📄 পশ্চিমা পন্ডিতদের সাক্ষ্য
এ অনন্য ঐক্যের বিষয়টি বেশ কয়েকজন পশ্চিমা পণ্ডিত-চিন্তাবিদ ও গবেষক অনুভব করেছেন এবং এর স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। আমরা এখানে শুধু কয়েকটি সাক্ষ্য উল্লেখ করাকে যথেষ্ট মনে করছি।
হ্যামিলটন গিভ লিখেছেন
"ইসলাম একটি চিন্তা, যা অত্যন্ত সুশৃংখল। কিন্তু তা বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ঐক্যের আদলে প্রকাশ পেয়েছে। তা স্থান-কাল-পাত্রভেদে এবং স্থানীয় ও ভৌগোলিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ- পশ্চিম এশিয়ার ইসলামি কেন্দ্রের সাথে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার এবং মধ্যযুগের স্পেনের গভীর সম্পর্ক ছিল। তাদের সভ্যতা ঐ কেন্দ্রীয় সভ্যতারই একটি শাখা ছিল। তদুপরি তারা তাতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিশেষত্বের অধিকারী ছিল। ফলে, তারা পশ্চিম এশিয়ার উপরে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। এছাড়া, অন্যান্য বৃহত্তর ও স্বাধীন অঞ্চল, যেমন ভারত উপমহাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ রাশিয়ার মরুভূমি এলাকা থেকে চীনের সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত ভারসাম্যময় উপাদানসমূহ এভাবেই বিশেষ বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এরপরেও তারা সকলেই এবং তাদের প্রত্যেকেই সহজে বোধগম্য ইসলামি রঙকে ধারণ করে থাকে।"১
উইলফ্রেড কান্টওয়েল স্মিথ লিখেছেন: "মুসলমানদের সফলতাই হলো তাদের ধর্মের অভ্যন্তরীণ সফলতা। তারা যে শুধু যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী হয়েছে এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে, এমন নয়; বরং তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে তারা জীবনকে একটি সামগ্রিক রূপদানে সফল হয়েছে- যাকে সভ্যতা বলা হয়। ইসলামি সভ্যতার গঠন ও রূপদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী অংশগ্রহণ করেছিল। যেমন- আরব, গ্রীক, মধ্যপ্রাচ্যের সেমিটিক সভ্যতা, ইরানের সাসানী সভ্যতা ও ভারতীয় উপাদানসমূহ ভূমিকা পালন করেছে। এক্ষেত্রে, مسلمانوں প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তারা ঐ সকল উপাদানকে একটি সমজাতীয় জীবনপদ্ধতিতে একাকার করেছে এবং তাকে আরো উন্নত করেছে। একমাত্র ইসলামই তাকে পূর্ণতা দান করেছে এবং তা ব্যাহত রাখার মত শক্তি সরবরাহ করেছে। জীবনের প্রতিটি শাখায় তা ইসলামি রূপদান করেছে; যদিও তার গঠনগত উপাদানসমূহের বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি ভিন্ন ছিল।
"ইসলামি জীবনপদ্ধতি সমাজকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করেছে। তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন মৌলিক ভূমিকা পালন করেছে। এ ইসলামি বিধান স্বীয় শক্তিশালী ও নির্ধারিত প্রবাহের মাধ্যমে সামাজিক রীতি- নীতি ও ইবাদত-বন্দেগী হতে শুরু করে মালিকানা পর্যন্ত সকল বিষয়কে সুশৃংখল ও সুসংহত করেছে। ইসলামি বিধিবিধানই ইসলামি সমাজকে কর্ডোভা থেকে মুলতান পর্যন্ত সকলকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। এ বিধিবিধানই মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং তাদের জীবনের সকল কর্মতৎপরতাকে ফেরেশতাসুলভ বৈশিষ্ট্য দান করে অর্থবহ করেছে। সমাজকে ধারাবাহিকতা প্রদান করে তা যুগের মাঝে ঐক্য সৃষ্টি করেছে। ফলে, রাজা-বাদশাহগণ ধারাবাহিকভাবে আগমন ও প্রস্থান করেছেন কিন্তু ভূপৃষ্ঠে রব্বানী বিধান অনুযায়ী সমাজ গঠনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় তাদের অবস্থান অত্যন্ত গৌণ ছিল।"১
