমি কি তোমদেরাকে এর থেকে উত্তম কথা বলব না- যার আবেদন তুমি করেছিলে? যখন তুমি ঘুমাতে যাও, তখন ৩৩বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪বার আল্লাহু আকবার পড়বে। আমার কাছে তোমরা যা চেয়েছিলে, তার চেয়ে এটি উত্তম।"
অপর এক বর্ণনায় এই ঘটনার সাথে এও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁদেরকে বললেন, "আল্লাহ্র কসম! আহলে সুফফার সদস্যদের ক্ষুধায় পেট যখন পিঠের সাথে লেগে গেছে, তখন (তাদের জন্য একটা ব্যবস্থা না করে) তোমাদের জন্য আমি কিছুই দিতে পারি না। তাদের খরচ চালাবার মতো এ মুহূর্তে আমার কাছে কিছুই নেই। এদের (দাস-দাসীগুলো)-কে বিক্রি করে যা পাওয়া যাবে তা ওদের জন্য ব্যয় করব।'২

টিকাঃ
২. বুখারী, কিতাবুস-সালাত, আহমদ ও আবদুর রাযযাক সূত্রে
৩. মুসান্নিফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ২০৪৯২, ১১শ খণ্ড, পৃঃ ২৬০
৪. ইবনে আসাকির
৫. মুসনাদে আহমদ, আনাস (রা) বর্ণিত; মুসলিম
৬. ইবনে মাজাহ, باب حسن معاشر النساء
১. বুখারী, কিতাবুল আতইমা ও মুসলিম
১. বুখারী, কিতাবুল-জিহাদ
২. আহমাদ, ফাতহুল বারী, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ২৩, ২৪

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 সূক্ষ্মতর অনুভূতি, আবেগের মর্যাদা ও পবিত্রতা

📄 সূক্ষ্মতর অনুভূতি, আবেগের মর্যাদা ও পবিত্রতা


রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সীরাত তথা জীবনচরিত নবুয়ত ও দাওয়াত-ই হকের মহান দায়িত্ব, মানবতার জন্য দরদ ও মর্মজ্বালা এবং সেই চিন্তা-ভাবনা ও কর্তব্যের তাগিদের সাথে সাথে, পর্বতের পক্ষেও যার ভার বহন করা সহজসাধ্য ছিল না, সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতি পবিত্র ও সমুন্নত আবেগপূর্ণ মাত্রায় বিরাজ করছিল, সেই অস্বাভাবিক ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে- যা আম্বিয়া (আ)-এর চিহ্ন ও বিশেষ চরিত্র হয়ে থাকে এবং যারা দাওয়াত ইলাল্লাহ ও আল্লাহ্র কালামের অতি মর্যাদার পথে এবং তাঁর হুকুম-আহকাম পালন করবার ক্ষেত্রে কোনকিছুকেই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন না এবং কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেন না। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সাথীদেরকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত ভোলেননি- যাঁরা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন এবং সত্যের পথে নিজেদের সবকিছু সোপর্দ করে দিয়েছিলেন, যাঁরা ওহুদ যুদ্ধে শাহাদাত লাভ করে চিরন্তন ও চিরস্থায়ী জীবন লাভ করেছিলেন, তাঁদের কথা তিনি বারবার আলোচনা করেছেন, তাঁদের জন্য দু'আ করেছেন এবং তাঁদের শেষ বিশ্রামস্থলে যিয়ারতে গেছেন।
এই ভালবাসা ও আস্থা মানবীয় দেহ অতিক্রম করে সেইসব নিষ্প্রাণ পাথর, পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকা পর্যন্ত সঞ্চারিত হয়েছিল- যেখানে প্রেম ও বিশ্বস্ততা, কুরবানী ও আত্মোৎসর্গের এই অপূর্ব দৃশ্য বিশাল বিস্তৃত আসমান দেখছিল এবং যেই উপত্যকা ভূমি তাঁদের অবস্থানস্থলে পরিণত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিল। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) একবার ওহুদ পাহাড়কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, هَذَا جَبَلٌ يُحِبُّنَا وَنُحِبُّهُ "এই সেই পাহাড় যে আমাদেরকে ভালবাসে আর আমরাও যাকে ভালবাসি।"১
আবি হুমায়দ (রা) বর্ণনা করেন : "আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলাম। আমরা যখন মদীনার কাছাকাছি এলাম, তখন তিনি বললেন, هَذِهِ طَابَةٌ وَهُذَا جَبَلْ يُحِبُّنَا وَنَحْبُّهُ "এই মদীনা তায়্যিবা আর এই সেই পাহাড় যে আমাদেরকে ভালবাসে এবং আমরা তাকে ভালবাসি।২
উকবা (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন ওহুদের শহীদগণের কবর যিয়ারত করতে গেলেন এবং তাদের জন্য দু'আ ও মাগফিরাত কামনা করলেন।"
জাবির ইবন অবদুল্লাহ (রা) বলেন: আমি দেখলাম, আল্লাহ্র রাসূলের সামনে ওহুদের শহীদদের সম্পর্কে কথা উঠল। তখন তিনি বললেন: "আল্লাহ্র কসম! আমার ইচ্ছা ছিল আমিও যদি ওহুদের শহীদদের সাথে পাহাড়ের কোলে যেতে পারতাম!”
