📄 রাসূলুল্লাহ (সা) কেমন ছিলেন
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উন্নত চরিত্র ও ব্যবহার, মহান গুণাবলী ও আচার- অভ্যাস সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা (রা)-এর সন্তান এবং হযরত হাসান ও হুসায়নের মামা হিন্দ ইবন আবী হালা (রা) খুবই ব্যাপক ও বাগ্মিতাপূর্ণ ভাষায় বর্ণনা দান করেছেন। তিনি বলেন : “রাসূলুল্লাহ (সা) সবসময় আখিরাতের চিন্তায় ও পারলৌকিক বিষয় নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকতেন। এক্ষেত্রে তাঁর একটি ধারাবাহিকতা ছিল। এ চিন্তা তাঁকে সবসময় অস্থির করে রাখত। অধিকাংশ সময় তিনি দীর্ঘ নীরবতা পালন করতেন, বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না। কথা বলতে শুরু করলে বেশ ভালভাবে উচ্চারণ করতেন' এবং সেভাবেই শেষ করতেন। তাঁর আলোচনা ও বর্ণনা খুব পরিষ্কার, স্পষ্ট ও দু'রকম অর্থ থেকে মুক্ত হতো। কথা অনাবশ্যক- ভাবে যেমন দীর্ঘ হতো না, তেমনি তা খুব সংক্ষিপ্তও হতো না (বরং পরিমাণ মতো হতো)। তিনি নরম মেজাজের ও নম্রভাষী ছিলেন, কর্কশ ও রূঢ়ভাষী ছিলেন না।
তিনি কাউকে যেমন ঘৃণা কিংবা অবজ্ঞা করতেন না, তেমনি কেউ তাঁকে অবজ্ঞা বা ঘৃণা করুক তাও পছন্দ করতেন না। অর্থাৎ তিনি দুর্বল প্রকৃতির লোক ছিলেন না যে, সবকিছুই মেনে নেবেন, বরং প্রভাবশালী মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। নিয়ামতের বিরাট কদর করতেন এবং খুব বেশি মনে করতেন, পরিমাণে তা যত অল্পই হোক না কেন, এমনকি তা চোখে না পড়ার মত বিষয়ও যদি হয়, এবং এর ত্রুটি বা খুঁত ধরতেন না। খানাপিনার বস্তুর দোষ ধরতেন না যেমন, তেমনি প্রশংসাও করতেন না। পার্থিব ও পার্থিব বিষয় সম্পর্কিত কোন বিষয়ের উপর রাগান্বিত হতেন না। কিন্তু আল্লাহ্ কোন হক নষ্ট হতে দেখলে সে সময় তাঁর জালালী তথা তেজস্বিতার সামনে কোন কিছুই দাঁড়াতে পারত না, যতক্ষণ না তিনি এর বদলা নিতেন।
তিনি নিজের ব্যাপারে কখনও ক্রুদ্ধ হননি এবং কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। ইশারা করতে হলে গোটা হাত দ্বারা ইশারা করবেন। কোন বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে হলে একে উল্টে দিতেন। কথা বলার সময় ডান হাতের তালুকে বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুলের সাথে মিলাতেন। রাগের কিংবা অপছন্দনীয় কথা হলে শ্রোতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। খুশি হলে চোখ নামিয়ে ফেলতেন। তাঁর হাসি বেশির ভাগ সময় মুচকি হাসি হতো- যার ফলে বৃষ্টিস্নাত মেঘের আড়াল থেকে সূর্য উঁকি দেবার মত উজ্জ্বল শুভ্র দাঁতগুলো দেখা যেত।”
হযরত আলী (রা) ছিলেন তাঁর খান্দানেরই লোক। তিনি লেখাপড়া ও জানাশোনার ব্যাপক সুযোগ পেয়েছিলেন এবং যার দৃষ্টি মানুষের মনস্তত্ত্ব ও চরিত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলোর গভীরে প্রবেশ করেছিল। তিনি ছিলেন নবীজীর (সা) একান্ত নিকটজন ও কাছের মানুষ। একই সাথে মানুষের গুণাবলী প্রকাশে ও দৃশ্য বর্ণনায় তিনি ছিলেন সবচেয়ে দক্ষ। তাঁর মহান চরিত্র (خُلْقٍ عَظِيمٌ) সম্পর্কে তিনি বলেন:
"তিনি স্বভাবগতভাবেই খারাপ কথা বলা, নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা থেকে দূরে অবস্থান করতেন এবং অনিচ্ছাকৃতভাবেও এমন কোনও বিষয় তাঁর থেকে প্রকাশ পেত না। বাজারে তিনি কখনও উচ্চস্বরে কথা বলেননি। মন্দের বদলা কখনো মন্দের দ্বারা নিতেন না, বরং ক্ষমা করতেন। তিনি কখনো কারো উপর হাত তোলেননি। একমাত্র 'জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ' ছাড়া। কখনো কোন খাদেম কিংবা মহিলার উপর হাত তোলেননি। কোন প্রকার জুলুম কিংবা বাড়াবাড়ির প্রতিশোধ নিতে তাঁকে কেউ কখনো দেখেনি- যতক্ষণ না কেউ আল্লাহ্ নির্ধারিত হুদূদ বা সীমারেখা অতিক্রম করত এবং তাঁর সম্মান ও মর্যাদার উপর আঁচ পড়ত। তবে হ্যাঁ, আল্লাহ্ তা'আলার কোন হুকুম নষ্ট করা হলে এবং তাঁর মর্যাদার উপর আঘাত এলে তিনি এর জন্য সবচেয়ে বেশি রাগান্বিত হতেন। দু'টি জিনিস সামনে এলে সহজতরটিকে বেছে নিতেন। যখন নিজের ঘরে তাশরীফ নিতেন, তখন সাধারণ মানুষের মতই দেখা যেত। নিজেই কাপড় পরিষ্কার করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন এবং নিজের সকল প্রয়োজন নিজেই আঞ্জাম দিতেন।
নিজের যবান হিফাযত করতেন। কেবল তখনই মুখ খুলতেন, যখন এর প্রয়োজন দেখা দিত। লোকের মন জয় করতেন, তাদের মনকে ঘৃণাসিক্ত করতেন না। কোন সম্প্রদায় কিংবা জাতি-গোষ্ঠীর সম্মানিত লোকের আগমন ঘটলে, তিনি তার সঙ্গে সম্মান ও মর্যাদামণ্ডিত আচরণ করতেন এবং তাঁকে তাঁর জাতীয় আমির বানিয়ে দিতেন। লোকের সম্পর্কে সতর্ক ও পরিমিত মন্তব্য করতেন আপন হৃদ্যতা ও আখলাক দ্বারা মাহরوم না করেই। আপন সঙ্গী-সাথীদের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন।
তিনি ভাল কথার ভাল দিক বর্ণনা করতেন এবং একে শক্তি জোগাতেন মন্দ কথার অনিষ্টকর দিক বলে দিতেন এবং একে দুর্বল করে দিতেন। তাঁর ব্যাপারগুলো ছিল ভারসাম্যময় ও একই রূপ। এক্ষেত্রে, কোনরূপ পরিবর্তন হতো না। কোনকিছুর প্রতি অলসতা কিংবা অবহেলা প্রদর্শন করতেন না এই ভয়ে যে, না জানি অন্যেরাও এই অলসতার শিকার হয়ে পড়ে এবং বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে। প্রতিটি অবস্থা ও প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্যই তাঁর নিকট সেই অবস্থামাফিক প্রয়োজনীয় সামান ছিল। সত্যের ব্যাপারে তিনি কোনরূপ কার্পণ্যের প্রশ্রয় দিতেন না, আবার সীমা অতিক্রমও করতেন না। যেসব লোক তাঁর কাছাকাছি থাকতেন, তাঁরা হতেন সবচেয়ে ভাল ও নির্বাচিত লোক। তাঁর চোখে সর্বোত্তম লোক তিনি ছিলেন- যিনি সকলের মঙ্গলকামী এবং যাঁর ব্যবহার ভাল।
তার নিকট সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যদার অধিকারী ছিলেন তিনি- যিনি মানুষের শোকে সান্ত্বনাদানকারী, সহানুভূতিশীল এবং যিনি অপরের সাহায্য-সহযোগিতায় সকলের আগে থাকেন। আল্লাহ্র যিকির করতে করতে তিনি দাঁড়াতেন এবং আল্লাহ্র যিকির করতে করতে বসতেন। তিনি কোথাও তাশরীফ নিলে যেখানে মজলিস সমাপ্ত হত, সেখানেই অবস্থান করতেন এজন্য আদেশও করতেন। মজলিসে উপস্থিত সবার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতেন এবং সকলের দিকে লক্ষ্য রাখতেন। উপস্থিত সকলে মনে করতেন হযরত (সা)-এর চোখে তার চেয়ে বেশি আপন বুঝি আর কেউ নন। যদি কেউ কোন বিশেষ প্রয়োজন বা উদ্দেশ্যে রাসূল (সা)-কে বসাতেন কিংবা কোন প্রয়োজনে কথা বলতেন, তবে তিনি পরিপূর্ণ ধৈর্য্য এবং প্রশান্তির সঙ্গে তার সকল কথা শুনতেন যতক্ষণ না সে তার কথা শেষ করে নিজে থেকে বিদায় নিত। যদি কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইতো, সাহায্য কামনা করত, তবে তিনি তার প্রয়োজন পূরণ না করে ফিরিয়ে দিতেন না, কিছু দিতে না পারলেও কমপক্ষে তাকে মিষ্টি ও কোমল ভাষায় জবাব দিতেন। তাঁর উত্তম ব্যবহার সবার জন্যই উন্মুক্ত ছিল এবং তিনি তাদের জন্য পিতার ভূমিকা পালন করতেন। সকল শ্রেণীর ও সকল স্তরের লোক সত্যের মাপকাঠিতে তাঁর চোখে ছিল সমান।
তাঁর মজলিস ইলম ও মা'রেফাত, লজ্জা-শরম, ধৈর্য্য ও আমানতদারীর মজলিস ছিল। এ মজলিসে কেউ উচ্চকণ্ঠে কথা বলত না, কারো দোষ-ত্রুটির চর্চা কিংবা চরিত্র হননও করা হত না এ মজলিসে। কারো সম্মান ও মর্যাদার উপর আঘাত হানা হতো না কিংবা কারো চারিত্রিক দুর্বলতাকে ঢোল পিটিয়ে প্রচারও করা হতো না। সকলেই ছিল সমান, কারো উপর কারো মর্যাদা থাকলে, তা একমাত্র তাকওয়ার ভিত্তিতেই ছিল। ছোটরা বড়দের সম্মান করত আর বড়রা ছোটদের করতেন স্নেহ ও মায়া। অভাবী ও দুঃস্থ লোকদেরকে নিজের উপর প্রাধান্য দিতেন। মুসাফির ও নবাগতকে হিফাযত করতেন এবং তাদের প্রতি খেয়াল রাখতেন।"
হযরত আলী (রা) আরো বলেন: "তিনি সব সময় হাসিখুশি ও প্রফুল্ল থাকতেন। তিনি ছিলেন কোমল চরিত্রের ও নরম দিলের মানুষ। তিনি কঠোর প্রকৃতির লোক ছিলেন না, রূঢ় ও কঠোর ভাষায় কথা বলায় অভ্যস্ত ছিলেন না, মানুষের উপর খুব সত্ত্বর সদয় হয়ে যেতেন, খুব তাড়াতাড়ি মানুষকে ক্ষমা করে দিতেন, কারো সঙ্গে বাগড়া করতেন না, বরং পরিপূর্ণ ভাব-গম্ভীর, শান্ত ও ধীরস্থির মেজাজের ছিলেন। তিনি চেঁচিয়ে কথা বলতেন না, কোনো ধরনের ফালতু কথা বলতেন না আর নিম্নমানের কথাও বলতেন না, কারো উপর দোষ চাপাতেন না, সংকীর্ণ চিত্ত ও কৃপণ ছিলেন না। যে কথা তাঁর পছন্দ হত না, তা তিনি উপেক্ষা করতেন, তা ধর্তব্যের মধ্যে আনতেন না, স্পষ্টভাবে সে সম্পর্কে হতাশা প্রকাশ করতেন না এবং এর জওয়াবও দিতেন না।
