📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 মানব সভ্যতাকে কর্মচঞ্চল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকা উচিত

📄 মানব সভ্যতাকে কর্মচঞ্চল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকা উচিত


ইসলামের সাংস্কৃতিক উপহার এবং মানব সভ্যতায় তার অবদানের ব্যাখ্যা এবং মানবতার কাফেলাকে ধ্বংস ও আত্মহত্যা থেকে রক্ষা করা, তার উন্নতি ও অগ্রগতি সাধনের ক্ষেত্রে ইসলামের সুমহান ভূমিকার কথা আলোচনা করার পর একটি চিরন্তন ও ঐতিহাসিক সত্য বিষয় সুস্পষ্ট করা অত্যাবশ্যক। আর তা হলো, মানব সভ্যতায় প্রভাবশালী কর্মতৎপরতা এবং বিভিন্ন সময়ে তার নতুনভাবে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করা; তাকে উপকারী অতীত ও কল্যাণকর বর্তমানের সাথে সংযুক্ত ও সংমিশ্রণ করা এবং তাকে ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর উপাদান এবং ফাসেদ বা বিনষ্টকারী চিন্তা ও উপাদান থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ স্বতন্ত্র ও নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয় তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্য এই যে, মুসলিম উম্মাহ ঐ সময় পর্যন্ত মানব সভ্যতার উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে না যতদিন তারা অন্য সভ্যতার দস্তরখানে উচ্ছিষ্ট কুড়াতে থাকবে এবং তাদের ঝর্ণাধারা থেকে তৃষ্ণা নিবারণ করতে থাকবে, তাদের প্রভাবে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকবে। এ অবস্থায় তারা অন্য জাতিকে নিজেদের অনুসারী হওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা তো দূরের কথা, অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেও সক্ষম হবে না।
এটা তখনই সম্ভব যখন মুসলিম উম্মাহ পরিপূর্ণভাবে তার সভ্যতার স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার ব্যাপারে বিশ্বাসী ও আস্থাশীল হবে এবং তার শিক্ষা-সংস্কৃতি আল্লাহ্ প্রদত্ত ও অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হবার বিষয়ে পূর্ণ ঈমানদার হবে; আর তা সর্ব যুগে ও সকল স্থানে প্রযোজ্য ও কল্যাণকর। কারণ, তা সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, কুরআন-সুন্নাহ থেকে সংগৃহীত রব্বানী দিকনির্দেশনা ও প্রিয়নবী (সা)-এর শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত। এ সভ্যতার মাঝে শালীনতা ও পাক-পবিত্রতার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কারণ, তাদের 'তাহারাত'-এর অর্থ শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সমার্থক নয়, আর তাদের শালীনতার অর্থ শুধু চারিত্রিক ও নৈতিক বিশৃংখলা থেকে বিরত থাকার মধ্যে নয়; বরং তার অর্থ ব্যাপক বিস্তৃত এবং এর মর্ম সুদূরপ্রসারী।
ইসলামি জীবনব্যবস্থা পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে কোন প্রকার সামঞ্জস্য রাখে না। কারণ, পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্ম ও বিকাশ একটি বিশেষ ঐতিহ্যের প্রভাব-প্রতিপত্তির ছত্রছায়ায় ও এক বিশেষ পরিবেশে ঘটেছিল- যার উপর বস্তুবাদের প্রাধান্য রয়েছে এবং এক সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত তার উপর ধর্ম বিদ্বেষী ও আখলাক-চরিত্র ও সুস্থ মূল্যবোধের সাথে বিদ্রোহকারীদের শাসন ছিল। যেমন- এ সভ্যতা ও তার ইতিহাস সম্পর্কে অভিজ্ঞ ডঃ আল্লামা ইকবাল এ মতই ব্যক্ত করেছেন- 4 " ع ۔ رکه ورح اس مدینت کی رہ سکی نہ عقیف تھا
নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, নতুন নতুন শিল্প আবিষ্কার, বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন এবং ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য ও মহত্ত্ব, সরলতা ও বাস্তবতাপ্রিয়তা, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি দৃষ্টি এবং অপচয় ও অপব্যয় এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিকাশ ও জৌলুসপ্রিয়তা থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে পরস্পর সমন্বয় ও সংমিশ্রণ বর্তমানে অত্যন্ত সহজ। যদি মুসলিম দেশ ও সমাজগুলো স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে, ধীরস্থির ও সাহসিকতার সাথে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করার সামর্থ্য লাভ করে এবং তারা যদি বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভার দীপ্তি, ইসলামি শিক্ষা ও ইসলামি সভ্যতাকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে ঈমান ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। কারণেই তাদের অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে; সেই সাথে যদি নিজেদের ইসলামি স্বতন্ত্র সত্তা ও ঐত্যিহ্যের উপর গর্ব করার অনুপ্রেরণা তাদের মাঝে সক্রিয় থাকে।