তিনি তাঁর প্রিয়তম চাচা ও দুধভাইয়ের শাহাদাতের বেদনায় ও শোকে (যিনি রাসূলের ভালবাসার টানে ও ইসলামের সাহায্য-সমর্থনে আপন জীবন বিলিয়ে দেন এবং তাঁর লাশ মুবারকের সঙ্গে যেই আচরণ করা হয়েছিল যা আর কারো সাথে করা হয়নি) উলুল-আজম (সুদৃঢ় ধৈর্যের অধিকারী) পয়গাম্বরদের ন্যায় ধৈর্যের সাথে বরদাশত করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ওহুদ থেকে মদীনায় ফিরলেন এবং বনী আবদিল আশহাল-এর ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় শহীদদের জন্য কান্নার আওয়াজ তাঁর কানে ভেসে এল। আর এটাই তাঁর সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতিতে অনুরণ সৃষ্টি করল, তাঁর চোখকে করে তুলল অশ্রুসিক্ত। তিনি বললেন, لَكِنَّ حَمْزَةَ لَا بَوَاتِيَ لَهُ “কিন্তু হামযার জন্য কোন ক্রন্দনকারী নেই।”১
তথাপি এই অভিজাত ও উন্নত মানবীয় আবেগ-অনুভূতি, নবুওয়াত ও ইসলামের দাওয়াতের মহান যিম্মাদারী, আল্লাহ্র সীমারেখা হিফাযতের ব্যাপারে কোনরূপ প্রভাব-প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করতে পারেনি। সীরাত তথা জীবনচরিতকার ও ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেন, সা'দ ইবন মু'আয ও উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) যখন বনী আব্দুল আশহাল-এর ঘরে ফিরে এলেন, তখন তারা নিজেদের ঘরের মহিলাদের তৈরি হওয়ার জন্য হুকুম দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ঘরে গিয়ে তাঁর চাচা সায়্যিদুনা হামযা (রা)-এর শাহাদাতে শোক প্রকাশের জন্য বললেন। মহিলারা তাই করল। রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে ফিরে মহিলাদেরকে মসজিদে নববীর দরজায় কান্নারত দেখতে পেলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, "আল্লাহ্ তোমাদের উপর রহম করুন। তোমরা যে যার ঘরে ফিরে যাও। তোমাদের এখানে আসাটাই শোক প্রকাশের সমান হয়ে গেছে।"
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এসব কী হচ্ছে?” তাঁকে বলা হলো, আনসাররা তাদের মহিলাদেরকে কোন উদ্দেশ্যে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহ্র কাছে মাফ চাইলেন এবং ভালভাবে ভদ্র ভাষায় সম্বোধন করে তাদেরকে বললেন, "আমার উদ্দেশ্য তা ছিল না যা তোমরা করছ, মৃতের জন্য কান্নাকাটি করা আমি পছন্দ করি না।" এরপর তিনি তাদেরকে মাতম করতে নিষেধ করলেন।'
এর থেকেও নাজুক মুহূর্ত দেখা দিয়েছিল আল্লাহ্র সিংহ সায়্যিদুনা হযরত হামযা (রা)-এর ঘাতক ওয়াহশীর ক্ষেত্রে। মুসলমানরা মক্কা জয় করলেন। ওয়াহশীর কাছে তখন গোটা পৃথিবী ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায় এবং সকল পথই সে অবরুদ্ধ দেখতে পায়। তার জন্য কুদরতীভাবেই সমস্যা সৃষ্টি হয়। সে সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে লুকাবার ইচ্ছা করে কিন্তু লোকে তাকে বলল, "আরে ভালো মানুষ! আল্লাহ্র রাসূল (সা) এমন কাউকেই হত্যা করেন না, যে তাঁর ধর্মে দাখিল হয় অর্থাৎ তিনি কোন মুসলমানকেই হত্যা করেন না।” বিষয়টা এবার সে বুঝতে পারলো এবং সাথে সাথে কালেমা শাহাদাত পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেল। মুসলমান হওয়ার পর সে যখন প্রথমবারের মত রাসূল পাক (সা)-এর দরবারে হাযির হলো, তখন তিনি তার ইসলাম গ্রহণকে কবুল করলেন এবং এমন কোন কথা বললেন না, যা তার মনে ভীতির সঞ্চার হতে পারে। এরপর তিনি