"তিনটি জিনিসের স্পর্শ থেকে তিনি নিজকে সম্পূর্ণ বাঁচিয়ে রাখতেন- ১। ঝগড়া, ২। অহংকার ও ৩। অনর্থক কথা ও কাজ। লোকদেরকেও তিনটি জিনিসের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন ১। কারো ওপর দোষ চাপাতেন না, ২। কারো দুর্বল ও গোপনীয় বিষয়ের অনুসন্ধান করে বেড়াতেন না এবং ৩। কেবল সে কথাই বলতেন- যে কথাতে সওয়াবের আশা করা যেত। যখন কথা বলতেন, মজলিসে উপস্থিত লোকেরা সম্মানার্থে এমনভাবে মস্তক অবনত করে ফেলতেন যেন মনে হত বুঝি সকলের মাথার উপর পাখি বসে আছে, না জানি নড়াচড়াতেও তা উড়ে যায়। যখন তিনি চুপ করতেন, তখন তারা কথা বলতেন। তাঁর সামনে তারা কখনো ঝগড়ায় লিপ্ত হতেন না। যদি তাঁর মজলিসে কেউ কথা বলতেন, তখন আর সব লোক চুপ করে ঐ ব্যক্তির কথা শুনতেন, যতক্ষণ না তিনি তার কথা শেষ করতেন।
রাসূল (সা)-এর সামনে প্রত্যেক লোকের কথা বলার অধিকার ঠিক ততটুকুই থাকত, যতটুকু থাকত তার পূর্ববর্তী লোকের যাতে সে পূর্ণ সন্তুষ্টি সহকারে তার কথা বলার সুযোগ পায় এবং ঠিক তেমনি সম্মান ও প্রশান্তির সঙ্গে তা শোনা হতো। যে কথায় সকলে হাসত, তিনিও তাতে হাসতেন। যে কথায় লোকে বিস্ময় প্রকাশ করত, তিনিও তাতে বিস্ময় প্রকাশ করতেন। মুসাফির ও পরদেশীর বেআদবী তিনি সইতেন এবং সর্বপ্রকার দাবী, ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে শুনতেন। সাহাবায়ে কিরাম (রা) এ ধরনের লোকদের মনোযোগ নিজেদের দিকে টেনে নিতেন যাতে রাসূল (সা)-এর ওপর তা বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। তিনি বলতেন: তোমরা অভাবী ও প্রয়োজন মুখাপেক্ষী লোক পেলে তাদের সাহায্য করবে। তিনি সেইসব লোকের প্রশংসা ও স্তুতি কবুল করতেন- যারা সীমার ভেতর অবস্থান করত। কারো কথা বলার সময় তিনি কথা বলতেন না, তার কথা মাঝপথে থামিয়েও দিতেন না। তবে হ্যাঁ, সীমা অতিক্রম করলে তাকে নিষেধ করতেন এবং মজলিস থেকে উঠে গিয়ে তার কথা থামিয়ে দিতেন।
তিনি সবচেয়ে উদার মন ও প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন; স্পষ্টভাষী, কোমল প্রকৃতিবিশিষ্ট এবং সামাজিক, পারস্পরিক লেনদেনের ব্যাপারে বদান্য ছিলেন। যে তাঁকে প্রথম দেখত, সে-ই ভীত ও কম্পিত হয়ে পড়ত। কিন্তু তাঁর সাহচর্যে থাকলে ও জানাশোনা হলে মুগ্ধ, আকৃষ্ট ও অভিভূত হতো এবং যেই তাঁকে দেখত, সেই বলত, তাঁর মত আর কাউকে আগে যেমন দেখিনি, তেমনি দেখিনি এরপরও অন্য কাউকে। আমাদের নবী (সা)-এর উপর আল্লাহ্র রহমত ও অনুগ্রহরাশি বর্ষিত হোক।"১
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতার পোশাকে মণ্ডিত ও সজ্জিত করেছিলেন এবং তাঁকে ভালবাসা ও আকর্ষণ, ভীতিকর প্রভাব ও ব্যক্তিত্বের এক অপূর্ব প্রতিমূর্তি বানিয়েছিলেন। হিন্দ ইবন আবী হালা (রা) বলেন:
"তিনি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও শান-শওকতের অধিকারী ছিলেন এবং অন্যের দৃষ্টিতেও খুবই মর্যাদাবান ছিলেন। তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল পূর্ণিমা রাতের চাঁদের মতই জ্বলজ্বল করত।”২
হযরত বারা' ইবন আযিব (রা) বলেন: "আল্লাহ্র রাসূল (সা) মধ্যম আকৃতির ছিলেন, না বেশি লম্বা, না বেশি বেঁটে। আমি একবার তাঁকে লাল কুবা পরিহিত অবস্থায় দেখেছিলাম। এর থেকে ভাল কোন জিনিস আমি কখনো দেখিনি।"'
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন: "তিনি মধ্যম আকৃতির ছিলেন, বরং এর থেকে কিছুটা লম্বা। তিনি ছিলেন গৌরবর্ণের, ঘন কৃষ্ণ শ্মশ্রু, মুখমণ্ডল অত্যন্ত মানানসই ও সুন্দর, দীর্ঘ চোখের পলক ও চওড়া কাঁধের অধিকারী। শেষে তিনি বলেন, তাঁর মত আর কাউকে এর আগেও যেমনি দেখিনি, তেমনি দেখিনি পরেও।"২
হযরত আনাস (রা) বলেন: "আমি রেশম ও রেশমী কিংখাবও তাঁর হাতের মত নরম পাইনি এবং তাঁর (শরীরের) খোশবু থেকে অধিকতর খোশবুও আমি আর শুঁকিনি।"°
টিকাঃ
১. অর্থাৎ অহংকারীর মত বেপরোয়া ও উদ্ধত ভঙ্গিতে কাঠখোট্টা কথা বলতেন না।
১. শামাইলে তিরমিযী থেকে উদ্ধৃত
২. প্রাগুক্ত, হিন্দ ইবন আবী হালা (রা)-এর সূত্রে হাসান (রা) কর্তৃক বর্ণিত
১. বুখারী-মুসলিম
২. আল-আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারীকৃত
৩. বুখারী ও মুসলিম; বুখারী, কিতাবুল মানাকিব
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উন্নত চরিত্র ও ব্যবহার, মহান গুণাবলী ও আচার- অভ্যাস সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা (রা)-এর সন্তান এবং হযরত হাসান ও হুসায়নের মামা হিন্দ ইবন আবী হালা (রা) খুবই ব্যাপক ও বাগ্মিতাপূর্ণ ভাষায় বর্ণনা দান করেছেন। তিনি বলেন : “রাসূলুল্লাহ (সা) সবসময় আখিরাতের চিন্তায় ও পারলৌকিক বিষয় নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকতেন। এক্ষেত্রে তাঁর একটি ধারাবাহিকতা ছিল। এ চিন্তা তাঁকে সবসময় অস্থির করে রাখত। অধিকাংশ সময় তিনি দীর্ঘ নীরবতা পালন করতেন, বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না। কথা বলতে শুরু করলে বেশ ভালভাবে উচ্চারণ করতেন' এবং সেভাবেই শেষ করতেন। তাঁর আলোচনা ও বর্ণনা খুব পরিষ্কার, স্পষ্ট ও দু'রকম অর্থ থেকে মুক্ত হতো। কথা অনাবশ্যক- ভাবে যেমন দীর্ঘ হতো না, তেমনি তা খুব সংক্ষিপ্তও হতো না (বরং পরিমাণ মতো হতো)। তিনি নরম মেজাজের ও নম্রভাষী ছিলেন, কর্কশ ও রূঢ়ভাষী ছিলেন না।
তিনি কাউকে যেমন ঘৃণা কিংবা অবজ্ঞা করতেন না, তেমনি কেউ তাঁকে অবজ্ঞা বা ঘৃণা করুক তাও পছন্দ করতেন না। অর্থাৎ তিনি দুর্বল প্রকৃতির লোক ছিলেন না যে, সবকিছুই মেনে নেবেন, বরং প্রভাবশালী মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। নিয়ামতের বিরাট কদর করতেন এবং খুব বেশি মনে করতেন, পরিমাণে তা যত অল্পই হোক না কেন, এমনকি তা চোখে না পড়ার মত বিষয়ও যদি হয়, এবং এর ত্রুটি বা খুঁত ধরতেন না। খানাপিনার বস্তুর দোষ ধরতেন না যেমন, তেমনি প্রশংসাও করতেন না। পার্থিব ও পার্থিব বিষয় সম্পর্কিত কোন বিষয়ের উপর রাগান্বিত হতেন না। কিন্তু আল্লাহ্ কোন হক নষ্ট হতে দেখলে সে সময় তাঁর জালালী তথা তেজস্বিতার সামনে কোন কিছুই দাঁড়াতে পারত না, যতক্ষণ না তিনি এর বদলা নিতেন।
তিনি নিজের ব্যাপারে কখনও ক্রুদ্ধ হননি এবং কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। ইশারা করতে হলে গোটা হাত দ্বারা ইশারা করবেন। কোন বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে হলে একে উল্টে দিতেন। কথা বলার সময় ডান হাতের তালুকে বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুলের সাথে মিলাতেন। রাগের কিংবা অপছন্দনীয় কথা হলে শ্রোতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। খুশি হলে চোখ নামিয়ে ফেলতেন। তাঁর হাসি বেশির ভাগ সময় মুচকি হাসি হতো- যার ফলে বৃষ্টিস্নাত মেঘের আড়াল থেকে সূর্য উঁকি দেবার মত উজ্জ্বল শুভ্র দাঁতগুলো দেখা যেত।”
হযরত আলী (রা) ছিলেন তাঁর খান্দানেরই লোক। তিনি লেখাপড়া ও জানাশোনার ব্যাপক সুযোগ পেয়েছিলেন এবং যার দৃষ্টি মানুষের মনস্তত্ত্ব ও চরিত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলোর গভীরে প্রবেশ করেছিল। তিনি ছিলেন নবীজীর (সা) একান্ত নিকটজন ও কাছের মানুষ। একই সাথে মানুষের গুণাবলী প্রকাশে ও দৃশ্য বর্ণনায় তিনি ছিলেন সবচেয়ে দক্ষ। তাঁর মহান চরিত্র (خُلْقٍ عَظِيمٌ) সম্পর্কে তিনি বলেন:
"তিনি স্বভাবগতভাবেই খারাপ কথা বলা, নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা থেকে দূরে অবস্থান করতেন এবং অনিচ্ছাকৃতভাবেও এমন কোনও বিষয় তাঁর থেকে প্রকাশ পেত না। বাজারে তিনি কখনও উচ্চস্বরে কথা বলেননি। মন্দের বদলা কখনো মন্দের দ্বারা নিতেন না, বরং ক্ষমা করতেন। তিনি কখনো কারো উপর হাত তোলেননি। একমাত্র 'জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ' ছাড়া। কখনো কোন খাদেম কিংবা মহিলার উপর হাত তোলেননি। কোন প্রকার জুলুম কিংবা বাড়াবাড়ির প্রতিশোধ নিতে তাঁকে কেউ কখনো দেখেনি- যতক্ষণ না কেউ আল্লাহ্ নির্ধারিত হুদূদ বা সীমারেখা অতিক্রম করত এবং তাঁর সম্মান ও মর্যাদার উপর আঁচ পড়ত। তবে হ্যাঁ, আল্লাহ্ তা'আলার কোন হুকুম নষ্ট করা হলে এবং তাঁর মর্যাদার উপর আঘাত এলে তিনি এর জন্য সবচেয়ে বেশি রাগান্বিত হতেন। দু'টি জিনিস সামনে এলে সহজতরটিকে বেছে নিতেন। যখন নিজের ঘরে তাশরীফ নিতেন, তখন সাধারণ মানুষের মতই দেখা যেত। নিজেই কাপড় পরিষ্কার করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন এবং নিজের সকল প্রয়োজন নিজেই আঞ্জাম দিতেন।
নিজের যবান হিফাযত করতেন। কেবল তখনই মুখ খুলতেন, যখন এর প্রয়োজন দেখা দিত। লোকের মন জয় করতেন, তাদের মনকে ঘৃণাসিক্ত করতেন না। কোন সম্প্রদায় কিংবা জাতি-গোষ্ঠীর সম্মানিত লোকের আগমন ঘটলে, তিনি তার সঙ্গে সম্মান ও মর্যাদামণ্ডিত আচরণ করতেন এবং তাঁকে তাঁর জাতীয় আমির বানিয়ে দিতেন। লোকের সম্পর্কে সতর্ক ও পরিমিত মন্তব্য করতেন আপন হৃদ্যতা ও আখলাক দ্বারা মাহরوم না করেই। আপন সঙ্গী-সাথীদের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন।