📘 বিশ্ব সভ্যতায় রাসূলে ﷺ > 📄 বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ পয়গাম্বর এবং বিশ্বের জন্য অনুগ্রহ স্বরূপ দ্বীনি দাওয়াত

📄 বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ পয়গাম্বর এবং বিশ্বের জন্য অনুগ্রহ স্বরূপ দ্বীনি দাওয়াত


আমরা এ ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবের পর বিশ্বে তার প্রভাব সম্পর্কে আমার পুস্তক 'নবীয়ে রহমত'-এর সমাপ্তি আলোচনার মধ্যমে সমাপ্ত করতে চাই, যাতে পুস্তকটি সুন্দরভাবে সমাপ্ত হয়। মহানবী (সা)-এর শুভাগমনের বরকতে ও তাঁর মহান শিক্ষার বদৌলতে বদলে গেল পৃথিবী, বদলে গেল মানুষের মন-মেজাজ, অন্তরে আল্লাহ্র প্রতি ভালোবাসার স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল। আল্লাহ্প্রাপ্তির আগ্রহ ব্যাপক হলো। মানুষের মাঝে এক নতুন ধ্যান-ধারণা, আল্লাহকে সন্তষ্ট করার মেজাজ, আল্লাহর সৃষ্টিকে আল্লাহর সাথে মিলিয়ে দেয়া এবং তাদের উপকার করার আগ্রহ সৃষ্টি হলো। বর্ষার আগমনে যেমন গ্রীষ্মের খরতাপ, লু-হাওয়া, প্রচণ্ড দাবদাহ ও দুর্ভিক্ষঘেরা এক ভয়ংকর ঋতু থেকে মুক্তি লাভ করে এমন এক ঋতুতে পৌছে, যেখানে গলাগলি করছে ফুল আর বসন্ত, নতুন নতুন কুঁড়ি ফোটে, সবকিছু সবুজ সতেজ হয়ে ওঠে। অনুররূপভাবে, মহানবী মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবে অন্তরসমূহে উত্তাপ, মস্তিষ্কের নতুন উদ্যমতা এবং মাথায় নতুন উদ্দীপনা প্রবিষ্ট হলো, লক্ষ- কোটি মানুষ নিজেদের প্রকৃত মনযিলের সন্ধানে ও সেখানে পৌঁছার জন্য বেরিয়ে পড়ল।
প্রত্যেক রাষ্ট ও জাতির প্রবৃত্তিতে এটাই নেশা এবং প্রত্যেক শ্রেণীর মধ্যে এর প্রতিযোগিতার উদ্দীপনা দৃষ্টিগোচর হলো, পাল্টে গেল মানুষের স্বভাব- প্রকৃতি। আরব, আজম, মিসর, তুরস্ক, ইরান, খোরাসান, উত্তর আফ্রিকা, স্পেন, অবশেষে আমাদের দেশ হিন্দুস্থান ও পূর্ব হিন্দুস্থানের সবাই এই জগতের ইশক- মহব্বত ও প্রেম-ভালবাসায় হয়ে পড়লো বেকারার ও দেওয়ানা। মানবতা যেন শত শত বছরের দীর্ঘ ও গভীর ঘুম শেষে চোখ মেলে তাকাল, অতঃপর তারা ঘুমের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিতে চাইল ফলে মানবতার প্রতিটি গোষ্ঠী থেকে জন্ম নিলেন, আল্লাহর পথের অসংখ্য দাঈ, আল্লাহ্-প্রেমিক ও আল্লাহ্-সন্ধানী দুঃসাহসী আবেদ-কামিল, মাখলুকের ব্যাথায় ব্যতিত, মানবতার কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ এবং আরো এমন সব মনীষী ও ব্যক্তিত্ব, নূরের ফেরেশতাকুলের কাছেও যাঁরা ঈর্ষার কারণ, তাঁরা সবাই মিলে কী করলেন?