তার থেকে হযরত হামযা (রা)-এর শাহাদতের বিবরণ শুনলেন অর্থাৎ হামযা (রা)-কে কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বিবরণ পেশ করতে তার ভিতর সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতি ও অবস্থা অবশ্যই সৃষ্টি হয়ে থাকবে। কিন্তু এই বিশেষ অবস্থা তাঁর নববী মেজাজ ও দায়িত্ববোধের উপর প্রাধান্য পায়নি- তিনি তার ইসলাম গ্রহণ মেনে নেবেন না, কিংবা ক্রোধের বশে তাকে হত্যাই করবেন (না, এমনটি হয়নি, হতে পারে না)। কেবল তাকে এটুকু বললেন, "আল্লাহ্র বান্দা! তুমি আমার সামনে এসো না। আমি চাই তুমি যেন আমার সামনে না পড়!" ওয়াহশী বললেন, এরপর থেকে আমি তাঁর সামনে যেতে চাইতাম না যাতে আমার উপর তাঁর চোখ পড়ে যায়। আর এভাবেই তাঁর নির্ধারিত ও প্রতিশ্রুত সময় এসে যায়।২
বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে: আমার উপর যখন তাঁর চোখ পড়ল, তখন তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি ওয়াহশী? আমি বললাম। হ্যাঁ (আমি ওয়াহশী)।
তিনি বললেন, "তাহলে তুমিই হামযাকে শহীদ করেছিলে?" আমি বললাম, "আপনি যা জেনেছেন তা সত্য।" তিনি বললেন, "তুমি কি এতটুকু করতে পার, তুমি আর আমার সামনে আসবে না?"৩
এই প্রকৃতিগত ও মানবীয় অবস্থা ও অনুভূতি এবং উন্নত ও সূক্ষ্ম আবেগের ঝলক আমরা সেখানেও দেখতে পাই। যখন তিনি মাটিতে মিশে যাওয়া একটি পুরনো কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন তখন নিজেকে আর স্থির রাখতে না পেরে কেঁদে ফেললেন। এরপর তিনি বললেন: "এ (আমার মা) আমিনার কবর।” এ ছিল তখনকার কথা যখন তাঁর (মা আমিনার) ইন্তেকালের পর বহুদিন গত হয়েছে।

টিকাঃ
১. বুখারী
২. প্রাগুক্ত
১. ইবন কাছীর, ৩য় খণ্ড, ৯৫; ইমাম আহমাদ এই হাদীস ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।
১. প্রাগুক্ত, পৃঃ ৯২
২. ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭২
৩. বুখারী, কিতাবুল মাগাযী

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সীরাত তথা জীবনচরিত নবুয়ত ও দাওয়াত-ই হকের মহান দায়িত্ব, মানবতার জন্য দরদ ও মর্মজ্বালা এবং সেই চিন্তা-ভাবনা ও কর্তব্যের তাগিদের সাথে সাথে, পর্বতের পক্ষেও যার ভার বহন করা সহজসাধ্য ছিল না, সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতি পবিত্র ও সমুন্নত আবেগপূর্ণ মাত্রায় বিরাজ করছিল, সেই অস্বাভাবিক ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে- যা আম্বিয়া (আ)-এর চিহ্ন ও বিশেষ চরিত্র হয়ে থাকে এবং যারা দাওয়াত ইলাল্লাহ ও আল্লাহ্র কালামের অতি মর্যাদার পথে এবং তাঁর হুকুম-আহকাম পালন করবার ক্ষেত্রে কোনকিছুকেই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন না এবং কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেন না। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সাথীদেরকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত ভোলেননি- যাঁরা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন এবং সত্যের পথে নিজেদের সবকিছু সোপর্দ করে দিয়েছিলেন, যাঁরা ওহুদ যুদ্ধে শাহাদাত লাভ করে চিরন্তন ও চিরস্থায়ী জীবন লাভ করেছিলেন, তাঁদের কথা তিনি বারবার আলোচনা করেছেন, তাঁদের জন্য দু'আ করেছেন এবং তাঁদের শেষ বিশ্রামস্থলে যিয়ারতে গেছেন।
