📄 ঐক্যের অনন্য নিদর্শন
বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের নাম, যদিও তারা দূর-দূরান্তে বসবাস করে এবং তাদের ভাষা ও সভ্যতার মাঝে পার্থক্য রয়েছে, তদুপরি অন্যদের তুলনায় স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী এবং বেশির ভাগ তা আরবী ভাষায় ও নবী, সাহাবা, নবী-পরিবার ও নেককার ব্যক্তিগণের নাম থেকে গ্রহণ করা হয়। এসব নামের মাধ্যমে আল্লাহ্র প্রশংসা, একত্ববাদ ও দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং প্রিয় নবী (সা)-এর প্রতি ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে অধিকাংশ সময় 'মুহাম্মদ' ও 'আহমদ' নাম রাখা হয়।
মুসলমানদের মাঝে পরস্পর সাক্ষাতের সময় السلام عليكم বলার সাধারণ-রীতি রয়েছে। বিভিন্ন সময় কুরআনের শব্দ ও আয়াতের অংশ মুখে উচ্চারিত হয়। যেমন- الحمد لله - ماشاء الله - ان شاء الله انا الله وانا اليه راجعون - لا حول ولا قوة الا بالله.
এ ধরনের বাক্য বিভিন্ন প্রয়োজন ও সময়ে বলার রেওয়াজ রয়েছে। এ ধর্মীয় ও সভ্যতাগত ঐক্য, ফরয ও ওয়াজিবসমূহ, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের সময় আরো বেশি করে প্রকাশ পায়। সুতরাং, পাঁচ ওয়াক্ত নামায (বিভিন্ন দেশের সময়ের সাথে মিল রেখে) নির্ধারিত রাকাআতের সাথে বেশির ভাগ মসজিদে জামা'আতের সাথে আদায় করা হয়। আর এ জামা'আতে যে-কোন দেশের, যে-কোন ভাষার, যে কোন মুসলমান শরীক হতে পারে এবং তাতে স্থানীয় শিক্ষা ও হেদায়াত ছাড়াই শুধুমাত্র মুসল্লিদের চাহিদা অনুযায়ী যে কেউ ইমামতি করতে পারে। পবিত্র কুরআনই একমাত্র আসমানী ধর্মীয় গ্রন্থ- যা সকল দেশে ও সকল সময় তারতীল ও তাজবীদের সাথে তিলাওয়াত করা হয় এবং তা হেফজ করা হয়।'
এমনিভাবে সকল মসজিদে একই শব্দে আযান দেয়া হয়। রমযান মাস (মৌসুমের ভিন্নতা সত্ত্বেও) রোযার মাস হিসেবে পরিগণিত হয়। মুসলমানগণ দু'টি ঈদ, (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা) পালন করে এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য দু'রাকা'আত নামায আদায় করে। অতঃপর নিজেদের অবস্থানগত পার্থক্য সত্ত্বেও খুতবাতে সকল মুসলমান শরীক থাকে। এমনিভাবে হজ্জের জন্য সকলেই দূর-দূরান্ত হতে মক্কা শরীফে উপস্থিত হয়। আর এসব কিছুই ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে অবিরাম ঘটছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশৃংখলা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় কখনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। এসকল ঘটনা এমন এক ঐক্যের নমুনা পেশ করে- যার তুলনা কোন জাতি-গোষ্ঠী ও অপরাপর সমাজ ব্যবস্থায় পাওয়া যায় না।
টিকাঃ
১. এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকা (Encyclopaedia of Britennica)-তে মুহাম্মদ নামের শিরোনামে লেখা হয়েছে যে, কুরআনই একমাত্র কিতাব- যা বিশ্বে সর্বাধিক পাঠ করা হয়।
📄 পশ্চিমা পন্ডিতদের সাক্ষ্য
এ অনন্য ঐক্যের বিষয়টি বেশ কয়েকজন পশ্চিমা পণ্ডিত-চিন্তাবিদ ও গবেষক অনুভব করেছেন এবং এর স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। আমরা এখানে শুধু কয়েকটি সাক্ষ্য উল্লেখ করাকে যথেষ্ট মনে করছি।
হ্যামিলটন গিভ লিখেছেন
"ইসলাম একটি চিন্তা, যা অত্যন্ত সুশৃংখল। কিন্তু তা বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ঐক্যের আদলে প্রকাশ পেয়েছে। তা স্থান-কাল-পাত্রভেদে এবং স্থানীয় ও ভৌগোলিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ- পশ্চিম এশিয়ার ইসলামি কেন্দ্রের সাথে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার এবং মধ্যযুগের স্পেনের গভীর সম্পর্ক ছিল। তাদের সভ্যতা ঐ কেন্দ্রীয় সভ্যতারই একটি শাখা ছিল। তদুপরি তারা তাতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিশেষত্বের অধিকারী ছিল। ফলে, তারা পশ্চিম এশিয়ার উপরে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। এছাড়া, অন্যান্য বৃহত্তর ও স্বাধীন অঞ্চল, যেমন ভারত উপমহাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ রাশিয়ার মরুভূমি এলাকা থেকে চীনের সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত ভারসাম্যময় উপাদানসমূহ এভাবেই বিশেষ বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এরপরেও তারা সকলেই এবং তাদের প্রত্যেকেই সহজে বোধগম্য ইসলামি রঙকে ধারণ করে থাকে।"১