তাঁরা বিরান ও অনাবাদ হৃদয়গুলোকে আবাদ করলেন, আল্লাহ্-প্রেমের মশাল জ্বেলে বইয়ে দিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও হিকমত-মারেফাতের হাজারো সালসাবিল; নির্যাতিত মানুষের হৃদয়ে স্থাপন করলেন জুলুম-নিপীড়ন, অন্যায়-অবিচার এবং দুশমনী ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক প্রচণ্ড দ্রোহ, নির্যাতিত, অপমানিত ও লাঞ্ছিত মানবতাকে শিক্ষা দিলেন সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব আর উপেক্ষিত, বিতাড়িত ও অসহায় মানবগোষ্ঠীকে টেনে নিলেন সেই বুকে যা আবাদ হয়ে আছে শুধু প্রেম, ভালবাসা ও মায়া মমতায় মনে হয় যেন বৃষ্টির ফোটার ন্যায় যমীনের প্রতিটি আনাচে কানাচে তারা অবতরণ করেছেন-যা গণনা করা অসম্ভব।
এঁদের সংখ্যার কথা বাদ দিয়ে এঁদের গুণও দেখুন। তাঁদের উন্নত চিন্তা, জাগ্রত বিবেকবোধ, প্রশান্ত আত্মা, তীক্ষ্ণধী ও নির্মল স্বভাব-চরিত্র সম্বন্ধে পাঠ করুন। কেমন করে এঁরা আর্ত মানবতার ব্যথায় ব্যথিত হতেন এবং নিজেকে তাদের সেবায় বিলিয়ে দিতেন। সৃষ্টিলোকের দুঃখ-দুর্দশায় তাঁদের পবিত্র আত্মাগুলো কিভাবে বিগলিত হতো সমবেদনায়, সহমর্মিতায়। মানবতার মুক্তির স্বার্থে নিজেদেরকে কিভাবে তাঁরা যে কোন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতেন হাসিমুখে আর নিজেদের সন্তান ও সংশ্লিষ্টদেরকেও চরম পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিতেন।
তাদের আমীর ও শাসকগণ ছিলেন কতটা পূর্ণ দায়িত্বসচেতন ও আমানতদার এবং তাদের প্রজাসাধারণ তাদের আনুগত্যে কতটা উদ্বুদ্ধ ছিল। তাদের ইবাদতের উৎসাহ, তাদের প্রার্থনার শক্তি, তাদের অধ্যাবসায় ও দারিদ্র্য-সেবার উদ্দীপনা এবং উন্নত চরিত্রের ঘটনাবলী পাঠ করুন। প্রবৃত্তির পথে তাদের শুচি, আত্মসমালোচনা, দূর্বলদের প্রতি করুণা, বন্ধুবাৎসল্য, শত্রুর প্রতি কৃপা এবং সহানুভূতি সৃষ্টির নমুনা দেখুন। অনেক সময় কবি-সাহিত্যিকের কল্পনা বিলাসও এতটা উচ্চতায় পৌঁছতে পারেনি- যেখানে তাঁরা স্বকৃতিসহ দৈহিকভাবে উপনীত হয়েছেন। যদি ইতিহাসের সনদযুক্ত ও ধারাবাহিক সাক্ষ্য না থাকত, তা হলে এ ঘটনাগুলো কিসসা-কাহিনী ও রূপক বলেই মনে হতো। এ মহাবিপ্লব মুহাম্মদ রাসূল (সা)-এর বিশাল মু'জিযা ও তাঁর রাহমাতুল্লিল 'আলামিন হওয়ারই কারিশমাঁ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00