এই ভালবাসা ও আস্থা মানবীয় দেহ অতিক্রম করে সেইসব নিষ্প্রাণ পাথর, পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকা পর্যন্ত সঞ্চারিত হয়েছিল- যেখানে প্রেম ও বিশ্বস্ততা, কুরবানী ও আত্মোৎসর্গের এই অপূর্ব দৃশ্য বিশাল বিস্তৃত আসমান দেখছিল এবং যেই উপত্যকা ভূমি তাঁদের অবস্থানস্থলে পরিণত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিল। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) একবার ওহুদ পাহাড়কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, هَذَا جَبَلٌ يُحِبُّنَا وَنُحِبُّهُ "এই সেই পাহাড় যে আমাদেরকে ভালবাসে আর আমরাও যাকে ভালবাসি।"১
আবি হুমায়দ (রা) বর্ণনা করেন : "আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলাম। আমরা যখন মদীনার কাছাকাছি এলাম, তখন তিনি বললেন, هَذِهِ طَابَةٌ وَهُذَا جَبَلْ يُحِبُّنَا وَنَحْبُّهُ "এই মদীনা তায়্যিবা আর এই সেই পাহাড় যে আমাদেরকে ভালবাসে এবং আমরা তাকে ভালবাসি।২
উকবা (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন ওহুদের শহীদগণের কবর যিয়ারত করতে গেলেন এবং তাদের জন্য দু'আ ও মাগফিরাত কামনা করলেন।"
জাবির ইবন অবদুল্লাহ (রা) বলেন: আমি দেখলাম, আল্লাহ্র রাসূলের সামনে ওহুদের শহীদদের সম্পর্কে কথা উঠল। তখন তিনি বললেন: "আল্লাহ্র কসম! আমার ইচ্ছা ছিল আমিও যদি ওহুদের শহীদদের সাথে পাহাড়ের কোলে যেতে পারতাম!”
তিনি তাঁর প্রিয়তম চাচা ও দুধভাইয়ের শাহাদাতের বেদনায় ও শোকে (যিনি রাসূলের ভালবাসার টানে ও ইসলামের সাহায্য-সমর্থনে আপন জীবন বিলিয়ে দেন এবং তাঁর লাশ মুবারকের সঙ্গে যেই আচরণ করা হয়েছিল যা আর কারো সাথে করা হয়নি) উলুল-আজম (সুদৃঢ় ধৈর্যের অধিকারী) পয়গাম্বরদের ন্যায় ধৈর্যের সাথে বরদাশত করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ওহুদ থেকে মদীনায় ফিরলেন এবং বনী আবদিল আশহাল-এর ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় শহীদদের জন্য কান্নার আওয়াজ তাঁর কানে ভেসে এল। আর এটাই তাঁর সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতিতে অনুরণ সৃষ্টি করল, তাঁর চোখকে করে তুলল অশ্রুসিক্ত। তিনি বললেন, لَكِنَّ حَمْزَةَ لَا بَوَاتِيَ لَهُ “কিন্তু হামযার জন্য কোন ক্রন্দনকারী নেই।”১
তথাপি এই অভিজাত ও উন্নত মানবীয় আবেগ-অনুভূতি, নবুওয়াত ও ইসলামের দাওয়াতের মহান যিম্মাদারী, আল্লাহ্র সীমারেখা হিফাযতের ব্যাপারে কোনরূপ প্রভাব-প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করতে পারেনি। সীরাত তথা জীবনচরিতকার ও ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেন, সা'দ ইবন মু'আয ও উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) যখন বনী আব্দুল আশহাল-এর ঘরে ফিরে এলেন, তখন তারা নিজেদের ঘরের মহিলাদের তৈরি হওয়ার জন্য হুকুম দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ঘরে গিয়ে তাঁর চাচা সায়্যিদুনা হামযা (রা)-এর শাহাদাতে শোক প্রকাশের জন্য বললেন। মহিলারা তাই করল। রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে ফিরে মহিলাদেরকে মসজিদে নববীর দরজায় কান্নারত দেখতে পেলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, "আল্লাহ্ তোমাদের উপর রহম করুন। তোমরা যে যার ঘরে ফিরে যাও। তোমাদের এখানে আসাটাই শোক প্রকাশের সমান হয়ে গেছে।"