টিকাঃ
১. Hamilton A. R. Gibb, Studies on Civilization of Islam. (London-1962) p. 3.
১. Wilfared Cantwell Smith. Islam in Modern History. (New York. 1957) p. 36-37.
📄 ইসলামি সভ্যতার প্রাণ ও প্রকৃতি
ইসলামি সভ্যতা এমন এক সভ্যতা- যার প্রাণ ও প্রকৃতিই হলো আল্লাহর পবিত্র নাম ও তাঁর প্রতি ঈমান ও ইয়াকীন। এ সভ্যতা আল্লাহর রঙে রঙিন হওয়া এবং ঈমান ও আমলের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এ জন্য তাকে ধর্মীয় রঙ, রব্বানী প্রকৃতি ও ঈমানী প্রাণ থেকে পৃথক করা অসম্ভব। তাই যদি কখনো তার উপর জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণা, জাহিলী অহমিকা, বংশগত দ্বন্দ্ব, বস্তুবাদী মানসিকতা, নৈতিক অবক্ষয়, কিংবা সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করে, তবে তা সাময়িক বা বহিরাগত প্রভাবের ফল। অথবা ঐ ধর্ম, সমাজ ও সামাজিকতার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ঐ মুসলিম জনগোষ্ঠী বসবাস করে। অথবা তা ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে প্রভাবিত ও উপকৃত না হওয়া এবং পবিত্র কুরআন ও হাদীস, ইসলামের প্রথম ও মৌলিক উৎসের সাথে গভীর সম্পর্ক না থাকার কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
📄 ইসলামি ইতিহাসে সংস্কার ও সংশোধন আন্দোলনের সফলতার রহস্য
এজন্য মুসলিম দেশ ও জাতি-গোষ্ঠীর ইতিহাসে সংস্কার ও সংশোধন, ফাসাদ ও বিদ'আত এবং জাহিলীপনার প্রভাবের বিরুদ্ধে জিহাদ ও প্রতিরোধের এমন অব্যাহত ধারা রয়েছে- যার দৃষ্টান্ত ইসলাম ছাড়া অন্য কোন জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্মীয় ইতিহাসে পাওয়া যায় না। এমনিভাবে, এ মুবারক প্রচেষ্টায় এমন সফলতা অর্জিত হয়েছে যা অন্য সকল জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্মীয় ইতিহাসে বিরল। আর এমনটা হওয়া এ জন্য সম্ভব হয়েছে, কারণ- এ প্রচেষ্টা এ উম্মতের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, তার প্রাণ ও তার চিন্তা-চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তা ঐ সকল মূলনীতি ও বুনিয়াদী শিক্ষার ব্যাখ্যা, যার উপর এ উম্মতের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত এবং এখান থেকে তাদের ঐতিহাসিক সফর শুরু হয়েছিল।'
টিকাঃ
১. এ বিষয়ে লেখকের গ্রন্থ 'তারিখে দাওয়াত ওয়া আযীমত' প্রথম খন্ডের ভূমিকা এবং এ সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে পঞ্চম খন্ড দেখা যেতে পারে।
📄 মানব সভ্যতাকে কর্মচঞ্চল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকা উচিত
ইসলামের সাংস্কৃতিক উপহার এবং মানব সভ্যতায় তার অবদানের ব্যাখ্যা এবং মানবতার কাফেলাকে ধ্বংস ও আত্মহত্যা থেকে রক্ষা করা, তার উন্নতি ও অগ্রগতি সাধনের ক্ষেত্রে ইসলামের সুমহান ভূমিকার কথা আলোচনা করার পর একটি চিরন্তন ও ঐতিহাসিক সত্য বিষয় সুস্পষ্ট করা অত্যাবশ্যক। আর তা হলো, মানব সভ্যতায় প্রভাবশালী কর্মতৎপরতা এবং বিভিন্ন সময়ে তার নতুনভাবে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করা; তাকে উপকারী অতীত ও কল্যাণকর বর্তমানের সাথে সংযুক্ত ও সংমিশ্রণ করা এবং তাকে ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর উপাদান এবং ফাসেদ বা বিনষ্টকারী চিন্তা ও উপাদান থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ স্বতন্ত্র ও নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয় তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্য এই যে, মুসলিম উম্মাহ ঐ সময় পর্যন্ত