তিনি ভাল কথার ভাল দিক বর্ণনা করতেন এবং একে শক্তি জোগাতেন মন্দ কথার অনিষ্টকর দিক বলে দিতেন এবং একে দুর্বল করে দিতেন। তাঁর ব্যাপারগুলো ছিল ভারসাম্যময় ও একই রূপ। এক্ষেত্রে, কোনরূপ পরিবর্তন হতো না। কোনকিছুর প্রতি অলসতা কিংবা অবহেলা প্রদর্শন করতেন না এই ভয়ে যে, না জানি অন্যেরাও এই অলসতার শিকার হয়ে পড়ে এবং বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে। প্রতিটি অবস্থা ও প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্যই তাঁর নিকট সেই অবস্থামাফিক প্রয়োজনীয় সামান ছিল। সত্যের ব্যাপারে তিনি কোনরূপ কার্পণ্যের প্রশ্রয় দিতেন না, আবার সীমা অতিক্রমও করতেন না। যেসব লোক তাঁর কাছাকাছি থাকতেন, তাঁরা হতেন সবচেয়ে ভাল ও নির্বাচিত লোক। তাঁর চোখে সর্বোত্তম লোক তিনি ছিলেন- যিনি সকলের মঙ্গলকামী এবং যাঁর ব্যবহার ভাল।
তার নিকট সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যদার অধিকারী ছিলেন তিনি- যিনি মানুষের শোকে সান্ত্বনাদানকারী, সহানুভূতিশীল এবং যিনি অপরের সাহায্য-সহযোগিতায় সকলের আগে থাকেন। আল্লাহ্র যিকির করতে করতে তিনি দাঁড়াতেন এবং আল্লাহ্র যিকির করতে করতে বসতেন। তিনি কোথাও তাশরীফ নিলে যেখানে মজলিস সমাপ্ত হত, সেখানেই অবস্থান করতেন এজন্য আদেশও করতেন। মজলিসে উপস্থিত সবার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতেন এবং সকলের দিকে লক্ষ্য রাখতেন। উপস্থিত সকলে মনে করতেন হযরত (সা)-এর চোখে তার চেয়ে বেশি আপন বুঝি আর কেউ নন। যদি কেউ কোন বিশেষ প্রয়োজন বা উদ্দেশ্যে রাসূল (সা)-কে বসাতেন কিংবা কোন প্রয়োজনে কথা বলতেন, তবে তিনি পরিপূর্ণ ধৈর্য্য এবং প্রশান্তির সঙ্গে তার সকল কথা শুনতেন যতক্ষণ না সে তার কথা শেষ করে নিজে থেকে বিদায় নিত। যদি কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইতো, সাহায্য কামনা করত, তবে তিনি তার প্রয়োজন পূরণ না করে ফিরিয়ে দিতেন না, কিছু দিতে না পারলেও কমপক্ষে তাকে মিষ্টি ও কোমল ভাষায় জবাব দিতেন। তাঁর উত্তম ব্যবহার সবার জন্যই উন্মুক্ত ছিল এবং তিনি তাদের জন্য পিতার ভূমিকা পালন করতেন। সকল শ্রেণীর ও সকল স্তরের লোক সত্যের মাপকাঠিতে তাঁর চোখে ছিল সমান।
তাঁর মজলিস ইলম ও মা'রেফাত, লজ্জা-শরম, ধৈর্য্য ও আমানতদারীর মজলিস ছিল। এ মজলিসে কেউ উচ্চকণ্ঠে কথা বলত না, কারো দোষ-ত্রুটির চর্চা কিংবা চরিত্র হননও করা হত না এ মজলিসে। কারো সম্মান ও মর্যাদার উপর আঘাত হানা হতো না কিংবা কারো চারিত্রিক দুর্বলতাকে ঢোল পিটিয়ে প্রচারও করা হতো না। সকলেই ছিল সমান, কারো উপর কারো মর্যাদা থাকলে, তা একমাত্র তাকওয়ার ভিত্তিতেই ছিল। ছোটরা বড়দের সম্মান করত আর বড়রা ছোটদের করতেন স্নেহ ও মায়া। অভাবী ও দুঃস্থ লোকদেরকে নিজের উপর প্রাধান্য দিতেন। মুসাফির ও নবাগতকে হিফাযত করতেন এবং তাদের প্রতি খেয়াল রাখতেন।"
হযরত আলী (রা) আরো বলেন: "তিনি সব সময় হাসিখুশি ও প্রফুল্ল থাকতেন। তিনি ছিলেন কোমল চরিত্রের ও নরম দিলের মানুষ। তিনি কঠোর প্রকৃতির লোক ছিলেন না, রূঢ় ও কঠোর ভাষায় কথা বলায় অভ্যস্ত ছিলেন না, মানুষের উপর খুব সত্ত্বর সদয় হয়ে যেতেন, খুব তাড়াতাড়ি মানুষকে ক্ষমা করে দিতেন, কারো সঙ্গে বাগড়া করতেন না, বরং পরিপূর্ণ ভাব-গম্ভীর, শান্ত ও ধীরস্থির মেজাজের ছিলেন। তিনি চেঁচিয়ে কথা বলতেন না, কোনো ধরনের ফালতু কথা বলতেন না আর নিম্নমানের কথাও বলতেন না, কারো উপর দোষ চাপাতেন না, সংকীর্ণ চিত্ত ও কৃপণ ছিলেন না। যে কথা তাঁর পছন্দ হত না, তা তিনি উপেক্ষা করতেন, তা ধর্তব্যের মধ্যে আনতেন না, স্পষ্টভাবে সে সম্পর্কে হতাশা প্রকাশ করতেন না এবং এর জওয়াবও দিতেন না।
"তিনটি জিনিসের স্পর্শ থেকে তিনি নিজকে সম্পূর্ণ বাঁচিয়ে রাখতেন- ১। ঝগড়া, ২। অহংকার ও ৩। অনর্থক কথা ও কাজ। লোকদেরকেও তিনটি জিনিসের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন ১। কারো ওপর দোষ চাপাতেন না, ২। কারো দুর্বল ও গোপনীয় বিষয়ের অনুসন্ধান করে বেড়াতেন না এবং ৩। কেবল সে কথাই বলতেন- যে কথাতে সওয়াবের আশা করা যেত। যখন কথা বলতেন, মজলিসে উপস্থিত লোকেরা সম্মানার্থে এমনভাবে মস্তক অবনত করে ফেলতেন যেন মনে হত বুঝি সকলের মাথার উপর পাখি বসে আছে, না জানি নড়াচড়াতেও তা উড়ে যায়। যখন তিনি চুপ করতেন, তখন তারা কথা বলতেন। তাঁর সামনে তারা কখনো ঝগড়ায় লিপ্ত হতেন না। যদি তাঁর মজলিসে কেউ কথা বলতেন, তখন আর সব লোক চুপ করে ঐ ব্যক্তির কথা শুনতেন, যতক্ষণ না তিনি তার কথা শেষ করতেন।
রাসূল (সা)-এর সামনে প্রত্যেক লোকের কথা বলার অধিকার ঠিক ততটুকুই থাকত, যতটুকু থাকত তার পূর্ববর্তী লোকের যাতে সে পূর্ণ সন্তুষ্টি সহকারে তার কথা বলার সুযোগ পায় এবং ঠিক তেমনি সম্মান ও প্রশান্তির সঙ্গে তা শোনা হতো। যে কথায় সকলে হাসত, তিনিও তাতে হাসতেন। যে কথায় লোকে বিস্ময় প্রকাশ করত, তিনিও তাতে বিস্ময় প্রকাশ করতেন। মুসাফির ও পরদেশীর বেআদবী তিনি সইতেন এবং সর্বপ্রকার দাবী, ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে শুনতেন। সাহাবায়ে কিরাম (রা) এ ধরনের লোকদের মনোযোগ নিজেদের দিকে টেনে নিতেন যাতে রাসূল (সা)-এর ওপর তা বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। তিনি বলতেন: তোমরা অভাবী ও প্রয়োজন মুখাপেক্ষী লোক পেলে তাদের সাহায্য করবে। তিনি সেইসব লোকের প্রশংসা ও স্তুতি কবুল করতেন- যারা সীমার ভেতর অবস্থান করত। কারো কথা বলার সময় তিনি কথা বলতেন না, তার কথা মাঝপথে থামিয়েও দিতেন না। তবে হ্যাঁ, সীমা অতিক্রম করলে তাকে নিষেধ করতেন এবং মজলিস থেকে উঠে গিয়ে তার কথা থামিয়ে দিতেন।
তিনি সবচেয়ে উদার মন ও প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন; স্পষ্টভাষী, কোমল প্রকৃতিবিশিষ্ট এবং সামাজিক, পারস্পরিক লেনদেনের ব্যাপারে বদান্য ছিলেন। যে তাঁকে প্রথম দেখত, সে-ই ভীত ও কম্পিত হয়ে পড়ত। কিন্তু তাঁর সাহচর্যে থাকলে ও জানাশোনা হলে মুগ্ধ, আকৃষ্ট ও অভিভূত হতো এবং যেই তাঁকে দেখত, সেই বলত, তাঁর মত আর কাউকে আগে যেমন দেখিনি, তেমনি দেখিনি এরপরও অন্য কাউকে। আমাদের নবী (সা)-এর উপর আল্লাহ্র রহমত ও অনুগ্রহরাশি বর্ষিত হোক।"১
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতার পোশাকে মণ্ডিত ও সজ্জিত করেছিলেন এবং তাঁকে ভালবাসা ও আকর্ষণ, ভীতিকর প্রভাব ও ব্যক্তিত্বের এক অপূর্ব প্রতিমূর্তি বানিয়েছিলেন। হিন্দ ইবন আবী হালা (রা) বলেন:
"তিনি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও শান-শওকতের অধিকারী ছিলেন এবং অন্যের দৃষ্টিতেও খুবই মর্যাদাবান ছিলেন। তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল পূর্ণিমা রাতের চাঁদের মতই জ্বলজ্বল করত।”২
হযরত বারা' ইবন আযিব (রা) বলেন: "আল্লাহ্র রাসূল (সা) মধ্যম আকৃতির ছিলেন, না বেশি লম্বা, না বেশি বেঁটে। আমি একবার তাঁকে লাল কুবা পরিহিত অবস্থায় দেখেছিলাম। এর থেকে ভাল কোন জিনিস আমি কখনো দেখিনি।"'
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন: "তিনি মধ্যম আকৃতির ছিলেন, বরং এর থেকে কিছুটা লম্বা। তিনি ছিলেন গৌরবর্ণের, ঘন কৃষ্ণ শ্মশ্রু, মুখমণ্ডল অত্যন্ত মানানসই ও সুন্দর, দীর্ঘ চোখের পলক ও চওড়া কাঁধের অধিকারী। শেষে তিনি বলেন, তাঁর মত আর কাউকে এর আগেও যেমনি দেখিনি, তেমনি দেখিনি পরেও।"২
হযরত আনাস (রা) বলেন: "আমি রেশম ও রেশমী কিংখাবও তাঁর হাতের মত নরম পাইনি এবং তাঁর (শরীরের) খোশবু থেকে অধিকতর খোশবুও আমি আর শুঁকিনি।"°
টিকাঃ
১. অর্থাৎ অহংকারীর মত বেপরোয়া ও উদ্ধত ভঙ্গিতে কাঠখোট্টা কথা বলতেন না।
১. শামাইলে তিরমিযী থেকে উদ্ধৃত
২. প্রাগুক্ত, হিন্দ ইবন আবী হালা (রা)-এর সূত্রে হাসান (রা) কর্তৃক বর্ণিত
১. বুখারী-মুসলিম
২. আল-আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারীকৃত
৩. বুখারী ও মুসলিম; বুখারী, কিতাবুল মানাকিব
📄 আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে রিসালাত দ্বারা ধন্য করেছিলেন, তাঁকে আপন মাহবুব বানিয়েছিলেন এবং উত্তম মনোনয়নে মনোনীত করেছিলেন। তাঁর অগ্র-পশ্চাতের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছিলেন। এতদসত্ত্বেও তিনি ইবাদত-বন্দেগীতে সবচেয়ে বেশি উদ্যমী ও প্রয়াসী ছিলেন, ছিলেন সবচেয়ে আগ্রহী।
হযরত মুগীরা ইবন শু'বা (রা) বলেন: "একবার রাসূলুল্লাহ (সা) নফল নামাযে এত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন যে, তাঁর কদম মুবারক ফুলে গিয়েছিল। আরয করা হলো, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার আগে-পিছের যাবতীয় গুনাহ তো মাফ করে দেয়া হয়েছে (তারপরও ইবাদতে এত বেশি কষ্ট করছেন কেন)? একথা শুনে তিনি বললেন, আমি কি আল্লাহ্র শোকরগুযার বান্দা হব না?"৪
হযরত আয়েশা (রা) বলেন: “রাসূলুল্লাহ (সা) একবার কুরআন পাকের একটি আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে সারা রাত কাটিয়ে দিয়েছিলেন।”১
