📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ পয়গাম্বর এবং বিশ্বের জন্য অনুগ্রহ স্বরূপ দ্বীনি দাওয়াত

📄 বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ পয়গাম্বর এবং বিশ্বের জন্য অনুগ্রহ স্বরূপ দ্বীনি দাওয়াত


আমরা এ ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবের পর বিশ্বে তার প্রভাব সম্পর্কে আমার পুস্তক 'নবীয়ে রহমত'-এর সমাপ্তি আলোচনার মধ্যমে সমাপ্ত করতে চাই, যাতে পুস্তকটি সুন্দরভাবে সমাপ্ত হয়। মহানবী (সা)-এর শুভাগমনের বরকতে ও তাঁর মহান শিক্ষার বদৌলতে বদলে গেল পৃথিবী, বদলে গেল মানুষের মন-মেজাজ, অন্তরে আল্লাহ্র প্রতি ভালোবাসার স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল। আল্লাহ্প্রাপ্তির আগ্রহ ব্যাপক হলো। মানুষের মাঝে এক নতুন ধ্যান-ধারণা, আল্লাহকে সন্তষ্ট করার মেজাজ, আল্লাহর সৃষ্টিকে আল্লাহর সাথে মিলিয়ে দেয়া এবং তাদের উপকার করার আগ্রহ সৃষ্টি হলো। বর্ষার আগমনে যেমন গ্রীষ্মের খরতাপ, লু-হাওয়া, প্রচণ্ড দাবদাহ ও দুর্ভিক্ষঘেরা এক ভয়ংকর ঋতু থেকে মুক্তি লাভ করে এমন এক ঋতুতে পৌছে, যেখানে গলাগলি করছে ফুল আর বসন্ত, নতুন নতুন কুঁড়ি ফোটে, সবকিছু সবুজ সতেজ হয়ে ওঠে। অনুররূপভাবে, মহানবী মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবে অন্তরসমূহে উত্তাপ, মস্তিষ্কের নতুন উদ্যমতা এবং মাথায় নতুন উদ্দীপনা প্রবিষ্ট হলো, লক্ষ- কোটি মানুষ নিজেদের প্রকৃত মনযিলের সন্ধানে ও সেখানে পৌঁছার জন্য বেরিয়ে পড়ল।
প্রত্যেক রাষ্ট ও জাতির প্রবৃত্তিতে এটাই নেশা এবং প্রত্যেক শ্রেণীর মধ্যে এর প্রতিযোগিতার উদ্দীপনা দৃষ্টিগোচর হলো, পাল্টে গেল মানুষের স্বভাব- প্রকৃতি। আরব, আজম, মিসর, তুরস্ক, ইরান, খোরাসান, উত্তর আফ্রিকা, স্পেন, অবশেষে আমাদের দেশ হিন্দুস্থান ও পূর্ব হিন্দুস্থানের সবাই এই জগতের ইশক- মহব্বত ও প্রেম-ভালবাসায় হয়ে পড়লো বেকারার ও দেওয়ানা। মানবতা যেন শত শত বছরের দীর্ঘ ও গভীর ঘুম শেষে চোখ মেলে তাকাল, অতঃপর তারা ঘুমের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিতে চাইল ফলে মানবতার প্রতিটি গোষ্ঠী থেকে জন্ম নিলেন, আল্লাহর পথের অসংখ্য দাঈ, আল্লাহ্-প্রেমিক ও আল্লাহ্-সন্ধানী দুঃসাহসী আবেদ-কামিল, মাখলুকের ব্যাথায় ব্যতিত, মানবতার কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ এবং আরো এমন সব মনীষী ও ব্যক্তিত্ব, নূরের ফেরেশতাকুলের কাছেও যাঁরা ঈর্ষার কারণ, তাঁরা সবাই মিলে কী করলেন?
তাঁরা বিরান ও অনাবাদ হৃদয়গুলোকে আবাদ করলেন, আল্লাহ্-প্রেমের মশাল জ্বেলে বইয়ে দিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও হিকমত-মারেফাতের হাজারো সালসাবিল; নির্যাতিত মানুষের হৃদয়ে স্থাপন করলেন জুলুম-নিপীড়ন, অন্যায়-অবিচার এবং দুশমনী ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক প্রচণ্ড দ্রোহ, নির্যাতিত, অপমানিত ও লাঞ্ছিত মানবতাকে শিক্ষা দিলেন সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব আর উপেক্ষিত, বিতাড়িত ও অসহায় মানবগোষ্ঠীকে টেনে নিলেন সেই বুকে যা আবাদ হয়ে আছে শুধু প্রেম, ভালবাসা ও মায়া মমতায় মনে হয় যেন বৃষ্টির ফোটার ন্যায় যমীনের প্রতিটি আনাচে কানাচে তারা অবতরণ করেছেন-যা গণনা করা অসম্ভব।
এঁদের সংখ্যার কথা বাদ দিয়ে এঁদের গুণও দেখুন। তাঁদের উন্নত চিন্তা, জাগ্রত বিবেকবোধ, প্রশান্ত আত্মা, তীক্ষ্ণধী ও নির্মল স্বভাব-চরিত্র সম্বন্ধে পাঠ করুন। কেমন করে এঁরা আর্ত মানবতার ব্যথায় ব্যথিত হতেন এবং নিজেকে তাদের সেবায় বিলিয়ে দিতেন। সৃষ্টিলোকের দুঃখ-দুর্দশায় তাঁদের পবিত্র আত্মাগুলো কিভাবে বিগলিত হতো সমবেদনায়, সহমর্মিতায়। মানবতার মুক্তির স্বার্থে নিজেদেরকে কিভাবে তাঁরা যে কোন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতেন হাসিমুখে আর নিজেদের সন্তান ও সংশ্লিষ্টদেরকেও চরম পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিতেন।
তাদের আমীর ও শাসকগণ ছিলেন কতটা পূর্ণ দায়িত্বসচেতন ও আমানতদার এবং তাদের প্রজাসাধারণ তাদের আনুগত্যে কতটা উদ্বুদ্ধ ছিল। তাদের ইবাদতের উৎসাহ, তাদের প্রার্থনার শক্তি, তাদের অধ্যাবসায় ও দারিদ্র্য-সেবার উদ্দীপনা এবং উন্নত চরিত্রের ঘটনাবলী পাঠ করুন। প্রবৃত্তির পথে তাদের শুচি, আত্মসমালোচনা, দূর্বলদের প্রতি করুণা, বন্ধুবাৎসল্য, শত্রুর প্রতি কৃপা এবং সহানুভূতি সৃষ্টির নমুনা দেখুন। অনেক সময় কবি-সাহিত্যিকের কল্পনা বিলাসও এতটা উচ্চতায় পৌঁছতে পারেনি- যেখানে তাঁরা স্বকৃতিসহ দৈহিকভাবে উপনীত হয়েছেন। যদি ইতিহাসের সনদযুক্ত ও ধারাবাহিক সাক্ষ্য না থাকত, তা হলে এ ঘটনাগুলো কিসসা-কাহিনী ও রূপক বলেই মনে হতো। এ মহাবিপ্লব মুহাম্মদ রাসূল (সা)-এর বিশাল মু'জিযা ও তাঁর রাহমাতুল্লিল 'আলামিন হওয়ারই কারিশমাঁ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00