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এসব কী হচ্ছে?” তাঁকে বলা হলো, আনসাররা তাদের মহিলাদেরকে কোন উদ্দেশ্যে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহ্র কাছে মাফ চাইলেন এবং ভালভাবে ভদ্র ভাষায় সম্বোধন করে তাদেরকে বললেন, "আমার উদ্দেশ্য তা ছিল না যা তোমরা করছ, মৃতের জন্য কান্নাকাটি করা আমি পছন্দ করি না।" এরপর তিনি তাদেরকে মাতম করতে নিষেধ করলেন।'
এর থেকেও নাজুক মুহূর্ত দেখা দিয়েছিল আল্লাহ্র সিংহ সায়্যিদুনা হযরত হামযা (রা)-এর ঘাতক ওয়াহশীর ক্ষেত্রে। মুসলমানরা মক্কা জয় করলেন। ওয়াহশীর কাছে তখন গোটা পৃথিবী ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায় এবং সকল পথই সে অবরুদ্ধ দেখতে পায়। তার জন্য কুদরতীভাবেই সমস্যা সৃষ্টি হয়। সে সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে লুকাবার ইচ্ছা করে কিন্তু লোকে তাকে বলল, "আরে ভালো মানুষ! আল্লাহ্র রাসূল (সা) এমন কাউকেই হত্যা করেন না, যে তাঁর ধর্মে দাখিল হয় অর্থাৎ তিনি কোন মুসলমানকেই হত্যা করেন না।” বিষয়টা এবার সে বুঝতে পারলো এবং সাথে সাথে কালেমা শাহাদাত পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেল। মুসলমান হওয়ার পর সে যখন প্রথমবারের মত রাসূল পাক (সা)-এর দরবারে হাযির হলো, তখন তিনি তার ইসলাম গ্রহণকে কবুল করলেন এবং এমন কোন কথা বললেন না, যা তার মনে ভীতির সঞ্চার হতে পারে। এরপর তিনি তার থেকে হযরত হামযা (রা)-এর শাহাদতের বিবরণ শুনলেন অর্থাৎ হামযা (রা)-কে কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বিবরণ পেশ করতে তার ভিতর সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতি ও অবস্থা অবশ্যই সৃষ্টি হয়ে থাকবে। কিন্তু এই বিশেষ অবস্থা তাঁর নববী মেজাজ ও দায়িত্ববোধের উপর প্রাধান্য পায়নি- তিনি তার ইসলাম গ্রহণ মেনে নেবেন না, কিংবা ক্রোধের বশে তাকে হত্যাই করবেন (না, এমনটি হয়নি, হতে পারে না)। কেবল তাকে এটুকু বললেন, "আল্লাহ্র বান্দা! তুমি আমার সামনে এসো না। আমি চাই তুমি যেন আমার সামনে না পড়!" ওয়াহশী বললেন, এরপর থেকে আমি তাঁর সামনে যেতে চাইতাম না যাতে আমার উপর তাঁর চোখ পড়ে যায়। আর এভাবেই তাঁর নির্ধারিত ও প্রতিশ্রুত সময় এসে যায়।২
বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে: আমার উপর যখন তাঁর চোখ পড়ল, তখন তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি ওয়াহশী? আমি বললাম। হ্যাঁ (আমি ওয়াহশী)।
তিনি বললেন, "তাহলে তুমিই হামযাকে শহীদ করেছিলে?" আমি বললাম, "আপনি যা জেনেছেন তা সত্য।" তিনি বললেন, "তুমি কি এতটুকু করতে পার, তুমি আর আমার সামনে আসবে না?"৩
এই প্রকৃতিগত ও মানবীয় অবস্থা ও অনুভূতি এবং উন্নত ও সূক্ষ্ম আবেগের ঝলক আমরা সেখানেও দেখতে পাই। যখন তিনি মাটিতে মিশে যাওয়া একটি পুরনো কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন তখন নিজেকে আর স্থির রাখতে না পেরে কেঁদে ফেললেন। এরপর তিনি বললেন: "এ (আমার মা) আমিনার কবর।” এ ছিল তখনকার কথা যখন তাঁর (মা আমিনার) ইন্তেকালের পর বহুদিন গত হয়েছে।

টিকাঃ
১. বুখারী
২. প্রাগুক্ত
১. ইবন কাছীর, ৩য় খণ্ড, ৯৫; ইমাম আহমাদ এই হাদীস ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।
১. প্রাগুক্ত, পৃঃ ৯২
২. ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭২
৩. বুখারী, কিতাবুল মাগাযী

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00