হযরত আবূ যর (রা) বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) রাতের বেলায় সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে একটি আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে ভোর হয়ে যায়। আয়াতটি ছিল: إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ ، وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ . “আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে, তারা তো আপনারই বান্দা। আর আপনি তাদের ক্ষমা করলে আপনি তো অবশ্যই প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”২ [সূরা মায়িদা: ১১৮]
হযরত আয়েশা (রা) এও বলেন: “তিনি এত বেশি সিয়াম (রোযা) পালন করতেন যে, আমরা মনে করতাম তিনি সম্ভবত সিয়াম আর ছাড়বেন না সর্বদাই বুঝি রোযাদার থাকবেন। আবার যখন সওম ছাড়তেন, তখন আমরা ভাবতাম সম্ভবত তিনি আর সিয়াম পালন করবেন না।”৩
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন : “যদি কেউ তাঁকে কিয়ামুল-লায়ল (তাহাজ্জুদ সালাত)-এ মশগুল দেখতে চাইত, তবে তা দেখতে পেত। আবার ঠিক তেমনি কেউ যদি তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে চাইত, তাহলে তাও সে দেখতে পেত।”৪
আব্দুল্লাহ ইবনুশ শিখখীর (রা) বর্ণনা করেন: "আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে হাযির হয়ে দেখতে পেলাম, তিনি সালাতে মগ্ন এবং কান্নার কারণে তার বক্ষ মুবারক থেকে এমন আওয়াজ বের হচ্ছিল যেমন ডেকচি থেকে ফুটন্ত পানির শব্দ বের হয়।”৫
সালাত ভিন্ন আর কোনোকিছুতে তিনি সান্ত্বনা লাভ করতেন না এবং মনে হতো, সালাত আদায়ের পরও তিনি সালাতের জন্য অপেক্ষমান ও আকাঙ্ক্ষী। তিনি বলতেন : جُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلاةِ “আমার চক্ষুর শীতলতা সালাতের ভেতর রাখা হয়েছে।”৬
সাহাবা-ই কিরাম (রা) বলেন': "যখনই রাতের বেলা প্রবল বেগে বাতাস বইত, তিনি মসজিদে আশ্রয় নিতেন, যতক্ষণ না বাতাস থেমে যেত। যদি মহাকাশে কোন রকম পরিবর্তন দেখা যেত, যেমন সূর্যগ্রহণ কিংবা চন্দ্রগ্রহণ, তিনি সালাতে মনোনিবেশ করতেন, এ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন যতক্ষণ না গ্রহণ কেটে যেত এবং আকাশ পরিষ্কার হয়ে যেত।”২
তিনি সব সময় সালাত আদায়ে আগ্রহী থাকতেন এবং সালাত ছাড়া তৃপ্তি ও শান্তি পেতেন না। যতক্ষণ না তিনি সালাত আদায় করতেন তাঁর অস্থিরতা বিদ্যমান থাকত। কখনো বা তাঁর মুয়াযযিন বিলাল (রা)-কে বলতেন, “ওহে বিলাল! সালাতের ইত্তিজাম কর এবং আমার শান্তি ও তৃপ্তির ব্যবস্থা কর।""
টিকাঃ
৪. ইমাম বুখারী সূরা আল-ফাতিহার তাফসীরে এবং মুসলিম, তিরমিযী ও নাসাঈ ইহয়া উল্লায়ল অধ্যায়ে উদ্ধৃত করেছেন।
১. তিরমিযী
২. নাসাঈ ও ইবন মাজাহ
৩. নফল সিয়াম সম্পর্কে বলা হয়েছে।
৪. বুখারী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ
৫. শামাইলে তিরমিযী
৬. নাসাঈ, হাক্কুন নিসা অধ্যায়
১. "যখন কোন সমস্যা, সংকট কিংবা পেরেশানীর কারণ দেখা দিত, অমনি তিনি সালাতের দিকে মনোযোগী হতেন এবং সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন।-আবু দাউদ
২. তাবারানী।
৩. আবূ দাউদ, ফী সালাতিল আতামাহ
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে রিসালাত দ্বারা ধন্য করেছিলেন, তাঁকে আপন মাহবুব বানিয়েছিলেন এবং উত্তম মনোনয়নে মনোনীত করেছিলেন। তাঁর অগ্র-পশ্চাতের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছিলেন। এতদসত্ত্বেও তিনি ইবাদত-বন্দেগীতে সবচেয়ে বেশি উদ্যমী ও প্রয়াসী ছিলেন, ছিলেন সবচেয়ে আগ্রহী।
হযরত মুগীরা ইবন শু'বা (রা) বলেন: "একবার রাসূলুল্লাহ (সা) নফল নামাযে এত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন যে, তাঁর কদম মুবারক ফুলে গিয়েছিল। আরয করা হলো, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার আগে-পিছের যাবতীয় গুনাহ তো মাফ করে দেয়া হয়েছে (তারপরও ইবাদতে এত বেশি কষ্ট করছেন কেন)? একথা শুনে তিনি বললেন, আমি কি আল্লাহ্র শোকরগুযার বান্দা হব না?"৪
হযরত আয়েশা (রা) বলেন: “রাসূলুল্লাহ (সা) একবার কুরআন পাকের একটি আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে সারা রাত কাটিয়ে দিয়েছিলেন।”১
হযরত আবূ যর (রা) বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) রাতের বেলায় সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে একটি আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে ভোর হয়ে যায়। আয়াতটি ছিল: إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ ، وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ . “আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে, তারা তো আপনারই বান্দা। আর আপনি তাদের ক্ষমা করলে আপনি তো অবশ্যই প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”২ [সূরা মায়িদা: ১১৮]
হযরত আয়েশা (রা) এও বলেন: “তিনি এত বেশি সিয়াম (রোযা) পালন করতেন যে, আমরা মনে করতাম তিনি সম্ভবত সিয়াম আর ছাড়বেন না সর্বদাই বুঝি রোযাদার থাকবেন। আবার যখন সওম ছাড়তেন, তখন আমরা ভাবতাম সম্ভবত তিনি আর সিয়াম পালন করবেন না।”৩
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন : “যদি কেউ তাঁকে কিয়ামুল-লায়ল (তাহাজ্জুদ সালাত)-এ মশগুল দেখতে চাইত, তবে তা দেখতে পেত। আবার ঠিক তেমনি কেউ যদি তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে চাইত, তাহলে তাও সে দেখতে পেত।”৪
আব্দুল্লাহ ইবনুশ শিখখীর (রা) বর্ণনা করেন: "আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে হাযির হয়ে দেখতে পেলাম, তিনি সালাতে মগ্ন এবং কান্নার কারণে তার বক্ষ মুবারক থেকে এমন আওয়াজ বের হচ্ছিল যেমন ডেকচি থেকে ফুটন্ত পানির শব্দ বের হয়।”৫
সালাত ভিন্ন আর কোনোকিছুতে তিনি সান্ত্বনা লাভ করতেন না এবং মনে হতো, সালাত আদায়ের পরও তিনি সালাতের জন্য অপেক্ষমান ও আকাঙ্ক্ষী। তিনি বলতেন : جُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلاةِ “আমার চক্ষুর শীতলতা সালাতের ভেতর রাখা হয়েছে।”৬
সাহাবা-ই কিরাম (রা) বলেন': "যখনই রাতের বেলা প্রবল বেগে বাতাস বইত, তিনি মসজিদে আশ্রয় নিতেন, যতক্ষণ না বাতাস থেমে যেত। যদি মহাকাশে কোন রকম পরিবর্তন দেখা যেত, যেমন সূর্যগ্রহণ কিংবা চন্দ্রগ্রহণ, তিনি সালাতে মনোনিবেশ করতেন, এ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন যতক্ষণ না গ্রহণ কেটে যেত এবং আকাশ পরিষ্কার হয়ে যেত।”২
তিনি সব সময় সালাত আদায়ে আগ্রহী থাকতেন এবং সালাত ছাড়া তৃপ্তি ও শান্তি পেতেন না। যতক্ষণ না তিনি সালাত আদায় করতেন তাঁর অস্থিরতা বিদ্যমান থাকত। কখনো বা তাঁর মুয়াযযিন বিলাল (রা)-কে বলতেন, “ওহে বিলাল! সালাতের ইত্তিজাম কর এবং আমার শান্তি ও তৃপ্তির ব্যবস্থা কর।""
টিকাঃ
৪. ইমাম বুখারী সূরা আল-ফাতিহার তাফসীরে এবং মুসলিম, তিরমিযী ও নাসাঈ ইহয়া উল্লায়ল অধ্যায়ে উদ্ধৃত করেছেন।
১. তিরমিযী
২. নাসাঈ ও ইবন মাজাহ
৩. নফল সিয়াম সম্পর্কে বলা হয়েছে।
৪. বুখারী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ
৫. শামাইলে তিরমিযী
৬. নাসাঈ, হাক্কুন নিসা অধ্যায়
১. "যখন কোন সমস্যা, সংকট কিংবা পেরেশানীর কারণ দেখা দিত, অমনি তিনি সালাতের দিকে মনোযোগী হতেন এবং সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন।-আবু দাউদ
২. তাবারানী।
৩. আবূ দাউদ, ফী সালাতিল আতামাহ
📄 পার্থিব সম্পদ ও এর প্রতি অনীহা
টাকা-পয়সা ও দুনিয়ার ধন-সম্পদ রাসূল (সা) কোন নজরে দেখতেন তা কোন কথাশিল্পী কিংবা তুখোড় কোন বাগ্মীও বর্ণনা করতে গেলে খেই হারিয়ে ফেলবেন। আর তা এজন্য যে, তিনি তো দূরের কথা, তাঁর ঈমানী ও রব্বানী মাদ্রাসার একজন পিছনের সারির ছাত্র এবং আরব ও অনারব বিশ্বের একজন ছাত্রের ছাত্র ও টাকা-পয়সা কিংবা বিত্ত-সম্পদকে এক কানাকড়ির বেশি মূল্য দিতেন না এবং তাদের বৈরাগ্যসুলভ জীবন পার্থিব সম্পদের প্রতি নিস্পৃহ মানসিকতা, অপরের জন্য সম্পদ ব্যয়ের আগ্রহ, নিজের মোকাবিলায় অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্যদান, অল্পে তুষ্টি ও পরমুখাপেক্ষিতাহীনতার যেসব ঘটনা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাওয়া যায়, তাতে যে কোন মানুষের হতভম্ব হওয়া বিচিত্র নয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একজন গোলামদের গোলামের এই অবস্থা, তখন এ থেকেই পরিমাপ করা যায় তাহলে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা), যিনি এদের সবার ইমাম ও পথপ্রদর্শক এবং যিনি প্রতিটি নেক ও কল্যাণ, মর্যাদা ও তাকওয়ায় তাদের মুরব্বী ও শিক্ষক ছিলেন, তাঁর অবস্থা এ ব্যাপারে কী হতে পারে?