মানব সভ্যতার উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে না যতদিন তারা অন্য সভ্যতার দস্তরখানে উচ্ছিষ্ট কুড়াতে থাকবে এবং তাদের ঝর্ণাধারা থেকে তৃষ্ণা নিবারণ করতে থাকবে, তাদের প্রভাবে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকবে। এ অবস্থায় তারা অন্য জাতিকে নিজেদের অনুসারী হওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা তো দূরের কথা, অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেও সক্ষম হবে না।
এটা তখনই সম্ভব যখন মুসলিম উম্মাহ পরিপূর্ণভাবে তার সভ্যতার স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার ব্যাপারে বিশ্বাসী ও আস্থাশীল হবে এবং তার শিক্ষা-সংস্কৃতি আল্লাহ্ প্রদত্ত ও অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হবার বিষয়ে পূর্ণ ঈমানদার হবে; আর তা সর্ব যুগে ও সকল স্থানে প্রযোজ্য ও কল্যাণকর। কারণ, তা সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, কুরআন-সুন্নাহ থেকে সংগৃহীত রব্বানী দিকনির্দেশনা ও প্রিয়নবী (সা)-এর শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত। এ সভ্যতার মাঝে শালীনতা ও পাক-পবিত্রতার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কারণ, তাদের 'তাহারাত'-এর অর্থ শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সমার্থক নয়, আর তাদের শালীনতার অর্থ শুধু চারিত্রিক ও নৈতিক বিশৃংখলা থেকে বিরত থাকার মধ্যে নয়; বরং তার অর্থ ব্যাপক বিস্তৃত এবং এর মর্ম সুদূরপ্রসারী।
ইসলামি জীবনব্যবস্থা পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে কোন প্রকার সামঞ্জস্য রাখে না। কারণ, পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্ম ও বিকাশ একটি বিশেষ ঐতিহ্যের প্রভাব-প্রতিপত্তির ছত্রছায়ায় ও এক বিশেষ পরিবেশে ঘটেছিল- যার উপর বস্তুবাদের প্রাধান্য রয়েছে এবং এক সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত তার উপর ধর্ম বিদ্বেষী ও আখলাক-চরিত্র ও সুস্থ মূল্যবোধের সাথে বিদ্রোহকারীদের শাসন ছিল। যেমন- এ সভ্যতা ও তার ইতিহাস সম্পর্কে অভিজ্ঞ ডঃ আল্লামা ইকবাল এ মতই ব্যক্ত করেছেন- 4 " ع ۔ رکه ورح اس مدینت کی رہ سکی نہ عقیف تھا
নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, নতুন নতুন শিল্প আবিষ্কার, বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন এবং ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য ও মহত্ত্ব, সরলতা ও বাস্তবতাপ্রিয়তা, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি দৃষ্টি এবং অপচয় ও অপব্যয় এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিকাশ ও জৌলুসপ্রিয়তা থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে পরস্পর সমন্বয় ও সংমিশ্রণ বর্তমানে অত্যন্ত সহজ। যদি মুসলিম দেশ ও সমাজগুলো স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে, ধীরস্থির ও সাহসিকতার সাথে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করার সামর্থ্য লাভ করে এবং তারা যদি বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভার দীপ্তি, ইসলামি শিক্ষা ও ইসলামি সভ্যতাকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে ঈমান ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। কারণেই তাদের অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে; সেই সাথে যদি নিজেদের ইসলামি স্বতন্ত্র সত্তা ও ঐত্যিহ্যের উপর গর্ব করার অনুপ্রেরণা তাদের মাঝে সক্রিয় থাকে।