উইলফ্রেড কান্টওয়েল স্মিথ লিখেছেন: "মুসলমানদের সফলতাই হলো তাদের ধর্মের অভ্যন্তরীণ সফলতা। তারা যে শুধু যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী হয়েছে এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে, এমন নয়; বরং তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে তারা জীবনকে একটি সামগ্রিক রূপদানে সফল হয়েছে- যাকে সভ্যতা বলা হয়। ইসলামি সভ্যতার গঠন ও রূপদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী অংশগ্রহণ করেছিল। যেমন- আরব, গ্রীক, মধ্যপ্রাচ্যের সেমিটিক সভ্যতা, ইরানের সাসানী সভ্যতা ও ভারতীয় উপাদানসমূহ ভূমিকা পালন করেছে। এক্ষেত্রে, مسلمانوں প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তারা ঐ সকল উপাদানকে একটি সমজাতীয় জীবনপদ্ধতিতে একাকার করেছে এবং তাকে আরো উন্নত করেছে। একমাত্র ইসলামই তাকে পূর্ণতা দান করেছে এবং তা ব্যাহত রাখার মত শক্তি সরবরাহ করেছে। জীবনের প্রতিটি শাখায় তা ইসলামি রূপদান করেছে; যদিও তার গঠনগত উপাদানসমূহের বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি ভিন্ন ছিল।
"ইসলামি জীবনপদ্ধতি সমাজকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করেছে। তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন মৌলিক ভূমিকা পালন করেছে। এ ইসলামি বিধান স্বীয় শক্তিশালী ও নির্ধারিত প্রবাহের মাধ্যমে সামাজিক রীতি- নীতি ও ইবাদত-বন্দেগী হতে শুরু করে মালিকানা পর্যন্ত সকল বিষয়কে সুশৃংখল ও সুসংহত করেছে। ইসলামি বিধিবিধানই ইসলামি সমাজকে কর্ডোভা থেকে মুলতান পর্যন্ত সকলকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। এ বিধিবিধানই মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং তাদের জীবনের সকল কর্মতৎপরতাকে ফেরেশতাসুলভ বৈশিষ্ট্য দান করে অর্থবহ করেছে। সমাজকে ধারাবাহিকতা প্রদান করে তা যুগের মাঝে ঐক্য সৃষ্টি করেছে। ফলে, রাজা-বাদশাহগণ ধারাবাহিকভাবে আগমন ও প্রস্থান করেছেন কিন্তু ভূপৃষ্ঠে রব্বানী বিধান অনুযায়ী সমাজ গঠনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় তাদের অবস্থান অত্যন্ত গৌণ ছিল।"১
টিকাঃ
১. Hamilton A. R. Gibb, Studies on Civilization of Islam. (London-1962) p. 3.
১. Wilfared Cantwell Smith. Islam in Modern History. (New York. 1957) p. 36-37.
📄 ইসলামি সভ্যতার প্রাণ ও প্রকৃতি
ইসলামি সভ্যতা এমন এক সভ্যতা- যার প্রাণ ও প্রকৃতিই হলো আল্লাহর পবিত্র নাম ও তাঁর প্রতি ঈমান ও ইয়াকীন। এ সভ্যতা আল্লাহর রঙে রঙিন হওয়া এবং ঈমান ও আমলের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এ জন্য তাকে ধর্মীয় রঙ, রব্বানী প্রকৃতি ও ঈমানী প্রাণ থেকে পৃথক করা অসম্ভব। তাই যদি কখনো তার উপর জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণা, জাহিলী অহমিকা, বংশগত দ্বন্দ্ব, বস্তুবাদী মানসিকতা, নৈতিক অবক্ষয়, কিংবা সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করে, তবে তা সাময়িক বা বহিরাগত প্রভাবের ফল। অথবা ঐ ধর্ম, সমাজ ও সামাজিকতার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ঐ মুসলিম জনগোষ্ঠী বসবাস করে। অথবা তা ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে প্রভাবিত ও উপকৃত না হওয়া এবং পবিত্র কুরআন ও হাদীস, ইসলামের প্রথম ও মৌলিক উৎসের সাথে গভীর সম্পর্ক না থাকার কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
📄 ইসলামি ইতিহাসে সংস্কার ও সংশোধন আন্দোলনের সফলতার রহস্য
এজন্য মুসলিম দেশ ও জাতি-গোষ্ঠীর ইতিহাসে সংস্কার ও সংশোধন, ফাসাদ ও বিদ'আত এবং জাহিলীপনার প্রভাবের বিরুদ্ধে জিহাদ ও প্রতিরোধের এমন অব্যাহত ধারা রয়েছে- যার দৃষ্টান্ত ইসলাম ছাড়া অন্য কোন জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্মীয় ইতিহাসে পাওয়া যায় না। এমনিভাবে, এ মুবারক প্রচেষ্টায় এমন সফলতা অর্জিত হয়েছে যা অন্য সকল জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্মীয় ইতিহাসে বিরল। আর এমনটা হওয়া এ জন্য সম্ভব হয়েছে, কারণ- এ প্রচেষ্টা এ উম্মতের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, তার প্রাণ ও তার চিন্তা-চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তা ঐ সকল মূলনীতি ও বুনিয়াদী শিক্ষার ব্যাখ্যা, যার উপর এ উম্মতের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত এবং এখান থেকে তাদের ঐতিহাসিক সফর শুরু হয়েছিল।'
টিকাঃ
১. এ বিষয়ে লেখকের গ্রন্থ 'তারিখে দাওয়াত ওয়া আযীমত' প্রথম খন্ডের ভূমিকা এবং এ সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে পঞ্চম খন্ড দেখা যেতে পারে।