এজন্য আমরা এখানে এ সম্পর্কে মাত্র কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরছি- যা সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর মুখ থেকে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। কেননা সত্য ঘটনা থেকে বেশি প্রভাবশালী ও কার্যকর কোনকিছু নেই এবং এর চেয়ে অধিকতর বিশুদ্ধ ও নির্ভুল প্রতিনিধিত্ব কোন কথামালা দ্বারা হতে পারে না।
তাঁর সবচেয়ে প্রভাবমণ্ডিত ও বিখ্যাত উক্তি, যা তিনি হরফে হরফে মেনে চলতেন এবং যা ছিল তাঁর সমগ্র জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, তা হলো:
اللَّهُمَّ لَا عَيْشَ إِلَّا عَيْشُ الْآخِرَةِ “হে আল্লাহ্! পারলৌকিক জীবনই তো আসল জীবন।"
তিনি বলতেন:
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا وَمَا أَنَا وَالدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِبِ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا. "দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক কি? দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক তো এতটুকুই যেমন কোন মুসাফির পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে কোন গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বসল, আরাম করল, তারপর ছায়া ছেড়ে গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হলো।"১
হযরত উমর (রা) একবার নবীজী (সা)-কে চাটাইয়ের উপর শোয়া অবস্থায় দেখতে পান। দেখতে পান তাঁর পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ। এই দৃশ্যে হযরত উমর (রা) কেঁদে ফেলেন তাঁকে কাঁদতে দেখে রাসুলে আকরাম (সা) জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার?
উমর (রা) আরয করলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্র সৃষ্টজগতের ভিতর সর্বাধিক নির্বাচিত আপনি, অথচ সকল সুখ-সম্ভোগের অধিকারী রোম ও পারস্য সম্রাটেরা!" এ কথা শুনে রাসুল আকরাম (সা)-এর চেহারা লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন, "হে খাত্তাব পুত্র! এতে কি তোমার কোন সন্দেহ আছে?" এরপর তিনি বললেন, "এরা তো তারাই, যাদেরকে দুনিয়ার জীবনের সমস্ত মজাই এখানে দিয়ে দেয়া হয়েছে।"২
তিনি কেবল বিলাসী ও আরাম-আয়েশের জীবন নিজের জন্যই অপছন্দ করতেন তাই নয়, বরং আহলে বায়ত (নবী-পরিবার)-এর জন্যও এর পক্ষপাতি ছিলেন না। তিনি দু'আ করতেন:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ رِزْقَ آلِ مُحَمَّدٍ قُوْتًا. "হে আল্লাহ্! মুহাম্মদের পরিবারবর্গের যতটুকু প্রয়োজন, কেবল ততটুকু রিযিকই দিও।"'
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন : “শপথ সেই সত্তার, যাঁর হাতে আবূ হুরায়রার জীবন! আল্লাহর নবী ও তাঁর পরিবারবর্গ কখনো গমের রুটি পরপর তিনদিন পেটভরে খেতে পারেন নি। আর এ অবস্থায় তাঁরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেছেন।”
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন: “আমরা মুহাম্মদ (সা)- এর পরিবারবর্গের এক চাঁদ উঠে আর এক চাঁদ এসে যেত, অথচ আমাদের ঘরে চুলা জ্বলত না, কেবল খেজুর ও পানির উপর আমাদের জীবন চলত।”২
যখন তিনি জীবনের শেষ হজ্জ আদায় করেন, যে সময় তাঁর সামনে ছিল مسلمانوں জনসমুদ্র, সমগ্র আরব ভূখণ্ড ছিল তাঁর পদানত, অথচ তাঁর নিজের অবস্থা ছিল একজন দরিদ্রের মতো, তাঁর গায়ে ছিল একটি চাদরমাত্র যার মূল্য চার দিরহামের বেশি ছিল না। সে সময় তিনি বলেছিলেন, “হে আল্লাহ্! একে তুমি এমন এক হজ্জ বানাও যার ভিতর রিয়া (লোক দেখানো) ও খ্যাতির কামনা না থাকে।""
হযরত আবু যর (রা)-কে তিনি বলেছিলেন: "আমি পছন্দ করি না, আমার কাছে ওহুদ পাহাড়সম স্বর্ণ থাকুক আর-এ অবস্থায় তিনদিন অতিবাহিত হোক এবং তার ভেতর থেকে একটি দীনারও অবশিষ্ট থাকুক। তবে কোন দ্বীনী কাজে কিছু অবশিষ্ট থাকলে ভিন্ন কথা। অন্যথায়, আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে আমি সেগুলো এভাবে এবং এভাবে ডানে বামে ও পেছনে (যাকে পাব) বিলিয়ে দেব।"৪
হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেন, “কখনো এমন হয়নি, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে কোন জিনিস চাওয়া হয়েছে আর তার জওয়াবে তিনি 'না' বলেছেন।' ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: "রাসূলুল্লাহ (সা) বদান্যতা ও দানশীলতায় বেগবান বাতাসের চেয়েও অধিক দ্রুতগামী ছিলেন।”২
হযরত আনাস (রা) বলেন: একবার এক লোক তাঁর (রাসূলের) নিকট কিছু চাইল। তিনি তাকে একপাল বকরি ও ভেড়া দিয়ে দিলেন, যা দু'টো পাহাড়ের মাঝে ছিল। লোকটি ভেড়া-বকরির পাল হাঁকিয়ে তার গোত্রের লোকদের নিকট ফিরে গেল এবং বলতে লাগল, লোক সকল! ইসলাম কবুল কর। মুহাম্মদ (সা) এভাবে বিলাচ্ছেন যে, দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের কোনই ভয় নেই।
একবার তাঁর খিদমতে নব্বই হাজার দিরহাম পেশ করা হলো। দিরহামগুলো একটা চাটাইয়ে ঢালা হলো। অতঃপর তিনি তা দাঁড়িয়ে বণ্টন শুরু করলেন, কোন প্রার্থীকেই তিনি ফেরাননি। এমনকি এক সময় তা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেল।
টিকাঃ
৪. বিস্তারিত জানতে পাঠ করুন- আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের কিতাবুয যুহদ; ইবনুল যাওজীর কিতাবুস সফওয়া ও আবূ নুআয়ম-এর হিলয়াতুল আউলিয়া।
১. আবূ দাউদ; আত তিরমিযী
২. বুখারী-মুসলিম
১. বুখারী কিতাবুর রিকাক, মুসলিম কিতাবুষ-যুহদ
২. বুখারী ও মুসলিম
৩. শামাইলে তিরমিযী, আনাস (রা) বর্ণিত
৪. বুখারী ও মুসলিম, শব্দসমষ্টি বুখারীর, কিতাবুর রিকাক باب قول النبي (ص) ما احب الالى احدا ذهباً.
১. বুখারী, কিতাবুল-আদাব
২. পূর্ণ হাদীস, বুখারী ও মুসলিম-এ দেখা যেতে পারে।
৩. বুখারী ও মুসলিম
টাকা-পয়সা ও দুনিয়ার ধন-সম্পদ রাসূল (সা) কোন নজরে দেখতেন তা কোন কথাশিল্পী কিংবা তুখোড় কোন বাগ্মীও বর্ণনা করতে গেলে খেই হারিয়ে ফেলবেন। আর তা এজন্য যে, তিনি তো দূরের কথা, তাঁর ঈমানী ও রব্বানী মাদ্রাসার একজন পিছনের সারির ছাত্র এবং আরব ও অনারব বিশ্বের একজন ছাত্রের ছাত্র ও টাকা-পয়সা কিংবা বিত্ত-সম্পদকে এক কানাকড়ির বেশি মূল্য দিতেন না এবং তাদের বৈরাগ্যসুলভ জীবন পার্থিব সম্পদের প্রতি নিস্পৃহ মানসিকতা, অপরের জন্য সম্পদ ব্যয়ের আগ্রহ, নিজের মোকাবিলায় অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্যদান, অল্পে তুষ্টি ও পরমুখাপেক্ষিতাহীনতার যেসব ঘটনা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাওয়া যায়, তাতে যে কোন মানুষের হতভম্ব হওয়া বিচিত্র নয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একজন গোলামদের গোলামের এই অবস্থা, তখন এ থেকেই পরিমাপ করা যায় তাহলে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা), যিনি এদের সবার ইমাম ও পথপ্রদর্শক এবং যিনি প্রতিটি নেক ও কল্যাণ, মর্যাদা ও তাকওয়ায় তাদের মুরব্বী ও শিক্ষক ছিলেন, তাঁর অবস্থা এ ব্যাপারে কী হতে পারে?
এজন্য আমরা এখানে এ সম্পর্কে মাত্র কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরছি- যা সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর মুখ থেকে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। কেননা সত্য ঘটনা থেকে বেশি প্রভাবশালী ও কার্যকর কোনকিছু নেই এবং এর চেয়ে অধিকতর বিশুদ্ধ ও নির্ভুল প্রতিনিধিত্ব কোন কথামালা দ্বারা হতে পারে না।
তাঁর সবচেয়ে প্রভাবমণ্ডিত ও বিখ্যাত উক্তি, যা তিনি হরফে হরফে মেনে চলতেন এবং যা ছিল তাঁর সমগ্র জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, তা হলো:
اللَّهُمَّ لَا عَيْشَ إِلَّا عَيْشُ الْآخِرَةِ “হে আল্লাহ্! পারলৌকিক জীবনই তো আসল জীবন।"
তিনি বলতেন:
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا وَمَا أَنَا وَالدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِبِ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا. "দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক কি? দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক তো এতটুকুই যেমন কোন মুসাফির পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে কোন গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বসল, আরাম করল, তারপর ছায়া ছেড়ে গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হলো।"১
হযরত উমর (রা) একবার নবীজী (সা)-কে চাটাইয়ের উপর শোয়া অবস্থায় দেখতে পান। দেখতে পান তাঁর পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ। এই দৃশ্যে হযরত উমর (রা) কেঁদে ফেলেন তাঁকে কাঁদতে দেখে রাসুলে আকরাম (সা) জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার?
উমর (রা) আরয করলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্র সৃষ্টজগতের ভিতর সর্বাধিক নির্বাচিত আপনি, অথচ সকল সুখ-সম্ভোগের অধিকারী রোম ও পারস্য সম্রাটেরা!" এ কথা শুনে রাসুল আকরাম (সা)-এর চেহারা লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন, "হে খাত্তাব পুত্র! এতে কি তোমার কোন সন্দেহ আছে?" এরপর তিনি বললেন, "এরা তো তারাই, যাদেরকে দুনিয়ার জীবনের সমস্ত মজাই এখানে দিয়ে দেয়া হয়েছে।"২
তিনি কেবল বিলাসী ও আরাম-আয়েশের জীবন নিজের জন্যই অপছন্দ করতেন তাই নয়, বরং আহলে বায়ত (নবী-পরিবার)-এর জন্যও এর পক্ষপাতি ছিলেন না। তিনি দু'আ করতেন:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ رِزْقَ آلِ مُحَمَّدٍ قُوْتًا. "হে আল্লাহ্! মুহাম্মদের পরিবারবর্গের যতটুকু প্রয়োজন, কেবল ততটুকু রিযিকই দিও।"'
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন : “শপথ সেই সত্তার, যাঁর হাতে আবূ হুরায়রার জীবন! আল্লাহর নবী ও তাঁর পরিবারবর্গ কখনো গমের রুটি পরপর তিনদিন পেটভরে খেতে পারেন নি। আর এ অবস্থায় তাঁরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেছেন।”
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন: “আমরা মুহাম্মদ (সা)- এর পরিবারবর্গের এক চাঁদ উঠে আর এক চাঁদ এসে যেত, অথচ আমাদের ঘরে চুলা জ্বলত না, কেবল খেজুর ও পানির উপর আমাদের জীবন চলত।”২
যখন তিনি জীবনের শেষ হজ্জ আদায় করেন, যে সময় তাঁর সামনে ছিল مسلمانوں জনসমুদ্র, সমগ্র আরব ভূখণ্ড ছিল তাঁর পদানত, অথচ তাঁর নিজের অবস্থা ছিল একজন দরিদ্রের মতো, তাঁর গায়ে ছিল একটি চাদরমাত্র যার মূল্য চার দিরহামের বেশি ছিল না। সে সময় তিনি বলেছিলেন, “হে আল্লাহ্! একে তুমি এমন এক হজ্জ বানাও যার ভিতর রিয়া (লোক দেখানো) ও খ্যাতির কামনা না থাকে।""
হযরত আবু যর (রা)-কে তিনি বলেছিলেন: "আমি পছন্দ করি না, আমার কাছে ওহুদ পাহাড়সম স্বর্ণ থাকুক আর-এ অবস্থায় তিনদিন অতিবাহিত হোক এবং তার ভেতর থেকে একটি দীনারও অবশিষ্ট থাকুক। তবে কোন দ্বীনী কাজে কিছু অবশিষ্ট থাকলে ভিন্ন কথা। অন্যথায়, আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে আমি সেগুলো এভাবে এবং এভাবে ডানে বামে ও পেছনে (যাকে পাব) বিলিয়ে দেব।"৪
হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেন, “কখনো এমন হয়নি, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে কোন জিনিস চাওয়া হয়েছে আর তার জওয়াবে তিনি 'না' বলেছেন।' ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: "রাসূলুল্লাহ (সা) বদান্যতা ও দানশীলতায় বেগবান বাতাসের চেয়েও অধিক দ্রুতগামী ছিলেন।”২
হযরত আনাস (রা) বলেন: একবার এক লোক তাঁর (রাসূলের) নিকট কিছু চাইল। তিনি তাকে একপাল বকরি ও ভেড়া দিয়ে দিলেন, যা দু'টো পাহাড়ের মাঝে ছিল। লোকটি ভেড়া-বকরির পাল হাঁকিয়ে তার গোত্রের লোকদের নিকট ফিরে গেল এবং বলতে লাগল, লোক সকল! ইসলাম কবুল কর। মুহাম্মদ (সা) এভাবে বিলাচ্ছেন যে, দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের কোনই ভয় নেই।
একবার তাঁর খিদমতে নব্বই হাজার দিরহাম পেশ করা হলো। দিরহামগুলো একটা চাটাইয়ে ঢালা হলো। অতঃপর তিনি তা দাঁড়িয়ে বণ্টন শুরু করলেন, কোন প্রার্থীকেই তিনি ফেরাননি। এমনকি এক সময় তা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেল।
টিকাঃ
৪. বিস্তারিত জানতে পাঠ করুন- আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের কিতাবুয যুহদ; ইবনুল যাওজীর কিতাবুস সফওয়া ও আবূ নুআয়ম-এর হিলয়াতুল আউলিয়া।
১. আবূ দাউদ; আত তিরমিযী
২. বুখারী-মুসলিম
১. বুখারী কিতাবুর রিকাক, মুসলিম কিতাবুষ-যুহদ
২. বুখারী ও মুসলিম
৩. শামাইলে তিরমিযী, আনাস (রা) বর্ণিত
৪. বুখারী ও মুসলিম, শব্দসমষ্টি বুখারীর, কিতাবুর রিকাক باب قول النبي (ص) ما احب الالى احدا ذهباً.
১. বুখারী, কিতাবুল-আদাব
২. পূর্ণ হাদীস, বুখারী ও মুসলিম-এ দেখা যেতে পারে।
৩. বুখারী ও মুসলিম
📄 আল্লাহর সৃষ্ট জীবের সঙ্গে আচরণ
কিন্তু ইবাদতের প্রতি এই আগ্রহ, দুনিয়া ও পার্থিব জগতের উপকরণাদির সঙ্গে সম্পর্কহীনতা, পরিপূর্ণ যুহদ, আল্লাহ্ তা'আলার দিকে পূর্ণ মনোনিবেশ এবং তাঁর দরবারে কান্নাকাটি, দু'আ ও মুনাজাতের ভেতর দিয়ে আত্মবিলোপ, তাঁর সবচেয়ে উত্তম আখলাক, স্নেহ-ভালবাসা, অন্তররাজ্য জয়, স্নেহপূর্ণ আচরণ এবং প্রত্যেক মানুষকে তার বৈধ অধিকার প্রদানে ও তার সম্মান ও মর্যাদামাফিক আচরণে কোনরূপ পার্থক্য সৃষ্টি করত না। আর এ দু'টো এমন বিষয় যে, দুটোকে একত্র করা অন্য কোন লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলতেন:
لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا. "আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তবে খুব কম হাসতে আর বেশি কাঁদতে।"৪
লোকের ভিতর তিনিই সবচেয়ে উদার হৃদয়ের ছিলেন, কোমল প্রকৃতির অধিকারী এবং খান্দানের দিক দিয়ে সর্বাধিক সম্মানিত ছিলেন। তদপুরি তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা) থেকে আলাদা হয়ে থাকতেন না, বরং তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আনন্দিত চিত্তে ও সহাস্য বদনে মিশতেন। তাঁদের বাচ্চাদের কোলে বসাতেন। স্বাধীন হোক বা ক্রীতদাস-দাসী, ফকীর-মিসকীন, সকলের দাওয়াতই তিনি কবুল করতেন। পীড়িতদের সেবা-শুশ্রূষা করতেন, তা সে শহরের শেষ প্রান্তেই থাকুক না কেন! মা'যূর-এর ওযর কবূল করতেন। 'সাহাবা-ই কিরাম (রা)-এর মজলিসে তাঁকে কখনো হাত-পা ছড়িয়ে বসতে দেখা যায়নি, যাতে অন্যের কোনরূপ কষ্ট হয়।
'আবদুল্লাহ ইবনুল-হারিছ (রা) বর্ণনা করেন: "আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে বেশি প্রফুল্ল ও হাসি-খুশি আর কাউকে দেখিনি।"'
জাবর ইবন সামুরা (রা) বর্ণনা করেন: "রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুবারক মজলিসে আমি শতবারের বেশি বসার সুযোগ পেয়েছি। আমি দেখেছি, তাঁর সাহাবা-ই কিরাম (রা) একে অন্যের থেকে কবিতা শুনছেন, শোনাচ্ছেন এবং জাহিলী যুগের কোন কথা ও ঘটনাসমূহের আলোচনাও করছেন আর তিনি চুপ করে আছেন অথবা কখনো কোন হাসির কথা হলে তিনিও তাঁদের সাথে মুচকি হাসছেন।"
মুরায়েদ (রা) বর্ণনা করেন: "রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে উমাইয়া ইবনুস সালত-এর কবিতা শোনাবার জন্য বললেন। তারপর আমি তাঁকে তার কবিতা শোনালাম।"২
তিনি অত্যন্ত কোমল অন্তঃকরণবিশিষ্ট, স্নেহ-ভালবাসা ও দয়ামায়ার সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি ছিলেন। মানবীয় আবেগ ও সূক্ষ্ণতার অনুভূতি তাঁর পবিত্র জীবনচরিতে সর্বোত্তম ও সুন্দরতম আকৃতিতে ছেঁয়েছিল।
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা)-কে বলতেন, আমার সন্তানদ্বয় (হাসান ও হুসায়ন)-কে ডাক দাও। ডাক দিতেই তাঁরা দৌড়ে আসতেন। তখন তিনি তাঁদের দু'জনকে চুমু খেতেন এবং টেনে নিতেন। একবার তিনি তাঁর দৌহিত্র হাসান ইবন আলী (রা)-কে ডাকলেন। তিনি দৌড়ে এলেন এবং তাঁর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এরপর তাঁর দাড়ি মুবারকের ভিতর আঙ্গুল ঢোকাতে লাগলেন। এরপর তিনি তাঁর নিজের পবিত্র মুখ খুলে দিলেন এবং তিনি (হাসান) আপন মুখ তাঁর (রাসূলের) বরকতময় মুখের ভেতর প্রবেশ করালেন।"৩
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেনঃ যায়দ ইবন হারিছা (রা) (যিনি রাসুল (সা)-এর গোলাম ছিলেন)। যখন মদীনায় এলো, তখন তিনি ঘরেই ছিলেন। সে ঘরে এলো এবং দরজায় আঘাত করল। রাসূলুল্লাহ (সা) তখনই উঠে পড়লেন। সে সময় তাঁর শরীরের সর্বত্র কাপড়-ঢাকা ছিল না, শরীর থেকে চাদর গড়িয়ে পড়ছিল। এ অবস্থায় তিনি তাকে (যায়দ) দেখে জড়িয়ে ধরলেন, কোলাকুলি করলেন এবং চুমু খেলেন।"'
উসামা ইবন যায়দ (রা) বর্ণনা করেনঃ "রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জনৈক কন্যা রাসূল (সা)-কে পয়গাম পাঠান, আমার বাচ্চা মরণাপন্ন, মেহেরবানি করে আসুন। তিনি তাকে সালাম পাঠালেন এবং বললেন, সবই আল্লাহর- যা তিনি নিয়েছেন এবং যা তিনি দিয়েছেন। প্রতিটি বস্তু তাঁর দরবারে নামাঙ্কিত ও নির্ধারিত। অতএব ধৈর্যধারণ কর এবং পুরস্কারের প্রত্যাশী হও, আশায় বুক বাঁধো।
কন্যা কসম দিয়ে পাঠালেন, যেন তিনি অবশ্যই একবার আসেন। তিনি যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন এবং আমরাও তাঁর সাথে উঠে দাঁড়ালাম। তিনি সেখানে গিয়ে বসলে কোলে করে শিশুটি সেখানে আনা হলো। তিনি তাকে কোলে তুলে নিলেন। ঐ সময় তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে। এ দেখে তাঁর চোখ ফেটে অবিরলধারায় পানি পড়তে লাগল। হযরত সা'দ (রা) আরয করলেন: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ কি (আপনিও কাঁদছেন)!' তিনি বললেনঃ এ স্নেহ-মমতার বহিঃপ্রকাশ- যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের ভেতর যাকে চান দান করে থাকেন। আর আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রহমদিল বান্দাদের ওপরই দয়া প্রদর্শন করে থাকেন।২
বদরের যুদ্ধবন্দীদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আপন চাচা আব্বাস (রা)- ও (তখনও তিনি মুসলমান হন নি) ছিলেন। অন্য যুদ্ধবন্দীদের মত তাঁকেও কষে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ফলে, তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন আর তাঁর কাতরানির কারণে তিনি ঘুমাতে পারছিলেন না। জনৈক সাহাবী বিষয়টি বুঝতে পেরে হযরত আব্বাস (রা)-এর বাঁধন একটু ঢিলা করে দিলেন। আনসার সাহাবীর এই মমতা দেখানো আল্লাহ্র রাসূল (সা)-কে উৎসাহিত করতে পারেনি। তিনি চাননি যে হযরত আব্বাস (রা) ও একজন সাধারণ যুদ্ধবন্দীর মধ্যে কোনরূপ ভিন্ন আচরণ করা হোক। ফলে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইচ্ছামতো অপরাপর বন্দীদের বাঁধনও অনুরূপ ঢিলা করে দেয়া হয়।
আনসার সাহাবী যখন দেখতে পেলেন, হযরত আব্বাস-এর বাঁধন ঢিলা করে দেয়াতে আল্লাহ্র রাসূল খুশি হয়েছেন, তখন তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তাঁর চাচাকে মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দেয়া হোক। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর এই পরামর্শ গ্রহণ করেননি।'
একবার জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে উপস্থিত হলো এবং বলতে লাগল: "আপনারা কি আপনাদের ছেলেমেয়েদের স্নেহ করেন, মায়া করেন, ভালোবাসেন? আমরা তো তাদের মায়া করি না, ভালোবাসি না।" আল্লাহ্র রাসূল (সা) বললেন: “যদি আল্লাহ্ তা'আলা তোমার অন্তর থেকে দয়া-মায়া উঠিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমি আর তোমাদের জন্য কী করতে পারি?"২
তিনি শিশুদের প্রতি খুবই সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ ও কোমল আচরণ করতেন। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন: "একবার রাসূল (সা) খেলাধুলায় মত্ত কয়েকটি শিশুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দিলেন।"°
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের সঙ্গে একেবারে মিশে থাকতেন। আমার এক কনিষ্ঠ ভাইকে তিনি বলতেন, ওহে উমায়র! তোমার নুগায়র (একটা ছোট পাখি- যা নিয়ে শিশুরা বেশি সময় খেলা করে থাকে)-এর কি হলো?"৪
মুসলমানদের প্রতি তিনি অত্যন্ত সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন। তিনি তাদের অবস্থার প্রতি খুব লক্ষ্য করতেন। মানব স্বভাবে বিরক্তি ও ক্লান্তিবোধ এবং সাময়িকভাবে তাদের মাঝে ভীরুতা ও কাপুরুষতা সৃষ্টি হওয়া বিচিত্র নয়। এসবের দিকে তিনি বরাবর লক্ষ্য রাখতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে যে ওয়ায-নসীহত করতেন তা বিরতি দিয়ে করতেন এবং তা এজন্য করতেন যাতে তা আমাদের মাঝে বিরক্তি বা একঘেঁয়েমী সৃষ্টি না করে। সালাত বা নামাযের সঙ্গে এতটা প্রেম ও আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও যদি কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেতেন অমনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে দিতেন। তিনি নিজে বলেছেন: "আমি সালাতে দাঁড়াই এবং চাই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তা আদায় করি। অতঃপর কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। তখন এই ধারণায় সালাত সংক্ষিপ্ত করি যাতে তার মায়ের কোনরূপ উৎকণ্ঠা কিংবা মানসিক পীড়ার কারণ না হয়।"১
হযরত অবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) আরও বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে আরয করল, হে আল্লাহ্র রাসূল (সা)! আমি আমার মহল্লায় ফজরের নামাযে কেবল এজন্যই হাযির হই না যে, অমুক লোক সালাত খুবই দীর্ঘ আদায় করে থাকে। এরপর তিনি যে ওয়ায করলেন এর থেকে রাগান্বিত অবস্থায় আর কোন ওয়ায করতে আমি তাঁকে দেখিনি। তিনি বললেন: "তোমাদের মধ্যে সেইসব লোক রয়েছে যারা (ইবাদত ও সালাতের প্রতি) মানুষকে বিতৃষ্ণ ও বিরক্ত করে তুলছে। তোমাদের মধ্যে যারা সালাতে ইমামতি করবে, তাদের উচিত হবে তা সংক্ষিপ্ত করা। কেননা জামা'আতে উপস্থিত মুসল্লীদের মধ্যে দুর্বল লোক যেমন রয়েছে, তেমনি বৃদ্ধ ও প্রয়োজনের তাগিদে ব্যস্ত লোকও রয়েছে।"২
এই প্রসঙ্গে বলতে চাই, মহিলা যাত্রীদলে ছিল আনজাশা নামে জনৈক সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী- যার সুরেলা আবৃত্তিতে উট দ্রুত ছুটত। মহিলাদের এতে কষ্ট হতো। এই দেখে তিনি একদিন আনজাশাকে বললেন: “ওহে আনজাশা! একটু আস্তে। কাঁচের পাত্রগুলো ভেঙে যেতে পারে (অর্থাৎ দ্রুতগতির কারণে দুর্বল ও কোমল স্ত্রীলাকদের যেন কষ্ট না হয়)।"৩
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বক্ষ মুবারককে সব রকমের হিংসা-বিদ্বেষ ও অপরের ক্ষতি ও অমঙ্গল কামনা থেকে সযত্নে মুক্ত রেখেছিলেন। তাই তিনি বলতেন, "তোমাদের কেউ যেন আমার সামনে অপর কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ না করে। কেননা আমি চাই, তোমাদের সামনে যেন আমি এমন ভাবে হাযির হতে পারি যাতে, তোমাদের প্রতি আমার দিল সাফ থাকে।”১
মুসলমানের পক্ষে তিনি ছিলেন স্নেহশীল পিতার মতই, আর সমস্ত মুসলমান ছিল যেন তাঁর পরিবার-পরিজনের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের সকলের যিম্মাদারী যেন তাঁরই কাঁধে ন্যস্ত। তিনি তাদের উপর এতটা সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন যতটা হয়ে থাকেন একজন মা তার সন্তানের প্রতি। مسلمانوں নিকট তাদের ধন-সম্পদ ও তাদের জীবিকার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা'আলা যে প্রাচুর্য দান করেছিলেন তার সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তাদের ঋণ ও তাদের পিঠের ওপর চাপানো বোঝা হালকা করে তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, "কেউ সম্পত্তি রেখে-মারা গেলে, তা তার উত্তরাধিকারী তথা ওয়ারিসদের, আর কেউ ঋণ রেখে মারা গেলে তা পরিশোধের দায়িত্ব আমার। "২
অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি বলতেন, "এমন কোন মুমিন নেই যার দুনিয়া ও আখিরাতে আমার চেয়ে বড় কোন অভিভাবক আছে। যদি চাও এই আয়াত পড়তে পার:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِيْنَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ .
নবী মুমিনদের জন্য তাদের জীবনের চেয়েও বেশি বন্ধু ও সুহৃদ হয়ে থাকেন। [সূরা আহযাব: ৬]
এজন্যে কোন মুসলমান ইন্তিকাল করলে এবং তার পরিত্যক্ত কোন সম্পদ থাকলে, তা তার ওয়ারিস ও নিকটত্মীয়দের অধিকার হিসেবে গণ্য হবে, তা সে যেই হোক! কিন্তু যদি তার যিম্মায় কোন ঋণ থাকে, তবে সে যেন আমার কাছে আসে। তার অভিভাবক ও যিম্মাদার আমি।""
টিকাঃ
৪. আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণিত
১. শামাইলে তিরমিযী
২. আল-আদাবুল-মুফরাদ, বুখারী
৩. আল-আদাবুল-মুফরাদ, বুখারীকৃত পৃঃ ৭৩
১. তিরমিযী
২. বুখারী, কিতাবুল মারদ্বা, কিতাবুজ জানাইয بأب قول النبي صلى الله عليه وسلم يعذب الميت ببكاء اهله
১. ফাতহুল বারী, ৮ম. খণ্ড, পৃঃ ৩২৪ মিসরী সংস্করণ
২. বুখারী, আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীস, কিতাবুল আদব
৩. বুখারী
৪. আল-আদাবুল মুফরাদ
১. বুখারী, কিতাবুস-সালাত
২. প্রাগুক্ত
৩. আল-আদাবুল মুফরাদ, এ ছাড়াও বুখারী ও মুসলিম
১. কিতাবুশ-শিফা, পৃঃ ৫৫, আবূ দাউদ সূত্রে বর্ণিত
২. বুখারী, কিতাবুল-ইসতিযকার
৩. বুখারী, কিতাবুল-ইসতিযকার
কিন্তু ইবাদতের প্রতি এই আগ্রহ, দুনিয়া ও পার্থিব জগতের উপকরণাদির সঙ্গে সম্পর্কহীনতা, পরিপূর্ণ যুহদ, আল্লাহ্ তা'আলার দিকে পূর্ণ মনোনিবেশ এবং তাঁর দরবারে কান্নাকাটি, দু'আ ও মুনাজাতের ভেতর দিয়ে আত্মবিলোপ, তাঁর সবচেয়ে উত্তম আখলাক, স্নেহ-ভালবাসা, অন্তররাজ্য জয়, স্নেহপূর্ণ আচরণ এবং প্রত্যেক মানুষকে তার বৈধ অধিকার প্রদানে ও তার সম্মান ও মর্যাদামাফিক আচরণে কোনরূপ পার্থক্য সৃষ্টি করত না। আর এ দু'টো এমন বিষয় যে, দুটোকে একত্র করা অন্য কোন লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলতেন:
لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا. "আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তবে খুব কম হাসতে আর বেশি কাঁদতে।"৪
লোকের ভিতর তিনিই সবচেয়ে উদার হৃদয়ের ছিলেন, কোমল প্রকৃতির অধিকারী এবং খান্দানের দিক দিয়ে সর্বাধিক সম্মানিত ছিলেন। তদপুরি তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা) থেকে আলাদা হয়ে থাকতেন না, বরং তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আনন্দিত চিত্তে ও সহাস্য বদনে মিশতেন। তাঁদের বাচ্চাদের কোলে বসাতেন। স্বাধীন হোক বা ক্রীতদাস-দাসী, ফকীর-মিসকীন, সকলের দাওয়াতই তিনি কবুল করতেন। পীড়িতদের সেবা-শুশ্রূষা করতেন, তা সে শহরের শেষ প্রান্তেই থাকুক না কেন! মা'যূর-এর ওযর কবূল করতেন। 'সাহাবা-ই কিরাম (রা)-এর মজলিসে তাঁকে কখনো হাত-পা ছড়িয়ে বসতে দেখা যায়নি, যাতে অন্যের কোনরূপ কষ্ট হয়।
'আবদুল্লাহ ইবনুল-হারিছ (রা) বর্ণনা করেন: "আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে বেশি প্রফুল্ল ও হাসি-খুশি আর কাউকে দেখিনি।"'
জাবর ইবন সামুরা (রা) বর্ণনা করেন: "রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুবারক মজলিসে আমি শতবারের বেশি বসার সুযোগ পেয়েছি। আমি দেখেছি, তাঁর সাহাবা-ই কিরাম (রা) একে অন্যের থেকে কবিতা শুনছেন, শোনাচ্ছেন এবং জাহিলী যুগের কোন কথা ও ঘটনাসমূহের আলোচনাও করছেন আর তিনি চুপ করে আছেন অথবা কখনো কোন হাসির কথা হলে তিনিও তাঁদের সাথে মুচকি হাসছেন।"
মুরায়েদ (রা) বর্ণনা করেন: "রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে উমাইয়া ইবনুস সালত-এর কবিতা শোনাবার জন্য বললেন। তারপর আমি তাঁকে তার কবিতা শোনালাম।"২
তিনি অত্যন্ত কোমল অন্তঃকরণবিশিষ্ট, স্নেহ-ভালবাসা ও দয়ামায়ার সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি ছিলেন। মানবীয় আবেগ ও সূক্ষ্ণতার অনুভূতি তাঁর পবিত্র জীবনচরিতে সর্বোত্তম ও সুন্দরতম আকৃতিতে ছেঁয়েছিল।
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা)-কে বলতেন, আমার সন্তানদ্বয় (হাসান ও হুসায়ন)-কে ডাক দাও। ডাক দিতেই তাঁরা দৌড়ে আসতেন। তখন তিনি তাঁদের দু'জনকে চুমু খেতেন এবং টেনে নিতেন। একবার তিনি তাঁর দৌহিত্র হাসান ইবন আলী (রা)-কে ডাকলেন। তিনি দৌড়ে এলেন এবং তাঁর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এরপর তাঁর দাড়ি মুবারকের ভিতর আঙ্গুল ঢোকাতে লাগলেন। এরপর তিনি তাঁর নিজের পবিত্র মুখ খুলে দিলেন এবং তিনি (হাসান) আপন মুখ তাঁর (রাসূলের) বরকতময় মুখের ভেতর প্রবেশ করালেন।"৩
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেনঃ যায়দ ইবন হারিছা (রা) (যিনি রাসুল (সা)-এর গোলাম ছিলেন)। যখন মদীনায় এলো, তখন তিনি ঘরেই ছিলেন। সে ঘরে এলো এবং দরজায় আঘাত করল। রাসূলুল্লাহ (সা) তখনই উঠে পড়লেন। সে সময় তাঁর শরীরের সর্বত্র কাপড়-ঢাকা ছিল না, শরীর থেকে চাদর গড়িয়ে পড়ছিল। এ অবস্থায় তিনি তাকে (যায়দ) দেখে জড়িয়ে ধরলেন, কোলাকুলি করলেন এবং চুমু খেলেন।"'
উসামা ইবন যায়দ (রা) বর্ণনা করেনঃ "রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জনৈক কন্যা রাসূল (সা)-কে পয়গাম পাঠান, আমার বাচ্চা মরণাপন্ন, মেহেরবানি করে আসুন। তিনি তাকে সালাম পাঠালেন এবং বললেন, সবই আল্লাহর- যা তিনি নিয়েছেন এবং যা তিনি দিয়েছেন। প্রতিটি বস্তু তাঁর দরবারে নামাঙ্কিত ও নির্ধারিত। অতএব ধৈর্যধারণ কর এবং পুরস্কারের প্রত্যাশী হও, আশায় বুক বাঁধো।
কন্যা কসম দিয়ে পাঠালেন, যেন তিনি অবশ্যই একবার আসেন। তিনি যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন এবং আমরাও তাঁর সাথে উঠে দাঁড়ালাম। তিনি সেখানে গিয়ে বসলে কোলে করে শিশুটি সেখানে আনা হলো। তিনি তাকে কোলে তুলে নিলেন। ঐ সময় তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে। এ দেখে তাঁর চোখ ফেটে অবিরলধারায় পানি পড়তে লাগল। হযরত সা'দ (রা) আরয করলেন: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ কি (আপনিও কাঁদছেন)!' তিনি বললেনঃ এ স্নেহ-মমতার বহিঃপ্রকাশ- যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের ভেতর যাকে চান দান করে থাকেন। আর আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রহমদিল বান্দাদের ওপরই দয়া প্রদর্শন করে থাকেন।২
বদরের যুদ্ধবন্দীদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আপন চাচা আব্বাস (রা)- ও (তখনও তিনি মুসলমান হন নি) ছিলেন। অন্য যুদ্ধবন্দীদের মত তাঁকেও কষে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ফলে, তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন আর তাঁর কাতরানির কারণে তিনি ঘুমাতে পারছিলেন না। জনৈক সাহাবী বিষয়টি বুঝতে পেরে হযরত আব্বাস (রা)-এর বাঁধন একটু ঢিলা করে দিলেন। আনসার সাহাবীর এই মমতা দেখানো আল্লাহ্র রাসূল (সা)-কে উৎসাহিত করতে পারেনি। তিনি চাননি যে হযরত আব্বাস (রা) ও একজন সাধারণ যুদ্ধবন্দীর মধ্যে কোনরূপ ভিন্ন আচরণ করা হোক। ফলে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইচ্ছামতো অপরাপর বন্দীদের বাঁধনও অনুরূপ ঢিলা করে দেয়া হয়।
আনসার সাহাবী যখন দেখতে পেলেন, হযরত আব্বাস-এর বাঁধন ঢিলা করে দেয়াতে আল্লাহ্র রাসূল খুশি হয়েছেন, তখন তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তাঁর চাচাকে মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দেয়া হোক। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর এই পরামর্শ গ্রহণ করেননি।'
একবার জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে উপস্থিত হলো এবং বলতে লাগল: "আপনারা কি আপনাদের ছেলেমেয়েদের স্নেহ করেন, মায়া করেন, ভালোবাসেন? আমরা তো তাদের মায়া করি না, ভালোবাসি না।" আল্লাহ্র রাসূল (সা) বললেন: “যদি আল্লাহ্ তা'আলা তোমার অন্তর থেকে দয়া-মায়া উঠিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমি আর তোমাদের জন্য কী করতে পারি?"২
তিনি শিশুদের প্রতি খুবই সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ ও কোমল আচরণ করতেন। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন: "একবার রাসূল (সা) খেলাধুলায় মত্ত কয়েকটি শিশুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দিলেন।"°
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের সঙ্গে একেবারে মিশে থাকতেন। আমার এক কনিষ্ঠ ভাইকে তিনি বলতেন, ওহে উমায়র! তোমার নুগায়র (একটা ছোট পাখি- যা নিয়ে শিশুরা বেশি সময় খেলা করে থাকে)-এর কি হলো?"৪
মুসলমানদের প্রতি তিনি অত্যন্ত সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন। তিনি তাদের অবস্থার প্রতি খুব লক্ষ্য করতেন। মানব স্বভাবে বিরক্তি ও ক্লান্তিবোধ এবং সাময়িকভাবে তাদের মাঝে ভীরুতা ও কাপুরুষতা সৃষ্টি হওয়া বিচিত্র নয়। এসবের দিকে তিনি বরাবর লক্ষ্য রাখতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে যে ওয়ায-নসীহত করতেন তা বিরতি দিয়ে করতেন এবং তা এজন্য করতেন যাতে তা আমাদের মাঝে বিরক্তি বা একঘেঁয়েমী সৃষ্টি না করে। সালাত বা নামাযের সঙ্গে এতটা প্রেম ও আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও যদি কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেতেন অমনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে দিতেন। তিনি নিজে বলেছেন: "আমি সালাতে দাঁড়াই এবং চাই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তা আদায় করি। অতঃপর কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। তখন এই ধারণায় সালাত সংক্ষিপ্ত করি যাতে তার মায়ের কোনরূপ উৎকণ্ঠা কিংবা মানসিক পীড়ার কারণ না হয়।"১
হযরত অবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) আরও বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে আরয করল, হে আল্লাহ্র রাসূল (সা)! আমি আমার মহল্লায় ফজরের নামাযে কেবল এজন্যই হাযির হই না যে, অমুক লোক সালাত খুবই দীর্ঘ আদায় করে থাকে। এরপর তিনি যে ওয়ায করলেন এর থেকে রাগান্বিত অবস্থায় আর কোন ওয়ায করতে আমি তাঁকে দেখিনি। তিনি বললেন: "তোমাদের মধ্যে সেইসব লোক রয়েছে যারা (ইবাদত ও সালাতের প্রতি) মানুষকে বিতৃষ্ণ ও বিরক্ত করে তুলছে। তোমাদের মধ্যে যারা সালাতে ইমামতি করবে, তাদের উচিত হবে তা সংক্ষিপ্ত করা। কেননা জামা'আতে উপস্থিত মুসল্লীদের মধ্যে দুর্বল লোক যেমন রয়েছে, তেমনি বৃদ্ধ ও প্রয়োজনের তাগিদে ব্যস্ত লোকও রয়েছে।"২
এই প্রসঙ্গে বলতে চাই, মহিলা যাত্রীদলে ছিল আনজাশা নামে জনৈক সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী- যার সুরেলা আবৃত্তিতে উট দ্রুত ছুটত। মহিলাদের এতে কষ্ট হতো। এই দেখে তিনি একদিন আনজাশাকে বললেন: “ওহে আনজাশা! একটু আস্তে। কাঁচের পাত্রগুলো ভেঙে যেতে পারে (অর্থাৎ দ্রুতগতির কারণে দুর্বল ও কোমল স্ত্রীলাকদের যেন কষ্ট না হয়)।"৩
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বক্ষ মুবারককে সব রকমের হিংসা-বিদ্বেষ ও অপরের ক্ষতি ও অমঙ্গল কামনা থেকে সযত্নে মুক্ত রেখেছিলেন। তাই তিনি বলতেন, "তোমাদের কেউ যেন আমার সামনে অপর কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ না করে। কেননা আমি চাই, তোমাদের সামনে যেন আমি এমন ভাবে হাযির হতে পারি যাতে, তোমাদের প্রতি আমার দিল সাফ থাকে।”১
মুসলমানের পক্ষে তিনি ছিলেন স্নেহশীল পিতার মতই, আর সমস্ত মুসলমান ছিল যেন তাঁর পরিবার-পরিজনের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের সকলের যিম্মাদারী যেন তাঁরই কাঁধে ন্যস্ত। তিনি তাদের উপর এতটা সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন যতটা হয়ে থাকেন একজন মা তার সন্তানের প্রতি। مسلمانوں নিকট তাদের ধন-সম্পদ ও তাদের জীবিকার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা'আলা যে প্রাচুর্য দান করেছিলেন তার সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তাদের ঋণ ও তাদের পিঠের ওপর চাপানো বোঝা হালকা করে তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, "কেউ সম্পত্তি রেখে-মারা গেলে, তা তার উত্তরাধিকারী তথা ওয়ারিসদের, আর কেউ ঋণ রেখে মারা গেলে তা পরিশোধের দায়িত্ব আমার। "২
অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি বলতেন, "এমন কোন মুমিন নেই যার দুনিয়া ও আখিরাতে আমার চেয়ে বড় কোন অভিভাবক আছে। যদি চাও এই আয়াত পড়তে পার:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِيْنَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ .
নবী মুমিনদের জন্য তাদের জীবনের চেয়েও বেশি বন্ধু ও সুহৃদ হয়ে থাকেন। [সূরা আহযাব: ৬]
এজন্যে কোন মুসলমান ইন্তিকাল করলে এবং তার পরিত্যক্ত কোন সম্পদ থাকলে, তা তার ওয়ারিস ও নিকটত্মীয়দের অধিকার হিসেবে গণ্য হবে, তা সে যেই হোক! কিন্তু যদি তার যিম্মায় কোন ঋণ থাকে, তবে সে যেন আমার কাছে আসে। তার অভিভাবক ও যিম্মাদার আমি।""
টিকাঃ
৪. আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণিত
১. শামাইলে তিরমিযী
২. আল-আদাবুল-মুফরাদ, বুখারী
৩. আল-আদাবুল-মুফরাদ, বুখারীকৃত পৃঃ ৭৩
১. তিরমিযী
২. বুখারী, কিতাবুল মারদ্বা, কিতাবুজ জানাইয بأب قول النبي صلى الله عليه وسلم يعذب الميت ببكاء اهله
১. ফাতহুল বারী, ৮ম. খণ্ড, পৃঃ ৩২৪ মিসরী সংস্করণ
২. বুখারী, আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীস, কিতাবুল আদব
৩. বুখারী
৪. আল-আদাবুল মুফরাদ
১. বুখারী, কিতাবুস-সালাত
২. প্রাগুক্ত
৩. আল-আদাবুল মুফরাদ, এ ছাড়াও বুখারী ও মুসলিম
১. কিতাবুশ-শিফা, পৃঃ ৫৫, আবূ দাউদ সূত্রে বর্ণিত
২. বুখারী, কিতাবুল-ইসতিযকার
৩. বুখারী, কিতাবুল-ইসতিযকার